বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)18%

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: হযরত মোহাম্মদ (সা.)

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 87 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 16409 / ডাউনলোড: 4108
সাইজ সাইজ সাইজ
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

রাসূল (সা.)-এর সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধ

পারস্পরিক সমঝোতার আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামের রাসূল (সা.) বিশ্বের স্বৈরাচারী শাসকদের ন্যায় সীমানা বৃদ্ধি করতে বা জনগণের উপর শোষণ চালাতে কিংবা বিভিন্ন জাতির ধনসম্পদ হস্তগত করতে যুদ্ধ করেন নি। বরং কোরআন ও ইসলামী আইনের মশাল নিয়ে এগিয়ে যেতেন। তরবারিকে শুধুমাত্র জরুরী ক্ষেত্রে যেমন : অত্যাচার ও জুলুম ঠেকাতে এবং সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডাকে উন্নীত করতে অথবা সত্য প্রচারের পথের বাধা দূর করতে ব্যবহার করতেন।

রাসূল (সা.)-এর সময়ে যে সকল যুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল তা ছিল স্বার্থপর ও জালিম লোকদেরকে উৎখাত করতে। কেননা তারা আল্লাহর পবিত্র বান্দাদের উপর জুলুম করত এবং সত্য ও ইসলামের আকিদা প্রচারের পথে বাধা সৃষ্টি করত। এছাড়া যেন মানুষ ইনসাফ ও ন্যায় সংগত হুকুমতের ছায়ায় আন্তর্জাতিক পারস্পরিক সমঝোতার অন্তর্ভূক্ত হতে পারে , সে উদ্দেশ্যেই ঐসকল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

এরূপ যুদ্ধকে কি অবৈধ বলা যেতে পারে ?! অবশ্য প্রত্যেক নবীর জন্যেই এ সংগ্রাম একান্তভাবে জরুরী এবং প্রতিটি বিবেকবান ব্যক্তিই এর প্রশংসা করবে। কেননা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে এটা ছাড়া আর অন্য কোন পথ খোলা থাকে না।

যেহেতু হযরত ঈসা (আ.)-এর নবুওয়াতকাল কম ছিল এবং উপযুক্ত পরিবেশ ছিলনা , তাই তিনি যুদ্ধ করেন নি। অন্যথায় তিনিও সমাজের আগাছাগুলোকে উৎখাত করতেন। খ্রিস্টানদের ধর্মপ্রচারমূলক প্রতিষ্ঠান সমূহ ইসলামী বিশ্বের মনোবলকে দুর্বল করার জন্যে এবং উপনিবেশ ও অনাচারের সাথে সংগ্রামের মানসিকতা নিস্পাণ করতে এবং ইসলামের উত্তরোত্তর অগ্রগতিতে বাধা দেয়ার জন্যে রাসূল (সা.)-এর যুদ্ধ সমূহকে উল্টোভাবে ব্যাখ্যা করে। আর হতাহতের সংখ্যাকে লোমহর্ষক ভাবে উপস্থাপন করে। এর মাধ্যমে তারা মধ্যযুগে খ্রিস্টান ধর্মযাজকগণ কর্তৃক ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিজ্ঞানীদের ব্যাপক হত্যাসহ মুসলমানদের সাথে সংঘটিত ক্রুসেডের যুদ্ধকে (যাতে মিলিয়ন মিলিয়ন নিরাপরাধ লোককে হত্যা করা হয়) সামান্য এবং সাধারণ বলে উপস্থাপন করতে চায়।

প্রথমে আমরা মহানবী (সা.)-এর প্রসিদ্ধ যুদ্ধ সমূহের উদ্দেশ্য এবং শেষে মৃতের সংখ্যা তুলে ধরব। যার মাধ্যমে সত্য সুস্পষ্ট হবে এবং পাঠকবৃন্দ মহানবী (সা.)-এর এর যুদ্ধ সমূহের দর্শন উপলব্ধি করতে পারবেন। তাছাড়া জানতে পারবেন যে কত নগণ্য সংখ্যক মানুষ এ সকল যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিল।

বদরের যুদ্ধ : মহানবী (সা.) ও তাঁর সাথীরা তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর হতে ১৩ বৎসর যাবৎ মক্কায় কুরাইশদের হাতে নির্যাতিত হন। অবশেষে রাসূল (সা.) ও তাঁর সাথীরা জন্মভূমি ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করেন। কিন্তু মক্কার কাফেররা তাদের অত্যাচার অব্যাহত রেখেছিল এবং অসহায় মুসলমানদেরকে নির্যাতন করত। তারা তাদেরকে মক্কা থেকে হিজরত করার ও অনুমতি দিত না।৮৭

অন্যদিকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে , মদীনায় এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করবে। নির্দেশ দেয় যে , কোন কাফেলাই যেন মদীনায় কোন খাদ্য-সামগ্রী না নিয়ে যায়। বেশ কিছু দিন এ অবরোধ চলার পর মদীনার লোকজন বেশ কষ্টে ও বিপদে পড়ে। খাদ্য সামগ্রী আনার জন্যে তাদেরকে বাধ্যতামূলক ভাবে লোহিত সাগর উপকূলে যেতে হত।৮৮

আবু জেহেল ও রাসূল (সা.)-এর হিযরতের পর রূঢ় ভাষায় এক পত্র লেখে এবং রাসূল (সা.)-কে সাবধান করে দেয় যে কুরাইশদের হামলার প্রতীক্ষায় থাকতে।৮৯

এ পর্যায়ে আল্লাহ্ বললেন : যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে তাদেরকে (আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করার) অনুমতি দেওয়া হইল। কারণ তাদের উপর জুলুম করা হচ্ছে এবং নিশ্চয় আল্লাহ্ তাদেরকে সাহায্য করতে পূর্ণ ক্ষমতাবান। (সূরা হজ : ৩৯)

যাদেরকে তাদের ঘর বাড়ী হতে অন্যায়ভাবে শুধু এ কারণে বহিষ্কার করা হয়েছে যে , তারা বলে : আল্লাহ্ আমাদের প্রতিপালক। আল্লাহ্ যদি এই সকল মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করিতেন তা হইলে সাধু-সন্ন্যাসীগণের মঠ , গীর্জা , ইহুদীদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ যাতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয় সেগুলো অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যেত এবং নিশ্চয় আল্লাহ্ তাদেরকে সাহায্য করবেন , যারা তাঁর সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ্ অতিশয় শক্তিমান , মহা পরাক্রমশালী। (সূরা হজ : ৪০)

রাসূল (সা.) দ্বিতীয় হিজরীতে ইসলাম রক্ষার্থে ও মুসলমানদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে এবং কুরাইশদের মারাত্মক নীল নকশা পণ্ড করতে উঠে দাঁড়ান। অবশেষে বদরে কুরাইশদের মুখোমুখী হন। মুসলমান মুজাহিদদের সংখ্যা কুরাইশদের এক-তৃতীয়াংশ ভাগ হলেও ঈমানের শক্তিতে এবং আল্লাহর সাহায্যে তারা কুরাইশদেরকে পরাজিত করেন।৯০

ওহুদের যুদ্ধ : যেহেতু বদরের যুদ্ধে কিছু সংখ্যক কাফের নিহত হয়েছিল , তাই কুরাইশ বিশেষ ভাবে রণ সাজে সজ্জিত হয়ে প্রতিশোধ নিতে তৃতীয় হিজরীতের মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং ওহুদে মুসলমানদের মুখোমুখী হয়। এ যুদ্ধে কিছু সংখ্যক মুসলমান কর্তৃক রাসূল (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করা হলে , মুসলমানরা পরাজিত হয়।৯১

খন্দকের যুদ্ধ : পঞ্চম হিজরীতে বনী নাযির গোত্রের কিছু সংখ্যক ইহুদী মক্কায় যেয়ে কুরাইশদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে। কুরাইশ এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন গোত্র থেকে লোক নিয়ে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করে।

মুসলমানরা মদীনা শহরের চারপাশে পরিখা খনন করলেন এবং ১০ হাজার শত্রু সৈন্যের বিপক্ষে সারিবদ্ধ হলেন।

হযরত আলী (আ.) বীরদর্পে শত্রুদলের সেনাপতিকে ধরাশায়ী করেন এবং মুসলমানরা বিজয়ী হয়।৯২

বনি কুরাইযার যুদ্ধ : বনি কুরাইযা৯৩ রাসূল (সা.)-এর সাথে সন্ধি চুক্তি করেছিল কিন্তু খন্দকের যুদ্ধে সে চুক্তি ভঙ্গ করে কুরাইশদেরকে সাহায্য করেছিল।৯৪ যেহেতু রাসূল (সা.) তাদেরকে ভয়ানক হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন তাই তাদেরকে উৎখাত করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা।

খন্দকের যুদ্ধের পর রাসূল (সা.) মুসলমানদেরকে বনী কুরাইযাদের দিকে যাত্রা করতে আদেশ দিলেন। ২৫ দিন মুসলমানরা তাদেরকে অবরোধ করে রাখে অবশেষে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। আওস গোত্র রাসূল (সা.)-এর কাছে অনুরোধ করল তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে। রাসূল (সা.) বললেন : তোমারা কি রাজি আছ সা দ ইবনে মায়ায যে হুকুম করে তা মেনে নিতে ? সকলেই মেনে নিল , তারা মনে করেছিল যে সা দ তাদের পক্ষপাতিত্ব করবে। কিন্তু সে পুরুষদেরকে হত্যা , সম্পদসমূহকে বন্টন এবং নারীদেরকে বন্দী করার নির্দেশ দেয়। রাসূল (সা.) বললেন : এদের ব্যাপারে সা দ যে হুকুম করেছে তা আল্লাহরই হুকুম। এ নির্দেশ অনুসারে তাদের সকল যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হয়।৯৫

বনি মুসতালিকের যুদ্ধ : বনি মুসতালিক খাযায়া গোত্রের একটি দল ছিল , যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কিছু ষড়যন্ত্র এঁটেছিল। রাসূল (সা.) তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত হয়ে সৈন্য নিয়ে তাদের দিকে যাত্রা করেন , যেন তাদের অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকেন। মুরাইসী নামক স্থানে তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং বিজয়ী হন। এ যুদ্ধ ৬ষ্ঠ হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিল।

খায়বরের যুদ্ধ : খায়বরের দূর্গসমূহে ইহুদীদের অনেকগুলো দল একত্রে বসবাস করত। মুশরিকদের সাথে তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল। যেহেতু তাদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল ; তাই ৭ম হিজরীতে মুসলমানরা শত্রুদের প্রাণকেন্দ্র খায়বার অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। অবরোধ এবং যুদ্ধের পর অবশেষে ইহুদীরা ইসলামী হুকুমতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। (এ যুদ্ধে আলী (আ.)-এর ঢাল ভেঙ্গে গেলে তিনি খায়বার দূর্গের দরজা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেন এবং যুদ্ধ শেষে তা ছুড়ে ফেলে দেন। ঐ দরজা এত বড় এবং ভারী ছিল যে , পরবর্তীতে ৪০ জনেরও বেশী সংখ্যক লোক তা তুলতে ব্যর্থ হয়)।

মুতার যুদ্ধ : অষ্টম হিজরীতে রাসূলে আকরাম (সা.) হারেছ ইবনে উমাইরকে একটি পত্র দিয়ে বসরার৯৬ বাদশার নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু রাসূল (সা.) দূত সেখানে পৌঁছলেই তারা তাকে হত্যা করে। মুসলমানরা মহানবীর নির্দেশে শত্রুর দিকে যাত্রা করে। অবশেষে মুতায় রোমের বাদশা হিরাকিলাসের এক লক্ষ সৈন্যের মুখোমুখী হয় এবং তাদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে যাইদ ইবনে হারেছ , জাফর ইবনে আবু তালিব এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা যারা ইসলামের সেনাপতি ছিলেন শহীদ হন। শেষ পর্যন্তমুসলমানরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অপারগ হয়ে পড়ে এবং মদীনায় ফিরে আসে।

মক্ কা বিজয় : কুরাইশরা হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তিতে মহানবী (সা.)-এর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে , মুসলমান ও তাদের সাথে যারা চুক্তি বদ্ধ তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু তারা এ অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এবং বনি বাকর গোত্রকে খায়যা গোত্র (যারা মুসলমানদের সাথে চুক্তি বদ্ধ ছিল) তাদেরকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে।

রাসূল (সা.) তাদের অনুপ্রবেশ প্রতিহত করতে রুখে দাঁড়ান। অতঃপর মক্কায় প্রবেশ করেন এবং মক্কা বিজয় হয়। তিনি খোদার ঘর যিয়ারত করেন। অতঃপর তার ঐতিহাসিক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন : জেনে রাখ , তোমরা রাসূল (সা.)-এর জন্যে অতি নিকৃষ্ট প্রতিবেশী ছিলে , তাকে অস্বীকার করেছিলে এবং তার প্রতি অত্যাচার করেছিলে। আমাদেরকে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিলে এমনকি তাতেও তুষ্ট থাকনি। মদীনাতে এবং অন্যান্য স্থানেও আমাদের বিরোধিতা করেছিলে। যেখানে যেতে চলে যাও তোমরা সকলেই স্বাধীন।৯৭

এই ক্ষমা এবং মহত্ত্বের কারণে মক্কার লোকেরা মুসলমান হয়ে যায়। এ বিজয়ে রাসূল (সা.) মুসলমানদেরকে যুদ্ধ করতে নিষেধ করেন। তবে আত্মরক্ষা এবং মুশরিকদের হামলা প্রতিহত করতে অনুমতি দেন। আর ৮ জন পুরুষ ও ৪ জন নারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তার মধ্যে মাত্র ৪ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। খালিদ ইবনে ওয়ালিদের সেনাদল এবং মুশরিকদের মধ্যে কিছুটা দাঙ্গা দেখা দেয় এবং তাতেও কয়েক ব্যক্তি নিহত হয়।

হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধ : হাওয়াযেন গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে সৈন্য গঠন করে। রাসূল (সা.) বিষয়টি জানতে পেরে ১২ হাজারের এক বাহিনী নিয়ে তাদের দিকে যাত্রা করেন এবং হুনাইনে যুদ্ধ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত কাফেররা হেরে যায় এবং আত্মসমর্পন করে। এ যুদ্ধের পর রাসূল (সা.) তায়েফের দিকে দৃষ্টি দেন এবং ছাকিফ গোত্রকে (যারা হাওয়াযেন গোত্রের সাথে এক হয়েছিল) উৎখাত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কিছু দিন তাদেরকে অবরোধ করে রাখার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং মক্কায় ফিরে আসেন।

এ যুদ্ধসমূহ ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর সময়ে কয়েকটি সফর এবং ছোট খাট যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এখন প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর সময়ে সংঘটিত সকল যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নির্ভরযোগ্য দলিলের মাধ্যমে নিম্নে তুলে ধরা হলো :

ব্যাখ্যা

১.এই সংখ্যা উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে মত পার্থক্যের স্থানে সর্বোচ্চ সংখ্যাকে ধরা হয়েছে। যেখানে সংখ্যা জানা যায়নি সে ঘরটি খালি রাখা হয়েছে।

২.তারিখে খামিস যা আমাদের একটি তথ্যসূত্র তা একাধিক তাফসীর , হাদীস ও ইতিহাস বইয়ের সমন্বয়।

৩.বিঃদ্রঃ তারিখে খামিসকে সংক্ষেপে তাঃ খাঃ , সীরাতে ইবনে হিশামকে সীঃ হিঃ , তারিখে ইয়াকুবীকে তাঃ ইঃ তাবাকাতকে তাবাঃ বিহারুল আনোয়ারকে বিঃ আঃ এবং তারিখে তাবারীকে তাঃ তাঃ আকারে লেখা হয়েছে।

যে সামান্য সংখ্যক হতাহতের সংখ্যা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন তা কখনোই খ্রিস্টানদের বিভিন্ন ধর্মীয় দলগুলোর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ ও ক্রুসেডের যুদ্ধে মৃতের সংখ্যার তুলনায় খুবই নগণ্য।

পাঠক মহাদয় লক্ষ্য করেছেন যে , রাসূল (সা.)-এর কোন যুদ্ধই সীমানা বৃদ্ধি , প্রতিশোধ বা অনুপ্রবেশের উদ্দেশ্যে ছিলনা। বরং অনুপ্রবেশ রোধ , প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে , স্বাধীনতা রক্ষার্থে , মুসলমানদের সীমানা প্রতিরক্ষা ও সত্য প্রতিষ্ঠা করতে তা সংঘটিত হয়েছিল।

ড. গুস্তাভলুবুন , মিশুড থেকে বর্ণনা করেন :

ইসলাম জিহাদকে ওয়াজিব করেছে কিন্তু জনগণকে অন্যন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি ইনসাফ , ন্যায় বিচার ও সদয় আচরণের দাওয়াত দিয়েছে এবং সকল ধর্মকে স্বাধীনতা দিয়েছে।

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিশ্বজনীন রেসালত

ইসলাম পূর্ব ও পশ্চিমের (অর্থাৎ সর্বজনীন) দীন

ইসলাম প্রথম দিন থেকেই স্বচ্ছ ঝর্ণার ন্যায় প্রকাশ লাভ করে। অতঃপর ধীরে ধীরে তা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এক বিশাল সমুদ্রে পরিণত হয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পানি সিঞ্চন করে ও জনগণকে পরিতৃপ্ত করে। এখনো যতই এগিয়ে যাচ্ছে ততই গভীর হচ্ছে ও বিস্তৃতি লাভ করছে। সত্যিই (এ দীন) সকল ভ্রান্ত রীতিসমূহকে ধুয়ে জনগণকে সর্বদা এবং সকল ক্ষেত্রে হেদায়েত ও পথ প্রদর্শন করতে সক্ষম।

ইসলাম স্বৈরাচারী রাজনীতির সকল বাধা উপেক্ষা করে অগ্রগতি সাধন করে চলছে। শত্রুরা ইসলামের ভিত্তি নষ্ট করবার জন্যে ইসলামকে মিথ্যা ভাবে উপস্থাপন করেও কোন ফায়দা লুটতে পারেনি।

ইসলাম বিজয়ের রহস্যকে নিজের হাতে রেখেছে এবং সেই মোতাবেক নিজের আইন ও কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে।

সে মহান রহস্য ও সূত্রটি হলো এই যে , ইসলাম মানুষের প্রকৃতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রাখে এবং তাদের জীবনধারণের মূল ভিত্তি তারই উপর প্রতিষ্ঠিত।

অতএব , যারা বলে : পূর্ব , পূর্বই এবং পশ্চিম , পশ্চিমই। পূর্বের রাসূল (সা.) পশ্চিমাদের নেতৃত্ব দিতে অক্ষম। তারা ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত। কেননা পূর্ব ও স্বভাবগত দিনের প্রয়োজন বোধ করে , পশ্চিমারাও একই ভাবে তা অনুভব করে। রাসূল (সা.) মক্কা থেকে সারা বিশ্বের জনগণকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেন।

সেদিন রাসূল (সা.)-এর মাধ্যমে মক্কার অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে তৌহীদের ধ্বনি বেজে উঠেছিল। এই আন্দোলনের ঝাণ্ডা বাহকের দৃষ্টি কেবল মাত্র হেজাজ ও আরবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তার দায়িত্ব এটা ছিল যে , তাঁর বিশ্বজনীন রেসালতকে আরব থেকে শুরু করবেন।

এর দৃষ্টান্ত হলো সেই বাক্য যা রাসূল (সা.) তাঁর দাওয়াতের শুরুতেই তাঁর আত্মীয়দের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন :

اني رسول الله اليكم خاصة والي الناس عامة

অর্থাৎ নিশ্চয় আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ করে তোমাদের জন্যে এবং সর্বসাধারণের জন্য প্রেরিত হয়েছি।৯৮

কোরআনের আয়াতও এ বিষয়টিকে স্বীকার করে বলছে :

১.( قل يا ايها الناس اني رسول الله اليكم جميعا ) বল , হে মানুষ ! আমি তোমাদিগের সকলের জন্য আল্লাহর রাসূল। ৯৯

২.( وما ارسلناك الا رحمة للعالمين ) “ আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমত রূপেই প্রেরণ করিয়াছি। ১০০

৩.( و اوحي الي هذا القران لا نذركم به ومن بلغ ) ... এই কোরআন আমার নিকট প্রেরিত হইয়াছে যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট এটি পৌঁছবে তাদেরকে...। ১০১

উপরোক্ত আয়াত সমূহ থেকে প্রমাণিত হয় যে , রাসূল (সা.)-এর বিশ্বব্যাপী রেসালত মদীনায় হিজরতের পর এবং ইসলামের প্রসারের পর হয়নি। বরং প্রথম দিনেই তিনি সর্ব সাধারণের জন্য দাওয়াত শুরু করেন।

আল্লাহ তায়ালা কোরআনকে কোন নির্দিষ্ট সময় বা কোন বিশেষ গোত্রর জন্য প্রেরণ করেন নি। একারণেই কিয়ামত পর্যন্ত তা সকল সময়ের জন্য নতুন ও প্রত্যেক জাতির জন্য নিপূন হয়ে আছে এবং থাকবে। ইসলাম যে বিশ্বজনীন ধর্ম এটি তার অপর এক দৃষ্টান্ত।

মহানবী (সা.) ৬ষ্ঠ হিজরীতে তাঁর প্রতিনিধিদেরকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের শাসকদের নিকট চিঠি দিয়ে পাঠান যার উপর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ নামক মোহরাঙ্কিত ছিল এবং ইসলামের দাওয়াত দেন। এ চিঠিগুলোর সবই এক অর্থ বহন করছিল এবং তা ছিল তৌহীদের ও ইসলামী ভ্রাতৃত্বের দাওয়াত।

যেহেতু মহানবীর দাওয়াতসমূহ আল্লাহর নির্দেশে এবং জনগণকে সাবধান করে দেওয়ার জন্য ছিল , তা মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল।

এমনকি সত্য পিয়াসী ও ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। যেমন : নাজজাশী , মুকুস এবং অন্যান্যরা...।১০২

গবেষণা করে দেখা গিয়েছে যে , রাসূল (সা.) বিভিন্ন দেশের বাদশা এবং গোত্রপতিদের কাছে মোট ৬২টি পত্র লিখেছিলেন। যার ২৯টি আমাদের নিকট রয়েছে।১০৩

বিভিন্ন দেশের বাদশা এবং গোত্রপতিদের কাছে প্রেরিত পত্র

এখানে রাসূল (সা.)-এর কয়েকটি পত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করব

১.ইরান সম্রাটের প্রতি প্রেরিত পত্র

بسم الله الرحمن الرحيم

মুহাম্মদের পক্ষ থেকে পারস্যের বাদশাকে। দরুদ তাঁর প্রতি যে হেদায়াতের পথে চলে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে এবং যে এক আল্লাহর উপাসনা ও তাঁর বান্দা মুহম্মদকে স্বীকৃতি দেয়।

আমি আল্লাহর নির্দেশে তোমাকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত করছি। আমি সকল মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছি , এই জন্য যে , যাদের অন্তঃকরণ জীবিত তাদের ভীতি প্রদর্শন করব , যেন কাফেররাও কোন অজুহাত দেখাতে না পারে। যদি সন্ধি ও শান্তির সাথে থাকতে চাও তাহলে ইসলাম গ্রহণ কর। যদি অবাধ্য হও মাজুসদের (জারথুষ্ট্র বা অগ্নি উপাসক) গোনাহ তোমার উপর বর্তাবে।১০৪

২.রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি প্রেরিত পত্র

بسم الله الرحمن الرحيم

আমি তোমাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। যদি ইসলামের গণ্ডিতে আস তাহলে মুসলমানদের লাভ লোকসানের শামিল হবে। যদি তা না কর তবে জনগণকে স্বাধীন ভাবে ছেড়ে দাও ; যেন ইসলাম গ্রহণ করতে পারে অথবা জিযিয়া কর দিতে পারে। তুমি তাদেরকে বাধা দিও না।১০৫

রাসূল (সা.)-এর পত্রসমূহ শুধুমাত্র বাদশাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের প্রতিও তিনি পত্র দিয়েছিলেন। যেন সকলেই ইসলামের উদিত সূর্য সম্পর্কে অবগত হতে পারেন।

৩.ইয়ামামার শাসকের উদ্দেশ্যে প্রেরিত পত্র

بسم الله الرحمن الرحيم

আল্লাহর বার্তাবাহক মুহাম্মদ এর পক্ষ থেকে হুযাহকে। তার প্রতি দরুদ যে পথ প্রদর্শন করে হেদায়েত ও দীনকে অনুসরণ করে।

হে ইয়ামামার শাসক! তুমি জেনে রাখ যে , আমার দীন মানুষ যে পর্যন্ত যাবে তার শেষ পর্যন্ত পৌঁছবে। অতএব , যদি নিরাপদ থাকতে চাও তাহলে ইসলাম গ্রহণ কর।১০৬

৪.ইহুদীদের প্রতি

পত্রটি মুহাম্মদ (সা.)-এর পক্ষ থেকে যিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। তিনি মূসা ইবনে ইমরানের ভাই ও সাথি। আল্লাহ্ তাকে সেই দায়িত্ব দিয়েছেন যা মূসা কালিমুল্লাহকে দিয়ে ছিলেন। তোমাদেরকে আল্লাহ্ যা কিছু সিনাই পর্বতে মূসার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল তার কসম দিচ্ছি ।

তোমরা কী তোমাদের আসমানী কিতাবে ইহুদী সমাজ এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি রাসূল হিসেবে আমার প্রেরিত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জেনেছ ?! যদি জেনে থাক তাহলে আল্লাহকে ভয় কর এবং ইসলাম গ্রহণ কর। আর যদি এরূপ কিছু না পেয়ে থাক তাহলে তোমরা বাহানা করতে পার।১০৭

৫.নাজরানের পাদ্রীকে

بسم الله الرحمن الرحيم

শুরু করছি ইবরাহীমের প্রভুর নামে। পত্রটি মুহাম্মদের পক্ষ থেকে নাজরানের পাদ্রীকে। আমি তোমাকে বান্দার উপাসনা থেকে , আল্লাহ্ পূজার দিকে যিনি প্রকৃত মাবুদ দাওয়াত করছি।১০৮

ইসলাম প্রচারে আমাদের দায়িত্ব

ইসলামের দ্রুত অগ্রগতি প্রকৃত পক্ষে সব কিছুর ঊর্ধ্বে ইসলামের প্রিয় নবী (সা.) ও তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গীদের অহর্নিশ অক্লান্ত শ্রমের ফল। মহানবী (সা.) ইসলামের প্রচারের জন্যে দুটি শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করেছিলেন : একটি হলো বাগ্মী বক্তাগণ , যারা ইসলামের সত্যতাকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং মহানবীর প্রতি ছিল যাদের অকৃত্রিম বিশ্বাস ও ভালবাসা। আর অপরটি ছিল ইসলামের প্রাণবন্ত ও পরিপূর্ণ শিক্ষা সম্বলিত পত্রসমূহ।

মহানবী (সা.) যথাযথ মাধ্যমের অভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দূত পাঠাতেন।

এখন মহানবী (সা.)-এর আত্মা মুসলিম সমাজের জন্যে উদ্বিগ্ন যে , কিরূপে ইসলামের ঐশী মিশনের পথে কর্মতৎপরতা চালানো হবে। মুসলমানরা কি ইসলামী শিক্ষার সর্বজনীন প্রচারের জন্য আধুনিক প্রচার ব্যবস্থা ও যুগোপযোগী পরিকল্পনাসমূহ গ্রহণ করছে কি ?

বিশ্বজনীন রেসালাত ইসলামের প্রচারের জন্য আমরা আমাদের সর্ব শক্তি নিয়োগ করব এবং ইসলামের প্রসারের জন্যে সকল ধরনের ত্যাগ তিতিক্ষার ক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ পরিমাণে পিছপা হবো না। হোক সে প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের কিন্তু সকল ভাই বোনকে এ প্রাণবন্ত ও জীবন সঞ্চারনী ঝর্ণা ধারা থেকে পিপাসা নিবারণের জন্যে আহবান করব ; আর কল্যাণ ও খেদমতের অধিকারী হব। যেমনটি মহানবী (সা.) হযরত আলী (আ.)-কে বলেছিলেন :

আল্লাহর শপথ , যদি মহান আল্লাহ্ কোন মানুষকে তোমার মাধ্যমে হেদায়াত দান করেন , তবে সূর্য যাদের উপর আলোক প্রদান করে ও অস্তমিত হয় , তোমার জন্যে তার চেয়ে উত্তম কিছু রয়েছে...। (বিহারুল আনওয়ার , ২১তম খণ্ড , পৃ. ৩৬১)

বোহাইরার সাথে হযরত মুহাম্মদের সাক্ষাৎ

যখন কোরাইশদের কাফেলা বসরার6 দিকে আসছিল তখন বোহাইরা নামক এক সন্ন্যাসী তার আশ্রম থেকে হঠাৎ দেখতে পেল যে , একটি কাফেলা আসছে যাদের মাথার উপর একখণ্ড মেঘ তাদের উপর ছায়া দিয়ে সাথে আসছে।

বোহাইরা আশ্রম থেকে বের হয়ে আসল এবং এক কোণে দাঁড়িয়ে তার সহযোগীকে বলল : তাদেরকে গিয়ে বল যে , আজ তোমরা আমাদের অতিথি। মুহাম্মদ (সা.) ব্যতীত কাফেলার সকলেই তার নিকট আসল। মুহাম্মদ (সা.) আসবাব পত্রের নিকট দাঁড়িয়েছিলেন। বোহাইরা যখন দেখল যে মেঘখণ্ড যথাস্থানে দাঁড়িয়ে আছে এবং স্থানান্তারিত হচ্ছে না , তখন বলল : তাঁকেও নিয়ে আস। যখন মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে আসা হচ্ছিল , মেঘ খণ্ডও তাঁর সাথে আসছিল। ঐ সন্ন্যাসী তাঁকে আড় চোখে ভাল করে দেখছিল। পানাহারান্তে তাঁকে বলল : আমি কিছু প্রশ্ন করব ? তোমাকে লাত , ওজ্জার7 কসম দিয়ে বলছি , আমার প্রশ্নের জবাব দাও!

মুহাম্মদ (সা.) বললেন : আমার নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্টতম নাম হলো এ দুটি নাম যাদের কসম তুমি আমাকে দিয়েছ।

বোহাইরা বলল : তোমাকে আল্লাহর কসম দিচ্ছি , আমার প্রশ্নের জবাব দাও।

মুহাম্মদ (সা.) বললেন : তোমার প্রশ্ন বল! বোহাইরা মহানবীর (সা.) সাথে একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার সম্পন্ন করল। অতঃপর তাঁর হাতে পায়ে চুম্বন দিতে লাগল এবং বলল : যদি তোমার সময়কাল পর্যন্ত বেঁচে থাকি , তবে তোমার সাথে থেকে তোমার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। তুমি তো বিশ্বমানবতার শ্রেষ্ঠ সন্তান...।

অতঃপর সে জিজ্ঞাসা করল যে , এ কিশোর কার সন্তান ?

কাফেলার লোকজন হযরত আবু তালিবের দিকে ইঙ্গিত করে বলল যে , তাঁর সন্তান। বোহাইরা : না , এ কিশোরের পিতা কখনোই বেঁচে থাকতে পারে না ।

হযরত আবু তালিব : হ্যাঁ , সে আমার ভাইপো। বোহাইরা : এ কিশোরের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ। আমি যা তার মধ্যে দেখতে পাই , তা যদি ইহুদীরা জানতে পারে , তবে তারা তাঁকে হত্যা করে ফেলবে ; লক্ষ্য রেখ যেন ইহুদীরা তার কোন ক্ষতি না করতে পারে। আবু তালিব : তবে সে কী করবে , আর ইহুদীদেরই বা তার সাথে কী কাজ ?

বোহাইরা : সে ভবিষ্যতে নবী হবে এবং তার নিকট ওহীর ফেরেশতা অবতীর্ণ হবে।

আবু তালিব : মহান আল্লাহ্ তাঁকে নিরাশ্রয় করবেন না (এবং শত্রু ও ইহুদীদের থেকে রক্ষা করবেন)।8

রাখালী ও মহানবী (সা.)-এর চিন্তা-চেতনা

যদিও হযরত আবু তালিব ছিলেন কোরাইশদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি , কিন্তু বিশাল পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করার মত যথেষ্ট সম্পদ তার ছিল না। স্বভাবতঃই বয়োপ্রাপ্ত যুবক হযরত মুহাম্মদ (সা.) কোন কর্মে আত্মনিয়োগ করতে এবং আপন চাচার বিরাট ব্যয়ভার লাঘব করতে চাইলেন। কিন্তু কী ধরনের পেশা তিনি নির্বাচন করবেন , যা তার মন মানসিকতার সাথে অধিক সাযুজ্যপূর্ণ হবে ?

যেহেতু মহানবী (সা.) পরবর্তীতে নবী ও শ্রেষ্ঠ নেতা হবেন এবং বলগাহারা ও গাঁড়া এক সম্প্রদায়ের সম্মুখীন হবেন। আর অন্ধকার যুগের কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস ও ভ্রান্ত প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হবেন এবং ন্যায়পরায়ণতার সুউচ্চ মিনার ও জীবনের সঠিক নীতির ভিত্তি স্থাপন করবেন সেহেতু রাখালের পেশা গ্রহণ করাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন।

মুহাম্মদ (সা.) তাঁর আত্মীয় স্বজন ও মক্কাবাসীদের পশু ও মেষ মক্কার আশেপাশের চারণ ভূমিতে নিয়ে যেতেন ও রক্ষণাবেক্ষণ করতেন এবং এ ভাবে যা উপার্জন করতেন , তা দিয়ে হযরত আবু তালিবকে সাহায্য করতেন।9 আর সেই সাথে শহরের কোলাহল ও যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে দূরে মরু প্রান্তরের মুক্ত পরিবেশের অবসরে নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন , যেগুলো পরবর্তীতে তাঁর রেসালতের প্রচারকালে সুফল প্রদান করেছিল।

যাহোক , তিনি ইতোমধ্যে দয়া , সৎকর্ম , বদান্যতা , উদারতা , প্রতিবেশী সুলভ আচরণ , সততা , বিশ্বস্ততা এবং কুপ্রবৃত্তি পরিহার ইত্যাদি সকল গুণে মানুষের শীর্ষে অবস্থান করেছিলেন। আর এ কারণেই তিনি মুহাম্মদ আমীন নামে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।10

মহানবী (সা.)-এর সততা

যখন বয়োপ্রাপ্তির ফলে মানুষের কামনা , বাসনা ও সুপ্ত শক্তির প্রকাশ ঘটে , শিশু কিশোররা তাদের শৈশব ও কৈশর অতিক্রম করে উদ্দাম ও উদ্দীপনাময় যৌবনে পদার্পণ করে এবং নিজেকে অন্য এক জগতে খুঁজে পায় , তখন যৌবনের এ স্পর্শকাতর মুহূর্তে নানা ধরনের বিচ্যুতি , কলুষতা , অন্যায় , অনাচার , অশ্লীলতা উচ্ছৃঙ্খলতা যুবকদেরকে গ্রাস করতে আসে। আর তখন যদি যুবকদের প্রতি সঠিক লক্ষ্য না রাখা হয় কিংবা স্বয়ং যুবকরা যদি তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা না করে তবে দুর্ভাগ্যের পর্বত পদতলে পতিত হবে যেখান থেকে পুনরায় সৌভাগ্যের রঙিন পাখিকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীন।

মহানবী (সা.) এমন এক কলুষিত সমাজে জীবন-যাপন করতেন , যার পরিবেশ অসংখ্য চারিত্রিক অনাচার ও পাপাচারে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল ; যুবকরা এমনকি আরবের বৃদ্ধরাও অশ্লীল ও নির্লজ্জভাবে অসততা ও যৌন অনাচারে নিমগ্ন ছিল। আর এ জন্যে অশ্লীলতার নিদর্শনস্বরূপ অলিতে গলিতে কোন কোন গৃহের উপর কালো পতাকা উত্তোলিত ছিল এবং এ প্রক্রিয়ায় উচ্ছৃলঙ্খল ব্যক্তিদেরকে অন্যায়ের পথে নিমন্ত্রণ জানাত।

মহানবী (সা.) এমন এক কলুষিত সমাজেই শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পন বরলেন এবং পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হলেও পরিবেশের প্রভাব তাঁর উপর পতিত হয়নি। কিঞ্চিৎ পরিমান অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মই তাঁকে করতে দেখা যায়নি। বরং শত্রু মিত্র সকলেই তাঁকে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বলে আখ্যায়িত করেছিল।

কোরাইশ তনয়ার (হযরত খাদিজা) সাথে মহানবীর দাম্পত্য জীবনের বর্ণনা যেভাবে চিত্রিত হয়েছে তাতে তাঁর শ্রেষ্ঠ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা ফুঁটে উঠেছে। যেমন তাঁর লাজুক প্রকৃতির কথা হযরত খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে লেখা কবিতার ভাষায় এ ভাবে বর্ণিত হয়েছে :

হে খাদিজা! তুমি পৃথিবীর মানুষের মাঝে সর্বোত্তম স্থানে পৌঁছেছো ,

আর সকলের চেয়ে সমুন্নত হয়েছো ,

অর্থাৎ তুমি সে মুহাম্মদ (সা.)-এর নৈকট্য লাভ করেছো ,

পৃথিবীর কোন নারী তাঁর মত সন্তান ভূমিষ্ঠ করেনি ; উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য , মহত্ব ও আত্মসম্মানের মত সকল গুণ তাঁরই মাঝে সমাহার ঘটেছে। আর চিরদিন এরূপই থাকবে।11

অন্য এক কবি তার কবিতায় বলেন : যদি আহমদ (সা.)-এর সাথে সমস্ত সৃষ্টিকেও তুলনা করা হয় , তবে তিনিই হবেন সর্বশ্রেষ্ঠ। প্রকৃতই তাঁর মর্যাদা কোরাইশদের জন্যে স্পষ্ট ও তর্কাতীত ছিল।12

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম বিবাহ

যৌবন কাল বিভিন্ন কামনা বাসনা জাগ্রত ও জৈবিক চাহিদার বহিঃপ্রকাশ ঘটার সময়। যখন ছেলে মেয়েরা বয়সের এ বিন্দুতে পৌঁছে , তখন স্বীয় অভ্যন্তরে পরস্পরের প্রতি এক আকর্ষণ উপলব্ধি করে। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ না করবে , ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মানসিক প্রশান্তি ও স্থিতি লাভ করতে পারে না এবং তাদের অন্তরে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি নির্বাপিত হয় না।

অতএব , ইসলামে সঠিকভাবে এ পারস্পরিক অনুরাগ থেকে লাভবান হওয়ার জন্যে এবং যৌন আনাচার প্রতিরোধ করার জন্যে অতি গুরুত্বের সাথে যুবক-যুবতীকে দ্রুত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ রয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যতে জীবন নির্বাহের খরচের যোগান দিতে পারবে না এ আশঙ্কার অজুহাতে কেউ যেন বিবাহ থেকে দূরে না থাকে।13

কিন্তু কখনো কখনো জীবনব্যবস্থা এতটা প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয় যে , বিবাহের প্রাথমিক শর্তসমূহ পূরণ ও জীবন নির্বাহের খরচ সংগ্রহ করতে অপারগ বলে মনে হয়। নিঃসন্দেহে এমতাবস্থায় উপযুক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যে অপেক্ষা করতে হবে এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। আর সেই সাথে নিজেকে পূত পবিত্র রাখতে হবে ।14

মহানবী (সা.)ও 25 বছর কাল15 পর্যন্ত এমনই এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ করার সামর্থ্য তাঁর ছিল না।

অতএব , বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া থেকে দূরে থাকাটাই শ্রেয় মনে করলেন এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্যে ও অনুকূল পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকলেন।16

হযরত খাদিজার পরামর্শ

হযরত খাদিজা ছিলেন এক ধণাঢ্য ও সম্মানিতা রমণী। তিনি তার অর্থ সম্পদ ব্যবসার জন্যে অপরের নিকট অর্পণ করতেন এবং এ কাজের বিনিময়ে তাকে পারিশ্রমিক দিতেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যবাদিতা , একনিষ্ঠতা , মর্যাদা ও খ্যাতির কথা সমস্ত আরবে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এভাবে তা হযরত খাদিজার কর্ণগোচর হলে তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে ব্যবসা করার চিন্তা করলেন। তিনি এ বিষয়টি মহানবীর নিকট উপস্থাপন করলেন এবং প্রস্তাব দিলেন : কিছু সম্পদ এক গোলামসহ (যার নাম মাইসারাহ বলা হয়) আপনার নিকট অর্পণ করা হবে এবং অন্যদেরকে যা পরিশোধ করা হতো তার চেয়ে অধিক আপনাকে পরিশোধ করব।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত আবু তালিবের অবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি জানতেন যে , বার্ধক্যের কারণে বিশাল পরিবারের ভার বহন করার মত সন্তোষজনক অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর চাচার ছিলনা। ফলে তিনি হযরত খাদিজার প্রস্তাব গ্রহণ করলেন।17

খাদিজা কে ?

খাদিজা ছিলেন খুয়াইলিদের কন্যা , অনন্য ব্যক্তিত্ব সম্পন্না এক রমনী। তিনি রাসূলের পূর্বে দু বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর পূর্ববর্তী দু স্বামী ছিলেন মৃত আবু হালা আতিক মাখযুমী

খাদিজা তাঁর জীবনের চল্লিশ বছর অতিক্রম করলে ও তাঁর অঢেল সম্পত্তি ও জনপ্রিয়তার কারণে কোরাইশ পতিদের মধ্যে ও তদানিন্তন সময়ের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অনেকেই তাঁর পাণি প্রার্থনা করত।

কিন্তু হযরত খাদিজা তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং বিবাহ করেন নি। কারণ তিনি জানতেন যে , হয় তারা জীবন সঙ্গী হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা অথবা তাঁর সম্পদের লোভে তার পাণি প্রার্থনা করছে।18

শামের পথে যাত্রা

যখন কোরাইশের বাণিজ্য কাফেলা শামের পথে যাত্রা করার জন্যে প্রস্তুতি নিল এবং মহানবী (সা.)ও তাঁর সফরের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন , তখন হযরত খাদিজা তাঁর গোলাম মাইসারাকে নির্দেশ দিলেন : তুমিও মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে তাঁর খেদমতের জন্যে শামে যাও! যদিও এ ঐতিহাসিক সফরের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া এ পুস্তিকার ক্ষুদ্র পরিসরে সম্ভব নয় তথাপি এতটুকু বলা যায় যে , এ সফর ছিল অতি বরকতময় ও কল্যাণময়। এগুলোর মধ্যে ব্যবসায় প্রচুর লাভবান হওয়া , কাফেলার জন্যে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনন্য ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটা , খ্রিস্টান পাদ্রীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ও তাঁর নবুওয়াত লাভ সম্পর্কে তার (খ্রিস্টান পাদ্রীর) ভবিষ্যদ্বাণী19 এবং এক বরকতময় দাম্পত্যজীবনের পূর্ব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

এ সফর কিছু দিন পর সম্পন্ন হলে কাফেলা শাম থেকে ফিরে আসল। মাইসারাহ এ সফরের বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিক , তাদের অভূতপূর্ব লাভের কথা এবং এ সফরে প্রকাশিত মহানবীর মহত্ব ও বিভিন্ন কারামতের কথা কোরাইশের নন্দিতা রমণী হযরত খাদিজার কর্ণগোচর করল।20

হযরত খাদিজা এক ইহুদী আলেমের কাছ থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ঐশী ব্যক্তিত্বের ও কোরাইশের অন্যতম রমণীর (খাদিজা) সাথে তাঁর বিবাহ বন্ধনে অবদ্ধ হওয়ার কথা শুনেছিল। আর এখন তার গোলামের নিকট এ সমুদয় সংবাদ শুনে শুধু যে হযরতের প্রতি প্রেমাসক্তি তাঁর হৃদয়ে লালন করতে লাগলেন , তা নয় ; বরং তাঁকে তাঁর আদর্শ স্বামী হিসাবে মনে করতে লাগলেন।21

অনুরূপ তাঁর চাচা ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের নিকট তিনি পূর্ববর্তী নবীগণের (আ.) ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের সুসংবাদ ও খাদিজা নামক রমণীর সাথে তাঁর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কথা শুনে ছিলেন।22 ফলে তাঁর আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল।

কিন্তু কিরূপে তাঁকে এ কথা জানানো যেতে পারে ? এ কর্মটি স্বয়ং তাঁর জন্যে যিনি কোরাইশের অনন্য ব্যক্তিত্ব সম্পন্না রমণী ছিলেন , সহজ ছিল না।

বিবাহের প্রস্তাব

হযরত খাদিজা তাঁর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নাফিসার নিকট চেয়েছিলেন , সে যেন এ ব্যাপারে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে আলোচনা করে। নাফিসা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিকট গেলেন এবং বললেন : কেন বিয়ে করছেন না ? তিনি জবাবে বললেন : আমার আর্থিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত অবস্থা আমাকে অনুমতি দেয় না। নাফিসা বললেন : যদি এ সমস্যা দূরীভূত হয় এবং সুন্দরী , ধনবতী , সম্মানিতা ও খ্যাতিমান পরিবারের কোন কন্যা আপনার জন্যে পাওয়া যায় , তবে আপনি কি তা গ্রহণ করবেন ?

হযরত মুহাম্মদ (সা.) বললেন : এ রমণী কে , যার কথা তুমি বলছ ?

নাফিসা বলল : খাদিজা।

হযরত বললেন : এটা কিরূপে সম্ভব যে সে কোরাইশের ধনিক ও বণিক শ্রেণীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে , অথচ আমার সঙ্গে বিবাহে রাজি হবে ?!

নাফিসা বলল : হ্যাঁ , এটা সম্ভব এবং আমি তা সম্পন্ন করব।23

যখন মহানবী (সা.) পূর্ণ আস্থা স্থাপন করতে পারলেন যে , খাদিজা তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ইচ্ছুক , তখন তিনি একথা তাঁর চাচাদের কাছে জানালেন।

তারা এ শুভসংবাদ শুনে খুবই আনন্দিত হলেন এবং অনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। অবশেষে বিশেষ বিবাহ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহ কার্য সম্পন্ন করেন।24

খাদিজা ছিলেন প্রথম নারী , যিনি মহানবী (সা.)-এর উপর ঈমান এনেছিলেন এবং তাঁর সকল সম্পদ ইসলামের প্রচারের জন্যে রাসূল (সা.)-এর হাতে অর্পণ করেন।25 মুহাম্মদ (সা.)-এর এ দাম্পত্য জীবনেই ছয়টি সন্তান লাভ করেছিলেন : কাসিম ও তাহির নামে দু পুত্র যারা শৈশবেই মৃত্যু বরণ করেন এবং রুকাইয়্যা , যয়নাব , উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা (আ.) নামক চার কন্যা। তাদের মধ্যে হয়রত ফাতেমা (সা.) ছিলেন অন্যতম।26 খাদিজা হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর দীনের জন্যে যে ধৈর্য্য ও ত্যাগ-তিতীক্ষা প্রদর্শন করেছিলেন , তা তাঁর জীবদ্দশায়ই কেবলমাত্র হযরতের জন্যে হৃদয় গ্রাহী ছিল না , বরং তাঁর (খাদিজার) মৃত্যুর পরও যখন তাঁর কথা স্মরণ করতেন , হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়তেন।27 কখনো কখনো তাঁর বিয়োগ বেদনায় অশ্রু বিসর্জন দিতেন...।

যাহোক , খাদিজার জীবনের সূর্য 65 বছর বয়সে অর্থাৎ নবুওয়াতের দশম বছরে অস্তমিত হয়েছিল। আর সেই সাথে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর গৃহে চিরদিনের জন্যে খাদিজার দ্যুতি নিভে গেল।

মহানবী (সা.)-এর একাধিক বিয়ের দর্শন ও খ্রিস্টানগণ কর্তৃক অপবাদ দানের কয়েকটি উদাহরণ :

খ্রিস্টানগণ কর্তৃক অপবাদ প্রদানের কয়েকটি দৃষ্টান্ত

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে খ্রিস্টবাদী লেখকরা ইসলামের বিরুদ্ধে নতুন সংগ্রাম শুরু করেছিল। তারা মিথ্যা ও হঠকারিতায় পূর্ণ পুস্তকসমূহ প্রকাশ করে ইসলাম ধর্মের প্রতি মানুষের আকর্ষণ নষ্ট করতে এবং ইসলামের মহান প্রবর্তক হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি মানুষের অন্তরে বিষেদাগার করতে চেয়েছিল।28

এ কল্পকাহিনীসমূহ এবং খ্রিস্টানদের বিভিন্ন গোঁড়ামীপূর্ণ গল্প কাহিনীর প্রথম সূতিকাগার ছিল মধ্যযুগ , বিশেষ করে পঞ্চদশ শতাব্দীতে। জন অ্যান্ডার মূর ( J.A. Mure ) নামক এক ব্যক্তি মুহাম্মদের দীনের অসারতা নামক একটি পুস্তক লিখেছিল যা পরবর্তী ইসলাম বিদ্বেষী লেখকদের খোরাক যুগিয়েছিল। আর যেহেতু অন্যান্য লেখক আরবী ভাষা জানত না এবং ইসলামের উৎসসমূহ তাদের নাগালে ছিল না সেহেতু ইসলাম পরিচিতির ক্ষেত্রে তারা মূরের পুস্তক নকল বা তার সিদ্ধান্তেই তুষ্ট থেকেছিল।29

হ্যাঁ , যাদের তথাকথিত পবিত্র গ্রন্থে প্রকাশ্যে নবী (আ.) গণের উপর যৌন অনাচারের অপবাদ দেয়30 তারাই আবার আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সম্পর্কে লিখে যে , তিনি কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করেছিলেন। অর্থাৎ যেখানে তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে কেবলমাত্র চারজন স্ত্রী রাখার অধিকার দিয়েছেন অথচ স্বয়ং তিনি একাধিক (চারের অধিক) স্ত্রীর অধিকারী ছিলেন ?!31

তারা তাদের স্থূল চিন্তায় অজ্ঞ খ্রিস্টবাদী গায়কের ভাষায় হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কুপ্রবৃত্তির অনুসারী বলে পরিচয় করাতে চেয়েছিল , যাতে এর মাধ্যমে তার ব্যক্তিত্বহানি করতে পারে এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসার রোধ করতে পারে।

কিন্তু তাদের এহেন অপচেষ্টা অপরাপর প্রচেষ্টার মতই অসার ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। কারণ ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টীয় পণ্ডিতগণ মহানবী (সা.)-এর স্বপক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এবং কোরআন ও হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর যে মানহানিকর আক্রমণ চালানো হয়েছিল তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন।

নিঃসন্দেহে এ ধরনের বানোয়াট বক্তব্য আমরা যারা নবিগণের (আ.) পবিত্রতায় বিশ্বাস করি , তাদের নিকট অবাঞ্ছিত বৈ কিছু নয়। কিন্তু যারা আমাদের এ বিশ্বাসের সাথে একমত নয় তাদের জন্যে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হওয়া প্রয়োজন।

ইতিহাসের বিচার

সত্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ইতিহাসবেত্তাগণ , কি মুসলমান কি খ্রিস্টান তাদের গ্রন্থসমূহে লিখেছেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বিবাহসমূহ কোন কামনার ফল ছিল না। কারণ , যদি তাই হতো , তবে 25 বছর বয়সে যখন যৌবনের উত্তাল ও উদ্দম যুবকদেরকে ষোড়শী যুবতী স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোন চিন্তা আবিষ্ট করতে পারেনা , তখন তিনি 40 বছর বয়সের প্রৌঢ়া নারী হযরত খাদিজার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতেন না , যিনি ইতোপূর্বে ও দু জন স্বামীর সংসার করেছিলেন।

মুহাম্মদ (সা.) হযরত খাদিজার সাথে 25 বছর32 বয়স পর্যন্ত আন্তরিকতা ও আনন্দের সাথে জীবন যাপন করেছিলেন এবং যদিও আরবের কুমারী , যুবতীরা তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্যে আগ্রাহান্বিত ছিল , কিন্তু তিনি একবারের জন্যেও অন্য কোন কুমারী রমণী বিবাহ করেন নি।

নিঃসন্দেহে যদি মহানবী (সা.) কোন কামাতুর ব্যক্তি হতেন , তবে অবশ্যই এ সুদীর্ঘ সময় ধরে কুমারী ও যুবতী নারীর পাণি গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারতেন না।

ছিদ্রান্বেষীদের নিকট প্রশ্ন

যদি কেউ বর্ণিত ব্যক্তিদের নিকট জিজ্ঞাসা করে : কি কারণে মহানবী (সা.) যৌবনের শুরুতে এক প্রৌঢ়া স্ত্রীর সাথে সংসার করেছিলেন এবং অন্য কোন স্ত্রী গ্রহণ করেন নি , অথচ জীবনের শেষ দশ বছরে যখন তার বার্ধক্য ঘনিয়ে এসেছিল , এছাড়া অভ্যন্তরীন ও বহিঃ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভারসাম্য রক্ষাকরণ ইত্যাদি তাঁর বিবাহের জন্যে অনুকূল ছিল না , তখন তিনি একাধিক বিবাহ করেন ?

অনাথ ও সর্বস্বহারা নারীদেরকে ভরণ পোষণ দেয়া কি স্বয়ং এক কঠিন কাজ নয় ? বিচিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মনমানসিকতার অধিকারী স্ত্রীদের সাথে জীবন যাপন করা কি আরাম-আয়েশের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ ? 50 বছরের একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্যে একজন যবুতী স্ত্রী , যে ব্যক্তির মর্যাদা ও স্থান সম্পর্কে অজ্ঞ তার সাথে জীবন যাপন করা কি কোন সহজ ব্যাপার ?33

নিঃসন্দেহে ছিদ্রান্বেষীদের নিকট এর কোন জবাব নেই। সঙ্গত কারণেই তাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে , হযরত মুহাম্মদ (সা.) কখনোই কামাতুর ছিলেন না এবং তারা হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে মহানবীর উপর এ ধরনের অপবাদ প্রদান করেছিল। আর এটা কতই না অন্যায় ও হীন কর্ম!

জন ডেভেন পোর্ট বলেন : এটা কি করে সম্ভব , যে ব্যক্তি এতটা কামাতুর সে এমন এক দেশে যেখানে একাধিক স্ত্রী থাকাটা এক সাধারণ নিয়ম বলে পরিগণিত হতো , সেখানে থেকে 25 বছর ধরে মাত্র একজন স্ত্রী নিয়েই তুষ্ট ছিলেন ?34


3

4

5

6

7

8

9

10

11