ইমাম হোসাইন (আ.)-এর কালজয়ী বিপ্লব(৩য় খণ্ড)

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর কালজয়ী বিপ্লব(৩য় খণ্ড)25%

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর কালজয়ী বিপ্লব(৩য় খণ্ড) লেখক:
: আব্দুল কুদ্দুস বাদশা
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইমাম হোসাইন (আ.)

  • শুরু
  • পূর্বের
  • 11 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 13142 / ডাউনলোড: 4777
সাইজ সাইজ সাইজ
ইমাম হোসাইন (আ.)-এর কালজয়ী বিপ্লব(৩য় খণ্ড)

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর কালজয়ী বিপ্লব(৩য় খণ্ড)

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

বার্তা পৌঁছানোর উপকরণাদি ও মাধ্যমসমূহ

একটি বার্তার সফলতা নির্ভর করে চারটি শর্তের উপর। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো খোদ বার্তার বিষয়সার। অর্থাৎ বার্তা হতে হবে সমৃদ্ধ ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান। কোরআনের পরিভাষায় যাকে বলা হয় হক্কানী তথা সত্যনিষ্ঠ বার্তা। এটা হলো এমন একটা শর্ত যা বার্তা বাহকের সাথে সম্পৃক্ত নয়। আর এই যে খোদ বার্তার সত্যনিষ্ঠ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা রয়েছে এ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক,মানসিক এবং মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই,তদ্রুপ দীনি এবং মযহাবী দৃষ্টিকোণ থেকেও কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। পবিত্র কোরআন এ দিকটির ওপর নির্ভর করে যে,একটি বিষয় যদি সত্যনিষ্ঠ ও বাস্তব হয় তাহলে খোদ ঐ বাস্তবসত্য হওয়াটাই তার স্থায়িত্বের কারণ হয়। পক্ষান্তরে কোনো বার্তার অন্তসারশুন্য হওয়া বা মিথ্যা ও বাতিল হওয়াটাই তার ধ্বংসের কারণ হয় যা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে নিঃশেষ করে ফেলে। পবিত্র কোরআনে এ সংক্রান্ত একটি উপমা রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ

) نزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَسَالَتْ أَوْدِيَةٌ بِقَدَرِ‌هَا فَاحْتَمَلَ السَّيْلُ زَبَدًا رَّ‌ابِيًا وَمِمَّا يُوقِدُونَ عَلَيْهِ فِي النَّارِ‌ ابْتِغَاءَ حِلْيَةٍ أَوْ مَتَاعٍ زَبَدٌ مِّثْلُهُ كَذَٰلِكَ يَضْرِ‌بُ اللَّـهُ الْحَقَّ وَالْبَاطِلَ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً وَأَمَّا مَا يَنفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْ‌ضِ كَذَٰلِكَ يَضْرِ‌بُ اللَّـهُ الْأَمْثَالَ(

অর্থাৎ,তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর স্লোতধারা প্রবাহিত হতে থাকে নিজ নিজ পরিমাণ অনুযায়ী। অতঃপর,স্লোতধারা স্ফীত ফেনারাশি উপরে নিয়ে আসে এবং অলঙ্কার ও তৈজসপত্রের জন্য যে বস্তুকে আগুনে উত্তপ্ত করে,তাতেও তেমনি ফেনারাশি থাকে। এমনিভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত প্রদান করেন। অতএব ফেনা তো শুকিয়ে লুপ্ত হয়ে যায়। আর যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ এমনিভাবে দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন। (রাদ : ১৭)

এ আয়াতে প্রথমে বৃষ্টি নামার এবং পানির ঢলে বান ডাকার বর্ণনা দেবার পর এবং সে বানের তোড়ে ছোট-বড় সব গর্ত-নালা প্রত্যেকে তাদের ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী পানিতে পূর্ণ হওয়া এবং পানির স্লোত বয়ে চলা কালে কিভাবে তার ওপর ফেনার আস্তরণ জমে যায় যে আস্তরণ কখনো কখনো পানির উপরিভাগকে পুরোপুরি আচ্ছাদিত করে ফেলে ইত্যাদি বর্ণনা তুলে ধরার পর বলেঃ কিন্তু ফেনা অবশেষে বিদুরিত হয়। আর যা কিছু মানুষের জন্য লাভজনক ও উপকারী অর্থাৎ মূল পানিগুলোই শুধু অবশিষ্ট রয়ে যায়। অতঃপর বলেঃ এ উপমাটি হলো হক ও বাতিলের উপমা।

একটি বার্তা সফল হওয়ার আরো অনেক নিয়ামক রয়েছে যেগুলো অবশ্য খোদ বার্তার সারবস্তুর সাথে সম্পৃক্ত নয়। একটি বার্তা যখন চায় এক আত্মা থেকে আরেক আত্মায় পৌছবে এবং জনমানুষের আত্মাগুলিতে প্রবেশ করবে,একটি সমাজকে স্বীয় আধ্যাত্মিক প্রভাবে প্রভাবান্বিত করবে তখন নিঃসন্দেহে বার্তাবাহকদের দরকার রয়েছে,যারা সে বার্তাকে পৌছে দেব। একারণে,বার্তাবাহকদের মধ্যে যেসব গুণবৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা থাকা বাঞ্ছনীয় সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বা নিয়ামক হলো সেই সব উপকরণ এবং মাধ্যম,বার্তা পৌছাবার জন্যে যেগুলোকে ব্যাবহার করা হয়। একজন বার্তাপ্রবাহকের নিঃসন্দেহে কি উপকরণ এবং হাতিয়ার ও মাধ্যমের দরকার য দ্বারা সে যে বার্তা পৌছে দেবার জন্যে আদিষ্ট হয়েছে সেটা জনগণের কাছে (ইবলাগ) বা পৌছাতে সক্ষম হয়। আর চতুর্থ কারণ তথা নিয়ামক হলো বার্তাপ্রবাহকের Method বা পদ্ধতি এবং কৌশল ও অভিরুচি। অর্থাৎ কি উপায়ে সে বার্তা পৌছাবে। সুতরাং যে চারটি নিয়ামক কারণ একটি বার্তার সফলতা বা ব্যর্থতার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে সেগুলো হলো যথাঃ

১. বার্তার বিষয়সার (অর্থাৎ তা সমৃদ্ধ ও ন্যায়নিষ্ঠ হওয়া)

২. বার্তাবাহকের নিজস্ব বিশেষ ব্যক্তিত্ব

৩. বার্তা পৌছানোর উপকরণাদি

৪. বার্তা পৌছানোর কলা-কৌশল

এখানে বার্তা পৌছানোর উপকরণাদি বিষয়ে আলোচনাটি ধরে এগিয়ে যাওয়া যাক। একটি বার্তা যদি মানুষের কাছে পৌছতে চায় তাহলে নিঃসন্দেহে উপায় উপকরণাদির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ,উপকরণ ছাড়া একস্থানে বসে থেকে কখনো আরেক জনের অন্তরে কোনো বার্তাকে অঙ্কিত করে দেয়া সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নূন্যতম যে উপকরণ কাজে না লাগালে নয় তা হলো বাকশক্তি এবং কথার মাধ্যম। শব্দ উচ্চারণ করে কিম্বা বক্তৃতা করে অথবা কবিতা আবৃতির মাধ্যমে অথবা কোনো প্রবন্ধ লিখে। মোটকথা কোনো না কোনো উপকরণ দরকার। একজন বক্তার জন্য তার আসনটি (মেম্বার) একটি উপকরণ,তদ্রুপ মাক্রোফোনটিও একটি উপকরণ ইত্যাদি শত সহস্র উপকরণের কথা থাকতে পারে একটি বার্তা পৌছানোর জন্য ।

তবে একটি কথা রয়েছে। সেটা হলো পৌছে দেবার বার্তাটি যদি হয় ঐশী বার্তা তাহলে সেক্ষেত্রে যে কোনো উপকরণকেই কাজে লাগানো যাবে না। অর্থাৎ যাতে ঐশী বার্তা পৌছানো হয় এবং যেহেতু উদ্দেশ্যও পুত-পবিত্র কাজেই আমাদের এমনটা ভাবা ঠিক হবে না যে উপকরণ যা-ই হোক না কেন আমরা একাজে তা ব্যাবহার করতে পারবো। চাই সে উপকরণ বৈধ হোক আর অবৈধ। বলা হয়ে থাকে যে  اَلْغَايَةُ تُبَرِّرُ الْمَبَادِي  অর্থাৎ,‘‘ ফলাফলসমূহ উপকরণাদিকে বৈধ করে দেয়।’’ অর্থাৎ উদ্দেশ্য সঠিক হলেই আর উপকরণের বাছবিচার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এহেন নীতি পরিত্যাজ্য । আমরা যদি একটি পবিত্র কাজের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করি তাহলে একটি পবিত্র উপকরণ কিম্বা কমপক্ষে একটি বৈধ উপকরণকে কাজে লাগাতে পারি। কিন্তু যদি অবৈধ হয় তাহলে তার আশ্রয় নেয়া যাবে না। আমরা কখনো কখনো দেখতে পাই যে কিছু কিছু লক্ষ্য যেগুলো নিজে বৈধ এবং ন্যায়নীতিপূর্ণ,কিন্তু সেগুলোর জন্যে এমনসব উপকরণ ব্যাবহার করা হয় যেগুলো নীতিবিরুদ্ধ এবং অবৈধ। এর থেকে বুঝা যায় যে যারা দেখাতে চায় যে আমাদের এমন এমন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে আর এগুলো হলো তার উপকরণ,আসলে ঐ উপকরণগুলোই তাদের লক্ষ্য । উদাহরণ হিসাবে বলা যায়,আগেকার যুগে একটি বিষয় ছিল যাকে বলা হতো শাবিহখানি । তেহরানে এটা বেশি বেশি ছিল। এটা হলো কারবালার ঘটনাবলীর উপর একটি কার নাট্যাভিনয়। কারবালার ঘটনাবলী নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরার মূল বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু আমরা দেখতে পেতাম যে আস্তে আস্তে মূল শাবিহখানির বিষয়টিই মানুষের উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছিল। যেন তখন আর ইমাম হোসাইন (আঃ) এবং কারবালার কাহিনী তুলে ধরা বা সে সব হৃদয়বিদারক ঘটনাকে চিত্রায়িত করা কাজ ছিল না। শাবিহখানির মধ্যে তখন শত সহস্র বিষয় যুক্ত হয়ে পড়ে যেগুলো আর যাই হোক,কারবালার ঘটনাবলীর সাথে অন্তত মিলতো না। কত যে খেয়ানত,কত যে মিথ্যাচার,ধোকাবাজি আর রিপুচর্চা এসব শাবিহখানির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল যে সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় কখনো কখনো সেগুলো হারাম কাজ হয়ে যেত! কোনো নিয়মনীতির প্রতিই যেন তার দায়বদ্ধতা নয়। আর এটা নিয়ে বিজ্ঞ দীনি আলেমবর্গের সাথে একটা বিরোধ লেগেই থাকতো। তারা এগুলোকে বরদাশত করতেন না। এমনকি পবিত্র কোম শহরেও শাবিহখানির নামে এসব উপহাসমূলক কল্পকাহিণী চালু হয়ে পড়ে। আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দীর মারজাইয়্যাত লাভের প্রথমদিকে যখন তার অসাধারণ প্রতাপ ছিল তখন একবার মহররমের আগে তাকে জানানো হলো যে আমাদের শাবিহখানির অবস্থা এরকম। তিনি তাদেরকে আমন্ত্রণ জানালেন। প্রত্যেক হেইয়্যাত তথা আযাদারী দলের নেতারা তার আমন্ত্রণে আসলো। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন,আপনারা কার তাকলীদ করেন? সকলে উত্তর দিল যে আমরা আপনারই তাকলীদ করি। তিনি বললেন,যদি আমার তাকলীদ করে থাকেন তাহলে আমার ফতোয়া হলো এই যে শাবিহখানিকে আপনারা এই অবস্থায় পরিণত করেছেন,এটা হারাম কাজ। তখন তারা খুবই স্পষ্টরূপে আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দীকে জানিয়ে দিল যে,মুহতারাম,আমরা সারা বছর আপনারই তাকলীদ করি বটে;কিন্তু এই তিন চারটে দিন কোন ক্রমে আপনার তাকলীদ করবো না!! তারা একথা বলেই সেখান থেকে প্রস্থান করলো এবং তাদের মারজায়ে তাকলীদের কথার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপই করলো না। তাহলে বোঝা গেল যে এখানে উদ্দেশ্য ইমাম হোসাইন (আঃ) বা ইসলাম নয়। বরং তাদের উদ্দেশ্য হলো ঐ নাট্যাভিনয় যা থেকে তাদের অন্য কোনো ফায়দা রয়েছে। কিম্বা কমপক্ষে মজা তো উপভোগ করতে পারে! এটা ছিল এর পুরাতন রূপ।

আর এর আধুনিক রূপ হলো আমরা বর্তমানে যেটা দেখতে পাই কোনো সুফী দরেবেশর জন্য কিছূকাল অন্তর অন্তর একটা বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত করা দেশের অভ্যন্তরে কিম্বা বাইরে,কোনো বড় দরেবশ যেমন মাওলানা রুমির নামে। দেখতে পাই যে কি একটা বলে যা তাদের ভাষায়‘‘ সামা’’ যদিও খোদ এই সামা নিয়েও অনেক কথা রয়েছে। ঐ সামা র মজিলস বৈধ নাকি অবৈধ আমি সে বিষয়ে কথা বলতে চাই না। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে উক্ত সামা র মজিলস এরূপ ছিল না যে গোটা কতেক নাচনে আর ঢুলি যাদের মাথায় ইরফানের মরমী অর্থই বোধগম্য নয়,তারা সেখানে অংশগ্রহণ করবে! পরবর্তিতে আমরা দেখতে পাই যে (তৎকালীন শাহ সরকার কর্তৃক) মাওলানা রুমীর ৭০০তম জন্মবার্ষিকী পালনের নামে যে কংগ্রেসের আয়াজন করেছে সেখানে যে একটিমাত্র কাজ করা হয় তাহলো একদল নাচনে কে এনে তথাকথিত সামা র মজিলস অনুষ্ঠিত করা,একটি রিপুচর্চার মজলিস তাও আবার মাওলানা রুমির শানে।

উদ্দেশ্য যদি বৈধ হয়ে থাকে তাহলে উপায় উপকরণও বৈধ হতে হবে। অপরদিকে আবার একদল রয়েছে যাদেরকে বৈধ উপকরণ ব্যবহারের জন্য হাজার কষ্ট করেও রাজি করানো যায় না। এই মাইক্রোফোনের কথাই ধরুন। যখন প্রথম এটা তৈরী হয় তখন কতইনা এর বিরোধিতা করা হয়! যদিও শব্দের জন্যে মাইক্রোফোন হলো চোখের জন্য চশমার তুল্য কিম্বা কানের জন্য ইয়ার-ট্রাম্পেট তুল্য। যদি মানুষের কান ভার থাকে তাহলে এক ইয়ার-ট্রাম্পেট স্থাপন করে। এর অর্থ হলো আগে শুনতো না,এখন শুনতে পায়। আগে কোরআনকে শুনতে পেত না,এখন কোরআনকে ভালোমতো শুনতে পায়। গালিগালাজকেও আগে শুনতো না,এখন গালিগালাজকেও ভালোমতো শুনতে পায়। কিন্তু এটা তো ইয়ার-ট্রাম্পেট এর সাথে সম্পর্কিত না। মােইক্রোফোনের বেলায়ও সেই একই কথা। মাইক্রোফোন তো আর হারাম কাজের বিশেষ উপকরণ নয়। সেই উপকরণই ব্যাবহার করা হারাম যার দ্বারা কেবল হারাম কাজ ছাড়া আর কিছুই সাধিত হয় না। যেমন‘‘ ক্রুশ’’ চিহ্নটি । যা দ্বারা শিরকের প্রতীক ছাড়া আর কিছুই বুঝায় না। মূর্তিও তদ্রুপ। কিন্তু যেসব জিনিস দ্বারা হারাম কাজও করা যায় আবার হালাল কাজও করা যায় সেগুলো হারাম হবে কেন?

জনৈক ওয়াজকারী বলতেন,মাইক আবিস্কার হওয়ার প্রথমদিকের একটি ঘটনা। আমরাও নতুন নতুন মাইকে কথা বলা শুরু করেছি। (সত্যি বলতে কি এই মাইক ওয়াজকারীদের ওপর আসলেই অনেক দাবীদার। যদি ত্রিশবছর আগে লক্ষ্য করেন তাহলে দেখা যাবে যে সত্তর বছর বয়স হয়েছে এমন ওয়াজকারী খুবই কম ছিল। বেশীরভাগ ওয়াজকারীই চল্লিশ-পঞ্চাশবছর বয়সেই কোনো একভাবে মৃত্যুবরণ করতেন। আর এর পেছনে একটি কারণ ছিল এই মাইক না থাকা। ফলে তাদের অনেক জোরে জোরে কথা বলতে হতো। তখন গাড়ীঘোড়াও তো ছিল না যে তারপর গাড়ীতে চেপে বসবে। গাধা বা খচ্চরের পিঠে সওয়ার হতেন। আর শীতের সময় এটা তাদের জন্য খুব খারাপ হতো। ফলে তাদের অধিকাংশই যুবক বয়সেই মৃত্যুর কবলে পড়তেন। এক্ষমতাবস্থায় মাইক তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে) কিন্তু তখনো মাইক প্রচলন লাভ করেনি। কথা ছিল আমি এক বৃহৎ মজলিসে বক্তব্য রাখবো। সেখানে মাইকও রাখা হয়েছিল। আমার আগে জনৈক বক্তা মেম্বারে ওঠেন। মেম্বারে উঠেই তিনি বললেন,এই শয়তানের গোরটাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। শয়তানের গোরটাকে সরিয়ে ফেলা হলো। আমি দেখলাম যদি সহ্য করি এবং কথা না বিল তাহলে এই শয়তানের গোরটাকে তো নিয়ে গেছে,পরবর্তিতেও একে আর ব্যাবহার করা যাবে না। তিনি বলেন যে,আমি যেইমাত্র মেম্বারে আরোহণ করলাম,বললাম,ঐ শয়তানের জীনটাকে আনা।

মোটকথা,এধরনের নিরেট মন-মানসিকতা আর শুস্ক চিন্তা-ভাবনা অবান্তর। মাইকের কোনো দোষ নেই। রেডিও,টেলিভিশন,ফিল্ম ইত্যাদি নিজ পরিসরে কোনো দুষ্ট নয়। এর বিষয়সার কি হবে? রেডিওতে যা বলা হবে সেটা কি হবে? টেলিভিশনে যা দেখানো হবে তা কি হবে? ফিল্মে যা দর্শন করা হবে তা কি হবে? এ ক্ষেত্রে মানুষের আর শুস্কতার পরিচয় দেয়া উচিত নয় এবং যে জিনিস নিজ পরিসরে হারাম নয় বরং বৈধ,সেটাকে একটা অবৈধ হিসাবে প্রতিপন্ন করা উচিত নয়। ইসলামের ইতিহাসে তৎকালীন যুগে যেসব উপকরণ ছিল সেগুলোর কেমন ব্যাবহার হয়েছে এবং সেসব উপকরণ ইসলামের বার্তা পৌছানোর কাজে কি অসাধারণ অবদান রেখেছে সে সম্পর্কে জানতে হলে এ বিষয়টির দিকে মনোযোগ প্রদান করতে হবে। কখনো কি পবিত্র কোরআন মজিদের আয়াতমালার বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতা,এগুলোর প্রঞ্জলতা এবং আকর্ষণীয়তার ব্যাপারে চিন্তা করেছেন? কোরআন দুটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারীঃ একটি হলো এর বিষয়বস্তুর বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ হক্কানী তথা সত্যনিষ্ঠতা। আর দ্বিতীয়টি হলো সৌন্দর্যময়তা।

কোরআন তার অর্ধেক সফলতা এপথ ধরেই অর্জন করেছে। সৌন্দর্যময়তা ও শিল্পশৈলিতা। কোরআনের বিশুদ্ধতা রয়েছে যা মানবের উর্দ্ধে । কোরআনের এই প্রভাব-প্রতাপ তার সৌন্দর্যের দান। কোনো উক্তির বিশুদ্ধতা এবং সৌন্দর্যই সেই উক্তি কে অপরের কাছে পৌছে দেবার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। স্বয়ং কোরআনও তার এই বিশুদ্ধতা এবং সৌন্দর্যকে নিয়ে কতই না গর্ব করে এবং এ ব্যাপারে কতই না কথা বলে! আসলে কোরআনের আয়াতমালার প্রভাব সম্পর্কে স্বয়ং কোরআনেই কতো আলোচনা এসেছে! এই প্রভাব হলো কোরআনের রীতি পদ্ধতি সম্পর্কিত অর্থাৎ এর বিশুদ্ধতা ও সৌন্দর্য।

) اللَّـهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُّتَشَابِهًا مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ‌ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَ‌بَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَىٰ ذِكْرِ‌ اللَّـهِ ذَٰلِكَ هُدَى اللَّـهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاءُ(

অর্থাৎ,আল্লাহ কিতাব তথা উত্তম বাণী অবতীর্ণ করেছেন,যা সামঞ্জস্যপূর্ণ,পুনঃ পুনঃ গঠিত। এতে তাদের লোম কাটা দিয়ে ওঠে চামড়ার উপর,যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে। এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহর পথনির্দেশ। এর মাধ্যমে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। ( যুমারঃ ২৩)

এই যে একটি হাকিকত তথা সারসত্য বিষয় যা বিদ্যমান ছিল এবং বিদ্যমান রয়েছে,কোরআন সে ব্যাপারে বর্ণনা করছে। উক্তি সমূহের মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট এবং সুন্দরতম হলো-মাছানি কিতাব। (মাছানির অর্থ যাই হোক না কেন) تَقْشَعِرُّ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ  অর্থাৎ,যাদের অন্তরে প্রতিপালকের ভয় থেকে একটি অনুভূতি রয়েছে,যখন তারা কোরআনকে শ্রবণ করে তখন কাঁপতে শুরু করে। তাদের শরীরের চামড়া মুষড়ে পড়ে,

) ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَ قُلُوبُهُمْ اِلَي ذِآکرِ اللهِ(

আরেকটি আয়াতে এসেছেঃ

) اِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ اِذَا ذُآکرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَ اِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ اِيمَاناً وَ عَلَي رَبِّهِمْ يَتَوَکَّلُونَ(

অর্থাৎ,যারা ঈমানদার তারা এমন যে,যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম,তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি ভরসা পোষণ করে। (আনফাল ২)

অথবা কিছু আয়াতে সেসকল ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যারা কোরআনের আয়াত শোনার সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ।

) يَخِرُّونَ لِلْاَذْقَانِ سُجَّداً(

অর্থাৎ,তারা নতমস্তকে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। (ইসরাঃ ১০৭)

কিম্বা কিছু খৃষ্টানদের ব্যাপারে বর্ণনা করে যেঃ

) إذَا سَمِعُوا مَا اُنْزِلَ اِلَي الرَّسُولِ تَرَي اَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ(

অর্থাৎ,তারা রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে,তা যখন শুনে,তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রু সজল দেখতে পাবেন। (মায়িদা ৮৩)

আসলে হাবাশার বিপ্লব কিভাবে সংঘটিত হয়? হাবাশার বিপ্লবের সূচনা হয় কি থেকে? হাবাশা মুসলমান হয়ে যায় কেন এবং এই ইসলামের উৎপত্তি হয় কোত্থেকে? কোরআন এবং এর সৌন্দর্য ছাড়া কি অন্য কিছু ছিল? সেদিনকার সে ঘটনায় হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব হাবাশায় ঐ সভায় প্রবেশ করলেন,রাজকীয় গাম্ভীর্যতা চারপাশে,তিনি শুরু করলেন পবিত্র কোরআন (সুরা তাহা) থেকে তেলাওয়াত করতে। মুহুর্তেই গোটা আসর বিস্ময়ে জেগে উঠলো। এ জাগরণের কারণ কি ছিল?! কোরআন বিশুদ্ধতা ও বর্ণনা শক্তি এবং প্রঞ্জলতা ও আকর্ষণীয়তা আর প্রভাব ক্ষমতার দিক থেকে এমনভাবে রচিত যে অন্তরসমূহের উপরে এরূপে প্রভাব বিস্তার করে।

আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) এর জনগণের মাঝে সফলতার একটি কারণ হলো তার ভাষার বিশুদ্ধতা। নাহজুল বালাগা -আজ যা সংকলনের এক সহাস্রাব্দকাল অতিক্রান্ত হতে চলেছে অর্থাৎ গ্রন্থাকারে রূপলাভ করার সময় থেকে এক হাজার বছর কেটে গেছে,আর মূল খোতবাসমূহ উচ্চারিত হওয়ার পর থেকে প্রায় চৌদ্দশ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু সেই প্রাচীন আমলেও কি আর বর্তমান যুগেও কি,তার শীর্ষ স্থান বজায় রেখেছে। আমি এক সময় একটা সমীক্ষা চালিয়েছিলাম। দেখতে পাই যে স্বয়ং আমিরুল মুমিনীন (আঃ) এর যুগ থেকে অদ্যাবধি আরবের সকল সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ আমিরুল মুমিনীন (আঃ)-এর বিশুদ্ধ ও উৎকৃষ্ট ভাষার সামনে কুর্ণিশ জানিয়ে এসেছে ।

বলা হয় যে,মিশরে কয়েকবছর আগে শাকিল আরসেলান যাকে‘‘ আমিরুল বাইয়্যান’’ তথা বাগ্মী সম্রাট বলে আখ্যায়িত করা হতো-তার সম্মানে এক সম্বর্ধনা সভার আয়াজন করা হয়েছিল। এ সভায় বক্তাদের মধ্যে একজন তার বক্তৃতায় শাকিল আরসেলানের প্রশংসা তুলে ধরতে গিয়ে এক পর্যায়ে তাকে হযরত আলী (আঃ)-এর সাথে তুলনা করে বলে যে,শাকিল আরসেলান হলেন আমাদের যুগের আমিরুল বাইয়্যান যেমনভাবে আলী ইবনে আবি তালিব ছিলেন তার যুগের আমিরুল বাইয়্যান অর্থাৎ বাগ্মী সম্রাট। যখন স্বয়ং শাকিল আরসেলান বক্তৃতা মঞ্চে আরোহন করলেন,প্রচণ্ড ক্ষুধা অবস্থায় বললেন,এসব আজগুবি কথাবার্তা বলা হচ্ছে কেন?! আমাকে আলী ইবনে আবি তালিবের সাথে তুলনা করছেন?! আমি আলীর জুতোর ফিতার সমানও হতে পারবো না। আমার বয়ান কোথায় আর হযরত আলীর বয়ান কোথায়?! আমাদের যুগেও এমন এমন লোক দেখি নির্মল পবিত্র অন্তরের অধিকারী,যখন হযরত আলীর বক্তৃতা শ্রবণ করে,মনের অজান্তে তাদের চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়। এটা তাহলে কি? বক্তৃতার সৌন্দর্য থেকেই। স্বয়ং হযরত আলীর জামানায় এধরনের নজীর অনেক পাওয়া যায়।

হযরত আলী (আঃ) এর‘‘ খুতবাতুল গাররা’’ তথা দীপ্ত ভাষণটি যা দৃশ্যতঃ মরুভূমিতে উচ্চারিত হয়েছিল,সে সম্পর্কে লেখা রয়েছে যে,যখন ভাষণ শেষ হয় তখন সমবেত সবাই সেভাবেই অশ্রু ঝরিয়ে যাচ্ছিল।‘‘ হাম্মাম’’ নাম্মী জনৈক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আমীরুল মুমিনীনের কাছে আবেদন জানালেন যে,মুত্তাকী লোকদের পরিচয় কি আমাকে ব্যাখ্যা দিন। প্রথমে ইমাম এড়িয়ে যেতে চাইলেন এবং দু-তিনটি বর্ণনা দিয়ে থেমে গেলেন। কিন্তু হাম্মাম তুষ্ট হলেন না। বললেন,আরো জানতে চাই। আপনি পরিপূর্ণভাবে মুত্তাকীর চিত্র আমার জন্য চিত্রায়িত করুন। এবার হযরত আলী (আঃ) ঐ মজলিসেই শুরু করলেন মুত্তাকীদের পরিচয় ব্যাখ্যা করতে;মুত্তাকীরা তাদের রাত অতিবাহিত করে এভাবে,তাদের দিন কাটে এভাবে,তাদের বস্ত্র এরূপ,লোকজনের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে তারা এরূপ,তাদের কোরআন পড়া এরূপ। আমি (ওস্তাদ শহীদ মুতাহহারী) একবার গণনা করে দেখেছিলাম,চল্লিশটি বাক্যের মাধ্যমে মুত্তাকীদের একশ’’ ত্রিশটি গুণবৈশিষ্ট্য ঐ মজলিসে ব্যাখ্যা করেন। ঐ লোকটি এই বর্ণনা যতই শুনছিলেন ততই তার আসক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অতঃপর একসময় জোরে চিৎকার করে ওঠেন এবং সেখানেই মৃত্যু বরণ করেন। আমিরুল মুমিনীন বললেন :  هَكَذَا تَصْنَعُ الْمَوَاعِظُ الْبَالِغَةُ بِاَهْلِهَا - অর্থাৎ বক্তৃতা যদি বিশুদ্ধ হয় আর অন্তর যদি গ্রহী হয় তাহলে এরূপ করে থাকে।( নাহজুল বালাগা , ফয়জুল ইসলাম , খোতবা নং ১৮৪ , খোতবা - ই হাম্মাম নামে প্রসিদ্ধ , পৃষ্ঠা - ৬১৮ )

দোয়া দরুদের কথাও বলা যায়। দোয়াসমূহের মধ্যে মানুষ আল্লাহর সাথে কথা বলে থাকে। নিছক শব্দ বা উক্তির কোনো প্রভাব থাকে না। কিন্তু আমাদের দোয়াসমুহ পরিপূর্ণতম বিশুদ্ধতা এবং সৌন্দর্যের অধিকারী। কেন? কারণ,দোয়ার ঐ সৌন্দর্য যেন একটা মাধ্যম হয় যাতে দোয়ার বিষয়বস্তুকে মানুষের অন্তরে পৌছাতে সক্ষম হয়। কেন বলা হয় যে মুয়াজ্জিন সুকন্ঠের হওয়া মুস্তাহাব? এটা তো ইসলামী ফেকাহর কথা।‘‘ আল্লাহু আকবার’’ কে সুকন্ঠে বলা হোক আর কর্কশ কণ্ঠে বলা হোক-অর্থ তো আর বদলে যায় না। কিম্বা‘‘ আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ কে সুকন্ঠে বলা হোক আর কর্কশ কন্ঠে বলা হোক-অর্থ তো আর পরিবর্তন হয়না। কিন্তু মানুষ যখন‘‘ আল্লাহু আকবার’’ কে কোনো কর্কশ কন্ঠ থেকে না শুনে বরং কোনো সুললিত কন্ঠ থেকে শ্রবণ করে তখন তার অন্তরে অন্যরূপে প্রভাব ফেলে।

শেখ সাদী এক কাহিনী বর্ণনা করেনঃ তিনি বলেন যে এক শহরে একজন মুয়াজ্জিন ছিল খুবই কর্কশ গলার। সে ঐ কর্কশ কন্ঠে আযান দিচ্ছিল। একসময় তাকিয়ে দেখলো যে এক ইহুদী তার জন্যে উপেঢৗকন নিয়ে উপস্থিত হলো এবং বললো এই সামান্য উপহারটুকু গ্রহণ করবে? মুয়াজ্জিন বললোঃ কেন? সে বললোঃ কারণ,তুমি আমার বড় একটি উপকার করেছ। মুয়াজ্জিন বললোঃ কি উপকার! আমি তো কোনোই উপকারই তোমার জন্যে করিনি। ইহুদী তখন বললোঃ আমার একটি কন্যা রয়েছে যে ইদানীং ইসলাম ধর্মের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছিল। কিন্তু তুমি যখন আযান দিচ্ছিলে তখন তোমার মুখ থেকে আল্লাহু আকবার ধ্বনি শুনে এখন সে ইসলাম থেকে বিমুখ হয়ে গেছে। তাই আমি তোমার জন্যে এই উপহারটি নিয়ে এসেছি। কারণ আমার মেয়েকে মুসলমান হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে তুমি আমার বড়ই উপকার করেছ।

মোটকথা এ বিষয়টি নিজেই একটি বিষয়।

ইবনে সীনা তার‘‘ মাকামাতুল আরেফীন’’ গ্রন্থে মানুষের জন্য আত্মিক সংযুতি কখন সৃষ্টি হয় সে সম্পর্কে খুবই উত্তম ও সুক্ষ্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন এবং এর কতিপয় কারণ উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে একটি হলো যথাঃ  اَلْكَلامُ الْوَاعِظُ مِنْ قَائِلٍ زَآکيٍّ   অর্থাৎ উপদেশ বাণী যখন কোনো পবিত্র বক্তার মুখ থেকে নিঃসৃত হয়। অর্থাৎ প্রথম কথা হলো স্বয়ং উপদেশদাতা (ওয়াজকারী) কে শুদ্ধ ও পবিত্র অন্তরের অধিকারী হতে হবে। অতঃপর বলেনঃ   بِعِبَارَةٍ بَلِيغَةٍ وَ نَغْمَةٍ رَخِيمَةٍ  অর্থাৎ উক্ত ওয়াজকারীর কন্ঠ হতে হবে সুললিত,সুকন্ঠ । যাতে শ্রোতার মনে উত্তমরূপে রেখাপাত করতে সক্ষম হয়। ওয়াজকারীর কথা বিশুদ্ধ হতে হবে তাহলে শ্রোতার অন্তরে প্রভাব ফেলবে। স্বয়ং বক্তার চেহারা সুরতও এ প্রভাব ফেলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ আলোচনা করার উদ্দেশ্য একটাই। আর তাহলো যাতে বুঝা যায় যে অর্থ পৌছানো,নিজেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো হলো উপকরণ তথা মাধ্যম,এগুলোই বৈশিষ্ট্য আর পদ্ধতি। এই উপকরণ ও মাধ্যমগুলোই বার্তাকে চতুর্দিকের ব্যক্তি তথা জনতার কাছে পৌছে দেবে।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলতে হয়। স্বয়ং কোরআন পড়ার বিষয়টি কিরূপ? অবশ্য কোরআন আযানের মতো নয়। আযানের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে একজন আযান দেবার জায়গায় আরোহণ করবে এবং আযান প্রদান করবে। আর তাকে সুকন্ঠের অধিকারী হতে হবে। কিন্তু কোরআনকে সবাই পড়ে। যারাই কোরআন পড়ে তাদের কর্তব্য হলো যথাসম্ভব সুন্দরভাবে পড়া। এতে যেমন স্বয়ং কারীর অন্তরে উত্তম প্রভাব ফেলে,তদ্রুপ শ্রোতার অন্তরেও। কোরআনে এই যে নির্দেশ এসেছেঃ

) وَ رَتِّلِ الْقُرآنَ تَرْتِيلاً(

অর্থাৎ, কোরআন আবৃত্তি করুন তারতীল তথা সুবিন্যস্তভাবে এবং স্পষ্টভাবে। (মুযযাম্মিলঃ ৪)-এর অর্থ কি? অর্থাৎ যখন কোরআন পড়বেন তখন যেন শব্দাবলীকে এমন দ্রুততার সাথে পড়বেন না যে সেগুলো পরস্পর জোড়া লেগে যায়। আবার এমন বিরিত দিয়ে পড়বেন না যে এক শব্দ আরেকটি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এমনভাবে সেগুলো পড়তে হবে যেন কেউ বলে দিচ্ছে আর আপনি তা শুনে শুনে পাঠ করছেন। কিম্বা আপনি যেন নিজের সাথে নিজে কথা বলছেন। আরফগণের ভাষায়,মানুষের উচিত কোরআনকে সবসময় এমনভাবে পাঠ করা যে সে যেন মনে করে বক্তা হলেন আল্লাহ আর শ্রোতা সে নিজে। সে স্বয়ং আল্লাহর নিকট থেকে সরাসরি একথাগুলো শুনছে এবং গ্রহণ করছে।

আল্লামা ইকবাল লাহোরী বলেন,আমার পিতা আমাকে একটি কথা বলেন যা আমার ভাগ্য গড়ার কাজে অসাধারণ প্রভাব ফেলেছিল। তিনি বর্ণনা করেন যে একিদন আমি আমার কক্ষে বসে কোরআন পাঠ করার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এমন সময় আমার পিতা সে কক্ষের সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে থেমে গেলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে বললেনঃ মুহাম্মাদ! কোরআনকে এমনভাবে পাঠ করো যেন স্বয়ং তোমার উপরেই তা অবতীর্ণ হয়েছে। তখন থেকে আমি যখনই কোরআন খুলে বসি এবং আয়াতগুলোকে পাঠ করি তখনই আমি মনে করি যে,এ হলেন আমার আল্লাহ যিনি আমার সাথে অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইকবালের সাথে কথা বলছেন। 

এক হাদীসে রয়েছেঃ

 تَغَنَّوْا بِالْقُرْآنِ

অর্থাৎ কোরআনকে গানে গানে ( সূরে সূরে) পাঠ করো।( বিহারুল আনায়ার , খণ্ড ৯২ , পৃষ্ঠ - ১৯১ ; জামেউল আখবার , অধ্যায় ২৩ , পৃষ্ঠা - ৫৭ ) এমর্মে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেটা নিশ্চিত করে বলা যায় তাহলো এর বক্তব্য-তোমরা কোরআনকে খুবই সুরেলা কন্ঠে পাঠ করো। অবশ্য সেসব সুর যেগুলো আনন্দ ফুর্তির আসরের গান বাজনা সদৃশ্য এবং যৌন সুড়সুড়িকর সেগুলো তো অবধারিতভাবে হারাম এবং শরীয়ত বিরোধী। কিন্তু যেসব সুর মানুষের আত্মিক অবস্থার সাথে সমঞ্জস্যশীল তেমন সুরে হওয়া বাঞ্ছনীয়। স্মরণ রাখতে হবে যে পবিত্র কোরআনের অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে সুর ধারণ করার ক্ষেত্রে । এটাও কোরআনের এক মুজিজা। তবে সে সুর আত্মিক ও আধ্যাত্মিক। কোনো যৌন সুড়সুড়িকর সুর নয়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেবেন কোনো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ।

আব্দুল বাসেতের কোরআন তেলাওয়াত কেন দেশ দেশ এত জনপ্রিয়? কারণ,আব্দুল বাসেত তার মোহনীয় কন্ঠে সুললিত সুরে এবং তেলাওয়াতের যথাযথ নিয়ম কানুন মেনে যে সূরাকে যেমন সুরে পড়তে হবে ঠিক সেভাবে পড়তে জানেন এবং পড়ে থাকেন। আমাদের মাসুম ইমামগণের সম্পর্কেও বিশেষ করে ইমাম যয়নুল আবেদীন এবং ইমাম মোহাম্মদ বাকের (আঃ) সম্পর্কে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে তারা যখন কোরআন তেলাওয়াত করতেন,সুমধুর ও চিত্তাকর্ষক কন্ঠে ,তখন সে আওয়াজ গলিপথে ছড়িয়ে পড়তো। আর যারা সে পথে চলাচল করতো তারা সে সুর শুনে বিমোহিত হয়ে পড়তো। থেমে যেত তাদের পথ চলা। ইমাম (আঃ) এর দরজা পাশে ভীড় জমে যেত আর সে ভীড়ে পথ বন্ধ হয়ে যেত। এমনকি যারা পানি সরবরাহ করতো (সে আমলে চলন ছিল কিছু কিছু লোক মশক কাঁধে নিয়ে কুপ থেকে পানি তুলে মানুষের ঘরে ঘরে সরবরাহ করতো। মদীনায় শুধুই কুপ ছিল। পানির নহর ছিল না।) এবং সংখ্যায়ও নিতান্ত কম ছিল না,তারা কাঁধে পানির মশক নিয়েই যখন ইমাম (আঃ) এর বাড়ীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে যেত,তখন ইমাম (আঃ) এর সুমধুর কন্ঠ শুনে তাদের পা চলার শক্তি হারিয়ে ফেলতো। ঐ পানি ভরা ভারী মশকগুলো কাঁধে নিয়েই তারা দাড়িয়ে দাড়িয়ে কোরআন তেলাওয়াত শ্রবণে নিমগ্ন হয়ে যেত যতক্ষণ না ইমাম (আঃ) এর তেলাওয়াত শেষ হতো। এসব কিছু থেকে কি বেরিয়ে আসে? ঐশী বার্তা পৌছানোর জন্যে বৈধ উপকরণ বা মাধ্যমকে কাজে লাগানো। ইমাম (আঃ) কেন কোরআনকে এভাবে সুমধুর সুরে তেলাওয়াত করতেন? কারণ তিনি চেয়েছিলেন এই মাধ্যম দ্বারা তাবলীগের কাজ করতে। কোরআনকে মানুষের কাছে পৌছাতে। কেউ যখন ইসলামের ব্যাপারে কবিতা সম্পর্কে অধ্যয়ন করে তখন অদ্ভুত বিষয়াদি দেখতে পায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কবিতার সাথে লড়াইও করেছেন আবার কবিতাকে প্রচলনও করেছেন। সেই সব কবিতার সাথে লড়াই করেছেন যেগুলো আজকের ভাষায় প্রতিশ্রুতিশীল ছিল না। অর্থাৎ সেগুলো কোনো উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য সম্বলিত কবিতা ছিল না। নিছক কল্পনা আর খেয়াল,সময় কাটানোর মাধ্যম,মিথ্যাচারে ভরা। যেমন কেউ কবিতা আবৃত্তি করতো কারো বল্লমের প্রশংসায় কিম্বা কারো ঘোড়ার প্রশংসায়। কেউ বা আবার কবিতা আবৃত্তি করতো প্রেয়সীর তিলকের প্রশংসায় অথবা ধনীলোকের প্রশংসা করতো তার অর্থের আশায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কঠোরভাবে এজাতীয় কবিতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। বলেছেনঃ 

لَاَنْ يَمْتَلِيَ جَوْفُ رَجُلٍ قَيْحاً خَيْرٌ لَهُ مِنْ اَنْ يَمْتَلِيَ شِعْراً

অর্থাৎ যদি মানুষের পেট বমি দ্বারা ভরা থাকে সেটাও বরং ভালো ফালতু কবিতায় ভরা থাকার চেয়ে।( নাহজুল ফাসাহা , পৃষ্ঠা ৪৭০ , হাদীস নং ২২১৫ ) কিন্তু আবার তিনিই বলেছেনঃ

اِنَّ مِنَ الشِّعْرِ لَحِكْمَةً

অর্থাৎ কিছু কিছু কবিতা রয়েছে প্রজ্ঞাপূর্ণ।( আল গাদীর , খণ্ড ২ , পৃষ্ঠা ৯ ) সব কবিতাকে ফালতু বলা হয়নি। বরং কিছু কিছু কবিতা রয়েছে বাস্তবতা সমৃদ্ধ ।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার সভাসদদের মধ্যে কয়েকজন কবিকেও রেখেছিলেন। তাদের মেধ্যে একজন হলেন হাসসান বিন সাবিত। দুই প্রকার কবিতার মধ্যে প্রভেদকরণ শুধু কেবল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীসেই আসেনি। বরং পবিত্র কোরআনেও এ ব্যাপারে বর্ণনা রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ

) وَالشُّعَرَ‌اءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ  أَلَمْ تَرَ‌ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ  وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ  إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ(

-অর্থাৎ,বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি দেখ না যে,তারা প্রতি ময়দানেই উদভ্রান্ত হয়ে ফিরে? এবং এমন কথা বলে যা তারা করে না। তবে,তাদের কথা ভিন্ন যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে।( শুআরা ২২৪ - ২২৭ ) এমনও কবি ছিল যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অথবা পবিত্র ইমামগণ (আঃ) ঊৎসাহিত করতেন। কিন্তু কোন ধরনের কবিরা? যারা কবিতার সুন্দর আভরণে ইসলামের বার্তাকে এবং এর সারত্তাকে জনগণের কাছে তুলে ধরতো। নিঃসন্দেহে কবিতা যে কাজ করতে পারে,একটি প্রবন্ধ দ্বারা তা করা যায় না। কারণ,কবিতা হলো যুগের চেয়ে সৌন্দর্যময়। কবিতার ছন্দ থাকে,থাকে অন্তরাত্মা যা সূর ধারণ করতে সক্ষম। মস্তিস্ক তা মুখস্ত করতে সক্ষম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্বীয় সভাসদের একজন হাসসান বিন সাবিতকে বললেনঃ

لَا تَزَالُ مُؤَيِّداً بِرُوحِ الْقُدُسِ ، مَا ذَبَبْتَ عَنَّا اَهْلَ الْبَيْتِ

অর্থাৎ,পবিত্র আত্মা তোমাকে ততক্ষণ অবিধ সমর্থন করে যাবে যতক্ষণ তুমি যে পথে (অর্থাৎ আহলে বাইত) রয়েছ তা থেকে বিপথগামী না হবে।( আল - গাদীর , খণ্ড ২ , পৃষ্ঠা ৩৪ ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একথাগুলো বলেন একজন কবি সম্পর্কে।

মাসুম ইমামদের (আঃ) সময়কার কবিরা কতই না অবদান রেখেছেন! আমাদের ইসলামের ইতিহাসে আরবী,ফার্সী ও অন্যান্য ভাষায় অনেক বীরত্বগাঁথা ও একত্ববাদী কবিতা রয়েছে। অসাধারণ উপদেশময় সেসব কবিতা। এগুলো সবই হলো ইসলামী সংস্কৃতির ফলস্বরূপ। কবিতার যে প্রভাব রয়েছে,যুগের তা নেই। আর নাহজুল বালাগার বিস্ময় হলো এটাই যে গদ্য,কিন্তু বিশুদ্ধতা আর সৌন্দর্যতায় কবিতার সমকক্ষ বা তার চেয়েও বেশী। ফার্সী ভাষায় আপনি এক পৃষ্ঠাও লেখা খুজে পাবেন না যা শেখ সাদীর এক পৃষ্ঠা কবিতার সমকক্ষ হবে। যদিও মানোর্ত্তীর্ণ লেখা বহু রয়েছে। যেমন,খাজা আব্দুল্লাহ আনসারীর কালেমাতে কেসার কিম্বা সাদীর কথা-সাহিত্য । মাওলানা জালালুদ্দীন রুমি তার ঐ অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও দক্ষতা সত্বেও যখন তার ওয়াজের মজলিসে যাবেন,দেখবেন যে তার কবিতার তুলনায় কথার বয়ানগুলো কিছুই না। আরবী ভাষায়ও এমন কোনো গদ্য রীতির লেখা নেই যার মধ্যে নাহজুল বালাগার মতো অসাধারণ শক্তিমত্তা প্রত্যক্ষ করা যায়। কবিতা তার নিজ আদলে অনেক অবদানই রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং অনেক অবদান রাখতে সক্ষম। আবার মন্দ কবিতাও খুবই মন্দ হতে পারে যেমনভাবে ভালো কবিতাও অনেক ভালো হতে পারে। হিকমতের কবিতা,তৌহিদের কবিতা,পরকালের কবিতা,নবুওয়াতের কবিতা,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রশংসার কবিতা,মাসুম ইমাগণ এবং পবিত্র কোরআনের প্রশংসায় কবিতা,শোক-মার্সিয়ার কবিতা ইত্যাদি কবিতাসমূহ যদি ইমামদের যুগের কবিতার মতো ভালো হয় তাহলে তা অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে।

আল্লামা ইকবাল লাহোরী প্রকৃতই একজনবান পণ্ডিত ছিলেন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ইসলামের ক্ষেত্রে নিজের জন্যে এক রেসালাত তথা দায়িত্ব অনুভব করতেন। আর এ রেসালাত পৌছানোর জন্যে তিনি যে উপকরণকে কাজে লাগিয়েছিলেন তা হলো কবিতা। ফার্সী ভাষার কবিদের মধ্যে বিশেষ করে সাম্প্রতিক কালের কবিদের মধ্যে লক্ষ্য নিয়ে চলেছেন এমন কবি হিসাবে নিঃসন্দেহে আল্লামা ইকবালের কোনো জুড়ি নেই। কবিতা যদি কবির জন্যে মাধ্যম হয়ে থাকে তার লক্ষ্যের জন্যে ,তাহলে তার কোনো তুলনা হয় না। আল্লামা ইকবাল যেখানে সঙ্গীতের প্রয়োজন ছিল সেখানে সঙ্গীত রচনা করতেন। তার বিখ্যাত যে সঙ্গীতটি আরবীতে অনুবাদ করা হয়েছে সেটা উর্দুতেই তিনি রচনা করেছিলেন। এখন ফার্সী ভাষায়ও তা অনুবাদ করা হয়েছে। কি অসাধারণ সঙ্গীত খানি। আমি (ওস্তাদ মুতাহহারী) নিজে একাধিকবার এটি শুনে ক্রন্দন করেছি,অনেককে কাদতেও দেখেছি। আমরা সঙ্গীতকে কাজে লাগাবো না কেন? এগুলো সবই হলো মাধ্যম। এসব মাধ্যম থেকে উদাসীন থাকা আজ আর চলে না। আধুনিক যুগে এমন সব মাধ্যম আবিস্কৃত হয়েছে যা আগের আমলে ছিল না। শুধু আগেকার যুগের উপকরণ নিয়ে আমরা ক্ষান্ত থাকবো কেন? আমাদের কেবল দেখতে হবে যে কোন উপকরণটি শরীয়ত স্বীকৃত আর কোনটি শরীয়ত স্বীকৃত নয়।

স্বয়ং ইমাম হোসাইন (আঃ) ঐ উত্তপ্ত মরু প্রান্তরে স্বীয় বার্তাকে পৌছানোর জন্য এবং ইসলামের বার্তাকে পৌছানোর জন্য যে যে উপকরণ এবং মাধ্যমকে ব্যাবহার করা সম্ভব ছিল তার সবগুলোই তিনি কাজে লাগিয়েছেন। ইমামের মক্কা থেকে কারবালা পর্যন্ত এবং কারবালায় প্রবেশ করার পর থেকে শাহাদাত বরণ পর্যন্ত তার ভাষণসমূহ অসাধারণ অনুপ্রেরণাদায়ক,আবেগময় এবং অসাধারণ সৌন্দর্যময় আর সাবলীল ও বিশুদ্ধ ভাষা সমৃদ্ধ । এদিক থেকে কেবলমাত্র যে ব্যক্তি আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) এর প্রতিদ্বন্দী তিনি হলেন ইমাম হোসাইন (আঃ)। এমনকি কেউ কেউ বলে থাকেন যে আশুরার দিনের ইমাম হোসাইন (আঃ) এর ভাষণসমুহ আমিরুল মুমিনীনের ভাষণসমূহের চেয়েও ঊৎকৃষ্টতর। তিনি যখন মক্কা ছেড়ে বের হয়ে আসতে চাইলেন তখন লক্ষ্য করুন কি উৎকৃষ্ট ভাষা আর কি সুন্দর ও বিশুদ্ধ বাচনের মাধ্যমে তিনি স্বীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে তুলে ধরলেন।

মানুষকে আরবী ভাষা শিখতে হবে;তবেই কেবল পবিত্র কোরআন,রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বাণীমালায়,মাসুম ইমামগণের ভাষণে এবং খোতবা আর দোয়া-কালামের মধ্যে নিহিত এই অপরূপ সৌন্দর্যকে অবলোকন করতে পারবে। ইমামের এসব ভাষণগুলো অনুবাদ করলে যথার্থ রূপে অর্থ প্রকাশ করে না। তিনি বলছেনঃ মৃত্যু হলো মানুষের গলায় অলঙ্কারের ন্যায়। একজন মানুষের জন্যে মৃত্যু ততখানি সৌন্দর্যময় যেমনটা সৌন্দর্য ফুটে ওঠে যুবতীর গলায় অলঙ্কার পরিধান করলে। হে লোক সকল! আমি সবকিছুর মায়া ত্যাগ করেছি,আমি আত্মত্যাগের নেশায় মত্ত ,আমি আমার পূর্বসূরীদের সাক্ষাতে ততটাই আসক্ত যতটা আসক্ত ছিলেন নবী ইয়াকুব তার ইউসুফকে সাক্ষাতের জন্য । অতঃপর তিনি যে তার ভবিষ্যত সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন এবং কেউ যেন মনে না করে যে তিনি দুনিয়ার বাহ্যিক বিজয় লাভ করার আশায় চলেছেন,না বরং তিনি ভবিষ্যতকে সচক্ষে দেখতে পাচ্ছিলেন যে ঐ মরু মাঝে কিভাবে মানুষরূপী নেকড়েগুলো সারি বেধেছ এবং কিভাবে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলছে,এ বিষয়টি জানিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে তিনি বলেনঃ

رِضَي اللهِ، رِضَانَا اَهْلُ الْبَيْتِ

অর্থাৎ,আমরা আহলে বাইত আল্লাহ যেটাতে সন্তুষ্ট হন তাতেই সন্তুষ্ট থাকি।( বিহারুল আনোয়ার , খণ্ড ৪৪ , পৃষ্ঠা ৩৬৭ ; মাকতালু মুকাররাম , পৃষ্ঠা ১৯৩ , আল লুহুফ , পৃষ্ঠা ২৫ , কাশফুল গুম্মাহ , খণ্ড ২ , পৃষ্ঠা ২৯ ) এটা হলো সেই রাস্তা যা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তিনি পছন্দ করেছেন। সুতরাং আমরা এ পথকেই বেছে নেব। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের সন্তুষ্টি । কেবলমাত্র তিন চার লাইনের বেশী নয়। কিন্তু একটি বইয়ের চেয়েও বেশী প্রভাব ফেলে। শেষ মুহুর্তে তিনি মানুষের কাছে ইবলাগ করতে (তথা পৌছে দিতে) চান যে আমি কি বলতে চাই আর তোমাদের কাছ থেকে কি প্রত্যাশা করি। তাই তিনি বলেনঃ যে ব্যক্তি বুকের রক্তকে আমাদের পথে উৎসর্গ করতে তৈরী আছে এবং স্বীয় প্রতিপালকের সাক্ষাত লাভ করার সংকল্প রাখে সে যেন প্রস্তুত থাকে। আগামীকাল সকালে আমরা রওনা হব। আশুরার রাতে পবিত্র তেলাওয়াতের মুগ্ধকর সুর শুনতে পাই,মৌমাছির গুঞ্জরণের মতো দোয়া মোনাজাতের গুনগুনানী ভেসে আসে যা শত্রুর অন্তরকেও বিমোহিত করে দেয় এবং তাদেরকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করে। যে সাহাবীদল মদীনা থেকে ইমামের সঙ্গে এসেছিলেন তাদের সংখ্যা খুবই কম ছিল। হয়তো কুড়ি জন হতে পারে। কেননা একদল তো পথিমধ্যে আলাদা হয়ে চলে যায়। বাহাত্তর জন শহীদের অনেকেই কারবালায় এসে যোগদান করেছিলেন। অনেকে আবার ইবনে সা দের দল থেকে পৃথক হয়ে ইমামের বাহিনীতে যোগ দেয়। এদের মধ্যে একদল হলো তারা,যারা আশুরার রাতে এসব খিমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদের কানে ভেসে আসছিল মিষ্টি মধুর গুঞ্জরণের ধ্বনি,কোরআনের তেলাওয়াত,সিজদা আর রুকুর যিকির, সুরা হামদ। এই ধ্বনিই তাদেরকে আকৃষ্ট করে এবং তাদেরকে টেনে নিয়ে যায়। অর্থাৎ ইমাম হোসাইন (আঃ) ও তার সাহাবীবগ যে প্রকার মাধ্যমকেই অধিকতর কাজে লাগোনো সম্ভব ছিল তার সবগুলোকেই কাজে লাগিয়েছেন। অন্যান্য মাধ্যম ও উপকরণের কথায়ও যাব। স্বয়ং দৃশ্যগুলোকেও ইমাম এমনভাবে বিন্যস্ত করেন যে মনে হবে যেন কোনো ঐতিহাসিক দৃশ্যকে মঞ্চস্থ করার উদ্দেশ্যেই এভাবে সাজিয়েছেন যাতে কিয়ামত অবধি এক শিহরণ জাগানো দৃশ্য হিসাবে ইতিহাসে অক্ষয় থেকে যায়।

ইতিহাসে লেখা রয়েছে যে,যতক্ষণ পর্যন্ত সাহাবীরা বেঁচে ছিলেন,এমনকি তাদের একজন অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত ও আহলে বাইতের তথা ইমাম হোসাইন (আঃ) এর সন্তানবর্গ,ভাই-ভাতিজা প্রমুখের কোনো একজনকেও ময়দানে যেত দেননি। তাদের কথা ছিল,হে ইমাম! আমাদের দায়িত্বকে আগে পালন করার সুযোগ দিন। তারপর আমরা যখন থাকবো না তখন আপনি যেটা ভালো মনে করেন সেটাই করবেন। অপরদিকে নবী (সাঃ) এর আহলে বাইতও অপেক্ষায় ছিলেন কখন তাদের পালা আসবে। ইমামের সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি যখন শহীদ হন তখন নবী পরিবারের যুবকদের মধ্যে সহসা উলুধ্বণি পড়ে গেল। সবাই স্ব স্ব জায়গা ছেড়ে উঠে পড়লেন। লেখা রয়েছে যেঃ

 فَجَعَلَ يُودَعُ بَعْضَهُمْ بَعْضاً

অর্থাৎ তারা পরস্পরকে বিদায় জানাচ্ছিলেন,এক অপরের গলায় হাত রেখে পরস্পরের মুখে চুম্বন করছিলেন।

আহলে বাইতের যুবকদের মধ্যে সর্ব প্রথম যিনি ইমামের নিকট থেকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি লাভ করেন তিনি হলেন তার যুবক পুত্র হযরত আলী আকবার। যার ব্যাপারে স্বয়ং ইমাম হোসাইন (আঃ) সাক্ষ্যদান করেছেন যে দেহের গড়ণ,চেহারা-চিরত্র আর চলায় বলায় আলী আকবার ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অধিকতর সদৃশ। তিনি যখন কথা বলতেন মনে হতো যেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কথা বলছেন। এত বেশী মিল ছিল যে ইমাম হোসাইন (আঃ) নিজে বলেন,হে আল্লাহ! তুমিই ভালো জানো যে যখন আমরা নবীজীকে দেখার জন্যে উদগ্রীব হয়ে পড়তাম তখন এই যুবকের দিকে তাকাতাম। সে ছিল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পূর্ণ প্রতিচ্ছবির দর্পণ। এবার সেই যুবকই এলেন পিতার সম্মুখে।

বললেন,বাবা! আমাকে অনুমতি দিন। অনেক সাহাবী বিশেষ করে যুবকদের সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে তারা যখন অনুমতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে ইমামের কাছে উপস্থিত হচ্ছিলেন তখন ইমাম কোনো না কোনো ভাবে তাকে নিঃরত করার জন্য ব্যাখ্যা তুলে ধরছিলেন। যেমন হযরত কাসিমের কাহিনী যা সকলের জানা রয়েছে। কিন্তু যখন হযরত আলী আকবার উপস্থিত হলেন তখন তিনি শুধুই কেবল স্বীয় মাথাকে নীচু করলেন। যুবক পুত্র ময়দানে রওনা হয়ে যায়। বর্ণিত রয়েছে যে ইমামের চক্ষুদ্বয় যখন অর্ধ নির্মিলিত অবস্থায় ছিলঃ

ثُمَّ نَظَرَ اِلَيْهِ نَظَرَ آئِسٍ

অর্থাৎ তিনি তার দিকে তাকালেন এমন ভঙ্গিতে যেভাবে একজন নিঃরাশ ব্যক্তি তার যুবক পুত্রের দিকে তাকায়।( আল - লুহুফ , পৃষ্ঠা ৪৭ )

ইমাম নিঃরাশার সাথে তার যুবক পুত্রের দিকে তাকালেন,কয়েক ধাপ তার পিছে পিছেও এগিয়ে গেলেন। আর ঠিক এই সময়ে তিনি বলে ওঠেনঃ হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো যে এমন এক যুবক আজ এদের বিরুদ্ধে রওনা হয়েছে যে ছিল তোমার নবীর চেহারার সাথে সবচেয়ে বেশি সদৃশ । অতঃপর তিনি ওমর ইবনে সা দকেও একটি কথা বলেন। উচ্চঃস্বরে চিৎকার করে বললেন যেন ইবনে সা দ বুঝতে পারে। বললেনঃ

يَابْنَ سَعْدٍ قَطَعَ اللهُ رَحِمَكَ

অর্থাৎ,হে ইবনে সা দ! আল্লাহ যেন তোমার বংশকে নির্বংশ করে যেমনভাবে আমার এই সন্তান থেকে আমাকে নির্বংশ করলে।( আল - লুহুফ , পৃষ্ঠা ৪৭ , মাকতালু আলী আকবার - মুকাররাম , পৃষ্ঠা ৭৬ , মাকতালুল হোসাইন - মুকাররাম , পৃষ্ঠা ৩২১ , মাকতালুল হোসাইন - খরাযমী , খণ্ড ২ , পৃষ্ঠা ৩০ , বিহারুল আনোয়ার , খণ্ড ৪৫ , পৃষ্ঠা ৪৩ )

ইমাম হোসাইন (আঃ) এর এই বদ্দোয়ার পর দুই তিন বছরের বেশী দেরী হয়নি,এর মধ্যেই মোখতার,ওমর ইবনে সা দকে হত্যা করেন। এমন সময়ে যখন ওমর ইবনে সা দের পুত্র মোখতারের দরবারে এসেছিল তার পিতার জন্য সুপারিশ করতে। ওমর ইবনে সা দের মস্তককে একটি কাপড়ে ঢেকে সভায় আনা হয় এবং মোখতারের সামনে রাখা হয়। তখনই তার পুত্র এসেছিল পিতার জন্য সুপারিশ করতে। একসময় বলা হলো যে মস্তকটি এখানে রাখা আছে সেটাকে তুমি কি চেন? যখন কাপড় সরিয়ে ফেলা হলো দেখতে পেল যে তারই বাবার মাথা। মনের অজান্তেই কখন সে সেখান থেকে উঠে চলে যেতে লাগলো। সাথে সাথে মোখতার নির্দেশ দিলেন,ওকেও ওর বাবর সাথে যুক্ত করে দাও।

এভাবেই হযরত আলী আকবার ময়দানে যাত্রা করেন। ঐতিহাসিকগণ সকলে ঐক্যমত পোষণ করেন যে হযরত আলী আকবার অতুলনীয় সাহসিকতা আর বীরত্বের সাথে লড়াই চালিয়ে যান। কিছু যুদ্ধ করার পর তিনি ফিরে আসনে তার মহান পিতার নিকটে যা ইতিহাসে একটি চিরন্তন ধাঁ ধাঁ হয়েই থাকবে যে কি কারণে তিনি ফিরে এসেছিলেন এবং তার উদ্দেশ্যকি ছিল? এসে বললেন,বাব! বড়ই পিপাসা। পিপাসা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে । এই অস্ত্রের ভারও আমাকে পরিশ্রান্ত করে ফেলেছে। এক কাতরা পানি যদি আমার গলায় স্পর্শ করে তাহলে আমি শক্তি সঞ্চার করে পুনরায় আক্রমণ চালাতে পারবো। এই কথাগুলো ইমামের কলিজায় আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, পুত্র আমার! দেখ,আমার মুখ তোমার মুখের চাইেতও শুস্ক । তবে আমি তোমাকে ওয়াদা দিলাম যে শীঘ্রই তুমি তোমার নানা নবীর হাতে পানি পান করবে। এই যুবক আবারো চলেন ময়দানে এবং লড়াই চালিয়ে যান।

হামিদ ইবনে মুসলিম নাম্মী জৈনক ব্যক্তি ছিল হাদীসের রেওয়ায়েতকারী। কারবালার ময়দানে সে উপস্থিত ছিল একজন সংবাদদাতার মতো। অবশ্য যুদ্ধে সে অংশগ্রহণ করেনি। তবে বেশিরভাগ ঘটনাবলীকে সে বর্ণনা করেছে। তার বর্ণনায় এসেছ যে,আমি এক ব্যক্তির পাশে ছিলাম। যখন আলী আকবার আক্রমণ করছিলেন তখন সবাই পালিয়ে যাচ্ছিল। এ দেখে লোকটি অসন্তুষ্ট হলো কারণ সে নিজেও একজন বীর। শপথ করে বললো,যদি ঐ যুবক আমার নিকট দিয়ে অতিক্রম করে তাহলে আমি ওর পিতাকে পুত্র হারানোর শোক বেদনায় নিমজ্জিত করবই। আমি তাকে বললাম,তোমার এতে কি কাজ। ছেড়ে দাও,শেষ পর্যন্ত তো তাকে হত্যা করা হবেই। সে বললো,না। আলী আকবার যখন অগ্রসর হলেন তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় লোকটি গুপ্ত হামলার মতো বর্শা দ্বারা এমন সজোরে আঘাত করলো যে আলী আকবার নিশ্চল হয়ে পড়লেন। হাতদুটি ঘোড়ার গলায় জড়িয়ে ধরে নিজের ভারসাম্য রাখার প্রচেষ্টা করলেন। এমন সময় চিৎকার করে বলে উঠলেন,

يَا اَبَتَاه هَذَا جَدِّي رَسُولِ اللهِ

অর্থাৎ,হে বাবা! এখনই আমি নানা রসূলকে মনের চোখ দ্বারা দেখতে পাচ্ছি পানি পান করছি।( বিহারুল আনোয়ার , খণ্ড ৪৫ , পৃষ্ঠা ৪৪ , মাকতালুল হোসাইন খরাজমী , খণ্ড ২ , পৃষ্ঠা ৩১ )

ঘোড়া হযরত আলী আকবারকে এমনভাবে শত্রুদের মাঝে নিয়ে গেল (যেহেতু বাস্তবে ঐ ঘোড়ার আর কোনো সওয়ারী ছিল না) যে এখানে এসে অদ্ভুত একটি কথা লেখা রয়েছে :

فَاحْتَمَلَهُ الْفَرَسُ اِلَي عَسْكَرِ الْاَعْدَاءِ فَقَطَّعُوهُ بِسُيُوفِهِمْ اِرْباً ارْباً

অর্থাৎ,অতঃপর ঘোড়া তাকে বহন করে নিয়ে গেল শত্রু সেনার অভ্যন্তরে। আর তারা তাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ছাড়ে।( মাকতালুল হোসাইন - মুকাররাম , পৃষ্ঠা ৩২৪ , মাকতালুল আওয়াসিম , পৃষ্ঠা ৯৫ , বিহারুল আনোয়ার খণ্ড ৪৫ , পৃষ্ঠা ৪৪ , মাকতালুল হোসাইন - খরাজমী , খণ্ড ২ , পৃষ্ঠা ২৪২ )

হোসাইনী আন্দোলনে অন্যতম উপাদান তাবলীগ

তাবলীগ -এর তাৎপর্য

মানুষের উক্তির মধ্যে যেমন সহজ অথবা দুর্বোধ্য হওয়া অর্থাৎ সরলভাবে একটিমাত্র অর্থপ্রকাশক কিম্বা বহুমাত্রিক ও একাধিক অর্থ প্রকাশক হওয়ার দিক থেকে পার্থক্য থাকে,তদ্রুপ মানুষের আন্দোলন ও বিপ্লবসমূহও একইভাবে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। আমাদের উক্তি দু প্রকারের হতে পারেঃ যে উক্তির একটিমা অর্থ থাকে আর যে উক্তির একাধিক অর্থ বা দিক থাকতে পারে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহ। কোরআন তার আয়াতমালাকে দু-ভাগে ভাগ করেছেঃ আয়াতে মুহকামাত তথা সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন আয়াত আর আয়াতে মুতাশাবিহাত তথা দ্ব্যর্থক আয়াত। প্রথম প্রকারের আয়াত হলো যার একটিমাত্র অর্থ থাকে। অর্থাৎ উক্ত ভাষা বা শব্দ থেকে একটার বেশী অর্থ পাওয়া যায় না। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের আয়াত থেকে একই সময়ে কয়েকটি অর্থ প্রকাশ করা যেতে পারে। তবে আমরা যাতে সদৃশ্য অর্থাবলীর মধ্যে বিভ্রান্তির কবলে না পড়ি এজন্যে মুহকাম আয়াতগুলোকেই মানদণ্ড হিসাবে গণ্য করতে হবে। কারণ সেগুলোই হলো‘‘ উম্মুল কিতাব’’ তথা কিতাবের মূল স্বরূপ।

মানুষের আন্দোলনসমূহ এবং বিপ্লবসমূহও ঠিক তদ্রুপ। কোনো আন্দোলনের একটি মাত্র অর্থ বা লক্ষ্য থাকতে পারে আবার একাধিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বলিতও হতে পারে। অর্থাৎ একই সময়ে একাধিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সে আন্দোলন পরিচালিত হয় আবার যেন সে সবগুলো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিণতিতে একটি মূল লক্ষ্যে প্রত্যাবর্তিত হয়। এভাবে একটি আন্দোলন একই সময়ে বিভিন্ন দিক ও মাত্রা সম্বলিত হতে পারে।

ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর আন্দোলন হলো এরূপ একটি বহু মাত্রা এবং বহু দিক সম্বলিত আন্দোলন। এই যে ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর আন্দোলনকে ঘিরে নানান ব্যাখ্যা আর নানান মত,এর কারণ হলো এর মধ্যে একাধিক উপাদানের সমান্তরাল উপস্থিতি। আমরা যখন কিছু কিছু উপাদান এবং নিয়ামকের দিক বিবেচনায় এ আন্দোলনের দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই যে ক্ষমতাসীন স্বৈরাচার ও শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় দাবীর বিপরীতে কেবলই প্রতিবাদী দৃঢ়তা এবং একগুয়েমী অবাধ্যতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এ আন্দোলনটি হলো এক নাকচ ঘোষণা এবং আত্ম-সমর্পণ না করা। আমরা সকলে জানি যে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর এবং ইয়াযিদের ক্ষমতায় আরোহণ আর এ উদ্দেশ্যে যতসব চক্রান্ত চালানো হয় তারপর ইয়াযিদ অপরিহার্য মনে করলো যে ইসলামী বিশ্বের কতিপয় ব্যক্তিত্ব যাদের সর্বাগ্রে ছিলেন ইমাম হোসাইন (আঃ),যাকে নিয়ে ইয়াযিদের হিসাব নিকাশ ছিল সবচেয়ে বেশী,এদের থেকে বাইয়াত আদায় করা। তাহলে জনসাধারাণও সবাই চুপ হয়ে যাবে এবং প্রকৃতপক্ষে ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর নিকট থেকে একটি প্রতিশ্রুতি আদায় করতে সক্ষম হবে।

মুয়াবিয়ার মৃত্যু পর ইয়াযিদ কালক্ষেপণ না করে একটি চিঠি মদীনার গভর্ণর,তারই চাচাতো ভাই ওয়ালীদ ইবনে উতবা ইবনে আবি সুফিয়ানের কাছে প্রেরণ করে। তার মাধ্যমে সে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সংবাদ এবং নিজের ক্ষমতারোহনের কথা তাকে অবগত করে। আর আলাদা একটি চিরকুটে সে কয়েক জনের নাম লিখে পাঠায় যাদের শিরোনামে ছিল ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর নাম,তাদের কাছ থেকে অবশ্যই বাইয়াত গ্রহণ করার নির্দেশ দান করে। কিন্তু ইমাম হোসাইন (আঃ) বাইয়াত করতে রাজি হলেন না। তারপর আরো কয়েকদিন মদীনায় অবস্থান করার পর যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে এরা ছেড়ে দেবার পাত্র নয়,তখন স্বীয় আহল পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর পবিত্র নিরাপদ ঘরের অভিমুখে রওনা হন। অর্থাৎ রজব মাসের শেষ ভাগে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর খবর মদীনায় পৌছে এবং ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর নিকট বাইয়াতের দাবী জানায়।

সম্ভবত 27 রজব ইমাম হোসাইন (আঃ) মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং 3রা শাবান তারিখে মক্কায় প্রবেশ করেন। সেদিন তার জন্ম দিবসও ছিল। 8ই জিলহজ্ব অবধি তিনি সেখানে অবস্থান করেন। তবে কোনো অবস্থাতেই তিনি তার কাছে যে দাবী জানানো হয়েছিল তার প্রতি সাড়া দিতে রাজি হননি। এই নাকচ করে দেয়াটা হলো একটি উক্তি । যে উক্তি এই আন্দোলনকে এক বিশেষ প্রাণ দান করে। এ প্রাণসত্তাটি হলো যুগের শাসন ক্ষমতা দখলকারী এক স্বৈরাচারী দাবীর বিরুদ্ধে না বলা এবং আত্মসমর্পণ না করা।

এই আন্দোলনে ভূমিকা পালনকারী আরেকটি উপাদান হলো‘‘ সৎকাজের আদেশ আর অন্যায় কাজে নিষেধ’’ -এই নীতিটি । ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (আঃ)-এর বক্তব্যে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিবৃতি রয়েছে। এমর্মে সাক্ষ্য প্রমাণও অনেক রয়েছে। অর্থাৎ যদি ধরে নেয়া হয় যে তার কাছে বাইয়াতের দাবী নাও করতো তাহলেও তিনি নীরব থাকতেন না।

আরেকটি উপাদান হলো হুজ্জাত তথা প্রমাণ পূর্ণ করা এবং চরম পত্র প্রদান করা। তৎকালে মুসলিম জাহানের তিনটি বড় কেন্দ্র ছিলঃ মদীনা-যা রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হিজরতের ভূমি নামে পরিচিত ছিল,শ্যাম-যা খেলাফতের ভূমি নামে পরিচিত ছিল এবং পূর্বে আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) এর দারুল খেলাফত ছিল। এছাড়া এটা ছিল একটি নতুন শহর যা মুসলমান সৈন্যদের দ্বারা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবের সময়ে স্থাপিত হয়েছিল এবং একে ইসলামী সৈন্যদের সেনানিবাসও বলা হতো। আর একারণে একে শ্যামের সমান বলে তুলনা করা হতো। এই শহরের অর্থাৎ মুসলিম সেনানিবাসের জনগণ যখন অবগত হলো ইমাম হোসাইন (আঃ) ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত করতে রাজি হননি তখন তাদের নিকট থেকে প্রায় আঠারো হাজার চিঠি এসে পৌঁছে ইমামের কাছে। চিঠি গুলোকে কেন্দ্রে পাঠায় এবং ঘোষণা করে যে আপনি যদি কুফায় আসনে তাহলে আমরা আপনাকে সাহায্য করবো। এখানে ইমাম হোসাইন (আঃ) ইতিহাসের দুই রাস্তার মোড়ে এসে উপনীতঃ যদি তাদের আহবানের প্রতি সাড়া না দেন তাহলে অনিবার্যভাবে ইতিহাসের রায়ে তিনি নিন্দিত হবেন। ভবিষ্যতের ইতিহাস তখন বিচার করে বলবে যে অভাবনীয় একটি অনুকূল পরিবেশ ছিল। কিন্তু ইমাম হোসাইন (আঃ) এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারেন নি। অথবা তিনি চাননি কিম্বা তিনি ভয় পেয়েছিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি অপব্যাখ্যা। ইমাম হোসাইন (আঃ) যাতে এই লোকগুলো যারা এভাবে সাহায্যের হাত তার দিকে প্রসারিত করেছে,তাদের কাছে হুজ্জাত তথা প্রমাণকে চুড়ান্ত করতে পারেন এজন্যে তাদের আহবানে সাড়া জানান। ইতিপূর্বে যা বর্ণিত হয়েছে। এপর্যায়ে এই আন্দোলন আরেক সত্তা এবং আরেক রূপ ও বর্ণ ধারণ করে।

এই আন্দোলনের আরো একটি মাত্রা বা দিক হলো এর তাবলীগ তথা প্রচারের দিক। অর্থাৎ,এই আন্দোলন একই সাথে যেমন সৎকাজের আদেশ আর অসৎকাজের নিষেধ এবং একইসাথে যেমন প্রমাণ চুড়ান্তকরণ (ও যুগের স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় দাবীর কাছে আত্মসমর্পণ না করার ঘোষণা) তদ্রুপ এটা একটি প্রচার এবং বার্তাবাহীও বটে। ইসলামকে পরিচিত করা এবং চিনিয়ে দেবার এক আন্দোলনও বটে।

আলোচনার শুরুতে‘‘ তাবলীগ’’ এর সঠিক অর্থকে আগে ব্যাখ্যা করার দরকার। বিশেষ করে সৎকাজের আদেশ আর অসৎ কাজে নিষেধ-এই নীতির সাথে এর পার্থক্য কি সেটা নির্ধারণ করতে হবে যাতে বুঝা যায় যে,হোসাইনী আন্দোলনে তাবলীগ উপাদানটি আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার উপাদান থেকে ভিন্ন ।

তাবলীগ এমন একটি শব্দ যা পবিত্র কোরআনে অনেক ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন কোরআন নবীগণের ভাষায় বর্ণনা করে যে,

) يَا قَوْمِ لَقَدْ اَبْلَغْتُكُمْ رِسَالَةَ رَبِّي وَ نَصَحْتُ لَكُمْ وَلَكِنْ لَا تُحِبُّونَ النَّاصِحِينَ(

‘‘ হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের কাছে স্বীয় প্রতিপালকের বার্তা পৌছিয়েছি এবং তোমাদের মঙ্গল কামনা করেছি। কিন্তু তোমরা মঙ্গলাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাস না।’’ (আ রাফঃ 79)

কিম্বা নবীদের সম্পর্কে ইরশাদ করেঃ

 ) مَا عَلَي الرَّسُولِ اِلَّا الْبَلَاغُ(

‘‘ রসুলের উপর কোনো দায়িত্ব নেই কেবল পৌছিয়ে দেয়া ছাড়া।’’ (মায়িদাঃ 99)

মোদ্দকথা হলো,‘‘ বালাগ’’ ,‘‘ তাবলীগ ,‘‘ ইউবাল্লিগুনা’’ ইত্যাদি শব্দগুলো পবিত্র কোরআনে বহুল ব্যবহৃত হয়েছে। এই শব্দের অর্থ কি?  দুর্ভাগ্যেরকথা হলো বর্তমানে এই শব্দটি একটি করুণ পরিণতির শিকার হয়েছে। অর্থাৎ এক অশুভ এবং ঘৃণ্য অর্থ লাভ করেছে। এমন পরিস্থিতি হয়েছে যে আজ (উদাহরণস্বরূপ ফার্সী ভাষাভাষীদের কাছে তাবলীগ বলতে বুঝায় সত্য মিথ্যার তেলেসমাতি করা এবং প্রকৃতপক্ষে ঠগবাজি ও বোকা বানিয়ে মানুষের হাতে কোনো পন্য ধরিয়ে দেয়া। অর্থাৎ বোকা বানানোর অর্থেই এখন এর প্রয়োগ। আর একারণেই দেখা যায় যখন কেউ বলতে চায় যে এসবের কোনো ভিত্তি নেই তখন বলে দেয় যে জনাব,এসব কিছুই আসলে তাবলীগ,সবকিছুই মিথ্যা আর ধোকাবাজি। এজন্যে দেখতে পাই অনেকে ধর্মীয় ব্যাপারে এ শব্দটি প্রয়োগের পক্ষপাতি নয়। কিন্তু কথা হলো যদি কোনো শব্দের সঠিক অর্থ থাকে আর সেই সঠিক অর্থ পবিত্র  কোরআন এবং নাহজুল বালাগার মধ্যে প্রয়োগ হয়ে থাকে তাহলে উক্ত শব্দের অর্থ বিভ্রান্ত ঘটার অপরাধে সেটাকে শাস্তি দেয়া আমাদের উচিত হবে না। বরং সবসময় এর সঠিক অর্থটিই মানুষের কাছে বলা আমাদের কর্তব্য ।

تبلیغ (তাবলীগ) কথাটিوصول (উসুল) এবংایصال (ইসাল) কথা দুটির সাথে খুব নিকটবর্তী অর্থ বহন করে। আরবী ভাষায় অনেক ক্ষেত্রে এমন কিছু সূক্ষ্ণও নিখুঁত কাজ থাকে যা অন্য ভাষায় (এমনকি ফার্সীর মতো মিষ্টি ও সমৃদ্ধ ভাষাতেও) দেখা যায় না। আরবী ভাষায় একটি শব্দ হলোایصال (ইসাল) এবং আরেকটি শত্রুহলোابلاغ  (ইবলাগ)।ایصال (ইসাল) এর অর্থ কি? যেমন ধরুন,আমি কোনো এক কাপড়কেایصال (ইসাল) করেছি। এর অর্থ হবে আমি ওটাকে পৌছে দিয়েছি।ابلاغ (ইবলাগ) ফার্সী ভাষায় কি অর্থ দেয়? যদি বলা হয় যে অমুক জিনিসটাকেابلاغ (ইবলাগ) করেছি,সে ক্ষেত্রে ও বলি যে এর অর্থ হলো পৌছে দিয়েছি। ফার্সী ভাষায় এ উভয়ের বলোয় পৌছানো এবং পৌছে দেয়া অর্থে ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু আরবী ভাষায়ایصال (ইসাল) কেابلاغ (ইবলাগ) এর স্থলে প্রয়োগ করা যায় না। তদ্রুপابلاغ (ইবলাগ) কেওایصال (ইসাল) এর স্থলে প্রয়োগ করা যায় না।ایصال  (ইসাল) শব্দটি সচরাচর কোনো জিনিসকে কারো হাত দ্বারা অথবা কারো আয়ত্বাধীনে পৗছানোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। অর্থাৎ জড়বস্তুগত বিষয়ে। কেউ যদি একটি পার্সেলকে কারো নিকটে পৌছাতে চায়,এ ক্ষেত্রেایصال (ইসাল) শব্দকে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। কিম্বা কেউ যদি আপনার কাছে কোনো আমানত (বস্তুগত) রেখে থাকে এবং আপনি সে আমানতকে তার কাছে পৌছে দিতে চান,এ ক্ষেত্রে বলা হয় যে আমানতকে তার মালিকের নিকটایصال  (ইসাল) করেছে।

কিন্তুابلاغ (ইবলাগ) কথা কোনো চিন্তা কিম্বা বার্তাকে পৌছে দেবার সময় বলা হয়। অর্থাৎ কোনো জিনিসকে কারো মন,মানস,চিন্তা ও অন্তরে পৌছে দেবার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একারণেابلاغ (ইবলাগ) এর বিষয়বস্তু কোনো জড়বস্তু হতে পারে না। অবশ্যই তা কোনো অজড় এবং আধ্যাত্মিক কিছু হতে হবে। একটি চিন্তা অথবা একটি অনুভব। অন্যকথায়,সাধারণতঃ কোনো বার্তা,সালাম বা অনুরূপ কোনো কিছু প্রেরণের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা হয়। বলা হয় সালামابلاغ (ইবলাগ) করেছে,বার্তাابلاغ  (ইবলাগ) করেছে। যখন বার্তাابلاغ  (ইবলাগ) করে তখন কোনো চিন্তাকে অন্যদের কাছে পৌছায়। আর যখন সালামابلاغ  (ইবলাগ) করে তখন আবেগ ও ভক্তিকে পৌছায়। এরূপ বিষয়ের ক্ষেত্রেইابلاغ  (ইবলাগ) বাتبلیغ (তাবলীগ) কথাটি ব্যবহৃত হয়। আর পবিত্র কোরআন এই শব্দকে রেসালাত তথা বার্তাসমূহের বেলায় প্রয়োগ করেছে।

সুতরাং,تبلیغ (তাবলীগ) হলো কোনো বার্তাকে একজনের নিকট থেকে আরেক জনের নিকটে পৌছানো। ফার্সী ভাষায় যে পয়গম্বর (বা বার্তাবাহক) কথা এসেছে তা রাসুল শব্দের অনুবাদ। এর অর্থ হলো রেসালাতের মুবাল্লিগ তথা বার্তা প্রচারক। রেসালাত শব্দ এমন একটি শব্দ যা শুভ পরিণতি লাভ করেছে। অবশ্য আমরা রেসালাহ বলতে যেসব জিনিসকে বুঝি তা কোরআনে ব্যবহৃত রেসালাত এর থেকে ভিন্ন । আমরা সাধারনত কিছু লিখিত কাগজের সেট যার সমষ্টি একটি পুস্তকের মতো নয় সেটাকে রেসালাহ বলে থাকি। যদিও উক্ত রেসালাহ র বিষয়বস্তুর বার্তার সাথে কোনো সম্পর্ক নাও থাকে। যেমন ধরুন,কেউ একটি পুস্তিকা লিখলো কোনো ভাষার ব্যাকরণ সম্পর্কে,ফার্সী কিম্বা আরবীর। তখন বলা হয় যে অমুক লোক অমুক বিষয়ে একটি রেসালাহ লিখেছে। যদিও এ নামটি উক্ত বিষয়বস্তুর ( যেমন ভাষার ব্যাকরণ) সাথে সঙ্গতিশীল নয়। রেসালাহ কে এমন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে যেখানে কোনো বার্তা থাকবে। কিন্তু কেউ যদি কোনো জ্ঞানগত বা ভাষাগত সমস্যার সমাধান করে থাকে তাহলে সে কারো জন্য কোনো বার্তা আনেনি। এক্ষেত্রে এশব্দটি প্রয়োগ সঙ্গত নয়। কিন্তু সম্প্রতি রেসালাত শব্দটি ফার্সী ভাষায় ব্যাবহার করা হচ্ছে । যেমন বলা হয় অমুকের সমাজের প্রতি রোসালাত রয়েছে। অর্থাৎ,বর্তমানে যার সম্পর্কে অনুভব করা হয় যে স্বীয় সমাজের প্রতি তার কোনো দায়িত্ব রয়েছে যা তার পালন করা উচিত,তার ক্ষেত্রে বলা হয় যে,তার একটা রেসালাত রয়েছে। এই ভাষাটি কোরআনে রেসালাতকে যে ভাষায় প্রয়োগ করা হয়েছে তার সাথে যদি অনুরূপ নাও হয়,খুবই কাছাকাছি হবে। অর্থাৎ,এই অর্থটি কোরআনে ব্যবহৃত রেসালাত র অর্থের খুবই কাছাকাছি। ইরশাদ হচ্ছেঃ

 ) اَلَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللهِ وَ يَخْشَوْنَهُ وَ لَا يَخْشَوْنَ اَحَداً اِلَّا اللهُ(

 

‘‘ সেই নবীগণ আল্লাহর পয়গাম প্রচার করতেন ও তাকে ভয় করতেন। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করতেন না। (আহযাবঃ 39)

এটা হলো বার্তাবাহকের জন্য সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত।

যখন প্রতিপন্ন হলো যেابلاغ (ইবলাগ) এবংتبلیغ  (তাবলীগ) এর অর্থ হলো বার্তা পৌছে দেয়া তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় যে,تبلیغ (তাবলীগ) যা কোরআনে এসেছে আর আমর বিল মারুফ এবং নাহী আনীল মুনকার -সেটাও যে কোরআনে এসেছ-এ দুটি আলাদা বিষয়। যদিও একে অপরের সাথে জড়িত,তবে বিষয় দুটি।

তাবলীগ হলো পরিচিত করার এবং উত্তমভাবে পৌছানোর পর্যায়। সুতরাং এটা হলো জানা বা পরিচিতর স্তর। কিন্তু আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকারের পর্যায়টি হলো কার্যকর এবং বাস্তবায়নের পর্যায়। তাবলীগ নিজেই একটি সার্বজনীন কর্তব্য সকল মুসলমানের জন্য । যেমনভাবে আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকারও এক সার্বজনীন কর্তব্য । তাবলীগের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য যে কর্তব্য রয়েছে সেটা হলো তার মধ্যে যেন এমন অনুভূতি কাজ করে যে তার স্থান থেকে সে যেন ইসলামের বার্তা বহন করে। কিন্তু যে কর্তব্যটি আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার এর দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেক মুসলমানের ওপর রয়েছে তা হলো তার মধ্যে যেন এই অনুভূতি কাজ করে যে সেও একজন বাস্তবায়নকারী এবং সমাজে এই বার্তা বাস্তবায়নকারী শক্তির সেও একটি অংশ। একারণেই আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার হলো এক বিষয়,আর তাবলীগ হলো ভিন্ন আরেকটি বিষয়। তাই হোসাইনী আন্দোলনে আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার র মাত্রা তথা দিক ছাড়াও আরেকটি মাত্রা তথা দিক রয়েছে। আর সেটা হলো তাবলীগ। এই মুতাশাবিহ তথা দ্ব্যর্থক এবং বহুমাত্রিক আন্দোলন যে কাজটি করেছে তা হলো ইসলামের স্বরূপকে ঠিক যেভাবে আছে সেভাবেই পরিচিত করেছে। ইসলামের বার্তাকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত ও উত্থাপিত করেছে। তাও আবার কতো দ্ব্যর্থহীন ও স্পষ্টভাবে! ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে যে উক্তি দু প্রকারেরঃ মুহকাম তথা দ্ব্যর্থহীন আর মুতাশাবিহ তথা দ্ব্যর্থক। আরেকটি বিচারেও উক্তি দু প্রকারের হয়। যথাঃ স্বচ্ছ ও পরিণত উক্তি আর অস্বচ্ছ ও অপরিণত উক্তি ।

মুসলিম পণ্ডিতরা কিছু কিছু বাচনকে বিশুদ্ধ ও পরিণত বলে থাকেন। বিশুদ্ধ ও পরিণত বচন হলো সেটাই যা বক্তার মনোভাব ও উদ্দেশ্যকে উত্তম ও যথার্থভাবে শ্রোতার মন ও অনুভূতিতে পৌছাতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ এমন উক্তি যা প্রকৃতই বক্তার উদ্দেশ্যকে পৌছে দিতে পারে।

আন্দোলনও এরূপ। স্বচ্ছ আন্দোলন যেমন রয়েছে,অস্বচ্ছ আন্দোলনও তেমনি রয়েছে। স্বচ্ছ আন্দোলন হলো সেটা,যা,যে বার্তাকে মনসমুহ,চিন্তাসমূহ এবং অনুভূতিসমুহের কাছে পৌছাতে চায়,তাকে ভালোভাবে পৌছে দিতে সক্ষম হয়। এই দিক থেকে যখন তাকাই তখন দেখি যে,হোসাইনী আন্দোলনের চেয়ে অধিকতর,পরিণত এবং পৌছে দিতে সক্ষম কোনো আন্দোলনই খুজে পাওয়া যাবে না। এটা এমন এক আন্দোলন যা একদিক থেকে দেখা যায় যে স্থানিক ব্যপ্তির বিবেচনায় তা বিশ্বময় বিস্তৃতি লাভ করেছে। আবার কালের বিবেচনায় প্রায় চৌদ্দশ বছর পেরিয়ে এসেও আজ তার প্রভাব ও পৌছে দেবার শক্তি শুধু কমে যায়নি,তা নয়,বরং বলীয়ান হয়েছে। অসাধারণ শক্তিশালী এক আন্দোলন।

এপর্বে খোদ তাবলীগ সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক যাতে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর আন্দোলনে তাবলীগ উপকরণ কে সঠিকভাবে চিনতে এবং ব্যাখ্যা করতে পারি। তাবলীগ এর অর্থ ও তাৎপর্য ইতিপূর্বে অবগত হয়েছি। দেখা গেছে যে পবিত্র কোরআন তাবলীগ শব্দটির ওপর নির্ভর করেছে। নবীগেণর প্রেরণের দর্শন সম্পর্কে নাহজুল বালাগায় প্রসিদ্ধ একটি বাক্য রয়েছে। বাক্যটিতে বলা হয়েছেঃ

فَبَعَثَ فِيهِمْ رُسُلَهُ، وَ وَاتَرَ اِلَيْهِمْ اَنْبِيَائَهُ لِيَسْتَأْدُوهُمْ مِيثَاقَ فِطْرَتِهِ وَيُذَآّکرُوهُمْ مَنْسِيَّ نِعْمَتِهِ وَ يَحْتَجُّوا عَلَيْهِمْ بِالتَّبْلِيغِ—

আল্লাহ নবীগণকে একের পর এক প্রেরণ করলেন। কি জন্যে ? প্রথমতঃ এজন্যে যে আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবে মানুষের স্বভাবে প্রতিশ্রুতি নিহিত রেখেছেন। (বলতে চান যে দীন কোনো চাপিয়ে দেয়া বিষয় নয় যে মানুষের ওপর আরোপ করা হবে,বরং মানুষের সহজাত আহবানের প্রতিই সাড়া দেয়া। আল্লাহ যে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন তা কোনো কাগজের নয়। অক্ষর,ধ্বণি কিম্বা বাইয়াতের মাধ্যমে নয়,বরং তকদীরের কলম দ্বারা,মানবের স্বভাব ও আত্মার গহীনে)। বলছেন যে,নবীগণ এসেছেন একথা বলতে যে,হে মানব! তোমরা তোমাদের সহজাত স্বভাব ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহর প্রতি যে অস্বীকারবদ্ধতা হয়েছে,আমরা তোমাদের সে প্রতিশ্রুতি পালন দেখতে চাই। অন্য কিছু নয়।

وَ يُذَکِّرُوهُمْ مَنْسِيَّ نِعْمَتِهِ অর্থাৎ নবীরা হলেন স্মরণ করিয়ে দেবার জন্যে ।

وَ يَحْتَجُّوا عَلَيْهِمْ بِالتَّبْلِيغِ   আর আল্লাহর বার্তাকে মানুষের কাছে পৌছে দেন যাতে এর মাধ্যমে মানুষের জন্য হুজ্জাত বা দলীলকে পূর্ণ করেন।

وَ يُثيِرُوا لَهُمْ دَفائِنَ الْعُقُولِ

(কি অদ্ভুত বাক্যগুলো!)অর্থাৎ বলেছেন যে, মানুষের অভ্যন্তরে তথা বিবেক ও আত্মার মধ্যে গুপ্ত ধন লুকিয়ে রয়েছে। তাদের মগজে নিহিত রয়েছে চিন্তার গুপ্তধন। কিন্তু এসব গুপ্তধনকে ঢেকে ফেলেছে ধুলা ময়লার আস্তরণ। নবীগণ এসেছেন এসব ধুলা ময়লাকে ঝেড়ে ফলতে এবং মানুষের নিজের মধ্যে যেসব গুপ্তধন রয়েছে সেগুলো তাকে দেখিয়ে দিতে। প্রত্যেক ব্যক্তিই তার নিজের মন ও আত্মার ঘরের ভেতর মূল্যবান গুপ্তধনের অধিকারী রয়েছে কিন্তু সে তা থেকে বেমালুম বেখবর। নবীগণ মানুষকে তার এই মূল্যবান গুপ্তধনের সন্ধান দিতে চান যাতে প্রত্যেকে স্বতঃ প্রণোদিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে তার গুপ্তধন বের করে আনার কাজে ব্রতী হয়।( উদ্ধৃত বাণীটির জন্য দেখুন নাহজুল বালাগা , ফয়জুল ইসলাম , খুতবা 1 , অংশ 36 , পৃষ্ঠা 33 )

তাবলীগের এই যে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হলো নবীগণ ছিলেন সে অর্থে মুবাল্লিগ। কিন্তু সকলে শরীয়ত প্রবর্তক ছিলেন না। একারণে আল্লাহর নবীগণ ছিলেন দুই শ্রেণীরঃ এক শ্রেণীর নবী হলেন যারা মুবাল্লিগ এবং শরীয়তেরও প্রবর্তক। আর আরেক শ্রেণীর নবী যারা শুধুই মুবাল্লিগ। শরীয়ত প্রবর্তনকারী নবী হলেন আইন ও বিধান প্রণয়ণকারী নবী যাদের সংখ্যা নিতান্তই কম ছিল। তাদের মোট সংখ্যা হলো পাঁচজন। যথাঃ হযরত নূহ,ইব্রাহীম,মূসা,ঈসা আর শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)। কিন্তু সকল নবীই ঐশী বার্তার মুবাল্লিগ তথা প্রচারক। যেমনভাবে তারা আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার কারীও বটে। এই যে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী এসেছেন,প্রত্যেক নবীই মানুষের জন্যে আইন নিয়ে আসেননি। যারা আইন নিয়ে এসেছেন তারা সীমিত। অবশিষ্ট নবীরা সেই বার্তা পৌছানোর দায়িত্ব পালন করতেন যা শরীয়ত প্রবর্তনকারী নবীগণ নিয়ে এসেছেন। এরা হলেন তাবলীগের নবী। আর শেষনবীর পরে যেমন কোনো শরীয়তের নবীও আসবেন না তদ্রুপ কোনো তাবলীগের নবীও আসবেন না। কিন্তু মুবাল্লিগ থাকতে হবে। কিভাবে? যেহেতু শেষ যুগ হলো মানুষের প্রাপ্ত বয়স্ক ও পরিপূর্ণতার যুগ। এসময়ে ঐ যে দায়িত্ব এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী (পাঁচজন ব্যতীত) পালন করতেন অর্থাৎ তাবলীগের কাজ (যদিও প্রকৃত অর্থে স্বয়ং আল্লাহই তা করতেন অর্থাৎ নবীদেরকে একাজ পালন করার জন্যে প্রেরণ করতেন),সেকাজ এখন সাধারণ মানুষকে পালন করতে হবে। অ-নবীরাই এখন সেকাজ পালন করবে,আলেম এবং অ-আলেমরাই এখন তা পালন করবে। আর এজন্যেই ইসলামের প্রকৃত মুবাল্লিগরা হলেন নবীদের নবী। অর্থাৎ,নবীদের বার্তাকে তারা মানুষের কাছে পৌছায়।

তবে,একটি বার্তার সফলতার পূর্বশত কি? ইসলাম নিজে কি একটি সফল বার্তা ছিল? যদি উত্তর ইতিবাচক হয় তাহলে এই সফলতার পেছনে রহস্য কি ছিল? একটি বার্তা সফল হওয়ার চারটি শর্ত রয়েছে। যদি সে শর্ত চারটি একত্রে জমা হয় তাহলেই উক্ত বার্তার সফলতা শতভাগ নিশ্চিত হবে। কিন্তু যদি তা একত্রে জমা না হয় তাহলে তখন বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করবে।

একটি বার্তা সফল হওয়ার প্রথম শর্ত হলো সেটা বুদ্ধিবৃত্তিক হওয়া এবং এর বিষয়বস্তুর শক্তিদীপ্ত হওয়া। অর্থাৎ উক্ত বার্তা মানুষের জন্যে কি নিয়ে এসেছ এবং মানুষের যুগ জিজ্ঞাসা স্মরণে কত সামঞ্জস্যশীল এবং কিভাবে তা পূরণ করতে সক্ষম হবে? মানুষের চাহিদার অন্ত নেই। মানিসক,চিন্তাগত,আবেগ অনুভূতিগত,ব্যবহারিক,সামাজিক,বস্তুগত ইত্যাদি ইত্যাদি। একটি বার্তা শুধু যে মানুষের চাহিদার বিরুদ্ধ হবে না তাই নয়,বরং,সে চাহিদাগুলোর অনুকূল ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এক বার্তার প্রথম কথাই হলো তাকে যুক্তিসিদ্ধ হতে হবে। অর্থাৎ,মানুষের চিন্তা ও বুদ্ধির সাথে সঙ্গতিশীল। তা এমন হবে যেন মানুষের বুদ্ধির আকর্ষণ ক্ষমতাকে সে নিজের দিকে টেনে আনে। কেননা,কোনো বার্তা যদি মানুষের যুক্তি ও বুদ্ধির পরিপন্থি হয় এমনকি যদি আবেগপ্রসূতও হয় তাহলে তার স্থিতিকাল খুব সামান্যই থাকে। চিরকাল তা টিকতে পারে না। একারণে কোরআন সর্বদা চিন্তা ও অনুধ্যানের ওপর জোরারোপ করে থাকে। কোরআন কখনোই বুদ্ধি ও যুক্তিকে পরিত্যাগ করেনি। বরং,যুক্তি ও বুদ্ধিকে সব সময় নিজের জন্য একটি খুঁটি হিসাবে কাজে লাগিয়েছে এবং মানুষকে বুদ্ধি খাটানোর জন্যে আহবান জানিয়েছে।

তদ্রুপ,একটি বার্তা যাতে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয় এজন্য তাকে মানুষের আবেগের সাথে সামঞ্জস্যশীল হতে হবে। মানুষের একটি দিক রয়েছে যা তার বুদ্ধি ও চিন্তার দিক থেকে ভিন্ন । যার নাম আবেগ এবং যাকে উপেক্ষা করার জো নেই। বার্তাকে মানুষের এই আবেগের সাথে সামঞ্জস্যশীল হওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলোর উন্নত ও সূক্ষ্ণগুলোকে একটা পর্যায় পর্যন্ত পরিতৃপ্ত করা এবং মানুষের জীবনের বাস্তব প্রয়োজন সমূহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া হলো ঐ বার্তার বিষয়বস্তুর বলীয়ান হওয়ার মূলকথা। যদি কোনো বার্তা মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদাসমূহের বিরুদ্ধ হয় তাহলে সফল হতে পারবে না।

একটি হাদীস রয়েছে,ফেকাহ র মধ্যেও যার উদ্ধৃতি দেয়া হয়ে থাকে। রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ  الْاِسْلامُ يَعْلُو وَ لَا يُعْلَي عَلَيْهِ অর্থাৎ,ইসলামই বিজয়ী হয় এবং অন্যের ওপরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে,কোনো কিছুই ইসলামের ওপর বিজয়ী হয় না।( নাহজুল ফাসাহা , পৃষ্ঠা 214 , হাদীস নং 1056 )

এটা হলো এমন একটি হাদীস যা ইসলামের সকল শ্রেণীর আলেমবৃন্দ সমান দৃষ্টিতে যার মূল্যায়ন করেছেন। ফেকাহর আলেমগণ যারা সবকিছুকেই ফেকহী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পছন্দ করেন,তারা এই হাদীসের থেকে এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে ইসলামে সামাজিক বিধি বিধানে এমন কোনো বিধান নেই যা পরিণামে অমুসলমানদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয়ী করবে। ইসলাম এধরনের বিধানকে অনুমোদন করে না। উদাহরণস্বরূপ,ইসলামী সমাজে একজন আহলে যিম্মা (যেমন ইহুদী,খৃষ্টান কিম্বা যরথুষ্ট্রীয়) কি এমন মর্যাদা বা অবস্থায় উপনীত হতে পারে যে সে-ই শাসক হবে আর একজন মুসলমান হবে তার শাসনাধীন? কিম্বা একজন মুসলমানকে তার নিজের এখতিয়ারে নিয়ে নিবে? ফকীহবৃন্দ উত্তরে বলেন,:

 الْاِسْلامُ يَعْلُو وَ لَا يُعْلَي عَلَيْهِ অর্থাৎ ইসলামের হাত সব সময় উপরে থাকতে হবে। ইসলাম নীচের হাতকে কখনো মেনে নেয় না। এই নীতির ওপর ভিত্তি করে কতিপয় বিধান নিঃসরণ করে থাকেন।

কালাম শাস্ত্রের পণ্ডিতবর্গ আবার বিষয়টিকে দেখেন অন্যভাবে। তারা কালাম শাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এর দিকে তাকান। (যেহেতু তাদের কাজ হলো যুক্তি প্রমাণ আর দলীল দস্তাবেজ নিয়ে একারণে) তারা বলেন যে,:الْاِسْلامُ يَعْلُو وَ لَا يُعْلَي عَلَيْهِ এর অর্থ হলো ইসলামের যুক্তি-প্রমাণ অন্য সব যুক্তি প্রমাণের চেয়ে শ্রেয়তর। যুক্তি-প্রমাণের ময়দানে ইসলামের যুক্তি প্রমাণই জয়যুক্ত হবে। এটা হলো উক্ত হাদীসের আরেক ধরনের ব্যাখ্যা । আবার যারা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এবিষটি মূল্যায়ন করেছেন তারা বলেনঃالْاِسْلامُ يَعْلُو وَ لَا يُعْلَي عَلَيْهِ অর্থাৎ,কার্যক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতা ইসলামেরই। কারণ,ইসলামের বিধি বিধান অন্য যে কোনো বিধি বিধানের চেয়ে মানুষের চাহিদা ও প্রবৃত্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে তার পথকে বাস্তবক্ষেত্রে সহজতর করে তোলে।

কেউ যখন স্বীয় প্রোপাগাণ্ডার মাধ্যমগুলোর দিকে তাকায়,উন্নত কলা-কৌশল,দক্ষ জনবল,ব্যাপক পরিকল্পনা,বিশাল বাজেট এবং সর্বোপরি তাদের ব্যাপকতা দেখে বলে ওঠে যে,তাদের প্রোপাগাণ্ডার এতসব কিছুর পরেও কি ইসলাম টিকে থাকতে পারে? সত্যিই আজব ব্যাপার! যখন আমাদের নিজেদের দিকে তাকাই তখন দেখি,তাবলীগের উপায় উপকরণের দিক দিয়ে আমরা একবারে শুন্যের কোঠায় রয়েছি। পৃথিবীর কোনো ধর্মই তাবলীগের উপকরণ আর মুবাল্লিগের দিক থেকে ইসলামের চেয়ে দুর্বল নয়। এমনকি ইহুদীরা যাদের সংখ্যা মুষ্টিমেয়,কিন্তু তাদের কোমর শক্ত করে বাধা। কিছু না হলেও অন্তত বিকৃতির দ্বারা। তাদের ইতিবাচক কিছু নেই যা দ্বারা মানুষদেরকে ইহুদীবাদের প্রতি আহবান জানাতে পারে। কিন্তু তাদের বিধ্বংসী ক্ষমতা প্রবল অন্য ধর্মগুলোকে বিনষ্ট করে দেবার জন্য । একজন ইহুদী তার জীবনভর ইসলামের কোনো একটি বিষয় নিয়ে গবেষণা চালায়। তার লক্ষ হলো কোনো একটি বিশ্ব বিদ্যালয়ে একটি আসন দখল করা। আর ঐ আসনে বসেই সে তার কাজ সেরে ফেলে। এমন একটি বই লিখবে এবং উক্ত বইয়ের মধ্যে সে তার নিজ চিন্তার প্রসার ঘটাবে। আপনারা কি জানেন যে বিশ্বে ইসলামিক ষ্টাডিজ এর নববই শতাংশেরও বেশি চেয়ার ইহুদীদের দখলে রয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বে ইসলামের এক্সপার্টরা হলো সব ইহুদী! তাহলে বুঝতে হবে যে তাদের আঘাত শক্তি কতো জোরদার। ঐ হলো খৃষ্টানদের কথা আর এই হলো ইহুদীদের কথা।

কিন্তু এতসব কিছু সত্বেও,বিশ্বে কি হারে মানুষ মুসলমান হচ্ছে পত্র পত্রিকা খুললেই চোখে পড়বে। এটা কোন তাবলীগের জোরে? কোনো মুবাল্লিগও ছিল না। বড়জোর একটা রেডিও থেকে মাঝে মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের অনুষ্ঠান শুনেছে হয়তো। আমি (ওস্তাদ মুতাহহারী) ইউরোপ ফেরত একজন খোঁজ-খবর রাখা ব্যক্তির সাথে এ বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলাম। ভদ্রলোকটি যিনি বহু বছর ধরে ইউরোপে থাকেন তিনি লোমণ্ড সংবাদপত্রে বিগত কয়েক বছরে 14 মিলিয়ন লোকের মুসলমান হওয়া মর্মে প্রকাশিত খবরের প্রসঙ্গে জনৈক খৃষ্টান ব্যক্তির অভিমত তুলে ধরে বলেন যে ঐ খৃষ্টান লোকটি বলেছিল,লোমণ্ড-এর তথ্য ভুল। আসলে বিগত বছরগুলোতে মুসলমান হওয়া লোকের সংখ্যা পচিশ মিলিয়ন। লোকটি আরো বলে যে আফ্রিকায় দুইটি শক্তি ক্রমবর্ধমানঃ ইসলাম এবং কম্যুনিজম। খৃষ্টবাদ যতই তৎপরতা চালাক,উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেনি। যদিও তাদের প্রচার মাধ্যমসমূহ শক্তিশালী এবং ব্যাপক;পক্ষান্তরে ইসলামের প্রচারমাধ্যম দুর্বল। এর পার্থক্য হলো দুটোর বিষয়বস্তুর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটির বিষয়বস্তু শক্তিশালী এবং যুক্তিনির্ভর,আর অপরটির বিষয়বস্তু আবেগ নির্ভর। আবেগের দৃষ্টিতে তা খুবই শক্তিশালী। এর বিষয়বস্তু বাস্তবমুখী এবং মানুষের ব্যবহারিক জীবনাচার কেন্দ্রিক। পক্ষান্তরে অন্যটির বিষয়বস্তু হলো চাপিয়ে দেয়া। ইসলামের প্রথম কথাটি একজন পিপাসার্তের গলায় পানির মতো পরম আগ্রহে গলাধঃকরণ হয়। ইসলাম বলে, বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা আল্লাহ ও তার একত্ববাদকে প্রমাণিত করতে হবে। কিন্তু খৃষ্টবাদের প্রথম কথাই হলো বুদ্ধিবৃত্তিকে বিদায় করে ত্রিত্ববাদের কথা বলতে হবে।

মহররম ও আশুরাকে ঘিরে আলোচনা এতাটা বিস্তারিত করার উদ্দেশ্য হলো হোসাইনী বার্তাকে মানুষের কাছে পৌছানো। অতঃপর ব্যাখ্যা প্রদান করবো যে কিভাবে এ আন্দোলন ইসলামের বার্তা বহনকারী ছিল। অর্থাৎ ইমাম হোসাইন (আঃ) কিভাবে ইসলামের বার্তাকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌছাতে সক্ষম হয়েছেন।

ইমাম হোসাইন (আঃ) 8ই জিলহাজ্ব তারিখে যখন ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা সহকারে হাজীরা দলে দলে মক্কায় প্রবেশ করছিল,আর ঠিক যে দিনটাতে তাদের আরাফাত ও মিনার দিকে যাত্রা করতে হয়,তখন তিনি মক্কা থেকে প্রস্থান করলেন। তিনি রওনা হয়ে গেলেন এবং ইবনে তাউসের মারফত বর্ণিত সেই বিখ্যাত ভাষণটি প্রদান করেন। এক মঞ্জিল অতিক্রম করে অন্য মঞ্জিলে পৌছিলেন এবং একসময় ইরাকের সীমান্তের নিকটবর্তী হলেন। কুফায় তখনও কি সংবাদ আল্লাহ মাবুদই ভালো জানেন। সেখানে হযরত মুসলিম ইবনে আকিলের ওপর নির্যাতনের করুণ কাহিনী ঘটে গেছে। ইমাম হোসাইন (আঃ) পথিমধ্যে এক ব্যক্তিকে দেখলেন কুফার দিক থেকে আসছে। ইমাম ক্ষণিক যাত্রাবিরিত করলেন তার সাথে কথা বলার জন্যে । বলা হয় যে,ঐ লোকটি ইমাম হোসাইন (আঃ) কে চিনতো। অপরদিকে সে কুফার করুণ ঘটনার খবর রাখতো। কাজেই সে বুঝতে পারলো যে যদি ইমাম হোসাইন (আঃ) এর নিকটে যায় তাহলে ইমাম নিশ্চয় তাকে কুফার সংবাদ জিজ্ঞাসা করবেন। তখন তাকে ঐ দুঃসংবাদের কথা জানাতে হবে। সে উক্ত খবর ইমামকে বলতে চাইলো না। অগত্যা নিজের রাস্তা ঘুরিয়ে দিলো এবং অন্য পথ দিয়ে অগ্রসর হলো। বিন আসাদ গোত্রীয় দুইজন লোক যারা হজ্জ পালনের জন্যে মক্কায় ছিল এবং ইতিমধ্যে তাদের হজ্জ পালন সমাপ্ত হয়ে গিয়েছিল,যেহেতু তারা ইমামকে সহযোগিতা করার মনস্থ করেছিল একারণে দ্রুততার সাথে পেছন থেকে রওনা হয়েছিল ইমাম হোসাইন (আঃ) এর কাফেলায় যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে ।

এরা প্রায় এক মঞ্জিল পিছিয়ে ছিল। দেখা হয়ে গেল ঐ লোকটির সাথে যে কুফা থেকে আসছিল। পরস্পর নিকটবর্তী হওয়ার পর সালাম বিনিময়ের পরে আরবের প্রথা অনুযায়ী ইন্তিসাবের খবর জানতে চাইলো অর্থাৎ কে কোন গোত্রভূক্ত তার পরিচয় জানতে চাইলো। লোকটি বললো,আমি বনি আসাদ গোত্রের। তারা বললো,অবাক ব্যাপার! আমরাও তো বনি আসাদ গোত্রের! তাহলে বলো দেখি তোমার বাবা কে আর দাদা কে? সে উত্তর দিল। তারাও নিজেদের পরিচয় দিল। তখন মদীনা থেকে আসা লোক দুজন বললো,কুফার সংবাদ কি? সে বললোঃ সত্যি বলতে কি কুফার অবস্থা আসলে খুবই দুঃখজনক। ইমাম হোসাইন (আঃ) মক্কা থেকে কুফার দিকে যাচ্ছেন এবং পথিমধ্যে আমাকে দেখে তিনি থেমে যান কুফার সংবাদ নেবার উদ্দেশ্যে । কিন্তু আমি এ দুঃসংবাদ তাকে বলতে পারবো না বলে পাশ কাটিয়ে চলে এসেছি। তারপর সে কুফার সব ঘটনা এ দুজনকে খুলে বললো।

তারা দুজন চলতে চলতে ইমামের কাফেলায় পৌছে যায়। প্রথম মঞ্জিলে পৌছে তারা এ ব্যাপারে মুখ খুললো না। তারা অপেক্ষা করলো যতক্ষণ না ইমাম আরেকটি মঞ্জিলে অবতরণ করলেন এবং গতকাল তারা কুফার যে লোকটির সাথে পথিমধ্যে সাক্ষাত করেছিল তখন থেকে প্রায় চব্বিশ ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেল। ইমাম তাবুর ভেতরে একদল সঙ্গী সাথী নিয়ে বসে আছেন। এমন সময় সে দুজন লোক সেখানে প্রবেশ করলো এবং আরজ করলো,হে ইমাম! আমাদের কাছে একটি সংবাদ রয়েছে। সেটাকে এখানেই সকলের সম্মুখে বলার অনুমতি দান করবেন নাকি আড়ালে শুনবেন? তিনি বললেন,আমি আমার সঙ্গীদের থেকে কিছুই গোপন করবো না। যে সংবাদই হোক এখানেই সকলের সামনে তা বলো। দু জনের একজন বললো,হে ইমাম! আমরা গতকাল যে লোকটি আপনাকে দেখে না থেমে পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিল তার সাথে সাক্ষাত করেছি। সে একজন আস্থাশীল লোক। আমরা তাকে চিনি। আমাদেরই স্বগোত্রীয় বনি আসাদের লোক। আমরা তাকে কুফার সংবাদ জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে খুব খারাপ সংবাদ দিল। বললো,আমি কুফা থেকে এমন অবস্থায় বের হয়েছি যখন নিজের চোখে দেখেছি যে মুসলিম ইবনে আকিল এবং হানি ইবনে উরওয়াকে শহীদ করা হয়েছে। আর তাদের লাশকে পায়ে রশি বেঁধে গলিতে আর বাজারে টেনে বেড়ানো হচ্ছিল। ইমাম হযরত মুসলিমের শাহাদাতের সংবাদ শুনলেন। তার দুচোখ অশ্রুতে ভরে গেল। সাথে সাথে তিনি এই আয়াতখানি পাঠ করলেনঃ

) مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَي نَحْبَهُ وَ مِنْهُمْ مَنْ يَنْتَظِرُ وَ مَا بَدَّلُوا تَبْدِيلاً(

অর্থাৎ,মুমীনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যু বরণ করেছে আর কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি। (আহযাবঃ 23)

এমন অবস্থায় ইমাম কিন্তু বললেন না যে,কুফাকে যেহেতু কব্জা করে নিয়েছে আর মুসলিম ও হানীকে যেহেতু শহীদ করে ফেলেছে কাজেই আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা পরাজিত হয়ে গেছি। কাজেই এখান থেকেই ফিরে যাই। বরং তিনি এমন এক বাক্য বললেন যা প্রতিপন্ন করে যে ব্যাপারটা অন্য কিছু । উপরোক্ত আয়াতটি সম্ভবতঃ আহযাবের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। ইমাম বোঝালেন যে মুসলিম ইবনে আকিল তার কর্তব্য পালন করেছেন। এখন আমাদের পালা। কবির ভাষায়ঃ

کاروان شهيد رفت از پيش

وان ما رفته گير و مي انديش

‘‘ শহীদের কাফেলা আগই গেছে চলি

আমরা এখনো বেধে আছি চিন্তার খাতা খুলি’’

ইমামের একথা শুনে যারা দুর্বল চিত্তের ছিল এবং পার্থিব আশা নিয়ে ইমামের সঙ্গী হয়েছিল তারা প্রস্থান করে। (যেমনটা সব আন্দোলনেই দেখা যায়)।

 لَمْ يَبْقَ مَعَهُ اِلَّا اَهْلَ بَيْتِهِ وَ صَفْوَتِهِ

অর্থাৎ তার সাথে অবিশষ্ট থেকে গেল কেবল তার আহলে বাইত ও নিষ্ঠাবান সঙ্গীদল। যাদের সংখ্যা সে সময়ে খুবই কিঞ্চিত ছিল। (খোদ কারবালায় এসে কিছুসংখ্যক লোক যারা প্রথমে ধোকার শিকার হয়েছিল এবং ওমর ইবনে সা দের দলে যোগ দিয়েছিল তারা একজন একজন করে জাগ্রত হয়ে ইমামের সাথে এসে যোগদান করেছিল)। হয়তো বা বড়জোর কুড়ি জনের বেশী হবে না তারা। এমন অবস্থাতেই হযরত মুসলিম ইবনে আকিল এবং হানী ইবনে উরওয়ার মর্মান্তিক শাহাদাতের খবর এসে পৌছে। লিসানুল গাইব গ্রন্থের লেখক বলেন,কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেছেন,ইমাম হোসাইন (আঃ) যেহেতু কোনো কিছুকেই তার সঙ্গীদের কাছে গোপন করছিলেন না,কাজেই এই খবরটি শোনার পরে সমীচিন ছিল শিশু ও নারীদের তাঁবুতেও গিয়ে মুসলিমের সংবাদটা তাদেরকে প্রদান করা যখন তাদের মধ্যে অবস্থান করছিলো হযরত মুসলিমের পরিবার,তার ছোট শিশুরা,ছোট ভাইয়েরা,বোনেরা এবং আরো কতিপয় চাচাতো বোনেরা।

এখন কিভাবে ইমাম তাদেরকে এ সংবাদ জানাবেন। হযরত মুসলিমের ছোট একটি মেয়ে ছিল। ইমাম হোসাইন (আঃ) যখন বসলেন তাকে ডেকে পাঠালেন। তাকে আনা হলো। তিনি তাকে কোলে বসালেন এবং আদর করতে শুরু করলেন। কন্যাটি বুদ্ধিমতী ছিল। সে বুঝতে পারলো এ আদর কোনো সাধারণ আদর নয়। পিতৃসুলভ আদর। একারণে সে জিজ্ঞেস করলো,চাচাজী! যদি আমার বাবা মারা যান তাহলে আমাদের কি হবে? ইমাম তার একথায় বিগলিত হলেন। বললেন,মা আমার,আমি তোমার পিতার জায়গায় আছি। তার অবর্তমানে আমিই তোমার বাবার জায়গায় থাকবো। ইমাম পরিবারে কান্নার রোল পড়ে গেল। আকিলের সন্তানদের প্রতি উদ্দেশ্য করে ইমাম ঘোষণা দিলেন,হে আকিলের সন্তানেরা! তোমরা একজন মুসলিমকে উৎসর্গ করেছো। এটাই তোমাদের জন্য যথেষ্ট । এখন তোমরা চলে যেতে চাইেল চলে যেতে পারো। তারা প্রতিবাদের সুরে বলে উঠলো,হে ইমাম! আমরা এতক্ষণ কোনো মুসলিমকে শহীদ দান করিনি তখন আপনার সাথে ছিলাম। আর মুসলিমকে দান করে এখন আমরা ছেড়ে যাব? কক্ষনোই তা হতে পারে না। আমরা আপনার খেদমতে থেকে যাবো যতক্ষণ না মুসলিমের ভাগ্যে যা ঘটেছে আমাদের ভাগ্যেও তা ঘটে।


3

4

5

6

7

8