চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড3%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 242 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 106709 / ডাউনলোড: 9685
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

কোন্ দিন প্রথম ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল

মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত দিবস তাঁর জন্ম ও ওফাত দিবসের মতোই ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে নিশ্চিত ও চূড়ান্ত নয়। শিয়া আলেমগণ প্রায় ঐকমত্য পোষণ করেন যে,মহানবী (সা.) ২৭ রজব নবুওয়াতের পদ লাভ করেন। ঐ দিন থেকেই তাঁর নবুওয়াত শুরু হয়েছিল। কিন্তু সুন্নী আলেমদের প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে এই যে,মহানবী (সা.) পবিত্র রামযান মাসে এ সুমহান মর্যাদা লাভ করেছিলেন এবং পবিত্র বরকতময় এ মাসেই তিনি নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জনগণকে পথ প্রদর্শন করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং রিসালাত ও নবুওয়াতের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

যেহেতু শিয়ারা নিজেদেরকে মহানবীর ইতরাত ও আহলে বাইতের অনুসারী বলে বিবেচনা করে এবং হাদীসে সাকালাইন অনুসারে তাদের ইমামদের বক্তব্য ও বাণীকে সব দিক থেকে অকাট্য ও শুদ্ধ বলে বিশ্বাস করে এ কারণেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াতপ্রাপ্তির দিবস নির্ধারণ করার ব্যাপারে ঐ অভিমতের অনুসারী-যা মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইত থেকে নির্ভুলভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর সন্তানগণ (আহলে বাইত) বলেছেন, আমাদের বংশের প্রধান ব্যক্তিটি (মহানবী) ২৭ রজব নবুওয়াতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এ সব পূর্ব প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ ও ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে উপরিউক্ত বক্তব্য ও অভিমতের সত্যতা ও নির্ভুল হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ ও সংশয় পোষণ করা অনুচিত।

যে বিষয়টি (মহানবীর নবুওয়াতপ্রাপ্তির দিবস নির্ধারণ করার ব্যাপারে প্রচলিত) অপর একটি অভিমতের দলিল হিসাবে বিবেচিত তা হচ্ছে পবিত্র কোরআনের ঐ সকল আয়াত যেগুলোতে উল্লিখিত হয়েছে যে,এ গ্রন্থ (পবিত্র কোরআন) পবিত্র রামযান মাসে অবতীর্ণ হয়েছিল। যেহেতু নবুওয়াত দিবস ওহীর সূচনা এবং পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার দিবস ছিল অতএব,অবশ্যই বলা উচিত যে,নবুওয়াত দিবস যে মাসে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছিল সে মাসেই হতে হবে। আর ঐ মাসটি হচ্ছে পবিত্র রামযান মাস। এখন যে সব আয়াতে পবিত্র রামযান মাসে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর অনুবাদসহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

) شهر رمضان الّذي أنزل فيه القرآن(

রামযান মাসেই পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। (সূরা বাকারাহ্ : ১৮৫)

) حم و الكتاب المبين إنّا أنزلناه في ليلة مباركة(

হা মীম স্পষ্ট বর্ণনাকারী গ্রন্থের (পবিত্র কোরআন) শপথ,নিশ্চয়ই আমরা এ গ্রন্থকে একটি বরকতময় রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি। (সূরা দুখান : ২ ও ৩)

) إنّا أنزلناه في ليلة القدر(

আর উক্ত বরকতময় রজনী হচ্ছে ঐ শবে কদর (মহিমাময় রাত্রি) যা সূরা কদরে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে : আমরা পবিত্র কোরআনকে কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি। (সূরা কদর : ১)

শিয়া আলেমদের জবাব

শিয়া মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ বিভিন্ন উপায়ে উপরিউক্ত যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ খণ্ডন করেছেন। আমরা তন্মধ্যে কেবল কয়েকটি এখানে উল্লেখ করব :

প্রথম উত্তর : উপরিউক্ত আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে,পবিত্র কোরআন রমযান মাসের একটি বরকতময় রাতে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর উক্ত রজনী পবিত্র কোরআনে শবে কদর’ অর্থাৎ ভাগ্য রজনী নামে পরিচিত হয়েছে। আর এ সব আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় না যে,ঐ রাতেই পবিত্র কোরআন মহানবী (সা.)-এর পবিত্র হৃদয়ের ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল,বরং পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন ধরনের নুযূল থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এ সব নুযূলের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে মহানবীর ওপর পবিত্র কোরআনের ধারাবাহিক ও পর্যায়ক্রমিক নুযূল। আরেক ধরনের নুযূল হচ্ছে একত্রে একবারে সম্পূর্ণ কোরআনের নুযূল। লওহে মাহফূয (সংরক্ষিত ফলক) থেকে বাইতুল মামূরে সম্পূর্ণ কোরআন একত্রে একবারে অবতীর্ণ (নাযিল) হয়েছিল।২২০ সুতরাং ২৭ রজব যদি মহানবী (সা.)-এর ওপর সূরা আলাকের কয়েকটি আয়াত এবং পবিত্র রমযান মাসে যদি (পবিত্র কোরআনের ভাষায়) লওহে মাহফূয নামক একটি স্থান থেকে অন্য এক স্থান যা রেওয়ায়েতসমূহে বাইতুল মামূর নামে অভিহিত (হয়েছে) সেখানে সম্পূর্ণ কোরআন একত্রে একবারে অবতীর্ণ হয়,তাহলে কি এতে কোন অসুবিধা ও আপত্তি থাকতে পারে?

এ বক্তব্য ও অভিমতের পক্ষে প্রমাণ হচ্ছে সূরা দুখানের ৩ নং আয়াতটি যাতে এরশাদ হচ্ছে:

আমরা পবিত্র কিতাবটি (কোরআন) একটি বরকতময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি। [যে সর্বনামটি কিতাব’ (গ্রন্থ)-এর দিকে প্রত্যাগমন করে সেই সর্বনামটি প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপন করলে] এ আয়াতটির স্পষ্ট প্রকাশিত অর্থ হচ্ছে এই যে,সম্পূর্ণ কিতাবটি পবিত্র রমযানের একটি বরকতময় রজনীতে অবতীর্ণ হয়েছে। অবশ্যই এ নুযূলটি ঐ নুযূল থেকে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র যা মহানবীর নবুওয়াতের মাকামে অভিষেকের দিবসে বাস্তবায়িত হয়েছিল। কারণ নবুওয়াতের মাকামে অভিষেক দিবসে গুটিকতক আয়াতই (সূরা আলাকের প্রথম ৫ আয়াত) অবতীর্ণ হয়েছিল।

সার সংক্ষেপ

যে সব আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে,পবিত্র কোরআন রামযান মাসের কদরের পুণ্যময় রাতে অবতীর্ণ হয়েছিল সেগুলো থেকে প্রমাণিত হয় না যে,যে দিবসে মহানবী (সা.) নবুওয়াতের পদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন এবং সর্বপ্রথম কয়েকটি আয়াতও অবতীর্ণ হয়েছিল সে দিবসটি ছিল পবিত্র রামযান মাসে। কারণ উপরিউক্ত আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে,সম্পূর্ণ ঐশী গ্রন্থটি ঐ মাসে (রামযান মাসে) অবতীর্ণ হয়েছিল,অথচ মহানবীর নবুওয়াতের অভিষেক দিবসে কেবল গুটিকতক আয়াতই অবতীর্ণ হয়েছিল। এমতাবস্থায় পবিত্র কোরআনের সম্পূর্ণ অবতীর্ণ হওয়াটাই ঐ মাসে (রামযান মাসে) লওহে মাহফূয থেকে বাইতুল মামূরে সমগ্র পবিত্র কোরআনের অবতীর্ণ হওয়াকেই সম্ভবত বুঝিয়ে থাকবে। শিয়া ও সুন্নী আলেমগণ এতদ্প্রসঙ্গে বেশ কিছু হাদীসও বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল আযীম আয-যারকানী মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমুল কোরআন’ নামক গ্রন্থে ঐ সব রেওয়ায়েত বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।২২১

দ্বিতীয় উত্তর

সবচেয়ে শক্তিশালী ও দৃঢ় উত্তর যা এখন পর্যন্ত আলেমদের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে এই দ্বিতীয় উত্তর। আল্লামা তাবাতাবাঈ তাঁর মূল্যবান তাফসীর গ্রন্থ আল মীযান’-এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন।২২২ এ উত্তরটির সার সংক্ষেপ নিচে উল্লেখ করা হলো :

‘আমরা এ গ্রন্থকে রামযান মাসে অবতীর্ণ করেছিলাম’-পবিত্র কোরআনের এ আয়াতটির প্রকৃত অর্থ কি? এ আয়াতটির প্রকৃত ও যথার্থ অর্থ হচ্ছে সম্পূর্ণ কোরআনের প্রকৃত স্বরূপ ও হাকীকত রামযান মাসে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র অন্তঃকরণের ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। কারণ পর্যায়ক্রমিক (ধারাবাহিক) অস্তিত্ব ছাড়াও পবিত্র কোরআনের এমন এক প্রকৃত বাস্তব স্বরূপ আছে যার সাথে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় রাসূলকে রামযান মাসের কোন একটি নির্দিষ্ট রজনীতে পরিচিত করিয়ে দিয়েছিলেন।

যেহেতু মহানবী সম্পূর্ণ পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবগত ছিলেন তাই যতক্ষণ পর্যন্ত পবিত্র কোরআনের ধারাবাহিক নুযূলের বিধান বাস্তবে জারী করা না হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর প্রতি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পবিত্র কোরআনের ব্যাপারে ত্বরা না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।২২৩

এ উত্তরটির সার সংক্ষেপ

পবিত্র কোরাআনের যেমন একটি সার্বিক তাত্ত্বিক ও প্রকৃত বাস্তব অস্তিত্ব আছে যা একযোগে একত্রে (একবারেই) পবিত্র রামযান মাসে অবতীর্ণ হয়েছিল ঠিক তেমনি এ গ্রন্থের আরেকটি অস্তিত্ব আছে যা পর্যায়ক্রমিক (ধারাবাহিক)-যার সূচনা মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতে অভিষেক দিবসে কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়েছে এবং মহানবীর জীবন সায়াহ্ন পর্যন্ত বলবৎ ছিল (অর্থাৎ পবিত্র কোরআনের ধারাবাহিক অবতরণ মহানবীর নবুওয়াতে অভিষেক দিবসে শুরু হয়ে তাঁর ওফাত পর্যন্ত বলবৎ ছিল।)

তৃতীয় উত্তর

পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সাথে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতের দায়িত্বে অভিষিক্ত হওয়ার বিষয়টি যুগপৎ ছিল না।

ওহীর শ্রেণীবিভাগ বর্ণনা করার সময় সার সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে যে,ওহীরও বেশ কিছু পর্যায় আছে। ওহীর প্রথম পর্যায় : সত্য স্বপ্নদর্শন (এ পর্যায়ে নবী কেবল সত্য স্বপ্ন দর্শন করেন।) ওহীর দ্বিতীয় পর্যায় : নবী কর্তৃক গায়েবী ও ঐশী আহবান শুনতে পাওয়া (অর্থাৎ এ পর্যায়ে নবী অদৃশ্য ঐশী আহবান শুনতে পান),তবে এ ক্ষেত্রে তিনি কোন ফেরেশতাকে প্রত্যক্ষ করেন না;ওহীর চূড়ান্ত ও সর্বশেষ পর্যায় হচ্ছে নবী ফেরেশতার কাছ থেকে মহান আল্লাহর বাণী শোনেন যাঁকে তিনি দেখেন এবং যাঁর মাধ্যমে তিনি অন্যান্য জগতের প্রকৃত অবস্থা ও বাস্তবতাসমূহের সাথেও পরিচিত হন।

যেহেতু মানবাত্মার একেবারে প্রাথমিক পর্যায় ওহীর বিভিন্ন পর্যায় ধারণ করতে অক্ষম সেহেতু অবশ্যই ওহী ধারণ করার বিষয়টি পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়িত হতে হবে। সুতরাং নির্দ্বিধায় বলা উচিত মহানবীর নবুওয়াতে অভিষেক দিবসে (২৭ রজব) এবং এর পরেও আরো বেশ কিছুদিন পর্যন্ত তিনি স্বর্গীয় ঐশী আহবানই শুনতে পেতেন। তিনি শুনতে পেতেন যে,তিনি মহান আল্লাহর রাসূল। নবুওয়াত দিবসে তাঁর ওপর কোন আয়াতই অবতীর্ণ হয় নি। অতঃপর বেশ কিছুদিন পর পবিত্র রামযান মাসে পবিত্র কোরআনের ধারাবাহিক নুযূল শুরু হয়।

সুতরাং সংক্ষেপে বলা যায় যে,রজব মাসে মহানবীর নবুওয়াতে অভিষিক্ত হওয়ার বিষয়টি ঐ মাসেই পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সাথে মোটেও সংশ্লিষ্ট নয়। এ বক্তব্যের ভিত্তিতে মহানবীর যদি রজব মাসে নবুওয়াতে অভিষিক্ত এবং পবিত্র কোরআন যদি একই বছরের রমযান মাসে অবতীর্ণ হয় তাহলে কি কোন অসুবিধা আছে?

উপরিউক্ত উত্তরটি যদিও অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনা ও বিবরণের সাথে খাপ খায় না (কারণ ঐতিহাসিকগণ স্পষ্ট বলেছেন যে,সূরা আলাকের কতিপয় আয়াত নবুওয়াতে অভিষিক্ত হওয়ার দিবসেই অবতীর্ণ হয়েছিল।) কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও এমন কিছু রেওয়ায়েত আছে যেগুলোতে মহানবীর নবুওয়াতে অভিষিক্ত হওয়ার দিবসের ঘটনাটি বলতে কেবল গায়েবী অর্থাৎ অদৃশ্য (ঐশী) আহবানের কথাই উল্লিখিত হয়েছে এবং পবিত্র কোরআন অথবা কতিপয় আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি বর্ণিত হয় নি;বরং নবুওয়াত দিবসের ঘটনা ঠিক এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে,ঐ দিন মহানবী একজন ফেরেশতাকে দেখতে পেয়েছিলেন যিনি তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিলেন,

يا محمّد أنّك لرسول الله হে মুহাম্মদ! নিশ্চয়ই আপনি মহান আল্লাহর রাসূল। আবার কিছু সংখ্যক বর্ণনায় কেবল গায়েবী আহবান ও সম্বোধনধ্বনি শোনার কথাই বর্ণিত হয়েছে এবং কোন ফেরেশতাকে দেখার বিষয় উল্লিখিত হয় নি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে বিহারুল আনওয়ার অধ্যয়ন করুন।২২৪

অবশ্য তৃতীয় এ উত্তরটি চতুর্থ উত্তর থেকে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। চতুর্থ উত্তরে বলা হয়েছে যে,মহানবীর বেসাত (নবুওয়াতে অভিষিক্ত হওয়া) রজব মাসেই হয়েছিল এবং গোপনে দাওয়াত অর্থাৎ গোপনে ইসলাম প্রচারের পর্যায় যা বেসাতের পর থেকে দীর্ঘ তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল তা অতিবাহিত হওয়ার পরই পবিত্র কোরআনের অবতরণ (নুযূল) শুরু হয়। (অর্থাৎ বে সাতের পর দীর্ঘ তিন বছর গোপনে ইসলাম প্রচারের পর্যায় অতিবাহিত হওয়ার পরপরই পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হতে থাকে।)

ত্রয়োদশ অধ্যায় : সর্বপ্রথম যে পুরুষ ও মহিলা মহানবীর প্রতি ঈমান এনেছিলেন

সমগ্র বিশ্বে ইসলাম ধর্মের প্রসার ধীরে ধীরেই হয়েছিল। পবিত্র কোরআনের পরিভাষায় যে সব ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এবং এ ধর্মের প্রচার করার ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিলেন তাঁদেরকেالسّابقون (অগ্রগামিগণ) বলা হয়েছে। আর ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অগ্রগামিতা শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি বলে গণ্য হতো। অতএব,বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে এ বিষয়টি (ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রগামিতা) আলোচনা করা উচিত। তাহলে আমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী মহিলা ও পুরুষকে চিনতে পারব।

মহিলাদের মধ্যে হযরত খাদীজাহ্

ইসলামের ইতিহাসের অকাট্য বিষয়াদির মধ্যে অন্যতম বিষয় হচ্ছে এই যে,হযরত খাদীজাহ্ (আ.) ছিলেন প্রথম নারী যিনি মহানবী (সা.)-এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন। আর এ ব্যাপারে কোন মতপার্থক্যও নেই।২২৫ আমরা বর্ণনা সংক্ষেপ করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল এখানে উল্লেখ করব যা ঐতিহাসিকগণ মহানবী (সা.)-এর একজন স্ত্রীর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন।

হযরত আয়েশা বলেন, আমি খাদীজাকে কখনই দেখি নি বলে সব সময় আফসোস করতাম এবং তাঁর প্রতি মহানবী (সা.) সব সময় যে টান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন তাতে আমি খুব আশ্চর্যান্বিত হতাম। কারণ মহানবী তাঁকে খুব বেশি স্মরণ করতেন। যদি কখনো কোন দুম্বা জবাই করতেন তখন তিনি হযরত খাদীজার বান্ধবীদের খোঁজখবর নিয়ে তাঁদের কাছে জবাইকৃত দুম্বার মাংস প্রেরণ করতেন। একদিন মহানবী ঘর থেকে বের হওয়ার সময় খাদীজার কথা স্মরণ করে তাঁর প্রশংসা করছিলেন। অবশেষে অবস্থা এমন হলো যে,আমি আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। পূর্ণ স্পর্ধা সহকারে আমি বলেই বসলাম : তিনি তো একজন বৃদ্ধা নারী বৈ আর কিছুই ছিলেন না। মহান আল্লাহ্ আপনাকে তাঁর চেয়ে উত্তম ভালো ভালো স্ত্রী দিয়েছেন! আমার এ কথা মহানবী (সা.)-এর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল। তাঁর মুখমণ্ডলে ক্রোধ ও অসন্তোষের চি‎‎ হ্ন স্পষ্ট ফুটে উঠল। তিনি বললেন : কখনই এমন হয় নি। তাঁর চেয়ে উত্তম স্ত্রী আমি পাই নি। তিনি ঐ সময় আমার প্রতি ঈমান এনেছিলেন যখন সবাই শিরক ও কুফরে লিপ্ত ছিল। তিনি সবচেয়ে কঠিন সময় তাঁর সমুদয় ধন-সম্পদ আমার হাতে অর্পণ করেছিলেন। মহান আল্লাহ্ তাঁর মাধ্যমে আমাকে সন্তান-সন্ততি দিয়েছেন যা আমার অন্য কোন স্ত্রীকে দেন নি।”

ঈমান আনয়ন করার ক্ষেত্রে বিশ্বের সকল নারীর চেয়ে হযরত খাদীজার শ্রেষ্ঠত্ব ও অগ্রগামিতার আরেকটি দলিল হচ্ছে ওহীর শুভ সূচনা ও পবিত্র কোরআনের অবতীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গ। কারণ যখন মহানবী (সা.) হিরা গুহা থেকে নিচে নেমে আসলেন এবং বে সাতের (নবুওয়াতের অভিষেকের) পুরো ঘটনাটি খাদীজার কাছে সবিস্তারে বর্ণনা করলেন তখন সাথে সাথে তিনি স্পষ্টভাবে ও ইঙ্গিতে স্ত্রী খাদীজার ঈমানের সাথে পরিচিত হলেন। এছাড়া হযরত খাদীজাহ্ (আ.) আরবের ভবিষ্যদ্বক্তা ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাঁর স্বামীর নবুওয়াতের ব্যাপারে অনেক কথা শুনেছিলেন। আর এ সব কথা ও বাণী এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার কারণেই হযরত খাদীজাহ্ তাঁর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

ঈমানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিলেন আলী

শিয়া ও সুন্নী নির্বিশেষে সকল ঐতিহাসিকের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে,পুরুষদের মধ্য থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি প্রথম যে ব্যক্তি ঈমান এনেছিলেন তিনি ছিলেন হযরত আলী (আ.)। আর এ প্রসিদ্ধ অভিমতের বিপক্ষে ইতিহাসে আরো কিছু বিরল অভিমতও আছে যেগুলোর বর্ণনাকারিগণ উক্ত প্রসিদ্ধ অভিমতটির বিপরীতটি বর্ণনা করেছেন। যেমন বলা হয়ে থাকে যে,প্রথম যে ব্যক্তি পুরুষদের মধ্য থেকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন তিনি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর পালক পুত্র যায়েদ ইবনে হারিসা অথবা হযরত আবু বকর। তবে অগণিত দলিল এ দুই অভিমতের বিপক্ষে বিদ্যমান আছে;আমরা এ সব দলিল থেকে মাত্র কয়েকটি সংক্ষেপে নিচে উল্লেখ করছি :

১. হযরত আলী মহানবী (সা.)-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হয়েছিলেন

হযরত আলী বাল্যকাল থেকেই মহানবী (সা.)-এর গৃহে প্রতিপালিত হয়েছিলেন এবং মহানবীও একজন স্নেহময় পিতার মতোই তাঁর লালন-পালনের ব্যাপারে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। সকল সীরাত রচয়িতা এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করে লিখেছেন :

“মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতে অভিষিক্ত হবার আগেই পবিত্র মক্কায় একবার এক মারাত্মক দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টি দেখা দিয়েছিল। মহানবী (সা.)-এর চাচা আবু তালিবের পরিবার বেশ বড় হওয়ার কারণে এবং যেহেতু তাঁর আয় তাঁর সাংসারিক ব্যয় ও খরচের সাথে সামঞ্জস্যশীল ছিল না এবং ভাই আব্বাসের তুলনায় তিনি বিস্তর সম্পদ ও বিত্তের অধিকারী ছিলেন না সেহেতু এ ধরনের দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর আর্থিক অবস্থা সংকটজনক হয়ে পড়লে মহানবী (সা.) চাচা আব্বাসের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন যে,হযরত আবু তালিবের আর্থিক সংকট ও অসচ্ছলতা কিছুটা লাঘব করার জন্য তাঁরা তাঁর কতিপয় সন্তানকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে প্রতিপালন করবেন। যার ফলে তাঁরা আবু তালিবের সাংসারিক খরচ ও ব্যয় নির্বাহ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে সক্ষম হবেন। এ সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতিতে মহানবী (সা.) আলীকে এবং আব্বাস জাফরকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসেন। ২২৬

এ ধরনের পরিস্থিতিতে অবশ্যই বলতে হয় যে,যখন হযরত আলী (আ.) মহানবী (সা.)-এর গৃহে আসলেন তখন তাঁর বয়স ৮ বছরের চেয়ে কম ছিল না। কারণ হযরত আলীকে নিয়ে যাবার উদ্দেশ্য ছিল মক্কা নগরীর প্রধান হযরত আবু তালিবের সংসারে সচ্ছলতা আনয়ন। আর যে শিশুর বয়স ৮ বছরেরও কম তাকে তার পিতা-মাতা থেকে পৃথক করা খুবই কঠিন কাজ। এ ছাড়াও হযরত আবু তালিবের জীবনে এ ধরনের শিশু ততটা প্রভাব রাখবে না।

অতএব,হযরত আলী (আ.)-এর বয়সের ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই এমনভাবে চিন্তা করা উচিত যে,তাঁকে নিয়ে যাওয়ার ফলে হযরত আবু তালিবের জীবনে লক্ষণীয় প্রভাব পড়ে। তাই এমতাবস্থায় কিভাবে বলা সম্ভব যে,যায়েদ ইবনে হারিসা ও অন্য ব্যক্তিবর্গ ওহীর গুপ্তভেদ ও রহস্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন,অথচ তাঁরই পিতৃব্যপুত্র যিনি ছিলেন অন্য সকলের চেয়ে তাঁর সবচেয়ে নিকটবর্তী এবং সর্বদা তাঁরই সাথে থেকেছেন তিনি মহানবী (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ ঐশী রহস্যাবলী সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবেন?!

হযরত আলীকে প্রতিপালন করার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর প্রতি চাচা হযরত আবু তালিবের খেদমত ও অবদান একটি পর্যায় পর্যন্ত পূরণ করা। কোন ব্যক্তিকে সুপথে পরিচালিত করার চেয়ে আর কোন কাজ বা বিষয় মহানবী (সা.)-এর কাছে এত বেশি প্রিয় ও মর্যাদাসম্পন্ন ছিল না। এতদ্সত্ত্বেও এ কথা কিভাবে বলা সম্ভব যে,মহানবী (সা.) নিজ চাচাত ভাই যিনি ছিলেন আলোকিত মন ও হৃদয় এবং বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী তাঁকে এ বিরাট নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করবেন? স্বয়ং আলী (আ.)-এর বাণী থেকেই এ কথা শোনা উত্তম :

وقد علمتم موضعي من رسول الله بالقرابة القريبة والمنزلةِ الخصيصةِ وضعني في حجره وأنا وليدٌ يضمُّني إلى صدره ويكنفني في فراشهِ ويمسُّني جسدَه ويُشِمُّني عرفَه ولقد كنتُ أتَّبِعُه اتّباع الفصيل أثر أمِّه، يرفع لي في كلِّ يومٍ من أخلاقه علماً ويأمرني بالإقتداءِ به، ولقد كان يجاورُ في كلِّ سنةٍ بِحراءَ فأراه لا يراه غيري، ولم يحمعْ بيتٌ واحدٌ يومئذٍ في الإسلامِ غيرَ رسولِ اللهِ وخديجةَ وأنا ثالثهما! أرى نورَ الوحْيِ والرِّسالةَ وأشُمُّ ريحَ النُّبُوَّةِ ...

“আর তোমরা সবাই রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাছে আমার নিকটাত্মীয়তা জনিত অবস্থান এবং বিশেষ মর্যাদার কথা জান;আমি যখন শিশু তখন তিনি আমাকে তাঁর কোলে বসাতেন। তিনি আমাকে তাঁর বুকে টেনে নিতেন এবং তাঁর বিছানায় আমাকে শোয়াতেন। তাঁর দেহ তখন আমার দেহে স্পর্শ করত;তিনি আমাকে তাঁর দেহের সুঘ্রাণ নেওয়াতেন;... যেমন করে উট-শাবক তার মাকে অনুসরণ করে ঠিক তেমনি আমিও তাঁকে অনুসরণ করতাম;তিনি আমাকে প্রতিদিন তাঁর (মার্জিত) চারিত্রিক গুণাবলী থেকে একটি নিদর্শন আমার সামনে উপস্থাপন করতেন এবং আমাকে তা অনুসরণ করার আদেশ দিতেন। তিনি প্রতি বছর হিরা গুহায় নির্জনে বাস করতেন;অতঃপর আমি তাঁকে দেখতাম এবং আমি ব্যতীত তাঁকে অন্য কোন ব্যক্তি প্রত্যক্ষ করত না। তখন (ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পরবর্তী দিনগুলোতে) রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ও খাদীজাহ্ (আ.)-এর পরিবার ছাড়া ইসলামে বিশ্বাসী আর কোন পরিবার ছিল না;আর আমি ছিলাম তাঁদের (পরিবারের) তৃতীয় সদস্য। আমি ওহী ও রিসালাতের আলো প্রত্যক্ষ করি এবং নবুওয়াতের সুঘ্রাণ পাই...। ২২৭

২. আলী ও খাদীজাহ্ মহানবীর সাথে নামায পড়তেন

ইবনে আসীর উস্দুল গাবা য়,ইবনে হাজর আল-ইসাবা য় আফীফ কিন্দীর জীবন বৃত্তান্তে এবং বহু ঐতিহাসিক তাঁর (আফীফ) থেকে নিম্নোক্ত ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন : একবার জাহেলিয়াতের যুগে আমি পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করে হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের আতিথেয়তা গ্রহণ করলাম। আমরা দু জন পবিত্র কাবার পাশে ছিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম একজন পুরুষ আসল এবং পবিত্র কাবামুখী হয়ে দাঁড়াল;এরপর একটি ছেলেকে দেখলাম-যে এসে ঐ লোকটির ডানপাশে দাঁড়াল। এর পরপরই একজন মহিলাকে দেখলাম যে এসে এদের পেছনে দাঁড়াল। আমি দেখলাম যে,এ দু ব্যক্তি (ছেলেটি ও স্ত্রীলোকটি) ঐ লোকটিকে অনুসরণ করে রুকু ও সিজদাহ্ করছে। এ অভূতপূর্ব দৃশ্য আমাকে অনুসন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করল। তাই আমি আব্বাসকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি আমাকে বলেছিলেন : ঐ লোকটি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্;ঐ ছেলেটি তার পিতৃব্যপুত্র এবং ঐ স্ত্রীলোকটি যে এদের দু জনের পেছনে দাঁড়িয়েছিল সে মুহাম্মদের স্ত্রী। অতঃপর তিনি বললেন : আমার ভাতিজা (মুহাম্মদ) বলে : এমন একদিন আসবে যে দিন পারস্যসম্রাট খসরু ও রোমানসম্রাট কায়সারের সকল ধনভাণ্ডার তার করায়ত্তে আসবে। তবে মহান আল্লাহর শপথ! একমাত্র এ তিনজন ব্যতীত পৃথিবীর বুকে এ ধর্মের আর কোন অনুসারী নেই। এরপর রাবী বলেন, আমিও আশা করছিলাম যে,হায় যদি আমি তাদের চতুর্থ ব্যক্তি হতাম।”

এমনকি যে সব ব্যক্তি হযরত আলী (আ.)-এর গুণ বর্ণনা করার ক্ষেত্রে অবহেলা প্রদর্শন করেছেন তাঁরাও উপরিউক্ত ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। আগ্রহী পাঠকবর্গ উপরিউক্ত ঘটনা বিস্তারিত জানার জন্য নিম্নোক্ত গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করতে পারেন।২২৮

1. হযরত ইবরাহীম খলীল (আ.)

খলীলুর রাহমান (মহান আল্লাহর বন্ধু) হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনচরিত বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্য হলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও পরিচিতি লাভ করা। কারণ মহানবীর সম্ভ্রান্ত বংশধারা ইবরাহীম (আ.)-এর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট। আর যেহেতু এ দু জন এবং মহানবীর কতিপয় মহান পূর্বপুরুষ আরব জাতি ও ইসলামের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন সেজন্য আমরা সংক্ষেপে তাঁদের বিভিন্ন অবস্থা ও ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করা সংগত বলেই মনে করছি। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের ঘটনাসমূহ এ ধর্মের শুভ অভ্যুদয়ের সমকালীন ঘটনা অথবা ইসলামপূর্ব অতীত ঘটনাবলীর সাথে শিকলের গ্রথিত আংটা বা কড়াসমূহের ন্যায় পরস্পর সংযুক্ত ও গ্রথিত।

উদাহরণস্বরূপ পিতামহ হযরত আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক শৈশবে মহানবী (সা.)-এর লালন-পালন,পিতৃব্য হযরত আবু তালিবের অশেষ কষ্ট বরণ এবং মহানবীর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দান ও পৃষ্ঠপোষকতা,বনি হাশিমের উচ্চ সম্মান ও মর্যাদা এবং বনি উমাইয়্যার শত্রুতার মূল উৎস ও কারণ ইসলামের ইতিহাসের ঘটনাবলীর মৌলিক ভিত্তিমূল হিসাবে গণ্য। এ কারণেই এ ধরনের আলোচনাসমূহের জন্য ইসলামের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের অবতারণা করা হয়েছে।

তাওহীদের মহানায়ক হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জীবনের অনেক সমুজ্জ্বল অধ্যায় ও দিক রয়েছে। তাওহীদের প্রসার এবং শিরক ও মূর্তিপূজার মূলোৎপাটনের পথে তাঁর অক্লান্ত সাধনা,সংগ্রাম ও শ্রম,তারকা পূজারীদের সাথে তাঁর তাত্ত্বিক,তাৎপর্যমণ্ডিত ও ক্ষুরধার আলোচনাসমূহ সত্যান্বেষীদের জন্য তাওহীদের সর্বোচ্চ পাঠ ও শিক্ষা বলে গণ্য যা আমাদের জন্য পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জন্মভূমি

হযরত ইবরাহীম (আ.) এমন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যা পুরোপুরি মূর্তিপূজা,শিরক ও মানবপূজায় লিপ্ত ছিল। মানুষ নিজ হাতে নির্মিত মূর্তি ও তারকারাজির কাছে মাথা নোয়াত।

বাবিল বা ব্যাবিলন নগরী ছিল তাওহীদের মহান পতাকাবাহী হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জন্মভূমি। ঐতিহাসিকগণ এ নগরীকে পৃথিবীর সাত আশ্চর্যের একটি বলে গণ্য করেছেন। আর এ নগরীর উন্নত কৃষ্টি ও সভ্যতা সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে বিশদ আলোচনা হয়েছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হেরোডোট লিখেছেন : ব্যাবিলন নগরী বর্গাকৃতিতে তৈরি করা হয়েছিল যার (চতুর্দিকের) প্রতিটি পাশের দৈর্ঘ্য 120 ফারসাখ এবং পরিধি 480 ফারসাখ ছিল।80 যদিও এ বর্ণনাটি অতিশয়োক্তির দোষে দুষ্ট তারপরও একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা (এতৎসংক্রান্ত লিখিত অন্যান্য তথ্য ও গ্রন্থ বিবেচনায় আনলে) এ বর্ণনা থেকে ভালোভাবে উন্মোচিত হয়। কিন্তু আজ দজলা ও ফোরাতের মাঝখানে ছোট-খাটো একটি মাটির টিলা ব্যতীত ঐ সময়ের চিত্তাকর্ষক দৃশ্যাবলী,উঁচু উঁচু সুরম্য প্রাসাদ ও ভবনের আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। এখন ঐ জায়গার সর্বত্র মৃত্যুপুরীর নীরবতা বিরাজমান। তবে কখনো কখনো প্রত্নতত্ত্ববিদগণ বাবিল নগরী ও রাজ্যের জনগণের সভ্যতার স্বরূপ জানা ও বোঝার জন্য খননকার্য চালানোর ফলে সেখানকার এ নীরবতার জাল ছিন্ন-ভিন্ন করে ফেলেন।

নমরুদ বিন কিনআন-এর রাজত্বকালে তাওহীদের মহানায়ক হযরত ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যদিও নমরুদ মূর্তিপূজক ছিল,তথাপি সে জনগণের কাছে নিজেকে খোদা’বলে দাবি করত। সম্ভবত আশ্চর্যই লাগতে পারে যে,কিভাবে একই ব্যক্তি মূর্তিপূজক,আবার একই সাথে সে জনগণের কাছে নিজেকে খোদা’বলে দাবি করে? আর ঠিক মিশরের ফিরআউনের ব্যাপারেও আমরা পবিত্র কোরআন থেকে এ ধরনের বিষয়ই জেনেছি (অর্থাৎ ফিরআউন মূর্তিপূজক হওয়ার পাশাপাশি নিজেকে খোদা’বলে দাবি করেছিল)। যখন মূসা ইবনে ইমরান (আ.) শক্তিশালী যুক্তি ও দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে ফিরআউনের প্রশাসন ও সরকারের ভিত টলিয়ে দিয়েছিলেন তখন ফিরআউনের সমর্থকগণ প্রতিবাদী কণ্ঠে তাকে (ফিরআউনকে) সম্বোধন করে বলেছিল,

) أ تذر موسى و قومه ليفسدوا في الأرض و يذرك و آلهتك(

“আপনি কি মূসা ও তার কওমকে পৃথিবীর বুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেবেন? সে আপনাকে ও আপনার উপাস্যদেরকে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করছে।” (সূরা আরাফ : 127)

এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে,ফিরআউন নিজেকে খোদা বলে দাবি করত এবং

) أنا ربّكم الأعلى(

আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ প্রভু 81   ও

 ) ما علمت لكم من إله غيري(

আমি ব্যতীত তোমাদের যে আর কোন উপাস্য আছে তা আমি জানি না 82

-এ কথাগুলো বলত,অথচ সে ঐ একই সময় মূর্তিপূজকও ছিল। কিন্তু মূর্তিপূজক ও মুশরিকদের যুক্তিতে এতে কোন অসুবিধা নেই যে,কোন ব্যক্তি কোন এক গোষ্ঠীর খোদা ও উপাস্য হবে,অথচ ঐ একই সময় উক্ত উপাস্যও তার চেয়ে বড় খোদার পূজা করবে। কারণ খোদা ও উপাস্য শব্দের অর্থ বিশ্বব্র‏‏ হ্মাণ্ডের স্রষ্টা নয়,বরং এমন সত্তা যার অন্যদের ওপর কোন এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে এবং তাদের জীবনের সর্বময় কর্তৃত্ব তার হাতেই ন্যস্ত। ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে : রোমে কোন এক বংশের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিগণকে বংশের অন্যান্য সদস্য পূজা করত,অথচ ঐ একই সময় ঐ সব পূজিত বয়োজ্যেষ্ঠগণেরও নিজস্ব উপাস্য ছিল যার পূজা তারা করত।

সবচেয়ে বড় যে দুর্গ নমরুদ নিজ হাতের মুঠোয় এনেছিল তা ছিল (তার প্রতি) একদল জ্যোতির্বিদ ও ভবিষ্যদ্বক্তার সমর্থন,মনোযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণ। এ সব জ্যোতির্বিদ ও ভবিষ্যদ্বক্তা সে যুগের জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী বলে গণ্য হতো। তাদের নমরুদের প্রতি ভক্তি ও বিনয় সমাজের নিম্ন ও অজ্ঞ শ্রেণীকে দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। অধিকন্তু হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে আযরের মতো ব্যক্তিবর্গও ছিল। আযর ছিল মূর্তিনির্মাতা এবং সে তারকারাজির অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত। সে নমরুদের একজন সভাসদও হয়েছিল। আর এ বিষয়টিও হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জন্য এক বিরাট অন্তরায় ছিল। কারণ জনগণের কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা ছাড়াও তিনি তাঁর নিজ আত্মীয়-স্বজনদের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

যখন নমরুদ স্বপ্নিল জীবনের মধ্যে বুঁদ ছিল ঠিক তখনই আকস্মিকভাবে জ্যোতির্বিদগণ বিপদের প্রথম ঘণ্টা বাজিয়ে বলল, তোমার হুকুমত এমন এক ব্যক্তির হাতে ধ্বংস হবে যে এ জনপদেরই সন্তান।” নমরুদের সুপ্ত চিন্তাধারা জাগ্রত হলো এবং সে জিজ্ঞেস করল, সে কি জন্মগ্রহণ করেছে না করে নি? তারা বলল, সে এখনও জন্মগ্রহণ করে নি।” রাজা নমরুদ জ্যোতির্বিদদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী যে রাতে তার উক্ত ভয়ঙ্কর শত্রুর ভ্রুণ মাতৃগর্ভে স্থিতি লাভ করবে সে রাতে সক্ষম নারী-পুরুষদের বিচ্ছিন্ন রাখার আদেশ দিয়েছিল। বর্ণনা অনুসারে নমরুদের জল্লাদরা ছেলে শিশুদের হত্যা করত। ধাত্রীদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তারা যেন নবজাতক শিশুদের মুখ নমরুদের বিশেষ দফতরে পাঠিয়ে দেয়।

ঘটনাক্রমে যে রাতে নারী-পুরুষের দৈহিক মিলন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল সে রাতেই হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পবিত্র ভ্রুণ মাতৃগর্ভে স্থিতি লাভ করে। ইবরাহীম (আ.)-এর মা গর্ভধারণ করলেন এবং মূসা ইবনে ইমরানের মায়ের মতোই তাঁর গর্ভধারণকাল গোপনে সমাপ্ত হলো। প্রসব করার পর প্রাণপ্রিয় সন্তান নবজাতক ইবরাহীমকে নিয়ে তাঁর মা শহরের পাশে অবস্থিত এক গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং তাঁকে সেখানেই রেখেছিলেন। দিন-রাত যতবার সম্ভব ততবার তিনি তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে দেখতে ঐ গুহায় যেতেন। সময় গত হওয়ার সাথে সাথে এ ধরনের অত্যাচার নমরুদকে নিশ্চিত ও নিরুদ্বিগ্ন করে এবং তার নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মে যে,সে তার রাজত্ব ও রাজসিংহাসনের শত্রুকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে।

ইবরাহীম (আ.) পুরো 13 বছর ঐ গুহায় কাটিয়েছিলেন। স্মর্তব্য যে,ঐ গুহাটির একটি সরু প্রবেশপথ ছিল। 13 বছর পর ইবরাহীম (আ.)-এর মা তাঁকে গুহার বাইরে নিয়ে আসেন। ইবরাহীম (আ.) জনপদে পদার্পণ করলেন। নমরুদপন্থীদের জিজ্ঞাস্য দৃষ্টি তাঁর ওপর পড়লে তাঁর মা বললেন, এ আমার সন্তান;জ্যোতির্বিদদের ভবিষ্যদ্বাণী করার আগেই সে জন্মগ্রহণ করেছিল।”83

ইবরাহীম (আ.) গুহা থেকে বের হয়ে এসে ভূপৃষ্ঠ,আকাশ,উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ও তারকারাজি এবং বৃক্ষসমূহের সবুজ-শ্যামল হওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে তাঁর ফিতরাতগত তাওহীদী (توحيد فطري ) আকীদা-বিশ্বাসকে পূর্ণতর করেন।84 সমাজ ও জনপদে পদার্পণ করেই হযরত ইবরাহীম (আ.) কতিপয় ব্যক্তিকে তারকারাজির ঔজ্জ্বল্যের সামনে নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি বিকিয়ে দিতে দেখলেন। তিনি আরেক দলকে দেখতে পেলেন যে,তাদের চিন্তাধারার পর্যায় পূর্বোক্ত গোষ্ঠীর চেয়েও নিকৃষ্ট এ কারণে যে,তারা কাঠ বা পাথর নির্মিত প্রতিমার পূজায় রত। আর এ সব কিছুর চেয়েও নিকৃষ্ট ব্যাপার যা তিনি দেখতে পেলেন তা ছিল এই যে,এক ব্যক্তি (নমরুদ) জনগণের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে খোদা বলে দাবি করছে।

হযরত ইবরাহীম (আ.) তাই এ তিন রণাঙ্গনে সংগ্রাম করার প্রস্তুতি নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে হযরত ইবরাহীম যে এ তিনটি ক্ষেত্রে সংগ্রাম করেছিলেন তা বর্ণিত হয়েছে।

মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সংগ্রাম

মূর্তিপূজার নিকষ কালো আঁধার সমগ্র ব্যাবিলন রাজ্যকে গ্রাস করেছিল। পার্থিব ও স্বর্গীয় অগণিত মিথ্যা খোদা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর বিবেক-বুদ্ধি কেড়ে নিয়েছিল। তারা কতিপয় মিথ্যা খোদাকে মহাশক্তির এবং আরো কিছু মিথ্যা খোদাকে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম বলে বিশ্বাস করত।

মানব জাতিকে পথ প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে মহান নবী-রাসূলদের পথ ও রীতিনীতি যুক্তি ও দলিল-প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ মানুষের হৃদয়ের সাথে তাঁদের সম্পর্ক। আর তাঁরা চান এমন এক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করতে যা ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ ধরনের শাসনব্যবস্থা বাহুবল ও তরবারির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। মহান নবীদের শাসনব্যবস্থা এবং নমরুদ ও ফিরআউনদের শাসনব্যবস্থার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য করতে হবে। দ্বিতীয় গোষ্ঠীর একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে যে কোনভাবে তাদের শাসনকর্তৃত্ব  ও নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখা,যদিও তাদের প্রশাসন তাদের মৃত্যুর পর ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু আধ্যাত্মিক ব্যক্তিগণ (মহান নবিগণ ও তাঁদের অনুসারিগণ) এমন প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান যা প্রকাশ্যে ও গোপনে,শাসকের ক্ষমতা-অক্ষমতার সময়,তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরবর্তীকালে শাসনকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম। অর্থাৎ তাঁরা মানব জাতির হৃদয়ে কর্তৃত্ব করেন-দেহের ওপর নয়। আর এ মহান লক্ষ্যটি কখনই জোর করে বাস্তবায়িত হবে না।

হযরত ইবরাহীম (আ.) শুরুতেই নিজ আত্মীয়-স্বজনদের ধর্মমতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। আযর তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের নেতৃত্ব দিত। এ সংগ্রামে পুরোপুরি সাফল্য আসতে না আসতেই85 ইবরাহীম (আ.) সংগ্রামের আরেকটি ক্ষেত্রের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এ দলটির চিন্তাধারার পর্যায় পূর্বোক্ত প্রথম দলটির চিন্তাধারা থেকে কিছুটা উন্নত ছিল। কারণ তারা হযরত ইবরাহীমের জ্ঞাতি-গোত্রের অনুসৃত রীতিনীতি ও ধর্মমতের বিপরীতে ভূলোকের নীচ ও হীন অস্তিত্ববান সত্তাসমূহকে পরিত্যাগ করে নভোমণ্ডলীয় গ্রহ,জ্যোতিষ্ক ও তারকারাজির পূজা করত। ইবরাহীম (আ.) মহাজাগতিক নভোমণ্ডলীয় বস্তুসমূহের পূজা-অর্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার ক্ষেত্রে কতগুলো ধারাবাহিক দার্শনিক ও তাত্ত্বিক সত্য যা সে সময়ের মানুষের চিন্তা-চেতনায় উদিতই হয় নি তা অত্যন্ত সহজ ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তাঁর উপস্থাপিত দলিল-প্রমাণ ও যুক্তিসমূহ আজও জ্ঞানী-গুণী,দার্শনিক,তাত্ত্বিক ও কালামশাস্ত্রবিদদের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপারটি হচ্ছে যে,পবিত্র কোরআনে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ বর্ণনা করার ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। এ কারণেই আমি একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ এ কয়েক পৃষ্ঠায় হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর বক্তব্য উল্লেখ করব।

ইবরাহীম (আ.) জনগণকে হেদায়েত করার জন্য এক রাতে সূর্যাস্তের শুরু থেকে পরের দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত জেগে থেকে আকাশ পর্যবেক্ষণ করলেন। এ 24 ঘণ্টায় তিনি পূর্বোক্ত তিন দলের সাথে আলোচনা এবং উপরিউক্ত গোষ্ঠীত্রয়ের আকীদা-বিশ্বাস মজবুত যুক্তি ও দলিল-প্রমাণের আলোকে খণ্ডন করেছেন।

রাতের কালো আঁধার ছেয়ে গেল এবং অস্তিত্বজগতের নিদর্শনগুলো সেই কালো আঁধারের মাঝে ঢাকা পড়ে গেল। নভোমণ্ডলীয় উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক শুক্রগ্রহ দিকচক্রবাল রেখার কোণে আবির্ভূত হলো। ইবরাহীম (আ.) শুক্রগ্রহের পূজারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বাহ্যত তাদেরই রীতিনীতি অনুসরণ করে বললেন, এ আমার প্রভু।” যখন তা অস্ত গেল এবং এক কোণে আত্মগোপন করল তখন তিনি বললেন, যে খোদা অস্ত যায় তাকে আমি পছন্দ করি না।” তিনি তাঁর বলিষ্ঠ এ যুক্তির আলোকে শুক্রগ্রহের পূজারীদের আকীদা-বিশ্বাস প্রত্যাখ্যান এবং এর অসারত্ব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেন।

পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর দৃষ্টি চাঁদের উজ্জ্বল গোলকের ওপর নিবদ্ধ হয় যার ঔজ্জ্বল্য ও সৌন্দর্য সবাইকে আকৃষ্ট করছিল। তিনি চন্দ্রপূজারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য চাঁদকে উপাস্য বলে বাহ্যত স্বীকার করলেন এবং এর পরেই তিনি দৃঢ় শক্তিশালী যুক্তির মাধ্যমে এ বিশ্বাসের তীব্র সমালোচনা করলেন। ঘটনাক্রমে মহান আল্লাহর অসীম শক্তি ও ক্ষমতা চাঁদকে দিকচক্রবাল রেখায় অদৃশ্য করে ফেলল। আর সে সাথে চাঁদের সকল আলো ও ঔজ্জ্বল্যও হারিয়ে গেল। উপত্যকা ও প্রান্তর কালো আঁধারে ছেয়ে গেল। ইবরাহীম (আ.) সত্যান্বেষীদের মনোবৃত্তি নিয়ে চন্দ্রপূজারীদের অন্তরে ব্যথা না দিয়ে বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আপনি যদি আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন তাহলে আমি নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্ট হয়ে যাব। কারণ তারকাসমূহের ন্যায় চাঁদেরও উদয়-অস্ত আছে। আর তা নিজেই এমন এক নিয়ম-শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থার অধীন যা স্থায়ী এবং যাতে বিঘ্ন ঘটানো সম্ভব নয়।”

রাতের আঁধার কেটে গেলে পূর্ব দিকের দিকচক্রবাল রেখার বক্ষভেদ করে সূর্যোদয় হলো। সূর্যের সোনালী আলো মরুপ্রান্তর,উপত্যকা ও পাহাড়ের পাদদেশ আলোকোদ্ভাসিত করল। সূর্যপূজারীরা তাদের উপাস্যের দিকে নিজেদেরকে রুজু করল। ইবরাহীম (আ.) বিতর্কের মূলনীতি সংরক্ষণ করার ছলে বাহ্যিকভাবে সূর্যকে নিজ প্রতিপালক বলে স্বীকার করলেন। কিন্তু সূর্য অস্ত গেলে তিনি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করলেন যে,সূর্যও এ অস্তিত্বজগতের অমোঘ নিয়মের অধীন। এরপর তিনি সূর্যের উপাস্য হওয়ার বিষয়টি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বর্জন করেন।

তখন তিনি উপরিউক্ত গোষ্ঠীত্রয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন,

...) إنّي وجّهت وجهي للّذي فطر السّموات و الأرض حنيفا و ما أنا من المشركين(

“নিশ্চয়ই আমি আমার মুখমণ্ডল (তথা সমগ্র অস্তিত্বকে) একনিষ্ঠ চিত্তে এমন এক সত্তার দিকে নিবদ্ধ করলাম যিনি যমীন ও আকাশসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিক নই।” (সূরা আনআম: 75-79)

ইবরাহীম (আ.)-এর বক্তব্যের উপলক্ষ ছিল ঐ সব ব্যক্তি যারা চিন্তা করত যে,পার্থিবজগতের যাবতীয় অস্তিত্ববান সত্তার প্রতিপালন ও পরিচালনা,যেমন তন্মধ্যে মানব জাতির অস্তিত্ব ও সৃষ্টির বিষয়টি নভোমণ্ডলীয় জ্যোতিষ্ক ও বস্তুসমূহের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে,উপরিউক্ত তিনটি বিষয়ে অনুষ্ঠিত হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আলোচনার চাপ অবশ্যই নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ওপর ছিল না। যথা : 1. স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ,2. মহান আল্লাহর সত্তার একত্ব ও তিনি যে এক ও অদ্বিতীয় এবং একাধিক খোদার অস্তিত্ব নেই-এ বিষয়টি প্রমাণ করা,3. স্রষ্টার একত্ব (মহান আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন স্রষ্টা নেই অর্থাৎ নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা মাত্র একজন)-এ বিষয়টি প্রমাণ,বরং ইবরাহীম (আ.)-এর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রভুত্ব,প্রতিপালন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে তাওহীদ বা একত্ববাদ। মহান আল্লাহ্ ব্যতীত সকল অস্তিত্ববান সত্তার প্রভু,পরিচালক ও প্রতিপালক অন্য কোন সত্তা নয়-এ বিষয়টির ওপর তিনি তাঁর আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ কারণেই তিনি নভোমণ্ডলীয় জ্যোতিষ্ক ও পদার্থসমূহের প্রভুত্ব খণ্ডন করার দলিল উপস্থাপন করার পর তৎক্ষণাৎ বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি আমার মুখমণ্ডল মহান আল্লাহর দিকেই নিবদ্ধ করেছি যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা।” অর্থাৎ পৃথিবী ও আকাশসমূহের স্রষ্টাই এগুলোর প্রভু,প্রতিপালক ও পরিচালক। কখনই এ নিখিল বিশ্বের একাংশের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কতিপয় নভোমণ্ডলীয় জ্যোতিষ্ক ও তারকার হাতে অর্পণ করা হয় নি। আর তাই স্রষ্টা এবং পালনকর্তা ও পরিচালক এক ও অদ্বিতীয়। ব্যাপারটি এমন নয় যে,মহান আল্লাহ্ স্রষ্টা আর পালনকর্তা তিনি ব্যতীত অন্য সত্তা।

মুফাসসির ও কালামশাস্ত্রবিদগণ যাঁরা পবিত্র কোরআনের তত্ত্বজ্ঞানে গভীরভাবে চিন্তা ও আলোচনা করেছেন তাঁরা ইবরাহীম (আ.)-এর প্রদত্ত যুক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিরাট ভুল করেছেন। তাঁরা ভেবেছেন যে,ইবরাহীম (আ.)-এর আলোচনা ও কথোপকথনের লক্ষ্য এ সব নভোমণ্ডলীয় বস্তুসমূহের খোদায়ী অস্বীকার করা। অর্থাৎ যে খোদার প্রতি পৃথিবীর সকল জাতি বিশ্বাস রাখে এবং সমগ্র অস্তিত্বজগতই যার অস্তিত্বের নিদর্শন সেই খোদার অস্তিত্ব প্রমাণ। আবার কেউ কেউ ভেবেছেন যে,ইবরাহীম (আ.)-এর উপরিউক্ত আলোচনার আসল উদ্দেশ্য এ সব নভোমণ্ডলীয় বস্তুসমূহের সৃষ্টিক্ষমতা (خالقيّة ) রদ করা। কারণ অনেকেই এমন ধারণা করতে পারে যে,নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা মহান আল্লাহ্ এক পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্ববান সত্তাকে সৃষ্টি করার পর কতিপয় অস্তিত্বময় সত্তার কাছে সৃষ্টিকর্তার পদ হস্তান্তর করে থাকতে পারেন। যদি উপরিউক্ত ব্যাখ্যাদ্বয় সঠিক না হয় এবং অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্ববান সত্তা (واجب الوجود ) এবং তাঁর তাওহীদ (একত্ব) এবং স্রষ্টার একত্বের শিরোনামে কতিপয় বিষয় মেনে নেয়ার পর তাওহীদে রুবূবী’(প্রভুত্বের ক্ষেত্রে একত্ব) নামের অন্য এক ধরনের তাওহীদ প্রসঙ্গে এবং নিখিল বিশ্বের যে একজন স্রষ্টা ও পালনকর্তা আছেন-এ ব্যাপারে আলোচনা করাই ছিল ইবরাহীম (আ.)-এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং নিশ্চয়ই আমি আমার মুখমণ্ডলকে নিবদ্ধ করলাম... -এ আয়াতটি বর্ণিত ব্যাখ্যার সর্বোত্তম দলিল ও সাক্ষ্যপ্রমাণ। এ কারণেই প্রতিপালক এবং তারকা,চন্দ্র ও সূর্যের মতো নভোমণ্ডলীয় বস্তুসমূহের প্রভুত্বের মধ্যেই হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আলোচনার সমগ্র চাপ ও দৃষ্টি নিহিত ছিল।86

আলোচনা পূর্ণ করার জন্য ইবরাহীম (আ.)-এর প্রদত্ত যুক্তি ও দলিল-প্রমাণকে আমরা আরেকভাবে ব্যাখ্যা করব :

হযরত ইবরাহীম (আ.) তিন ক্ষেত্রেই এ সব নভোমণ্ডলীয় পদার্থের উদয়-অস্তকে এ বিষয়ের ওপর সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করেছেন যে,এ সকল নভোমণ্ডলীয় বস্তু পৃথিবীর প্রপঞ্চ ও ঘটনাবলী,বিশেষ করে মানুষ’নামের প্রপঞ্চটির প্রতিপালন ও পরিচালনা করার কোন যোগ্যতাই রাখে না। এখন প্রশ্ন করা যায় যে,এ সব বস্তুর উদয়-অস্ত কেন এগুলোর প্রতিপালক ও পরিচালক না হওয়ার পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও দলিলস্বরূপ?

এ বিষয়টি বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা সম্ভব। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা কোন না কোন গোষ্ঠীর জন্য উপকারী। নভোমণ্ডলীয় বস্তুসমূহের প্রতিপালক ও পরিচালক হওয়ার বিষয়টি অপনোদন করা সংক্রান্ত হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর প্রদত্ত যুক্তিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে,পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন দিক,মাত্রা ও পর্যায় রয়েছে;আর এর প্রতিটি দিক ও পর্যায় কোন না কোন গোষ্ঠীর জন্য উপস্থাপন করা যায়।

ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক প্রদত্ত যুক্তি ও দলিল-প্রমাণের বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিচে দেয়া হলো :

ক. প্রভু ও প্রতিপালক হিসাবে গ্রহণ করার লক্ষ্য হচ্ছে এই যে,দুর্বল অস্তিত্ববান সত্তা তার শক্তি ও সামর্থ্যরে আলোকে পূর্ণতার পর্যায়ে উপনীত হয়। আর এ ধরনের প্রতিপালক ও প্রশিক্ষকের অবশ্যই প্রতিপালিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অস্তিত্ববান সত্তাদের সাথে এমন গভীর সম্পর্ক থাকতে হবে যে,প্রতিপালক ও প্রশিক্ষক সর্বদা প্রতিপালিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সত্তার অবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকবে,তার থেকে কখনই পৃথক হবে না এবং তার সামনে উপস্থিত থাকবে।

যে অস্তিত্ববান সত্তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রতিপালিত সত্তার কাছ থেকে অনুপস্থিত থাকে,সম্পূর্ণরূপে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তার থেকে সরাসরি আলো ও কল্যাণ উঠিয়ে নেয়,সে কিভাবে ভূলোকের অস্তিত্ববান সত্তাসমূহের প্রশিক্ষক ও প্রতিপালক হবে? এ কারণেই তারকার উদয়-অস্ত যা মর্ত্যলোকের ঘটনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার নিদর্শন তা সাক্ষ্য দেয় যে,মর্ত্যলোকের অস্তিত্ববান সত্তাসমূহের অন্য কোন প্রশিক্ষক ও প্রতিপালক আছেন যিনি এ ত্রুটি থেকে মুক্ত।

খ. নভোমণ্ডলীয় বস্তুসমূহের উদয়-অস্ত এবং এগুলোর সুশৃঙ্খল গতি সাক্ষ্য দেয় যে,এগুলো সবই আজ্ঞাধীন এবং এমন সব নিয়মের অধীন যা ঐ সব বস্তুর ওপর কর্তৃত্বকারী ও ক্রিয়াশীল। আর এ সব বস্তুর সুশৃঙ্খল নিয়মসমূহ মেনে চলাই এগুলোর দুর্বলতা ও অক্ষমতার দলিলস্বরূপ। এ ধরনের দুর্বল অস্তিত্ববান সত্তাসমূহ অস্তিত্বজগৎ এবং বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনা ও প্রপঞ্চের ওপর কর্তৃত্বশীল হতে পারে না। আর পৃথিবীর অস্তিত্ববান সত্তাসমূহ যদি এ সব নভোমণ্ডলীয় বস্তুর আলো থেকে উপকৃত হয় তাহলে তা এ সব বস্তুর প্রভুত্বের দলিল বলে গণ্য হবে না,বরং এ থেকে প্রমাণিত হয় যে,ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে আদেশপ্রাপ্ত হয়ে এ সব বস্তু এ পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনা ও প্রপঞ্চের বরাবরে দায়িত্ব পালন করে মাত্র;অন্যভাবে বলা যায় যে,এ বিষয়টি নিখিল বিশ্বের যাবতীয় অস্তিত্ববান সত্তার মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক,সামঞ্জস্য,নির্ভরশীলতা ও প্রভাব বিদ্যমান আছে তা প্রমাণ করে।

গ. এ সব (নভোমণ্ডলীয়) বস্তুসমূহের গতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই বা কি হতে পারে? লক্ষ্য কি এটিই যে,এগুলো অপূর্ণতা থেকে পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে অথবা এর উল্টোটি? দ্বিতীয়টি মোটেও ভাবা যায় না। আর দ্বিতীয়টি যদি কল্পনা করা হয় তাহলে অস্তিত্ববান সত্তাসমূহের প্রতিপালক ও পরিচালক এ সব নভোমণ্ডলীয় বস্তুর পূর্ণতার পর্যায় থেকে অপূর্ণতা,অস্তিত্বহীনতা ও ধ্বংসের দিকে ধাবমান হওয়ার কোন অর্থই হয় না। আর স্বয়ং এ বিষয়টি (পূর্ণতা থেকে অপূর্ণতার পর্যায়ে অবনতি) থেকে প্রমাণিত হয় যে,অন্য এক প্রতিপালক আছেন যিনি এ সব বাহ্যত শক্তিশালী অস্তিত্ববান সত্তাকে এক পর্যায় থেকে পূর্ণতর পর্যায়ে উন্নীত করেন এবং আসলে তিনিই প্রভু ও প্রতিপালক। আর তিনিই এ সব বস্তু এবং এগুলোর অধীনে যা কিছু আছে সেগুলোকেও পূর্ণতার দিকে পৌঁছে দেন।


11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53

54

55

56

57

58

59

60

61