দ্বীনের মৌলিক ভিত্তিসমূহের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা

দ্বীনের মৌলিক ভিত্তিসমূহের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা30%

দ্বীনের মৌলিক ভিত্তিসমূহের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা লেখক:
: মোঃ মাঈনুদ্দিন তালুকদার
প্রকাশক: শহীদ আল্লামা বাকের সাদর (রহঃ) বিশ্ব সম্মেলন কমিটি,কোম-ইরান।
বিভাগ: নবুয়্যত

দ্বীনের মৌলিক ভিত্তিসমূহের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 26 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 12896 / ডাউনলোড: 3644
সাইজ সাইজ সাইজ
দ্বীনের মৌলিক ভিত্তিসমূহের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা

দ্বীনের মৌলিক ভিত্তিসমূহের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা

লেখক:
প্রকাশক: শহীদ আল্লামা বাকের সাদর (রহঃ) বিশ্ব সম্মেলন কমিটি,কোম-ইরান।
বাংলা

দার্শনিক যুক্তির সম্মুখে বস্তুবাদের অবস্থানঃ

যান্ত্রিক বস্তুবাদ এ যুক্তির মোকাবিলায় কোন প্রকার অসুবিধার সম্মুখীন হয় না। কেননা আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে,যান্ত্রিক বস্তুবাদ প্রাণ,অনুভূতি ও চিন্তাকে এভাবে ব্যাখ্যা করে যে,এ বিষয়গুলো বস্তুদেহসমূহের বিচ্ছিন্নতা ও একীভূতি থেকে অর্জিত হয়েছে-কোন প্রাচুর্য থেকে নয়। অতএব,এ বিচ্ছিন্নতা ও একীভূতির মাধ্যমেই যান্ত্রিক শক্তি অনুসারে অংশসমূহের গতি নামক নূতন কিছু অর্জিত হয়েছে।

কিন্তু নব্য বস্তুবাদ বস্তুর প্রকরণগত ও অবস্থাগত বিবর্তন ও বিকাশের মাধ্যমে বস্তু বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে -এ বিশ্বাস হেতু উক্ত যুক্তির সম্মুখে সমস্যায় পতিত হয়। তবে এ প্রতিষ্ঠান গুণগত বা অবস্থাগত বিবর্তনকে এমন এক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করে যা পূর্বোল্লিখিত দ্বিতীয় বিষয়টির (অর্থাৎ নিম্ন পর্যায়ের বস্তু উচ্চ পর্যায়ের বস্তুর অস্তিত্বগত কারণ হতে পারে না) সাথে সমন্বয়  রক্ষা করে এবং একমাত্র পদার্থকেই এ অবস্থাগত বা গুণগত বিবর্তনের জন্য যথেষ্ট মনে করে। অর্থাৎ পদার্থই এ অবস্থাগত ও গুণগত বিবর্তন ও বিকাশের উৎস। আর এটি বিত্তহীন ব্যক্তির আপন সম্পদের জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা পূর্বোল্লিখিত এ উদাহরণের মতো;দ্বিতীয় বিষয়টির সাথে বৈপরীত্য প্রদর্শন করে না।

বরং এ ব্যাখ্যাটি এরূপ যে,প্রতিটি বিকশিত ও বিবর্তিত রূপ এবং এর ধারণকৃত উপাদানসমূহ পদার্থের মধ্যে সৃষ্টির আদি থেকেই বিদ্যমান। যেমন ডিমের মধ্যে মুরগী এবং পানির মধ্যে গ্যাস সৃষ্টির আদিতেই উপস্থিত ছিল। কিন্তু কিরূপে পদার্থ সমসাময়িককালে ডিম,আবার মুরগী;কিংবা গ্যাস আবার পানিও হতে পারে? দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এর জবাব নিম্নরূপে প্রদান করে :

এটা হলো পারস্পরিক বৈপরীত্য যা প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক নিয়ম। প্রতিটি পদার্থই স্বয়ং তার বিপরীত উপাদানের অধিকারী এবং এ দু পরস্পর বিপরীত উপাদানের মধ্যে এক প্রকার নিরবচ্ছিন্ন দ্বন্দ্ব বিরাজমান। এ দ্বন্দ্বের ফলেই পদার্থের বিবর্তন ঘটে থাকে। যেমন যখন ডিমের খোলস ভেঙ্গে যায় তখন একটি মুরগীর বাচ্চা তা থেকে বের হয়ে আসে। আর এভাবেই পদার্থ সর্বদা পূর্ণতা লাভ করতে থাকে। কারণ পারস্পরিক বৈপরীত্যের দ্বন্দ্বের ফলে যে বৈপরিত্য (نقيض ) অর্জিত হয়েছে তা পরবর্তী দু বৈপরীত্যের একটি হিসাবে কাজ করে।

অতএব,আমরা বলতে পারি নব্য বস্তুবাদ এ পদ্ধতির দ্বারা বুঝাতে চায় যে,প্রতিটি পদার্থ স্বয়ং তার বিপরীতেরও ধারণকারী। সুতরাং নিম্নলিখিত যে কোন একটি অর্থ উদ্দিষ্ট হতে পারে :

১. তবে কি ডিম এবং মুরগীর বাচ্চা পরস্পর বিরোধী বস্তু এবং ডিমই কি মুরগীকে অর্জন করে ও প্রাণ নামক বিশেষ গুণকে এর মধ্যে অস্তিত্বে আনে? অর্থাৎ মৃত বস্তু জীবন ও অস্তিত্ব সৃষ্টি করে এবং প্রাণ ও জীবন দান করে। তাহলে তো তা দরিদ্র ও বিত্তহীন ব্যক্তির সম্পদহীন অবস্থায় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করার মতোই যা  উল্লিখিত ভূমিকার সাথে বিরোধ সৃষ্টি করে।

২. অথবা এর অর্থ হলো ডিম বাচ্চাকে অস্তিত্বে আনে না,বরং তার অপ্রকাশিত অস্তিত্বকে প্রকাশ করে। কারণ প্রতিটি বস্তুরই নিভৃতে তার বিপরীত বস্তুও বিদ্যমান। অর্থাৎ ডিম যে অবস্থায় ডিম সে অবস্থায় বাচ্চাও বটে। যেন সে ছবির মতো-এক দিক থেকে একরকম আবার অন্য দিক থেকে বিভিন্ন রকম।

তাহলে এটা পরিষ্কার যে,ডিম যে অবস্থায় ডিম আবার সে অবস্থায়ই যদি বাচ্চাও হয়,তবে পূর্ণতার জন্য কোন কার্য সম্পাদিত হয়নি (অর্থাৎ পূর্ণতা অর্জিত হয়নি)। কারণ যা এখন বিদ্যমান তা প্রথম থেকেই অস্তিত্ববান ছিল। যেমন কোন ব্যক্তি তার পকেট থেকে টাকা বের করল এবং তাতে অতিরিক্ত কোন টাকা সংযোজিত হয়নি। কারণ এ টাকা পূর্ব থেকেই তার পকেটে ছিল। যদি তাই হয়,তবে পূর্ণতার গতি (حركت تكاملي ) যা নতুন বস্তু সৃষ্টি করে,তার অর্থ কি?

অতএব,এর যথোপযুক্ত ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য আমাদেরকে বলতে হবে যে,ডিম,বাচ্চা বা মুরগী ছিল না,বরং সেটার জন্য যোগ্য ছিল-যা বাচ্চায় পরিণত হয়েছে। আর এভাবে ব্যাখ্যা করেই আমরা ডিমকে প্রস্তরখণ্ড থেকে পৃথক করতে পারি। কারণ প্রস্তরখণ্ড কখনই মুরগী হতে পারবে না। অপরদিকে মুরগীর ডিমের এ সম্ভাবনা আছে যে,উপযুক্ত পরিস্থিতি ও শর্ত সাপেক্ষে তা মুরগীর বাচ্চায় পরিবর্তিত হতে পারবে। সর্বোপরি কথা হলো সৃষ্টি ও সংগঠনের জন্য শুধু সম্ভাবনাই যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ যদি কখনও ডিম বাচ্চায় পরিণত হয়,তবে শুধু সম্ভাবনার ভিত্তিতে এ পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা যাবে না।

অপরদিকে বস্তুর এ রূপান্তর যদি অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের ফল হয়,তবে উক্ত রূপান্তরকেও অবশ্যই এ অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের ভিত্তেতে ব্যাখ্যা করা উচিত। মুরগীর ডিমের অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য অবশ্য পানির অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য থেকে ভিন্ন। অর্থাৎ ডিমের অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের ফল হলো মুরগী,আর পানির অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের ফল হলো গ্যাস। এ কল্পনার উপর ভিত্তি করে সহজেই বস্তুর শেষ রূপান্তর থেকে বস্তুর গাঠনিক একক (অর্থাৎ ইলেকট্রন,প্রোটন ও নিউট্রন) পর্যন্ত আলোচনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

প্রোটন একটি অসমস (ضد ),ইলেকট্রন অপর একটি অসমস ( ضد )। তাহলে নিউট্রন কি? প্রতিটি বস্তুই কি এ অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের ভিত্তিতে একটি বিশেষ রূপ পরিগ্রহ করে? অর্থাৎ প্রোটন বস্তুর অভ্যন্তরে বিদ্যমান এবং পরবর্তীতে গতি ও পারস্পরিক সংস্পর্শের ফলে কি মুরগী ও ডিমের মতো  প্রকাশিত রূপ লাভ করে?

যদি তাই হয়,তবে বস্তুর রূপান্তরকে কিরূপে ব্যাখ্যা করতে পারি? কারণ অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের যুক্তি অনুসারে আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে,বস্তসমূহ অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের ক্ষেত্রে পরস্পর পৃথক। অর্থাৎ বস্তুসমূহের অভ্যন্তরীণ মৌলিক সত্তা পরস্পর ভিন্ন। কিন্তু অধুনা বিজ্ঞান বস্তুর মৌলিক সত্তাগত অভিন্নতায় বিশ্বাসী। আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় বস্তুসমূহের অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহ বা মৌলিক সত্তাসমূহ অভিন্ন এবং তারা যে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে তা তাদের এ অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহের (যারা সর্বদা এক ও অভিন্ন) ভিত্তিতে হতে পারে না।

তবে  প্রোটন নিউট্রনে বা নিউট্রন প্রোটনে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ বস্তুর বাহ্যিক রূপ (পরমাণু ও মৌলিক সত্তাগত অভিন্নতা বিবেচনা না করলে) পরিবতির্ত হতে পারে। কিন্তু বস্তুর অভ্যন্তরীণ মৌলিক সত্তা সর্বদা একই থাকে যদিও তাদের রূপসমূহ বিভিন্ন। অতএব,কিরূপে এ ধারণা করা যায় যে,অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য ও বস্তুর অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহের পার্থক্যের কারণে বস্তুসমূহ বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে?

মুরগী ও এর ডিমের উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করে উপস্থাপন করা যায়। বিভিন্ন ডিম বিভিন্ন বাচ্চায় পরিণত হয়। তাহলে বস্তুসমূহের বিভিন্ন রূপের কারণ হলো তাদের অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য -এ ধারণার উপর ভিত্তি করে বলতে হয় যে,এ ডিমগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ গঠনেও পরস্পর বিভিন্ন ধরনের। অতএব,মুরগীর ডিম এবং অন্য কোন পাখির ডিম দু টি ভিন্ন বাচ্চা অর্থাৎ মুরগী এবং অন্য পাখিতে পরিণত হয়। কিন্তু যদি উভয়েই একই প্রকারের অর্থাৎ মুরগীর ডিম হয়,তবে বলা যাবে না যে,ডিম দু টির অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের কারণেই দু টি ভিন্ন রূপে পরিণত হয়েছে।

অতএব,দেখা যায় যে, বস্তুরূপের বৈসাদৃশ্য,অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের কারণ -নব্য বস্তুবাদের এ ব্যাখ্যা এবং অধুনা বিজ্ঞানের বস্তুর অভ্যন্তরীণ মৌলিক সত্তার অভিন্নতায় যে বিশ্বাস তা দু টি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়।

৩. অথবা এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভবত বুঝানো হয়েছে যে,স্বয়ং মুরগীর ডিম দু টি অসমস বা দুটি স্বাধীন বিপরীত সত্তার ধারক যেখানে প্রতিটিই একটি বিশেষ অস্তিত্বের অধিকারী।

তাদের একটি হলো : জীবন একক (نطفه ) যার কারণ স্বয়ং মুরগীর ডিমের অভ্যন্তরে রূপ লাভ করে এবং অপরটি হলো : যা মুরগীর ডিমের অন্যান্য উপাদানে সমন্বিত। এ দু টি অসমস ডিমের অভ্যন্তরে সংঘর্ষ ও দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়,যার ফলে তাদের একটি অপরটি অপেক্ষা অধিকতর প্রকাশ লাভ করে অর্থাৎ জীবন একক (نطفه ) জয়ী হয় এবং ডিম মুরগীর বাচ্চা আকারে প্রকাশিত হয়। অসমসদের (اضداد ) মধ্যকার এ দ্বন্দ্ব সর্বদা মানুষের জীবনে বিদ্যমান ছিল এবং দার্শনিক চিন্তায় তো বটেই,এমনকি মানুষের দৈনন্দিন চিন্তায়ও তা  আদিকাল থেকে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু কেন ডিমের অভ্যন্তরস্থ জীবন একক ও ডিমের প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে বিদ্যমান ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে পারস্পরিক বৈপরীত্য (تناقض ) নামকরণ করব? কেন বীজ,মাটি ও বাতাসের মধ্যকার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে পারস্পরিক বৈপরীত্য বলব? এবং কেনইবা মাতৃগর্ভে ভ্রুণ এবং তা যে সকল খাদ্য উপাদান গ্রহণ করে তাদের মধ্যকার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে পারস্পরিক বৈপরীত্য নামকরণ করব? প্রকৃতপক্ষে এগুলো নিছক নামকরণ ছাড়া আর কিছুই না এবং এটাই বলা শ্রেয় যে,তাদের (অসমসদ্বয়) একটি অপরটিতে বিগলিত হয় বা অপরটির সাথে একীভূত হয়।

ধরা যাক,একে আমরা পারস্পরিক বৈপরীত্য নামকরণ করব। অতএব,যদবধি আমরা বলব যে,দু টি অসমসের মধ্যে বিশেষ দ্বন্দ্বই বিকশিত নূতন বস্তুর আবির্ভাবের কারণ যা পূর্বের  অসমসদ্বয়ের উপাদনাসমূহের সমষ্টি অপেক্ষা বেশি,তদবধি এটা দ্বারা আমাদের সমস্যা দূরীভূত হয় না। কারণ এ বেশি অংশ কোথা থেকে এসেছে? দু টি অসমসের (যাদের প্রতিটিই তৃতীয় কোন বিষয়ের ঘাটতিযুক্ত) পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ফলেই কি এ বেশি অংশটুকু উদ্ভাবিত হয়েছে? এ ব্যাখ্যা পূর্বোল্লিখিত বিষয়ত্রয়ের দ্বিতীয়টির (নিম্ন পর্যায়ের বস্তু উচ্চ পর্যায়ের বস্তুর কারণ হতে পারে না) ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অসমস এবং দু টি অসমসের মধ্যকার সংঘর্ষই প্রকৃত বিকাশ ও বিবর্তনের কারণ-এ ধরনের কোন উদাহরণ কি আমরা প্রকৃতিতে পেতে পারি? কিরূপে এক অসমস পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মাধ্যমে নিজের বিপরীতের বিকাশ ও বিবর্তনে সাহায্য করতে পারে যেখানে অসমতা বা দ্বন্দ্বের অর্থ হলো প্রতিরোধ বা কোন কিছু গ্রহণে আপত্তি এবং প্রতিটি প্রতিরোধই আপন শক্তির বিপরীতকে পরাজিত করতে বদ্ধপরিকর। অর্থাৎ বিপরীতের বিকাশ ও পূর্ণতার বিরোধী?

আমরা সকলেই জানি যে,সাঁতারু যখন সমুদ্রতরঙ্গের সম্মুখীন হয় তখন সমুদ্রতরঙ্গ তাকে সম্মুখে এগুতে বাধাগ্রস্ত করে এবং সাঁতারুকে গতিশীল করার পরিবর্তে তার অগ্রসর হওয়ার শক্তিকে হরণ করে। যদি অসমসদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ (যে কোন অর্থেই হোক না কেন) ডিমের  বিকাশ এবং এর মুরগীতে বিবর্তিত হওয়ার মূলে বিদ্যমান থাকে,তবে যে বিকাশ অসমসমূহের  দ্বন্দ্বের ফলে পানিকে গ্যাসে পরিণত করে বা গ্যাস পানিতে পরিণত হয়,তা কোথায়?

প্রকৃতি আমাদেরকে ঐ সকল অসমসের সাথে পরিচয় করায় যাদের মধ্যকার সংঘর্ষ,এমনকি সম্পৃক্তি,বিবর্তন ও বিকাশের কারণ তো নয়ই,বরং বিনাশ ও ধ্বংসের কারণ হয়। ধনাত্মক প্রোটন পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং ঋণাত্মক ইলেকট্রন উক্ত নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ করে। যদি এ দু টি বিপরীতধর্মী সত্তা পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়,তবে পরমাণু ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং ফলশ্রুতিতে উক্ত পদার্থ প্রকাশিত অবস্থা থেকে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে।

মোটকথা পদার্থ (এর বহির্ভূত) কোন বাহ্যিক সাহায্য ও সহযোগিতা ছাড়া প্রকৃত বিকাশ ও পূর্ণতা লাভ করতে এবং উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে না। বিশেষ করে,পদার্থ কখনই স্বয়ং পূর্ণতা প্রাপ্তির মাধ্যমে জীবন,অনুভূতি ও অনুধাবনের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে না যদি না মহান আল্লাহ পদার্থকে এ সকল বিশেষত্ব অর্জনে সাহায্য করে। বিকাশ ও বিবর্তনের কার্যক্রমে পদার্থের ভূমিকা শুধুমাত্র জীবন,অনুভূতি ও উপলব্ধির বিশেষত্বকে গ্রহণ করার জন্য উপযুক্ততা অর্জন ব্যতীত আর কিছুই নয়। যেমন কোন শিশু তার শিক্ষকের কাছে জ্ঞান নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়।

অতএব,বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহ অতীব বরকতময়।

মহান আল্লাহর গুণসমূহ

এখন যেহেতু প্রজ্ঞা ও কৌশল অনুযায়ী সৃষ্টিকারী,প্রতিপালনকারী এবং জগতের শৃঙ্খলা বিধানকারী হিসাবে মহান আল্লাহর প্রতি আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি স্বভাবতঃই তাঁর সৃষ্টি ও সৃষ্টের মাধ্যমে তাঁর গুণাবলীর সাথেও আমরা পরিচিত হব এবং এ সৃষ্টসমূহের সাহায্যে তাঁর গুণাবলীকে পর্যালোচনা করব। যেমনি করে আমরা একজন প্রকৌশলীকে তাঁর তৈরিকৃত ইমারতের বৈশিষ্ট্য অনুসারে কিংবা একজন লেখককে তাঁর লিখিত বইয়ের বিষয়বস্তু অনুসারে অথবা একজন শিক্ষককে তাঁর শিক্ষার্থীদের গুণ ও বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সঠিকভাবে চিনতে পারি।

এরূপে আমরা মহান স্রষ্টার কতিপয় গুণ,যেমন তাঁর জ্ঞান,প্রজ্ঞা,জীবন,ক্ষমতা,দর্শন ও শ্রবণ সম্পর্কে অবগত হতে পারব। কারণ এ সৃষ্টিজগৎ সুনিপুণতা ও সূক্ষ্ম কার্যে পরিপূর্ণ (যার জন্য গভীর মনোযোগের প্রয়োজন),যা আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাক্ষ্য প্রদান করে এবং এ সুনিপুণ বিন্যাস ব্যবস্থার গভীরে এমন সব শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে যারা তাঁর ক্ষমতা ও আধিপত্যকে প্রদর্শন করে। এছাড়া বিচিত্র রূপ,বর্ণ ও বিভিন্ন প্রকারের জ্ঞান ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপলব্ধিও বিদ্যমান যা মহান আল্লাহর জীবন ও উপলব্ধিকে বর্ণনা করে। জগতের এ বিন্যাস ব্যবস্থায় বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে এক বিশেষ সমন্বয় ও সুসংগতি প্রতিষ্ঠিত যা সৃষ্টিকর্তার একত্বের প্রমাণ বহন করে। আর সে সাথে প্রমাণ করে তাঁর জ্ঞানের একত্বকেও যা থেকে এ মহাজগৎ সৃষ্ট ও সিদ্ধি লাভ করেছে।

ন্যায়পরায়ণতা (عدل )ও দৃঢ়তা (استقامت ) :

আমরা প্রত্যেকেই (ফেতরাতগত ও তাৎক্ষণিকভাবে) আমাদের জীবন ব্যবস্থায় এক শ্রেণির সাধারণ মূল্যবোধে বিশ্বাসী। এ মূল্যবোধ গুরুত্বারোপ করে যে,ন্যায়পরায়ণতা সত্য ও কল্যাণকর;জুলুম বা অত্যাচার মিথ্যা ও অকল্যাণকর। ন্যায়পরায়ণ পৃথিবীতে সম্মান ও পরকালে পুরস্কারের উপযুক্ত। আর অত্যাচারী ও সীমা লঙ্ঘনকারী পৃথিবীতে নিন্দিত ও আখেরাতে শাস্তির যোগ্য। এ মূল্যবোধসমূহ স্বভাবজাত ও ফেতরাতগতভাবেই মানুষের আচরণের ব্যাখ্যা প্রদানের মূল,তবে যখন অজ্ঞতা ও সুবিধাবাদীতার মতো কোন প্রতিকূলতা না থাকে। অতএব,যদি কোন মানুষ সত্য ও মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে অথবা বিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকে এবং যখন ব্যক্তিগত কোন বাধা ও কোন বিশেষ উদ্দেশ্য তাকে এ মূল্যবোধসমূহ থেকে বিচ্যুতিতে বাধ্য না করে,তবে সে সত্যকে মিথ্যা এবং বিশ্বস্ততাকে বিশ্বাসঘাতকতার উপর প্রাধান্য দেয়। অর্থাৎ যে এমন কারো উপর নির্ভরশীল নয়,যে তাকে এ সকল মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য করতে পারে অথবা কোন বিশেষ উদ্দেশ্য যাকে বিশ্বাসঘাতকতা ও অত্যাচারের পথে পরিচালিত না করতে পারে,সে ব্যক্তির সাথে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির মতো আচরণ করাই যুক্তিযুক্ত। অর্থাৎ ঠিক সেরকম আচরণ যা মহান আল্লাহর জন্যই সঠিক এবং তিনিও ঐ ধরনের ব্যক্তির সাথে এরূপ আচরণই করে থাকেন। এ সমস্ত মূল্যবোধ মহান আল্লাহরই আওতাধীন এবং আমরা যা ফেতরাতগত জ্ঞানের দ্বারা অনুধাবন করতে পারি। কারণ মহান আল্লাহই আমাদেরকে এ জ্ঞান দান করেছেন এবং ঐ অবস্থায় মহান প্রভু তাঁর মহাপরাক্রম ও জগতের সর্বত্রব্যাপী বিরাজমান শক্তি ও আধিপত্য এবং সকল পূর্ণতাব্যঞ্জক গুণের অধিকারী হওয়ার কারণে কোন  কিছু থেকে লাভবান হওয়ার মুখাপেক্ষী নন। এখানেই আমরা বিশ্বাস স্থাপন করব যে,মহান আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ এবং তিনি কাউকেই অত্যাচার করার অনুমতি প্রদান করেন না।

মহান আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতা প্রতিদানের প্রমাণবহ :

ইতোপূর্বে আমরা জেনেছি যে,যে সকল মূল্যবোধে আমরা বিশ্বাসী সে সকল মূল্যবোধ আমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা,দৃঢ়তা,বিশ্বস্ততা,সততা,প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ও অন্যান্য সৎ গুণের দিকে আকৃষ্ট করে এবং ঐগুলোর বিরোধী কোন বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব থেকে আমাদেরকে দূরে রাখে। এ মূল্যবোধসমূহ শুধু আমাদেরকে কিছু  গুণের প্রতি আকৃষ্ট বা কিছু গুণের প্রতি বিকর্ষিতই করে না,বরং এগুলোর বিনিময়ে যথোপোযুক্ত প্রতিদানও যাঞ্ছা করে থাকে। ফেতরাতগত জ্ঞান নিরপেক্ষভাবেই অনুধাবন করে যে,অত্যাচারী ও বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি পাওয়া উচিত এবং ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বাসী,যে ন্যায়,বিশ্বাস ও সততার পথে নিজেকে উৎসর্গ করে তার পুরস্কৃত হওয়া উচিত। অবশ্য আমাদের প্রত্যেকেরই অস্তিত্বের গভীরে এমন একটি অবস্থা বিরাজমান যা অত্যাচারী সীমা লঙ্ঘনকারীকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করে;আর ন্যায়পরায়ণ ও সৎ কর্মপরায়ণকে উৎসাহ ও স্বীকৃতি দান করে। এরূপ প্রতিক্রিয়ার অনুপস্থিতির কারণ,হয় কোন ব্যক্তির সঠিক অবস্থান গ্রহণে অক্ষমতা অথবা তার ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত থাকার বহিঃপ্রকাশ।

যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বিশ্বাস করব যে,মহান আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ এবং যথাযথ প্রতিদান প্রদানে মহাপরাক্রমশালী;কোন কিছুই ঐ সকল মূল্যবোধের জন্য প্রতিশ্রুত প্রতিদান প্রদানে তাঁকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না এবং তিনি সৎ কর্মপরায়ণ ও দুষ্কর্ম পরায়ণের প্রত্যেককেই তাদের সঠিক প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে অতীব শক্তিধর,ততক্ষণ পর্যন্ত স্বভাবতঃই আমরা বিশ্বাস করব যে,মহান আল্লাহ পুণ্যবানকে তাঁর পুণ্য অনুসারে পুরস্কৃত করেন;আর অত্যাচারিতের প্রাপ্য অত্যাচারীর নিকট থেকে আদায় করেন। কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে,এ প্রতিদানগুলোর অধিকাংশই মহান আল্লাহর আওতাধীন হওয়া সত্ত্বেও এ পৃথিবীতে কার্যকর হয় না।

অতএব,আমাদের পূর্বোল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে,প্রতিদানের জন্য এক আসন্ন দিবসের অস্তিত্ব রয়েছে-যেদিন কোন এক অখ্যাত ব্যক্তি,যে নিজেকে এক মহান উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলেন,কিন্তু তাঁর এ ত্যাগের ফল পার্থিব জীবনে আহরণ করতে পারেননি এবং যে অত্যাচারী তার শাস্তি প্রাপ্তি থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল,শত অত্যাচারিতের রক্তের উপর দিয়ে আপন পথ রচনা করেছিল,হরণকৃত সম্পদের বিনিময়ে সুখের নীড় গড়েছিল-তাদের প্রত্যেকেই ন্যায়-নীতির পরাকাষ্ঠে যথাযথ প্রতিদান লাভ করবে। আর এ আসন্ন দিবসটিই হলো কিয়ামত বা পরকাল। সেদিন এ মূল্যবোধসমূহের প্রতিটিই মূর্তরূপে প্রতীয়মান হবে এবং এমন একটি দিবস ব্যতীত প্রাগুক্ত মূল্যবোধসমূহই অর্থহীন।

প্রেরিত

(রাসূল)

v নবুওয়াতের সাধারণ আলোচনা

v বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত

রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীর সংখ্যা

ইসলামের নবী (সা.) খাদিজার পর একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সাওদা , আয়েশা , গাজিয়া , হাফসাহ , উম্মে হাবিবা , উম্মে সালামাহ , যয়নাব বিনতে যাহেশ , যয়নাব বিনতে খুযাইমাহ , মাইমুনাহ , জুয়াইরিয়াহ , সাফিয়াহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

এখন যে পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-কে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে হয়েছে , সে সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।

মূলতঃ কয়েকটি উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) একাধিক বিয়ে করেছিলেন:

1.অনাথ ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের আত্মসম্মান রক্ষা করার জন্যে , যারা ইতোপূর্বে সম্মান ও প্রতিপত্তির সাথে জীবন যাপন করতেন , কিন্তু স্বীয় অভিভাবককে হারানোর ফলে তাদের সম্মান প্রতিপত্তি এখন বিপর্যস্ত , মহানবী (সা.) তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। নতুবা তাদের গোত্র তাদেরকে ফিরিয়ে নিত এবং তাদেরকে কুফর করতে ও ইসলামের অস্বীকৃতিতে বাধ্য করত। যেমন : সাত্তদা , যার স্বামী হাবাশায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার পর পরলোক গমন করেছিলেন। ফলে তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিলেন।

রাসূল (সা.) খাদিজাকে হারানোর পর বিপত্নীক ছিলেন এবং সাওদার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

যয়নাব বিনতে খুযাইমা ছিলেন রাসূলের অপর এক স্ত্রী। তিনি এক বিধবা রমণী ছিলেন যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর একদিকে অভিবাবকহীন এবং অপরদিকে দারিদ্রকবলিত হয়ে পড়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন দানশীলা , উদার এবং উম্মুল মাসাকীন (নিঃস্বদের মাতা) আল্লাহর রাসূল (সা.) যয়নাবের সম্মান রক্ষার্থে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যয়নাব বিনতে খুযাইমা রাসূলের জীবদ্দশায়ই পরলোক গমন করেন।

উম্মে সালমাও ছিলেন বয়স্কা ও অনাথ সন্তানের মাতা , ঈমানদার। তিনিও নবী (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

2.প্রচলিত অবস্থার পরিবর্তন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভ্রান্ত রীতি-নীতির প্রাচীর চূর্ণ করে দেয়ার জন্যে তাঁর ফুফাত বোন যয়নাব বিনতে জাহাশের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন , যিনি রাসূলের পালক পুত্র যায়েদ ইবনে হারিসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যায়েদের সাথে যয়নাবের যে বিবাহ মহানবী (সা.)-এর নির্দেশানুসারে সম্পন্ন হয়েছিল তা স্বয়ং ইসলামের শ্রেণী বৈষম্যহীন বিশেষত্বেরই দৃষ্টান্ত। কারণ , যয়নাব ছিলেন কোরাইশ অধিপতি আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্রাদের মধ্যে একজন , আর যায়িদ ছিল পারিবারিক দিক থেকে কৃতদাস , যিনি রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে মুক্তি পেয়েছিলেন।

যয়নাব যেহেতু অভিজাত পরিবারের ছিলেন , সেহেতু যায়েদের সাথে দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ করত ; আর এভাবে নিজের দাম্পত্য জীবনে তিক্ততা সৃষ্টি করত এবং রাসূল (সা.) তাদেরকে শতভাবে উপদেশ দিলেও তাতে কোন ফল হয়নি। অবশেষে যায়েদ যয়নাবের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিল এবং তাকে তালাক দিয়েছিল।

যয়নাব তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর আদেশে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন , যাতে মানুষের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার ও অযৌক্তিক রীতি-নীতির মূলোৎপাটিত হয়। (যেহেতু তারা পালক পূত্রকে স্বীয় প্রকৃত পুত্র বলে মনে করত এবং তার স্ত্রীকে নিজের জন্যে নিষিদ্ধ মনে করত)।35

খ্রিস্টবাদী কিছু লেখক এ বিষয়টির ক্ষেত্রে (হযরতের একাধিক বিবাহ) এতটা বিচ্যুত ও কুরটনাকারী হয়েছিল যে লিখেছিল : আল্লাহর রাসূল যয়নাবের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়েছিলেন! এ বক্তব্যটি এতটা অনর্থক ও অযৌক্তিক যে তা সমস্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির পরিপন্থী। কারণ যদি নবী (সা.) কুমন্ত্রনা ও এ ধরনের ধ্যান- ধারণার বশবর্তী হতেন কিংবা যয়নাবের রূপ সৌন্দর্য এতটা মনোহারী ছিল যে , হযরতকে প্রেমাসক্ত করে ফেলেছিল যদি তাই হতো , তবে কেন যখন যয়নাব কুমারী ও বিশেষ আকর্ষণের অধিকারী ছিল আর রাসূলও (সা.) উদ্দাম যৌবনের অধিকারী ছিলেন , তখন কেন তার প্রতি আসক্ত হলেন না ; বিশেষ করে এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে যয়নাব তো তখনও তার নিকট অপরিচিত ছিল না ? বরং রাসূলের নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই তিনি পরিগণিত হতেন এবং পারিবারিক পরিচিতের মাধ্যমে তারা পরস্পরের সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

3.বন্দী ও দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্যে ; যেমন , জুয়াইরিয়াকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। জুয়াইরিয়া ছিলেন সম্ভ্রান্ত বনি মুসতালিক গোত্রের কন্যা , যিনি ইসলামী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দী হয়েছিলেন। মহানবী (সা.) হারেসের কন্যা জুবাইরিয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। হারেস ছিলেন গোত্রপতি। মুসলমানরা যখন দেখল যে , বন্দীরা হযরতের আত্মীয়দের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে , তখন তাদের (বন্দীদের) অনেককেই মুক্তি দিয়েছিলেন। ইবনে হিশামের মতে এ বিবাহের সুবাদে বনি মুসতালিকের একশতটি পরিবার মুক্তি পেয়েছিল।36

4.আরবের বৃহত্তর গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংরক্ষণ করার জন্যে নবী (সা.) আয়েশা , হাফসা , উম্মে হাবিবা , সাফিয়া ও মাইমূনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

উম্মে হাবিবা ছিলেন সেই আবু সুফিয়ানের কন্যা যার বংশ (ইসলামের) রেসালতের ধারক সম্মানিত (হাশেমী) পরিবারের সাথে আপোসহীন শত্রুতা প্রদর্শন করত। তার স্বামী হাবাশে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হয়েছিল এবং অতঃপর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিল। উম্মে হাবিবা কঠিন সঙ্কটময় অবস্থায় দিনাতিপাত করছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন মুসলমান ; অপর দিকে তার পিতা ছিল নবী (সা.)-এর ঘোর শত্রু । ফলে তিনি তার পিতা (আবু সুফিয়ানের) নিকট আশ্রয় নিতে পারছিলেন না। সুতরাং উম্মে হাবিবা অভিভাবকহীন ও বঞ্চিত নারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন।

মহানবী (সা.) বনি উমাইয়্যাদের অন্তর জয় করার জন্যে এবং সেই সাথে উম্মে হাবিবার অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।37

সাফিয়া ছিলেন হাই ইবনে আখতাবের কন্যা , যিনি বনি নাযির গোত্রের প্রধান ছিলেন। ইহুদী বন্দীরা মুসলমানদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার পর হযরত (সা.) সাফিয়ার ব্যক্তিত্ব রক্ষা করার জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে অবদ্ধ হলেন। আর এ প্রক্রিয়ায় বনি ইসরাইলের একটি শ্রেষ্ঠ গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।38

বৃহত্তর গোত্র বনি মাখযুমের রমণী ছিলেন মায়মূনা , যাকে মহানবী (সা.) সপ্তম হিজরীতে বিবাহ সম্পন্ন করেন।39

নবী (সা.)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে আয়েশা ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় সকলেই বিধবা ছিলেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই যৌবনের উচ্ছলতা ও অভিলাষ হারিয়ে ছিলেন। আর এটাই এর সপক্ষে শ্রেষ্ঠ দলিল যে , রাসূল (সা.)-এর একাধিক বিবাহ বৃহত্তর কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। সুতরাং রাসূলের প্রতি কুমন্ত্রণা ইত্যাদির অপবাদ প্রদান কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না।

নবুওয়াত লাভের পূর্বে মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব

পারিপার্শ্বিকতার নীতি

মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে , পরিবেশ , কোন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ও চিন্তা-চেতনার ভিত্তি রচনা করে এবং পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধান ও অনুরূপ হওয়ার নীতি অনুসরণ তারা সামাজিক রীতি প্রথার পশ্চাদ্ধাবন করে।

যদিও এ ব্যাপারে একদল চরমপন্থা অবলম্বন করেছেন এবং এ মতবাদকে একটি সার্বিক ও সর্বজনীন নীতি বলে মনে করেছেন। তারা সকল সামাজিক বিষয় ও ঘটনাকে কোন প্রকার ব্যতিক্রম ব্যতীতই এ নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তবে ব্যক্তির মন মানসিকতার উপর পরিবেশের প্রভাব অনস্বীকার্য।

অতএব , কল্যাণময় ও সংযমী পরিবেশ , সমাজের সন্তানদেরকে সংযমী ও সুশৃঙ্খল রূপে গড়ে তোলে। অপরদিকে বিচ্যুত ও কলুষিত পরিবেশ কোন না কোন ভাবে ব্যক্তিকে বিচ্যুতি ও অনাচারের দিকে ঠেলে দেয়। অতএব , যিনি স্বীয় পথকে কলুষিত পরিবেশ থেকে পৃথক করে থাকেন , নিঃসন্দেহে তিনি কোন সাধারণ ব্যক্তিত্ব নন।

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের পরিবেশ

পৃথিবী , বিশেষ করে আরবভূমি তখন অজ্ঞতা ও অন্যায়ের সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল এবং আরবের জনগণ কুসংস্কার ও অনাচারের আগুনে জ্বলছিল। অজ্ঞতার কৃষ্ণকায় মেঘগুলো আরববাসীর জীবন-দিগন্তকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলেছিল এবং তারা অন্ধকারের ঘনঘটায় জীবনাতিবাহিত করছিল। কতইনা সম্পদ লুটতরাজ হতো , কতইনা রক্ত অন্যায় ভাবে ঝরত।

নিকৃষ্টতম ব্যাপার ছিল , প্রাণহীন মূর্তিসমূহের উপাসনা। কুসংস্কার ও শ্রেণী বৈষম্য সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিল। যার অস্তিত্ব সেথায় ছিলনা তা হলো ন্যায়পরায়ণতা ও নিয়ম শৃঙ্খলা । নিষ্ঠুর শক্তিধররা অন্যের শ্রম এবং বিধবা ও অনাথের ঘামের বিনিময়ে স্বীয় ধন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলত। আর আত্মম্ভরিতা ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করত এবং খেঁটে খাওয়া মানুষের উপর আগ্রাসন ও নিপীড়ন চালাত।

তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যনীতি এতটা খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল যে , অক্ষম স্বামীর ঋণের মোকাবিলায় তারা স্ত্রীকে দায়ী মনে করতো ; আর যদি অক্ষম , অপারগ কোন স্ত্রীর নিকট ঋণ থাকত তবে তার জন্যে তার স্বামীকে গ্রেফতার করত।40

উৎকর্ষ ও জ্ঞানার্জনের কোন উদ্যোগ তাদের ছিলই না , বরং এর পরিবর্তে তাদের পূর্বপুরুষ ও লোক জনের সংখ্যাধিক্যের জন্যে অহঙ্কার করত । কখনো কখনো কোন গোত্রের জনবলের আধিক্য প্রমাণ করার জন্যে তারা গোরস্থানে যেয়ে কবরের সংখ্যা গণনা করে তাদের সংখ্যাধিক্য দেখাত।41

হিংসা বিদ্বেষ , কাম-ক্রোধ , মদ্যপান , রক্তারক্তি ছিল তাদের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

ইমরুল কাইস নামক এক বিখ্যাত আরব কবি , তার চাচাত বোন উনাইযার সাথে শয়তানী ও উন্মাদ প্রেম ঘটিত ঘটনাবহুল অতীত সম্পর্কে নির্লজ্জ ভাবে তার কবিতায় বর্ণনা করেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এ কাব্যসমূহই সাহিত্য কর্মের নিদর্শন স্বরূপ কাবা ঘরের দেয়ালে টানানো হয়েছিল।

এটাই ছিল সে সমাজের জনজীবন ও আচার ব্যবহারের চিত্র , যে সমাজের অন্ধকারময় দিগন্ত থেকে ইসলামের জ্যোতি আত্মপ্রকাশ করেছিল।

নিঃসন্দেহে যিনি এহেন সমাজের রঙে রঞ্জিত না হয়ে , বরং এতে অস্বস্থি বোধ করতেন এবং এর বিরোধিতায় রত হতেন , তিনি এক মহান ও ঐশী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর তিনিই জাতির নেতৃত্বের জন্যে এবং বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্তি দানের জন্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।

নবীগণ (আ.) সমাজ গঠন করতেন , সমাজের অনুসরণ করতেন না

সকলেই মূর্তিনগরের দিকে ধাবিত হতো ; কিন্তু মহানবী (সা.) কারো কাছে শিক্ষা গ্রহণ না করলেও42 হেরা পর্বতের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সেথায় , শক্তি ও মর্যাদার অধিকারী বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর সম্মুখে সিজদাবনত হয়ে তাঁরই উপাসনায় আত্মনিয়োগ করতেন।43

হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর করুণার ছোঁয়ায় শৈশব থেকেই তাঁর পথ (সঠিকরূপে) নির্বাচন করে নিয়েছিলেন এবং কোন প্রকার উৎকন্ঠা ও সন্দেহ ব্যতীতই স্বীয় গোত্রের ভ্রান্ত রীতিনীতি পরিহার করে চলতেন এবং এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন।44

তিনি তাঁর জীবনের কোন মুহূর্তেই মূর্তি পূজা করেন নি , এমনকি ঐগুলোর নাম শুনতেও অনীহা প্রকাশ করতেন। যেমনটি ইতোপূর্বেও আমরা উল্লেখ করেছিলাম।

যখন হযরত মাত্র 12 বছরের বালক ছিলেন এবং বোহাইরা তাঁকে দুটি কুখ্যাত মূর্তি লাত ও ওজ্জার কসম দিয়েছিল তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং সক্রোধে বলেছিলেন : আমি কোন কিছুকেই এ দুটির মত শত্রু মনে করি না।

তাঁর সততা ও মহত্বের খ্যাতি ছিল লোকের মুখে মুখে ; তাঁর আচার , ব্যবহার ও বিশ্বস্ততার কারণে তিনি আল আমীন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর এহেন কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের কারণেই , খাদিজা তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁর উপর ন্যস্ত করেছিলেন।

মহানবী (সা.)-এর আচার-আচরণ এতই মনোমুকর ও সমুন্নত ছিল যে , তা সকল মানুষকে তাঁর দিকে আকর্ষণ করত।

আম্মার বলেন : নবুয়াতের পূর্বে আমি ও মুহাম্মদ (সা.) রাখালী করতাম। একদিন আমি প্রস্তাব দিলাম যে , ফাখের চারণ ভূমিতে গেলে ভাল হয়। মুহাম্মদ (সা.) আমার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন। পরদিন সেখানে গেলাম । দেখলাম যে মুহাম্মদ (সা.) আমার পূর্বে সেখানে গিয়েছেন কিন্তু মেষগুলোকে সেখানে চরানো থেকে বিরত রাখছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : কেন মেষগুলোকে চরতে দিচ্ছেন না ? তিনি বললেন : যেহেতু তোমার সাথে কথা দিয়েছিলাম তাই তুমি আসার পূর্বে আমার মেষগুলো এ চারণ ভূমি থেকে আহার গ্রহণ করবে , তা পছন্দ করছিলাম না।

এভাবেই মুহম্মাদ (সা.) অন্য এক পথে নিজেকে পরিচালিত করেছিলেন এবং গোত্রের রীতিনীতির অনুগামী হন নি। আর অদৃশ্যলোকের সাহায্যে স্বীয় উৎকর্ষের পথে অগ্রসরমান ছিলেন।

আর এ জন্যেই মানুষ তাঁর প্রতি অধিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং কোন সমস্যার সমাধানে তাঁর দেয়া সিদ্ধান্তের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন ও তাঁর অনুসরণ করতেন।

হাজারুল আসওয়াদ স্থাপনের ক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত

মহানবীর বয়স ছিল তখন 35 বছর। কোরাইশ কাবা অর্থাৎ আল্লাহর গৃহ পুনঃনির্মাণ ও মেরামত করার জন্যে সিদ্ধান্ত নিল। যেহেতু কোরাইশের গোত্রসমূহের সকলেই এ গৃহ মেরামতকরণের মর্যাদার অধিকারী হতে চেয়েছিল , সেহেতু প্রত্যেকেই কাবার এক একটি অংশ মেরামত করার জন্যে ভাগাভাগি করে নিল।

প্রথমে ওয়ালিদ গৃহ ভাঙ্গার কাজ শুরু করল। অতঃপর অন্যরা তাকে সাহায্য করল। ফলে ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক নির্মিত স্তম্ভগুলো দৃশ্যমান হলো। অতঃপর প্রত্যেক গোত্র কাবাগৃহের নির্দিষ্ট অংশ মেরামত করার জন্যে নির্ধারণ করে নিল। যখন কাবা গৃহের মেরামত কাজ এমন এক স্থানে পৌঁছল যেখানে হাজারুল আসওয়াদ স্থাপন করতে হবে , তখন কোরাইশের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তুমুল বিবাদ শুরু হলো। কারণ প্রত্যেক গোত্রই স্বহস্তে এ কর্ম সম্পাদন করতে এবং এ মর্যাদার অধিকারী হতে চাইল।

ধীরে ধীরে এ বিরোধ প্রকট হতে লাগল এবং যুদ্ধ বাঁধার পর্যায়ে পৌঁছল। আব্দুদ্দারের পুত্ররা একটি বৃহৎ পাত্র রক্তে পূর্ণ করে এবং তাতে হস্ত সমূহ নিমজ্জিত করে পরস্পরের খুনে রঞ্জিত হওয়ার জন্যে শপথ গ্রহণ করল।

এ ভয়ঙ্কর বিরোধ চার অথবা পাঁচ রাত্রি স্থায়ী হয়েছিল। অতঃপর আবু উমাইয়া কোরাইশের বয়োজ্যেষ্ঠতম ব্যক্তি বলল : আমার প্রস্তাব হলো এই যে , (আগামী কাল প্রত্যুষে) সর্বপ্রথমেই যে ব্যক্তি মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে , তাকে এ বিরোধের মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিবে। তার এ প্রস্তাব সকলেই একবাক্যে গ্রহণ করল , যাতে সমস্যার সমাধান হয়।

কোরাইশ তার এ প্রস্তাব গ্রহণ করতঃ অপেক্ষা করতে লাগল যে , কে মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করছে। হঠাৎ দেখা গেল যে ইসলামের নবী (সা.) প্রবেশ করলেন। যখন তাদের দৃষ্টি তাঁর উপর পতিত হলো । বলল : এতো মুহাম্মদ , সে বিশ্বস্ত (আমীন) , আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত।

মুহাম্মদ (সা.) এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তিনি ঘটনার বিষয় সম্পর্কে অবহিত হয়ে বললেন : একটি জামা নিয়ে আস। কোরাইশরা যদিও তার উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারেনি তবু দ্রুত একটি জামা নিয়ে আসল। মহানবী (সা.) ঐ জামাটিকে বিছিয়ে দিলেন এবং হাজারুল আসওয়াদকে এর মাঝে রাখলেন। অতঃপর বললেন : প্রত্যেক গোত্র এ জামার এক একটি অংশ ধর যাতে প্রত্যেকেই এ মর্যাদায় অংশীদার হতে পার। কোরাইশের প্রত্যেক গোত্র জামার চারদিকে ধরল। অতঃপর ঐ নির্দিষ্ট স্থানে বয়ে নিল , যেখানে পাথরটি স্থাপন করতে হবে। তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) দেখলেন যদি এর সংস্থাপনের দায়িত্ব অন্যকে দেন , তবে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে । তাই তিনি স্বয়ং হাজারুল আসওয়াদ তুলে নিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। আর এ উন্নত বিচারের মাধ্যমে বিরোধ সম্পূর্ণ রূপে দূর করলেন।

এ ঘটনা রাসূল (সা.)-এর মহান সামাজিক ব্যক্তিত্বের প্রমাণবহ। আর সে সাথে সঠিক চিন্তার মাধ্যমে এক রক্তাক্ত ভয়ঙ্কর গোলযোগের রক্তপাতহীন সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর সঠিক সিদ্ধান্ত ও সুবিচারের প্রকাশ ঘটায়।

আর এভাবেই অনুধাবন করা যায় যে , তিনি নবুওয়াতের জন্যে এবং পবিত্র ও ঐশী বিপ্লবের ধ্বজা ধারণ করার জন্যে যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

ওহীর অবতরণ

মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিশ্বজনীন রেসালত

এখন পর্যন্ত আমরা মহানবী (সা.)-এর জীবনের পাতাসমূহ থেকে কিছু পাতা দেখেছি মাত্র এবং তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের কিছু ঘটনা সেখানে আমরা পড়েছি। এবার আমরা তাঁর জীবনেতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করব।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশ বছর যাবৎ এমন এক অভিভাবকহীন ও লাগামহীন জনসমাজে বসবাস করেছিলেন যেখানে সভ্যতা ও সংস্কৃতির লেশ-মাত্র ছিল না। আর সমাজের এহেন অবস্থা মহানবী (সা.)-এর কোমল হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তুলত। মুহাম্মদ (সা.) সমাজে অজ্ঞতার তিমির ব্যতীত কিছুই দেখতে পাননি। কাবায় যেতেন , দেখতেন , খোদার পরিবর্তে তারা মূর্তি পূজা করছে ; কাবা ত্যাগ করে সমাজে আসতেন , সেখানের অবস্থা অবলোকনেও ব্যথিত হতেন ; মানুষের মাঝে যেতেন , গোত্রের নিকৃষ্ট চিন্তা-চেতনা ও রীতিনীতি দেখে হৃদয় ভারাক্রান্ত হতেন ; দরিদ্র নিপীড়িত , বঞ্চিত মানুষের অবস্থা দেখে ক্লেষ ভোগ করতেন।

নারীদের নিকৃষ্টতম সামাজিক অবস্থান , মদ , জুয়া , নরহত্যা , অনাচার ইত্যাদির বিস্তৃতিতে নিদারুণ কষ্ট অনুভব করতেন।

যখন ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন এবং মানুষের সাথে মেলামেশা করতেন , তখন মানুষের চারিত্রিক অবনতি তার কোমল হৃদয়কে ব্যথিত করত। তখন বাধ্য হয়ে বিশ্রাম ও ইবাদতের জন্যে এমন কোন স্থানে যেতেন , যেখানে তাঁর হৃদয় ক্লেশমুক্ত থাকে , তাঁর প্রাণে একটু সস্তি পেতে পারেন। এ জন্যে তিনি হেরা পর্বতে যেতেন এবং আল্লাহর রহমতের নিদর্শন ও সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করতেন।

চল্লিশ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (সা.)

মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশতম বছরে পদার্পণ করলেন এবং ঐশী ও বিশ্বজনীন রেসালতের দায়িত্ব পালন করার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করলেন। হঠাৎ তাঁর প্রতি ওহীর ফেরেশতা জিব্রাইল অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন : পড়! ...মুহাম্মদ (সা.) বললেন : কী পড়ব ? তিনি এক অভূতপূর্ব অনুভূতিতে নিমগ্ন হলেন। দ্বিতীয়বার একই শব্দ শুনতে পেলেন যে সুস্পষ্ট রূপে বলল : পড় , হে মুহাম্মদ!

তৃতীয়বার জিব্রাইল পুনরাবৃত্তি করে বললেন : তোমার প্রভুর নামে পাঠ কর , যিনি সৃষ্টি করেছেন , সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত পিণ্ড থেকে , পড় , এবং তোমার প্রভু সর্বাপেক্ষা দয়ালু , যে প্রভু লিখতে শিখিয়েছেন এবং মানুষ যা জানতো না , তা তাকে শিখিয়েছেন।45

এক অবর্ণনীয় আনন্দ ও উৎকণ্ঠা তাঁর সমস্ত অন্তরাত্মা , তাঁর অস্তিত্বকে বিমোহিত করে তুলেছিল। কারণ এক বৃহৎ ও সমুন্নত জগতের সাথে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ...ফেরেশতাদের সাথে ...জিব্রাইলের সাথে উর্ধ্বলোকের সাথে ...তাঁর আত্মা এক পবিত্র ও মহান আশ্রয়স্থলের সাথে নিবিঢ় ও সার্বক্ষণিক সম্পর্ক স্থাপন করল , তিনি স্বীয় অভ্যন্তরে নবুওয়াতের ক্ষমতা অনুভব করলেন এবং কোন প্রকার উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের লেশমাত্র তাঁর অস্তিত্বে পরিলক্ষিত হয়নি। যা ছিল তা হলো দৃঢ়তা ও প্রশান্তি।

তাহলে মুহাম্মদ (সা.) কি হেরা পর্বতে কোন প্রশিক্ষণকাল সম্পন্ন করেছিলেন ? এটি সে প্রশ্ন , যার ইতিবাচক জবাব দিয়েছিলেন কোন কোন প্রাচ্যবিদ ও লেখক এবং বলেছিলেন : মুহাম্মদ (সা.) হেরা পর্বতের গুহায় ইঞ্জিল ও নবীগণের (আ.) বক্তব্য ও শিক্ষার উপর গভীর ভাবে গবেষণা ও পর্যালোচনা চালিয়েছিলেন এবং এ (জ্ঞান) জগতের অনেক স্বাদ আস্বাদন করেছিলেন।

এ কথার অর্থ দাঁড়ায় মুহাম্মদ (সা.) স্বশিক্ষিত কোন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ইঞ্জিল ও তৌরাতের উপর গভীর অনুসন্ধান ও পড়াশুনার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে আবিস্কার করেছিলেন!

কিন্তু এ ধারণার বিপরীতে অনেক প্রমাণ রয়েছে , এ গুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

যদি ইসলামের নবী (সা.) কোরআনকে ইঞ্জিল ও পূর্ববর্তী নবীগণের (আ.) শিক্ষা থেকে গ্রহণ করতেন , তবে সঙ্গত কারণেই কোরআনের বিষয়-বস্তুসমূহ ইঞ্জিল ও তৌরাতের সদৃশ হতো। অথচ কোরআনের বিষয় বস্তু তৌরাত ও ইঞ্জিল থেকে সামগ্রিক ও মৌলিক ভাবে পৃথক ও স্বতন্ত্র।

কোরআনের বক্তব্য , প্রাঞ্জল ও অভূতপূর্ব ভাষাশৈলীর সম্মুখে তদানিন্তন ও পরবর্তী যুগের খ্যাতনামা সাহিত্যিকগণও নতশির। আর এটাই প্রমাণ করে যে , ইসলামের নবী (সা.) সরাসরি বিশ্ব সৃষ্টি কর্তার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন এবং নিঃসন্দেহে এ কথাগুলো ও বাক্যগুলো কোন পুস্তকেই বিদ্যমান ছিল না , যা থেকে নবী (সা.) উদ্ধৃতি দিবেন ও শিক্ষা নিবেন।

কোন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না ; বরং এ অপপ্রচারটি ছিল খ্রিস্টান পাদ্রী ও পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যপ্রবণ প্রাচ্যবিদদের সাজানো কথা।

যদি কোরআন বাইবেলের পুরাতন ও নতুন সংস্করণ থেকে অস্তিত্ব লাভ করত , তবে যারা কোরআনের বিরুদ্ধে কোন আয়াত উদ্ধৃতি করতে ও এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইত , তাহলে , যে তৌরাত ও ইঞ্জিল তাদের হাতে ছিল তারা তাতে খুঁজে দেখত এবং কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই স্বীয় লক্ষ্যে পৌঁছতে পারত।

সকলেই বিশ্বাস করেন যে , মুহম্মদ (সা.) (কারো নিকট) শিক্ষা গ্রহণ করেন নি।

কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি বিশ্বাস করবে যে , পড়াশুনা করেন নি এমন একজন ব্যক্তি , যিনি অজ্ঞ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের পাঠ্য পুস্তক থেকে দূরে বিদ্যমান এক সমাজে বড় হয়েছেন , তিনি এক জ্ঞানগর্ভ ও বিশ্বজনীন পুস্তক উপহার দিয়েছেন ? এ ধরনের ব্যক্তি বর্গের নিকট প্রশ্ন করা উচিৎ যে , কিরূপে ইসলামের নবী (সা.) তৌরাত ও ইঞ্জিলের উপর পড়াশুনা করতেন ? যে ব্যক্তি তার সমস্ত জীবনে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যান নি , কোন শিক্ষাগুরুর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন নি , কিরূপে তিনি অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে সংবাদ দিতে পারেন ?!

ওহী কী ?

যা সর্বজন স্বীকৃত তাতে বলা হয় , মহান আল্লাহ্ ও তাঁর নবী (আ.) গণের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং তারা সকল বাস্তবতার জ্ঞান বিশ্ব সৃষ্টির উৎস (অর্থাৎ মহান আল্লাহ্) থেকে লাভ করতেন। আর এ সম্পর্ক তাঁদের আত্মিক উৎকর্ষ ও দৃঢ়তার ফলে বিদ্যমান ছিল।

তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে , যদি নবীগণের (আ.) সাথে এ সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় তবে তাঁদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। নবীগণের (আ.) সকল মর্যাদার কারণ হলো যে , তারা বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কের যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। সুতরাং তাঁরা যা বলতেন তাতে কোন প্রকার সন্দেহ ও জটিলতা ছিলনা। বরং কী এবং কোথা থেকে এসেছে এ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণরূপে অবহিত ছিলেন , যা কারো কারো তথাকথিত অর্ন্তদৃষ্টির (كشف ) দাবির ব্যতিক্রম যেখানে যোগ সাধনা ও অন্যান্য পদ্ধতি ও নিয়ামকের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এর অধিকারীদের নিকট এমন কিছু বিষয় অর্জিত হয় যে তারা জানে না কোথা থেকে এসেছে। বরং প্রায়শঃই ধারণা ও অনুমানের বশবর্তী আবার কখনোবা প্রকৃত অবস্থার ব্যতিক্রম হয়ে থাকে।

যাহোক , এ দলের (যোগী) উপর নবীগণের (আ.) শ্রেষ্ঠত্ব এতটা সুস্পষ্ট যে , কোন প্রকার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আল্লাহর নবীগণ (আ.) যা বলেন ও দেখেন তা-ই বাস্তব ও সত্য। এমনকি উদাহরণত এক বিন্দু পরিমাণ সন্দেহও তাদের নিকট আশ্রয় পায় না। অতএব , ওহী হলো মহান আল্লাহ্ ও নবীগণের (আ.) মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল তা-ই। আর এ সম্পর্ক কখনো কখনো জিব্রাইলের মাধ্যমে , আবার কখনো কখনো কোন প্রকার মাধ্যম ব্যতীতই সম্পন্ন হতো।

রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীর সংখ্যা

ইসলামের নবী (সা.) খাদিজার পর একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সাওদা , আয়েশা , গাজিয়া , হাফসাহ , উম্মে হাবিবা , উম্মে সালামাহ , যয়নাব বিনতে যাহেশ , যয়নাব বিনতে খুযাইমাহ , মাইমুনাহ , জুয়াইরিয়াহ , সাফিয়াহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

এখন যে পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-কে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে হয়েছে , সে সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।

মূলতঃ কয়েকটি উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) একাধিক বিয়ে করেছিলেন:

1.অনাথ ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের আত্মসম্মান রক্ষা করার জন্যে , যারা ইতোপূর্বে সম্মান ও প্রতিপত্তির সাথে জীবন যাপন করতেন , কিন্তু স্বীয় অভিভাবককে হারানোর ফলে তাদের সম্মান প্রতিপত্তি এখন বিপর্যস্ত , মহানবী (সা.) তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। নতুবা তাদের গোত্র তাদেরকে ফিরিয়ে নিত এবং তাদেরকে কুফর করতে ও ইসলামের অস্বীকৃতিতে বাধ্য করত। যেমন : সাত্তদা , যার স্বামী হাবাশায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার পর পরলোক গমন করেছিলেন। ফলে তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিলেন।

রাসূল (সা.) খাদিজাকে হারানোর পর বিপত্নীক ছিলেন এবং সাওদার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

যয়নাব বিনতে খুযাইমা ছিলেন রাসূলের অপর এক স্ত্রী। তিনি এক বিধবা রমণী ছিলেন যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর একদিকে অভিবাবকহীন এবং অপরদিকে দারিদ্রকবলিত হয়ে পড়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন দানশীলা , উদার এবং উম্মুল মাসাকীন (নিঃস্বদের মাতা) আল্লাহর রাসূল (সা.) যয়নাবের সম্মান রক্ষার্থে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যয়নাব বিনতে খুযাইমা রাসূলের জীবদ্দশায়ই পরলোক গমন করেন।

উম্মে সালমাও ছিলেন বয়স্কা ও অনাথ সন্তানের মাতা , ঈমানদার। তিনিও নবী (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

2.প্রচলিত অবস্থার পরিবর্তন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভ্রান্ত রীতি-নীতির প্রাচীর চূর্ণ করে দেয়ার জন্যে তাঁর ফুফাত বোন যয়নাব বিনতে জাহাশের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন , যিনি রাসূলের পালক পুত্র যায়েদ ইবনে হারিসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যায়েদের সাথে যয়নাবের যে বিবাহ মহানবী (সা.)-এর নির্দেশানুসারে সম্পন্ন হয়েছিল তা স্বয়ং ইসলামের শ্রেণী বৈষম্যহীন বিশেষত্বেরই দৃষ্টান্ত। কারণ , যয়নাব ছিলেন কোরাইশ অধিপতি আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্রাদের মধ্যে একজন , আর যায়িদ ছিল পারিবারিক দিক থেকে কৃতদাস , যিনি রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে মুক্তি পেয়েছিলেন।

যয়নাব যেহেতু অভিজাত পরিবারের ছিলেন , সেহেতু যায়েদের সাথে দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ করত ; আর এভাবে নিজের দাম্পত্য জীবনে তিক্ততা সৃষ্টি করত এবং রাসূল (সা.) তাদেরকে শতভাবে উপদেশ দিলেও তাতে কোন ফল হয়নি। অবশেষে যায়েদ যয়নাবের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিল এবং তাকে তালাক দিয়েছিল।

যয়নাব তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর আদেশে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন , যাতে মানুষের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার ও অযৌক্তিক রীতি-নীতির মূলোৎপাটিত হয়। (যেহেতু তারা পালক পূত্রকে স্বীয় প্রকৃত পুত্র বলে মনে করত এবং তার স্ত্রীকে নিজের জন্যে নিষিদ্ধ মনে করত)।35

খ্রিস্টবাদী কিছু লেখক এ বিষয়টির ক্ষেত্রে (হযরতের একাধিক বিবাহ) এতটা বিচ্যুত ও কুরটনাকারী হয়েছিল যে লিখেছিল : আল্লাহর রাসূল যয়নাবের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়েছিলেন! এ বক্তব্যটি এতটা অনর্থক ও অযৌক্তিক যে তা সমস্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির পরিপন্থী। কারণ যদি নবী (সা.) কুমন্ত্রনা ও এ ধরনের ধ্যান- ধারণার বশবর্তী হতেন কিংবা যয়নাবের রূপ সৌন্দর্য এতটা মনোহারী ছিল যে , হযরতকে প্রেমাসক্ত করে ফেলেছিল যদি তাই হতো , তবে কেন যখন যয়নাব কুমারী ও বিশেষ আকর্ষণের অধিকারী ছিল আর রাসূলও (সা.) উদ্দাম যৌবনের অধিকারী ছিলেন , তখন কেন তার প্রতি আসক্ত হলেন না ; বিশেষ করে এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে যয়নাব তো তখনও তার নিকট অপরিচিত ছিল না ? বরং রাসূলের নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই তিনি পরিগণিত হতেন এবং পারিবারিক পরিচিতের মাধ্যমে তারা পরস্পরের সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

3.বন্দী ও দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্যে ; যেমন , জুয়াইরিয়াকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। জুয়াইরিয়া ছিলেন সম্ভ্রান্ত বনি মুসতালিক গোত্রের কন্যা , যিনি ইসলামী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দী হয়েছিলেন। মহানবী (সা.) হারেসের কন্যা জুবাইরিয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। হারেস ছিলেন গোত্রপতি। মুসলমানরা যখন দেখল যে , বন্দীরা হযরতের আত্মীয়দের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে , তখন তাদের (বন্দীদের) অনেককেই মুক্তি দিয়েছিলেন। ইবনে হিশামের মতে এ বিবাহের সুবাদে বনি মুসতালিকের একশতটি পরিবার মুক্তি পেয়েছিল।36

4.আরবের বৃহত্তর গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংরক্ষণ করার জন্যে নবী (সা.) আয়েশা , হাফসা , উম্মে হাবিবা , সাফিয়া ও মাইমূনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

উম্মে হাবিবা ছিলেন সেই আবু সুফিয়ানের কন্যা যার বংশ (ইসলামের) রেসালতের ধারক সম্মানিত (হাশেমী) পরিবারের সাথে আপোসহীন শত্রুতা প্রদর্শন করত। তার স্বামী হাবাশে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হয়েছিল এবং অতঃপর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিল। উম্মে হাবিবা কঠিন সঙ্কটময় অবস্থায় দিনাতিপাত করছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন মুসলমান ; অপর দিকে তার পিতা ছিল নবী (সা.)-এর ঘোর শত্রু । ফলে তিনি তার পিতা (আবু সুফিয়ানের) নিকট আশ্রয় নিতে পারছিলেন না। সুতরাং উম্মে হাবিবা অভিভাবকহীন ও বঞ্চিত নারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন।

মহানবী (সা.) বনি উমাইয়্যাদের অন্তর জয় করার জন্যে এবং সেই সাথে উম্মে হাবিবার অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।37

সাফিয়া ছিলেন হাই ইবনে আখতাবের কন্যা , যিনি বনি নাযির গোত্রের প্রধান ছিলেন। ইহুদী বন্দীরা মুসলমানদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার পর হযরত (সা.) সাফিয়ার ব্যক্তিত্ব রক্ষা করার জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে অবদ্ধ হলেন। আর এ প্রক্রিয়ায় বনি ইসরাইলের একটি শ্রেষ্ঠ গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।38

বৃহত্তর গোত্র বনি মাখযুমের রমণী ছিলেন মায়মূনা , যাকে মহানবী (সা.) সপ্তম হিজরীতে বিবাহ সম্পন্ন করেন।39

নবী (সা.)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে আয়েশা ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় সকলেই বিধবা ছিলেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই যৌবনের উচ্ছলতা ও অভিলাষ হারিয়ে ছিলেন। আর এটাই এর সপক্ষে শ্রেষ্ঠ দলিল যে , রাসূল (সা.)-এর একাধিক বিবাহ বৃহত্তর কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। সুতরাং রাসূলের প্রতি কুমন্ত্রণা ইত্যাদির অপবাদ প্রদান কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না।

নবুওয়াত লাভের পূর্বে মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব

পারিপার্শ্বিকতার নীতি

মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে , পরিবেশ , কোন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ও চিন্তা-চেতনার ভিত্তি রচনা করে এবং পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধান ও অনুরূপ হওয়ার নীতি অনুসরণ তারা সামাজিক রীতি প্রথার পশ্চাদ্ধাবন করে।

যদিও এ ব্যাপারে একদল চরমপন্থা অবলম্বন করেছেন এবং এ মতবাদকে একটি সার্বিক ও সর্বজনীন নীতি বলে মনে করেছেন। তারা সকল সামাজিক বিষয় ও ঘটনাকে কোন প্রকার ব্যতিক্রম ব্যতীতই এ নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তবে ব্যক্তির মন মানসিকতার উপর পরিবেশের প্রভাব অনস্বীকার্য।

অতএব , কল্যাণময় ও সংযমী পরিবেশ , সমাজের সন্তানদেরকে সংযমী ও সুশৃঙ্খল রূপে গড়ে তোলে। অপরদিকে বিচ্যুত ও কলুষিত পরিবেশ কোন না কোন ভাবে ব্যক্তিকে বিচ্যুতি ও অনাচারের দিকে ঠেলে দেয়। অতএব , যিনি স্বীয় পথকে কলুষিত পরিবেশ থেকে পৃথক করে থাকেন , নিঃসন্দেহে তিনি কোন সাধারণ ব্যক্তিত্ব নন।

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের পরিবেশ

পৃথিবী , বিশেষ করে আরবভূমি তখন অজ্ঞতা ও অন্যায়ের সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল এবং আরবের জনগণ কুসংস্কার ও অনাচারের আগুনে জ্বলছিল। অজ্ঞতার কৃষ্ণকায় মেঘগুলো আরববাসীর জীবন-দিগন্তকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলেছিল এবং তারা অন্ধকারের ঘনঘটায় জীবনাতিবাহিত করছিল। কতইনা সম্পদ লুটতরাজ হতো , কতইনা রক্ত অন্যায় ভাবে ঝরত।

নিকৃষ্টতম ব্যাপার ছিল , প্রাণহীন মূর্তিসমূহের উপাসনা। কুসংস্কার ও শ্রেণী বৈষম্য সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিল। যার অস্তিত্ব সেথায় ছিলনা তা হলো ন্যায়পরায়ণতা ও নিয়ম শৃঙ্খলা । নিষ্ঠুর শক্তিধররা অন্যের শ্রম এবং বিধবা ও অনাথের ঘামের বিনিময়ে স্বীয় ধন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলত। আর আত্মম্ভরিতা ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করত এবং খেঁটে খাওয়া মানুষের উপর আগ্রাসন ও নিপীড়ন চালাত।

তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যনীতি এতটা খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল যে , অক্ষম স্বামীর ঋণের মোকাবিলায় তারা স্ত্রীকে দায়ী মনে করতো ; আর যদি অক্ষম , অপারগ কোন স্ত্রীর নিকট ঋণ থাকত তবে তার জন্যে তার স্বামীকে গ্রেফতার করত।40

উৎকর্ষ ও জ্ঞানার্জনের কোন উদ্যোগ তাদের ছিলই না , বরং এর পরিবর্তে তাদের পূর্বপুরুষ ও লোক জনের সংখ্যাধিক্যের জন্যে অহঙ্কার করত । কখনো কখনো কোন গোত্রের জনবলের আধিক্য প্রমাণ করার জন্যে তারা গোরস্থানে যেয়ে কবরের সংখ্যা গণনা করে তাদের সংখ্যাধিক্য দেখাত।41

হিংসা বিদ্বেষ , কাম-ক্রোধ , মদ্যপান , রক্তারক্তি ছিল তাদের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

ইমরুল কাইস নামক এক বিখ্যাত আরব কবি , তার চাচাত বোন উনাইযার সাথে শয়তানী ও উন্মাদ প্রেম ঘটিত ঘটনাবহুল অতীত সম্পর্কে নির্লজ্জ ভাবে তার কবিতায় বর্ণনা করেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এ কাব্যসমূহই সাহিত্য কর্মের নিদর্শন স্বরূপ কাবা ঘরের দেয়ালে টানানো হয়েছিল।

এটাই ছিল সে সমাজের জনজীবন ও আচার ব্যবহারের চিত্র , যে সমাজের অন্ধকারময় দিগন্ত থেকে ইসলামের জ্যোতি আত্মপ্রকাশ করেছিল।

নিঃসন্দেহে যিনি এহেন সমাজের রঙে রঞ্জিত না হয়ে , বরং এতে অস্বস্থি বোধ করতেন এবং এর বিরোধিতায় রত হতেন , তিনি এক মহান ও ঐশী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর তিনিই জাতির নেতৃত্বের জন্যে এবং বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্তি দানের জন্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।

নবীগণ (আ.) সমাজ গঠন করতেন , সমাজের অনুসরণ করতেন না

সকলেই মূর্তিনগরের দিকে ধাবিত হতো ; কিন্তু মহানবী (সা.) কারো কাছে শিক্ষা গ্রহণ না করলেও42 হেরা পর্বতের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সেথায় , শক্তি ও মর্যাদার অধিকারী বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর সম্মুখে সিজদাবনত হয়ে তাঁরই উপাসনায় আত্মনিয়োগ করতেন।43

হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর করুণার ছোঁয়ায় শৈশব থেকেই তাঁর পথ (সঠিকরূপে) নির্বাচন করে নিয়েছিলেন এবং কোন প্রকার উৎকন্ঠা ও সন্দেহ ব্যতীতই স্বীয় গোত্রের ভ্রান্ত রীতিনীতি পরিহার করে চলতেন এবং এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন।44

তিনি তাঁর জীবনের কোন মুহূর্তেই মূর্তি পূজা করেন নি , এমনকি ঐগুলোর নাম শুনতেও অনীহা প্রকাশ করতেন। যেমনটি ইতোপূর্বেও আমরা উল্লেখ করেছিলাম।

যখন হযরত মাত্র 12 বছরের বালক ছিলেন এবং বোহাইরা তাঁকে দুটি কুখ্যাত মূর্তি লাত ও ওজ্জার কসম দিয়েছিল তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং সক্রোধে বলেছিলেন : আমি কোন কিছুকেই এ দুটির মত শত্রু মনে করি না।

তাঁর সততা ও মহত্বের খ্যাতি ছিল লোকের মুখে মুখে ; তাঁর আচার , ব্যবহার ও বিশ্বস্ততার কারণে তিনি আল আমীন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর এহেন কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের কারণেই , খাদিজা তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁর উপর ন্যস্ত করেছিলেন।

মহানবী (সা.)-এর আচার-আচরণ এতই মনোমুকর ও সমুন্নত ছিল যে , তা সকল মানুষকে তাঁর দিকে আকর্ষণ করত।

আম্মার বলেন : নবুয়াতের পূর্বে আমি ও মুহাম্মদ (সা.) রাখালী করতাম। একদিন আমি প্রস্তাব দিলাম যে , ফাখের চারণ ভূমিতে গেলে ভাল হয়। মুহাম্মদ (সা.) আমার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন। পরদিন সেখানে গেলাম । দেখলাম যে মুহাম্মদ (সা.) আমার পূর্বে সেখানে গিয়েছেন কিন্তু মেষগুলোকে সেখানে চরানো থেকে বিরত রাখছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : কেন মেষগুলোকে চরতে দিচ্ছেন না ? তিনি বললেন : যেহেতু তোমার সাথে কথা দিয়েছিলাম তাই তুমি আসার পূর্বে আমার মেষগুলো এ চারণ ভূমি থেকে আহার গ্রহণ করবে , তা পছন্দ করছিলাম না।

এভাবেই মুহম্মাদ (সা.) অন্য এক পথে নিজেকে পরিচালিত করেছিলেন এবং গোত্রের রীতিনীতির অনুগামী হন নি। আর অদৃশ্যলোকের সাহায্যে স্বীয় উৎকর্ষের পথে অগ্রসরমান ছিলেন।

আর এ জন্যেই মানুষ তাঁর প্রতি অধিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং কোন সমস্যার সমাধানে তাঁর দেয়া সিদ্ধান্তের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন ও তাঁর অনুসরণ করতেন।

হাজারুল আসওয়াদ স্থাপনের ক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত

মহানবীর বয়স ছিল তখন 35 বছর। কোরাইশ কাবা অর্থাৎ আল্লাহর গৃহ পুনঃনির্মাণ ও মেরামত করার জন্যে সিদ্ধান্ত নিল। যেহেতু কোরাইশের গোত্রসমূহের সকলেই এ গৃহ মেরামতকরণের মর্যাদার অধিকারী হতে চেয়েছিল , সেহেতু প্রত্যেকেই কাবার এক একটি অংশ মেরামত করার জন্যে ভাগাভাগি করে নিল।

প্রথমে ওয়ালিদ গৃহ ভাঙ্গার কাজ শুরু করল। অতঃপর অন্যরা তাকে সাহায্য করল। ফলে ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক নির্মিত স্তম্ভগুলো দৃশ্যমান হলো। অতঃপর প্রত্যেক গোত্র কাবাগৃহের নির্দিষ্ট অংশ মেরামত করার জন্যে নির্ধারণ করে নিল। যখন কাবা গৃহের মেরামত কাজ এমন এক স্থানে পৌঁছল যেখানে হাজারুল আসওয়াদ স্থাপন করতে হবে , তখন কোরাইশের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তুমুল বিবাদ শুরু হলো। কারণ প্রত্যেক গোত্রই স্বহস্তে এ কর্ম সম্পাদন করতে এবং এ মর্যাদার অধিকারী হতে চাইল।

ধীরে ধীরে এ বিরোধ প্রকট হতে লাগল এবং যুদ্ধ বাঁধার পর্যায়ে পৌঁছল। আব্দুদ্দারের পুত্ররা একটি বৃহৎ পাত্র রক্তে পূর্ণ করে এবং তাতে হস্ত সমূহ নিমজ্জিত করে পরস্পরের খুনে রঞ্জিত হওয়ার জন্যে শপথ গ্রহণ করল।

এ ভয়ঙ্কর বিরোধ চার অথবা পাঁচ রাত্রি স্থায়ী হয়েছিল। অতঃপর আবু উমাইয়া কোরাইশের বয়োজ্যেষ্ঠতম ব্যক্তি বলল : আমার প্রস্তাব হলো এই যে , (আগামী কাল প্রত্যুষে) সর্বপ্রথমেই যে ব্যক্তি মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে , তাকে এ বিরোধের মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিবে। তার এ প্রস্তাব সকলেই একবাক্যে গ্রহণ করল , যাতে সমস্যার সমাধান হয়।

কোরাইশ তার এ প্রস্তাব গ্রহণ করতঃ অপেক্ষা করতে লাগল যে , কে মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করছে। হঠাৎ দেখা গেল যে ইসলামের নবী (সা.) প্রবেশ করলেন। যখন তাদের দৃষ্টি তাঁর উপর পতিত হলো । বলল : এতো মুহাম্মদ , সে বিশ্বস্ত (আমীন) , আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত।

মুহাম্মদ (সা.) এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তিনি ঘটনার বিষয় সম্পর্কে অবহিত হয়ে বললেন : একটি জামা নিয়ে আস। কোরাইশরা যদিও তার উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারেনি তবু দ্রুত একটি জামা নিয়ে আসল। মহানবী (সা.) ঐ জামাটিকে বিছিয়ে দিলেন এবং হাজারুল আসওয়াদকে এর মাঝে রাখলেন। অতঃপর বললেন : প্রত্যেক গোত্র এ জামার এক একটি অংশ ধর যাতে প্রত্যেকেই এ মর্যাদায় অংশীদার হতে পার। কোরাইশের প্রত্যেক গোত্র জামার চারদিকে ধরল। অতঃপর ঐ নির্দিষ্ট স্থানে বয়ে নিল , যেখানে পাথরটি স্থাপন করতে হবে। তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) দেখলেন যদি এর সংস্থাপনের দায়িত্ব অন্যকে দেন , তবে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে । তাই তিনি স্বয়ং হাজারুল আসওয়াদ তুলে নিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। আর এ উন্নত বিচারের মাধ্যমে বিরোধ সম্পূর্ণ রূপে দূর করলেন।

এ ঘটনা রাসূল (সা.)-এর মহান সামাজিক ব্যক্তিত্বের প্রমাণবহ। আর সে সাথে সঠিক চিন্তার মাধ্যমে এক রক্তাক্ত ভয়ঙ্কর গোলযোগের রক্তপাতহীন সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর সঠিক সিদ্ধান্ত ও সুবিচারের প্রকাশ ঘটায়।

আর এভাবেই অনুধাবন করা যায় যে , তিনি নবুওয়াতের জন্যে এবং পবিত্র ও ঐশী বিপ্লবের ধ্বজা ধারণ করার জন্যে যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

ওহীর অবতরণ

মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিশ্বজনীন রেসালত

এখন পর্যন্ত আমরা মহানবী (সা.)-এর জীবনের পাতাসমূহ থেকে কিছু পাতা দেখেছি মাত্র এবং তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের কিছু ঘটনা সেখানে আমরা পড়েছি। এবার আমরা তাঁর জীবনেতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করব।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশ বছর যাবৎ এমন এক অভিভাবকহীন ও লাগামহীন জনসমাজে বসবাস করেছিলেন যেখানে সভ্যতা ও সংস্কৃতির লেশ-মাত্র ছিল না। আর সমাজের এহেন অবস্থা মহানবী (সা.)-এর কোমল হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তুলত। মুহাম্মদ (সা.) সমাজে অজ্ঞতার তিমির ব্যতীত কিছুই দেখতে পাননি। কাবায় যেতেন , দেখতেন , খোদার পরিবর্তে তারা মূর্তি পূজা করছে ; কাবা ত্যাগ করে সমাজে আসতেন , সেখানের অবস্থা অবলোকনেও ব্যথিত হতেন ; মানুষের মাঝে যেতেন , গোত্রের নিকৃষ্ট চিন্তা-চেতনা ও রীতিনীতি দেখে হৃদয় ভারাক্রান্ত হতেন ; দরিদ্র নিপীড়িত , বঞ্চিত মানুষের অবস্থা দেখে ক্লেষ ভোগ করতেন।

নারীদের নিকৃষ্টতম সামাজিক অবস্থান , মদ , জুয়া , নরহত্যা , অনাচার ইত্যাদির বিস্তৃতিতে নিদারুণ কষ্ট অনুভব করতেন।

যখন ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন এবং মানুষের সাথে মেলামেশা করতেন , তখন মানুষের চারিত্রিক অবনতি তার কোমল হৃদয়কে ব্যথিত করত। তখন বাধ্য হয়ে বিশ্রাম ও ইবাদতের জন্যে এমন কোন স্থানে যেতেন , যেখানে তাঁর হৃদয় ক্লেশমুক্ত থাকে , তাঁর প্রাণে একটু সস্তি পেতে পারেন। এ জন্যে তিনি হেরা পর্বতে যেতেন এবং আল্লাহর রহমতের নিদর্শন ও সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করতেন।

চল্লিশ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (সা.)

মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশতম বছরে পদার্পণ করলেন এবং ঐশী ও বিশ্বজনীন রেসালতের দায়িত্ব পালন করার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করলেন। হঠাৎ তাঁর প্রতি ওহীর ফেরেশতা জিব্রাইল অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন : পড়! ...মুহাম্মদ (সা.) বললেন : কী পড়ব ? তিনি এক অভূতপূর্ব অনুভূতিতে নিমগ্ন হলেন। দ্বিতীয়বার একই শব্দ শুনতে পেলেন যে সুস্পষ্ট রূপে বলল : পড় , হে মুহাম্মদ!

তৃতীয়বার জিব্রাইল পুনরাবৃত্তি করে বললেন : তোমার প্রভুর নামে পাঠ কর , যিনি সৃষ্টি করেছেন , সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত পিণ্ড থেকে , পড় , এবং তোমার প্রভু সর্বাপেক্ষা দয়ালু , যে প্রভু লিখতে শিখিয়েছেন এবং মানুষ যা জানতো না , তা তাকে শিখিয়েছেন।45

এক অবর্ণনীয় আনন্দ ও উৎকণ্ঠা তাঁর সমস্ত অন্তরাত্মা , তাঁর অস্তিত্বকে বিমোহিত করে তুলেছিল। কারণ এক বৃহৎ ও সমুন্নত জগতের সাথে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ...ফেরেশতাদের সাথে ...জিব্রাইলের সাথে উর্ধ্বলোকের সাথে ...তাঁর আত্মা এক পবিত্র ও মহান আশ্রয়স্থলের সাথে নিবিঢ় ও সার্বক্ষণিক সম্পর্ক স্থাপন করল , তিনি স্বীয় অভ্যন্তরে নবুওয়াতের ক্ষমতা অনুভব করলেন এবং কোন প্রকার উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের লেশমাত্র তাঁর অস্তিত্বে পরিলক্ষিত হয়নি। যা ছিল তা হলো দৃঢ়তা ও প্রশান্তি।

তাহলে মুহাম্মদ (সা.) কি হেরা পর্বতে কোন প্রশিক্ষণকাল সম্পন্ন করেছিলেন ? এটি সে প্রশ্ন , যার ইতিবাচক জবাব দিয়েছিলেন কোন কোন প্রাচ্যবিদ ও লেখক এবং বলেছিলেন : মুহাম্মদ (সা.) হেরা পর্বতের গুহায় ইঞ্জিল ও নবীগণের (আ.) বক্তব্য ও শিক্ষার উপর গভীর ভাবে গবেষণা ও পর্যালোচনা চালিয়েছিলেন এবং এ (জ্ঞান) জগতের অনেক স্বাদ আস্বাদন করেছিলেন।

এ কথার অর্থ দাঁড়ায় মুহাম্মদ (সা.) স্বশিক্ষিত কোন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ইঞ্জিল ও তৌরাতের উপর গভীর অনুসন্ধান ও পড়াশুনার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে আবিস্কার করেছিলেন!

কিন্তু এ ধারণার বিপরীতে অনেক প্রমাণ রয়েছে , এ গুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

যদি ইসলামের নবী (সা.) কোরআনকে ইঞ্জিল ও পূর্ববর্তী নবীগণের (আ.) শিক্ষা থেকে গ্রহণ করতেন , তবে সঙ্গত কারণেই কোরআনের বিষয়-বস্তুসমূহ ইঞ্জিল ও তৌরাতের সদৃশ হতো। অথচ কোরআনের বিষয় বস্তু তৌরাত ও ইঞ্জিল থেকে সামগ্রিক ও মৌলিক ভাবে পৃথক ও স্বতন্ত্র।

কোরআনের বক্তব্য , প্রাঞ্জল ও অভূতপূর্ব ভাষাশৈলীর সম্মুখে তদানিন্তন ও পরবর্তী যুগের খ্যাতনামা সাহিত্যিকগণও নতশির। আর এটাই প্রমাণ করে যে , ইসলামের নবী (সা.) সরাসরি বিশ্ব সৃষ্টি কর্তার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন এবং নিঃসন্দেহে এ কথাগুলো ও বাক্যগুলো কোন পুস্তকেই বিদ্যমান ছিল না , যা থেকে নবী (সা.) উদ্ধৃতি দিবেন ও শিক্ষা নিবেন।

কোন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না ; বরং এ অপপ্রচারটি ছিল খ্রিস্টান পাদ্রী ও পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যপ্রবণ প্রাচ্যবিদদের সাজানো কথা।

যদি কোরআন বাইবেলের পুরাতন ও নতুন সংস্করণ থেকে অস্তিত্ব লাভ করত , তবে যারা কোরআনের বিরুদ্ধে কোন আয়াত উদ্ধৃতি করতে ও এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইত , তাহলে , যে তৌরাত ও ইঞ্জিল তাদের হাতে ছিল তারা তাতে খুঁজে দেখত এবং কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই স্বীয় লক্ষ্যে পৌঁছতে পারত।

সকলেই বিশ্বাস করেন যে , মুহম্মদ (সা.) (কারো নিকট) শিক্ষা গ্রহণ করেন নি।

কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি বিশ্বাস করবে যে , পড়াশুনা করেন নি এমন একজন ব্যক্তি , যিনি অজ্ঞ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের পাঠ্য পুস্তক থেকে দূরে বিদ্যমান এক সমাজে বড় হয়েছেন , তিনি এক জ্ঞানগর্ভ ও বিশ্বজনীন পুস্তক উপহার দিয়েছেন ? এ ধরনের ব্যক্তি বর্গের নিকট প্রশ্ন করা উচিৎ যে , কিরূপে ইসলামের নবী (সা.) তৌরাত ও ইঞ্জিলের উপর পড়াশুনা করতেন ? যে ব্যক্তি তার সমস্ত জীবনে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যান নি , কোন শিক্ষাগুরুর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন নি , কিরূপে তিনি অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে সংবাদ দিতে পারেন ?!

ওহী কী ?

যা সর্বজন স্বীকৃত তাতে বলা হয় , মহান আল্লাহ্ ও তাঁর নবী (আ.) গণের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং তারা সকল বাস্তবতার জ্ঞান বিশ্ব সৃষ্টির উৎস (অর্থাৎ মহান আল্লাহ্) থেকে লাভ করতেন। আর এ সম্পর্ক তাঁদের আত্মিক উৎকর্ষ ও দৃঢ়তার ফলে বিদ্যমান ছিল।

তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে , যদি নবীগণের (আ.) সাথে এ সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় তবে তাঁদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। নবীগণের (আ.) সকল মর্যাদার কারণ হলো যে , তারা বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কের যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। সুতরাং তাঁরা যা বলতেন তাতে কোন প্রকার সন্দেহ ও জটিলতা ছিলনা। বরং কী এবং কোথা থেকে এসেছে এ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণরূপে অবহিত ছিলেন , যা কারো কারো তথাকথিত অর্ন্তদৃষ্টির (كشف ) দাবির ব্যতিক্রম যেখানে যোগ সাধনা ও অন্যান্য পদ্ধতি ও নিয়ামকের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এর অধিকারীদের নিকট এমন কিছু বিষয় অর্জিত হয় যে তারা জানে না কোথা থেকে এসেছে। বরং প্রায়শঃই ধারণা ও অনুমানের বশবর্তী আবার কখনোবা প্রকৃত অবস্থার ব্যতিক্রম হয়ে থাকে।

যাহোক , এ দলের (যোগী) উপর নবীগণের (আ.) শ্রেষ্ঠত্ব এতটা সুস্পষ্ট যে , কোন প্রকার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আল্লাহর নবীগণ (আ.) যা বলেন ও দেখেন তা-ই বাস্তব ও সত্য। এমনকি উদাহরণত এক বিন্দু পরিমাণ সন্দেহও তাদের নিকট আশ্রয় পায় না। অতএব , ওহী হলো মহান আল্লাহ্ ও নবীগণের (আ.) মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল তা-ই। আর এ সম্পর্ক কখনো কখনো জিব্রাইলের মাধ্যমে , আবার কখনো কখনো কোন প্রকার মাধ্যম ব্যতীতই সম্পন্ন হতো।


4

5

6

7

8

9

10