আল মুরাজায়াত

আল মুরাজায়াত6%

আল মুরাজায়াত লেখক:
: আবুল কাসেম
প্রকাশক: এস. এম. আলীম রেজা ৯৩,আরামবাগ,ঢাকা।
বিভাগ: ইতিহাস

আল মুরাজায়াত
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 133 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 69324 / ডাউনলোড: 9341
সাইজ সাইজ সাইজ
আল মুরাজায়াত

আল মুরাজায়াত

লেখক:
প্রকাশক: এস. এম. আলীম রেজা ৯৩,আরামবাগ,ঢাকা।
বাংলা

1

2

3

৮০। মুহাম্মদ ইবনে ফুযাইল ইবনে গাযওয়ান (আবু আবদুর রহমান কুফী)

ইবনে কুতাইবা তাঁর মা আরিফ গ্রন্থে তাঁকে শিয়া রিজালের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। ইবনে সা দ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ২৭১ পৃষ্ঠায় তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, তিনি সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত এবং প্রচুর হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি শিয়া মতাবলম্বী। সা দ তাঁর কোন কোন হাদীস দলিল হিসাবে গ্রহণ করতেন না।

যাহাবী তাঁর মিযানুল ই তিদাল গ্রন্থের শেষে যে সকল রাবী তাঁদের পিতার মাধ্যমে পরিচিত তাঁদের পরিচয় দান করতে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, তিনি শিয়া ও সত্যবাদী। মুহাম্মদ নামধারীদের তালিকায় তাঁর নাম স্মরণ করে বলেছেন,আহমাদ তাঁকে শিয়া বলেছেন,তিনি সত্যবাদী এবং সুন্দর ও সঠিক হাদীস বর্ণনাকারী। আবু দাউদ তাঁকে উগ্র ও কট্টর শিয়া বলে অভিহিত করে বলেছেন,তিনি প্রসিদ্ধ হাদীসবিদদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি হামযাহর জন্য কোরআন পাঠ করতেন।

যাহাবী সংকলিত গ্রন্থের কথা বলতে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ইবনে মুঈন তাঁকে বিশ্বস্ত বলেছেন। আহমাদ তাঁকে ভাল বলেছেন। নাসায়ী বলেছেন : কোন সমস্যা নেই।

সিহাহ সিত্তাহর হাদীসবিদগণ তাঁর হাদীস দলিল হিসাবে গ্রহণ ও পেশ করেছেন। যে সকল হাদীস তিনি তাঁর পিতা ফুযাইল,আ মাশ,ইসমাঈল ইবনে আবি খালিদ ও অন্যান্যদের হতে বর্ণনা করেছেন তা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে। বুখারীর বর্ণনানুসারে মুহাম্মদ ইবনে নুমাইর,ইসহাক হানযালী,ইবনে আবি শাইবা,মুহাম্মদ ইবনে সালাম,কুতাইবা,ইমরান ইবনে মাইসারাহ্ এবং আমর ইবনে আলী তাঁর হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

মুসলিমের মতানুসারে আবদুল্লাহ্ ইবনে আমের,আবু কুরাইব,মুহাম্মদ ইবনে তারিফ,ওয়াসেল ইবনে আবদুল আলা,যুহাইর,আবু সাঈদ আশাজ,মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযীদ,মুহাম্মদ ইবনে মুসান্না,আহমাদ ওয়াকিয়ী এবং আবদুল আযীয ইবনে উমর ইবনে আবান তাঁর হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

তিনি ১৯৫ হিজরীতে মতান্তরে ১৯৪ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।

৮১। মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম তায়েফী

ইমাম সাদিক (আ.)-এর প্রসিদ্ধ সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত। শাইখুত তায়েফাহ্ আবু জা ফর তুসী তাঁকে শিয়া রিজাল বলেছেন। হাসান ইবনে আলী ইবনে দাউদ১১৯ বিশ্বস্ত রাবীদের তালিকায় তাঁকে স্মরণ করেছেন।

যাহাবী তাঁর পরিচিতি পর্বে ইয়াহিয়া ইবনে মুঈন ও অন্যদের হতে তাঁর নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করেছেন এবং বলেছেন, কাছনী,ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া ও কুতাইবা তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবদুর রহমান ইবনে মাহ্দী মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম সম্পর্কে বলেছেন, তাঁর লিখিত গ্রন্থসমূহ সঠিক ও নির্ভরযোগ্য (সহীহ)। মা রুফ ইবনে ওয়াসেল বলেছেন, সুফিয়ান সাওরীকে তাঁর নিকট হাঁটু গেঁড়ে বসে হাদীস লিখতে দেখেছি।

আমার মতে যাঁরা তাঁকে দুর্বল বলে উপেক্ষা করেছেন তাঁদের এ উপেক্ষার কারণ তাঁর শিয়া হওয়া। কিন্তু তাঁকে দুর্বল বলার এ প্রচেষ্টা তাঁর কোনই ক্ষতি করে নি। ওযু সম্পর্কে আমর ইবনে দিনার হতে তাঁর বর্ণিত হাদীস সহীহ মুসলিমে রয়েছে।

তাবাকাতে ইবনে সাদ -এ যেভাবে উদ্ধৃত হয়েছে তাতে ওয়াকী ইবনে জাররাহ্,আবু নাঈম,মুঈন ইবনে ঈসা ও অন্যান্যরা তাঁর নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন। তিনি ১৭৭ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর সমনামী মুসলিম ইবনে জাম্মাযও একই বছর ইন্তেকাল করেন বলে ইবনে সা দ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থের ৫ম খণ্ডে তাঁর পরিচিতি পর্বে উল্লেখ করেছেন।

৮২। মুহাম্মদ ইবনে মূসা ইবনে আবদুল্লাহ্ ফিতরী (মদীনার অধিবাসী)

যাহাবী তাঁর মিযানুল ই তিদাল গ্রন্থে তাঁর শিয়া হবার বিষয়টি আবু হাতেম হতে এবং বিশ্বস্ততার বিষয়টি তিরমিযী হতে উল্লেখ করেছেন। তাঁর নামের পাশে সাংকেতিক চিহ্নে মুসলিম ও সুনানে আরবাআহ্ লিখেছেন এটি বোঝানোর জন্য যে,তাঁরা তাঁর হাদীস হতে প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। তিনি আবদুল্লাহ্ ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবু তালহা হতে যে হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন তা সহীহ মুসলিমের আত্ ইমাহ্ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।

তিনি মাকবারী ও তাঁর পর্যায়ের কয়েকজন হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবি ফাদিক,ইবনে মাহদী,কুতাইবা ও সমপর্যায়ের অনেকেই তাঁর হতে হাদীস নকল করেছেন।

৮৩। মুয়াবিয়া ইবনে আম্মার দোহনী বাজালী কুফী

শিয়াদের মধ্যে তিনি পরিচিত ও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তিনি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী এবং বিশ্বস্ত। তাঁর পিতা আম্মার সেসব ব্যক্তিত্বের অন্তর্ভুক্ত যাঁরা দৃঢ়তা ও সত্যের পথে অটল থাকার আদর্শ হিসেবে প্রবাদ পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর পথে অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করে ধৈর্যশীলদের নমুনা হয়েছিলেন। অত্যাচারী শাসকরা শিয়া হবার কারণে তাঁর পা কেটে দিয়েছিল। তাতেও তিনি কখনও কোন দুর্বলতা প্রদর্শন করেন নি বা পিছিয়ে আসেন নি,বরং ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত অবিচল ছিলেন। তাঁর পুত্র মুয়াবিয়াও পিতার পথকে আঁকড়ে ধরে রাখেন। সন্তান পিতার প্রতিকৃতি(الولد سرّ أبيه)

যে ব্যক্তি এরূপ পিতার সদৃশ,তিনি ভুল পথে যেতে পারেন না,তিনি ইমাম সাদিক ও ইমাম কাযেম (আ.)-এর সাহাবীগণের অন্তর্ভুক্ত ও তাঁদের জ্ঞানের ধারক ও বাহক।

তিনি কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। আমরা সনদসহ তাঁর হতে বর্ণিত হাদীসগুলো উল্লেখ করেছি। ইবনে আবি উমাইর ও অন্যান্য শিয়া রাবী তাঁর হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। মুসলিম ও নাসায়ী তাঁর বর্ণিত হাদীস প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যুবাইর হতে তাঁর বর্ণিত হাদীস সহীহ মুসলিমে রয়েছে। মুসলিমের বর্ণনানুসারে ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া ও কুতাইবা তাঁর হাদীস বর্ণনা করেছেন। মুয়াবিয়া তাঁর পিতা আম্মার এবং তাঁর পর্যায়ের অনেকের হতেই হাদীস নকল করেছেন। আহলে সুন্নাহর হাদীস গ্রন্থসমূহে এ রেওয়ায়েতগুলো রয়েছে।

তিনি ১৭৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

৮৪। মা রুফ ইবনে খারবুয কারখী (ইবনে ফিরুজ ও ইবনে আলী নামেও পরিচিত)

যাহাবী তাঁর মিযানুল ই তিদাল গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, তিনি সত্যবাদী ও শিয়া। তিনি তাঁর নামের পাশে সাংকেতিকভাবে বুখারী,মুসলিম ও আবু দাউদ লিখেছেন,কারণ তাঁরা তাঁর হাদীস দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে তিনি আবু তুফাইল হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং রাবী হিসেবে কম হাদীস বর্ণনাকারী। আবু আছেম,আবু দাউদ,উবাইদুল্লাহ্ ইবনে মূসা ও অন্যান্যরা তাঁর হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবু হাতেম বলেছেন, তাঁর হাদীস সহীহ তাই অবশ্যই তা লিপিবদ্ধ হওয়া উচিত।

ইবনে খাল্লেকান তাঁর ওয়াফায়াতুল আ য়ান গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, তিনি দাসশ্রেণীর এবং আলী ইবনে মূসা রেযা (আ.)-এর ভক্তদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি তাঁর উপদেশবাণীর একটিতে বলেছেন, আমি আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছি ও আমার যা কিছু ছিল তা আমার মাওলা আলী ইবনে মূসা রেযা (আ.)-এর খেদমতে নিয়োজিত করেছি।

ইবনে কুতাইবা তাঁর মা আরিফ গ্রন্থে তাঁকে শিয়া রিজালদের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন।

মুসলিম তাঁর হাদীস প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি তাঁর সহীহতে হজ্ব অধ্যায়ে আবু তুফাইল হতে তাঁর হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি ২০০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

৮৫। মানসুর ইবনে মো তামার ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে রাবীয়া সালামী কুফী

তিনি ইমাম বাকির ও সাদিক (আ.)-এর সাহাবীগণের অন্তর্ভুক্ত এবং তিনি তাঁদের নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন। মুনতাহাল মাকাল ফি আহওয়ালির রিজাল গ্রন্থে তা উদ্ধৃত হয়েছে।

ইবনে কুতাইবা তাঁর মা আরিফ গ্রন্থে তাঁকে শিয়া রিজালের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন এবং জাওযাজানী তাঁকে সে সকল মুহাদ্দিসের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন যাঁদের মাজহাবগত আকীদার (ধর্মের মৌল ও শাখাগত বিষয়ে) কারণে লোকেরা তাঁদের পছন্দ করত না। এজন্যই তিনি বলেছেন, কুফার লোকদের মধ্যে একদল ছিলেন যাঁদের মাজহাবের কারণে জনসাধারণ তাঁদের পছন্দ করত না,তাঁরা কুফার মুহাদ্দিসদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন,যেমন আবু ইসহাক,মানসুর,যুবাইদ ইয়ামী,আ মাশ এবং তাঁদের নিকটবর্তী ব্যক্তিবর্গ। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁদের মুখের বিশ্বস্ততার কারণে তাঁদেরকে গ্রহণ করত।

আমার প্রশ্ন হলো কি বিষয়ে এই সত্যপরায়ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তাদের শত্রুতার কারণ ঘটেছিল? তাঁরা নবীর আহলে বাইত হতে যা এসেছে তার প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন বলে? নাকি যে মূল্যবান ভারী বস্তুকে আঁকড়ে ধরার জন্য রাসূল (সা.) বলেছিলেন তা আঁকড়ে ধরার কারণে? যেহেতু তাঁরা মুক্তির তরণিতে আরোহণ করেছিলেন,নবীর জ্ঞানের শহরের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন এবং তাঁরা আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সব সময় ক্রন্দন করতেন ও নবীর সুন্নাহকে তাঁর বংশধরদের অনুসরণের মাধ্যমে জীবিত রেখেছিলেন এরূপ বিষয়গুলোই তাঁদের প্রতি শত্রুতার আগুন জ্বালিয়েছিল। তাঁদের জীবনী অধ্যয়নে আমাদের নিকট তাই প্রমাণিত হয়।

ইবনে সা দ মানসুরের পরিচিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, আল্লাহর ভয়ে অধিক ক্রন্দনের কারণে তাঁর চোখগুলো প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সব সময় তাঁর চক্ষুদ্বয় হতে অশ্রুপাত হত বলে তিনি হাতে সর্বক্ষণ রুমাল রাখতেন ও চোখের পানি তা দিয়ে বার বার মুছতেন। তিনি ষাট বছর রোযা রেখেছেন এবং অধিকাংশ সময় নামাযে মশগুল থাকতেন। ২২০

প্রশ্ন হলো এমন আমলকারী ব্যক্তি মানুষের অপছন্দ ও তিরস্কারের পাত্র হওয়া কি বাঞ্ছনীয়? অবশ্যই না। কিন্তু তদুপরি আমরা এমন উম্মতের মুখোমুখি যারা ইনসাফ করে না। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

ইবনে সা দ মানসুর সম্পর্কে হাম্মাদ ইবনে যাঈদ হতে উদ্ধৃত করেছেন, মানসুরকে মক্কায় দেখেছিলাম। আমি তাঁকে খাশাবিয়া ভেবেছিলাম কিন্তু তাঁকে দেখে আমার বিশ্বাস হয় নি যে,তিনি মিথ্যা বলতে পারেন।

আপনার প্রতি আমার আহবান গায়ের জোরে অন্যদের হীন বলা,ছোট করে দেখা ও তাঁদের প্রতি শত্রুতাভাব পোষণ করার যে প্রবণতা এসব কথার মধ্যে রয়েছে তার মূল্যায়ন করুন। দেখুন,কতটা ভয়ঙ্কর একজন মুমিনের ব্যাপারে এরূপ মন্তব্য যিনি বিশ্বাস করতে পারেন নি তিনি মিথ্যা কথা বলেন।

আফসোস! আফসোস! মিথ্যা বলা যেন রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতের বন্ধু ও তাঁদের প্রতি ভালবাসা পোষণকারীদের মজ্জাগত। সম্ভবত মানসুর সত্যবাদিতার বিপরীত পথে চলেছেন তাই নাসেবীরা (আহলে বাইতের প্রতি বিদ্বেষীরা) তাঁর মত আহলে বাইতপন্থীদের জন্য মিথ্যাবাদী হতে উত্তম কোন বিশেষণ খুঁজে পায় নি। তাই তারা তাঁদের জন্য খাশাবিয়া,তুরাবিয়া,রাফেযা এবং এরূপ বিশেষণগুলো নির্বাচন করেছেন। সম্ভবত তাঁরা আল্লাহর এ বাণীটি শ্রবণ করেন নি :

) ولا تنابزوا بالألقاب بئس الاسم الفسوق بعد الإيْمان(

তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না,কত নিকৃষ্ট (জাহেলিয়াতের) এ মন্দ উপনাম ঈমান আনয়নের পর। (সূরা হুজরাত : ১১)

ইবনে কুতাইবা তাঁর মাআরিফ গ্রন্থে খাশাবিয়া উপনাম শিয়াদের জন্য ব্যবহার করে বলেছেন তাঁরা রাফেযী। তাঁদের এ নামকরণের কারণ হলো ইবরাহীম আশতার উবাইদুল্লাহ্ যিয়াদের মুখোমুখি হবার মুহূর্তে ইবরাহীমের সকল সঙ্গীদের হাতে কাষ্ঠ ছিল। খাশাবিয়া অর্থ কাষ্ঠধারীগণ।

আমার মতে তারা এ সকল ব্যক্তিবর্গের জন্য এরূপ নাম এজন্য নির্বাচন করেছিল যাতে করে তিরস্কারের মাধ্যমে তাঁদের অপরাজেয় মানসিকতাকে দুর্বল করা যায়। কিন্তু এ কাষ্ঠধারীগণ (খাশাবিয়া) নাসেবীদের নেতা ইবনে মারজানাকে (উবাইদুল্লাহকে) হত্যা করে এ বিষবৃক্ষকে উৎপাটন করেছেন। যারা রাসূলের বংশধরদের কারবালায় শহীদ করেছিল। সেই জালেম ও অত্যাচারীদের লেজ কেটেছিলেন (সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর)। সুতরাং তারা যে উপনামের মাধ্যমে আমাদের ছোট করতে চেয়েছিল তা আমাদের সম্মানের বস্তু। তেমনি হযরত আলীর আবু তুরাব উপাধির কারণে শিয়াদের যে তুরাবিয়া বলা হয় তাও আমাদের নিকট ত্রুটি বলে গণ্য নয়,বরং তা আমাদের গর্বিত ও সম্মানিত করে।

মূল আলোচনা থেকে অন্যদিকে সরে গিয়েছিলাম,সুতরাং ফিরে আসি আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনায়। মানসুরের হাদীসের বিষয়ে সিহাহ সিত্তাহরও অন্যান্য হাদীসবেত্তাগণ একমত পোষণ করেন যে,তিনি শিয়া হওয়া সত্ত্বেও তাঁর হাদীস ও কথা প্রমাণ উপস্থাপনে কোন সমস্যা নেই। এজন্য তাঁরা তা দলিল হিসেবে ব্যবহার করতেন। আপনি আবু ওয়ায়েল,আবু যুহা,ইবরাহীম নাখয়ী ও তাঁদের পর্যায়ের অন্যান্য রাবীগণ তাঁর হতে যে সকল হাদীস বর্ণনা করেছেন তা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে দেখতে পারেন। বুখারী ও মুসলিমে শো বা,সুফিয়ান সাওরী,ইবনে উয়াইনা,হাম্মাদ ইবনে যাইদ এবং এরূপ প্রসিদ্ধ অনেক রাবীই তাঁর হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

ইবনে সা দ বলেছেন, মানসুর ১৩২ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তিনি নিরাপদ,বিশ্বস্ত,অনেক হাদীস বর্ণনাকারী,উঁচু পর্যায়ের মুহাদ্দিস ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহ্ তাঁকে রহম করুন।

৮৬। মিনহাল ইবনে আমর তাবেয়ী (কুফার অধিবাসী)

কুফার প্রসিদ্ধ শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই জাওযাজানী তাঁকে দুর্বল ও মন্দ মাজহাবের অনুসারী বলেছেন।

ইবনে হাযমও তাঁর সম্পর্কে এরূপ মন্তব্য করেছেন। ইয়াহিয়া ইবনে সাইদও তাঁর তীব্র সমালোচনা করেছেন। কিন্তু আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেছেন, মিনহালের প্রতি আমার আকর্ষণ আবু বিশর হতে অধিক এবং তিনি অধিকতর বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য।

মুখতারের শাসনামলে তিনি নিজেকে শিয়া বলে প্রচার করতেন। তাই এ বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত হওয়া সত্ত্বেও মুহাদ্দিসরা তাঁর হাদীসের বিশুদ্ধতার বিষয়ে সন্দেহ করতেন না। তাই মাসউদী,শো বা,হাজ্জাজ ইবনে আরতাত এবং তাঁদের পর্যায়ের অনেকেই তাঁর নিকট হতে হাদীস শিক্ষা করেছেন। ইবনে মুঈন,আহমাদ আজালী ও অন্যরাও তাঁকে বিশ্বস্ত বলেছেন। যাহাবী তাঁর মিযানুল ই তিদাল গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে উপরোক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করে তাঁর নামের পাশে সাংকেতিকভাবে বুখারী ও মুসলিম লিখেছেন যেহেতু তাঁরা তাঁর হাদীস দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সাঈদ ইবনে জুবাইর হতে তাঁর বর্ণিত হাদীসসমূহ সহীহ বুখারীতে রয়েছে। যাইদ ইবনে আবি আনিসা সহীহ বুখারীর তাফসীর অধ্যায়ে তাঁর হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। মানসুর ইবনে মো তামার নবীদের সম্পর্কে তাঁর হতে হাদীস নকল করেছেন।

৮৭। মূসা ইবনে কাইস হাযরামী (তাঁর কুনিয়াত হলো আবু মুহাম্মদ)

আকিলী তাঁকে বাড়াবাড়ি আকীদা পোষণকারী রাফেযীদের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। সুফিয়ান হযরত আবু বকর ও আলী সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আলী আমার নিকট অধিকতর প্রিয়।

মূসা সালামাহ্ ইবনে কুহাইল হতে,তিনি আয়ায ইবনে আয়ায হতে,আয়ায মালিক ইবনে জাউনা হতে বর্ণনা করেছেন, উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালমাহ্ বলেছেন : আলী সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কেউ তাঁর অনুসরণ করলে সেও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। আর কেউ আলীকে ত্যাগ করলে প্রকৃতপক্ষে সে সত্যকেই ত্যাগ করেছে। এটি আল্লাহর পক্ষ হতে আমাদের প্রতি আরোপিত প্রতিশ্রুতি। আবু নাঈম,ফযল ইবনে দাকিন হতে এবং তিনি মূসা ইবনে কায়িস হতে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

মূসা আহলে বাইতের ফজীলত ও মর্যাদা বর্ণনা করে কিছু সহীহ হাদীস বর্ণনা করেছেন যা আকিলীর মনোকষ্টের কারণ। তাই মূসা সম্পর্কে কটু মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ইবনে মুঈন তাঁকে বিশ্বস্ত বলেছেন।

আবু দাউদ এবং সাঈদ ইবনে মানসুর তাঁদের সুনান গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত হাদীসসমূহ হতে দলিল পেশ করেছেন।

উপরোক্ত বিষয়গুলো যাহাবী তাঁর মিযানুল ই তিদাল গ্রন্থে এনেছেন। যেসব হাদীস তিনি সালামাহ্ ইবনে কুহাইল ও হাজর ইবনে আনবাসাহ্ হতে বর্ণনা করেছেন তা সুনান গ্রন্থসমূহে রয়েছে।

ফযল ইবনে দাকিন,উবাইদুল্লাহ্ ইবনে মূসা ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ রিজাল তাঁর হতে হাদীস নকল করেছেন। তিনি আব্বাসীয় খলীফা মানসুরের শাসনামলে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহ্ তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করুন।

ن

৮৮। নাফিই ইবনে হারিস হামাদানী সাবিয়ী (আবু দাউদ নাখয়ী কুফী)

আকিলী বলেছেন, তিনি রাফেযী মতবাদে বাড়াবাড়ি করতেন। বুখারী তাঁর শিয়া হওয়াকে ত্রুটি বলে মনে করতেন।

সুফিয়ান,হাম্মাম (হুমাম),শারীক এবং তাঁদের পর্যায়ের অনেকেই তাঁর নিকট হাদীস শিক্ষা করেছেন। তিরমিযী তাঁর সহীহতে তাঁর হাদীস প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। হাদীস গ্রন্থের লেখকগণ তাঁর হাদীস গ্রহণ করতেন। আপনি আনাস ইবনে মালিক,ইবনে আব্বাস,ইমরান ইবনে হুসাইন এবং যাইদ ইবনে আরকাম হতে তাঁর বর্ণিত হাদীস সহীহ তিরমিযীতে দেখতে পারেন।

উপরোক্ত কথাগুলো যাহাবী তাঁর মিযান গ্রন্থে এনেছেন।

৮৯। নূহ ইবনে কাইস ইবনে রাবাহ হাদানী ওয়াতাহী (তাঁকে বাসরী বলেও উল্লেখ করা হয়েছে)

যাহাবী তাঁর মিযানুল ই তিদাল গ্রন্থে সালিহুল হাদীস বা গ্রহণযোগ্য হাদীস বর্ণনাকারী বলেছেন। তাঁর মতে আহমাদ এবং ইবনে মুঈনও তাঁকে বিশ্বস্ত বলেছেন। আবু দাউদ তাঁকে শিয়া বলেছেন এবং নাসায়ী বলেছেন, তাঁর কোন সমস্যা নেই।

যাহাবী মুসলিম ও সুনানের গ্রন্থকারদের নাম সাংকেতিকভাবে তাঁর নামের পাশে লিখেছেন কারণ তিনি তাঁদের মতে সত্যপরায়ণ রিজালদের অন্তর্ভুক্ত। ইবনে আউন হতে পানীয় সম্পর্কিত তাঁর বর্ণিত হাদীসসমূহ সহীহ মুসলিমে রয়েছে। তাছাড়া পোষাক সম্পর্কিত একটি হাদীস যা তিনি তাঁর ভ্রাতা খালিদ ইবনে কাইস সূত্রে বর্ণনা করেছেন তা সহীহ মুসলিমে দেখতে পারেন। মুসলিমের নিকট নাসর ইবনে আলী তাঁর হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। সুনানে আরবাআহ্য় আবুল আশআস ও তাঁর পর্যায়ের অনেকেই তাঁর নিকট হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি আইয়ুব,আমর ইবনে মালিক এবং আরো কয়েকজন হতে হাদীস নকল করেছেন।

জাহেলিয়াত যুগের আরবদের বিশ্বাসে কুসংস্কার

বিশ্বের সকল জাতি ও সমাজের আকীদা-বিশ্বাস ইসলামের সূর্যোদয়ের সময় বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও অলীক উপাখ্যান দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। গ্রীক ও সামানীয় অলীক উপাখ্যান ও কল্প-কাহিনীসমূহ সে যুগের সবচেয়ে সভ্য ও উন্নত জাতিসমূহের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এখনও প্রাচ্যের উন্নত জাতিসমূহের মধ্যে অনেক কুসংস্কার বিদ্যমান রয়েছে যা আধুনিক সভ্যতা জনগণের জীবন থেকে দূর করতে পারে নি। জ্ঞান ও কৃষ্টিসমূহের অনুপাতে কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কারের প্রসার ও বিলুপ্ত হয়ে থাকে। সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি-সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে যত পশ্চাদপদ ও অনগ্রসর  হবে ঠিক সেই অনুপাতে কুসংস্কার ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসও তাদের মধ্যে বৃদ্ধি পাবে।

ইতিহাস আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের প্রচুর কুসংস্কার ও কল্প-কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছে। বুলূগুল আরবে ফী মারেফাতি আহওয়ালিল আরাব’গ্রন্থের রচয়িতা39 এ সব কুসংস্কার ও কল্প-কাহিনীর অনেকাংশ কতগুলো কবিতা ও গল্প আকারে ঐ গ্রন্থে সংগ্রহ করেছেন। যে কোন ব্যক্তি এ গ্রন্থ ও অন্যান্য গ্রন্থ পাঠ করার পর নানারূপ কুসংস্কারের সাথে পরিচিত হবেন যা জাহেলী আরবদের মন-মস্তিষ্ক ভর্তি করে রেখেছিল। আর এ সব ভিত্তিহীন বিষয়বস্তু ছিল অন্যান্য জাতি থেকে আরব জাতির অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ হওয়ার কারণ। ইসলাম ধর্মের অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ঐ সব কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কার।

আর এ কারণেই মহানবী (সা.) তাঁর সকল শক্তি নিয়োগ করে জাহেলিয়াতের নিদর্শনসমূহ যা ছিল বিভিন্ন ধরনের অসার কল্প-কাহিনী,অলীক ধ্যান-ধারণা ও কুসংস্কার তা মূলোৎপাটন করার চেষ্টা করেছেন। মহানবী (সা.) যখন মায়ায ইবনে জাবালকে ইয়েমেনে প্রেরণ করেছিলেন তখন তিনি তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, হে মায়ায! জনগণের মধ্য থেকে জাহেলিয়াতের সকল চি হ্ন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস উচ্ছেদ করবে এবং ইসলামের যাবতীয় প্রথা ও আদর্শ যা হচ্ছে চিন্তা-ভাবনা এবং গভীর অনুধাবন ও উপলব্ধির দিকে আহবান তা পুনরুজ্জীবিত করবে।”40

و أمت امر الجاهلية إلّا ما سنّهُ الإسلام و أظهر أمر الإسلام كلّه صغيره و كبيره

যে আরব জাতির ওপর বহু বছর যাবত জাহেলী চিন্তাধারা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল তাদের সামনে তিনি এ রকম বলেছিলেন,

كلّ مأثرة في الجاهلية تحت قدمي

“(ইসলামের আবির্ভাবের সাথে সাথে) সব ধরনের অলীক আচার-অনুষ্ঠান,আকীদা-বিশ্বাস,মিথ্যা অহমিকা ও গর্ব বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং তা আমার পদতলে রাখা হলো।”41

যাতে করে ইসলাম ধর্মের উচ্চাঙ্গের তত্ত্বজ্ঞান স্পষ্ট হয়ে যায় সেজন্য এখানে কতিপয় উদাহরণ পেশ করব :

1. বৃষ্টি বর্ষণের জন্য আগুন জ্বালানো : আরব উপদ্বীপ বছরের বেশিরভাগ সময়ই শুষ্ক থাকে;সেখানকার অধিবাসীরা বৃষ্টিপাতের জন্য সালা’(سلع ) নামের এক প্রকার নিমজাতীয় বৃক্ষের কাঠ এবং ওসর’(عشر ) নামের অপর একটি দ্রুত দহনশীল বৃক্ষের কাঠ একত্র করে সেগুলোকে গরুর লেজের সাথে বেঁধে গরুকে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেত। তারপর ঐ কাঠগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিত। ওসর বৃক্ষের কাঠের মধ্যে দগ্ধকারী উপাদান থাকার কারণে ঐ কাঠগুলো থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠত। আর গরুটি দগ্ধ হওয়ার কারণে ছুটোছুটি ও উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার শুরু করত। তারা এ ধরনের কাপুরুষোচিত কাজকে পূর্বপুরুষদের প্রাচীন রীতিনীতির অনুসরণ হিসাবে আকাশের বিদ্যুৎ চমকানি ও বজ্রপাতের সাথে তুলনা করত। তারা অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে বিদ্যুৎ এবং গরুর চিৎকারকে বজ্রপাতের শব্দের স্থলে বিবেচনা করত;তারা তাদের এ কাজকে বৃষ্টি বর্ষণে কার্যকর প্রভাব রাখে বলে বিশ্বাস করত।

2. যদি গাভী পানি না খেত তাহলে তারা ষাঁড়কে প্রহার করত। পানি পান করানোর জন্য গাভী ও ষাঁড়গুলোকে পানির নালার ধারে নিয়ে যাওয়া হতো। মাঝে মধ্যে এমন হতো যে,ষাঁড়গুলো পানি খেত,কিন্তু গাভীগুলো পানি স্পর্শও করত না। আরবরা মনে করত যে,গাভীগুলোর পানি পান করা থেকে বিরত থাকার কারণ হচ্ছে ঐ সব শয়তান যা ষাঁড়ের দু শিংয়ের মাঝখানে স্থান নিয়েছে এবং গাভীগুলোকে পানি পান করতে দিচ্ছে না। তাই ঐ শয়তানগুলোকে তাড়ানোর জন্য ষাঁড়ের মাথা ও মুখমণ্ডলে প্রহার করত।42

3. নীরোগ উটের মাথায় আগুনের ছ্যাঁকা দেয়া হতো যাতে করে অপরাপর উট সুস্থ হয়ে ওঠে: কোন উট যদি অসুস্থ হয়ে পড়ত অথবা উটের ঠোঁট ও মুখে ক্ষত ও ঠোসা দেখা যেত তাহলে অন্যান্য উটের মধ্যে এ রোগের সংক্রমণ রোধ করার জন্য একটি সুস্থ উটের ঠোঁট,বাহু ও ঊরুতে ছ্যাঁকা দেয়া হতো,কিন্তু তাদের এ কাজের কারণ স্পষ্ট নয়। কখনো কখনো ধারণা করা হয় যে,এ ধরনের কাজের রোগ-প্রতিষেধক দিক আছে এবং এটি এক ধরনের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতিও হতে পারে। কিন্তু যেহেতু অনেক উটের মধ্য থেকে কেবল একটি উটের ওপর এ ধরনের বিপদ নেমে আসত তাই বলা যায় যে,তা এক ধরনের কুসংস্কার।

4. একটি উটকে কোন কবরের কাছে আটকে রাখা হতো যাতে করে কবরবাসী কিয়ামত দিবসে পদব্রজে (কবর থেকে) উত্থিত না হয় (অর্থাৎ উক্ত উটের ওপর সওয়ার অবস্থায় উত্থিত হয়)।

যদি কোন মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করত তখন ঐ ব্যক্তির কবরের পাশে একটি গর্ত খুঁড়ে তাতে একটি উট আটকে রাখা হতো এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঐ উটকে দানা-পানি ও খড়কুটা কিছুই খেতে দেয়া হতো না যাতে করে কিয়ামত দিবসে মৃত ব্যক্তি ঐ উটের ওপর সওয়ার হয় এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় তার পুনরুত্থান না হয়।

5. কবরের পাশে উট জবাই করা হতো। যেহেতু মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় তার প্রিয় ব্যক্তি ও অতিথিদের জন্য উট জবাই করত তাই মৃতকে সম্মান ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তার আত্মীয়স্বজন তার কবরের কাছে বেদনাদায়কভাবে উট বধ করত।

কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলামের সংগ্রাম

এ ধরনের কাজ যা যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার সাথে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ আগুন জ্বালানোর কারণে বৃষ্টিপাত হয় না,ষাঁড়কে প্রহার করলে গাভীর মধ্যে এর কোন প্রভাবই পড়ে না,আর নীরোগ উটকে ছ্যাঁকা দিলে তা রোগাক্রান্ত উটের সুস্থতা ও রোগমুক্তির কারণ হয় না এবং...) পশুগুলোর প্রতি অত্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা যদি এ সব আচার-আচরণকে ইসলামের সুদৃঢ় বিধিবিধান-যা জীবজন্তু সংরক্ষণ করার ব্যাপারে প্রবর্তিত হয়েছে সেগুলোর সাথে তুলনা করি তাহলে আমাদের বলতে হবে : এই শরীয়ত তদানীন্তন আরব সমাজে প্রচলিত চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা এখানে ইসলামের অগণিত বিধানের মধ্য থেকে কেবল একটি ছোট বিধান উল্লেখ করব :

মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রতিটি বাহক পশুর আরোহীর ওপর ছয়টি অধিকার আছে : 1. যে অবতরণস্থলে অবতরণ করবে সেখানে পশুটিকে কিছু খাদ্য খেতে দেবে,2. যদি পানি বা জলাধারের পাশ দিয়ে গমন কর,তাহলে ঐ পশুটিকে পানি পান করাবে,3. পশুর মুখের ওপর চাবুক মারবে না,4. দীর্ঘক্ষণ কথা বলার সময় পশুর পিঠের ওপর বসে থাকবে না,5. ক্ষমতার বাইরে পশুর ওপর অধিক বোঝা চাপাবে না,6. যে পথে চলার সামর্থ্য পশুটির নেই সে পথে পশুকে চালনা করবে না।”43

6. রোগীদের চিকিৎসাপদ্ধতির ক্ষেত্রে কুসংস্কার : যদি কোন ব্যক্তিকে বিচ্ছু বা সাপ দংশন করত তাহলে উক্ত ব্যক্তির ঘাড়ে স্বর্ণালংকার ঝোলানো হতো এবং বিশ্বাস করা হতো যে,যদি দংশিত ব্যক্তির সাথে তামা ও টিন থাকে তাহলে সে মারা যাবে। জলাতঙ্ক রোগ-যা সাধারণত উক্ত রোগে আক্রান্ত কুকুরের দংশনে সংক্রমিত হয়-দংশিত স্থানের ওপর গোত্রপ্রধানের অল্প রক্ত মাখিয়ে চিকিৎসা করা হতো। আর নিম্নোক্ত কবিতায় তা প্রতিফলিত হয়েছে :

أحلامكم لسقام الجهل شافية

كما دماءكم تشفى من الكلب

যেমন (জলাতঙ্ক ব্যাধিবাহী) কুকুর হতে আরোগ্য দেয় তোমাদের রক্ত

ঠিক তেমনি তোমাদের স্বপ্নগুলোও অজ্ঞতা (জনিত) ব্যাধির আরোগ্যদানকারী।

আর যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে উন্মাদনার আলামত প্রকাশ পেত তাহলে অপবিত্র আত্মা দূর করার জন্য নোংরা কার্যকলাপের আশ্রয় নেয়া হতো। নোংরা ন্যাকড়া এবং মৃত ব্যক্তিদের হাড় পাগলের গলায় ঝুলানো হতো। যাতে করে শিশুরা শয়তানের কুপ্রভাব দ্বারা প্রভাবিত না হয় (অর্থাৎ শয়তানের প্রভাব তাদের ওপর না পড়ে) সেজন্য শিয়াল ও বিড়ালের দাঁত সুতার সাথে বেঁধে শিশুদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হতো। যখন শিশুদের ঠোঁট ও মুখ বিষফোঁড়ায় ভরে যেত তখন শিশুর মা একটি চালুনী মাথার ওপর বসিয়ে গোত্রের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে রুটি ও খেজুর জমা করত এবং তা কুকুরকে খেতে দিত যাতে করে নিজ সন্তানের ঠোঁট ও মুখের ফোঁড়া সেরে যায়;গোত্রের মহিলারা সজাগ দৃষ্টি রাখত যে,তাদের সন্তানরা ঐ সব রুটি ও খেজুর থেকে কিছু না খায়,পাছে তারা এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

চর্মরোগ,যেমন দেহের চামড়া ঝরে পরার চিকিৎসা করার জন্য মুখের লালা চর্মরোগাক্রান্ত স্থানে মালিশ করত। যদি কোন ব্যক্তির (চর্ম) রোগ এতে ভালো না হতো এবং অব্যাহত থাকত তাহলে ভাবা হতো রোগী যে সব প্রাণী,যেমন সাপ,শয়তানদের (অপদেবতা) সাথে যুক্ত সেগুলোর কোন একটিকে হত্যা করেছে। তারা শয়তানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য কাদামাটি দিয়ে উটের মূর্তি নির্মাণ করত। এরপর যব,গম ও খেজুর ঐ মূর্তিগুলোর ওপরে রেখে সেগুলো পাহাড়ের গুহার সামনে রেখে চলে আসত এবং পরের দিন তারা উক্ত স্থানে ফিরে যেত। যদি তারা দেখতে পেত যে,বোঝাগুলো খোলা হয়েছে,তাহলে তারা একে নজরানা কবুল হওয়ার নিদর্শন বলে গণ্য করত এবং বলত যে,রোগীটি সুস্থ হয়ে যাবে। আর এর অন্যথা হলে তারা বিশ্বাস করত,যেহেতু এ নজরানা তুচ্ছ ও নগণ্য তাই তা অপদেবতারা গ্রহণ করে নি।

ইসলাম বিভিন্ন পদ্ধতিতে এ সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। একদল মরুচারী আরব বেদুইন যারা যাদুর কর্ণফুল,যাদুর তাবীজ,মাদুলী এবং হার-যার মধ্যে পাথর ও হাড় বেঁধে রাখা হতো তা দিয়ে রোগীর রোগের চিকিৎসা করত তারা যখন মহানবী (সা.)-এর কাছে গমন করত এবং উদ্ভিদ ও ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করত তখন মহানবী (সা.) বলতেন, প্রতিটি রোগীর জন্য ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ যে আল্লাহ্ ব্যথা ও রোগযন্ত্রণা সৃষ্টি করেছেন তিনিই রোগের ঔষধও তৈরি করেছেন। 44 অর্থাৎ এ সব কর্ণফুল,তাবীজ,মাদুলী ও মালা রোগ নিরাময় করার ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। এমনকি যখন সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস হৃদরোগে আক্রান্ত হন তখন মহানবী (সা.) তাঁকে বলেছিলেন, সাকীফ গোত্রের প্রসিদ্ধ ডাক্তার হারিস কালদার কাছে তোমরা অবশ্যই যাবে।” এরপর তিনি তাঁকে একটি বিশেষ ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিলেন।45

অধিকন্তু যাদুর কর্ণফুল,তাবীজ ও মাদুলী যেগুলোর আসলে কোন কার্যকর প্রভাব নেই সেগুলো সংক্রান্ত বেশ কিছু বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। এখানে আমরা দু টি বর্ণনা উল্লেখ করাই যথেষ্ট বলে বিবেচনা করছি :

এক ব্যক্তি যার সন্তান গলাব্যথা রোগে আক্রান্ত হয়েছিল সে যাদুর মাদুলী ও তাবীজসহ মহানবীর সামনে উপস্থিত হলো। মহানবী (সা.) বললেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের যাদুর এ সব কর্ণফুল,তাবীজ ও মাদুলী দিয়ে ভয় দেখিও না। এই অসুস্থ রোগীকে ভারতীয় চন্দন কাঠের নির্যাস সেবন করানো প্রয়োজন। 46

ইমাম সাদেক (আ.) বলতেন,إنّ كثيرا من التّمائم شرك বহু বাজুবন্দ,কর্ণফুল ও মাদুলী হচ্ছে শিরক।”47

মহানবী (সা.) এবং তাঁর সম্মানিত ওয়াসিগণ (নির্বাহী প্রতিনিধিগণ) জনগণকে অসংখ্য ঔষধ সম্পর্কে অবহিত করার মাধ্যমে যে সব অলীক ধারণা ও কুসংস্কার জাহেলী যুগের আরব জাতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেগুলোর ওপর জোরালো আঘাত হেনেছেন। তাঁদের বর্ণিত এ সব ঔষধ-পথ্য বড় বড় হাদীসশাস্ত্রবিদ কর্তৃক তিব্বুন নবী’(নবীর চিকিৎসাপদ্ধতি), তিব্বুর রেযা’(ইমাম রেযার চিকিৎসাপদ্ধতি) ইত্যাদি শিরোনামে সংকলিত হয়েছে।

7. আরো কিছু কুসংস্কার : দুশ্চিন্তা ও ভীতি দূর করার জন্য আরবরা নিম্নোক্ত মাধ্যমগুলো ব্যবহার করত :

ক. যখন তারা কোন গ্রামে প্রবেশ করত এবং কলেরা রোগ অথবা অপদেবতার ভীতি তাদের পেয়ে বসত তখন ভীতি দূর করার জন্য তারা গ্রামের ফটকের সামনে 10 বার গাধার ন্যায় চিৎকার করত। আবার কখনো কখনো এরূপ চিৎকার করার সময় শিয়ালের হাড় ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখত।

খ. যখন তারা কোন মরুপ্রান্তরে হারিয়ে যেত তখন তারা তাদের পরিধেয় বস্ত্র উল্টে-পাল্টে পরত। সফর করার সময় যখন তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতা করার আশংকা করত তখন তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোন গাছের কাণ্ডে বা ডালে একটি সুতা বেঁধে রাখত। ফেরার সময় যদি তারা দেখতে পেত,সুতা অক্ষত ও পূর্বের অবস্থায় আছে তাহলে তারা নিশ্চিত হতো যে,তাদের পত্নীরা বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আর যদি তারা দেখতে পেত,সুতাটি নেই অথবা খুলে গেছে তাহলে তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করত।

যদি তাদের সন্তানদের দাঁত পড়ে যেত তাহলে তারা ঐ দাঁতটিকে দু আঙ্গুল দিয়ে ধরে সূর্যের দিকে ছুঁড়ে দিত ও বলত, হে সূর্য! এ দাঁতের চেয়ে উত্তম দাঁত দাও।” যে নারীর সন্তান বাঁচত না সে যদি কোন বয়স্ক মানুষের নিহত লাশের ওপর দিয়ে সাত বার হাঁটত,তখন তারা বিশ্বাস করত যে,তার সন্তান জীবিত থাকবে।

এগুলো হচ্ছে অগণিত কুসংস্কারের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র যা জাহেলী যুগের বেদুইন আবরদের জীবনধারাকে প্রগাঢ়ভাবে তিমিরাচ্ছন্ন করেছিল এবং তাদের চিন্তা-ভাবনাকে উন্নতির সুউচ্চ শিখরে উড্ডয়ন করা থেকে বিরত রেখেছিল।

ইসলামের আবির্ভাবের সময়ে আরবের সামাজিক অবস্থা

মানব জাতি সামাজিক জীবনের দিকে প্রথম যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা ছিল গোত্রীয় জীবন। গোত্র ছিল কতগুলো পরিবার ও আত্মীয়ের সমষ্টি যারা গোত্রের শেখ বা নেতার নেতৃত্বাধীনে জীবনযাপন করত। আর এভাবে গোত্রের মাধ্যমে সমাজের আদিমতম চিত্র বা রূপ অস্তিত্ব লাভ করে। সে সময়ের আরব জাতির জীবনযাত্রা এমনই ছিল। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের সাথে যোগ দিয়ে ছোট একটি সমাজ গঠন করত। গোত্রের সকল সদস্য গোত্রপতির আদেশ মেনে চলত। যে বিষয়টি তাদের পরস্পর সম্পর্কিত করে রেখেছিল তা ছিল তাদের গোত্রীয় বন্ধন ও আত্মীয়তা। এ সব গোত্র সব দিক থেকেই পরস্পর পৃথক ছিল;তাদের আচার-প্রথাও পৃথক ছিল। কারণ অন্য সকল গোত্র মূলত একে অপর থেকে আলাদা ও অপরিচিত বলে গণ্য হতো। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের কোন অধিকার ও সম্মান আছে-এ কথার স্বীকৃতি দিত না। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন,সদস্যদের হত্যা এবং নারীদের অপহরণ করা তাদের আইনসংগত ন্যায্য অধিকার বলে গণ্য করত। তবে কোন গোত্রের সাথে যদি চুক্তি থাকত সে ক্ষেত্রে ছিল অন্যকথা। অন্যদিকে প্রতিটি গোত্র যখনই আগ্রাসন ও আক্রমণের শিকার হতো তখন সকল আগ্রাসনকারীকে হত্যা করা তাদের ন্যায্য অধিকার বলে গণ্য হতো। কারণ তারা বিশ্বাস করত যে,একমাত্র রক্ত ব্যতীত অন্য কিছু রক্তকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে সক্ষম নয়।

আরব জাতি ইসলাম ধর্ম কবুল করার মাধ্যমে গোত্রতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পদার্পণ করে। মহানবী (সা.) বিক্ষিপ্ত আরব গোত্রগুলোকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে যে সব গোত্র সুদূর অতীতকাল থেকে পরস্পর দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও আক্রমণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং একে অন্যের রক্ত ঝরাত তাদের অল্প সময়ের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করা সত্যি একটি বড় কাজ এবং একটি অতুলনীয় সামাজিক মুজিযা (অলৌকিক বিষয়) বলে গণ্য। কারণ এ ধরনের বিশাল পরিবর্তন যদি কতগুলো স্বাভাবিক পরিবর্তন ও রূপান্তরেরই ফল হতো তাহলে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এবং অগণিত মাধ্যম ও উপায়-উপকরণের প্রয়োজন হতো।

টমাস কারলাইল বলেছেন, মহান আল্লাহ্ ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে আরব জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পরিচালিত করেছেন। সে জাতি স্থবির ছিল,যাদের ধ্বনি শোনা যেত না,যাদের কর্মতৎপরতা ও প্রাণচাঞ্চল্য অনুভূত হতো না তাদের থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব হয় যারা অখ্যাতি থেকে খ্যাতির দিকে,অলসতা ও শৈথিল্য থেকে জাগরণের দিকে,হীনতা ও দীনতা থেকে উচ্চ মর্যাদার পানে,দুর্বলতা ও অক্ষমতা থেকে শক্তি ও ক্ষমতার দিকে অগ্রসর হয়েছে। তাদের থেকে আলো পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর একশ বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মুসলিম উম্মাহ্ এক পা ভারতে ও অপর পা আন্দালুসিয়ায় (বর্তমান স্পেন) রাখতে সক্ষম হয়েছিল।”48

পাশ্চাত্যের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মেসিয়োর ন্যাঁ (مسيورنان ) তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন,

“এই বিস্ময়কর সুমহান ঘটনা (ইসলাম) যা আরব জাতিকে দিগ্বিজয়ী এবং উন্নত চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার উদ্ভাবকের পোশাকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে-তা ঘটার সময়কাল পর্যন্ত আরব উপদ্বীপের কোন অঞ্চলই না বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের অংশ বলে গণ্য হতো,আর না বিজ্ঞান বা ধর্মের দৃষ্টিতে সেখানে সভ্যতার কোন নিদর্শন বিদ্যমান ছিল।”49

হ্যাঁ,জাহেলিয়াত যুগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তগণ অর্থাৎ বিভিন্ন আরব গোত্র না কোন সভ্যতার আলো প্রত্যক্ষ করেছে,আর না তাদের কোন শিক্ষা-দীক্ষা,নিয়ম-কানুন ও আচার-প্রথার প্রচলন ছিল। যে সকল সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ও ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য উন্নতি ও সভ্যতা বিকাশের কারণ সেগুলো থেকে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত ছিল। অতএব,কখনই আশা করা যেত না যে,এই জাতি এত অল্প সময়ের মধ্যে মর্যাদা ও সম্মানের শীর্ষে আরোহণ করবে এবং সংকীর্ণ গোত্রীয় জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার সুবিস্তৃত জগতের পানে অগ্রসর হবে।

পৃথিবীর জাতিসমূহ আসলে ইমারতসদৃশ। যেমনভাবে একটি মৌলিক ইমারত মজবুত উপাদানের মুখাপেক্ষী যা সঠিক পদ্ধতি অনুসারে এবং পূর্ণ শৃঙ্খলার সাথে নির্মিত হয়েছে যাতে করে তা ঝড়-ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টি-বাদলের প্রভাব থেকে টিকে থাকতে এবং স্থায়ী হতে পারে,ঠিক তেমনি একটি সাহসী ও নৈতিক গুণসম্পন্ন জাতির গঠন-কাঠামো ও দৃঢ় ভিত্তিসমূহ অর্থাৎ মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস,পূর্ণাঙ্গ রীতি-নীতি এবং উন্নত মানবীয় স্বভাব-চরিত্রের মুখাপেক্ষী যাতে তা অস্তিত্ব বজায় রাখতে ও প্রগতির পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।

এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে অবশ্যই ভেবে দেখা উচিত যে,কোথা থেকে এবং কিভাবে জাহেলী বেদুইন আরবদের ক্ষেত্রে এত আশ্চর্যজনক পরিবর্তন সাধিত হলো? যে জাতি গতকাল পর্যন্তও নিজেদের সার্বিক শক্তি মতবিরোধ ও কপটতার মধ্যে ব্যবহার করে নিঃশেষ করত এবং সব ধরনের সমাজব্যবস্থা থেকে বহু দূরে ছিল,এত অত্যাশ্চর্যজনক দ্রুতগতিতে সৌহার্দ,সম্প্রীতি ও ঐক্যের বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে গেল এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করল যে,সেই সময়ের বিশ্বের বৃহৎ জাতিসমূহকে তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও রীতিনীতির সামনে নতজানু ও একান্ত আনুগত্যশীল করতে সক্ষম হয়েছিল।

সত্যিই যদি নির্ধারিত হয়ে থাকে যে,হিজায অর্থাৎ আরব উপদ্বীপের আরব জাতি এত উন্নতি করবে এবং এত বড় সম্মান ও গৌরবের অধিকারী হবে তাহলে ইয়েমেনের আরবগণ যারা (পূর্ব হতে) সভ্যতা ও কৃষ্টির অধিকারী ছিল তারা বছরের পর বছর ধরে রাজত্ব করেছে এবং বড় বড় শাসনকর্তাকে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছে তারা কেন এ ধরনের উন্নতি ও প্রগতির অধিকারী হতে পারে নি? শামদেশের প্রতিবেশী গাসসানী আরবগণ যারা সভ্য রোমীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে জীবনযাপন করত তারা কেন উন্নতি ও বিকাশের এ পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হয় নি? হীরার আরবগণ যারা গতকালও বিশাল পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাস করত তারা কেন এ ধরনের উন্নতি করতে সক্ষম হয় নি? প্রাগুক্ত জাতিসমূহ যদি এ ধরনের সাফল্য অর্জন করত তাহলে তা আশ্চর্যজনক বিষয় বলে বিবেচিত হতো না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এটিই যে,হিজাযের আরবগণ যাদের নিজেদের কোন ইতিহাসই ছিল না তারাই সুমহান ইসলামী সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েছে।

জাহেলিয়াত যুগের আরবদের বিশ্বাসে কুসংস্কার

বিশ্বের সকল জাতি ও সমাজের আকীদা-বিশ্বাস ইসলামের সূর্যোদয়ের সময় বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও অলীক উপাখ্যান দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। গ্রীক ও সামানীয় অলীক উপাখ্যান ও কল্প-কাহিনীসমূহ সে যুগের সবচেয়ে সভ্য ও উন্নত জাতিসমূহের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এখনও প্রাচ্যের উন্নত জাতিসমূহের মধ্যে অনেক কুসংস্কার বিদ্যমান রয়েছে যা আধুনিক সভ্যতা জনগণের জীবন থেকে দূর করতে পারে নি। জ্ঞান ও কৃষ্টিসমূহের অনুপাতে কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কারের প্রসার ও বিলুপ্ত হয়ে থাকে। সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি-সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে যত পশ্চাদপদ ও অনগ্রসর  হবে ঠিক সেই অনুপাতে কুসংস্কার ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসও তাদের মধ্যে বৃদ্ধি পাবে।

ইতিহাস আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের প্রচুর কুসংস্কার ও কল্প-কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছে। বুলূগুল আরবে ফী মারেফাতি আহওয়ালিল আরাব’গ্রন্থের রচয়িতা39 এ সব কুসংস্কার ও কল্প-কাহিনীর অনেকাংশ কতগুলো কবিতা ও গল্প আকারে ঐ গ্রন্থে সংগ্রহ করেছেন। যে কোন ব্যক্তি এ গ্রন্থ ও অন্যান্য গ্রন্থ পাঠ করার পর নানারূপ কুসংস্কারের সাথে পরিচিত হবেন যা জাহেলী আরবদের মন-মস্তিষ্ক ভর্তি করে রেখেছিল। আর এ সব ভিত্তিহীন বিষয়বস্তু ছিল অন্যান্য জাতি থেকে আরব জাতির অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ হওয়ার কারণ। ইসলাম ধর্মের অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ঐ সব কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কার।

আর এ কারণেই মহানবী (সা.) তাঁর সকল শক্তি নিয়োগ করে জাহেলিয়াতের নিদর্শনসমূহ যা ছিল বিভিন্ন ধরনের অসার কল্প-কাহিনী,অলীক ধ্যান-ধারণা ও কুসংস্কার তা মূলোৎপাটন করার চেষ্টা করেছেন। মহানবী (সা.) যখন মায়ায ইবনে জাবালকে ইয়েমেনে প্রেরণ করেছিলেন তখন তিনি তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, হে মায়ায! জনগণের মধ্য থেকে জাহেলিয়াতের সকল চি হ্ন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস উচ্ছেদ করবে এবং ইসলামের যাবতীয় প্রথা ও আদর্শ যা হচ্ছে চিন্তা-ভাবনা এবং গভীর অনুধাবন ও উপলব্ধির দিকে আহবান তা পুনরুজ্জীবিত করবে।”40

و أمت امر الجاهلية إلّا ما سنّهُ الإسلام و أظهر أمر الإسلام كلّه صغيره و كبيره

যে আরব জাতির ওপর বহু বছর যাবত জাহেলী চিন্তাধারা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল তাদের সামনে তিনি এ রকম বলেছিলেন,

كلّ مأثرة في الجاهلية تحت قدمي

“(ইসলামের আবির্ভাবের সাথে সাথে) সব ধরনের অলীক আচার-অনুষ্ঠান,আকীদা-বিশ্বাস,মিথ্যা অহমিকা ও গর্ব বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং তা আমার পদতলে রাখা হলো।”41

যাতে করে ইসলাম ধর্মের উচ্চাঙ্গের তত্ত্বজ্ঞান স্পষ্ট হয়ে যায় সেজন্য এখানে কতিপয় উদাহরণ পেশ করব :

1. বৃষ্টি বর্ষণের জন্য আগুন জ্বালানো : আরব উপদ্বীপ বছরের বেশিরভাগ সময়ই শুষ্ক থাকে;সেখানকার অধিবাসীরা বৃষ্টিপাতের জন্য সালা’(سلع ) নামের এক প্রকার নিমজাতীয় বৃক্ষের কাঠ এবং ওসর’(عشر ) নামের অপর একটি দ্রুত দহনশীল বৃক্ষের কাঠ একত্র করে সেগুলোকে গরুর লেজের সাথে বেঁধে গরুকে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেত। তারপর ঐ কাঠগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিত। ওসর বৃক্ষের কাঠের মধ্যে দগ্ধকারী উপাদান থাকার কারণে ঐ কাঠগুলো থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠত। আর গরুটি দগ্ধ হওয়ার কারণে ছুটোছুটি ও উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার শুরু করত। তারা এ ধরনের কাপুরুষোচিত কাজকে পূর্বপুরুষদের প্রাচীন রীতিনীতির অনুসরণ হিসাবে আকাশের বিদ্যুৎ চমকানি ও বজ্রপাতের সাথে তুলনা করত। তারা অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে বিদ্যুৎ এবং গরুর চিৎকারকে বজ্রপাতের শব্দের স্থলে বিবেচনা করত;তারা তাদের এ কাজকে বৃষ্টি বর্ষণে কার্যকর প্রভাব রাখে বলে বিশ্বাস করত।

2. যদি গাভী পানি না খেত তাহলে তারা ষাঁড়কে প্রহার করত। পানি পান করানোর জন্য গাভী ও ষাঁড়গুলোকে পানির নালার ধারে নিয়ে যাওয়া হতো। মাঝে মধ্যে এমন হতো যে,ষাঁড়গুলো পানি খেত,কিন্তু গাভীগুলো পানি স্পর্শও করত না। আরবরা মনে করত যে,গাভীগুলোর পানি পান করা থেকে বিরত থাকার কারণ হচ্ছে ঐ সব শয়তান যা ষাঁড়ের দু শিংয়ের মাঝখানে স্থান নিয়েছে এবং গাভীগুলোকে পানি পান করতে দিচ্ছে না। তাই ঐ শয়তানগুলোকে তাড়ানোর জন্য ষাঁড়ের মাথা ও মুখমণ্ডলে প্রহার করত।42

3. নীরোগ উটের মাথায় আগুনের ছ্যাঁকা দেয়া হতো যাতে করে অপরাপর উট সুস্থ হয়ে ওঠে: কোন উট যদি অসুস্থ হয়ে পড়ত অথবা উটের ঠোঁট ও মুখে ক্ষত ও ঠোসা দেখা যেত তাহলে অন্যান্য উটের মধ্যে এ রোগের সংক্রমণ রোধ করার জন্য একটি সুস্থ উটের ঠোঁট,বাহু ও ঊরুতে ছ্যাঁকা দেয়া হতো,কিন্তু তাদের এ কাজের কারণ স্পষ্ট নয়। কখনো কখনো ধারণা করা হয় যে,এ ধরনের কাজের রোগ-প্রতিষেধক দিক আছে এবং এটি এক ধরনের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতিও হতে পারে। কিন্তু যেহেতু অনেক উটের মধ্য থেকে কেবল একটি উটের ওপর এ ধরনের বিপদ নেমে আসত তাই বলা যায় যে,তা এক ধরনের কুসংস্কার।

4. একটি উটকে কোন কবরের কাছে আটকে রাখা হতো যাতে করে কবরবাসী কিয়ামত দিবসে পদব্রজে (কবর থেকে) উত্থিত না হয় (অর্থাৎ উক্ত উটের ওপর সওয়ার অবস্থায় উত্থিত হয়)।

যদি কোন মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করত তখন ঐ ব্যক্তির কবরের পাশে একটি গর্ত খুঁড়ে তাতে একটি উট আটকে রাখা হতো এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঐ উটকে দানা-পানি ও খড়কুটা কিছুই খেতে দেয়া হতো না যাতে করে কিয়ামত দিবসে মৃত ব্যক্তি ঐ উটের ওপর সওয়ার হয় এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় তার পুনরুত্থান না হয়।

5. কবরের পাশে উট জবাই করা হতো। যেহেতু মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় তার প্রিয় ব্যক্তি ও অতিথিদের জন্য উট জবাই করত তাই মৃতকে সম্মান ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তার আত্মীয়স্বজন তার কবরের কাছে বেদনাদায়কভাবে উট বধ করত।

কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলামের সংগ্রাম

এ ধরনের কাজ যা যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার সাথে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ আগুন জ্বালানোর কারণে বৃষ্টিপাত হয় না,ষাঁড়কে প্রহার করলে গাভীর মধ্যে এর কোন প্রভাবই পড়ে না,আর নীরোগ উটকে ছ্যাঁকা দিলে তা রোগাক্রান্ত উটের সুস্থতা ও রোগমুক্তির কারণ হয় না এবং...) পশুগুলোর প্রতি অত্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা যদি এ সব আচার-আচরণকে ইসলামের সুদৃঢ় বিধিবিধান-যা জীবজন্তু সংরক্ষণ করার ব্যাপারে প্রবর্তিত হয়েছে সেগুলোর সাথে তুলনা করি তাহলে আমাদের বলতে হবে : এই শরীয়ত তদানীন্তন আরব সমাজে প্রচলিত চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা এখানে ইসলামের অগণিত বিধানের মধ্য থেকে কেবল একটি ছোট বিধান উল্লেখ করব :

মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রতিটি বাহক পশুর আরোহীর ওপর ছয়টি অধিকার আছে : 1. যে অবতরণস্থলে অবতরণ করবে সেখানে পশুটিকে কিছু খাদ্য খেতে দেবে,2. যদি পানি বা জলাধারের পাশ দিয়ে গমন কর,তাহলে ঐ পশুটিকে পানি পান করাবে,3. পশুর মুখের ওপর চাবুক মারবে না,4. দীর্ঘক্ষণ কথা বলার সময় পশুর পিঠের ওপর বসে থাকবে না,5. ক্ষমতার বাইরে পশুর ওপর অধিক বোঝা চাপাবে না,6. যে পথে চলার সামর্থ্য পশুটির নেই সে পথে পশুকে চালনা করবে না।”43

6. রোগীদের চিকিৎসাপদ্ধতির ক্ষেত্রে কুসংস্কার : যদি কোন ব্যক্তিকে বিচ্ছু বা সাপ দংশন করত তাহলে উক্ত ব্যক্তির ঘাড়ে স্বর্ণালংকার ঝোলানো হতো এবং বিশ্বাস করা হতো যে,যদি দংশিত ব্যক্তির সাথে তামা ও টিন থাকে তাহলে সে মারা যাবে। জলাতঙ্ক রোগ-যা সাধারণত উক্ত রোগে আক্রান্ত কুকুরের দংশনে সংক্রমিত হয়-দংশিত স্থানের ওপর গোত্রপ্রধানের অল্প রক্ত মাখিয়ে চিকিৎসা করা হতো। আর নিম্নোক্ত কবিতায় তা প্রতিফলিত হয়েছে :

أحلامكم لسقام الجهل شافية

كما دماءكم تشفى من الكلب

যেমন (জলাতঙ্ক ব্যাধিবাহী) কুকুর হতে আরোগ্য দেয় তোমাদের রক্ত

ঠিক তেমনি তোমাদের স্বপ্নগুলোও অজ্ঞতা (জনিত) ব্যাধির আরোগ্যদানকারী।

আর যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে উন্মাদনার আলামত প্রকাশ পেত তাহলে অপবিত্র আত্মা দূর করার জন্য নোংরা কার্যকলাপের আশ্রয় নেয়া হতো। নোংরা ন্যাকড়া এবং মৃত ব্যক্তিদের হাড় পাগলের গলায় ঝুলানো হতো। যাতে করে শিশুরা শয়তানের কুপ্রভাব দ্বারা প্রভাবিত না হয় (অর্থাৎ শয়তানের প্রভাব তাদের ওপর না পড়ে) সেজন্য শিয়াল ও বিড়ালের দাঁত সুতার সাথে বেঁধে শিশুদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হতো। যখন শিশুদের ঠোঁট ও মুখ বিষফোঁড়ায় ভরে যেত তখন শিশুর মা একটি চালুনী মাথার ওপর বসিয়ে গোত্রের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে রুটি ও খেজুর জমা করত এবং তা কুকুরকে খেতে দিত যাতে করে নিজ সন্তানের ঠোঁট ও মুখের ফোঁড়া সেরে যায়;গোত্রের মহিলারা সজাগ দৃষ্টি রাখত যে,তাদের সন্তানরা ঐ সব রুটি ও খেজুর থেকে কিছু না খায়,পাছে তারা এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

চর্মরোগ,যেমন দেহের চামড়া ঝরে পরার চিকিৎসা করার জন্য মুখের লালা চর্মরোগাক্রান্ত স্থানে মালিশ করত। যদি কোন ব্যক্তির (চর্ম) রোগ এতে ভালো না হতো এবং অব্যাহত থাকত তাহলে ভাবা হতো রোগী যে সব প্রাণী,যেমন সাপ,শয়তানদের (অপদেবতা) সাথে যুক্ত সেগুলোর কোন একটিকে হত্যা করেছে। তারা শয়তানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য কাদামাটি দিয়ে উটের মূর্তি নির্মাণ করত। এরপর যব,গম ও খেজুর ঐ মূর্তিগুলোর ওপরে রেখে সেগুলো পাহাড়ের গুহার সামনে রেখে চলে আসত এবং পরের দিন তারা উক্ত স্থানে ফিরে যেত। যদি তারা দেখতে পেত যে,বোঝাগুলো খোলা হয়েছে,তাহলে তারা একে নজরানা কবুল হওয়ার নিদর্শন বলে গণ্য করত এবং বলত যে,রোগীটি সুস্থ হয়ে যাবে। আর এর অন্যথা হলে তারা বিশ্বাস করত,যেহেতু এ নজরানা তুচ্ছ ও নগণ্য তাই তা অপদেবতারা গ্রহণ করে নি।

ইসলাম বিভিন্ন পদ্ধতিতে এ সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। একদল মরুচারী আরব বেদুইন যারা যাদুর কর্ণফুল,যাদুর তাবীজ,মাদুলী এবং হার-যার মধ্যে পাথর ও হাড় বেঁধে রাখা হতো তা দিয়ে রোগীর রোগের চিকিৎসা করত তারা যখন মহানবী (সা.)-এর কাছে গমন করত এবং উদ্ভিদ ও ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করত তখন মহানবী (সা.) বলতেন, প্রতিটি রোগীর জন্য ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ যে আল্লাহ্ ব্যথা ও রোগযন্ত্রণা সৃষ্টি করেছেন তিনিই রোগের ঔষধও তৈরি করেছেন। 44 অর্থাৎ এ সব কর্ণফুল,তাবীজ,মাদুলী ও মালা রোগ নিরাময় করার ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। এমনকি যখন সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস হৃদরোগে আক্রান্ত হন তখন মহানবী (সা.) তাঁকে বলেছিলেন, সাকীফ গোত্রের প্রসিদ্ধ ডাক্তার হারিস কালদার কাছে তোমরা অবশ্যই যাবে।” এরপর তিনি তাঁকে একটি বিশেষ ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিলেন।45

অধিকন্তু যাদুর কর্ণফুল,তাবীজ ও মাদুলী যেগুলোর আসলে কোন কার্যকর প্রভাব নেই সেগুলো সংক্রান্ত বেশ কিছু বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। এখানে আমরা দু টি বর্ণনা উল্লেখ করাই যথেষ্ট বলে বিবেচনা করছি :

এক ব্যক্তি যার সন্তান গলাব্যথা রোগে আক্রান্ত হয়েছিল সে যাদুর মাদুলী ও তাবীজসহ মহানবীর সামনে উপস্থিত হলো। মহানবী (সা.) বললেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের যাদুর এ সব কর্ণফুল,তাবীজ ও মাদুলী দিয়ে ভয় দেখিও না। এই অসুস্থ রোগীকে ভারতীয় চন্দন কাঠের নির্যাস সেবন করানো প্রয়োজন। 46

ইমাম সাদেক (আ.) বলতেন,إنّ كثيرا من التّمائم شرك বহু বাজুবন্দ,কর্ণফুল ও মাদুলী হচ্ছে শিরক।”47

মহানবী (সা.) এবং তাঁর সম্মানিত ওয়াসিগণ (নির্বাহী প্রতিনিধিগণ) জনগণকে অসংখ্য ঔষধ সম্পর্কে অবহিত করার মাধ্যমে যে সব অলীক ধারণা ও কুসংস্কার জাহেলী যুগের আরব জাতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেগুলোর ওপর জোরালো আঘাত হেনেছেন। তাঁদের বর্ণিত এ সব ঔষধ-পথ্য বড় বড় হাদীসশাস্ত্রবিদ কর্তৃক তিব্বুন নবী’(নবীর চিকিৎসাপদ্ধতি), তিব্বুর রেযা’(ইমাম রেযার চিকিৎসাপদ্ধতি) ইত্যাদি শিরোনামে সংকলিত হয়েছে।

7. আরো কিছু কুসংস্কার : দুশ্চিন্তা ও ভীতি দূর করার জন্য আরবরা নিম্নোক্ত মাধ্যমগুলো ব্যবহার করত :

ক. যখন তারা কোন গ্রামে প্রবেশ করত এবং কলেরা রোগ অথবা অপদেবতার ভীতি তাদের পেয়ে বসত তখন ভীতি দূর করার জন্য তারা গ্রামের ফটকের সামনে 10 বার গাধার ন্যায় চিৎকার করত। আবার কখনো কখনো এরূপ চিৎকার করার সময় শিয়ালের হাড় ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখত।

খ. যখন তারা কোন মরুপ্রান্তরে হারিয়ে যেত তখন তারা তাদের পরিধেয় বস্ত্র উল্টে-পাল্টে পরত। সফর করার সময় যখন তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতা করার আশংকা করত তখন তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোন গাছের কাণ্ডে বা ডালে একটি সুতা বেঁধে রাখত। ফেরার সময় যদি তারা দেখতে পেত,সুতা অক্ষত ও পূর্বের অবস্থায় আছে তাহলে তারা নিশ্চিত হতো যে,তাদের পত্নীরা বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আর যদি তারা দেখতে পেত,সুতাটি নেই অথবা খুলে গেছে তাহলে তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করত।

যদি তাদের সন্তানদের দাঁত পড়ে যেত তাহলে তারা ঐ দাঁতটিকে দু আঙ্গুল দিয়ে ধরে সূর্যের দিকে ছুঁড়ে দিত ও বলত, হে সূর্য! এ দাঁতের চেয়ে উত্তম দাঁত দাও।” যে নারীর সন্তান বাঁচত না সে যদি কোন বয়স্ক মানুষের নিহত লাশের ওপর দিয়ে সাত বার হাঁটত,তখন তারা বিশ্বাস করত যে,তার সন্তান জীবিত থাকবে।

এগুলো হচ্ছে অগণিত কুসংস্কারের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র যা জাহেলী যুগের বেদুইন আবরদের জীবনধারাকে প্রগাঢ়ভাবে তিমিরাচ্ছন্ন করেছিল এবং তাদের চিন্তা-ভাবনাকে উন্নতির সুউচ্চ শিখরে উড্ডয়ন করা থেকে বিরত রেখেছিল।

ইসলামের আবির্ভাবের সময়ে আরবের সামাজিক অবস্থা

মানব জাতি সামাজিক জীবনের দিকে প্রথম যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা ছিল গোত্রীয় জীবন। গোত্র ছিল কতগুলো পরিবার ও আত্মীয়ের সমষ্টি যারা গোত্রের শেখ বা নেতার নেতৃত্বাধীনে জীবনযাপন করত। আর এভাবে গোত্রের মাধ্যমে সমাজের আদিমতম চিত্র বা রূপ অস্তিত্ব লাভ করে। সে সময়ের আরব জাতির জীবনযাত্রা এমনই ছিল। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের সাথে যোগ দিয়ে ছোট একটি সমাজ গঠন করত। গোত্রের সকল সদস্য গোত্রপতির আদেশ মেনে চলত। যে বিষয়টি তাদের পরস্পর সম্পর্কিত করে রেখেছিল তা ছিল তাদের গোত্রীয় বন্ধন ও আত্মীয়তা। এ সব গোত্র সব দিক থেকেই পরস্পর পৃথক ছিল;তাদের আচার-প্রথাও পৃথক ছিল। কারণ অন্য সকল গোত্র মূলত একে অপর থেকে আলাদা ও অপরিচিত বলে গণ্য হতো। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের কোন অধিকার ও সম্মান আছে-এ কথার স্বীকৃতি দিত না। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন,সদস্যদের হত্যা এবং নারীদের অপহরণ করা তাদের আইনসংগত ন্যায্য অধিকার বলে গণ্য করত। তবে কোন গোত্রের সাথে যদি চুক্তি থাকত সে ক্ষেত্রে ছিল অন্যকথা। অন্যদিকে প্রতিটি গোত্র যখনই আগ্রাসন ও আক্রমণের শিকার হতো তখন সকল আগ্রাসনকারীকে হত্যা করা তাদের ন্যায্য অধিকার বলে গণ্য হতো। কারণ তারা বিশ্বাস করত যে,একমাত্র রক্ত ব্যতীত অন্য কিছু রক্তকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে সক্ষম নয়।

আরব জাতি ইসলাম ধর্ম কবুল করার মাধ্যমে গোত্রতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পদার্পণ করে। মহানবী (সা.) বিক্ষিপ্ত আরব গোত্রগুলোকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে যে সব গোত্র সুদূর অতীতকাল থেকে পরস্পর দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও আক্রমণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং একে অন্যের রক্ত ঝরাত তাদের অল্প সময়ের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করা সত্যি একটি বড় কাজ এবং একটি অতুলনীয় সামাজিক মুজিযা (অলৌকিক বিষয়) বলে গণ্য। কারণ এ ধরনের বিশাল পরিবর্তন যদি কতগুলো স্বাভাবিক পরিবর্তন ও রূপান্তরেরই ফল হতো তাহলে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এবং অগণিত মাধ্যম ও উপায়-উপকরণের প্রয়োজন হতো।

টমাস কারলাইল বলেছেন, মহান আল্লাহ্ ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে আরব জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পরিচালিত করেছেন। সে জাতি স্থবির ছিল,যাদের ধ্বনি শোনা যেত না,যাদের কর্মতৎপরতা ও প্রাণচাঞ্চল্য অনুভূত হতো না তাদের থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব হয় যারা অখ্যাতি থেকে খ্যাতির দিকে,অলসতা ও শৈথিল্য থেকে জাগরণের দিকে,হীনতা ও দীনতা থেকে উচ্চ মর্যাদার পানে,দুর্বলতা ও অক্ষমতা থেকে শক্তি ও ক্ষমতার দিকে অগ্রসর হয়েছে। তাদের থেকে আলো পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর একশ বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মুসলিম উম্মাহ্ এক পা ভারতে ও অপর পা আন্দালুসিয়ায় (বর্তমান স্পেন) রাখতে সক্ষম হয়েছিল।”48

পাশ্চাত্যের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মেসিয়োর ন্যাঁ (مسيورنان ) তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন,

“এই বিস্ময়কর সুমহান ঘটনা (ইসলাম) যা আরব জাতিকে দিগ্বিজয়ী এবং উন্নত চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার উদ্ভাবকের পোশাকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে-তা ঘটার সময়কাল পর্যন্ত আরব উপদ্বীপের কোন অঞ্চলই না বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের অংশ বলে গণ্য হতো,আর না বিজ্ঞান বা ধর্মের দৃষ্টিতে সেখানে সভ্যতার কোন নিদর্শন বিদ্যমান ছিল।”49

হ্যাঁ,জাহেলিয়াত যুগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তগণ অর্থাৎ বিভিন্ন আরব গোত্র না কোন সভ্যতার আলো প্রত্যক্ষ করেছে,আর না তাদের কোন শিক্ষা-দীক্ষা,নিয়ম-কানুন ও আচার-প্রথার প্রচলন ছিল। যে সকল সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ও ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য উন্নতি ও সভ্যতা বিকাশের কারণ সেগুলো থেকে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত ছিল। অতএব,কখনই আশা করা যেত না যে,এই জাতি এত অল্প সময়ের মধ্যে মর্যাদা ও সম্মানের শীর্ষে আরোহণ করবে এবং সংকীর্ণ গোত্রীয় জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার সুবিস্তৃত জগতের পানে অগ্রসর হবে।

পৃথিবীর জাতিসমূহ আসলে ইমারতসদৃশ। যেমনভাবে একটি মৌলিক ইমারত মজবুত উপাদানের মুখাপেক্ষী যা সঠিক পদ্ধতি অনুসারে এবং পূর্ণ শৃঙ্খলার সাথে নির্মিত হয়েছে যাতে করে তা ঝড়-ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টি-বাদলের প্রভাব থেকে টিকে থাকতে এবং স্থায়ী হতে পারে,ঠিক তেমনি একটি সাহসী ও নৈতিক গুণসম্পন্ন জাতির গঠন-কাঠামো ও দৃঢ় ভিত্তিসমূহ অর্থাৎ মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস,পূর্ণাঙ্গ রীতি-নীতি এবং উন্নত মানবীয় স্বভাব-চরিত্রের মুখাপেক্ষী যাতে তা অস্তিত্ব বজায় রাখতে ও প্রগতির পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।

এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে অবশ্যই ভেবে দেখা উচিত যে,কোথা থেকে এবং কিভাবে জাহেলী বেদুইন আরবদের ক্ষেত্রে এত আশ্চর্যজনক পরিবর্তন সাধিত হলো? যে জাতি গতকাল পর্যন্তও নিজেদের সার্বিক শক্তি মতবিরোধ ও কপটতার মধ্যে ব্যবহার করে নিঃশেষ করত এবং সব ধরনের সমাজব্যবস্থা থেকে বহু দূরে ছিল,এত অত্যাশ্চর্যজনক দ্রুতগতিতে সৌহার্দ,সম্প্রীতি ও ঐক্যের বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে গেল এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করল যে,সেই সময়ের বিশ্বের বৃহৎ জাতিসমূহকে তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও রীতিনীতির সামনে নতজানু ও একান্ত আনুগত্যশীল করতে সক্ষম হয়েছিল।

সত্যিই যদি নির্ধারিত হয়ে থাকে যে,হিজায অর্থাৎ আরব উপদ্বীপের আরব জাতি এত উন্নতি করবে এবং এত বড় সম্মান ও গৌরবের অধিকারী হবে তাহলে ইয়েমেনের আরবগণ যারা (পূর্ব হতে) সভ্যতা ও কৃষ্টির অধিকারী ছিল তারা বছরের পর বছর ধরে রাজত্ব করেছে এবং বড় বড় শাসনকর্তাকে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছে তারা কেন এ ধরনের উন্নতি ও প্রগতির অধিকারী হতে পারে নি? শামদেশের প্রতিবেশী গাসসানী আরবগণ যারা সভ্য রোমীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে জীবনযাপন করত তারা কেন উন্নতি ও বিকাশের এ পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হয় নি? হীরার আরবগণ যারা গতকালও বিশাল পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাস করত তারা কেন এ ধরনের উন্নতি করতে সক্ষম হয় নি? প্রাগুক্ত জাতিসমূহ যদি এ ধরনের সাফল্য অর্জন করত তাহলে তা আশ্চর্যজনক বিষয় বলে বিবেচিত হতো না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এটিই যে,হিজাযের আরবগণ যাদের নিজেদের কোন ইতিহাসই ছিল না তারাই সুমহান ইসলামী সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েছে।


7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49