চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড3%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 238 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 81659 / ডাউনলোড: 7492
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

মহানবী (সা.)-এর কাঁধে হযরত আলী (আ.)

মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ বলেন : পবিত্র কাবার ভেতরে বা বাইরে স্থাপিত কিছু প্রতিমা হযরত আলী (আ.) ধ্বংস করেছিলেন। মহানবী (সা.) হযরত আলীকে বললেন : আলী! তুমি বসে পড়, আমি তোমার কাঁধে উঠে প্রতিমাগুলো ধ্বংস করব।” হযরত আলী (আ.) পবিত্র কাবার প্রাচীরের পাশে মহানবীকে নিজ কাঁধে উঠালেন। কিন্তু তিনি বেশ ভার ও দুর্বলতা অনুভব করতে লাগলেন। তখন মহানবী হযরত আলীর অবস্থা বুঝতে পেরে তাঁকে কাঁধে উঠার নির্দেশ দিলেন। হযরত আলী মহানবীর কাঁধে উঠলেন এবং তামা দিয়ে নির্মিত কুরাইশদের সর্ববৃহৎ মূর্তি মাটিতে নিক্ষেপ করলেন। এরপর তিনি অন্যান্য মূর্তিও মাটির উপর ফেলতে লাগলেন।৩৫০

হিজরী নবম শতকের কবিদের অন্তর্ভুক্ত হিল্লার সুবক্তা কবি ইবনে আরান্দাস এ ফযীলত প্রসঙ্গে এক কাসীদায় বলেছেন :

وَ صُعُوْدُ غَارِبِ أَحْمَدَ فَضْلٌ لَهُ

دُوْنَ الْقَرَابَةِ وَ الصَّحَابَةِ أَفْضَلَا

“আহমদের কাঁধের উপর আরোহণ তাঁর (আলীর) একটি ফযীলত। আর এ ফযীলত (মহানবীর সাথে) তাঁর আত্মীয়তা ও সাহচর্য অপেক্ষাও শ্রেয়।”

মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে পবিত্র কাবার দরজা খোলা হলো। তখন তিনি কাবার দরজার উপর হাত রেখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং জনতা তাঁর উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় পবিত্র মুখমণ্ডলের দিকে তাকাচ্ছিল। ঐ অবস্থায় জনগণের দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি বললেন :

الحمد لله الذى صدق وعده و نصر عبده و هزم الأحزاب وحده

“ঐ মহান আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা, যিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছেন, নিজ বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং নিজেই সকল দল ও গোষ্ঠীকে পরাজিত করেছেন।”

মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনের একখানা আয়াতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি মহানবীকে তাঁর আপন মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন। এ আয়াত হলো :

) إنّ الّذى فرض عليك القرآن لرادّك إلى معاد(

“যিনি আপনার ওপর এ কুরআনের বিধান পাঠিয়েছেন (এবং এ কুরআন প্রচার করতে গিয়ে আপনি নিজ দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন), তিনিই আপনাকে মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন। (সূরা কাসাস : ৮৫)

‘মহান আল্লাহ্ নিজ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন’- এ কথা বলার মাধ্যমে মহানবী (সা.) এ গায়েবী প্রতিশ্রুতি যে বাস্তবায়িত হয়েছে, সে ব্যাপারে সবাইকে অবগত করলেন। এভাবে আবারও তিনি তাঁর সত্যবাদিতার কথা প্রমাণ করলেন।

মসজিদুল হারামের প্রাঙ্গন ও এর বাইরে সর্বত্র নীরবতা বিরাজ করছিল। শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বুকের মধ্যে আটকে গিয়েছিল এবং জনগণের মন-মস্তিষ্কের ওপর বিভিন্ন ধরনের চিন্তা-ভাবনা প্রভাব বিস্তার করেছিল। মক্কাবাসী ঐ মুহূর্তগুলোয় নিজেদের ঐ সকল অন্যায়, অত্যাচার ও শত্রুতামূলক আচরণের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের চিন্তা করছিল।

এখন ঐ গোষ্ঠী,- যারা বহু বার মহানবীর বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ বাঁধিয়ে তাঁর তরুণ অনুসারী ও সাহাবীগণকে হত্যা করেছিল এবং অবশেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, রাতের আঁধারে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাঁকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে,- এখন তারাই তাঁর শক্তিশালী হাতের মুঠোয় বন্দী হয়ে গেছে এবং মহানবীও তাদের ওপর যে কোন ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারেন।

এ লোকগুলো নিজেদের বড় বড় অপরাধের কথা স্মরণ করে পরস্পর বলাবলি করছিল : তিনি অবশ্যই আমাদের সবাইকে হত্যা করবেন বা কিছুসংখ্যক ব্যক্তিকে হত্যা এবং কিছুসংখ্যককে বন্দী করবেন। আর তিনি আমাদের নারী ও শিশুদেরও দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করবেন।”

তাদের বিভিন্ন শয়তানী চিন্তায় ব্যস্ত থাকাকালে হঠাৎ মহানবী (সা.) এ কথার মাধ্যমে সকল নীরবতার অবসান ঘটালেন। তিনি বললেন :ماذا تقولون؟ و ماذا تظنّون؟ তোমাদের বক্তব্য কী? কী ধারণা করছ?

তখন জনগণ হতবাক, অস্থির ও ভীত হয়ে ভাঙা-ভাঙা ও কাঁপা কণ্ঠে মহানবীর সুমহান দয়া, মমত্ববোধ ও আবেগ-অনুভূতির কথা স্মরণ করে বলেছিল : আমরা আপনার ব্যাপারে ভালো ধারণা পোষণ করা ছাড়া আর কিছুই ভাবছি না। আমরা আপনাকে আমাদের মহান ভাই’ এবং মহান ভাইয়ের সন্তান’ ছাড়া আর কিছুই মনে করি না।” তাদের আবেগপূর্ণ এ কথাগুলোর মুখোমুখি হলে স্বভাবগতভাবেই দয়ালু, ক্ষমাশীল ও উদার মহানবী (সা.) বললেন : আমার ভাই ইউসুফ তাঁর অত্যাচারী ভাইদের যে কথা বলেছিলেন, আমিও তোমাদের সে একই কথা বলব :

) لا تثريب عليكم اليوم يغفر الله لكم و هو أرحم الرّاحمين(

আজকের এ দিনে তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই; মহান আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন এবং তিনি সবচেয়ে দয়ালু।” (সূরা ইউসুফ : ৯২)

মহানবীর কালাম উচ্চারণের আগে যে বিষয়টি মক্কাবাসীদের বেশ আশাবাদী করেছিল, তা ছিল, মক্কা নগরীতে প্রবেশ করার সময় একজন মুসলিম সেনা কর্মকর্তা যে স্লোগানটি দিয়েছিলেন তার প্রতি মহানবী তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। সে সময় ঐ সেনা কর্মকর্তা বলছিলেন :

اليـوم يـوم الـملحـمة

اليـوم تستـحلّ الـحرمة

“আজ যুদ্ধের দিন; আজ তোমাদের জান-মাল হালাল গণ্য হবে (তাদেরকে হত্যা ও তাদের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করা হবে)।” মহানবী (সা.) এ ধরনের কবিতা ও স্লোগান শুনে খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন এবং তিনি ঐ সেনা কর্মকর্তার হাত থেকে পতাকা কেড়ে নিয়ে তাঁকে সেনানায়কের পদ থেকে অপসারণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত আলী (আ.) তাঁর কাছ থেকে পতাকা নেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। আরেকটি বর্ণনা মতে, ঐ সেনা কর্মকর্তার পুত্র তাঁর পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পিতার হাত থেকে পতাকা গ্রহণ করেছিল। এ সেনা কর্মকর্তা ছিলেন খাযরাজ গোত্রপতি সাদ ইবনে উবাদাহ্। এ ধরনের দয়ার্দ্র আচরণ,- তাও আবার মক্কার পরাজিত অধিবাসীদের চোখের সামনে- তাদেরকে মহানবীর পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী করে তুলেছিল। আর সেই মুহূর্তে আবু সুফিয়ান বাইতুল্লাহ্-এ বা আবু সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেয়া বা নিজেদের বাড়িতে দরজা বন্ধ করে অবস্থান রত একদল লোককে নিরাপত্তা প্রদানের ঘোষণা করে।৩৫১

মহানবী (সা.)-এর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

মহানবী (সা.) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বলেন : তোমরা, হে লোকসকল! অত্যন্ত অনুপযুক্ত স্বদেশবাসী আমাকে আমার বাস্তুভিটা থেকে বহিষ্কার করেছিলে। তোমরা আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলে। কিন্তু এত অপরাধ সত্বেও তোমাদের আমি ক্ষমা করে দিচ্ছি এবং তোমাদের পা থেকে দাসত্বের শৃঙ্খল আমি খুলে দিচ্ছি ও ঘোষণা করছি :

إذهبوا فأنتم الطّلقاء

-যাও, তোমরা মুক্ত জীবন যাপন কর; কারণ তোমরা সবাই মুক্ত।”৩৫২

হযরত বিলালের আযান

যুহরের নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেল। আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্মের মুয়ায্যিন (বিলাল) পবিত্র কাবার ছাদে উঠে ঐ সাধারণ সমাবেশে সমগ্র জনতার কানে বলিষ্ঠ কণ্ঠে তাওহীদ ও রিসালাতের ধ্বনি পৌঁছে দিলেন। একগুঁয়ে মুশরিকরা সবাই যে যার মতো মন্তব্য করছিল। তাদের একজন বলল : অমুকের জন্য সাধুবাদ; কারণ সে মারা গেছে বলেই তাকে আর আযানের ধ্বনি শুনতে হলো না।” ইত্যবসরে আবু সুফিয়ান বলল : আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলব না। কারণ মুহাম্মদের গোয়েন্দা সংস্থা এত শক্তিশালী যে, আমি ভয় পাচ্ছি মসজিদের এ সব ধূলিকণাও আমাদের কথা-বার্তা তাকে অবগত করবে।”

এ অবিবেচক বৃদ্ধ (আবু সুফিয়ান), জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যার অন্তর ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত ও আলোকিত হয় নি, গায়েবী ইলাহী জগৎ থেকে তথ্য লাভ ও বাস্তবতাসমূহ অবগত হওয়া এবং পার্থিব জগতের অত্যাচারী গুপ্তচরবৃত্তি অভিন্ন বলেই মনে করত এবং এ দু টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেছিল। গায়েবী বিষয়াদি সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর অবগত হওয়া এমন এক বিষয় যা স্বাভাবিক জাগতিকতার গণ্ডির বাইরে। অন্যদিকে গোপন অবস্থা সম্পর্কে রাজনীতিজ্ঞদের অবগতি ভিন্ন একটি বিষয়, যা কোন গোষ্ঠী বা দলকে কাজে লাগিয়ে তারা অর্জন করে থাকে।

মহানবী (সা.) যুহরের নামায আদায় করলেন। অতঃপর উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে পবিত্র কাবার চাবি তাঁকে দিয়ে বললেন : এ পদ তোমাদের বংশের সাথেই সংশ্লিষ্ট এবং তা তোমাদের বংশের জন্যই সংরক্ষিত থাকবে।” মহানবীর কাছ থেকে এ ছাড়া অন্য কিছু আশা করারও ছিল না। ইনি সেই নবী, যিনি মহান আল্লাহর কাছ থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত হন জনগণের মাঝে ঘোষণা করার জন্য :

) إنّ الله يأمركم أن تؤدُّوا الأمانات إلى أهلها(

“নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ তোমাদেরকে প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।” (সূরা নিসা : ৫৮)

এমন নবীই এ ধরনের মহা আমানত উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে ফিরিয়ে দেবার ব্যাপারে অবশ্যই অগ্রগামী হবেন। তিনি কখনই সামরিক ক্ষমতা ও বাহুবলের দ্বারা জনগণের অধিকার পদদলিত করেন না এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জনগণকে বলেন : পবিত্র কাবার চাবি রক্ষণাবেক্ষণ ইবনে তালহার সুনিশ্চিত অধিকার এবং এ ক্ষেত্রে আর কোন ব্যক্তির কোন অধিকার নেই।”

ইত্যবসরে মহানবী (সা.) পবিত্র কাবা সংক্রান্ত সকল পদ বিলুপ্ত করেন। তবে যে সব পদ জনগণের জন্য কল্যাণকর, কেবল সেসব, যেমন পবিত্র কাবার চাবি রক্ষণাবেক্ষণ, পবিত্র কাবার উপর পর্দা বা গিলাফ দেয়া ও হাজীগণকে খাবার পানি সরবরাহ করার পদ ইত্যাদি বহাল রাখেন।

আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি মহানবী (সা.)-এর নসীহত

মহানবী (সা.)-এর নিকটাত্মীয়বর্গ যাতে অবগত হন যে, মহানবীর সাথে তাঁদের আত্মীয়তা ও রক্ত-সম্পর্ক তাঁদের কাঁধ থেকে কোন বোঝা তো লাঘব করেই নি; বরং তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে আরো ভারী করেছে, এ কারণেই মহানবী এক ভাষণ দেন, যাতে করে তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, তাঁর সাথে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক যেন ইসলামী রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন অবমাননা ও উপেক্ষা করার কারণ না হয় এবং রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার সুবাদে তাঁরা যেন কোন ধরনের অসৎ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ না করেন। তাই তিনি হাশিম ও আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের এক সমাবেশে যে কোন ধরনের অবৈধ বৈষম্যের তীব্র নিন্দা এবং সমাজের সকল শ্রেণীর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন:

“হে হাশিম ও আবদুল মুত্তালিবের বংশধরগণ! আমি তোমাদের কাছেও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল এবং আমার ও তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও মমতার বন্ধন অটুট। তবে তোমরা ভেবো না যে, কিয়ামত দিবসে কেবল আত্মীয়তার এ সম্পর্ক তোমাদের মুক্তি দিতে সক্ষম। এ কথাটা তোমাদের সবার জানা থাকা উচিত, তোমাদের ও অন্যদের মধ্যে আমার বন্ধু হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে খোদাভীরু এবং যারা কিয়ামত দিবসে ভারী পাপের বোঝা নিয়ে মহান আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে, তাদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে এবং কিয়ামত দিবসে আমার দ্বারা কোন উপকারই সাধিত হবে না। আর আমি ও তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মের জন্য (মহান আল্লাহর কাছে) দায়বদ্ধ (و اَنّ لِى عملى و لكم عملكم )।”৩৫৩

মসজিদুল হারামে মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ

মসজিদুল হারামে বাইতুল্লাহর চারপাশে এক বিশাল ও মহতী গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মুসলমান ও মুশরিক- শত্রু-মিত্র সবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল এবং ইসলাম ধর্মের মহত্ত্ব ও মহানবী (সা.)-এর মহানুভবতা মসজিদুল হারামকে ঘিরে রেখেছিল। সমগ্র মক্কা নগরীর ওপর প্রশান্তির ছায়া বিস্তৃতি লাভ করেছিল। আর তখন মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত দাওয়াতের রূপ জনগণের সামনে উপস্থাপন করারও যথার্থ সময় এসে গিয়েছিল। মহানবী (সা.) যে কথা বিশ বছর আগে বলা শুরু করেছিলেন এবং মুশরিকদের অপকর্ম ও দুর্বৃত্তপনার কারণে তা সম্পাদন করতে সক্ষম হন নি, তা আজ সম্পন্ন করার সময় এসে গেল।

মহানবী (সা.) স্বয়ং ঐ পরিবেশেরই সন্তান ছিলেন এবং আরব সমাজের দুঃখ-বেদনা এবং এর উপশম সম্পর্কে তাঁর পূর্ণ পরিচিতি ও জ্ঞান ছিল। তিনি জানতেন, পবিত্র মক্কার অধিবাসীদের অধঃপতনের কারণ কী? এ কারণেই তিনি আরব সমাজের ব্যথা-বেদনাগুলোর উপর হাত বুলিয়ে এ সব বিরানকারী ব্যাধি পূর্ণরূপে নিরাময়ের সংকল্প ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

এখানে আমরা মহানবীর ভাষণের কতক বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক উপস্থাপন করব। উল্লেখ্য, এ ভাষণের প্রতিটি অংশ (মানব জাতির) এক একটি ব্যাধি নিরাময় করার জন্যই বর্ণিত হয়েছে।

১. বংশ-কৌলিন্যের গর্ব

পরিবার, বংশ ও গোত্র নিয়ে বড়াই করার বিষয়টি আরব সমাজের মৌলিক ও সনাতন ব্যাধিগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরব সমাজে একজন লোকের সবচেয়ে বড় অহংকার ছিল এটাই যে, সে কুরাইশ গোত্রের মতো একটি প্রসিদ্ধ গোত্রোদ্ভূত। মহানবী (সা.) এ কল্পিত মূলনীতিটি ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার জন্য বললেন :

أيّها النّاس إنّ الله قد أذهب عنكم نخوة الجاهلية و تفاخرها بآبائها ألا إنّكم من آدم و آدم من طين ألا أنّ خير عباد الله عبد اتقاه

“হে জনগণ! মহান আল্লাহ্ ইসলাম ধর্মের আলোকে জাহিলী যুগের গর্ব এবং বংশ-গৌরব ও কৌলিন্য তোমাদের মধ্য থেকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। তোমাদের সবাই আদম থেকে এসেছ (সৃষ্ট হয়েছ) এবং তিনিও কাদামাটি থেকে সৃষ্ট হয়েছেন। সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ সেই ব্যক্তি, যে পাপ ও খোদাদ্রোহিতা থেকে বিরত থাকে (মহান আল্লাহকে ভয় করে)।”

ব্যক্তিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি কেবল তাকওয়া, তা জগৎবাসীকে বোঝানোর জন্য ভাষণের এক অংশে মহানবী (সা.) সমগ্র মানব জাতিকে দু শ্রেণীতে ভাগ করেছেন এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও গৌরব ঐ ব্যক্তিদের বলে গণ্য করেছেন যাঁরা মুত্তাকী, পরহেজগার। আর এ শ্রেণীবিন্যাসের দ্বারা তিনি শ্রেষ্ঠত্বের সমুদয় কাল্পনিক মাপকাঠি বাতিল করে দিয়েছেন।

তিনি ভাষণে বলেন :

إنّما النّاس رجلان : مؤمن تقىّ كريم علي الله و فاخر شقىّ هيّن علي الله

“মহান আল্লাহর কাছে মানব জাতি দু শ্রেণীতে বিভক্ত : পরহেজগার মুমিনদের দল- যারা মহান আল্লাহর কাছে সম্মানিত এবং সীমা লঙ্ঘনকারী ও পাপী- যারা মহান আল্লাহর কাছে লাঞ্ছিত।

২. আরব হবার কারণে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব

মহানবী (সা.) জানতেন, এ জাতি আরব হওয়া এবং এ জাতির সাথে সংশ্লিষ্টতা ও সম্পর্ককে নিজেদের অন্যতম গৌরব ও মর্যাদা বলে বিশ্বাস করে। আরব জাতীয়তাবাদের গর্ব এদের হৃদয়গুলোর গভীরে ও রক্ত-মজ্জার মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। তিনি এ ব্যথার উপশম এবং ঠুনকো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার কল্পিত প্রাসাদ ধূলিসাৎ করার জন্য জনগণের দিকে তাকিয়ে বললেন :

ألا أنّ العربيّة ليست ب< اب> والد و لكنها لسان ناطق، فمن قصر عمله لم يبلغ به حسبه

“হে লোকসকল! আরব হওয়া তোমাদের সত্তার অংশ নয়; বরং তা হচ্ছে একটি সাবলীল ভাষা; আর যে কেউ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করার ক্ষেত্রে অবহেলা করবে, বংশ-কৌলিন্য তাকে কোথাও (মর্যাদার অবস্থানে) পৌঁছে দেবে না (এবং তার কর্মের দোষ-ত্রুটি ও অপূর্ণতা পূরণ করে দেবে না)।”

এ কথার চেয়ে অধিকতর বলিষ্ঠ ও সাবলীল বক্তব্য পাওয়া যাবে কি?

৩. সমগ্র জাতির জন্য

মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রকৃত আহবায়ক সমগ্র মানব জাতির ও মানব সমাজের মধ্যেকার সাম্য দৃঢ়ীকরণের লক্ষ্যে বললেন :

إنّ النّاس من عهد آدم إلى يومنا هذا مثل أسنان المشط لا فضل للعربِىّ علي العجمىّ و لا للأحمر علي الأسود إلّا بالتّقوي

“আদম (আ.)-এর যুগ থেকে আমাদের যুগ পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতি চিরুনীর দাঁতগুলোর মতো পরস্পর সমান। অনারবের ওপর আরব জাতির এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া।”

মহানবী (সা.) এ কথার মাধ্যমে পৃথিবীর সকল জাতির মধ্য থেকে সব ধরনের অবৈধ বৈষম্য (শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকাপ্রসূত পার্থক্য) ও সকল সংকীর্ণতাবোধ বিলুপ্ত করে দিয়েছেন এবং যে কাজ মানবাধিকার ঘোষণার সনদপত্র বা মুক্তি ও স্বাধীনতার সনদ অথবা মানব জাতির সাম্যের প্রবক্তারা এত হৈ চৈ করে এবং ঢাক-ঢোল পিটিয়েও যা সমাপ্ত করতে পারে নি, তা তিনি ঐ অতীত যুগে আঞ্জাম দিয়ে গেছেন।

৪. শত বছরব্যাপী যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং পুরনো শত্রুতা

আরব জাতি ও গোত্রগুলো অগণিত গৃহযুদ্ধ ও অবিরাম রক্তপাতের কারণে এক শত্রু মনোভাবাপন্ন জাতিতে পরিণত হয়েছিল এবং সর্বদা তাদের মধ্যে যুদ্ধের দাবানল প্রজ্বলিত হতো। আরব-উপদ্বীপের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর মহানবী (সা.) এ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ও শান্তির জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ রোগের উপশম আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। মহানবী এ সমস্যা সমাধানের উপায় এর মাঝে দেখতে পেলেন যে, তিনি আপামর জনগণের কাছে আহবান জানাবেন যেন তারা জাহিলীয়াতের যুগে যে সব রক্ত ঝরানো হয়েছে ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো (প্রতিশোধ গ্রহণ করা) থেকে বিরত থাকে এবং এভাবে ঐ যুগের সকল বিবাদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘোষণা করে। এর ফলে যে কোন ধরনের রক্তপাত ও হত্যাকাণ্ড- যা শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করে দেয়,- প্রতিহত করা সম্ভব হবে এবং প্রতিশোধ গ্রহণ ও আক্রমণ মোকাবেলা করার ধূয়ো তুলে যে সব আক্রমণ, লুটতরাজ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবার সম্ভাবনা ছিল, সেগুলোর চিন্তাও আরবদের মন-মগজ থেকে বের করে দেয়া সম্ভব হবে।

মহানবী (সা.) এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন করার জন্য ঘোষণা করলেন :

ألا إنّ كلّ مال و مأثرة و دم فِى الجاهليّة تحت قدمىّ هاتين

“আমি জাহিলী যুগের প্রাণ ও ধন-সম্পদ সংক্রান্ত যাবতীয় ঝগড়া-বিবাদ এবং কল্পিত গর্ব আমার এ দুই পদতলে রেখে দিলাম এবং সেসব কিছুকে আমি বিলুপ্ত বলে ঘোষণা করছি।”

৫. ইসলামী ভ্রাতৃত্ব

মহানবী (সা.)-এর ঐ দিনের ভাষণের একটি অংশ মুসলমানদের একতা ও সংহতি এবং পারস্পরিক অধিকারসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। এ সব ইতিবাচক বিষয় বর্ণনা করার ক্ষেত্রে মহানবীর লক্ষ্য ছিল, ইসলাম ধর্মের বাইরে যারা আছে, তারা এ ধরনের একতা ও সৌহার্দ্যবোধ প্রত্যক্ষ করে আন্তরিকতার সাথে ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়বে এবং এ ধর্ম গ্রহণ করবে।

মহানবী (সা.) বললেন :

المسلم أخ المسلم و المسلمون إخوة، و هم يد واحدة علي من سواهم تتكافؤ دمائهم يسعي بذمّتهم أدناهم

“এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই এবং সকল মুসলমান পরস্পর ভাই এবং অমুসলিমদের বিপক্ষে তারা সবাই একটি হাতের মতো (ঐক্যবদ্ধ)। তাদের সবার রক্ত এক সমান (অর্থাৎ তাদের সবার জীবন-পণ এক ও অভিন্ন। তাই কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতে পারবে না), এমনকি মুসলমানদের পক্ষে তাদের মধ্যেকার সবচেয়ে ছোট ব্যক্তিও প্রতিশ্রুতি বা চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে।”৩৫৪

অপরাধীদের গ্রেফতার

এ বিষয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই যে, মহানবী (সা.) করুণা, উদারতা ও ক্ষমার সবচেয়ে বড় নমুনা ছিলেন এবং চরমপন্থী গোষ্ঠী রূঢ় আচরণ প্রকাশ করা সত্বেও তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তবে ঐ উগ্রবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ছিল, যারা অনেক ভয়াবহ অপরাধ করেছিল এবং এতসব ভয়ঙ্কর অপরাধ ও বিপর্যয় সৃষ্টি করার পর তারা যে মুসলমানদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করবে, তা কখনই কল্যাণকর ও বাঞ্ছনীয় ছিল না। কারণ ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষমা ঘোষণার যথেচ্ছ অপব্যবহার করে ইসলামের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক তৎপরতা চালানো হতে পারে।

মুসলমানরা রাস্তা-ঘাটে বা মসজিদুল হারামে এ জঘন্য অপরাধীদের কয়েকজনকে হত্যা করেছিল এবং তাদের মধ্য থেকে দু জন৩৫৫ হযরত আলী (আ.)-এর বোন উম্মে হানীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। আলী (আ.) অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উম্মে হানীর বাড়ি ঘেরাও করে ফেললেন। উম্মে হানী ঘরের দরজা খুললেন এবং একজন অপরিচিত সেনাপতির মুখোমুখি হলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি নিজের পরিচয় প্রদান করলেন এবং বললেন : আমি একজন মুসলিম নারী হিসাবে এ দু ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়েছি। মুসলিম নারীর আশ্রয়দান মুসলিম পুরুষের মতোই সম্মান পাওয়ার যোগ্য।” হযরত আলী এ সময় যুদ্ধের শিরস্ত্রাণ মাথা থেকে উঠিয়ে ফেলেন যাতে উম্মে হানী তাঁকে চিনতে পারেন। বোনের দৃষ্টি তখন ভাইয়ের উপর পড়ল। বহু বছরের ঘটনাবলী এ দু ভাই-বোনকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। সাথে সাথে তাঁর দু চোখ জলে পূর্ণ হয়ে গেল এবং তিনি ভাইয়ের কাঁধের উপর দু হাত রাখলেন। অতঃপর তাঁরা দু জন মহানবী (সা.)-এর কাছে গেলেন এবং মহানবীও এ নারীর প্রতি অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করলেন।

আবদুল্লাহ্ ইবনে সা দ ইবনে আবী সারাহ্, যে প্রথমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং পরে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, সেও ঐ দশ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবে সে হযরত উসমানের সুপারিশ ও মধ্যস্থতায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল।

ইকরামাহ্ ও সাফ্ওয়ানের কাহিনী

বদর যুদ্ধের পরবর্তী যুদ্ধগুলোর অগ্নি প্রজ্বলনকারী ইকরামাহ্ ইবনে আবি জাহল ইয়েমেনে পলায়ন করে। তবে তার স্ত্রীর সুপারিশে সে মুক্তি পেয়েছিল। সাফ্ওয়ান ইবনে উমাইয়্যা বিভিন্ন ধরনের জঘন্য অপরাধ ছাড়াও বদর যুদ্ধে নিহত তার পিতা উমাইয়্যার রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য এক মুসলমানকে মক্কায় প্রকাশ্য দিবালোকে জনতার চোখের সামনে ফাঁসীতে ঝুলিয়েছিল। এ কারণে মহানবী (সা.) তার রক্ত বৈধ ঘোষণা করেন। সে ঐ সময় শাস্তি পাওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে সমুদ্রপথে হিজায থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বিশেষ করে যখন সে জানতে পেরেছিল, ঐ দশ ব্যক্তির তালিকায় তার নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

উমাইর ইবনে ওয়াহাব মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে তার অপরাধ ক্ষমা করে দেয়ার আবেদন জানিয়েছিল। মহানবীও তার আবেদন গ্রহণ করেন এবং মক্কায় প্রবেশকালীন পরিহিত তাঁর পাগড়ী তাকে নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে প্রদান করেন। তিনি ঐ প্রতীক নিয়ে জেদ্দায় যান এবং সাফ্ওয়ানকে সাথে নিয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। মহানবী (সা.)-এর দৃষ্টি যখন যুগের সবচেয়ে বড় অপরাধীর ওপর পড়ল তখন তিনি পূর্ণ মহানুভবতা সহকারে বললেন : তোমার প্রাণ ও ধন-সম্পদ সম্মানিত; তবে তোমার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা হবে উত্তম।” সে তখন দু মাসের সময় চায়, যাতে সে ইসলামের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। মহানবী (সা.) তখন বললেন : আমি তোমাকে দু মাসের স্থলে চার মাসের ফুরসৎ দিচ্ছি এজন্য যে, তুমি পূর্ণ বিচক্ষণতা, জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি সহকারে এ ধর্ম গ্রহণ কর।” চার মাস গত হতে না হতেই সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল।৩৫৬

এ ঘটনা সংক্ষিপ্ত অধ্যয়ন করলে ইসলাম ধর্মের এক অকাট্য বাস্তবতা- যা স্বার্থান্বেষী প্রাচ্যবিদরা দুর্দমনীয়ভাবে অস্বীকার করে থাকে- স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। শিরকের প্রতিভূরা ও মুশরিক নেতারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেছে; আর বাধ্যবাধকতা ও ভীতি প্রদর্শনের তো কোন অস্তিত্বই ছিল না। বরং চেষ্টা করা হয়েছে, সঠিক চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার মাধ্যমেই যেন একমাত্র এ আসমানী ধর্ম গ্রহণ করা হয়।

মক্কা বিজয়ের উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলী বর্ণনা করার আগে এখানে নিম্নোক্ত দু টি আকর্ষণীয় ঘটনার দিকে আমরা ইঙ্গিত করব :

মুনাফিক দলের ভূমিকা

মুনাফিক দলের ভূমিকা ছিল ইহুদীদের চেয়েও মারাত্মক। কেননা মুনাফিকরা বন্ধুর বেশে পেছন থেকে পিঠে ছুরি মারছিল। এদের নেতা ছিল আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই ও মালেক ইবনে উবাই। এরা মুসলমানদের সামনে বন্ধুত্বের মুখোশ পরেছিল। এরা দ্রুত বনী নাযীর গোত্রের নেতাদের কাছে প্রস্তাব পাঠায় যে,আমরা দু হাজার সৈন্য দিয়ে তোমাদের সাহায্য করব। আর তোমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ গোত্রসমূহ অর্থাৎ বনী কুরাইযাহ্ ও বনী গাতফান তোমাদের একাকী ছেড়ে দেবে না। এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দানের কারণে ইহুদীদের সাহস বেড়ে যায়। শুরুতে তারা আত্মসমর্পণ করে দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেও পরবর্তীতে তাদের চিন্তা ও সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে। তারা দুর্গের প্রবেশদ্বারসমূহ বন্ধ করে দেয় এবং যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয়,যে কোন মূল্যেই হোক,প্রতিরক্ষার লড়াই করবে এবং বিনামূল্যে তাদের ক্ষেত-খামার মুসলমানদের হাতে তুলে দেবে না।

বনী নাযীর গোত্রের অন্যতম সর্দার সালাম ইবনে মুশকাম,আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের অঙ্গীকারকে ভিত্তিহীন বলে গণ্য করে এবং বলে,কল্যাণজনক হচ্ছে সবার চলে যাওয়া। কিন্তু হুয়াই ইবনে আখতাব জনসাধারণকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানায়।

রাসূল (সা.) আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের বার্তা সম্পর্কে অবহিত হন। তিনি আবদুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতুমকে মদীনায় স্থলবর্তী হিসেবে রেখে যান এবং তাকবীর ধ্বনি দিয়ে বনী নাযীর গোত্রের দুর্গ অবরোধের জন্য অগ্রসর হন। বনী নাযীর ও বনী কুরাইযার মধ্যবর্তী স্থানে তিনি শিবির স্থাপন করেন এবং উভয় গোত্রের মধ্যেকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী87 ছয় দিন ছয় রাত এবং অন্য কয়েকজনের বর্ণনা মোতাবেক 15 দিন তিনি তাদের দুর্গ অবরোধ করেন। কিন্তু ইহুদীরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং দৃঢ়তা প্রদর্শন করে। মহানবী (সা.) দুর্গের আশ-পাশের খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলার নির্দেশ দেন,যাতে ইহুদীরা এ ভূখণ্ডের প্রতি লোভের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যায়।

এ সময় দুর্গের ভেতর থেকে ইহুদীদের চিৎকার শুরু হয় এবং তারা বলে : হে আবুল কাসেম (মুহাম্মদ)! আপনি সব সময় আপনার সৈন্যদের গাছ-পালা কাটতে নিষেধ করেছেন। এখন কেন সে কাজ করার নির্দেশ দিলেন?”   তবে এর কারণ যেটি ছিল তা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইহুদীরা আগের ফয়সালা মেনে নিতে রাযী হয়ে যায়। তারা একমত হয়ে বলল : আমরা দেশত্যাগ করে চলে যেতে রাযী আছি;তবে শর্ত হলো আমাদের যাবতীয় অস্থাবর সম্পত্তি আমাদের সাথে নিয়ে যাব। মহানবী (সা.) এ প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন এবং বললেন,তারা অস্থাবর সম্পত্তি সাথে নিয়ে যেতে পারবে,তবে অস্ত্রগুলো নিতে পারবে না;সেগুলো মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করতে হবে।

লোভাতুর ইহুদীরা তাদের সহায়-সম্পত্তি নিয়ে যাবার ব্যাপারে যারপর নাই চেষ্টা চালায়। এমনকি ঘরের দরজাগুলোও চৌকাঠসহ নিয়ে যাবার জন্য তৈরি হয়। বাকী ঘরগুলো নিজেদের হাতে ভেঙে ফেলে। তাদের একদল খাইবর ও আরেক দল সিরিয়ায় চলে যায়। তবে তাদের কেবল দু ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে। পরাজিত ও অপদস্থ এ জাতিটি এ পরাজয়ের গ্লানি ঢাকার জন্য দফ বাজিয়ে,গান গেয়ে মদীনা ত্যাগ করে এবং এ আচরণের মধ্য দিয়ে এ কথা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে,এ এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় তারা ততটা চিন্তিত বা মনঃক্ষুণ্ণ হয় নি।

মুহাজিরগণের মধ্যে বনী নাযীরের ক্ষেত-খামার বণ্টন

ইসলামের সৈনিকগণ যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়া শত্রুপক্ষের কাছ থেকে যে সম্পদ গনীমত হিসেবে লাভ করেন,পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী88 তা সম্পূর্ণরূপে মহানবী (সা.)-এর মালিকানাধীন। তিনি যেভাবে ভালো মনে করেন,ইসলামের কল্যাণে তা ব্যয় করবেন। মহানবী এটাই কল্যাণকর মনে করলেন যে,এই ক্ষেত-খামার,পানির উৎস ও বাগানগুলো মুহাজিরগণের মধ্যে ভাগ করে দেবেন। কেননা মক্কা থেকে হিজরত করে আসার কারণে তাঁদের হাতে জাগতিক সহায়-সম্পদ ছিল না বললেই চলে। তাঁরা আনসারগণের উপর নির্ভরশীল এবং তাঁদের মেহমান হিসেবেই ছিলেন। এ মতটিকে সা দ ইবনে উবাদা ও সা দ ইবনে মায়ায সমর্থন করেন। এ কারণে সকল জমি মক্কা থেকে আগত মুহাজিরগণের মধ্যে বণ্টন করা হয় এবং আনসারগণের মধ্যে অত্যন্ত দরিদ্র হবার কারণে সাহল ইবনে হাদীদ এবং আবু দুজানাহ্ ছাড়া অন্য কেউ তার ভাগ পান নি। এভাবে সকল মুসলমানের সার্বিক অবস্থার উন্নতির একটি ব্যবস্থা হয়। বনী নাযীর গোত্রের জনৈক নেতার মূল্যবান তরবারিটি সা দ ইবনে মায়াযকে প্রদান করা হয়।

হিজরী চতুর্থ শতকের রবিউল আউয়াল মাসে এ ঘটনা সংঘটিত হয়। সূরা হাশরও এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়। আমরা দীর্ঘতা এড়ানোর জন্য এ সূরার আয়াতসমূহের অনুবাদ ও তাফসীর হতে বিরত থাকছি। অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন,এ ঘটনায় কোনরূপ রক্তপাত ঘটে নি। কিন্তু মরহুম শেখ মুফীদ বলেন,বিজয়ের রাতে সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষ বাঁধে। তাতে বনী নাযীর গোত্রের দশজন ইহুদী নিহত হয় এবং তারা নিহত হবার ফলে ইহুদীদের আত্মসমর্পণের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।89

পঁয়ত্রিশতম অধ্যায় : চতুর্থ হিজরীর ঘটনাপ্রবাহ

মদ ও নেশাকর পানীয় নিষিদ্ধকরণ

মদ এবং সামগ্রিকভাবে মাদকদ্রব্য মানব সমাজের অন্যতম জঘন্য ও ধ্বংসাত্মক আপদ ছিল এবং এখনো রয়েছে। এ ধ্বংসকারী বিষাক্ত দ্রব্যাদির নিন্দায় এটুকুই যথেষ্ট যে,অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের পার্থক্যের সর্বপ্রধান সম্বল জ্ঞান-বু্দ্ধির সাথে এ মাদকদ্রব্য সাংঘর্ষিক। মানুষের সৌভাগ্য ও কলাণের নিয়ামক হচ্ছে তার জ্ঞান ও বিবেক। অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের যে ব্যবধান,তা মানুষের এ অভ্যন্তরীণ শক্তির উপরই নির্ভরশীল। এলকোহল (মদ) বা মাদকদ্রব্য এর চরম শত্রু। এ কারণে মদ ও নেশাকর পানীয় অর্থাৎ মাদকদ্রব্য সেবন প্রতিরোধ আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত নবী-রাসূলগণের অন্যতম কর্মসূচী ছিল। একই কারণে সকল শরীয়তে মদ সম্পূর্ণ হারাম ঘোষিত হয়েছে।90

আরব উপদ্বীপে মদপান একটি গণ-মুসিবত ও মহামারী আকারে বিদ্যমান ছিল। তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং তার মূলোৎপাটনের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল। পরিবেশের চাহিদা এবং সাধারণভাবে সব আরবের অবস্থা ও পরিস্থিতি এ অনুমতি দিচ্ছিল না যে,মহানবী (সা.) কোন পটভূমি ছাড়াই তা হারাম ঘোষণা করবেন। বরং একজন দক্ষ চিকিৎসকের ন্যায় সমাজের মন-মানসিকতাকে আগে প্রস্তুত করার প্রয়োজন ছিল যাতে চূড়ান্ত ও নিশ্চিত সংস্কার সম্ভবপর হয়। এ কারণে মদপানের নিন্দায় নাযিলকৃত চারখানা আয়াতের ভাষা এক রকম নয়। বরং প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু হয় এবং ক্রমান্বয়ে চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

এ আয়াতসমূহ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে আমরা মহানবীর দ্বীন প্রচারের কর্মকৌশল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে পারি। আমাদের মতে বড় বড় বক্তা ও লেখকরা এ পদ্ধতির অনুসরণ করতে পারেন এবং এ পদ্ধতিতেই তাঁরা সমাজের কলুষ ও অনাচারগুলো দূর করার চেষ্টা করতে পারেন।

কোন একটি অন্যায় ও অনাচার প্রতিরোধ করার জন্য মৌলিক শর্ত হলো,প্রথমে সমাজের লোকদের চিন্তা-চেতনা ও বৃহত্তর জনমতকে ঐ অনাচারের ক্ষয়-ক্ষতি ও অশুভ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সজাগ করা। যতদিন পর্যন্ত সমাজে মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ চেতনার সৃষ্টি না হবে,ততদিন পর্যন্ত কোন অনাচার মৌলিকভাবে মোকাবেলা করা যাবে না। কেননা স্বয়ং মানুষই তো এ সংস্কার-সংশোধনের যিম্মাদার।

যে সমাজে মদপান জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল,পবিত্র কুরআন এ দৃষ্টিকোণ থেকে সেখানে প্রথম বারের মতো খেজুর ও আঙুর দ্বারা মদ তৈরিকে উত্তম জীবিকা বা রিয্কে হাসান -এর পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছে। এভাবে সমাজের ঘুমন্ত অনুভূতিতে নাড়া দিয়ে তা জাগ্রত ও সচেতন করা হয়। এরশাদ হয়েছে :

) و من ثمرات النّخيل و الأعناب تتخذون منه سكرا و رزقا حسنا(

তোমরা খেজুর গাছের ফল ও আঙুর থেকে মাদক ও উত্তম খাদ্য গ্রহণ করে থাক। (সূরা নাহল : 67)

পবিত্র কুরআন প্রথম বারের মতো এ তথ্য কর্ণগোচর করে যে,খেজুর ও আঙুর থেকে মদ তৈরি করা উত্তম খাদ্য নয়;বরং উত্তম খাদ্য হচ্ছে উভয় ফলকে খেজুর ও আঙুর রূপে আহার করা।

এ আয়াত মানুষের চিন্তায় নাড়া দেয় এবং তাদের মানসিকতা এমনভাবে প্রস্তুত করে যাতে পরবর্তীতে আল্লাহ্ তাঁর ভাষাকে আরো কঠোরতর করেন এবং আরেকখানা আয়াতের মাধ্যমে এ কথা ঘোষণা করেন যে,মদ ও জুয়ার দ্বারা যে  আংশিক (পার্থিব) মুনাফা হয়,তা সমুদয় ক্ষয়-ক্ষতির প্রেক্ষিতে অত্যন্ত তুচ্ছ। নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে এ বক্তব্য সমাজের সামনে পেশ করা হয় :

) يسألونك عن الخمر و الميسر قل فيهما اثم كبير و منافع للنّاس و إثمهما أكبر من نفعهما(

তারা আপনার কাছে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জানতে চায়। বলুন,উভয়ের মধ্যে আছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য উপকারও;কিন্তু তাদের পাপ উপকার অপেক্ষা অধিক। 91

নিঃসন্দেহে লাভ ও ক্ষতির মাঝে তুলনা করা এবং লাভের চাইতে ক্ষতির পাল্লা ভারী দেখানো চিন্তাশীল লোকদের মনে ঐ কাজটির প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির জন্য যথার্থ। কিন্তু সাধারণ লোকদের যতক্ষণ পরিষ্কার ভাষায় নিষেধ করা না হবে,ততক্ষণ নিছক এ ধরনের বাচনভঙ্গি ও বর্ণনা পদ্ধতির দ্বারা তারা অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত হয় না।

এমনকি এ আয়াত নাযিল হওয়া সত্বেও আবদুর রহমান ইবনে আউফ এক ভোজসভার আয়োজন করে তাতে খাবার দস্তরখানে মদ পরিবেশন করেন। মেহমানরা মদ পান করার পর নামাযে দাঁড়ান। তাঁদের একজন নামাযে (মদের নেশায়) পবিত্র কুরআনের আয়াত ভুলভাবে তেলাওয়াত করেন,যার ফলে ঐ আয়াতের অর্থই পাল্টে যায়!

অর্থাৎ সূরা কাফিরুন-এلا أعبد ما تعبدون (হে কাফেররা!) তোমরা যার (মূর্তির) উপাসনা করো,আমি তার উপাসনা করি না -এর পরিবর্তে এভাবে তেলাওয়াত করেন :أعبد ما تعبدون তোমরা যার উপাসনা করো,আমি তার উপাসনা করি -যার অর্থ আয়াতের অর্থের সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যায়।

এসব ঘটনা মানুষের মন-মানসিকতা প্রস্তুত করতে থাকে যাতে পরিবেশ ও পরিস্থিতি এ অনুমতি দেয় যে,অন্তত বিশেষ বিশেষ অবস্থা ও পরিস্থিতিতে শরাব (মদ) হারাম ঘোষিত হোক। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ঘোষণা করা হয় যে,মাতাল অবস্থায় নামায পড়ার অধিকার কোন মুসলমানের নেই।

আর এ বিধান বা নির্দেশ নিম্নোক্ত আয়াতে ঘোষণা করা হয় :

) لا تقربوا الصّلاة و أنتم سكاري حتّي تعلموا ما تقولوا(

অর্থাৎ মাতাল অবস্থায় নামায পড়ো না। কারণ তোমরা (মাতাল অবস্থায় নামাযে) কী বলছ,তা জান না।

এ আয়াতের প্রভাব এতটা তীব্র ছিল যে,একদল লোক চিরতরে মদ পান ত্যাগ করে এবং তাদের যুক্তি ছিল এই যে,যে জিনিস তোমাদের নামাযের ক্ষতি করে,তা অবশ্যই তোমাদের জীবনের কর্মসূচী থেকেই নিরঙ্কুশভাবে বাদ দিতে হবে।

তবে আরেকটি দল এরপরও মদ পানের অভ্যাস ত্যাগ করতে পারে নি;এমনকি আনসারগণের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি উল্লিখিত আয়াত অবতীর্ণ হওয়া সত্বেও এমন ভোজসভার আয়োজন করে যাতে মদ পরিবেশন করার পর অতিথিবৃন্দ (নেশাগ্রস্ত হয়ে) পরস্পর মারামারিতে লিপ্ত হয় এবং পরস্পরের হাত ভেঙে দেয় ও মাথা ফাটিয়ে দেয়। এরপর মহানবী (সা.)-এর কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ পেশ করা হয়।

দ্বিতীয় খলীফা ঐ দিন পর্যন্ত মদ পান করতেন। তিনি পূর্ববর্তী আয়াতসমূহ মদ পান সুনিশ্চিতভাবে হারাম করার জন্য যথেষ্ট নয় -এ ধারণার বশবর্তী হয়ে দু হাত তুলে প্রার্থনা

করেন :

اللهم بيّن لنا بيانا شافيا فِى الخمر

হে আল্লাহ্! মদ সম্পর্কে আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সন্তোষজনক বিধান সম্বলিত ব্যাখ্যা অবতীর্ণ করুন।

বলার অপেক্ষা রাখে না,এ ধরনের অপ্রীতিকর অবস্থা মদ পান নিশ্চিতভাবে হারাম হবার বিধান মেনে নেয়ার জন্য (তদানীন্তন) মুসলিম সমাজকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিল। এ কারণেই মদ পান নিষিদ্ধ করার স্পষ্ট ও চূড়ান্ত বিধান অবতীর্ণ হয়। এ আয়াত হলো :

) يا أيّها الّذين آمنوا إنّما الخمر و الميسر و الأنصاب و الأزلام رجس من عمل الشّيطان فاجتنبوه لعلّكم تُفلحون(

হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই শরাব (মদ),জুয়া,মূর্তিপূজার বেদী এবং আযলাম (এক ধরনের ভাগ্য পরীক্ষা) অপবিত্র বস্তু,শয়তানের কাজ। কাজেই সবাই তা থেকে বেঁচে থাক। আশা করা যায়,তোমরা সফলকাম হবে। 92

এ স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ঘোষণার ফল দাঁড়িয়েছিল এই যে,যারা তখনো শরীয়তের স্পষ্ট ও পরিষ্কার বিধান না আসার যুক্তিতে মদ পান করত,তারাও মদ পান ত্যাগ করল। সুন্নী ও শিয়া সূত্রের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে,এ আয়াত শোনার পর দ্বিতীয় খলীফা বলেন :انتهينا يا ربّ

হে প্রভু! এখন থেকে আমরা বিরত হলাম। 93

বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিষয়ক সংযুক্তি

দ্বিতীয় খলীফা উল্লিখিত তিনখানা আয়াত শোনার পর ক্ষান্ত হন নি। তিনি মদ হারাম হওয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যার অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মাদকদ্রব্য হারাম হওয়া সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ সম্বলিত আয়াত নাযিল হলে তিনি সন্তষ্টি লাভ করেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহর হুকুম ছিল :

) رجس من عمل الشّيطان فاجتنبوه لعلّكم تُفلحون(

(শরাব) অপবিত্র বস্তু,শয়তানের কাজ। অতএব,তোমরা তা থেকে বিরত থাক। আশা করা যায়,তোমরা সফলকাম হবে। 94

কিন্তু আমাদের যুগের পাশ্চাত্যপন্থীরা এসব আয়াতকে যথেষ্ট মনে করে না;বরং তারা বলতে চায়,মদ হারাম হওয়ার ব্যাপারেحرام (হারাম) বাحُرّم হুররিমা (হারাম করা হলো) পরিভাষা ব্যবহৃত হওয়া উচিত ছিল। অন্যথায় মদ যে নিষিদ্ধ,তা বোঝা যায় না।

এ দলটি কুপ্রবৃত্তির কামনা-বাসনার পূজারী এবং অজুহাত খুঁজে বেড়াতে অভ্যস্ত। এরা শয়তানী বোতলটার মধ্যে ডুবে থাকতে ও বুকে জড়িয়ে রাখতে এবং এ জাতীয় অনর্থক কথা বলতে চায়;অথচ পবিত্র কুরআন এ ধরনের শয়তানী চিন্তাধারা দমন করার উদ্দেশ্যে শরাব হারাম হওয়ার বিষয়ে অন্যভাবে হারাম পরিভাষা ব্যবহার করেছে। পবিত্র কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতে বলা হয়েছে :و إثمهما أكبر من نفعهما এতদুভয়ের (মদ ও জুয়া) গুনাহ,উভয়ের উপকারের চেয়ে বড় (জঘন্য)। 95

অর্থাৎ মদপানকে বড় গুনাহ ও পাপ বলে আখ্যায়িত করেছে। অপর এক আয়াতে সকল পাপকর্মকে (إثم ) হারাম ঘোষণা করে বলা হয়েছে :

) قل إنّما حرّم ربّى الفواحش ما ظهر منها و ما بطن و الأثم(

বলুন,আমার পালনকর্তা প্রকাশ্য ও গোপন সকল অশ্লীলতা এবং পাপকর্ম হারাম ঘোষণা করেছেন। 96

এত স্পষ্ট বিবরণের পরও কি পাশ্চাত্যপূজারী নোংরা মানসিকতার লোকেরা মদ হারাম হওয়া সংক্রান্ত আরো পর্যাপ্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যার অপেক্ষায় বসে থাকবে?

আমাদের মতে এ বিষয়ে যুক্তিতর্কের কোন অবকাশ নেই। কেননা মদ সম্পর্কিত চার আয়াতে মদকে নোংরা,অপবিত্র এবং মূর্তি,জুয়া ও শয়তানের কাজের সমপর্যায়ের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে,মদ হারাম। আর স্বার্থ বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয়-এমন সহজ সরল দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এ সব আয়াত সবচেয়ে কার্যকরী বর্ণনা ও ব্যাখ্যা।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন,তা হচ্ছে মহানবী (সা.) এ চার আয়াতের সাহায্যে তাঁর চারপাশের পরিবেশকে এই অপবিত্র বস্তু থেকে পবিত্র করেন এবং স্বয়ং ঈমানদারদের ঈমানই আল্লাহর হুকুম কার্যকর করতে উদ্যোগী হয়। কিন্তু পাশ্চাত্য জগৎ ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েও এ ব্যাপারে তেমন কোন সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। এই প্রাণ হরণকারী বস্তুটি বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রে তাদের যাবতীয় চেষ্টা-প্রচেষ্টা নিস্ফল প্রমাণিত হয়েছে। 1933-1935 সালে এলকোহল জাতীয় পানীয় নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ব্যর্থতা সর্বজনবিদিত। এটি বিরাট ট্র্যাজেডি এবং পাঠকগণ এ সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য ইতিহাসের শরণাপন্ন হতে পারেন।

যাতুর রিকা অভিযান

রিকা (رقاع ) আরবদের পরিভাষায় তালি নামে পরিচিত। কাজেই এই পবিত্র জিহাদকে যাতুর রিকা অভিযান নামকরণের কারণ হচ্ছে এ অভিযানে মুসলমানরা বহু চড়াই-উৎরাইয়ের সম্মুখীন হন,যা তালিযুক্ত জামার সাথে তুলনীয়। কখনো কখনো বলা হয়,এ অভিযানকে যাতুর রিকা বলার কারণ মুসলিম সৈনিকগণ পায়ে হেঁটে পথ চলার ক্লান্তি দূর করার জন্য তাঁদের পায়ে পট্টি জড়িয়েছিলেন।

যা হোক,অন্যান্য অভিযানের মতো এ অভিযান প্রথম পর্যায়ের কোন লড়াই ছিল না;বরং প্রজ্বলিত হবার উপক্রম যুদ্ধের স্ফূলিঙ্গ নির্বাপিত করার জন্যই এ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অর্থাৎ গাতফান -এর দু টি শাখা-গোত্র বনী মাহারির বনী সালাবাহ্ -এর পক্ষ হতে যে অশুভ তৎপরতা চালানো হচ্ছিল,তা দমিয়ে দেয়ার জন্যই এ অভিযান পরিচালিত হয়।

মহানবী (সা.)-এর নিয়ম ছিল তিনি বিচক্ষণ ও সচেতন ব্যক্তিদের আশে-পাশের এলাকায় পাঠাতেন যাতে তাঁরা সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর কাছে প্রতিবেদন প্রদান করেন। হঠাৎ তাঁর কাছে সংবাদ পৌঁছে যে,এ গোত্র দু টি মদীনা নগরী দখল করার জন্য অস্ত্র ও সৈন্য সংগ্রহের চিন্তা-ভাবনা করছে। মহানবী একটি বিশেষ বাহিনী নিয়ে নজ্দের উদ্দেশে গমন করেন এবং শত্রু-ভূখণ্ডের খুব কাছে অবতরণ করেন। ইসলামী বাহিনীর অতীত শৌর্য-বীর্য,ত্যাগ-তিতিক্ষার ঐতিহ্য গোটা আরব উপদ্বীপকে বিস্ময়াভিভূত করেছিল। তাদের আগমনের খবর পেয়ে শত্রুবাহিনী পশ্চাদপসরণ করে এবং কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়াই পাহাড়ী অঞ্চল ও উচ্চভূমিতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

তবে মহানবী যেহেতু এ অভিযানে ফরয নামাযসমূহ সালাতে খাওফ অর্থাৎ ভীতিকর পরিস্থিতিতে নামায আদায়ের নিয়মে পড়েন এবং এ ধরনের নামায কীভাবে পড়তে হবে,তা সূরা নিসার 102তম আয়াতে বলা হয়,সেহেতু অনুমান করা যায়,শত্রু বাহিনীর যুদ্ধাস্ত্র ও রণপ্রস্তুতি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল এবং যুদ্ধ বেশ জটিল রূপ ধারণ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুসলমানরা বিজয় লাভ করতে সক্ষম হন।

বীরত্বের স্বাক্ষর

ইবনে হিশাম97 ও আমীনুল ইসলাম তাবারসী-এর মতো সীরাত রচয়িতা ও মুফাসসিরগণ এ অভিযানের বর্ণনা প্রসঙ্গে এমন কতক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন,যা শত্রুবাহিনীর মোকাবেলায় মহানবী (সা.)-এর বীরত্বের সাক্ষ্য বহন করে। এর সাদৃশ্যপূর্ণ বর্ণনা আমরা যি আমর অভিযান প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি। বর্ণনা সংক্ষেপ করার প্রয়োজনে আমরা এখানে তার পুনরাবৃত্তি করছি না।

ইসলামের ধৈর্যশীল রক্ষীগণ

ইসলামের সৈনিকগণ যদিও এ অভিযানে সম্মুখ লড়াই ছাড়াই মদীনায় ফিরে আসেন,তবুও সামান্য কিছু মালে গনীমত তাঁদের হস্তগত হয়। ফেরার পথে একটি বিশাল উপত্যকায় তাঁরা রাতটা বিশ্রামে কাটান। মহানবী (সা.) দু জন বীর যোদ্ধাকে উপত্যকার প্রবেশপথ সংরক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁদের নাম ছিল আব্বাদ আম্মার । তাঁরা দু জন রাতের ঘণ্টাগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। সে হিসেবে রাতের প্রথম ভাগের পাহারার দায়িত্ব পড়ে আব্বাদের উপর।

গাতফান গোত্রের এক লোক মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবন করার মানসিকতা পোষণ করছিল। সে যে কোন ভাবে মুসলমানদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে নিজ গোত্রের কাছে ফিরে যাওয়ার ফন্দি এঁটেছিল। লোকটি রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নামাযরত প্রহরীর দিকে তীর নিক্ষেপ করে। কিন্তু প্রহরী নামাযে এতখানি বিভোর ছিলেন যে,তিনি তীরের আঘাত খুব সামান্যই অনুভব করেন এবং তীরটি নিজের পা থেকে বের করে পুনরায় নামাযে মশগুল হয়ে যান। কিন্তু শত্রুর আক্রমণের তিন বার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তৃতীয় বারে তীরটি খুব শক্তভাবে তাঁর পায়ে বিদ্ধ হয়। ফলে মনের মাধুরি মিশিয়ে আর নামাযে তন্ময় হয়ে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নি। কাজেই খুব সংক্ষিপ্ত রূকূ ও সিজদা সহকারে নামায শেষ করে আম্মারকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন।

আব্বাদের হৃদয়বিদারক অবস্থা দেখে আম্মার দারুণভাবে মর্মাহত হন এবং অনেকটা প্রতিবাদী সুরে বলেন : কেন তুমি আমাকে শুরুতে জানালে না?”   আহত প্রহরী তাঁকে বললেন : আমি আল্লাহর কাছে মুনাজাতে মশগুল ছিলাম এবং পবিত্র কুরআনের একখানা সূরা তেলাওয়াত করছিলাম। হঠাৎ প্রথম তীরটি আমাকে আঘাত করে। মহান আল্লাহর কাছে নিভৃতে দুআ এবং তাঁর প্রতি মনোনিবেশ করার স্বাদ আমাকে নামায ভঙ্গ করতে বারণ করে। যদি মহানবী (সা.) আমাকে এ উপত্যকার পাহারার দায়িত্ব প্রদান না করতেন,তা হলে কিছুতেই আমার নামায এবং যে সূরা পাঠ করছিলাম,তাতে বিরতি টানতাম না;বরং মহান আল্লাহর কাছে মুনাজাতরত অবস্থায় আমার প্রাণটি দিয়ে দিতাম। কখনো নামায মাঝখানে শেষ করার চিন্তাও করতাম না 98


10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53