চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড5%

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড লেখক:
: মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-প্রথম খণ্ড চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 238 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 81916 / ডাউনলোড: 7558
সাইজ সাইজ সাইজ
চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

চিরভাস্বর মহানবী (সা.)-দ্বিতীয় খণ্ড

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

প্রতিনিধি দলের শর্তাবলী

মহানবী (সা.) তাদের অনেক শর্তই মেনে নেন। এমনকি একটি অঙ্গীকারপত্রে তিনি তায়েফ অঞ্চল ও তায়েফবাসীর ভূ-খণ্ডের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করেছিলেন। তবে তাদের কতিপয় শর্ত এতটা অবমাননাকর ছিল যে, এর ফলে মহানবী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তাদের একটি অযৌক্তিক শর্ত ছিল। তারা বলেছিল, তায়েফের জনগণ ঐ অবস্থায় তাওহীদী আদর্শ ও ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়বে যখন তায়েফের সবচেয়ে বড় প্রতিমালয় তিন বছরের জন্য এই একই অবস্থায় থাকবে এবং ঐ সময় ধরে সাকীফ গোত্রের প্রধান প্রতিমা লাত’-এর পূজা করতে দেয়া হবে। কিন্তু তারা মহানবীর ক্ষোভের সম্মুখীন হয়ে তাদের অবস্থান থেকে সরে এসে পুনরায় আবেদন করল, তাদের প্রতিমালয় ও মন্দিরগুলো এক মাসের জন্য বহাল রাখতে হবে।

যে নবীর মৌলিক লক্ষ্যই হচ্ছে একত্ববাদের প্রসার, প্রতিমালয়ের ধ্বংসসাধন এবং মূর্তিসমূহ ভেঙে ফেলা, তাঁর কাছে এ ধরনের আবেদন পেশ করা ছিল সত্যিই লজ্জাকর। তাদের এ বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, তারা এমন এক ইসলাম চাচ্ছে যা তাদের স্বার্থ ও অভ্যন্তরীণ ঝোঁকসমূহের ওপর মোটেই আঘাত হানবে না; আর তা না হলে তারা এ ধরনের ইসলাম মোটেই চাচ্ছে না। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা তাদের আবেদনের অবমাননাকর দিকগুলো বুঝতে পেরে সাথে সাথে অজুহাত পেশ করে বলল : আমরা আমাদের গোত্রের বোকা মহিলা ও পুরুষদের মুখ বন্ধ করা এবং তায়েফ ভূ-খণ্ডে ইসলাম ধর্মের আগমনের পথে বিদ্যমান সব ধরনের বাধা অপসারণের জন্য এ ধরনের আবেদন জানিয়েছিলাম। মহানবী যখন এ ধরনের শর্তের ব্যাপারে সম্মত হচ্ছেন না, তখন তিনি যেন প্রতিমা ও মূর্তিগুলো নিজেদের হাতে ধ্বংস করা থেকে সাকীফ গোত্রের অধিবাসীদের অব্যাহতি দেন এবং অন্য ব্যক্তিদের তায়েফের মূর্তিগুলো ধ্বংস করার দায়িত্ব প্রদান করেন।” মহানবী এ শর্ত মেনে নেন। কারণ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এটাই ছিল যে, বাতিল উপাস্যগুলো যেন মানব জাতির মাঝ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়- হোক তা স্বয়ং তায়েফবাসীদের হাতে বা অন্য কোন ব্যক্তির হাতে।

তাদের দ্বিতীয় শর্ত ছিল মহানবী (সা.) যেন তাদের নামায পড়া থেকে অব্যাহতি দেন। তারা ভেবেছিল, মহানবী (সা.) আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের নেতাদের মতো মহান আল্লাহর শরীয়ত পরিবর্তন করে দিতে পারেন অর্থাৎ একদলকে আইনের অধীন করতে পারেন এবং আরেক দলকে আইন পালন থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন। অথচ তারা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অমনোযোগী থেকে গিয়েছিল যে, তিনি ইলাহী ওহীর অনুসারী এবং শরীয়তের বিধান সামান্য খড়-কুটো পরিমাণও কম-বেশি করতে পারেন না।

তাদের প্রদত্ত এ শর্ত থেকে প্রতীয়মান হয়ে যায়, তখনও তাদের মধ্যে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মনোবৃত্তি সৃষ্টি হয় নি এবং ইসলাম ধর্মের প্রতি তাদের ঝোঁক এমন সব অবস্থার ফল ছিল, যা তাদেরকে বাহ্যত ইসলাম ধর্মের দিকে ধাবিত করেছিল; আর তা না হলে ইসলামের বিধানসমূহের ক্ষেত্রে বৈষম্যের পথ অবলম্বন অর্থাৎ কিছু বিধান পালন এবং অপর কিছু বিধান ত্যাগ করার কোন যুক্তি থাকতে পারে না। ইসলাম ও ঈমান (মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস) হচ্ছে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ ও আত্মিক আত্মসমর্পণ, যার ছায়ায় মহান আল্লাহর যাবতীয় বিধান আগ্রহ সহকারে মেনে নেয়া ও পালন করা সম্ভব হয়। কেবল এ অবস্থায় ইলাহী বিধানসমূহ পালন করার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক চিন্তা ও আচরণ মানবাত্মা ও কল্পনার জগতে প্রবেশ করার পথ খুঁজে পাবে না।

মহানবী (সা.) তাদের এ শর্তের জবাবে বলেছিলেন :لا خير فِى دين لا صلاة معه অর্থাৎ যাতে নামায নেই, সে দীনে কোন কল্যাণ নেই।

যে মুসলমান রাত-দিনে নিজ স্রষ্টা ও প্রভুর সামনে বিনয়াবনত হয় না ও মাথা নত করে না এবং তাঁর কথা স্মরণ করে না, সে আসলে মুসলমানই নয়।

উভয় পক্ষ তাদের নিজ নিজ শর্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সমঝোতায় উপনীত হলে বেশ কিছু ধারা ও শর্ত সম্বলিত একখানা চুক্তিপত্র মহানবী (সা.) কর্তৃক সম্পাদিত হয়েছিল। মহানবী প্রতিনিধি দলকে বিদায় দিলেন যাতে তারা তাদের গোত্রের কাছে প্রত্যাবর্তন করে। (বিদায়ের প্রাক্কালে) ঐ ছয় সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দলের মধ্য থেকে সবচেয়ে তরুণ ব্যক্তি, যিনি মদীনায় অবস্থানকালে পবিত্র কুরআন ও শরীয়তের বিধান শিক্ষা লাভে অধিক আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, মহানবী তাঁকে (প্রতিনিধি দলের) প্রধান হিসেবে মনোনীত এবং তায়েফের সাকীফ গোত্রের মাঝে তাঁর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি নিযুক্ত করলেন। আর সে সাথে নবনিযুক্ত প্রতিনিধিকে জামাআতে নামায পড়ানোর সময় দুর্বল ও অসুস্থ ব্যক্তিদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে নামায দীর্ঘায়িত না করার উপদেশ দিয়েছিলেন।

পরে মুগীরাহ্ ও আবু সুফিয়ান মহানবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দলের সাথে তায়েফ গিয়ে সেখানকার প্রতিমা ও মূর্তিগুলো ধ্বংস করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। যে আবু সুফিয়ান আগের দিন পর্যন্ত মূর্তিগুলোর রক্ষক ছিল এবং সেগুলো সংরক্ষণ করার পথে রক্তবন্যা প্রবাহিত করেছিল, সে কুঠার নিয়ে তায়েফের মূর্তি ও প্রতিমাগুলো ভেঙে সেগুলোকে জ্বালানী কাঠের স্তূপে পরিণত করেছিল এবং প্রতিমাগুলোর অলংকার বিক্রি করে মহানবীর নির্দেশ মতো উরওয়াহ্ ও তাঁর ভাই আসওয়াদের সকল ঋণ পরিশোধ করেছিল।৪৪৩

ছাপ্পান্নতম অধ্যায় : নবম হিজরীর ঘটনাপ্রবাহ

মিনা দিবসের ঘোষণাপত্র

হিজরতের নবম বর্ষের শেষের দিকে ওহীর ফেরেশতা সূরা তাওবার কয়েকখানা আয়াত নিয়ে এসে মহানবী (সা.)-কে দায়িত্ব প্রদান করলেন, তিনি যেন হজ্বের মৌসুমে ৪ ধারা সম্বলিত ঘোষণাপত্র সহ এ আয়াতসমূহ পাঠ করার জন্য এক ব্যক্তিকে পবিত্র মক্কায় প্রেরণ করেন। এ সব আয়াতে মুশরিকদের যে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করা হয় এবং (চুক্তি সম্পাদনকারীরা যে সব চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছে এবং কার্যত লঙ্ঘন করে নি, কেবল সে সব চুক্তি ব্যতীত) সকল চুক্তি বাতিল করে দেয়া হয় এবং মুশরিক নেতারা ও তাদের অনুসারীদের স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়, চার মাসের মধ্যে তাওহীদী আদর্শে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী হুকুমতের সাথে যেন নিজেদের সম্পর্ক ও দায়িত্বটা সুস্পষ্ট করে নেয় এবং তারা যদি এ চার মাস সময়সীমার মধ্যে শিরক ও মূর্তিপূজা ত্যাগ না করে, তা হলে তাদের থেকে নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হবে।

প্রাচ্যবিদরা যখনই ইসলামের ইতিহাসের এ পর্যায়ে উপনীত হন, তখনই তারা ইসলামের প্রতি তাদের তীক্ষ্ণ আক্রমণগুলো চালনা করতে থাকেন এবং (মুশরিকদের প্রতি ইসলাম ও মহানবীর) এ চূড়ান্ত কঠোর আচরণকে আকীদা-বিশ্বাস ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী বিবেচনা করেন। তবে তারা যদি সব ধরনের গোঁড়ামি পরিহার করে ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়ন করতেন এবং এ বিষয়, যা সূরা তাওবা এবং ঐতিহাসিক গ্রন্থাদিতে বর্ণিত হয়েছে, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পর্যালোচনা করতেন, তা হলে সম্ভবত তারা কম ভ্রান্তির শিকার হতেন এবং প্রত্যয়ন করতেন যে, এ পদক্ষেপ কখনই আকীদা-বিশ্বাস ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়, যা বিশ্বের সকল বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে সম্মানার্হ। এ ঘোষণাপত্র জারির মূল উদ্দেশ্যসমূহ ছিল নিম্নরূপ :

১. জাহিলীয়াতের যুগে আরবদের প্রথা ছিল এই যে, পবিত্র কাবা তাওয়াফ ও যিয়ারতকারী প্রত্যেক ব্যক্তি যে পোশাক পরে কাবা তাওয়াফ করত, তা দরিদ্রকে দান করত এবং তার একটির বেশি পোশাক না থাকলে পোশাক ধার করে তা পরে তাওয়াফ করত, যাতে সে দরিদ্রকে তার পোশাক দান করতে বাধ্য না হয়। আর ধার করা সম্ভব না হলে তাকে পোশাকবিহীন অবস্থায় তাওয়াফ করতে হতো।

একদিন এক সুন্দরী মহিলা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলে তার একটির বেশি পোশাক না থাকায় তখনকার কুসংস্কারমূলক প্রথা অনুসারে সে বিবস্ত্র হয়ে তাওয়াফ করতে বাধ্য হলো। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র স্থানে এ ধরনের তাওয়াফ, তাও আবার বিবস্ত্র হয়ে, কতই না মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে!

২. সূরা তাওবা অবতীর্ণ হওয়ার সময় মহানবী (সা.)-এর বে সাত অর্থাৎ নবুওয়াতের মাকামে আনুষ্ঠানিক সমুন্নতির পর থেকে বিশ বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল এবং এ সময় আরব উপদ্বীপের মুশরিক ও মূর্তিপূজকদের কানে পৌত্তলিকতাবাদ ও মূর্তিপূজায় বাধাদান সংক্রান্ত ইসলামের শক্তিশালী যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ পৌঁছে গিয়েছিল; আর ঐ দিন পর্যন্ত মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী শিরক্, পৌত্তলিকতা ও মূর্তি পূজা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে জবরদস্তি করে থাকলে একমাত্র অন্ধ গোঁড়ামি ও আক্রোশ ছাড়া এর আর কোন কারণ ছিল না। এ কারণেই তখন সমাজ সংস্কারের জন্য সর্বশেষ ঔষধ প্রয়োগ তথা শক্তি ব্যবহার করে মূর্তিপূজা, শিরক ও পৌত্তলিকতার সকল রূপ ও নিদর্শন গুঁড়িয়ে ফেলা, এ মূর্তিপূজাকে মহান আল্লাহ্ ও মানুষের সমুদয় অধিকার লঙ্ঘন বলে গণ্য করা এবং এভাবে মানব সমাজে শত শত মন্দ প্রথার মূলোৎপাটনের সময় এসে গিয়েছিল।

তবে যে সব প্রাচ্যবিদ এ ধরনের পদক্ষেপকে আকীদা-বিশ্বাস ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, যা পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও আধুনিক সভ্যতার মূল ভিত্ বলে গণ্য,- তার সাথে সাংঘর্ষিক ও পরিপন্থী বলে বিবেচনা করেন, তাঁরা একটি বিষয়ে অমনোযোগী থেকে গেছেন। কারণ আকীদা-বিশ্বাস ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা যে পর্যন্ত ব্যক্তি ও সমাজের সৌভাগ্যের ক্ষতি সাধন না করবে, সে পর্যন্ত তা সম্মানার্হ। এর অন্যথা হলে যুক্তি-বুদ্ধির আলোকে এবং বিশ্বের সকল চিন্তাশীল ব্যক্তির অনুসৃত রীতি অনুসারে এ ধরনের স্বাধীনতার শতকরা এক শ’ ভাগ অর্থাৎ পুরোপুরি বিরোধিতা করা অবশ্য কর্তব্য হয়ে যাবে।

উদাহরণস্বরূপ , আজ ইউরোপে মুষ্টিমেয় ইন্দ্রিয়পরায়ণ যুবক কতকগুলো ভ্রান্ত চিন্তাধারার বশবর্তী হয়ে সমাজে নগ্নতাবাদের (Nudism)সমর্থক হয়ে যাচ্ছে এবং দেহের কিয়দংশ আবৃত করাই হচ্ছে ( যৌন কামনা - বাসনা কেন্দ্রিক ) উত্তেজনা এবং চারিত্রিক অবক্ষয় , দুর্নীতি অনাচারের মূল কারণ - ধরনের শতকরা এক ভাগ বালসুলভ যুক্তি ধারণার ভিত্তিতে গোপন ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে সেখানে বিবস্ত্র অবস্থায় আবির্ভূত হচ্ছে। সুস্থ মানব বিবেক মন কি অনুমতি দেয় যে, মত প্রকাশের স্বাধীনতার শিরোনামে এ সব তরুণদের হাত আমরা উন্মুক্ত রাখব এবং বলব যে, মতামত, চিন্তা-ভাবনা ও বিশ্বাসের প্রতি অবশ্যই সম্মান প্রদর্শন করতে হবে, নাকি এ সব তরুণের ও সমাজের কল্যাণের জন্য আমাদের অবশ্যই এ ধরনের বোকামিপূর্ণ চিন্তা-ভাবনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা উচিত? এটা শুধু ইসলাম ধর্মের অনুসৃত পন্থাই নয়, বরং বিশ্বের সকল জ্ঞানী যে সব ধ্যান-ধারণা ও কর্মকাণ্ড মানব সমাজের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম করেন। আর এ সংগ্রাম আসলে অধঃপতিত দলগুলোর বোকামিপূর্ণ বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে সংগ্রাম।

মূর্তিপূজা কতকগুলো অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ও অলীক চিন্তা-ভাবনার চেয়ে বেশি কিছু নয়। উল্লেখ্য, এ সব অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ও অলীক চিন্তা-ভাবনা শত শত মন্দ অভ্যাস ও প্রথার প্রবর্তন করে। আর মহানবী (সা.) মূর্তিপূজক ও মুশরিকদের পথ প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন এবং বিশ বছর গত হবার পর এই ফ্যাসাদ ও অনাচারের মূলোৎপাটন করার জন্য সর্বশেষ মাধ্যম হিসেবে সামরিক শক্তি ব্যবহার করার সময় হয়ে গিয়েছিল।

৩. অপর দিকে হজ্ব হচ্ছে সর্ববৃহৎ ইসলামী ইবাদত, সবচেয়ে বড় ধর্মীয় নিদর্শন। আর এ সূরা অবতীর্ণ হবার দিন পর্যন্ত শিরকের প্রতিভূদের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম ও মহানবীর দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে তিনি মুসলমানদের পবিত্র হজ্বের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান যথাযথভাবে ও সব ধরনের জাহিলী রীতি-নীতির বাইরে শিক্ষা দিতে পারেন নি। এ কারণে অত্যাবশ্যক হয়ে গিয়েছিল যে, এ বিশাল ইসলামী জনসমাবেশে মহানবী (সা.) স্বয়ং অংশগ্রহণ করে ব্যবহারিকভাবে মুসলমানদের এ মহৎ ইবাদত অনুষ্ঠানের শিক্ষা দেবেন। তবে তিনি ঐ অবস্থায় কেবল এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারতেন, যখন মহান আল্লাহর হারাম শরীফ এবং এর চারপাশের অঞ্চল মুশরিকদের- যারা ইবাদত-বন্দেগীর মাকাম কতকগুলো প্রস্তর ও কাঠের তৈরি মূর্তির কাছে সোপর্দ করেছিল,- থেকে মুক্ত ও পবিত্র হয়ে যাবে এবং মহান আল্লাহর হারাম তাঁর প্রকৃত বান্দা ও ইবাদতকারীদের জন্য একান্তভাবে নির্দিষ্ট হবে।

৪. মহানবী (সা.)-এর সংগ্রাম বিশ্বাসের স্বাধীনতার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল না। আকীদা-বিশ্বাস এমন এক বিষয় যা বলপ্রয়োগ করে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। আকীদা-বিশ্বাসের কেন্দ্র হচ্ছে মানুষের হৃদয়, যা অত্যন্ত দুর্ভেদ্য এবং সহজে বশীভূত হয় না। আর আকীদা-বিশ্বাসের উদ্ভব কতকগুলো মূল ভিত ও পূর্ব পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল। এ সব মূল ভিত ও পূর্ব পদক্ষেপ আকীদা-বিশ্বাসের উৎপত্তির প্রক্রিয়াকে নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু মূল ভিত ও নীতিমালার অনুপস্থিতিতে আকীদা-বিশ্বাসের উদ্ভব একেবারে অসম্ভব। সুতরাং আকীদা-বিশ্বাস আসলে বল প্রয়োগের বিষয় নয়। বরং মহানবী (সা.)-এর সংগ্রাম ছিল এই শিরকী আকীদা-বিশ্বাসের বাহ্য অবয়বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। আর মূর্তিপূজা ছিল এ শিরকী আকীদা-বিশ্বাসের বাহ্য রূপ ও নিদর্শনস্বরূপ। এ কারণেই মহানবী (সা.) প্রতিমালয়গুলো ধ্বংস করেছিলেন এবং সকল প্রতিমা ও মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাই তিনি আকীদা-বিশ্বাসের জগৎ ও হৃদয়গুলোর মধ্যেকার বিপ্লব ও আমূল পরিবর্তনের বিষয়কে কালের আবর্তনের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন যা আপনাআপনি এ ধরনের বিপ্লব ও আমূল পরিবর্তন আনয়ন করবে।৪৪৪

উল্লিখিত চার কারণের ভিত্তিতে মহানবী (সা.) হযরত আবু বকরকে ডেকে এনে সূরা তাওবার প্রথম কয়েক আয়াত শিক্ষা দেন এবং চল্লিশ জন মুসলমানকে৪৪৫ সাথে নিয়ে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা এবং যে সব আয়াতে মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কথা উল্লিখিত আছে, ঈদুল আযহার দিনে সেসব (মিনায় হাজীগণের সমাবেশে) পাঠ করার নির্দেশ দেন।

হযরত আবু বকর মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে সফরের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। এর কিছুক্ষণ পরই ওহীর ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়ে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে (বিশেষ নির্দেশ সম্বলিত) এক বাণী (মহানবীর ওপর) অর্পণ করলেন। তা ছিল এই যে, মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের বিষয়টি স্বয়ং মহানবী বা তাঁর আহলে বাইতভুক্ত কোন ব্যক্তিকে জনগণের কাছে ঘোষণা করতে হবে।৪৪৬ এ কারণেই মহানবী (সা.) হযরত আলী (আ.)-কে ডেকে এনে পুরো বিষয়টি তাঁকে জানালেন ও তাঁর বিশেষ সওয়ারী পশুটি তাঁকে দিলেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন যত শীঘ্র সম্ভব মদীনা ত্যাগ করেন, যাতে তিনি পথিমধ্যে হযরত আবু বকরের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর কাছ থেকে আয়াতসমূহ নিয়ে নেন এবং ঈদুল আযহার দিন মিনার বিশাল হজ্ব সমাবেশ, যেখানে আরব উপদ্বীপের সকল অঞ্চল থেকে জনগণ অংশগ্রহণ করবে, সেখানে একটি ঘোষণাপত্র সমেত মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ সংক্রান্ত (সূরা তাওবার) আয়াতসমূহ পাঠ করেন।

এ ঘোষণাপত্রের ধারাসমূহ ছিল নিম্নরূপ :

ক. মহান আল্লাহর ঘরে (কাবা শরীফ) মূর্তিপূজকদের প্রবেশাধিকার নেই;

খ. উলঙ্গাবস্থায় তাওয়াফ নিষিদ্ধ;

গ. এরপর থেকে কোন মূর্তিপূজকই আর হজ্ব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারবে না;

ঘ. যারা মহানবী (সা.)-এর সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করেছিল এবং পুরো সময় ধরে নিজেদের চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছে (চুক্তি রক্ষা করেছে), তাদের চুক্তি এবং চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রাণ ও সম্পদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে। তবে যে সব মুশরিক মুসলমানদের সাথে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হয় নি বা কার্যত চুক্তি ভঙ্গ করেছে, তাদেরকে এ তারিখ (১০ যিলহজ্ব) থেকে ৪ মাসের সময় দেয়া হচ্ছে, যাতে তারা ইসলামী হুকুমতের সাথে তাদের অবস্থান ও দায়িত্ব স্পষ্ট করে নেয় অর্থাৎ হয় তারা তাওহীদপন্থীদের কাতারভুক্ত হবে এবং শিরক ও দ্বিত্ববাদের সকল নিদর্শন ও বহিঃপ্রকাশের ধ্বংসসাধন করবে অথবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।৪৪৭

আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) একটি কাফেলাকে সাথে নিয়ে মহানবীর বিশেষ সওয়ারী পশুর উপর আরোহণ করে পবিত্র মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। এ কাফেলায় জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্ আনসারীও ছিলেন। জুহ্ফাহ্’ নামক স্থানে হযরত আলী (আ.) হযরত আবু বকরের সাথে মিলিত হয়ে মহানবী (সা.)-এর বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছে দিলেন; আর তিনিও হযরত আলীর কাছে আয়াতসমূহ হস্তান্তর করলেন।

শিয়া মুহাদ্দিসগণ এবং কতিপয় সুন্নী মুহাদ্দিস বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আলী (আ.) বললেন: মহানবী (সা.) আপনাকে আমার সাথে মক্কা গমন বা এখান থেকে মদীনায় ফিরে যাবার ব্যাপারে ইখতিয়ার দিয়েছেন।” হযরত আবু বকর মক্কাভিমুখে যাত্রা অব্যাহত রাখার চেয়ে মদীনায় প্রত্যাবর্তনকে অগ্রাধিকার দিলেন এবং মদীনায় ফিরে গেলেন। তিনি মহানবী (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন : আপনি আমাকে এমন এক কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচনা করেছিলেন, যা সম্পন্ন করার জন্য অন্যরাও আগ্রহী ছিল এবং সবাই মনে মনে তা সম্পন্ন করার গৌরব অর্জনের ইচ্ছা পোষণ করত। যখন আমি খানিকটা পথ অতিক্রম করেছি, তখনই আপনি আমাকে এ দায়িত্ব থেকে অপসারণ করেছেন। তা হলে কি আমার ব্যাপারে মহান আল্লাহর ওহী অবতীর্ণ হয়েছে? মহানবী (সা.) তখন তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন : হযরত জিবরীল (আ.) এসে আমার কাছে মহান আল্লাহর নির্দেশবাণী পৌঁছে দিয়ে বলেছেন : আমি এবং যে ব্যক্তি আমার আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত, সে ব্যতীত আর কেউ এ কাজ সম্পন্ন করার যোগ্য নয়।”৪৪৮ তবে আহলে সুন্নাত বর্ণিত কতিপয় রেওয়ায়েতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হজ্ব অনুষ্ঠান পরিচালনা করার দায়িত্ব হযরত আবু বকরের উপর ন্যস্ত ছিল এবং হযরত আলী (আ.) কেবল মিনা দিবসে জনসমক্ষে মহানবীর ঘোষণাপত্র এবং (মুশরিকদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের) আয়াতসমূহ পাঠ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।৪৪৯

আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করলেন। ১০ যিলহজ্ব তিনি জামরা-ই-আকাবার উপর দাঁড়িয়ে সূরা তাওবার প্রথম ১৩ আয়াত পাঠ করলেন। এরপর তিনি দৃঢ় মনোবল সহকারে উচ্চকণ্ঠে মহানবীর ঘোষণাপত্র পাঠ করলেন, যেন তা সবাই শুনতে পায়। মুসলমানদের সাথে যেসব মুশরিকের কোন চুক্তি ছিল না, তিনি তাদের সবাইকে জানিয়ে দিলেন যে, তাদেরকে কেবল চার মাসের সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং তাদের উচিত নিজেদের আবাসস্থল ও চারপাশের পরিবেশ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিরক ও মূর্তিপূজার সকল নিদর্শন থেকে মুক্ত ও পবিত্র করা। এর অন্যথা হলে তাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা উঠিয়ে নেয়া হবে।

এ সব আয়াত ও এ ঘোষণাপত্রের ফলাফল এই হয়েছিল যে, চার মাস অতিবাহিত হতে না হতেই মুশরিক ও মূর্তিপূজকরা দলে দলে একত্ববাদ অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং হিজরতের দশম বর্ষের মাঝামাঝিতে সমগ্র আরব উপদ্বীপ থেকে মূর্তিপূজা মূলোৎপাটিত হয়ে যায়।

পঁচিশতম পত্র

১৬ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

১।   এ হাদীসের প্রতি তাঁর বিশ্বাস।

২।   এ বিষয়ে আরো আলোচনার আহবান।

১। সেই শক্তির প্রতি ঈমান আনছি যিনি আপনার জ্ঞানের আলোয় আমার অন্ধকারকে দূরীভূত করে আলোকিত করেছেন ও আমার অস্পষ্টতাকে দূর করেছেন। সেই আল্লাহর প্রশংসা যিনি আপনাকে তাঁর নিদর্শন ও চিহ্নে পরিণত করেছেন।

২। এ বিষয়ে আরো প্রামাণ্য হাদীস উপস্থাপন করুন।

ওয়াসসালাম

ছাব্বিশতম পত্র

১৭ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

১।   হযরত আলী (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে দশটি ফজীলত বর্ণিত হয়েছে যা অন্য কারো মধ্যে ছিল না।

২।   কেন আমরা এ হাদীস হতে দলিল পেশ করেছি?

১। হাদীসে দার (যে হাদীসটি বিংশতম পত্রে উল্লেখ করেছি) ছাড়াও আরেকটি হাদীস এখানে বর্ণনা করছি আপনার অবগতির জন্য।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে,ইমাম নাসায়ী তাঁর খাছায়েসুল আলাভীয়া তে,হাকিম তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থের ৩য় খণ্ডে,যাহাবী তাঁর তালখিস গ্রন্থে (হাদীসটির বিশুদ্ধতাকে স্বীকার করে) ও সুনান লেখকগণ তাঁদের সুনানে আমর ইবনে মাইমুন হতে এ হাদীসটি এনেছেন এবং এর বিশুদ্ধতার বিষয়ে একমত হয়েছেন। আমর বলেন, ইবনে আব্বাসের নিকট বসেছিলাম,নয় দল লোক তাঁর নিকট এসে বলল : আমাদের সঙ্গে আসুন নতুবা আপনার নিকট হতে সবাইকে চলে যেতে বলুন। আপনার সঙ্গে আমাদের কথা আছে। ইবনে আব্বাস বললেন : তোমাদের সঙ্গে যাব। আমর ইবনে মাইমুন বলেন, ইবনে আব্বাস তখনও অন্ধ হন নি,তাঁর চোখ ভাল ছিল। ইবনে আব্বাস তাদের সঙ্গে একদিকে চলে গেলেন। তাঁরা কি কথা বললেন তা আমরা শুনি নি। কিছুক্ষণ পর ইবনে আব্বাস তাঁর পরিধেয় বস্ত্রটি ঝাড়তে ঝাড়তে ফিরে এলেন ও বলতে লাগলেন : এমন ব্যক্তির তারা নিন্দা করছে যার দশটি ফজীলত রয়েছে যা কোন ব্যক্তির মধ্যেই নেই। তারা এমন ব্যক্তির নিন্দা করছে যার সম্পর্কে স্বয়ং রাসূল (সা.) বলেছেন : এমন ব্যক্তিকে আমি আজ যুদ্ধে প্রেরণ করবো যাকে আল্লাহ্ কোনদিনই লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করবেন না,আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তাকে ভালবাসে আর সেও আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে। যখন রাসূল এ মর্যাদার কথা বলছিলেন তখন সকলেই ঘাড় টান করে অপেক্ষা করছিল এ সৌভাগ্য তার ভাগ্যে জুটুক। তখন রাসূল (সা.) বললেন : আলী কোথায়? আলী আসলেন,তাঁর তখন চক্ষু পীড়া ছিল,তিনি কিছু দেখতে পারছিলেন না। রাসূল নিজ জিহ্বার পানি তাঁর চোখে লাগিয়ে দিলেন এবং তিনবার যুদ্ধের পতাকাটি এদিক-ওদিক নাড়িয়ে আলীর হাতে দিলেন। আলী তা নিয়ে খায়বারে গেলেন ও যুদ্ধে জয়ী হয়ে ইহুদী গোত্রপতি হুয়াইয়ের কন্যা সাফিয়াসহ অন্যান্যদের বন্দী করে রাসূল (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হলেন।

ইবনে আব্বাস বলেন : নবী (সা.) অমুককে (হযরত আবু বকর) মক্কাবাসীদের জন্য সূরা তওবা পাঠ করে শুনানোর জন্য প্রেরণ করলেন এবং তারপর আলীকে তাঁর নিকট হতে তা গ্রহণ করতে বললেন ও ঘোষণা করলেন : এমন ব্যক্তি এ সূরা পাঠ করবে যে আমা হতে এবং আমি তার হতে।

ইবনে আব্বাস বলেন : নবী (সা.) তাঁর সকল চাচা ও চাচার পুত্রদের প্রতি আহবান জানালেন দুনিয়া আখেরাতে তাঁর সহযোগী হতে কিন্তু তারা তা করতে সম্মত না হলে আলী দাঁড়িয়ে বললেন: আমি দুনিয়া ও আখেরাতে আপনার সহযোগী হব। রাসূল (সা.) বললেন : তুমি দুনিয়া ও আখেরাতে আমার বন্ধু,আমার সহযোগী। অতঃপর পুনরায় তাদের প্রতি এ আহবান জানালেন। তবুও তারা কেউ সম্মত হলো না,শুধু আলী দাঁড়িয়ে সাড়া দিলেন। আর রাসূল বললেন : তুমি দুনিয়া ও আখেরাতে আমার সহযোগী ও বন্ধু।

ইবনে আব্বাস বলেন : আলী হযরত খাদিজাহর পর রাসূলের ওপর ঈমান আনয়নকারী প্রথম ব্যক্তি।

তিনি আরো বলেন : রাসূল (সা.) নিজ চাদরকে আলী,ফাতিমা,হাসান ও হুসাইনের ওপর বিছিয়ে দিলেন ও বললেন : হে আহলে বাইত! আল্লাহ্ ইচ্ছা করেছেন তোমাদের হতে সকল

পাপ-পঙ্কিলতা দূর করতে ও তোমাদের পবিত্র করতে।২৩৪

ইবনে আব্বাস বলেন : আলী নিজের জীবনকে বিপন্ন করে রাসূল (সা.)-এর ঘুমানোর স্থানে তাঁর পোষাক পড়ে শুয়েছিলেন,রাসূলের জন্য তাঁর জীবনকে আল্লাহর নিকট বিক্রয় করেছিলেন,তখন কাফেররা তাঁর প্রতি পাথর বর্ষণ করছিল।

তিনি বলেন : নবী তাবুকের যুদ্ধের জন্য যাত্রা করলেন,মদীনায় লোকেরাও তাঁর সঙ্গে মদীনা হতে বের হলো। আলী তাঁকে বললেন : আমিও আপনার সঙ্গে যাব। রাসূল (সা.) বললেন : না। আলী কেঁদে ফেললেন। নবী তাঁকে বললেন : তুমি কি এতে খুশী নও,তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কে হারুন ও মূসার মধ্যকার সম্পর্কের মত হোক? তবে পার্থক্য এই,আমার পর কোন নবী নেই। এটি ঠিক হবে না যে,আমি চলে যাব অথচ তুমি আমার স্থলাভিষিক্ত হবে না।

নবী (সা.) তাঁকে (আলীকে) বলেছেন :أنت ولِيّ كلّ مؤمن بعدي و مؤمنة   অর্থাৎ তুমি আমার পর সকল মুমিন পুরুষ ও নারীর অভিভাবক।

ইবনে আব্বাস আরো বলেন : নবী মসজিদের মধ্যে অতিক্রমকারী সকল দ্বার বন্ধ করে দেন শুধু আলীর দ্বার ব্যতীত। আলী অপবিত্র (জুনুব) অবস্থায়ও মসজিদে প্রবেশ করতেন এবং ঐ দ্বার ব্যতীত বাইরে যাবার অন্য কোন পথও ছিল না। নবী (সা.) বলেছেন : আমি যার মাওলা (অভিভাবক) আলীও তার মাওলা।

উপরোক্ত ঘটনা বর্ণনা করে হাকিম বলেছেন, এ হাদীস সনদের দিক থেকে সঠিক,তদুপরি বুখারী ও মুসলিম তা বর্ণনা করেন নি। তদ্রুপ যাহাবীও তাঁর তালখিস গ্রন্থে হাদীসটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন।

২। এ হাদীসের মধ্যে যে সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে তা কারো নিকট গোপন নেই। এ হাদীস এটিই প্রমাণ করে যে,হযরত আলী (আ.) রাসূল (সা.)-এর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত।

আপনি কি এখানে লক্ষ্য করেছেন রাসূল (সা.) কিরূপে আলী (আ.)-কে দুনিয়া ও আখেরাতের মাওলা বা অভিভাবক হিসেবে অভিহিত করে তাঁকে তাঁর অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি তাঁদের সম্পর্ককে হারুন ও মূসার মত বলেছেন শুধু এ পার্থক্য ব্যতীত যে,তাঁর পর কেউ নবী নেই অর্থাৎ নবুওয়াতের মর্যাদা ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর অন্য সকল মর্যাদা আলী (আ.)-এরও রয়েছে।

আপনি সম্যক জ্ঞাত,হযরত হারুন ও মূসা (আ.)-এর মধ্যে সম্পর্কের ধরন কিরূপ ছিল। হযরত হারুন (আ.) মূসা (আ.)-এর সঙ্গে নবুওয়াতের ক্ষেত্রে অংশীদার ছিলেন। তাছাড়া তিনি তাঁর সহযোগী,পরামর্শদাতা,খলীফা ও প্রতিনিধিও ছিলেন। তাই হযরত মূসা (আ.)-এর মত হযরত হারুনের অনুসরণ সকল উম্মতের জন্য অপরিহার্য বা ওয়াজিব ছিল। এজন্যই হযরত মূসা (আ.) দোয়া করেছিলেন, আমার আহল (পরিবার) হতে একজনকে আমার সহযোগী কর,আমার ভাই হারুনকে ও তার মাধ্যমে আমার কোমরকে মজবুত কর ও তাকে আমার কাজের অংশীদার কর। (সূরা ত্বাহা : ২৯)

হযরত মূসা (আ.) হারুনকে বললেন, আমার জাতির মধ্যে আমার স্থলাভিষিক্ত হও। তাদেরকে সংশোধন কর ও অন্যায়কারীদের পথ অবলম্বন কর না। ২৩৫ আল্লাহ্ হযরত মূসা (আ.)-কে বললেন, তুমি আমার নিকট যা চেয়েছিলে তা তোমাকে দেয়া হলো। ২৩৬

সুতরাং এ হাদীস অনুযায়ী আলী (আ.) এ জাতির মধ্যে রাসূল (সা.)-এর খলীফা,তাঁর পরিবারের মধ্যে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ও তাঁর কাজে (খেলাফতের বিষয়ে,নবুওয়াতের বিষয়ে নয়) অংশীদার। তাই আলী (আ.) রাসূলের উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং রাসূলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তাঁর আনুগত্য সর্বাবস্থায় হযরত হারুনের মত যাঁর আনুগত্য মূসা (আ.)-এর উম্মতের ওপর অপরিহার্য ছিল। বিষয়টি দিবালোকের মত স্পষ্ট।

যে কেউ এ হাদীসটি ( মানযিলাত -এর হাদীস) শ্রবণ করবে আলী সম্পর্কে এসব মর্যাদা তার স্মরণে আসবে এবং এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। নবীও তাই এ বিষয়টি সকলের জন্য সুস্পষ্ট করে বলেছেন, এটি ঠিক হবে না,তোমাকে আমার স্থলভিষিক্ত না করেই আমি চলে যাব।

এটি আলী (আ.)-এর খেলাফতের পক্ষে স্পষ্ট দলিল যে,আলীকে নিজের খলীফা মনোনীত না করে যাওয়াকে রাসূল (সা.) সঠিক মনে করেন নি। রাসূল (সা.) তাঁর এ কাজটি আল্লাহর নির্দেশেই করেছিলেন,যেমনটি নিম্নোক্ত আয়াতের তাফসীরে এসেছে-

) يا أَيُّهَا الرَّسُوْل بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّك وَ إِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ(

হে নবী! যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দিন। যদি আপনি তা না করেন তাহলে তাঁর রেসালতের কিছুই আপনি পৌঁছান নি।২৩৭

যদি কেউ এ আয়াতের আপনি তাঁর রেসালতের কিছুই পৌঁছান নি অংশটি লক্ষ্য করেন এবং এর সঙ্গে রাসূলের এ কথাটি নিশ্চয়ই এটি সঠিক হবে না,তোমাকে খলীফা নিযুক্ত না করেই চলে যাব মিলিয়ে দেখেন তাহলে দেখবেন দু টি বাণীই একটি লক্ষ্যকে অনুসরণ করছে।

আমাদের রাসূল (সা.)-এর এ বাণীটি কখনোই ভুলে গেলে চলবে না, তুমি আমার পর সকল মুমিনদের অভিভাবক। এটি অকাট্য দলিল হিসেবে হাদীসে এসেছে যে,আলী (আ.) রাসূল (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ত। প্রসিদ্ধ কবি কুমাইত (আল্লাহ্ তাঁকে রক্ষা করুন) যেমনটি বলেছেন-

কত সুন্দর অভিভাবক তিনি সেই শ্রেষ্ঠ অভিভাবকের পর,যিনি তাকওয়ার কেন্দ্র ও আদবের শিক্ষকের পর মনোনীত হয়েছেন।

ওয়াসসালাম

সাতাশতম পত্র

১৮ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

 ‘ মানযিলাত -এর হাদীসের বিষয়ে সন্দেহ।

মানযিলাত -এর হাদীসটি সহীহ ও মুস্তাফিয (খবরে ওয়াহেদের চেয়ে বহুল প্রচারিত) কিন্তু বিশিষ্ট হাদীসবিদ আমেদী এ হাদীসের সনদের বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন। তাই আপনাদের অনেক শত্রুরই দ্বিধান্বিত হওয়া স্বাভাবিক। আপনি কিরূপে তাদের নিকট এটি প্রমাণ করবেন। উত্তর জানিয়ে বাধিত করুন।

ওয়াসসালাম

আটাশতম পত্র

১৯ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

১।   মানযিলাত -এর হাদীস প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহের অন্যতম।

২।   এ সত্যের সপক্ষে প্রমাণ।

৩।   আহলে সুন্নাহর যে সকল রাবী এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

৪।   এ হাদীসটির বিষয়ে আমেদীর সন্দেহ পোষণের কারণ।

১। আমেদী এ সন্দেহের মাধ্যমে নিজের ওপরই জুলুম করেছেন। কারণ মানযিলাত -এর হাদীসটি সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহের একটি।

২। এ হাদীসের সনদের বিশুদ্ধতার বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। হাদীসটি সম্পর্কে দ্বন্দ্বের কোন অবকাশ নেই এবং এর প্রামাণিকতার বিষয়ে কেউ প্রশ্ন উঠাতে পারেন না,এমন কি যাহাবী অত্যন্ত কঠোরতা সত্ত্বেও মুসতাদরাক গ্রন্থের সারসংক্ষেপে হাদীসটির সহীহ হবার কথা স্বীকার করেছেন।৩৩৮ ইবনে হাজার হাইসামী বিভিন্ন বিষয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকা সত্ত্বেও তাঁর সাওয়ায়েক গ্রন্থের দ্বাদশ পর্বে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন ও এর বিশুদ্ধতার বিষয়টি প্রসিদ্ধ হাদীস বিশারদদের (এ বিষয়ে যাঁদের প্রতি রুজু করা উচিত) সূত্রে বর্ণনা করেছেন।৩৩৯ আপনি এ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করুন। যদি হাদীসটি এতটা প্রমাণ্য না হত তাহলে বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে তা উল্লেখ করতেন না। কারণ বুখারী হযরত আলীর বৈশিষ্ট্য,ফজীলত ও মর্যাদা বর্ণনায় যথেষ্ট সতর্ক ও পারতঃপক্ষে বিরত থাকতেন ও এ বিষয়ে তিনি নিজের ওপর জুলুম করেছেন। মুয়াবিয়া যিনি আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী ও সব সময় তাঁর প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করতেন,এমন কি মিম্বারে আলীর ওপর লানত পড়ার জন্য নির্দেশ জারী করেছিলেন তদুপরি তিনি মানযিলাত -এর হাদীসটি অস্বীকার করেন নি। মুসলিমের৩৪০ সূত্রে উদ্ধৃত হয়েছে : একবার মুয়াবিয়া সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে বললেন : কি কারণে আবু তোরাবের (আলী [আ.]-এর) নিন্দা কর না? সা দ জবাবে বললেন : মহানবী (সা.) তাঁর বিষয়ে তিনটি কথা বলেছেন সেগুলো মনে হওয়ায় এ কাজ হতে আমি বিরত হলাম। ঐ তিনটি বৈশিষ্ট্যের যদি একটিও আমার থাকত তাহলে আরবের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হতেও তা আমার নিকট প্রিয়তর বলে গণ্য হত। নবী (সা.) কোন কোন যুদ্ধের সময় তাঁকে মদীনায় রেখে যেতেন ও বলতেন : তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মূসা ও হারুনের মত হোক তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও? শুধু পার্থক্য এটিই আমার পর তুমি নবী নও।২৪১ মুয়াবিয়া একথা শুনে চুপ হয়ে গেলেন ও সা দকে আলীর প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করা হতে বিরত থাকার অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন।

আরো বাড়িয়ে বললে বলা যায় স্বয়ং মুয়াবিয়া মানযিলাত -এর হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার তাঁর সাওয়ায়েক ২৪২ গ্রন্থে বলেছেন, আহমাদ বর্ণনা করেছেন : এক ব্যক্তি কোন একটি বিষয়ে মুয়াবিয়াকে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন : আলী এ বিষয়ে অধিকতর জ্ঞাত,তাকে প্রশ্ন কর। লোকটি বলল : আলী অপেক্ষা তোমার উত্তর আমার নিকট অধিকতর প্রিয়। মুয়াবিয়া বললেন : মন্দ কথা বলেছ,এমন ব্যক্তি হতে তুমি বীতশ্রদ্ধ যাঁকে রাসূল (সা.) জ্ঞানের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল মুখ মনে করতেন ও তাঁকে বলেছেন :

أَنْتَ مِنِّيْ بِمَنْزِلَةِ هَارُوْنَ مِنِ مُوْسى إِلّا أَنَّهُ لا نَبِيَّ بَعْدِي

তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মূসা ও হারুনের মত,শুধু এ পার্থক্য ব্যতীত যে,আমার পর কোন নবী নেই।

যখনই হযরত উমরের জন্য কোন সমস্যা দেখা দিত,তিনি আলী (আ.)-কে ডাকতেন।

সুতরাং মানযিলাত -এর হাদীসটি এমন একটি বিষয় যাতে মুসলমানদের সকল মাজহাব ও দল ঐকমত্য পোষণ করে,হাদীসটির বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

৩। আল জাম বাইনাস্ সিহাহ আস সিত্তাহ্ ২৪৩ আল জাম বাইনাস্ সহীহাইন ২২৪ গ্রন্থের লেখকদ্বয়ও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারীতে তাবুকের যুদ্ধের২৪৫ বর্ণনায় হাদীসটি রয়েছে।

সহীহ মুসলিমে২৪৬ হযরত আলীর ফাজায়েল অধ্যায়ে হাদীসটি এসেছে। এছাড়া সুনানে ইবনে মাজাহ্তে২৪৭ নবী (সা.)-এর সাহাবীদের ফাজায়েল অধ্যায়ে ও মুসতাদরাকে হাকিম -এ হযরত আলীর মানাকিব ২৪৮ বা বৈশিষ্ট্যের আলোচনায় এ হাদীসটি আনা হয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস হতে কয়েকটি সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন২৪৯

আহমাদ তাঁর মুসনাদে ইবনে আব্বাস২৫০ ,আসমা বিনতে উমাইস২৫১ ,আবু সাঈদ খুদরী২৫২ এবং মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান২৫৩ ও আরো কয়েকটি সূত্রে অন্যান্য সাহাবী হতেও হাদীসটি নকল করেছেন।

তাবরানী এ হাদীসটি আসমা বিনতে উমাইস,উম্মে সালামাহ্,হাবিশ ইবনে জুনাদাহ্,ইবনে উমর,ইবনে আব্বাস,জাবির ইবনে সামুরাহ্,যায়েদ ইবনে আরকাম,বাররাহ্ ইবনে আযেব এবং আলী ইবনে আবি তালিব ও অন্যান্যদের হতে বর্ণনা করেছেন।

বাযযার তাঁর মুসনাদে ও তিরমিযী তাঁর সহীহ গ্রন্থে আবু সাঈদ খুদরী হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবদুল বার তাঁর ইসতিয়াব গ্রন্থে হযরত আলী (আ.)-এর পরিচিতি পর্বে হাদীসটি বর্ণনা করে বলেছেন, হাদীসটি বিশুদ্ধতম ও সর্বাপেক্ষা প্রতিষ্ঠিত হাদীস যা সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাসূল (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেন, সা দ হতে এত অধিক সূত্রে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে যে,ইবনে আবি খাইসামাহ্ ও অন্যরাও তা বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবদুল বারের মতে হাদীসটির অন্যান্য বর্ণনাকারীরা হলেন ইবনে আব্বাস,আবু সাঈদ খুদরী,উম্মে সালামাহ্,আসমা বিনতে উমাইস,জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ অনসারী ও আরো কয়েকজন সাহাবী।

যে সকল মুহাদ্দিস,সীরাহ্ লেখক ও হাদীস বর্ণনাকারী তাবুকের যুদ্ধের ঘটনা বর্ণনা করেছেন তাঁরা এ হাদীসটি তাঁদের বর্ণনায় এনেছেন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তীকালের সকল রিজাল লেখকই (শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে) হযরত আলী

(আ.)-এর পরিচিতি বর্ণনায় এ হাদীসটি এনেছেন।

আহলে বাইতের মানাকিব (বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা) বর্ণনাকারী ব্যক্তিরা যেমন আহমাদ ইবনে হাম্বল ও তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলেই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটি এমন এক হাদীস যা সকল যুগেই প্রতিষ্ঠিত হাদীসগুলোর একটি বলে পরিগণিত হত।

৪। অতএব,আমেদীর সন্দেহ (হাদীসটির বিষয়ে) এ ক্ষেত্রে কোন মূল্যই রাখে না,বরং বলা যায় তিনি কোন হাদীসবেত্তা নন ও এ বিষয়ে তাঁর কোন জ্ঞান নেই। উসূলশাস্ত্রের জ্ঞান দিয়ে হাদীসের সনদ ও সূত্র পর্যালোচনা সম্ভব নয়। তাই সুস্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত হাদীসের সনদে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর সে প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

ওয়াসসালাম

উনত্রিশতম পত্র

২০ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

১।   হাদীসটির সনদের বিশুদ্ধতার সত্যায়ন।

২।   হাদীসটির সার্বিকতার বিষয়ে সন্দেহ।

৩।   হাদীসের প্রামাণিকতার (প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের উপযোগিতার) বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন।

১। হাদীসটি ( মানযিলাত -এর হাদীস) যে সুপ্রতিষ্ঠিত সে বিষয়ে আপনার বর্ণনায় আমার সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রে আমেদী যে ভুল করেছেন এর কারণ হাদীসশাস্ত্রে তাঁর জ্ঞানের অভাব। আমি তাঁর বিশ্বাস ও মত উপস্থাপন করে আপনাকে কষ্টে ফেলেছি তাতে আপনি বাধ্য হয়েছেন এ বিষয়ে  প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দিতে। এ ভুলের জন্য আমি আপনার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী। আশা করি বিষয়টিকে ক্ষমার চোখে দেখবেন।

২। আপনাদের বিরোধীদের মধ্যে আমেদী ছাড়াও অনেকেই মনে করেছেন মানযিলাত -এর হাদীসটি সর্বজনীন নয়,বরং তা বিশেষভাবে তাবুকের যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং সে সময়ের জন্যই তিনি রাসূলের স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। এর প্রমাণ হিসেবে তাঁরা এ হাদীসের প্রেক্ষাপট যেখানে রাসূল (সা.) আলীকে মদীনায় তাঁর স্থানে রেখে যাচ্ছেন তার উল্লেখ করেন। ইমাম আলী (আ.) যখন রাসূল (সা.)-কে বললেন, আমাকে কি মহিলা ও শিশুদের মাঝে রেখে যাচ্ছেন? তখন নবী (সা.) তাঁকে বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে মূসার স্থলাভিষিক্ত হারুনের মত তুমি আমার স্থলাভিষিক্ত হও এ পার্থক্য সহ যে আমার পর কোন নবী নেই? বাহ্যিকভাবে রাসূলের উদ্দেশ্য ছিল এটিই বলা,রাসূলের সাথে আলীর সম্পর্ক মূসা (আ.)-এর সঙ্গে হারুন (আ.)-এর সম্পর্কের ন্যায়। কারণ হযরত মূসা (আ.) তুর পর্বতে যাবার সময় নিজের জাতির মধ্যে হারুন (আ.)-কে স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রেখে যান।

সুতরাং এ থেকে বোঝা যায় রাসূল (সা.) বলতে চেয়েছেন তাবুকের যুদ্ধের সময় তাঁর অনুপস্থিতিতে আলী তাঁর স্থলাভিষিক্ত যেমনভাবে মূসা ইবাদতের জন্য তুর পর্বতে যাবায় সময় হারুনকে স্থলাভিষিক্ত করে যান।

৩। তাছাড়া হাদীসটি এক্ষেত্রে প্রমাণ্য না হবারও সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ যদিও হাদীসটি সর্বজনীন তবুও নবুওয়াতের বিষয়টি বাদ যাওয়ায় বাক্যটির বাকী অংশ সর্বজনীনতা হারিয়েছে। তাই হাদীসটি এক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের যোগ্যতা  রাখে না।

ওয়াসসালাম

 

পঁচিশতম পত্র

১৬ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

১।   এ হাদীসের প্রতি তাঁর বিশ্বাস।

২।   এ বিষয়ে আরো আলোচনার আহবান।

১। সেই শক্তির প্রতি ঈমান আনছি যিনি আপনার জ্ঞানের আলোয় আমার অন্ধকারকে দূরীভূত করে আলোকিত করেছেন ও আমার অস্পষ্টতাকে দূর করেছেন। সেই আল্লাহর প্রশংসা যিনি আপনাকে তাঁর নিদর্শন ও চিহ্নে পরিণত করেছেন।

২। এ বিষয়ে আরো প্রামাণ্য হাদীস উপস্থাপন করুন।

ওয়াসসালাম

ছাব্বিশতম পত্র

১৭ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

১।   হযরত আলী (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে দশটি ফজীলত বর্ণিত হয়েছে যা অন্য কারো মধ্যে ছিল না।

২।   কেন আমরা এ হাদীস হতে দলিল পেশ করেছি?

১। হাদীসে দার (যে হাদীসটি বিংশতম পত্রে উল্লেখ করেছি) ছাড়াও আরেকটি হাদীস এখানে বর্ণনা করছি আপনার অবগতির জন্য।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে,ইমাম নাসায়ী তাঁর খাছায়েসুল আলাভীয়া তে,হাকিম তাঁর মুসতাদরাক গ্রন্থের ৩য় খণ্ডে,যাহাবী তাঁর তালখিস গ্রন্থে (হাদীসটির বিশুদ্ধতাকে স্বীকার করে) ও সুনান লেখকগণ তাঁদের সুনানে আমর ইবনে মাইমুন হতে এ হাদীসটি এনেছেন এবং এর বিশুদ্ধতার বিষয়ে একমত হয়েছেন। আমর বলেন, ইবনে আব্বাসের নিকট বসেছিলাম,নয় দল লোক তাঁর নিকট এসে বলল : আমাদের সঙ্গে আসুন নতুবা আপনার নিকট হতে সবাইকে চলে যেতে বলুন। আপনার সঙ্গে আমাদের কথা আছে। ইবনে আব্বাস বললেন : তোমাদের সঙ্গে যাব। আমর ইবনে মাইমুন বলেন, ইবনে আব্বাস তখনও অন্ধ হন নি,তাঁর চোখ ভাল ছিল। ইবনে আব্বাস তাদের সঙ্গে একদিকে চলে গেলেন। তাঁরা কি কথা বললেন তা আমরা শুনি নি। কিছুক্ষণ পর ইবনে আব্বাস তাঁর পরিধেয় বস্ত্রটি ঝাড়তে ঝাড়তে ফিরে এলেন ও বলতে লাগলেন : এমন ব্যক্তির তারা নিন্দা করছে যার দশটি ফজীলত রয়েছে যা কোন ব্যক্তির মধ্যেই নেই। তারা এমন ব্যক্তির নিন্দা করছে যার সম্পর্কে স্বয়ং রাসূল (সা.) বলেছেন : এমন ব্যক্তিকে আমি আজ যুদ্ধে প্রেরণ করবো যাকে আল্লাহ্ কোনদিনই লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করবেন না,আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তাকে ভালবাসে আর সেও আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে। যখন রাসূল এ মর্যাদার কথা বলছিলেন তখন সকলেই ঘাড় টান করে অপেক্ষা করছিল এ সৌভাগ্য তার ভাগ্যে জুটুক। তখন রাসূল (সা.) বললেন : আলী কোথায়? আলী আসলেন,তাঁর তখন চক্ষু পীড়া ছিল,তিনি কিছু দেখতে পারছিলেন না। রাসূল নিজ জিহ্বার পানি তাঁর চোখে লাগিয়ে দিলেন এবং তিনবার যুদ্ধের পতাকাটি এদিক-ওদিক নাড়িয়ে আলীর হাতে দিলেন। আলী তা নিয়ে খায়বারে গেলেন ও যুদ্ধে জয়ী হয়ে ইহুদী গোত্রপতি হুয়াইয়ের কন্যা সাফিয়াসহ অন্যান্যদের বন্দী করে রাসূল (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হলেন।

ইবনে আব্বাস বলেন : নবী (সা.) অমুককে (হযরত আবু বকর) মক্কাবাসীদের জন্য সূরা তওবা পাঠ করে শুনানোর জন্য প্রেরণ করলেন এবং তারপর আলীকে তাঁর নিকট হতে তা গ্রহণ করতে বললেন ও ঘোষণা করলেন : এমন ব্যক্তি এ সূরা পাঠ করবে যে আমা হতে এবং আমি তার হতে।

ইবনে আব্বাস বলেন : নবী (সা.) তাঁর সকল চাচা ও চাচার পুত্রদের প্রতি আহবান জানালেন দুনিয়া আখেরাতে তাঁর সহযোগী হতে কিন্তু তারা তা করতে সম্মত না হলে আলী দাঁড়িয়ে বললেন: আমি দুনিয়া ও আখেরাতে আপনার সহযোগী হব। রাসূল (সা.) বললেন : তুমি দুনিয়া ও আখেরাতে আমার বন্ধু,আমার সহযোগী। অতঃপর পুনরায় তাদের প্রতি এ আহবান জানালেন। তবুও তারা কেউ সম্মত হলো না,শুধু আলী দাঁড়িয়ে সাড়া দিলেন। আর রাসূল বললেন : তুমি দুনিয়া ও আখেরাতে আমার সহযোগী ও বন্ধু।

ইবনে আব্বাস বলেন : আলী হযরত খাদিজাহর পর রাসূলের ওপর ঈমান আনয়নকারী প্রথম ব্যক্তি।

তিনি আরো বলেন : রাসূল (সা.) নিজ চাদরকে আলী,ফাতিমা,হাসান ও হুসাইনের ওপর বিছিয়ে দিলেন ও বললেন : হে আহলে বাইত! আল্লাহ্ ইচ্ছা করেছেন তোমাদের হতে সকল

পাপ-পঙ্কিলতা দূর করতে ও তোমাদের পবিত্র করতে।২৩৪

ইবনে আব্বাস বলেন : আলী নিজের জীবনকে বিপন্ন করে রাসূল (সা.)-এর ঘুমানোর স্থানে তাঁর পোষাক পড়ে শুয়েছিলেন,রাসূলের জন্য তাঁর জীবনকে আল্লাহর নিকট বিক্রয় করেছিলেন,তখন কাফেররা তাঁর প্রতি পাথর বর্ষণ করছিল।

তিনি বলেন : নবী তাবুকের যুদ্ধের জন্য যাত্রা করলেন,মদীনায় লোকেরাও তাঁর সঙ্গে মদীনা হতে বের হলো। আলী তাঁকে বললেন : আমিও আপনার সঙ্গে যাব। রাসূল (সা.) বললেন : না। আলী কেঁদে ফেললেন। নবী তাঁকে বললেন : তুমি কি এতে খুশী নও,তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কে হারুন ও মূসার মধ্যকার সম্পর্কের মত হোক? তবে পার্থক্য এই,আমার পর কোন নবী নেই। এটি ঠিক হবে না যে,আমি চলে যাব অথচ তুমি আমার স্থলাভিষিক্ত হবে না।

নবী (সা.) তাঁকে (আলীকে) বলেছেন :أنت ولِيّ كلّ مؤمن بعدي و مؤمنة   অর্থাৎ তুমি আমার পর সকল মুমিন পুরুষ ও নারীর অভিভাবক।

ইবনে আব্বাস আরো বলেন : নবী মসজিদের মধ্যে অতিক্রমকারী সকল দ্বার বন্ধ করে দেন শুধু আলীর দ্বার ব্যতীত। আলী অপবিত্র (জুনুব) অবস্থায়ও মসজিদে প্রবেশ করতেন এবং ঐ দ্বার ব্যতীত বাইরে যাবার অন্য কোন পথও ছিল না। নবী (সা.) বলেছেন : আমি যার মাওলা (অভিভাবক) আলীও তার মাওলা।

উপরোক্ত ঘটনা বর্ণনা করে হাকিম বলেছেন, এ হাদীস সনদের দিক থেকে সঠিক,তদুপরি বুখারী ও মুসলিম তা বর্ণনা করেন নি। তদ্রুপ যাহাবীও তাঁর তালখিস গ্রন্থে হাদীসটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন।

২। এ হাদীসের মধ্যে যে সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে তা কারো নিকট গোপন নেই। এ হাদীস এটিই প্রমাণ করে যে,হযরত আলী (আ.) রাসূল (সা.)-এর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত।

আপনি কি এখানে লক্ষ্য করেছেন রাসূল (সা.) কিরূপে আলী (আ.)-কে দুনিয়া ও আখেরাতের মাওলা বা অভিভাবক হিসেবে অভিহিত করে তাঁকে তাঁর অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি তাঁদের সম্পর্ককে হারুন ও মূসার মত বলেছেন শুধু এ পার্থক্য ব্যতীত যে,তাঁর পর কেউ নবী নেই অর্থাৎ নবুওয়াতের মর্যাদা ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর অন্য সকল মর্যাদা আলী (আ.)-এরও রয়েছে।

আপনি সম্যক জ্ঞাত,হযরত হারুন ও মূসা (আ.)-এর মধ্যে সম্পর্কের ধরন কিরূপ ছিল। হযরত হারুন (আ.) মূসা (আ.)-এর সঙ্গে নবুওয়াতের ক্ষেত্রে অংশীদার ছিলেন। তাছাড়া তিনি তাঁর সহযোগী,পরামর্শদাতা,খলীফা ও প্রতিনিধিও ছিলেন। তাই হযরত মূসা (আ.)-এর মত হযরত হারুনের অনুসরণ সকল উম্মতের জন্য অপরিহার্য বা ওয়াজিব ছিল। এজন্যই হযরত মূসা (আ.) দোয়া করেছিলেন, আমার আহল (পরিবার) হতে একজনকে আমার সহযোগী কর,আমার ভাই হারুনকে ও তার মাধ্যমে আমার কোমরকে মজবুত কর ও তাকে আমার কাজের অংশীদার কর। (সূরা ত্বাহা : ২৯)

হযরত মূসা (আ.) হারুনকে বললেন, আমার জাতির মধ্যে আমার স্থলাভিষিক্ত হও। তাদেরকে সংশোধন কর ও অন্যায়কারীদের পথ অবলম্বন কর না। ২৩৫ আল্লাহ্ হযরত মূসা (আ.)-কে বললেন, তুমি আমার নিকট যা চেয়েছিলে তা তোমাকে দেয়া হলো। ২৩৬

সুতরাং এ হাদীস অনুযায়ী আলী (আ.) এ জাতির মধ্যে রাসূল (সা.)-এর খলীফা,তাঁর পরিবারের মধ্যে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ও তাঁর কাজে (খেলাফতের বিষয়ে,নবুওয়াতের বিষয়ে নয়) অংশীদার। তাই আলী (আ.) রাসূলের উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং রাসূলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তাঁর আনুগত্য সর্বাবস্থায় হযরত হারুনের মত যাঁর আনুগত্য মূসা (আ.)-এর উম্মতের ওপর অপরিহার্য ছিল। বিষয়টি দিবালোকের মত স্পষ্ট।

যে কেউ এ হাদীসটি ( মানযিলাত -এর হাদীস) শ্রবণ করবে আলী সম্পর্কে এসব মর্যাদা তার স্মরণে আসবে এবং এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। নবীও তাই এ বিষয়টি সকলের জন্য সুস্পষ্ট করে বলেছেন, এটি ঠিক হবে না,তোমাকে আমার স্থলভিষিক্ত না করেই আমি চলে যাব।

এটি আলী (আ.)-এর খেলাফতের পক্ষে স্পষ্ট দলিল যে,আলীকে নিজের খলীফা মনোনীত না করে যাওয়াকে রাসূল (সা.) সঠিক মনে করেন নি। রাসূল (সা.) তাঁর এ কাজটি আল্লাহর নির্দেশেই করেছিলেন,যেমনটি নিম্নোক্ত আয়াতের তাফসীরে এসেছে-

) يا أَيُّهَا الرَّسُوْل بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّك وَ إِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ(

হে নবী! যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দিন। যদি আপনি তা না করেন তাহলে তাঁর রেসালতের কিছুই আপনি পৌঁছান নি।২৩৭

যদি কেউ এ আয়াতের আপনি তাঁর রেসালতের কিছুই পৌঁছান নি অংশটি লক্ষ্য করেন এবং এর সঙ্গে রাসূলের এ কথাটি নিশ্চয়ই এটি সঠিক হবে না,তোমাকে খলীফা নিযুক্ত না করেই চলে যাব মিলিয়ে দেখেন তাহলে দেখবেন দু টি বাণীই একটি লক্ষ্যকে অনুসরণ করছে।

আমাদের রাসূল (সা.)-এর এ বাণীটি কখনোই ভুলে গেলে চলবে না, তুমি আমার পর সকল মুমিনদের অভিভাবক। এটি অকাট্য দলিল হিসেবে হাদীসে এসেছে যে,আলী (আ.) রাসূল (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ত। প্রসিদ্ধ কবি কুমাইত (আল্লাহ্ তাঁকে রক্ষা করুন) যেমনটি বলেছেন-

কত সুন্দর অভিভাবক তিনি সেই শ্রেষ্ঠ অভিভাবকের পর,যিনি তাকওয়ার কেন্দ্র ও আদবের শিক্ষকের পর মনোনীত হয়েছেন।

ওয়াসসালাম

সাতাশতম পত্র

১৮ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

 ‘ মানযিলাত -এর হাদীসের বিষয়ে সন্দেহ।

মানযিলাত -এর হাদীসটি সহীহ ও মুস্তাফিয (খবরে ওয়াহেদের চেয়ে বহুল প্রচারিত) কিন্তু বিশিষ্ট হাদীসবিদ আমেদী এ হাদীসের সনদের বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন। তাই আপনাদের অনেক শত্রুরই দ্বিধান্বিত হওয়া স্বাভাবিক। আপনি কিরূপে তাদের নিকট এটি প্রমাণ করবেন। উত্তর জানিয়ে বাধিত করুন।

ওয়াসসালাম

আটাশতম পত্র

১৯ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

১।   মানযিলাত -এর হাদীস প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহের অন্যতম।

২।   এ সত্যের সপক্ষে প্রমাণ।

৩।   আহলে সুন্নাহর যে সকল রাবী এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

৪।   এ হাদীসটির বিষয়ে আমেদীর সন্দেহ পোষণের কারণ।

১। আমেদী এ সন্দেহের মাধ্যমে নিজের ওপরই জুলুম করেছেন। কারণ মানযিলাত -এর হাদীসটি সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহের একটি।

২। এ হাদীসের সনদের বিশুদ্ধতার বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। হাদীসটি সম্পর্কে দ্বন্দ্বের কোন অবকাশ নেই এবং এর প্রামাণিকতার বিষয়ে কেউ প্রশ্ন উঠাতে পারেন না,এমন কি যাহাবী অত্যন্ত কঠোরতা সত্ত্বেও মুসতাদরাক গ্রন্থের সারসংক্ষেপে হাদীসটির সহীহ হবার কথা স্বীকার করেছেন।৩৩৮ ইবনে হাজার হাইসামী বিভিন্ন বিষয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকা সত্ত্বেও তাঁর সাওয়ায়েক গ্রন্থের দ্বাদশ পর্বে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন ও এর বিশুদ্ধতার বিষয়টি প্রসিদ্ধ হাদীস বিশারদদের (এ বিষয়ে যাঁদের প্রতি রুজু করা উচিত) সূত্রে বর্ণনা করেছেন।৩৩৯ আপনি এ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করুন। যদি হাদীসটি এতটা প্রমাণ্য না হত তাহলে বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে তা উল্লেখ করতেন না। কারণ বুখারী হযরত আলীর বৈশিষ্ট্য,ফজীলত ও মর্যাদা বর্ণনায় যথেষ্ট সতর্ক ও পারতঃপক্ষে বিরত থাকতেন ও এ বিষয়ে তিনি নিজের ওপর জুলুম করেছেন। মুয়াবিয়া যিনি আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী ও সব সময় তাঁর প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করতেন,এমন কি মিম্বারে আলীর ওপর লানত পড়ার জন্য নির্দেশ জারী করেছিলেন তদুপরি তিনি মানযিলাত -এর হাদীসটি অস্বীকার করেন নি। মুসলিমের৩৪০ সূত্রে উদ্ধৃত হয়েছে : একবার মুয়াবিয়া সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে বললেন : কি কারণে আবু তোরাবের (আলী [আ.]-এর) নিন্দা কর না? সা দ জবাবে বললেন : মহানবী (সা.) তাঁর বিষয়ে তিনটি কথা বলেছেন সেগুলো মনে হওয়ায় এ কাজ হতে আমি বিরত হলাম। ঐ তিনটি বৈশিষ্ট্যের যদি একটিও আমার থাকত তাহলে আরবের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হতেও তা আমার নিকট প্রিয়তর বলে গণ্য হত। নবী (সা.) কোন কোন যুদ্ধের সময় তাঁকে মদীনায় রেখে যেতেন ও বলতেন : তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মূসা ও হারুনের মত হোক তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও? শুধু পার্থক্য এটিই আমার পর তুমি নবী নও।২৪১ মুয়াবিয়া একথা শুনে চুপ হয়ে গেলেন ও সা দকে আলীর প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করা হতে বিরত থাকার অপরাধ ক্ষমা করে দিলেন।

আরো বাড়িয়ে বললে বলা যায় স্বয়ং মুয়াবিয়া মানযিলাত -এর হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার তাঁর সাওয়ায়েক ২৪২ গ্রন্থে বলেছেন, আহমাদ বর্ণনা করেছেন : এক ব্যক্তি কোন একটি বিষয়ে মুয়াবিয়াকে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন : আলী এ বিষয়ে অধিকতর জ্ঞাত,তাকে প্রশ্ন কর। লোকটি বলল : আলী অপেক্ষা তোমার উত্তর আমার নিকট অধিকতর প্রিয়। মুয়াবিয়া বললেন : মন্দ কথা বলেছ,এমন ব্যক্তি হতে তুমি বীতশ্রদ্ধ যাঁকে রাসূল (সা.) জ্ঞানের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল মুখ মনে করতেন ও তাঁকে বলেছেন :

أَنْتَ مِنِّيْ بِمَنْزِلَةِ هَارُوْنَ مِنِ مُوْسى إِلّا أَنَّهُ لا نَبِيَّ بَعْدِي

তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মূসা ও হারুনের মত,শুধু এ পার্থক্য ব্যতীত যে,আমার পর কোন নবী নেই।

যখনই হযরত উমরের জন্য কোন সমস্যা দেখা দিত,তিনি আলী (আ.)-কে ডাকতেন।

সুতরাং মানযিলাত -এর হাদীসটি এমন একটি বিষয় যাতে মুসলমানদের সকল মাজহাব ও দল ঐকমত্য পোষণ করে,হাদীসটির বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

৩। আল জাম বাইনাস্ সিহাহ আস সিত্তাহ্ ২৪৩ আল জাম বাইনাস্ সহীহাইন ২২৪ গ্রন্থের লেখকদ্বয়ও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারীতে তাবুকের যুদ্ধের২৪৫ বর্ণনায় হাদীসটি রয়েছে।

সহীহ মুসলিমে২৪৬ হযরত আলীর ফাজায়েল অধ্যায়ে হাদীসটি এসেছে। এছাড়া সুনানে ইবনে মাজাহ্তে২৪৭ নবী (সা.)-এর সাহাবীদের ফাজায়েল অধ্যায়ে ও মুসতাদরাকে হাকিম -এ হযরত আলীর মানাকিব ২৪৮ বা বৈশিষ্ট্যের আলোচনায় এ হাদীসটি আনা হয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস হতে কয়েকটি সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন২৪৯

আহমাদ তাঁর মুসনাদে ইবনে আব্বাস২৫০ ,আসমা বিনতে উমাইস২৫১ ,আবু সাঈদ খুদরী২৫২ এবং মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান২৫৩ ও আরো কয়েকটি সূত্রে অন্যান্য সাহাবী হতেও হাদীসটি নকল করেছেন।

তাবরানী এ হাদীসটি আসমা বিনতে উমাইস,উম্মে সালামাহ্,হাবিশ ইবনে জুনাদাহ্,ইবনে উমর,ইবনে আব্বাস,জাবির ইবনে সামুরাহ্,যায়েদ ইবনে আরকাম,বাররাহ্ ইবনে আযেব এবং আলী ইবনে আবি তালিব ও অন্যান্যদের হতে বর্ণনা করেছেন।

বাযযার তাঁর মুসনাদে ও তিরমিযী তাঁর সহীহ গ্রন্থে আবু সাঈদ খুদরী হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবদুল বার তাঁর ইসতিয়াব গ্রন্থে হযরত আলী (আ.)-এর পরিচিতি পর্বে হাদীসটি বর্ণনা করে বলেছেন, হাদীসটি বিশুদ্ধতম ও সর্বাপেক্ষা প্রতিষ্ঠিত হাদীস যা সা দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাসূল (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেন, সা দ হতে এত অধিক সূত্রে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে যে,ইবনে আবি খাইসামাহ্ ও অন্যরাও তা বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবদুল বারের মতে হাদীসটির অন্যান্য বর্ণনাকারীরা হলেন ইবনে আব্বাস,আবু সাঈদ খুদরী,উম্মে সালামাহ্,আসমা বিনতে উমাইস,জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ অনসারী ও আরো কয়েকজন সাহাবী।

যে সকল মুহাদ্দিস,সীরাহ্ লেখক ও হাদীস বর্ণনাকারী তাবুকের যুদ্ধের ঘটনা বর্ণনা করেছেন তাঁরা এ হাদীসটি তাঁদের বর্ণনায় এনেছেন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তীকালের সকল রিজাল লেখকই (শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে) হযরত আলী

(আ.)-এর পরিচিতি বর্ণনায় এ হাদীসটি এনেছেন।

আহলে বাইতের মানাকিব (বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা) বর্ণনাকারী ব্যক্তিরা যেমন আহমাদ ইবনে হাম্বল ও তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলেই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এটি এমন এক হাদীস যা সকল যুগেই প্রতিষ্ঠিত হাদীসগুলোর একটি বলে পরিগণিত হত।

৪। অতএব,আমেদীর সন্দেহ (হাদীসটির বিষয়ে) এ ক্ষেত্রে কোন মূল্যই রাখে না,বরং বলা যায় তিনি কোন হাদীসবেত্তা নন ও এ বিষয়ে তাঁর কোন জ্ঞান নেই। উসূলশাস্ত্রের জ্ঞান দিয়ে হাদীসের সনদ ও সূত্র পর্যালোচনা সম্ভব নয়। তাই সুস্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত হাদীসের সনদে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর সে প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

ওয়াসসালাম

উনত্রিশতম পত্র

২০ জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ

১।   হাদীসটির সনদের বিশুদ্ধতার সত্যায়ন।

২।   হাদীসটির সার্বিকতার বিষয়ে সন্দেহ।

৩।   হাদীসের প্রামাণিকতার (প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের উপযোগিতার) বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন।

১। হাদীসটি ( মানযিলাত -এর হাদীস) যে সুপ্রতিষ্ঠিত সে বিষয়ে আপনার বর্ণনায় আমার সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রে আমেদী যে ভুল করেছেন এর কারণ হাদীসশাস্ত্রে তাঁর জ্ঞানের অভাব। আমি তাঁর বিশ্বাস ও মত উপস্থাপন করে আপনাকে কষ্টে ফেলেছি তাতে আপনি বাধ্য হয়েছেন এ বিষয়ে  প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দিতে। এ ভুলের জন্য আমি আপনার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী। আশা করি বিষয়টিকে ক্ষমার চোখে দেখবেন।

২। আপনাদের বিরোধীদের মধ্যে আমেদী ছাড়াও অনেকেই মনে করেছেন মানযিলাত -এর হাদীসটি সর্বজনীন নয়,বরং তা বিশেষভাবে তাবুকের যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং সে সময়ের জন্যই তিনি রাসূলের স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। এর প্রমাণ হিসেবে তাঁরা এ হাদীসের প্রেক্ষাপট যেখানে রাসূল (সা.) আলীকে মদীনায় তাঁর স্থানে রেখে যাচ্ছেন তার উল্লেখ করেন। ইমাম আলী (আ.) যখন রাসূল (সা.)-কে বললেন, আমাকে কি মহিলা ও শিশুদের মাঝে রেখে যাচ্ছেন? তখন নবী (সা.) তাঁকে বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে মূসার স্থলাভিষিক্ত হারুনের মত তুমি আমার স্থলাভিষিক্ত হও এ পার্থক্য সহ যে আমার পর কোন নবী নেই? বাহ্যিকভাবে রাসূলের উদ্দেশ্য ছিল এটিই বলা,রাসূলের সাথে আলীর সম্পর্ক মূসা (আ.)-এর সঙ্গে হারুন (আ.)-এর সম্পর্কের ন্যায়। কারণ হযরত মূসা (আ.) তুর পর্বতে যাবার সময় নিজের জাতির মধ্যে হারুন (আ.)-কে স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রেখে যান।

সুতরাং এ থেকে বোঝা যায় রাসূল (সা.) বলতে চেয়েছেন তাবুকের যুদ্ধের সময় তাঁর অনুপস্থিতিতে আলী তাঁর স্থলাভিষিক্ত যেমনভাবে মূসা ইবাদতের জন্য তুর পর্বতে যাবায় সময় হারুনকে স্থলাভিষিক্ত করে যান।

৩। তাছাড়া হাদীসটি এক্ষেত্রে প্রমাণ্য না হবারও সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ যদিও হাদীসটি সর্বজনীন তবুও নবুওয়াতের বিষয়টি বাদ যাওয়ায় বাক্যটির বাকী অংশ সর্বজনীনতা হারিয়েছে। তাই হাদীসটি এক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের যোগ্যতা  রাখে না।

ওয়াসসালাম

 


13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38

39

40

41

42

43

44

45

46

47

48

49

50

51

52

53