চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড3%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 242 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 106707 / ডাউনলোড: 9685
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

4

5

আবু তালিবের অভিভাবকত্ব

আবু তালিবের মহান ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা প্রসঙ্গে আমরা এ গ্রন্থের একটি বিশেষ অংশে (নবুওয়াতের ১০ম বর্ষের ঘটনাবলী সংক্রান্ত অধ্যায়) আলোচনা করব। সেখানে আমরা বিশুদ্ধ দলিল ও সূত্রের ভিত্তিতে মহানবী (সা.)-এর প্রতি তাঁর ঈমান এবং আত্মসমর্পণের বিষয়েও আলোচনা করব। কিন্তু এখন আমরা মহানবীর অভিভাবক হিসাবে হযরত আবু তালিবের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু ঘটনা উল্লেখ করব।

কতিপয় গৌরবোজ্জ্বল কারণে হযরত আবু তালিব মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অভিভাবকত্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। কারণ আবু তালিব ছিলেন মহানবীর পিতা হযরত আবদুল্লাহর সহোদর ভ্রাতা।১৫০ তিনি দানশীলতা,বদান্যতা,পরোপকার ও জনহিতকর কাজে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এ কারণেই হযরত আবদুল মুত্তালিব তাঁর অনাথ নাতির লালন-পালন করার জন্য আবু তালিবকে মনোনীত করেছিলেন। স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস তাঁর অতীব মূল্যবান অবদানের সাক্ষী যা আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করব।

কথিত আছে যে,মহানবী (সা.) দশ বছর বয়সে পিতৃব্য আবু তালিবের সাথে একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর যেহেতু এ যুদ্ধ নিষিদ্ধ মাসসমূহে সংঘটিত হয়েছিল সেহেতু উক্ত যুদ্ধের নামকরণ করা হয়েছিল ফিজার’। ইতিহাসে ফিজার যুদ্ধ সংক্রান্ত বিশদ বর্ণনা এসেছে।১৫১

শামদেশ (সিরিয়া) সফর

কুরাইশ বংশীয় বণিকগণ যথারীতি প্রতি বছর অন্তত একবার শামদেশে গমন করত। হযরত আবু তালিব কুরাইশদের বাৎসরিক এ বাণিজ্যিক সফরে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। যে ভ্রাতুষ্পুত্রকে তিনি মুহূর্তের জন্য নিজের কাছ থেকে পৃথক হতে দিতেন না তাঁকে কার কাছে রেখে যাবেন এতৎসংক্রান্ত সমস্যাটির এভাবে সমাধান করলেন যে,তিনি তাঁকে মক্কায় রেখে যাবেন এবং কতিপয় ব্যক্তিকে তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব দেবেন। কিন্তু কাফেলার প্রস্থানের মুহূর্তে মহানবীর চোখ অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে গেল এবং তাঁর অভিভাবক আবু তালিবের কাছ থেকে (কিছুদিনের জন্য হলেও) এ বিচ্ছেদ তাঁর কাছে অত্যন্ত কঠিন বলে গণ্য হলো। মহানবীর দুঃখভারাক্রান্ত মুখমণ্ডল হযরত আবু তালিবের অন্তরে আবেগ-অনুভূতির প্রলয়ঙ্কর তুফানের সৃষ্টি করল। তিনি অবশেষে কষ্ট সংবরণ করে হলেও হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজের সাথে নিলেন।১৫২

মহানবীর বারো বছর বয়সের এ সফর ছিল তাঁর অন্যতম আনন্দঘন ভ্রমণ। কারণ এ সফরে তিনি মাদইয়ান,ওয়াদী-উল কুরা ও সামুদ জাতির আবাসস্থল অতিক্রম করেছিলেন। তিনি শাম দেশের মনোজ্ঞ প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীও অবলোকন করেছিলেন। কুরাইশ কাফেলাটি তখনও গন্তব্যস্থলে পৌঁছে নি ঠিক তখন বুসরা নামক স্থানে এমন এক ঘটনা সংঘটিত হয় যার জন্য হযরত আবু তালিবের সফর সংক্রান্ত কর্মসূচীর মধ্যে এক ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। নিচে এতৎসংক্রান্ত বিশদ বিবরণ প্রদান করা হলো :

অনেক বছর যাবৎ বাহীরা নামের একজন খ্রিষ্টান পাদরী বুসরা নামক স্থানে একটি বিশেষ ধর্মীয় উপাসনালয়ে উপাসনা করতেন এবং তিনি সেখানকার খ্রিষ্টানদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। বাণিজ্যিক কাফেলাসমূহ যাত্রাপথে ঐ স্থানে বিশ্রামের জন্য যাত্রাবিরতি করত এবং কল্যাণ ও বরকত লাভের জন্য তাঁর কাছে যেত। সৌভাগ্যবশত বাহীরা কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলার মুখোমুখি হন। তাঁর দৃষ্টি আবু তালিবের ভ্রাতুষ্পুত্রের ওপর পড়লে তিনি খুবই আকৃষ্ট হন। শিশু মহানবীর দৃষ্টিতে এমন এক রহস্যের নিদর্শন ছিল যা তাঁর অন্তরে লুক্কায়িত ছিল। বেশ কিছুক্ষণ তিনি মহানবীর দিকে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, এ শিশুটি আপনাদের মধ্যে কার সন্তান? ঐ কাফেলার কতিপয় ব্যক্তি আবু তালিবের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, (শিশুটি) আবু তালিবের আত্মীয়।” আবু তালিব তখন বললেন, সে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র।” বাহীরা বললেন, এ শিশুর এক অতি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। এ সেই প্রতিশ্রুত নবী যাঁর সর্বজনীন নবুওয়াত ও বিশাল হুকুমত (রাজত্ব) সম্পর্কে আসমানী গ্রন্থসমূহে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। এ সেই নবী যাঁর নাম এবং যাঁর পিতা ও পরিবারের নামও আমি ধর্মীয় গ্রন্থাদিতে পড়েছি এবং আমি জানি তিনি কোথা থেকে উত্থিত হবেন এবং কিভাবে তিনি তাঁর নব্য প্রতিষ্ঠিত ধর্মকে পৃথিবীতে বিস্তৃত করবেন১৫৩ ,তবে আপনাদের কর্তব্য হচ্ছে তাঁকে ইয়াহুদীদের চোখের আড়ালে রাখা। কারণ তারা যদি বুঝতে পারে,তাহলে তারা তাঁকে হত্যা করবে।”

অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা বিশ্বাস করেন যে,শামদেশ সফরকালে আবু তালিবের ভ্রাতুষ্পুত্র ঐ স্থানটিই আসলে অতিক্রম করেন নি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার নয় যে,মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচা আবু তালিব তাঁকে কোন ব্যক্তির সাথে পবিত্র মক্কায় ফেরত পাঠিয়ে ছিলেন কি না? আর এ বিষয়টি অসম্ভব বলেই মনে হয় যে,সন্ন্যাসীর কথা শোনার পর আবু তালিব তাঁকে নিজের কাছ থেকে পৃথক করে দেবেন অথবা তিনি শামদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদের সাথে পবিত্র মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে যেতে পারেন।  আবার কখনো বলা হয় যে,আবু তালিব বাহীরার কাছ থেকে শোনার পরও হযরত মুহাম্মদকে নিজের সাথে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শামদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন।

প্রাচ্যবিদদের মিথ্যাচার

আমরা মহান আল্লাহর অনুগ্রহে এ গ্রন্থে পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবিদদের ভুল-ভ্রান্তি এবং কখনো কখনো তাঁদের অবৈধ মিথ্যাচার ও অপবাদের ওপরও হাত দেব। যার ফলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে,তাঁরা কতটা জেনে-শুনে ও ইচ্ছা প্রণোদিত হয়ে সরল ব্যক্তিদের মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার প্রয়াস চালিয়েছেন!

পাদ্রী বাহীরার সাথে শিশু মহানবীর সাক্ষাৎ আসলে একটি অত্যন্ত সাদামাটা ঘটনা। কিন্তু প্রাচ্যবিদরা বহু শতাব্দী পরে এ ঘটনাকে তাঁদের বক্তব্যের দলিল হিসাবে উত্থাপন করে জোর দিয়ে বলতে চান যে,হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর উন্নত ও মহান শিক্ষামালা যা তিনি ২৮ বছর পরে জনসমক্ষে প্রকাশ ও প্রচার করেছিলেন এবং আবে হায়াতের (অমৃত) মতো মৃতপ্রায় আরব জাতিকে উজ্জীবিত করেছিলেন আসলে তা তিনি উপরিউক্ত সফরেই বাহীরা থেকে শিখেছিলেন। এ ব্যাপারে তাঁরা বলতে চান যে,হযরত মুহাম্মদ (সা.) যেহেতু নির্মল,পবিত্র,স্বচ্ছ হৃদয়,পুণ্য আত্মা এবং প্রকৃতি প্রদত্ত অসাধারণ স্মরণশক্তির অধিকারী এবং সূক্ষ্মভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে সক্ষম ছিলেন তাই তিনি উক্ত সাক্ষাতেই পূর্ববর্তী নবী ও আদ-সামূদের মতো ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের কাহিনী এবং তাঁর ধর্মের অধিকাংশ প্রাণসঞ্জীবনী শিক্ষা ও বিধান এ খ্রিষ্টান পাদ্রীর কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন।

নিঃসন্দেহে উপরিউক্ত বক্তব্য অলীক কল্পনা বৈ আর কিছুই নয় এবং মহানবীর জীবনেতিহাসের সাথে তা বিন্দুমাত্র খাপ খায় না। আর বুদ্ধিবৃত্তিক মাপকাঠি ও নীতিমালাও তা প্রত্যাখ্যান করে। আমাদের এ বক্তব্যের পক্ষে দলিলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো :

১. হযরত মুহাম্মদ (সা.) সকল ঐতিহাসিকের মতে নিরক্ষর (উম্মী) ছিলেন। তিনি লিখতে-পড়তে জানতেন না। আর শামদেশ সফরের সময় তাঁর বয়স ১২ বছরও পূর্ণ হয় নি। এমতাবস্থায় কোন বিবেকবান ব্যক্তি কি বিশ্বাস করতে পারবে যে,যে শিশু লেখাপড়া করে নি এবং যার বয়সের বারোটি বসন্তও অতিক্রান্ত হয় নি সে কি তাওরাত ও ইঞ্জিল থেকে বেশ কিছু বিষয় শিখে নিয়ে ৪০ বছর বয়সে তা ওহী হিসাবে প্রচার এবং এক নতুন শরীয়তের প্রবর্তন করেছে? এ ধরনের বিষয় স্বাভাবিক নিয়ম-নীতিমালার বাইরে এবং মানুষের সামর্থ্য ও ক্ষমতা বিবেচনা করলে তা অসম্ভব বলেই গণ্য করা যায়।

২. যে সময়ের মধ্যে হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাওরাত ও ইঞ্জিল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারবেন এ সফরের সময়কাল তার চেয়েও অতি সংক্ষিপ্ত ছিল। কারণ এ সফর ছিল বাণিজ্যিক সফর। যাওয়া-আসা এবং বিদেশে অবস্থানকাল সর্বসাকুল্যে ৪ মাসের বেশি লাগত না। কারণ কুরাইশগণ বছরে দু বার সফরে বের হতো। শীতকালে তারা ইয়েমেনের দিকে এবং গ্রীষ্মকালে শামদেশের দিকে সফর করত। তাই এত অল্প সময়ের মধ্যে যে,তাদের পুরো সফর কাল ৪ মাসের বেশি হতে পারে এ কথা কল্পনা করা যায় না। আর পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ব্যক্তিগণও এত অল্প সময়ের মধ্যে এ দু বৃহৎ ধর্মীয় গ্রন্থ শিক্ষা ও আয়ত্ত করতে সক্ষম হবেন না। একজন নিরক্ষর শিশুর পক্ষে তো এ কাজ মোটেও সম্ভব নয়। এ ছাড়াও তিনি পুরো এ চার মাস পাদ্রী বাহীরার সাথে ছিলেন না;বরং শামদেশ যাওয়ার পথে কোন এক স্থানে এ সাক্ষাৎটি হয়েছিল। আর গোটা সাক্ষাৎকাল বড় জোর কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল।

৩. ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণাদি থেকে প্রমাণিত হয় যে,শিশু মহানবীকে নিজের সাথে শামদেশে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেই আবু তালিব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁদের প্রকৃত গন্তব্যস্থল বুসরা ছিল না;বরং বুসরা ছিল শামে যাওয়ার পথে অবস্থিত একটি এলাকা যেখানে বাণিজ্যিক কাফেলাসমূহ বিশ্রাম করার জন্য কখনো কখনো যাত্রাবিরতি করত। তাই এটি কিভাবে সম্ভব যে,মহানবী সেখানে অবস্থান করে তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষায় ব্রত হবেন? আর যদি বলি যে,আবু তালিব তাঁকে নিজের সাথে শামে নিয়ে গিয়েছিলেন অথবা সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে মক্কায় ফিরে গিয়েছিলেন অথবা অন্য কোন ব্যক্তির সাথে তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রকে মক্কায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাহলে কোন অবস্থায়ই বুসরা আবু তালিবের বাণিজ্যিক কাফেলার প্রকৃত গন্তব্যস্থল ছিল না। যার ফলে কাফেলা উক্ত অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়বে আর মহানবীও সেখানে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করবেন।

৪. যদি মহানবী উক্ত পাদ্রীর কাছ থেকে কতিপয় বিষয় শিখে থাকেন তাহলে তা অবশ্যই কুরাইশদের মধ্যে খ্যাতি লাভ করত এবং সকলেই ফেরার পর তা বর্ণনা করত। তা ছাড়া মহানবীও তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে দাবি করতে পারতেন না যে, হে লোকসকল! আমি নিরক্ষর ও লেখাপড়া শিখি নি।” অথচ মহানবী তাঁর রিসালাত ও নবুওয়াত উক্ত শিরোনামেই শুরু করেছিলেন। আর তখন মক্কার কোন ব্যক্তি তাঁকে বলেনি যে, হে মুহাম্মদ! তুমি তোমার বারো বছর বয়সে বুসরায় এক পাদরীর কাছে পাঠ নিয়েছিলে (তাওরাত ও ইঞ্জিল শিখেছিলে)। আর এ সব উজ্জ্বল সত্যসমূহ তাঁর কাছ থেকেই আয়ত্ত করেছ।”

মক্কার মুশরিকগণ তাঁর প্রতি সকল প্রকার অপবাদ আরোপ করেছিল। যাতে করে তারা মহানবীর বিরুদ্ধে কোন দলিল-প্রমাণ পেতে পারে সেজন্য তারা পবিত্র কোরআনের ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করত। এমনকি তারা যখন দেখতে পেত যে,মহানবী কখনো কখনো মারওয়া পাহাড়ের একজন খ্রিষ্টান দাসের পাশে বসে রয়েছেন তখন তারা এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বলত, মুহাম্মদ তার বাণী এ গোলামটির কাছ থেকে শিখেছে।” তাই পবিত্র কোরআন তাদের এ অযৌক্তিক অপবাদ খণ্ডন করে বলেছে :

) و لقد نعلم أنّهم يقولون إنّما يعلّمه بشر لسان الذي يلحدون إليه أعجميّ و هذا لسان عربيّ مبين(

“তাদের এ বক্তব্যের ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। তারা বলে যে,এক মানুষ তাকে এ কোরআন শিক্ষা দেয়,কিন্তু যে ব্যক্তির (খ্রিষ্টান দাস) প্রতি তারা ইঙ্গিত করেছে তার ভাষা তো অনারবীয় (আজামী) আর এ গ্রন্থটি পরম বিশুদ্ধ আরবী ভাষায় অবতীর্ণ।” (সূরা নাহল : ১০৩)

কিন্তু প্রাচ্যবিদদের এ অপবাদ না পবিত্র কোরআনে উল্লিখিত হয়েছে,আর না কোন সুযোগসন্ধানী কুরাইশ তা মহানবীর বিরুদ্ধে দলিল হিসাবে ব্যবহার করেছে। আর এ থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে,এ অপবাদ আসলে আমাদের সমসাময়িক কালের প্রাচ্যবিদদের মস্তিষ্কপ্রসূত।

৫. পবিত্র কোরআনে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের যে সব কাহিনী ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে সেগুলো তাওরাত ও ইঞ্জিলে বর্ণিত কাহিনীগুলোর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ দু গ্রন্থে নবী-রাসূলদের কাহিনী অত্যন্ত জঘন্য ও ঘৃণ্যভাবে বর্ণিত হয়েছে যা কখনই বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিক নীতিমালার সাথে খাপ খায় না। পবিত্র কোরআনের সাথে এ দু গ্রন্থের তুলনা করলে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে,পবিত্র কোরআনের বিষয়বস্তু এ দু গ্রন্থ থেকে নেয়া হয় নি। আর যদি ধরেও নেয়া হয় যে,হযরত মুহাম্মদ (সা.) পূর্ববর্তী জাতি ও উম্মতদের কাহিনী সংক্রান্ত তথ্য ও জ্ঞান বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়ম অর্থাৎ তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিভিন্ন গ্রন্থ ও অধ্যায় হতে গ্রহণ করেছেন তাহলে অবশ্যই তাঁর বক্তব্য ও বাণীর সাথে কুসংস্কার ও কল্পকাহিনী মিশ্রিত হয়ে যাবে।১৫৫

৬. শামদেশ গমনের পথে অবস্থিত বুসরা এলাকার খ্রিষ্টান পাদরী যদি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মতো একজন নবীকে প্রশিক্ষিত করে সমাজকে উপহার দেয়ার মতো এতটা ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক জ্ঞান ও তথ্যাবলীর অধিকারী হতেন তাহলে কেন তিনি খ্যাতি অর্জন করেন নি? কেন তিনি অজ্ঞাত রয়ে গেলেন? কেন তিনি মুহাম্মদ (সা.) ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তিকে প্রশিক্ষিত করেন নি,অথচ তাঁর আশ্রম ও উপাসনালয়ে সর্বদা জনতা যিয়ারত করতে আসত?

৭. খ্রিষ্টান লেখকগণও মহানবী হযরত মুহাম্মদকে একজন বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী ব্যক্তি হিসাবেই জানেন। আর পবিত্র কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী পূর্ববর্তী নবী-রাসূল এবং জাতিসমূহের কাহিনী ও ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর কোন তথ্যই জানা ছিল না। ঐ সব নবী-রাসূল এবং জাতি সংক্রান্ত জ্ঞান তিনি কেবল ওহী মারফত লাভ করেছেন-অন্য কোন সূত্র থেকে পান নি। সূরা কাসাসের ৪৪ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে :

) و ما كنت بجانب الغربي إذ قضينا إلى موسى الأمر و ما كنت من الشّاهدين(

“যখন আমি মূসাকে রিসালাতের দায়িত্বভার প্রদান করেছিলাম তখন আপনি তুর পাহাড়ের পশ্চিম প্রান্তে ছিলেন না এবং আপনি তা প্রত্যক্ষও করেন নি।”

সূরা হুদের ৪৯ নং আয়াতে হযরত নূহ (আ.)-এর কাহিনী বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে :

) تلك من أنباء الغيب نوحيها إليك ما كنت تعلمها أنت و لا قومك من قبل هذا(

“এগুলো হচ্ছে অদৃশ্যজগতের সংবাদ যা আমরা আপনার প্রতি ওহী করেছি। না আপনি এর আগে এ সব সংবাদ ও কাহিনী সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন,আর না আপনার সম্প্রদায় (এগুলো জানত)।”

এ সব আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়ে যায় যে,মহানবী এ সব ঘটনা ও কাহিনী সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন না। সূরা আলে ইমরানের ৪৪ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে :

) ذلك من أنباء الغيب نوحيه إليك و ما كنت لديهم إذ يُلقون أقلامهم أيّهم يكفل مريم و ما كنت لديهم إذ يختصمون(

“এটি হচ্ছে অদৃশ্য জগতের সংবাদ যা আপনার প্রতি আমরা ওহী করেছি;আর আপনি তাদের কাছে ছিলেন না যখন তারা লটারী করছিল যে,কে তাদের মধ্য থেকে মরিয়মের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করবে? (তাদের প্রত্যেকেই চাচ্ছিল যে,সে এ গৌরবের অধিকারী হবে) এবং তারা যখন এ ব্যাপারে পরস্পর বিবাদ করছিল তখনও আপনি তাদের নিকট ছিলেন না।”

তাওরাত গ্রন্থ সম্পর্কে একটি পর্যালোচনা

নবী-রাসূলদের কাহিনী বর্ণনা করার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থ এতটা অসংলগ্ন কথাবার্তা,আলোচনা ও বক্তব্যে ভরপুর যে,তা কখনই ওহীর সাথে সম্পর্কিত করা সম্ভব নয়। আমরা এতৎসংক্রান্ত তাওরাত থেকে কিছু নমুনা পেশ করব যার ফলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে যে,মহানবী (সা.) যদি খ্রিষ্টান পাদ্রী বাহীরার কাছ থেকেই পবিত্র কোরআন শিখে থাকবেন তাহলে পবিত্র কোরআনে কেন তাওরাতে বর্ণিত জঘন্য ও ঘৃণ্য বিষয়সমূহের কোন অস্তিত্ব নেই? যেমন :

১. তাওরাতের সৃষ্টি’সংক্রান্ত পুস্তিকার ৩২ নং অধ্যায়ের ২৫-৩০ নং বাক্যে বর্ণিত আছে,মহান আল্লাহ্ এক রাতে প্রভাত হওয়া পর্যন্ত হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর সাথে কুস্তি লড়েছিলেন!

২. মহান আল্লাহ্ হযরত আদম (আ.)-কে মিথ্যা বলেছিলেন, যদি এ গাছের ফল খাও তাহলে তুমি মারা যাবে? অথচ যদি তাঁরা ঐ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করতেন তাহলে মহান আল্লাহর ন্যায় ভালো-মন্দ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতেন! যেহেতু তাঁরা (ঐ নিষিদ্ধ গাছের ফল) খেয়েছিলেন তাই তাঁরা (ভালো-মন্দ সম্পর্কে) জ্ঞাত হয়েছিলেন!১৫৬

৩. তাওরাত হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর ওপর দু জন ফেরেশতার অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছে : খোদা দু জন ফেরেশতার সাথে নিচে (ভূপৃষ্ঠে) অবতরণ করলেন যাতে করে তিনি মানব জাতির ব্যাপারে যাচাই করতে পারেন যে,যা কিছু তাঁর কাছে পৌঁছায় তা সত্য না মিথ্যা। এ কারণেই তিনি ইবরাহীমের কাছে প্রকাশিত হলেন। ইবরাহীম বললেন, আপনাদের পা ধুয়ে দেয়ার জন্য কি পানি আনব? খোদা ও ফেরেশতাদ্বয় ক্লান্ত ছিলেন। তাই তাঁরা বিশ্রাম করলেন এবং খাদ্য গ্রহণ করলেন।১৫৭

সম্মানিত পাঠকবর্গ! আপনারা পবিত্র কোরআনের কাহিনীগুলো অধ্যয়ন করে বিচার করুন যে,এ কথা বলা কি সম্ভব,পবিত্র কোরআন যা এত বড় সম্মানের অধিকারী সে গ্রন্থটি নবী-রাসূলদের সাথে সংশ্লিষ্ট কাহিনীগুলো তাওরাত থেকে ধার করেছে? যদি তাওরাত থেকেই নিয়ে থাকে তাহলে তাওরাতের উপরিউক্ত কুসংস্কারগুলোর লেশমাত্রও কেন পবিত্র কোরআনের মধ্যে নেই?

ইঞ্জিলের প্রতি দৃষ্টিপাত

আমরা এখানে ইঞ্জিল থেকে তিনটি বিষয় বর্ণনা করব যার ফলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হবে যে,মুসলমানদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআনের উৎস কি এ ইঞ্জিল না অন্য কোথাও?

হযরত ঈসা মসীহ্ (আ.)-এর মুজিযা

হযরত ঈসা (আ.) মা এবং শিষ্যদের সাথে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন। ইত্যবসরে মদ শেষ হয়ে গেলে তিনি সাত মশক পানি অলৌকিকভাবে মদে রূপান্তরিত করে দিলেন।১৫৮ ঈসা (আ.) একটি পেয়ালা নিয়ে তাদের হাতে দিয়ে বললেন, পান কর। কারণ এটি হচ্ছে আমার রক্ত। ১৫৯

কিন্তু সম্মানিত পাঠকবর্গ! আপনার ইতোমধ্যে জেনেছেন যে,মদ্যপান সংক্রান্ত পবিত্র কোরআনের যুক্তি এতৎসংক্রান্ত ইঞ্জিলের বক্তব্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, হে লোকসকল! মদ ও জুয়া যে কোন ধরনেরই হোক না কেন-তা অপবিত্র এবং শয়তানের কর্ম। তাই এগুলো থেকে দূরে থাক। তাহলে তোমরা সফলকাম হবে। ১৬০ তাই এমতাবস্থায় হযরত মুহাম্মদ (সা.) কি পবিত্র কোরআন বুসরার খ্রিষ্টান পাদ্রী বাহীরার কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন?

বর্তমানে বিদ্যমান ইঞ্জিল হযরত ঈসাকে একজন দুর্ভাগা ব্যক্তি’হিসাবে পরিচিত করিয়ে দেয় যিনি ছিলেন তাঁর মায়ের প্রতি নির্দয়।১৬১ অথচ পবিত্র কোরআন ঈসা (আ.)-এর ব্যাপারে ইঞ্জিলের উপরিউক্ত বক্তব্যের ঠিক বিপরীতটিই উল্লেখ করেছে :

) وبّرا بوالدتي و لم يجعلني جبّارا شقيّا(

“...আমাকে আমার জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি পুণ্য করার আদেশ দিয়েছেন এবং তিনি আমাকে দুর্ভাগা,অত্যাচারী ও অবাধ্য করেন নি।” (সূরা মরিয়ম : ৩২)

ন্যায়পরায়ণ এবং সকল গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত ব্যক্তিগণ পবিত্র কোরআনের কাহিনী ও বিধি-বিধানসমূহ যদি তাওরাত ও ইঞ্জিলের সাথে তুলনা করেন তাহলে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করবেন যে,তাওরাত ও ইঞ্জিল পবিত্র কোরআনের ক্ষুদ্রতম প্রামাণিক উৎস হওয়ারও যোগ্যতা রাখে না।১৬২

 

অষ্টম অধ্যায় : মহানবী (সা.)-এর যৌবনকাল

সমাজপতি ও নেতাদের অবশ্যই ধৈর্যশীল,শক্তিশালী,সাহসী,বীর এবং সুমহান উদার আত্মার অধিকারী হতে হবে।

ভীরু,কাপুরুষ,দুর্বল চিত্তের অধিকারী,ইচ্ছাহীন ও ঢিলাঢালা ব্যক্তিগণ কিভাবে সমাজকে আঁকা-বাঁকা পথ অতিক্রম করিয়ে (ইপ্সিত লক্ষ্যপানে) নিয়ে যেতে পারবে? তারা কিভাবে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে? তারা কিভাবে তাদের নিজ অস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্বকে অন্যদের বিকৃতি সাধন করা থেকে রক্ষা করবে?

নেতার হৃদয় ও আত্মার উদারতা ও মহত্ত্ব এবং তাঁর শারীরিক ও মানসিক শক্তি তাঁর অনুসারীদের ওপর আশ্চর্যজনক ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। যখন আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে মিশরের প্রাদেশিক শাসনকর্তা হিসাবে নিযুক্ত করেন তখন তিনি মিশরের মজলুম জনগণের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে,তদানীন্তন স্বৈরাচারী প্রশাসনের অত্যাচারে মিশরের জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। তিনি উক্ত চিঠিতে তাঁর নিযুক্ত প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে আত্মিকভাবে সাহসী ও বীর বলে অভিহিত করেছিলেন। এখন আমরা উক্ত চিঠি থেকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্ণনা করছি। হযরত আলী (আ.) এ চিঠিতে একজন দায়িত্বশীল নেতার প্রয়োজনীয় গুণাবলী বর্ণনা করেছেন :

أمّا بعد فقد بعثت إليكم عبدا من عباد الله لا ينام أيّام الخوف و لا ينكل عن الأعداء ساعات الرّوع. أشدّ على الفجّار من حريق النّار و هو مالك بن الحارث أخو مذحج فاسمعوا له و اطيعوا أمره فيما طابق الحقّ,فإنّه سيف من سيوف الله لا كليل الظّبة و لا نابى الضّريبة.

আমি তোমাদের কাছে মহান আল্লাহর একজন বান্দাকে প্রেরণ করেছি যে ভয়ের দিনগুলোতে ঘুমায় না এবং ভীতিপ্রদ মুহূর্তগুলোতে শত্রুদের থেকে বিরত থাকে না (পলায়ন করে না);অপরাধীদের প্রতি আগুনের দহন ক্ষমতার চেয়ে সে অধিকতর কঠোর। এ ব্যক্তিটি মাযহাজ গোত্রভুক্ত মালেক ইবনে হারেস (আল আশতার)। তোমরা তার কথা শুনবে এবং তার আদেশ পালন করবে যদি তা সত্য ও ন্যায়সংগত হয়;কারণ সে হচ্ছে মহান আল্লাহর তরবারি যার ধার কখনই নষ্ট হবে না এবং যার আঘাত কখনই ব্যর্থ হবে না। ১৬৩

মহানবীর আধ্যাত্মিক শক্তি

কুরাইশদের প্রিয়ভাজন ব্যক্তিটির (মুহাম্মদ) ললাটে শৈশব ও কৈশোর থেকেই শক্তি,সাহস ও দৃঢ়তার নিদর্শন স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়েছিল। তিনি ১৫ বছর বয়সে হাওয়াযিন গোত্রের বিরুদ্ধে কুরাইশদের একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন যা ফিজারের যুদ্ধ নামে খ্যাতি লাভ করেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্ব ছিল চাচাদের কাছে তীর সরবরাহ করা। ইবনে হিশাম তাঁর সীরাত গ্রন্থে এ বাক্যটি মহানবীর নিকট থেকে উদ্ধৃত করে বলেছেন : মহানবী (সা.) বলেছেন,

كنت أنبّل على أعمامي

“আমি আমার চাচাদের কাছে তীর পৌঁছে দিতাম যাতে করে তাঁরা তা নিক্ষেপ করেন। ১৬৪

ঐ অতি অল্প বয়সে মহানবীর যুদ্ধে যোগদান আমাদেরকে তাঁর অসীম সাহসের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় এবং এ থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে,কেন আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) মহানবীর ব্যাপারে বলেছেন,

كنّا إذا احمرّ البأس اتّقينا برسول الله (ص) فلم يكن أحد منّا أقرب إلى العدوّ منه

“যখনই যুদ্ধের বিভীষিকা তীব্র হয়ে যেত তখনই আমরা রাসূল (সা.)-এর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করতাম। কারণ আমাদের মধ্য হতে কোন ব্যক্তি তাঁর চেয়ে শত্রুর অধিকতর নিকটবর্তী ছিল না। ১৬৫

আমরা ইনশাল্লাহ্ মুশরিকদের সাথে মুসলমানদের জিহাদ’সংক্রান্ত অধ্যায়ে ইসলামের সমরনীতির দিকে ইঙ্গিত করব। আর সেখানে আমরা মুসলমানদের যুদ্ধ ও সংগ্রাম করার পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা করব। এ সব যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান মহানবী (সা.)-এর নির্দেশেই বাস্তবায়িত হয়েছে। আর ঠিক এ বিষয়টিই ইসলামের ইতিহাসের অত্যন্ত আকর্ষণীয় আলোচ্য বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত।

হীরা ও গাসসান রাজ্যসমূহ

আরব উপদ্বীপের যে সব অঞ্চলের জলবায়ু ও আবহাওয়া ভালো ছিল সে সব অঞ্চল ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে সর্বশেষ শতাব্দীতে পুরোপুরি তিন বৃহৎ শক্তি অর্থাৎ ইরান,রোম ও আবিসিনিয়ার অধীন ছিল। আরব উপদ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ইরানের প্রভাবাধীন,উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল রোমের অনুগত এবং মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল হাবাশাহ্ অর্থাৎ আবিসিনিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। এ সব সভ্য রাষ্ট্রের পাশে থাকার কারণে এবং ঐ সব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বদা দ্বন্দ্ব থাকার কারণে আরব উপদ্বীপের সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহে অর্ধ-স্বাধীন ও অর্ধ-সভ্য বেশ কিছু রাজ্যের পত্তন হয়েছিল যেগুলোর প্রতিটিই ছিল নিজ নিজ প্রতিবেশী সভ্য বৃহৎ সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের অনুগত। হীরা,গাসসান ও কিন্দাহ্ ছিল ঐ ধরনের রাজ্য যেগুলোর প্রতিটি ছিল পারস্য,রোম ও আবিসিনীয় সাম্রাজ্যের যে কোন একটির প্রভাবাধীন।50

ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণাদি অনুযায়ী খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমাংশে আশকানীয় যুগের শেষের দিকে কতিপয় আরব গোত্র ফোরাত নদীর পাড়ে অবস্থিত এলাকায় বসতি স্থাপন করে এবং ইরাকের একটি অংশকে নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে আসে। তারা ধীরে ধীরে এ সব বসতি স্থাপনকারী আরব গ্রাম,দুর্গ,শহর ও নগর প্রতিষ্ঠা করে যেগুলোর মধ্যে হীরা’নগরটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ নগরীটি বর্তমান কুফা নগরীর নিকটেই অবস্থিত ছিল।

এ শহরটি ছিল দুর্গ-নগরী। আর এ বিষয়টি এ শহরের নামকরণ থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে যায়।51 এ নগরীতে আরবগণ বসবাস করত। তবে ধীরে ধীরে তা শহরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ফোরাত অঞ্চলের ভালো জলবায়ু এবং প্রচুর নদ-নদীর অস্তিত্ব ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকূল হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চল আবাদ হয়েছিল। ঐ অঞ্চলের অধিবাসিগণ মরুবাসী আরব সর্দারদেরকে কৃষ্টি ও সভ্যতার আহবান জানাতে সক্ষম হয়েছিল। হীরা অঞ্চলের অধিবাসিগণ পারস্যের প্রতিবেশী হওয়ার কারণে পারস্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা উপকৃত হয়েছিল। খওরানাক প্রাসাদের ন্যায় হীরার সন্নিকটে বেশ কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিল যা উক্ত নগরীকে এক বিশেষ সৌন্দর্য দান করেছিল। এ অঞ্চলের আরবগণ লিপি ও লিখনপ্রণালীর সাথে পরিচিত হয়েছিল এবং সম্ভবত সেখান থেকেই লিপি ও লিখনপ্রণালী আরব উপদ্বীপের অন্যান্য স্থানে প্রচলিত হয়েছিল।52

হীরার শাসনকর্তা ও আমীরগণ বনি লাখম গোত্রের আরব ছিলেন এবং পারস্যের সাসানীয় সম্রাটগণ তাঁদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। হীরার আমীরদের সাসানীয় সম্রাটগণ এ কারণে সমর্থন করতেন যাতে করে তাঁরা তাঁদের (হীরার আমীরগণ) ইরান ও আরব বেদুইনদের মাঝে অন্তরায় হিসাবে গড়ে তুলতে এবং তাঁদের সহায়তায় পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহে লুণ্ঠনকারী আরব বেদুইন ও যাযাবরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন। (হীরার) এ সব আমীরের নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। হামযাহ্ ইসফাহানী এ সব আমীরের নাম ও আয়ুষ্কাল এবং যে সব সাসানীয় সম্রাট তাঁদের সমসাময়িক ছিলেন তাঁদের একটি তালিকা প্রদান করেছেন।53

যা হোক বনি লাখম বংশের রাজ্য ছিল হীরা অঞ্চলের বৃহত্তম আরবীয় রাজ্য যা ছিল অর্ধসভ্য। এ বংশের সর্বশেষ বাদশাহ্ ছিলেন নূমান বিন মুনযির যিনি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ কর্তৃক অপসারিত ও নিহত হয়েছিলেন। তাঁর অপসারণ ও হত্যার কাহিনী ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।54

পঞ্চম শতাব্দীর শেষে অথবা ষষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে একদল বহিরাগত আরব আরব উপদ্বীপের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে যা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী। এ দেশটি রোমান সাম্রাজ্যের ছত্রছায়ায় ছিল এবং ঠিক যেমনি হীরার শাসকবর্গ পারস্য সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল ঠিক তেমনি গাসসানীয় রাজ্যের শাসকবর্গও বাইজান্টাইনীয় সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল।

গাসসান দেশটি কিছুটা সভ্য ছিল। যেহেতু দেশটির সরকারের কেন্দ্র একদিকে দামেস্কের কাছাকাছি,অন্যদিকে বসরার নিকটবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সেহেতু এ দেশটি রোমান প্রভাবাধীন আরব অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। আর অত্র এলাকাতে রোমান সভ্যতা ও সংস্কৃতি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।

গাসসানিগণ হীরার লাখম গোত্রভুক্ত শাসকবর্গ এবং ইরানীদের সাথে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব থাকার কারণে রোমান সাম্রাজ্যের মিত্র হয়েছিল। প্রায় 9 অথবা 10 গাসসানী আমীর একের পর এক এ দেশটিতে শাসনকার্য পরিচালনা করেছে।

হিজাযে প্রচলিত ধর্ম

হিজাযে যে ধর্ম প্রচলিত ছিল তা ছিল পৌত্তলিক ধর্ম। কেবল ইয়াসরিব (মদীনা) ও খাইবারে ইয়াহুদী সংখ্যালঘুরা বসবাস করত। ইয়েমেন ও হিজাযের সীমান্তবর্তী শহর নজরানের অধিবাসীরা যেমনি খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ছিল,ঠিক তদ্রূপ আরব উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন এলাকা হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চলেও খ্রিষ্টধর্ম প্রচলিত ছিল। যদি এ তিন সংবেদনশীল এলাকা বাদ দেই তাহলে হিজাযের অন্য সব এলাকায় মূলত বিভিন্ন আকার-অবয়বে মূর্তিপূজা এবং বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।

তবে হানীফ’(حنيف ) নামে পরিচিত অতি মুষ্টিমেয় ব্যক্তি তাওহীদী মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যারা নিজেদের হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর ধর্মের অনুসারী বলে জানত। তাদের সংখ্যা আসলেই খুব কম ছিল। তদানীন্তন পৌত্তলিক আরব জনসংখ্যার তুলনায় তাদের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল।55

হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সময় থেকে ধর্মীয় ও চারিত্রিক আচার-প্রথা ও বিধিসমন্বিত একত্ববাদী ধর্ম হিজাযে প্রবর্তিত ও প্রচলিত হয়েছিল। পবিত্র কাবার সম্মানার্থে হজ্বব্রত পালন ছিল ঐ সব প্রথারই অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীকালে আমর বিন কুসাই নামের খুযাআ গোত্রের এক ব্যক্তি-যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব ছিল তার মাধ্যমে পবিত্র মক্কা নগরীতে মূর্তিপূজার প্রচলন হয়। এ ব্যক্তি শাম (সিরিয়া) ভ্রমণ করার সময় দেখতে পেয়েছিল যে,আমালাকা সম্প্রদায় সুন্দর সুন্দর প্রতিমার পূজা করে। তাদের এ কাজ তার মনঃপূত হয় এবং সে হুবাল’নামের একটি সুন্দর প্রতিমা শাম থেকে মক্কায় আনয়ন করে এবং জনগণকে তা পূজা করার ব্যাপারে আহবান জানায়।56

প্রসিদ্ধ প্রতিমাসমূহ : 1. হুবাল 2. আসাফ 3. নায়েলাহ্ 4. লাত 5. উয্যা 6. মানাত 7. আমইয়ানুস 8. সা দ 9. যূল খালসাহ্ 10. মান্নাফ।

এগুলোই ছিল আরবদের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রতিমা। এ সব প্রতিমা ছাড়াও আরবদের অন্যান্য প্রতিমার উপাসনাও প্রচলিত ছিল। কখনো কখনো কোন গোত্র,এমনকি কোন কোন বংশের নিজস্ব প্রতিমা ও মূর্তি ছিল যাকে তারা পূজা করত।

হিজাযে জ্ঞান ও শিক্ষা

হিজাযের জনগণ ও অধিবাসীদের উম্মী’বলা হতো। উম্মী’শব্দের অর্থ অশিক্ষিত। অর্থাৎ ঐ ব্যক্তিকে উম্মী বলা হয় যে মায়ের পেট থেকে যে অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিল ঠিক সে অবস্থায়ই রয়েছে। (জাহেলিয়াতের যুগে) আরবদের মধ্যে জ্ঞান ও শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে,ইসলামের শুভ অভ্যুদয়ের লগ্নে কুরাইশ গোত্রে কেবল 17 ব্যক্তি লেখাপড়া জানত। আর মদীনায় আওস’ও খাযরাজ’গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কেবল 11 জন লেখাপড়া জানত।57

আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত এ আলোচনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে মতাদর্শ,চিন্তা-চেতনা,বিশ্বাস,অর্থনীতি,চরিত্র,আচার-ব্যবহার এবং কৃষ্টি-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলাম ধর্মের শিক্ষা-দীক্ষার মাহাত্ম্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় এবং সব সময় সভ্যতাসমূহের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের ঐ সব সভ্যতার পূর্ববর্তী অধ্যায় অধ্যয়ন করতেই হবে। অধ্যয়নের পরই কেবল উক্ত সভ্যতার মহত্ত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন করা উচিত।58

তৃতীয় অধ্যায় : দুই পরাশক্তি ইরান ও রোমের অবস্থা

ইসলাম ধর্মের পবিত্র আন্দোলনের প্রকৃত তাৎপর্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্য দু টি পরিবেশের সমুদয় অবস্থা অধ্যয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :

1. পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার পরিবেশ অর্থাৎ যে পরিস্থিতি ও পরিবেশের মধ্যে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ও এর বিকাশ ঘটেছিল।

2. ঐ সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য অঞ্চলসমূহে যে সব জাতি বসবাস করত তাদের চিন্তাধারা,চরিত্র,আচার,রীতি-নীতি,প্রথা ও সভ্যতা অধ্যয়ন।

ইতিহাস থেকে ঐ সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত যে অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা জানতে পারি তা হলো রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা ও পরিবেশ। আলোচনা পূর্ণ করার জন্য আমাদের অবশ্যই উক্ত দু দেশের অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলোচনা ও অধ্যয়ন করতে হবে। যার ফলে ইসলাম ধর্ম যে সুমহান সভ্যতা মানব জাতিকে উপহার দিয়েছে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যাবে।

তখনকার রোমান সাম্রাজ্যের অবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্যের অবস্থা অপেক্ষা কোন অংশে কম ছিল না। গৃহযুদ্ধ এবং আর্মেনিয়া ও অন্যান্য এলাকাকে কেন্দ্র করে ইরানের সাথে সংঘটিত যুদ্ধসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের জনগণকে এক নতুন বিপ্লব বরণ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল। ধর্মীয় মতপার্থক্যসমূহ অন্য সব কিছুর চেয়ে বেশি এ সব বিরোধ ও পার্থক্যকে বিস্তৃত করেছিল। মূর্তিপূজক ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে যুদ্ধের বহ্নিশিখা নির্বাপিত হতো না। যখন গির্জার পুরোহিতগণ শাসনকর্তৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁরা তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধীদের কঠিন চাপের মধ্যে রেখেছিলেন যা একটি অসন্তুষ্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটিয়েছিল। যে বিষয়কে রোমান সাম্রাজ্যের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অন্যতম বড় কারণ বলে গণ্য করা হয়েছে তা ছিল গির্জার পুরোহিতদের সহিংসতার কারণে উক্ত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বঞ্চনা ও নাগরিক অধিকারহীনতা। একদিকে পুরোহিত ও ধর্মযাজকদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের পথ ও মত দিন দিন রোমান সাম্রাজ্যের শক্তি,ক্ষমতা ও আধিপত্য নিঃশেষ করে দিচ্ছিল।

এ সব ছাড়াও উত্তর-পূর্ব দিকের শ্বেতাঙ্গ ও পীতবর্ণের লোকেরা সর্বদা ইউরোপ মহাদেশের উর্বর অঞ্চলসমূহ নিজেদের করায়ত্তে আনার ইচ্ছা পোষণ করত এবং কখনো কখনো সামরিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধসমূহে একে অপরের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি সাধন করত। এর ফলে রোমান সাম্রাজ্য দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিকগণ বিশ্বাস করেন যে,ষষ্ঠ শতাব্দীতে রোমের রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি পারস্য সাম্রাজ্যের ওপর রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি উক্ত সাম্রাজ্যের সামরিক পরাশক্তি হওয়ার প্রমাণ বলে গণ্য করা হতো না,বরং বিশ্বাস করা হতো যে,ইরানের পরাজয় আসলে সে দেশটির প্রশাসনের বিশৃঙ্খলারই ফসল ছিল। এ দু টি দেশ যা নিজেদের ওপর বিশ্ব রাজনীতি ও নেতৃত্বের মুকুট পরিধান করেছিল তা ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব কালে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছিল। এটি স্পষ্ট যে,এ ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি একটি সঠিক ধর্ম গ্রহণ করার জন্য অসাধারণ প্রস্তুতি ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছিল যা মানব জাতির জীবনের সার্বিক অবস্থা উন্নয়নে সক্ষম।

রোমের খণ্ডকালীন আলোচনাসভাসমূহ

কিছু কিছু দেশে একদল বেকার ও প্রবৃত্তিপূজারী ব্যক্তি নিজেদের অসদুদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কতগুলো অন্তঃসারশূন্য বিষয় জনসমক্ষে উত্থাপন ও প্রচার করত এবং এভাবে তারা জনগণের মূল্যবান জীবন নষ্ট করত। প্রাচ্যের অনেক দেশেই আমাদের এ বক্তব্যের পক্ষে প্রচুর দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান যা বর্তমানে আলোচনা করার কোন অবকাশ নেই। ঘটনাচক্রে তখনকার রোম অন্য সব দেশের চেয়ে বেশি এ ধরনের সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছিল। যেমন রোমান সম্রাট ও রাজনীতিকগণ কিছু কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুসারী হওয়ার কারণে বিশ্বাস করতেন যে,হযরত ঈসা মসীহ্ (আ.) দু ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। কিন্তু কিছু সংখ্যক ইয়াকুবী সম্প্রদায়ভুক্ত খ্রিষ্টান বিশ্বাস করত যে,হযরত ঈসা (আ.) কেবল এক ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। আর ভিত্তিহীন এ বিষয়টিই রোমান সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব,ঐক্য ও সংহতির ওপর তীব্র আঘাত হানে এবং তাদের মধ্যে এক গভীর ফাটলের উদ্ভব ঘটায় যার ফলে সরকার ও প্রশাসন নিজ আকীদা-বিশ্বাস সংরক্ষণ করতে বাধ্য হয়। আর এ কারণেই প্রশাসন বিরোধীদেরকে অতি নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়। উৎপীড়ন ও চাপের কারণে বেশ কিছুসংখ্যক বিরোধী ইরান সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এ সব বিরোধীই মুসলিম সেনাবাহিনীর সম্মুখে রণক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং মনে-প্রাণে মুসলিম সেনাবাহিনীকে বরণ করে নিয়েছিল।

তদানীন্তন রোমান সাম্রাজ্য ঠিক মধ্যযুগীয় ইউরোপের মতো ছিল। প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ফ্লামারীয়োন মধ্যযুগে ইউরোপীয় কৃষ্টির পর্যায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত কাহিনীটি বর্ণনা করেছেন : আধ্যাত্মিক সমগ্র’নামক গ্রন্থটি মধ্যযুগে স্কলাসটিক দর্শনের পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ও নিদর্শন বলে গণ্য হতো। এ গ্রন্থটি চারশ’বছর ধরে আনুষ্ঠানিক পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ইউরোপে পঠিত হতো। উক্ত গ্রন্থের একটি অংশে এ শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে : একটি সুঁইয়ের অগ্রভাগের সরু ছিদ্রের মধ্যে কত জন ফেরেশতার অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব?’‘ চিরন্তন পিতার বাম চোখের পুতুলী থেকে তাঁর ডান চোখের পুতুলী পর্যন্ত দূরত্ব কত ফারসাখ? (1 ফারসাখ = প্রায় 6 কিলোমিটার)

দুর্ভাগ্যপীড়িত রোমান সাম্রাজ্য বহিঃশক্তিগুলোর সাথে যুদ্ধে-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়ার একই সময় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিল। এ সব দ্বন্দ্ব-সংঘাত ধর্মীয় রূপ পরিগ্রহ করেছিল। আর এর ফলে দিন দিন দেশটি পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। ইয়াহুদিগণ যারা ছিল একটি ষড়যন্ত্রকারী জাতি,তারা যখন দেখল,রোমের খ্রিষ্টান সম্রাট কর্তৃক আরোপিত চাপ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে তখন তারা রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস ও এর মূলোৎপাটন করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা একবার আনতাকীয়া নগরীও দখল করে নিয়েছিল এবং নগরীর প্রধান ধর্মযাজকের কান,নাক ও ঠোঁট কর্তন করেছিল। রোম সরকার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আনতাকীয়ার ইয়াহুদীদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। রোমে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কয়েকবার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। আবার কখনো কখনো এ শত্রুতা দেশের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিল। উদাহরণস্বরূপ ইয়াহুদীরা একবার ইরান থেকে 80,000 খ্রিষ্টানকে ক্রয় করে দুম্বার মতো জবাই করেছিল।

এখানেই সম্মানিত পাঠকবর্গ ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক বিশ্বের অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অরাজক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে এবং স্বীকার করতে পারবেন যে,ইসলামের মুক্তিদানকারী শিক্ষা-দীক্ষা ও বিধি-বিধান ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে সৃষ্ট হয় নি এবং তা মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তাধারারও ফসল নয়। ঐক্য ও সহমর্মিতার মৃদুমন্দ এ সমীরণ এবং শান্তি ও মৈত্রীর সুর যা পবিত্র ইসলাম ধর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা আসলে ঐশ্বরিক উৎস থেকেই উৎসারিত হয়েছে। কিভাবে বলা সম্ভব যে,যে ইসলাম ধর্ম জীবজন্তু ও প্রাণীকুলকে পর্যন্ত জীবনধারণ করার অধিকার দিয়েছে আসলে তা এ ধরনের রক্তপিপাসু পরিবেশ থেকে উদ্ভূত?

ইসলাম ধর্ম হযরত ঈসা (আ.)-এর ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে ভিত্তিহীন এ সব আলোচনার অবসান ঘটিয়েছে এবং ঈসা (আ.)-কে ঠিক এভাবে পরিচিত করিয়েছে :

) ما المسيح بن مريم إلّا رسول قد خلت من قبله الرّسل و أمّه صدّيقة كانا يأكلان الطّعام(

“মরিয়ম তনয় মসীহ্ একজন নবীর চেয়ে বেশি কিছু নন যাঁর আগে অনেক নবী-রাসূল গত হয়েছেন। তাঁর মাতা ছিলেন একজন পূতঃপবিত্রা পরম সত্যবাদিনী। এমতাবস্থায় তাঁরা উভয়ই খাদ্য গ্রহণ করতেন এবং মানুষ ছিলেন।” (সূরা মায়েদাহ্ : 75)

পবিত্র কোরআনের এ আয়াত হযরত ঈসা (আ.)-এর আত্মা,রক্ত ও পরিচিতি সংক্রান্ত গীর্জার ধর্মযাজকদের অনর্থক আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে। এ ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ এবং মহৎ মানবীয় গুণাবলী পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে মানব জাতিকে অযথা যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত থেকে বিরত রেখেছে।


8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53

54

55

56

57

58

59

60

61