চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড3%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 242 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 106702 / ডাউনলোড: 9685
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

সংলাপ ও আলোচনায় মহান নবীদের পদ্ধতি

পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে,হযরত ইবরাহীম (আ.) গুহা থেকে বের হবার পর তাওহীদের পথ থেকে বিচ্যুত দু টি গোষ্ঠীর মুখোমুখি হয়েছিলেন। উক্ত গোষ্ঠীদ্বয়  হলো :

ক. মূর্তিপূজকগণ এবং         খ. নভোমণ্ডলীয় বস্তুসমূহের পূজকগণ।

দ্বিতীয় গোষ্ঠীর সাথে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আলোচনা আমরা শুনেছি। এখন অবশ্যই দেখা উচিত যে,তিনি কিভাবে মূর্তিপূজকদের সাথে বিতর্ক করেছিলেন?

মহান নবীদের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে,তাঁরা তাঁদের প্রচার কার্যক্রমের শুরুতে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের থেকেই সংস্কার ও সংশোধনমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করতেন। এরপর তাঁরা তাঁদের প্রচার কার্যক্রমের পরিধি বিস্তৃত করতেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর নবুওয়াতের সূচনালগ্নে সর্বাগ্রে নিজের নিকটাত্মীয় ও জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহবান জানিয়েছিলেন। তিনি মহান আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী (( و أنذر عشيرتك الأقربين ) এবং আপনার অতি নিকটাত্মীয়দেরকে ভয় প্রদর্শন করুন”-সূরা শুআরা : ২১৪) তাঁর দাওয়াহ্ বা প্রচার কার্যক্রমের ভিত্তি নিজ আত্মীয়-স্বজন ও জ্ঞাতির সংশোধন করার ওপর স্থাপন করেছিলেন।

ইবরাহীম (আ.)-এর প্রচার পদ্ধতিও ঠিক এমনই ছিল। তাঁর সমাজসংস্কার ও সংশোধনমূলক কার্যক্রম নিকটাত্মীয়দের থেকে শুরু করেছিলেন।

আযর তাঁর গোত্রের মধ্যে অত্যন্ত উঁচুমর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী ছিল। তাত্ত্বিক (বৈজ্ঞানিক) ও শৈল্পিক তথ্য,জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা ছাড়াও সে অতি দক্ষ জ্যোতির্বিদও ছিল। তাই নমরুদের শাহী দরবারে তার ভীষণ প্রভাব ছিল। তার জ্যোতির্বিদ্যাভিত্তিক গণনা এবং ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ নমরুদের দরবারে সকলের কাছে সমাদৃত হতো। ইবরাহীম (আ.) বুঝতে পেরেছিলেন যে,তাকে তাওহীদী ধর্মে দীক্ষিত করা গেলে মূর্তিপূজকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করা সম্ভব হবে। এ কারণেই তিনি সর্বোত্তম পন্থায় তাকে মূর্তিপূজা থেকে বিরত রাখলেন। কিন্তু কতিপয় কারণবশত আযর ইবরাহীম (আ.)-এর আহবান,বাণী ও উপদেশ গ্রহণ করে নি। যে বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আযরের সাথে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর কথোপকথন পদ্ধতি। পবিত্র কোরআনের যে সব আয়াতে আযরের সাথে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর কথোপকথন বর্ণনা করা হয়েছে সে সব আয়াত যদি আমরা সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করি তাহলে প্রচারপদ্ধতির ক্ষেত্রে মহান নবীদের রীতিনীতি স্পষ্ট হয়ে যাবে। এখন আমরা হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর প্রচারপদ্ধতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব।

) إذ قال لأبيه يا أبت لم تعبد ما لا يسمع و لا يبصر و لا يغني عنك شيئا يا أبت إنّي قد جاءني من العلم ما لم يأتك فاتّبعني أهدك صراطا سويّا يا أبت لا تعبد الشّيطان إنّ الشّيطان كان للرّحمان عصيا. يا أبت إنّي أخاف أن يمسّك عذاب من الرّحمان فتكون للشّيطان وليّا(

“হে পিতা! যে বস্তু শোনেও না,দেখেও না এবং তোমাকে কোন কিছু থেকে অমুখাপেক্ষী করে না,কেন তুমি তার উপাসনা কর? হে আমার পিতা! নিশ্চয়ই আমি ওহীর মাধ্যমে যে সব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেছি সে সব বিষয় সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই। তাই তুমি যদি আমার অনুসরণ কর তাহলে তোমাকে আমি সত্য পথে পরিচালিত করব। হে আমার পিতা! শয়তানের উপাসনা কর না। কারণ শয়তান পরম দয়ালু আল্লাহর অবাধ্য। আমার ভয় হয় যে,মহান আল্লাহর আযাব তোমার কাছে পৌঁছবে আর এমতাবস্থায় তুমি শয়তানের বন্ধু ও মিত্রে পরিণত হবে।” (সূরা মরিয়ম : ৪৪-৪৭)

আযর ইবরাহীম (আ.)-এর এ আহ্বানে এ রকম বলেছিল, ইবরাহীম! আমার খোদাদের৮৭ থেকে কি তুমি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি এ কাজ বর্জন না কর তাহলে আমি তোমাকে রজম (প্রস্তর নিক্ষেপ) করে হত্যা করব। আর এ ধরনের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য কিছু সময় তোমাকে অবশ্যই আমার নিকট থেকে দূরে থাকতে হবে।”

যেহেতু ইবরাহীম (আ.) মহান আত্মা ও প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন তাই তিনি আযরের কটুক্তিগুলো নিজের মধ্যে হজম করে নিলেন এবং তিনি এমনই উত্তর দিলেন, আপনার ওপর সালাম (শান্তি)। অচিরেই আমি আপনার জন্য আমার প্রভুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব।” এ ধরনের বর্ণনার চেয়ে উত্তম জবাব আর কি হতে পারে;আর এ ধরনের কথা অপেক্ষা আর কোন্ বক্তব্য ভদ্রতাপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় হবে?

আযর কি ইবরাহীম (আ.)-এর পিতা ছিল?

উপরিউক্ত আয়াতসমূহ,সূরা তাওবার ১১৫ নং আয়াত এবং সূরা মুমতাহিনার ১৪ নং আয়াতের বাহ্য অর্থ হচ্ছে আযর ইবরাহীম (আ.)-এর পিতৃস্থানীয় ছিল এবং হযরত ইবরাহীমও তাকে পিতা বলে সম্বোধন করতেন। কিন্তু মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং সকল নবী-রাসূলের পূর্বপুরুষগণ তাওহীদবাদী ও খোদায় বিশ্বাসী ছিলেন-এতৎসংক্রান্ত সকল শিয়া আলেমের ঐকমত্যের (ইজমা) সাথে মূর্তিপূজক আযরের ইবরাহীম (আ.)-এর পিতা হওয়া মোটেও খাপ খায় না। প্রসিদ্ধ আলেম শেখ মুফিদ (রহ.) তাঁর আওয়ায়েলুল মাকালাত’নামক গ্রন্থে উপরিউক্ত বিষয়টিতে যে ইমামীয়া শিয়া আলেমদের ইজমা রয়েছে তা লিখেছেন। এমনকি অনেক সুন্নী আলেমও এ ব্যাপারে তাঁদের সাথে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। এমতাবস্থায় উপরিউক্ত আয়াতসমূহের বাহ্য অর্থের অবস্থাই বা কি হবে এবং কিভাবে এ সমস্যাটি সমাধান করতে হবে?

অনেক মুফাসসির বলেছেন যে,أب (আব) শব্দটি যদিও সাধারণত আরবী ভাষায় পিতা’র ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়,তবুও এ শব্দটির ব্যবহার কেবল পিতা’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এবং কখনো কখনো আরবী ভাষা ও পবিত্র কোরআনের পরিভাষায় চাচা’অর্থেও ব্যবহৃত হয়,যেমন নিচের আয়াতেأب শব্দটি চাচা’অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে :

) إذ قال لبنيه ما تعبدون من بعدي قالوا نعبد إلهك و إله ءابائك إبراهيم و إسماعيل و إسحاق إلها واحدا و نحن له مسلمون(

“যখন ইয়াকুব নিজ সন্তানদেরকে বললেন : আমার পরে তোমরা কার উপাসনা করবে? তখন তারা বলেছিল : আমরা আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষগণ ইবরাহীম,ইসমাঈল ও ইসহাকের এক-অদ্বিতীয় উপাস্যের উপাসনা করব। আর আমরা তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণকারী।” (সূরা বাকারা:  ১৩২)

নিঃসন্দেহে হযরত ইসমাঈল হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর চাচা ছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন না। কারণ হযরত ইয়াকুব হযরত ইসহাকের সন্তান। আর হযরত ইসহাক হযরত ইসমাঈলের ভাই ছিলেন। এতদ্সত্ত্বেও হযরত ইয়াকুবের সন্তানগণ হযরত ইয়াকুবের চাচা হযরত ইসমাঈলকে পিতা বলেছে। অর্থাৎ তারাأب শব্দটি তাঁর (ইসমাঈল) ওপরও প্রয়োগ করেছে। এ দু ধরনের ব্যবহার সত্ত্বেও এ সম্ভাবনা থেকে যায় যে,আযরকে হেদায়েত করা সংক্রান্ত যে সব আয়াত রয়েছে সেগুলোতে উল্লিখিতأب শব্দটির কাঙ্ক্ষিত অর্থ হচ্ছে চাচা,বিশেষ করে শেখ মুফীদ যে ইজমার কথা বর্ণনা করেছেন তা থেকে। আর আযরকে ইবরাহীম (আ.) পিতা বলেছিলেন তা সম্ভবত এ কারণে যে,ইবরাহীম (আ.)-এর অভিভাবকত্বের দায়িত্ব দীর্ঘদিন আযরের ওপর ছিল। এ কারণেই হযরত ইবরাহীম (আ.) তাকে পিতার ন্যায় সম্মান প্রদর্শন করতেন।

কোরআন আযরকে ইবরাহীম (আ.)-এর পিতা বলে নি

হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে আযরের আত্মীয়তার সম্পর্ক সংক্রান্ত পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করার জন্য নিম্নোক্ত দু টি আয়াতের ব্যাখ্যার দিকে আমরা সম্মানিত পাঠকবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করব :

১. আরব উপদ্বীপের পরিবেশ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অপার আত্মত্যাগের কারণে ঈমান ও ইসলামের নির্মল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। অধিকাংশ অধিবাসীই আন্তরিকতার সাথে ঈমান আনয়ন করেছিল এবং বুঝতে পেরেছিল যে,শিরক ও মূর্তিপূজার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে দোযখ এবং শাস্তি। তারা যদিও ঈমান আনয়ন করার কারণে আনন্দিত ও প্রফুল্ল ছিল কিন্তু তাদের পিতা-মাতাদের মূর্তিপূজারী হওয়ার তিক্ত স্মৃতি স্মরণ করে তারা কষ্ট পেত। যে সব আয়াতে কিয়ামত দিবসে মুশরিকদের জীবন সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ ও ব্যাখ্যা এসেছে সেগুলো শ্রবণ করা তাদের জন্য ছিল খুবই কষ্টকর ও বেদনাদায়ক। নিজেদের এ আত্মিক যন্ত্রণা লাঘব ও দূর করার জন্য তারা মহানবী (সা.)-এর কাছে অনুরোধ জানাত যেন তিনি তাদের প্রয়াত অতি নিকটাত্মীয় যারা কাফির ও মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আর ঠিক এভাবেই হযরত ইবরাহীম (আ.) তাঁর চাচা আযরের জন্যও এ কাজটিই করেছিলেন। নিম্নোক্ত আয়াতটি তাদের (আরবের নবদীক্ষিত মুসলমানগণ) অনুরোধের প্রতি উত্তরস্বরূপ অবতীর্ণ হয়েছিল :

) ما كان للنَّبِيِّ وَ الّذين آمنوا أنْ يَسْتَغْفِروا للمشرِكين و لو كانوا أولي قُربى مِن بعدِ ما تبيَّن لهم أنَّهم أصحابُ الجحيم و ما كان استغفارُ إبراهيمَ لأبيه إلّا عن موعدةٍ وعدها إيّاه فلمّا تبيَّن له إنَّه عدوٌّ للهِ تبرَّأ منه إنَّ إبراهيمَ لأوّاهٌ حليم(

“নবী ও যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য শোভনীয় নয় যে,তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে যদি তারা অতি নিকটাত্মীয়ও হয়,যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে,ঐ সব মুশরিক জাহান্নামের অধিবাসী। আর নিজ পিতার জন্য ইবরাহীমের ক্ষমা প্রার্থনা ছিল ঐ প্রতিজ্ঞার কারণে যা তিনি তাকে (চাচা আযরকে) করেছিলেন। তবে যখন ইবরাহীমের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে,সে (আযর) আল্লাহর শত্রু তখন তিনি তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করলেন। নিশ্চয়ই ইবরাহীম অত্যন্ত দয়ালু ও ধৈর্যশীল।” (সূরা তাওবা : ১১৩-১১৪)

অগণিত দলিল-প্রমাণ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে,আযরের সাথে ইবরাহীম (আ.)-এর কথোপকথন এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অঙ্গীকার ইবরাহীম (আ.)-এর যৌবনেই হয়েছিল। অবশেষে ইবরাহীম (আ.) চাচা আযরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন। অর্থাৎ এটি ঐ সময় হয়েছিল যখন ইবরাহীম (আ.) তাঁর জন্মভূমি বাবেল ত্যাগ করে ফিলিস্তিন,মিশর ও হিজাযে গমন করেন নি। এ আয়াত থেকে এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে,যখন আযর কুফর ও শিরকের মধ্যে দৃঢ়পদ থেকেছে তখন ইবরাহীম (আ.) তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে মোটেও স্মরণ করেন নি।

২. ইবরাহীম (আ.) তাঁর জীবনের শেষভাগে একটি মহান দায়িত্ব পালন (অর্থাৎ পবিত্র কাবার পুনঃনির্মাণ কার্য সমাপ্ত করার পর) এবং পবিত্র মক্কার শুষ্ক ও মরুপ্রান্তরে নিজ স্ত্রী ও সন্তানকে আনয়ণ করার পর এমন সব ব্যক্তি সম্পর্কে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করেন যার মধ্যে তাঁর পিতা-মাতাও ছিলেন। তিনি মহান আল্লাহর কাছে তাঁর প্রার্থনা কবুল হওয়ার জন্য এ ধরনের দোয়াও করেছিলেন,

) ربَّنا اغْفِرْلي وَلِوالِدَيَّ و للمُؤْمنين يومَ يقومُ الحِساب(

“হে আমার প্রভু! আমাদেরকে,আমার পিতা-মাতা এবং মুমিনদেরকে যেদিন বিচার (হিসাব-নিকাশ) করা হবে সেদিন ক্ষমা করে দিন।” (সূরা ইবরাহীম : ৪১)

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে,পবিত্র কাবাগৃহ নির্মাণ করার পরই ইবরাহীম (আ.) বৃদ্ধাবস্থায় এ প্রার্থনা করেছিলেন। যদি উক্ত আয়াতে বর্ণিতوالديَّ (আমার পিতা-মাতা) যাঁরা ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর দয়া,ভালোবাসা এবং ভক্তিশ্রদ্ধার পাত্র এবং তাঁদের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেছেন তিনিই যদি আযর হন তাহলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে,ইবরাহীম (আ.) আমৃত্যু এবং তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত আযরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেন নি এবং কখনো কখনো তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেছেন,অথচ যে আয়াতটি মুশরিকদের অনুরোধের উত্তরে বর্ণিত হয়েছে তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে,হযরত ইবরাহীম (আ.) তাঁর যৌবনকালেই আযরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন এবং তার থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন। আর ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ মোটেও সংগতিসম্পন্ন নয়।

এ দু টি আয়াত পরস্পর সংযোজন করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে,যে ব্যক্তি যৌবনকালে ইবরাহীম (আ.)-এর ঘৃণার পাত্র হয়েছিল এবং যার সাথে তিনি সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন সেই ব্যক্তিটি ঐ ব্যক্তি থেকে ভিন্ন  যাঁকে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সর্বদা স্মরণ করেছিলেন এবং যাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন।৮৮

মূর্তি ধ্বংসকারী ইবরাহীম

উৎসবের মুহূর্ত সমাগত হয়েছে। বাবেল শহরের অমনোযোগী জনগণ ক্লান্তি দূর করা,উদ্যম পুনঃসঞ্চার ও উৎসব উদযাপন করার জন্য মরুভূমির দিকে গমন করল এবং শহর সম্পূর্ণরূপে জনশূন্য হয়ে গেল। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর উজ্জ্বল ইতিহাস এবং শিরক ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য ও নিন্দাবাদ বাবেলের জনগণকে ভীষণভাবে চিন্তিত করে তুলেছিল। এ কারণেই তারা সবাই অনুরোধ করেছিল যে,ইবরাহীমও যেন তাদের সাথে ঐ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। তবে তারা এ ব্যাপারে জোর-জবরদস্তি করতে থাকলে ইবরাহীম (আ.) অসুস্থতার সম্মুখীন হন। তখন তিনিإنِّي سقيم (আমি অসুস্থ অথবা আমার শরীর ভালো নেই) এ কথা বলে তাদের কথার উত্তর দিয়েছিলেন এবং উৎসবে যোগদান করা থেকে বিরত ছিলেন।

সত্যিই ঐ দিন ছিল তাওহীদবাদী ও মুশরিকদের জন্য আনন্দের দিন। মুশরিকদের জন্য ঐ দিন ছিল প্রাচীন উৎসব উদযাপনের। উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা উদযাপন এবং পূর্বপুরুষদের আচার-অনুষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তারা পাহাড়ের পাদদেশ ও চিরসবুজ ক্ষেত-খামারে গিয়েছিল।

আর তাওহীদের বীর পুরুষের জন্যও এটি ছিল অতি প্রাথমিক ও অভূতপূর্ব উৎসবের দিন যার আগমনের জন্য তিনি (ইবরাহীম) দীর্ঘদিন যাবত অপেক্ষা করছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন শহর জনশূন্য হয়ে যাক এবং সে সুযোগে শিরক ও কুফরের যাবতীয় নিদর্শন তিনি ধ্বংস করে দেবেন।

যখন জনতার সর্বশেষ দলটি শহর থেকে বের হয়ে গেল তখন হযরত ইবরাহীম (আ.) সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন। তিনি মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসাসহকারে মন্দিরে প্রবেশ করলেন। তিনি মন্দিরের মধ্যে নিস্প্রাণ মূর্তি ও কাষ্ঠনির্মিত প্রতিমাসমূহ দেখতে পেলেন। তাবাররুক হিসাবে মূর্তিপূজকরা যে সব খাবার মন্দিরে রেখে যেত তা হযরত ইবরাহীমের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং তিনি সরাসরি খাদ্যের নিকটে গেলেন। তিনি এক টুকরা রুটি হাতে নিয়ে ঐ সব মূর্তির দিকে বিদ্রূপের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, কেন তোমরা বিভিন্ন ধরনের খাবার খাচ্ছ না? বলার অপেক্ষা রাখে না যে,মুশরিকদের হস্তনির্মিত প্রতিমাসমূহের সামান্য নড়া-চড়া করার ক্ষমতাও ছিল না। তারা খাবে কি? মন্দিরের বিরাট অঙ্গনে সুনশান নীরবতা বিরাজ করছিল। কিন্তু ইবরাহীম (আ.) মূর্তিগুলোর হাত,পা ও দেহের ওপর কুঠার দিয়ে একের পর এক আঘাত হানতে লাগলেন। যার ফলে সেখানকার নীরবতা ভেঙ্গে গেল। তিনি মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। আর এভাবে মন্দিরের মধ্যে কাঠ ও ধাতুর একটি বিরাট স্তূপের সৃষ্টি হলো। তিনি কেবল বড় মূর্তিটিকে অক্ষত রেখে দিলেন এবং ঐ মূর্তিটির কাঁধে কুড়াল ঝুলিয়ে রাখলেন। তাঁর কাজের লক্ষ্য ছিল এটিই যে,তিনি বোঝাতে চেয়েছেন স্বয়ং বড় মূর্তিটিই মূর্তিগুলো ধ্বংস করেছে। কিন্তু তাঁর এ বাহ্য কার্যকলাপের পেছনে একটি সুমহান উদ্দেশ্য ছিল যা বর্ণিত হওয়া উচিত। ইবরাহীম (আ.) ভালোভাবেই জানতেন যে,মুশরিকরা উৎসবস্থল থেকে ফিরে আসার পর মন্দিরগুলোর মূর্তিসমূহ ধ্বংস করার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করবে এবং তারা এ ঘটনার বাহ্য রূপকে এক ধরনের অন্তঃসারশূন্য অবাস্তব কার্যকলাপ বলে অভিহিত করবে। কারণ তারা বিশ্বাস করবে না যে,এ বড় মূর্তিটিই এ সব আঘাত হেনেছে যার নড়াচড়া ও কাজ করার কোন ক্ষমতাই নেই। এমতাবস্থায় হযরত ইবরাহীম (আ.) প্রচারণার দৃষ্টিকোণ থেকে এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বলতে পারবেন যে,তোমাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী যখন এ বড় মূর্তিটির সামান্যতম ক্ষমতাই নেই তখন কিভাবে তোমরা তার উপাসনা করছ?

দিকচক্রবাল রেখার ওপর সূর্যোদয় হলো। সূর্যের আলোয় মরুপ্রান্তর ও সমতলভূমি সবকিছু আলোকিত হলো। জনগণ দলে দলে শহরে রওয়ানা হলো। প্রতিমাপূজার লগ্ন উপস্থিত হলো। একদল মন্দিরে প্রবেশ করল। এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যা দেবতাদের হীনতা ও অপদস্থতা প্রকাশ করছিল তা যুবা-বৃদ্ধ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। মন্দিরে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল। এক ব্যক্তি সেই নীরবতা ভেঙ্গে বলল, কোন্ ব্যক্তি এ কাজ করেছে?   ইবরাহীম (আ.) প্রতিমাসমূহকে যে পূর্ব হতেই মন্দ বলতেন এবং মূর্তিপূজার স্পষ্ট বিরোধিতা করতেন তা সকলের জানা ছিল। তাই তারা নিশ্চিত হতে পারল যে,ইবরাহীম (আ.)-ই এ কাজ করেছেন। নমরুদের তত্ত্বাবধানে একটি বিচারসভার আয়োজন করা হলো। যুবক ইবরাহীমকে মায়ের সাথে এক সর্বসাধারণ বিচার অধিবেশনে জেরা করা হলো।

মায়ের অপরাধ ছিল এই যে,কেন তিনি তাঁর সন্তানকে গোপন রেখেছিলেন এবং শিরোচ্ছেদ করার জন্য কেন তিনি সরকারের বিশেষ দফতরে তাঁর সন্তানের পরিচিতি প্রদান করেন নি? তখন ইবরাহীম (আ.)-এর মা জেরাকারীর প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, আমি দেখতে পেলাম এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই আমার এ সন্তানের ভবিষ্যৎ কি হবে তা না জানা পর্যন্ত আমি তার ব্যাপারে কোন তথ্য প্রদান করি নি। যদি এ ব্যক্তি (ইবরাহীম) গণক ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের ভবিষ্যদ্বাণীতে বর্ণিত ঐ ব্যক্তিই হয়ে থাকে তাহলে আমি পুলিশকে তার ব্যাপারে অবশ্যই তথ্য প্রদান করতাম যাতে করে তারা অন্যদের রক্তপাত সংঘটিত করা থেকে বিরত থাকে। আর এ যদি ঐ ব্যক্তি না হয়ে থাকে তাহলে আমি এ দেশের এক ভবিষ্যৎ যুবপ্রজন্মকেই রক্ষা করেছি। ইবরাহীম (আ.)-এর মায়ের যুক্তি বিচারকদের দৃষ্টি সম্পূর্ণরূপে আকর্ষণ করেছিল।

এরপর ইবরাহীম (আ.)-কে জেরা করার পালা আসে। তিনি বললেন, বাহ্যিক অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে,এটি বড় প্রতিমারই কাজ। আর আপনারা ঘটনা সম্পর্কে তাকেই জিজ্ঞাসা করুন। যদি তাদের (প্রতিমাদের) বাকশক্তি থেকে থাকে! তেজোদ্দীপ্ত এ জবাব যা ব্যঙ্গ ও অবজ্ঞাপূর্ণ ছিল তা আসলে অন্য উদ্দেশ্যেই দেয়া হয়েছিল;আর তা হলো : ইবরাহীম (আ.) নিশ্চিত ছিলেন যে,তারা তাঁর জবাবে এটিই বলবে, ইবরাহীম! তুমি তো জান,এ সব প্রতিমার বাকশক্তি নেই।” তখন তিনি একটি মৌলিক বিষয়ের দিকে বিচারকমণ্ডলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবেন। ঘটনাক্রমে তিনি যা পূর্ব হতে উপলব্ধি করেছিলেন তা-ই হলো। তাদের এ কথা মূর্তিগুলোর দুর্বলতা,অপদস্থতা ও অসামর্থ্যরেই পরিচায়ক ছিল। ইবরাহীম (আ.) জবাবে বললেন, আসলেই যদি প্রতিমাগুলোর অবস্থা এমন হয় যা তোমরা বর্ণনা করেছ তাহলে কেন তোমরা তাদের উপাসনা করছ এবং তাদের কাছে নিজেদের মনস্কামনা প্রার্থনা করছ?!

অজ্ঞতা,গোঁড়ামি,অন্ধভক্তি ও অনুসরণ বিচারকদের মন-মানসিকতার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছিল এবং ইবরাহীম (আ.)-এর দাঁতভাঙ্গা জবাবে তারা একদম নিরুপায় হয়ে পড়ে;তাই তারা ইবরাহীম (আ.)-কে জীবন্ত দগ্ধ করে হত্যা করার পক্ষে রায় দিল। অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বলিত করা হলো এবং তাওহীদের অমিত বিক্রম পুরুষ ইবরাহীম (আ.)-কে অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে নিক্ষেপ করা হলো। কিন্তু ইবরাহীম (আ.)-এর প্রতি মহান আল্লাহ্ দয়া ও অনুগ্রহের হস্ত প্রসারিত করলেন এবং তাঁকে তাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন। মহান আল্লাহ্ মনুষ্য নির্মিত দোযখকে (অগ্নিকুণ্ডকে) চিরসবুজ পুষ্পোদ্যানে রূপান্তরিত করলেন।৮৯

এ কাহিনীর শিক্ষণীয় দিকসমূহ

যেহেতু ইয়াহুদিগণ নিজেদেরকে তাওহীদের অনুসারী বলে বিবেচনা করে তাই তাদের মধ্যে এ কাহিনীটি প্রসিদ্ধ এবং তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ তাওরাতে বিদ্যমান এবং ঐশী গ্রন্থসমূহের মধ্যে কেবল পবিত্র কোরআনই বর্ণনার দায়িত্ব নিয়েছে। এ কারণেই এ গল্পের কতিপয় শিক্ষণীয় দিক যা হচ্ছে পবিত্র কোরআন কর্তৃক নবীদের কাহিনী বর্ণনা করারই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা আমরা এখানে উল্লেখ করব :

১. এ কাহিনী হযরত ইবরাহীম খলীল (আ.)-এর অসাধারণ সাহস ও বীরত্বের শক্তিশালী দলিল। মূর্তি ভাঙা এবং শিরকের যাবতীয় নিদর্শন ও উপায়-উপকরণ ধ্বংস করার ব্যাপারে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সিদ্ধান্ত এমন কোন কিছু ছিল না যা নমরুদের অনুসারীদের কাছে গোপন থাকবে। কারণ তিনি মূর্তি ও প্রতিমাসমূহের নিন্দা ও কটূক্তি করে মূর্তিপূজার ব্যাপারে তাঁর পূর্ণ ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, তোমরা যদি এ গর্হিত কাজ থেকে বিরত না হও তাহলে আমি নিজেই এ সব মূর্তি ও প্রতিমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব।” যেদিন সবাই মরুভূমিতে গমন করেছিল সেদিন তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তোমাদের অনুপস্থিতিতে আমি এ সব মূর্তি ও প্রতিমার ব্যাপারে একটি চিন্তা-ভাবনা করব। ৯০

ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন, কয়েক সহস্রাধিক কাফির-মুশরিকের সংঘবদ্ধ দল ও চক্রের বিরুদ্ধে একজন তাওহীদবাদী ব্যক্তির আন্দোলন ও সংগ্রাম হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পূর্ণ সাহসিকতা ও দৃঢ়পদ থাকার জীবন্ত দলিল। তিনি তাওহীদের বাণী উন্নীতকরণ এবং এক উপাস্যের উপাসনার মূলনীতি ও ভিত্তিসমূহ দৃঢ় করার পথে যে কোন ধরনের ঘটনায় মোটেও ভীত হন নি। ৯১

২. হযরত ইবরাহীমের তীব্র আঘাতসমূহ : যদিও বাহ্যত এক ধরনের সশস্ত্র ও বৈরীসুলভ বিপ্লব ছিল,তবে বিচারকমণ্ডলীর সাথে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর কথোপকথন থেকে যেমন প্রতিভাত হয় তদনুযায়ী এ বিপ্লব ও আন্দোলনের প্রকৃত স্বরূপের কেবল প্রচার পর্যায়ই রয়েছে। কারণ তাঁর জনপদের অধিবাসীদের ঘুমন্ত বিবেক ও স্বভাব-প্রকৃতি জাগ্রত করার সর্বশেষ উপায় হিসাবে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে,তিনি যাবতীয় মূর্তি ধ্বংস করবেন,সবচেয়ে বড় বিগ্রহটিকে অক্ষত রাখবেন এবং তার কাঁধেই কুঠারটি ঝুলিয়ে রাখবেন যাতে করে এ জনগণ এ ধরনের বিষয়ের প্রকৃত উৎস ও কারণসমূহের ব্যাপারে আরো বেশি অনুসন্ধান ও গবেষণা করতে সচেষ্ট হয় এবং পরিশেষে যখন তারা এ কাজকে (মূর্তি ভাঙা) পূর্বপরিকল্পিত ঘটনার চেয়ে বেশি কিছু মনে করবে না এবং কখনই তারা বিশ্বাস করবে না যে,বড় মূর্তিটি এ সব আঘাত করতে পারে তখন হযরত ইবরাহীম (আ.) এ কাজটি থেকে সত্যধর্ম প্রচার কার্যক্রমের ফায়দা উঠাতে সক্ষম হবেন এবং বলতে পারবেন যে,তোমাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এ বড় মূর্তিটির সামান্য ক্ষমতাও নেই;তাহলে তোমরা কিভাবে এগুলোর উপাসনা করছ? ঘটনাচক্রে হযরত ইবরাহীম (আ.) এ সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন এবং তাঁর (হযরত ইবরাহীমের) কথাগুলো শোনার পর তাদের বিবেকবোধ জাগ্রত হলো এবং নিজেদেরকে তারা জালেম’বলে অভিহিত করেছিল। পবিত্র কোরআনে ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে :

) فرجعوا إلى أنفسهم فقالوا إنّكم أنتم الظّالمون( ...

“তারা নিজেদের বিবেকের দিকে প্রত্যাবর্তন করল (অর্থাৎ তাদের বিবেকবোধ জাগ্রত হলো)। অতঃপর তারা বলল : নিঃসন্দেহে তোমরাই তো জালেম। আর তারা লজ্জাবশত নিজেদের মাথা নিচে নামিয়ে বলল : তুমি তো জান,মূর্তিগুলোর বাকশক্তি নেই।” (সূরা আম্বিয়া : ৬৪)

আর এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে,শুরু থেকেই নবীদের সাফল্য ও বিজয়ের সোপান যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। তবে প্রতিটি যুগে তা ছিল সে যুগেরই উপযোগী। আর যদি তা না হয় তাহলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হযরত ইবরাহীম (আ.) প্রতিমাগুলো যে ভেঙ্গেছিলেন তারই বা কি মূল্য থাকে? অবশ্যই তাঁর এ কাজের মাধ্যমে একটি বিরাট খেদমত সম্পন্ন হয়েছে যার জন্য নিজ প্রাণ উৎসর্গ করা বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

৩. হযরত ইবরাহীম (আ.) বেশ ভালোভাবেই বুঝতেন যে,এ কাজ তাঁর জীবনকে বিপন্ন ও নিঃশেষ করে দেবে এবং স্বাভাবিকভাবে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন থাকবেন ও পালিয়ে যাবেন। অথবা তিনি অন্ততঃপক্ষে ঠাট্টা-মশকরা ও আজে-বাজে কথা বলায় লিপ্ত হবেন। কিন্তু এর বিপরীতে নিজ আত্মা,বিবেক-বুদ্ধি ও স্নায়ুর ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। যেমন যখন তিনি মন্দিরে প্রবেশ করছিলেন তখন তিনি বিদ্রূপাত্মক কণ্ঠে প্রতিমাগুলোর কাছে গিয়ে প্রতিটিকে রুটি খেতে আহবান জানিয়েছিলেন। এরপর তিনি মন্দিরকে ভাঙ্গা কাঠ ও লাকড়ির ছোট-খাটো একটি স্তূপ বা টিলায় পরিণত করলেন। তিনি এ কাজকে অত্যন্ত সাদামাটা ও স্বাভাবিক কাজ বলে গণ্য করেছিলেন যেন তাঁর এ কাজের ফলশ্রুতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে না। যখন হযরত ইবরাহীম (আ.) বিচারকমণ্ডলীর সম্মুখীন হলেন তখন তিনি এমন উত্তরই দিয়েছিলেন, এটি আমার কাজ নয়,বরং এ হচ্ছে সবচেয়ে বড় মূর্তিটিরই কাজ। আপনারা তো তার কাছ থেকেই প্রকৃত ঘটনা জেনে নিতে পারেন।” বিচারালয়ে এ ধরনের রসিকতাপূর্ণ উক্তি আসলে ঐ ব্যক্তিরই সাজে যে নিজেকে যে কোন ধরনের পরিস্থিতি ও অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত করেছে এবং (যে কোন পরিণতি বরণ করার জন্য) সে মোটেও ভীত ও শঙ্কিত হয় না।

এ সব কিছুর চেয়ে আশ্চর্যজনক হচ্ছে ইবরাহীম (আ.)-এর অবস্থা পর্যালোচনা করা ঐ মুহূর্তে যখন তাঁকে মিনজানিকের ওপর স্থাপন করা হয়েছিল এবং তখন তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে,আর কয়েক মিনিট পরেই তাঁকে ঐ আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে যার জ্বালানি কাষ্ঠ দেবতাদের সাহায্যার্থে এবং একটি পবিত্র ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করার জন্য ব্যাবিলনের অধিবাসীরা পূর্ব হতে একত্র ও স্তূপীকৃত করেছিল। আর আগুনের লেলিহান শিখাগুলো এতটা লকলকিয়ে উঠছিল যে,তার ওপর উড্ডয়নের ক্ষমতা শকুনেরও ছিল না। ঠিক ঐ মুহূর্তে ওহীর ফেরেশতা হযরত জিবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হলেন এবং যে কোন সাহায্য করার ব্যাপারে যে তিনি প্রস্তুত এ কথা হযরত ইবরাহীমকে জানালেন এবং বললেন, আপনার যদি কোন বক্তব্য থেকে থাকে তাহলে তা বলুন।” হযরত ইবরাহীম (আ.) বললেন, আমার আর্জি আছে,তবে তা আপনার কাছে নয়,বরং তা মহান আল্লাহর কাছেই বলব।” ঐ কঠিন পরিস্থিতিতে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর এ উত্তর তাঁর আত্মা ও চিত্তের মহত্ত্বকে সম্পূর্ণরূপে পরিস্ফুটিত করে।

বাদশাহ্ নমরুদের প্রাসাদ যে স্থানে অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বলিত করা হয়েছিল সেখান থেকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। বাদশাহ্ নমরুদ তার সেই প্রাসাদে বসে খুব সূক্ষ্মভাবে এবং অধীর আগ্রহে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতীক্ষা করছিল। আর সে মনে-প্রাণে দেখতে চাচ্ছিল যে,আগুনের লেলিহান শিখাগুলো কিভাবে ইবরাহীমকে দগ্ধ ও ভস্মীভূত করে ফেলছে। মিনজানিক সচল করা হলো। এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনির পরপরই তাওহীদের অমিত বিক্রম বীর পুরুষের দেহ প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হলো। কিন্তু মহান আল্লাহর অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছাশক্তি ঐ কৃত্রিম (মানবনির্মিত) দোযখকে পুষ্পোদ্যানে রূপান্তরিত করল। এ দৃশ্য দেখে সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেল। এমনকি বাদশাহ্ নমরুদ পর্যন্ত অনিচ্ছাকৃতভাবে আযরের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেই ফেলল, ইবরাহীম তার নিজ প্রভুর কাছেও দেখছি সম্মানিত।”

কার্যকারণের স্রষ্টা এবং কার্যকারণের অস্তিত্ব বিলোপকারী মহান আল্লাহরই নির্দেশে অগ্নিকুণ্ডটি হযরত ইবরাহীমের জন্য পুষ্পোদ্যানে পরিণত হয়েছিল। যেহেতু মহান আল্লাহ্ই আগুনকে দহন করার ক্ষমতা,সূর্যকে আলোকোজ্জ্বল্য এবং চন্দ্রকে স্নিগ্ধতা দান করেছেন সেহেতু তিনি এ সব পদার্থ ও বস্তুর এ সব গুণ ও ক্ষমতা কেড়ে নিতে সক্ষম। আর এ কারণেই মহান আল্লাহকে কার্যকারণের স্রষ্টা এবং ঐ একই কার্যকারণের অস্তিত্বলোপকারী বলে অভিহিত করা যায়।

পুনশ্চ এ সব ঘটনাপ্রবাহ দীন প্রচারের ক্ষেত্রে হযরত ইবরাহীমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে পারে নি। অবশেষে নমরুদ-সরকার পরামর্শ করার পর হযরত ইবরাহীমকে দেশ থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিল। আর এভাবে শাম (সিরিয়া),ফিলিস্তিন,মিশর ও হিজাযের পবিত্র ভূমির দিকে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর হিজরতের পটভূমি তৈরি হয়ে গেল।

আরব জাতির মাঝে নারীর সামাজিক অবস্থান

আরব সমাজে নারীদেরকে পণ্যের মতো কেনা-বেচা করা হতো। তারা সব ধরনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকার,এমনকি উত্তরাধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল। আরব বুদ্ধিজীবীরা নারীদেরকে পশু বলে মনে করত। আর এ কারণেই তাদেরকে দৈনন্দিন জীবনের পণ্য-সামগ্রী ও আসবাবপত্রের মধ্যে গণ্য করা হতো। এ ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েইو إنّما أمّهات النّاس أوعية মায়েরা ঘটি-বাটি ও থালা-বাসনের মতো’-এ প্রবাদ বাক্যটি আরবদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল।

প্রধানত দুর্ভিক্ষের ভয়ে এবং কখনো কখনো কলুষতা ও অশূচিতার ভয়ে আরবরা মেয়েদেরকে জন্মগ্রহণের পর পরই হত্যা করে ফেলত। কখনো পাহাড়ের ওপরে তুলে সেখান থেকে নিচে ফেলে দিত এবং কখনো কখনো পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করত। আমাদের মহান ঐশী গ্রন্থ যা অমুসলিম প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিতে ন্যূনপক্ষে একটি অবিকৃত ঐতিহাসিক তাত্ত্বিক গ্রন্থ যা এতৎসংক্রান্ত একটি অভিনব কাহিনী বর্ণনা করেছে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে : যখন তাদের কোন এক ব্যক্তিকে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণের সুসংবাদ দেয়া হতো তখন তার বর্ণ কালো হয়ে যেত এবং বাহ্যত সে যেন তার ক্রোধকে চাপা দিত। আর এই জঘন্য সংবাদ শোনার কারণে সে (লজ্জায়) তার সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াত। আর সে জানত না যে,সে কি অপমান ও লাঞ্ছনা সহকারে তার এ নবজাতক কন্যাসন্তান প্রতিপালন করবে,নাকি তাকে মাটির নিচে জীবন্ত পুঁতে ফেলবে? সত্যিই তাদের ফয়সালা কতই না জঘন্য! 27

সবচেয়ে দুঃখজনক ছিল আরবদের বৈবাহিক ব্যবস্থা। পৃথিবীতে এর কোন নজির বিদ্যমান নেই। যেমন আরবদের কাছে স্ত্রীর কোন সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। স্ত্রীর মোহরানা যাতে আদায় করতে না হয় সেজন্য তারা স্ত্রীদেরকে নির্যাতন ও উৎপীড়ন করত। কোন মহিলা চারিত্রিক সততার পরিপন্থী কোন কাজ করলেই তার মোহরানা সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যেত। কখনো কখনো আরবরা এনিয়মের অপব্যবহার করত। মোহরানা যাতে আদায় করতে না হয় সেজন্য তারা নিজেদের স্ত্রীদের ওপর অপবাদ আরোপ করত। পুত্রসন্তানগণ পিতার মৃত্যুর পর বা পিতা তালাক দিলে পিতার স্ত্রীদেরকে নিজের স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে পারত এবং এতে কোন অসুবিধা ছিল না। যখন মহিলা তার স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্তা হতো তখন প্রাক্তন তথা প্রথম স্বামীর অনুমতির ওপর তার পুনর্বিবাহ নির্ভর করত। আর কেবল অর্থ প্রদানের মাধ্যমেই প্রথম স্বামীর অনুমতি পাওয়া যেত। উত্তরাধিকারিগণ ঘরের আসবাবপত্রের মতো উত্তরাধিকারসূত্রে মহিলাদের ( পিতার স্ত্রীদের ) মালিক হতো এবং তাদের মাথার ওপর রোসারী ( Scarf) নিক্ষেপ করে উত্তরাধিকারিগণ তাদের নিজ নিজ স্বত্বাধিকার ঘোষণা করত।

ছোট একটি তুলনা

সম্মানিত পাঠকবর্গ যদি ইসলামে নারীর অধিকার লক্ষ্য করেন তাহলে তাঁরা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন যে,নারীর অধিকার সংক্রান্ত এত সব বিধান প্রবর্তন এবং এগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত উদ্যোগ যা মহানবী (সা.) কর্তৃক গৃহীত হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে,মহানবী (সা.) সত্যনবী এবং ঐশী জগতের সাথে তাঁর যোগসূত্র ছিল। কারণ পবিত্র কোরআনের বহু আয়াত এবং মহানবী (সা.)-এর অগণিত হাদীসে নারীর অধিকারসমূহের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং তিনিও তাঁর অনুসারীদেরকে নারীদের প্রতি সদাচরণ ও দয়া প্রদর্শন করার আহবান জানিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বিদায় হজ্বের ভাষণে নারীদের ব্যাপারে পুরুষদেরকে নিম্নোক্ত যে উপদেশ দিয়েছেন তার চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে? তিনি বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছেন,

أيّها النّاس فإنّ لكم على نسائكم حقّا و لهنّ عليكم حقّا و استوصوا بالنّساء خيرا فإنّهنّ عندكم عوان... أطعموهنّ ممّا تأكلون و ألبسوهنّ ممّا تلبسون

“হে লোকসকল! নারীদের ওপর যেমন তোমাদেরকে অধিকার দেয়া হয়েছে,ঠিক তদ্রূপ তোমাদের ওপরও তাদের অধিকার রয়েছে। তাদের ব্যাপারে তোমরা একে অপরের প্রতি সদাচরণ করার আদেশ দেবে। কারণ তারা (নারীরা) তোমাদের কাজকর্মে তোমাদের সাহায্যকারী। ...তোমরা যা খাবে তাদেরকে তা খেতে দেবে। আর তোমরা যা পরিধান করবে তাদেরকেও তা-ই পরিধান করতে দেবে।”28

আরবদের সাহস ও বীরত্ব

বলা যেতে পারে যে,মানসিকভাবে জাহেলিয়াত যুগের আরবগণ লোভী মানুষের পূর্ণাঙ্গ উপমা ছিল। পার্থিব বস্তুসামগ্রীর প্রতি ছিল তাদের দুর্বার আকর্ষণ। তারা প্রতিটি বস্তু বা বিষয়কেই তার অন্তর্নিহিত লাভ ও উপকারের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করত (অর্থাৎ যে জিনিসে যত বেশি লাভ ও উপকার পাওয়া যেত সেটিই তাদের কাছে প্রিয় ও কাম্য হতো)। তারা সর্বদা অন্যদের চেয়ে নিজেদের এক ধরনের উচ্চমর্যাদা,সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব আছে বলে বিশ্বাস করত। তারা সীমাহীনভাবে স্বাধীন থাকতে ভালবাসত। তাই যে সব বিষয় তাদের স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিত তা তারা মোটেও পছন্দ করত না।29

ইবনে খালদুন আরবদের অবস্থা প্রসঙ্গে বলেছেন, স্বভাবপ্রকৃতির দিক থেকে এ জাতিটি অসভ্য,বর্বর এবং লুটতরাজপ্রিয় ছিল। তাদের মধ্যে অসভ্যতা ও বর্বরতার কারণগুলো এতটা গভীরে প্রোথিত ছিল যে সেগুলো যেন তাদের স্বভাব-চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। তারা তাদের এ ধরনের অসভ্য স্বভাব-চরিত্রকে বেশ মজা করে উপভোগ করত। কারণ তাদের এই চারিত্রিক বর্বরতা ও অসভ্যতার কারণেই তারা কোন শাসকের শাসন বা আইন-কানুনের আনুগত্য ও সকল ধরনের বাধ্যতামূলক বন্ধন থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারত এবং রাজ্যশাসন নীতির বিরুদ্ধাচরণ করত। আর এটি স্পষ্ট প্রমাণিত যে,এ ধরনের স্বভাব-চরিত্র সভ্যতা ও কৃষ্টির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।...

এরপর তিনি আরো বলেছেন, তাদের স্বভাবে ছিল লুণ্ঠন ও দস্যুবৃত্তি। তারা অন্যদের কাছে যা পেত তা ছিনিয়ে নিত। বর্শা ও তরবারির মাধ্যমেই তাদের জীবিকা নির্বাহ হতো। অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করার ক্ষেত্রে তারা কোন সীমারেখার ধার ধারত না,বরং যে কোন সম্পদ ও জীবনযাপনের উপকরণের ওপর দৃষ্টি পড়লেই তারা তা লুণ্ঠন করত।”30

আসলে লুটতরাজ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ আরবদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। কথিত আছে,মহানবী (সা.)-এর কণ্ঠে বেহেশতের সুখ-শান্তির কথা শোনার পর এক আরব বেহেশতে যুদ্ধ-বিগ্রহের অস্তিত্ব আছে কিনা এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিল। যখন তাকে এর উত্তরে বলা হলো : না সেখানে যুদ্ধ-বিগ্রহের কোন অস্তিত্ব নেই,তখন সে বলেছিল, তাহলে বেহেশত থাকলেই বা লাভ কি? আরব জাতির ইতিহাসে 1700-এর বেশি যুদ্ধের কাহিনী লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কোন কোন যুদ্ধ 100 বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে চলেছে। অর্থাৎ কয়েকটি প্রজন্ম পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ করেই কালাতিপাত করেছে। কখনো কখনো অত্যন্ত তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ,রক্তপাত ও হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে।31 ইসলামপূর্ব আরব জাতির অন্যতম ঘটনা হচ্ছে একটি দীর্ঘ যুদ্ধ যা ইতিহাসে হারবু দাহিস ওয়া গাবরা’নামে প্রসিদ্ধ। দাহিস ও গাবরা দু গোত্রপতির দু টি ঘোড়ার নাম ছিল। দাহিস বনি আবেস গোত্রের প্রধান কাইস বিন যুহাইরের ঘোড়ার নাম এবং গাবরা ছিল বনি ফিরাযাহ্ গোত্রপতি হুযাইফার ঘোড়ার নাম। উক্ত গোত্রপতিদ্বয়ের প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ ঘোড়াকে অন্যের ঘোড়া অপেক্ষা অধিকতর দ্রুতগতিসম্পন্ন বলে মনে করত। অবশেষে তাদের মধ্যে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়;কিন্তু প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর প্রত্যেকেই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার দাবি করল। এই ত্চ্ছু বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো। নিহতের গোত্রও হত্যাকারী গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করল। কিন্তু ঘটনাটি এখানেই শেষ হলো না,বরং এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দু বৃহৎ গোত্রের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা  হলো যা 568 খ্রিষ্টাব্দ থেকে 608 খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চলতে থাকে এবং এর ফলে উভয় পক্ষের অগণিত লোক নিহত হয়।32

জাহেলী যুগের আরবরা বিশ্বাস করত যে,রক্ত ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে রক্তকে ধুয়ে সাফ করা যায় না। শানফারা-এর ঘটনা যা একটি উপাখ্যানসদৃশ তা জাহেলী গোত্রপ্রীতির মাত্রার নির্দেশক হতে পারে। সে (শানফারাহ্) বনি সালমান গোত্রের এক ব্যক্তির হাতে লাঞ্ছিত হলে এর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উক্ত গোত্রের 100 জনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অবশেষে দীর্ঘকাল দিগ্বিদিক ঘোরাঘুরি ও চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে অপমানকারী গোত্রের 99 জনকে হত্যা করে। এরপর একদল দস্যু একটি কূপের কাছে তাকেও হত্যা করে। বহু বছর পর নিহত শানফারা-এর হাড় ও মাথার খুলি অপমানকারী গোত্রের শততম ব্যক্তির হত্যার কারণে পর্যবসিত হয়। কাহিনীটি এরূপ : বনি সালমান গোত্রের এক পথিক সেখান দিয়ে অতিক্রম করছিল। হঠাৎ মরুঝড় মাথার খুলি উড়িয়ে এনে ঐ পথিকটির পায়ে কঠিনভাবে আঘাত করে। ফলে সে পায়ের তীব্র ব্যথায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়।33

আরব বেদুইনরা রক্তপাত,খুন-খারাবি,লুটতরাজ ও দস্যুবৃত্তিতে এতটা অভ্যস্ত ছিল যে,পরস্পর গর্ব-অহংকার করার সময় তারা অন্যদের ধন-সম্পদ লুণ্ঠনকে তাদের অন্যতম গর্ব ও অহংকারের বিষয় বলে গণ্য করত। এক জাহেলী আরব কবি লুটতরাজ করার ক্ষেত্রে নিজ গোত্রের অপারগতা দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে আকাঙ্ক্ষা করেছিল :

“হায় যদি সে এ গোত্রের না হয়ে অন্য কোন গোত্রের হতো যারা অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করে লুটতরাজ করত।”34

এ জাতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এ রকম বলা হয়েছে :

) و كنتم على شفا حفرة من النّار فأنقذكم منها(

“আর তোমরা,হে আরব জাতি! অগ্নিকুণ্ডের ধারে ছিলে। মহান আল্লাহ্ তোমাদেরকে তা থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন।”35

জাহেলিয়াত যুগের আরবদের সাধারণ চরিত্র

যা হোক অজ্ঞতা,মূর্খতা,সংকীর্ণ জীবনযাত্রা,জীবনযাপনের সঠিক পদ্ধতি ও ব্যবস্থা না থাকা,হিংস্রতা,পাশবিকতা,অলসতা,বেহাল অবস্থা এবং আরো অন্যান্য চারিত্রিক দোষ-ত্রুটির ন্যায় বিভিন্ন ধরনের প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান আরব উপদ্বীপের সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রেখেছিল এবং ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে লজ্জাজনক বিষয়াদি স্বাভাবিক ও বৈধ হয়ে যায়।

লুণ্ঠন,দস্যুবৃত্তি,জুয়া,সুদ ও মানুষকে বন্দী করা জাহেলী আরবীয় জীবনে বহুল প্রচলিত নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। তাদের আরেকটি জঘন্য কুঅভ্যাস ছিল মদ্যপান। এ ঘৃণ্য অভ্যাসটি জাহেলী আরব সমাজে এতটা বিস্তৃতি লাভ করেছিল যে,তা তাদের ভাগ্য ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। আরবের কবিরা মদের গুণ এবং মদ্যপান বর্ণনায় তাদের অধিকাংশ কাব্যপ্রতিভা ব্যবহার করত। পানশালা রাতদিন 24 ঘণ্টাই উন্মুক্ত থাকত। এগুলোর ছাদের ওপর বিশেষ ধরনের পতাকা উড়ত। ইসলামপূর্ব আরব সমাজে মদের কেনা-বেচার ব্যাপক প্রচলনের কারণে তাদের কাছে ব্যবসা-বাণিজ্য মদ বিক্রির সমার্থক ছিল।

আরবগণ চারিত্রিক নীতিমালাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করত। যেমন মহানুভবতা,সাহস ও তীব্র আত্মসম্ভ্রমবোধ আরবদের কাছে প্রশংসনীয় ছিল। তবে তাদের দৃষ্টিতে সাহসের অর্থ ছিল যুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাত ঘটানো। আত্মসম্ভ্রমবোধ তাদের দৃষ্টিতে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হতো যার ফলে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবরস্থ করা তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আত্মসম্ভ্রমবোধ বলে গণ্য হতো। আরবদের দৃষ্টিতে বিশ্বস্ততা ও সংহতি ছিল নিজ গোত্র ও চুক্তিবদ্ধ মিত্র গোত্রগুলোকে সমর্থন করা-তা সত্যই হোক,আর অন্যায়ই হোক।36 তারা মদ,নারী ও যুদ্ধের প্রতি তীব্রভাবে আসক্ত ছিল।

জাহেলিয়াত যুগের আরবগণ কুসংস্কার পূজারী ছিল

পবিত্র কোরআনে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত ও রিসালাতের পবিত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ নাতিদীর্ঘ বাক্যসমূহের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে (যদিও বাক্যগুলো ছোট,কিন্তু গভীর অর্থ ও তাৎপর্যমণ্ডিত)। ঐ সকল আয়াত যা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য তন্মধ্যে এ আয়াতটি এখানে উল্লেখ করা হলো :

) و يضع عنهم إصرهم و الأغلال الّتى كانت عليهم(

“তিনি (মহানবী) তাদের থেকে তাদের বোঝা এবং শিকল ও বেড়ী থেকে মুক্ত করেন যা তাদের ওপর (বাঁধা) রয়েছে।” (সূরা আরাফ : 157)

এখানে অবশ্যই দেখতে হবে যে,যে শিকল ও বেড়ীতে ইসলাম ধর্মের শুভ সূচনালগ্নে জাহেলিয়াতের যুগের আরব জাতির হাত ও পা বাঁধা ছিল তা কি? নিঃসন্দেহে এই শিকল ও বেড়ী লৌহ নির্মিত ছিল না,বরং এ সব শিকল ও বেড়ী বলতে কুসংস্কার,অলীক কল্পনা এবং ধ্যান-ধারণাকে বোঝানো হয়েছে যা মানুষের চিন্তাশক্তি ও বিবেকবুদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। এ ধরনের বাঁধন যদি মানুষের চিন্তাশক্তির পাখার সাথে বেঁধে দেয়া হয় তাহলে তা লোহার বেড়ী ও শিকল হতে বেশি ক্ষতিকর হবে। কারণ লৌহনির্মিত শিকল কিছুদিন অতিবাহিত হলে বন্দীর হাত ও পা থেকে খুলে নেয়া হয়। আর জেলে বন্দী ব্যক্তিটি সুস্থ চিন্তাধারাসহকারে এবং কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে বাস্তব জীবনে প্রত্যাবর্তন করে। কিন্তু অমূলক চিন্তা,ধারণা এবং ভ্রান্ত কল্পনার শিকলে যদি মানুষের বিবেক-বুদ্ধি,আবেগ-অনুভূতি এবং অনুধাবন শক্তি বাঁধা হয়ে যায় তাহলে তা আমৃত্যু তার সাথে থেকেই যেতে পারে এবং তাকে যে কোন ধরনের তৎপরতা ও প্রচেষ্টা,এমনকি তা এ ধরনের বাঁধন খোলার জন্যও যদি হয়ে থাকে তা থেকে তাকে বিরত রাখে। মানুষ সুস্থ চিন্তাধারা এবং বিবেক ও জ্ঞানের ছত্রছায়ায় যে কোন ধরনের কঠিন বাঁধন ও শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে সক্ষম। তবে সুস্থ চিন্তাধারা ছাড়া এবং সব ধরনের অলীক ও ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত না হলে মানুষের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও কর্মতৎপরতা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্যতম গৌরব ও কৃতিত্ব হচ্ছে,তিনি সকল প্রকার কুসংস্কার,অমূলক চিন্তাভাবনা ও অলীক কল্প-কাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তিনি মানব জাতির বিবেক-বুদ্ধিকে কুসংস্কারের মরিচা ও ধুলোবালি থেকে ধৌত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষের চিন্তাশৈলীকে শক্তিশালী করতে এবং সব ধরনের কুসংস্কার,এমনকি যে কুসংস্কার আমার লক্ষ্য অর্জনের পথে সহায়ক সেটিরও বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেই আমি এসেছি।”

বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ,জনগণের ওপর শাসনকর্তৃত্ব চালানো ছাড়া যাদের আর কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে নেই তারা সব সময় যে কোন অবস্থা ও পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে;এমনকি প্রাচীন কল্পকাহিনী এবং জাতির কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস যদি নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হয় তাহলে তারা তা প্রসার ও প্রচার করতে দ্বিধাবোধ করে না। আর তারা যদি চিন্তাশীল ও যুক্তিবাদীও হয় তাহলেও তারা সাধারণ জনতার ধ্যান-ধারণা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের আকীদা-বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নামে বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী ঐ সকল অমূলক কল্প-কাহিনী ও ধ্যান-ধারণাকে সমর্থন করতে থাকে।

তবে মহানবী (সা.) যে সব কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস তাঁর ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর কেবল সেগুলোর বিরুদ্ধেই সংগ্রাম করেন নি,বরং যে কোন ধরনের আঞ্চলিক কল্প-কাহিনী ও উপাখ্যান অথবা ভিত্তিহীন চিন্তা ও বিশ্বাস যা তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সহায়ক সেটির বিরুদ্ধেও তাঁর সকল শক্তি ও ক্ষমতা নিয়োগ করে সংগ্রাম করেছেন। তিনি সব সময় চেষ্টা করেছেন মানুষ যেন সত্যপূজারী হয়। ভিত্তিহীন কল্প-কাহিনী,উপাখ্যান ও কুসংস্কারের পূজারীতে যেন পরিণত না হয়। এখন উদাহরণস্বরূপ নিম্নোক্ত কাহিনীটি মনোযোগ সহকারে পাঠ করুন :

মহানবী (সা.)-এর এক পুত্রসন্তান মারা গেলেন যাঁর নাম ছিল ইবরাহীম। তিনি পুত্রবিয়োগে শোকাহত ও দুঃখভারাক্রান্ত ছিলেন এবং তাঁর পবিত্র নয়নযুগল থেকে অশ্রু ঝরছিল। ইবরাহীমের মৃত্যুর দিনে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। আরবের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অলীক কল্প-কাহিনীর পূজারী জাতি সূর্যগ্রহণকে মহানবী (সা.)-এর ওপর আপতিত বিপদের চরম ও বিরাট হওয়ার প্রমাণ বলে মনে করল এবং বলতে লাগল : মহানবী (সা.)-এর পুত্রের মৃত্যুতে সূর্যগ্রহণ হয়েছে। মহানবী (সা.) তাদের এ কথা শুনে বললেন, চন্দ্র ও সূর্য মহান আল্লাহর অসীম শক্তি ও ক্ষমতার দু টি বড় নিদর্শন এবং তারা সর্বদা আদেশ পালনকারী। কারো জীবন ও মৃত্যু উপলক্ষে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হয় না। যখনই চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ হবে তখন তোমরা সবাই নিদর্শনসমূহের নামায আদায় করবে।” এ কথা বলে তিনি মিম্বার থেকে নিচে নেমে আসলেন এবং উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে আয়াতের নামায পড়লেন।37

মহানবী (সা.)-এর পুত্রের মৃত্যুতে সূর্যগ্রহণ হয়েছে চিন্তা করা যদিও মহানবী (সা.)-এর প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করত এবং পরিণতিতে তাঁর ধর্মের অগ্রগতি ও প্রসারের ক্ষেত্রে সহায়কও হতো,কিন্তু তিনি চান নি এবং সন্তুষ্ট হতে পারেন নি যে,অলীক কল্প-কাহিনীর দ্বারা জনগণের অন্তরে তাঁর স্থান দৃঢ় ও শক্তিশালী হোক। অলীক কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম যার জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত হচ্ছে মূর্তিপূজা এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন সত্তার উপাস্য হওয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তা কেবল তাঁর রিসালাতের পদ্ধতি ছিল না,বরং তিনি তাঁর জীবনের সব ক টি পর্বেই,এমনকি তাঁর শৈশবকালেও কুসংস্কার ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।

যে সময় মহানবী (সা.)-এর বয়স ছিল চার বছর এবং মরুভূমিতে দুধ মা হালিমার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হচ্ছিলেন তখন তিনি তাঁর দুধ মা হালিমার কাছে তাঁর দু ভাইয়ের সাথে মরুভূমিতে যাওয়ার ব্যাপারে অনুরোধ করেছিলেন। হালিমা এ ব্যাপার বলেন, পরের দিন মুহাম্মদকে গোসল দিলাম। তার চুলে তেল ও চোখে সুরমা দিলাম। যাতে করে মরুর শয়তানগুলো তার অনিষ্ট সাধন করতে না পারে সেজন্য একটি ইয়েমেনী পাথর সুতায় ভরে তাকে রক্ষা করার জন্য তার গলায় পরিয়ে দিলাম।” মহানবী (সা.) ঐ পাথরটি গলা থেকে খুলে এনে দুধ মা হালিমাকে বললেন,مهلا يا إمّاه، فإنّ معي من يحفظني মা,শান্ত হোন,আমার আল্লাহ্ সর্বদা আমার সাথে আছেন। তিনি আমার রক্ষাকারী।”38


6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53

54

55

56

57

58

59

60

61