চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড3%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 238 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 81658 / ডাউনলোড: 7492
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

4

5

মহানবীর ষষ্ঠ দূতের ইয়ামামায় গমন

মহানবীর ষষ্ঠ দূত বাহরাইন ও নাজদের মধ্যবর্তী ইয়ামামায় প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি সেখানে পৌঁছে ইয়ামামার শাসক হাওযাত ইবনে আলাল হানাফীর নিকট তাঁর পত্র পৌঁছালেন। পত্রের বাণী ছিল নিম্নরূপ :

“পরম করুণাময় ও দাতা আল্লাহর নামে। সৎপথ প্রাপ্তদের উপর সালাম। আপনি জেনে রাখুন,আমার আনীত দ্বীন দ্রুতগামী বাহন যে পর্যন্ত পৌঁছায় (পূর্ব-পশ্চিম সকল দিকে),সে পর্যন্ত পৌঁছবে। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন,তবেই নিরাপত্তা লাভ করবেন এবং আপনার রাজত্ব টিকে থাকবে।”

ইয়ামামার শাসক খ্রিষ্টান ছিলেন,এজন্য মহানবী (সা.) সেখানে প্রেরণের জন্য এমন এক ব্যক্তিকে দূত মনোনীত করেছিলেন,যিনি দীর্ঘদিন আবিসিনিয়ায় ছিলেন এবং খ্রিষ্টীয় আচার,বিশ্বাস ও ধর্মীয় যুক্তিসমূহ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। এই দূতের নাম সুলাইত ইবনে আমর,যিনি মুসলমানরা মক্কায় মুশরিকদের চরম নির্যাতনের শিকার থাকাকালে রাসূলের নির্দেশে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। ইসলামের উন্নত শিক্ষা এবং বিভিন্ন স্থানে সফরে বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ফলে তাঁর বক্তব্য দানের ক্ষমতা এবং সাহস বেশ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তিনি একজন বাগ্মী ও সাহসী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর যুক্তিপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বক্তব্যের মাধ্যমে ইয়ামামার শাসককে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। তিনি তাঁর উদ্দেশে বলেন : সেই ব্যক্তিই মহান,যে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করেছে এবং খোদাভীতিকে পাথেয় বানিয়েছে। যে জাতি আপনার নেতৃত্বে সৌভাগ্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছবে,তার পরিণতি কখনো মন্দ হতে পারে না। আমি আপনাকে সর্বোত্তম বিষয়ের প্রতি আহবান জানাচ্ছি এবং নিকৃষ্ট বিষয় হতে দূরে থাকার উপদেশ দিচ্ছি। আমি আপনাকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান জানাচ্ছি এবং শয়তানের উপাসনা ও মন্দ প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে নিষেধ করছি। আল্লাহর ইবাদতের সুফল চিরস্থায়ী বেহেশ্ত এবং শয়তান ও প্রবৃত্তির অনুসরণের পরিণতি জাহান্নাম। আমি যা বলছি,তা ছাড়া অন্য কিছু যদি গ্রহণ করেন,তবে অপেক্ষা করুন পর্দা উন্মোচিত হয়ে মহাসত্য প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত।”

ইয়ামামার শাসকের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল রাসূলের দূতের কথা তার মনে প্রভাব ফেলেছে। সে দূতের কাছে মহানবীর নবুওয়াতের বিষয়ে চিন্তার জন্য কয়েক দিন সময় চাইল। ঘটনাক্রমে সে সময়ে রোম থেকে একজন প্রথম সারির ধর্মযাজক ইয়ামামায় গেলেন। ইয়ামামার শাসক তাঁর কাছে ঘটনা খুলে বললে তিনি বললেন : কেন তাঁর সত্যায়ন থেকে বিরত রয়েছ?”   সে বলল : আমি আমার রাজত্ব ও ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভীত।” ধর্মযাজক বললেন : আমার মনে হয়,তাঁর অনুসরণ করাই কল্যাণকর ও শ্রেয়। কারণ তিনিই সেই আরব নবী,যাঁর সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ.) সংবাদ দিয়েছেন এবং ইনযীলে উল্লিখিত হয়েছে,মুহাম্মদ আল্লাহর নবী।”

ধর্মযাজকের উপদেশমূলক বাণী তাকে মানসিক শক্তি দান করল এবং সে মহানবীর দূতকে ডেকে নিম্নোক্ত (বক্তব্য সম্বলিত) পত্র প্রদান করল : আপনি আমাকে সবচেয়ে সুন্দর ধর্মের প্রতি আহবান করেছেন। আমি আমার জাতির মধ্যে সবচেয়ে বাগ্মী ব্যক্তি ও শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে পরিচিত। আরবদের মধ্যে আমার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আমি আপনার ধর্ম অনুসরণে রাজি আছি। তবে এ শর্তে যে,আপনি আমাকে ধর্মীয় বিশেষ মর্যাদা দেবেন এবং আপনার মর্যাদার অংশীদার (প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত) করবেন।”

সে এ পর্যন্ত বলেই ক্ষান্ত হলো না;বরং মাজাআ ইবনে মারারার নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দলকে তার বক্তব্য পৌঁছে দেয়ার জন্য মদীনায় প্রেরণ করল এবং তাদেরকে বলে পাঠালো যে,যদি রাসূল তাঁর মৃত্যুর পর তাকে তাঁর স্থলবর্তী করেন,তবে সে ইসলাম গ্রহণ করবে ও তাঁকে সহযোগিতা করবে,নতুবা তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। তার প্রেরিত প্রতিনিধিরা মহানবীর নিকট উপস্থিত হয়ে শর্তহীন ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে ইয়ামামার শাসকের বাণী তাঁর কাছে পৌঁছাল। মহানবী (সা.) তার কথা শুনে বললেন : যদি তার ঈমান আনা শর্তাধীন হয়ে থাকে,তবে সে খিলাফত লাভের উপযুক্ত নয়। আল্লাহ্ আমাকে তার অকল্যাণ থেকে রক্ষা করবেন। ২৩২

মহানবীর অন্যান্য পত্র

মহানবী (সা.) বিভিন্ন অঞ্চলের শাসকবর্গ ও গোত্রপতিদের নিকট যে পত্রসমূহ দিয়েছেন,তার সংখ্যা অনেক। ঐতিহাসিক ও গবেষকগণ মহানবীর প্রেরিত ঊনত্রিশখানা পত্রের বিবরণ উল্লেখ করেছেন। আমরা গ্রন্থের কলেবর যাতে বৃদ্ধি না পায়,সে লক্ষ্যে অন্যসবের উল্লেখ থেকে বিরত থাকছি।

চুয়াল্লিশতম অধ্যায় :সপ্তম হিজরীর ঘটনাপ্রবাহ

খাইবরের দুর্ভেদ্য দুর্গ (আশংকার কেন্দ্র)

ইসলামের প্রদীপ-নক্ষত্র মদীনার আকাশে আলো বিকিরণ শুরু করলে মদীনার ইহুদীরা মক্কার কুরাইশদের থেকেও মহানবী ও মুসলমানদের শত্রুর চোখে দেখতে লাগল এবং সর্বশক্তি দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো।

মদীনা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী ইহুদীরা তাদের অপতৎপরতা ও মন্দ কর্মের পরিণতিতেই দুর্ভাগ্যে পতিত হয়। তাদের অনেকেই মৃতুদণ্ড প্রাপ্ত হয় এবং কোন কোন গোত্র,যেমন বনী কাইনুকা এবং বনী নাযীর মদীনা থেকে বহিষ্কৃত হয়। তারা খাইবর,ওয়াদিউল কুরা বা আযারআতে শামে নতুনভাবে বসতি স্থাপন করে।

মদীনার ৩২ ফারসাখ (প্রায় ২০০ কিলোমিটার) দূরবর্তী খাইবর উপত্যকায় অবস্থিত সমতল ভূমিটি অত্যন্ত উর্বর ছিল। মহানবীর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ইহুদীরা বসবাস ও আত্মরক্ষার জন্য সেখানে সাতটি দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি করেছিল। ঐ অঞ্চলের ভূমি ও আবহাওয়া কৃষিকাজের জন্য খুবই উপযোগী থাকায় ওখানে বসবাসকারীরা কৃষিকাজের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জনে সক্ষম হয়েছিল,যার দ্বারা তারা আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম প্রস্তুত করত। তারা এক্ষেত্রে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিল। সেখানকার জনসংখ্যা বিশ হাজারের অধিক ছিল এবং তাদের মধ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক সাহসী ও দক্ষ যোদ্ধা ছিল।২৩৩

খাইবরের ইহুদীদের সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল,তারা আরবের সকল গোত্রকে মদীনার ইসলামী সরকার উৎখাতে উস্কানি দিচ্ছিল এবং মুশরিকরা ইহুদীদের অর্থনৈতিক ও যুদ্ধ সরঞ্জামের পৃষ্ঠপোষকতায় আরবের সকল প্রান্ত থেকে মদীনার সন্নিকটে সমবেত হয়েছিল। এর পরিণতিতে খন্দকের (আহযাব) যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল,যার বিবরণ পাঠকরা পূর্বে পাঠ করেছেন। ঐ যুদ্ধে মহানবীর রণকৌশল ও তাঁর সঙ্গীগণের নিবেদিতপ্রাণ ভূমিকার ফলে আক্রমণকারীরা এক মাস পরিখার বিপরীতে অবস্থান গ্রহণের পর নিজেদের ঘরে,যেমন খাইবরের ইহুদীরা খাইবরে প্রত্যাবর্তনে বাধ্য হয় এবং ইসলামের কেন্দ্র নিরাপত্তা লাভ করে ও শান্তি ফিরে আসে।

খাইবরের ইহুদীদের কাপুরুষোচিত ভূমিকা মহানবীকে বিশৃঙ্খলা ও আশংকার এ কেন্দ্রে আক্রমণ করে তাদের উচ্ছেদ ও নিরস্ত্র করার এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। কারণ,এ আশংকা ছিল,একগুঁয়ে ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এ জাতি আরবের গোত্রগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করে মুসলমাদের বিরুদ্ধে নতুন করে উস্কানী দেবে এবং আহযাবের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। বিশেষত কুরাইশদের মূর্তিপূজা ও স্বধর্মের প্রতি যতটা গোঁড়ামি ছিল,ইহুদীদের স্বধর্মের প্রতি গোঁড়ামি তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এ কারণেই এক হাজার মূর্তিপূজকের বিপরীতে একজন ইহুদীও ইসলাম গ্রহণ করে নি। তারা এতটা গোঁড়া ছিল যে,নিজ ধর্ম ত্যাগ করে সত্য ধর্ম গ্রহণে তাদের কোন আগ্রহই ছিল না।

অন্য যে বিষয়টি মহানবীকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছিল,তা হলো,তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের শাসকদের প্রতি মাধুর্যপূর্ণ ভাষায় পত্র দিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। এ প্রেক্ষিতে বিশেষত পারস্য ও রোম সম্রাট ইহুদীদের ব্যবহার করে মুসলমানদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ এবং দীন ইসলামকে অঙ্কুরেই বিনাশ করার প্রচেষ্টা নিতে পারে এ আশংকায় ইহুদীদের কর্মকাণ্ডের উপর কড়া নজর রাখা এবং তাদেরকে নিরস্ত্র করা প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে এ সম্ভাবনাও ছিল,ইহুদীরা রোম ও পারস্য সম্রাটদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে,যেভাবে ইতোপূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সংগঠিত করেছিল। বিশেষত ঐ সময়ে ইরান ও রোমের মধ্যেকার যুদ্ধে তারা এক পক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করত। এসব দিক চিন্তা করে মহানবী (সা.) দেখলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ বিপজ্জনক অগ্নি নির্বাপণ দরকার। এ কাজের জন্য তখনই ছিল উপযুক্ত সময়। কারণ হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণের কোন সম্ভবনা ছিল না;বরং সেদিক থেকে মদীনা নিরাপদ ছিল। আর সে মুহূর্তে ইহুদীদের সংগঠিত শক্তির উপর আক্রমণ ঘটলে কুরাইশরা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। অন্যদিকে আহযাবের যুদ্ধে ইহুদীদের সহযোগী মদীনার উত্তরের গাতফান গোত্রসহ অন্যান্য গোত্র,যারা তাদের সাহায্য করতে পারে,তাদের বিষয়েও মহানবী বিশেষ পরিকল্পনা নিলেন।

উপরিউক্ত উদ্দেশ্যসমূহ সামনে রেখে আরব ভূখণ্ডে ইহুদীদের সর্বশেষ কেন্দ্র দখলের লক্ষ্যে মহানবী (সা.) মুসলমাদের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে বললেন,এ যুদ্ধে শুধু তারাই সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে যারা হুদায়বিয়ার সন্ধিতে উপস্থিত ছিল। অন্যরা ইচ্ছা করলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারে,কিন্তু গনীমত থেকে কিছুই পাবে না। রাসূল (সা.) গাইলা লাইসীকে মদীনায় তাঁর স্থলবর্তী করে হযরত আলীর হাতে সাদা পতাকা দিয়ে যাত্রার নির্দেশ দিলেন। সেনাদল দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার জন্য উট চালানোর সময় বিশেষ সঙ্গীত (হিদা) গাওয়ার অনুমতি দিলেন। উটচালক দলের অগ্রগামী ব্যক্তি আমের ইবনে আকওয়া নিম্নোক্ত কবিতা পড়ছিলেন :

والله لولا الله ما اهـتدينـا

و لا تـصدقنا و لا صليـنـا

انا إذا قوم  بـغـوا علينـا

و ان أرادوا فـتـنـة  ابيـنـا

فانـزلـن سـكينة علينـا

و ثبت الأقـدام ان لاقيـنـا

অর্থাৎ আল্লাহর শপথ,যদি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ না থাকত,তবে আমরা বিপথগামী হতাম। কোন যাকাতও দিতাম না,নামাযও পড়তাম না। আমরা এমন এক জাতি,যদি কেউ আমাদের উপর জুলুম করে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে,আমরা তাদের অধীনতাকে মানি না। আল্লাহ্ আমাদের তাঁর পথে অবিচল রাখুন এবং আমাদের উপর প্রশান্তি বর্ষণ করুন।

এই কবিতা ও সঙ্গীতের বিষয়বস্তু এ যুদ্ধের উদ্দেশ্যকে সুন্দরভাবে বর্ণনা করছে। এ থেকে বোঝা যায়,ইহুদীরা আমাদের উপর জুলুম করেছে এবং আমাদের ঘরে আগুন জ্বালিয়েছে বলে আমরা এ ফিতনার কেন্দ্র ধ্বংস করে আগুন নির্বাপিত করতে সফরের কষ্ট সহ্য করছি। তাঁর সঙ্গীতের বিষয়বস্তু মহানবীকে এতটা খুশী করেছিল যে,তিনি আমেরের জন্য দুআ করেন। এ যুদ্ধেই আমের শাহাদাতের শরবত পান করেন।

মহানবী (সা.) সেনাবহিনীকে যাত্রার নির্দেশ দেয়ার সময় সামরিক কৌশল গোপন রাখার বিষয়ে বিশেষ সচেতন ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন কেউ তাঁদের গন্তব্যস্থল সম্পর্কে যেন জানতে না পারে এবং শত্রুরা কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই তাদের উপর আকস্মিক আক্রমণ চালাবেন ও দুর্গ অবরুদ্ধ করবেন। অন্যদিকে শত্রুপক্ষের মিত্ররা যাতে মনে করে,মহানবী (সা.) তাদের উদ্দেশে হয় তো যাত্রা করে থাকবেন। তাই তারা নিজ ঘর থেকে বের হবার সাহস করবে না।

কেউ কেউ যেন এটা মনে করে,মহানবীর উত্তর দিকে পরিচালিত এ অভিযানের উদ্দেশ্য আহযাবের যুদ্ধে ইহুদীদের দুই সহযোগী গোত্র গাতফান ও ফাযারাহ্। তাই রাসূল (সা.) যখন রাজিই’ নামক স্থানে পৌঁছেন,তখন সেনাদলকে খাইবরের দিকে পরিচালিত করে তাদের ও বনী গাতফান গোত্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নেন যাতে এ দুই গোত্রের মধ্যে যোগাযোগ ছিন্ন হয় এবং তারা খাইবরের ইহুদীদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে না পারে। খাইবরের অবরোধ এক মাস স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু এ এক মাসে ঐ গোত্র তাদেরকে সাহায্য করতে পারে নি।২৩৪

ইসলামের মহান নেতা দু শ’ অশ্বারোহীসহ এক হাজার ছয় শ’ সৈন্য নিয়ে খাইবর অভিযানে যাত্রা করেন।২৩৫

মহানবী (সা.) খাইবরের নিকটবর্তী হলে নিম্নোক্ত দুআ পড়েন,যা তাঁর পবিত্র নিয়্যতের পরিচয় বহন করে :

اللهم ربّ السّموات و ما اظللن و ربّ الأرضين و ما اقللن... نسألك خير هذه القرية و خير أهلها و خير ما فيها، و نعوذ بك من شرها و شر أهلها و شر ما فيها

“হে আল্লাহ,আপনি আকাশ ও যা কিছু তার নিচে রয়েছে,তার পালনকর্তা এবং পৃথিবীসমূহ ও যা কিছু ভারী বস্তু তার উপর রয়েছে,তারও প্রভু। আমি আপনার নিকট এ ভূমি,এর অধিবাসী এবং যা কিছু তাতে রয়েছে,সবকিছুর কল্যাণ কামনা করছি এবং এ ভূমি,এর অধিবাসী এবং এর মধ্যে বিদ্যমান অকল্যাণ হতে আপনার আশ্রয় চাইছি। ২৩৬

এক হাজার ছয় শ’ সাহসী সৈনিক,যারা প্রত্যেকেই যুদ্ধের তীব্র আগ্রহ ও উত্তেজনা নিয়ে এখানে এসেছে,তাঁদের সামনে এভাবে ক্রন্দনরত অবস্থায় প্রার্থনা প্রমাণ করে মহানবী (সা.) প্রতিশোধ গ্রহণ এবং দেশ ও ভূমি দখলের মনোবৃত্তি নিয়ে সেখানে যান নি,বরং তিনি গিয়েছেন এ বিপজ্জনক কেন্দ্র,যে কোন মুহূর্তে যা কাফের ও মুশরিকদের ঘাঁটিতে পরিণত হওয়ার আশংকা রয়েছে,তাকে নিরস্ত্র ও শক্তিহীন করতে,যাতে এদিক থেকে ইসলামের অগ্রযাত্রা নিরাপদ থাকে।

রাতে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পথ অবরুদ্ধ

খাইবরের সাতটি দুর্গের প্রতিটির বিশেষ নাম ছিল;যথাক্রমে নায়েম,কামুস,কুতাইবা,নাসতাত,শাক্ক,তীহ্ এবং মালালিম। কোন কোন দুর্গ কখনো যে সেনাপতির অধীন ছিল,তার নামে অভিহিত হতো,যেমন মারহাবের দুর্গ। অন্যদিকে শত্রুদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিটি দুর্গের পাশে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল,যাতে কেল্লাগুলোর প্রহরীরা দুর্গের বাইরের খবরাখবর দুর্গের অভ্যন্তরে সরবরাহ করতে পারে। দুর্গগুলো এমনভাবে নির্মিত হয়েছিল,যেন দুর্গের অধিবাসীরা বাইরের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে এবং শত্রুর অবস্থানের ওপর মিনজানিক (পাথর ছোড়ার জন্য বিশেষ কামান) দ্বারা আক্রমণ চালাতে পারে।২৩৭

সাতটি দুর্গে অবস্থানরত বিশ হাজার অধিবাসীর মধ্যে দুই হাজার যোদ্ধা ছিল। খাদ্য ও পানীয় এতটা সঞ্চিত ছিল যে,তারা সবাই এ দিক থেকে নিশ্চিত ছিল। তাদের গুদামগুলো খাদ্যে পূর্ণ ছিল। এ দুর্গগুলো এতটা সুরক্ষিত ছিল যে,ছিদ্র করারও কোন সুযোগ ছিল না। যে কেউ দুর্গের দিকে অগ্রসর হলে পাথরের বা তীরের আঘাতে নিহত বা আহত হতো। তাই এ দুর্গগুলো ইহুদী যোদ্ধাদের জন্য শক্তিশালী ঘাঁটি বলে পরিগণিত হতো।

এরূপ শক্তিশালী ও সুসজ্জিত শত্রুর ঘাঁটি দখলের উদ্দেশ্যে আগত মুসলমানদের তা দখল করতে সর্বোচ্চ যুদ্ধকলা ও সূক্ষ্মতম সমরশৈলী অবলম্বনের প্রয়োজন ছিল। তাই মুসলিম যোদ্ধারা সর্বপ্রথম যে কাজ করলো,তা হলো,রাতে দুর্গের দিকের সকল গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পথ অবরোধ করল। এ কাজ এত দ্রুত ও গোপনে সম্পাদিত হলো যে,দুর্গগুলোর প্রহরীরাও তা টের পেল না। সকালে খাইবরের কৃষকরা দুর্গ হতে কৃষিক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য বের হলে লক্ষ্য করল,ইসলামের সাহসী ও সংগ্রামী যোদ্ধারা সকল পথ অবরোধ করে রেখেছে,তাদের চেহারা ঈমান ও প্রত্যয়ের চিহ্ন বহন করছে,তাদের শক্তিশালী হাতে রয়েছে ধারালো অস্ত্র। এ অবস্থায় অগ্রসর হলেই বন্দী হতে হবে। তাই এ দৃশ্য দেখামাত্রই তারা এতটা ভীত হলো যে,দ্রুত দুর্গের মধ্যে পালিয়ে গেল। ভেতরে প্রবেশ করে সমবেতভাবে সৈন্যদের জানালো,মুহাম্মদ তার সৈন্যদের নিয়ে দুর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাথে সাথে দুর্গের কপাট বন্ধ করা হলো। দুর্গের ভেতরে যুদ্ধ উপলক্ষে জরুরী সভা বসলো। অপরদিকে মহানবী (সা.)-এর চোখ কোদাল,বেলচা,গাঁইতি ইত্যাদির মতো ধ্বংসকারী সরঞ্জামের উপর পড়লে তিনি একে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করলেন। তাই মুসলিম সেনাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য বললেন :

الله أكبر خربت خيبر انا إذا نزلنا بساحة قوم فساء صباح المنذرين

“সর্বশ্রেষ্ঠ তিনিই আল্লাহ্,খাইবর ধ্বংস হোক;আমরা যখন এমন জাতির ভূমিতে এসেছি,যাদের সতর্ক করা হয়েছে,তাদের পরিণতি কত মন্দ!

যুদ্ধাবস্থার জরুরী বৈঠকে ইহুদীরা সিদ্ধান্ত নিল,নারী ও শিশুদের একটি দুর্গে এবং খাদ্যদ্রব্য এক দুর্গে রেখে অন্যান্য দুর্গ থেকে প্রতিরোধ করবে। দুর্গের অভ্যন্তর থেকে যোদ্ধারা পাথর ও তীর দিয়ে আক্রমণ করবে এবং সুযোগ বুঝে দুর্গ থেকে বের হয়ে মুসলমানদের সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হবে। এ যুদ্ধকৌশল তারা যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিল এবং এ কৌশলে তারা এক মাস ইসলামের দুর্বার যোদ্ধাদের প্রতিরোধ করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি কখনো কখনো একটি দুর্গ দখলের জন্য মুসলমানরা দশ দিন যুদ্ধ করেছে,কিন্তু কোন ফল হয় নি।

পর পর ইহুদী ঘাঁটির পতন

মুসলমানরা যেখানে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন সে স্থান সামরিক দৃষ্টিতে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কারণ,ইহুদী সৈন্যদের আক্রমণের আওতায় ছিলেন তাঁরা। খুব সহজেই ইহুদীরা ঐ স্থানে তাঁদের উপর তীর ও পাথর নিক্ষেপ করতে পারত। এ কারণে মুসলমানদের সাহসী ও অভিজ্ঞ সৈন্য হুবাব ইবনে মুনযার মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে বললেন : আপনি যদি আল্লাহর নির্দেশে এ স্থানে অবস্থান নিয়ে থাকেন,তবে আমার কোন আপত্তি নেই। কারণ আল্লাহর নির্দেশ সকল পরামর্শ ও পূর্ব অনুমানের ঊর্ধ্বে। কিন্তু যদি কোন পরিকল্পনা ছাড়া এমনিই এখানে অবস্থান গ্রহণ করে থাকেন,সেক্ষেত্রে সেনাদলের সদস্যদের পরামর্শ দানের সুযোগ দিলে আমার পরামর্শ হলো,এ স্থান শত্রুর নাগালের মধ্যে। কারণ,তাদের দুর্গ নামতাত’ -এর তীরন্দাজদের সামনে কোন ঘর ও খেজুর গাছ না থাকায় সহজেই তারা আমাদের অবস্থানের প্রাণকেন্দ্রে আঘাত হানতে পারবে।” মহানবী (সা.) ইসলামের মহান মৌলনীতি (পরামর্শের নীতি) অনুসারে অন্যদের মতামতের গুরুত্ব দেয়ার জন্য বললেন : যদি তোমরা এর থেকে উত্তম স্থান নির্বাচন কর,আমরা ক্যাম্প সরিয়ে সেখানে নিয়ে যাব।” হুবাব ইবনে মুনযার খাইবরের অবস্থানগুলোর সুবিধা-অসুবিধা পর্যালোচনা করে এমন স্থান নির্বাচন করলেন যা খেজুর বাগানের পশ্চাতে ছিল। ফলে যুদ্ধ ক্যাম্পটি সেখানে সরিয়ে নেয়া হলো। খাইবরের যুদ্ধ চলাকালীন দিনের বেলা মহানবী ও সৈন্যগণ ক্যাম্প থেকে দুর্গের দিকে আসতেন ও রাতে সেখানে ফিরে যেতেন।২৩৮

খাইবারের যুদ্ধের বিস্তারিত ও যথাযথ বিবরণ দেয়া অসম্ভব। কিন্তু ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থসমূহ থেকে মোটামুটিভাবে জানা যায়,মুসলিম সৈন্যরা একটি একটি করে দুর্গ দখলে অগ্রসর হয়েছিলেন। তাঁরা চেষ্টা করতেন,যে দুর্গে আক্রমণ পরিচালিত হচ্ছে,তা থেকে অন্য দুর্গগুলোকে বিচ্ছিন্ন করতে। এভাবে একটি দুর্গের পতন ঘটানোর পর অপর দুর্গে আক্রমণ করতেন। কিন্তু যে দুর্গগুলো মাটির নিচ দিয়ে পরস্পর সংযুক্ত ছিল এবং যে দুর্গগুলোর অভ্যন্তরে সৈন্যরা কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলত,সেগুলোর দখল প্রক্রিয়া বেশ ধীর গতিতে সম্পন্ন হতো। কিন্তু যে দুর্গগুলোর সৈন্যদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হতো বা অন্য দুর্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত,সহজেই তার পতন হতো। সেক্ষেত্রে হতাহতের ঘটনাও কম ঘটত।

একদল ঐতিহাসিকের মতে,খাইবরের দুর্গগুলোর মধ্যে প্রথম পতন ঘটে নায়েম দুর্গের। মুসলমানদের তা দখলে প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছিল। এ দুর্গ দখল করতে ইসলামের এক মহান সৈনিক মাহমুদ ইবনে মাসলামা নিহত হন এবং আরো কয়েক সৈন্য আহত হন। মাহমুদ ইহুদীদের নিক্ষিপ্ত একটি বড় পাথরের আঘাতে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেন। অবশ্য ইবনে আসীরের২৩৯ বর্ণনামতে তিনি আহত হওয়ার তিন দিন পর শাহাদাত বরণ করেন। পঞ্চাশ জন আহত সৈনিক ব্যান্ডেজ ও শুশ্রূষার জন্য নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তরিত হন।২৪০

বনী গিফার গোত্রের একদল নারী রাসূলের অনুমতিক্রমে খাইবরে এসেছিলেন। তাঁরা আহতদের শুশ্রূষা ও তাঁদের জন্য বৈধ অন্যান্য দায়িত্ব পালনে আত্মত্যাগী ভূমিকা রাখেন এবং এ জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।২৪১

সামরিক পরামর্শসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নায়েম দুর্গের পর কামুস দুর্গকে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলো। এ দুর্গে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আবিল হুকাইক। এ দুর্গও মুসলিম সেনাদের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে হস্তগত হলো। ইহুদী নেতা হুইয়াই ইবনে আখতাবের২৪২ কন্যা সাফিয়া এ সময় বন্দী হন,যিনি পরবর্তীতে রাসূলের স্ত্রী হয়েছিলেন।

এ দুই দুর্গের পতন মুসলমানদের মানসিক শক্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল এবং ইহুদীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হলো। কিন্তু মুসলমানদের খাদ্য-দ্রব্যের রসদ ফুরিয়ে এসেছিল বলে তাঁরা খাদ্যসংকটে পড়েছিলেন। ফলে বাধ্য হয়ে এমন প্রাণীর মাংস খেতে বাধ্য হলেন যা মাকরূহ। যে দুর্গে ইহুদীরা খাদ্য-দ্রব্য মজুদ রেখেছিল,তখনও তা মুসলমানদের দখলে আসে নি।

সংকটের মুহূর্তেও চরম আত্মসংযম

মুসলমানদের উপর ক্ষুধার চাপ তীব্রতর হলে তাঁরা মাকরূহ প্রাণীর মাংস খেতে বাধ্য হচ্ছিলেন। তখন একজন কৃষ্ণাঙ্গ রাখাল,যে ইহুদীদের দুম্বাগুলোকে দেখাশুনা করত,রাসূলের নিকট এসে ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাইল। মহানবী (সা.) আকর্ষণীয় বক্তব্যের মাধ্যমে তার কাছে ইসলাম ধর্মকে তুলে ধরলেন। সেও এতে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করল। সে মহানবীকে বলল : এ দুম্বাগুলো আমার তত্ত্বাবধানে আমানত হিসেবে রয়েছে। এখন তো আমার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। তাই এ দুম্বাগুলোকে আপনি নিতে পারেন।”

মহানবী (সা.) সহস্রাধিক ক্ষুধার্ত সৈনিকের সামনে সুস্পষ্টভাবে বললেন : আমাদের ধর্মে আমানতের খেয়ানত অন্যতম বড় অপরাধ ও গুনাহ। তোমার দায়িত্ব হলো,দুর্গে গিয়ে দুম্বাগুলোর মালিকের কাছে সেগুলো ফিরিয়ে দেয়া।” সে রাসূল (সা.)-এর নির্দেশ মতো কাজ করল। সেগুলো ফিরিয়ে দিয়ে সে রাসূলের সৈন্যদলে যোগ দিল। অবশেষে মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধ করে শহীদ হলো।২৪৩

মহানবী (সা.) তাঁর যৌবনে আল আমীন’ বা বিশ্বস্ত’ উপাধি লাভ করেছিলেন। কিন্তু তা শুধু সে সময়েই ছিল না;বরং সারা জীবন তিনি এমনই ছিলেন। সকালে দুর্গগুলো থেকে রাখালরা মেষ পাল নিয়ে সবুজ মাঠে যেত এবং সন্ধ্যায় ফিরত,কিন্তু কোন মুসলমানই তা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন নি। কারণ তাঁরা তাঁদের নেতার প্রশিক্ষণে ইসলামের মহান শিক্ষার ছায়ায় তাঁর মতো বিশ্বস্ত ও আমানতদার হিসেবে তৈরি হয়েছিলেন। রাসূল (সা.) শুধু একদিন চরম খাদ্য সংকটে পড়ায় মাত্র দু টি মেষ গ্রহণের অনুমতি তিনি দিয়েছিলেন,যাতে সৈন্যরা তাঁদের জীবন বাঁচাতে পারেন। যদি সংকট এতটা তীব্র না হতো,তবে কখনোই তা করার অনুমতি দিতেন না। অধিকাংশ সময়ই সৈন্যরা ক্ষুধার কষ্টের কথা বললে তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে বলতেন : যে দুর্গে খাদ্য-দ্রব্য রয়েছে,তা হস্তগত কর।” যুদ্ধের মাধ্যমে হস্তগত করা ছাড়া তাদের সম্পদে হস্তক্ষেপে নিষেধ করতেন।২৪৪

এ সত্বেও সমসাময়িক কোন কোন মধ্যপ্রাচ্যবিদ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসলামের মহান উদ্দেশ্যকে খাটো করে দেখাতে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এ বিষয়টি প্রমাণের মাধ্যমে যে,মুসলমানরা যুদ্ধের সময় ন্যায়পরায়ণ আচরণ করতেন না এবং ইসলামের যুদ্ধগুলো গনীমত লাভ ও লুটপাটের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতো। কিন্তু এ ঘটনাসহ এরূপ অসংখ্য ঘটনা,যা ইতিহাসের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে,তাদের এ মিথ্যা দাবী অসার প্রমাণ করে। কারণ নিজ ত্যাগী সৈন্যদের জীবন-মরণ সমস্যার সময়ও মহানবী ঐ রাখালকে তার ইহুদী মনিবের সম্পদে বিশ্বাসঘাতকতায় নিষেধ করেছেন;অথচ তিনি ইচ্ছা করলেই তা আটক করতে পারতেন।

ঈমানদার মহিলার বিস্ময়কর স্মৃতি

ইসলামের ইতিহাসের পাতায় ঈমানদার নারীগণের আত্মত্যাগের ইতিহাস বিস্ময়কর। বিস্ময়কর বলছি এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে,আমরা এর দৃষ্টান্ত বা নযীর সমকালীন নারীদের মাঝে কদাচিৎ দেখতে পাই।63

স্বামী,পিতা ও ভাইকে এ যুদ্ধে হারানো বনী দীনার গোত্রের এক মহিলা,একদল মহিলার মাঝে বসে অশ্রুপাত করছিলেন। অন্য মহিলারাও শোকগাথা গেয়ে কান্নাকাটি করছিলেন। হঠাৎ মহানবী (সা.) ঐ মহিলাদের পাশ দিয়ে গমন করেন। শোকে কাতর এ মহিলা তাঁর চারপাশে যাঁরা ছিলেন,তাঁদের কাছ থেকে মহানবীর খবর জিজ্ঞেস করেন। সবাই বললেন,আলহামদুলিল্লাহ্,আল্লাহর রাসূল সুস্থ আছেন। তিনি বলেন : আমার বড় আগ্রহ নিকট থেকে আমি মহানবীকে দেখব। যে স্থানে মহানবী দাঁড়িয়েছিলেন,তা নারীদের বসার জায়গা থেকে বেশি দূরে ছিল না। তারা তাঁকে দেখিয়ে বলল : ঐ যে রাসূলুল্লাহ্।

মহিলার দৃষ্টি যখন রাসূল (সা.)-এর পবিত্র মুখমণ্ডলের উপর পড়ল,মুহূর্তে তিনি সব শোক,দুঃখ-বেদনা ভুলে গেলেন। তাঁর অন্তরের অন্তস্থল থেকে এমন এক ধ্বনি বের হয়ে এল,যা একটি বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। ঐ মহিলা বললেন : হে রাসূলাল্লাহ্! আপনার পথে সকল দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদ আমার জন্য অতি সহজ। আপনি জীবিত থাকলে আমাদের ওপর যত বড় বিপদই আসুক না কেন,তা অত্যন্ত তুচ্ছ;তার প্রতি আমরা মোটেই ভ্রুক্ষেপ করি না।

সাবাশ এই দৃঢ়তা ও অবিচলতার প্রতি! মুবারকবাদ সেই ঈমানের জন্য যা মহাসাগরগামী বিশাল জাহাজের নোঙরের মতো মানুষের অস্তিত্বের তরীকে ভয়ঙ্কর ঝড়-তুফানের মোকাবেলায় অস্থিরতা ও পদস্খলন থেকে রক্ষা করে!64

আত্মত্যাগী নারীগণের আরেক দৃষ্টান্ত

ইতোপূর্বে আমরা আমর ইবনে জামূহ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। তিনি খোঁড়া এবং জিহাদ তাঁর ওপর ফরয না হলেও অনেক পীড়াপীড়ি করে মহানবীর কাছ থেকে অনুমতি আদায় করেন এবং মুজাহিদদের প্রথম সারিতে গিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর ছেলে খাল্লাদ এবং তাঁর শ্যালক আবদুল্লাহ্ ইবনে আমরও এ পবিত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা তিনজনই শাহাদাত লাভ করেন। তাঁর স্ত্রী হিন্দ ছিলেন আমর ইবনে হাযামের মেয়ে এবং জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্ আনসারীর ফুফু। তিনি উহুদ প্রান্তরে যান। তিনি তাঁর প্রিয়ভাজন শহীদগণকে মাটির উপর থেকে তুলে একটি উটের ওপর রাখেন এবং মদীনায় চলে যান।

মদীনার গুজব রটেছিল,মহানবী (সা.) যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয়েছেন। নারীরা মহানবীর ব্যাপারে সঠিক খবর পাওয়ার জন্য উহুদের দিকে রওয়ানা হন। তিনি পথিমধ্যে মহানবীর স্ত্রীগণের সাক্ষাৎ পান। তাঁরা তাঁর কাছ থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর অবস্থা জানতে চান। এই নারী তাঁর স্বামী,ভাই ও সন্তানদের লাশ উটের উপর বেঁধে মদীনা নিয়ে যাচ্ছিলেন। এহেন অবস্থায়ও মনে হলো তাঁর যেন কোন বিপদই হয় নি! অত্যন্ত উৎফুল্ল কণ্ঠে তিনি বললেন : আমার কাছে আনন্দের খবর আছে। আল্লাহর রাসূল জীবিত আছেন। এই বিরাট নেয়ামতের মুকাবেলায় সকল দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদ নগণ্য ও তুচ্ছ।

অপর খবর হলো,মহান আল্লাহ্ কাফেরদেরকে ক্ষুব্ধ ও ক্ষিপ্ত অবস্থার মধ্যে ফিরিয়ে দিয়েছেন।65 এরপর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো : এই লাশগুলো কার?”   তিনি বললেন : সবই আমার নিজের লোক। একজন আমার স্বামী,অপর আমার সন্তান,তৃতীয় আমার ভাই;মদীনায় দাফন করার জন্য তাদের নিয়ে যাচ্ছি।

আমরা পুনরায় ইসলামের ইতিহাসের এ অধ্যায়ে ঈমানের আরেক দৃষ্টান্ত পাই। অর্থাৎ দুঃখ ও বিপদাপদ তুচ্ছ জ্ঞান করা এবং পবিত্র লক্ষ্যের জন্য সকল দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করা। এ ঘটনা তারই জ্বলন্ত সাক্ষী। বস্তুবাদী আদর্শ কখনো এ ধরনের আত্মত্যাগী নারী ও পুরুষকে প্রশিক্ষিত করতে পারে নি। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে,এই ব্যক্তিরা লক্ষ্য ও আদর্শের জন্য লড়াই করেন;পার্থিব ভোগ-লিপ্সা বা পদমর্যাদার জন্য নয়।

এ ঘটনার পর আরো ঘটনা আছে,যা আরো বিস্ময়কয়,যা বস্তুগত দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা ও যারা ঐতিহাসিক বিষয়াদি বিশ্লেষণ করার জন্য প্রণয়ন করেছে,সেগুলোর আলোকে কখনোই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কেবল মহান আল্লাহর মনোনীত বান্দাগণ এবং ঊর্ধ্ব জগতের প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার প্রতি যাঁদের অটুট ঈমান রয়েছে এবং অলৌকিকত্ব ও কারামাতের বিষয়গুলো যাদের কাছে স্পষ্ট,কেবল তাঁরাই এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম এবং সবদিক থেকে সঠিক ও বিশুদ্ধ বলে গ্রহণ করতে পারবেন।

ঘটনার বিবরণ

উটের লাগাম তাঁর হাতে ছিল। মদীনার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু উটটি খুব কষ্টে পথ চলছিল। মহানবী (সা.)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে একজন বললেন : নিশ্চয়ই উটের বোঝা খুব ভারী হয়েছে। জবাবে হিন্দ বললেন : এই উট খুব শক্তিশালী। একাই দুই উটের বোঝা বহন করতে পারে। বরং এর অন্য কারণ আছে। তা হচ্ছে,যখনই আমি উটটি উহুদের দিকে নিয়ে যাই,উটটি খুব স্বচ্ছন্দে পথ চলে। আবার যখন মদীনার দিকে নিতে চাই,তখন খুব কষ্টে টেনে নিতে হয় বা হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে। হিন্দ সিদ্ধান্ত নিলেন,উহুদে ফিরে যাবেন এবং মহানবী (সা.)-এর কাছে এ ঘটনা জানাবেন। তিনি সেই উটটি ও লাশগুলো নিয়ে উহুদ প্রান্তরে যান। উটের পথ চলার বৃত্তান্ত মহানবীকে শোনান। মহানবী বললেন : তোমার স্বামী যখন উহুদ আসছিল,তখন আল্লাহর কাছে কী দুআ করেছিল?”   তিনি জবাব দিলেন : আমার স্বামী আল্লাহর কাছে হাত তুলে মুনাজাত করেছিলেন : হে আল্লাহ্! আমাকে আমার ঘরে ফিরিয়ে আনবেন না।

মহানবী বললেন : তোমার স্বামীর দুআ কবুল হয়েছে। আল্লাহ্ চান না,এ লাশ আমরের ঘরে ফিরে যাক। তোমার এখন কর্তব্য,এই তিনটি লাশই উহুদ প্রান্তরে দাফন করা। জেনে রেখ,পরকালে তারা তিনজনই একত্রে থাকবে।

হিন্দ অশ্রুসিক্ত নয়নে মহানবীর কাছে একটি আবেদন করেন। তা হলো,তিনি যেন দুআ করেন যাতে তিনিও (হিন্দ) তাঁদের সাথে থাকতে পারেন।66

মহানবী (সা.) তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমার দৃষ্টি পিতার বিমর্ষ চেহারার উপর পড়ল। তাঁর দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। মহানবী তাঁর নিজের তরবারিখানা ধোয়ার জন্য হযরত ফাতিমা যাহরাকে দিলেন।

হিজরী সপ্তম শতাব্দীর দিকে ঐতিহাসিক আরবালী বলেন : মহানবী (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা পানি আনলেন,যাতে পিতার পবিত্র মুখমণ্ডলের রক্ত ধুয়ে ফেলেন। আমীরুল মুমিনীন পানি ঢালছিলেন। কিন্তু আঘাতজনিত ক্ষত গভীর ছিল বলে রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে তিনি মাদুরের একটি টুকরো জ্বালিয়ে সেটির ছাই মুখমণ্ডলের ক্ষতস্থানসমূহের উপর লাগিয়ে দেন। ফলে মুখমণ্ডলের ক্ষতস্থানের রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়।67

প্রয়োজন শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন

উহুদের ঘটনার পর মুসলমানরা যে রাতে নিজ নিজ ঘরে ফিরে গিয়ে ঘুমিয়েছিলেন,তা খুবই স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল রাত ছিল। মুনাফিকরা,ইহুদীরা এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের অনুসারীরা এ পরিস্থিতির জন্য দারুণ খুশী হয়েছিল। অধিকাংশ ঘর থেকে শহীদগণের আত্মীয়-স্বজনের কান্নাকাটি ও বিলাপের আওয়ায শোনা যাচ্ছিল।

সবচেয়ে বড় কথা,মুসলমানদের বিরুদ্ধে মদীনার মুনাফিক ও ইহুদীদের বিদ্রোহের আশংকা ছিল। অন্ততপক্ষে তারা মতবিরোধ ও অনৈক্য সৃষ্টি করে ইসলামের প্রাণকেন্দ্রের রাজনৈতিক সংহতি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে পারত।

অভ্যন্তরীণ মতবিরোধজনিত ক্ষয়-ক্ষতি বহিঃশত্রুর আক্রমণের চেয়েও অনেক বেশি। এসব কারণে অভ্যন্তরীণ শত্রুদের মাঝে ভীতি সঞ্চার করা মহানবী (সা.)-এর অন্যতম কর্তব্য ছিল। তাদেরকে এ কথা বুঝিয়ে দেয়া প্রয়োজন ছিল যে,তাওহীদী বাহিনীতে কোনরূপ বিশৃংখলা বা দুর্বলতা প্রবেশ করে নি। বরং অনৈক্য সৃষ্টির যে কোন পাঁয়তারা এবং ইসলামের শক্তিমূলে আঘাত হানার যে কোন তৎপরতা সর্বশক্তি দিয়ে অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেয়া হবে।

মহানবীর ওপর আল্লাহর তরফ থেকে দায়িত্ব অর্পিত হয় যে,ঐ রাতের পরের দিনই শত্রুবাহিনীকে ধাওয়া করতে হবে। মহানবী এক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেন তিনি যেন সারা শহরে এ কথা ঘোষণা করে দেন যে,গতকাল যারা উহুদের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল,তারা যেন আগামীকাল শত্রুবাহিনীকে ধাওয়া করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। যারা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি,(আগামীকালের) এ জিহাদে আমাদের সাথে তাদের অংশগ্রহণের অধিকার নেই।

অবশ্য এ অভিযানে যাওয়ার ব্যাপারে উহুদ যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করে নি,তাদের বাধা দেয়া বা সীমাবদ্ধতা আরোপের পেছনে কতকগুলো হিকমতপূর্ণ কারণ বিদ্যমান ছিল,যা আলোকিত হৃদয়ের রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের কাছে মোটেই অজ্ঞাত নয়।

প্রথমত এই নিষেধাজ্ঞা এক ধরনের আঘাত ছিল ঐ লোকদের উপর,যারা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিল। অন্য অর্থে তাদের থেকে যোগ্যতা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল এবং প্রকারান্তরে বলা হচ্ছিল যে,প্রতিরক্ষার যুদ্ধে অংশগ্রহণের যোগ্যতা তারা হারিয়ে ফেলেছে।

দ্বিতীয়ত যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের জন্যও একটি শাস্তিমূলক শিক্ষা ছিল। কেননা তাদের শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণেই ইসলাম ও মুসলমানদের এত বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কাজেই তাদেরকেই এই বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে,একে পুষিয়ে দিতে হবে,যাতে তারা ভবিষ্যতে আর কখনো এমন শৃঙ্খলা ভঙ্গের কাজ না করেন।

মহানবী (সা.)-এর পক্ষ হতে ঘোষণা দানকারীর আওয়ায বনী আবদুল আশহালের এক তরুণ শুনতে পায়। ঐ সময় সে তার ভাই সহ আহত শরীরে বিছানায় শুয়েছিল। এই আহবান তাদের এমনভাবে আলোড়িত করে যে,তাদের একটি মাত্র ঘোড়া এবং নানা কারণে তাদের জন্য যুদ্ধযাত্রা সমস্যাপূর্ণ হওয়া সত্বেও তারা পরস্পরকে বলল : আমাদের জন্য কিছুতেই উচিত হবে না যে,মহানবী (সা.) জিহাদের ময়দানে গমন করবেন,আর আমরা তাঁর পেছনে পড়ে থাকব। এই দু যুবক পালাক্রমে ঘোড়ায় চড়ে পরদিন ইসলামী বাহিনীর সাথে মিলিত হয়।68

হামরাউল আসাদ69

মহানবী (সা.) ইবনে উম্মে মাকতুমকে মদীনায় স্থলবর্তী রূপে রেখে যান। তিনি মদীনা থেকে আট মাইল দূরে হামরাউল আসাদে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। খুযাআহ্ গোত্রপ্রধানের নাম ছিল মা বাদ খুযায়ী। তিনি মুশরিক হলেও মহানবীকে সমবেদনা জানান। খুযাআহ্ গোত্রের সকল লোকই ইসলামী সেনাবাহিনীর সহায়তা করে। মা বাদ মহানবীকে সহায়তা দানের উদ্দেশ্যে হামরাউল আসাদ থেকে কুরাইশ বাহিনীর অবস্থানকেন্দ্র রওহা গমন করেন এবং আবু সুফিয়ানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বুঝতে পারেন,আবু সুফিয়ান মদীনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুসলমানদের অবশিষ্ট শক্তি গুঁড়িয়ে দেয়া তার উদ্দেশ্য। মা বাদ আবু সুফিয়ানকে মদীনা প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেন এবং বলেন :

হে আবু সুফিয়ান! মুহাম্মদ এখন হামরাউল আসাদে আছেন। তিনি মদীনা থেকে অনেক বেশি সেনাশক্তি নিয়ে এসেছেন। গতকাল যারা যুদ্ধে অংশ নেয় নি,তারাও আজ তাঁর সাথে যোগ দিয়েছে।

আবু সুফিয়ান! আমি এমন কতক চেহারা দেখেছি যা ক্রোধে,ক্ষোভে জ্বলজ্বল করছিল। আমি জীবনে এমন ক্রোধান্বিত লোক দেখি নি। মুসলমানরা গতকালের বিশৃঙ্খলার জন্য খুবই অনুতপ্ত।

তিনি মুসলমানদের বাহ্যিক ও মানসিক শক্তি ও শৌর্য-বীর্য সম্পর্কে কথা বলে আবু সুফিয়ানকে তার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য করেন।

মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবীগণ সহ সারা রাত হামরাউল আসাদে অবস্থান করেন। তিনি গোটা প্রান্তর জুড়ে আগুন জ্বালানোর নির্দেশ দিলেন যাতে শত্রুবাহিনী মনে করে,মুসলমানদের যোদ্ধা ও সমরশক্তি গতকাল উহুদ প্রান্তরে যা ছিল,তার চেয়ে বহু গুণ বেশি। সাফওয়ান উমাইয়্যা আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে বলে : মুসলমানরা আঘাতে জর্জরিত,ক্ষত-বিক্ষত ও ক্ষুব্ধ। আমার মনে হয়,এতটুকুই যথেষ্ট;বরং আমাদের উচিত মক্কায় ফিরে যাওয়া। 70

একবারের বেশি প্রতারিত হয় না ঈমানদার

এ উপশিরোনাম মহানবী (সা.)-এর এক বিখ্যাত উক্তির সার কথা। তিনি বলেছেন :

لا يُلدغ المؤمن من جحر مرّتين

মহানবী (সা.) এ উক্তি তখনই করেন,যখন আবু আররা জামহী তাঁর কাছে মুক্তির আবেদন জানায়। লোকটি ইতোপূর্বে বদর যুদ্ধে বন্দী হয়েছিল। বদর যুদ্ধে মহানবী তার কাছ থেকে এই শর্তে প্রতিশ্রুতি নেন যেতাকে মুক্তি দেন এবং,ইসলামের বিরোধিতায় সে মুশরিকদের সহায়তা করবে না। সেও শর্তটি মেনে নেয়। কিন্তু উহুদ যুদ্ধে অংশ নিয়ে সে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। ঘটনাচক্রে হামরাউল আসাদ থেকে ফেরার পথে মুসলমানরা তাকে বন্দী করে। এবারও সে মহানবীর কাছে মুক্তির জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু মহানবী তার অনুরোধের প্রতি কর্ণপাত করেন নি। তিনি এ মন্তব্য করে তার প্রাণদণ্ড কার্যকর করার হুকুম দেন। আর এভাবে উহুদ যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের সমাপ্তি ঘটে।71

অবশেষে সত্তরজন বা চুয়াত্তরজন বা বর্ণনান্তরে একাশি জন শহীদের বিনিময়ে উহুদ যুদ্ধ সমাপ্ত হয়। অন্যদিকে কুরাইশ বাহিনীর নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র বাইশ জন। এ পরাজয়ের কারণ ছিল গিরিপথের প্রহরীদের শৃঙ্খলা ভঙ্গ। এর বিবরণ ইতোপূর্বে দেয়া হয়েছে। এভাবেই উহুদ যুদ্ধ তৃতীয় হিজরীর 7 শাওয়াল শনিবার সংঘটিত হয় এবং একই সপ্তাহের শুক্রবার হামরাউল আসাদের ঘটনাপ্রবাহ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। 14 শাওয়াল এ যুদ্ধের পূর্ণ সমাপ্তি ঘটে।

হিজরী তৃতীয় সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ইমামতের উজ্জ্বল রত্ন ইমাম মুজতাবা হাসান ইবনে আলীর জন্ম। তিনি হিজরী তৃতীয় সালের রমযান মাসের মধ্যভাগে (15 রমযান) মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর জন্মগ্রহণের দিন তাঁর ওপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হয়। তাঁর জন্মের সময় এমন আনুষ্ঠানিকতা উদ্যাপন করা হয়,যার বিবরণ শিয়াদের মহান ইমামগণের জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তেত্রিশতম অধ্যায় : চতুর্থ হিজরীর ঘটনাপ্রবাহ

প্রচার-সৈনিকদের ট্র্যাজেডী

যুদ্ধ শেষ হবার পর উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের রাজনৈতিক প্রভাব সুস্পষ্ট ছিল। মুসলমানরা যদিও বিজয়ী বাহিনীর সম্মুখে দৃঢ়তা দেখায় এবং শত্রুবাহিনীর পুনরায় ফিরে এসে আঘাত হানার চেষ্টা প্রতিরোধ করে,কিন্তু উহুদের ঘটনার পর ইসলাম উৎখাত করার লক্ষ্যে ভেতরের ও বাইরের চক্রান্ত ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। মদীনার মুনাফিক ও ইহুদীদের,শহরের বাইরের মুশরিকদের এবং দূর-দূরান্তের মুশরিক গোত্রগুলোর সাহস বেশ বেড়ে যায়। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং সৈন্য সমাবেশ করা থেকে বিরত হচ্ছিল না।

মহানবী (সা.) পূর্ণ দক্ষতার সাথে অভ্যন্তরীণ চক্রান্তগুলো নস্যাৎ করে দেন এবং মদীনার বাইরের যে সব গোত্র মদীনা নগরী আক্রমণের ইচ্ছা পোষণ করছিল,মুজাহিদ যোদ্ধাদের পাঠিয়ে তাদের দমন করেন। এ সময়ই তিনি গোপন সংবাদ পান,বনী আসাদ গোত্র মদীনা দখল করে মুসলমানদের হত্যা ও ধন-সম্পদ লুটপাট করার ষড়যন্ত্র করছে। মহানবী (সা.) তৎক্ষণাৎ একশ পঞ্চাশ সৈন্যের একটি দলকে আবু সালামার অধিনায়কত্বে চক্রান্তকারীদের এলাকায় প্রেরণ করেন। মহানবী অধিনায়ককে নির্দেশ দেন : এ অভিযানের আসল উদ্দেশ্য গোপন রাখবে এবং ভিন্ন পথ ধরে গমন করবে। দিনের বেলা বিশ্রাম নেবে আর রাতের বেলা পথ চলবে। তিনি মহানবীর আদেশ মান্য করেন এবং রাতের বেলা বনী আসাদ গোত্রকে ঘেরাও করে ষড়যন্ত্র অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেন। তিনি বিজয়ী বেশে বেশ কিছু গনীমতের সম্পদ নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। এ ঘটনা হিজরতের পঁয়ত্রিশতম মাসে সংঘটিত হয়।72

ধর্ম প্রচারকগণের হত্যার গভীর ষড়যন্ত্রের নীল নকশা

মহানবী (সা.) ছোট ছোট সেনাদল পাঠিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিচ্ছিলেন। অনুরূপভাবে বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মপ্রচারক দল পাঠিয়ে নিরপেক্ষ গোত্রগুলোর লোকদের মনকে ইসলামের মহান শিক্ষার দিকে আহবান করেছিলেন।

পবিত্র কুরআন,ধর্মীয় বিধানাবলী ও মহানবী (সা.)-এর হাদীস কণ্ঠস্থ ও হৃদয়ঙ্গমকারী দক্ষ মুবাল্লিগগণ (ধর্মপ্রচারক) একান্তই প্রস্তুত ছিলেন,নিজ নিজ জীবন বিপন্ন করেও ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বর্ণনা ও সবচেয়ে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে মানুষের কর্ণকুহরে পৌঁছে দেবেন।

মহানবী (সা.) সামরিক বাহিনী ও ধর্মপ্রচারকগণের বিভিন্ন দল প্রেরণ করে মহান নবুওয়াত ও রিসালাতের সাথে সংশ্লিষ্ট দু টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে সেনাদলসমূহ প্রেরণ ছিল মাথা চাড়া দেয়ার উপক্রম ঐ সব ফিতনা ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যে,যাতে নিরাপদ ও মুক্ত পরিবেশে ধর্ম প্রচারকারীগণ তাঁদের অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। আর সে দায়িত্ব ছিল মানুষের চিন্তা ও মনকে আলোকিত করা ও তাদের হৃদয় জয় করা।

কিন্তু কতিপয় বর্বর ও নীচ গোত্র ইসলামের আধ্যাত্মিক শক্তিরূপ ধর্ম প্রচারক দল-যাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল এক আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর প্রসার এবং কুফর ও মূর্তিপূজার উচ্ছেদ-তাঁদের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তের জাল বিস্তার করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এখানে এই নিবেদিতপ্রাণ ধর্ম প্রচারকারী দলের কাহিনী উপস্থাপন করছি যাঁদের সংখ্যা ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী ছয়73 এবং ইবনে সা দের বর্ণনা মোতাবেক দশ জন।74


8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53