চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড3%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 242 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 106703 / ডাউনলোড: 9685
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

ইসলামের মহীয়সী নারী হযরত খাদীজাহ্

ঐ দিন পর্যন্ত মহানবী (সা.)-এর আর্থিক অবস্থা ভালো ও সুবিন্যস্ত ছিল না। তখনও তিনি চাচা আবু তালিবের আর্থিক সাহায্য ও দানের মুখাপেক্ষী ছিলেন। তাঁর কাজ ও পেশার অবস্থাও বাহ্যত খুব একটা দৃঢ় ছিল না বলেই বিবাহ করে সাংসারিক জীবনযাপন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। শামদেশে তাঁর সর্বশেষ (বাণিজ্যিক) সফর যা তিনি কুরাইশ বংশীয়া একজন ধনাঢ্য মহিলার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হয়ে আঞ্জাম দিয়েছিলেন সেই সফরের বদৌলতে তাঁর আর্থিক অবস্থা বেশ কিছুটা সচ্ছল হয়েছিল। যুবক মহানবীর সাহসিকতা ও দক্ষতা খাদীজাকে বিস্ময়াভিভূত করেছিল। তিনি তাঁকে চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়েও বেশি অর্থ পুরস্কারস্বরূপ প্রদান করার ইচ্ছা করলেন। কিন্তু মহানবী (সা.) যে পারিশ্রমিক কাজের শুরুতেই নির্ধারণ করা হয়েছিল কেবল সেটিই গ্রহণ করলেন। এরপর তিনি চাচা আবু তালিবের গৃহের দিকে রওয়ানা হলেন এবং এ সফরে যা কিছু লাভ করেছিলেন তার পুরোটাই আবু তালিবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার জন্য চাচার হাতে অর্পণ করলেন।

তাঁকে দেখেই অধীর আগ্রহে ভ্রাতুষ্পুত্রের জন্য অপেক্ষমান চাচার চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু ঝরতে লাগল। এই ভ্রাতুষ্পুত্র ছিল তাঁর পিতা আবদুল মুত্তালিব ও ভ্রাতা আবদুল্লাহর একমাত্র স্মৃতি। ভ্রাতুষ্পুত্রের ব্যবসায়িক সাফল্য এবং যে প্রচুর লাভ তিনি অর্জন করেছিলেন সে সম্পর্কে যখন তিনি অবগত হলেন তখন তিনি খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। তিনি দু টি ঘোড়া ও দু টি উট ভ্রাতুষ্পুত্রের হাতে অর্পণ করতে চাইলেন যাতে করে তিনি তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

মহানবী এ সফরে যে অর্থ উপার্জন করেছিলেন তার পুরোটাই চাচা আবু তালিবের হাতে তুলে দেন যাতে তিনি তাঁর বিবাহের ব্যবস্থা ও আয়োজন করতে পারেন।

শামে বাণিজ্যিক সফর থেকে ফেরার পর আর্থিক সচ্ছলতা এলে মহানবী জীবনসঙ্গিনী হিসাবে একজন উপযুক্ত স্ত্রী গ্রহণ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কিভাবে হযরত খাদীজাকে তিনি কাঙ্ক্ষিত স্ত্রী হিসাবে পেলেন,অথচ উকবাহ্ ইবনে আবি মুয়ীত,আবু জাহল ও আবু সুফিয়ানের মতো ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বিবাহের প্রস্তাব তিনি ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন? কোন্ কোন্ কারণ এ দু জনকে পরস্পরের নিকটবর্তী করেছিল যাঁদের জীবনযাপন পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এবং তাঁদের মধ্যে এমন দৃঢ় সম্পর্ক,মায়া-মমতা,প্রেম-ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিকতার বন্ধন সৃষ্টি করেছিল যার ফলে হযরত খাদীজাহ্ তাঁর যাবতীয় ঐশ্বর্য ও ধন-সম্পদ স্বামী মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে অর্পণ করেছিলেন যা ইসলাম ধর্ম,কলেমা-ই তাইয়্যেবাহ্ এবং তাওহীদের পতাকা চির উন্নত ও বুলন্দ করার পথে ব্যয় করা হয়েছিল? যে গৃহের চারদিক ও অভ্যন্তরভাগ হাতীর দাঁতনির্মিত ও মুক্তাখচিত অতি মূল্যবান চেয়ার ও আসবাবপত্র দিয়ে পূর্ণ ছিল এবং যা ভারতীয় রেশমী বস্ত্র এবং কারুকাজ করা ইরানী পর্দা দিয়ে সুশোভিত ছিল তা কিভাবে অসহায় মুসলমানদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল?

এ সব ঘটনার উৎস সন্ধান করতে হলে অবশ্যই হযরত খাদীজার জীবনেতিহাস অধ্যয়ন করতে হবে। যে বিষয়টি নিশ্চিত তা হলো,যে ব্যক্তি দৃঢ়,পবিত্র ও আধ্যাত্মিক উৎসমূলের অধিকারী না হবে তার পক্ষে এ ধরনের আত্মত্যাগ করা কখনই সম্ভব হবে না।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে,এ বিবাহ মহানবীর খোদাভীতি,চরিত্র,সততা এবং বিশ্বস্ততার প্রতি খাদীজার বিশ্বাস থেকে উৎসারিত। হযরত খাদীজার জীবনচরিত এবং যে সব কাহিনী তাঁর উচ্চ মর্যাদা প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে সেগুলো থেকেও এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।

হযরত খাদীজাহ্ ছিলেন সচ্চরিত্রা রমণী। তিনি সব সময় খোদাভীরু ও চরিত্রবান স্বামীর সন্ধান করছিলেন। আর এ কারণেই মহানবী তাঁর ব্যাপারে বলেছেন, খাদীজাহ্ বেহেশতের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রমণীদের অন্তর্ভুক্ত।” তিনিই প্রথম মহিলা যিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন। আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) মহানবীর নবুওয়াতের সূচনালগ্নে ইসলাম ধর্মের নিঃসঙ্গতার দিকে ইঙ্গিত করে একটি ভাষণে বলেছেন,

لم يجمع بيت واحد يومئذ في الإسلام غير رسول الله و خديجة و أنا ثالثهما

“সে দিন রাসূলুল্লাহ্ ও খাদীজার গৃহ ব্যতীত ইসলামে বিশ্বাসী আর কোন ঘর ছিল না;আমি ছিলাম তাঁদের পর ইসলামে বিশ্বাসী তৃতীয় ব্যক্তি। ১৮১

ইবনে আসীর লিখেছেন, আফীফ নামের একজন ব্যবসায়ী মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে তিন ব্যক্তির ইবাদাত-বন্দেগীর দৃশ্য অবলোকন করে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হয়েছিল। সে দেখতে পেল যে,মহানবী (সা.) খাদীজাহ্ ও আলীর সাথে সেই মহান আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল ঐ এলাকার অধিবাসীরা যার ইবাদাত-বন্দেগী ত্যাগ করে মিথ্যা উপাস্য ও দেব-দেবীর পূজা-অর্চনায় লিপ্ত হয়েছে। ঘটনা যাচাই করার জন্য সে মহানবীর চাচা আব্বাসের সাথে যোগাযোগ করে যা সে দেখেছে তা তাঁর কাছে বর্ণনা করে এবং তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে। মহানবীর চাচা আব্বাস তাঁকে বলেছিলেন : প্রথম ব্যক্তিটি নবুওয়াতের দাবিদার;আর ঐ মহিলা তার স্ত্রী খাদীজাহ্ এবং ঐ তৃতীয় ব্যক্তিটি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র আলী। এরপর তিনি বললেন :

ما علمت على ظهر الأرض كلّها على هذا الدين غير هؤلاء الثّلاثة

এ তিন ব্যক্তি ব্যতীত পৃথিবীর বুকে এ ধর্মের আর কোন অনুসারী আছে কি না তা আমার জানা নেই। ১৮২

যে সব হাদীস ও রেওয়ায়েতে হযরত খাদীজার মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে আসলে তা বর্ণনা করা আমাদের এ গ্রন্থের সীমিত কলেবরে সম্ভব নয়। তাই এ ঐতিহাসিক ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণগুলো এখন ব্যাপকভাবে আলোচনা করাই আমাদের জন্য সমীচীন হবে।

বিবাহের প্রকাশ্য ও গুপ্ত কারণসমূহ

বস্তুবাদীরা যারা সকল বিষয় ও জিনিসকে বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে তারা হয়তো ভাবতে পারে যে,যেহেতু খাদীজাহ্ ধনাঢ্যা মহিলা ও ব্যবসায়ী ছিলেন সেহেতু তাঁর ব্যবসায়িক কাজ-কর্ম দেখাশোনা করার জন্য অন্য কিছুর চেয়ে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। এ কারণে তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বিবাহ করেন। আর যেহেতু হযরত মুহাম্মদও খাদীজার মর্যাদাসম্পন্ন জীবন সম্পর্কে অবগত ছিলেন,যদিও তাঁদের মধ্যে বয়সের দিক থেকে কোন মিল ছিল না তারপরও তিনি তাঁর বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু ইতিহাস থেকে প্রতীয়মান হয় যে,কুরাইশদের শ্রেষ্ঠ সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে তাঁকে যে সব বিষয় উদ্বুদ্ধ করেছিল তা ছিল কতগুলো আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিষয়-কতগুলো বস্তুগত দিক ও বিষয় নয়। নিচে আমরা এর সপক্ষে প্রমাণ পেশ করছি :

১. যখন হযরত খাদীজাহ্ মাইসারার কাছ থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শাম সফরের বিবরণ জানতে চেয়েছিলেন তখন সে ঐ সফরে যে সব অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল এবং শামের খ্রিষ্টান পাদ্রীর কাছ থেকে যা শুনেছিল সব কিছু খাদীজার কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করেছিল। খাদীজাহ্ তাঁর নিজের মধ্যে যে তীব্র ভালোবাসা,আকাঙ্ক্ষা ও আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন এর উৎস ছিল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নীতি-নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ। তাই তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে বলেই ফেললেন, মাইসারাহ্! যথেষ্ট,মুহাম্মদের প্রতি আমার টান ও আগ্রহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছ। যাও আমি তোমাকে ও তোমার স্ত্রীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দিলাম এবং তোমাকে দু শ দিরহাম,দু টি ঘোড়া এবং কিছু মূল্যবান পোশাক দিয়ে দিলাম।”

এরপর তিনি মাইসারার কাছ থেকে যা কিছু শুনেছিলেন তা আরবের পণ্ডিত ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেলের কাছে বর্ণনা করলেন। তিনি শোনার পর বললেন, এ সব অলৌকিক ঘটনা সংঘটনকারী ব্যক্তি হচ্ছেন আরবীয় নবী। ১৮৩

২. একদিন খাদীজাহ্ তাঁর ঘরে বসেছিলেন। তাঁর চারপাশ ঘিরে রেখেছিল দাস-দাসীরা। একজন ইয়াহুদী পণ্ডিতও উক্ত মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাক্রমে যুবক মহানবী (সা.) এ ঘরের পাশ দিয়ে গমন করলেন। ঐ পণ্ডিতের দৃষ্টি মহানবীর ওপর পড়লে তৎক্ষণাৎ তিনি হযরত খাদীজাকে বলেন,যাতে করে তিনি তাঁকে কিছুক্ষণের জন্য উক্ত মাহফিলে যোগদান করার জন্য অনুরোধ করেন। মহানবী ইয়াহুদী পণ্ডিতের আবেদনে সাড়া দিলেন এবং মাহফিলে অংশগ্রহণ করলেন। উল্লেখ্য যে,মহানবী (সা.)-এর মধ্যে নবুওয়াতের বিদ্যমান লক্ষণগুলো দেখেই ইয়াহুদী পণ্ডিত তাঁকে মাহফিলে অংশগ্রহণ করার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। এ সময় হযরত খাদীজাহ্ ঐ ইয়াহুদী পণ্ডিতকে লক্ষ্য করে বললেন, যদি তাঁর চাচারা আপনার আগ্রহ ও অনুসন্ধানের ব্যাপারে অবগত হন তাহলে তাঁরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন। কারণ তাঁরা ইয়াহুদীদের অনিষ্ট থেকে তাঁদের ভ্রাতুষ্পুত্রের ব্যাপারে শঙ্কিত।” এ কথা শুনে ইয়াহুদী পণ্ডিত বললেন, মুহাম্মদের অনিষ্ট সাধন করা কি কারো পক্ষে সম্ভব,অথচ মহান আল্লাহ্ তাঁকে নবুওয়াত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি ও মানব জাতির হেদায়েতের জন্য প্রতিপালিত করেছেন? খাদীজাহ্ তখন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথা থেকে জেনেছেন যে,তিনি এ ধরনের মর্যাদার অধিকারী হবেন? এ প্রশ্ন শুনে তিনি বললেন, আমি তাওরাত গ্রন্থে সর্বশেষ নবীর চি হ্ন ও নিদর্শনসমূহ অধ্যয়ন করেছি। তাঁর নিদর্শনাদির মধ্যে এও যে,তাঁর পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করবেন। তাঁর দাদা ও পিতৃব্য তাঁকে সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা করবেন। তিনি কুরাইশদের মধ্য থেকে এমন এক নারীকে বিবাহ করবেন যিনি কুরাইশদের নেত্রী।” এরপর তিনি খাদীজার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ঐ রমণীকে অভিনন্দন যিনি তাঁর স্ত্রী হবার মর্যাদা ও গৌরব অর্জন করবেন। ১৮৪

৩. খাদীজার চাচা ওয়ারাকাহ্ ছিলেন আরবের অন্যতম পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি নতুন ও পুরাতন নিয়মের বিভিন্ন গ্রন্থাদি সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান ও তথ্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি প্রায়শঃই বলতেন, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরাইশদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি মানব জাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরিত ও মনোনীত হবেন এবং কুরাইশ বংশীয়া সর্বশ্রেষ্ঠা ধনাঢ্য রমণীদের মধ্য থেকে একজনকে তিনি বিবাহ করবেন।” আর যেহেতু খাদীজাহ্ ছিলেন কুরাইশ রমণীদের মধ্যে সবচেয়ে ধনাঢ্য সেহেতু তিনি প্রায়শ হযরত খাদীজাকে বলতেন, এমন একদিন আসবে যে দিন তুমি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের সাথে শুভ পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হবে।”

৪. খাদীজাহ্ (আ.) এক রাতে স্বপ্ন দেখলেন,মক্কা নগরীর ওপর সূর্য ঘুরপাক খেয়ে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসল এবং তাঁর ঘরেই উপস্থিত হলো। তিনি তাঁর এ স্বপ্নের কথা ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেলকে বললেন। তিনি এ স্বপ্নের বিবরণ শুনে বললেন, তুমি একজন মহান ব্যক্তিকে বিবাহ করবে যার খ্যাতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।”

এগুলো হচ্ছে এমন সব ঘটনা যা কোন কোন ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন এবং অনেক ইতিহাস গ্রন্থেও লিপিবদ্ধ হয়েছে। এ সব ঘটনা থেকে মহানবীর প্রতি হযরত খাদীজার আকর্ষণের কারণ স্পষ্ট হয়ে যায়। এ সব ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে,যুবক মহানবীর আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি হযরত খাদীজার বিশ্বাস ও আস্থা থেকেই প্রধানত মহানবীর প্রতি তাঁর এ আকর্ষণের উৎপত্তি। আর যেহেতু মহানবী (অর্থাৎ কুরাইশদের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বাসী ও সত্যবাদী) খাদীজার ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা ও পরিচালনা করার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত ছিলেন সেহেতু তা খুব সম্ভবত এ বৈবাহিক সম্পর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রভাবও রাখে নি।

হযরত খাদীজার বিবাহের প্রস্তাব

এটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত বিষয় যে,হযরত খাদীজার পক্ষ থেকেই প্রথমে বিবাহের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল,এমনকি ইবনে হিশামও১৮৫ বর্ণনা করেছেন যে,খাদীজাহ্ স্বয়ং এ বিবাহের ব্যাপারে আগ্রহ প্রদর্শন করেন। তিনি মহানবীকে বলেছিলেন, হে পিতৃব্যপুত্র! আমার ও আপনার মধ্যে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে এবং আপনার সম্প্রদায়ের মাঝে আপনার যে উচ্চ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে এবং আপনার বিশ্বস্ততা এবং সত্যবাদিতার কারণে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে আমি গভীরভাবে আগ্রহী। আপনার সত্যবাদিতা আপনা থেকে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।” তখন মহানবী (সা.) তাঁকে জবাব দিয়েছিলেন, এ বিষয় সম্পর্কে আমার চাচাদেরকে অবগত করা এবং তাঁদের পরামর্শে এ কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন।”

অধিকাংশ ঐতিহাসিক বিশ্বাস করেন যে,আলীয়ার কন্যা নাফীসাহ্ খাদীজার প্রস্তাব ঠিক এভাবে মহানবীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন :

“মুহাম্মদ! কেন আপনি আপনার জীবনকে প্রদীপসদৃশ উপযুক্ত স্ত্রী অর্থাৎ জীবনসঙ্গিনীর দ্যুতি দ্বারা আলোকিত করছেন না? আপনাকে যদি রূপসী নারী,ধন-দৌলত,সম্মান ও মর্যাদার দিকে আহবান করি,তাহলে কি আপনি সাড়া দেবেন না? মহানবী বললেন, আপনার আসল উদ্দেশ্য কি? তখন নাফীসাহ্ খাদীজার কথা উত্থাপন করলেন। মহানবী বললেন, খাদীজাহ্ কি এতে সম্মত হবেন? কারণ তাঁর জীবনের সাথে আমার জীবনের অনেক পার্থক্য রয়েছে।” নাফীসাহ্ বললেন, তাঁকে রাজী করার ভার আমার ওপর। আপনি একটি সময় নির্ধারণ করুন। ঠিক সে সময় তাঁর প্রতিনিধি আমর বিন আসাদ১৮৬ আপনার ও আপনার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করে বিয়ের আক্দ ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন।”

মহানবী (সা.) তাঁর চাচাদের সাথে (বিশেষ করে আবু তালিবের সাথে) বিবাহের ব্যাপারে আলোচনা করলেন। কুরাইশ বংশীয় শীর্ষস্থানীয় ও সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে একটি গৌরবোজ্জ্বল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রথমে হযরত আবু তালিব একটি ভাষণ দেন যার শুরুতে তিনি মহান আল্লাহর প্রশংসা করার পর নিজ ভ্রাতুষ্পুত্রের পরিচিতি সবার সামনে তুলে ধরেন :

“আমার ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহকে যদি সকল কুরাইশ বংশীয় পুরুষের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে তিনি তাদের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যদিও তিনি সব ধরনের সম্পদ থেকে বঞ্চিত;কিন্তু অর্থ-সম্পদ ইত্যাদি ছায়া বৈ আর কিছুই নয় যা ক্ষণস্থায়ী। আর উচ্চ বংশমর্যাদা ও কৌলিন্য হচ্ছে এমন এক বিষয় যা স্থায়ী...। ১৮৭

হযরত আবু তালিবের ভাষণ শেষ হলে হযরত খাদীজার আত্মীয় ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেল ইবনে আসাদ ভাষণ দিলেন। হযরত আবু তালিবের উক্ত ভাষণের উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশ ও বনি হাশিমের পরিচিতি তুলে ধরা। ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেল বললেন, কোন কুরাইশই আপনাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা অস্বীকার করতে অক্ষম। আমরা আন্তরিকতার সাথে আপনাদের সুমহান মর্যাদার রজ্জুকে আঁকড়ে ধরতে চাই। ১৮৮

বিবাহের আক্দ সম্পন্ন হলো এবং মোহরানা ৪০০ দীনার নির্ধারণ করা হলো। তবে কোন কোন ঐতিহাসিক বলেছেন,মোহরানা ছিল ২০টি উট।

হযরত খাদীজার বয়স

এটিই প্রসিদ্ধ যে,এ বিয়ের সময় খাদীজার বয়স ছিল ৪০ বছর। তিনি হস্তি সালেরও ১৫ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কোন কোন ঐতিহাসিক তাঁর বয়স এর চেয়েও কম ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। মহানবীর সাথে এ বিয়ের আগে আতীক ইবনে আ য়েয এবং আবু হালাহ্ মালেক বিন বান্নাশ আত তামীমী নামক দু ব্যক্তির সাথে খাদীজার বিবাহ হয়েছিল,কিন্তু বৈবাহিক জীবনেই উক্ত স্বামীদ্বয় মৃত্যুমুখে পতিত হন।

দশম অধ্যায়: বিবাহ থেকে নবুওয়াত প্রাপ্তি পর্যন্ত

মানব জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল মুহূর্ত হচ্ছে তাঁর যৌবনকাল। কারণ এ সময় যৌন প্রবৃত্তি ও চাহিদা পূর্ণতা লাভ করে;প্রবৃত্তির পূজারী যে কোন ধরনের কামনা-বাসনাকে লালন করে;জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার ঝড় মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে তিমিরাচ্ছন্ন করে ফেলে;বস্তুগত রিপুসমূহের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য সুদৃঢ় হয় এবং এর ফলে প্রদীপতুল্য বুদ্ধিবৃত্তি নি®প্রভ হয়ে পড়ে। দিবা-রাত্রি সময়-অসময় আকাশকুসুম আকাঙ্ক্ষার এক সুরম্য অট্টালিকার চিত্র যুবকের চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে।

এ সময় যদি মানুষের হাতের মুঠোয় কোন সম্পদ থাকে তাহলে তার জীবন এক ভয়াবহ বিভীষিকায় পরিণত হয়। একদিকে পাশবিক ঝোঁক ও প্রবণতাসমূহ,শারীরিক সুস্থতা,অন্যদিকে বিবিধ বস্তুগত সুযোগ-সুবিধা,উপায়-উপকরণ এবং মোটা অংকের উপার্জন সম্মিলিতভাবে মানুষকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন এবং প্রবৃত্তির কামনা-বাসনায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত রাখে। এ সময় মানুষ তার রিপুর তাড়না ও জৈবিক প্রবণতাসমূহ মেটাতেই ব্যস্ত হয়ে যায়।

চিন্তাশীল শিক্ষকগণ এ যুগসন্ধিক্ষণকে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের সীমারেখা বলে চি হ্নিত করেছেন। খুব কমসংখ্যক যুবকই তাদের নিজেদের জন্য যুক্তিপূর্ণ জীবনযাপন পদ্ধতি,উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী এবং পবিত্র আত্মিক শক্তি অর্জন করার উদ্দেশ্যে এমন এক পথ বেছে নিতে সক্ষম হয় যা তাদেরকে সব ধরনের বিপদাপদ থেকে রক্ষা করে।

আত্মসংযম এ সময় অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। এ সময় যদি কোন যুবক পারিবারিক অঙ্গন থেকে সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ না করে তাহলে তার জীবনের জন্য দুর্ভাগ্যের অপেক্ষাই করতে হবে।

মহানবীর যৌবনকাল

যুবক মহানবী যে সাহসী,নির্ভীক,দৈহিকভাবে শক্তিশালী ও সুস্থ-সবল ছিলেন এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ তিনি এমন এক নির্মল পরিবেশে প্রতিপালিত হয়েছিলেন যা ছিল নগর জীবনের কোলাহল ও জটিলতা থেকে মুক্ত। আর তিনি এমন এক বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন সাহস ও বীরত্বের দীপ্ত প্রতীক। ধনাঢ্য রমণী খাদীজার বিপুল ধন-সম্পদ ও বিত্ত-বৈভব তাঁর করায়ত্তে ছিল। এর ফলে যে কোন ধরনের স্ফূর্তি ও আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত হওয়ার যাবতীয় উপায়-উপকরণ তাঁর জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু এখন আমাদের দেখা উচিত তিনি এ সব উপায়-উপকরণ কিভাবে ও কোন্ কাজে ব্যবহার করেছেন? তিনি কি স্ফূর্তি ও আমোদ-প্রমোদের দস্তরখান বিছিয়েছিলেন এবং অধিকাংশ যুবকের ন্যায় প্রবৃত্তির তাড়না ও কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার চিন্তায় মগ্ন থেকেছেন? অথবা তিনি কি এমন কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন যা থেকে তাঁর সুমহান আধ্যাত্মিক-নৈতিক জীবনের চিত্র স্পষ্ট ও প্রতিফলিত হয়ে যায়? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে,তিনি বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ন্যায় জীবনযাপন করতেন। তিনি সর্বদা আমোদ-প্রমোদ ও উদাসীনতা বর্জন করেছেন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে সর্বদা গভীর মনন ও চিন্তাশীলতার চি হ্ন বিদ্যমান থাকত। সমাজের নৈতিক অধঃপতন থেকে দূরে থাকার জন্য কখনো কখনো তিনি দীর্ঘক্ষণ পাহাড়ের পাদদেশে ও গুহায় নিভৃতে জীবনযাপন এবং অস্তিত্বজগতের সৃষ্টি ও বিশ্ব-ব্র‏‏ হ্মাণ্ডের মহান স্রষ্টার বিদ্যমান শক্তির নিদর্শনাদি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন।

যৌবনকালীন আবেগ ও অনুভূতিসমূহ

মক্কার বাজারে একবার এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল যা তাঁর সুকুমার মানবীয় আবেগ ও অনুভূতিকে মারাত্মকভাবে আহত করেছিল। তিনি বাজারে গিয়ে দেখতে পেলেন যে,এক জুয়ারী জুয়া খেলায় মগ্ন। ভাগ্য খারাপ হওয়ায় সে প্রথমে তার উটটি হারালো। এরপর তার নিজ বসত বাড়িটিও হারালো। এরপর খেলাটা এমন ভয়ঙ্কর পর্যায়ে উপনীত হলো যে,সে তার জীবনের দশ বছরও হারালো (অর্থাৎ যার কাছে জুয়ায় হেরেছে তার কাছে দশ বছর সে ক্রীতদাসের মতো কাজ-কর্ম করবে। এ দশ বছর তার কোন স্বাধীনতাই থাকবে না)। এ দৃশ্য দেখে যুবক মহানবী এতটা ব্যথিত হলেন যে,তিনি ঐ দিন আর মক্কায় থাকতে পারলেন না। তিনি মক্কার পাশের পাহাড়ে চলে গেলেন এবং রাত হওয়ার পরেও বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে ঘরে প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি সত্যিই এ ধরনের হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে খুব ব্যথিত হতেন। তিনি এ সব পথভ্রষ্টের নির্বুদ্ধিতা প্রত্যক্ষ করে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত ও চিন্তিত হতেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে হযরত খাদীজার বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগেও তাঁর বাড়ি ছিল দুঃস্থ,সহায়-সম্বলহীন জনগণের আশার কাবা ও আশ্রয়স্থল। আর ঠিক তেমনি মহানবীর সাথে তাঁর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পরেও তাঁর গৃহের এ অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয় নি।

দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টির সময় কখনো কখনো তাঁর দুধ মা হযরত হালীমাহ্ মহানবীর কাছে আসতেন। মহানবী মাটিতে নিজ চাদর বিছিয়ে তাঁকে বসতে দিতেন। তখন মহানবীর মানসপটে নিজ মায়ের কথা এবং শৈশবের সেই অনাড়ম্বর জীবনের স্মৃতি ভেসে উঠত। তিনি হযরত হালীমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি হযরত হালীমাকে সাধ্যমত সাহায্য করতেন।১৮৯

ইরান : তদানীন্তন সভ্যতার লালনভূমি

যে কারণে আমরা রোমান সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা অধ্যয়ন করেছি সে একই কারণে আমরা সে সময়ের ইরানের সার্বিক পরিস্থিতি সম্মানিত পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরব। তবে এ বিষয়টির দিকেও দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক যে,আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের দুর্বল দিকগুলো বর্ণনা করে থাকি,তাহলে কেবল সত্য বিশ্লেষণ এবং ইসলাম ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা ব্যতীত আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। জাতীয় গর্ব ও স্বদেশপ্রেম যেন অবশ্যই আমাদের বাস্তববাদী হওয়া থেকে বিরত রাখতে না পারে। আমরা দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি পবিত্র ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ইরানে রাজত্ব করত তা বর্ণনা করতে,বাস্তবকে মেনে নিতে এবং (তদানীন্তন ইরানী সমাজে প্রচলিত) কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে কোন কিছু পরোয়া করি না। অ্যারিস্টটল তাঁর শিক্ষক প্লেটোর সাথে তাঁর মতবিরোধ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা-ই পুনরাবৃত্তি করছি। তিনি তাঁর এ মতপার্থক্যের ব্যাপারে এভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন: আমি প্লেটোকে ভালোবাসি। তবে সত্যকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি।”

সে যুগের ইরানী সরকার ও প্রশাসনের প্রধান দুর্বল দিকটি ছিল স্বৈরাচারী একনায়ক সরকার। নিঃসন্দেহে ব্যক্তিবিশেষের বিবেক-বুদ্ধি ও তাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা এবং একটি সংঘ বা দলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা মোটেও এক নয়। সামষ্টিক অর্থাৎ জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে ষড়যন্ত্র,পেশী প্রদর্শন ও জোর খাটানো অপেক্ষাকৃত কমই হয়ে থাকে। এ কারণেই ইরানীদের মহত্ত্ব,নেতৃত্ব অথবা দুর্বলতা ও অপদস্থ হওয়ার বিষয়টি তাদের কর্তৃত্বশীল একনায়কতন্ত্রের দুর্বলতা অথবা সামর্থ্যরে সাথে পূর্ণরূপে জড়িত। সাসানী সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংক্রান্ত আলোচনা ও অধ্যয়ন এবং তাদের প্রশাসনের ছায়ায় যে সব অস্থিতিশীলতার উদ্ভব হয়েছে সেগুলো আমাদের এ বক্তব্যের জীবন্ত দলিল।

ইসলামের আবির্ভাবকালে ইরানের সার্বিক অবস্থা

ইসলামের আবির্ভাব এবং 611 খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতপ্রাপ্তি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের (590-628 খ্রি.) শাসনামলের সমসাময়িক ঘটনা ছিল। মহানবী (সা.) সম্রাট খসরু পারভেজের রাজত্বকালেই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। (সে দিনটি ছিল শুক্রবার,16 জুলাই,622 খ্রি.)। আর এ তারিখ অর্থাৎ মহানবীর হিজরত দিবস থেকেই মুসলমানদের সন ও তারিখ গণনা শুরু হয়েছিল।

দু টি বৃহৎ পরাশক্তি (প্রাচ্যের রোমান সাম্রাজ্য ও সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য) ঐ সময়ের সভ্য দুনিয়ার বেশিরভাগ অংশ শাসন করত। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে এ দু টি সাম্রাজ্য সমগ্র বিশ্বে শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।

পারস্য সম্রাট আনুশীরওয়ান (নওশেরওয়ান) [531-589 খ্রি.]-এর রাজত্বকাল থেকে রোমানদের সাথে ইরানীদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা খসরু পারভেজের রাজত্বকাল পর্যন্ত দীর্ঘ 24 বছর স্থায়ী হয়েছিল।

পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যদ্বয় এ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যে বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছিল এবং ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সে কারণে উক্ত সাম্রাজ্যদ্বয়ের সরকার ও প্রশাসন কার্যত পঙ্গু ও অচল হয়ে গিয়েছিল;আসলে খোলস ছাড়া এ পরাশক্তিদ্বয়ের আর কিছুই তখন অবশিষ্ট ছিল না।

বিভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট থেকে ইরানের সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতি আলোচনা করতে হলে সম্রাট আনুশীরওয়ানের রাজত্বকালের শেষভাগ থেকে মুসলমানদের আগমন ও পারস্যবিজয় পর্যন্ত সে দেশের সরকার ও প্রশাসনের অবস্থা আমরা আলোচনা করব।

সাসানী শাসনামলে জৌলুস ও বিলাসিতা

সাসানী সম্রাটগণ সাধারণত বিলাসী ও আনুষ্ঠানিকতাপ্রিয় ছিলেন। সাসানী সম্রাটদের জাঁকজমকপূর্ণ শাহী দরবার এবং এর জৌলুস দর্শনার্থীদের চোখ ঝলসে দিত।

সাসানী শাসনামলে দারাফশেশে কভীয়নী’নামে ইরানীদের একটি পতাকা ছিল যা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা সাসানীয়দের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ উৎসবসমূহের সময় রাজকীয় প্রাসাদসমূহে উত্তোলন করা হতো। পতাকাটি মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত দ্বারা সুশোভিত করা হতো। একজন লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী,এ পতাকাটির মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত আসলেই অদ্বিতীয় ছিল যার মূল্য 12,00,000 দিরহাম অর্থাৎ 30,000 পাউন্ড।59

সাসানীদের কল্পকাহিনীর মতো জমকালো প্রাসাদসমূহে বিপুল সংখ্যক মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী,হীরা-জহরত,মণিমুক্তা এবং বিস্ময়কর চিত্রকলা ও ছবির সংগ্রহ ছিল যা দর্শনার্থীদের বিস্ময়াভিভূত করত। আমরা যদি এ সব শাহী প্রাসাদের বিস্ময়কর বিষয়াদি জানতে চাই তাহলে কেবল একটি বৃহদাকার সাদা কার্পেটের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই চলবে যা একটি (সাসানী) রাজপ্রাসাদে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। উক্ত কার্পেটের নাম ছিল বাহারিস্তানে কিসরা’অর্থাৎ সম্রাট কিসরা বা খসরুর বসন্তবাগান। সাসানী শাসকবর্গ এ কার্পেটটি এ কারণে তৈরি করিয়েছিলেন যাতে করে তাঁরা আমোদ-প্রমোদ করার সময় হর্ষোৎফুল্ল থাকতে পারেন এবং সর্বদা বসন্ত ঋতুর সুন্দর ও আনন্দদায়ক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।60

বর্ণনামতে এ কার্পেটের দৈর্ঘ্য ছিল 150 হাত এবং প্রস্থ 70 হাত;আর এর সমস্ত সুতা স্বর্ণ,হীরা-মুক্তা ও জহরত খচিত ছিল।61

সাসানী সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট খসরু পারভেজই অন্য সকল সম্রাটের চেয়ে বেশি জাঁকজমক,বিলাসিতা ও জৌলুসপ্রিয় ছিলেন। তাঁর শাহী হেরেমে নারী,দাসী,গায়িকা ও নর্তকীদের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

হামযাহ্ ইসফাহানী সানা মুলূকিল আরদ’গ্রন্থে সম্রাট খসরু পারভেজের শান-শওকত,জৌলুস ও বিলাসিতা ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছেন :

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের তিন হাজার স্ত্রী,12000 গায়িকা দাসী,6000 দেহরক্ষী পুরুষ সৈনিক,8500টি সওয়ারী ঘোড়া,960টি হাতী,মালপত্র বহন করার জন্য 12000টি গাধা এবং 1000টি উট ছিল।62

এরপর তাবারী আরো বলেছেন,এ সম্রাট অন্য সকলের চেয়ে বেশি মনিমুক্তা,হীরা-জহরত এবং মূল্যবান তৈজসপত্রের প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করতেন।63

ইরানের সামাজিক অবস্থা

সাসানী যুগে ইরানের সামাজিক অবস্থা সে দেশের দরবার ও রাজনৈতিক অবস্থার চেয়ে কোনভাবেই ভালো ছিল না। শ্রেণীশাসন ও শোষণ যা সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই ইরানে বিদ্যমান ছিল তা সাসানীদের যুগে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে।

অভিজাত ও পুরোহিতশ্রেণী অন্যান্য শ্রেণী অপেক্ষা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণী বলে বিবেচিত হতো। সকল ধরনের সামাজিক সংবেদনশীল পদ ও পেশা তাদেরই করায়ত্তে ছিল। পেশাজীবী ও কৃষকগণ সকল প্রকার ন্যায্য অধিকারভিত্তিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। কেবল কর প্রদান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ব্যতীত তাদের অন্য কোন পেশাই ছিল না।

সাসানীদের শ্রেণীবৈষম্যের বিষয়ে নাফীসী লিখেছেন :

“যে বিষয়টি ইরানী জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কপটতার প্রসার ও প্রচলন করেছিল তা ছিল অতি নিষ্ঠুর শ্রেণীবৈষম্য যা সাসানীরা ইরানে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আর শ্রেণীবৈষম্যের মূল পূর্বতন সভ্যতাসমূহের মাঝেই নিহিত ছিল। কিন্তু সাসানীদের যুগে কঠোরতা আরোপের বিষয়টি চরমভাবে বৃদ্ধি পায়।

পারস্য সমাজে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সাত অভিজাত বংশ এবং তাদের পর পাঁচটি শ্রেণী এমন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত যা থেকে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত ছিল। মালিকানা ও স্বত্বাধিকার প্রায় ঐ সাত পরিবার বা বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাসানী ইরানের জনসংখ্যা ছিল 140 মিলিয়ন (14 কোটি)। ঐ সাত বংশের প্রতিটির লোকসংখ্যা যদি এক লক্ষও ধরি তাহলে ঐ সাত বংশের সম্মিলিত লোকসংখ্যা 7,00,000 হবে। আর সৈন্য-সামন্ত এবং জমিদারশ্রেণী যাদেরও কিছুটা মালিকানা স্বীকৃত ছিল তাদের সংখ্যাও যদি আমরা 7,00,000 বলে অনুমান করি তাহলে এ চৌদ্দ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় 15,00,000 ব্যক্তির মালিকানা ছিল এবং বাকী জনগণ স্রষ্টাপ্রদত্ত এই স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।64

পেশাজীবী ও কৃষিজীবিগণ যারা সকল প্রকার অধিকার সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল,কিন্তু অভিজাতশ্রেণীর তাবৎ ব্যয়ভার যাদের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছিল তারা এ অবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের কোন স্বার্থ বা লাভের কথা চিন্তাও করতে পারত না। এ কারণেই অধিকাংশ কৃষিজীবী এবং সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোক নিজেদের পেশা ত্যাগ করে অসহনীয় কর থেকে বাঁচার জন্য মঠ অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের আস্তানায় আশ্রয়গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।65

‘সাসানীদের যুগে ইরান’নামক গ্রন্থের লেখক ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর দুর্ভাগ্য সম্পর্কে লিখেছেন : এমিয়ান মার্সেলিনোস নামক পাশ্চাত্যের এক ঐতিহাসিকের বাণী এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে : ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণী সাসানীদের যুগে চরম দীনতা ও দুর্ভাগ্যের মধ্যে দুর্বিষহ জীবনযাপন করত। তারা যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর পেছনে পায়ে হেঁটে যাত্রা করত। তাদেরকে এমনভাবে মর্যাদাহীন বলে গণ্য করা হতো যেন তাদের ললাটে চিরকালের জন্য দাসত্ব লিখে দেয়া হয়েছে। তারা তাদের শ্রমের বিনিময়ে কোন মজুরি লাভ করত না।”66

সাসানী সাম্রাজ্যের একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণী যারা জনসংখ্যায় শতকরা 1.5 ভাগের কম ছিল তারাই সব কিছুর অধিকারী ছিল। কিন্তু ইরানের জনসংখ্যার শতকরা 98 ভাগের বেশি দাসশ্রেণীর মতো জীবনের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

অভিজাতশ্রেণীই শিক্ষাগ্রহণের অধিকার রাখত

সাসানী যুগে কেবল অভিজাত ও উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন শিশুরাই বিদ্যার্জন করার অধিকার রাখত। সাধারণ জনতা ও সমাজের মধ্যবিত্তশ্রেণী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রাচীন ইরানের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় এ ত্রুটি এতটা প্রকট ছিল যে,এমনকি শাহনামা’ও রাজা-বাদশাদের উপাখ্যান রচয়িতাগণ যাঁদের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে বীরত্বগাথা রচনা করা তাঁরাও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন।

ইরানের বীরত্বগাথা রচয়িতা কবি ফেরদৌসী শাহনামা য় একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন যা এ বিষয়টির সর্বোত্তম সাক্ষ্য-প্রমাণ। কাহিনীটি সম্রাট আনুশীরওয়ানের শাসনামল অর্থাৎ যখন সাসানী সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ তখন সংঘটিত হয়েছিল। এ কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে,তাঁর শাসনামলে প্রায় সকল অধিবাসীরই শিক্ষা ও বিদ্যার্জন করার অধিকার ছিল না,এমনকি জ্ঞানপ্রেমিক সম্রাট আনুশীরওয়ানও অন্যান্য শ্রেণীর জনসাধারণকে জ্ঞানার্জনের অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন না।

ফেরদৌসী লিখেছেন : ইরান ও রোমের যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য একজন জুতা নির্মাতা (মুচি) তার স্বর্ণ ও রূপার ভাণ্ডার দান করতে চেয়েছিল। সে সময় সম্রাট আনুশীরওয়ান আর্থিক সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিলেন। কারণ ইরানের প্রায় তিন লক্ষ সৈন্য তখন তীব্র খাদ্য ও অস্ত্র সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। সম্রাট আনুশীরওয়ান এ অবস্থার কারণে খুবই উদ্বিগ্ন এবং তাঁর নিজ পরিণতি সম্পর্কেও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সম্রাট তাৎক্ষণিকভাবে জ্ঞানী প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করার জন্য ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেন যেন তিনি মাযেনদারান গমন করে যুদ্ধের খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু বুযুর্গমেহের সম্রাটকে বললেন, বিপদ অত্যাসন্ন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে একটি উপায় খুঁজে বের করা আবশ্যক।” তখন বুযুর্গমেহের জাতীয় ঋণ’অর্থাৎ জাতির কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার পরামর্শ দিলেন। সম্রাট আনুশীরওয়ানও তাঁর এ প্রস্তাবটি পছন্দ করলেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশও জারী করলেন। বুযুর্গমেহের নিকটবর্তী শহর,গ্রাম ও জনপদে রাজকীয় কর্মকর্তাদের প্রেরণ করে ঐ সকল স্থানের সচ্ছল ব্যক্তিদের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবগত করলেন।

তখন একজন জুতা নির্মাতা যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সে যা চেয়েছিল তা হলো : এর বিনিময়ে তার একমাত্র পুত্রসন্তান যে লেখাপড়া শিখতে অত্যন্ত আগ্রহী তাকে যেন লেখাপড়া শেখার অনুমতি দেয়া হয়। বুযুর্গমেহের ঐ মুচির আবেদনকে তার দানের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করেন এবং সম্রাটের কাছে ফিরে গিয়ে তার আর্জি সম্পর্কে সম্রাটকে অবহিত করেন। আনুশীরওয়ান এ কথা শুনে খুব রেগে যান এবং প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে তিরস্কার করে বলেন, তুমি এ কেমন আবেদন করছ? এ কাজ কল্যাণকর নয়। কারণ যে শ্রেণীবিন্যাসের আওতায় সে রয়েছে তা থেকে তার বের হয়ে আসার মাধ্যমে দেশের শ্রেণীপ্রথা ধসে পড়বে এবং তখন সে যে স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করছে তার মূল্যমান অপেক্ষা তার এ আর্জি অনেক বেশি ক্ষতি বয়ে আনবে।”

এরপর ফেরদৌসী সম্রাট আনুশীরওয়ানের কণ্ঠে তাঁর (সম্রাটের) মেকিয়াভ্যালি দর্শন’ব্যাখ্যা করেছেন:

বণিকপুত্র যদি হয় সচিব

গুণী,জ্ঞানী ও শিক্ষানবীশ

তাই যখন বসবে মোদের যুবরাজ সিংহাসন পরি

অবশ্যই পাবে সে তখন এক (দক্ষ ও গুণী) ভাগ্যমান সহকারী

আর কভু যদি মোজা বিক্রেতা করে এ গুণ ও জ্ঞান অর্জন

এ জ্ঞান দেবে তারে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন চক্ষু

আর নীচ বংশজাত জ্ঞানীকে দেবে অনুধাবনকারী কর্ণ

ব্যস্,তখন পরিতাপ ও শীতল বায়ু ছাড়া রইবে না আর কিছু।

এভাবেই ন্যায়পরায়ণ (!) বাদশার নির্দেশে জুতা নির্মাতা লোকটির টাকা-পয়সা ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ হতভাগা জুতা নির্মাতা তীব্র মনঃকষ্ট পায় এবং সে রাতের বেলা ন্যায়বিচারক স্রষ্টার দরবারে দু হাত উঠিয়ে এ ধরনের অত্যাচার ও ন্যায্য অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রার্থনা করে-যা হচ্ছে মজলুমদেরই রীতি। আর এভাবে সে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচারের ঘণ্টা ধ্বনিত করে।

প্রেরিত দূত ফিরে আসল এবং ঐ দিরহামগুলো দেখতে পেয়ে

ঐ মুচির অন্তর হলো তীব্র দুঃখভারাক্রান্ত

রাত হলে শাহের কথায় হলো সে দুঃখভারাক্রান্ত

মহান আল্লাহর দরবারে সে চাইল ঐশী আদালতের ঘণ্টাধ্বনি ধ্বনিত হোক। 67

এত কিছু সত্ত্বেও সম্রাট আনুশীরওয়ানের বিশাল প্রচারমাধ্যম ও প্রশাসন তাঁকে ন্যায়পরায়ণ বলে আখ্যায়িত করতে এবং ইরানী সমাজকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু তথাকথিত ন্যায়পরায়ণ এ শাহ তদানীন্তন ইরানী সমাজের মৌলিক সমস্যার জট খুলতে তো সক্ষম হননি;বরং ইরানীদের প্রভূত সামাজিক সমস্যার কারণও হয়েছিলেন। কেবল মাযদাক গোলযোগের ঘটনায় আশি হাজার এবং অপর একটি অভিমত অনুযায়ী এক লক্ষ ইরানীকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ধারণা করেছিলেন যে,উক্ত ফিতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে।68 অথচ এ ফিতনা যে মূলোৎপাটিত হয় নি তা তিনি মোটেও উপলব্ধি করতে পারেন নি। এ ধরনের শাস্তি আসলে ফলাফলের অস্তিত্ব নিশ্চি‎‎ হ্ন করে দেয়,তা কারণের অস্তিত্ব বিলোপ করে না। এ হচ্ছে পাপীদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সংগ্রাম-পাপ ও অপরাধের বিরুদ্ধে নয়। ফিতনার মূল কারণই ছিল সমাজে ভারসাম্যহীনতা,শ্রেণীবৈষম্য,দ্বন্দ্ব,বিশেষ একটি শ্রেণী কর্তৃক সম্পদ ও পদমর্যাদা কুক্ষিগতকরণ,নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা এবং অপরাপর দুর্নীতি ও অপরাধ। আর সম্রাট আনুশীরওয়ান অস্ত্র বল ও চাপ প্রয়োগ করে চাইতেন যে,জনগণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করুক।

এডওয়ার্ড ব্রাউন সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে লিখেছেন : সম্রাট আনুশীরওয়ান নাস্তিকদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি যারথুস্ত্রীয় (যারদোশ্ত) ধর্মযাজকদের প্রশংসা ও সম্মতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর ঐ সব ধর্মযাজকের হাতেই জাতীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে...।”69   এ সব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত ইতিহাসে সম্রাট আনুশিরওয়ানকে ন্যায়পরায়ণতা ও মানবতার পূর্ণ আদর্শ এক সম্রাট হিসাবে পরিচিত করানো হয়েছে। এ ব্যাপারে অনেক কাহিনীও রচনা করা হয়েছে।

খুবই আশ্চর্যজনক! এ দীর্ঘ সময় একমাত্র একটি বৃদ্ধ গাধা ব্যতীত আর কোন মজলুমই ন্যায়বিচারের ঘণ্টা বাজায় নি,অবশ্য এটিও জ্ঞাত বিষয় যে,ঐ গাধাটি তার নিজের সাহসের অপরাধের কথা জানত না;আর যদি সে তা জানত তাহলে সে ঘুণাক্ষরেও ন্যায়পরায়ণতার রজ্জুর নিকটবর্তী হতো না!!

আরো বলা হয় যে,একবার রোমের বাদশাহ্,আজম অর্থাৎ ইরানের বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের কাছে এক দূত প্রেরণ করেছিলেন। যখন ঐ দূত ইরানের বাদশার শানশওকত এবং বিশাল তাক-ই কিসরা প্রত্যক্ষ করলেন তখন তিনি দেখতে পেলেন যে,ইরানের বাদশাহ্ সিংহাসনে উপবিষ্ট;আর রাজারা তাঁর দরবারে উপস্থিত। তিনি এক ঝলক দৃষ্টি শাহী দ্বারমণ্ডপের ওপর নিবদ্ধ করলে উক্ত দ্বারমণ্ডপটি তাঁর দৃষ্টিতে খুবই জমকালো ও জাঁকজমকপূর্ণ বলে মনে হয়। কিন্তু ঐ দ্বারমণ্ডপের চারপাশ যেন একটু বাঁকা। দূত তখন দরবারে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন : দ্বারমণ্ডপে যে সামান্য বক্রতা আপনি দেখতে পাচ্ছেন আসলে এর কারণ হচ্ছে এখানে এক বৃদ্ধার ঘর ছিল যা বাদশাহ্ কিনে নিয়ে দ্বারমণ্ডপের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঐ বৃদ্ধা তার ঘর বিক্রি করতে রাজী না হওয়ায় বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানও তাকে বিক্রি করতে বাধ্য করেন নি। তাই ঐ বৃদ্ধার বাড়িটিই অবশেষে এ দ্বারমণ্ডপটির বক্রতার কারণ হয়েছে। তখন ঐ দূত শপথ করে বললেন যে,দ্বারমণ্ডপের এই বক্রতা আসলে এর সরল ও অবক্র হওয়া অপেক্ষা শ্রেয়।70

এটি আশ্চর্যজনক যে,এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ভবন ও দ্বারমণ্ডপ যে ব্যক্তি নির্মাণ করতে ইচ্ছুক তিনি কি পূর্ব থেকেই এর নকশা সংগ্রহ করবেন না এবং নকশা ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ভূমি ব্যতীতই কেউ কি এ ধরনের ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে! আর এর ফলে শাহী প্রাসাদ বাঁকা হবে। এ কি কখনো বিশ্বাস করা যায়?

আসলে এ ধরনের গালগল্প সম্রাটের দরবারের ব্যক্তিবর্গ ও যারথুস্ত্রীয় ধর্মযাজকগণ,মাযদাকী মতাবলম্বীদের দমন করে সম্রাট তাঁদের স্বার্থে যে মহামূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন সে কারণেই তাঁরা সম্রাটের অনুকূলেই রচনা করে থাকতে পারেন।

‘ইরান ও ইসলাম’গ্রন্থের লেখকের অভিমত অনুসারে এ সব কিছুর চেয়েও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই যে,কেউ কেউ সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতাকে শারয়ী ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণ করার জন্য এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের সূত্র থেকেও হাদীস বর্ণনা করতে বাধ্য হয়েছে। যেমন :ولدت في زمن الملك العادل আমি ন্যায়পরায়ণ বাদশার রাজত্বকালে জন্মগ্রহণ করেছি।”-প্রসিদ্ধ এ হাদীসটি। মহানবী (সা.) যেন এ কথা বলতে গর্ববোধ করতেন যে,তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছেন,অথচ মহানবীর সাথে তাঁর (বাদশার) ন্যায়পরায়ণতার কি কোন সম্পর্ক আছে?

অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : হযরত আলী মাদায়েনে এসে কিসরার প্রাসাদে গমন করলেন। সেখানে তিনি আনুশীরওয়ানকে জীবিত করে তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন হযরত আলীকে বলেছিলেন যে,কুফ্রী করার কারণে তিনি বেহেশত থেকে বঞ্চিত হয়েছেন,তবে ন্যায়পরায়ণ হবার কারণে জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্তও হচ্ছেন না।71 এখন আমরা পর্যালোচনা করব যে,সাসানীরা কি ধরনের অত্যাচার করেছে।

খসরু পারভেজের অপরাধসমূহের পর্দা উন্মোচন

সম্রাট খসরু পারভেজের অত্যাচারমূলক ও পাগলামিপূর্ণ আরেকটি কাজ ছিল প্রসিদ্ধ বুযুর্গমেহেরের সাথে তাঁর আচরণ। এ বুযুর্গমেহের আনুশীরওয়ানের দরবারে 13 বছর কর্মরত ছিলেন এবং তিনি প্রভূত যশ ও খ্যাতির অধিকারী হয়েছিলেন। অবশেষে সম্রাট খসরু পারভেজ তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সম্রাট কারাগারে বন্দী বুযুর্গমেহেরের কাছে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন : তোমার জ্ঞান,বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা অবশেষে তোমারই নিহত হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।” বুযুর্গমেহেরও উত্তরে লিখেছিলেন : যে পর্যন্ত ভাগ্য আমার প্রতি প্রসন্ন ছিল সে পর্যন্ত আমি আমার বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়েছি। এখন যখন ভাগ্য আমার অনুকূলে নেই তখন আমার ধৈর্য ও সহ্যশক্তিকে কাজে লাগাব। আমার হাত দিয়ে যদি অগণিত সৎকর্মসম্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে আমি আমার মন্দ কাজ থেকেও নিরাপদ ও নিশ্চিত হয়েছি। আমার কাছ থেকে মন্ত্রিত্ব পদ কেড়ে নেয়া হলেও আমা থেকে ঐ পদের অসংখ্য অন্যায় ও অত্যাচারের দুঃখ-কষ্টও দূর করা হয়েছে। অতএব,আমার আর ভয় কিসে?

যখন সম্রাট খসরু পারভেজের হাতে বুযুর্গমেহেরের উক্ত চিঠি পৌঁছালো তখন সম্রাট বুযুর্গমেহেরের নাক ও ঠোঁট কেটে ফেলার আদেশ দিলেন। যখন বুযুর্গমেহেরকে সম্রাটের এ আদেশ শুনানো হলো তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন : আমার ঠোঁট এর চেয়ে আরোও বেশি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।” সম্রাট খসরু পারভেজ তখন জিজ্ঞাসা করলেন : কি কারণে? বুযুর্গমেহের তখন বললেন : যেহেতু আপামর জনতার কাছে তোমার এমন সব গুণের প্রশংসা করেছি যা তোমার ছিল না এবং অসন্তুষ্ট অন্তঃকরণসমূহকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম। আমি তোমার এমন সব ভালো কাজ ও পুণ্যের কথা জনগণের মধ্যে প্রচার করেছি যার উপযুক্ত তুমি ছিলে না। হে নিকৃষ্ট অসৎকর্মশীল সম্রাট! যদিও আমার সততার ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত এতদ্সত্ত্বেও আমাকে কুধারণার বশবর্তী হয়ে হত্যা করছ? অতএব,তোমার কাছে সুবিচার আশা করা এবং তোমার কথায় ভরসা করা যায় কি?

সম্রাট খসরু পারভেজ বুযুর্গমেহেরের কথায় খুবই উত্তেজিত হয়ে তাঁর শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলেন।72

‘ইরানের সামাজিক ইতিহাস’গ্রন্থের রচয়িতা-যিনি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা সাসানী যুগের অরাজকতা,অধঃপতিত অবস্থা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল দেশের অভিজাতশ্রেণীর জন্য শিক্ষাগ্রহণের অধিকার ও সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়টি এভাবে চিত্রিত করেছেন :

“এ যুগে তখনকার প্রচলিত সকল জ্ঞান ও শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং শিক্ষা কেবল পুরোহিত,যাজক ও অভিজাতশ্রেণীর সন্তানগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল;আর ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।”73

হ্যাঁ,এ জাহেলী প্রথা সাসানী সম্রাটদের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। আর তাঁরা কোনভাবেই এ বিষয়টি পরিহার করতে চাইতেন না ।

এ কারণেই সৌভাগ্য ও সুখের ক্রোড়ে প্রতিপালিত এ সংখ্যালঘু শ্রেণীটির অপরিপক্ব ও অসংযত প্রবৃত্তি ও রিপুর কামনা-বাসনা ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে জ্ঞানার্জনের অধিকারসহ সকল বৈধ সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল।


9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53

54

55

56

57

58

59

60

61