আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড)

আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড)21%

আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড) লেখক:
: মুহাম্মদ মাঈন উদ্দিন
প্রকাশক: আহলে বাইত (আ.) বিশ্ব সংস্থা,কোম,ইরান
বিভাগ: আল্লাহর একত্ববাদ

  • শুরু
  • পূর্বের
  • 37 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 16207 / ডাউনলোড: 4943
সাইজ সাইজ সাইজ
আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড)

আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড)

লেখক:
প্রকাশক: আহলে বাইত (আ.) বিশ্ব সংস্থা,কোম,ইরান
বাংলা

আক্বায়েদ শিক্ষা

প্রথম খণ্ড

মূলঃ আয়াতুল্লাহ্ মুহাম্মদ তাকী মিসবাহ্ ইয়াযদী

অনুবাদঃ মুহাম্মদ মাঈন উদ্দিন

প্রকাশনায়ঃ

আহলে বাইত (আ.) বিশ্ব সংস্থা

الحمد لله رب العالمین، و الصلاة و السلام علی خیر خلقه محمد و اله الطاهرین. لاسیما بقیة الله فی الارضین عجل الله تعالی فرجه و جعلنا من اعوانه و انصاره.

মৌলিক বিশ্বাস ও চিন্তা সকল মূল্যবোধ ও সুশৃংখল মতাদর্শের ভিত্তি রচনা করে এবং সচেতন অথবা প্রায় সচেতনভাবে মানুষের আচার-ব্যবহারের উপর প্রভাব ফেলে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী মূল্যবোধ ও রীতি-নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসসমূহকে মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত করতে হবে,যেগুলো এ বিশালদেহী বৃক্ষের মূল বলে পরিগণিত। আর এর মাধ্যমে সুমিষ্ট ও মনোমুগ্ধকর ফল ধারণ করতঃ দু জগতের সৌভাগ্য ও সম্মৃদ্ধির নিশ্চয়তা বিধিত হয় ।

এ কারণেই ইসলামী চিন্তাবিদগণ,ইসলামের আবির্ভাবের প্রথম শতাব্দীতেই বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে ইসলামী বিশ্বাস সম্পর্কে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। যেমনঃ কালামশাস্ত্রবিদগণ বিভিন্ন পর্যায়ের কালামশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। সাম্প্রতিক কালেও নব নব বিভিন্ন অনুপপত্তির উপর ভিত্তি করে( ঐগুলোর জবাব দানের জন্যে ) একাধিক পুস্তক লেখা হয়েছে ও সকলের হাতের নাগালে রাখা—হয়েছে । কিন্তু প্রায়শঃই এ সকল পুস্তক দু টি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র স্তরের জন্যে প্রণয়ন করা হয় । এর একটি হলঃ সাধারণ স্তরের জন্যে যা অপেক্ষাকৃত সহজ-সরল ভাষায় ও অধিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে রচিত হয়;আর অপরটি হলঃ বিশেষজ্ঞ শ্রেণীর জন্যে,যা জটিল ও তত্ত্বীয় পরিভাষায় বর্ণিত হয়। তবে মধ্যবর্তী স্তরের পাঠকশ্রেণীর জন্যে উপযুক্ত পুস্তকের স্থান শূন্য পড়ে আছে। আর এজন্যে বর্ষ পরস্পরায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ এধরনের পুস্তকের অভাব অনুভব করছে।

ফলে ইসলামী প্রচার সংস্থার’দায়িত্বশীলদের পরামর্শক্রমে এবং দার রাহে হাক’ নামক প্রতিষ্ঠানের একদল বিশেষজ্ঞের সহযোগীতায় এ পুস্তকটি প্রণয়নের উদ্ধোগ নিই । এ পুস্তকটির——বিশেষত্ব হল নিম্নরূপঃ

১। পুস্তকের বিষয়-বস্তু যৌক্তিক বিন্যাস ব্যবস্থার আলোকে শৃংখলিত করার এবং যথাসম্ভব কোন বিষয়ের আলোচনা পরবর্তী পাঠের উপর ন্যস্ত না করার চেষ্টা করা হয়েছে।

২। পারতপক্ষে সুস্পষ্ট ও সরল ভাষা ব্যবহার করার এবং জটিল ও সংকটময় পরিভাষাগুলো পরিহার করার চেষ্টা করেছি। আর সেই সাথে চেষ্টা করেছি সহজবোধ্য অর্থসমূহকে সাহিত্যালংকারের জন্যে উৎসর্গ না করার ।

৩। কোন বিষয়ের প্রতিপাদনের জন্য নিশ্চিত ও অপেক্ষাকৃত সুস্পষ্ট দলিলসমূহ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি । আর একাধিক দলিলের সমাহারকরণ ও দুর্বল দলিলের আকস্মিক উপস্থিতি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি ।

৪। অনুরূপ অতিরিক্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা থেকে যথাসম্ভব দূরে থেকেছি,যাবি দ্যানুরাগীদের ধৈর্যচ্যুতির কারণ হয়। অতএব আশানুরূপ সংক্ষিপ্ততা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি ।

৫। যেহেতু এ পুস্তকটি মধ্যম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের জন্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। তাই—জটিল ও সুকঠিন দলিল,যেগুলোর জন্যে দর্শন,তাফসির অথবা হাদীস সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকার প্রয়োজন হয়,সেগুলোর উপস্থাপনা থেকে বিরত থেকেছি। জরুরী ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভূমিকা বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হয়েছি এবং ঐ বিষয়ের অন্যান্য সম্পূরক অংশের জন্যে অপর পুস্তকসমূহে অনুসন্ধানের—পরামর্শ দিয়েছি,যাতে শিক্ষার্থীদের মাঝে অনুসন্ধান ও গবেষণার মানসিকতা সৃষ্টি হয়।

৬। পুস্তকের বিষয় বস্তু স্বতন্ত্র পাঠে বিভক্ত করা হয়েছে এবং মোটামুটি প্রত্যেকটি পাঠে সংশ্লিষ্ট বিষয় বস্তকে স্থান দেয়া হয়েছে।

৭। কোন কোন পাঠের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহকে পরবর্তী পাঠে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। কখনোবা পুনব্যক্ত করা হয়েছে,যাতে শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কে বিষয়টি উত্তমরূপে স্থান লাভ করে।

৮। প্রতিটি পাঠের শেষে প্রশ্নমালা উদ্ধৃত করা হয়েছে,যা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান লাভের পথে সহায়ক হবে। (অনুবাদের সময় ঐগুলো উল্লেখ করা হয় নি)। নিসন্দেহে এ বইটিও ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয় এবং আশা করি সম্মানিত শিক্ষমন্ডলীর পরামর্শ ও সমালোচনার মাধ্যমে পরবর্তী সংস্করণে ঐগুলোকে পরিহার করা হবে ।

পবিত্র ওয়ালী আসরের দরবারে ( আমাদের জীবন তাঁর নিমিত্ত উৎসর্গকৃত ,আল্লাহ তাঁর আবির্ভাব তরান্বিত করুন ) এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাটুকু গ্রহণযোগ্য হবে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মহিমান্বিত শহীদগণের নিকট আমাদের ঋণের বোঝা হয়ত কিছুটা লাঘব হবে এ প্রত্যাশা রইল ।

কোম-মোহাম্মদ তাকী মিসবাহ ইয়াযদী

শাহরিয়ার ১৩৬৫ সৌর বর্ষ

প্রথম খণ্ড

খোদা পরিচিতি

১ম পাঠ

দ্বীন অর্থ কী

দ্বীনের ধারণাঃ

এ বইয়ের উদ্দেশ্য হল ,ইসলামী মতবিশ্বাসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যাকে পারিভাষিক অর্থে  দ্বীনের মূলনীতি’বলা হয়ে থাকে । ফলে দ্বীন’(دین )শব্দটি ও এতদসস্পর্কিত অন্যান্য পরিভাষাসমূহের উপর সর্বাগ্রে সংক্ষিপ্তরূপে আলোকপাত করার চেষ্টা করব । কারণ,যুক্তিশাস্ত্রের মতে কোন বিষয়ের সংজ্ঞাসমূহের স্থান সর্বশীর্ষে।

  দ্বীন’একটি আরবী শব্দ,যার শাব্দিক অর্থ হল অনুসরণ,প্রতিদান ইত্যাদি। পরিভাষাগত অর্থে,মানুষ ও বিশ্বের জন্যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন বলে বিশ্বাস এবং এ বিশ্বাস সস্পর্কিত যাবতীয় বিধি-নিষেধ হল দ্বীন’। দ্বীনের এ সংজ্ঞানুসারে,যারা সম্পূর্ণরূপে সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বার্সী এবং সৃষ্টসমূহের সৃষ্টিকে সাংঘর্ষিক অথবা শুধুমাত্র প্রকৃতি ও পদার্থসমূহের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল বলে মনে করেন,তারা বিধর্মী বলে পরিচিত । আর যারা বিশ্বের সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন,তাদের মতাদর্শ ও ধর্মানুষ্ঠানগুলো যতই সবিচ্যুতি ও কুসংস্কারাচ্ছন্নই হোক না কেন,তারা সধর্মী বলে পরিগণিত। এ মূলনীতির ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধর্মসমূহকে সত্যধর্ম ও মিথ্যাধর্মে বিভক্ত করা যায় ।

অতএব সত্যধর্ম বলতে বুঝায়ঃ যে ধর্ম সত্যানুসারে ও সঠিক মত বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিতএবং যে সকল আচার-ব্যবহার পর্যাপ্ত যুক্তি- প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক ও আস্থাশীল বলে পরিগণিত সে সকল আচার-ব্যবহারের ব্যাপারে সুপারিশ ও গুরুত্ব প্রদান করে ।

দ্বীনের মৌলাংশ ও গৌণাংশ

দ্বীনের পারিভাষিক ধারণার ভিত্তিতে স্পষ্টতঃই প্রতীয়মান হয় যে,প্রতিটি দ্বীনই কমপক্ষে দু টি অংশ নিয়ে গঠিতঃ-

১। যে সকল বিশ্বাসের উপর দ্বীনের মূলভিত্তি প্রতিষ্ঠিত

২। ঐ মূলভিত্তিসমূহের ভিত্তিতে প্রণীত কর্মসূচী ।

অতএব,যথার্থই বলা যায় যে, মতবিশ্বাস হল,দ্বীনের মূল অংশ এবং বিধি-নিষেধ হল দ্বীনের গৌণ অংশ। যেমনঃ ইসলামী পন্ডিতগণ এ দু টি পরিভাষাকে ইসলামী মতবিশ্বাস ও বিধি-নিষেধের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন ।

বিশ্বদৃষ্টি এবং মতাদর্শঃ-

বিশ্বদৃষ্টি এবং মতাদর্শ এ পরিভাষাগুলো প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থকে সাধারণতঃ বিশ্বদৃষ্টি বলতে বুঝায় : বিশ্ব ও মানুষ সস্পর্কিত এক শ্রেণীর সামগ্রিক বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি,অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে অস্তিত্ব সম্পর্কে এক শ্রেণীর সামগ্রিক বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি। আর মতাদর্শ বলতে বুঝায় : মানুষের আচার-ব্যবহার সম্পর্কে এক শ্রেণীর সামগ্রিক মতামত ।

উপরোল্লিখিত অর্থানুসারে কোন দ্বীনের মৌলিক ও বিশ্বাসগত বিষয়গুলোকে ঐ দ্বীনের বিশ্বদৃষ্টি এবং দ্বীনের সামগ্রিক বিধি-নিষেধগত বিষয়গুলোকে ঐ দ্বীনের মতাদর্শ বলে মনে করা যেতে পারে। অনুরূপ তাদেরকে দ্বীনের মৌলাংশ ও গৌনাংশ রূপে বর্ণনা করা যেতে পারে । কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে,মতাদর্শ পরিভাষাটি আংশিক বিধি-নিষেধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সেরূপ বিশ্বদৃষ্টিও আংশিক বিশ্বাসসমূহকে সমন্বয় করেনা ।

উল্লেখ্য, মতাদর্শ’শব্দটি কখনো কখনো সাধারণ অর্থে ব্যবহার করা হয় । তখন বিশ্বদৃষ্টিও এর অন্তর্ভুক্ত বলে পরিগণিত হয় ।

ঐশ্বরিক বিশ্বদৃষ্টি ও বস্তুগত বিশ্বদৃষ্টি

মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের বিশ্বদৃষ্টি বিদ্যমান ছিল এবং এখনও বর্তমান। তবে অতি প্রাকৃতিক বিষয়কে গ্রহণ ও বর্জনের উপর ভিত্তি করে এগুলোকে দু ভাগে বিভক্ত করা যায় :

ঐশ্বরিক বিশ্বদৃষ্টি এবং বস্তুবাদী বিশ্বদৃষ্টি।

পূর্বে বস্তুবাদী বিশ্বদৃষ্টির অনুসারীদেরকে প্রকৃতিবাদী,এ্যাথিষ্ট (Atheist) কখনো কখনো দ্বৈতবাদী (Dualist) ও নাস্তিক বলা হত। বর্তমানে তাদেরকে বস্তুবাদী বা Materialist নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

বস্তুবাদের বিভিন্ন শাখা - প্রশাখা রয়েছে। তবে , অধুনা এগুলোর মধ্যে দান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectic Materialism)সর্বাধিক পরিচিত , যা মার্কসিজমের দর্শনকে রূপদান করেছে। ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে যে,বিশ্বদৃষ্টির পরিধি দ্বীনের বিশ্বাসগত অংশ অর্থাৎ আক্বায়েদ অপেক্ষা বিস্তৃততর। কারণ,তা নাস্তিক্যবাদী ও বস্তুবাদী বিশ্বাসকেও সমন্বিত করে থাকে। অনুরূপ,মতাদর্শ পরিভাষাটিও শুধুমাত্র দ্বীনের সমগ্র বিধি-নিষেধের জন্যেই ব্যবহৃত হয়না ।

ঐশী ধর্মসমূহ এবং তাদের মূলনীতিসমূহ

বিভিন্ন ধর্মের উৎপত্তির স্বরূপ সম্পর্কে ঐতিহাসিক,সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতানৈক্য বিদ্যমান । তবে,ইসলামী উৎস থেকে যতটুকু জানা সম্ভব,তার ভিত্তিতে বলা যায় : মানুষের আবির্ভাবের সাথে সাথেই ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল এবং মানব জাতির প্রথম সদস্য হযরত আদম (আঃ) স্বয়ং আল্লাহর নবী ,তাওহীদের প্রবক্তা এবং একেশ্বরবাদী ছিলেন। আর অংশীবাদী ধর্মসমূহ সর্বদা বিচ্যুতি এবং সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ফলে উৎপত্তি লাভ করেছিল ।

একেশ্বরবাদী ধর্মসমূহ, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে ঐশ্বরিক ধর্মসমূহও বটে, সেগুলো সত্যধর্ম বলে পরিগণিত। এ ধর্মগুলো তিনটি সামগ্রিক মূলে অভিন্ন । যথাঃ

(১) একক প্রভুর প্রতি বিশ্বাস।

(২)প্রতিটি মানুষের জন্যে পরকালীন অনন্ত জীবন আছে বলে বিশ্বাস ও পার্থিব কর্মের জন্যে অর্জিত কর্মফল গ্রহণের (দিবসের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন।

(৩) পরম উৎকর্ষ সাধন এবং ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের পথে মানুষকে পরিচালনার জন্যে মহান প্রভুর নিকট থেকে নবীগণ প্রেরিত হয়েছেন বলে বিশ্বাস স্থাপন।

এ মূলত্রয় প্রকৃতপক্ষে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন, যা প্রত্যেক বিবেক সম্পন্ন মানুষের বিবেকেই বিদ্যমান তারই জবাব মাত্র। প্রশ্নত্রয় নিম্নরূপ :

(১) অস্তিত্ব দান করেন কে ?

(২)জীবনের শেষে কী রয়েছে ?

(৩) কিরূপে জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট কর্মসূচীর পরিচয় পাওয়া যেতে পারে ?

প্রসঙ্গতঃ ওহীর মাধ্যমে জীবন-কর্মসূচীর যে বিষয়-বস্তু নিশ্চিতরূপ লাভ করেছে,সত্যিকার অর্থে তা-ই হল সে ধর্মীয় মতাদর্শ যা ঐশ্বরিক বিশ্বদৃষ্টির উপর প্রতিষ্ঠিত ।

অপরিহার্য বিষয়সমূহ ,অবিচ্ছেদ্য বিষয়সমূহ ,নির্ভরশীল বিষয়সমূহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসমূহ, যেগুলি সামগ্রিকভাবে দ্বীনের বিশ্বাস সমষ্টিকে রূপায়িত করে সেগুলির সমন্বয়ে মৌলিক মতবিশ্বাস গঠিত। আর বিশ্বাসসমূহের বৈসাদৃশ্যই হল একাধিক ধর্ম,ধর্মীয় দল-উপদল ও মাযহাবের উৎপত্তির কারণ। যেমন : কোন কোন নবীগণের (আঃ) নবুয়্যতের ব্যাপারে মতানৈক্যের কারণেই ইহুদি,খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে এবং তাদের মতবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমনকি কোন কোন বিষয়,মৌলিক মতবিশ্বাসের (প্রকৃত) সাথেও অসঙ্গতি সৃষ্টি করেছে। যেমন : খ্রীষ্টানদের ত্রিত্ববাদ,একেশ্বরবাদের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিহীন;যদিও তারা এর ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন। অনুরূপ রাসুল (সঃ) -এর উত্তরসূরী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হবেন,না জনগণ নির্বাচন করবে? এ বিষয়ের উপর মতবিরোধের ফলেই শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের মধ্যে বৈসাদৃশ্য সৃষ্টি হয়েছে ।

উপসংহারে বলা যায়,তাওহীদ,নবুয়্যত এবং পুনরুত্থান দিবস,এ তিনটি হচ্ছে প্রত্যেক ঐশ্বরিক ধর্মেরই মৌলিকতম বিশ্বাস। তবে এ মূলত্রয়ের বিশ্লেষণের ফলে অর্জিত অথবা তাদের অধীনস্থ অন্যান্য বিশ্বাসসমূহকেও বিশেষ পারিভাষিক অর্থে মৌলিক বিশ্বাসরূপে গণনা করা যেতে পারে । যেমন : খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসকে একটি মৌলিক বিশ্বাস এবং তাঁর একত্বকে অপর একটি মৌলিক বিশ্বাস হিসাবে মনে করা যেতে পারে । অথবা নবুয়্যতের বিশ্বাসকে সকল ধর্মেরই মৌলাংশ এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)-এর নবুয়্যতের প্রতি বিশ্বাসকে ইসলামের অপর একটি মৌলিক বিশ্বাসরূপে গণনা করা যেতে পারে । যেমন : কোন কোন শিয়া পন্ডিত ন্যায়পরায়ণতাকে (العدل ) একটি স্বতন্ত্র মূল হিসাবে মনে করেন, যদিও এটা তাওহীদেরইএকটি শাখা । অনুরূপ, নবুয়্যতের অধীন হওয়া সত্বেও ইমামতকে আলাদা একটি মৌলিক বিশ্বাসরূপে গণনা করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে এধরনের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মৌলিক শব্দটির ব্যবহার একান্তই পারিভাষিক ও পারস্পরিক সম্মতিভিত্তিক। ফলে,এ ব্যাপারে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই ।

অতএব, দ্বীনের মৌলাংশ’ শব্দটিকে সাধারণ ও বিশেষ এ দু টি অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। মৌলাংশ’পরিভাষাটির সাধারণ অর্থ দ্বীনের গৌণাংশ’অর্থাৎ বিধি-নিষেধ অংশের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং নির্ভরযোগ্য সকল মতবিশ্বাসকে সমন্বয় করে থাকে। আর তার বিশেষ অর্থটি দ্বীনের মৌলিকতম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হয়ে থাকে। অনুরূপ,মৌলিক বিশ্বাসত্রয়ের মত সকল ঐশী ধর্মের অভিন্ন বিশ্বাসকে (তাওহীদ,নবুয়্যত,পুনরুত্থন দিবস) দ্বীনের মৌলাংশ (নিরঙ্কুশভাবে) এবং তাদের সাথে অপর এক বা একাধিক মৌলিক বিশ্বাসের সমন্বয়ে দ্বীনের বিশেষ মৌলাংশ’অথবা এক বা একাধিক বিশ্বাস ,যেগুলো মাযহাব বা ফিরকার বিশেষত্ব, সেগুলোর সংযোজনের মাধ্যমে কোন মাযহাবের মৌলিক বিশ্বাসরূপে গণনা করা হয়।

২য় পাঠ

দ্বীনের অনুসন্ধানের

অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান

মানুষের মধ্যে আরেকটি জ্ঞানমাধ্যম রয়েছে , তা হচ্ছে তার অন্তঃকরণ (قلب ) । এর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে অন্তঃকরণজাত বা অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান (علم قلبی ) বলা যেতে পারে । বিচারবুদ্ধি ও অন্তঃকরণের মধ্যে পার্থক্য এখানে যে , বিচারবুদ্ধি প্রত্যক্ষ (ইন্দ্রিয়বহির্ভূত) অভিজ্ঞতা থেকে (যেমন: স্বীয় অস্তিত্ব সম্বন্ধে) অথবা ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যাদি বিশ্লেষণের মাধ্যমে জ্ঞানে উপনীত হয় , কিন্তু অন্তঃকরণের জ্ঞান এমন যা এরূপ কার্যকারণ ছাড়াই অন্তঃকরণে উদ্ভূত হয়। যেমন: যথাযথ চিন্তাগবেষণা ছাড়াই কারো মনে কোনো প্রশ্নের জবাব বা কোনো সমস্যার সমাধান ভেসে উঠলো । তেমনি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে পূর্ব ধারণা ছাড়াই তাকে প্রথম বারের মতো দেখা মাত্রই অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা , স্নেহ-মমতা , ভয় , আশা , শ্রদ্ধা , ভক্তি ইত্যাদি জেগে উঠতে পারে এবং পরে তা যথার্থ বলে প্রমাণিত হতে পারে। অবশ্য ইন্দ্রিয়লব্ধ পূর্বাহ্নিক তথ্য বা বিচারবুদ্ধির প্রভাবেও এ ধরনের অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে , তবে এ সবের প্রভাব ছাড়াও , দৃশ্যতঃ কোনো কারণ ছাড়াও হতে পারে। দ্বিতীয়োক্ত ধরনের অনুভূতি অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান , যদিও প্রথমোক্ত ও দ্বিতীয়োক্ত উভয় ধরনের জ্ঞানেরই শারীরিক প্রতিক্রিয়ার প্রধান কেন্দ্র হচ্ছে হৃদপিণ্ড।

কারো প্রতি ভালোবাসা , স্নেহ-মমতা , ভয় , আশা , শ্রদ্ধা , ভক্তি ইত্যাদি জাগ্রত হওয়ার বিষয়টি সহজাত প্রবৃত্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হিসেবে একে সহজাত জ্ঞান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এখানে সহজাত জ্ঞান থেকে পার্থক্য এই যে , মানুষের মূল অনুভূতিগুলো সহজাত , কিন্তু তার প্রয়োগক্ষেত্র তথা কা রা এগুলোর উপযুক্ত সে সংক্রান্ত জ্ঞান কেবল ইন্দ্রিয়নিচয়ের দ্বারা অর্জিত তথ্যাদি বিচারবুদ্ধির দ্বারা বিশ্লেষণের মাধ্যমেই অর্জিত হয়ে থাকে এবং কেবল এর পরেই ঐ সব অনুভূতি সে সব পাত্রের দিকে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তা যদি ইন্দ্রিয়নিচয়ের দ্বারা অর্জিত তথ্য ও বিচারবুদ্ধির বিশ্লেষণ ছাড়াই , দৃশ্যতঃ বিনা কারণেই ঘটে , যেমন: একজন লোককে প্রথম বারের মতো দেখেই মনে হলো লোকটি বিপজ্জনক , তাহলে তা অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান।

বিচারবুদ্ধি ও অন্তঃকরণের মধ্যকার পার্থক্য ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি দিক হেচ্ছ এই যে , বিচারবুদ্ধির জ্ঞানের উদয় , বিচারবিশ্লেষণ ও উপসংহার যেখানে মস্তিষ্কে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটায় সেখানে অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান অন্তঃকরণ থেকে মস্তিষ্কে স্থানান্তরিত হয় , যদিও পরে বিচারবুদ্ধি সে সব নিয়ে বিচারবিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করতে পারে এবং সে সবকে শক্তিশালী বা দুর্বল করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করা বিশেষভাবে প্রয়োজন , তা হচ্ছে , অনেকে শরীরের হৃদপিণ্ডকেই ক্বালব্ বলে মনে করেন। যদিও আরবী ভাষায় হৃদপিণ্ডকেও ক্বালব্ বলা হয় , কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অন্তঃকরণ বা হৃদয় (ক্বালব্) কোনো বস্তুগত অঙ্গ নয় , যদিও উভয়ের মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। অনেক ভাষায়ই যেমন এক শব্দ একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয় , আরবী ভাষায়ও তদ্রূপ ব্যবহারের প্রচলন আছে। আরবী ভাষায় হৃদপিণ্ড এবং অন্তঃকরণ বা হৃদয় উভয় অর্থেই ক্বালব্ শব্দ ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে অন্তঃকরণ বা হৃদয়ের অনুভূতি হৃদপিণ্ডে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে বিধায় অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এ উভয় অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অন্তঃকরণ বা হৃদয় হচ্ছে মানবসত্তায় নিহিত একটি অবস্তুগত জ্ঞানকেন্দ্র , আর হৃদপিণ্ডের মূল কাজ হচ্ছে রক্ত পরিশোধন ও সঞ্চালন।

যা-ই হোক , ক্বালব্ -এর জ্ঞান দুই ধরনের। ইতিপূর্বে যেমন ইঙ্গিত করা হয়েছে , এর এক ধরনের জ্ঞানের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা বিচারবুদ্ধির আওতাধীন জগতের সাথে যোগসূত্র থাকে। অর্থাৎ এ দুই জগতের কোনো তথ্য মস্তিষ্কে জমা হয়ে তা বিচারবুদ্ধির বিশ্লেষণ ছাড়াই অন্তরে স্থানান্তরিত হতে এবং তাকে কেন্দ্র করে অন্তরে বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে যা পরে সেখান থেকে মস্তিষ্কে স্থানান্তরিত হয়। যেমন: একজন মানুষকে দেখামাত্রই অন্তরে তার প্রতি ভয় বা ঘৃণা জাগ্রত হতে পারে যদিও দৃশ্যতঃ তার মধ্যে তাকে ভয় বা ঘৃণা করার মতো কোনো কারণ দেখা যায় না এবং বিচারবুদ্ধি তাকে ভয় বা ঘৃণা করার সপক্ষে রায় দেয় না। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যাদি ও বিচারবুদ্ধির ফয়সালার বিপরীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ও তার ভিত্তিতে কোনো কাজ করে বা কোনো কাজ পরিহার করে কেবল এ কারণে যে , মন বলছে , এ কাজটি করা উচিত অথবা করা উচিত নয়।

ক্ষেত্রবিশেষে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও বিচারবুদ্ধির আওতাভুক্ত বিষয় এমন হতে পারে যে , সে ব্যাপারে সঠিক ফয়সালায় উপনীত হবার পথে স্থানগত , কালগত , পরিবেশগত বা পরিস্থিতিগত বাধা থাকতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে ক্বালব্ ব্যক্তিকে পথপ্রদর্শন করতে পারে। অর্থাৎ ব্যক্তির পক্ষে অভিজ্ঞতা হাসিল , গবেষণা ও বিচারবুদ্ধির বিশ্লেষণ ছাড়াই কেবল অন্তরের অনুভূতির ভিত্তিতে কোনো বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হতে পারে।

মানুষের শরীরের বস্তুগত অঙ্গ হৃদপিণ্ড ছাড়াও যে তার মধ্যে অন্তঃকরণ বা হৃদয় নামক একটি অবস্তুগত শক্তি রয়েছে কোরআন মজীদের আয়াত থেকে তার সন্ধান পাওয়া যায়। আল্লাহ্ তা আলা অতীতের বহু শক্তিশালী জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর এরশাদ করেছেন:

) إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْب(

নিঃসন্দেহে এতে তার জন্য উপদেশ রয়েছে যে ব্যক্তি ক্বালব্-এর অধিকারী। (সূরাহ্ ক্বাফ্: 37)

বলা বাহুল্য যে , এখানে শরীরের বস্তুগত হৃদপিণ্ডের কথা বলা হয় নি , কারণ , তা প্রত্যেকেরই রয়েছে যা না থাকলে কোনো মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

বিভিন্ন জাতির ধ্বংসের কারণ সম্বন্ধে গবেষণা করলে বহু প্রাকৃতিক , বস্তুগত , রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যকারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু নির্মল অন্তঃকরণের অধিকারী ব্যক্তি এ ধরনের প্রতিটি জাতির পাপাচারের ক্ষেত্রে সকল মাত্রা ছাড়িয়ে যাবার পর ধ্বংস হবার ঘটনা অবহিত হয়ে অনুভব করতে পারেন যে , এ হচ্ছে আল্লাহ্ তা আলার এক অমোঘ বিধান , যদিও তা প্রাকৃতিক বা মানবিক কার্যকারণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে।

ক্বালবের দ্বিতীয় ধরনের জ্ঞান হচ্ছে এমন যার সাথে ইন্দ্রিয়লব্ধ বা বিচারবুদ্ধিজাত তথ্যের কোনোরূপ যোগসূত্র নেই। বরং বস্তুগত ও বিচারবুদ্ধিগত কার্যকারণের সংযোগ ছাড়াই অন্তঃকরণে বা হৃদয়ে কোনো তথ্য জাগ্রত হয় এবং তাতে প্রত্যয়ও সৃষ্টি হয়। ওয়াহী ও ইলহাম্ এ পর্যায়ের জ্ঞান। এ ক্ষেত্রে তা শব্দ ও বাক্যের সাহায্যে তৈরী বাণী , কোনো স্থির বা চলমান দৃশ্য , অথবা উভয়ই হতে পারে যা নবী-রাসূলগণ (আঃ) পেয়েছিলেন। আল্লাহর কোনো কোনো ওয়ালীও এরূপ বাণী লাভ করেন , যেমন: হযরত মূসা (আঃ)-এর মাতা লাভ করেছিলেন।

অন্যদিকে অন্তঃকরণে ভেসে ওঠা দৃশ্য বা অকাট্য তথ্য আকারেও কোনো জ্ঞান কেউ পেতে পারেন এবং তা অকাট্য প্রত্যয় উৎপাদক হয়ে থাকে। নবী-রাসূলগণ (আঃ) ও আল্লাহর ওয়ালীগণ ছাড়াও যে কোনো লোকই এ ধরনের জ্ঞান লাভ করতে পারে (যেমন অনেক বিজ্ঞানী লাভ করেন)। এমনকি নাস্তিক ব্যক্তির জন্যও এরূপ জ্ঞান লাভ করা অসম্ভব নয়।

বাণীর আকারে হলে এরূপ জ্ঞানকে পঠনযোগ্য ওয়াহী (وحی متلوء )বলা হয় , আর বাণী আকারে না হলে এরূপ জ্ঞানকে পঠন - অযোগ্য ওয়াহী (وحی غير متلوء ) বা প্রেরণা (الهام - ইলহাম্) বা প্রত্যক্ষ অনুভূতি (intuition) বলা হয়।

বর্ণনাসূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান

ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানকে সহজাত , ইন্দ্রিয়লব্ধ , বিচারবুদ্ধিজাত ও অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান - এ চার ভাগে ভাগ করার পাশাপাশি বর্ণনাসূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান বা উদ্ধৃত জ্ঞান (علم نقلی ) নামেও একটি বিভাগ নির্দেশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি অন্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ইন্দ্রিয়লব্ধ , বিচারবুদ্ধিজাত ও অন্তঃকরণে উদ্ভূত যে জ্ঞান বর্ণনাসূত্রে (লেখা ও কথা নির্বিশেষে) অবগত হয় তাকেই বর্ণনাসূত্রে প্রাপ্ত বা উদ্ধৃত জ্ঞান বলা হয়। এ ধরনের জ্ঞান যদি বিচারবুদ্ধিজাত ও অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান হয় এবং যথাযথভাবে স্থানান্তরিত হয় অর্থাৎ বর্ণনা ও গ্রহণ যথাযথ হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জ্ঞান একই পর্যায়ের হবে। তবে বিচারবুদ্ধির জ্ঞানের ক্ষেত্রেই এটা যথাযথভাবে হওয়া সম্ভব। অন্তঃকরণে উদ্ভূত কোনো কোনো জ্ঞানের যথাযথ স্থানান্তর ও যার কাছে স্থানান্তরিত হয় তার পক্ষে তা যথাযথভাবে ধারণ করতে পারা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। অবস্তুগত সমুন্নত সত্তা ও জগতসমূহ সংক্রান্ত জ্ঞান এ পর্যায়ের।

অন্যদিকে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান স্থানান্তরের বিষয়টি ভিন্ন ধরনের। প্রকৃত পক্ষে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়নিচয় দ্বারা যে তথ্য আহরণ করে , বা প্রচলিত কথায় , যে জ্ঞান অর্জন করে , তা হুবহু অন্যের মাঝে স্থানান্তরিত করতে পারে না , কেবল এ সংক্রান্ত একটা প্রতীকী ধারণা স্থানান্তরিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ , কোনো ব্যক্তি যখন একটি সুন্দর দৃশ্য দেখার পর তা অন্যের নিকট মুখে বা লিখে বর্ণনা করে তখন তার পক্ষে পাঠক-পাঠিকা বা শ্রোতাকে হুবহু নিজের অভিজ্ঞতা প্রদান করা সম্ভব হয় না ; প্রতীকী শব্দাবলীর সাহায্যে ধারণা প্রদান করা সম্ভব হয় মাত্র। অবশ্য বর্ণনা যত নিখুঁত হবে পাঠক-পাঠিকা বা শ্রোতার পক্ষে স্বীয় কল্পনানেত্রে ততটাই কাছাকাছি দৃশ্য রচনা করা সম্ভব হবে। কিন্তু কখনোই তা বক্তার বা লেখকের দেখা দৃশ্যের হুবহু অনুরূপ হবে না। এমনকি তার ভিডিও-চিত্র প্রদর্শন করা হলেও ভিডিও-দর্শনকারীর জন্য অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর ন্যায় হুবহু জ্ঞান অর্জিত হবে না। কারণ , সংশ্লিষ্ট চলমান দৃশ্যাবলী ও শব্দ ( sound) ছাড়াও সেখানকার পরিবেশগত অনেক বিষয় , ধরুন বাতাসের স্পর্শ ইত্যাদি অনেক কিছু ব্যক্তির অভিজ্ঞতায় শামিল থাকে যা চলচ্চিত্রে অনুপস্থিত থাকে।

তেমনি একটি সুর , কোনো বস্তুর স্বাদ , কোনো কিছুর ঘ্রাণ ও কোনো বস্তুর স্পর্শের অনুভূতি সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ এগুলো মৌখিক বা লিখিত বর্ণনা , এমনকি রেকর্ড বা চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও হুবহু পাঠক-পাঠিকা বা শ্রোতার কাছে স্থানান্তরিত করা সম্ভবপর হয় না , কেবল এ সংক্রান্ত ধারণা প্রদান করা সম্ভব হয় মাত্র। যদিও লেখ্য বা মৌখিক বর্ণনার তুলনায় রেকর্ড বা চলচ্চিত্রের সাহায্যে প্রদত্ত ধারণা বাস্তবতার অধিকতর কাছিাকাছি হয়ে থাকে , কিন্তু তা হুবহু অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর অনুভূতির ন্যায় হয় না। আর পরীক্ষাগারে হাতে-কলমে পরীক্ষার মাধ্যমে যে জ্ঞান দেয়া হয় মূলতঃ তা আর উদ্ধৃত জ্ঞান থাকে না , বরং জ্ঞান গ্রহণকারীর জন্যও পরীক্ষালব্ধ জ্ঞানে পরিণত হয় , যদিও অন্য একজন তাকে সাহায্য করেছে বা ইতিপূর্বে সে অন্যের কাছ থেকে যে উদ্ধৃত জ্ঞান পেয়েছে তা থেকে এ ব্যাপারে সাহায্য নিয়েছে।

ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান স্থানান্তরের ক্ষেত্রে দু টি শর্ত বিদ্যমান থাকা অপরিহার্য। প্রথমতঃ গ্রহীতার সংশ্লিষ্ট ইন্দ্রিয় অর্থাৎ তার যে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অন্যের ইন্দ্রিয় দ্বারা সংগৃহীত তথ্যাদি তার মধ্যে স্থানান্তরিত করা হবে সে ইন্দ্রিয়টি অক্ষত ও অবিকৃত থাকতে হবে। দ্বিতীয়তঃ গ্রহীতার মধ্যে সংশ্লিষ্ট বর্ণনার বিষয়বস্তুর অনুরূপ বিষয়বস্তু বা তার কাছাকাছি বিষয় সম্পর্কে পূর্বাহ্নিক ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞান থাকতে হবে। কেবল তাহলেই গ্রহীতার পক্ষে স্বীয় অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে অন্যের অভিজ্ঞতাভুক্ত বিষয় সম্পর্কে কোনো না কোনো পর্যায়ের ধারণা লাভ করা সম্ভব , অন্যথায় নয়। যেমন: চক্ষুষ্মান ব্যক্তিকে বর্ণনার দ্বারা একটি দৃশ্য সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা দেয়া সম্ভব। ধরুন , যে ব্যক্তি তাজমহল দেখে নি তাকে বর্ণনার দ্বারা তাজমহল সম্পর্কে তাজমহল-দর্শকের অনুরূপ ধারণা দেয়া সম্ভব নয় , তবে মোটামুটি ধারণা দেয়া সম্ভব । অবশ্য বর্ণনার সাথে সাথে ছবি দেখানো হলে দর্শক-শ্রোতার এতদসংক্রান্ত জ্ঞান উন্নততর ও অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর অধিকতর কাছাকাছি হবে। আর রঙিন ছবি ও ভিডিও-চিত্রের সাহায্যে পর্যায়ক্রমে অধিকতর উন্নত স্তরের ধারণা দেয়া ও তার এ সংক্রান্ত জ্ঞানকে অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর জ্ঞানস্তরের আরো কাছাকাছি নিয়ে আসা সম্ভব হবে। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও তার জ্ঞান হুবহু তাজমহল-পরিদর্শনকারীর এতদসংক্রান্ত জ্ঞানের অনুরূপ হবে না। কিন্তু যে ব্যক্তির চোখ নেই তাকে , বিশেষতঃ জন্মান্ধকে তাজমহলের সৌন্দর্য সম্বন্ধে কোনো ধারণাই দেয়া সম্ভব হবে না।

অন্যান্য ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও এটা সত্য।

অবশ্য বর্ণিত সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে তৈরী পটভূমিকার কারণে ব্যক্তি বর্ণনাকারীর অনুরূপ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য উদ্যোগী হতে পারে। যেমন: সে তাজমহলের সৌন্দর্য দেখতে যেতে পারে , সমুদ্রের শো-শো শব্দ শোনার জন্য সমুদ্রে যেতে পারে , যে নতুন ফলের প্রশংসা সে শুনেছে তা সংগ্রহ করে খেয়ে দেখতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার এতদসংক্রান্ত জ্ঞান আর বর্ণনাসূত্রে লব্ধ জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না , বরং ইন্দ্রিয়লব্ধ বা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানে পরিণত হলো।

অন্ধভাবে গ্রহণীয় জ্ঞান

জ্ঞানকে অন্য এক বিবেচনায় দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: বিচারবুদ্ধি দ্বারা আয়ত্তযোগ্য জ্ঞান (علم تعقلی ) ও অন্ধভাবে গ্রহণীয় জ্ঞান (علم تعبدی ) । সহজাত জ্ঞান , ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান , অভিজ্ঞতালব্ধ বা পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান এবং অনেক উদ্ধৃত জ্ঞানই প্রথমোক্ত ধরনের জ্ঞানের মধ্যে শামিল। আর দ্বিতীয়োক্ত ধরনের জ্ঞান যদিও পুরোপুরিভাবে বিচারবুদ্ধির ধারণক্ষমতার বহির্ভূত নয় , তবে তা সর্বজনীন নয়। তাই এ জ্ঞান যার আছে তাঁর কাছ থেকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। উদাহরণস্বরূপ , লাওহে মাহফূযের কথা ধরা যাক। এ ক্ষেত্রে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত কোরআন মজীদের তথ্য মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ , সংশ্লিষ্ট তথ্যের সত্যাসত্য যাচাই করা বিচারবুদ্ধির আওতাবহির্ভূত ব্যাপার।

এ পরিভাষা দু টি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কিছুটা পরিবর্তিত অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তা হচ্ছে , যে তথ্য কেবল বিশেষজ্ঞদের পক্ষেই জানা সম্ভব তা তাঁদের জন্য বিচারবুদ্ধির আয়ত্তাধীন জ্ঞান (علم تعقلی ) এবং সাধারণ মানুষদের জন্য অন্ধভাবে গ্রহণীয় জ্ঞান (علم تعبدی ) । কারণ , এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞের কথা মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। তবে এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের কথা চোখ বুঁজে মেনে নেয়ার আগে স্বীয় বিচারবুদ্ধির দ্বারা বিশেষজ্ঞকে অর্থাৎ প্রকৃতই তিনি বিশেষজ্ঞ , নাকি বিশেষজ্ঞ হবার মিথ্যা দাবীদার তা পরীক্ষা করে দেখে নিশ্চিত হতে হবে এবং বিশেষজ্ঞ মিথ্যা বলবেন না সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে হবে বা প্রত্যয়ে উপনীত হতে হবে। যেমন: আমরা যখন অসুস্থ হই তখন চিকিৎসকের কাছে যাই , তবে বিচারবুদ্ধি নির্দেশিত বিভিন্ন পন্থায় , যেমন: চিকিৎসাক্ষেত্রে খ্যাতি , সার্টিফিকেট , সরকারী নিবন্ধন ইত্যাদির ভিত্তিতে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত হই যে , ঐ ব্যক্তি চিকিৎসক হবার মিথ্যা দাবী করছেন না ; এ কারণেই নিশ্চিন্ত মনে তাঁর কাছে যাই।

অন্যদিকে সর্বজনীন বিচারবুদ্ধির ধারণযোগ্য বিষয়ে অন্যের কথা মেনে নেয়া এবং বিশেষজ্ঞ হবার দাবীদার ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা সম্বন্ধে বিচারবুদ্ধির দ্বারা বিচার বা অনুসন্ধান পূর্বক নিশ্চিত না হয়েই তার কথা মেনে নেয়া বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে নিন্দনীয় কাজ। এরূপ ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষজ্ঞত্বের দাবীদার ব্যক্তির কাছ থেকে যে ধারণা লাভ করে তাকে নেতিবাচক ও নিন্দনীয় অর্থেتعبد বা অন্ধ বিশ্বাস বলা হয়। বস্তুতঃ এ ধরনের অন্ধ বিশ্বাস জ্ঞানের পর্যায়ে পড়ে না।

কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে জ্ঞানমাধ্যম

সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য বিচারবুদ্ধির পর্যালোচনায় যে জ্ঞানমাধ্যমগুলোর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে তা হচ্ছে: সহজাত প্রবণতা , বিচারবুদ্ধি , ইন্দ্রিয়নিচয় ও অন্তঃকরণ বা হৃদয় (قلب ) । এ মাধ্যমগুলো এমন যে , এগুলোকে আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সকলেই জ্ঞানমাধ্যমরূপে স্বীকার করতে বাধ্য , অবশ্য কেউ গোঁয়ার্তুমি করে বা অন্ধভাবে এর মধ্য থেকে কোনোটিকে অস্বীকার করতে চাইলে সে কথা স্বতন্ত্র এবং তা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। আমরা কোরআন মজীদেও জ্ঞানমাধ্যম হিসেবে এগুলোর উল্লেখ দেখতে পাই।

অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান

মানুষের মধ্যে আরেকটি জ্ঞানমাধ্যম রয়েছে , তা হচ্ছে তার অন্তঃকরণ (قلب ) । এর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানকে অন্তঃকরণজাত বা অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান (علم قلبی ) বলা যেতে পারে । বিচারবুদ্ধি ও অন্তঃকরণের মধ্যে পার্থক্য এখানে যে , বিচারবুদ্ধি প্রত্যক্ষ (ইন্দ্রিয়বহির্ভূত) অভিজ্ঞতা থেকে (যেমন: স্বীয় অস্তিত্ব সম্বন্ধে) অথবা ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যাদি বিশ্লেষণের মাধ্যমে জ্ঞানে উপনীত হয় , কিন্তু অন্তঃকরণের জ্ঞান এমন যা এরূপ কার্যকারণ ছাড়াই অন্তঃকরণে উদ্ভূত হয়। যেমন: যথাযথ চিন্তাগবেষণা ছাড়াই কারো মনে কোনো প্রশ্নের জবাব বা কোনো সমস্যার সমাধান ভেসে উঠলো । তেমনি কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে পূর্ব ধারণা ছাড়াই তাকে প্রথম বারের মতো দেখা মাত্রই অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা , স্নেহ-মমতা , ভয় , আশা , শ্রদ্ধা , ভক্তি ইত্যাদি জেগে উঠতে পারে এবং পরে তা যথার্থ বলে প্রমাণিত হতে পারে। অবশ্য ইন্দ্রিয়লব্ধ পূর্বাহ্নিক তথ্য বা বিচারবুদ্ধির প্রভাবেও এ ধরনের অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে , তবে এ সবের প্রভাব ছাড়াও , দৃশ্যতঃ কোনো কারণ ছাড়াও হতে পারে। দ্বিতীয়োক্ত ধরনের অনুভূতি অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান , যদিও প্রথমোক্ত ও দ্বিতীয়োক্ত উভয় ধরনের জ্ঞানেরই শারীরিক প্রতিক্রিয়ার প্রধান কেন্দ্র হচ্ছে হৃদপিণ্ড।

কারো প্রতি ভালোবাসা , স্নেহ-মমতা , ভয় , আশা , শ্রদ্ধা , ভক্তি ইত্যাদি জাগ্রত হওয়ার বিষয়টি সহজাত প্রবৃত্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হিসেবে একে সহজাত জ্ঞান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এখানে সহজাত জ্ঞান থেকে পার্থক্য এই যে , মানুষের মূল অনুভূতিগুলো সহজাত , কিন্তু তার প্রয়োগক্ষেত্র তথা কা রা এগুলোর উপযুক্ত সে সংক্রান্ত জ্ঞান কেবল ইন্দ্রিয়নিচয়ের দ্বারা অর্জিত তথ্যাদি বিচারবুদ্ধির দ্বারা বিশ্লেষণের মাধ্যমেই অর্জিত হয়ে থাকে এবং কেবল এর পরেই ঐ সব অনুভূতি সে সব পাত্রের দিকে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তা যদি ইন্দ্রিয়নিচয়ের দ্বারা অর্জিত তথ্য ও বিচারবুদ্ধির বিশ্লেষণ ছাড়াই , দৃশ্যতঃ বিনা কারণেই ঘটে , যেমন: একজন লোককে প্রথম বারের মতো দেখেই মনে হলো লোকটি বিপজ্জনক , তাহলে তা অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান।

বিচারবুদ্ধি ও অন্তঃকরণের মধ্যকার পার্থক্য ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি দিক হেচ্ছ এই যে , বিচারবুদ্ধির জ্ঞানের উদয় , বিচারবিশ্লেষণ ও উপসংহার যেখানে মস্তিষ্কে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটায় সেখানে অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান অন্তঃকরণ থেকে মস্তিষ্কে স্থানান্তরিত হয় , যদিও পরে বিচারবুদ্ধি সে সব নিয়ে বিচারবিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করতে পারে এবং সে সবকে শক্তিশালী বা দুর্বল করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করা বিশেষভাবে প্রয়োজন , তা হচ্ছে , অনেকে শরীরের হৃদপিণ্ডকেই ক্বালব্ বলে মনে করেন। যদিও আরবী ভাষায় হৃদপিণ্ডকেও ক্বালব্ বলা হয় , কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অন্তঃকরণ বা হৃদয় (ক্বালব্) কোনো বস্তুগত অঙ্গ নয় , যদিও উভয়ের মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। অনেক ভাষায়ই যেমন এক শব্দ একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয় , আরবী ভাষায়ও তদ্রূপ ব্যবহারের প্রচলন আছে। আরবী ভাষায় হৃদপিণ্ড এবং অন্তঃকরণ বা হৃদয় উভয় অর্থেই ক্বালব্ শব্দ ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে অন্তঃকরণ বা হৃদয়ের অনুভূতি হৃদপিণ্ডে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে বিধায় অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এ উভয় অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অন্তঃকরণ বা হৃদয় হচ্ছে মানবসত্তায় নিহিত একটি অবস্তুগত জ্ঞানকেন্দ্র , আর হৃদপিণ্ডের মূল কাজ হচ্ছে রক্ত পরিশোধন ও সঞ্চালন।

যা-ই হোক , ক্বালব্ -এর জ্ঞান দুই ধরনের। ইতিপূর্বে যেমন ইঙ্গিত করা হয়েছে , এর এক ধরনের জ্ঞানের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা বিচারবুদ্ধির আওতাধীন জগতের সাথে যোগসূত্র থাকে। অর্থাৎ এ দুই জগতের কোনো তথ্য মস্তিষ্কে জমা হয়ে তা বিচারবুদ্ধির বিশ্লেষণ ছাড়াই অন্তরে স্থানান্তরিত হতে এবং তাকে কেন্দ্র করে অন্তরে বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে যা পরে সেখান থেকে মস্তিষ্কে স্থানান্তরিত হয়। যেমন: একজন মানুষকে দেখামাত্রই অন্তরে তার প্রতি ভয় বা ঘৃণা জাগ্রত হতে পারে যদিও দৃশ্যতঃ তার মধ্যে তাকে ভয় বা ঘৃণা করার মতো কোনো কারণ দেখা যায় না এবং বিচারবুদ্ধি তাকে ভয় বা ঘৃণা করার সপক্ষে রায় দেয় না। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যাদি ও বিচারবুদ্ধির ফয়সালার বিপরীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ও তার ভিত্তিতে কোনো কাজ করে বা কোনো কাজ পরিহার করে কেবল এ কারণে যে , মন বলছে , এ কাজটি করা উচিত অথবা করা উচিত নয়।

ক্ষেত্রবিশেষে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও বিচারবুদ্ধির আওতাভুক্ত বিষয় এমন হতে পারে যে , সে ব্যাপারে সঠিক ফয়সালায় উপনীত হবার পথে স্থানগত , কালগত , পরিবেশগত বা পরিস্থিতিগত বাধা থাকতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে ক্বালব্ ব্যক্তিকে পথপ্রদর্শন করতে পারে। অর্থাৎ ব্যক্তির পক্ষে অভিজ্ঞতা হাসিল , গবেষণা ও বিচারবুদ্ধির বিশ্লেষণ ছাড়াই কেবল অন্তরের অনুভূতির ভিত্তিতে কোনো বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হতে পারে।

মানুষের শরীরের বস্তুগত অঙ্গ হৃদপিণ্ড ছাড়াও যে তার মধ্যে অন্তঃকরণ বা হৃদয় নামক একটি অবস্তুগত শক্তি রয়েছে কোরআন মজীদের আয়াত থেকে তার সন্ধান পাওয়া যায়। আল্লাহ্ তা আলা অতীতের বহু শক্তিশালী জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর এরশাদ করেছেন:

) إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْب(

নিঃসন্দেহে এতে তার জন্য উপদেশ রয়েছে যে ব্যক্তি ক্বালব্-এর অধিকারী। (সূরাহ্ ক্বাফ্: 37)

বলা বাহুল্য যে , এখানে শরীরের বস্তুগত হৃদপিণ্ডের কথা বলা হয় নি , কারণ , তা প্রত্যেকেরই রয়েছে যা না থাকলে কোনো মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

বিভিন্ন জাতির ধ্বংসের কারণ সম্বন্ধে গবেষণা করলে বহু প্রাকৃতিক , বস্তুগত , রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যকারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু নির্মল অন্তঃকরণের অধিকারী ব্যক্তি এ ধরনের প্রতিটি জাতির পাপাচারের ক্ষেত্রে সকল মাত্রা ছাড়িয়ে যাবার পর ধ্বংস হবার ঘটনা অবহিত হয়ে অনুভব করতে পারেন যে , এ হচ্ছে আল্লাহ্ তা আলার এক অমোঘ বিধান , যদিও তা প্রাকৃতিক বা মানবিক কার্যকারণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে।

ক্বালবের দ্বিতীয় ধরনের জ্ঞান হচ্ছে এমন যার সাথে ইন্দ্রিয়লব্ধ বা বিচারবুদ্ধিজাত তথ্যের কোনোরূপ যোগসূত্র নেই। বরং বস্তুগত ও বিচারবুদ্ধিগত কার্যকারণের সংযোগ ছাড়াই অন্তঃকরণে বা হৃদয়ে কোনো তথ্য জাগ্রত হয় এবং তাতে প্রত্যয়ও সৃষ্টি হয়। ওয়াহী ও ইলহাম্ এ পর্যায়ের জ্ঞান। এ ক্ষেত্রে তা শব্দ ও বাক্যের সাহায্যে তৈরী বাণী , কোনো স্থির বা চলমান দৃশ্য , অথবা উভয়ই হতে পারে যা নবী-রাসূলগণ (আঃ) পেয়েছিলেন। আল্লাহর কোনো কোনো ওয়ালীও এরূপ বাণী লাভ করেন , যেমন: হযরত মূসা (আঃ)-এর মাতা লাভ করেছিলেন।

অন্যদিকে অন্তঃকরণে ভেসে ওঠা দৃশ্য বা অকাট্য তথ্য আকারেও কোনো জ্ঞান কেউ পেতে পারেন এবং তা অকাট্য প্রত্যয় উৎপাদক হয়ে থাকে। নবী-রাসূলগণ (আঃ) ও আল্লাহর ওয়ালীগণ ছাড়াও যে কোনো লোকই এ ধরনের জ্ঞান লাভ করতে পারে (যেমন অনেক বিজ্ঞানী লাভ করেন)। এমনকি নাস্তিক ব্যক্তির জন্যও এরূপ জ্ঞান লাভ করা অসম্ভব নয়।

বাণীর আকারে হলে এরূপ জ্ঞানকে পঠনযোগ্য ওয়াহী (وحی متلوء )বলা হয় , আর বাণী আকারে না হলে এরূপ জ্ঞানকে পঠন - অযোগ্য ওয়াহী (وحی غير متلوء ) বা প্রেরণা (الهام - ইলহাম্) বা প্রত্যক্ষ অনুভূতি (intuition) বলা হয়।

বর্ণনাসূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান

ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানকে সহজাত , ইন্দ্রিয়লব্ধ , বিচারবুদ্ধিজাত ও অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান - এ চার ভাগে ভাগ করার পাশাপাশি বর্ণনাসূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান বা উদ্ধৃত জ্ঞান (علم نقلی ) নামেও একটি বিভাগ নির্দেশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি অন্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ইন্দ্রিয়লব্ধ , বিচারবুদ্ধিজাত ও অন্তঃকরণে উদ্ভূত যে জ্ঞান বর্ণনাসূত্রে (লেখা ও কথা নির্বিশেষে) অবগত হয় তাকেই বর্ণনাসূত্রে প্রাপ্ত বা উদ্ধৃত জ্ঞান বলা হয়। এ ধরনের জ্ঞান যদি বিচারবুদ্ধিজাত ও অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান হয় এবং যথাযথভাবে স্থানান্তরিত হয় অর্থাৎ বর্ণনা ও গ্রহণ যথাযথ হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জ্ঞান একই পর্যায়ের হবে। তবে বিচারবুদ্ধির জ্ঞানের ক্ষেত্রেই এটা যথাযথভাবে হওয়া সম্ভব। অন্তঃকরণে উদ্ভূত কোনো কোনো জ্ঞানের যথাযথ স্থানান্তর ও যার কাছে স্থানান্তরিত হয় তার পক্ষে তা যথাযথভাবে ধারণ করতে পারা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। অবস্তুগত সমুন্নত সত্তা ও জগতসমূহ সংক্রান্ত জ্ঞান এ পর্যায়ের।

অন্যদিকে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান স্থানান্তরের বিষয়টি ভিন্ন ধরনের। প্রকৃত পক্ষে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়নিচয় দ্বারা যে তথ্য আহরণ করে , বা প্রচলিত কথায় , যে জ্ঞান অর্জন করে , তা হুবহু অন্যের মাঝে স্থানান্তরিত করতে পারে না , কেবল এ সংক্রান্ত একটা প্রতীকী ধারণা স্থানান্তরিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ , কোনো ব্যক্তি যখন একটি সুন্দর দৃশ্য দেখার পর তা অন্যের নিকট মুখে বা লিখে বর্ণনা করে তখন তার পক্ষে পাঠক-পাঠিকা বা শ্রোতাকে হুবহু নিজের অভিজ্ঞতা প্রদান করা সম্ভব হয় না ; প্রতীকী শব্দাবলীর সাহায্যে ধারণা প্রদান করা সম্ভব হয় মাত্র। অবশ্য বর্ণনা যত নিখুঁত হবে পাঠক-পাঠিকা বা শ্রোতার পক্ষে স্বীয় কল্পনানেত্রে ততটাই কাছাকাছি দৃশ্য রচনা করা সম্ভব হবে। কিন্তু কখনোই তা বক্তার বা লেখকের দেখা দৃশ্যের হুবহু অনুরূপ হবে না। এমনকি তার ভিডিও-চিত্র প্রদর্শন করা হলেও ভিডিও-দর্শনকারীর জন্য অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর ন্যায় হুবহু জ্ঞান অর্জিত হবে না। কারণ , সংশ্লিষ্ট চলমান দৃশ্যাবলী ও শব্দ ( sound) ছাড়াও সেখানকার পরিবেশগত অনেক বিষয় , ধরুন বাতাসের স্পর্শ ইত্যাদি অনেক কিছু ব্যক্তির অভিজ্ঞতায় শামিল থাকে যা চলচ্চিত্রে অনুপস্থিত থাকে।

তেমনি একটি সুর , কোনো বস্তুর স্বাদ , কোনো কিছুর ঘ্রাণ ও কোনো বস্তুর স্পর্শের অনুভূতি সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ এগুলো মৌখিক বা লিখিত বর্ণনা , এমনকি রেকর্ড বা চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও হুবহু পাঠক-পাঠিকা বা শ্রোতার কাছে স্থানান্তরিত করা সম্ভবপর হয় না , কেবল এ সংক্রান্ত ধারণা প্রদান করা সম্ভব হয় মাত্র। যদিও লেখ্য বা মৌখিক বর্ণনার তুলনায় রেকর্ড বা চলচ্চিত্রের সাহায্যে প্রদত্ত ধারণা বাস্তবতার অধিকতর কাছিাকাছি হয়ে থাকে , কিন্তু তা হুবহু অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর অনুভূতির ন্যায় হয় না। আর পরীক্ষাগারে হাতে-কলমে পরীক্ষার মাধ্যমে যে জ্ঞান দেয়া হয় মূলতঃ তা আর উদ্ধৃত জ্ঞান থাকে না , বরং জ্ঞান গ্রহণকারীর জন্যও পরীক্ষালব্ধ জ্ঞানে পরিণত হয় , যদিও অন্য একজন তাকে সাহায্য করেছে বা ইতিপূর্বে সে অন্যের কাছ থেকে যে উদ্ধৃত জ্ঞান পেয়েছে তা থেকে এ ব্যাপারে সাহায্য নিয়েছে।

ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান স্থানান্তরের ক্ষেত্রে দু টি শর্ত বিদ্যমান থাকা অপরিহার্য। প্রথমতঃ গ্রহীতার সংশ্লিষ্ট ইন্দ্রিয় অর্থাৎ তার যে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অন্যের ইন্দ্রিয় দ্বারা সংগৃহীত তথ্যাদি তার মধ্যে স্থানান্তরিত করা হবে সে ইন্দ্রিয়টি অক্ষত ও অবিকৃত থাকতে হবে। দ্বিতীয়তঃ গ্রহীতার মধ্যে সংশ্লিষ্ট বর্ণনার বিষয়বস্তুর অনুরূপ বিষয়বস্তু বা তার কাছাকাছি বিষয় সম্পর্কে পূর্বাহ্নিক ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞান থাকতে হবে। কেবল তাহলেই গ্রহীতার পক্ষে স্বীয় অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে অন্যের অভিজ্ঞতাভুক্ত বিষয় সম্পর্কে কোনো না কোনো পর্যায়ের ধারণা লাভ করা সম্ভব , অন্যথায় নয়। যেমন: চক্ষুষ্মান ব্যক্তিকে বর্ণনার দ্বারা একটি দৃশ্য সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা দেয়া সম্ভব। ধরুন , যে ব্যক্তি তাজমহল দেখে নি তাকে বর্ণনার দ্বারা তাজমহল সম্পর্কে তাজমহল-দর্শকের অনুরূপ ধারণা দেয়া সম্ভব নয় , তবে মোটামুটি ধারণা দেয়া সম্ভব । অবশ্য বর্ণনার সাথে সাথে ছবি দেখানো হলে দর্শক-শ্রোতার এতদসংক্রান্ত জ্ঞান উন্নততর ও অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর অধিকতর কাছাকাছি হবে। আর রঙিন ছবি ও ভিডিও-চিত্রের সাহায্যে পর্যায়ক্রমে অধিকতর উন্নত স্তরের ধারণা দেয়া ও তার এ সংক্রান্ত জ্ঞানকে অভিজ্ঞতা অর্জনকারীর জ্ঞানস্তরের আরো কাছাকাছি নিয়ে আসা সম্ভব হবে। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও তার জ্ঞান হুবহু তাজমহল-পরিদর্শনকারীর এতদসংক্রান্ত জ্ঞানের অনুরূপ হবে না। কিন্তু যে ব্যক্তির চোখ নেই তাকে , বিশেষতঃ জন্মান্ধকে তাজমহলের সৌন্দর্য সম্বন্ধে কোনো ধারণাই দেয়া সম্ভব হবে না।

অন্যান্য ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও এটা সত্য।

অবশ্য বর্ণিত সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে তৈরী পটভূমিকার কারণে ব্যক্তি বর্ণনাকারীর অনুরূপ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য উদ্যোগী হতে পারে। যেমন: সে তাজমহলের সৌন্দর্য দেখতে যেতে পারে , সমুদ্রের শো-শো শব্দ শোনার জন্য সমুদ্রে যেতে পারে , যে নতুন ফলের প্রশংসা সে শুনেছে তা সংগ্রহ করে খেয়ে দেখতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার এতদসংক্রান্ত জ্ঞান আর বর্ণনাসূত্রে লব্ধ জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না , বরং ইন্দ্রিয়লব্ধ বা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানে পরিণত হলো।

অন্ধভাবে গ্রহণীয় জ্ঞান

জ্ঞানকে অন্য এক বিবেচনায় দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: বিচারবুদ্ধি দ্বারা আয়ত্তযোগ্য জ্ঞান (علم تعقلی ) ও অন্ধভাবে গ্রহণীয় জ্ঞান (علم تعبدی ) । সহজাত জ্ঞান , ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান , অভিজ্ঞতালব্ধ বা পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান এবং অনেক উদ্ধৃত জ্ঞানই প্রথমোক্ত ধরনের জ্ঞানের মধ্যে শামিল। আর দ্বিতীয়োক্ত ধরনের জ্ঞান যদিও পুরোপুরিভাবে বিচারবুদ্ধির ধারণক্ষমতার বহির্ভূত নয় , তবে তা সর্বজনীন নয়। তাই এ জ্ঞান যার আছে তাঁর কাছ থেকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। উদাহরণস্বরূপ , লাওহে মাহফূযের কথা ধরা যাক। এ ক্ষেত্রে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত কোরআন মজীদের তথ্য মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ , সংশ্লিষ্ট তথ্যের সত্যাসত্য যাচাই করা বিচারবুদ্ধির আওতাবহির্ভূত ব্যাপার।

এ পরিভাষা দু টি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কিছুটা পরিবর্তিত অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তা হচ্ছে , যে তথ্য কেবল বিশেষজ্ঞদের পক্ষেই জানা সম্ভব তা তাঁদের জন্য বিচারবুদ্ধির আয়ত্তাধীন জ্ঞান (علم تعقلی ) এবং সাধারণ মানুষদের জন্য অন্ধভাবে গ্রহণীয় জ্ঞান (علم تعبدی ) । কারণ , এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞের কথা মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। তবে এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের কথা চোখ বুঁজে মেনে নেয়ার আগে স্বীয় বিচারবুদ্ধির দ্বারা বিশেষজ্ঞকে অর্থাৎ প্রকৃতই তিনি বিশেষজ্ঞ , নাকি বিশেষজ্ঞ হবার মিথ্যা দাবীদার তা পরীক্ষা করে দেখে নিশ্চিত হতে হবে এবং বিশেষজ্ঞ মিথ্যা বলবেন না সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে হবে বা প্রত্যয়ে উপনীত হতে হবে। যেমন: আমরা যখন অসুস্থ হই তখন চিকিৎসকের কাছে যাই , তবে বিচারবুদ্ধি নির্দেশিত বিভিন্ন পন্থায় , যেমন: চিকিৎসাক্ষেত্রে খ্যাতি , সার্টিফিকেট , সরকারী নিবন্ধন ইত্যাদির ভিত্তিতে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত হই যে , ঐ ব্যক্তি চিকিৎসক হবার মিথ্যা দাবী করছেন না ; এ কারণেই নিশ্চিন্ত মনে তাঁর কাছে যাই।

অন্যদিকে সর্বজনীন বিচারবুদ্ধির ধারণযোগ্য বিষয়ে অন্যের কথা মেনে নেয়া এবং বিশেষজ্ঞ হবার দাবীদার ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা সম্বন্ধে বিচারবুদ্ধির দ্বারা বিচার বা অনুসন্ধান পূর্বক নিশ্চিত না হয়েই তার কথা মেনে নেয়া বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে নিন্দনীয় কাজ। এরূপ ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষজ্ঞত্বের দাবীদার ব্যক্তির কাছ থেকে যে ধারণা লাভ করে তাকে নেতিবাচক ও নিন্দনীয় অর্থেتعبد বা অন্ধ বিশ্বাস বলা হয়। বস্তুতঃ এ ধরনের অন্ধ বিশ্বাস জ্ঞানের পর্যায়ে পড়ে না।

কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে জ্ঞানমাধ্যম

সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য বিচারবুদ্ধির পর্যালোচনায় যে জ্ঞানমাধ্যমগুলোর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে তা হচ্ছে: সহজাত প্রবণতা , বিচারবুদ্ধি , ইন্দ্রিয়নিচয় ও অন্তঃকরণ বা হৃদয় (قلب ) । এ মাধ্যমগুলো এমন যে , এগুলোকে আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সকলেই জ্ঞানমাধ্যমরূপে স্বীকার করতে বাধ্য , অবশ্য কেউ গোঁয়ার্তুমি করে বা অন্ধভাবে এর মধ্য থেকে কোনোটিকে অস্বীকার করতে চাইলে সে কথা স্বতন্ত্র এবং তা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। আমরা কোরআন মজীদেও জ্ঞানমাধ্যম হিসেবে এগুলোর উল্লেখ দেখতে পাই।


4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14