চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড3%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 242 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 106714 / ডাউনলোড: 9685
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

নবুওয়াতের দশম বর্ষটি আনন্দ-বেদনার বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে অতিবাহিত হলো। এ বছরেই তিনি তাঁর বড় দুই পৃষ্ঠপোষক হারান। প্রথমে আবদুল মুত্তালিব পরিবারের সম্মানিত ব্যক্তিত্ব,তাঁর মিশনের একমাত্র কুরাইশ সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক স্বীয় চাচা আবু তালিবকে হারান। এ মুসিবতের কষ্ট তাঁর অন্তর হতে দূরীভূত হওয়ার পূর্বেই প্রিয় স্ত্রী হযরত খাদীজার বিয়োগ তাঁর মনোকষ্টকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।৩৫৪ হযরত আবু তালিব মহানবী (সা.)-এর প্রাণ ও সম্মান রক্ষাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং হযরত খাদীজাহ্ তাঁর সমগ্র সম্পদ দ্বারা ইসলামের উন্নতি ও সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

ইবনে হিশাম তাঁর সীরাত’ গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ২৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন। আবু তালিবের মৃত্যুর কয়েকদিন পর কুরাইশ বংশীয় এক ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর মাথায় কিছু মাটি ঢেলে দিলে তিনি এ অবস্থায় গৃহে ফিরে আসলেন। তাঁর এক কন্যা এ করুণ অবস্থায় পিতাকে দেখে দ্রূত পানি এনে তা দ্বারা পিতার মস্তক ধৌত করতে থাকেন ও চিৎকার করে ক্রন্দন শুরু করেন। তাঁর চক্ষু হতে পানি ঝরতে দেখে নবী (সা.) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ক্রন্দন করো না। আল্লাহ্ তোমার পিতার রক্ষক। অতঃপর বললেন, যতদিন আবু তালিব জীবিত ছিলেন,কুরাইশ আমাকে কষ্ট দেয়ার সাহস পায় নি। ৩৫৫

মক্কায় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার কারণে নবী (সা.) অন্য স্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সে সময় তায়েফ’ হিজাযের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। তিনি সেখানে একটি সফরের চিন্তা করলেন। তিনি ভাবলেন,সেখানকার সাকীফ’ গোত্রের নিকট গিয়ে দীনের দাওয়াত দিবেন (যদি তারা তা গ্রহণ করে এ আশায়)। তিনি তায়েফে পৌঁছে উপরিউক্ত গোত্রের প্রধান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাদের নিকট নিজের আনীত একত্ববাদী ধর্মের বিবরণ দান করে তা গ্রহণের আহবান জানালেন। কিন্তু নবীর এ আহবান ও বক্তব্য তাদের ওপর কোন প্রভাব তো বিস্তার করলই না,বরং তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে বলল, যদি তুমি আল্লাহর প্রেরিত নবী হয়ে থাক তবে তোমাকে অস্বীকার করার কারণে প্রতিশ্রুত আযাব আন। আর যদি তোমার দাবি মিথ্যা হয় তবে কোন কথা বলার অধিকার তোমার নেই।”

নবী করীম তাদের অযৌক্তিক ও শিশুসুলভ কথায় বুঝতে পারলেন তারা দায়িত্ব এড়াতে চাইছে। ফলে তিনি সে স্থান ত্যাগ করা সমীচীন মনে করে তাদের নিকট থেকে এ প্রতিশ্রুতি নিলেন যে,তাঁর এ কথা যেন গোত্রের অন্য ব্যক্তিরা জানতে না পারে। কারণ এতে গোত্রের নিম্নশ্রেণীর ব্যক্তিরা তাঁর একাকিত্বের সুযোগে তাঁর ক্ষতি করতে পারে। কিন্ত সাকীফ গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করল না। তারা গোত্রের মূর্খ ও দুষ্ট প্রকৃতির লোকদেরকে নবীর পেছনে লেলিয়ে দিল। নবী (সা.) হঠাৎ করে নিজেকে অসংখ্য শত্রুর মাঝে দেখতে পেলেন। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে নিজ শত্রু উতবা ও শায়বার মালিকানাধীন বাগানে আশ্রয় নিলেন।৩৫৬ নবী অনেক কষ্টে ঐ বাগানে প্রবেশ করলেন। তায়েফবাসীরাও তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখে প্রত্যাবর্তন করল। তখন নবী (সা.)-এর পবিত্র দেহ ক্ষত-বিক্ষত এবং তাঁর দেহ হতে অবিরত ঘাম ও রক্ত ঝরছিল। তিনি আঙ্গুরের মাচার নিচে বসে বলছিলেন,

اللّهم إليك أشكو ضعف قوّتي و قلّة حيلي و هواني على النّاس يا أرحم الرّاحمين أنت ربّ المستضعفين و أنت ربّي من تكلني...

“হে আল্লাহ! আমার শক্তির স্বল্পতা ও অক্ষমতার বিষয়ে আপনার দ্বারস্থ হয়েছি। আপনি পরমতম দয়ালু এবং অসহায় ও দুর্বলের আশ্রয়। আপনি আমার প্রতিপালক,আমাকে কার ওপর ছেড়ে দেবেন...?

উপরিউক্ত দোয়ার ভাষা এমন এক ব্যক্তির যিনি পঞ্চাশ বছর সম্মান ও মর্যাদার সাথে নিবেদিত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় জীবন কাটিয়েছেন। এখন তিনি এমনই সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েছেন যে,শত্রুর উদ্যানে ক্লান্ত ও ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এবং নিজ ভবিষ্যতের প্রতীক্ষায় রয়েছেন।

এমন সময় রাবিয়া’ পরিবারের এক ব্যক্তি নবী (সা.)-এর অবস্থাদৃষ্টে প্রভাবিত হয়ে স্বীয় দাস আ দাসকে তাঁর নিকট এক পেয়ালা আঙ্গুরের রস নিয়ে যাবার নির্দেশ দিল। আ দাস একজন খ্রিষ্টান ছিল। সে যখন আঙ্গুরের রসপূর্ণ পাত্র নিয়ে নবীর নিকট উপস্থিত হলো তখন তাঁর আলোকোজ্জ্বল চেহারা দেখে হতচকিত হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি ঘটনা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আর তা হলো এ খ্রিষ্টান দাস লক্ষ্য করল,নবী (সা.) আঙ্গুরের রসপানের মুহূর্তে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ বললেন। বিষয়টি তাকে এতটা আশ্চর্যান্বিত করল যে,সে নীরবতা ভেঙে নবী (সা.)-কে প্রশ্ন করল, আপনি যে বাক্যটি বললেন,আরব উপদ্বীপের কেউ এ বাক্যের সঙ্গে পরিচিত নয় এবং আমি কোন ব্যক্তির নিকট থেকে এ বাক্য শুনি নি;সাধারণত এ অঞ্চলের লোকেরা খাদ্য গ্রহণের সময় লাত ও উয্যার নাম উচ্চারণ করে থাকে। রাসূল (সা.) তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কোথাকার অধিবাসী এবং কোন্ ধর্মের অনুসারী? সে বলল, আমি নেইনাওয়া’-এর অধিবাসী এবং খ্রিষ্টান। নবী (সা.) বললেন, তাহলে তুমি আল্লাহর পুণ্যময় বান্দা ইউনুস ইবনে মাত্তার অঞ্চলের লোক। নবীর এ কথায় সে অধিকতর আশ্চর্যান্বিত হলো। সে প্রশ্ন করল, আপনি ইউনুস ইবনে মাত্তাকে কিরূপে চিনলেন? নবী বললেন, আমার ভ্রাতা ইউনুস আমার ন্যায় আল্লাহর নবী ছিলেন। নবীর বক্তব্যে সত্যতার চি‎‎ হ্ন লক্ষ্য করে সে আশ্চর্য রকম প্রভাবিত হলো। সে নবীর প্রতি এতটা আকৃষ্ট হলো যে,তাঁর হাতে-পায়ে চুম্বন করতে লাগল এবং তাঁকে সত্য নবী বলে গ্রহণ করল। অতঃপর তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজ মালিকের দিকে প্রত্যাবর্তন করল। তার মনিব তার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করে তাকে প্রশ্ন করল, এ আগন্তুক ব্যক্তির সঙ্গে কি বিষয়ে আলাপ করলে এবং কেনই বা তার হাতে-পায়ে পড়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করলে? দাস উত্তর দিল, যে ব্যক্তিটি এ বাগানে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি মানবকুলের নেতা। তিনি আমাকে এমন বিষয়ে বলেছেন-যে বিষয়ে কেবল নবীরাই জানেন। তিনিই প্রতিশ্রুত নবী। তার এ কথায় রাবীয়ার সন্তানরা অসন্তুষ্ট হয়ে তার শুভাকাক্সক্ষী হিসাবে বুঝানোর চেষ্টা করল, এ ব্যক্তি তোমাকে তোমার আদি ধর্ম থেকে সরিয়ে নিতে চায়,অথচ তুমি যে খ্রিষ্টধর্মে রয়েছ তা তার ধর্ম থেকে উত্তম।”

মহানবীর মক্কায় প্রত্যাবর্তন

তায়েফবাসী কর্তৃক পশ্চাদ্ধাবনের বিষয়টি রাবীয়া পরিবারের উদ্যানে আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটলেও যেহেতু নবীকে পুনরায় মক্কায় ফিরে আসতে হবে সেহেতু মক্কায় প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও তাঁর জন্য তেমন সুখকর নয়। কারণ মক্কায় তাঁর একমাত্র পৃষ্ঠপোষকের মৃত্যুর ফলে তিনি প্রত্যাবর্তনের সাথে সাথেই বন্দী অথবা নিহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন কয়েকদিন মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে অবস্থান করবেন। তিনি পরিকল্পনা করলেন কাউকে কুরাইশ নেতাদের নিকট প্রেরণ করে নিজ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু সেখানে এমন কোন ব্যক্তির সন্ধান না পেয়ে হেরা পর্বতের উদ্দেশে যাত্রা করলেন এবং একজন খুযায়ী আরব ব্যক্তির সন্ধান পেলেন। তিনি তাকে মক্কার অন্যতম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মুতয়েম ইবনে আদীর নিকট গিয়ে তাঁর জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানালেন। খুযায়ী লোকটি মক্কায় প্রবেশ করে মুতয়েমের নিকট মহানবীর অনুরোধের বিষয়টি উপস্থাপন করল। মুতয়েম যদিও একজন মূর্তিপূজক ছিলেন তদুপরি মহানবীর অনুরোধ রক্ষা করলেন এবং বললেন, মুহাম্মদ আমার গৃহে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পারে এবং আমি ও আমার সন্তানেরা তার নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব নিলাম। নবী করীম (সা.) রাত্রিতে মক্কায় প্রবেশ করে সরাসরি মুতয়েমের গৃহে পৌঁছলে সেখানে রাত্রি যাপনের পর প্রভাত হলে মুতয়েম তাঁর নিকট প্রস্তাব রাখলেন যেহেতু তাঁর গৃহে নবীর আশ্রয় গ্রহণের বিষয়টি কুরাইশদের জানা প্রয়োজন সেহেতু নবী যেন তাঁর সঙ্গে কাবা ঘর পর্যন্ত যান। প্রস্তাবটি মহানবীর পছন্দ হলো এবং তিনি এ প্রস্তাবে সম্মত হলেন। মুতয়েম তাঁর সন্তানদের অস্ত্রসহ প্রস্তুত হতে আদেশ দিলেন। অতঃপর তাঁকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা বায়তুল্লায় প্রবেশ করলেন। তাঁদের বায়তুল্লায় প্রবেশের দৃশ্যটি দর্শনীয় ছিল। আবু সুফিয়ান রাসূলের অনিষ্টের প্রচেষ্টায় ছিল,কিন্তু রাসূলকে এভাবে কাবা গৃহে প্রবেশ করতে দেখে সে খুবই রাগান্বিত হলো কিন্তু তাঁর ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা ত্যাগে বাধ্য হলো। মুতয়েম ও তাঁর সন্তানরা কাবাগৃহের নিকট বসে পড়লেন এবং নবী করীম (সা.) শান্তভাবে কাবার তাওয়াফ সম্পন্ন করলেন। তাওয়াফ শেষ করে তাঁদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন।৩৫৭

এর কিছুদিন পরেই মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করেন এবং হিজরতের প্রথম বর্ষেই মক্কায় মুতয়েমের মৃত্যু ঘটে। যখন তাঁর মৃত্যুর খবর নবীর নিকট পৌঁছে তখন তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে তাঁকে স্মরণ করেন। নবীর সাহাবী কবি হাসসান ইবনে সাবিত তাঁর প্রশংসায় বেশ কিছু কবিতা রচনা করেছেন। মহানবী (সা.) বিভিন্ন সময় এ ব্যক্তির কথা স্মরণ করতেন,যেমন বদর যুদ্ধের পর-এ যুদ্ধে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে ও তাদের অনেকেই মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়-রাসূল (সা.) মুতয়েমের কথা স্মরণ করে বলেন, যদি মুতয়েম এখন জীবিত থাকতেন এবং আমাকে এ বন্দীদের মুক্তিদানের অনুরোধ করতেন বা ক্ষমা করে তাঁর নিকট হস্তান্তরের আহবান জানাতেন তাহলে আমি তা গ্রহণ করতাম।”

একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়

রাসূলের তায়েফ সফরের কষ্টদায়ক ঘটনাটি তাঁর দৃঢ়তা ও সহনশীলতার দৃষ্টান্ত। তাই ঐ বিশেষ মুহূর্তে মুতয়েম ইবনে আদী তাঁর প্রতি যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি তা কখনই ভুলতে পারেন নি। এ বিষয়টি আমাদেরকে উন্নত এক বৈশিষ্ট্য অর্জনের প্রতি আহবান জানায়। কিন্তু এ ঘটনাটি এর বাইরের অপর একটি বিষয়ে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আর তা হলো রাসূলের চাচা আবু তালিবের মূল্যবান অবদান। মুতয়েম কয়েকদিন বা কয়েক ঘণ্টা রাসূলের খেদমত ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন,অথচ আবু তালিব সারা জীবন রাসূলের খেদমত ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। হযরত আবু তালিব রাসূল (সা.)-কে রক্ষা করতে যত কষ্ট সহ্য করেছেন মুতয়েম তার সহস্র ভাগের একভাগও করেন নি। যদি রাসূলুল্লাহ্ মুতয়েমের কয়েক ঘণ্টার সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে বদরের যুদ্ধের সকল বন্দীকে মুক্তি দিতে সম্মত হতে চান,তবে স্বীয় চাচার অক্লান্ত ও নিরবচ্ছিন্ন খেদমতের প্রতিদান কি দিয়ে দিতে পারেন? যে ব্যক্তি নবুওয়াতের ধারকের আট বছর বয়স হতে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত সুদীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর সেবা করেছেন,বিশেষত শেষ দশ বছর নিজের ও স্বীয় পুত্রের জীবন বাজি রেখে তাঁকে রক্ষায় ব্রত হয়েছেন বিশ্বনেতার নিকট তাঁর স্থান কোন্ পর্যায়ে হওয়া উচিত? তদুপরি এ দু ব্যক্তির (হযরত আবু তালিব ও মুতয়েম) মধ্যে বিরাট পার্থক্য লক্ষণীয়। আর তা হলো মুতয়েম একজন মূর্তিপূজক,অথচ আবু তালিব ছিলেন ইসলামী জগতের এক শ্রেষ্ঠ মুসলিম ব্যক্তিত্ব।

আরবদের প্রসিদ্ধ বাজারসমূহে বক্তব্য দান

হজ্বের সময়ে আরবরা উকাজ,মাজনাহ্,যিলমাজাজ প্রভৃতি স্থানে সমবেত হতো। বাগ্মী,মিষ্টভাষী কবিরা বিভিন্ন উচ্চ স্থানে দাঁড়িয়ে প্রেম,গোত্রীয় প্রশংসা ও বীরত্বসূচক কবিতা ও বাণীসমূহ উপস্থাপন করে লোকদের মাতিয়ে রাখতেন। নবী করীম (সা.) পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীর ন্যায় এরূপ সমাবেশের সুযোগকে কাজে লাগাতেন। যেহেতু হারাম মাসসমূহে (রজব,শাবান,যিলহজ্ব ও মুহররম) যুদ্ধ ও রক্তপাত নিষিদ্ধ ছিল সেহেতু নবী (সা) এ সময় তাদের নিকট থেকে ক্ষতির আশংকামুক্ত ছিলেন। তিনিও অন্যান্যের মতো এক উচ্চ স্থানে দাঁড়িয়ে জনসাধারণের উদ্দেশে বলতেন,

قولوا لا إله إلّا الله تفلحوا تملكوا بها العرب و تذلّ لكم العجم و إذا آمنتم كنتم ملوكا في الجنة

“আল্লাহর একত্বকে মেনে নাও,তবে সফলকাম হবে। এ ঈমানের শক্তিতে তোমরা বিশ্বকে (আজম) পদানত করতে পারবে এবং সকল মানুষ তোমাদের অনুগত হবে। যখন তোমরা ঈমান আনবে তখন চিরস্থায়ী বেহেশতে স্থান লাভ করবে।”

হজ্বের মৌসুমে বিভিন্ন গোত্রপতিদের প্রতি দাওয়াত

নবী করীম (সা.) হজ্বের সময় আরবের বিভিন্ন গোত্রপ্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। বিভিন্ন স্থানে তাদের সঙ্গে স্বতন্ত্রভাবে নিজ দীনের দাওয়াত পেশ করতেন। কখনো কখনো নবীর বক্তব্যে বাধা প্রদান করে আবু লাহাব তাদেরকে তাঁর কথা বিশ্বাস না করতে বলত। সে প্রচার চালাত এ বলে যে,রাসূল (সা.) তাদের পিতৃধর্মের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এবং তাঁর দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নিজ চাচার বিরোধিতার বিষয়টি গোত্রপতিদের মনের ওপর প্রভাব ফেলত এ কারণে যে,তারা মনে করত যদি এ ব্যক্তির কথা সত্য হতো তবে চাচা ও আত্মীয়রা তাঁর বিরোধিতা করত না।৩৫৮

বনি আমের গোত্রের কিছুসংখ্যক লোক মক্কায় আগমন করলে নবী (সা.) তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত উপস্থাপন করলেন। তারা এ শর্তে ইসলাম গ্রহণে সম্মত হলো যে,নবীর মৃত্যুর পর তাদের গোত্র তাঁর উত্তরাধিকারী হবে। তিনি বললেন যে,তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনয়নের দায়িত্ব আল্লাহর,তিনি যাকে ভালো মনে করেন তাকেই মনোনীত করেন।৩৫৯ এ কথা শ্রবণে তারা ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত রইল। নিজ গোত্রের নিকট ফিরে গিয়ে বিষয়টি এক স্বচ্ছ হৃদয় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির নিকট উপস্থাপন করলে তিনি বললেন,এটি সেই উজ্জ্বল নক্ষত্র যা মক্কার আকাশে উদিত হওয়ার কথা। ইতিহাসের এ অংশটি প্রমাণ করে যে, ইমামত’ অর্থাৎ রাসূলের উত্তরাধিকারী নির্ধারণের বিষয়টি মানুষের নির্বাচনের মাধ্যমে নয়,বরং আল্লাহর মনোনয়নের ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা পিশভোয়ায়ী আয নাজারে ইসলাম’ (ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব) নামক গ্রন্থে আলোচনা করেছি।

চব্বিশতম অধ্যায় : আকাবার চুক্তি

পূর্বকালে ইয়েমেন হতে সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলার পথ ছিল ওয়াদিউল কুরা র ওপর দিয়ে। ইয়েমেন থেকে বাণিজ্য কাফেলা মক্কা অতিক্রম করে যে বিস্তীর্ণ উপত্যকায় পৌঁছত তাকে ওয়াদিউল কুরা বলা হতো। ওয়াদিউল কুরা অতিক্রম করে যে সবুজাকীর্ণ লোকালয়ে কাফেলা পৌঁছায় তার পূর্ববর্তী নাম ছিল ইয়াসরিব’। পরবর্তীতে তা মদীনাতুর রাসূল’ নামে অভিহিত হয় ও প্রসিদ্ধি লাভ করে। এ এলাকায় ইয়েমেনের কাহতানী’ আরবদের (যারা ইয়েমেন থেকে অত্র এলাকায় হিজরত করে এসেছিল) দু টি গোত্র (আওস ও খাজরাজ) বসবাস করত। সেখানে আরব উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চল হতে আসা ইয়াহুদীদের তিনটি প্রসিদ্ধ গোত্রও (বনি কুরাইযাহ্,বনি নাযির ও বনি কাইনুকা’) বাস করত। প্রতি বছরই ইয়াসরিব হতে একদল লোক মক্কায় হজ্বের উদ্দেশ্যে আসত। নবী (সা.) তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। এরূপ সাক্ষাতের ফলশ্রুতিতেই হিজরতের পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং ইসলামের বিক্ষিপ্ত শক্তিকে এক স্থানে কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। যদিও এরূপ সাক্ষাতের অধিকাংশই ফলপ্রসূ হতো না তদুপরি ইয়াসরিবের হাজীরা নতুন এক নবীর আগমনের সংবাদ বহন করে নিয়ে যেত যা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হিসাবে সেখানে প্রচারিত হতো। খবরটি সেখানকার অধিবাসীদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করত। তাই আমরা এখানে এরূপ কয়েকটি সাক্ষাতের বিবরণ পেশ করছি যা নবুওয়াতের একাদশ,দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বছরে হয়েছিল। এ আলোচনা থেকে নবীর মক্কা হতে মদীনায় হিজরতের কারণ ও ইসলামী শক্তির কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

. যখনই মহানবী (সা.) জানতে পারতেন কোন বহিরাগত ব্যক্তি মক্কায় এসেছে তখনই তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন ও তার নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন। একদিন তিনি খবর পেলেন সুয়াইদ ইবনে সামেত নামে এক ব্যক্তি মক্কায় এসেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি বললেন, আমার নিকট হযরত লোকমানের প্রজ্ঞাজনোচিত যে কথামালা রয়েছে তদনুরূপ কথাই কি বলছেন? রাসূল (সা.) বললেন,

و الّذي معي أفضل هذا قرآن أنزله الله تعالى هو هدى و نور

“(তোমার কাছে যা রয়েছে তা ভালো) তবে আমার ওপর আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন তা আরো উত্তম। কারণ তা প্রজ্বলিত আলো এবং হেদায়েতের নূর। ৩৬০

অতঃপর রাসূল (সা.) কয়েকটি আয়াত পাঠ করলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং মদীনায় ফিরে গেলেন। বুয়াস’ যুদ্ধে তিনি খাজরাজ গোত্রের হাতে নিহত হন এবং মৃত্যুর সময় তাঁর মুখে পবিত্র কালেমার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

খ. আনাস ইবনে রাফে বনি আবদুল আশহালের কিছু যুবককে সঙ্গে নিযে মক্কায় প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে আয়াস ইবনে মায়ায নামে এক যুবকও ছিল। তাদের মক্কা আগমনের উদ্দেশ্য ছিল খাজরাজ গোত্রের মোকাবিলায় কুরাইশদের নিকট থেকে সামরিক সাহায্য গ্রহণ। নবী (সা.) তাদের বৈঠকে তাদের সঙ্গে মিলিত হলেন ও ইসলামের দাওয়াত উপস্থাপন করে কয়েকটি আয়াত পাঠ করলেন। আয়াস একজন সাহসী যুবক ছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে এ নতুন ধর্মের প্রতি ঈমানের ঘোষণা দিয়ে বললেন, এ ধর্মটি কুরাইশদের নিকট থেকে সাহায্য গ্রহণ অপেক্ষা উত্তম। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে,একত্ববাদী এ ধর্ম তাঁদের জীবনের সকল দিকের নিরাপত্তা বিধানকারী। কারণ এ ধর্ম সকল বিশৃঙ্খলা,ভ্রাতৃহত্যা ও ধ্বংসকারী যুদ্ধের অপনোদন ঘটাবে। যেহেতু এ যুবক গোত্রপতির অনুমতি ব্যতিরেকে ঈমান এনেছিলেন সেহেতু আনাস এতে খুবই রাগান্বিত হলো।  সে তার রাগ দমনের উদ্দেশ্যে এক মুঠো বালি এ যুবকের উদ্দেশে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, চুপ কর! আমরা এখানে কুরাইশদের নিকট থেকে সাহায্যের আশায় এসেছি,নতুন ধর্ম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আসি নি। নবী (সা.) সেখান থেকে উঠে এলে দলটি মদীনায় ফিরে যায় এবং আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে বুয়া স’-এর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আয়াস ইসলামের প্রতি ঈমান নিয়ে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নিহত হন।

বুয়া সের যুদ্ধ

আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে ঐতিহাসিক যুদ্ধসমূহের মধ্যে প্রসিদ্ধ একটি যুদ্ধ হলো বুয়া সের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আওসরা জয়ী হয় এবং খাজরাজ গোত্রের খেজুর বাগানগুলো জ্বালিয়ে দেয়। এরপর তাদের মধ্যে পালাক্রমে যুদ্ধ ও সন্ধি হতে থাকে। খাজরাজ গোত্রের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি। এ কারণে উভয় গোত্রের নিকটই সে সম্মানিত ছিল। ক্রমাগত যুদ্ধের কারণে উভয় পক্ষই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং তাদের মধ্যে সন্ধির প্রতি তীব্র আগ্রহ দেখা দিয়েছিল। ফলে উভয় গোত্র আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাইকে সন্ধির জন্য মধ্যস্থতাকারী নেতৃত্ব বলে গ্রহণে সম্মত হলো,এমনকি তারা উভয় গোত্রের নেতা হিসাবে তাকে গ্রহণের লক্ষ্যে তার জন্য বিশেষ মুকুট প্রস্তুতের পরিকল্পনা করল। কিন্তু এ পরিকল্পনা খাজরাজ গোত্রের কিছুসংখ্যক ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের কারণে পণ্ড হলো। নবী করীম (সা.) খাজরাজ গোত্রের ছয় ব্যক্তির নিকট ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা তা গ্রহণ করে।

খাজরাজদের ইসলাম গ্রহণ

নবী (সা.) হজ্বের সময় মক্কায় খাজরাজ গোত্রের ছয় ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা কি ইয়াহুদীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ? তারা বলল, হ্যাঁ। নবী (সা.) তাদের বললেন, তোমাদের সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই। তারা মহানবীর আহবান গ্রহণ করে তাঁর কথা শ্রবণ করল। মহানবী (সা.) কয়েকটি আয়াত পাঠ করে বক্তব্য রাখলে তা তাদের মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলল। এ বৈঠকেই তারা ইসলাম গ্রহণ করল। যে বিষয়টি তাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল তা হলো তারা পূর্বেই ইয়াহুদীদের নিকট থেকে শুনেছিল আরবদের মধ্য থেকে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে যিনি একত্ববাদী ধর্মের দাওয়াত দেবেন এবং মূর্তিপূজার অবসান ঘটাবেন। খুব শীঘ্রই তিনি আবির্র্ভূত হবেন। এ কারণে ইয়াহুদীরা কোন অপচেষ্টা করার পূর্বেই তারা ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে তাঁকে সাহায্য করার ইচ্ছা পোষণ করল।

ছয় সদস্যের দলটি মহানবীকে উদ্দেশ্য করে বলল, আমাদের মাঝে সব সময় যুদ্ধের অগ্নি প্রজ্বলিত। আশা করি মহান আল্লাহ্ আপনার এ পবিত্র ধর্মের মাধ্যমে এ যুদ্ধের অগ্নিকে প্রশমিত করবেন। আমরা ইয়াসরিবে ফিরে গিয়ে আপনার দীনের দাওয়াত দেব। যখনই আমরা সকলে আপনার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছব তখন আমাদের নিকট আপনি অপেক্ষা সম্মানিত কেউ থাকবে না। ৩৬১

আকাবার প্রথম শপথ

উক্ত ছয় ব্যক্তি ইয়াসরিবের অধিবাসীদের মধ্যে অনবরত দীনের প্রচার কার্য চালায়। ফলে ইয়াসরিবের প্রতিটি ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যায় এবং তাদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে। নবুওয়াতের দ্বাদশ বছরে মদীনা থেকে বারো সদস্যের একটি দল রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এদের সঙ্গে প্রথম আকাবা চুক্তি সম্পাদিত হয়। এ বারো সদস্যের দলের প্রসিদ্ধ দু জন ব্যক্তি হলেন আসআদ ইবনে জুরারাহ্ এবং উবাদাতা ইবনে সামিত। তাঁদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে নিম্নোক্ত বক্তব্যটি ছিল :

أن لا نشرك بالله شيئا و لا نسرق و لا نزنى و لا نقتل أولَادنا و لا نأتى ببهتان نفتريه بين أيدينا و أرجلنا و لا نعصيه في معروف

“রাসূলের সঙ্গে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হলাম যে,আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক (অংশীদার) করব না,চুরি ও ব্যভিচার করব না,নিজ সন্তানদেরকে হত্যা করব না,একে অপরের ওপর অপবাদ আরোপ করব না,অশ্লীল ও মন্দ কাজ করব না এবং ভালো কাজের বিরোধিতা করব না।”

রাসূল (সা.) তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যদি এ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ কর তাহলে তোমাদের স্থান হবে বেহেশত,আর যদি এর অন্যথা কর তবে তোমাদের কর্মফল আল্লাহর ইচ্ছাধীন,হয় তিনি তোমাদের ক্ষমা করবেন,নতুবা শাস্তি দেবেন। এ প্রতিশ্রুতি গ্রহণ ও চুক্তিনামাটি ঐতিহাসিকভাবে বাইয়াতুন্নেসা নামে প্রসিদ্ধ। কারণ নবী (সা.) মক্কা বিজয়ের পর নারীদের নিকট থেকে একই মর্মে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছিলেন।

এ বারো ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান নিয়ে মদীনায় ফিরে যায় এবং পূর্ণোদ্যমে দীনের দাওয়াতের কাজ শুরু করে। পরে তারা নবীর নিকট তাদের কোরআন শিক্ষাদানের জন্য একজন মুবাল্লিগ (প্রচারক) পাঠানোর অনুরোধ জানায়। নবী মুসআব ইবনে উমাইরকে তাদের প্রশিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। এ শক্তিশালী মুবাল্লিগের প্রচেষ্টায় মুসলমানরা পরস্পর ঐক্যবদ্ধ হয় এবং জামায়াতে নামায পড়া শুরু হয়।৩৬২

কুরাইশদের কল্পরাজ্য

খোদা না করুন যে,এই মানুষ একদিন তার জীবনের দিকচক্রবাল রেখা পরিষ্কার ও উজ্জ্বল দেখতে পেয়ে নিজের জন্য এক কাল্পনিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রবক্তা হয়ে যায়। তখনই সে অস্তিত্ব ও জীবনকে কেবল তারই সাথে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করবে এবং অন্য মানুষের জন্য স্বল্পতম জীবনধারণের ন্যূনতম অধিকার ও সম্মানের স্বীকৃতি দেবে না।

সকলের ওপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদা প্রমাণ করার জন্য কুরাইশগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যে,তারা মক্কা শরীফের বাইরে নির্ধারিত এলাকার  (حل )114 অধিবাসীদের ন্যূনতম সম্মান ও মর্যাদার স্বীকৃতি দেবে না। কারণ তারা বলত, সাধারণ আরব আমাদের ইবাদাতগাহের প্রতি মুখাপেক্ষী। আর আরব জাতির সবাই প্রত্যক্ষ করেছে,আমরা কাবার দেব-দেবীদের কৃপাদৃষ্টিতে আছি।” তখন থেকেই কুরাইশদের কড়াকড়ি ও বাড়াবাড়ি শুরু হয়ে যায়। তারা জোরজুলুম চালিয়ে হিল-এর অধিবাসীদেরকে বাধ্য করেছিল যে,হজ্ব ও উমরার জন্য মক্কায় প্রবেশ করলে তারা তাদের নিজেদের সাথে আনা খাদ্য ভক্ষণ করতে পারবে না। হারামের অধিবাসীদের খাবারই তাদের খেতে হবে। তাওয়াফের সময় তাদেরকে মক্কার স্থানীয় পোশাক পরিধান করতে হবে। আর এখানে স্মর্তব্য যে,এ স্থানীয় পোশাকে গোত্রীয় দিক প্রতিফলিত হয়েছিল। কোন ব্যক্তি মক্কার স্থানীয় পোশাক সংগ্রহ করতে না পারলে তাকে অবশ্যই দিগম্বর হয়ে পবিত্র কাবার চারপাশে তাওয়াফ করতে হবে। তবে যে কতিপয় (অ-কুরাইশ) আরব গোত্রপতি এ বিষয়টি মেনে নেয় নি তাদের ব্যাপারে স্থির করা হয় যে,তাওয়াফ শেষ করার পর তারা দেহ থেকে পোশাক পরিচ্ছদ বের করে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। কোন ব্যক্তির হক নেই ঐ সব পোশাকে হাত দেয়ার। তবে সবক্ষেত্রেই মহিলারা বিবস্ত্র হয়ে তাওয়াফ করতে বাধ্য ছিল। তাদেরকে (মহিলাদের) তাওয়াফ করার সময় কেবল নিজেদের মাথা একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে বিশেষ ধরনের একটি কবিতা115 গুনগুন করে পড়তে হতো।

খ্রিষ্টান আবরাহার আক্রমণের পর কোন ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানের পবিত্র মক্কায় প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে যে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান কোন মক্কাবাসীর বেতনভূক কর্মচারী হতো সে হতো ব্যতিক্রম (অর্থাৎ সে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করতে পারত)। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিজ ধর্ম সম্পর্কে ন্যূনতম কথা বলার অধিকার তার থাকত না।

কুরাইশদের গর্ব ও অহংকার এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল যে,হজ্বের কিছু কিছু আচার-অনুষ্ঠান যা হারামের বাইরে আঞ্জাম দিতে হয় তা তারা বর্জন করেছিল এবং এ কারণে তারা আরাফাতের ময়দানে116 অবস্থান করত না ( আরাফাত’হারামের বাইরে একটি স্থানের নাম যেখানে হাজীদেরকে অবশ্যই যিলহজ্ব মাসের নবম দিবসে যোহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করতে হয়।)। অথচ তাদের পূর্বপুরুষগণ (হযরত ইসমাঈল-এর সন্তানগণ) আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাকে হজ্ব অনুষ্ঠানের একটি অংশ বলে গণ্য করতেন। আর কুরাইশদের পুরো বাহ্যিক সম্মান ও মর্যাদা পবিত্র কাবা ও হজ্বের এ সব আচার-অনুষ্ঠানের কাছেই ঋণী ছিল। আরব উপদ্বীপের সকল স্থান থেকে জনগণ প্রতি বছর শুষ্ক ও পানিহীন এ মরু এলাকায় হজ্বব্রত পালনের জন্য আসতে বাধ্য ছিল। এখানে যদি কোন তাওয়াফ করার স্থান (পবিত্র কাবা) ও মাশআর (হাজীদের নির্দিষ্ট ইবাদাতের স্থান-যেখানে হাজীরা আরাফাহ্ থেকে বের হয়ে রাত্রিযাপন করে ফজরের সময় থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত ফরয অবস্থান করার জন্য এবং এরপর তারা মীনায় হজ্বের বাকি কাজগুলো আঞ্জাম দেয়ার জন্য বের হয়ে যায়) না থাকত তাহলে কোন ব্যক্তিই জীবনে একবারের জন্যও এ স্থান অতিক্রম করার ইচ্ছা প্রকাশ করত না।

সামাজিক হিসাব-নিকাশের দৃষ্টিতে এ সব দুর্নীতি ও বৈষম্যের উদ্ভব আসলে এড়ানো সম্ভব নয়। একটি মৌলিক বিপ্লব ও শক্তিশালী আন্দোলনের জন্য বিশ্বের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত পবিত্র মক্কা নগরীর পরিবেশ অবশ্যই সীমাহীন দুর্নীতি ও কলঙ্কের মধ্যে নিমজ্জিত হতেই হবে।

এ সব বঞ্চনা,আমোদ-প্রমোদ প্রভৃতি পবিত্র মক্কা নগরীর পরিবেশ-পরিস্থিতিকে একজন বিশ্বসংস্কারক নেতার আবির্ভাবের জন্য প্রস্তুত ও উপযুক্ত করে তুলছিল। আর এ বিষয়টি মোটেও অনর্থক ও অসমীচীন হবে না যে,আরবদের পণ্ডিত বলে খ্যাত ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেল যিনি তাঁর শেষ জীবনে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং ইঞ্জিল শরীফ সংক্রান্ত জ্ঞানও অর্জন করেছিলেন তিনি যখনই মহান আল্লাহ্ ও নবীদের সম্পর্কে কথা বলতেন তখনই তিনি মক্কার ফিরআউন আবু সুফিয়ানের ক্রোধ ও উষ্মার শিকার হতেন। আবু সুফিয়ান তখন বলত, এমন স্রষ্টা ও নবীর কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। কারণ আমরা প্রতিমা ও মূর্তিদের দয়া ও কৃপার মধ্যেই আছি।”

6. মহানবীর পিতা আবদুল্লাহ্

যেদিন আবদুল মুত্তালিব তাঁর পুত্র আবদুল্লাহর জীবন মহান আল্লাহর পথে 100 উট কোরবানী করার মাধ্যমে পুনঃক্রয় করেছিলেন তখনও তাঁর (আবদুল্লাহর) জীবনের 24টি বসন্ত অতিবাহিত হয়নি। এ ঘটনার কারণে আবদুল্লাহ্ কুরাইশ বংশীয়দের মধ্যে প্রশংসনীয় মর্যাদা ও খ্যাতির অধিকারী হওয়া ছাড়াও নিজ বংশে,বিশেষ করে আবদুল মুত্তালিবের কাছে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলেন। কারণ যে জিনিসের জন্য মানুষকে তার জীবনে চড়া মূল্য দিতে হয় এবং বেশি কষ্ট সহ্য করতে হয় সে জিনিসের প্রতি তার টান সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। এ কারণেই আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে আবদুল্লাহ্ অস্বাভাবিক ধরনের সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলেন।

যেদিন আবদুল্লাহ্ পিতার সাথে কোরবানী করার স্থানে গমন করছিলেন সেদিন তাঁর মধ্যে পরস্পর ভিন্নধর্মী আবেগ ও অনুভূতির উদ্ভব হয়েছিল। পিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁর সার্বিক দুঃখ-কষ্ট বরণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অনুভূতি তাঁর গোটা অস্তিত্বকে ঘিরে রেখেছিল;আর এ কারণেই আত্মসমর্পণ করা ব্যতীত তাঁর আর কোন উপায় ছিল না। কিন্তু অন্যদিকে,যেহেতু ভাগ্যবিধি চাচ্ছিল তাঁর জীবন-বসন্তের ফুলগুলোকে শরৎকালীন পত্রের মতো শুকিয়ে বিবর্ণ ও মলিন করে দিতে সে কারণে তাঁর অন্তরের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতাও দেখা দিয়েছিল।

আবদুল্লাহ্ ঈমান এবং আবেগ-অনুভূতি-এ দু টি শক্তির পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে গিয়েছিলেন এবং এ ঘটনাপ্রবাহ তাঁর অন্তরে বেশ কিছু অপূরণীয় অস্বস্তি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। তবে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে ঠিক সেভাবে সমস্যার সমাধান হলে আবদুল মুত্তালিব আমেনার সাথে আবদুল্লাহর বিবাহের ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করার মাধ্যমে এ তিক্ত অনুভূতির তাৎক্ষণিক অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। আবদুল্লাহর জীবনসূত্র যা ছিন্ন-ভিন্ন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল তা জীবনের সবচেয়ে মৌলিক বিষয়ের (অর্থাৎ বিবাহ) সাথে এখন সংযুক্ত হয়ে গেল।

আবদুল মুত্তালিব কোরবানীর স্থল থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় পুত্র আবদুল্লাহর হাত ধরে সরাসরি ওয়াহাব ইবনে আবদে মান্নাফ ইবনে যাহরার গৃহে চলে গেলেন। ওয়াহাবের মেয়ে আমেনার সাথে আবদুল্লাহকে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করলেন। উল্লেখ্য যে,ওয়াহাব-কন্যা আমেনা ছিলেন পুণ্যবতী ও সচ্চরিত্রা নারী। আর তিনি (আবদুল মুত্তালিব) ঐ একই অনুষ্ঠানে আমেনার চাচাতো বোন দালালাকে বিবাহ করেন। মহানবী (সা.)-এর চাচা হযরত হামযাহ্117 এই দালালার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হযরত হামযাহ্ ছিলেন মহানবীর সমবয়সী।

সমসাময়িক ঐতিহাসিক আবদুল ওয়াহ্হাব (মিশর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক,যিনি তারীখে ইবনে আসীরের ওপর কিছু মূল্যবান ও উপকারী টীকা লিখেছেন) উপরিউক্ত ঘটনাকে একটি অসাধারণ ঘটনা হিসাবে উল্লেখ করে লিখেছেন, ঐ দিনই ওয়াহ্হাবের গৃহে আবদুল মুত্তালিবের গমন,তা-ও আবার দু টি মেয়ের বিবাহ প্রস্তাব দেয়া-একটি মেয়েকে নিজে বিয়ে করার জন্য এবং অপর মেয়েকে পুত্র আবদুল্লাহর সাথে বিবাহ দেয়ার জন্য আসলেই সামাজিক লোকাচার ও রীতিনীতি বহির্ভূত। ঐ ঐতিহাসিক দিনে যা তাঁর জন্য শোভনীয় ছিল তা হলো বিশ্রাম নেয়া ও ক্লান্তি-অবসাদ দূর করা। তাঁদের নিজেদের ক্লান্তি দূর করে নিজ নিজ কাজে হাত দেয়াটিই ছিল (তাঁদের জন্য একান্ত) স্বাভাবিক।118

কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি,লেখক যদি বিষয়টিকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে অধ্যয়ন করতেন,তাহলে তাঁর পক্ষে তা বিশ্বাস করা সহজ হতো।

যা হোক অতঃপর আবদুল মুত্তালিব বধূবরণের জন্য একটি সময় নির্দিষ্ট করেন। নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলে কুরাইশদের প্রচলিত প্রথানুযায়ী হযরত আমেনার পিতৃগৃহে বিবাহ অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হয়। কিছুদিন আমেনার সাথে একত্রে বসবাস করার পর আবদুল্লাহ্ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য শামের উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং শাম থেকে ফেরার পথে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আমরা এতৎসংক্রান্ত বিশদ বিবরণ পরে যথাস্থানে উল্লেখ করব।

রহস্যজনক চক্রান্তকারীদের আনাগোনা

এতে কোন সন্দেহ নেই যে,ইতিহাসের পাতায় পাতায় জাতিসমূহের উজ্জ্বল ও অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকসমূহ শিক্ষণীয় বিষয় হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তবে সকল যুগ ও শতাব্দীতে ভালোবাসা ও ঘৃণা,আপোষকামিতা,উপেক্ষা ও শৈথিল্য,সৃজনশীলতা,অভূতপূর্ব বক্তব্য,লেখনী শক্তির বহিঃপ্রকাশ এবং এ ধরনের আরো অনেক কারণ ইতিহাস রচনা ও লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রভাব রেখেছে এবং ঐতিহাসিক সত্য ঘটনাগুলোকে মিথ্যা কল্প-কাহিনীর সাথে সংমিশ্রিত করে ফেলেছে। আর এটি হচ্ছে সেই ইতিহাসবেত্তার জন্য এক বিরাট সমস্যা যিনি ইতিহাসশাস্ত্রের তাত্ত্বিক মূলনীতিসমূহ বাস্তবে প্রয়োগ করে সত্য ও মিথ্যাকে পৃথক করে থাকেন।

উপরিউক্ত কারণসমূহ ইসলামের ইতিহাস রচনা ও লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। ঐতিহাসিক সত্য ঘটনাসমূহের বিকৃতি সাধনে অদৃশ্য হাতসমূহ কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্য কখনো কখনো বন্ধুদের তরফ থেকে এমন সব শোভাবর্ধনকারী অলংকারিক বক্তব্য প্রদান ও প্রশংসাব্যঞ্জক কথা বলা হয়েছে যেগুলোর মাঝে মিথ্যা ও বানোয়াট হওয়ার নিদর্শন স্পষ্ট বিদ্যমান।

আমরা ইতিহাসে পাঠ করি যে,হযরত আবদুল্লাহর ললাটে সব সময় নবুওয়াতের নূর (আলো) চমকাত।119 আমরা আরো জেনেছি,অনাবৃষ্টির বছরগুলোতে আবদুল মুত্তালিব তাঁর সন্তান আবদুল্লাহর হাত ধরে পাহাড়ের দিকে চলে যেতেন এবং আবদুল্লাহর ললাটের নূরের উসিলায় মহান আল্লাহর কাছে দয়া ও কৃপা প্রার্থনা করতেন।

এ বিষয়টি (আবদুল্লাহর কপালে নবুওয়াতের নূরের অস্তিত্ব) বহু শিয়া-সুন্নী আলেম বর্ণনা করেছেন। আর এ বিষয়টির অসত্য হওয়ার পক্ষে কোন দলিল বিদ্যমান নেই। তবে কতিপয় ইতিহাস গ্রন্থে বিষয়টি এমন এক কল্প-কাহিনী বা উপাখ্যানের উপজীব্য হয়েছে যা আমরা কখনই সুন্দর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শোভা হিসাবে গ্রহণ করতে পারি না।

ফাতিমা খাসআমীয়ার কাহিনী

ফাতিমা খাসআমীয়াহ্ ছিল ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেলের ভগ্নি। ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেল ছিলেন আরবের অন্যতম পণ্ডিত ও ভবিষ্যদ্বক্তা। তিনি ইঞ্জিল সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য ও জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াতের ঘোষণার শুরুতে হযরত খাদীজার সাথে তাঁর কথোপকথন ঐতিহাসিক গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ আছে। আমরা তা যথাস্থানে আলোচনা করব।

ওয়ারাকার বোন ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছিল যে,ইসমাঈলের বংশধারায় এক ব্যক্তি নবী হবেন। এ কারণে সে সব সময় তাঁর সন্ধান করত। যেদিন আবদুল মুত্তালিব আবদুল্লাহর হাত ধরে তাঁকে কোরবানীর স্থল থেকে বের হয়ে হযরত আমেনার পিতৃগৃহের দিকে যাচ্ছিলেন তখন ফাতিমা খাসআমীয়াহ্ তার ঘরের পাশে দণ্ডায়মান ছিল। তার চোখ একটি আলোর প্রতি নিবদ্ধ হয় অনেকদিন ধরে সে যার সন্ধান করে এসেছেন। সে বলল, আবদুল্লাহ্! তুমি কোথায় যাচ্ছ? তোমার পিতা যেসব উট তোমার মুক্তির জন্য কোরবানী করেছেন তা আমি এক শর্তে দিতে প্রস্তুত। আর তা হলো তুমি আমার সাথে সহবাস করবে।” তখন আবদুল্লাহ্ বললেন, এখন আমি আমার পিতার সাথে আছি। এটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” আবদুল্লাহ্ ঐ দিনই আমেনার সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং একরাত তাঁর সাথে অতিবাহিত করেন। পরের দিন তিনি ফাতিমা খাসআমীয়ার ঘরে ছুটে যান এবং তার পূর্বপ্রদত্ত প্রস্তাবে তিনি যে সম্মত ও প্রস্তুত আছেন তা তাকে জানান। ফাতিমা খাসআমীয়াহ্ বলল, আজ তোমাকে আমার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ তোমার কপালে যে নূর আগে প্রত্যক্ষ করতাম তা এখন আর নেই এবং তোমা থেকে তা চলে গেছে। 120

কখনো কখনো বলা হয়েছে যে,ফাতিমা তার প্রয়োজনের কথা আবদুল্লাহর কাছে প্রকাশ করলে তিনি (আবদুল্লাহ্) তাৎক্ষণিকভাবে নিম্নোক্ত দু টি পঙ্ক্তি আবৃত্তি করেন :

أما الحرام فالممات دونه

والحل لأحل فاستبينه

فكيف بالأمر الذي تبغينه

يحمي الكريم عرضه و دينه

“যেখানে এ ব্যাপারে আমি ভাবতেও পারি না সেখানে আমার পক্ষে তোমার প্রস্তাবে সাড়া দেয়া কিভাবে সম্ভব? মহৎ ব্যক্তি তার নিজ সম্মান ও ধর্ম সংরক্ষণ করে।”

কিন্তু আমেনার সাথে তাঁর বিবাহের তিন দিন অতিবাহিত হতে না হতেই প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা আবদুল্লাহকে ফাতিমা খাসআমীয়ার গৃহপানে তাড়িত করে। ফাতিমা খাসআমীয়াহ্ তখন তাঁকে বলেছিল, তোমার কপালে যে দ্যুতি ছিল সে কারণেই আমি তোমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। কিন্তু এখন সেই দ্যুতিটি আর নেই। মহান আল্লাহ্ যে স্থানে তা রাখতে চেয়েছিলেন সেখানেই রেখেছেন।” আবদুল্লাহ্ বললেন, হ্যাঁ আমি আমেনাকে বিবাহ করেছি। 121

এ ঘটনাটি বানোয়াট ও মিথ্যা হবার প্রমাণ

এ কাহিনীর জালকারী কিছু কিছু দিক উপেক্ষা করেছে এবং কাহিনীটির মিথ্যা ও কৃত্রিম হওয়ার চি হ্নগুলো দূর করতে পারে নি। যদি সে ঠিক এতটুকু পরিমাণের ওপরই নির্ভর করত যে,একদিন বাজারে অথবা গলিতে আবদুল্লাহর সাথে ফাতিমা খাসআমীয়ার দেখা হলে আবদুল্লাহর কপালে নবুওয়াতের দ্যুতি প্রত্যক্ষ করেছিল;এ দ্যুতি তাকে আবদুল্লাহর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছিল,তাহলে তা বিশ্বাস করা যেত। কিন্তু কাহিনীটির মূল ভাষ্য অন্যভাবে বর্ণিত হয়েছে যা নিম্নোক্ত কারণসমূহের আলোকে গ্রহণযোগ্য নয়:

1. এ কাহিনী থেকে প্রতীয়মান হয় যে,যখন ফাতিমা খাসআমীয়াহ্ তার কামনা-বাসনার কথা প্রকাশ করল তখন আবদুল্লাহর হাত পিতা আবদুল মুত্তালিবের হাতের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। এমতাবস্থায় এ মেয়েটির পক্ষে তার মনোবাসনা ব্যক্ত করা কি আসলেই সম্ভব এবং আবদুল মুত্তালিবের মতো কুরাইশপ্রধানের সামনে তার এ কথা বলতে কি মোটেও লজ্জা হলো না? কারণ আবদুল মুত্তালিব ছিলেন ঐ ব্যক্তি যিনি মহান আল্লাহর আনুগত্য ও বন্দেগীর পথে নিজ সন্তানকে পর্যন্ত কোরবানী করতে মোটেও ভীত ও শঙ্কিত ছিলেন না। আর যদি আমরা বলি,ফাতিমা খাসআমীয়ার মনবাসনা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বৈধ ছিল (অর্থাৎ সে আবদুল্লাহর কাছে বৈধ বিবাহের প্রস্তাবই পেশ করেছিল) তাহলে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আবদুল্লাহ্ তাঁকে লক্ষ্য করে যে পঙ্ক্তিদ্বয় আবৃত্তি করেছিলেন সেগুলোর সাথে তা মোটেও খাপ খায় না।

2. এ থেকেও জটিলতর হচ্ছে আবদুল্লাহর পুরো ব্যাপারটা। কারণ যে সন্তান পিতার জন্য নিজে নিহত হয়েও অর্থাৎ নিজের জীবন প্রাণ উৎসর্গ করে হলেও সম্মান প্রদর্শন করে সে কিভাবে পিতার সামনে উপরিউক্ত কথাগুলো বলতে পারে? আসলে যে যুবক কয়েক মিনিট আগে তরবারির নিচে জবাই হওয়া থেকে নিস্কৃতি পেয়েছে সে তো তীব্রভাবে আত্মিক-মানসিক অস্থিরতার শিকার। তার পক্ষে কিভাবে এক রমণীর কামনা-বাসনার প্রতি সাড়া দেয়া সম্ভব?! ঐ রমণীর কি তাহলে সময়জ্ঞান বলতে কিছুই ছিল না? অথবা জালকারী কি কাহিনীটির এ সব দুর্বল ও উজ্জ্বল দিকের প্রতি উদাসীন থেকেছে?

কাহিনীর দ্বিতীয় রূপটি আরো বেশি অপমানজনক ও লজ্জাকর। কারণ প্রথমেই আবদুল্লাহ্ (অবৈধ কাজের আহবান শোনামাত্রই) ঐ দুটি পঙ্ক্তি আবৃত্তি করে প্রস্তাব দানকারিণীকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং বলেছিলেন, এই অবৈধ কাজ যা ধর্ম ও মানমর্যাদা নষ্ট করে দেয় তা অপেক্ষা মৃত্যুও আমার জন্য অপেক্ষাকৃত বেশি সহজ।” অতঃপর আত্মমর্যাদাবোধে উদ্দীপ্ত এ যুবকের পক্ষে এ ধরনের বিচ্যুত চিন্তাধারার কাছে নতি স্বীকার ও আত্মসমর্পণ করা কিভাবে সম্ভব হলো অথচ যার এখনো বিয়ের পর তিন রাতের বেশি সময় অতিবাহিত হয় নি। আর এরই মধ্যে যৌন তাড়না তাকে ফাতিমা খাসআমীয়ার গৃহপানে তাড়িত করেছিল!

আমরা কখনই মেনে নিতে পারব না যে,বনি হাশিম গোত্রে প্রতিপালিত আবদুল্লাহর মতো কোন যুবকের মাথায় এ ধরনের তাকওয়াবহির্ভূত চিন্তাধারার উদ্ভব হতে পারে যেখানে আবদুল্লাহকে মহান আল্লাহ্ একজন শ্রেষ্ঠ মহামানবের পিতা হিসাবে মনোনীত করেছেন। অধিকন্তু শিয়া-সুন্নী আলেমগণ মহানবী (সা.)-এর ঊর্ধ্বতন পিতৃপুরুষ ও গর্ভধারণকারিণীদের চারিত্রিক পবিত্রতার পক্ষে যে সব দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন তা এ ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য এবং উপরিউক্ত কাহিনীটি মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এ মিথ্যা কল্পকাহিনী যদি অজ্ঞ ব্যক্তিদের হাতের মুঠোয় তুলে দেয়া না হতো তাহলে আমরা মূলত তা আলোচনাই করতাম না।

 ‘ কিতাবে পিয়াম্বার গ্রন্থের প্রতি দৃষ্টিপাত

কিতাবে পিয়াম্বার গ্রন্থটিতে যদি দৃষ্টিপাত করুন এবং এ কাহিনীটি লালন করার জন্য লেখক যে সব অধ্যায়ের অবতারণা করেছেন সেগুলোর ব্যাপারে সূক্ষ্মভাবে চিন্তা-ভাবনা করেন তাহলে এ গ্রন্থের লেখকের আসল উদ্দেশ্যের সাথে আমরা পরিচিত হতে পারব। মহানবী (সা.)-এর জীবনী গল্পাকারে লেখাই হচ্ছে লেখকের মূল উদ্দেশ্য যাতে করে এ গল্পের প্রতি আগ্রহী তরুণগণ মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিত অধ্যয়ন করতে আগ্রহী হয়। এটি এরকমই এক মহৎ,পবিত্র ও প্রশংসনীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য,তবে এ শর্তে যে,তা অবশ্যই ধর্মীয় নীতিমালার সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল হতে হবে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে,উপরিউক্ত গ্রন্থের ভাষ্য থেকে প্রমাণিত হয় যে,দুর্বলতম রেওয়ায়েত এবং সবচেয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন কল্পকাহিনীই হচ্ছে লেখকের মূল দলিল;আবার কখনো কখনো লেখক নিজ থেকেই এগুলোর সাথে কয়েকগুণ বেশি বানোয়াট কথাবার্তা ও ভিত্তিহীন তথ্য যোগ করেছেন।

ফাতিমা খাসআমীয়ার কাহিনীটি ঠিক এমনই যা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। যদি ধরে নেয়া হয় যে,উক্ত গল্পটি একটি মৌলিক গল্প বা কাহিনী,তারপরেও ঘটনাটির মূল বিবরণ ঠিক এটিই যা আদি ঐতিহাসিক সূত্রসমূহ থেকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।122

‘মহানবী’(সা.) গ্রন্থের লেখক,এমন সব ঘৃণ্য ও মর্যাদাহানিকর কথা অলঙ্কারসূচক গুণ হিসাবে এ ঘটনার সাথে উল্লেখ করেছেন যা বনি হাশিম গোত্রের মান-সম্মান,বিশেষ করে মহানবী (সা.)-এর শ্রদ্ধেয় পিতার খোদাভীরুতা ও পূতঃপবিত্র চরিত্রের ওপর কালিমা লেপন করে। আর এভাবে লেখক চেয়েছেন,যে গল্প বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছে ভিত্তিহীন তা অধিকতর সুপাঠ্য করতে। লেখক এমনভাবে সরলমতি আরব ললনা ফাতিমা খাসআমীয়ার চারিত্রিক আচার-আচরণ বর্ণনা করেছেন যেন দীর্ঘকাল অভিনেত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত ছিল।

লেখক এমনভাবে এ রমণীর প্রতি আবদুল্লাহর প্রেমাসক্তি বর্ণনা করেছেন,আবদুল্লাহর সুউচ্চ মর্যাদার সাথে যার ক্ষুদ্রতম সম্পর্কও নেই। আবদুল্লাহর সুমহান মর্যাদার প্রমাণ এটিই যে,মহান আল্লাহ্ তাঁরই ঔরসে নবুওয়াত ও তাকওয়ার নূর আমানতস্বরূপ স্থাপন করেছিলেন।

মহানবী’গ্রন্থের পাঠকবর্গের মনে রাখা উচিত যে,এ গ্রন্থের কিছু কিছু বিষয় ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে এবং এ গ্রন্থের বেশ কিছু আলোচ্য বিষয়ের কাহিনীভিত্তিক ও ঔপন্যাসিক দিকও আছে। এ গ্রন্থের অনেক আলোচ্য বিষয়ই পাশ্চাত্যের লেখকদের থেকে ধার করা হয়েছে যেগুলোর কোন স্পষ্ট যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ আমাদের সামনে নেই। যেমন উক্ত গ্রন্থের 102 পৃষ্ঠায় আবদুল্লাহর বিয়ের রাতের ঘটনাপ্রবাহ ও আরবীয় নৃত্যপদ্ধতি সম্পর্কে এবং আমেনার সাথে আবদুল্লাহর বিয়ের রাতে আবদুল্লাহর প্রতি প্রেম ও ভালোবাসার কারণে 200 কুমারী মেয়ে হিংসার আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করেছিল-এ উপাখ্যানটি গীবন লিখিত রোমান সাম্রাজ্যের পতন’গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। তাই এ গ্রন্থের পাঠকদের কাছে সবিনয় অনুরোধ করছি তাঁরা যেন এ গ্রন্থ পাঠ করার সময় এর দুর্বল ও শক্তিশালী দিকগুলো বেশি বেশি বিবেচনায় আনেন।

ইয়াসরিবে আবদুল্লাহর মৃত্যু

আমেনার সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে আবদুল্লাহর জীবনের নব অধ্যায়ের সূচনা হয় এবং আমেনার মতো স্ত্রী লাভ করার কারণে তাঁর জীবন আলোকিত হয়ে যায়। কিছুদিন অতিবাহিত হলে পবিত্র মক্কা থেকে একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে ব্যবসা উপলক্ষে তিনি শামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। যাওয়ার ঘণ্টা বেজে উঠলে কাফেলা যাত্রা শুরু করে এবং শত শত হৃদয়কেও যেন সেই সাথে নিয়ে যায়। এ সময় হযরত আমেনা গর্ভবতী ছিলেন। কয়েক মাস পরে দূর থেকে কাফেলার নিশান দেখা গেলে কিছু ব্যক্তি ঐ কাফেলায় তাদের নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য শহরের বাইরে গমন করল।

হযরত আবদুল মুত্তালিব তাঁর পুত্র আবদুল্লাহর অপেক্ষায় ছিলেন। পুত্রবধু আমেনার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি কাফেলার মাঝে আবদুল্লাহকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরছিল। কিন্তু কাফেলার মাঝে তাঁর কোন চি‎‎ হ্নই পাওয়া গেল না। খোঁজাখুঁজির পর তাঁরা জানতে পারলেন,আবদুল্লাহ্ ফেরার পথে ইয়াসরিবে (মদীনায়) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই বিশ্রাম ও সফরের ক্লান্তি দূর করার জন্য তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কিছুদিন অতিবাহিত করতে চেয়েছেন। এ খবর শোনার পর আবদুল মুত্তালিব ও আমেনার মুখমণ্ডলে দুশ্চিন্তা ও বিষাদের ছায়া বিস্তার করল এবং তাঁদের নয়ন বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল।

আবদুল মুত্তালিব জ্যেষ্ঠ পুত্র হারেসকে ইয়াসরিবে গিয়ে আবদুল্লাহকে মক্কায় নিয়ে আসার আদেশ দিলেন। হারেস ইয়াসরিবে পৌঁছে জানতে পারলেন যে,বাণিজ্য কাফেলা প্রস্থানের এক মাস পরে যে অসুস্থতার কারণে আবদুল্লাহ্ যাত্রাবিরতি করেছিলেন সেই অসুস্থতায় মৃতুবরণ করেছেন। হারেস মক্কায় ফিরে এসে পুরো ঘটনা হযরত আবদুল মুত্তালিবকে জানালেন এবং হযরত আমেনাকেও তাঁর স্বামীর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করলেন। আবদুল্লাহ্ মৃত্যুর আগে যা কিছু উত্তরাধিকার হিসাবে রেখে গিয়েছিলেন তা ছিল নিম্নরূপ : পাঁচটি উট,এক পাল দুম্বা এবং উম্মে আইমান নাম্নী এক দাসী যিনি পরবর্তীকালে মহানবী (সা.)-কে প্রতিপালন করেছিলেন ।123


17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53

54

55

56

57

58

59

60

61