চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড5%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 238 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 81731 / ডাউনলোড: 7517
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

মহানবী (সা.)-এর কাঁধে হযরত আলী (আ.)

মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ বলেন : পবিত্র কাবার ভেতরে বা বাইরে স্থাপিত কিছু প্রতিমা হযরত আলী (আ.) ধ্বংস করেছিলেন। মহানবী (সা.) হযরত আলীকে বললেন : আলী! তুমি বসে পড়, আমি তোমার কাঁধে উঠে প্রতিমাগুলো ধ্বংস করব।” হযরত আলী (আ.) পবিত্র কাবার প্রাচীরের পাশে মহানবীকে নিজ কাঁধে উঠালেন। কিন্তু তিনি বেশ ভার ও দুর্বলতা অনুভব করতে লাগলেন। তখন মহানবী হযরত আলীর অবস্থা বুঝতে পেরে তাঁকে কাঁধে উঠার নির্দেশ দিলেন। হযরত আলী মহানবীর কাঁধে উঠলেন এবং তামা দিয়ে নির্মিত কুরাইশদের সর্ববৃহৎ মূর্তি মাটিতে নিক্ষেপ করলেন। এরপর তিনি অন্যান্য মূর্তিও মাটির উপর ফেলতে লাগলেন।৩৫০

হিজরী নবম শতকের কবিদের অন্তর্ভুক্ত হিল্লার সুবক্তা কবি ইবনে আরান্দাস এ ফযীলত প্রসঙ্গে এক কাসীদায় বলেছেন :

وَ صُعُوْدُ غَارِبِ أَحْمَدَ فَضْلٌ لَهُ

دُوْنَ الْقَرَابَةِ وَ الصَّحَابَةِ أَفْضَلَا

“আহমদের কাঁধের উপর আরোহণ তাঁর (আলীর) একটি ফযীলত। আর এ ফযীলত (মহানবীর সাথে) তাঁর আত্মীয়তা ও সাহচর্য অপেক্ষাও শ্রেয়।”

মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে পবিত্র কাবার দরজা খোলা হলো। তখন তিনি কাবার দরজার উপর হাত রেখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং জনতা তাঁর উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় পবিত্র মুখমণ্ডলের দিকে তাকাচ্ছিল। ঐ অবস্থায় জনগণের দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি বললেন :

الحمد لله الذى صدق وعده و نصر عبده و هزم الأحزاب وحده

“ঐ মহান আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা, যিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছেন, নিজ বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং নিজেই সকল দল ও গোষ্ঠীকে পরাজিত করেছেন।”

মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনের একখানা আয়াতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি মহানবীকে তাঁর আপন মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন। এ আয়াত হলো :

) إنّ الّذى فرض عليك القرآن لرادّك إلى معاد(

“যিনি আপনার ওপর এ কুরআনের বিধান পাঠিয়েছেন (এবং এ কুরআন প্রচার করতে গিয়ে আপনি নিজ দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন), তিনিই আপনাকে মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন। (সূরা কাসাস : ৮৫)

‘মহান আল্লাহ্ নিজ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন’- এ কথা বলার মাধ্যমে মহানবী (সা.) এ গায়েবী প্রতিশ্রুতি যে বাস্তবায়িত হয়েছে, সে ব্যাপারে সবাইকে অবগত করলেন। এভাবে আবারও তিনি তাঁর সত্যবাদিতার কথা প্রমাণ করলেন।

মসজিদুল হারামের প্রাঙ্গন ও এর বাইরে সর্বত্র নীরবতা বিরাজ করছিল। শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বুকের মধ্যে আটকে গিয়েছিল এবং জনগণের মন-মস্তিষ্কের ওপর বিভিন্ন ধরনের চিন্তা-ভাবনা প্রভাব বিস্তার করেছিল। মক্কাবাসী ঐ মুহূর্তগুলোয় নিজেদের ঐ সকল অন্যায়, অত্যাচার ও শত্রুতামূলক আচরণের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের চিন্তা করছিল।

এখন ঐ গোষ্ঠী,- যারা বহু বার মহানবীর বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ বাঁধিয়ে তাঁর তরুণ অনুসারী ও সাহাবীগণকে হত্যা করেছিল এবং অবশেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, রাতের আঁধারে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাঁকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে,- এখন তারাই তাঁর শক্তিশালী হাতের মুঠোয় বন্দী হয়ে গেছে এবং মহানবীও তাদের ওপর যে কোন ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারেন।

এ লোকগুলো নিজেদের বড় বড় অপরাধের কথা স্মরণ করে পরস্পর বলাবলি করছিল : তিনি অবশ্যই আমাদের সবাইকে হত্যা করবেন বা কিছুসংখ্যক ব্যক্তিকে হত্যা এবং কিছুসংখ্যককে বন্দী করবেন। আর তিনি আমাদের নারী ও শিশুদেরও দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করবেন।”

তাদের বিভিন্ন শয়তানী চিন্তায় ব্যস্ত থাকাকালে হঠাৎ মহানবী (সা.) এ কথার মাধ্যমে সকল নীরবতার অবসান ঘটালেন। তিনি বললেন :ماذا تقولون؟ و ماذا تظنّون؟ তোমাদের বক্তব্য কী? কী ধারণা করছ?

তখন জনগণ হতবাক, অস্থির ও ভীত হয়ে ভাঙা-ভাঙা ও কাঁপা কণ্ঠে মহানবীর সুমহান দয়া, মমত্ববোধ ও আবেগ-অনুভূতির কথা স্মরণ করে বলেছিল : আমরা আপনার ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করা ছাড়া আর কিছুই ভাবছি না। আমরা আপনাকে আমাদের মহান ভাই’ এবং মহান ভাইয়ের সন্তান’ ছাড়া আর কিছুই মনে করি না।” তাদের আবেগপূর্ণ এ কথাগুলোর মুখোমুখি হলে স্বভাবগতভাবেই দয়ালু, ক্ষমাশীল ও উদার মহানবী (সা.) বললেন : আমার ভাই ইউসুফ তাঁর অত্যাচারী ভাইদের যে কথা বলেছিলেন, আমিও তোমাদের সে একই কথা বলব :

) لا تثريب عليكم اليوم يغفر الله لكم و هو أرحم الرّاحمين(

আজকের এ দিনে তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই; মহান আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন এবং তিনি সবচেয়ে দয়ালু।” (সূরা ইউসুফ : ৯২)

মহানবীর কালাম উচ্চারণের আগে যে বিষয়টি মক্কাবাসীদের বেশ আশাবাদী করেছিল, তা ছিল, মক্কা নগরীতে প্রবেশ করার সময় একজন মুসলিম সেনা কর্মকর্তা যে স্লোগানটি দিয়েছিলেন তার প্রতি মহানবী তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। সে সময় ঐ সেনা কর্মকর্তা বলছিলেন :

اليـوم يـوم الـملحـمة

اليـوم تستـحلّ الـحرمة

“আজ যুদ্ধের দিন; আজ তোমাদের জান-মাল হালাল গণ্য হবে (তাদেরকে হত্যা ও তাদের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করা হবে)।” মহানবী (সা.) এ ধরনের কবিতা ও স্লোগান শুনে খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন এবং তিনি ঐ সেনা কর্মকর্তার হাত থেকে পতাকা কেড়ে নিয়ে তাঁকে সেনানায়কের পদ থেকে অপসারণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত আলী (আ.) তাঁর কাছ থেকে পতাকা নেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। আরেকটি বর্ণনা মতে, ঐ সেনা কর্মকর্তার পুত্র তাঁর পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পিতার হাত থেকে পতাকা গ্রহণ করেছিল। এ সেনা কর্মকর্তা ছিলেন খাযরাজ গোত্রপতি সাদ ইবনে উবাদাহ্। এ ধরনের দয়ার্দ্র আচরণ,- তাও আবার মক্কার পরাজিত অধিবাসীদের চোখের সামনে- তাদেরকে মহানবীর পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী করে তুলেছিল। আর সেই মুহূর্তে আবু সুফিয়ান বাইতুল্লাহ্-এ বা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেয়া বা নিজেদের বাড়িতে দরজা বন্ধ করে অবস্থান রত একদল লোককে নিরাপত্তা প্রদানের ঘোষণা করে।৩৫১

মহানবী (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

মহানবী (সা.) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেন : তোমরা, হে লোকসকল! অত্যন্ত অনুপযুক্ত স্বদেশবাসী আমাকে আমার বাস্তুভিটা থেকে বহিষ্কার করেছিলে। তোমরা আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলে। কিন্তু এত অপরাধ সত্বেও তোমাদের আমি ক্ষমা করে দিচ্ছি এবং তোমাদের পা থেকে দাসত্বের শৃঙ্খল আমি খুলে দিচ্ছি ও ঘোষণা করছি :

إذهبوا فأنتم الطّلقاء

-যাও, তোমরা মুক্ত জীবন যাপন কর; কারণ তোমরা সবাই মুক্ত।”৩৫২

হযরত বিলালের আযান

যুহরের নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেল। আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্মের মুয়ায্যিন (বিলাল) পবিত্র কাবার ছাদে উঠে ঐ সাধারণ সমাবেশে সমগ্র জনতার কানে বলিষ্ঠ কণ্ঠে তাওহীদ ও রিসালাতের ধ্বনি পৌঁছে দিলেন। একগুঁয়ে মুশরিকরা সবাই যে যার মতো মন্তব্য করছিল। তাদের একজন বলল : অমুকের জন্য সাধুবাদ; কারণ সে মারা গেছে বলেই তাকে আর আযানের ধ্বনি শুনতে হলো না।” ইত্যবসরে আবু সুফিয়ান বলল : আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলব না। কারণ মুহাম্মদের গোয়েন্দা সংস্থা এত শক্তিশালী যে, আমি ভয় পাচ্ছি মসজিদের এ সব ধূলিকণাও আমাদের কথা-বার্তা তাকে অবগত করবে।”

এ অবিবেচক বৃদ্ধ (আবু সুফিয়ান), জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যার অন্তর ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত ও আলোকিত হয় নি, গায়েবী ইলাহী জগৎ থেকে তথ্য লাভ ও বাস্তবতাসমূহ অবগত হওয়া এবং পার্থিব জগতের অত্যাচারী গুপ্তচরবৃত্তি অভিন্ন বলেই মনে করত এবং এ দু টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেছিল। গায়েবী বিষয়াদি সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর অবগত হওয়া এমন এক বিষয় যা স্বাভাবিক জাগতিকতার গণ্ডির বাইরে। অন্যদিকে গোপন অবস্থা সম্পর্কে রাজনীতিজ্ঞদের অবগতি ভিন্ন একটি বিষয়, যা কোন গোষ্ঠী বা দলকে কাজে লাগিয়ে তারা অর্জন করে থাকে।

মহানবী (সা.) যুহরের নামায আদায় করলেন। অতঃপর উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে পবিত্র কাবার চাবি তাঁকে দিয়ে বললেন : এ পদ তোমাদের বংশের সাথেই সংশ্লিষ্ট এবং তা তোমাদের বংশের জন্যই সংরক্ষিত থাকবে।” মহানবীর কাছ থেকে এ ছাড়া অন্য কিছু আশা করারও ছিল না। ইনি সেই নবী, যিনি মহান আল্লাহর কাছ থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত হন জনগণের মাঝে ঘোষণা করার জন্য :

) إنّ الله يأمركم أن تؤدُّوا الأمانات إلى أهلها(

“নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ তোমাদেরকে প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।” (সূরা নিসা : ৫৮)

এমন নবীই এ ধরনের মহা আমানত উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে ফিরিয়ে দেবার ব্যাপারে অবশ্যই অগ্রগামী হবেন। তিনি কখনই সামরিক ক্ষমতা ও বাহুবলের দ্বারা জনগণের অধিকার পদদলিত করেন না এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জনগণকে বলেন : পবিত্র কাবার চাবি রক্ষণাবেক্ষণ ইবনে তালহার সুনিশ্চিত অধিকার এবং এ ক্ষেত্রে আর কোন ব্যক্তির কোন অধিকার নেই।”

ইত্যবসরে মহানবী (সা.) পবিত্র কাবা সংক্রান্ত সকল পদ বিলুপ্ত করেন। তবে যে সব পদ জনগণের জন্য কল্যাণকর, কেবল সেসব, যেমন পবিত্র কাবার চাবি রক্ষণাবেক্ষণ, পবিত্র কাবার উপর পর্দা বা গিলাফ দেয়া ও হাজীগণকে খাবার পানি সরবরাহ করার পদ ইত্যাদি বহাল রাখেন।

আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর নসীহত

মহানবী (সা.)-এর নিকটাত্মীয়বর্গ যাতে অবগত হন যে, মহানবীর সাথে তাঁদের আত্মীয়তা ও রক্ত-সম্পর্ক তাঁদের কাঁধ থেকে কোন বোঝা তো লাঘব করেই নি; বরং তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে আরো ভারী করেছে, এ কারণেই মহানবী এক ভাষণ দেন, যাতে করে তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, তাঁর সাথে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক যেন ইসলামী রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন অবমাননা ও উপেক্ষা করার কারণ না হয় এবং রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার সুবাদে তাঁরা যেন কোন ধরনের অসৎ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ না করেন। তাই তিনি হাশিম ও আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের এক সমাবেশে যে কোন ধরনের অবৈধ বৈষম্যের তীব্র নিন্দা এবং সমাজের সকল শ্রেণীর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন:

“হে হাশিম ও আবদুল মুত্তালিবের বংশধরগণ! আমি তোমাদের কাছেও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল এবং আমার ও তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও মমতার বন্ধন অটুট। তবে তোমরা ভেবো না যে, কিয়ামত দিবসে কেবল আত্মীয়তার এ সম্পর্ক তোমাদের মুক্তি দিতে সক্ষম। এ কথাটা তোমাদের সবার জানা থাকা উচিত, তোমাদের ও অন্যদের মধ্যে আমার বন্ধু হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে খোদাভীরু এবং যারা কিয়ামত দিবসে ভারী পাপের বোঝা নিয়ে মহান আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে, তাদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে এবং কিয়ামত দিবসে আমার দ্বারা কোন উপকারই সাধিত হবে না। আর আমি ও তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মের জন্য (মহান আল্লাহর কাছে) দায়বদ্ধ (و اَنّ لِى عملى و لكم عملكم )।”৩৫৩

মসজিদুল হারামে মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ

মসজিদুল হারামে বাইতুল্লাহর চারপাশে এক বিশাল ও মহতী গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মুসলমান ও মুশরিক- শত্রু-মিত্র সবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল এবং ইসলাম ধর্মের মহত্ত্ব ও মহানবী (সা.)-এর মহানুভবতা মসজিদুল হারামকে ঘিরে রেখেছিল। সমগ্র মক্কা নগরীর ওপর প্রশান্তির ছায়া বিস্তৃতি লাভ করেছিল। আর তখন মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত দাওয়াতের রূপ জনগণের সামনে উপস্থাপন করারও যথার্থ সময় এসে গিয়েছিল। মহানবী (সা.) যে কথা বিশ বছর আগে বলা শুরু করেছিলেন এবং মুশরিকদের অপকর্ম ও দুর্বৃত্তপনার কারণে তা সম্পাদন করতে সক্ষম হন নি, তা আজ সম্পন্ন করার সময় এসে গেল।

মহানবী (সা.) স্বয়ং ঐ পরিবেশেরই সন্তান ছিলেন এবং আরব সমাজের দুঃখ-বেদনা এবং এর উপশম সম্পর্কে তাঁর পূর্ণ পরিচিতি ও জ্ঞান ছিল। তিনি জানতেন, পবিত্র মক্কার অধিবাসীদের অধঃপতনের কারণ কী? এ কারণেই তিনি আরব সমাজের ব্যথা-বেদনাগুলোর উপর হাত বুলিয়ে এ সব বিরানকারী ব্যাধি পূর্ণরূপে নিরাময়ের সংকল্প ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

এখানে আমরা মহানবীর ভাষণের কতক বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক উপস্থাপন করব। উল্লেখ্য, এ ভাষণের প্রতিটি অংশ (মানব জাতির) এক একটি ব্যাধি নিরাময় করার জন্যই বর্ণিত হয়েছে।

১. বংশ-কৌলিন্যের গর্ব

পরিবার, বংশ ও গোত্র নিয়ে বড়াই করার বিষয়টি আরব সমাজের মৌলিক ও সনাতন ব্যাধিগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরব সমাজে একজন লোকের সবচেয়ে বড় অহংকার ছিল এটাই যে, সে কুরাইশ গোত্রের মতো একটি প্রসিদ্ধ গোত্রোদ্ভূত। মহানবী (সা.) এ কল্পিত মূলনীতিটি ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার জন্য বললেন :

أيّها النّاس إنّ الله قد أذهب عنكم نخوة الجاهلية و تفاخرها بآبائها ألا إنّكم من آدم و آدم من طين ألا أنّ خير عباد الله عبد اتقاه

“হে জনগণ! মহান আল্লাহ্ ইসলাম ধর্মের আলোকে জাহিলী যুগের গর্ব এবং বংশ-গৌরব ও কৌলিন্য তোমাদের মধ্য থেকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। তোমাদের সবাই আদম থেকে এসেছ (সৃষ্ট হয়েছ) এবং তিনিও কাদামাটি থেকে সৃষ্ট হয়েছেন। সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ সেই ব্যক্তি, যে পাপ ও খোদাদ্রোহিতা থেকে বিরত থাকে (মহান আল্লাহকে ভয় করে)।”

ব্যক্তিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি কেবল তাকওয়া, তা জগৎবাসীকে বোঝানোর জন্য ভাষণের এক অংশে মহানবী (সা.) সমগ্র মানব জাতিকে দু শ্রেণীতে ভাগ করেছেন এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও গৌরব ঐ ব্যক্তিদের বলে গণ্য করেছেন যাঁরা মুত্তাকী, পরহেজগার। আর এ শ্রেণীবিন্যাসের দ্বারা তিনি শ্রেষ্ঠত্বের সমুদয় কাল্পনিক মাপকাঠি বাতিল করে দিয়েছেন।

তিনি ভাষণে বলেন :

إنّما النّاس رجلان : مؤمن تقىّ كريم علي الله و فاخر شقىّ هيّن علي الله

“মহান আল্লাহর কাছে মানব জাতি দু শ্রেণীতে বিভক্ত : পরহেজগার মুমিনদের দল- যারা মহান আল্লাহর কাছে সম্মানিত এবং সীমা লঙ্ঘনকারী ও পাপী- যারা মহান আল্লাহর কাছে লাঞ্ছিত।

২. আরব হবার কারণে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব

মহানবী (সা.) জানতেন, এ জাতি আরব হওয়া এবং এ জাতির সাথে সংশ্লিষ্টতা ও সম্পর্ককে নিজেদের অন্যতম গৌরব ও মর্যাদা বলে বিশ্বাস করে। আরব জাতীয়তাবাদের গর্ব এদের হৃদয়গুলোর গভীরে ও রক্ত-মজ্জার মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। তিনি এ ব্যথার উপশম এবং ঠুনকো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার কল্পিত প্রাসাদ ধূলিসাৎ করার জন্য জনগণের দিকে তাকিয়ে বললেন :

ألا أنّ العربيّة ليست ب< اب> والد و لكنها لسان ناطق، فمن قصر عمله لم يبلغ به حسبه

“হে লোকসকল! আরব হওয়া তোমাদের সত্তার অংশ নয়; বরং তা হচ্ছে একটি সাবলীল ভাষা; আর যে কেউ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করার ক্ষেত্রে অবহেলা করবে, বংশ-কৌলিন্য তাকে কোথাও (মর্যাদার অবস্থানে) পৌঁছে দেবে না (এবং তার কর্মের দোষ-ত্রুটি ও অপূর্ণতা পূরণ করে দেবে না)।”

এ কথার চেয়ে অধিকতর বলিষ্ঠ ও সাবলীল বক্তব্য পাওয়া যাবে কি?

৩. সমগ্র জাতির জন্য

মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রকৃত আহবায়ক সমগ্র মানব জাতির ও মানব সমাজের মধ্যেকার সাম্য দৃঢ়ীকরণের লক্ষ্যে বললেন :

إنّ النّاس من عهد آدم إلى يومنا هذا مثل أسنان المشط لا فضل للعربِىّ علي العجمىّ و لا للأحمر علي الأسود إلّا بالتّقوي

“আদম (আ.)-এর যুগ থেকে আমাদের যুগ পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতি চিরুনীর দাঁতগুলোর মতো পরস্পর সমান। অনারবের ওপর আরব জাতির এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া।”

মহানবী (সা.) এ কথার মাধ্যমে পৃথিবীর সকল জাতির মধ্য থেকে সব ধরনের অবৈধ বৈষম্য (শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকাপ্রসূত পার্থক্য) ও সকল সংকীর্ণতাবোধ বিলুপ্ত করে দিয়েছেন এবং যে কাজ মানবাধিকার ঘোষণার সনদপত্র বা মুক্তি ও স্বাধীনতার সনদ অথবা মানব জাতির সাম্যের প্রবক্তারা এত হৈ চৈ করে এবং ঢাক-ঢোল পিটিয়েও যা সমাপ্ত করতে পারে নি, তা তিনি ঐ অতীত যুগে আঞ্জাম দিয়ে গেছেন।

৪. শত বছরব্যাপী যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং পুরনো শত্রুতা

আরব জাতি ও গোত্রগুলো অগণিত গৃহযুদ্ধ ও অবিরাম রক্তপাতের কারণে এক শত্রু মনোভাবাপন্ন জাতিতে পরিণত হয়েছিল এবং সর্বদা তাদের মধ্যে যুদ্ধের দাবানল প্রজ্বলিত হতো। আরব-উপদ্বীপের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর মহানবী (সা.) এ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ও শান্তির জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ রোগের উপশম আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। মহানবী এ সমস্যা সমাধানের উপায় এর মাঝে দেখতে পেলেন যে, তিনি আপামর জনগণের কাছে আহবান জানাবেন যেন তারা জাহিলীয়াতের যুগে যে সব রক্ত ঝরানো হয়েছে ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো (প্রতিশোধ গ্রহণ করা) থেকে বিরত থাকে এবং এভাবে ঐ যুগের সকল বিবাদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘোষণা করে। এর ফলে যে কোন ধরনের রক্তপাত ও হত্যাকাণ্ড- যা শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করে দেয়,- প্রতিহত করা সম্ভব হবে এবং প্রতিশোধ গ্রহণ ও আক্রমণ মোকাবেলা করার ধূয়ো তুলে যে সব আক্রমণ, লুটতরাজ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবার সম্ভাবনা ছিল, সেগুলোর চিন্তাও আরবদের মন-মগজ থেকে বের করে দেয়া সম্ভব হবে।

মহানবী (সা.) এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন করার জন্য ঘোষণা করলেন :

ألا إنّ كلّ مال و مأثرة و دم فِى الجاهليّة تحت قدمىّ هاتين

“আমি জাহিলী যুগের প্রাণ ও ধন-সম্পদ সংক্রান্ত যাবতীয় ঝগড়া-বিবাদ এবং কল্পিত গর্ব আমার এ দুই পদতলে রেখে দিলাম এবং সেসব কিছুকে আমি বিলুপ্ত বলে ঘোষণা করছি।”

৫. ইসলামী ভ্রাতৃত্ব

মহানবী (সা.)-এর ঐ দিনের ভাষণের একটি অংশ মুসলমানদের একতা ও সংহতি এবং পারস্পরিক অধিকারসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। এ সব ইতিবাচক বিষয় বর্ণনা করার ক্ষেত্রে মহানবীর লক্ষ্য ছিল, ইসলাম ধর্মের বাইরে যারা আছে, তারা এ ধরনের একতা ও সৌহার্দ্যবোধ প্রত্যক্ষ করে আন্তরিকতার সাথে ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়বে এবং এ ধর্ম গ্রহণ করবে।

মহানবী (সা.) বললেন :

المسلم أخ المسلم و المسلمون إخوة، و هم يد واحدة علي من سواهم تتكافؤ دمائهم يسعي بذمّتهم أدناهم

“এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই এবং সকল মুসলমান পরস্পর ভাই এবং অমুসলিমদের বিপক্ষে তারা সবাই একটি হাতের মতো (ঐক্যবদ্ধ)। তাদের সবার রক্ত এক সমান (অর্থাৎ তাদের সবার জীবন-পণ এক ও অভিন্ন। তাই কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতে পারবে না), এমনকি মুসলমানদের পক্ষে তাদের মধ্যেকার সবচেয়ে ছোট ব্যক্তিও প্রতিশ্রুতি বা চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে।”৩৫৪

অপরাধীদের গ্রেফতার

এ বিষয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই যে, মহানবী (সা.) করুণা, উদারতা ও ক্ষমার সবচেয়ে বড় নমুনা ছিলেন এবং চরমপন্থী গোষ্ঠী রূঢ় আচরণ প্রকাশ করা সত্বেও তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তবে ঐ উগ্রবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ছিল, যারা অনেক ভয়াবহ অপরাধ করেছিল এবং এতসব ভয়ঙ্কর অপরাধ ও বিপর্যয় সৃষ্টি করার পর তারা যে মুসলমানদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করবে, তা কখনই কল্যাণকর ও বাঞ্ছনীয় ছিল না। কারণ ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষমা ঘোষণার যথেচ্ছ অপব্যবহার করে ইসলামের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক তৎপরতা চালানো হতে পারে।

মুসলমানরা রাস্তা-ঘাটে বা মসজিদুল হারামে এ জঘন্য অপরাধীদের কয়েকজনকে হত্যা করেছিল এবং তাদের মধ্য থেকে দু জন৩৫৫ হযরত আলী (আ.)-এর বোন উম্মে হানীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। আলী (আ.) অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উম্মে হানীর বাড়ি ঘেরাও করে ফেললেন। উম্মে হানী ঘরের দরজা খুললেন এবং একজন অপরিচিত সেনাপতির মুখোমুখি হলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি নিজের পরিচয় প্রদান করলেন এবং বললেন : আমি একজন মুসলিম নারী হিসাবে এ দু ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়েছি। মুসলিম নারীর আশ্রয়দান মুসলিম পুরুষের মতোই সম্মান পাওয়ার যোগ্য।” হযরত আলী এ সময় যুদ্ধের শিরস্ত্রাণ মাথা থেকে উঠিয়ে ফেলেন যাতে উম্মে হানী তাঁকে চিনতে পারেন। বোনের দৃষ্টি তখন ভাইয়ের উপর পড়ল। বহু বছরের ঘটনাবলী এ দু ভাই-বোনকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। সাথে সাথে তাঁর দু চোখ জলে পূর্ণ হয়ে গেল এবং তিনি ভাইয়ের কাঁধের উপর দু হাত রাখলেন। অতঃপর তাঁরা দু জন মহানবী (সা.)-এর কাছে গেলেন এবং মহানবীও এ নারীর প্রতি অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করলেন।

আবদুল্লাহ্ ইবনে সা দ ইবনে আবী সারাহ্, যে প্রথমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং পরে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, সেও ঐ দশ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবে সে হযরত উসমানের সুপারিশ ও মধ্যস্থতায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল।

ইকরামাহ্ ও সাফ্ওয়ানের কাহিনী

বদর যুদ্ধের পরবর্তী যুদ্ধগুলোর অগ্নি প্রজ্বলনকারী ইকরামাহ্ ইবনে আবি জাহল ইয়েমেনে পলায়ন করে। তবে তার স্ত্রীর সুপারিশে সে মুক্তি পেয়েছিল। সাফ্ওয়ান ইবনে উমাইয়্যা বিভিন্ন ধরনের জঘন্য অপরাধ ছাড়াও বদর যুদ্ধে নিহত তার পিতা উমাইয়্যার রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য এক মুসলমানকে মক্কায় প্রকাশ্য দিবালোকে জনতার চোখের সামনে ফাঁসীতে ঝুলিয়েছিল। এ কারণে মহানবী (সা.) তার রক্ত বৈধ ঘোষণা করেন। সে ঐ সময় শাস্তি পাওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে সমুদ্রপথে হিজায থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বিশেষ করে যখন সে জানতে পেরেছিল, ঐ দশ ব্যক্তির তালিকায় তার নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

উমাইর ইবনে ওয়াহাব মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে তার অপরাধ ক্ষমা করে দেয়ার আবেদন জানিয়েছিল। মহানবীও তার আবেদন গ্রহণ করেন এবং মক্কায় প্রবেশকালীন পরিহিত তাঁর পাগড়ী তাকে নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে প্রদান করেন। তিনি ঐ প্রতীক নিয়ে জেদ্দায় যান এবং সাফ্ওয়ানকে সাথে নিয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। মহানবী (সা.)-এর দৃষ্টি যখন যুগের সবচেয়ে বড় অপরাধীর ওপর পড়ল তখন তিনি পূর্ণ মহানুভবতা সহকারে বললেন : তোমার প্রাণ ও ধন-সম্পদ সম্মানিত; তবে তোমার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা হবে উত্তম।” সে তখন দু মাসের সময় চায়, যাতে সে ইসলামের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। মহানবী (সা.) তখন বললেন : আমি তোমাকে দু মাসের স্থলে চার মাসের ফুরসৎ দিচ্ছি এজন্য যে, তুমি পূর্ণ বিচক্ষণতা, জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি সহকারে এ ধর্ম গ্রহণ কর।” চার মাস গত হতে না হতেই সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল।৩৫৬

এ ঘটনা সংক্ষিপ্ত অধ্যয়ন করলে ইসলাম ধর্মের এক অকাট্য বাস্তবতা- যা স্বার্থান্বেষী প্রাচ্যবিদরা দুর্দমনীয়ভাবে অস্বীকার করে থাকে- স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। শিরকের প্রতিভূরা ও মুশরিক নেতারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেছে; আর বাধ্যবাধকতা ও ভীতি প্রদর্শনের তো কোন অস্তিত্বই ছিল না। বরং চেষ্টা করা হয়েছে, সঠিক চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার মাধ্যমেই যেন একমাত্র এ আসমানী ধর্ম গ্রহণ করা হয়।

মক্কা বিজয়ের উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলী বর্ণনা করার আগে এখানে নিম্নোক্ত দু টি আকর্ষণীয় ঘটনার দিকে আমরা ইঙ্গিত করব :

৭ম পাঠ

অনিবার্য অস্তিত্বের প্রমাণকরণ

ভূমিকাঃ

পূর্ববর্তী পাঠে আমরা আলোচনা করেছিলাম যে,ঐশী দার্শনিকগণ এবং কালামশাস্ত্র বিদগণ খোদার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্যে অসংখ্য যুক্তির অবতারণা করেছেন,যা দর্শন ও কালামশাস্ত্রে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আমরা ঐগুলোর মধ্যে যে প্রমাণটি অপেক্ষাকৃত কম ভূমিকার প্রয়োজন এবং সহজবোধ্য সেটিকে নির্বাচন করতঃ তার ব্যাখ্যা প্রদান করব। তবে একথা স্বরণযোগ্য যে,এ প্রমাণটি খোদার অস্তিত্বকে শুধুমাত্র অনিবার্য অস্তিত্ব”শিরোনামে প্রমাণ করে -অর্থাৎ যাঁর অস্তিত্ব অত্যাবশ্যকীয় এবং কোন অস্তিত্ব প্রদানকারীর উপর নির্ভরশীল নয়। অনিবার্য অস্তিত্বকে প্রমাণ করার পর তার হ্যাঁ-বোধক’বৈশিষ্ট্য (صفت الثبوتیة ) ও না-বোধক’বৈশিষ্ট্যকে (صفت السلبیة ) অপর এক যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। হ্যাঁ-বোধক’ বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ হল জ্ঞান,শক্তি ইত্যাদি এবং না-বোধক’বৈশিষ্টের উদাহরণ হল অশরীরীয় হওয়া,নির্দিষ্ট স্থানে ও কালে সীমাবদ্ধ না হওয়া।

প্রমাণের বিষয়বস্তু :

অস্তিত্বশীল বিষয়সমূহ,(বুদ্ধিবৃত্তিক মতে ) হয় অনিবার্য অস্তিত্ব অথবা সম্ভাব্য অস্তিত্ব এবং কোন অস্তিত্বশীল বিষয়ই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এ দু ধারণার বর্হির্ভূত হতে পারে না। সকল অস্তিত্বশীল বিষয়ই সম্ভাব্য অস্তিত্ব হতে পারে না। কেননা,সম্ভাব্য অস্তিত্ব কারণের মুখাপেক্ষী। সুতরাং যদি সমস্ত কারণসমূহ সম্ভাব্য অস্তিত্ব হয়ে থাকে,তবে প্রত্যেকটি কারণকেই অপর এক কারণের মুখাপেক্ষী হতে হবে। ফলে কখনোই কোন অস্তিত্বশীল বিষয় বাস্তব রূপ লাভ করবে না। অন্যভাবে বলা যায়: কারণের ধারাবাহিকতা অসম্ভব। অতএব অস্তিত্বশীল বিষয়সমূহের কারণসমূহ ধারাবাহিকভাবে এমন এক অস্তিত্বশীল বিষয়ে উপনীত হয়,যা স্বয়ং অপর অস্তিশীল বিষয়ের ফলশ্রুতি নয় অর্থাৎ যা হবে অনিবার্য অস্তিত্ব। এ প্রমাণটি খোদার অস্তিত্বের প্রমাণের জন্যে দর্শনের একটি সরলমত প্রমাণ,যা কয়েকটি খাঁটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিজ্ঞা দ্বারা রূপ লাভ করেছে এবং কোন প্রকার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল নয় । তবে যেহেতু এ প্রমাণটিতে দার্শনিক পরিভাষা ও ভাবার্থসমূহ ব্যবহৃত হয়েছে,সেহেতু যে সকল প্রতিজ্ঞা ও পরিভাষার মাধ্যমে,উল্লেখিত প্রমাণটি রূপপরিগ্রহ করেছে তাদের সম্পর্কে আলোকপাত করা অনিবার্য ।

সম্ভাব্যতা অনিবার্যতা :

প্রতিটি প্রতিজ্ঞাই (যতই সরল হোক না কেন) কমপক্ষে দুটি মৌলিক ভাবার্থ যথা : উদ্দেশ্য(موضوع ) ও বিধেয় (محمول ) নিয়ে গঠিত হয়। যেমন : সূর্য্য উজ্জল এ প্রতিজ্ঞাটিতে সূর্য” হল উদ্দেশ্য আর উজ্জ্বল”হল বিধেয় এবং প্রতিজ্ঞাটি সূর্যের জন্যে উজ্জ্বলতাকে প্রতিপাদন করে থাকে।

উদ্দেশ্যের জন্যে বিধেয়ের প্রতিপাদন তিনটি অবস্থার ব্যতিক্রম হতে পারে না। হয় অসম্ভব যেমন : ৪ অপেক্ষা ৩ বড়, অথবা অনিবার্য যেমন : ৪ এর অর্ধেক হল ২” নতুবা অসম্ভব বা অনিবার্য এ দুয়ের কোনটি নয় যেমন : সূর্য আমাদের মাথার উপর অবস্থান করছে ।

যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় উপরোক্ত প্রথম ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞার সস্পর্ককে নিষিদ্ধ (امتناع ),দ্বিতীয়ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞার সস্পর্ককে অনিবার্য (ضرورت ) বা আবশ্যকীয় (وجوب ) তৃতীয় ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞারসস্পর্ককে সম্ভাবনা (امکان ) (বিশেষ অর্থে ) গুণসম্বলিত বলা হয়ে থাকে ।

দর্শনে অস্তিত্বশীল বিষয়’সম্পর্কে আলোচনা করা হয়ে থাকে। যা কিছু নিষিদ্ধ ও অসম্ভব তা কখনোই বাস্তব রূপ লাভ করে না (তাই এ বিষয়ের আলোচনা দর্শনের অন্তর্ভুক্ত হয় না)। ফলে দর্শনশাস্ত্র,অস্তিত্বশীল বিষয়সমূহকে বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তিতে অনিবার্য অস্তিত্ব ও সম্ভাব্য অস্তিত্ব এ দু‘ভাগে বিভক্ত করেছে।

অনিবার্য অস্তিত্ব বলতে বুঝায়,যে অস্তিত্বশীল বিষয় নিজ থেকেই অস্তিত্বশীল এবং তার এ¡অস্তিত্বের জন্যে অপর কোন অস্তিত্বশীল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল নয়। ফলে স্বভাবতঃই এ ধরনের অস্তিত্ব অনাদি ও অনন্ত হবে। কারণ,কোন এক সময় কোন কিছুর অনুপস্থিতির অর্থ হল তার অস্তিত্ব নিজ থেকে নয় এবং অস্তিত্বে আসার জন্যে অপর এমন কোন অস্তিত্বশীলের উপর নির্ভর করতে হয় যে তার উপস্থিতি হল (এর উপস্থিতির জন্যে) শর্ত ও কারণ স্বরূপ;আর তার অনুপস্থিতিতে এর অস্তিত্ব থাকে না।

সম্ভাব্য অস্তিত্ব হল তা,যা নিজ থেকে অস্তিত্বশীল নয় এবং যার অস্তিত্বশীলতার জন্যে অপর কোন অস্তিত্বের উপর নির্ভর করতে হয় ।

অস্তিত্বের এ শ্রেণীবিভাগ বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং সংগত কারণেই তা নিষিদ্ধ অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। তবে বাস্তব অস্তিত্বসমূহ এ দু বিভাগের (অনিবার্য অস্তিত্ব ও সম্ভাব্য অস্তিত্ব )কোনটির অন্তর্ভূক্ত সে সম্পর্কে কোন দিকনির্দেশনা নেই। অন্য কথায়,এ ব্যাপারটিকে তিন ভাবে অনুধাবণ করা যেতে পারে। যথা :

প্রথমতঃ সকল অস্তিত্বই হল অনিবার্য অস্তিত্ব।

দ্বিতীয়তঃ সকল অস্তিত্বই হল সম্ভাব্য অস্তিত্ব।

তৃতীয়তঃ কোন কোনটি হল অনিবার্য অস্তিত্ব আবার কোন কোনটি হল সম্ভাব্য অস্তিত্ব।

প্রথম ও তৃতীয় ধারণায় অনিবার্য অস্তিত্ব’বিদ্যমান। অতএব এ ধারণাটিকেই ( দ্বিতীয়) আলোচনার বিষয়বস্তুরূপে স্থান দিতে হবে যে, সকল অস্তিত্বই কি সম্ভাব্য অস্তিত্ব হওয়া সম্ভব,না কি অসম্ভব’? আর এ ধারণাটির অপনোদনের মাধ্যমেই অনিবার্য অস্তিত্বের’ ধারণা চূড়ান্তরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় যদিও তার একত্ব এবং অন্যান্য গুণকে প্রতিপাদনের জন্যে অন্য কোন প্রমাণের উপর নির্ভর করা আবশ্যক ।

অতএব,দ্বিতীয় ধারণাটিকে পরিত্যাগ করার জন্যে অপর একটি প্রতিজ্ঞাকে উল্লেখিত প্রমাণের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। আর তা হল এই যে, সকল অস্তিত্বই সম্ভাব্য অস্তিত্ব হওয়া অসম্ভব’। তবে এ প্রতিজ্ঞাটি স্বতঃসিদ্ধ নয়। এ কারণে একে নিম্নরূপে প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক :

সম্ভাব্য অস্তিত্ব কারণের উপর নির্ভরশীল এবং কারণের অসীম ধারাবাহিকতা অসম্ভব। অতএব কারণসমূহ তাদের ধারাবাহিকতায় এমন এক অস্তিত্বে গিয়ে পৌঁছতে হবে যা কারণের উপর নির্ভরশীল নয়। আর তা-ই হল অনিবার্য অস্তিত্ব’। সুতরাং সকল অস্তিত্বই সম্ভাব্য অস্তিত্ব নয়। আর এখান থেকেই অপর এক দার্শনিক বিষয়ের সূত্রপাত ঘটে,যার ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন।

কার্য কারণ :

যদি কোন অস্তিত্বশীল বিষয় অপর কোন অস্তিত্বশীল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল হয় এবং তার অস্তিত্ব অপরটির অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে,তবে দর্শনের পরিভাষায় নির্ভরশীল অস্তিত্বকে কার্য (معلول ) এবং অপরটিকে কারণ (علت ) নামকরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু কারণ নিরঙ্কুশভাবে অনির্ভরশীল নাও হতে পারে,বরং কারণ' নিজেও নির্ভরশীল ও অন্য কোন অস্তিত্বশীলের কার্য,হতে পারে। আর যদি কোন কারণের (অপর কোন কারণের উপর) কোন প্রকার নির্ভরশীলতা ও নির্ভরতা না থাকে তবে ঐ কারণকে নিরঙ্কুশ কারণ’এবং সম্পূর্ণরূপে অনির্ভরশীল কারণ’ বলা যেতে পারে।

এ পর্যন্ত আমরা কারণ ও কার্যের দার্শনিক পরিভাষা এবং তাদের সংজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। এখন আমাদেরকে এ প্রতিজ্ঞাটি সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে যে, সকল সম্ভাব্য অস্তিত্বই কারণের উপর নির্ভরশীল

সম্ভাব্য অস্তিত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না’এ বাক্যের আলোকে বলা যায় উহার অস্তিত্ব,অপর কোন অস্তিত্বশীল বিষয় বা বিষয়সমূহের বাস্তব রূপ পরিগ্রহণের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য। কারণ এ উক্তিটি (قضیة ) স্বতঃসিদ্ধ যে,প্রত্যেক বিধেয়ই (محمول ) যা উদ্দেশ্যের (موضوع )জন্যে বিবেচনায় নেয়া হয় তা হয় নিজ থেকেই বিদ্যমান (সত্তাগতভাবে ) অথবা অন্য কোনভাবে (পরগতভাবে) বিদ্যমান। যেমন : কোন বস্তু হয় নিজ থেকেই আলোকিত হয়ে থাকে অথবা অন্য কোন কিছুর আলোর মাধ্যমে আলোকিত হয়ে থাকে। প্রতিটি বস্তুই হয় নিজে থেকেই তৈলাক্ত অথবা অন্য কোন কিছুর (তৈলের ) মাধ্যমে তৈলাক্ত হয়ে থাকে । এটা অসম্ভব যে,কোন কিছু না স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলোকিত বা তৈলাক্ত হবে,না অন্য কিছুর মাধ্যমে যা সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা গুণসম্বলিত;আর এমতাবস্থায় তা তৈলাক্ত বা আলোকিত,এ গুণের অধিকারী হবে ?

অতএব,কোন উদ্দেশ্যের (موضوع ) জন্যে অস্তিত্বের প্রতিপাদন হয়,সত্তাগতভাবে অথবা পরগত ভাবে হয়ে থাকে এবং যখন সত্তাগতভাবে না হয়,তখন পরগতভাবে হওয়া অনিবার্য। ফলে যে সকল সম্ভাব্য অস্তিত্ব স্বয়ংক্রীয়ভাবে অস্তিত্বশীল গুণাবলীতে ভূষিত না হয়,সে সকল অস্তিত্ব অপর কোন অস্তিত্বশীলের সহায়তায় অস্তিত্বে আসে এবং তার কার্য রূপে (معلول ) পরিগণিত হয়।

কিন্তু অনেকের মতে কার্যকারণ বিধির (Causality) প্রকৃত অর্থ হল সকল অস্তিত্বই কারণের উপর নির্ভরশীল,আর এর ভিত্তিতে সমস্যা সৃষ্টি করে থাকেন যে,খোদার জন্যেও কোন কারণকে বিবেচনা করা আবশ্যক তবে তারা এ কথাকে বিস্মৃত হয়েছেন যে,কার্যকারণ বিধির উদ্দেশ্য( موضوع ) নিরঙ্কুশ অস্তিত্ব নয় বরং এর উদ্দেশ্য (موضوع ) হল সম্ভাব্য অস্তিত্ব’ও কার্য। অর্থাৎ সকল নির্ভরশীল বা পরগত অস্তিত্বই কারণের উপর নির্ভরশীল,না সকল অস্তিত্বই।

কারণের অসীম ধারাবাহিকতা অসম্ভব :

এ প্রমাণের জন্যে ব্যবহৃত সর্বশেষ প্রতিজ্ঞাটি হল,কারণের ধারাবাহিকতা এমন এক অস্তিত্বে গিয়ে শেষ হতে বাধ্য যে,ঐ অস্তিত্ব অপর কোন কারণের কার্য (معلول ) নয়। অর্থাৎ পারিভাষিক অর্থে কারণের ধারাবাহিকতা অসীম পর্যন্ত অসম্ভব। আর এ প্রক্রিয়ায় সর্বপথম কারণরূপে অনিবার্য অস্তিত্ব অর্থাৎ যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্তিত্বশীল এবং অপর কোন অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল নয়,তা প্রতিপাদিত হয়ে থাকে ।

দর্শন,কারণের ধারাবাহিকতাকে রহিতকরণের জন্যে একাধিক যুক্তির অবতারণা করেছে। তবে সত্যিকার অর্থে কারণের অসীম ধারাবাহিকতার অসারতা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ এবং কিঞ্চিৎ চিন্তা করলেই সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়। অর্থাৎ কার্যের অস্তিত্ব কারণের উপর নির্ভরশীল এবং উক্ত কারণের শর্তাধীন’যদি এ নিয়মতান্ত্রিকতা সার্বজনীন বলে মনে করা হয়,তবে কখনোই কোন কিছু অস্তিত্ব লাভ করবে না । কারণ,নির্ভরশীল অস্তিত্বের সমষ্টি,অপর কোন অস্তিত্ব অর্থাৎ যার উপর তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে,তা ব্যতীত অস্তিত্বে আসার ধারণা বিবেক সস্পন্ন হতে পারে না।

মনে করা যাক,এক দল দৌড় প্রতিযোগী দৌড় শুরু করার জন্যে প্রারম্ভিক রেখায় প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্ত প্রত্যেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে,যদি তার পরবর্তী ব্যক্তি শুরু না করে তবে সেও শুরু করবে না। যদি তাদের এ সিদ্ধান্ত সার্বজনীন হয়,তবে কখনোই কোন প্রান্ত থেকেই দৌড় প্রতিযোগিতা বাস্তবায়িত হবে না ।

অনুরূপ যদি প্রতিটি অস্তিত্বই অপর অস্তিত্বের শর্তাধীন হয় তবে কখনোই কোন অস্তিত্ব বাস্তবরূপ লাভ করবে না। বাস্তব অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ হল,অনির্ভরশীল ও শর্তহীন অস্তিত্বেরই প্রমাণবাহক।

যুক্তির অবতারণা :

এখন উপরোল্লিখিত প্রতিজ্ঞাসমূহের (مقدمات ) আলোকে যুক্তিটিকে উপস্থাপন করব :

অস্তিত্বশীল বলে পরিগণিত প্রতিটি বিষয়ই নিম্নলিখিত দু অবস্থার বহিঃর্ভূত হতে পারে না : হয় অস্তিত্ব তার জন্যে অনিবার্য এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্তিত্বশীল অর্থাৎ অনিবার্য অস্তিত্ব’অথবা অস্তিত্ব তার জন্যে অনিবার্য নয় এবং অপর কোন অস্তিত্বের মাধ্যমে অস্তিত্বে এসেছে;অর্থাৎ সম্ভাব্য অস্তিত্ব। এটা স্বতঃসিদ্ধ যে,যদি কোন কিছুর অস্তিত্বলাভ অসম্ভব হয়ে থাকে,তবে কখনোই তা অস্তিত্ব লাভ করবে না এবং কোন অবস্থাতেই তা অস্তিত্বশীল বলে পরিগণিত হতে পারে না।

অতএব,সকল অস্তিত্বশীল বিষয়ই (موجود ) হয়, অনিবার্য অস্তিত্ব’হবে অথবা সম্ভাব্য অস্তিত্ব’হবে।

সম্ভাব্য অস্তিত্বের’ভাবার্থের প্রতি নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করলে প্রতীয়মান হয় যে,এ অর্থের যথার্থভাবের অধিকারী সকল কিছুই হল কার্য (معلول ) যেগুলো কারণের উপর নির্ভরশীল। কারণ কোন অস্তিত্বশীল বিষয় যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্তিত্বশীল না হয়ে থাকে,তবে অবশ্যই অপর কোন অস্তিত্বশীলের মাধ্যমে অস্বিত্বে এসেছে। যেমনঃ যদি কোন বৈশিষ্ট্য সত্তাগতভাবে (بالذات ) না হয়ে থাকে,তবে অবশ্যই পরগত ভাবে (بالغیر ) হবে। আর কার্যকারণ বিধির তাৎপর্যও হল তা-ই যে,প্রত্যেক‘নির্ভরশীল অস্তিত্ব’বা সম্ভাব্য অস্তিত্বই’কারণের উপর নির্ভরশীল,না সকল অস্তিত্বই;যাতে বলার অবকাশ থাকবে যে খোদাও কারণের উপর নির্ভরশীল অথবা কারণবিহীন খোদার প্রতি বিশ্বাস সস্থাপন হল কার্যকারণ বিধির পরিপন্থী।

অপরপক্ষে,যদি সকল অস্তিত্বশীলই সম্ভাব্য হয় এবং কারণের উপর নির্ভরশীল হয়,তবে কখনোই কোন অস্তিত্ব বাস্তবরূপ লাভ করবে না। আর এ ধরনের ধারণার দৃষ্টান্ত ঐরূপ যে,কোন দলের সকল সদস্যই অপর সদস্যের শুরু করণের শর্তাধীন এবং ঐ অবস্থায় কোন কিছুই ঘটবে না।

অতএব,বাস্তব অস্তিত্বসমূহের উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে,এক অনিবার্য অস্তিত্বের'(واجب الوجود ) অস্তিত্ব বিদ্যমান।

৭ম পাঠ

অনিবার্য অস্তিত্বের প্রমাণকরণ

ভূমিকাঃ

পূর্ববর্তী পাঠে আমরা আলোচনা করেছিলাম যে,ঐশী দার্শনিকগণ এবং কালামশাস্ত্র বিদগণ খোদার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্যে অসংখ্য যুক্তির অবতারণা করেছেন,যা দর্শন ও কালামশাস্ত্রে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আমরা ঐগুলোর মধ্যে যে প্রমাণটি অপেক্ষাকৃত কম ভূমিকার প্রয়োজন এবং সহজবোধ্য সেটিকে নির্বাচন করতঃ তার ব্যাখ্যা প্রদান করব। তবে একথা স্বরণযোগ্য যে,এ প্রমাণটি খোদার অস্তিত্বকে শুধুমাত্র অনিবার্য অস্তিত্ব”শিরোনামে প্রমাণ করে -অর্থাৎ যাঁর অস্তিত্ব অত্যাবশ্যকীয় এবং কোন অস্তিত্ব প্রদানকারীর উপর নির্ভরশীল নয়। অনিবার্য অস্তিত্বকে প্রমাণ করার পর তার হ্যাঁ-বোধক’বৈশিষ্ট্য (صفت الثبوتیة ) ও না-বোধক’বৈশিষ্ট্যকে (صفت السلبیة ) অপর এক যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। হ্যাঁ-বোধক’ বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ হল জ্ঞান,শক্তি ইত্যাদি এবং না-বোধক’বৈশিষ্টের উদাহরণ হল অশরীরীয় হওয়া,নির্দিষ্ট স্থানে ও কালে সীমাবদ্ধ না হওয়া।

প্রমাণের বিষয়বস্তু :

অস্তিত্বশীল বিষয়সমূহ,(বুদ্ধিবৃত্তিক মতে ) হয় অনিবার্য অস্তিত্ব অথবা সম্ভাব্য অস্তিত্ব এবং কোন অস্তিত্বশীল বিষয়ই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এ দু ধারণার বর্হির্ভূত হতে পারে না। সকল অস্তিত্বশীল বিষয়ই সম্ভাব্য অস্তিত্ব হতে পারে না। কেননা,সম্ভাব্য অস্তিত্ব কারণের মুখাপেক্ষী। সুতরাং যদি সমস্ত কারণসমূহ সম্ভাব্য অস্তিত্ব হয়ে থাকে,তবে প্রত্যেকটি কারণকেই অপর এক কারণের মুখাপেক্ষী হতে হবে। ফলে কখনোই কোন অস্তিত্বশীল বিষয় বাস্তব রূপ লাভ করবে না। অন্যভাবে বলা যায়: কারণের ধারাবাহিকতা অসম্ভব। অতএব অস্তিত্বশীল বিষয়সমূহের কারণসমূহ ধারাবাহিকভাবে এমন এক অস্তিত্বশীল বিষয়ে উপনীত হয়,যা স্বয়ং অপর অস্তিশীল বিষয়ের ফলশ্রুতি নয় অর্থাৎ যা হবে অনিবার্য অস্তিত্ব। এ প্রমাণটি খোদার অস্তিত্বের প্রমাণের জন্যে দর্শনের একটি সরলমত প্রমাণ,যা কয়েকটি খাঁটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিজ্ঞা দ্বারা রূপ লাভ করেছে এবং কোন প্রকার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল নয় । তবে যেহেতু এ প্রমাণটিতে দার্শনিক পরিভাষা ও ভাবার্থসমূহ ব্যবহৃত হয়েছে,সেহেতু যে সকল প্রতিজ্ঞা ও পরিভাষার মাধ্যমে,উল্লেখিত প্রমাণটি রূপপরিগ্রহ করেছে তাদের সম্পর্কে আলোকপাত করা অনিবার্য ।

সম্ভাব্যতা অনিবার্যতা :

প্রতিটি প্রতিজ্ঞাই (যতই সরল হোক না কেন) কমপক্ষে দুটি মৌলিক ভাবার্থ যথা : উদ্দেশ্য(موضوع ) ও বিধেয় (محمول ) নিয়ে গঠিত হয়। যেমন : সূর্য্য উজ্জল এ প্রতিজ্ঞাটিতে সূর্য” হল উদ্দেশ্য আর উজ্জ্বল”হল বিধেয় এবং প্রতিজ্ঞাটি সূর্যের জন্যে উজ্জ্বলতাকে প্রতিপাদন করে থাকে।

উদ্দেশ্যের জন্যে বিধেয়ের প্রতিপাদন তিনটি অবস্থার ব্যতিক্রম হতে পারে না। হয় অসম্ভব যেমন : ৪ অপেক্ষা ৩ বড়, অথবা অনিবার্য যেমন : ৪ এর অর্ধেক হল ২” নতুবা অসম্ভব বা অনিবার্য এ দুয়ের কোনটি নয় যেমন : সূর্য আমাদের মাথার উপর অবস্থান করছে ।

যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় উপরোক্ত প্রথম ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞার সস্পর্ককে নিষিদ্ধ (امتناع ),দ্বিতীয়ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞার সস্পর্ককে অনিবার্য (ضرورت ) বা আবশ্যকীয় (وجوب ) তৃতীয় ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞারসস্পর্ককে সম্ভাবনা (امکان ) (বিশেষ অর্থে ) গুণসম্বলিত বলা হয়ে থাকে ।

দর্শনে অস্তিত্বশীল বিষয়’সম্পর্কে আলোচনা করা হয়ে থাকে। যা কিছু নিষিদ্ধ ও অসম্ভব তা কখনোই বাস্তব রূপ লাভ করে না (তাই এ বিষয়ের আলোচনা দর্শনের অন্তর্ভুক্ত হয় না)। ফলে দর্শনশাস্ত্র,অস্তিত্বশীল বিষয়সমূহকে বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তিতে অনিবার্য অস্তিত্ব ও সম্ভাব্য অস্তিত্ব এ দু‘ভাগে বিভক্ত করেছে।

অনিবার্য অস্তিত্ব বলতে বুঝায়,যে অস্তিত্বশীল বিষয় নিজ থেকেই অস্তিত্বশীল এবং তার এ¡অস্তিত্বের জন্যে অপর কোন অস্তিত্বশীল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল নয়। ফলে স্বভাবতঃই এ ধরনের অস্তিত্ব অনাদি ও অনন্ত হবে। কারণ,কোন এক সময় কোন কিছুর অনুপস্থিতির অর্থ হল তার অস্তিত্ব নিজ থেকে নয় এবং অস্তিত্বে আসার জন্যে অপর এমন কোন অস্তিত্বশীলের উপর নির্ভর করতে হয় যে তার উপস্থিতি হল (এর উপস্থিতির জন্যে) শর্ত ও কারণ স্বরূপ;আর তার অনুপস্থিতিতে এর অস্তিত্ব থাকে না।

সম্ভাব্য অস্তিত্ব হল তা,যা নিজ থেকে অস্তিত্বশীল নয় এবং যার অস্তিত্বশীলতার জন্যে অপর কোন অস্তিত্বের উপর নির্ভর করতে হয় ।

অস্তিত্বের এ শ্রেণীবিভাগ বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং সংগত কারণেই তা নিষিদ্ধ অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। তবে বাস্তব অস্তিত্বসমূহ এ দু বিভাগের (অনিবার্য অস্তিত্ব ও সম্ভাব্য অস্তিত্ব )কোনটির অন্তর্ভূক্ত সে সম্পর্কে কোন দিকনির্দেশনা নেই। অন্য কথায়,এ ব্যাপারটিকে তিন ভাবে অনুধাবণ করা যেতে পারে। যথা :

প্রথমতঃ সকল অস্তিত্বই হল অনিবার্য অস্তিত্ব।

দ্বিতীয়তঃ সকল অস্তিত্বই হল সম্ভাব্য অস্তিত্ব।

তৃতীয়তঃ কোন কোনটি হল অনিবার্য অস্তিত্ব আবার কোন কোনটি হল সম্ভাব্য অস্তিত্ব।

প্রথম ও তৃতীয় ধারণায় অনিবার্য অস্তিত্ব’বিদ্যমান। অতএব এ ধারণাটিকেই ( দ্বিতীয়) আলোচনার বিষয়বস্তুরূপে স্থান দিতে হবে যে, সকল অস্তিত্বই কি সম্ভাব্য অস্তিত্ব হওয়া সম্ভব,না কি অসম্ভব’? আর এ ধারণাটির অপনোদনের মাধ্যমেই অনিবার্য অস্তিত্বের’ ধারণা চূড়ান্তরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় যদিও তার একত্ব এবং অন্যান্য গুণকে প্রতিপাদনের জন্যে অন্য কোন প্রমাণের উপর নির্ভর করা আবশ্যক ।

অতএব,দ্বিতীয় ধারণাটিকে পরিত্যাগ করার জন্যে অপর একটি প্রতিজ্ঞাকে উল্লেখিত প্রমাণের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। আর তা হল এই যে, সকল অস্তিত্বই সম্ভাব্য অস্তিত্ব হওয়া অসম্ভব’। তবে এ প্রতিজ্ঞাটি স্বতঃসিদ্ধ নয়। এ কারণে একে নিম্নরূপে প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক :

সম্ভাব্য অস্তিত্ব কারণের উপর নির্ভরশীল এবং কারণের অসীম ধারাবাহিকতা অসম্ভব। অতএব কারণসমূহ তাদের ধারাবাহিকতায় এমন এক অস্তিত্বে গিয়ে পৌঁছতে হবে যা কারণের উপর নির্ভরশীল নয়। আর তা-ই হল অনিবার্য অস্তিত্ব’। সুতরাং সকল অস্তিত্বই সম্ভাব্য অস্তিত্ব নয়। আর এখান থেকেই অপর এক দার্শনিক বিষয়ের সূত্রপাত ঘটে,যার ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন।

কার্য কারণ :

যদি কোন অস্তিত্বশীল বিষয় অপর কোন অস্তিত্বশীল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল হয় এবং তার অস্তিত্ব অপরটির অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে,তবে দর্শনের পরিভাষায় নির্ভরশীল অস্তিত্বকে কার্য (معلول ) এবং অপরটিকে কারণ (علت ) নামকরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু কারণ নিরঙ্কুশভাবে অনির্ভরশীল নাও হতে পারে,বরং কারণ' নিজেও নির্ভরশীল ও অন্য কোন অস্তিত্বশীলের কার্য,হতে পারে। আর যদি কোন কারণের (অপর কোন কারণের উপর) কোন প্রকার নির্ভরশীলতা ও নির্ভরতা না থাকে তবে ঐ কারণকে নিরঙ্কুশ কারণ’এবং সম্পূর্ণরূপে অনির্ভরশীল কারণ’ বলা যেতে পারে।

এ পর্যন্ত আমরা কারণ ও কার্যের দার্শনিক পরিভাষা এবং তাদের সংজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। এখন আমাদেরকে এ প্রতিজ্ঞাটি সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে যে, সকল সম্ভাব্য অস্তিত্বই কারণের উপর নির্ভরশীল

সম্ভাব্য অস্তিত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না’এ বাক্যের আলোকে বলা যায় উহার অস্তিত্ব,অপর কোন অস্তিত্বশীল বিষয় বা বিষয়সমূহের বাস্তব রূপ পরিগ্রহণের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য। কারণ এ উক্তিটি (قضیة ) স্বতঃসিদ্ধ যে,প্রত্যেক বিধেয়ই (محمول ) যা উদ্দেশ্যের (موضوع )জন্যে বিবেচনায় নেয়া হয় তা হয় নিজ থেকেই বিদ্যমান (সত্তাগতভাবে ) অথবা অন্য কোনভাবে (পরগতভাবে) বিদ্যমান। যেমন : কোন বস্তু হয় নিজ থেকেই আলোকিত হয়ে থাকে অথবা অন্য কোন কিছুর আলোর মাধ্যমে আলোকিত হয়ে থাকে। প্রতিটি বস্তুই হয় নিজে থেকেই তৈলাক্ত অথবা অন্য কোন কিছুর (তৈলের ) মাধ্যমে তৈলাক্ত হয়ে থাকে । এটা অসম্ভব যে,কোন কিছু না স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলোকিত বা তৈলাক্ত হবে,না অন্য কিছুর মাধ্যমে যা সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা গুণসম্বলিত;আর এমতাবস্থায় তা তৈলাক্ত বা আলোকিত,এ গুণের অধিকারী হবে ?

অতএব,কোন উদ্দেশ্যের (موضوع ) জন্যে অস্তিত্বের প্রতিপাদন হয়,সত্তাগতভাবে অথবা পরগত ভাবে হয়ে থাকে এবং যখন সত্তাগতভাবে না হয়,তখন পরগতভাবে হওয়া অনিবার্য। ফলে যে সকল সম্ভাব্য অস্তিত্ব স্বয়ংক্রীয়ভাবে অস্তিত্বশীল গুণাবলীতে ভূষিত না হয়,সে সকল অস্তিত্ব অপর কোন অস্তিত্বশীলের সহায়তায় অস্তিত্বে আসে এবং তার কার্য রূপে (معلول ) পরিগণিত হয়।

কিন্তু অনেকের মতে কার্যকারণ বিধির (Causality) প্রকৃত অর্থ হল সকল অস্তিত্বই কারণের উপর নির্ভরশীল,আর এর ভিত্তিতে সমস্যা সৃষ্টি করে থাকেন যে,খোদার জন্যেও কোন কারণকে বিবেচনা করা আবশ্যক তবে তারা এ কথাকে বিস্মৃত হয়েছেন যে,কার্যকারণ বিধির উদ্দেশ্য( موضوع ) নিরঙ্কুশ অস্তিত্ব নয় বরং এর উদ্দেশ্য (موضوع ) হল সম্ভাব্য অস্তিত্ব’ও কার্য। অর্থাৎ সকল নির্ভরশীল বা পরগত অস্তিত্বই কারণের উপর নির্ভরশীল,না সকল অস্তিত্বই।

কারণের অসীম ধারাবাহিকতা অসম্ভব :

এ প্রমাণের জন্যে ব্যবহৃত সর্বশেষ প্রতিজ্ঞাটি হল,কারণের ধারাবাহিকতা এমন এক অস্তিত্বে গিয়ে শেষ হতে বাধ্য যে,ঐ অস্তিত্ব অপর কোন কারণের কার্য (معلول ) নয়। অর্থাৎ পারিভাষিক অর্থে কারণের ধারাবাহিকতা অসীম পর্যন্ত অসম্ভব। আর এ প্রক্রিয়ায় সর্বপথম কারণরূপে অনিবার্য অস্তিত্ব অর্থাৎ যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্তিত্বশীল এবং অপর কোন অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল নয়,তা প্রতিপাদিত হয়ে থাকে ।

দর্শন,কারণের ধারাবাহিকতাকে রহিতকরণের জন্যে একাধিক যুক্তির অবতারণা করেছে। তবে সত্যিকার অর্থে কারণের অসীম ধারাবাহিকতার অসারতা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ এবং কিঞ্চিৎ চিন্তা করলেই সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়। অর্থাৎ কার্যের অস্তিত্ব কারণের উপর নির্ভরশীল এবং উক্ত কারণের শর্তাধীন’যদি এ নিয়মতান্ত্রিকতা সার্বজনীন বলে মনে করা হয়,তবে কখনোই কোন কিছু অস্তিত্ব লাভ করবে না । কারণ,নির্ভরশীল অস্তিত্বের সমষ্টি,অপর কোন অস্তিত্ব অর্থাৎ যার উপর তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে,তা ব্যতীত অস্তিত্বে আসার ধারণা বিবেক সস্পন্ন হতে পারে না।

মনে করা যাক,এক দল দৌড় প্রতিযোগী দৌড় শুরু করার জন্যে প্রারম্ভিক রেখায় প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্ত প্রত্যেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে,যদি তার পরবর্তী ব্যক্তি শুরু না করে তবে সেও শুরু করবে না। যদি তাদের এ সিদ্ধান্ত সার্বজনীন হয়,তবে কখনোই কোন প্রান্ত থেকেই দৌড় প্রতিযোগিতা বাস্তবায়িত হবে না ।

অনুরূপ যদি প্রতিটি অস্তিত্বই অপর অস্তিত্বের শর্তাধীন হয় তবে কখনোই কোন অস্তিত্ব বাস্তবরূপ লাভ করবে না। বাস্তব অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ হল,অনির্ভরশীল ও শর্তহীন অস্তিত্বেরই প্রমাণবাহক।

যুক্তির অবতারণা :

এখন উপরোল্লিখিত প্রতিজ্ঞাসমূহের (مقدمات ) আলোকে যুক্তিটিকে উপস্থাপন করব :

অস্তিত্বশীল বলে পরিগণিত প্রতিটি বিষয়ই নিম্নলিখিত দু অবস্থার বহিঃর্ভূত হতে পারে না : হয় অস্তিত্ব তার জন্যে অনিবার্য এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্তিত্বশীল অর্থাৎ অনিবার্য অস্তিত্ব’অথবা অস্তিত্ব তার জন্যে অনিবার্য নয় এবং অপর কোন অস্তিত্বের মাধ্যমে অস্তিত্বে এসেছে;অর্থাৎ সম্ভাব্য অস্তিত্ব। এটা স্বতঃসিদ্ধ যে,যদি কোন কিছুর অস্তিত্বলাভ অসম্ভব হয়ে থাকে,তবে কখনোই তা অস্তিত্ব লাভ করবে না এবং কোন অবস্থাতেই তা অস্তিত্বশীল বলে পরিগণিত হতে পারে না।

অতএব,সকল অস্তিত্বশীল বিষয়ই (موجود ) হয়, অনিবার্য অস্তিত্ব’হবে অথবা সম্ভাব্য অস্তিত্ব’হবে।

সম্ভাব্য অস্তিত্বের’ভাবার্থের প্রতি নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করলে প্রতীয়মান হয় যে,এ অর্থের যথার্থভাবের অধিকারী সকল কিছুই হল কার্য (معلول ) যেগুলো কারণের উপর নির্ভরশীল। কারণ কোন অস্তিত্বশীল বিষয় যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্তিত্বশীল না হয়ে থাকে,তবে অবশ্যই অপর কোন অস্তিত্বশীলের মাধ্যমে অস্বিত্বে এসেছে। যেমনঃ যদি কোন বৈশিষ্ট্য সত্তাগতভাবে (بالذات ) না হয়ে থাকে,তবে অবশ্যই পরগত ভাবে (بالغیر ) হবে। আর কার্যকারণ বিধির তাৎপর্যও হল তা-ই যে,প্রত্যেক‘নির্ভরশীল অস্তিত্ব’বা সম্ভাব্য অস্তিত্বই’কারণের উপর নির্ভরশীল,না সকল অস্তিত্বই;যাতে বলার অবকাশ থাকবে যে খোদাও কারণের উপর নির্ভরশীল অথবা কারণবিহীন খোদার প্রতি বিশ্বাস সস্থাপন হল কার্যকারণ বিধির পরিপন্থী।

অপরপক্ষে,যদি সকল অস্তিত্বশীলই সম্ভাব্য হয় এবং কারণের উপর নির্ভরশীল হয়,তবে কখনোই কোন অস্তিত্ব বাস্তবরূপ লাভ করবে না। আর এ ধরনের ধারণার দৃষ্টান্ত ঐরূপ যে,কোন দলের সকল সদস্যই অপর সদস্যের শুরু করণের শর্তাধীন এবং ঐ অবস্থায় কোন কিছুই ঘটবে না।

অতএব,বাস্তব অস্তিত্বসমূহের উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে,এক অনিবার্য অস্তিত্বের'(واجب الوجود ) অস্তিত্ব বিদ্যমান।


11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53