ইনসানে কামেল

ইনসানে কামেল 11%

ইনসানে কামেল লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: -
বিভাগ: চরিত্র গঠনমূলক বই

ইনসানে কামেল
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 83 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42358 / ডাউনলোড: 7041
সাইজ সাইজ সাইজ
ইনসানে কামেল

ইনসানে কামেল

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

ইনসানে কামেল

মূল : শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী

অনুবাদ : এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর

মানুষের আত্মিক ও মানসিক ত্রুটি

আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ইসলামের দৃষ্টিতে ইনসানে কামেল বা পূর্ণ মানব। ইনসানে কামেল বা পূর্ণ মানব অর্থ আদর্শ মানুষ,সর্বোত্তম মানুষ বা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। অন্যান্য বস্তু বা জিনিষের মত মানুষেরও পূর্ণতা ও অপূর্ণতা রয়েছে,এমনকি ত্রুটিযুক্ত ও ত্রুটিহীন হওয়ার বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। ত্রুটি মুক্ত মানুষ আবার দু ধরনের : পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত মানুষ এবং অপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত মানুষ। পূর্ণ বা আদর্শ মানুষকে চেনা ইসলামের দৃষ্টিতে আমাদের প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ যদি আমরা পূর্ণমুসলমান হতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের জানতে হবে পূর্ণ মানব কিরূপ। যেহেতু ইসলাম চায়পূর্ণ মানব তৈরি করতে এবং ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পূর্ণ মানব গড়ে তুলতে,সুতরাং আদর্শ মানুষের নমুনা আমাদের সামনে থাকতে হবে। এখানে আমরা পূর্ণ মানবের প্রকৃতি,তার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করছি। সে কেমন প্রকৃতির,তার আধ্যাত্মিক প্রকৃতি কেমন,একজন পরিপূর্ণ মানুষের চিহ্নিত বৈশিষ্ট্যসমূহ কি? যদি আমরা তা জানতে পারি তবেই নিজেকে ও সমাজকে সেভাবে গড়ে তুলতে পারব। যদি আমরা পরিপূর্ণ মানুষকে চিনতে না পারি তাহলে কোনক্রমেই পূর্ণ মুসলমান হতে পারব না। অন্যভাবে বলা যায় যে,আমরা ইসলামের দৃষ্টিতে একজন অপূর্ণ মানুষে পরিণত হব।

 

ইসলামের দৃষ্টিতে পূর্ণ মানব বা ইনসানে কামেলকে চেনার উপায়

 ইসলামের দৃষ্টিতে পরিপূর্ণ মানুষকে চেনার জন্য দু টি পথ রয়েছে। একটি পথ হচ্ছে প্রথমত আমরা দেখব কোরআন ও দ্বিতীয়ত সুন্নাত ইনসানে কামেলকে কিভাবে বর্ণনা করেছে। যদিও কোরআন ও সুন্নাতে এভাবে ইনসানে কামেলের ব্যাখ্যা করা হয়নি,বরং পরিপূর্ণ মুসলমান ও পূর্ণ মুমিনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছে,তবে এটা স্পষ্ট যে,পরিপূর্ণ মুসলমান অর্থ- যে মানব ইসলামের মধ্যে দিয়ে পূর্ণতায় পৌছেছে এবং পরিপূর্ণ মুমিন সে-ই যে ঈমানের ছায়ায় পরিপূর্ণতায় পৌছেছে। আমাদের অবশ্যই দেখতে হবে কোরআন ও সুন্নাত পরিপূর্ণ মানুষকে কিভাবে বর্ণনা করেছে এবং পরিপূর্ণ মানুষের প্রতিকৃতির বিষয়ে প্রচুর বর্ণনা এসেছে।

পরিপূর্ণ মানুষকে চেনার দ্বিতীয় পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে কোরআন ও সুন্নাতে পরিপূর্ণ মানুষ সম্পর্কে কিরূপ বর্ণনা এসেছে তা থেকে নয়,বরং ঐ সকল ব্যক্তিকে তাদের জীবনী থেকে চিনব যাদের উপর. আমরা আস্থা লাভ করেছি যে,ইসলাম ও কোরআন যেভাবে চায় তারা সেভাবে গড়ে উঠেছেন। ইসলামের পূর্ণ মানুষের হুবহু প্রতিকৃতি হলেন তারা। যেহেতু ইসলামের পরিপূর্ণ মানুষ শুধু আদর্শিক,কল্পনা ও চিন্তাগত কোন বিষয় নয় যে,বাস্তবে তার অস্তিত্ব থাকবে না। পরিপূর্ণ মানুষ সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন উভয় পর্যায়েই বাস্তবে অস্তিত্ব লাভ করেছে।

 মহানবী (সা.) নিজেই পূর্ণ মানবের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। হযরত আলী (আ.) অন্য এক পূর্ণ মানবের নমুনা। আলী (আ.)-কে চেনা অর্থ পরিপূর্ণ মানুষেকে চেনা। কিন্তু আলীকে চেনা এটা নয় যে,তার পরিচয় পত্র জানা। কখনো মানুষ আলীকে পরিচয় পত্র থেকে চিনে যে,তার নাম আলী,আবু তালিবের পুত্র,আবু তালিব আবদুল মুত্তালিবের পুত্র,মাতা ফাতেমা যে আসাদ ইবনে আবদুল ওজ্জার কন্যা,তিনি (আলী) মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমার সহধর্মী,হাসান ও হুসাইনের পিতা,অমুক বছর জন্মগ্রহণ করেছেন,অমুক বছর শাহাদাত বরণ করেছেন,অমুক অমুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন-এগুলো আলীর পরিচয় জানা। অর্থাৎ যদি চাই আলীর জন্য একটি পরিচয় পত্র তৈরি করব ও পরিচয়পত্র সম্পর্কে জানব তবে তা এরূপই হবে। কিন্তু আলীর পরিচয় পত্র জানা আলীকে জানা নয় বা একজন পরিপূর্ণ মানুষকে চেনাও নয়। অর্থাৎ আলীকে জানা তার ব্যক্তিত্বকে জানা,ব্যক্তি আলীকে নয়। আলীর সম্মিলিত ব্যক্তিত্বের যতটুকু আমরা জানব,ইসলামের পরিপূর্ণ মানুষকে ততটূকু চিনব। আর শুধু নাম ও শাব্দিক অর্থে নয়,বরং কার্যক্ষেত্রে পূর্ণ মানুষকে যতটুকু অনুসরণ করেছি তাকে সে পরিমাণ ইমাম বা নেতা হিসেবে মেনেছি ও তার পথে চলেছি; তার অনুসারী ও অনুগামী হয়েছি ও যতটুকু চেষ্টা করছি নিজেকে সেই আদর্শ অনুযায়ী তৈরি করতে ঠিক সেই পরিমাণ এ কামেল পুরুষের অনুসারী হয়েছি। যেহেতু শহীদ (প্রথম) লোমআ গ্রন্থেالشیعة من شایع علیا -এ বাক্যের অর্থ করতে গিয়ে বলেন,(অন্যরাও তা বলেছেন) শিয়া ঐ ব্যক্তি যে আলীর সহযাত্রী হয়েছে। অর্থাৎ শুধু বলার মাধ্যমে শিয়া হবে না (যে আমি শিয়া),নাম ধারণ করলেই শিয়া হবে না,শুধু ভালবাসা ও পছন্দের দাবিতে শিয়া হবে না। তাহলে কিভাবে শিয়া হবে? সহযাত্রী হয়ে অর্থাৎ পদানুসরণের মাধ্যমে। যখন কেউ একজন যে পথে চলে আপনি তার পেছনে পেছনে বা সঙ্গে যাবেন আপনাকে তার সহযাত্রী বা পদাঙ্কনুসারী (شایع ) বলা হবে। আলীর শিয়া অর্থ আলীর কর্মের পদাঙ্কনুসারী।

তাহলে পূর্ণ মানবকে চেনার দু টি পথ ও সে সাথে এ সম্পর্কে আলোচনার উপকারিতাও জানতে পারলাম। সুতরাং ইনসানে কামেল বিষয়টি শুধু একটি দার্শনিক ও জ্ঞানগত বিষয় নয় যে,কেবল জ্ঞানগত প্রভাব রয়েছে। যদি ইসলামের পূর্ণ মানবকে কোরআন ও সুন্নাতের বর্ণনা থেকে ও কোরআন দ্বারা পরিবর্ধিত রূপে না জানি তাহলে ইসলাম নির্দেশিত পথে চলতে পারব না এবং প্রকৃত ও সত্যিকারের মুসলমান হতে পারব না। অনুরূপ আমাদের সমাজও একটি ইসলামী সমাজ হতে পারবেনা। সুতরাং ইসলামের পূর্ণ,শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যের মানুষকে চেনা অপরিহার্য।

কামাল (کمال ) ও (تمام ) তামামের পার্থক্য

এখন প্রশ্ন হলো কামেল کمال)) এর প্রকৃত অর্থ কি? ইনসানে কামেল -এর অর্থই বা কি? আরবী ভাষায় এ দু শব্দের অর্থ কাছাকাছি হলেও এক নয়; যদিও দু টিরই বিপরীত শব্দ এক অর্থাৎ শব্দটি কখনো প্রথমটির বিপরীত শব্দ হিসেবে আবার কখনো দ্বিতীয়টির বিপরীত শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়,এমনকি ফার্সীতে ঐ দু টি শব্দের পরিবর্তে একটি শব্দই রয়েছে। ঐ দু টি শব্দ আরবীতে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হলেও  کمال এবং تمام দু টিরই বিপরীত শব্দ ناقص (নাকিস) অর্থাৎ অসম্পূর্ণ। যেমন ফার্সীতে বলা হয় : এটা(کمال) বা সম্পূর্ণ এবং ওটাناقص বা অসম্পূর্ণ; তেমনি বলা হয়,এটাتمام ওটাناقص

আল কোরআনের একটি আয়াতে এ দু টি শব্দই এসেছে-

) الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي(

 “ আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নেয়ামতকে তোমাদের জন্য সম্পূর্ণ করলাম। (সূরা মায়েদা : ৩)

এখানে এটা বলা হয়নি যে,وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي বা,أَكْمَلْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي যদি তা বলা হতো,তবে আরবী ব্যাকরণে ভুল বলে গণ্য হতো। এখন এ দু শব্দের পার্থক্য কি? যদি আমরা এ দু য়ের পার্থক্যকে স্পষ্টরূপে প্রকাশ না করি তাহলে আমাদের আলোচনা শুরু করতে পারব না। অর্থাৎ আমাদের আলোচনার শুরু হবে এ দু শব্দের অর্থ জানার মাধ্যমে।

تمام কোন বস্তুর জন্য তখনই বলা হবে যখন ঐ বস্তুর বাস্তব অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় সকল কিছুই অস্তিুত্বে এসে থাকে। অর্থাৎ যদি তা থেকে কিছু জিনিস অনুপস্থিত থাকে,তবে বস্তুটি ঐ বস্তু হওয়ার ক্ষেত্রে অপূর্ণ অথবা বলা যায় বস্তুটি তার অস্তিুত্বের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ। যেমন অর্ধেক অস্তিুত্ব লাভ করেছে,এক-তৃতীয়াংশ অস্তিুত্ব লাভ করেছে বা দুই-তৃতীয়াংশ অস্তিুত্ব লাভ করেছে ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ একটি পরিকল্পিত মসজিদের বিল্ডিংয়ের জন্য হলরুম দরকার। রুমের জন্য দেয়াল,ছাদ,দরজা,জানালা ও অন্যান্য জিনিস প্রয়োজন। যদি ঐ বিল্ডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় এ সকল অংশ বিদ্যমান না থাকে তবে ঐ বিল্ডিং ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। যখন প্রয়োজনীয় সব কিছু বিদ্যমান থাকবে তখন বলা যাবে বিল্ডিং সম্পূর্ণ (তামাম) হয়েছে। এ শব্দের বিপরীত স্থানকে নির্দেশ করতে অসম্পূর্ণ বা নাকিস ব্যবহার করা হয়। কোন বস্তু সম্পূর্ণতা লাভ করলেই তা পূর্ণতা লাভ করেছে বলা যায় না,বরং বস্তুটি হয়তো কখনো এর থেকে এক স্তর উপরের পর্যায়ের,কখনো কয়েক স্তর উপরের পর্যায়ের পূর্ণতা লাভ করে,এভাবে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত। যদি এই کمال বা পূর্ণতা ঐ বস্তুর না থাকে তবুও তা ঐ বস্তুরই। কিন্তু পূর্ণতা লাভ করার অর্থ তা থেকে এক স্তর উপরে অবস্থান লাভ করা।

কামাল বা পূর্ণতাকে আড়াআড়ি বা সমান্তরালভাবে বর্ণনা করা হয়। যখন বস্তু সমান্তরালভাবে শেষপ্রান্তে বা পরিসীমায় পৌছায় তখন বলা হয় সম্পূর্ণ(تمال) হয়েছে এবং বস্তু যখন লাম্বিকভাবে উপরের দিকে বাড়তে থাকে বা উন্নতি লাভ করে তখন বলা হয় পূর্ণতা کمال)) লাভ করেছে। যদি বলা হয় অমুক ব্যক্তির বুদ্ধি (আকল) পূর্ণতা লাভ করেছে,এর অর্থ পূর্বেও তার বুদ্ধি ছিল,কিন্তু তার বুদ্ধি পূর্বের চেয়ে উপরের পর্যায়ে পৌছেছে বা পরিপক্ব হয়েছে। অথবা যদি বলা হয় অমুক ব্যক্তির জ্ঞান পূর্ণর্তা লাভ করেছে তাহলে এর অর্থ পূর্বেও তার জ্ঞান ছিল ও সে তা ব্যবহার করত,কিন্তু এখন তার জ্ঞান পূর্ণতার এক স্তর অতিক্রম করেছে। সুতরাং আমরা দেখছি,একজন সম্পূর্ণ মানুষ আছে যার বিপরীতে সমান্তরালভাবে চিন্তা করে অসম্পূর্ণ মানুষও আছে অর্থাৎ অর্ধেক মানুষ বা মানুষের ভগ্নাংশ। উদাহরণস্বরূপ এক-তৃতীয়াংশ বা দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থাৎ সম্পূর্ণ মানুষ নয়। অন্য এক প্রকার মানুষও আছে যে মানুষ সম্পূর্ণ ও এই সম্পূর্ণ মানুষ পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হতে পারে-এভাবে সর্বোচ্চ পরিসীমা পর্যন্ত যার উপর কোন পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারে না যাকে পরিপূর্ণতম বা সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষ বলা যায়।

ইনসানে কামেলের ব্যাখ্যা

সপ্তম হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামী সাহিত্যে ইনসানে কামেলের কোন ব্যাখ্যা ছিল না। বর্তমানে ইউরোপেও মানুষ সম্পর্কে এ ব্যাখ্যা প্রচলিত থাকলেও ইসলামী বিশ্বে মানুষ সম্পর্কে এ ভাষা সপ্তম হিজরীতে ব্যবহৃত হয়েছে। যিনি মানুষ সম্পর্কে প্রথম ইনসানে কামেল শব্দটি ব্যবহার করেছেন তিনি হলেন বিখ্যাত আরেফ মহিউদ্দিন আরাবী আন্দালুসী তায়ী। মহিউদ্দিন আরাবী ইসলামী এরফানের (আধ্যাত্মিকতার) জনক। সপ্তম হিজরীর পর থেকে যত আরেফ ইসলামী জাতিসমূহের মধ্যে এসেছেন,যেমন ইরানী ও ফার্সী ভাষার আরেফগণ সকলেই মহিউদ্দিন আরাবীর ছাত্র। মৌলভী (মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী) মহিউদ্দিন আরাবীর মক্তবের ছাত্র। রুমী তার সকল মর্যাদাসহ এরফানের দৃষ্টিতে মহিউদ্দিন আরাবীর তুলনায় কিছূই নন। মহিউদ্দিন আরব জাতিভুক্ত ও হাতেম তায়ীর বংশধর এবং আন্দালুসের অধিবাসী ছিলেন। তার সকল ভ্রমণ ইসলামী দেশসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তিনি সিরিয়াতে মৃত্যুবরণ করেন। তার কবর দামেস্কে। সিরিয়ায় মৃত্যুবরণ করা ও সেখানে দাফন হওয়ায় তাকে শামী বলা হয়। তার ছাত্রদের মধ্যে সদরুদ্দিন কৌনাভী তার পরে সবচেয়ে বড় আরেফ হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে ইসলামী এরফান যে একটি জ্ঞানের রূপে এসেছে তা শুধু মহিউদ্দিন আরাবী ও সদরুদ্দীন কৌনাভীর কর্মপচেষ্টার ফলেই। সদরুদ্দিন কৌনাভী তুরস্কের কৌনীর বাসিন্দা ও মহিউদ্দিন আরাবীর স্ত্রীর পূর্ববতী স্বামীর ঔরসজাত পুত্র ছিলেন। অর্থাৎ মহিউদ্দীন তার শিক্ষকও ছিলেন আবার সৎ পিতাও। মৌলভী জালালুদ্দিন রুমী সদরুদ্দিন কৌনাভীর সমসাময়িক ছিলেন। সদরুদ্দিন একটি মসজিদের জামায়াতের ইমাম ছিলেন। মৌলভী সেখানে যেতেন ও তার পেছনে নামাজ পড়তেন। মহিউদ্দিন আরাবীর চিন্তা সদরুদ্দিনের মাধ্যমে মৌলভীর কাছে স্থানান্তরিত হয়েছিল।

অন্যতম যে বিষয়টি এ ব্যক্তি উপস্থাপন করেন তা ইনসানে কামেল সম্পর্কিত। তবে তিনি বিষয়টি এরফানের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে সাহেবে মানজুমে খ্যাত মাহমুদ সাবেস্তারীর সবচেয়ে উন্নত ও মূল্যবান সাহিত্যমান সম্পন্ন বই গুলশানে রজ -এ যে প্রশ্নগুলো ইনসানে কামেলের ব্যপারে এসেছে সদরুদ্দিন এরফানের দৃষ্টিতে সেগুলোর জবাব দিয়েছেন। সুতরাং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এ বিষয়টি ইনসানে কামেল শিরোনামে উপস্থাপন করেছেন ও এরফানের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন। অন্যরাও ইনসানে কামেলকে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে ও রূপে বর্ণনা করেছেন। আমরা দেখতে চাই ইনসানে কামেল কোরআনের দৃষ্টিতে কেমন মানুষ। আলোচনাকে সম্পূর্ণ মানুষ অসম্পূর্ণ মানুষ দিয়ে শুরু করছি যেন এ বিষয়ের উপর পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করতে পারি।

শারিরীক ও মানসিক ক্রটি

আমাদের মধ্যে কি ত্রুটিহীন এবং ত্রুটিযুক্ত মানুষও রয়েছে? সুস্থতা ও অসুস্থতা (ত্রুটি) কখনো কখনো মানুষের দেহের সাথে সম্পর্কিত। সন্দেহ নেই যে,কিছু মানুষ শারীরিকভাবে সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত এবং কিছু মানুষ ত্রুটিযুক্ত ও অসুস্থ। উদাহরণস্বরূপ শারীরিক ত্রুটি,যেমন দৃষ্টিহীনতা ও অন্ধত্ব,পঙ্গুত্বও পক্ষাঘাতগ্রস্ততা প্রভৃতি। কিন্তু এগুলো ব্যক্তি-মানুষের সাথে সম্পর্কিত,মানুষের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নয়। কোন ব্যক্তি যদি অন্ধ,বধির,পঙ্গু,খাটো বা কুৎসিত চেহারার হন,এ ত্রুটিগুলোকে আপনি তার মর্যাদা,ব্যক্তিত্ব ও মনুষত্বের ক্ষেত্রে ত্রুটি হিসেবে দেখেন না। যেমন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস যাকে নবীদের পরবর্তী পর্যায়ের জ্ঞানী বলে ধরা হয় তিনি পৃথিবীর এক কদাকার মানুষ ছিলেন। কিন্তু কেউই তার এ কদাকৃতিকে একজন মানুষ হিসেবে তার ত্রুটি বলে মনে করেন না। অথবা আবুল আলা মাযারি (আরব কবি) এবং ত্বাহা হোসেইন (মিশরীয় সাহিত্যিক) যারা উভয়ই অন্ধ ছিলেন,তাদের এ শারীরিক ত্রুটি ব্যক্তিগত ত্রুটি হিসেবে পরিগণিত হলেও তাদের ব্যক্তিত্বের জন্য ত্রুটি বলে গণ্য হবে কি? অবশ্যই নয়। সুতরাং মানুষের ব্যক্তি দিক তার ব্যক্তিত্বের দিক হতে যে ভিন্ন তা প্রমাণিত সত্য। একটি তার দেহের সাথে,অন্যটি তার রূহের সাথে সম্পর্কিত। মনের বিষয় তার দেহ থেকে ভিন্ন। যারা মনে করেন মানুষের মন একশ ভাগ দেহের অনুগত তাদের ভুল এখানেই। প্রকৃতপক্ষে মানুষের দেহ পুরোপুরি সুস্থ থাকলেও তার অন্তর কি অসুস্থ হতে পারে? এটা একটা প্রশ্ন সুতরাং যারা রূহ বা আত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে চান এবং রূহের সকল বৈশিষ্ট্যকে মানুষের স্নায়ুর সরাসরি প্রতিক্রিয়া বলে মনে করেন,তারা প্রকৃতপক্ষে বলতে চান যে,মন কিছুই নয়,সবই দেহের অনুগামী। তাদের মতে মন অসুস্থ হওয়ার অর্থ তার দেহ অসুস্থ। অর্থাৎ মানসিক অসুস্থতা এবং দৈহিক অসুস্থতা একই।

এটা আনন্দের বিষয় যে,বর্তমানে এটা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে একজন মানুষ শারীরিক দৃষ্টিকোণ থেকে (যেমন শরীরে লোহিত ও শ্বেত রক্তকণিকার পরিমাণ দেহে ভিটামিনের পরিমাণ,পরিপাকতন্ত্রের মেটাবলিক কার্যক্রম,এমনকি নিউরোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে) সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও মানসিকভাবে অসুস্থ হতে পারে। কিভাবে তা সম্ভব? আধুনিক পরিভাষায় একে মানসিক জটিলতা বলা হয়। আধুনিক বিজ্ঞান মানসিক জটিলতাসম্পন্ন মানুষকে অসুস্থ বলে মনে করে। এমন ব্যক্তিরদেহে শারীরিক কোন জটিলতা সৃষ্টি না হয়েই মানসিক জটিলতার সৃষ্টি য়েছে। তাই এ ধরনের অসুস্থতার চিকিৎসা শারীরিকভাবে না করে মানসিকভাবে করতে হয়। যেমন অহংকার যা মানসিক জটিলতা থেকে উদ্ভূত,একটি রোগ বলে বর্তমানে প্রমাণিত তা প্রকৃতপক্ষেই একটি আত্মিক ও মানসিক রোগ। কিন্তু কোন ঔষধের দোকানে অহংকার রোগের ঔষধ পাওয়া যাবে কি? কিংবা বাস্তবে এটা কি সম্ভব যে,অহংকারী ব্যক্তি একটি ট্যাবলেট খাবে আর সাথে সাথে তার অহংকার বিলুপ্ত হয়ে সে এক নিরহংকার ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে যাবে? না,এটা কখনোই সম্ভব নয় যে,জল্লাদ ও পাষাণ হৃদয়ের শিমারের মত কাউকে একটা ইনজেকশন পুশ করা হবে বা একটা ট্যাবলেট খাইয়ে দেয়া হবে আর সে রাতারাতি একজন দয়ালু,হৃদয়বান ও প্রশস্ত অন্তরের মানুষে পরিণত হয়ে যাবে। তবে এ ব্যাধিগুলোর চিকিৎসার বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে যা এভাবে নয়।

এমনকি শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসাও কখনো কখনো মানসিকভাবে করা সম্ভব। যেমনভাবে কখনো কখনো মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা শারীরিকভাবে করা হয়ে থাকে। যেমন কোন রোগ হয়তো শারীরিক,কিন্তু মানসিক উদ্দীপনা ও আত্মিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে তার চিকিৎসা করা হয়। এ বিষয়ে আলোচনা বেশ ব্যাপক এবং বিষয়টি আশ্চর্য হওয়ার মতোও বটে। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়,মানুষ দেহ ও মনের সমন্বয়ে এক সৃষ্টি এবং মানুষের মন তার দেহ হতে স্বাধীন ও সম্পূর্ণরূপে দেহের অনুগামী নয়। তেমনিভাবে দেহও পুরোপুরি মনের অনুগামী নয়। তবে এরা একে অপরকে প্রভাবিত করে। জ্ঞানীদের ভাষায় দেহ ও মন একে অপরের উপর গঠনমূলক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ যেমনভাবে দেহ মনের উপর প্রভাব ফেলে তেমনভাবে মনও দেহের উপর প্রভাব ফেলে। সেই সাথে পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবেও কাজ করে। তাই মানুষের মনোজগৎ একটি স্বাধীন জগতের অধিকারী।

আমরা পূর্ণ মানবের আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে ত্রুটিহীন ও ত্রুটিযুক্ত মানুষের বিষয়টি এনেছি এজন্য যে,আমাদের নিকট এটা পরিষ্কার হওয়া যে,আমাদের উদ্দেশ্য এখানে শারীরিক সুস্থতা বা ত্রুটি নয় এবং আমাদের উদ্দেশ্য এটাও নয় যে,মানব দেহ কতটা সুস্থ তা নিরীক্ষা করা। প্রকৃতপক্ষে তা দিয়ে আমাদের কাজও নেই। আমাদের লক্ষ্য হলো বাস্তবে এটা প্রমাণ করা যে,মানুষ যেমনভাবে মানসিকভাবে সুস্থ হতে পারে তেমনিভাবে ত্রুটিযুক্ত ও অসুস্থও হতে পারে। কোরআন এ সত্যকে স্বীকৃতি দিয়ে বলছে,

) فِي قُلُوبِهِم مَّرَ‌ضٌ فَزَادَهُمُ اللَّـهُ مَرَ‌ضًا(

তাদের অন্তরে অসুস্থতা রয়েছে,অতঃপর আল্লাহ তাদের এ অসুস্থতাকে বৃদ্ধি করে দেন। (সূরা বাকারাহ্ : ১০)

এখানে আল্লাহ্ বলছেন তাদের অন্তর রোগাক্রান্ত ও রূহ অসুস্থ,এটা বলেননি যে,তাদের চক্ষু অসুস্থ। এখানে লক্ষণীয় কোরআন হৃদয় বা অন্তর বলতে যা বুঝিয়েছে তা চিকিৎসা বিজ্ঞানের হৃদয় বা হৃৎপিণ্ড নয় যে,এর আরোগ্যের জন্য হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। কোরআনের বর্ণিত হৃদয় হলো মানুষের আত্মা ও মানস। যেমন কোরআন অন্যত্র বলছে,

) وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْ‌آنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَ‌حْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ(

  আমরা কোরআনে যা কিছু অবতীর্ণ করেছি তা মুমিনদের জন্য আরোগ্য লাভের উপায় ও রহমতস্বরূপ। (সূরা বনি ইসরাইল : ৮২)

সুতরাং কোরআন মুমিনদের জন্য আরোগ্য লাভের উপায়।

আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) বলেন,الا و انّ من البلاء الفاقة জেনে রাখ,নিশ্চয়ই দারিদ্র্য একটি বড় বিপদو اشد من الفاقة مرض البدن এবং দারিদ্র্য হতে মন্দ শারীরিক অসুস্থতা

  و اشد من مرض البدن مرض القلب এবং শারীরিক অসুস্থতা হতে মন্দ ও কঠিন হলো অন্তরের অসুস্থতা। কোরআনের অন্যতম পরিকল্পনা হলো সুস্থ মানুষ তৈরি। তাই আমাদের পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পূর্বে সুস্থ ও ত্রুটিহীন মানুষ হতে হবে।

রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীর সংখ্যা

ইসলামের নবী (সা.) খাদিজার পর একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সাওদা , আয়েশা , গাজিয়া , হাফসাহ , উম্মে হাবিবা , উম্মে সালামাহ , যয়নাব বিনতে যাহেশ , যয়নাব বিনতে খুযাইমাহ , মাইমুনাহ , জুয়াইরিয়াহ , সাফিয়াহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

এখন যে পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-কে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে হয়েছে , সে সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।

মূলতঃ কয়েকটি উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) একাধিক বিয়ে করেছিলেন:

1.অনাথ ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের আত্মসম্মান রক্ষা করার জন্যে , যারা ইতোপূর্বে সম্মান ও প্রতিপত্তির সাথে জীবন যাপন করতেন , কিন্তু স্বীয় অভিভাবককে হারানোর ফলে তাদের সম্মান প্রতিপত্তি এখন বিপর্যস্ত , মহানবী (সা.) তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। নতুবা তাদের গোত্র তাদেরকে ফিরিয়ে নিত এবং তাদেরকে কুফর করতে ও ইসলামের অস্বীকৃতিতে বাধ্য করত। যেমন : সাত্তদা , যার স্বামী হাবাশায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার পর পরলোক গমন করেছিলেন। ফলে তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিলেন।

রাসূল (সা.) খাদিজাকে হারানোর পর বিপত্নীক ছিলেন এবং সাওদার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

যয়নাব বিনতে খুযাইমা ছিলেন রাসূলের অপর এক স্ত্রী। তিনি এক বিধবা রমণী ছিলেন যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর একদিকে অভিবাবকহীন এবং অপরদিকে দারিদ্রকবলিত হয়ে পড়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন দানশীলা , উদার এবং উম্মুল মাসাকীন (নিঃস্বদের মাতা) আল্লাহর রাসূল (সা.) যয়নাবের সম্মান রক্ষার্থে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যয়নাব বিনতে খুযাইমা রাসূলের জীবদ্দশায়ই পরলোক গমন করেন।

উম্মে সালমাও ছিলেন বয়স্কা ও অনাথ সন্তানের মাতা , ঈমানদার। তিনিও নবী (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

2.প্রচলিত অবস্থার পরিবর্তন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভ্রান্ত রীতি-নীতির প্রাচীর চূর্ণ করে দেয়ার জন্যে তাঁর ফুফাত বোন যয়নাব বিনতে জাহাশের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন , যিনি রাসূলের পালক পুত্র যায়েদ ইবনে হারিসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যায়েদের সাথে যয়নাবের যে বিবাহ মহানবী (সা.)-এর নির্দেশানুসারে সম্পন্ন হয়েছিল তা স্বয়ং ইসলামের শ্রেণী বৈষম্যহীন বিশেষত্বেরই দৃষ্টান্ত। কারণ , যয়নাব ছিলেন কোরাইশ অধিপতি আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্রাদের মধ্যে একজন , আর যায়িদ ছিল পারিবারিক দিক থেকে কৃতদাস , যিনি রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে মুক্তি পেয়েছিলেন।

যয়নাব যেহেতু অভিজাত পরিবারের ছিলেন , সেহেতু যায়েদের সাথে দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ করত ; আর এভাবে নিজের দাম্পত্য জীবনে তিক্ততা সৃষ্টি করত এবং রাসূল (সা.) তাদেরকে শতভাবে উপদেশ দিলেও তাতে কোন ফল হয়নি। অবশেষে যায়েদ যয়নাবের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিল এবং তাকে তালাক দিয়েছিল।

যয়নাব তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর আদেশে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন , যাতে মানুষের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার ও অযৌক্তিক রীতি-নীতির মূলোৎপাটিত হয়। (যেহেতু তারা পালক পূত্রকে স্বীয় প্রকৃত পুত্র বলে মনে করত এবং তার স্ত্রীকে নিজের জন্যে নিষিদ্ধ মনে করত)।35

খ্রিস্টবাদী কিছু লেখক এ বিষয়টির ক্ষেত্রে (হযরতের একাধিক বিবাহ) এতটা বিচ্যুত ও কুরটনাকারী হয়েছিল যে লিখেছিল : আল্লাহর রাসূল যয়নাবের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়েছিলেন! এ বক্তব্যটি এতটা অনর্থক ও অযৌক্তিক যে তা সমস্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির পরিপন্থী। কারণ যদি নবী (সা.) কুমন্ত্রনা ও এ ধরনের ধ্যান- ধারণার বশবর্তী হতেন কিংবা যয়নাবের রূপ সৌন্দর্য এতটা মনোহারী ছিল যে , হযরতকে প্রেমাসক্ত করে ফেলেছিল যদি তাই হতো , তবে কেন যখন যয়নাব কুমারী ও বিশেষ আকর্ষণের অধিকারী ছিল আর রাসূলও (সা.) উদ্দাম যৌবনের অধিকারী ছিলেন , তখন কেন তার প্রতি আসক্ত হলেন না ; বিশেষ করে এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে যয়নাব তো তখনও তার নিকট অপরিচিত ছিল না ? বরং রাসূলের নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই তিনি পরিগণিত হতেন এবং পারিবারিক পরিচিতের মাধ্যমে তারা পরস্পরের সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

3.বন্দী ও দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্যে ; যেমন , জুয়াইরিয়াকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। জুয়াইরিয়া ছিলেন সম্ভ্রান্ত বনি মুসতালিক গোত্রের কন্যা , যিনি ইসলামী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দী হয়েছিলেন। মহানবী (সা.) হারেসের কন্যা জুবাইরিয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। হারেস ছিলেন গোত্রপতি। মুসলমানরা যখন দেখল যে , বন্দীরা হযরতের আত্মীয়দের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে , তখন তাদের (বন্দীদের) অনেককেই মুক্তি দিয়েছিলেন। ইবনে হিশামের মতে এ বিবাহের সুবাদে বনি মুসতালিকের একশতটি পরিবার মুক্তি পেয়েছিল।36

4.আরবের বৃহত্তর গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংরক্ষণ করার জন্যে নবী (সা.) আয়েশা , হাফসা , উম্মে হাবিবা , সাফিয়া ও মাইমূনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

উম্মে হাবিবা ছিলেন সেই আবু সুফিয়ানের কন্যা যার বংশ (ইসলামের) রেসালতের ধারক সম্মানিত (হাশেমী) পরিবারের সাথে আপোসহীন শত্রুতা প্রদর্শন করত। তার স্বামী হাবাশে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হয়েছিল এবং অতঃপর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিল। উম্মে হাবিবা কঠিন সঙ্কটময় অবস্থায় দিনাতিপাত করছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন মুসলমান ; অপর দিকে তার পিতা ছিল নবী (সা.)-এর ঘোর শত্রু । ফলে তিনি তার পিতা (আবু সুফিয়ানের) নিকট আশ্রয় নিতে পারছিলেন না। সুতরাং উম্মে হাবিবা অভিভাবকহীন ও বঞ্চিত নারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন।

মহানবী (সা.) বনি উমাইয়্যাদের অন্তর জয় করার জন্যে এবং সেই সাথে উম্মে হাবিবার অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।37

সাফিয়া ছিলেন হাই ইবনে আখতাবের কন্যা , যিনি বনি নাযির গোত্রের প্রধান ছিলেন। ইহুদী বন্দীরা মুসলমানদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার পর হযরত (সা.) সাফিয়ার ব্যক্তিত্ব রক্ষা করার জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে অবদ্ধ হলেন। আর এ প্রক্রিয়ায় বনি ইসরাইলের একটি শ্রেষ্ঠ গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।38

বৃহত্তর গোত্র বনি মাখযুমের রমণী ছিলেন মায়মূনা , যাকে মহানবী (সা.) সপ্তম হিজরীতে বিবাহ সম্পন্ন করেন।39

নবী (সা.)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে আয়েশা ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় সকলেই বিধবা ছিলেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই যৌবনের উচ্ছলতা ও অভিলাষ হারিয়ে ছিলেন। আর এটাই এর সপক্ষে শ্রেষ্ঠ দলিল যে , রাসূল (সা.)-এর একাধিক বিবাহ বৃহত্তর কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। সুতরাং রাসূলের প্রতি কুমন্ত্রণা ইত্যাদির অপবাদ প্রদান কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না।

নবুওয়াত লাভের পূর্বে মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব

পারিপার্শ্বিকতার নীতি

মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে , পরিবেশ , কোন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ও চিন্তা-চেতনার ভিত্তি রচনা করে এবং পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধান ও অনুরূপ হওয়ার নীতি অনুসরণ তারা সামাজিক রীতি প্রথার পশ্চাদ্ধাবন করে।

যদিও এ ব্যাপারে একদল চরমপন্থা অবলম্বন করেছেন এবং এ মতবাদকে একটি সার্বিক ও সর্বজনীন নীতি বলে মনে করেছেন। তারা সকল সামাজিক বিষয় ও ঘটনাকে কোন প্রকার ব্যতিক্রম ব্যতীতই এ নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তবে ব্যক্তির মন মানসিকতার উপর পরিবেশের প্রভাব অনস্বীকার্য।

অতএব , কল্যাণময় ও সংযমী পরিবেশ , সমাজের সন্তানদেরকে সংযমী ও সুশৃঙ্খল রূপে গড়ে তোলে। অপরদিকে বিচ্যুত ও কলুষিত পরিবেশ কোন না কোন ভাবে ব্যক্তিকে বিচ্যুতি ও অনাচারের দিকে ঠেলে দেয়। অতএব , যিনি স্বীয় পথকে কলুষিত পরিবেশ থেকে পৃথক করে থাকেন , নিঃসন্দেহে তিনি কোন সাধারণ ব্যক্তিত্ব নন।

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের পরিবেশ

পৃথিবী , বিশেষ করে আরবভূমি তখন অজ্ঞতা ও অন্যায়ের সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল এবং আরবের জনগণ কুসংস্কার ও অনাচারের আগুনে জ্বলছিল। অজ্ঞতার কৃষ্ণকায় মেঘগুলো আরববাসীর জীবন-দিগন্তকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলেছিল এবং তারা অন্ধকারের ঘনঘটায় জীবনাতিবাহিত করছিল। কতইনা সম্পদ লুটতরাজ হতো , কতইনা রক্ত অন্যায় ভাবে ঝরত।

নিকৃষ্টতম ব্যাপার ছিল , প্রাণহীন মূর্তিসমূহের উপাসনা। কুসংস্কার ও শ্রেণী বৈষম্য সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিল। যার অস্তিত্ব সেথায় ছিলনা তা হলো ন্যায়পরায়ণতা ও নিয়ম শৃঙ্খলা । নিষ্ঠুর শক্তিধররা অন্যের শ্রম এবং বিধবা ও অনাথের ঘামের বিনিময়ে স্বীয় ধন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলত। আর আত্মম্ভরিতা ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করত এবং খেঁটে খাওয়া মানুষের উপর আগ্রাসন ও নিপীড়ন চালাত।

তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যনীতি এতটা খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল যে , অক্ষম স্বামীর ঋণের মোকাবিলায় তারা স্ত্রীকে দায়ী মনে করতো ; আর যদি অক্ষম , অপারগ কোন স্ত্রীর নিকট ঋণ থাকত তবে তার জন্যে তার স্বামীকে গ্রেফতার করত।40

উৎকর্ষ ও জ্ঞানার্জনের কোন উদ্যোগ তাদের ছিলই না , বরং এর পরিবর্তে তাদের পূর্বপুরুষ ও লোক জনের সংখ্যাধিক্যের জন্যে অহঙ্কার করত । কখনো কখনো কোন গোত্রের জনবলের আধিক্য প্রমাণ করার জন্যে তারা গোরস্থানে যেয়ে কবরের সংখ্যা গণনা করে তাদের সংখ্যাধিক্য দেখাত।41

হিংসা বিদ্বেষ , কাম-ক্রোধ , মদ্যপান , রক্তারক্তি ছিল তাদের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

ইমরুল কাইস নামক এক বিখ্যাত আরব কবি , তার চাচাত বোন উনাইযার সাথে শয়তানী ও উন্মাদ প্রেম ঘটিত ঘটনাবহুল অতীত সম্পর্কে নির্লজ্জ ভাবে তার কবিতায় বর্ণনা করেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এ কাব্যসমূহই সাহিত্য কর্মের নিদর্শন স্বরূপ কাবা ঘরের দেয়ালে টানানো হয়েছিল।

এটাই ছিল সে সমাজের জনজীবন ও আচার ব্যবহারের চিত্র , যে সমাজের অন্ধকারময় দিগন্ত থেকে ইসলামের জ্যোতি আত্মপ্রকাশ করেছিল।

নিঃসন্দেহে যিনি এহেন সমাজের রঙে রঞ্জিত না হয়ে , বরং এতে অস্বস্থি বোধ করতেন এবং এর বিরোধিতায় রত হতেন , তিনি এক মহান ও ঐশী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর তিনিই জাতির নেতৃত্বের জন্যে এবং বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্তি দানের জন্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।

নবীগণ (আ.) সমাজ গঠন করতেন , সমাজের অনুসরণ করতেন না

সকলেই মূর্তিনগরের দিকে ধাবিত হতো ; কিন্তু মহানবী (সা.) কারো কাছে শিক্ষা গ্রহণ না করলেও42 হেরা পর্বতের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সেথায় , শক্তি ও মর্যাদার অধিকারী বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর সম্মুখে সিজদাবনত হয়ে তাঁরই উপাসনায় আত্মনিয়োগ করতেন।43

হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর করুণার ছোঁয়ায় শৈশব থেকেই তাঁর পথ (সঠিকরূপে) নির্বাচন করে নিয়েছিলেন এবং কোন প্রকার উৎকন্ঠা ও সন্দেহ ব্যতীতই স্বীয় গোত্রের ভ্রান্ত রীতিনীতি পরিহার করে চলতেন এবং এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন।44

তিনি তাঁর জীবনের কোন মুহূর্তেই মূর্তি পূজা করেন নি , এমনকি ঐগুলোর নাম শুনতেও অনীহা প্রকাশ করতেন। যেমনটি ইতোপূর্বেও আমরা উল্লেখ করেছিলাম।

যখন হযরত মাত্র 12 বছরের বালক ছিলেন এবং বোহাইরা তাঁকে দুটি কুখ্যাত মূর্তি লাত ও ওজ্জার কসম দিয়েছিল তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং সক্রোধে বলেছিলেন : আমি কোন কিছুকেই এ দুটির মত শত্রু মনে করি না।

তাঁর সততা ও মহত্বের খ্যাতি ছিল লোকের মুখে মুখে ; তাঁর আচার , ব্যবহার ও বিশ্বস্ততার কারণে তিনি আল আমীন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর এহেন কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের কারণেই , খাদিজা তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁর উপর ন্যস্ত করেছিলেন।

মহানবী (সা.)-এর আচার-আচরণ এতই মনোমুকর ও সমুন্নত ছিল যে , তা সকল মানুষকে তাঁর দিকে আকর্ষণ করত।

আম্মার বলেন : নবুয়াতের পূর্বে আমি ও মুহাম্মদ (সা.) রাখালী করতাম। একদিন আমি প্রস্তাব দিলাম যে , ফাখের চারণ ভূমিতে গেলে ভাল হয়। মুহাম্মদ (সা.) আমার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন। পরদিন সেখানে গেলাম । দেখলাম যে মুহাম্মদ (সা.) আমার পূর্বে সেখানে গিয়েছেন কিন্তু মেষগুলোকে সেখানে চরানো থেকে বিরত রাখছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : কেন মেষগুলোকে চরতে দিচ্ছেন না ? তিনি বললেন : যেহেতু তোমার সাথে কথা দিয়েছিলাম তাই তুমি আসার পূর্বে আমার মেষগুলো এ চারণ ভূমি থেকে আহার গ্রহণ করবে , তা পছন্দ করছিলাম না।

এভাবেই মুহম্মাদ (সা.) অন্য এক পথে নিজেকে পরিচালিত করেছিলেন এবং গোত্রের রীতিনীতির অনুগামী হন নি। আর অদৃশ্যলোকের সাহায্যে স্বীয় উৎকর্ষের পথে অগ্রসরমান ছিলেন।

আর এ জন্যেই মানুষ তাঁর প্রতি অধিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং কোন সমস্যার সমাধানে তাঁর দেয়া সিদ্ধান্তের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন ও তাঁর অনুসরণ করতেন।

হাজারুল আসওয়াদ স্থাপনের ক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত

মহানবীর বয়স ছিল তখন 35 বছর। কোরাইশ কাবা অর্থাৎ আল্লাহর গৃহ পুনঃনির্মাণ ও মেরামত করার জন্যে সিদ্ধান্ত নিল। যেহেতু কোরাইশের গোত্রসমূহের সকলেই এ গৃহ মেরামতকরণের মর্যাদার অধিকারী হতে চেয়েছিল , সেহেতু প্রত্যেকেই কাবার এক একটি অংশ মেরামত করার জন্যে ভাগাভাগি করে নিল।

প্রথমে ওয়ালিদ গৃহ ভাঙ্গার কাজ শুরু করল। অতঃপর অন্যরা তাকে সাহায্য করল। ফলে ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক নির্মিত স্তম্ভগুলো দৃশ্যমান হলো। অতঃপর প্রত্যেক গোত্র কাবাগৃহের নির্দিষ্ট অংশ মেরামত করার জন্যে নির্ধারণ করে নিল। যখন কাবা গৃহের মেরামত কাজ এমন এক স্থানে পৌঁছল যেখানে হাজারুল আসওয়াদ স্থাপন করতে হবে , তখন কোরাইশের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তুমুল বিবাদ শুরু হলো। কারণ প্রত্যেক গোত্রই স্বহস্তে এ কর্ম সম্পাদন করতে এবং এ মর্যাদার অধিকারী হতে চাইল।

ধীরে ধীরে এ বিরোধ প্রকট হতে লাগল এবং যুদ্ধ বাঁধার পর্যায়ে পৌঁছল। আব্দুদ্দারের পুত্ররা একটি বৃহৎ পাত্র রক্তে পূর্ণ করে এবং তাতে হস্ত সমূহ নিমজ্জিত করে পরস্পরের খুনে রঞ্জিত হওয়ার জন্যে শপথ গ্রহণ করল।

এ ভয়ঙ্কর বিরোধ চার অথবা পাঁচ রাত্রি স্থায়ী হয়েছিল। অতঃপর আবু উমাইয়া কোরাইশের বয়োজ্যেষ্ঠতম ব্যক্তি বলল : আমার প্রস্তাব হলো এই যে , (আগামী কাল প্রত্যুষে) সর্বপ্রথমেই যে ব্যক্তি মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে , তাকে এ বিরোধের মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিবে। তার এ প্রস্তাব সকলেই একবাক্যে গ্রহণ করল , যাতে সমস্যার সমাধান হয়।

কোরাইশ তার এ প্রস্তাব গ্রহণ করতঃ অপেক্ষা করতে লাগল যে , কে মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করছে। হঠাৎ দেখা গেল যে ইসলামের নবী (সা.) প্রবেশ করলেন। যখন তাদের দৃষ্টি তাঁর উপর পতিত হলো । বলল : এতো মুহাম্মদ , সে বিশ্বস্ত (আমীন) , আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত।

মুহাম্মদ (সা.) এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তিনি ঘটনার বিষয় সম্পর্কে অবহিত হয়ে বললেন : একটি জামা নিয়ে আস। কোরাইশরা যদিও তার উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারেনি তবু দ্রুত একটি জামা নিয়ে আসল। মহানবী (সা.) ঐ জামাটিকে বিছিয়ে দিলেন এবং হাজারুল আসওয়াদকে এর মাঝে রাখলেন। অতঃপর বললেন : প্রত্যেক গোত্র এ জামার এক একটি অংশ ধর যাতে প্রত্যেকেই এ মর্যাদায় অংশীদার হতে পার। কোরাইশের প্রত্যেক গোত্র জামার চারদিকে ধরল। অতঃপর ঐ নির্দিষ্ট স্থানে বয়ে নিল , যেখানে পাথরটি স্থাপন করতে হবে। তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) দেখলেন যদি এর সংস্থাপনের দায়িত্ব অন্যকে দেন , তবে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে । তাই তিনি স্বয়ং হাজারুল আসওয়াদ তুলে নিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। আর এ উন্নত বিচারের মাধ্যমে বিরোধ সম্পূর্ণ রূপে দূর করলেন।

এ ঘটনা রাসূল (সা.)-এর মহান সামাজিক ব্যক্তিত্বের প্রমাণবহ। আর সে সাথে সঠিক চিন্তার মাধ্যমে এক রক্তাক্ত ভয়ঙ্কর গোলযোগের রক্তপাতহীন সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর সঠিক সিদ্ধান্ত ও সুবিচারের প্রকাশ ঘটায়।

আর এভাবেই অনুধাবন করা যায় যে , তিনি নবুওয়াতের জন্যে এবং পবিত্র ও ঐশী বিপ্লবের ধ্বজা ধারণ করার জন্যে যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

ওহীর অবতরণ

মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিশ্বজনীন রেসালত

এখন পর্যন্ত আমরা মহানবী (সা.)-এর জীবনের পাতাসমূহ থেকে কিছু পাতা দেখেছি মাত্র এবং তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের কিছু ঘটনা সেখানে আমরা পড়েছি। এবার আমরা তাঁর জীবনেতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করব।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশ বছর যাবৎ এমন এক অভিভাবকহীন ও লাগামহীন জনসমাজে বসবাস করেছিলেন যেখানে সভ্যতা ও সংস্কৃতির লেশ-মাত্র ছিল না। আর সমাজের এহেন অবস্থা মহানবী (সা.)-এর কোমল হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তুলত। মুহাম্মদ (সা.) সমাজে অজ্ঞতার তিমির ব্যতীত কিছুই দেখতে পাননি। কাবায় যেতেন , দেখতেন , খোদার পরিবর্তে তারা মূর্তি পূজা করছে ; কাবা ত্যাগ করে সমাজে আসতেন , সেখানের অবস্থা অবলোকনেও ব্যথিত হতেন ; মানুষের মাঝে যেতেন , গোত্রের নিকৃষ্ট চিন্তা-চেতনা ও রীতিনীতি দেখে হৃদয় ভারাক্রান্ত হতেন ; দরিদ্র নিপীড়িত , বঞ্চিত মানুষের অবস্থা দেখে ক্লেষ ভোগ করতেন।

নারীদের নিকৃষ্টতম সামাজিক অবস্থান , মদ , জুয়া , নরহত্যা , অনাচার ইত্যাদির বিস্তৃতিতে নিদারুণ কষ্ট অনুভব করতেন।

যখন ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন এবং মানুষের সাথে মেলামেশা করতেন , তখন মানুষের চারিত্রিক অবনতি তার কোমল হৃদয়কে ব্যথিত করত। তখন বাধ্য হয়ে বিশ্রাম ও ইবাদতের জন্যে এমন কোন স্থানে যেতেন , যেখানে তাঁর হৃদয় ক্লেশমুক্ত থাকে , তাঁর প্রাণে একটু সস্তি পেতে পারেন। এ জন্যে তিনি হেরা পর্বতে যেতেন এবং আল্লাহর রহমতের নিদর্শন ও সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করতেন।

চল্লিশ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (সা.)

মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশতম বছরে পদার্পণ করলেন এবং ঐশী ও বিশ্বজনীন রেসালতের দায়িত্ব পালন করার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করলেন। হঠাৎ তাঁর প্রতি ওহীর ফেরেশতা জিব্রাইল অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন : পড়! ...মুহাম্মদ (সা.) বললেন : কী পড়ব ? তিনি এক অভূতপূর্ব অনুভূতিতে নিমগ্ন হলেন। দ্বিতীয়বার একই শব্দ শুনতে পেলেন যে সুস্পষ্ট রূপে বলল : পড় , হে মুহাম্মদ!

তৃতীয়বার জিব্রাইল পুনরাবৃত্তি করে বললেন : তোমার প্রভুর নামে পাঠ কর , যিনি সৃষ্টি করেছেন , সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত পিণ্ড থেকে , পড় , এবং তোমার প্রভু সর্বাপেক্ষা দয়ালু , যে প্রভু লিখতে শিখিয়েছেন এবং মানুষ যা জানতো না , তা তাকে শিখিয়েছেন।45

এক অবর্ণনীয় আনন্দ ও উৎকণ্ঠা তাঁর সমস্ত অন্তরাত্মা , তাঁর অস্তিত্বকে বিমোহিত করে তুলেছিল। কারণ এক বৃহৎ ও সমুন্নত জগতের সাথে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ...ফেরেশতাদের সাথে ...জিব্রাইলের সাথে উর্ধ্বলোকের সাথে ...তাঁর আত্মা এক পবিত্র ও মহান আশ্রয়স্থলের সাথে নিবিঢ় ও সার্বক্ষণিক সম্পর্ক স্থাপন করল , তিনি স্বীয় অভ্যন্তরে নবুওয়াতের ক্ষমতা অনুভব করলেন এবং কোন প্রকার উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের লেশমাত্র তাঁর অস্তিত্বে পরিলক্ষিত হয়নি। যা ছিল তা হলো দৃঢ়তা ও প্রশান্তি।

তাহলে মুহাম্মদ (সা.) কি হেরা পর্বতে কোন প্রশিক্ষণকাল সম্পন্ন করেছিলেন ? এটি সে প্রশ্ন , যার ইতিবাচক জবাব দিয়েছিলেন কোন কোন প্রাচ্যবিদ ও লেখক এবং বলেছিলেন : মুহাম্মদ (সা.) হেরা পর্বতের গুহায় ইঞ্জিল ও নবীগণের (আ.) বক্তব্য ও শিক্ষার উপর গভীর ভাবে গবেষণা ও পর্যালোচনা চালিয়েছিলেন এবং এ (জ্ঞান) জগতের অনেক স্বাদ আস্বাদন করেছিলেন।

এ কথার অর্থ দাঁড়ায় মুহাম্মদ (সা.) স্বশিক্ষিত কোন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ইঞ্জিল ও তৌরাতের উপর গভীর অনুসন্ধান ও পড়াশুনার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে আবিস্কার করেছিলেন!

কিন্তু এ ধারণার বিপরীতে অনেক প্রমাণ রয়েছে , এ গুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

যদি ইসলামের নবী (সা.) কোরআনকে ইঞ্জিল ও পূর্ববর্তী নবীগণের (আ.) শিক্ষা থেকে গ্রহণ করতেন , তবে সঙ্গত কারণেই কোরআনের বিষয়-বস্তুসমূহ ইঞ্জিল ও তৌরাতের সদৃশ হতো। অথচ কোরআনের বিষয় বস্তু তৌরাত ও ইঞ্জিল থেকে সামগ্রিক ও মৌলিক ভাবে পৃথক ও স্বতন্ত্র।

কোরআনের বক্তব্য , প্রাঞ্জল ও অভূতপূর্ব ভাষাশৈলীর সম্মুখে তদানিন্তন ও পরবর্তী যুগের খ্যাতনামা সাহিত্যিকগণও নতশির। আর এটাই প্রমাণ করে যে , ইসলামের নবী (সা.) সরাসরি বিশ্ব সৃষ্টি কর্তার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন এবং নিঃসন্দেহে এ কথাগুলো ও বাক্যগুলো কোন পুস্তকেই বিদ্যমান ছিল না , যা থেকে নবী (সা.) উদ্ধৃতি দিবেন ও শিক্ষা নিবেন।

কোন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না ; বরং এ অপপ্রচারটি ছিল খ্রিস্টান পাদ্রী ও পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যপ্রবণ প্রাচ্যবিদদের সাজানো কথা।

যদি কোরআন বাইবেলের পুরাতন ও নতুন সংস্করণ থেকে অস্তিত্ব লাভ করত , তবে যারা কোরআনের বিরুদ্ধে কোন আয়াত উদ্ধৃতি করতে ও এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইত , তাহলে , যে তৌরাত ও ইঞ্জিল তাদের হাতে ছিল তারা তাতে খুঁজে দেখত এবং কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই স্বীয় লক্ষ্যে পৌঁছতে পারত।

সকলেই বিশ্বাস করেন যে , মুহম্মদ (সা.) (কারো নিকট) শিক্ষা গ্রহণ করেন নি।

কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি বিশ্বাস করবে যে , পড়াশুনা করেন নি এমন একজন ব্যক্তি , যিনি অজ্ঞ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের পাঠ্য পুস্তক থেকে দূরে বিদ্যমান এক সমাজে বড় হয়েছেন , তিনি এক জ্ঞানগর্ভ ও বিশ্বজনীন পুস্তক উপহার দিয়েছেন ? এ ধরনের ব্যক্তি বর্গের নিকট প্রশ্ন করা উচিৎ যে , কিরূপে ইসলামের নবী (সা.) তৌরাত ও ইঞ্জিলের উপর পড়াশুনা করতেন ? যে ব্যক্তি তার সমস্ত জীবনে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যান নি , কোন শিক্ষাগুরুর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন নি , কিরূপে তিনি অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে সংবাদ দিতে পারেন ?!

ওহী কী ?

যা সর্বজন স্বীকৃত তাতে বলা হয় , মহান আল্লাহ্ ও তাঁর নবী (আ.) গণের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং তারা সকল বাস্তবতার জ্ঞান বিশ্ব সৃষ্টির উৎস (অর্থাৎ মহান আল্লাহ্) থেকে লাভ করতেন। আর এ সম্পর্ক তাঁদের আত্মিক উৎকর্ষ ও দৃঢ়তার ফলে বিদ্যমান ছিল।

তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে , যদি নবীগণের (আ.) সাথে এ সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় তবে তাঁদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। নবীগণের (আ.) সকল মর্যাদার কারণ হলো যে , তারা বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কের যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। সুতরাং তাঁরা যা বলতেন তাতে কোন প্রকার সন্দেহ ও জটিলতা ছিলনা। বরং কী এবং কোথা থেকে এসেছে এ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণরূপে অবহিত ছিলেন , যা কারো কারো তথাকথিত অর্ন্তদৃষ্টির (كشف ) দাবির ব্যতিক্রম যেখানে যোগ সাধনা ও অন্যান্য পদ্ধতি ও নিয়ামকের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এর অধিকারীদের নিকট এমন কিছু বিষয় অর্জিত হয় যে তারা জানে না কোথা থেকে এসেছে। বরং প্রায়শঃই ধারণা ও অনুমানের বশবর্তী আবার কখনোবা প্রকৃত অবস্থার ব্যতিক্রম হয়ে থাকে।

যাহোক , এ দলের (যোগী) উপর নবীগণের (আ.) শ্রেষ্ঠত্ব এতটা সুস্পষ্ট যে , কোন প্রকার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আল্লাহর নবীগণ (আ.) যা বলেন ও দেখেন তা-ই বাস্তব ও সত্য। এমনকি উদাহরণত এক বিন্দু পরিমাণ সন্দেহও তাদের নিকট আশ্রয় পায় না। অতএব , ওহী হলো মহান আল্লাহ্ ও নবীগণের (আ.) মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল তা-ই। আর এ সম্পর্ক কখনো কখনো জিব্রাইলের মাধ্যমে , আবার কখনো কখনো কোন প্রকার মাধ্যম ব্যতীতই সম্পন্ন হতো।

রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীর সংখ্যা

ইসলামের নবী (সা.) খাদিজার পর একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সাওদা , আয়েশা , গাজিয়া , হাফসাহ , উম্মে হাবিবা , উম্মে সালামাহ , যয়নাব বিনতে যাহেশ , যয়নাব বিনতে খুযাইমাহ , মাইমুনাহ , জুয়াইরিয়াহ , সাফিয়াহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

এখন যে পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-কে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে হয়েছে , সে সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।

মূলতঃ কয়েকটি উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) একাধিক বিয়ে করেছিলেন:

1.অনাথ ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের আত্মসম্মান রক্ষা করার জন্যে , যারা ইতোপূর্বে সম্মান ও প্রতিপত্তির সাথে জীবন যাপন করতেন , কিন্তু স্বীয় অভিভাবককে হারানোর ফলে তাদের সম্মান প্রতিপত্তি এখন বিপর্যস্ত , মহানবী (সা.) তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। নতুবা তাদের গোত্র তাদেরকে ফিরিয়ে নিত এবং তাদেরকে কুফর করতে ও ইসলামের অস্বীকৃতিতে বাধ্য করত। যেমন : সাত্তদা , যার স্বামী হাবাশায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার পর পরলোক গমন করেছিলেন। ফলে তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিলেন।

রাসূল (সা.) খাদিজাকে হারানোর পর বিপত্নীক ছিলেন এবং সাওদার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

যয়নাব বিনতে খুযাইমা ছিলেন রাসূলের অপর এক স্ত্রী। তিনি এক বিধবা রমণী ছিলেন যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর একদিকে অভিবাবকহীন এবং অপরদিকে দারিদ্রকবলিত হয়ে পড়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন দানশীলা , উদার এবং উম্মুল মাসাকীন (নিঃস্বদের মাতা) আল্লাহর রাসূল (সা.) যয়নাবের সম্মান রক্ষার্থে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যয়নাব বিনতে খুযাইমা রাসূলের জীবদ্দশায়ই পরলোক গমন করেন।

উম্মে সালমাও ছিলেন বয়স্কা ও অনাথ সন্তানের মাতা , ঈমানদার। তিনিও নবী (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

2.প্রচলিত অবস্থার পরিবর্তন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভ্রান্ত রীতি-নীতির প্রাচীর চূর্ণ করে দেয়ার জন্যে তাঁর ফুফাত বোন যয়নাব বিনতে জাহাশের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন , যিনি রাসূলের পালক পুত্র যায়েদ ইবনে হারিসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যায়েদের সাথে যয়নাবের যে বিবাহ মহানবী (সা.)-এর নির্দেশানুসারে সম্পন্ন হয়েছিল তা স্বয়ং ইসলামের শ্রেণী বৈষম্যহীন বিশেষত্বেরই দৃষ্টান্ত। কারণ , যয়নাব ছিলেন কোরাইশ অধিপতি আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্রাদের মধ্যে একজন , আর যায়িদ ছিল পারিবারিক দিক থেকে কৃতদাস , যিনি রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে মুক্তি পেয়েছিলেন।

যয়নাব যেহেতু অভিজাত পরিবারের ছিলেন , সেহেতু যায়েদের সাথে দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ করত ; আর এভাবে নিজের দাম্পত্য জীবনে তিক্ততা সৃষ্টি করত এবং রাসূল (সা.) তাদেরকে শতভাবে উপদেশ দিলেও তাতে কোন ফল হয়নি। অবশেষে যায়েদ যয়নাবের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিল এবং তাকে তালাক দিয়েছিল।

যয়নাব তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর আদেশে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন , যাতে মানুষের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার ও অযৌক্তিক রীতি-নীতির মূলোৎপাটিত হয়। (যেহেতু তারা পালক পূত্রকে স্বীয় প্রকৃত পুত্র বলে মনে করত এবং তার স্ত্রীকে নিজের জন্যে নিষিদ্ধ মনে করত)।35

খ্রিস্টবাদী কিছু লেখক এ বিষয়টির ক্ষেত্রে (হযরতের একাধিক বিবাহ) এতটা বিচ্যুত ও কুরটনাকারী হয়েছিল যে লিখেছিল : আল্লাহর রাসূল যয়নাবের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়েছিলেন! এ বক্তব্যটি এতটা অনর্থক ও অযৌক্তিক যে তা সমস্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির পরিপন্থী। কারণ যদি নবী (সা.) কুমন্ত্রনা ও এ ধরনের ধ্যান- ধারণার বশবর্তী হতেন কিংবা যয়নাবের রূপ সৌন্দর্য এতটা মনোহারী ছিল যে , হযরতকে প্রেমাসক্ত করে ফেলেছিল যদি তাই হতো , তবে কেন যখন যয়নাব কুমারী ও বিশেষ আকর্ষণের অধিকারী ছিল আর রাসূলও (সা.) উদ্দাম যৌবনের অধিকারী ছিলেন , তখন কেন তার প্রতি আসক্ত হলেন না ; বিশেষ করে এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে যয়নাব তো তখনও তার নিকট অপরিচিত ছিল না ? বরং রাসূলের নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই তিনি পরিগণিত হতেন এবং পারিবারিক পরিচিতের মাধ্যমে তারা পরস্পরের সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

3.বন্দী ও দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্যে ; যেমন , জুয়াইরিয়াকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। জুয়াইরিয়া ছিলেন সম্ভ্রান্ত বনি মুসতালিক গোত্রের কন্যা , যিনি ইসলামী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দী হয়েছিলেন। মহানবী (সা.) হারেসের কন্যা জুবাইরিয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। হারেস ছিলেন গোত্রপতি। মুসলমানরা যখন দেখল যে , বন্দীরা হযরতের আত্মীয়দের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে , তখন তাদের (বন্দীদের) অনেককেই মুক্তি দিয়েছিলেন। ইবনে হিশামের মতে এ বিবাহের সুবাদে বনি মুসতালিকের একশতটি পরিবার মুক্তি পেয়েছিল।36

4.আরবের বৃহত্তর গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংরক্ষণ করার জন্যে নবী (সা.) আয়েশা , হাফসা , উম্মে হাবিবা , সাফিয়া ও মাইমূনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

উম্মে হাবিবা ছিলেন সেই আবু সুফিয়ানের কন্যা যার বংশ (ইসলামের) রেসালতের ধারক সম্মানিত (হাশেমী) পরিবারের সাথে আপোসহীন শত্রুতা প্রদর্শন করত। তার স্বামী হাবাশে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হয়েছিল এবং অতঃপর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিল। উম্মে হাবিবা কঠিন সঙ্কটময় অবস্থায় দিনাতিপাত করছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন মুসলমান ; অপর দিকে তার পিতা ছিল নবী (সা.)-এর ঘোর শত্রু । ফলে তিনি তার পিতা (আবু সুফিয়ানের) নিকট আশ্রয় নিতে পারছিলেন না। সুতরাং উম্মে হাবিবা অভিভাবকহীন ও বঞ্চিত নারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন।

মহানবী (সা.) বনি উমাইয়্যাদের অন্তর জয় করার জন্যে এবং সেই সাথে উম্মে হাবিবার অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।37

সাফিয়া ছিলেন হাই ইবনে আখতাবের কন্যা , যিনি বনি নাযির গোত্রের প্রধান ছিলেন। ইহুদী বন্দীরা মুসলমানদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার পর হযরত (সা.) সাফিয়ার ব্যক্তিত্ব রক্ষা করার জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে অবদ্ধ হলেন। আর এ প্রক্রিয়ায় বনি ইসরাইলের একটি শ্রেষ্ঠ গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।38

বৃহত্তর গোত্র বনি মাখযুমের রমণী ছিলেন মায়মূনা , যাকে মহানবী (সা.) সপ্তম হিজরীতে বিবাহ সম্পন্ন করেন।39

নবী (সা.)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে আয়েশা ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় সকলেই বিধবা ছিলেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই যৌবনের উচ্ছলতা ও অভিলাষ হারিয়ে ছিলেন। আর এটাই এর সপক্ষে শ্রেষ্ঠ দলিল যে , রাসূল (সা.)-এর একাধিক বিবাহ বৃহত্তর কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। সুতরাং রাসূলের প্রতি কুমন্ত্রণা ইত্যাদির অপবাদ প্রদান কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না।

নবুওয়াত লাভের পূর্বে মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব

পারিপার্শ্বিকতার নীতি

মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে , পরিবেশ , কোন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ও চিন্তা-চেতনার ভিত্তি রচনা করে এবং পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধান ও অনুরূপ হওয়ার নীতি অনুসরণ তারা সামাজিক রীতি প্রথার পশ্চাদ্ধাবন করে।

যদিও এ ব্যাপারে একদল চরমপন্থা অবলম্বন করেছেন এবং এ মতবাদকে একটি সার্বিক ও সর্বজনীন নীতি বলে মনে করেছেন। তারা সকল সামাজিক বিষয় ও ঘটনাকে কোন প্রকার ব্যতিক্রম ব্যতীতই এ নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তবে ব্যক্তির মন মানসিকতার উপর পরিবেশের প্রভাব অনস্বীকার্য।

অতএব , কল্যাণময় ও সংযমী পরিবেশ , সমাজের সন্তানদেরকে সংযমী ও সুশৃঙ্খল রূপে গড়ে তোলে। অপরদিকে বিচ্যুত ও কলুষিত পরিবেশ কোন না কোন ভাবে ব্যক্তিকে বিচ্যুতি ও অনাচারের দিকে ঠেলে দেয়। অতএব , যিনি স্বীয় পথকে কলুষিত পরিবেশ থেকে পৃথক করে থাকেন , নিঃসন্দেহে তিনি কোন সাধারণ ব্যক্তিত্ব নন।

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের পরিবেশ

পৃথিবী , বিশেষ করে আরবভূমি তখন অজ্ঞতা ও অন্যায়ের সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল এবং আরবের জনগণ কুসংস্কার ও অনাচারের আগুনে জ্বলছিল। অজ্ঞতার কৃষ্ণকায় মেঘগুলো আরববাসীর জীবন-দিগন্তকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলেছিল এবং তারা অন্ধকারের ঘনঘটায় জীবনাতিবাহিত করছিল। কতইনা সম্পদ লুটতরাজ হতো , কতইনা রক্ত অন্যায় ভাবে ঝরত।

নিকৃষ্টতম ব্যাপার ছিল , প্রাণহীন মূর্তিসমূহের উপাসনা। কুসংস্কার ও শ্রেণী বৈষম্য সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিল। যার অস্তিত্ব সেথায় ছিলনা তা হলো ন্যায়পরায়ণতা ও নিয়ম শৃঙ্খলা । নিষ্ঠুর শক্তিধররা অন্যের শ্রম এবং বিধবা ও অনাথের ঘামের বিনিময়ে স্বীয় ধন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলত। আর আত্মম্ভরিতা ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করত এবং খেঁটে খাওয়া মানুষের উপর আগ্রাসন ও নিপীড়ন চালাত।

তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যনীতি এতটা খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল যে , অক্ষম স্বামীর ঋণের মোকাবিলায় তারা স্ত্রীকে দায়ী মনে করতো ; আর যদি অক্ষম , অপারগ কোন স্ত্রীর নিকট ঋণ থাকত তবে তার জন্যে তার স্বামীকে গ্রেফতার করত।40

উৎকর্ষ ও জ্ঞানার্জনের কোন উদ্যোগ তাদের ছিলই না , বরং এর পরিবর্তে তাদের পূর্বপুরুষ ও লোক জনের সংখ্যাধিক্যের জন্যে অহঙ্কার করত । কখনো কখনো কোন গোত্রের জনবলের আধিক্য প্রমাণ করার জন্যে তারা গোরস্থানে যেয়ে কবরের সংখ্যা গণনা করে তাদের সংখ্যাধিক্য দেখাত।41

হিংসা বিদ্বেষ , কাম-ক্রোধ , মদ্যপান , রক্তারক্তি ছিল তাদের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

ইমরুল কাইস নামক এক বিখ্যাত আরব কবি , তার চাচাত বোন উনাইযার সাথে শয়তানী ও উন্মাদ প্রেম ঘটিত ঘটনাবহুল অতীত সম্পর্কে নির্লজ্জ ভাবে তার কবিতায় বর্ণনা করেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এ কাব্যসমূহই সাহিত্য কর্মের নিদর্শন স্বরূপ কাবা ঘরের দেয়ালে টানানো হয়েছিল।

এটাই ছিল সে সমাজের জনজীবন ও আচার ব্যবহারের চিত্র , যে সমাজের অন্ধকারময় দিগন্ত থেকে ইসলামের জ্যোতি আত্মপ্রকাশ করেছিল।

নিঃসন্দেহে যিনি এহেন সমাজের রঙে রঞ্জিত না হয়ে , বরং এতে অস্বস্থি বোধ করতেন এবং এর বিরোধিতায় রত হতেন , তিনি এক মহান ও ঐশী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর তিনিই জাতির নেতৃত্বের জন্যে এবং বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্তি দানের জন্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।

নবীগণ (আ.) সমাজ গঠন করতেন , সমাজের অনুসরণ করতেন না

সকলেই মূর্তিনগরের দিকে ধাবিত হতো ; কিন্তু মহানবী (সা.) কারো কাছে শিক্ষা গ্রহণ না করলেও42 হেরা পর্বতের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সেথায় , শক্তি ও মর্যাদার অধিকারী বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর সম্মুখে সিজদাবনত হয়ে তাঁরই উপাসনায় আত্মনিয়োগ করতেন।43

হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর করুণার ছোঁয়ায় শৈশব থেকেই তাঁর পথ (সঠিকরূপে) নির্বাচন করে নিয়েছিলেন এবং কোন প্রকার উৎকন্ঠা ও সন্দেহ ব্যতীতই স্বীয় গোত্রের ভ্রান্ত রীতিনীতি পরিহার করে চলতেন এবং এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন।44

তিনি তাঁর জীবনের কোন মুহূর্তেই মূর্তি পূজা করেন নি , এমনকি ঐগুলোর নাম শুনতেও অনীহা প্রকাশ করতেন। যেমনটি ইতোপূর্বেও আমরা উল্লেখ করেছিলাম।

যখন হযরত মাত্র 12 বছরের বালক ছিলেন এবং বোহাইরা তাঁকে দুটি কুখ্যাত মূর্তি লাত ও ওজ্জার কসম দিয়েছিল তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং সক্রোধে বলেছিলেন : আমি কোন কিছুকেই এ দুটির মত শত্রু মনে করি না।

তাঁর সততা ও মহত্বের খ্যাতি ছিল লোকের মুখে মুখে ; তাঁর আচার , ব্যবহার ও বিশ্বস্ততার কারণে তিনি আল আমীন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর এহেন কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের কারণেই , খাদিজা তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁর উপর ন্যস্ত করেছিলেন।

মহানবী (সা.)-এর আচার-আচরণ এতই মনোমুকর ও সমুন্নত ছিল যে , তা সকল মানুষকে তাঁর দিকে আকর্ষণ করত।

আম্মার বলেন : নবুয়াতের পূর্বে আমি ও মুহাম্মদ (সা.) রাখালী করতাম। একদিন আমি প্রস্তাব দিলাম যে , ফাখের চারণ ভূমিতে গেলে ভাল হয়। মুহাম্মদ (সা.) আমার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন। পরদিন সেখানে গেলাম । দেখলাম যে মুহাম্মদ (সা.) আমার পূর্বে সেখানে গিয়েছেন কিন্তু মেষগুলোকে সেখানে চরানো থেকে বিরত রাখছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : কেন মেষগুলোকে চরতে দিচ্ছেন না ? তিনি বললেন : যেহেতু তোমার সাথে কথা দিয়েছিলাম তাই তুমি আসার পূর্বে আমার মেষগুলো এ চারণ ভূমি থেকে আহার গ্রহণ করবে , তা পছন্দ করছিলাম না।

এভাবেই মুহম্মাদ (সা.) অন্য এক পথে নিজেকে পরিচালিত করেছিলেন এবং গোত্রের রীতিনীতির অনুগামী হন নি। আর অদৃশ্যলোকের সাহায্যে স্বীয় উৎকর্ষের পথে অগ্রসরমান ছিলেন।

আর এ জন্যেই মানুষ তাঁর প্রতি অধিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং কোন সমস্যার সমাধানে তাঁর দেয়া সিদ্ধান্তের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন ও তাঁর অনুসরণ করতেন।

হাজারুল আসওয়াদ স্থাপনের ক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত

মহানবীর বয়স ছিল তখন 35 বছর। কোরাইশ কাবা অর্থাৎ আল্লাহর গৃহ পুনঃনির্মাণ ও মেরামত করার জন্যে সিদ্ধান্ত নিল। যেহেতু কোরাইশের গোত্রসমূহের সকলেই এ গৃহ মেরামতকরণের মর্যাদার অধিকারী হতে চেয়েছিল , সেহেতু প্রত্যেকেই কাবার এক একটি অংশ মেরামত করার জন্যে ভাগাভাগি করে নিল।

প্রথমে ওয়ালিদ গৃহ ভাঙ্গার কাজ শুরু করল। অতঃপর অন্যরা তাকে সাহায্য করল। ফলে ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক নির্মিত স্তম্ভগুলো দৃশ্যমান হলো। অতঃপর প্রত্যেক গোত্র কাবাগৃহের নির্দিষ্ট অংশ মেরামত করার জন্যে নির্ধারণ করে নিল। যখন কাবা গৃহের মেরামত কাজ এমন এক স্থানে পৌঁছল যেখানে হাজারুল আসওয়াদ স্থাপন করতে হবে , তখন কোরাইশের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তুমুল বিবাদ শুরু হলো। কারণ প্রত্যেক গোত্রই স্বহস্তে এ কর্ম সম্পাদন করতে এবং এ মর্যাদার অধিকারী হতে চাইল।

ধীরে ধীরে এ বিরোধ প্রকট হতে লাগল এবং যুদ্ধ বাঁধার পর্যায়ে পৌঁছল। আব্দুদ্দারের পুত্ররা একটি বৃহৎ পাত্র রক্তে পূর্ণ করে এবং তাতে হস্ত সমূহ নিমজ্জিত করে পরস্পরের খুনে রঞ্জিত হওয়ার জন্যে শপথ গ্রহণ করল।

এ ভয়ঙ্কর বিরোধ চার অথবা পাঁচ রাত্রি স্থায়ী হয়েছিল। অতঃপর আবু উমাইয়া কোরাইশের বয়োজ্যেষ্ঠতম ব্যক্তি বলল : আমার প্রস্তাব হলো এই যে , (আগামী কাল প্রত্যুষে) সর্বপ্রথমেই যে ব্যক্তি মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে , তাকে এ বিরোধের মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিবে। তার এ প্রস্তাব সকলেই একবাক্যে গ্রহণ করল , যাতে সমস্যার সমাধান হয়।

কোরাইশ তার এ প্রস্তাব গ্রহণ করতঃ অপেক্ষা করতে লাগল যে , কে মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করছে। হঠাৎ দেখা গেল যে ইসলামের নবী (সা.) প্রবেশ করলেন। যখন তাদের দৃষ্টি তাঁর উপর পতিত হলো । বলল : এতো মুহাম্মদ , সে বিশ্বস্ত (আমীন) , আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত।

মুহাম্মদ (সা.) এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তিনি ঘটনার বিষয় সম্পর্কে অবহিত হয়ে বললেন : একটি জামা নিয়ে আস। কোরাইশরা যদিও তার উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারেনি তবু দ্রুত একটি জামা নিয়ে আসল। মহানবী (সা.) ঐ জামাটিকে বিছিয়ে দিলেন এবং হাজারুল আসওয়াদকে এর মাঝে রাখলেন। অতঃপর বললেন : প্রত্যেক গোত্র এ জামার এক একটি অংশ ধর যাতে প্রত্যেকেই এ মর্যাদায় অংশীদার হতে পার। কোরাইশের প্রত্যেক গোত্র জামার চারদিকে ধরল। অতঃপর ঐ নির্দিষ্ট স্থানে বয়ে নিল , যেখানে পাথরটি স্থাপন করতে হবে। তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) দেখলেন যদি এর সংস্থাপনের দায়িত্ব অন্যকে দেন , তবে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে । তাই তিনি স্বয়ং হাজারুল আসওয়াদ তুলে নিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। আর এ উন্নত বিচারের মাধ্যমে বিরোধ সম্পূর্ণ রূপে দূর করলেন।

এ ঘটনা রাসূল (সা.)-এর মহান সামাজিক ব্যক্তিত্বের প্রমাণবহ। আর সে সাথে সঠিক চিন্তার মাধ্যমে এক রক্তাক্ত ভয়ঙ্কর গোলযোগের রক্তপাতহীন সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর সঠিক সিদ্ধান্ত ও সুবিচারের প্রকাশ ঘটায়।

আর এভাবেই অনুধাবন করা যায় যে , তিনি নবুওয়াতের জন্যে এবং পবিত্র ও ঐশী বিপ্লবের ধ্বজা ধারণ করার জন্যে যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

ওহীর অবতরণ

মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিশ্বজনীন রেসালত

এখন পর্যন্ত আমরা মহানবী (সা.)-এর জীবনের পাতাসমূহ থেকে কিছু পাতা দেখেছি মাত্র এবং তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের কিছু ঘটনা সেখানে আমরা পড়েছি। এবার আমরা তাঁর জীবনেতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করব।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশ বছর যাবৎ এমন এক অভিভাবকহীন ও লাগামহীন জনসমাজে বসবাস করেছিলেন যেখানে সভ্যতা ও সংস্কৃতির লেশ-মাত্র ছিল না। আর সমাজের এহেন অবস্থা মহানবী (সা.)-এর কোমল হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তুলত। মুহাম্মদ (সা.) সমাজে অজ্ঞতার তিমির ব্যতীত কিছুই দেখতে পাননি। কাবায় যেতেন , দেখতেন , খোদার পরিবর্তে তারা মূর্তি পূজা করছে ; কাবা ত্যাগ করে সমাজে আসতেন , সেখানের অবস্থা অবলোকনেও ব্যথিত হতেন ; মানুষের মাঝে যেতেন , গোত্রের নিকৃষ্ট চিন্তা-চেতনা ও রীতিনীতি দেখে হৃদয় ভারাক্রান্ত হতেন ; দরিদ্র নিপীড়িত , বঞ্চিত মানুষের অবস্থা দেখে ক্লেষ ভোগ করতেন।

নারীদের নিকৃষ্টতম সামাজিক অবস্থান , মদ , জুয়া , নরহত্যা , অনাচার ইত্যাদির বিস্তৃতিতে নিদারুণ কষ্ট অনুভব করতেন।

যখন ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন এবং মানুষের সাথে মেলামেশা করতেন , তখন মানুষের চারিত্রিক অবনতি তার কোমল হৃদয়কে ব্যথিত করত। তখন বাধ্য হয়ে বিশ্রাম ও ইবাদতের জন্যে এমন কোন স্থানে যেতেন , যেখানে তাঁর হৃদয় ক্লেশমুক্ত থাকে , তাঁর প্রাণে একটু সস্তি পেতে পারেন। এ জন্যে তিনি হেরা পর্বতে যেতেন এবং আল্লাহর রহমতের নিদর্শন ও সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করতেন।

চল্লিশ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (সা.)

মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশতম বছরে পদার্পণ করলেন এবং ঐশী ও বিশ্বজনীন রেসালতের দায়িত্ব পালন করার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করলেন। হঠাৎ তাঁর প্রতি ওহীর ফেরেশতা জিব্রাইল অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন : পড়! ...মুহাম্মদ (সা.) বললেন : কী পড়ব ? তিনি এক অভূতপূর্ব অনুভূতিতে নিমগ্ন হলেন। দ্বিতীয়বার একই শব্দ শুনতে পেলেন যে সুস্পষ্ট রূপে বলল : পড় , হে মুহাম্মদ!

তৃতীয়বার জিব্রাইল পুনরাবৃত্তি করে বললেন : তোমার প্রভুর নামে পাঠ কর , যিনি সৃষ্টি করেছেন , সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত পিণ্ড থেকে , পড় , এবং তোমার প্রভু সর্বাপেক্ষা দয়ালু , যে প্রভু লিখতে শিখিয়েছেন এবং মানুষ যা জানতো না , তা তাকে শিখিয়েছেন।45

এক অবর্ণনীয় আনন্দ ও উৎকণ্ঠা তাঁর সমস্ত অন্তরাত্মা , তাঁর অস্তিত্বকে বিমোহিত করে তুলেছিল। কারণ এক বৃহৎ ও সমুন্নত জগতের সাথে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ...ফেরেশতাদের সাথে ...জিব্রাইলের সাথে উর্ধ্বলোকের সাথে ...তাঁর আত্মা এক পবিত্র ও মহান আশ্রয়স্থলের সাথে নিবিঢ় ও সার্বক্ষণিক সম্পর্ক স্থাপন করল , তিনি স্বীয় অভ্যন্তরে নবুওয়াতের ক্ষমতা অনুভব করলেন এবং কোন প্রকার উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের লেশমাত্র তাঁর অস্তিত্বে পরিলক্ষিত হয়নি। যা ছিল তা হলো দৃঢ়তা ও প্রশান্তি।

তাহলে মুহাম্মদ (সা.) কি হেরা পর্বতে কোন প্রশিক্ষণকাল সম্পন্ন করেছিলেন ? এটি সে প্রশ্ন , যার ইতিবাচক জবাব দিয়েছিলেন কোন কোন প্রাচ্যবিদ ও লেখক এবং বলেছিলেন : মুহাম্মদ (সা.) হেরা পর্বতের গুহায় ইঞ্জিল ও নবীগণের (আ.) বক্তব্য ও শিক্ষার উপর গভীর ভাবে গবেষণা ও পর্যালোচনা চালিয়েছিলেন এবং এ (জ্ঞান) জগতের অনেক স্বাদ আস্বাদন করেছিলেন।

এ কথার অর্থ দাঁড়ায় মুহাম্মদ (সা.) স্বশিক্ষিত কোন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ইঞ্জিল ও তৌরাতের উপর গভীর অনুসন্ধান ও পড়াশুনার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে আবিস্কার করেছিলেন!

কিন্তু এ ধারণার বিপরীতে অনেক প্রমাণ রয়েছে , এ গুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

যদি ইসলামের নবী (সা.) কোরআনকে ইঞ্জিল ও পূর্ববর্তী নবীগণের (আ.) শিক্ষা থেকে গ্রহণ করতেন , তবে সঙ্গত কারণেই কোরআনের বিষয়-বস্তুসমূহ ইঞ্জিল ও তৌরাতের সদৃশ হতো। অথচ কোরআনের বিষয় বস্তু তৌরাত ও ইঞ্জিল থেকে সামগ্রিক ও মৌলিক ভাবে পৃথক ও স্বতন্ত্র।

কোরআনের বক্তব্য , প্রাঞ্জল ও অভূতপূর্ব ভাষাশৈলীর সম্মুখে তদানিন্তন ও পরবর্তী যুগের খ্যাতনামা সাহিত্যিকগণও নতশির। আর এটাই প্রমাণ করে যে , ইসলামের নবী (সা.) সরাসরি বিশ্ব সৃষ্টি কর্তার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন এবং নিঃসন্দেহে এ কথাগুলো ও বাক্যগুলো কোন পুস্তকেই বিদ্যমান ছিল না , যা থেকে নবী (সা.) উদ্ধৃতি দিবেন ও শিক্ষা নিবেন।

কোন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না ; বরং এ অপপ্রচারটি ছিল খ্রিস্টান পাদ্রী ও পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যপ্রবণ প্রাচ্যবিদদের সাজানো কথা।

যদি কোরআন বাইবেলের পুরাতন ও নতুন সংস্করণ থেকে অস্তিত্ব লাভ করত , তবে যারা কোরআনের বিরুদ্ধে কোন আয়াত উদ্ধৃতি করতে ও এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইত , তাহলে , যে তৌরাত ও ইঞ্জিল তাদের হাতে ছিল তারা তাতে খুঁজে দেখত এবং কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই স্বীয় লক্ষ্যে পৌঁছতে পারত।

সকলেই বিশ্বাস করেন যে , মুহম্মদ (সা.) (কারো নিকট) শিক্ষা গ্রহণ করেন নি।

কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি বিশ্বাস করবে যে , পড়াশুনা করেন নি এমন একজন ব্যক্তি , যিনি অজ্ঞ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের পাঠ্য পুস্তক থেকে দূরে বিদ্যমান এক সমাজে বড় হয়েছেন , তিনি এক জ্ঞানগর্ভ ও বিশ্বজনীন পুস্তক উপহার দিয়েছেন ? এ ধরনের ব্যক্তি বর্গের নিকট প্রশ্ন করা উচিৎ যে , কিরূপে ইসলামের নবী (সা.) তৌরাত ও ইঞ্জিলের উপর পড়াশুনা করতেন ? যে ব্যক্তি তার সমস্ত জীবনে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যান নি , কোন শিক্ষাগুরুর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন নি , কিরূপে তিনি অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে সংবাদ দিতে পারেন ?!

ওহী কী ?

যা সর্বজন স্বীকৃত তাতে বলা হয় , মহান আল্লাহ্ ও তাঁর নবী (আ.) গণের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং তারা সকল বাস্তবতার জ্ঞান বিশ্ব সৃষ্টির উৎস (অর্থাৎ মহান আল্লাহ্) থেকে লাভ করতেন। আর এ সম্পর্ক তাঁদের আত্মিক উৎকর্ষ ও দৃঢ়তার ফলে বিদ্যমান ছিল।

তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে , যদি নবীগণের (আ.) সাথে এ সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় তবে তাঁদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। নবীগণের (আ.) সকল মর্যাদার কারণ হলো যে , তারা বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কের যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। সুতরাং তাঁরা যা বলতেন তাতে কোন প্রকার সন্দেহ ও জটিলতা ছিলনা। বরং কী এবং কোথা থেকে এসেছে এ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণরূপে অবহিত ছিলেন , যা কারো কারো তথাকথিত অর্ন্তদৃষ্টির (كشف ) দাবির ব্যতিক্রম যেখানে যোগ সাধনা ও অন্যান্য পদ্ধতি ও নিয়ামকের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এর অধিকারীদের নিকট এমন কিছু বিষয় অর্জিত হয় যে তারা জানে না কোথা থেকে এসেছে। বরং প্রায়শঃই ধারণা ও অনুমানের বশবর্তী আবার কখনোবা প্রকৃত অবস্থার ব্যতিক্রম হয়ে থাকে।

যাহোক , এ দলের (যোগী) উপর নবীগণের (আ.) শ্রেষ্ঠত্ব এতটা সুস্পষ্ট যে , কোন প্রকার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আল্লাহর নবীগণ (আ.) যা বলেন ও দেখেন তা-ই বাস্তব ও সত্য। এমনকি উদাহরণত এক বিন্দু পরিমাণ সন্দেহও তাদের নিকট আশ্রয় পায় না। অতএব , ওহী হলো মহান আল্লাহ্ ও নবীগণের (আ.) মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল তা-ই। আর এ সম্পর্ক কখনো কখনো জিব্রাইলের মাধ্যমে , আবার কখনো কখনো কোন প্রকার মাধ্যম ব্যতীতই সম্পন্ন হতো।


4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27