আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড)

আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড)21%

আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড) লেখক:
: মুহাম্মদ মাঈন উদ্দিন
প্রকাশক: আহলে বাইত (আ.) বিশ্ব সংস্থা,কোম,ইরান
বিভাগ: আল্লাহর একত্ববাদ

  • শুরু
  • পূর্বের
  • 37 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 16211 / ডাউনলোড: 4943
সাইজ সাইজ সাইজ
আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড)

আকায়েদ শিক্ষা ( প্রথম খণ্ড)

লেখক:
প্রকাশক: আহলে বাইত (আ.) বিশ্ব সংস্থা,কোম,ইরান
বাংলা

1

১৭তম পাঠ

তাওহীদের অর্থ কী ?

ভূমিকা :

তাওহীদ (توحید ) শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল অদ্বিতীয় বলে স্বীকার করা’বা একত্ববাদ। দর্শন,কালাম,আখ্লাক ও ইরফান বিশেষজ্ঞগণের ভাষায় তাওহীদ”শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে এ অর্থগুলোতে খোদার একত্ববাদকে বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আবার কখনো কখনো তাওহীদের প্রকারভেদ’অথবা তাওহীদের স্তরসমূহ শিরোনামে স্মরণ করা হয়ে থাকে। তবে এগুলোর সবকটি সম্পর্কে আলোচনা করা এ প্রবন্ধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অতএব এখানে আমরা অপেক্ষাকৃত প্রসিদ্ধতর ও সাযুজ্যতর পরিভাষাগুলোর আলোচনা করে ইতুষ্ট থাকব।

১। বহুত্বের অস্বীকৃতি :

তাওহীদের সর্বপথম প্রসিদ্ধ পরিভাষাটি হল,খোদার একত্বে বিশ্বাস ও বহুত্বের অস্বীকৃতি। তাওহীদ”প্রকাশ্য অংশীবাদের বিরুদ্ধে বা বিপরীতে অবস্থান নিয়ে থাকে। দুই বা ততোধিক স্বাধীন খোদার প্রতি বিশ্বাস এরূপে যে,তাদের একের প্রতি অপরের কোন নির্ভরশীলতা নেই এ অংশীবাদী বিশ্বাসকেও তাওহীদ অস্বীকার করে।

২। যৌগিকতার অস্বীকৃতি :

তাওহীদের দ্বিতীয় পরিভাষাটি হল একত্বের বিশ্বাসার্থে সত্তার অবিভাজ্যতা বা প্রভুসত্তা,কার্যকরী ও সামর্থ্যগতভাবে অংশের সমষ্টি না হওয়া।

এ অর্থকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে না-বোধক গুণ বা সিফাতুসসালবিয়াহ্ (যৌগিকতার অস্বীকৃতি) রূপে বর্ণনা করা হয়ে থাকে (যেমনটি দশম পাঠে আলোচনা করা হয়েছে)। কারণ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি যৌগের ধারণা সম্পর্কে এবং প্রাসংগিকভাবে তার অস্বীকৃতির সাথে,অবিভাজ্যতার তাৎপর্য অপেক্ষা অধিকতর পরিচিত ।

৩। প্রভুসত্তার সাথে অতিরিক্ত গুণাবলী সংযোজনের অস্বীকৃতি :

তাওহীদের তৃতীয় পরিভাষাটি প্রভুসত্তার সাথে তাঁর গুণসমূহের একাত্বতা এবং সত্তার সাথে অতিরিক্ত বা অর্জিত গুণাবলী সংযোজনের অস্বীকৃতি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে-যাকে গুণগত একত্ব বলা হয়। তবে রেওয়ায়েতের ভাষায় একে গুণাবলীর পরিবর্জন’নামে উল্লেখ করা হয়েছে। তাওহীদের এ পরিভাষাটি,যারা (যেমন : আশায়েরী সম্প্রদায়) খোদার গুণাবলীকে তাঁর সত্তাবহির্ভূত অতিরিক্ত বিষয় বলে মনে করেন এবং যারা অষ্টপ্রাচীনত্বের’প্রবক্তা,তাদের বিপরীতে অবস্থান নেয় ।

গুণগত একত্ববাদের স্বপক্ষে যুক্তি হল : যদি আল্লাহর প্রতিটি গুণই স্বতন্ত্র দৃষ্টান্তের (مصداق ) অধিকারী হয়,তবে তা নিম্নলিখিত কয়েকটি অবস্থার ব্যতিক্রম নয় :

হয় ঐ গুণগুলোর দৃষ্টান্ত প্রভুসত্তার অন্তর্ভুক্ত বলে পরিগণিত হবে,যার অপরিহার্য অর্থ হবে,প্রভুসত্তা হল এশাধিক অংশের সমষ্টি এবং ইতিপূর্বে আমরা প্রমাণ করেছি যে,এ ধরণের কোন কিছু অসম্ভব অথবা ঐ গুণগুলোর দৃষ্টান্ত সত্তাবহির্ভূত বলে বিবেচিত হয় এবং এ অবস্থায়,হয় অনিবার্যঅস্তিত্ব’ও সৃষ্টিকর্তার উপর অনির্ভরশীল’বলে পরিগণিত হবে অথবা সম্ভাব্য অস্তিত্ব’ও সৃষ্টিকর্তার উপর নির্ভরশীল’বলে পরিগণিত হবে।

কিন্ত গুণগুলোর অনিবার্য অস্তিত্ব হওয়ার অর্থ হবে,সত্তার একাধিকত্ব ও সুস্পষ্ট অংশীবাদ এবং কোন মুসলমানই এর দায়িত্ব গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। অপরদিকে গুণগুলোর সম্ভাব্য অস্তিত্ব হওয়ার অপরিহার্য অর্থ হল প্রভুসত্তা’ঐ গুণগুলোর ঘাটতিতে থাকার ফলে ঐগুলোকে সৃষ্টি করতঃ সংশ্লিষ্ট গুণসমূহে গুণান্বিত হয়েছেন । যেমন : যদিও মহান আল্লাহ জীবনহীন তথাপি জীবন নামক এক অস্তিত্বকে সৃষ্টি করেন এবং তার মাধ্যমেই জীবন লাভ করেন। অনুরূপ জ্ঞান,ক্ষামতা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও একই ধারণা রূপ পরিগ্রহ করে । অথচ অস্তিত্বদাতা কারণ’ সত্তাগতভাবে সৃষ্ট বিষয়ের পূর্ণতাসমূহের ঘাটতিতে থাকবে,এটা অসম্ভব।

সর্বাপেক্ষা লজ্জাজনক ব্যাপার হল এটা যে,স্বীয় সৃষ্ট বিষয়সমূহের ছায়ায় জীবন,জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকারী হওয়া এবং অন্যান্য উৎকর্ষ গুণে গুণান্বিত হওয়া।

উপরোক্ত ধারণাগুলোর বর্জনের মাধ্যমে সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে,প্রভুর গুণসমূহ প্রভুসত্তা ভিন্ন,পরস্পর স্বতন্ত্র অন্য কোন দৃষ্টান্তের (مصداق ) অধিকারী নয়। বরং তাদের সকলেই এমন এক ভাবার্থ যে,(শুধুমাত্র) বুদ্ধিবৃত্তিই,প্রভুর একক,অবিভাজ্য,পবিত্র সত্তা থেকে পৃথক রূপে উপস্থাপন করে থাকে (কিন্তু বাস্তব জগতে তাদেরকে আলাদা করে ভাবা অসম্ভব)।

৪। ক্রিয়াগত একত্ববাদ :

তাওহীদের চতুর্থ পরিভাষাটি,দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রবিদগণের নিকট ক্রিয়াগত একত্ববাদ বলে পরিচিত। আর এর অর্থ হল : মহান আল্লাহ স্বীয় কর্ম সম্পাদনের জন্যে কারো উপর ও কোনকিছুর উপরই নির্ভরশীল নন এবং তিনি কোন ভাবেই কোন অস্তিত্বের সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন।

এ বিষয়টি অস্তিত্বদাতা কারণের’বিশেষত্বের আলোকে প্রমাণ করা যায়,যা সকল কার্যের (معلول )প্রতিষ্ঠাতা। কেননা এ ধরনের কারণের (অস্তিত্বদাতা কারণ) কার্যগুলো সমস্ত অস্তিত্বের জন্যে উক্ত কারণের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ দর্শনের ভাষায়,এ কার্যগুলো খোদার সাথে প্রত্যক্ষভাবে সস্পর্কযুক্ত’এবং ঐ গুলোর কোন প্রকার স্বনির্ভরতা নেই ।

অন্যকথায় : যে কেউ যা কিছুরই অধিকারী হোক না কেন,তা তাঁরই নিকট থেকে এবং তাঁরই ক্ষমতার অধীন। তাঁরই রাজত্বের পরিমণ্ডলে,তাঁরই সুনির্ধারিত ও প্রকৃত মালিকানাধীন। অন্য সবার ক্ষমতা ও মালিকানা তাঁর ক্ষমতা ও মালিকানার উলম্বে ও নিম্নস্তরে অবস্থান করে এবং তারা খোদার ক্ষমতার পথে কোন প্রকার ক্লেশ সৃষ্টি করে না। যেমন : বান্দা উপার্জিত সস্পদের উপর যে বৈধ মালিকানা লাভ করে তা প্রভুর বৈধ মালিকানার উলম্বে অবস্থান করে।

العبد و ما فی یده کان لمولاه

বান্দা ও যা কিছু তার নিকট আছে,সকলই প্রভুর জন্যে’।

অতএব মহান আল্লাহ এমন কারো সাহায্যের মুখাপেক্ষী হবেন,যারা তাদের সমগ্র অস্তিত্বের জন্যে তাঁর উপর নির্ভর করে,তা কীরূপে সম্ভব ?

৫। স্বাধীন প্রভাব :

তাওহীদের পঞ্চম পরিভাষাটি হল স্বাধীন প্রভাব’১৭ অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্ট বিষয়াদি স্বীয় কর্মের ক্ষেত্রেও আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল। সৃষ্ট বিষয়াদির পরস্পরের মধ্যে যে প্রভাব ও কর্মতৎপরতা বিদ্যমান,তা আল্লাহরই অনুমতিক্রমে,আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি ও ক্ষমতায় সস্পন্ন হয়। প্রকৃতপক্ষে একমাত্র যিনি অনির্ভরশীল ও স্বাধীনভাবে সর্বত্র ও সর্বাবস্থায় এবং সকল কিছুর উপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম,তিনি হলেন পবিত্র সত্তার অধিকারী মহান আল্লাহ। সকল কর্মতৎপরতা ও প্রভাব তাঁর কর্মতৎপরতা ও প্রভাবের উলমে^ অবস্থান করে এবং তাঁরই প্রভাবের প্রতিফলনে স্বীয় কর্মসম্পাদন করে।

আর এর ভিত্তিতেই পবিত্র কোরান প্রাকৃতিক নির্বাহকসমূহ এবং অপ্রাকৃতিক নির্বাহকসমূহের (যেমন : ফেরেস্তা,জ্বীন ও মানুষ) সকল র্কীতিকে খোদার প্রতি আরোপ করে থাকে । যেমন : বৃষ্টিবর্ষণ,বৃক্ষের উদ্গমন ও ফলদান ইত্যাদি খোদায়ী কীর্তি বলে আখ্যায়িত হয়। এ জন্যে সুপারিশ করা হয় যে,মানুষ যেন এ খোদায়ী কীর্তিকে খোদার উলমে^ নিকটবর্তী যে নির্বাহকসমূহ বিদ্যমান সেগুলোতে উপলব্ধি ও স্বীকার করে এবং সর্বদা এ সম্পর্কে চিন্তা করে।

অনুধাবনের জন্যে দৈনন্দিন জীবন থেকে একটি উদাহরণ উল্লেখ করব : যদি কোন কার্যালয়ের প্রধান কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে কোন কর্ম সম্পাদনের জন্যে আদেশ প্রদান করে,তবে কর্মটি আদিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারী কর্তৃক সম্পাদিত হলেও উচ্চ পর্যায়ে এর দায়-দায়িত্ব ঐ কার্যালয়ের প্রধানের উপরই বর্তায়। এমনকি জ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এটাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

সুনির্ধারিত কর্তৃত্বের (فاعلیت التکوینی ) ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রম বিদ্যমান। সকল নির্বাহকের অস্তিত্বই মহান আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ,এ দৃষ্টিকোণ থেকে তা মস্তিষ্কগত কল্পিত বিষয়ের মতই,যা কল্পনাকারীর উপর নির্ভরশীল।

و لله المثل الاعلی

ফলে যে কোন কর্ম,যে কোন কর্তার মাধ্যমেই সস্পন্ন হোক না কেন,উচ্চতর পর্যায়ে তা মহান আল্লাহর অনুমতিক্রমে,তাঁরই সুনির্ধারিত ইচ্ছায় (الارادة التکوینیة ) সম্পাদিত হয়েছে বলে বিবেচিত হবে।

و لا حول و لا قوت الا بالله العلی العظیم

দু টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত :

ক্রিয়াগত একত্ববাদের মোদ্দাকথা হল, মানুষ মহান আল্লাহ ব্যতীত কাউকে এবং কোন কিছুকেই উপাসনার জন্যে যোগ্য বলে মনে করবে না’। কারণ ইতিপূর্বে যেমনটি আমরা ইঙ্গিত করেছিলাম যে,বান্দার নিকট তার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা ব্যতীত কেউই উপাসনার যোগ্য হতে পারেনা। অন্যকথায় : প্রভুত্ব হল সৃজন ও পালন কতৃত্বের অবিয়োজ্য ভাষ্য ।

অপরদিকে তাওহীদের শেষোক্ত অর্থটি (স্বাধীন প্রভাব) থেকে প্রাপ্ত উপসংহারটি হল : মহান আল্লাহর উপর মানুষের পূর্ণ আস্থা থাকা,সকল কর্মের জন্যেই তাঁর উপর নির্ভর করা ও একমাত্র তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা,একমাত্র তাঁরই নিকট আশা করা এবং তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় না করা;এমন কি প্রত্যাশা ও চাহিদাসমূহ পূরণের স্বাভাবিক ক্ষেত্রসমূহ প্রস্তুত না থাকলেও নিরাশ না হওয়া। কারণ মহান আল্লাহ স্বাভাবিক পথ ভিন্ন অন্য কোন পথেও তাঁর বান্দার চাহিদা ও প্রয়োজন মিটাতে সক্ষম।

আর (উপরোক্ত অর্থদ্বয়ের অনুসারী) এমন কোন মানুষই প্রভুর বিশেষ অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত এবং অভূতপূর্ব মানসিক ও আত্মিক তুষ্টিতে পরিপূর্ণ জীবনের অধিকারী হয়ে থাকেন।

) أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ(

জেনে রাখ ! আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সূরা ইউনুস -৬২)

উপরোক্ত সিদ্ধান্তদ্বয় নিম্নলিখিত আয়াতশরীফে সন্নিহিত রয়েছে -যে আয়াতটি প্রত্যেক মুসলমান প্রত্যহ কমপক্ষে দশবার আবৃতি করে থাকে।

) إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ(

( প্রভু হে! ) আমরা আপনারই উপাসনা করি এবং আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।(সূরা ফাতিহা- ৫ )

একটি ভুল ধারণার অপনোদন :

এখানে সম্ভবতঃ একটি ভুল ধারণার অবকাশ থাকতে পারে। যথা : যদি পরিপূর্ণ তাওহীদের দাবি এটা হয়ে থাকে যে,মানুষ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে না। তবে আল্লাহর মনোনীত বান্দা ও ওলীগণেরتوسل করা বা শরণাপন্ন হওয়াও সঠিক হতে পারে না।

প্রতিউত্তরে বলতে হয় : আল্লাহর ওলীগণের শরণাপন্ন হওয়া যদি এ অর্থে হয় যে,তারা স্বাধীনভাবে ও আল্লাহর অনুমোদন ব্যতীতই শরণার্থীর কোন কর্ম সম্পাদন করবেন,তবে এ ধরনের তাওয়াসসুল তাওহীদের সাযুজ্য হতে পারে না। কিন্তু যদি এ অর্থে হয় যে,মহান আল্লাহ ওলীগণকে স্বীয় অনুগহের নিকটবর্তী হওয়ার জন্য মাধ্যম হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন এবং মানুষকেও তাদের শরণাপন্ন হওয়ার জন্যে আদেশ দিয়েছেন,তবে এ ধরনের তাওয়াসসুল একত্ববাদের সাথে কোন বিরোধ তো সৃষ্টি করেই না,বরং উপাসনা ও আজ্ঞাবহতার ক্ষেত্রে একত্ববাদের মর্যাদায় পরিগণিত হবে। কারণ তাঁরই (আল্লাহর) আদেশে সস্পন্ন হয়ে থাকে।

কিন্তু কেন মহান আল্লাহ এ ধরনের মাধ্যমসমূহকে স্থান দিয়েছেন এবং কেনই বা মানব সম্প্রদায়কে তাঁদের শরণাপন্ন হতে বলেছেন ? এর উত্তরে বলা যায় যে,এ ঐশ্বরিক বিষয়টির পশ্চাতে একাধিক উদ্দেশ্য লুক্বায়িত। এগুলোর মধ্যে নিম্নলিখিত কয়েকটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে : আল্লাহর উপযুক্ত বান্দাগণের উচ্চ মর্যাদার পরিচয় প্রদান,উপাসনা ও আনুগত্যের পথে অন্যদেরকে উৎসাহ প্রদান -যা তাঁদের এ সম্মানিত স্থানে পৌঁছার কারণ মানুষকে তাদের ইবাদত ও আনুগত্যের জন্যে অহংকার করা থেকে বিরত রাখা এবং যারা নিজেদেরকে সর্বোচ্চ আসনের অধিকারী ও পূর্ণতম মানব হিসেবে মনে করেন তাদেরকে সে ভ্রান্তি থেকে মুক্তি প্রদান। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে,সর্বশেষে বর্ণিত ব্যাপারটি যারা আহলে বাইতগণের (আঃ) বিলায়াতকে অস্বীকার করে এবং যারা তাঁদের শরণাপন্ন হওয়া থেকে বঞ্চিত,তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে ।

১৮তম পাঠ

জাবর ও এখতিয়ার

ভূমিকা :

যেমনটি পূর্ববর্তী পাঠসমূহে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, স্বাধীন কীর্তিতে তাওহীদ’হল একটি অমূল্য শিক্ষা,যা মানুষের আত্মপরিশুদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর এ জন্যেই পবিত্র কোরানে এ বিষয়টির উপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে তার সঠিক ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন : সকল বিষয়কে প্রভুর অনুমোদন,ইচ্ছা,ক্বাজা ও ক্বাদারের সাথে সস্পর্কিত বলে বিশ্বাস করা ।

তবে এ বিষয়টির সঠিক অনুধাবনের জন্যে একদিকে যেমন : বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাগত বিকাশের প্রয়োজন,অপরদিকে তেমনি সঠিক ব্যাখ্যা ও শিক্ষার প্রয়োজন। যারা যথেষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ঘাটতিতে আছেন অথবা কোরানের প্রকৃত ব্যাখ্যাকারী ও পবিত্র পথপ্রদর্শকগণের শিক্ষা-দীক্ষা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেছেন,তারা নিজেদেরকে বিচ্যুতি ও ভ্রান্তির পথে ঠেলে দিয়েছেন। তারা এ বিষয়টিকে,যে কোন প্রকারের প্রভাব ও কারণত্ব একান্তই মহান আল্লাহ থেকে -এ অর্থে ব্যবহার করেছেন এবং কোরানের সুস্পষ্ট আয়াতের ব্যতিক্রমে যে কোন প্রকার প্রভাব ও কারণত্বকে মাধ্যম ও(উলম্বিক) কারণসমূহ থেকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে আল্লাহর প্রকৃতি এরূপ যে,তিনি আগুনের উপস্থিতিতে তাপ সৃষ্টি করেন অথবা আহার গ্রহণ ও পানি পানের সময় ক্ষুধা নিবারণ ও তৃপ্তিকে অস্তিত্বে আনেন,নতুবা তাপ,ক্ষুধা নিবারণ ও তৃপ্তির জন্যে আগুন,আহার ও পানির কোন ভূমিকা নেই।

এ চিন্তাগত বিচ্যুতির কুফলগুলোকে আমরা মানুষের স্বাধীন কর্মকাণ্ড ও তার দায়িত্ব সস্পর্কিত বিষয়ের আলোচনায় স্থান দিব। অর্থাৎ এ ধরনের চিন্তার ফল হল : মানুষের কর্মকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব প্রত্যক্ষভাবে মহান আল্লাহর উপর বর্তায় এবং ঐ সকল কর্মকান্ডের ব্যাপারে মানুষের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকৃত হয়। ফলে কেউই তার কর্মের জন্যে দায়ী হবে না।

অন্যকথায়: এ ধরনের বক্রচিন্তার একটি ধ্বংসাত্বক প্রভাব হল,জাবরিয়াত ও মানুষের কর্তব্যপরায়ণতার অস্বীকৃতি তথা মানুষের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্বের অস্বীকৃতি,নিস্ফলতা এবং মানসিক,চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক পরিচর্যা তথা ইসলামী বিধি-ব্যবস্থার অন্ত:সারশূন্যতা। কারণ যেখানে মানুষ তার কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে স্বাধীন নির্বাচনের অধিকার রাখে না,সেখানে দায়িত্ব,কর্তব্য,আদেশ-নিষেধ এবং পুরস্কার-তিরস্কারের কোন প্রশ্নই আসে না। বরং সুনির্ধারিত বিন্যাস ব্যবস্থার নিরর্থকতা ও অসারতা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কারণ পবিত্র আয়াত,১৮ রেওয়ায়াত ও বৃদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির মাধ্যমে যাপাওয়া যায়,তার ভিত্তিতে বলা যায়,এ বিশ্বপ্রকৃতিকে সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল,মানব সৃষ্টির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা,যাতে মনুষ্য সম্প্রদায় স্বীয় নির্বাচন ক্ষমতার মাধ্যমে সুকর্ম সম্পাদন,উপাসনা ও আনুগত্যের মাধ্যমে উৎকর্ষের সর্বোচ্চ স্তরে আরোহণ করতঃ মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভে সক্ষম হয় এবং মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভের জন্যে উপযুক্ত হয়। যদি মানুষের স্বীয় কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে নির্বাচনাধিকার না থাকে এবং কোন দায়িত্বও না থাকে তবে পুরস্কার,অনন্ত অনুগহ ও প্রভুর সন্তুষ্টির জন্যে তার কোন উপযুক্ততাও থাকবে না। ফলে সৃষ্টির উদ্দেশ্যও ব্যাহত হবে। এবং সৃষ্টি জগৎ নিশীথের নাট্যশালায় পর্যবশিত হবে,যেন মানুষ আপন হাতে মূর্তি গড়ল ও অন্যের ইচ্ছাধীন তাদের মধ্যে গতির সঞ্চার হল,অতঃপর কেউ কেউ পুরস্কৃত ও প্রশংসিত হল,কেউবা আবার তিরস্কৃত ও শাস্তি প্রাপ্ত হল !

এ ভয়ংকর অপচিন্তার প্রচার ও প্রসারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অভিলাষ। কারণ এর মাধ্যমে তারা তাদের আপন কুকর্মের ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হয়েছে এবং নিরীহ ও অসচেতন জনগোষ্ঠীকে নিজেদের দুঃশাসন ও নেতৃত্বের আজ্ঞাবহ হতে বাধ্য করতে পেরেছে;একইসাথে সক্ষম হয়েছে যে কোন প্রকার প্রতিবাদ,প্রতিরোধ ও আন্দোলন থেকে জনগণকে দূরে রাখতে। সত্যিকার অর্থে জাতিসমূহের অজ্ঞতা ও অসচেতনতার জন্যে জাবরিয়াতকেই গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে গণনা করা উচিৎ।

অপরদিকে যারা কিছুটা হলেও এ বক্রচিন্তার দুর্বলতাগুলোকে অনুধাবন করতে পেরেছেন,কিন্ত না তারা পরিপূর্ণ তাওহীদ ও জাবরের অস্বীকৃতির মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হয়েছেন,না তারা পবিত্রও নিস্পাপ আহলে বাইতগণের (আঃ) জ্ঞানভাণ্ডার থেকে লাভবান হতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে তারা সমর্পণবাদে (تفویض ) বিশ্বাস স্থাপন করেছেন এবং মানুষের নির্বাচনাধীন কর্মকাণ্ডকে মহান আল্লাহর প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত বলে মনে করেছেন । প্রকৃতপক্ষে তারাও অন্য এক প্রকার বিচ্যুতি ও বক্রচিন্তার জালে আটকা পড়েছেন এবং ইসলামের মহামহিম শিক্ষা-দীক্ষা ও তার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

কিন্তু যারা এর স্বরূপ অনুধাবনে সক্ষম হয়েছেন এবং একই সাথে কোরানের প্রকৃত ব্যাখ্যাকারী ও শিক্ষকগণকে শনাক্ত করতে পেরেছেন,তারা এ বক্রচিন্তা থেকে পবিত্র থেকেছেন। তারা একদিকে যেমন স্বীয় নির্বাচনাধীন কর্মকাণ্ডকে প্রভু প্রদত্ত ক্ষমতার আলোকে সস্পন্ন হয় বলে মনে করেছেন ও এতদসংশ্লিষ্ট সকল দায়-দায়িত্বকে গ্রহণ করেছেন,অপরদিকে তেমনি প্রভুর মহিমান্বিত স্বাধীন কীর্তিসমূহকে উচ্চ পর্যায়ে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। যার ফলশ্রুতিতে এ অমূল্য পরিচিতির স্বরূপকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

মহানবী হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর পবিত্র আহলে বাইতগণের (আঃ) নিকট থেকে যে রেওয়ায়েত আমাদের কাছে পৌঁছেছে,তাতে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনার সন্ধান মিলে,যেগুলো ক্ষমতা (استطاعت ),জাবরের অস্বীকৃতি (نفی الجبر ),সমর্পণবাদ (تفویض ) ইত্যাদি শিরোনামে এবং অনুমতি (اذن ),ইচ্ছা (مشیت و اراده ),আল্লাহর ক্বাজা ও ক্বাদর ইত্যাদির অন্তর্ভূক্ত হয়ে হাদীস শরীফে সংরক্ষিত আছে। অনুরূপ এমনও হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে,অক্ষম ব্যক্তিরা যেন এ সূক্ষ্ম বিষয়টি নিয়ে মাথা না ঘামায়। কারণ এতে তারা বিচ্যুত ও পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে।

যাহোক জাবর ও এখ্তিয়ারের আলোচনার বিভিন্ন দিক রয়েছে,যার সবগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। তবে বিষয়বস্তুর গুরুত্বের উপর ভিত্তি করে সেগুলির কোন কোন দিকের উপর সরল ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করব। অনুরূপ যারা এ বিষয়ের উপর অধিকতর গবেষণায় আগ্রহী,তাদেরকে পরামর্শ দিব যাতে বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক ভিত্তির উপর জ্ঞানার্জনের জন্যে যথেষ্ট ধৈর্য ও স্থৈর্য অর্জন করেন।

এখতিয়ারের ব্যাখ্যা :

সিদ্ধান্ত নেয়ার ও নির্বাচনের ক্ষমতা মানুষের পরিচিতির ক্ষেত্রে একটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয় বলে পরিগণিত। কারণ প্রত্যেকেই নির্ভুল প্রত্যক্ষ জ্ঞানের মাধ্যমে স্বীয় অভ্যন্তরে একে খুজে পায়;যেমনিকরে অন্যান্য মানসিক অবস্থা সম্পর্কে এ জ্ঞানের মাধ্যমে অবগত হয়। এমনকি যখন কোন ব্যাপারে কেউ সন্দেহ করে তখন ঐ সন্দেহের উপস্থিতিকেও প্রত্যক্ষ জ্ঞানের মাধ্যমে অনুধাবন করে থাকে এবং এ ব্যাপারে কোন প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে নিজের মধ্যে স্থান দিতে পারে না ।

অনুরূপ যে কেউ স্বীয় অভ্যন্তরে কিঞ্চিৎ মনোযোগ দিলেই অনুধাবন করতে পারে যে,কোন কথা বলবে ? না,বলবে না ? হাত নাড়বে ? না,নাড়বে না? আহার গ্রহণ করবে? না,করবে না? ইত্যাদি।

কোন কাজের সিদ্ধান্ত কখনো কখনো প্রবৃত্তিগত পাশবিক চাহিদার উপর ভিত্তি করে নেয়া হয়। যেমন : ক্ষুধার্থ আহার গ্রহণের ইচ্ছা করে,তৃষ্ণার্ত পানি পানের ইচ্ছা করে ইত্যাদি। আবার কখনো কখনো বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাকে তুষ্ট করার জন্যে এবং সুউচ্চ মানবিক মূল্যবোধকে বাস্তবায়নের জন্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যেমন : কোন অসুস্থ স্বীয় রোগ নিরাময়ের জন্যে তিক্ত ঔষধ সেবন করে এবং লোভনীয় খাদ্যের স্বাদ গ্রহণ থেকে নিজেকে বিরত রাখে অথবা কোন বিদ্যা অর্জনকারী জ্ঞানার্জন ও সত্য উদঘাটনের পথে স্বীয় বস্তুগত কামনা থেকে নিজেকে দূরে রাখে এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের মাঝে নিজেকে মুহ্যমান রাখে অথবা আত্মোৎসর্গকারী সৈনিক মর্যাদাপূর্ণ মূল্যবোধে পৌঁছার জন্যে এমনকি আপন প্রিয় জীবনকে পর্যন্ত উৎসর্গ করে।

প্রকৃতপক্ষে মানবিক মূল্যবোধের প্রকাশ তখনই ঘটে যখন বিভিন্ন প্রকারের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং ব্যক্তি চারিত্রিক প্রকৃষ্টতা,আত্মিক উৎকর্ষ,আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে স্বীয় কুপ্রবৃত্তি ও পাশবিক কামনা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। যতোধিক কোন মানুষ স্বাধীনভাবে ও সচেতনভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে কোন কর্ম সম্পাদন করবে,আত্মিক ও মানবিক উৎকর্ষ বা পশ্চাৎপদতার ক্ষেত্রে ততোধিক প্রভাব থাকবে এবং পরকালীন পুরস্কার বা শাস্তির জন্যে উপযুক্ততর হবে।

তবে পাশবিক ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা সকল মানুষের মধ্যে সব বিষয়ে এক রকম নয়। কিন্তু প্রত্যেক মানুষই কম-বেশী এ আল্লাহ প্রদত্ত বৈভব (স্বাধীন নির্বাচনাধিকার) থেকে লাভবান হতে পারে এবং (প্রতিরোধের জন্যে) যতবেশী অনুশীলন করবে প্রতিরোধ ক্ষমতা ততবেশী দৃঢ়তর হবে ।

অতএব স্বাধীন নির্বাচন ক্ষমতার অস্তিত্ব সম্পর্কে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কোন সুযোগ নেই এবং এ বিবেকপ্রসূত ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয়টি সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার সন্দেহ,দ্বিধার মাধ্যমে মস্তিষ্ককে সন্ধিগ্ধ করে ফেলা অনুচিৎ। যেমনটি আমরা ইঙ্গিত করেছিলাম যে,স্বাধীন নির্বাচন ক্ষমতা একটি স্বতঃসিদ্ধ মূলনীতি হিসেবে সকল চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক পরিচর্যার প্রতিষ্ঠানে,বিভিন্ন ধর্মে এবং ঐশী বিধানে গৃহীত হয়েছে। এ মূলনীতি ব্যতিরেকে দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য,প্রশংসা বা ভর্ৎসনা,শাস্তি বা পুরষ্কারের কোনস্থান নেই ।

তবে যা এ স্বতঃসিদ্ধ সত্য থেকে বিচ্যুতির ও জাবরিয়াতের কারণ হয়েছে,তা কতগুলো ভ্রান্তধারণা বৈ কিছুই নয়। ফলে এ গুলোর জবাব দিতে হবে,যাতে কোন প্রকার কুমন্ত্রণা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সুযোগ না থাকে । আর তাই এখানে আমরা অতিশয় ভ্রান্ত ধারণাগুলোর অপনোদনে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় মনোনিবেশ করব।

জাহেলিয়াত যুগের আরবদের বিশ্বাসে কুসংস্কার

বিশ্বের সকল জাতি ও সমাজের আকীদা-বিশ্বাস ইসলামের সূর্যোদয়ের সময় বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও অলীক উপাখ্যান দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। গ্রীক ও সামানীয় অলীক উপাখ্যান ও কল্প-কাহিনীসমূহ সে যুগের সবচেয়ে সভ্য ও উন্নত জাতিসমূহের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এখনও প্রাচ্যের উন্নত জাতিসমূহের মধ্যে অনেক কুসংস্কার বিদ্যমান রয়েছে যা আধুনিক সভ্যতা জনগণের জীবন থেকে দূর করতে পারে নি। জ্ঞান ও কৃষ্টিসমূহের অনুপাতে কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কারের প্রসার ও বিলুপ্ত হয়ে থাকে। সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি-সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে যত পশ্চাদপদ ও অনগ্রসর  হবে ঠিক সেই অনুপাতে কুসংস্কার ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসও তাদের মধ্যে বৃদ্ধি পাবে।

ইতিহাস আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের প্রচুর কুসংস্কার ও কল্প-কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছে। বুলূগুল আরবে ফী মারেফাতি আহওয়ালিল আরাব’গ্রন্থের রচয়িতা39 এ সব কুসংস্কার ও কল্প-কাহিনীর অনেকাংশ কতগুলো কবিতা ও গল্প আকারে ঐ গ্রন্থে সংগ্রহ করেছেন। যে কোন ব্যক্তি এ গ্রন্থ ও অন্যান্য গ্রন্থ পাঠ করার পর নানারূপ কুসংস্কারের সাথে পরিচিত হবেন যা জাহেলী আরবদের মন-মস্তিষ্ক ভর্তি করে রেখেছিল। আর এ সব ভিত্তিহীন বিষয়বস্তু ছিল অন্যান্য জাতি থেকে আরব জাতির অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ হওয়ার কারণ। ইসলাম ধর্মের অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ঐ সব কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কার।

আর এ কারণেই মহানবী (সা.) তাঁর সকল শক্তি নিয়োগ করে জাহেলিয়াতের নিদর্শনসমূহ যা ছিল বিভিন্ন ধরনের অসার কল্প-কাহিনী,অলীক ধ্যান-ধারণা ও কুসংস্কার তা মূলোৎপাটন করার চেষ্টা করেছেন। মহানবী (সা.) যখন মায়ায ইবনে জাবালকে ইয়েমেনে প্রেরণ করেছিলেন তখন তিনি তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, হে মায়ায! জনগণের মধ্য থেকে জাহেলিয়াতের সকল চি হ্ন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস উচ্ছেদ করবে এবং ইসলামের যাবতীয় প্রথা ও আদর্শ যা হচ্ছে চিন্তা-ভাবনা এবং গভীর অনুধাবন ও উপলব্ধির দিকে আহবান তা পুনরুজ্জীবিত করবে।”40

و أمت امر الجاهلية إلّا ما سنّهُ الإسلام و أظهر أمر الإسلام كلّه صغيره و كبيره

যে আরব জাতির ওপর বহু বছর যাবত জাহেলী চিন্তাধারা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল তাদের সামনে তিনি এ রকম বলেছিলেন,

كلّ مأثرة في الجاهلية تحت قدمي

“(ইসলামের আবির্ভাবের সাথে সাথে) সব ধরনের অলীক আচার-অনুষ্ঠান,আকীদা-বিশ্বাস,মিথ্যা অহমিকা ও গর্ব বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং তা আমার পদতলে রাখা হলো।”41

যাতে করে ইসলাম ধর্মের উচ্চাঙ্গের তত্ত্বজ্ঞান স্পষ্ট হয়ে যায় সেজন্য এখানে কতিপয় উদাহরণ পেশ করব :

1. বৃষ্টি বর্ষণের জন্য আগুন জ্বালানো : আরব উপদ্বীপ বছরের বেশিরভাগ সময়ই শুষ্ক থাকে;সেখানকার অধিবাসীরা বৃষ্টিপাতের জন্য সালা’(سلع ) নামের এক প্রকার নিমজাতীয় বৃক্ষের কাঠ এবং ওসর’(عشر ) নামের অপর একটি দ্রুত দহনশীল বৃক্ষের কাঠ একত্র করে সেগুলোকে গরুর লেজের সাথে বেঁধে গরুকে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেত। তারপর ঐ কাঠগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিত। ওসর বৃক্ষের কাঠের মধ্যে দগ্ধকারী উপাদান থাকার কারণে ঐ কাঠগুলো থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠত। আর গরুটি দগ্ধ হওয়ার কারণে ছুটোছুটি ও উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার শুরু করত। তারা এ ধরনের কাপুরুষোচিত কাজকে পূর্বপুরুষদের প্রাচীন রীতিনীতির অনুসরণ হিসাবে আকাশের বিদ্যুৎ চমকানি ও বজ্রপাতের সাথে তুলনা করত। তারা অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে বিদ্যুৎ এবং গরুর চিৎকারকে বজ্রপাতের শব্দের স্থলে বিবেচনা করত;তারা তাদের এ কাজকে বৃষ্টি বর্ষণে কার্যকর প্রভাব রাখে বলে বিশ্বাস করত।

2. যদি গাভী পানি না খেত তাহলে তারা ষাঁড়কে প্রহার করত। পানি পান করানোর জন্য গাভী ও ষাঁড়গুলোকে পানির নালার ধারে নিয়ে যাওয়া হতো। মাঝে মধ্যে এমন হতো যে,ষাঁড়গুলো পানি খেত,কিন্তু গাভীগুলো পানি স্পর্শও করত না। আরবরা মনে করত যে,গাভীগুলোর পানি পান করা থেকে বিরত থাকার কারণ হচ্ছে ঐ সব শয়তান যা ষাঁড়ের দু শিংয়ের মাঝখানে স্থান নিয়েছে এবং গাভীগুলোকে পানি পান করতে দিচ্ছে না। তাই ঐ শয়তানগুলোকে তাড়ানোর জন্য ষাঁড়ের মাথা ও মুখমণ্ডলে প্রহার করত।42

3. নীরোগ উটের মাথায় আগুনের ছ্যাঁকা দেয়া হতো যাতে করে অপরাপর উট সুস্থ হয়ে ওঠে: কোন উট যদি অসুস্থ হয়ে পড়ত অথবা উটের ঠোঁট ও মুখে ক্ষত ও ঠোসা দেখা যেত তাহলে অন্যান্য উটের মধ্যে এ রোগের সংক্রমণ রোধ করার জন্য একটি সুস্থ উটের ঠোঁট,বাহু ও ঊরুতে ছ্যাঁকা দেয়া হতো,কিন্তু তাদের এ কাজের কারণ স্পষ্ট নয়। কখনো কখনো ধারণা করা হয় যে,এ ধরনের কাজের রোগ-প্রতিষেধক দিক আছে এবং এটি এক ধরনের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতিও হতে পারে। কিন্তু যেহেতু অনেক উটের মধ্য থেকে কেবল একটি উটের ওপর এ ধরনের বিপদ নেমে আসত তাই বলা যায় যে,তা এক ধরনের কুসংস্কার।

4. একটি উটকে কোন কবরের কাছে আটকে রাখা হতো যাতে করে কবরবাসী কিয়ামত দিবসে পদব্রজে (কবর থেকে) উত্থিত না হয় (অর্থাৎ উক্ত উটের ওপর সওয়ার অবস্থায় উত্থিত হয়)।

যদি কোন মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করত তখন ঐ ব্যক্তির কবরের পাশে একটি গর্ত খুঁড়ে তাতে একটি উট আটকে রাখা হতো এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঐ উটকে দানা-পানি ও খড়কুটা কিছুই খেতে দেয়া হতো না যাতে করে কিয়ামত দিবসে মৃত ব্যক্তি ঐ উটের ওপর সওয়ার হয় এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় তার পুনরুত্থান না হয়।

5. কবরের পাশে উট জবাই করা হতো। যেহেতু মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় তার প্রিয় ব্যক্তি ও অতিথিদের জন্য উট জবাই করত তাই মৃতকে সম্মান ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তার আত্মীয়স্বজন তার কবরের কাছে বেদনাদায়কভাবে উট বধ করত।

কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলামের সংগ্রাম

এ ধরনের কাজ যা যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার সাথে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ আগুন জ্বালানোর কারণে বৃষ্টিপাত হয় না,ষাঁড়কে প্রহার করলে গাভীর মধ্যে এর কোন প্রভাবই পড়ে না,আর নীরোগ উটকে ছ্যাঁকা দিলে তা রোগাক্রান্ত উটের সুস্থতা ও রোগমুক্তির কারণ হয় না এবং...) পশুগুলোর প্রতি অত্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা যদি এ সব আচার-আচরণকে ইসলামের সুদৃঢ় বিধিবিধান-যা জীবজন্তু সংরক্ষণ করার ব্যাপারে প্রবর্তিত হয়েছে সেগুলোর সাথে তুলনা করি তাহলে আমাদের বলতে হবে : এই শরীয়ত তদানীন্তন আরব সমাজে প্রচলিত চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা এখানে ইসলামের অগণিত বিধানের মধ্য থেকে কেবল একটি ছোট বিধান উল্লেখ করব :

মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রতিটি বাহক পশুর আরোহীর ওপর ছয়টি অধিকার আছে : 1. যে অবতরণস্থলে অবতরণ করবে সেখানে পশুটিকে কিছু খাদ্য খেতে দেবে,2. যদি পানি বা জলাধারের পাশ দিয়ে গমন কর,তাহলে ঐ পশুটিকে পানি পান করাবে,3. পশুর মুখের ওপর চাবুক মারবে না,4. দীর্ঘক্ষণ কথা বলার সময় পশুর পিঠের ওপর বসে থাকবে না,5. ক্ষমতার বাইরে পশুর ওপর অধিক বোঝা চাপাবে না,6. যে পথে চলার সামর্থ্য পশুটির নেই সে পথে পশুকে চালনা করবে না।”43

6. রোগীদের চিকিৎসাপদ্ধতির ক্ষেত্রে কুসংস্কার : যদি কোন ব্যক্তিকে বিচ্ছু বা সাপ দংশন করত তাহলে উক্ত ব্যক্তির ঘাড়ে স্বর্ণালংকার ঝোলানো হতো এবং বিশ্বাস করা হতো যে,যদি দংশিত ব্যক্তির সাথে তামা ও টিন থাকে তাহলে সে মারা যাবে। জলাতঙ্ক রোগ-যা সাধারণত উক্ত রোগে আক্রান্ত কুকুরের দংশনে সংক্রমিত হয়-দংশিত স্থানের ওপর গোত্রপ্রধানের অল্প রক্ত মাখিয়ে চিকিৎসা করা হতো। আর নিম্নোক্ত কবিতায় তা প্রতিফলিত হয়েছে :

أحلامكم لسقام الجهل شافية

كما دماءكم تشفى من الكلب

যেমন (জলাতঙ্ক ব্যাধিবাহী) কুকুর হতে আরোগ্য দেয় তোমাদের রক্ত

ঠিক তেমনি তোমাদের স্বপ্নগুলোও অজ্ঞতা (জনিত) ব্যাধির আরোগ্যদানকারী।

আর যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে উন্মাদনার আলামত প্রকাশ পেত তাহলে অপবিত্র আত্মা দূর করার জন্য নোংরা কার্যকলাপের আশ্রয় নেয়া হতো। নোংরা ন্যাকড়া এবং মৃত ব্যক্তিদের হাড় পাগলের গলায় ঝুলানো হতো। যাতে করে শিশুরা শয়তানের কুপ্রভাব দ্বারা প্রভাবিত না হয় (অর্থাৎ শয়তানের প্রভাব তাদের ওপর না পড়ে) সেজন্য শিয়াল ও বিড়ালের দাঁত সুতার সাথে বেঁধে শিশুদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হতো। যখন শিশুদের ঠোঁট ও মুখ বিষফোঁড়ায় ভরে যেত তখন শিশুর মা একটি চালুনী মাথার ওপর বসিয়ে গোত্রের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে রুটি ও খেজুর জমা করত এবং তা কুকুরকে খেতে দিত যাতে করে নিজ সন্তানের ঠোঁট ও মুখের ফোঁড়া সেরে যায়;গোত্রের মহিলারা সজাগ দৃষ্টি রাখত যে,তাদের সন্তানরা ঐ সব রুটি ও খেজুর থেকে কিছু না খায়,পাছে তারা এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

চর্মরোগ,যেমন দেহের চামড়া ঝরে পরার চিকিৎসা করার জন্য মুখের লালা চর্মরোগাক্রান্ত স্থানে মালিশ করত। যদি কোন ব্যক্তির (চর্ম) রোগ এতে ভালো না হতো এবং অব্যাহত থাকত তাহলে ভাবা হতো রোগী যে সব প্রাণী,যেমন সাপ,শয়তানদের (অপদেবতা) সাথে যুক্ত সেগুলোর কোন একটিকে হত্যা করেছে। তারা শয়তানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য কাদামাটি দিয়ে উটের মূর্তি নির্মাণ করত। এরপর যব,গম ও খেজুর ঐ মূর্তিগুলোর ওপরে রেখে সেগুলো পাহাড়ের গুহার সামনে রেখে চলে আসত এবং পরের দিন তারা উক্ত স্থানে ফিরে যেত। যদি তারা দেখতে পেত যে,বোঝাগুলো খোলা হয়েছে,তাহলে তারা একে নজরানা কবুল হওয়ার নিদর্শন বলে গণ্য করত এবং বলত যে,রোগীটি সুস্থ হয়ে যাবে। আর এর অন্যথা হলে তারা বিশ্বাস করত,যেহেতু এ নজরানা তুচ্ছ ও নগণ্য তাই তা অপদেবতারা গ্রহণ করে নি।

ইসলাম বিভিন্ন পদ্ধতিতে এ সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। একদল মরুচারী আরব বেদুইন যারা যাদুর কর্ণফুল,যাদুর তাবীজ,মাদুলী এবং হার-যার মধ্যে পাথর ও হাড় বেঁধে রাখা হতো তা দিয়ে রোগীর রোগের চিকিৎসা করত তারা যখন মহানবী (সা.)-এর কাছে গমন করত এবং উদ্ভিদ ও ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করত তখন মহানবী (সা.) বলতেন, প্রতিটি রোগীর জন্য ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ যে আল্লাহ্ ব্যথা ও রোগযন্ত্রণা সৃষ্টি করেছেন তিনিই রোগের ঔষধও তৈরি করেছেন। 44 অর্থাৎ এ সব কর্ণফুল,তাবীজ,মাদুলী ও মালা রোগ নিরাময় করার ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। এমনকি যখন সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস হৃদরোগে আক্রান্ত হন তখন মহানবী (সা.) তাঁকে বলেছিলেন, সাকীফ গোত্রের প্রসিদ্ধ ডাক্তার হারিস কালদার কাছে তোমরা অবশ্যই যাবে।” এরপর তিনি তাঁকে একটি বিশেষ ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিলেন।45

অধিকন্তু যাদুর কর্ণফুল,তাবীজ ও মাদুলী যেগুলোর আসলে কোন কার্যকর প্রভাব নেই সেগুলো সংক্রান্ত বেশ কিছু বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। এখানে আমরা দু টি বর্ণনা উল্লেখ করাই যথেষ্ট বলে বিবেচনা করছি :

এক ব্যক্তি যার সন্তান গলাব্যথা রোগে আক্রান্ত হয়েছিল সে যাদুর মাদুলী ও তাবীজসহ মহানবীর সামনে উপস্থিত হলো। মহানবী (সা.) বললেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের যাদুর এ সব কর্ণফুল,তাবীজ ও মাদুলী দিয়ে ভয় দেখিও না। এই অসুস্থ রোগীকে ভারতীয় চন্দন কাঠের নির্যাস সেবন করানো প্রয়োজন। 46

ইমাম সাদেক (আ.) বলতেন,إنّ كثيرا من التّمائم شرك বহু বাজুবন্দ,কর্ণফুল ও মাদুলী হচ্ছে শিরক।”47

মহানবী (সা.) এবং তাঁর সম্মানিত ওয়াসিগণ (নির্বাহী প্রতিনিধিগণ) জনগণকে অসংখ্য ঔষধ সম্পর্কে অবহিত করার মাধ্যমে যে সব অলীক ধারণা ও কুসংস্কার জাহেলী যুগের আরব জাতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেগুলোর ওপর জোরালো আঘাত হেনেছেন। তাঁদের বর্ণিত এ সব ঔষধ-পথ্য বড় বড় হাদীসশাস্ত্রবিদ কর্তৃক তিব্বুন নবী’(নবীর চিকিৎসাপদ্ধতি), তিব্বুর রেযা’(ইমাম রেযার চিকিৎসাপদ্ধতি) ইত্যাদি শিরোনামে সংকলিত হয়েছে।

7. আরো কিছু কুসংস্কার : দুশ্চিন্তা ও ভীতি দূর করার জন্য আরবরা নিম্নোক্ত মাধ্যমগুলো ব্যবহার করত :

ক. যখন তারা কোন গ্রামে প্রবেশ করত এবং কলেরা রোগ অথবা অপদেবতার ভীতি তাদের পেয়ে বসত তখন ভীতি দূর করার জন্য তারা গ্রামের ফটকের সামনে 10 বার গাধার ন্যায় চিৎকার করত। আবার কখনো কখনো এরূপ চিৎকার করার সময় শিয়ালের হাড় ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখত।

খ. যখন তারা কোন মরুপ্রান্তরে হারিয়ে যেত তখন তারা তাদের পরিধেয় বস্ত্র উল্টে-পাল্টে পরত। সফর করার সময় যখন তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতা করার আশংকা করত তখন তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোন গাছের কাণ্ডে বা ডালে একটি সুতা বেঁধে রাখত। ফেরার সময় যদি তারা দেখতে পেত,সুতা অক্ষত ও পূর্বের অবস্থায় আছে তাহলে তারা নিশ্চিত হতো যে,তাদের পত্নীরা বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আর যদি তারা দেখতে পেত,সুতাটি নেই অথবা খুলে গেছে তাহলে তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করত।

যদি তাদের সন্তানদের দাঁত পড়ে যেত তাহলে তারা ঐ দাঁতটিকে দু আঙ্গুল দিয়ে ধরে সূর্যের দিকে ছুঁড়ে দিত ও বলত, হে সূর্য! এ দাঁতের চেয়ে উত্তম দাঁত দাও।” যে নারীর সন্তান বাঁচত না সে যদি কোন বয়স্ক মানুষের নিহত লাশের ওপর দিয়ে সাত বার হাঁটত,তখন তারা বিশ্বাস করত যে,তার সন্তান জীবিত থাকবে।

এগুলো হচ্ছে অগণিত কুসংস্কারের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র যা জাহেলী যুগের বেদুইন আবরদের জীবনধারাকে প্রগাঢ়ভাবে তিমিরাচ্ছন্ন করেছিল এবং তাদের চিন্তা-ভাবনাকে উন্নতির সুউচ্চ শিখরে উড্ডয়ন করা থেকে বিরত রেখেছিল।

ইসলামের আবির্ভাবের সময়ে আরবের সামাজিক অবস্থা

মানব জাতি সামাজিক জীবনের দিকে প্রথম যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা ছিল গোত্রীয় জীবন। গোত্র ছিল কতগুলো পরিবার ও আত্মীয়ের সমষ্টি যারা গোত্রের শেখ বা নেতার নেতৃত্বাধীনে জীবনযাপন করত। আর এভাবে গোত্রের মাধ্যমে সমাজের আদিমতম চিত্র বা রূপ অস্তিত্ব লাভ করে। সে সময়ের আরব জাতির জীবনযাত্রা এমনই ছিল। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের সাথে যোগ দিয়ে ছোট একটি সমাজ গঠন করত। গোত্রের সকল সদস্য গোত্রপতির আদেশ মেনে চলত। যে বিষয়টি তাদের পরস্পর সম্পর্কিত করে রেখেছিল তা ছিল তাদের গোত্রীয় বন্ধন ও আত্মীয়তা। এ সব গোত্র সব দিক থেকেই পরস্পর পৃথক ছিল;তাদের আচার-প্রথাও পৃথক ছিল। কারণ অন্য সকল গোত্র মূলত একে অপর থেকে আলাদা ও অপরিচিত বলে গণ্য হতো। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের কোন অধিকার ও সম্মান আছে-এ কথার স্বীকৃতি দিত না। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন,সদস্যদের হত্যা এবং নারীদের অপহরণ করা তাদের আইনসংগত ন্যায্য অধিকার বলে গণ্য করত। তবে কোন গোত্রের সাথে যদি চুক্তি থাকত সে ক্ষেত্রে ছিল অন্যকথা। অন্যদিকে প্রতিটি গোত্র যখনই আগ্রাসন ও আক্রমণের শিকার হতো তখন সকল আগ্রাসনকারীকে হত্যা করা তাদের ন্যায্য অধিকার বলে গণ্য হতো। কারণ তারা বিশ্বাস করত যে,একমাত্র রক্ত ব্যতীত অন্য কিছু রক্তকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে সক্ষম নয়।

আরব জাতি ইসলাম ধর্ম কবুল করার মাধ্যমে গোত্রতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পদার্পণ করে। মহানবী (সা.) বিক্ষিপ্ত আরব গোত্রগুলোকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে যে সব গোত্র সুদূর অতীতকাল থেকে পরস্পর দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও আক্রমণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং একে অন্যের রক্ত ঝরাত তাদের অল্প সময়ের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করা সত্যি একটি বড় কাজ এবং একটি অতুলনীয় সামাজিক মুজিযা (অলৌকিক বিষয়) বলে গণ্য। কারণ এ ধরনের বিশাল পরিবর্তন যদি কতগুলো স্বাভাবিক পরিবর্তন ও রূপান্তরেরই ফল হতো তাহলে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এবং অগণিত মাধ্যম ও উপায়-উপকরণের প্রয়োজন হতো।

টমাস কারলাইল বলেছেন, মহান আল্লাহ্ ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে আরব জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পরিচালিত করেছেন। সে জাতি স্থবির ছিল,যাদের ধ্বনি শোনা যেত না,যাদের কর্মতৎপরতা ও প্রাণচাঞ্চল্য অনুভূত হতো না তাদের থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব হয় যারা অখ্যাতি থেকে খ্যাতির দিকে,অলসতা ও শৈথিল্য থেকে জাগরণের দিকে,হীনতা ও দীনতা থেকে উচ্চ মর্যাদার পানে,দুর্বলতা ও অক্ষমতা থেকে শক্তি ও ক্ষমতার দিকে অগ্রসর হয়েছে। তাদের থেকে আলো পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর একশ বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মুসলিম উম্মাহ্ এক পা ভারতে ও অপর পা আন্দালুসিয়ায় (বর্তমান স্পেন) রাখতে সক্ষম হয়েছিল।”48

পাশ্চাত্যের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মেসিয়োর ন্যাঁ (مسيورنان ) তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন,

“এই বিস্ময়কর সুমহান ঘটনা (ইসলাম) যা আরব জাতিকে দিগ্বিজয়ী এবং উন্নত চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার উদ্ভাবকের পোশাকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে-তা ঘটার সময়কাল পর্যন্ত আরব উপদ্বীপের কোন অঞ্চলই না বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের অংশ বলে গণ্য হতো,আর না বিজ্ঞান বা ধর্মের দৃষ্টিতে সেখানে সভ্যতার কোন নিদর্শন বিদ্যমান ছিল।”49

হ্যাঁ,জাহেলিয়াত যুগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তগণ অর্থাৎ বিভিন্ন আরব গোত্র না কোন সভ্যতার আলো প্রত্যক্ষ করেছে,আর না তাদের কোন শিক্ষা-দীক্ষা,নিয়ম-কানুন ও আচার-প্রথার প্রচলন ছিল। যে সকল সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ও ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য উন্নতি ও সভ্যতা বিকাশের কারণ সেগুলো থেকে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত ছিল। অতএব,কখনই আশা করা যেত না যে,এই জাতি এত অল্প সময়ের মধ্যে মর্যাদা ও সম্মানের শীর্ষে আরোহণ করবে এবং সংকীর্ণ গোত্রীয় জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার সুবিস্তৃত জগতের পানে অগ্রসর হবে।

পৃথিবীর জাতিসমূহ আসলে ইমারতসদৃশ। যেমনভাবে একটি মৌলিক ইমারত মজবুত উপাদানের মুখাপেক্ষী যা সঠিক পদ্ধতি অনুসারে এবং পূর্ণ শৃঙ্খলার সাথে নির্মিত হয়েছে যাতে করে তা ঝড়-ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টি-বাদলের প্রভাব থেকে টিকে থাকতে এবং স্থায়ী হতে পারে,ঠিক তেমনি একটি সাহসী ও নৈতিক গুণসম্পন্ন জাতির গঠন-কাঠামো ও দৃঢ় ভিত্তিসমূহ অর্থাৎ মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস,পূর্ণাঙ্গ রীতি-নীতি এবং উন্নত মানবীয় স্বভাব-চরিত্রের মুখাপেক্ষী যাতে তা অস্তিত্ব বজায় রাখতে ও প্রগতির পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।

এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে অবশ্যই ভেবে দেখা উচিত যে,কোথা থেকে এবং কিভাবে জাহেলী বেদুইন আরবদের ক্ষেত্রে এত আশ্চর্যজনক পরিবর্তন সাধিত হলো? যে জাতি গতকাল পর্যন্তও নিজেদের সার্বিক শক্তি মতবিরোধ ও কপটতার মধ্যে ব্যবহার করে নিঃশেষ করত এবং সব ধরনের সমাজব্যবস্থা থেকে বহু দূরে ছিল,এত অত্যাশ্চর্যজনক দ্রুতগতিতে সৌহার্দ,সম্প্রীতি ও ঐক্যের বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে গেল এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করল যে,সেই সময়ের বিশ্বের বৃহৎ জাতিসমূহকে তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও রীতিনীতির সামনে নতজানু ও একান্ত আনুগত্যশীল করতে সক্ষম হয়েছিল।

সত্যিই যদি নির্ধারিত হয়ে থাকে যে,হিজায অর্থাৎ আরব উপদ্বীপের আরব জাতি এত উন্নতি করবে এবং এত বড় সম্মান ও গৌরবের অধিকারী হবে তাহলে ইয়েমেনের আরবগণ যারা (পূর্ব হতে) সভ্যতা ও কৃষ্টির অধিকারী ছিল তারা বছরের পর বছর ধরে রাজত্ব করেছে এবং বড় বড় শাসনকর্তাকে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছে তারা কেন এ ধরনের উন্নতি ও প্রগতির অধিকারী হতে পারে নি? শামদেশের প্রতিবেশী গাসসানী আরবগণ যারা সভ্য রোমীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে জীবনযাপন করত তারা কেন উন্নতি ও বিকাশের এ পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হয় নি? হীরার আরবগণ যারা গতকালও বিশাল পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাস করত তারা কেন এ ধরনের উন্নতি করতে সক্ষম হয় নি? প্রাগুক্ত জাতিসমূহ যদি এ ধরনের সাফল্য অর্জন করত তাহলে তা আশ্চর্যজনক বিষয় বলে বিবেচিত হতো না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এটিই যে,হিজাযের আরবগণ যাদের নিজেদের কোন ইতিহাসই ছিল না তারাই সুমহান ইসলামী সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েছে।

জাহেলিয়াত যুগের আরবদের বিশ্বাসে কুসংস্কার

বিশ্বের সকল জাতি ও সমাজের আকীদা-বিশ্বাস ইসলামের সূর্যোদয়ের সময় বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও অলীক উপাখ্যান দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। গ্রীক ও সামানীয় অলীক উপাখ্যান ও কল্প-কাহিনীসমূহ সে যুগের সবচেয়ে সভ্য ও উন্নত জাতিসমূহের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এখনও প্রাচ্যের উন্নত জাতিসমূহের মধ্যে অনেক কুসংস্কার বিদ্যমান রয়েছে যা আধুনিক সভ্যতা জনগণের জীবন থেকে দূর করতে পারে নি। জ্ঞান ও কৃষ্টিসমূহের অনুপাতে কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কারের প্রসার ও বিলুপ্ত হয়ে থাকে। সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি-সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে যত পশ্চাদপদ ও অনগ্রসর  হবে ঠিক সেই অনুপাতে কুসংস্কার ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসও তাদের মধ্যে বৃদ্ধি পাবে।

ইতিহাস আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের প্রচুর কুসংস্কার ও কল্প-কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছে। বুলূগুল আরবে ফী মারেফাতি আহওয়ালিল আরাব’গ্রন্থের রচয়িতা39 এ সব কুসংস্কার ও কল্প-কাহিনীর অনেকাংশ কতগুলো কবিতা ও গল্প আকারে ঐ গ্রন্থে সংগ্রহ করেছেন। যে কোন ব্যক্তি এ গ্রন্থ ও অন্যান্য গ্রন্থ পাঠ করার পর নানারূপ কুসংস্কারের সাথে পরিচিত হবেন যা জাহেলী আরবদের মন-মস্তিষ্ক ভর্তি করে রেখেছিল। আর এ সব ভিত্তিহীন বিষয়বস্তু ছিল অন্যান্য জাতি থেকে আরব জাতির অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ হওয়ার কারণ। ইসলাম ধর্মের অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ঐ সব কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কার।

আর এ কারণেই মহানবী (সা.) তাঁর সকল শক্তি নিয়োগ করে জাহেলিয়াতের নিদর্শনসমূহ যা ছিল বিভিন্ন ধরনের অসার কল্প-কাহিনী,অলীক ধ্যান-ধারণা ও কুসংস্কার তা মূলোৎপাটন করার চেষ্টা করেছেন। মহানবী (সা.) যখন মায়ায ইবনে জাবালকে ইয়েমেনে প্রেরণ করেছিলেন তখন তিনি তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, হে মায়ায! জনগণের মধ্য থেকে জাহেলিয়াতের সকল চি হ্ন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস উচ্ছেদ করবে এবং ইসলামের যাবতীয় প্রথা ও আদর্শ যা হচ্ছে চিন্তা-ভাবনা এবং গভীর অনুধাবন ও উপলব্ধির দিকে আহবান তা পুনরুজ্জীবিত করবে।”40

و أمت امر الجاهلية إلّا ما سنّهُ الإسلام و أظهر أمر الإسلام كلّه صغيره و كبيره

যে আরব জাতির ওপর বহু বছর যাবত জাহেলী চিন্তাধারা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল তাদের সামনে তিনি এ রকম বলেছিলেন,

كلّ مأثرة في الجاهلية تحت قدمي

“(ইসলামের আবির্ভাবের সাথে সাথে) সব ধরনের অলীক আচার-অনুষ্ঠান,আকীদা-বিশ্বাস,মিথ্যা অহমিকা ও গর্ব বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং তা আমার পদতলে রাখা হলো।”41

যাতে করে ইসলাম ধর্মের উচ্চাঙ্গের তত্ত্বজ্ঞান স্পষ্ট হয়ে যায় সেজন্য এখানে কতিপয় উদাহরণ পেশ করব :

1. বৃষ্টি বর্ষণের জন্য আগুন জ্বালানো : আরব উপদ্বীপ বছরের বেশিরভাগ সময়ই শুষ্ক থাকে;সেখানকার অধিবাসীরা বৃষ্টিপাতের জন্য সালা’(سلع ) নামের এক প্রকার নিমজাতীয় বৃক্ষের কাঠ এবং ওসর’(عشر ) নামের অপর একটি দ্রুত দহনশীল বৃক্ষের কাঠ একত্র করে সেগুলোকে গরুর লেজের সাথে বেঁধে গরুকে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেত। তারপর ঐ কাঠগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিত। ওসর বৃক্ষের কাঠের মধ্যে দগ্ধকারী উপাদান থাকার কারণে ঐ কাঠগুলো থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠত। আর গরুটি দগ্ধ হওয়ার কারণে ছুটোছুটি ও উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার শুরু করত। তারা এ ধরনের কাপুরুষোচিত কাজকে পূর্বপুরুষদের প্রাচীন রীতিনীতির অনুসরণ হিসাবে আকাশের বিদ্যুৎ চমকানি ও বজ্রপাতের সাথে তুলনা করত। তারা অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে বিদ্যুৎ এবং গরুর চিৎকারকে বজ্রপাতের শব্দের স্থলে বিবেচনা করত;তারা তাদের এ কাজকে বৃষ্টি বর্ষণে কার্যকর প্রভাব রাখে বলে বিশ্বাস করত।

2. যদি গাভী পানি না খেত তাহলে তারা ষাঁড়কে প্রহার করত। পানি পান করানোর জন্য গাভী ও ষাঁড়গুলোকে পানির নালার ধারে নিয়ে যাওয়া হতো। মাঝে মধ্যে এমন হতো যে,ষাঁড়গুলো পানি খেত,কিন্তু গাভীগুলো পানি স্পর্শও করত না। আরবরা মনে করত যে,গাভীগুলোর পানি পান করা থেকে বিরত থাকার কারণ হচ্ছে ঐ সব শয়তান যা ষাঁড়ের দু শিংয়ের মাঝখানে স্থান নিয়েছে এবং গাভীগুলোকে পানি পান করতে দিচ্ছে না। তাই ঐ শয়তানগুলোকে তাড়ানোর জন্য ষাঁড়ের মাথা ও মুখমণ্ডলে প্রহার করত।42

3. নীরোগ উটের মাথায় আগুনের ছ্যাঁকা দেয়া হতো যাতে করে অপরাপর উট সুস্থ হয়ে ওঠে: কোন উট যদি অসুস্থ হয়ে পড়ত অথবা উটের ঠোঁট ও মুখে ক্ষত ও ঠোসা দেখা যেত তাহলে অন্যান্য উটের মধ্যে এ রোগের সংক্রমণ রোধ করার জন্য একটি সুস্থ উটের ঠোঁট,বাহু ও ঊরুতে ছ্যাঁকা দেয়া হতো,কিন্তু তাদের এ কাজের কারণ স্পষ্ট নয়। কখনো কখনো ধারণা করা হয় যে,এ ধরনের কাজের রোগ-প্রতিষেধক দিক আছে এবং এটি এক ধরনের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতিও হতে পারে। কিন্তু যেহেতু অনেক উটের মধ্য থেকে কেবল একটি উটের ওপর এ ধরনের বিপদ নেমে আসত তাই বলা যায় যে,তা এক ধরনের কুসংস্কার।

4. একটি উটকে কোন কবরের কাছে আটকে রাখা হতো যাতে করে কবরবাসী কিয়ামত দিবসে পদব্রজে (কবর থেকে) উত্থিত না হয় (অর্থাৎ উক্ত উটের ওপর সওয়ার অবস্থায় উত্থিত হয়)।

যদি কোন মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করত তখন ঐ ব্যক্তির কবরের পাশে একটি গর্ত খুঁড়ে তাতে একটি উট আটকে রাখা হতো এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঐ উটকে দানা-পানি ও খড়কুটা কিছুই খেতে দেয়া হতো না যাতে করে কিয়ামত দিবসে মৃত ব্যক্তি ঐ উটের ওপর সওয়ার হয় এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় তার পুনরুত্থান না হয়।

5. কবরের পাশে উট জবাই করা হতো। যেহেতু মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় তার প্রিয় ব্যক্তি ও অতিথিদের জন্য উট জবাই করত তাই মৃতকে সম্মান ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তার আত্মীয়স্বজন তার কবরের কাছে বেদনাদায়কভাবে উট বধ করত।

কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলামের সংগ্রাম

এ ধরনের কাজ যা যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার সাথে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ আগুন জ্বালানোর কারণে বৃষ্টিপাত হয় না,ষাঁড়কে প্রহার করলে গাভীর মধ্যে এর কোন প্রভাবই পড়ে না,আর নীরোগ উটকে ছ্যাঁকা দিলে তা রোগাক্রান্ত উটের সুস্থতা ও রোগমুক্তির কারণ হয় না এবং...) পশুগুলোর প্রতি অত্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা যদি এ সব আচার-আচরণকে ইসলামের সুদৃঢ় বিধিবিধান-যা জীবজন্তু সংরক্ষণ করার ব্যাপারে প্রবর্তিত হয়েছে সেগুলোর সাথে তুলনা করি তাহলে আমাদের বলতে হবে : এই শরীয়ত তদানীন্তন আরব সমাজে প্রচলিত চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা এখানে ইসলামের অগণিত বিধানের মধ্য থেকে কেবল একটি ছোট বিধান উল্লেখ করব :

মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রতিটি বাহক পশুর আরোহীর ওপর ছয়টি অধিকার আছে : 1. যে অবতরণস্থলে অবতরণ করবে সেখানে পশুটিকে কিছু খাদ্য খেতে দেবে,2. যদি পানি বা জলাধারের পাশ দিয়ে গমন কর,তাহলে ঐ পশুটিকে পানি পান করাবে,3. পশুর মুখের ওপর চাবুক মারবে না,4. দীর্ঘক্ষণ কথা বলার সময় পশুর পিঠের ওপর বসে থাকবে না,5. ক্ষমতার বাইরে পশুর ওপর অধিক বোঝা চাপাবে না,6. যে পথে চলার সামর্থ্য পশুটির নেই সে পথে পশুকে চালনা করবে না।”43

6. রোগীদের চিকিৎসাপদ্ধতির ক্ষেত্রে কুসংস্কার : যদি কোন ব্যক্তিকে বিচ্ছু বা সাপ দংশন করত তাহলে উক্ত ব্যক্তির ঘাড়ে স্বর্ণালংকার ঝোলানো হতো এবং বিশ্বাস করা হতো যে,যদি দংশিত ব্যক্তির সাথে তামা ও টিন থাকে তাহলে সে মারা যাবে। জলাতঙ্ক রোগ-যা সাধারণত উক্ত রোগে আক্রান্ত কুকুরের দংশনে সংক্রমিত হয়-দংশিত স্থানের ওপর গোত্রপ্রধানের অল্প রক্ত মাখিয়ে চিকিৎসা করা হতো। আর নিম্নোক্ত কবিতায় তা প্রতিফলিত হয়েছে :

أحلامكم لسقام الجهل شافية

كما دماءكم تشفى من الكلب

যেমন (জলাতঙ্ক ব্যাধিবাহী) কুকুর হতে আরোগ্য দেয় তোমাদের রক্ত

ঠিক তেমনি তোমাদের স্বপ্নগুলোও অজ্ঞতা (জনিত) ব্যাধির আরোগ্যদানকারী।

আর যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে উন্মাদনার আলামত প্রকাশ পেত তাহলে অপবিত্র আত্মা দূর করার জন্য নোংরা কার্যকলাপের আশ্রয় নেয়া হতো। নোংরা ন্যাকড়া এবং মৃত ব্যক্তিদের হাড় পাগলের গলায় ঝুলানো হতো। যাতে করে শিশুরা শয়তানের কুপ্রভাব দ্বারা প্রভাবিত না হয় (অর্থাৎ শয়তানের প্রভাব তাদের ওপর না পড়ে) সেজন্য শিয়াল ও বিড়ালের দাঁত সুতার সাথে বেঁধে শিশুদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হতো। যখন শিশুদের ঠোঁট ও মুখ বিষফোঁড়ায় ভরে যেত তখন শিশুর মা একটি চালুনী মাথার ওপর বসিয়ে গোত্রের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে রুটি ও খেজুর জমা করত এবং তা কুকুরকে খেতে দিত যাতে করে নিজ সন্তানের ঠোঁট ও মুখের ফোঁড়া সেরে যায়;গোত্রের মহিলারা সজাগ দৃষ্টি রাখত যে,তাদের সন্তানরা ঐ সব রুটি ও খেজুর থেকে কিছু না খায়,পাছে তারা এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

চর্মরোগ,যেমন দেহের চামড়া ঝরে পরার চিকিৎসা করার জন্য মুখের লালা চর্মরোগাক্রান্ত স্থানে মালিশ করত। যদি কোন ব্যক্তির (চর্ম) রোগ এতে ভালো না হতো এবং অব্যাহত থাকত তাহলে ভাবা হতো রোগী যে সব প্রাণী,যেমন সাপ,শয়তানদের (অপদেবতা) সাথে যুক্ত সেগুলোর কোন একটিকে হত্যা করেছে। তারা শয়তানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য কাদামাটি দিয়ে উটের মূর্তি নির্মাণ করত। এরপর যব,গম ও খেজুর ঐ মূর্তিগুলোর ওপরে রেখে সেগুলো পাহাড়ের গুহার সামনে রেখে চলে আসত এবং পরের দিন তারা উক্ত স্থানে ফিরে যেত। যদি তারা দেখতে পেত যে,বোঝাগুলো খোলা হয়েছে,তাহলে তারা একে নজরানা কবুল হওয়ার নিদর্শন বলে গণ্য করত এবং বলত যে,রোগীটি সুস্থ হয়ে যাবে। আর এর অন্যথা হলে তারা বিশ্বাস করত,যেহেতু এ নজরানা তুচ্ছ ও নগণ্য তাই তা অপদেবতারা গ্রহণ করে নি।

ইসলাম বিভিন্ন পদ্ধতিতে এ সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। একদল মরুচারী আরব বেদুইন যারা যাদুর কর্ণফুল,যাদুর তাবীজ,মাদুলী এবং হার-যার মধ্যে পাথর ও হাড় বেঁধে রাখা হতো তা দিয়ে রোগীর রোগের চিকিৎসা করত তারা যখন মহানবী (সা.)-এর কাছে গমন করত এবং উদ্ভিদ ও ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করত তখন মহানবী (সা.) বলতেন, প্রতিটি রোগীর জন্য ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ যে আল্লাহ্ ব্যথা ও রোগযন্ত্রণা সৃষ্টি করেছেন তিনিই রোগের ঔষধও তৈরি করেছেন। 44 অর্থাৎ এ সব কর্ণফুল,তাবীজ,মাদুলী ও মালা রোগ নিরাময় করার ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। এমনকি যখন সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস হৃদরোগে আক্রান্ত হন তখন মহানবী (সা.) তাঁকে বলেছিলেন, সাকীফ গোত্রের প্রসিদ্ধ ডাক্তার হারিস কালদার কাছে তোমরা অবশ্যই যাবে।” এরপর তিনি তাঁকে একটি বিশেষ ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিলেন।45

অধিকন্তু যাদুর কর্ণফুল,তাবীজ ও মাদুলী যেগুলোর আসলে কোন কার্যকর প্রভাব নেই সেগুলো সংক্রান্ত বেশ কিছু বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে। এখানে আমরা দু টি বর্ণনা উল্লেখ করাই যথেষ্ট বলে বিবেচনা করছি :

এক ব্যক্তি যার সন্তান গলাব্যথা রোগে আক্রান্ত হয়েছিল সে যাদুর মাদুলী ও তাবীজসহ মহানবীর সামনে উপস্থিত হলো। মহানবী (সা.) বললেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের যাদুর এ সব কর্ণফুল,তাবীজ ও মাদুলী দিয়ে ভয় দেখিও না। এই অসুস্থ রোগীকে ভারতীয় চন্দন কাঠের নির্যাস সেবন করানো প্রয়োজন। 46

ইমাম সাদেক (আ.) বলতেন,إنّ كثيرا من التّمائم شرك বহু বাজুবন্দ,কর্ণফুল ও মাদুলী হচ্ছে শিরক।”47

মহানবী (সা.) এবং তাঁর সম্মানিত ওয়াসিগণ (নির্বাহী প্রতিনিধিগণ) জনগণকে অসংখ্য ঔষধ সম্পর্কে অবহিত করার মাধ্যমে যে সব অলীক ধারণা ও কুসংস্কার জাহেলী যুগের আরব জাতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেগুলোর ওপর জোরালো আঘাত হেনেছেন। তাঁদের বর্ণিত এ সব ঔষধ-পথ্য বড় বড় হাদীসশাস্ত্রবিদ কর্তৃক তিব্বুন নবী’(নবীর চিকিৎসাপদ্ধতি), তিব্বুর রেযা’(ইমাম রেযার চিকিৎসাপদ্ধতি) ইত্যাদি শিরোনামে সংকলিত হয়েছে।

7. আরো কিছু কুসংস্কার : দুশ্চিন্তা ও ভীতি দূর করার জন্য আরবরা নিম্নোক্ত মাধ্যমগুলো ব্যবহার করত :

ক. যখন তারা কোন গ্রামে প্রবেশ করত এবং কলেরা রোগ অথবা অপদেবতার ভীতি তাদের পেয়ে বসত তখন ভীতি দূর করার জন্য তারা গ্রামের ফটকের সামনে 10 বার গাধার ন্যায় চিৎকার করত। আবার কখনো কখনো এরূপ চিৎকার করার সময় শিয়ালের হাড় ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখত।

খ. যখন তারা কোন মরুপ্রান্তরে হারিয়ে যেত তখন তারা তাদের পরিধেয় বস্ত্র উল্টে-পাল্টে পরত। সফর করার সময় যখন তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতা করার আশংকা করত তখন তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোন গাছের কাণ্ডে বা ডালে একটি সুতা বেঁধে রাখত। ফেরার সময় যদি তারা দেখতে পেত,সুতা অক্ষত ও পূর্বের অবস্থায় আছে তাহলে তারা নিশ্চিত হতো যে,তাদের পত্নীরা বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। আর যদি তারা দেখতে পেত,সুতাটি নেই অথবা খুলে গেছে তাহলে তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করত।

যদি তাদের সন্তানদের দাঁত পড়ে যেত তাহলে তারা ঐ দাঁতটিকে দু আঙ্গুল দিয়ে ধরে সূর্যের দিকে ছুঁড়ে দিত ও বলত, হে সূর্য! এ দাঁতের চেয়ে উত্তম দাঁত দাও।” যে নারীর সন্তান বাঁচত না সে যদি কোন বয়স্ক মানুষের নিহত লাশের ওপর দিয়ে সাত বার হাঁটত,তখন তারা বিশ্বাস করত যে,তার সন্তান জীবিত থাকবে।

এগুলো হচ্ছে অগণিত কুসংস্কারের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র যা জাহেলী যুগের বেদুইন আবরদের জীবনধারাকে প্রগাঢ়ভাবে তিমিরাচ্ছন্ন করেছিল এবং তাদের চিন্তা-ভাবনাকে উন্নতির সুউচ্চ শিখরে উড্ডয়ন করা থেকে বিরত রেখেছিল।

ইসলামের আবির্ভাবের সময়ে আরবের সামাজিক অবস্থা

মানব জাতি সামাজিক জীবনের দিকে প্রথম যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা ছিল গোত্রীয় জীবন। গোত্র ছিল কতগুলো পরিবার ও আত্মীয়ের সমষ্টি যারা গোত্রের শেখ বা নেতার নেতৃত্বাধীনে জীবনযাপন করত। আর এভাবে গোত্রের মাধ্যমে সমাজের আদিমতম চিত্র বা রূপ অস্তিত্ব লাভ করে। সে সময়ের আরব জাতির জীবনযাত্রা এমনই ছিল। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের সাথে যোগ দিয়ে ছোট একটি সমাজ গঠন করত। গোত্রের সকল সদস্য গোত্রপতির আদেশ মেনে চলত। যে বিষয়টি তাদের পরস্পর সম্পর্কিত করে রেখেছিল তা ছিল তাদের গোত্রীয় বন্ধন ও আত্মীয়তা। এ সব গোত্র সব দিক থেকেই পরস্পর পৃথক ছিল;তাদের আচার-প্রথাও পৃথক ছিল। কারণ অন্য সকল গোত্র মূলত একে অপর থেকে আলাদা ও অপরিচিত বলে গণ্য হতো। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের কোন অধিকার ও সম্মান আছে-এ কথার স্বীকৃতি দিত না। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন,সদস্যদের হত্যা এবং নারীদের অপহরণ করা তাদের আইনসংগত ন্যায্য অধিকার বলে গণ্য করত। তবে কোন গোত্রের সাথে যদি চুক্তি থাকত সে ক্ষেত্রে ছিল অন্যকথা। অন্যদিকে প্রতিটি গোত্র যখনই আগ্রাসন ও আক্রমণের শিকার হতো তখন সকল আগ্রাসনকারীকে হত্যা করা তাদের ন্যায্য অধিকার বলে গণ্য হতো। কারণ তারা বিশ্বাস করত যে,একমাত্র রক্ত ব্যতীত অন্য কিছু রক্তকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে সক্ষম নয়।

আরব জাতি ইসলাম ধর্ম কবুল করার মাধ্যমে গোত্রতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পদার্পণ করে। মহানবী (সা.) বিক্ষিপ্ত আরব গোত্রগুলোকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে যে সব গোত্র সুদূর অতীতকাল থেকে পরস্পর দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও আক্রমণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং একে অন্যের রক্ত ঝরাত তাদের অল্প সময়ের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করা সত্যি একটি বড় কাজ এবং একটি অতুলনীয় সামাজিক মুজিযা (অলৌকিক বিষয়) বলে গণ্য। কারণ এ ধরনের বিশাল পরিবর্তন যদি কতগুলো স্বাভাবিক পরিবর্তন ও রূপান্তরেরই ফল হতো তাহলে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এবং অগণিত মাধ্যম ও উপায়-উপকরণের প্রয়োজন হতো।

টমাস কারলাইল বলেছেন, মহান আল্লাহ্ ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে আরব জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পরিচালিত করেছেন। সে জাতি স্থবির ছিল,যাদের ধ্বনি শোনা যেত না,যাদের কর্মতৎপরতা ও প্রাণচাঞ্চল্য অনুভূত হতো না তাদের থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব হয় যারা অখ্যাতি থেকে খ্যাতির দিকে,অলসতা ও শৈথিল্য থেকে জাগরণের দিকে,হীনতা ও দীনতা থেকে উচ্চ মর্যাদার পানে,দুর্বলতা ও অক্ষমতা থেকে শক্তি ও ক্ষমতার দিকে অগ্রসর হয়েছে। তাদের থেকে আলো পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর একশ বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মুসলিম উম্মাহ্ এক পা ভারতে ও অপর পা আন্দালুসিয়ায় (বর্তমান স্পেন) রাখতে সক্ষম হয়েছিল।”48

পাশ্চাত্যের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মেসিয়োর ন্যাঁ (مسيورنان ) তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন,

“এই বিস্ময়কর সুমহান ঘটনা (ইসলাম) যা আরব জাতিকে দিগ্বিজয়ী এবং উন্নত চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার উদ্ভাবকের পোশাকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে-তা ঘটার সময়কাল পর্যন্ত আরব উপদ্বীপের কোন অঞ্চলই না বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের অংশ বলে গণ্য হতো,আর না বিজ্ঞান বা ধর্মের দৃষ্টিতে সেখানে সভ্যতার কোন নিদর্শন বিদ্যমান ছিল।”49

হ্যাঁ,জাহেলিয়াত যুগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তগণ অর্থাৎ বিভিন্ন আরব গোত্র না কোন সভ্যতার আলো প্রত্যক্ষ করেছে,আর না তাদের কোন শিক্ষা-দীক্ষা,নিয়ম-কানুন ও আচার-প্রথার প্রচলন ছিল। যে সকল সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ও ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য উন্নতি ও সভ্যতা বিকাশের কারণ সেগুলো থেকে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত ছিল। অতএব,কখনই আশা করা যেত না যে,এই জাতি এত অল্প সময়ের মধ্যে মর্যাদা ও সম্মানের শীর্ষে আরোহণ করবে এবং সংকীর্ণ গোত্রীয় জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার সুবিস্তৃত জগতের পানে অগ্রসর হবে।

পৃথিবীর জাতিসমূহ আসলে ইমারতসদৃশ। যেমনভাবে একটি মৌলিক ইমারত মজবুত উপাদানের মুখাপেক্ষী যা সঠিক পদ্ধতি অনুসারে এবং পূর্ণ শৃঙ্খলার সাথে নির্মিত হয়েছে যাতে করে তা ঝড়-ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টি-বাদলের প্রভাব থেকে টিকে থাকতে এবং স্থায়ী হতে পারে,ঠিক তেমনি একটি সাহসী ও নৈতিক গুণসম্পন্ন জাতির গঠন-কাঠামো ও দৃঢ় ভিত্তিসমূহ অর্থাৎ মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস,পূর্ণাঙ্গ রীতি-নীতি এবং উন্নত মানবীয় স্বভাব-চরিত্রের মুখাপেক্ষী যাতে তা অস্তিত্ব বজায় রাখতে ও প্রগতির পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।

এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে অবশ্যই ভেবে দেখা উচিত যে,কোথা থেকে এবং কিভাবে জাহেলী বেদুইন আরবদের ক্ষেত্রে এত আশ্চর্যজনক পরিবর্তন সাধিত হলো? যে জাতি গতকাল পর্যন্তও নিজেদের সার্বিক শক্তি মতবিরোধ ও কপটতার মধ্যে ব্যবহার করে নিঃশেষ করত এবং সব ধরনের সমাজব্যবস্থা থেকে বহু দূরে ছিল,এত অত্যাশ্চর্যজনক দ্রুতগতিতে সৌহার্দ,সম্প্রীতি ও ঐক্যের বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে গেল এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করল যে,সেই সময়ের বিশ্বের বৃহৎ জাতিসমূহকে তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও রীতিনীতির সামনে নতজানু ও একান্ত আনুগত্যশীল করতে সক্ষম হয়েছিল।

সত্যিই যদি নির্ধারিত হয়ে থাকে যে,হিজায অর্থাৎ আরব উপদ্বীপের আরব জাতি এত উন্নতি করবে এবং এত বড় সম্মান ও গৌরবের অধিকারী হবে তাহলে ইয়েমেনের আরবগণ যারা (পূর্ব হতে) সভ্যতা ও কৃষ্টির অধিকারী ছিল তারা বছরের পর বছর ধরে রাজত্ব করেছে এবং বড় বড় শাসনকর্তাকে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছে তারা কেন এ ধরনের উন্নতি ও প্রগতির অধিকারী হতে পারে নি? শামদেশের প্রতিবেশী গাসসানী আরবগণ যারা সভ্য রোমীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে জীবনযাপন করত তারা কেন উন্নতি ও বিকাশের এ পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হয় নি? হীরার আরবগণ যারা গতকালও বিশাল পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাস করত তারা কেন এ ধরনের উন্নতি করতে সক্ষম হয় নি? প্রাগুক্ত জাতিসমূহ যদি এ ধরনের সাফল্য অর্জন করত তাহলে তা আশ্চর্যজনক বিষয় বলে বিবেচিত হতো না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এটিই যে,হিজাযের আরবগণ যাদের নিজেদের কোন ইতিহাসই ছিল না তারাই সুমহান ইসলামী সভ্যতার উত্তরাধিকারী হয়েছে।


5

6

7

8

9

10

11

12

13

14