চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড3%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 242 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 106711 / ডাউনলোড: 9685
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

পবিত্র কোরআনের পর্যায়ক্রমিক অবতীর্ণ হওয়া

পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার (নুযূল) অকাট্য ইতিহাস এবং এ গ্রন্থের সূরাসমূহের আয়াতগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে,এ ঐশী গ্রন্থের আয়াত ও সূরাসমূহ ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়েছে। পবিত্র মক্কা ও মদীনা নগরীর পরিবেশ-পরিস্থিতির বৈশিষ্ট্যাবলী অধ্যয়ন করলে মাক্কী আয়াতসমূহকে মাদানী আয়াতসমূহ থেকে পৃথক ও শনাক্ত করা সম্ভব। শিরক ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম,এক-অদ্বিতীয় মহান আল্লাহ্ এবং কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস স্থাপনের প্রতি জনগণকে আহবান জানানো সংক্রান্ত আয়াতসমূহকে আবশ্যিকভাবে মাক্কী এবং বিধি-বিধান ও জিহাদের আহবান সংক্রান্ত আয়াতসমূহকে অবশ্যই মাদানী বলে গণ্য করতে হবে। কারণ পবিত্র মক্কা নগরীতে মহানবী (সা.)-এর বক্তব্য ও আহবানের উপলক্ষ ছিল মূর্তিপূজারী মুশরিকরা যারা মহান আল্লাহর একত্ব এবং কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করত। যে সব আয়াত এ সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তা পবিত্র মক্কার পরিবেশে অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ পবিত্র মদীনা নগরীতে ঈমানদার ব্যক্তিবর্গ,ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা ছিল মহানবী (সা.)-এর আহবান ও সম্বোধনের পাত্র এবং মহান আল্লাহর পথে জিহাদ ছিল মহানবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ কারণেই শরীয়তের বিধি-বিধান,ইয়াহুদী-নাসারাদের ধর্ম এবং মহান আল্লাহর পথে জিহাদ ও আত্মোৎসর্গ করার আহবান সম্বলিত আয়াতসমূহই হচ্ছে মাদানী আয়াত।

পবিত্র কোরআনের বহু আয়াত মহানবী (সা.)-এর সময় যে সব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এ সব ঘটনাই শানে নুযূল’ নামে পরিচিত। এ সব শানে নুযূল সংক্রান্ত জ্ঞান সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহের অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাৎপর্যের স্বচ্ছতার কারণ। আর এ সব ঘটনা ঘটার কারণেই পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহ ঐ সব প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়েছে।

কিছু কিছু আয়াত প্রশ্নকারীদের প্রশ্নসমূহের উত্তর হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেগুলো জনগণের প্রয়োজন ও চাহিদা মিটিয়েছে। কিছুসংখ্যক আয়াত স্রষ্টাতত্ত্ব জ্ঞান এবং শরীয়তের বিধি-বিধান বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং এ বিষয়টি বিবেচনা করে বলা যায় যে,মহানবী (সা.)-এর ওপর পবিত্র কোরআন ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়েছে।

পবিত্র কোরআনও বেশ কিছু ক্ষেত্রে এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে। এরশাদ হচ্ছে :

) و قرآنا فرقناه لتقرأه على النّاس على مكث(

  আমরা এ কোরআনকে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ করেছি যাতে করে আপনি ধীরস্থিরভাবে জনগণের উদ্দেশে তা পড়ে শোনাতে পারেন। (সূরা ইসরা : ১০৬)

এখন হয়তো এ প্রশ্নটি উত্থাপিত হতে পারে যে,পুরো কোরআন কেন একসঙ্গে মহানবীর ওপর অবতীর্ণ হয় নি? কেন এ গ্রন্থটি তাওরাত ও ইঞ্জিলের ন্যায় মহানবী (সা.)-এর হাতে সঁপে দেয়া হয় নি? উল্লেখ্য যে,পুরো তাওরাত ও ইঞ্জিল একবারেই অবতীর্ণ হয়েছিল।

বর্তমানেই কেবল এ প্রশ্নটি উত্থাপন করা হয় নি,বরং মহানবী (সা.)-এর সমসাময়িক বিরোধী ও শত্রুরাও রিসালাতের যুগে সমালোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে উক্ত প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তারা বলত,لولا نزّل عليه القرآن جملة واحدة “তার ওপর কেন সম্পূর্ণ কোরআন একত্রে একবারে অবতীর্ণ করা হয় নি?

এদের প্রতিবাদ ও আপত্তিটিকে দু ভাবে ব্যাখ্যা করা যায় :

১. যদি ইসলাম ধর্ম ঐশী ধর্ম এবং এ গ্রন্থ ঐশী গ্রন্থ হয়ে থাকে যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে তাহলে অবশ্যই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম হবে। আর মহান আল্লাহ্ অবশ্যই এ ধরনের একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম ওহীর ফেরেশতাদের মাধ্যমে একত্রে একবারে মহানবী (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ করবেন। তাই কখনো এ গ্রন্থের আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে বিরতি থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ যে ঐশী ধর্ম সমুদয় মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস (উসূল),খুঁটিনাটি শাখাগত দিক (ফুরু),বিধি-বিধান,ফরয,সুন্নাহর দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্ণতাপ্রাপ্ত তা ২৩ বছরে বিভিন্ন উপলক্ষ ও প্রেক্ষাপটে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হওয়ার কোন কারণই থাকতে পারে না। যেহেতু পবিত্র কোরআন বিক্ষিপ্তভাবে কতগুলো প্রশ্ন এবং বিশেষ কতগুলো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে তাই ধারণা করা যায় যে,এ ধর্মটি মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস ও খুঁটিনাটি শাখাগত বিধি-বিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় নি এবং ধীরে ধীরে তা নিজেকে পূর্ণতার রঙে রাঙ্গিয়েছে। আর এ ধরনের অপূর্ণাঙ্গ ধর্ম যা ধীরে ধীরে পূর্ণতাভিমুখে অগ্রসর হয়েছে তা ঐশী ধর্ম বলে অভিহিত করা সমীচীন ও যুক্তিসংগত নয়।

২. পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহ এবং তাওরাত,ইঞ্জিল ও যবুরের অকাট্য ইতিহাস থেকে প্রতীয়মান হয় যে,উক্ত ঐশী গ্রন্থত্রয় লিখিত ফলক আকারে নবীদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। তাই পবিত্র কোরআন কেন এভাবে অবতীর্ণ হয় নি? যেমন পবিত্র কোরআন কেন তাওরাতের মতো কতগুলো ফলকে উৎকীর্ণ করে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে দেয়া হয় নি?

যেহেতু কুরাইশ বংশীয় মুশরিকগণ এ ধরনের আসমানী গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস করত না এবং এ সব গ্রন্থের নুযূল সম্পর্কে তাদের সম্যক জ্ঞান ও ধারণা ছিল না তাই বলা যায় যে,এ আপত্তির ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সেই প্রথম দৃষ্টিভঙ্গির অনুরূপ যা ইতোমধ্যে বর্ণিত হয়েছে। আর এ দৃষ্টিভঙ্গিটির সারসংক্ষেপ : কেন ওহীর ফেরেশতা কোরআনের সমুদয় আয়াত একত্রে একবারে তাঁর ওপর অবতীর্ণ করেন নি,বরং এ সব আয়াত সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন উপলক্ষে তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে?

ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হওয়ার অন্তর্নিহিত মূল রহস্য

এ সব ব্যক্তির আপত্তির জবাবস্বরূপ পবিত্র কোরআন পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে লুক্কায়িত কারণগুলো প্রকাশ্যে বর্ণনা করেছে। এখন আমরা এ অংশটি একটু বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করব যার প্রতি পবিত্র কোরআন একটি ছোট বাক্যের মাধ্যমে ইঙ্গিত করেছে :

১. মহানবী (সা.)-এর অনেক বড় বড় দায়িত্ব ছিল। রিসালাতের বিবিধ দায়িত্ব পালন করার পথে তাঁকে অনেক ভয়ঙ্কর সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

আত্মা ও মন (আত্মিক ও মানসিক মনোবল) যত বড়ই হোক না কেন এ ধরনের সমস্যাসমূহ কর্মচাঞ্চল্য ও উদ্দীপনায় ভাটা পড়ার কারণ হয়। তাই এ সময় অতিপ্রাকৃতিক জগতের সাথে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন ও যোগাযোগ এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতার ওহীসহ অবতরণের পুনরাবৃত্তি মানুষের আত্মায় শক্তি জোগায় এবং তার চিত্ত ও মনকে কর্মচাঞ্চল্য ও আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ করে দেয়। আর মহান আল্লাহর বিশেষ সুদৃষ্টি এবং তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসা ও দয়াও ওহী অবতরণের পুনরাবৃত্তি ঘটার মাধ্যমে নবায়িত হয়।

পবিত্র কোরআন এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছে :

) كذالك لنثبّت به فؤادك(

আপনার অন্তঃকরণ শক্তিশালী ও দৃঢ় করার জন্য আমরা ধাপে ধাপে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ করেছি।”

২. উক্ত আয়াতটি  উপরিউক্ত দিকটি ছাড়াও আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতিও লক্ষ্য স্থির করেছে বলে মনে করা যায়;আর তা হলো শিক্ষামূলক কল্যাণ ও উপকারিতার জন্য পবিত্র কোরআনের যে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয় তা অবধারিত করে দেয় এবং তা এভাবেই মানব জাতির হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। কারণ মহানবী (সা.) ছিলেন তাঁর উম্মতের আদর্শ শিক্ষক ও আত্মিক চিকিৎসক। তাই ঐশী সমাধানসহ মানব জাতির শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সমস্যা ও দুঃখ-কষ্টের সুষ্ঠু সমাধান করার লক্ষ্যে এ গ্রন্থ ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছে। মহান আল্লাহর বিধি-বিধান বাস্তবে প্রয়োগ করার মাধ্যমে তাদের রোগ উপশম ও আরোগ্য করার জন্যও তা (এ গ্রন্থটি) মনোনীত হয়েছে।

ঐ শিক্ষাপদ্ধতি হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর ও শক্তিশালী যার জ্ঞানগত দিকগুলো ব্যবহারিক দিকগুলোর সাথে মিলেমিশে আছে। শিক্ষক ছাত্রদেরকে যা কিছু শিখান তাৎক্ষণিকভাবে তিনি তা তাদেরকে হাতে-কলমে (ব্যবহারিকভাবে) দেখিয়েও দেন। তিনি তাঁর তত্ত্বসমূহকে ব্যবহারিক গবেষণায় রূপ দান করেন। তাঁর চিন্তাধারা ও তত্ত্বগুলো যেন নিছক অবাস্তব তত্ত্ব ও প্রকল্পের রঙে রঞ্জিত না হয় সে দিকেও তিনি খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।

চিকিৎসাশাস্ত্রের অধ্যাপক যদি কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বজনীন সূত্র এবং মূলনীতিসমূহের ওপর তাত্ত্বিক পাঠ দান করেন তাহলে তা তেমন কোন ফল বয়ে আনবে না। তবে তিনি যদি ছাত্রদের চোখের সামনে একটি রোগীর ক্ষেত্রে ঐ সব নিয়ম,সূত্র ও মূলনীতিসমূহ প্রয়োগ করেন এবং তাঁর বক্তব্যকে ব্যবহারিক শিক্ষায় রূপান্তরিত করেন তাহলে তিনি বেশি ফল লাভ করতে পারবেন।

পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহ যদি একত্রে একবারে অবতীর্ণ হতো (যদিও মুসলিম সমাজ তখনও এগুলোর অনেকগুলোর প্রতি মুখাপেক্ষী ছিল না তবুও) এ ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআন ঐ ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব বিবর্জিত হতো যা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। জনগণ যে সব আয়াত শিক্ষা করা অর্থাৎ যেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার ব্যাপারে তেমন কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না সে সব আয়াতের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা মানুষের অন্তরে তেমন লক্ষণীয় প্রভাব ফেলত না। তবে ওহীর ফেরেশতা যদি পবিত্র কোরআনের ঐ আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করেন জনতা যেগুলো শেখা ও যেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তাহলে নিঃসন্দেহে ও তর্কাতীতভাবে এ সব আয়াত জনগণের হৃদয়ে অধিক ইতিবাচক প্রভাব রাখবে এবং মানুষের অন্তরের অন্তস্তলে এগুলো সুগ্রথিত হয়ে যাবে। আর তারাও ঐ সব আয়াতের শব্দ ও অর্থ শেখার ব্যাপারে অধিক প্রস্তুতি গ্রহণ করবে ও মনোযোগী হবে। এ সব কিছুর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে,তারা এ সব শিক্ষার পরিণতি ও ফলাফলসমূহকে প্রকৃতপ্রস্তাবে মহানবীর শিক্ষা বলেই উপলব্ধি করবে। এখানেই প্রশিক্ষকের বক্তব্য ও বাণী ফলাফলের সাথে একীভূত হয়ে যায়। আর সকল তত্ত্বও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়।

এখানে একটি প্রশ্নের উত্তর এখনও অবশিষ্ট থেকে যাচ্ছে। আর তা হলো পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহের অবতীর্ণ হওয়া যদি ধাপে ধাপে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সম্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে আয়াতসমূহের অন্তর্নিহিত সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। মানুষ সব আয়াতের অন্তর্নিহিত জ্ঞান শিক্ষা ,আয়ত্তকরণ ,মুখস্থকরণ সংরক্ষণের ব্যাপারে মোটেও আগ্রহ প্রদর্শন উদ্যোগ গ্রহণ করবে না। তবে সম্পূর্ণ পবিত্র কোরআন যদি একত্রে একবারে অবতীর্ণ হয় এবং ওহীর ফেরেশতা যদি কোরআনের সকল আয়াত একত্রে একবারে (মহানবীর কাছে )তেলাওয়াত করেন তাহলে মহান আল্লাহর ওহীর (সাথে সংশ্লিষ্ট )সকল বিষয়ের আন্তঃসম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে অটুট সংরক্ষিত থাকবে। আর সব আয়াতের অন্তর্নিহিত অর্থ জ্ঞান শেখার ব্যাপারে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যকার ঝোঁক ,আগ্রহ উদ্যোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। পবিত্র কোরআন খুব ছোট একটি বাক্যের দ্বারা প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছে। এরশাদ হচ্ছে :কোরআনের আয়াতসমূহ যে ধীরে ধীরে এবং বেশ কিছু উপলক্ষ কারণের পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে তা ঠিক ,তবে ধরনের পর্যায়ক্রমিক অবতরণ গ্রন্থের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন বাধাই নয়। মহান আল্লাহ্ গ্রন্থের আয়াতসমূহের মধ্যে এমন এক বিশেষ সামঞ্জস্যতা দান আন্তঃসম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন যে ,এর ফলে মানুষের উচ্চাশা সাহস তাকে পবিত্র কোরানের আয়াত শিখতে মুখস্থ করতে সক্ষম করে তোলে। বিষয়টি নিম্নোক্ত আয়াতটিতেও উল্লিখিত হয়েছে :( و رتّلناه ترتيلا ) আর আমরা কোরআনের আয়াতসমূহে এক বিশেষ শৃঙ্খলা দান করেছি।

কোরআন ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হওয়ার অন্যান্য কারণ

৩. মহানবী (সা.) তাঁর রিসালাত অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ধরনের গোষ্ঠী,যেমন মূর্তিপূজক,ইয়াহুদী এবং খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এ সব গোষ্ঠীর প্রতিটি স্বতন্ত্র মতাদর্শের অনুসারী ছিল এবং প্রতিটি গোষ্ঠী স্রষ্টা,পরকাল এবং অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের ব্যাপারে স্বতন্ত্র আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করত। এ সব সাক্ষাৎ,কথাবার্তা ও আলাপ-আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণেই ঐশী বাণী ঐ সব ধর্মীয় গোষ্ঠীর আকীদা-বিশ্বাস এবং অভিমতের বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা ও ব্যাখা-বিশ্লেষণ (করেছে) এবং তাদের ধর্মসমূহ অপনোদন করার যুক্তি ও প্রমাণের অবতারণা করেছে (যদিও বিধর্মীদের পক্ষ থেকে কোন আবেদনও জানানো হয় নি)। এ ধরনের দেখা-সাক্ষাৎ,আলাপ-আলোচনা ও কথোপকথন বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত হয়েছে;এ কারণেই বিভিন্ন সময় ও উপলক্ষে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ ওহীর মাধ্যমে বিধর্মীদের আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিহীনতা বর্ণনা করা এবং ইসলামধর্ম বিরোধীদের উত্থাপিত বিভিন্ন আপত্তি ও সন্দেহ-সংশয়ের সঠিক উত্তর দেয়া ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না।

কখনো কখনো এ ধরনের সাক্ষাৎ,আলোচনা এবং কথোপকথনের কারণে বিধর্মীরা মহানবীর কাছে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করত এবং মহানবীও তাদের ঐ সব প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতেন। যেহেতু বিভিন্ন সময় ও উপলক্ষে তাদের এ সব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে তাই বিভিন্ন সময় ধাপে ধাপে ওহী অবতীর্ণ হওয়া ছাড়া এর আর কোন বিকল্পও ছিল না।

এ ছাড়াও মহানবীর জীবন ছিল একটি ঘটনাবহুল বিপ্লবী জীবন। তিনি এমন বিপুল সংখ্যক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন যেগুলোর বিধি-বিধান এবং ধর্মীয় দায়িত্ব ঐশী বাণীর মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়।

কখনো কখনো সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু ঘটনা প্রবাহের সম্মুখীন হতো যার কারণে মহানবীর শরণাপন্ন হয়ে এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর বিধান কি হবে সে ব্যাপারে প্রশ্ন করত;আর যেহেতু বিভিন্ন সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটত ও এ সব প্রশ্ন উত্থাপিত হতো তাই ওহীর মাধ্যমে এ সব প্রশ্নের পর্যায়ক্রমে উত্তর দেয়া ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না।

পবিত্র কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে এ সব বিষয় ও অন্যান্য বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে:

) و لا يأتونك بمثل إلّا جئناك بالحقّ و أحسن تفسيرا(

“আপনার ওপর তারা কোন খুঁত ধরতে সক্ষম নয়;(তারা যা কিছুই উত্থাপন করুক না কেন) আমরা আপনার কাছে সত্য এনে দিয়েছি এবং সর্বোত্তম পন্থায় (সব বিষয়ের) ব্যাখ্যা প্রদান করেছি। (সূরা ফুরকান : ৩৩)

৪. এ সব কিছু ছাড়াও পবিত্র কোরআনের পর্যায়ক্রমিক অবতরণের আরো একটি অন্তর্নিহিত রহস্য বা কারণ আছে,যে বিষয়ে জনগণ ছিল অমনোযোগী। আর তা হলো মানব জাতিকে পবিত্র কোরআনের উৎসের (মহান আল্লাহর) দিকে এবং এ বিষয়ের দিকে পরিচালিত করা যে,এ গ্রন্থটি মহান আল্লাহর ঐশী গ্রন্থ। আর তা কখনই মানবরচিত নয়। কারণ পবিত্র কোরআন দীর্ঘ ২২ বছর ধরে বিভিন্নধর্মী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। আর এ সব ঘটনা দুঃখ,যন্ত্রণা,হাসি-আনন্দ ও সফলতামণ্ডিত ছিল (অর্থাৎ কোন কোন ঘটনা ছিল বিষাদময়,আবার কতিপয় ঘটনা ছিল আনন্দঘন ও সাফল্যমণ্ডিত)। নিশ্চিতভাবে এ ধরনের বিভিন্ন অবস্থা এবং পরস্পর বিপরীত আবেগ-অনুভূতি মানুষের আত্মা ও মন-মানসিকতার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। এ ধরনের পরস্পর বিপরীত অবস্থায় কোন মানুষের পক্ষেই সব সময় এক ধাঁচে কথা বলা কখনই সম্ভব নয়;কারণ আনন্দ ও প্রফুল্লতার মধ্যে মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত ও লিখনীর মাধ্যমে প্রকাশিত কথা ও বাণী এবং দুঃখ,অবসাদ,ক্লান্তি এবং ব্যথা-বেদনার মধ্যে মানুষের কণ্ঠনিঃসৃত কথা ও বাণীর মধ্যে ভাষার প্রাঞ্জলতা,সাবলীলতা,শব্দের সৌন্দর্য এবং গভীর অর্থ ও তাৎপর্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যদিও পবিত্র কোরআন মহানবীর ওপর বিভিন্ন ঘটনা ও পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে তবুও এ গ্রন্থের বিভিন্ন আয়াতে শব্দ ও অর্থের দৃষ্টিতে ছোট-খাটো পার্থক্যও বিদ্যমান নেই। আর এ সব আয়াত এমন এক ভাষাগত মান ও পর্যায়ে অধিষ্ঠিত যে,এ গ্রন্থের কোন একটি আয়াত ও সূরার সমমানের অনুরূপ কোন কিছু রচনা করা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। যেন পবিত্র কোরআন এমন এক গলিত রৌপ্যসদৃশ যা একবারেই ছাঁচ থেকে বের করে আনা হয়েছে।

এ গ্রন্থের আয়াতসমূহের মাঝে কোন দুর্বলতা ও পার্থক্য বিদ্যমান নেই বরং এক অনন্য রত্ন ও রাজোচিত মুক্তার ন্যায় যার শেষাংশ প্রথমাংশের ন্যায়।

আর সম্ভবত নিচের আয়াতটি যা পবিত্র কোরআনে যে কোন ধরনের পার্থক্যের অস্তিত্ব প্রত্যাখ্যান করে বলে, যদি তা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হতো তাহলে এতে অনেক পার্থক্য থাকত’,তা অন্তর্নিহিত এ কারণ বা রহস্যটির দিকেই ইঙ্গিতস্বরূপ। আয়াতটি হলো :

) و لو كان من عند غير الله لوجدوا فيه اختلافا كثيرا(

  আর যদি তা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন সত্তার কাছ থেকে অবতীর্ণ হতো তাহলে তারা এতে প্রচুর পার্থক্য ও বৈপরীত্য খুঁজে পেত। (সূরা নিসা : ৮২)

তাফসীরকারগণ এ আয়াতটিকে কোরআনের আয়াতসমূহের অন্তর্নিহিত অর্থের পার্থক্য ও বৈপরীত্যের সাথেই সংশ্লিষ্ট বলে মনে করেন,অথচ এ আয়াতটি এ ধরনের কোন পার্থক্য দূরীভূত করে না,বরং পবিত্র কোরআনকে সব ধরনের পার্থক্য ও বৈপরীত্য-যা মানবীয় কাজেরই অনিবার্য পরিণতি তা থেকে পবিত্র ও মুক্ত করে।

 

সপ্তদশ অধ্যায় : হিজরত

হাশিম-এর বিবাহ

আমর খাযরাজীর কন্যা সালমা ছিলেন সম্ভ্রান্ত ও ভদ্র রমণী যিনি স্বামীর কাছ থেকে তালাক নেয়ার পর অন্য কোন পুরুষের সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে মোটেও রাজী ছিলেন না। একবার শাম সফর শেষে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করার সময় হাশিম কয়েক দিনের জন্য ইয়াসরিবে যাত্রাবিরতি করেছিলেন এবং তখন তিনি সালমাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। হাশিমের মহৎ চরিত্র,মহানুভবতা,তাঁর বিত্তবিভব,দানশীলতা এবং কুরাইশদের ওপর তাঁর কথার প্রভাব সালমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং দু টি শর্তে তিনি হাশিমের সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে রাজী হন। শর্তদ্বয়ের একটি ছিল এই যে,সন্তান প্রসবের সময় তিনি তাঁর গোত্রের কাছে থাকবেন। আর এই শর্তের কারণে মক্কায় হাশিমের সাথে কিছুদিন বসবাস করার পর যখন অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেল তখন তিনি ইয়াসরিবে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং সেখান একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলেন যাঁর নাম রাখলেন শাইবাহ্। এ সন্তানই পরবর্তীকালে আবদুল মুত্তালিব নামে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। ঐতিহাসিকগণ তাঁর এ উপাধি লাভ করার কারণ সম্পর্কে ঠিক এ রকম লিখেছেন :

“যখন হাশিম বুঝতে পারলেন যে,তাঁর জীবনের অন্তিম সময় ঘনিয়ে আসছে তখন তিনি তাঁর ভাই মুত্তালিবকে বলেছিলেন : তোমার দাস শাইবাকে অবশ্য অবশ্যই দেখবে। যেহেতু হাশিম (শাইবার পিতা) তাঁর নিজ সন্তানকে মুত্তালিবের দাস বলেছেন এ কারণে তিনি (শাইবাহ্) আবদুল মুত্তালিব’নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যান।”

কখনো কখনো তাঁরা বলেছেন, একদিন একজন মক্কাবাসী ইয়াসরিবের সড়কগুলো অতিক্রম করছিল। তখন সে দেখতে পেল যে,অনেক বালক তীর নিক্ষেপ করছে। যখন একটি বালক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হলো তখন সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠল : আমি বাতহার নেতার পুত্র। ঐ মক্কাবাসী লোকটি সামনে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল : তুমি কে? তখন সে উত্তরে শুনতে পেল : শাইবাহ্ ইবনে হাশিম ইবনে আবদে মান্নাফ।”

ঐ লোকটি ইয়াসরিব থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করার পর হাশিমের ভ্রাতা ও মক্কা শহরের প্রধান মুত্তালিবের কাছে পুরো ঘটনাটি খুলে বলল। চাচা (মুত্তালিব) তখন আপন ভ্রাতুষ্পুত্রের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। এ কারণেই তিনি ইয়াসরিবের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। ভ্রাতুষ্পুত্রের চেহারা দেখে মুত্তালিবের দু চোখে ভাই হাশিমের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠল,তাঁর দু চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। অত্যন্ত আবেগ,উষ্ণতা ও উদ্দীপনাসহকারে চাচা-ভাতিজা একে অপরকে চুম্বন করলেন। মুত্তালিব ভাতিজাকে মক্কায় নিয়ে যেতে চাইলে শাইবার মা সালমার তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হন। সবশেষে মুত্তালিবের আশা বাস্তবায়িত হলো। মায়ের কাছ থেকে অনুমতি পাবার পর শাইবাকে নিজ অশ্বের পিঠে বসিয়ে মুত্তালিব মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন। আরবের প্রখর রৌদ্র ভাতিজা শাইবার রূপালী মুখমণ্ডলকে ঝলসে দিয়েছিল এবং তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদও প্রখর তাপে মলিন ও জীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই মক্কাবাসীরা মক্কায় মুত্তালিবের প্রবেশের সময় ধারণা করল যে,অশ্বারোহী বালকটি মুত্তালিবের দাস। মুত্তালিব যদিও বারবার বলেছিলেন, হে লোকসকল! এ আমার ভাতিজা’,তবুও মানুষের ধারণা ও কথাই শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। পরিণতিতে মুত্তালিবের ভাতিজা শাইবাহ্ আবদুল মুত্তালিব’উপাধিতেই প্রসিদ্ধি লাভ করলেন।103

কখনো কখনো বলা হয় যে,শাইবাকে আবদুল মুত্তালিব’বলে অভিহিত করার কারণ ছিল এই যে,যেহেতু তিনি স্নেহশীল চাচা মুত্তালিবের তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হয়েছিলেন এবং আরবদের প্রচলিত রীতিনীতিতে পালনকারীর অবদান ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য এ ধরনের ব্যক্তিদেরকে (যারা পালিত হতো) পালনকারীর দাস বা গোলাম বলে অভিহিত করা হতো।

5. আবদুল মুত্তালিব

হাশিমের পুত্র আবদুল মুত্তালিব ছিলেন মহানবী (সা.)-এর পিতামহ,কুরাইশ গোত্রের অবিসংবাদিত নেতা ও বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর গোটা সামাজিক জীবনটিই ছিল আলোকময় ঘটনাবলীতে পরিপূর্ণ। যেহেতু তাঁর নেতৃত্বকালীন ঘটনাবলীর সাথে ইসলামের ইতিহাসের অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক আছে সেহেতু তাঁর জীবনের কতিপয় ঘটনা আমরা এখানে আলোচনা করব :

নিঃসন্দেহে মানুষের আত্মা যতই শক্তিশালী হোক না কেন পরিণামে সে খানিকটা হলেও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং পরিবেশ ও সমাজের রীতিনীতি তার চিন্তাধারায় অতি সামান্য হলেও প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তবে কখনো কখনো এমন কিছু ব্যক্তি আবির্ভূত হন যাঁরা পূর্ণ সাহসিকতার সাথে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের বিভিন্ন প্রভাবকে প্রতিরোধ ও মোকাবিলা করেন এবং যে কোন ধরনের দূষণ দ্বারা বিন্দুমাত্র দূষিত হন না,বরং নিজেদেরকে তা থেকে পবিত্র ও মুক্ত রাখেন।

আমাদের আলোচিত বীরপুরুষ (আবদুল মুত্তালিব) এ ধরনের ব্যক্তিদের অন্যতম পূর্ণ নমুনা। তাঁর সমগ্র জীবন অগণিত আলোকমালায় উদ্ভাসিত। কোন ব্যক্তি আশি বছরের অধিককাল এমন এক সমাজ ও পরিবেশে বসবাস করেও মূর্তিপূজা,মদপান,সুদ খাওয়া,নরহত্যা ও অসৎ কার্যকলাপ ঐ সমাজের পূর্ব থেকে প্রতিষ্ঠিত রীতি-নীতি বলে গণ্য হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র জীবনে যদি একবারও মদপান না করে থাকেন,জনগণকে নরহত্যা,মদ্যপান ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখেন,যাদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ তাদেরকে বিবাহ করা এবং উলঙ্গ দেহে তাওয়াফ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজ মানত ও প্রতিজ্ঞার প্রতি অটল ও নিষ্ঠাবান থাকেন তাহলে এ ব্যক্তিটি অবশ্যই ঐ সব আদর্শবান ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হবেন যাঁদেরকে সমাজে খুব কমই দেখা যায়।

হ্যাঁ,যে ব্যক্তির ঔরসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র নূর আমানত হিসাবে রাখা হয়েছিল,তিনি অবশ্যই সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হবেন।

তাঁর সংক্ষিপ্ত জ্ঞানগর্ভমূলক বাণী,ঘটনা ও কাহিনীসমূহ থেকে প্রতিভাত হয় যে,তিনি ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে থেকেও একত্ববাদী ও পরকালে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি সর্বদা বলতেন, জালেম ব্যক্তি এই ইহলৌকিক জীবনেই কৃতকর্মের শাস্তি পায়। আর ঘটনাক্রমে যদি তার ইহলৌকিক জীবন শেষ হয়ে যায় এবং তার কৃতকর্মের শাস্তি না পায়,তাহলে সে পরকালে শেষবিচার দিবসে অবশ্যই তার কৃতকর্মের সাজাপ্রাপ্ত হবে। 104

হারব ইবনে উমাইয়্যাহ্ আবদুল মুত্তালিবের নিকটাত্মীয় ছিল এবং সে কুরাইশ গোত্রের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হতো। এক ইয়াহুদী তার প্রতিবেশী ছিল। এই ইয়াহুদী একদিন ঘটনাক্রমে তিহামার একটি বাজারে অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ প্রদর্শন করে এবং তার ও হারবের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। অবস্থা এতদূর গড়ালো যে,হারবের প্ররোচনায় ঐ ইয়াহুদী নিহত হয়। আবদুল মুত্তালিব ব্যাপারটি জানতে পেরে হারবের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করলেন এবং তার কাছ থেকে ঐ ইয়াহুদীর রক্তমূল্য আদায় করে তা নিহতের আত্মীয়-স্বজনের নিকট পৌঁছে দিলেন। এ ছোট কাহিনী থেকে এ মহান ব্যক্তির দুর্বল-অত্যাচারিতদের রক্ষা ন্যায়পরায়ণতার এক অত্যুজ্জ্বল মনোবৃত্তিই প্রমাণিত হয়।

যমযম কূপ খনন

যে দিন যমযম কূপের উদ্ভব হয়েছিল সে দিন থেকেই জুরহুম গোত্র ঐ কূপের চারপাশে বসতি স্থাপন করেছিল এবং পবিত্র মক্কা নগরীর শাসনকর্তৃত্ব দীর্ঘ দিন তাদের হাতেই ছিল। তারা উক্ত কূপের পানি নিজেদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করত। কিন্তু পবিত্র মক্কা নগরীতে ব্যবসায় ও জনগণের আমোদ-প্রমোদের প্রসার ঘটলে তাদের শৈথিল্য,উদাসীনতা এবং চারিত্রিক দুর্বলতা ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয় যে,এর ফলে যমযম কূপের পানি শুষ্ক হয়ে যায়।105

কখনো কখনো বলা হয় যে,জুরহুম গোত্র খুযাআহ্ গোত্রের হুমকির সম্মুখীন হয়ে নিজেদের আবাসস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেহেতু জুরহুম গোত্রপতি মাদ্দাদ ইবনে আমর নিশ্চিত বিশ্বাস করত যে,অতি শীঘ্রই সে তার নেতৃত্ব হারাবে এবং শত্রুদের আক্রমণে তার রাজ্য ও শাসনকর্তৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। এ কারণে সে পবিত্র মক্কার জন্য হাদিয়াস্বরূপ স্বর্ণনির্মিত যে দু টি হরিণ এবং খুব দামী যে কয়টি তলোয়ার আনা হয়েছিল তা যমযম কূপে নিক্ষেপ করে কূপটি মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল যাতে করে শত্রুরা এ মহামূল্যবান সম্পদ ব্যবহার করতে না পারে। এর কিছুদিন পরেই খুযাআহ্ গোত্রের আক্রমণ শুরু হয়। এর ফলে জুরহুম গোত্র এবং হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর অনেক বংশধরই পবিত্র মক্কা নগরী ত্যাগ করে ইয়েমেনের দিকে গমন করতে বাধ্য হয়। তাদের মধ্য থেকে আর কোন ব্যক্তি মক্কায় ফিরে আসে নি। এরপর থেকে মহানবী (সা.)-এর চতুর্থ ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ কুসাই বিন কিলাবের শাসনকর্তৃত্ব অর্জন করার মাধ্যমে কুরাইশদের জীবনাকাশে সৌভাগ্য-তারার উদয় হওয়া পর্যন্ত পবিত্র মক্কা নগরীর শাসনকর্তৃত্ব খুযাআহ্ গোত্রের হাতে থেকে যায়। কিছুকাল পরে শাসনকর্তৃত্ব আবদুল মুত্তালিবের হাতে চলে আসে। তিনি যমযম কূপ পুনরায় খনন করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে তখনও যমযম কূপের আসল অবস্থান সূক্ষ্মভাবে কেউ জানত না। অনেক অনুসন্ধান চালানোর পর তিনি যমযম কূপের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পেলেন এবং নিজ পুত্র হারেসকে নিয়ে কূপ খননের পূর্বপ্রস্তুতি সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

সাধারণত প্রতিটি গোত্র বা সমাজেই এমন কিছু মুষ্টিমেয় লোক পাওয়া যাবে যারা সব সময় যে কোন ভালো কাজ বাধাগ্রস্ত করার জন্য যে কোন ধরনের নেতিবাচক অজুহাত খুঁজে বেড়ায়। এ কারণেই আবদুল মুত্তালিবের প্রতিদ্বন্দ্বীরা ঘোর আপত্তি জানাতে থাকে যাতে করে তিনি এ বিরল সম্মান ও গৌরবের অধিকারী না হতে পারেন। তারা আবদুল মুত্তালিবকে লক্ষ্য করে বলেছিল, হে কুরাইশপ্রধান! যেহেতু এ কূপ আমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইসমাঈলের পুণ্যস্মৃতি এবং আমরা সবাই যেহেতু তাঁরই বংশধর তাই আমাদের সবাইকে এ কাজে শরীক করুন। বিশেষ কতিপয় কারণে হযরত আবদুল মুত্তালিব তাদের কথা মেনে নিলেন না। কারণ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এটিই যে,তিনি একাই এ কূপটি খনন করবেন এবং এর পানি বিনামূল্যে সকলের হাতে ছেড়ে দেবেন। আর এভাবেই বাইতুল্লাহ্ যিয়ারতকারী হাজীদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানিরও সুব্যবস্থা হয়ে যাবে। হাজীদের পানির বন্দোবস্ত করার বিষয়টি তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকার কারণে তা সব ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত হবে।

যখন তিনি স্বাধীনভাবে এ কাজের গুরুদায়িত্ব নিজ হাতে নেবেন ঠিক তখনই এ বিষয়টির পূর্ণ নিশ্চয়তা বিধান করা সম্ভব হবে।

অবশেষে তাঁরা একটি তীব্র বিরোধ ও টানাপড়েনের সম্মুখীন হলেন। আরবের একজন জ্ঞানী ভাববাদীর কাছে যাওয়া এবং এ ব্যাপারে তার বিচার মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা সফরের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। তাঁরা হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ফুল-ফল,পত্র-পল্লবহীন ধূসর মরু এলাকাগুলো একের পর এক অতিক্রম করতে লাগলেন। পথিমধ্যে তাঁরা অত্যন্ত পিপাসার্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁদের বিশ্বাস জন্মেছিল যে,তাঁরা তাঁদের অন্তিম মুহূর্তগুলো অতিবাহিত করছেন। এ কারণেই তাঁরা যখন মৃত্যুর কথা চিন্তা করতে থাকেন,তখন আবদুল মুত্তালিব এ অভিমত ব্যক্ত করলেন যে,প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ কবর খনন করুক। যখন তার মৃত্যু হবে তখন অন্যরা তার মৃতদেহ উক্ত কবরে শায়িত করবে। আর এভাবে যদি পানি পাওয়া না যায় এবং সকলের তৃষ্ণা অব্যাহত থাকে এবং সবাই মৃত্যুবরণ করে তাহলে এভাবে সকলেই (কেবল শেষ ব্যক্তি ব্যতীত) কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হবে এবং তাদের মৃতদেহ হিংস্র প্রাণী ও পাখির খাদ্যবস্তুতে পরিণত হবে না।

আবদুল মুত্তালিবের অভিমত সকলের কাছে মনঃপূত হলো। প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজের কবর খনন করল এবং সকলেই বিষণ্ণ বদনে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। হঠাৎ করে আবদুল মুত্তালিব উচ্চকণ্ঠে বললেন, হে লোকসকল! এটি এমনই এক মৃত্যু যা হীনতা ও দীনতা বয়ে আনে। তাই এটি কতই না উত্তম যে,আমরা সবাই দলবদ্ধ হয়ে এ মরুভূমির চারপাশে পানির অন্বেষণে ঘুরে বেড়াব! আশা করা যায় যে,মহান আল্লাহ্পাকের অনুগ্রহ ও কৃপার দৃষ্টি আমাদের ওপর পতিত হবে। 106 সবাই পশুর পিঠে আরোহণ করে হতাশা নিয়ে পথ চলতে লাগল এবং তখন তারা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। ঘটনাক্রমে সবাই অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে সুমিষ্ট পানির সন্ধান পেয়ে গেল এবং তারা সবাই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেল। এরপর তারা যে পথে এসেছিল সে পথেই পবিত্র কাবার দিকে ফিরে গেল এবং পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে যমযম কূপ খনন করার ব্যাপারে আবদুল মুত্তালিবের অভিমতের সাথে একমত পোষণ করল এবং সম্মত হলো।107

আবদুল মুত্তালিব একমাত্র পুত্রসন্তান হারেসকে সাথে নিয়ে কূপ খননে মশগুল হয়ে যান। খনন কার্য চালানোর ফলে কূপের চারদিকে মাটির একটি প্রকাণ্ড ঢিবি তৈরি হয়েছিল। হঠাৎ করে তিনি স্বর্ণনির্মিত দু টি হরিণ এবং কয়েকটি তলোয়ারের সন্ধান পান। কুরাইশগণ নতুন করে হৈ চৈ শুরু করে দিল এবং সকলেই প্রাপ্ত গুপ্তধনে নিজেদের অংশ আছে বলে দাবি করতে লাগল। তারা তাদের মাঝে লটারী করার সিদ্ধান্ত নিল। ঘটনাক্রমে লটারীতে ঐ দু টি স্বর্ণনির্মিত হরিণ এবং তরবারিগুলো যথাক্রমে পবিত্র কাবা ও আবদুল মুত্তালিবের নামেই উঠল। কুরাইশদের নামে লটারীতে কিছুই উঠল না এবং এ কারণে তারা উক্ত গুপ্তধন থেকে কোন অংশ পেল না। মহামতি আবদুল মুত্তালিব উক্ত তরবারিগুলো দিয়ে পবিত্র কাবার একটি দরজা নির্মাণ করে হরিণ দু টি ঐ দরজার ওপর স্থাপন করেছিলেন।

চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ ও নিষ্ঠা

যদিও অন্ধকার যুগের আরবগণ ছিল চরম নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার এবং চরমভাবে অধঃপতিত তবুও তাদের মধ্যে কতিপয় চারিত্রিক গুণ ছিল যা প্রশংসনীয়। যেমন চুক্তি ভঙ্গ করা তাদের কাছে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও খারাপ কাজ বলে গণ্য হতো। কখনো কখনো আরব গোত্রগুলো নিজেদের মধ্যে অত্যন্ত কঠিন চুক্তি সম্পাদন করত এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেগুলো মেনে চলত। কখনো কখনো তারা শক্তি নিঃশেষকারী নজর করত এবং চরম কষ্ট ও প্রাণান্তকর পরিশ্রমসহকারে তা বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে চেষ্টা করত।

আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপ খনন করার সময় উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে,বেশি সন্তান না থাকার কারণে কুরাইশদের মধ্যে তিনি দুর্বল ও অক্ষম। এ কারণেই তিনি নজর করেছিলেন যে,যখনই তিনি দশ সন্তানের পিতা হবেন তখন তিনি কাবা গৃহের সামনে যে কোন একজনকে কোরবানী করবেন। তিনি তাঁর এ নজর সম্পর্কে কাউকে অবহিত করেন নি। কিছুকাল পরে তাঁর সন্তানের সংখ্যা দশ হলে তাঁর নজর পূর্ণ করার সময়ও উপস্থিত হলো। আবদুল মুত্তালিবের জন্য এ বিষয়টি চিন্তা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে তাঁর মধ্যে ভয়ও কাজ করছিল যে,পাছে তিনি যদি তাঁর এ নজর আদায় করার ক্ষেত্রে সফল না হন তাহলে এর পরিণতিতে তিনি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারীদের কাতারে শামিল হয়ে যাবেন। এ কারণেই সন্তানদের সাথে বিষয়টি উত্থাপন ও আলোচনা এবং তাঁদের সম্মতি ও সন্তুষ্টি আদায় করার পর লটারীর মাধ্যমে তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে কোরবানীর জন্য মনোনীত করবেন।108

লটারীর আয়োজন করা হলো। লটারীতে মহানবী (সা.)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ্-এর নাম উঠলে আবদুল মুত্তালিব তৎক্ষণাৎ তাঁর হাত ধরে তাঁকে কোরবানী করার স্থানে নিয়ে গেলেন। কুরাইশ গোত্রের নর-নারীরা উক্ত নজর ও লটারী সম্পর্কে অবগত হলে যুবকদের চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। এক যুবক তখন বলছিল, হায় যদি এ যুবকের বদলে আমাকে জবাই করা হতো!

কুরাইশ দলপতিগণ বলতে লাগল, যদি আবদুল্লাহর পরিবর্তে সম্পদ উৎসর্গ করা যায় তাহলে আমরা আমাদের ধন-সম্পদ তার অধিকারে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত আছি।” আবদুল মুত্তালিব জনতার আবেগ ও অনুভূতির উত্তাল তরঙ্গমালার সামনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন এবং চিন্তা করতে লাগলেন পাছে যদি তাঁর অঙ্গীকার ভঙ্গ হয়ে যায়,এতদ্সত্ত্বেও তিনি এর একটি উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তাদের মধ্যে থেকে একজন বলল, এ সমস্যাটি আরবের একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে উত্থাপন করুন,তাহলে এ ব্যাপারে তিনি একটি পথ বাতলে দিতে পারবেন।” আবদুল মুত্তালিব এবং কুরাইশ নেতৃবর্গ এ প্রস্তাবে সম্মত হলেন এবং ইয়াসরিবের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। সেখানে ঐ জ্ঞানী ব্যক্তি বসবাস করতেন। সমস্যার সমাধান দেয়ার জন্য তিনি একদিন সময় চাইলেন। পরের দিন সবাই তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হলে তিনি বললেন, আপনাদের নিকট একজন লোকের রক্তমূল্য কত? তখন তাঁরা বললেন, 10টি উট।” গণক বললেন, দশটি উট ও যে ব্যক্তিকে আপনার কোরবানীর জন্য মনোনীত করেছেন তার মধ্যে লটারী করবেন। লটারীতে ঐ ব্যক্তির নাম উঠলে উটগুলোর সংখ্যা দ্বিগুণ করবেন এবং পুনরায় উটগুলো ও ঐ ব্যক্তির  মধ্যে লটারী করুন। এতে যদি লটারীতে পুনরায় ঐ ব্যক্তির নাম আসে তাহলে উটগুলোর সংখ্যা তিনগুণ করুন এবং পুনরায় ঐ ব্যক্তি ও উটগুলোর মধ্যে লটারী করুন। আর এভাবে লটারীতে উটগুলোর নাম ওঠা পর্যন্ত লটারী করে যান।

গণকের এ প্রস্তাব জনতার আবেগ-অনুভূতি ও উৎকণ্ঠাকে মুহূর্তের মধ্যে বিলীন করে দিল। কারণ আবদুল্লাহর মতো যুবককে রক্তাক্ত দেখার চাইতে তাদের কাছে শত শত উট কোরবানী করা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। মক্কায় ফেরার পর একদিন প্রকাশ্যে সকলের মাঝে লটারী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। দশম বারে উটসংখ্যা 100-এ উপনীত হলে লটারীতে উটগুলোর নাম উঠল। আবদুল্লাহর জবাই থেকে মুক্তি প্রাপ্তি এক অভিনব আবেগ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করল। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তখন বললেন, আমার স্রষ্টা এ কাজে পূর্ণ সন্তুষ্ট আছেন এ বিষয়টি নিশ্চিতরূপে না জানা পর্যন্ত আমি অবশ্যই লটারীটির পুনরাবৃত্তি করব।” তিনি তিন বার লটারী করলেন এবং তিন বারই উটগুলোর নাম উঠল। এভাবে তিনি পূর্ণরূপে নিশ্চিত হতে পারলেন যে,মহান আল্লাহ্ এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট আছেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উটগুলো থেকে 100টি উট কাবাগৃহের সামনে জবাই করার এবং কোন ব্যক্তি বা পশুকে তা ভক্ষণ করা থেকে বাধা না দেয়ার নির্দেশ দিলেন।109


14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53

54

55

56

57

58

59

60

61