চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড3%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 242 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 106700 / ডাউনলোড: 9685
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর হিজরত

ব্যাবিলনের বিচারালয় হযরত ইবরাহীমকে বহিষ্কার করার পক্ষে রায় দিল। আর তিনিও বাধ্য হয়ে নিজ জন্মভূমি ত্যাগ করে ফিলিস্তিন ও মিশরের দিকে যাত্রা করলেন। সেখানে ফিলিস্তিনের শাসকবর্গ আমালিকগণ তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। তারা তাঁকে প্রভূত উপঢৌকন প্রদান করে। তাদের প্রদত্ত উপঢৌকনসমূহের মধ্যে হাজার (হাজেরা) নাম্নী এক দাসীও ছিল।

হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর স্ত্রী সারাহ্ ঐ সময় পর্যন্ত মা হন নি (অর্থাৎ ইবরাহীম ও সারাহ্ দম্পতি তখনও নিঃসন্তান ছিলেন)। এ ঘটনা প্রাণপ্রিয় স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও আবেগকে আরো বৃদ্ধি করল। তিনি (হযরত সারাহ্) দাসী হাজারের (হাজেরার) সাথে সহবাস করার জন্য ইবরাহীম (আ.)-কে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন এতদুদ্দেশ্যে যে,নিঃসন্তান ইবরাহীম (আ.) সম্ভবত হাজেরার মাধ্যমে সন্তানের জনক হতে পারেন। আর এর ফলে তাঁদের জীবন সন্তানের দ্বারা আলোকিত হয়ে যাবে। বিবাহ অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হলো। হযরত হাজেরা কিছুদিন পরে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলেন যাঁর নাম ইসমাঈল’রাখা হলো। এর অল্প দিন পরেই হযরত সারাহ্ও মহান আল্লাহর অপার কৃপা ও করুণায় গর্ভধারণ করলেন। মহান আল্লাহ্ তাঁকে একটি পুত্রসন্তান দিলেন হযরত ইবরাহীম (আ.) যাঁর নাম ইসহাক রেখেছিলেন।৯২

কিছুকাল পরে হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসমাঈল (আ.)-কে তাঁর মাতাসহ দক্ষিণে অর্থাৎ পবিত্র মক্কার অখ্যাত এক উপত্যকায় আবাসন দেয়ার আদেশপ্রাপ্ত হলেন। এ উপত্যকায় কোন মনুষ্য বসতি ছিল না। শাম থেকে ইয়েমেন এবং ইয়েমেন থেকে শামে যে সব কাফেলা যাতায়াত করত কেবল তারাই উক্ত উপত্যকায় (বিশ্রামের জন্য) সাময়িকভাবে তাঁবু স্থাপন করত। এছাড়া বছরের বাকী সময় এ উপত্যকা আরব উপদ্বীপের অন্য সকল অঞ্চলের মতোই মানবশূন্য উত্তপ্ত মরুপ্রান্তর হিসাবেই পড়ে থাকত।

এ ধরনের ভীতিপ্রদ অঞ্চলে বসবাস আমালিকদের দেশে বসবাসরত একজন নারীর জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও অসহনীয় ব্যাপার ছিল।

মরুভূমির দগ্ধকারী উত্তাপ ও এর উষ্ণ বাতাস তাঁর চোখের সামনে যেন মৃত্যুর ভয়ঙ্কর ছায়ামূর্তিকে উপস্থাপন করেছিল। এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে বিধায় আর ইবরাহীম (আ.) নিজেও চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি সওয়ারী পশুর লাগাম ধরে অশ্রুসজল নয়নে স্ত্রী ও পুত্রকে বিদায় জানানোর সময় হযরত হাজেরাকে বললেন, হে হাজেরা! এ সব কিছু মহান আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী করা হয়েছে। আর তাঁর আদেশ পালন করা থেকে পালিয়ে বেড়াবার কোন পথ নেই। মহান আল্লাহর দয়া ও কৃপার ওপর নির্ভর কর। আর নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস কর যে,তিনি আমাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করবেন না।” এরপর তিনি মহান আল্লাহর কাছে একাগ্রতা সহকারে প্রার্থনা করে বললেন :

) ربِّ اجعل هذا بلداً آمناً و ارْزُقْ أهْله مِنَ الثّمرات مَنْ آمنَ منهم باللهِ و اليومِ الآخرِ(

“হে প্রভু! এ স্থানকে নিরাপদ শহর ও জনপদে পরিণত কর। এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা মহান আল্লাহ্ ও শেষ বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের ফল ও খাদ্য রিযিক হিসাবে প্রদান কর।” (সূরা বাকারা : ১২৬)

আর যখন তিনি টিলা বেয়ে নিচে নামছিলেন তখন তিনি পেছনের দিকে তাকিয়ে তাঁদের জন্য মহান আল্লাহর দয়া,কৃপা ও অনুগ্রহ প্রার্থনা করলেন।

এ হিজরত ও ভ্রমণ বাহ্যত অত্যন্ত কষ্টকর হলেও পরবর্তীতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে,তা সুমহান ফলাফল ও পরিণতি বয়ে এনেছিল। কারণ কাবাগৃহ নির্মাণ,তাওহীদে বিশ্বাসীদের জন্য সুমহান ও সুবৃহৎ ঘাঁটির গোড়াপত্তন,অত্র এলাকায় তাওহীদের ঝাণ্ডা উত্তোলন এবং এক গভীর ধর্মীয় আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন-যা এতদঞ্চলে সর্বশেষ নবী কর্তৃক বাস্তবায়িত হবে-আসলে এগুলোই হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর এ সুমহান হিজরতের মহাপরিণতি বা ফলাফল বলে গণ্য।

যমযম কূপ আবিষ্কার

হযরত ইবরাহীম (আ.) সওয়ারী পশুর লাগাম হাতে ধরে অশ্রুসজল নেত্রে পবিত্র মক্কায় বিবি হাজেরা এবং নিজ সন্তান ইসমাঈলকে ত্যাগ করে রওয়ানা হলেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের খাদ্য ও পানি ফুরিয়ে গেল এবং হাজেরার স্তন্য শুকিয়ে গেল। সন্তান ইসমাঈলের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে গেল। মা হযরত হাজেরার দু চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং সাফা পাহাড়ের পাথরগুলোর কাছে উপস্থিত হলেন। মারওয়া পাহাড়ের কাছে যে মরীচিকা ছিল তা দূর থেকে তাঁর দৃষ্টিগোচর হলে তিনি দৌড়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছলেন। তবে প্রহেলিকাময় প্রাকৃতিক এ দৃশ্যের তিক্ততা তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক হয়েছিল। তাঁর শিশুসন্তানের অনবরত গগনবিদারী ক্রন্দনধ্বনি এবং সঙ্গীন অবস্থা তাঁকে সবচেয়ে বেশি কিংকর্তব্যবিমূঢ় করেছিল। আর এর ফলে তিনি (পানির খোঁজে) যত্রতত্র ছুটাছুটি করতে লাগলেন। তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে পানির আশায় সাত বার আসা-যাওয়া করলেন। কিন্তু অবশেষে নিরাশ হয়ে সন্তানের কাছে ফিরে আসলেন।

দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাঈলের শ্বাস-প্রশ্বাসগুলো গোনা যাচ্ছিল (ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তাঁর প্রাণ এতটা ওষ্ঠাগত হয়েছিল যে,তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত ধীর ও টানা-টানা হয়ে গিয়েছিল এবং তা গণনা করা যাচ্ছিল)। এর ফলে তাঁর ক্রন্দন ও চিৎকার করার শক্তিও যেন রহিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর প্রার্থনা কবুল হলো। ক্লান্তশ্রান্ত মা দেখতে পেলেন ইসমাঈলের পায়ের তলদেশ থেকে স্বচ্ছ পানি বের হচ্ছে। যে মা সন্তানের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো প্রত্যক্ষ করছিলেন এবং নিশ্চিত ছিলেন যে,আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর সন্তানের প্রাণপাখি দেহ থেকে বের হয়ে যাবে,তিনি এ পানি দেখে এতটা আনন্দিত হলেন যে যার কোন সীমা ছিল না এবং তাঁর চোখে জীবনের আলো ও দ্যুতি চমকাচ্ছিল। ঐ স্বচ্ছ পানি পান করে তিনি নিজে ও তাঁর সন্তানের তৃষ্ণা মেটালেন। হতাশা ও নিরাশার কালো মেঘ যা তাঁদের জীবনের আকাশে ছায়া বিস্তার করেছিল তা মহান আল্লাহর দয়ার মৃদুমন্দ সমীরণের দ্বারা দূরীভূত হয়ে গেল।৯৩

এ ঝরনাটি সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত যমযম ঝরনা’নামে পরিচিত। এ ঝরনাটির উদ্ভব হওয়ার কারণে সেটির ওপর পাখির আনাগোনা শুরু হয়। জুরহুম গোত্র যারা উক্ত উপত্যকা থেকে দূরবর্তী এক অঞ্চলে বসবাস করত তারা পাখিদের আনাগোনা ও উড়ে বেড়ানো থেকে নিশ্চিত হলো যে,ঐ উপত্যকার আশেপাশে কোথাও পানি পাওয়া গেছে। প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য জুরহুম গোত্র দু ব্যক্তিকে সেখানে প্রেরণ করল। তারা অনেক অনুসন্ধান করার পর মহান আল্লাহর রহমতের এ কেন্দ্রবিন্দুর সাথে পরিচিত হলো। যখন তারা হযরত হাজেরার কাছে আসলো তখন দেখতে পেল যে,একজন রমণী এক সন্তানের সাথে উক্ত পানির ধারে (যমযমের পাশে) বসে আছেন। তারা তৎক্ষণাৎ ফিরে গিয়ে এ ব্যাপারটি গোত্রপতিদেরকে জানাল। জুরহুম গোত্র দলে দলে রহমতের এ ঝরনাধারার চারপাশে তাঁবু স্থাপন করল। একাকিত্বের তিক্ততা যা হযরত হাজেরাকে ঘিরে রেখেছিল তা এখন বিদূরিত হয়ে গেল। ইসমাঈল (আ.) সেখানে শশীকলার ন্যায় বেড়ে উঠতে লাগলেন এবং বসতিস্থাপনকারী জুরহুম গোত্রের সাথে তাঁদের মেলামেশার কারণে ইসমাঈল (আ.) জুরহুম গোত্রে বিবাহ করেছিলেন। আর এ বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে তিনি জুরহুম গোত্রের যথেষ্ট সামাজিক সমর্থন ও সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করেছিলেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ইসমাঈল (আ.) এ গোত্রেরই এক মেয়েকে বিয়ে করলেন। আর এ কারণেই হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধরগণ মায়ের মাধ্যমে এ গোত্রের সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়ে।

পুনরায় দেখা-সাক্ষাৎ

মহান আল্লাহর আদেশে প্রাণপ্রিয় সন্তান ইসমাঈলকে তাঁর মা হাজেরার সাথে মক্কায় রেখে আসার পর সন্তানকে দেখার জন্য হযরত ইবরাহীম কখনো কখনো পবিত্র মক্কা অভিমুখে সফর করতেন। তিনি খুব সম্ভবত তাঁর প্রথম সফরে যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন তিনি পুত্র ইসমাঈলকে ঘরে পেলেন না। ঐ সময় ইসমাঈল (আ.) শক্ত-সামর্থ্যবান যুবকে পরিণত হয়েছিলেন এবং জুরহুম গোত্রের এক রমণীকে বিয়ে করেছিলেন। ইবরাহীম (আ.) ইসমাঈল (আ.)-এর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার স্বামী কোথায়? তখন সে উত্তরে বলেছিল, সে শিকারে গিয়েছে।” এরপর তিনি ঐ মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের কাছে খাবার আছে কি? সে তখন বলেছিল, না,নেই।” ইবরাহীম (আ.) পুত্রবধুর এ নিষ্ঠুর আচরণে খুবই ব্যথিত হয়েছিলেন। তাই তিনি বললেন, ইসমাঈল যখনই শিকার থেকে ফিরবে তখন আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম জানাবে। আর তাকে বলবে : তোমার ঘরের চৌকাঠটি (স্ত্রী) পাল্টে ফেলবে।” এ কথা বলে তিনি যে পথ দিয়ে এসেছিলেন সে পথেই তাঁর লক্ষ্যস্থলের দিকে প্রত্যাবর্তন করলেন।

ইসমাঈল (আ.) শিকার থেকে ফিরে এসেই পিতার সুঘ্রাণ পেলেন এবং স্ত্রীর কথাবার্তা থেকেও নিশ্চিত হলেন যে,আগন্তুক ব্যক্তিটি ছিলেন তাঁর পিতা ইবরাহীম (আ.)। আর তিনি পিতার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হলেন এবং বুঝতে পারলেন যে,তাঁর পিতা তাঁকে তাঁর বর্তমান স্ত্রীকে তালাক দিয়ে অন্য আরেকজনকে বিয়ে করার আদেশ দিয়েছেন। কারণ এমন রমণী তাঁর সহধর্মিণী হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারে যে,হযরত ইবরাহীম (আ.) কেন এত দীর্ঘ পথ ও দূরত্ব অতিক্রম করেও ছেলের শিকার থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করতে পারলেন না এবং তিনি কিভাবে শত শত ফারসাখ দূরত্ব অতিক্রম করে সন্তানের সাথে দেখা না করেই ফিরে যেতে পারলেন?

ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন,তিনি স্ত্রী সারাহকে কথা দিয়েছিলেন যে,তিনি এর চেয়ে বেশি বিলম্ব করবেন না। এ প্রতিশ্রুতিই ছিল তাঁর ত্বরা করার কারণ। যাতে করে তিনি তাঁর কথার খেলাপ না করেন সেজন্য তিনি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেন নি। এ সফরের পরে তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পবিত্র মক্কা সফর করার জন্য পুনরায় আদিষ্ট হয়েছিলেন। হযরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পবিত্র কাবাগৃহের পুনঃনির্মাণ এবং একত্ববাদী বিশ্বাসীদের অন্তঃকরণ এ গৃহের পানে নিবদ্ধ করার ব্যাপারে তিনি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

পবিত্র কোরআন সাক্ষ্য দেয় যে,হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনের শেষভাগে পবিত্র কাবা পুনঃনির্মাণের পর পবিত্র মক্কার মরু এলাকা শহরে পরিণত হয়েছিল। কারণ হযরত ইবরাহীম (আ.) নির্মাণ কার্য সমাপ্ত হওয়ার পর মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন :

) ربِّ اجعلْ هذا البلدَ آمناً و اجنُبْني و بنيَّ أنْ نعبدَ الأصنام(

“হে প্রভু! এ শহরকে নিরাপদ নগরী করে দিন;আর আমাকে ও আমার বংশধরদেরকে মূর্তিপূজা করা থেকে বিরত রাখুন।” (সূরা ইবরাহীম : ৩৫)

হযরত ইবরাহীম (আ.) মক্কার মরুভূমিতে প্রবেশ করার সময় এ প্রার্থনা করেছিলেন,

) ربِّ اجعل هذا بلداً آمناً(

“হে আমার প্রভু! এ স্থানকে নিরাপদ নগরীতে পরিণত করে দিন।” (সূরা বাকারা : ১২৬)

আলোচনা পূর্ণ করার জন্য পবিত্র কাবাগৃহের নির্মাণপদ্ধতি এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা যেন আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে পিছিয়ে না থাকি সেজন্য আমরা মহানবী (সা.)-এর যে কতিপয় পূর্বপুরুষ ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন তাঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে এখন আলোচনা করব।

২. কুসাই বিন কিলাব

মহানবী (সা)-এর পূর্বপুরুষগণ যথাক্রমে আবদুল্লাহ্,আবদুল মুত্তালিব,হাশিম,আবদে মান্নাফ,কুসাই,কিলাব,মুররাহ্,কা’ব,লুওয়াই,গালিব,ফিহর (কুরাইশ),মালেক,নাযার,কিনানাহ্,খুযাইমাহ্,মুদ্রিকা,ইলইয়াস,মুযার (মুদার),নিযার,মা দ ও আদনান।৯৪

নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে,মা দ বিন আদনান পর্যন্ত মহানবী (সা.)-এর নসব (বংশ লতিকা) হচ্ছে এটিই যা ওপরে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আদনান থেকে তদূর্ধ্বে হযরত ইসমাঈল (আ.) পর্যন্ত সংখ্যা ও নামের দিক থেকে বেশ মতপার্থক্য আছে এবং ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত রেওয়ায়েত অনুযায়ী যখনই মহানবীর নসব আদনান পর্যন্ত পৌঁছবে তখন অবশ্যই আদনানকে ছাড়িয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ মহানবী (সা.) যখন নিজ পূর্বপুরুষদের নাম বর্ণনা করতেন তখন তিনি আদনানকে অতিক্রম করতেন না এবং হযরত ইসমাঈল (আ.) পর্যন্ত অবশিষ্ট নসব গণনা করা থেকে অন্যদেরকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতেন। তিনি বলতেন যে,আরবের মধ্যে যা প্রসিদ্ধ ও খ্যাত হয়েছে তা তাঁর বংশলতিকার এ অংশটি (অর্থাৎ পিতা আবদুল্লাহ্ থেকে ঊর্ধ্বতন পিতৃপুরুষ আদনান)।৯৫

এ কারণেই আমরা মহানবী (সা.)-এর নসবের যে অংশটি সুনিশ্চিত ও সকল তর্ক-বিতর্কের ঊর্ধ্বে কেবল সেটিই উল্লেখ করতঃ পিতা আবদুল্লাহ্ থেকে আদনান পর্যন্ত মহানবী (সা.)-এর পূর্বপুরুষ সম্পর্কে নিম্নে একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিতে চেষ্টা করব।

উপরিউক্ত ব্যক্তিগণ (আবদুল্লাহ্ থেকে আদনান পর্যন্ত মহানবীর পূর্বপুরুষগণ) আরব জাতির ইতিহাসে প্রভূত যশ ও খ্যাতির অধিকারী ছিলেন এবং তাঁদের কয়েকজনের জীবনের সাথে ইসলামের ইতিহাসেরও সম্পর্ক আছে। এ কারণেই কুসাই থেকে মহানবী (সা.)-এর শ্রদ্ধেয় পিতা পর্যন্ত তাঁর পূর্বপুরুষদের জীবনী বর্ণনা করব এবং তাঁর অন্যান্য পূর্বপুরুষদের জীবনী বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকব,আমাদের এ বক্ষ্যমাণ আলোচনার সাথে যাঁদের তেমন একটা সংশ্রব নেই।

কুসাই মহানবী (সা.)-এর চতুর্থ ঊর্ধ্বতন নিকটবর্তী পিতৃপুরুষ। তাঁর মাতা ফাতিমা বনি কিলাবের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি যাহরাহ্ ও কুসাই নামের দুই সন্তানের জন্ম দেন। দ্বিতীয় সন্তানটি (কুসাই) কোলে থাকাবস্থায় ফাতিমার স্বামী কিলাব মৃত্যুবরণ করেন। তিনি পুনরায় রবীয়াহ্ নামের এক ব্যক্তির সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং স্বামীর সাথে শামে চলে যান। রবীয়ার গোত্র ও কুসাই-এর মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ পাওয়া পর্যন্ত কুসাই রবীয়ার পিতৃসুলভ পৃষ্ঠপোষকতা ও স্নেহ লাভ করেছিলেন। মতবিরোধ প্রকাশ পেলে রবীয়াহ্ কুসাইকে তার গোত্র থেকে বহিষ্কার করে দেয়। যার ফলে তাঁর মা এতটা দুঃখ পান যে,তিনি তাঁকে (কুসাইকে) মক্কায় ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন। ভাগ্য তাঁকে পবিত্র মক্কায় নিয়ে আসে। কুসাইয়ের লুক্কায়িত যোগ্যতা ও প্রতিভা অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে মক্কাবাসী,বিশেষ করে কুরাইশদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে পৌঁছে দেয়। কিছুদিন গত না হতেই কুসাই উচ্চ সম্মান ও মর্যাদা,পবিত্র মক্কার প্রশাসনের পদ ও পবিত্র কাবা গৃহের চাবি রক্ষকের পদ লাভ করেছিলেন। তিনি পবিত্র মক্কা শরীফের নিরঙ্কুশ শাসনকর্তা হতে পেরেছিলেন। তিনি বহু স্মৃতি ও নির্দশন রেখে গেছেন। তিনিই সর্বপ্রথম জনগণকে পবিত্র মক্কার পাশে গৃহ নির্মাণ করার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি আরবদের জন্য দারুন নাদওয়া’নামে মন্ত্রণা ও পরামর্শসভা (সংসদসদৃশ্য) নির্মাণ করেছিলেন যাতে করে আরব গোত্রপতি ও সর্দারগণ এ ধরনের গণকেন্দ্রে একত্র হয়ে নিজেরাই নিজেদের সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম হয়। পরিশেষে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে তাঁর জীবনসূর্য অস্তমিত হয়। তিনি আবদুদ দার ও আবদে মান্নাফ নামের যোগ্য দু পুত্রসন্তান রেখে যান।

৩. আবদে মান্নাফ

তিনি মহানবী (সা.)-এর তৃতীয় নিকটবর্তী ঊর্ধ্বতন পুরুষ। তাঁর নাম ছিল মুগরীহ্ এবং তাঁর উপাধি কামারুল বাতহা’(অর্থাৎ মক্কা উপত্যকার চাঁদ)। তিনি তাঁর ভ্রাতা আবদুদ দার থেকে ছোট ছিলেন। কিন্তু জনতার অন্তরে তাঁর বিশেষ মর্যাদা ছিল। তাঁর কণ্ঠে তাকওয়া-পরহেজগারী ধ্বনিত হতো। তিনি তাকওয়া ও জনগণের সাথে সদাচরণ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার আহবান জানাতেন। এত বড় সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আবদুদ দারের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হওয়ার এবং পবিত্র মক্কার উচ্চপদ ও দায়িত্বভার অধিকার করার ইচ্ছা পোষণ করেন নি। কিন্তু এ দু ভাইয়ের মৃত্যুর পর পদগুলো লাভ করার জন্য তাঁদের সন্তানদের মধ্যে মতভেদ ও বিবাদ শুরু হয়ে যায়। অতঃপর অনেক টানাপড়েন ও দ্বন্দ্বের পর পারস্পরিক সন্ধি ও পদগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করার মাধ্যমে উক্ত বিরোধ ও মতভেদের নিষ্পত্তি হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে,কাবাগৃহের অভিভাবকত্ব,দেখাশুনা ও দারুন নদওয়ার সভাপতির পদ আবদুদ দারের সন্তানদের এবং হাজীদের পানি দান ও আপ্যায়নের দায়িত্ব হচ্ছে আবদে মান্নাফের সন্তানদের ওপর। আর এ রকম অবস্থা অর্থাৎ দায়িত্ব ও পদসমূহের বণ্টন পবিত্র ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব পর্যন্ত বহাল ছিল।৯৭

৪. হাশিম

তিনি মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় নিকটবর্তী ঊর্ধ্বতন পিতৃপুরুষ ছিলেন। তাঁর নাম ছিল আমর এবং উপাধি ছিল আলা। হাশিম আবদে শামসের যমজ ভ্রাতা ছিলেন। মুত্তালিব ও নওফেল নামের তাঁর আরো দু ভাই ছিল।

ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রসিদ্ধি আছে যে,হাশিম আবদে শামসের যমজ ভাই ছিলেন। জন্মগ্রহণের সময় হাশিমের আঙ্গুল ভাই শামসের কপালে লাগানো ছিল। পৃথক করার সময় ফিংকি দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগলে জনগণ এ ঘটনাকে অলুক্ষণে হিসাবে গ্রহণ করে।৯৮ হালাবী তাঁর সিরাত গ্রন্থে লিখেছেন,এ ধরনের অশুভ লক্ষণ অলুক্ষণে ফলাফলই বয়ে এনেছিল। কারণ হাশিমের পৌত্র আব্বাসের বংশধরগণ এবং আবদে শামসের বংশধর বনি উমাইয়্যার মধ্যে ইসলামের আবির্ভাবের পরও ব্যাপক রক্তপাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছিল।৯৯

সীরাতে হালাবীর লেখক যেন হযরত আলী (আ.)-এর বংশধরদের করুণ কাহিনী ও ঘটনাবলীকে একদম উপেক্ষা করেছেন,অথচ মহানবী (সা.)-এর বংশধরদের পবিত্র রক্ত ঝরিয়ে বনি উমাইয়্যাহ্ যে সব ভয়ঙ্কর রক্তাক্ত দৃশ্যের অবতারণা করেছিল সেগুলো হচ্ছে এ গোত্রদ্বয়ের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বন্দ্ব ও বিবাদের সর্বোৎকৃষ্ট দলিল। কিন্তু সীরাতে হালাবীর লেখক কেন ঐ সব ঘটনাপ্রবাহ একেবারেই উল্লেখ করলেন না তা আমাদের বোধগম্য হয় নি।

আবদে মান্নাফের সন্তানদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যা আরবীয় কবিতা ও সাহিত্যে প্রতিফলিত ও আলোচিত হয়েছে তা হচ্ছে এই যে,তাঁরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। যেমন হাশিম যুদ্ধক্ষেত্রে,আবদে শামস মক্কায়,নওফেল ইরাকে এবং মুত্তালিব ইয়েমেনে মৃত্যুবরণ করেছেন।১০০

হাশিমের মহৎ চরিত্রের একটি নমুনা : যখনই যিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখা যেত তখনই তিনি সকাল বেলা কাবায় আসতেন এবং কাবার দেয়ালে হেলান দিয়ে নিম্নোক্ত ভাষণ প্রদান করতেন, হে কুরাইশ গোত্র! তোমরা আরবদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও সম্ভ্রান্ত গোত্র। তোমাদের বংশধারা সর্বোত্তম বংশধারা। মহান আল্লাহ্ তোমাদেরকে তাঁর নিজ গৃহ কাবার পাশে আবাস দিয়েছেন। আর এ অতীব মহান মর্যাদা হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধরদের মধ্যে কেবল তোমাদেরকেই তিনি বিশেষভাবে দিয়েছেন। অতএব,হে আমার গোত্র! মহান আল্লাহর ঘরের যিয়ারতকারিগণ এ মাসে এক অভূতপূর্ব আলো ও উদ্দীপনাসহকারে তোমাদের কাছে আসবে। তারা মহান আল্লাহর মেহমান। তাদের আপ্যায়নের দায়িত্ব তোমাদের ওপর ন্যস্ত। এ সব হাজী ও যিয়ারতকারীর মধ্যে প্রচুর নিঃস্ব ও সহায়সম্বলহীন ব্যক্তি আছে যারা দূর-দূরান্ত থেকে আসে। এ গৃহের মালিকের শপথ,মহান আল্লাহর এ সব অতিথিকে আপ্যায়ন করার সামর্থ্য যদি আমার থাকত তাহলে আমি কখনই তোমাদের কাছে সাহায্য চাইতাম না। তবে এখন আমার যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে এবং হালাল উপায়ে যা উপার্জন করেছি তা এ পথে ব্যয় করব এবং তোমাদেরকে এ পবিত্র গৃহের মর্যাদা ও সম্মানের শপথ দিয়ে বলছি যে,যারা এ পথে অর্থ ব্যয় করবে তা যেন তাদের অন্যায়ভাবে অর্জিত না হয়ে থাকে। অথবা তা যেন তারা রিয়াবশত (লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে) অথবা অনিচ্ছা সহকারে চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে তা ব্যয় না করে। আর সাহায্য করার ব্যাপারে কোন ব্যক্তির যদি আত্মিক সম্মতি না থাকে সে যেন ব্যয় করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকে। ১০১

হাশিমের নেতৃত্ব ও শাসন সবদিক থেকেই মক্কাবাসীদের জন্য উপকার ও কল্যাণ বয়ে এনেছিল। তাঁর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব জনগণের জীবনযাত্রা উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল। দুর্ভিক্ষের বছরগুলোতে হাশিমের দানশীলতা ও মহানুভবতার কারণেই জনগণ দুর্ভিক্ষজনিত কষ্ট ও দুর্ভোগ মোটেও অনুভব করে নি।

মক্কাবাসীদের বাণিজ্যের প্রসার ও উন্নতিকল্পে হাশিমের গৃহীত মহান উদ্যোগ ও পদক্ষেপগুলোর মধ্যে আমীর গাসসানের সাথে তাঁর সম্পাদিত চুক্তিটি সবিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। তার এ ধরনের উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে তাঁর ভাই আবদে শামস হাবাশার শাসনকর্তার সাথে এবং তাঁর অন্য দুই ভ্রাতা মুত্তালিব ও নওফেল যথাক্রমে ইয়েমেনের শাসনকর্তা এবং ইরানের শাহের সাথে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। যার ফলে উভয়পক্ষের বাণিজ্যিক পণ্যসমূহ সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পূর্ণ নিরাপত্তাসহকারে একে অপরের দেশে রপ্তানি হতে থাকে। এ ধরনের চুক্তি অগণিত সমস্যার সমাধান করেছিল। এর ফলে পবিত্র মক্কা নগরীতে অনেক বাজার ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের গোড়াপত্তন হয়েছিল যা ইসলামের সূর্যোদয় পর্যন্ত স্থায়িত্ব লাভ করেছিল।

এছাড়াও হাশিম কর্তৃক প্রবর্তিত লাভজনক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমূহের অন্যতম ছিল গ্রীষ্মকালে শামের দিকে এবং শীতকালে ইয়েমেনের দিকে কুরাইশদের বাণিজ্যিক সফর। তাঁর প্রবর্তিত এ বাণিজ্যিক কার্যক্রম ইসলামের শুভ অভ্যুদয়ের পরেও অনেক সময় পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।

উমাইয়্যাহ্ ইবনে আবদে শামস-এর ঈর্ষা

উমাইয়্যাহ্ ছিল আবদে শামসের পুত্র এবং হাশিমের ভাতিজা। সে তার চাচা হাশিমের উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের কারণে তাঁর প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করত। সে দান ও ব্যয় করে জনগণের অন্তরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে চাইত। কিন্তু অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও বাধাদান করার পরেও সে হাশিমের পথ-পদ্ধতি অনুযায়ী চলতে সক্ষম হয় নি। চাচা হাশিমের প্রতি তার কটূক্তি সত্ত্বেও তাঁর মর্যাদা ও সম্মানকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই করেছিল।

উমাইয়্যার অন্তরে হিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। অবশেষে সে চাচা হাশিমকে আরবের কয়েকজন গণক ও ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে যেতে বাধ্য করে। ঠিক করা হয়েছিল যে,তাদের দু জনের মধ্যে যাকে ঐ ভবিষ্যদ্বক্তা প্রশংসা করবে সে-ই সকল বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে। মহানুভবতার কারণে হাশিম তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। কিন্তু ভাতিজা উমাইয়্যার পীড়াপীড়ির কারণে দু টি শর্তসাপেক্ষে এ ধরনের কাজে তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। শর্তদ্বয় হলো :

ক. এ দু জনের মধ্যে থেকে যে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে হজ্বের দিনগুলোতে তাকে ১০০টি কালো রংয়ের উট কোরবানী করতে হবে।

খ. দোষী ও দণ্ডিত ব্যক্তিকে অবশ্যই ১০ বছর মক্কার বাইরে নির্বাসনে থাকতে হবে।

সৌভাগ্যক্রমে আরবের জ্ঞানী ব্যক্তি নামে পরিচিত গণক আসফানের দৃষ্টি হাশিমের দিকে পড়ামাত্রই তিনি তাঁর প্রশংসা করেছিলেন। তাই চুক্তি অনুযায়ী উমাইয়্যাহ্ দেশ ত্যাগ করে শামে দশ বছর বসবাস করতে বাধ্য হয়েছিল।১০২

এ বংশানুক্রমিক হিংসা-বিদ্বেষের ফলাফল ও প্রভাব ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের পরেও ১৩০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এবং এর ফলে অনেক জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসে যার কোন নজির নেই। পূর্ববর্তী কাহিনীটি যেমন দু গোত্রের (বনি হাশিম ও বনি উমাইয়্যাহ্) মধ্যকার শত্রুতার সূচনা সম্পর্কে আলোকপাত করে ঠিক তেমনি শামদেশে বনি উমাইয়্যার প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণগুলোকেও স্পষ্ট করে দেয়। আর এ থেকে ভালোভাবে জানা যায় যে,শামদেশের অধিবাসীদের সাথে বনি উমাইয়্যার পুরানো সম্পর্কই অত্র অঞ্চলে বনি উমাইয়্যার শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনুকূল ক্ষেত্রও প্রস্তুত করেছিল।

আরব জাতির মাঝে নারীর সামাজিক অবস্থান

আরব সমাজে নারীদেরকে পণ্যের মতো কেনা-বেচা করা হতো। তারা সব ধরনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকার,এমনকি উত্তরাধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল। আরব বুদ্ধিজীবীরা নারীদেরকে পশু বলে মনে করত। আর এ কারণেই তাদেরকে দৈনন্দিন জীবনের পণ্য-সামগ্রী ও আসবাবপত্রের মধ্যে গণ্য করা হতো। এ ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েইو إنّما أمّهات النّاس أوعية মায়েরা ঘটি-বাটি ও থালা-বাসনের মতো’-এ প্রবাদ বাক্যটি আরবদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল।

প্রধানত দুর্ভিক্ষের ভয়ে এবং কখনো কখনো কলুষতা ও অশূচিতার ভয়ে আরবরা মেয়েদেরকে জন্মগ্রহণের পর পরই হত্যা করে ফেলত। কখনো পাহাড়ের ওপরে তুলে সেখান থেকে নিচে ফেলে দিত এবং কখনো কখনো পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করত। আমাদের মহান ঐশী গ্রন্থ যা অমুসলিম প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিতে ন্যূনপক্ষে একটি অবিকৃত ঐতিহাসিক তাত্ত্বিক গ্রন্থ যা এতৎসংক্রান্ত একটি অভিনব কাহিনী বর্ণনা করেছে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে : যখন তাদের কোন এক ব্যক্তিকে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণের সুসংবাদ দেয়া হতো তখন তার বর্ণ কালো হয়ে যেত এবং বাহ্যত সে যেন তার ক্রোধকে চাপা দিত। আর এই জঘন্য সংবাদ শোনার কারণে সে (লজ্জায়) তার সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াত। আর সে জানত না যে,সে কি অপমান ও লাঞ্ছনা সহকারে তার এ নবজাতক কন্যাসন্তান প্রতিপালন করবে,নাকি তাকে মাটির নিচে জীবন্ত পুঁতে ফেলবে? সত্যিই তাদের ফয়সালা কতই না জঘন্য! 27

সবচেয়ে দুঃখজনক ছিল আরবদের বৈবাহিক ব্যবস্থা। পৃথিবীতে এর কোন নজির বিদ্যমান নেই। যেমন আরবদের কাছে স্ত্রীর কোন সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। স্ত্রীর মোহরানা যাতে আদায় করতে না হয় সেজন্য তারা স্ত্রীদেরকে নির্যাতন ও উৎপীড়ন করত। কোন মহিলা চারিত্রিক সততার পরিপন্থী কোন কাজ করলেই তার মোহরানা সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যেত। কখনো কখনো আরবরা এনিয়মের অপব্যবহার করত। মোহরানা যাতে আদায় করতে না হয় সেজন্য তারা নিজেদের স্ত্রীদের ওপর অপবাদ আরোপ করত। পুত্রসন্তানগণ পিতার মৃত্যুর পর বা পিতা তালাক দিলে পিতার স্ত্রীদেরকে নিজের স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে পারত এবং এতে কোন অসুবিধা ছিল না। যখন মহিলা তার স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্তা হতো তখন প্রাক্তন তথা প্রথম স্বামীর অনুমতির ওপর তার পুনর্বিবাহ নির্ভর করত। আর কেবল অর্থ প্রদানের মাধ্যমেই প্রথম স্বামীর অনুমতি পাওয়া যেত। উত্তরাধিকারিগণ ঘরের আসবাবপত্রের মতো উত্তরাধিকারসূত্রে মহিলাদের ( পিতার স্ত্রীদের ) মালিক হতো এবং তাদের মাথার ওপর রোসারী ( Scarf) নিক্ষেপ করে উত্তরাধিকারিগণ তাদের নিজ নিজ স্বত্বাধিকার ঘোষণা করত।

ছোট একটি তুলনা

সম্মানিত পাঠকবর্গ যদি ইসলামে নারীর অধিকার লক্ষ্য করেন তাহলে তাঁরা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন যে,নারীর অধিকার সংক্রান্ত এত সব বিধান প্রবর্তন এবং এগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত উদ্যোগ যা মহানবী (সা.) কর্তৃক গৃহীত হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে,মহানবী (সা.) সত্যনবী এবং ঐশী জগতের সাথে তাঁর যোগসূত্র ছিল। কারণ পবিত্র কোরআনের বহু আয়াত এবং মহানবী (সা.)-এর অগণিত হাদীসে নারীর অধিকারসমূহের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং তিনিও তাঁর অনুসারীদেরকে নারীদের প্রতি সদাচরণ ও দয়া প্রদর্শন করার আহবান জানিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বিদায় হজ্বের ভাষণে নারীদের ব্যাপারে পুরুষদেরকে নিম্নোক্ত যে উপদেশ দিয়েছেন তার চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে? তিনি বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছেন,

أيّها النّاس فإنّ لكم على نسائكم حقّا و لهنّ عليكم حقّا و استوصوا بالنّساء خيرا فإنّهنّ عندكم عوان... أطعموهنّ ممّا تأكلون و ألبسوهنّ ممّا تلبسون

“হে লোকসকল! নারীদের ওপর যেমন তোমাদেরকে অধিকার দেয়া হয়েছে,ঠিক তদ্রূপ তোমাদের ওপরও তাদের অধিকার রয়েছে। তাদের ব্যাপারে তোমরা একে অপরের প্রতি সদাচরণ করার আদেশ দেবে। কারণ তারা (নারীরা) তোমাদের কাজকর্মে তোমাদের সাহায্যকারী। ...তোমরা যা খাবে তাদেরকে তা খেতে দেবে। আর তোমরা যা পরিধান করবে তাদেরকেও তা-ই পরিধান করতে দেবে।”28

আরবদের সাহস ও বীরত্ব

বলা যেতে পারে যে,মানসিকভাবে জাহেলিয়াত যুগের আরবগণ লোভী মানুষের পূর্ণাঙ্গ উপমা ছিল। পার্থিব বস্তুসামগ্রীর প্রতি ছিল তাদের দুর্বার আকর্ষণ। তারা প্রতিটি বস্তু বা বিষয়কেই তার অন্তর্নিহিত লাভ ও উপকারের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করত (অর্থাৎ যে জিনিসে যত বেশি লাভ ও উপকার পাওয়া যেত সেটিই তাদের কাছে প্রিয় ও কাম্য হতো)। তারা সর্বদা অন্যদের চেয়ে নিজেদের এক ধরনের উচ্চমর্যাদা,সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব আছে বলে বিশ্বাস করত। তারা সীমাহীনভাবে স্বাধীন থাকতে ভালবাসত। তাই যে সব বিষয় তাদের স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিত তা তারা মোটেও পছন্দ করত না।29

ইবনে খালদুন আরবদের অবস্থা প্রসঙ্গে বলেছেন, স্বভাবপ্রকৃতির দিক থেকে এ জাতিটি অসভ্য,বর্বর এবং লুটতরাজপ্রিয় ছিল। তাদের মধ্যে অসভ্যতা ও বর্বরতার কারণগুলো এতটা গভীরে প্রোথিত ছিল যে সেগুলো যেন তাদের স্বভাব-চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। তারা তাদের এ ধরনের অসভ্য স্বভাব-চরিত্রকে বেশ মজা করে উপভোগ করত। কারণ তাদের এই চারিত্রিক বর্বরতা ও অসভ্যতার কারণেই তারা কোন শাসকের শাসন বা আইন-কানুনের আনুগত্য ও সকল ধরনের বাধ্যতামূলক বন্ধন থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারত এবং রাজ্যশাসন নীতির বিরুদ্ধাচরণ করত। আর এটি স্পষ্ট প্রমাণিত যে,এ ধরনের স্বভাব-চরিত্র সভ্যতা ও কৃষ্টির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।...

এরপর তিনি আরো বলেছেন, তাদের স্বভাবে ছিল লুণ্ঠন ও দস্যুবৃত্তি। তারা অন্যদের কাছে যা পেত তা ছিনিয়ে নিত। বর্শা ও তরবারির মাধ্যমেই তাদের জীবিকা নির্বাহ হতো। অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করার ক্ষেত্রে তারা কোন সীমারেখার ধার ধারত না,বরং যে কোন সম্পদ ও জীবনযাপনের উপকরণের ওপর দৃষ্টি পড়লেই তারা তা লুণ্ঠন করত।”30

আসলে লুটতরাজ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ আরবদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। কথিত আছে,মহানবী (সা.)-এর কণ্ঠে বেহেশতের সুখ-শান্তির কথা শোনার পর এক আরব বেহেশতে যুদ্ধ-বিগ্রহের অস্তিত্ব আছে কিনা এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিল। যখন তাকে এর উত্তরে বলা হলো : না সেখানে যুদ্ধ-বিগ্রহের কোন অস্তিত্ব নেই,তখন সে বলেছিল, তাহলে বেহেশত থাকলেই বা লাভ কি? আরব জাতির ইতিহাসে 1700-এর বেশি যুদ্ধের কাহিনী লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কোন কোন যুদ্ধ 100 বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে চলেছে। অর্থাৎ কয়েকটি প্রজন্ম পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ করেই কালাতিপাত করেছে। কখনো কখনো অত্যন্ত তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ,রক্তপাত ও হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে।31 ইসলামপূর্ব আরব জাতির অন্যতম ঘটনা হচ্ছে একটি দীর্ঘ যুদ্ধ যা ইতিহাসে হারবু দাহিস ওয়া গাবরা’নামে প্রসিদ্ধ। দাহিস ও গাবরা দু গোত্রপতির দু টি ঘোড়ার নাম ছিল। দাহিস বনি আবেস গোত্রের প্রধান কাইস বিন যুহাইরের ঘোড়ার নাম এবং গাবরা ছিল বনি ফিরাযাহ্ গোত্রপতি হুযাইফার ঘোড়ার নাম। উক্ত গোত্রপতিদ্বয়ের প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ ঘোড়াকে অন্যের ঘোড়া অপেক্ষা অধিকতর দ্রুতগতিসম্পন্ন বলে মনে করত। অবশেষে তাদের মধ্যে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়;কিন্তু প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর প্রত্যেকেই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার দাবি করল। এই ত্চ্ছু বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো। নিহতের গোত্রও হত্যাকারী গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করল। কিন্তু ঘটনাটি এখানেই শেষ হলো না,বরং এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দু বৃহৎ গোত্রের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা  হলো যা 568 খ্রিষ্টাব্দ থেকে 608 খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চলতে থাকে এবং এর ফলে উভয় পক্ষের অগণিত লোক নিহত হয়।32

জাহেলী যুগের আরবরা বিশ্বাস করত যে,রক্ত ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে রক্তকে ধুয়ে সাফ করা যায় না। শানফারা-এর ঘটনা যা একটি উপাখ্যানসদৃশ তা জাহেলী গোত্রপ্রীতির মাত্রার নির্দেশক হতে পারে। সে (শানফারাহ্) বনি সালমান গোত্রের এক ব্যক্তির হাতে লাঞ্ছিত হলে এর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উক্ত গোত্রের 100 জনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অবশেষে দীর্ঘকাল দিগ্বিদিক ঘোরাঘুরি ও চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে অপমানকারী গোত্রের 99 জনকে হত্যা করে। এরপর একদল দস্যু একটি কূপের কাছে তাকেও হত্যা করে। বহু বছর পর নিহত শানফারা-এর হাড় ও মাথার খুলি অপমানকারী গোত্রের শততম ব্যক্তির হত্যার কারণে পর্যবসিত হয়। কাহিনীটি এরূপ : বনি সালমান গোত্রের এক পথিক সেখান দিয়ে অতিক্রম করছিল। হঠাৎ মরুঝড় মাথার খুলি উড়িয়ে এনে ঐ পথিকটির পায়ে কঠিনভাবে আঘাত করে। ফলে সে পায়ের তীব্র ব্যথায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়।33

আরব বেদুইনরা রক্তপাত,খুন-খারাবি,লুটতরাজ ও দস্যুবৃত্তিতে এতটা অভ্যস্ত ছিল যে,পরস্পর গর্ব-অহংকার করার সময় তারা অন্যদের ধন-সম্পদ লুণ্ঠনকে তাদের অন্যতম গর্ব ও অহংকারের বিষয় বলে গণ্য করত। এক জাহেলী আরব কবি লুটতরাজ করার ক্ষেত্রে নিজ গোত্রের অপারগতা দেখে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে আকাঙ্ক্ষা করেছিল :

“হায় যদি সে এ গোত্রের না হয়ে অন্য কোন গোত্রের হতো যারা অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করে লুটতরাজ করত।”34

এ জাতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এ রকম বলা হয়েছে :

) و كنتم على شفا حفرة من النّار فأنقذكم منها(

“আর তোমরা,হে আরব জাতি! অগ্নিকুণ্ডের ধারে ছিলে। মহান আল্লাহ্ তোমাদেরকে তা থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন।”35

জাহেলিয়াত যুগের আরবদের সাধারণ চরিত্র

যা হোক অজ্ঞতা,মূর্খতা,সংকীর্ণ জীবনযাত্রা,জীবনযাপনের সঠিক পদ্ধতি ও ব্যবস্থা না থাকা,হিংস্রতা,পাশবিকতা,অলসতা,বেহাল অবস্থা এবং আরো অন্যান্য চারিত্রিক দোষ-ত্রুটির ন্যায় বিভিন্ন ধরনের প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান আরব উপদ্বীপের সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রেখেছিল এবং ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে লজ্জাজনক বিষয়াদি স্বাভাবিক ও বৈধ হয়ে যায়।

লুণ্ঠন,দস্যুবৃত্তি,জুয়া,সুদ ও মানুষকে বন্দী করা জাহেলী আরবীয় জীবনে বহুল প্রচলিত নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। তাদের আরেকটি জঘন্য কুঅভ্যাস ছিল মদ্যপান। এ ঘৃণ্য অভ্যাসটি জাহেলী আরব সমাজে এতটা বিস্তৃতি লাভ করেছিল যে,তা তাদের ভাগ্য ও জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। আরবের কবিরা মদের গুণ এবং মদ্যপান বর্ণনায় তাদের অধিকাংশ কাব্যপ্রতিভা ব্যবহার করত। পানশালা রাতদিন 24 ঘণ্টাই উন্মুক্ত থাকত। এগুলোর ছাদের ওপর বিশেষ ধরনের পতাকা উড়ত। ইসলামপূর্ব আরব সমাজে মদের কেনা-বেচার ব্যাপক প্রচলনের কারণে তাদের কাছে ব্যবসা-বাণিজ্য মদ বিক্রির সমার্থক ছিল।

আরবগণ চারিত্রিক নীতিমালাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করত। যেমন মহানুভবতা,সাহস ও তীব্র আত্মসম্ভ্রমবোধ আরবদের কাছে প্রশংসনীয় ছিল। তবে তাদের দৃষ্টিতে সাহসের অর্থ ছিল যুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাত ঘটানো। আত্মসম্ভ্রমবোধ তাদের দৃষ্টিতে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হতো যার ফলে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবরস্থ করা তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আত্মসম্ভ্রমবোধ বলে গণ্য হতো। আরবদের দৃষ্টিতে বিশ্বস্ততা ও সংহতি ছিল নিজ গোত্র ও চুক্তিবদ্ধ মিত্র গোত্রগুলোকে সমর্থন করা-তা সত্যই হোক,আর অন্যায়ই হোক।36 তারা মদ,নারী ও যুদ্ধের প্রতি তীব্রভাবে আসক্ত ছিল।

জাহেলিয়াত যুগের আরবগণ কুসংস্কার পূজারী ছিল

পবিত্র কোরআনে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত ও রিসালাতের পবিত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ নাতিদীর্ঘ বাক্যসমূহের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে (যদিও বাক্যগুলো ছোট,কিন্তু গভীর অর্থ ও তাৎপর্যমণ্ডিত)। ঐ সকল আয়াত যা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য তন্মধ্যে এ আয়াতটি এখানে উল্লেখ করা হলো :

) و يضع عنهم إصرهم و الأغلال الّتى كانت عليهم(

“তিনি (মহানবী) তাদের থেকে তাদের বোঝা এবং শিকল ও বেড়ী থেকে মুক্ত করেন যা তাদের ওপর (বাঁধা) রয়েছে।” (সূরা আরাফ : 157)

এখানে অবশ্যই দেখতে হবে যে,যে শিকল ও বেড়ীতে ইসলাম ধর্মের শুভ সূচনালগ্নে জাহেলিয়াতের যুগের আরব জাতির হাত ও পা বাঁধা ছিল তা কি? নিঃসন্দেহে এই শিকল ও বেড়ী লৌহ নির্মিত ছিল না,বরং এ সব শিকল ও বেড়ী বলতে কুসংস্কার,অলীক কল্পনা এবং ধ্যান-ধারণাকে বোঝানো হয়েছে যা মানুষের চিন্তাশক্তি ও বিবেকবুদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। এ ধরনের বাঁধন যদি মানুষের চিন্তাশক্তির পাখার সাথে বেঁধে দেয়া হয় তাহলে তা লোহার বেড়ী ও শিকল হতে বেশি ক্ষতিকর হবে। কারণ লৌহনির্মিত শিকল কিছুদিন অতিবাহিত হলে বন্দীর হাত ও পা থেকে খুলে নেয়া হয়। আর জেলে বন্দী ব্যক্তিটি সুস্থ চিন্তাধারাসহকারে এবং কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে বাস্তব জীবনে প্রত্যাবর্তন করে। কিন্তু অমূলক চিন্তা,ধারণা এবং ভ্রান্ত কল্পনার শিকলে যদি মানুষের বিবেক-বুদ্ধি,আবেগ-অনুভূতি এবং অনুধাবন শক্তি বাঁধা হয়ে যায় তাহলে তা আমৃত্যু তার সাথে থেকেই যেতে পারে এবং তাকে যে কোন ধরনের তৎপরতা ও প্রচেষ্টা,এমনকি তা এ ধরনের বাঁধন খোলার জন্যও যদি হয়ে থাকে তা থেকে তাকে বিরত রাখে। মানুষ সুস্থ চিন্তাধারা এবং বিবেক ও জ্ঞানের ছত্রছায়ায় যে কোন ধরনের কঠিন বাঁধন ও শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে সক্ষম। তবে সুস্থ চিন্তাধারা ছাড়া এবং সব ধরনের অলীক ও ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত না হলে মানুষের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও কর্মতৎপরতা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অন্যতম গৌরব ও কৃতিত্ব হচ্ছে,তিনি সকল প্রকার কুসংস্কার,অমূলক চিন্তাভাবনা ও অলীক কল্প-কাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তিনি মানব জাতির বিবেক-বুদ্ধিকে কুসংস্কারের মরিচা ও ধুলোবালি থেকে ধৌত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষের চিন্তাশৈলীকে শক্তিশালী করতে এবং সব ধরনের কুসংস্কার,এমনকি যে কুসংস্কার আমার লক্ষ্য অর্জনের পথে সহায়ক সেটিরও বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেই আমি এসেছি।”

বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ,জনগণের ওপর শাসনকর্তৃত্ব চালানো ছাড়া যাদের আর কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে নেই তারা সব সময় যে কোন অবস্থা ও পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে;এমনকি প্রাচীন কল্পকাহিনী এবং জাতির কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস যদি নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হয় তাহলে তারা তা প্রসার ও প্রচার করতে দ্বিধাবোধ করে না। আর তারা যদি চিন্তাশীল ও যুক্তিবাদীও হয় তাহলেও তারা সাধারণ জনতার ধ্যান-ধারণা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের আকীদা-বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নামে বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী ঐ সকল অমূলক কল্প-কাহিনী ও ধ্যান-ধারণাকে সমর্থন করতে থাকে।

তবে মহানবী (সা.) যে সব কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস তাঁর ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর কেবল সেগুলোর বিরুদ্ধেই সংগ্রাম করেন নি,বরং যে কোন ধরনের আঞ্চলিক কল্প-কাহিনী ও উপাখ্যান অথবা ভিত্তিহীন চিন্তা ও বিশ্বাস যা তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সহায়ক সেটির বিরুদ্ধেও তাঁর সকল শক্তি ও ক্ষমতা নিয়োগ করে সংগ্রাম করেছেন। তিনি সব সময় চেষ্টা করেছেন মানুষ যেন সত্যপূজারী হয়। ভিত্তিহীন কল্প-কাহিনী,উপাখ্যান ও কুসংস্কারের পূজারীতে যেন পরিণত না হয়। এখন উদাহরণস্বরূপ নিম্নোক্ত কাহিনীটি মনোযোগ সহকারে পাঠ করুন :

মহানবী (সা.)-এর এক পুত্রসন্তান মারা গেলেন যাঁর নাম ছিল ইবরাহীম। তিনি পুত্রবিয়োগে শোকাহত ও দুঃখভারাক্রান্ত ছিলেন এবং তাঁর পবিত্র নয়নযুগল থেকে অশ্রু ঝরছিল। ইবরাহীমের মৃত্যুর দিনে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। আরবের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অলীক কল্প-কাহিনীর পূজারী জাতি সূর্যগ্রহণকে মহানবী (সা.)-এর ওপর আপতিত বিপদের চরম ও বিরাট হওয়ার প্রমাণ বলে মনে করল এবং বলতে লাগল : মহানবী (সা.)-এর পুত্রের মৃত্যুতে সূর্যগ্রহণ হয়েছে। মহানবী (সা.) তাদের এ কথা শুনে বললেন, চন্দ্র ও সূর্য মহান আল্লাহর অসীম শক্তি ও ক্ষমতার দু টি বড় নিদর্শন এবং তারা সর্বদা আদেশ পালনকারী। কারো জীবন ও মৃত্যু উপলক্ষে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হয় না। যখনই চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ হবে তখন তোমরা সবাই নিদর্শনসমূহের নামায আদায় করবে।” এ কথা বলে তিনি মিম্বার থেকে নিচে নেমে আসলেন এবং উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে আয়াতের নামায পড়লেন।37

মহানবী (সা.)-এর পুত্রের মৃত্যুতে সূর্যগ্রহণ হয়েছে চিন্তা করা যদিও মহানবী (সা.)-এর প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করত এবং পরিণতিতে তাঁর ধর্মের অগ্রগতি ও প্রসারের ক্ষেত্রে সহায়কও হতো,কিন্তু তিনি চান নি এবং সন্তুষ্ট হতে পারেন নি যে,অলীক কল্প-কাহিনীর দ্বারা জনগণের অন্তরে তাঁর স্থান দৃঢ় ও শক্তিশালী হোক। অলীক কল্প-কাহিনী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম যার জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত হচ্ছে মূর্তিপূজা এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন সত্তার উপাস্য হওয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তা কেবল তাঁর রিসালাতের পদ্ধতি ছিল না,বরং তিনি তাঁর জীবনের সব ক টি পর্বেই,এমনকি তাঁর শৈশবকালেও কুসংস্কার ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।

যে সময় মহানবী (সা.)-এর বয়স ছিল চার বছর এবং মরুভূমিতে দুধ মা হালিমার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হচ্ছিলেন তখন তিনি তাঁর দুধ মা হালিমার কাছে তাঁর দু ভাইয়ের সাথে মরুভূমিতে যাওয়ার ব্যাপারে অনুরোধ করেছিলেন। হালিমা এ ব্যাপার বলেন, পরের দিন মুহাম্মদকে গোসল দিলাম। তার চুলে তেল ও চোখে সুরমা দিলাম। যাতে করে মরুর শয়তানগুলো তার অনিষ্ট সাধন করতে না পারে সেজন্য একটি ইয়েমেনী পাথর সুতায় ভরে তাকে রক্ষা করার জন্য তার গলায় পরিয়ে দিলাম।” মহানবী (সা.) ঐ পাথরটি গলা থেকে খুলে এনে দুধ মা হালিমাকে বললেন,مهلا يا إمّاه، فإنّ معي من يحفظني মা,শান্ত হোন,আমার আল্লাহ্ সর্বদা আমার সাথে আছেন। তিনি আমার রক্ষাকারী।”38


6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53

54

55

56

57

58

59

60

61