জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা8%

জীবন জিজ্ঞাসা লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

জীবন জিজ্ঞাসা
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 58 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42095 / ডাউনলোড: 4626
সাইজ সাইজ সাইজ
জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

ত্রিত্ববাদী ধারণা

অপরিহার্য সত্তা সম্পর্কে অংশীবাদীদের আরেকটি ধারণা হচ্ছে পিতা , পুত্র ও আত্মা সংক্রান্ত ধারণা। বিচারবুদ্ধির বিচারে এ ধারণাটি সর্বাধিক দুর্বল। কারণ , কখনো বলা হয় যে , পবিত্র পিতা , পবিত্র পুত্র ও পবিত্র আত্মা স্বতন্ত্র , আবার কখনো বলা হয় অভিন্ন। কখনো তিনকে সমপর্যায়ভুক্ত গণ্য করা হয় , কখনোবা অপর দু জনকে পবিত্র পিতার সৃষ্টিরূপে গণ্য করা হয়।

বস্তুতঃ এ মতটি একটি গোলকধাঁধা সৃষ্টিকারী কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তিশীল , কোনোরূপ প্রকৃত দার্শনিকতার ওপর ভিত্তিশীল নয়। কারণ , অপরিহার্য সত্তাকে অনিবার্যভাবেই সত্তা ও গুণের দিক থেকে অভিন্ন ও অবিভাজ্য হতে হবে। অন্যথায় সে হবে অসম্পূর্ণ ও নির্ভরশীল সত্তা। এমনকি তাকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে চিন্তা করলে সে ক্ষেত্রে সে তার অংশসমূহের ওপর এবং তার অংশসমূহ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হবে। এরূপ নির্ভরশীল সত্তা অপরিহার্য সত্তা হতে পারে না। অতএব , তিনে এক এবং এক তিন হতে পারে না। আর পবিত্র পুত্র ও পবিত্র আত্মা যদি পবিত্র পিতার সৃষ্টি হয়ে থাকে তো সে ক্ষেত্রে এতদুভয় হবে সম্ভব সত্তা। আর সম্ভব সত্তা অপরিহার্য সত্তা নয়।

অপরিহার্য সত্তা সকল প্রকার অপূর্ণতা ও অভাব-অভিযোগ থেকে মুক্ত। অতএব , তিনি সন্তান , স্ত্রী ও পরিবারের প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্ত। বিশেষ করে কোনো সম্ভব সত্তাকে তাঁর পক্ষে পুত্র হিসেবে পরিগ্রহণ করা সম্ভব নয়।

মানুষের মধ্যে যে সন্তান লাভের সহজাত আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান তার জন্য দায়ী তার বিভিন্ন ধরনের অপূর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা। সন্তানের মাধ্যমে তার এ অপূর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা আংশিক হলেও পূরণ হয় এবং এ কারণেই সে সন্তানের প্রয়োজন অনুভব করে। যেহেতু পরম প্রমুক্ত ও সকল পূর্ণতার পূর্ণ মাত্রায় অধিকারী অপরিহার্য সত্তার কোনোরূপ অপূর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা নেই সেহেতু তিনি সন্তান জন্মদানের বা পরিগ্রহণের প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে বাধ্য।

অন্যদিকে যে কোনো প্রজাতির সন্তান সমপ্রজাতির হয়ে থাকে। সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যকার ব্যবধান দুই প্রজাতির মধ্যকার ব্যবধানের তুলনায় কোটি কোটি গুণ বেশী। কোনো মানুষ যদি একটি প্রস্তরকণা বা একটি মৃত পোকাকে হাতে তুলে নেয় এবং বলে যে , আমি এটাকে পুত্ররূপে পরিগ্রহণ করলাম , তাহলে তা যতোখানি পাগলামি হবে , অপরিহার্য সত্তা সর্বস্রষ্টা কর্তৃক কোনো সৃষ্টিকে - তা সে সৃষ্টি যতো উন্নত মানের ও যতখানি পূর্ণতার অধিকারীই হোক না কেন - পুত্ররূপে পরিগ্রহণের ধারণা পোষণ মানে তাঁর ওপর এর চেয়ে কোটি কোটি গুণে বেশী মাত্রার পাগলামি আরোপ বৈ নয়।

আর পুত্রকে যদি সৃষ্টিসত্তা গণ্য না করে অপরিহার্য সত্তারূপে গণ্য করা হয় সে ক্ষেত্রে তা এক অপ্রকৃত ও অসম্ভব দাবী বৈ নয়। কারণ , অপরিহার্য সত্তা সকল প্রকার পূর্ণতাবাচক গুণের পূর্ণতম মাত্রার অধিকারী হতে বাধ্য। অতএব , এরূপ সত্তা একাধিক হতে পারে না। এমনকি তর্কের খাতিরে যদি একাধিক হওয়াকে সম্ভবও গণ্য করা হয় , তো সে ক্ষেত্রে সমমর্যাদাসম্পন্ন দুই অপরিহার্য সত্তার একজনকে পিতা ও অপর জনকে পুত্র গণ্য করা যেতে পারে না। কারণ , একজনকে পিতা ও অপর জনকে পুত্র গণ্য করার পর আর তাদের সমমর্যাদা থাকে না। এমতাবস্থায় যার মর্যাদা হ্রাস পায় (পুত্র) তাকে অপরিহার্য সত্তারূপে গণ্য করা চলে না।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে , কোনো সৃষ্টির ব্যতিক্রমধর্মী সৃষ্টি ও গুণবৈশিষ্ট্যের কারণেও তাকে অপরিহার্য সত্তার সন্তান রূপে গণ্য করা যেতে পারে না। বস্তুতঃ মানুষের কাছে যা বিস্ময়কর ও ব্যতিক্রমধর্মী , সর্বশক্তিমান অপরিহার্য সত্তার কাছে তা একটি অতি সাধারণ ব্যাপার মাত্র। অবশ্য তিনি কোনো নিয়মকে সৃষ্টিলোকে কতটা কার্যকর রাখবেন তা তাঁর ইচ্ছার ব্যাপার। যদি বিস্ময়কর কিছু থেকে থাকে তো সে বিস্ময় শুধু পিতা বা মাতা বিহনে কোনো মানুষকে সৃষ্টি করা নয় , বরং পিতা-মাতা উভয় বিহনে প্রথম মানুষের সৃষ্টি। বরং এর চেয়েও বিস্ময়কর হচ্ছে শূন্য থেকে এ সৃষ্টিকর্মের সূচনাকরণ বা সৃষ্টিলোকের আদি উপকরণাদির সৃষ্টিকরণ।

বর্তমানে বস্তুবিজ্ঞানীরা যে স্টিফেন হকিং - এর মত গ্রহণ করে নিয়ে বলছেন যে , একটি আদি কণিকা ( primary particle)থেকে গোটা বিশ্বজগত সৃষ্টি হয়েছে , যদি সে ধারণাই সঠিক হয়ে থাকে তো বিবর্তনপ্রক্রিয়ায় সমগ্র বস্তুজগত এবং বিবর্তন ও বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে প্রাণীজগতের সৃষ্টির চেয়েও কোটি কোটি গুণে বিস্ময়কর হচ্ছে শূন্য থেকে সেই আদি কণিকার সৃষ্টি। অতএব , কোনো মানুষের জন্ম বিস্ময়কর হলেই তাকে ঈশ্বরের পুত্র মনে করার যৌক্তিকতা নেই।

এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করতে হয় যে , সাম্প্রতিককালে আবিষ্কৃত ক্লোনিং পদ্ধতি পিতা ছাড়া শুধু মাতা থেকে সন্তান জন্মদানের সম্ভাবনা প্রমাণিত করেছে। এমতাবস্থায় পিতা ছাড়া শুধু মাতা থেকে জন্মগ্রহণের সাথে ঐশ্বরিকতার অধিকারী হওয়ার কোনোই সম্পর্ক নেই।

কোরআন মজীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মুসলমানদের কাছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিতাবিহীন জন্ম ও তাঁর মাতার চারিত্রিক পবিত্রতা একটি বিতর্কাতীত বিষয়। কোরআন মজীদের বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা এসে হযরত মারইয়াম (আঃ)কে তাঁর গর্ভে একজন নেককার সন্তান জন্মগ্রহণের ঐশী সিদ্ধান্তের সুসংবাদ প্রদান করেন।

সর্বশক্তিমান স্রষ্টা ক্লোনিং বা ফেরেশতার মুখাপেক্ষী নন। তিনি যা চান তা-ই করতে পারেন এবং যেভাবে চান সেভাবেই করতে পারেন। তাই মুসলমানদের কাছে এই প্রক্রিয়াগত বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়া বা না হওয়ায় কিছু আসে যায় না। সর্বাবস্থায়ই তাদের কাছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর পিতা ব্যতীতই নিষ্পাপ মাতার গর্ভে জন্মগ্রহণের বিষয়টি অকাট্য সত্য। কিন্তু এ ধরনের ব্যতিক্রমী জন্মের কারণে তাঁকে খোদার পুত্র গণ্য করার যৌক্তিকতা নেই। কারণ , একই সূত্র (কোরআন মজীদ) তাঁকে মানুষ , আল্লাহর বান্দাহ্ (দাস) ও আল্লাহর নবী বলে জানিয়েছে।

অবশ্য কোরআন মজীদের ভাষ্য অনুযায়ী তৎকালীন বনি ইসরাঈলের নিকটও প্রকৃত সত্য অজানা ছিলো না। কারণ , হযরত ঈসা (আঃ) জন্মের পর মাতৃক্রোড়ে থেকেই কথা বলেন এবং নিজেকে আল্লাহর নবী বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কোরআন মজীদ ছাড়া আর কোনো প্রমাণ্য দলীল নেই। ইয়াহূদীরা জেনেশুনে স্বেচ্ছায় সত্য গোপন করেছে এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্ম সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। এ অপবাদ খণ্ডনের ক্ষেত্রে ইনজীলের বর্তমান সংস্করণসমূহ থেকে কোনোভাবে উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। কারণ , বর্তমানে ইনজীল নামে যা চালু আছে তা হচ্ছে প্রকৃত ইনজীলের (আংশিক) বাণী , হযরত ঈসা (আঃ)-এর কথা ও জীবনকাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট লেখকদের বক্তব্যের সংমিশ্রণ। কেউ যদি রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন এবং তাতে তাঁর কিছু কথা (হাদীছে ক্বাওলী) ও কোরআন মজীদের কতক আয়াত উদ্ধৃত করেন , যেমন: যদি বলেন যে , এ ঘটনা প্রসঙ্গে আয়াত নাযিল হলো যে , ... , তাহলে কেবল ঐ গ্রন্থের সাথেই বর্তমানে প্রচলিত ইনজীলের বাকবিন্যাসের বা রচনারীতির তুলনা করা চলে। তদুপরি ইনজীলের রয়েছে ডজন ডজন সংস্করণ যা প্রমাণ করে যে , এ গ্রন্থ তার মূল রূপে বিদ্যমান নেই , বরং বিকৃত হয়ে গেছে।

এতদসত্ত্বেও প্রচলিত ইনজীলকে তর্কের খাতিরে প্রামাণ্য বলে ধরে নিলেও তা ইয়াহূদীদের দেয়া অপবাদ খণ্ডনের ক্ষেত্রে তা কাজে আসবে না। কারণ , প্রথমে প্রমাণ করতে হবে যে , হযরত ঈসা (আঃ) নবী ছিলেন। কেবল এর পরই তাঁর ওপর নাযিলকৃত আসমানী কিতাব ইনজীল (যদি প্রমাণ করা যায় যে , তা অবিকৃতভাবে বর্তমান আছে) দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যে ব্যক্তিকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াত (খৃস্টানদের দাবী অনুযায়ী খোদার পুত্র হওয়ার বিষয়টি) মেনে নেয়ার জন্য দাও আত দেয়া হবে তার কাছে পূর্ব থেকেই ইনজীলের কোনো মূল্য থাকতে পারে না। তার কাছে ইনজীলের মূল্য হবে হযরত ঈসা (আঃ)কে নবী হিসেবে গণ্য করার পর।

অতএব , হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রতি কাউকে দাও আত দিতে হলে তা দিতে হবে বিচারবুদ্ধির ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রতি দাও আত দেয়ার জন্য কোরআন মজীদই হচ্ছে একমাত্র দলীল। কিন্তু যারা কোরআন মজীদকে ঐশী কিতাব হিসেবে জানে না তাদের পক্ষে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে কোরআন মজীদের দলীল থেকে সাহায্য গ্রহণ করা সম্ভব নয়। সুতরাং যারা কোরআন মজীদের ঐশিতা সম্বন্ধে নিশ্চিত নয় তাদের কাছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর খোদার পুত্র অথবা নবী বলে পরিগণিত হওয়া তো দূরের কথা , তাঁর জন্মের বিষয়টিই সংশয়াচ্ছন্নরূপে গণ্য হতে বাধ্য। এমতাবস্থায় এহেন ব্যক্তিকে খোদার পুত্র বলে দাবী করা কেবল বিচারবুদ্ধি বর্জনকারী কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধ দাবীদারদের পক্ষেই সম্ভব।

দেবদেবীদের ঈশ্বরের কর্মগত অংশীদার হওয়ার ধারণা

অংশীবাদী ধ্যানধারণাসমূহের মধ্যে সব শেষে যেটির ওপর আলোকপাত করতে হয় তা হচ্ছে , দেব-দেবীরা সত্তাগতভাবে ঈশ্বরের অংশীদার নয় , বরং কর্মগত দিক থেকে তাঁর অংশীদার ; তারা ঈশ্বরের বিশেষ ধরনের উন্নততম সৃষ্টি এবং স্বয়ং ঈশ্বরের পক্ষ থেকে তাদের ওপর সৃষ্টিকর্ম ও সৃষ্টিলোকের পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বলতে হয় যে , অপরিহার্য সত্তা যদি একটি বিশেষ ধরনের বা প্রজাতির সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেন এবং তাদের মাধ্যমে অন্যান্য সৃষ্টিকে সৃষ্টি করতে ও সৃষ্টিজগতের পরিচালনা ব্যবস্থা চালাতে চান , তাতে আপত্তির কিছু নেই ; এটা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কথিত সৃষ্টি সর্বশক্তিমান অপরিহার্য সত্তার ইচ্ছার বাইরে চলার স্বাধীনতা পাবে - এটা সম্ভব নয়। এরূপ সৃষ্টি সৃষ্টিকর্তার পূর্ণ অনুগত ও সুশৃঙ্খল হতে বাধ্য। এমতাবস্থায় তারা স্বাধীন এক্তিয়ার সম্পন্ন মানুষের চেয়ে উন্নততর হতে পারে না। অতএব , মানুষ তাদের কাছে নত হতে বা তাদের উপাসনা করতে পারে না।

আমরা যদি মেনে নেই যে , সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সৃষ্টিলোকের কাজকর্ম পরিচালনার জন্য এ ধরনের কোনো বিশেষ সৃষ্টির ওপরে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তাহলেও , এমনকি অপরিহার্য সত্তার সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও মানুষের জন্য তাদের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করা অপরিহার্য নয়। কারণ , অপরিহার্য সত্তা অনিবার্যভাবেই সকল স্থান ও কালকে আয়ত্ত করে আছেন। অতএব , তিনি সর্বত্র ও সর্বদা বিরাজমান এবং প্রতিটি সৃষ্টিরই নিকটতম অবস্থানে অবস্থান করছেন। কোনো সময় ও কোনো স্থানই তাঁর অস্তিত্ব থেকে শূন্য নয়। অন্য কথায় বলা যেতে পারে যে , গোটা সৃষ্টিলোক তাঁর ইচ্ছাশক্তিতেই অবস্থান করছে , কারণ , ইতিপূর্বেই আমরা প্রমাণ করেছি যে , সৃষ্টিকুল কেবল তাদের অস্তিত্বলাভের জন্যই অপরিহার্য সত্তার ওপর নির্ভরশীল নয় , বরং তাদের স্থিতি বা টিকে থাকার জন্যও প্রতি মুহূর্তেই তাঁর ওপর নির্ভরশীল। অতএব , তাঁর ও সৃষ্টির মধ্যে কোনোরূপ স্থানিক ও কালিক দূরত্ব নেই। সৃতরাং মানুষের আবেদন-নিবেদন তাঁর কাছে পেশ করা অন্য যে কারো কাছে পেশ করার চেয়ে সহজতর। এমতাবস্থায় , সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য অন্য কোনো সৃষ্টির নিকট (এবং সম্ভবতঃ তার নিজের চেয়ে নিমড়বতর সৃষ্টির নিকট) মাথা নত করা নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক বৈ নয়।

কোনো মহাবিজ্ঞানী ও মহাশক্তিধর সম্রাটের কোনো প্রজা যদি তাঁর দরবারে গিয়ে তাঁর সামনে হাযির থেকে তাঁকে কুর্নিশ করা ও তাঁর কাছে আবেদন পেশের পরিবর্তে তাঁর দিকে পিঠ দিয়ে , সেখানে ঘুরে বেড়ানো কোনো কম্পিউটার-চালিত রোবটকে কুর্নিশ করে তার প্রশংসাগীতি গাইতে শুরু করে , সে ক্ষেত্রে তাকে ঐ রোবট তো কোনো উপকার করতে পারবেই না , বরং এতে সম্রাটের ক্রোধের উদ্রেক হওয়া এবং লোকটিকে দরবার থেকে বের করে দেয়ার জন্য রোবটদের প্রতি নির্দেশদানের সম্ভাবনা প্রায় সুনিশ্চিত। একজন বিজ্ঞানী-সম্রাটের সাথে আচরণের ব্যাপারটা যদি এ ধরনের হয় , তো সে ক্ষেত্রে সর্বশক্তিমান অপরিহার্য সত্তার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের নির্বুদ্ধিতার পরিণাম অধিকতর মারাত্মক হতে বাধ্য। অতএব , দেখা যাচ্ছে , বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য সত্তার সাথে কোনো ধরনের অংশীবাদিতাকেই সম্ভব ও সঠিক বলে গণ্য করে না। কেবল অজ্ঞতা , অন্ধত্ব ও অসচেতনতাই অপরিহার্য সত্তার নিরঙ্কুশ একত্ব প্রত্যাখ্যান ও অংশীবাদকে গ্রহণ করতে পারে।

বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে সৃষ্টি ও ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া

মানবমনে চিরন্তন প্রশ্ন: সকল অস্তিত্বের উৎস মহান সৃষ্টিকর্তা পরম জ্ঞানময় অপরিহার্য সত্তা কেন সৃষ্টিকর্মের সূচনা করলেন এবং তা কীভাবে করলেন ? কীভাবে তিনি এতো সব অকল্পনীয় সূক্ষ্মতম সৃষ্টি থেকে শুরু করে অকল্পনীয় বিশাল সৃষ্টিনিচয়কে অস্তিত্ব দান করলেন এবং কীভাবে এর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করছেন ? বিষয়টি কি এরূপ যে , তিনি সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার সূচনা করে দিয়েছেন , অতঃপর সব কিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলছে এবং তাঁর আর কিছুই করার নেই ? নাকি এরূপ কোনো স্বয়ংক্রিয়তার স্থান নেই , বরং প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার দ্বারা অস্তিত্ব লাভ করছে ও সামনে এগিয়ে চলছে ? বিচারবুদ্ধি এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে কী বলে ?

সৃষ্টিকর্ম স্রষ্টাগুণের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ

প্রথমেই প্রশ্ন জাগে , তিনি কেন সৃষ্টিকর্মের সূচনা করলেন ? পরম প্রমুক্ত অপরিহার্য সত্তা তো সকল অপূর্ণতা ও সকল প্রয়োজন থেকে মুক্ত , তাহলে তিনি সৃষ্টির সূচনা করলেন কেন ?

বিচারবুদ্ধি এ ক্ষেত্রে সহজেই যে উপসংহারে উপনীত হয় তা হচ্ছে , অনস্তিত্ব যেমন নেতিবাচক , তেমনি অস্তিত্ব হচ্ছে ইতিবাচক। পরম প্রমুক্ত অপরিহার্য সত্তা সতত বিদ্যমান ও চিরন্তন অস্তিত্বের অধিকারী। অতএব , তিনি ইতিবাচকতা ও নেতিবাচকতার মধ্যবর্তী নিরপেক্ষতা -রূপ কোনো কাল্পনিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নন। বরং তিনি ইতিবাচক , আর সৃষ্টিকর্ম সম্পাদনও একটি ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য। আর যেহেতু তিনি সকল প্রকার ইতিবাচক গুণবৈশিষ্ট্যের পূর্ণতম মাত্রার অধিকারী , সেহেতু তিনি সৃষ্টিক্ষমতারও অধিকারী। অতএব , তাঁর এ সৃষ্টিক্ষমতার ইতিবাচক বহিঃপ্রকাশ ঘটবে - এটাই তো স্বাভাবিক। তাই সৃষ্টিকর্ম তাঁর জন্য কোনো প্রয়োজন নয় , বরং তাঁর সৃষ্টিক্ষমতার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ।

স্বতঃস্ফূর্ততা মানে স্বয়ংক্রিয়তা নয়

অপরিহার্য সত্তার সৃষ্টিকর্ম তাঁর স্রষ্টাক্ষমতার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ , কিন্তু এই স্বতঃস্ফূর্ততা মানে স্বয়ংক্রিয়তা হতে পারে না। কারণ , সৃষ্টিলোকের অস্তিত্বলাভ ও তা অব্যাহত থাকা এবং তার এগিয়ে চলাকে স্বয়ংক্রিয় গণ্য করার মানে হচ্ছে বিষয়টি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার তথা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা। এরূপ ধারণা মানে কার্যতঃ তাঁর প্রতি যান্ত্রিকতা তথা প্রকারান্তরে এক ধরনের অক্ষমতা আরোপ বৈ নয়। কিন্তু তিনি যে কোনো ধরনের অক্ষমতা থেকে প্রমুক্ত। তাই বিচারবুদ্ধির রায় হচ্ছে এই যে , সৃষ্টিলোক সর্বাবস্থায়ই তাঁর ইচ্ছাশক্তির আওতাধীন।

তিনি প্রাকৃতিক বিধানের স্রষ্টা

অনেকের ধারণা হচ্ছে এই যে , পরম প্রমুক্ত সৃষ্টিকর্তা ছোট-বড় প্রতিটি সম্ভব-অস্তিত্বের সৃষ্টি , স্থিতি ও সামনে এগিয়ে চলা সম্পর্কে প্রতি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এরূপ ধারণা তাঁর মহাবিজ্ঞানময়তার বৈশিষ্ট্যের সাথে মোটেই সামঞ্জস্যশীল নয়। কারণ , বিচারবুদ্ধি লক্ষ্য করে যে , অধিকতর মর্যাদাবান কর্তা সব কাজ নিজে করতে সক্ষম হলেও সব কিছু নিজেই করেন না। উদাহরণস্বরূপ , এক ব্যক্তি তার শারীরিক শক্তি দ্বারা কোনো কাজ সম্পাদন করে এবং অপর এক ব্যক্তি একটি যন্ত্র তৈরী করে ও তা চালানোর জন্য চালক নিয়োগ করে একই কাজ সেই যন্ত্রের সাহায্যে সম্পাদন করে। এ ক্ষেত্রে আমরা দ্বিতীয়োক্ত ব্যক্তিকে অধিকতর মর্যাদাবান কর্তা হিসেবে গণ্য করে থাকি।

সুতরাং মহাজ্ঞানময় অপরিহার্য সত্তার জন্য সামঞ্জস্যশীল হচ্ছে এটাই যে , তিনি সৃষ্টিকরণ এবং সৃষ্টির স্থিতি ও এগিয়ে চলার জন্য নিয়মাবলী বেঁধে দেবেন , আর সব কিছু তদনুযায়ী চলতে থাকবে। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় এ ধরনের নিয়মাবলী প্রত্যক্ষ করি যেগুলোকে আমরা প্রাকৃতিক বিধান বলে থাকি।

তিনি স্বাধীন সৃষ্টির কাজে হস্তক্ষেপ করেন

আমরা লক্ষ্য করছি যে মহাজ্ঞানময় সৃষ্টিকর্তা তাঁর সৃষ্টিকুলের জন্য অনতিক্রম্য প্রাকৃতিক নিয়মাবলীর আওতায় তাঁর কতক সৃষ্টিকে কতক ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েছেন। অর্থাৎ সৃষ্টি ও তার এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে তিনি নিজে যেমন স্বয়ংক্রিয়তার উর্ধে তেমনি তিনি তাঁর সকল সৃষ্টিকে সকল ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিধানের শৃঙ্খলে বেঁধে স্বয়ংক্রিয়তার অধীন করে দেন নি। সেহেতু যে সব সৃষ্টিকে তিনি কতক ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েছেন তারা কীভাবে এ স্বাধীনতাকে কাজে লাগায় সে ব্যাপারে তিনি দৃষ্টি রাখবেন এবং যেখানেই সৃষ্টির ব্যক্তিক বা সামষ্টিক স্বার্থে বা গোটা সৃষ্টিলোকের সৃষ্টি-উদ্দেশ্যের বাস্তবায়নের স্বার্থে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে সেখানে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন - এটাই স্বাভাবিক।

আর এটা সুস্পষ্ট যে , সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি রাখা ও প্রয়োজনবোধে হস্তক্ষেপ তাঁর নিজের প্রয়োজনে নয় , বরং সৃষ্টিরই প্রয়োজনে। যেহেতু তিনি সৃষ্টিকে অস্তিত্বদান করেছেন সেহেতু সৃষ্টির প্রয়োজনে ইতিবাচক হস্তক্ষেপ করবেন - এটাই তাঁর সৃষ্টিক্ষমতার দাবী এবং এ দাবী পূরণে কার্পণ্য করার মতো দুর্বলতা থেকে তিনি প্রমুক্ত।

অনবরত নব নব সৃষ্টি

যেহেতু অপরিহার্য সত্তার সৃষ্টিক্ষমতা অসীম , সেহেতু কতক সৃষ্টিকে (তার সংখ্যা যত ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়নই হোক না কেন) অস্তিত্বদান বা অস্তিত্বে আনয়নের প্রক্রিয়ার সূচনা করে দেয়ার পর তিনি আরো নতুন নতুন ধরনের সৃষ্টিকে অস্তিত্বদানের প্রক্রিয়ার সূচনা করা থেকে বিরত থাকতে পারেন না। কারণ , সে ক্ষেত্রে তা হবে তাঁর স্রষ্টাক্ষমতা কার্যতঃ স্থগিত হয়ে যাওয়ার সমতুল্য। বরং তিনি সদাসর্বদাই নতুন নতুন ধরনের সৃষ্টিকে অস্তিত্বদান ও নতুন নতুন ধরনের সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার সূচনা করবেন এটাই তাঁর অসীম সৃষ্টিক্ষমতার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশের দাবী। তবে বলা বাহুল্য যে , এটা তাঁর জন্য অনিবার্য বা অপরিহার্য হতে পারে না। বরং এটা সম্পূর্ণরূপেই তাঁর ইচ্ছাশক্তির অধীন , আর তাঁর ইচ্ছাশক্তি তাঁর ইতিবাচক গুণাবলীরই অন্যতম।

তাহলে বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে আমরা অপরিহার্য সত্তা কর্তৃক সৃষ্টি ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কয়েকটি সত্যে উপনীত হতে পারি। এ সত্যগুলো হচ্ছে:

তিনি অসীম সৃষ্টিক্ষমতার অধিকারী এবং অনবরত সৃষ্টি করে চলেছেন।

সৃষ্টিকর্ম তাঁর সৃষ্টিক্ষমতার স্বতঃস্ফূর্ত ইতিবাচক বহিঃপ্রকাশ , কিন্তু এ স্বতঃস্ফূর্ততা মানে স্বয়ংক্রিয়তা নয় এবং তিনি এরূপ সৃষ্টি ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদনে বাধ্য নন।

তিনি সৃষ্টিসমূহের সূচনা করেছেন এবং তার স্থিতি ও অগ্রগতির জন্য নিয়মাবলী (প্রাকৃতিক বিধিবিধান) বেঁধে দিয়েছেন। সব কিছু এ নিয়মের আওতায় চলছে।

তাঁরই নির্ধারিত প্রাকৃতিক বিধিবিধানের আওতায় তিনি কতক সৃষ্টিকে কিছুটা স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং তাদের কর্মের প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখেন ও তাদেরই প্রয়োজনে অনেক সময় তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করেন।

সৃষ্টির কাজে স্রষ্টার হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা

এখানে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী সৃষ্টির কাজে তাদেরই প্রয়োজনে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপকরণ সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে মনে হয়। কারণ , প্রশ্ন উঠতে পারে যে , পরম জ্ঞানময় সৃষ্টিকর্তা তো সৃষ্টিকর্ম সম্পাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকালেই তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির অনাগত ভবিষ্যৎ প্রয়োজন সম্পর্কে জানেন এবং সে প্রয়োজন পূরণের উপযোগী করে প্রাকৃতিক বিধিবিধান প্রণয়ন করেই সৃষ্টির সূচনা করেন। এমতাবস্থায় কী করে নতুন প্রয়োজন দেখা দিতে পারে - যা পূরণের লক্ষ্যে তাঁকে সৃষ্টির কাজে হস্তক্ষেপ করতে হবে ?

বিচারবুদ্ধির সামান্য প্রয়োগ করলেই আমরা এ প্রশ্নের জবাব পেতে পারি। আমরা বিচারবুদ্ধির দ্বারা বুঝতে পারি যে , এ সৃষ্টিলোকের সৃষ্টিনিচয় গুণগতভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত। আমাদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার আওতাধীন সৃষ্টিনিচয়ের মধ্যে কোনো কোনো সৃষ্টি প্রাকৃতিক নিয়মের কঠিন নিগড়ে বাঁধা বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় - যা যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলেছে এবং যার কোনোরূপ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্মশক্তি নেই। কিন্তু অপর কতক সৃষ্টি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। এ সব সৃষ্টির মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির ইচ্ছাশক্তি ও স্বাধীনতার মাত্রা ও পর্যায়ের ক্ষেত্রে পারস্পরিক পার্থক্য রয়েছে।

স্রষ্টার পক্ষ থেকে তাদেরকে ইচ্ছাশক্তি ও স্বাধীনতা প্রদানের মানেই হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা তাদের ভবিষ্যতকে , সরাসরিই হোক বা প্রাকৃতিক বিধিবিধানের দ্বারাই হোক , শতকরা একশ ভাগ অপরিবর্তনীয় করে বেঁধে দেন নি এবং স্রষ্টা তাদের জন্য যা করা ও যেমনটি হওয়া পসন্দ করেন তেমনটি হওয়া ও তা করার জন্য তাদেরকে বাধ্য করেন না। তিনি তাদেরকে কতক প্রাকৃতিক বিধিবিধানের বিরুদ্ধে (যেমন: সহজাত প্রবণতার বিরুদ্ধে) বিদ্রোহ করার ক্ষমতা ও সুযোগ দিয়েছেন। এমনকি তারা চাইলে স্রষ্টার পসন্দ-অপসন্দের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারবে ; তিনি তাদেরকে সে সুযোগও দিয়েছেন , যদিও বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে এটা সুনিশ্চিত যে , তিনি পসন্দ করেন না যে , তারা এমনটি করুক। অর্থাৎ কতক সৃষ্টিকে তিনি যে ইচ্ছাশক্তি ও স্বাধীনতা দিয়েছেন তার দাবী মিটাতে গিয়ে তিনি তাদেরকে তাঁর পসন্দনীয় কাজ সম্পাদনে ও তাঁর অপসন্দনীয় কাজ সম্পাদন থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেন না।

বলা বাহুল্য যে , ইচ্ছাশক্তি ও স্বাধীনতার অধিকারী এই সৃষ্টিনিচয় প্রকৃতিক বিধিবিধানে পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম না হলেও প্রাকৃতিক বিধিবিধানের স্বেচ্ছাচারী প্রয়োগ করতে পারে - যার পরিণতিতে সৃষ্টিলোকের গতিধারায় কমবেশী নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার লাভ করে। ক্ষেত্রবিশেষে এ নেতিবাচক প্রভাব এতোখানি হতে পারে যে , তা সৃষ্টিলোকের শৃঙ্খলা ও লক্ষ্যকে ব্যাহত করতে পারে বা অন্য সৃষ্টির স্বাভাবিক দাবীকে নস্যাৎ করতে পারে। এমতাবস্থায় সামগ্রিকভাবে সৃষ্টিলোকের বা তার অংশবিশেষের দাবী মিটাতে গিয়ে বা সৃষ্টিলোককে তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর স্বার্থে তিনি ঐ সব সৃষ্টির কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক হস্তক্ষেপ করবেন এটাই বিচারবুদ্ধির দাবী।

ইরান : তদানীন্তন সভ্যতার লালনভূমি

যে কারণে আমরা রোমান সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা অধ্যয়ন করেছি সে একই কারণে আমরা সে সময়ের ইরানের সার্বিক পরিস্থিতি সম্মানিত পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরব। তবে এ বিষয়টির দিকেও দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক যে,আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের দুর্বল দিকগুলো বর্ণনা করে থাকি,তাহলে কেবল সত্য বিশ্লেষণ এবং ইসলাম ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা ব্যতীত আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। জাতীয় গর্ব ও স্বদেশপ্রেম যেন অবশ্যই আমাদের বাস্তববাদী হওয়া থেকে বিরত রাখতে না পারে। আমরা দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি পবিত্র ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ইরানে রাজত্ব করত তা বর্ণনা করতে,বাস্তবকে মেনে নিতে এবং (তদানীন্তন ইরানী সমাজে প্রচলিত) কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে কোন কিছু পরোয়া করি না। অ্যারিস্টটল তাঁর শিক্ষক প্লেটোর সাথে তাঁর মতবিরোধ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা-ই পুনরাবৃত্তি করছি। তিনি তাঁর এ মতপার্থক্যের ব্যাপারে এভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন: আমি প্লেটোকে ভালোবাসি। তবে সত্যকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি।”

সে যুগের ইরানী সরকার ও প্রশাসনের প্রধান দুর্বল দিকটি ছিল স্বৈরাচারী একনায়ক সরকার। নিঃসন্দেহে ব্যক্তিবিশেষের বিবেক-বুদ্ধি ও তাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা এবং একটি সংঘ বা দলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা মোটেও এক নয়। সামষ্টিক অর্থাৎ জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে ষড়যন্ত্র,পেশী প্রদর্শন ও জোর খাটানো অপেক্ষাকৃত কমই হয়ে থাকে। এ কারণেই ইরানীদের মহত্ত্ব,নেতৃত্ব অথবা দুর্বলতা ও অপদস্থ হওয়ার বিষয়টি তাদের কর্তৃত্বশীল একনায়কতন্ত্রের দুর্বলতা অথবা সামর্থ্যরে সাথে পূর্ণরূপে জড়িত। সাসানী সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংক্রান্ত আলোচনা ও অধ্যয়ন এবং তাদের প্রশাসনের ছায়ায় যে সব অস্থিতিশীলতার উদ্ভব হয়েছে সেগুলো আমাদের এ বক্তব্যের জীবন্ত দলিল।

ইসলামের আবির্ভাবকালে ইরানের সার্বিক অবস্থা

ইসলামের আবির্ভাব এবং 611 খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতপ্রাপ্তি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের (590-628 খ্রি.) শাসনামলের সমসাময়িক ঘটনা ছিল। মহানবী (সা.) সম্রাট খসরু পারভেজের রাজত্বকালেই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। (সে দিনটি ছিল শুক্রবার,16 জুলাই,622 খ্রি.)। আর এ তারিখ অর্থাৎ মহানবীর হিজরত দিবস থেকেই মুসলমানদের সন ও তারিখ গণনা শুরু হয়েছিল।

দু টি বৃহৎ পরাশক্তি (প্রাচ্যের রোমান সাম্রাজ্য ও সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য) ঐ সময়ের সভ্য দুনিয়ার বেশিরভাগ অংশ শাসন করত। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে এ দু টি সাম্রাজ্য সমগ্র বিশ্বে শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।

পারস্য সম্রাট আনুশীরওয়ান (নওশেরওয়ান) [531-589 খ্রি.]-এর রাজত্বকাল থেকে রোমানদের সাথে ইরানীদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা খসরু পারভেজের রাজত্বকাল পর্যন্ত দীর্ঘ 24 বছর স্থায়ী হয়েছিল।

পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যদ্বয় এ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যে বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছিল এবং ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সে কারণে উক্ত সাম্রাজ্যদ্বয়ের সরকার ও প্রশাসন কার্যত পঙ্গু ও অচল হয়ে গিয়েছিল;আসলে খোলস ছাড়া এ পরাশক্তিদ্বয়ের আর কিছুই তখন অবশিষ্ট ছিল না।

বিভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট থেকে ইরানের সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতি আলোচনা করতে হলে সম্রাট আনুশীরওয়ানের রাজত্বকালের শেষভাগ থেকে মুসলমানদের আগমন ও পারস্যবিজয় পর্যন্ত সে দেশের সরকার ও প্রশাসনের অবস্থা আমরা আলোচনা করব।

সাসানী শাসনামলে জৌলুস ও বিলাসিতা

সাসানী সম্রাটগণ সাধারণত বিলাসী ও আনুষ্ঠানিকতাপ্রিয় ছিলেন। সাসানী সম্রাটদের জাঁকজমকপূর্ণ শাহী দরবার এবং এর জৌলুস দর্শনার্থীদের চোখ ঝলসে দিত।

সাসানী শাসনামলে দারাফশেশে কভীয়নী’নামে ইরানীদের একটি পতাকা ছিল যা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা সাসানীয়দের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ উৎসবসমূহের সময় রাজকীয় প্রাসাদসমূহে উত্তোলন করা হতো। পতাকাটি মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত দ্বারা সুশোভিত করা হতো। একজন লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী,এ পতাকাটির মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত আসলেই অদ্বিতীয় ছিল যার মূল্য 12,00,000 দিরহাম অর্থাৎ 30,000 পাউন্ড।59

সাসানীদের কল্পকাহিনীর মতো জমকালো প্রাসাদসমূহে বিপুল সংখ্যক মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী,হীরা-জহরত,মণিমুক্তা এবং বিস্ময়কর চিত্রকলা ও ছবির সংগ্রহ ছিল যা দর্শনার্থীদের বিস্ময়াভিভূত করত। আমরা যদি এ সব শাহী প্রাসাদের বিস্ময়কর বিষয়াদি জানতে চাই তাহলে কেবল একটি বৃহদাকার সাদা কার্পেটের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই চলবে যা একটি (সাসানী) রাজপ্রাসাদে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। উক্ত কার্পেটের নাম ছিল বাহারিস্তানে কিসরা’অর্থাৎ সম্রাট কিসরা বা খসরুর বসন্তবাগান। সাসানী শাসকবর্গ এ কার্পেটটি এ কারণে তৈরি করিয়েছিলেন যাতে করে তাঁরা আমোদ-প্রমোদ করার সময় হর্ষোৎফুল্ল থাকতে পারেন এবং সর্বদা বসন্ত ঋতুর সুন্দর ও আনন্দদায়ক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।60

বর্ণনামতে এ কার্পেটের দৈর্ঘ্য ছিল 150 হাত এবং প্রস্থ 70 হাত;আর এর সমস্ত সুতা স্বর্ণ,হীরা-মুক্তা ও জহরত খচিত ছিল।61

সাসানী সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট খসরু পারভেজই অন্য সকল সম্রাটের চেয়ে বেশি জাঁকজমক,বিলাসিতা ও জৌলুসপ্রিয় ছিলেন। তাঁর শাহী হেরেমে নারী,দাসী,গায়িকা ও নর্তকীদের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

হামযাহ্ ইসফাহানী সানা মুলূকিল আরদ’গ্রন্থে সম্রাট খসরু পারভেজের শান-শওকত,জৌলুস ও বিলাসিতা ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছেন :

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের তিন হাজার স্ত্রী,12000 গায়িকা দাসী,6000 দেহরক্ষী পুরুষ সৈনিক,8500টি সওয়ারী ঘোড়া,960টি হাতী,মালপত্র বহন করার জন্য 12000টি গাধা এবং 1000টি উট ছিল।62

এরপর তাবারী আরো বলেছেন,এ সম্রাট অন্য সকলের চেয়ে বেশি মনিমুক্তা,হীরা-জহরত এবং মূল্যবান তৈজসপত্রের প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করতেন।63

ইরানের সামাজিক অবস্থা

সাসানী যুগে ইরানের সামাজিক অবস্থা সে দেশের দরবার ও রাজনৈতিক অবস্থার চেয়ে কোনভাবেই ভালো ছিল না। শ্রেণীশাসন ও শোষণ যা সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই ইরানে বিদ্যমান ছিল তা সাসানীদের যুগে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে।

অভিজাত ও পুরোহিতশ্রেণী অন্যান্য শ্রেণী অপেক্ষা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণী বলে বিবেচিত হতো। সকল ধরনের সামাজিক সংবেদনশীল পদ ও পেশা তাদেরই করায়ত্তে ছিল। পেশাজীবী ও কৃষকগণ সকল প্রকার ন্যায্য অধিকারভিত্তিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। কেবল কর প্রদান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ব্যতীত তাদের অন্য কোন পেশাই ছিল না।

সাসানীদের শ্রেণীবৈষম্যের বিষয়ে নাফীসী লিখেছেন :

“যে বিষয়টি ইরানী জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কপটতার প্রসার ও প্রচলন করেছিল তা ছিল অতি নিষ্ঠুর শ্রেণীবৈষম্য যা সাসানীরা ইরানে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আর শ্রেণীবৈষম্যের মূল পূর্বতন সভ্যতাসমূহের মাঝেই নিহিত ছিল। কিন্তু সাসানীদের যুগে কঠোরতা আরোপের বিষয়টি চরমভাবে বৃদ্ধি পায়।

পারস্য সমাজে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সাত অভিজাত বংশ এবং তাদের পর পাঁচটি শ্রেণী এমন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত যা থেকে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত ছিল। মালিকানা ও স্বত্বাধিকার প্রায় ঐ সাত পরিবার বা বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাসানী ইরানের জনসংখ্যা ছিল 140 মিলিয়ন (14 কোটি)। ঐ সাত বংশের প্রতিটির লোকসংখ্যা যদি এক লক্ষও ধরি তাহলে ঐ সাত বংশের সম্মিলিত লোকসংখ্যা 7,00,000 হবে। আর সৈন্য-সামন্ত এবং জমিদারশ্রেণী যাদেরও কিছুটা মালিকানা স্বীকৃত ছিল তাদের সংখ্যাও যদি আমরা 7,00,000 বলে অনুমান করি তাহলে এ চৌদ্দ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় 15,00,000 ব্যক্তির মালিকানা ছিল এবং বাকী জনগণ স্রষ্টাপ্রদত্ত এই স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।64

পেশাজীবী ও কৃষিজীবিগণ যারা সকল প্রকার অধিকার সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল,কিন্তু অভিজাতশ্রেণীর তাবৎ ব্যয়ভার যাদের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছিল তারা এ অবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের কোন স্বার্থ বা লাভের কথা চিন্তাও করতে পারত না। এ কারণেই অধিকাংশ কৃষিজীবী এবং সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোক নিজেদের পেশা ত্যাগ করে অসহনীয় কর থেকে বাঁচার জন্য মঠ অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের আস্তানায় আশ্রয়গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।65

‘সাসানীদের যুগে ইরান’নামক গ্রন্থের লেখক ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর দুর্ভাগ্য সম্পর্কে লিখেছেন : এমিয়ান মার্সেলিনোস নামক পাশ্চাত্যের এক ঐতিহাসিকের বাণী এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে : ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণী সাসানীদের যুগে চরম দীনতা ও দুর্ভাগ্যের মধ্যে দুর্বিষহ জীবনযাপন করত। তারা যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর পেছনে পায়ে হেঁটে যাত্রা করত। তাদেরকে এমনভাবে মর্যাদাহীন বলে গণ্য করা হতো যেন তাদের ললাটে চিরকালের জন্য দাসত্ব লিখে দেয়া হয়েছে। তারা তাদের শ্রমের বিনিময়ে কোন মজুরি লাভ করত না।”66

সাসানী সাম্রাজ্যের একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণী যারা জনসংখ্যায় শতকরা 1.5 ভাগের কম ছিল তারাই সব কিছুর অধিকারী ছিল। কিন্তু ইরানের জনসংখ্যার শতকরা 98 ভাগের বেশি দাসশ্রেণীর মতো জীবনের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

অভিজাতশ্রেণীই শিক্ষাগ্রহণের অধিকার রাখত

সাসানী যুগে কেবল অভিজাত ও উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন শিশুরাই বিদ্যার্জন করার অধিকার রাখত। সাধারণ জনতা ও সমাজের মধ্যবিত্তশ্রেণী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রাচীন ইরানের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় এ ত্রুটি এতটা প্রকট ছিল যে,এমনকি শাহনামা’ও রাজা-বাদশাদের উপাখ্যান রচয়িতাগণ যাঁদের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে বীরত্বগাথা রচনা করা তাঁরাও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন।

ইরানের বীরত্বগাথা রচয়িতা কবি ফেরদৌসী শাহনামা য় একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন যা এ বিষয়টির সর্বোত্তম সাক্ষ্য-প্রমাণ। কাহিনীটি সম্রাট আনুশীরওয়ানের শাসনামল অর্থাৎ যখন সাসানী সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ তখন সংঘটিত হয়েছিল। এ কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে,তাঁর শাসনামলে প্রায় সকল অধিবাসীরই শিক্ষা ও বিদ্যার্জন করার অধিকার ছিল না,এমনকি জ্ঞানপ্রেমিক সম্রাট আনুশীরওয়ানও অন্যান্য শ্রেণীর জনসাধারণকে জ্ঞানার্জনের অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন না।

ফেরদৌসী লিখেছেন : ইরান ও রোমের যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য একজন জুতা নির্মাতা (মুচি) তার স্বর্ণ ও রূপার ভাণ্ডার দান করতে চেয়েছিল। সে সময় সম্রাট আনুশীরওয়ান আর্থিক সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিলেন। কারণ ইরানের প্রায় তিন লক্ষ সৈন্য তখন তীব্র খাদ্য ও অস্ত্র সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। সম্রাট আনুশীরওয়ান এ অবস্থার কারণে খুবই উদ্বিগ্ন এবং তাঁর নিজ পরিণতি সম্পর্কেও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সম্রাট তাৎক্ষণিকভাবে জ্ঞানী প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করার জন্য ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেন যেন তিনি মাযেনদারান গমন করে যুদ্ধের খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু বুযুর্গমেহের সম্রাটকে বললেন, বিপদ অত্যাসন্ন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে একটি উপায় খুঁজে বের করা আবশ্যক।” তখন বুযুর্গমেহের জাতীয় ঋণ’অর্থাৎ জাতির কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার পরামর্শ দিলেন। সম্রাট আনুশীরওয়ানও তাঁর এ প্রস্তাবটি পছন্দ করলেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশও জারী করলেন। বুযুর্গমেহের নিকটবর্তী শহর,গ্রাম ও জনপদে রাজকীয় কর্মকর্তাদের প্রেরণ করে ঐ সকল স্থানের সচ্ছল ব্যক্তিদের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবগত করলেন।

তখন একজন জুতা নির্মাতা যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সে যা চেয়েছিল তা হলো : এর বিনিময়ে তার একমাত্র পুত্রসন্তান যে লেখাপড়া শিখতে অত্যন্ত আগ্রহী তাকে যেন লেখাপড়া শেখার অনুমতি দেয়া হয়। বুযুর্গমেহের ঐ মুচির আবেদনকে তার দানের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করেন এবং সম্রাটের কাছে ফিরে গিয়ে তার আর্জি সম্পর্কে সম্রাটকে অবহিত করেন। আনুশীরওয়ান এ কথা শুনে খুব রেগে যান এবং প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে তিরস্কার করে বলেন, তুমি এ কেমন আবেদন করছ? এ কাজ কল্যাণকর নয়। কারণ যে শ্রেণীবিন্যাসের আওতায় সে রয়েছে তা থেকে তার বের হয়ে আসার মাধ্যমে দেশের শ্রেণীপ্রথা ধসে পড়বে এবং তখন সে যে স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করছে তার মূল্যমান অপেক্ষা তার এ আর্জি অনেক বেশি ক্ষতি বয়ে আনবে।”

এরপর ফেরদৌসী সম্রাট আনুশীরওয়ানের কণ্ঠে তাঁর (সম্রাটের) মেকিয়াভ্যালি দর্শন’ব্যাখ্যা করেছেন:

বণিকপুত্র যদি হয় সচিব

গুণী,জ্ঞানী ও শিক্ষানবীশ

তাই যখন বসবে মোদের যুবরাজ সিংহাসন পরি

অবশ্যই পাবে সে তখন এক (দক্ষ ও গুণী) ভাগ্যমান সহকারী

আর কভু যদি মোজা বিক্রেতা করে এ গুণ ও জ্ঞান অর্জন

এ জ্ঞান দেবে তারে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন চক্ষু

আর নীচ বংশজাত জ্ঞানীকে দেবে অনুধাবনকারী কর্ণ

ব্যস্,তখন পরিতাপ ও শীতল বায়ু ছাড়া রইবে না আর কিছু।

এভাবেই ন্যায়পরায়ণ (!) বাদশার নির্দেশে জুতা নির্মাতা লোকটির টাকা-পয়সা ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ হতভাগা জুতা নির্মাতা তীব্র মনঃকষ্ট পায় এবং সে রাতের বেলা ন্যায়বিচারক স্রষ্টার দরবারে দু হাত উঠিয়ে এ ধরনের অত্যাচার ও ন্যায্য অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রার্থনা করে-যা হচ্ছে মজলুমদেরই রীতি। আর এভাবে সে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচারের ঘণ্টা ধ্বনিত করে।

প্রেরিত দূত ফিরে আসল এবং ঐ দিরহামগুলো দেখতে পেয়ে

ঐ মুচির অন্তর হলো তীব্র দুঃখভারাক্রান্ত

রাত হলে শাহের কথায় হলো সে দুঃখভারাক্রান্ত

মহান আল্লাহর দরবারে সে চাইল ঐশী আদালতের ঘণ্টাধ্বনি ধ্বনিত হোক। 67

এত কিছু সত্ত্বেও সম্রাট আনুশীরওয়ানের বিশাল প্রচারমাধ্যম ও প্রশাসন তাঁকে ন্যায়পরায়ণ বলে আখ্যায়িত করতে এবং ইরানী সমাজকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু তথাকথিত ন্যায়পরায়ণ এ শাহ তদানীন্তন ইরানী সমাজের মৌলিক সমস্যার জট খুলতে তো সক্ষম হননি;বরং ইরানীদের প্রভূত সামাজিক সমস্যার কারণও হয়েছিলেন। কেবল মাযদাক গোলযোগের ঘটনায় আশি হাজার এবং অপর একটি অভিমত অনুযায়ী এক লক্ষ ইরানীকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ধারণা করেছিলেন যে,উক্ত ফিতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে।68 অথচ এ ফিতনা যে মূলোৎপাটিত হয় নি তা তিনি মোটেও উপলব্ধি করতে পারেন নি। এ ধরনের শাস্তি আসলে ফলাফলের অস্তিত্ব নিশ্চি‎‎ হ্ন করে দেয়,তা কারণের অস্তিত্ব বিলোপ করে না। এ হচ্ছে পাপীদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সংগ্রাম-পাপ ও অপরাধের বিরুদ্ধে নয়। ফিতনার মূল কারণই ছিল সমাজে ভারসাম্যহীনতা,শ্রেণীবৈষম্য,দ্বন্দ্ব,বিশেষ একটি শ্রেণী কর্তৃক সম্পদ ও পদমর্যাদা কুক্ষিগতকরণ,নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা এবং অপরাপর দুর্নীতি ও অপরাধ। আর সম্রাট আনুশীরওয়ান অস্ত্র বল ও চাপ প্রয়োগ করে চাইতেন যে,জনগণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করুক।

এডওয়ার্ড ব্রাউন সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে লিখেছেন : সম্রাট আনুশীরওয়ান নাস্তিকদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি যারথুস্ত্রীয় (যারদোশ্ত) ধর্মযাজকদের প্রশংসা ও সম্মতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর ঐ সব ধর্মযাজকের হাতেই জাতীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে...।”69   এ সব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত ইতিহাসে সম্রাট আনুশিরওয়ানকে ন্যায়পরায়ণতা ও মানবতার পূর্ণ আদর্শ এক সম্রাট হিসাবে পরিচিত করানো হয়েছে। এ ব্যাপারে অনেক কাহিনীও রচনা করা হয়েছে।

খুবই আশ্চর্যজনক! এ দীর্ঘ সময় একমাত্র একটি বৃদ্ধ গাধা ব্যতীত আর কোন মজলুমই ন্যায়বিচারের ঘণ্টা বাজায় নি,অবশ্য এটিও জ্ঞাত বিষয় যে,ঐ গাধাটি তার নিজের সাহসের অপরাধের কথা জানত না;আর যদি সে তা জানত তাহলে সে ঘুণাক্ষরেও ন্যায়পরায়ণতার রজ্জুর নিকটবর্তী হতো না!!

আরো বলা হয় যে,একবার রোমের বাদশাহ্,আজম অর্থাৎ ইরানের বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের কাছে এক দূত প্রেরণ করেছিলেন। যখন ঐ দূত ইরানের বাদশার শানশওকত এবং বিশাল তাক-ই কিসরা প্রত্যক্ষ করলেন তখন তিনি দেখতে পেলেন যে,ইরানের বাদশাহ্ সিংহাসনে উপবিষ্ট;আর রাজারা তাঁর দরবারে উপস্থিত। তিনি এক ঝলক দৃষ্টি শাহী দ্বারমণ্ডপের ওপর নিবদ্ধ করলে উক্ত দ্বারমণ্ডপটি তাঁর দৃষ্টিতে খুবই জমকালো ও জাঁকজমকপূর্ণ বলে মনে হয়। কিন্তু ঐ দ্বারমণ্ডপের চারপাশ যেন একটু বাঁকা। দূত তখন দরবারে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন : দ্বারমণ্ডপে যে সামান্য বক্রতা আপনি দেখতে পাচ্ছেন আসলে এর কারণ হচ্ছে এখানে এক বৃদ্ধার ঘর ছিল যা বাদশাহ্ কিনে নিয়ে দ্বারমণ্ডপের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঐ বৃদ্ধা তার ঘর বিক্রি করতে রাজী না হওয়ায় বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানও তাকে বিক্রি করতে বাধ্য করেন নি। তাই ঐ বৃদ্ধার বাড়িটিই অবশেষে এ দ্বারমণ্ডপটির বক্রতার কারণ হয়েছে। তখন ঐ দূত শপথ করে বললেন যে,দ্বারমণ্ডপের এই বক্রতা আসলে এর সরল ও অবক্র হওয়া অপেক্ষা শ্রেয়।70

এটি আশ্চর্যজনক যে,এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ভবন ও দ্বারমণ্ডপ যে ব্যক্তি নির্মাণ করতে ইচ্ছুক তিনি কি পূর্ব থেকেই এর নকশা সংগ্রহ করবেন না এবং নকশা ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ভূমি ব্যতীতই কেউ কি এ ধরনের ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে! আর এর ফলে শাহী প্রাসাদ বাঁকা হবে। এ কি কখনো বিশ্বাস করা যায়?

আসলে এ ধরনের গালগল্প সম্রাটের দরবারের ব্যক্তিবর্গ ও যারথুস্ত্রীয় ধর্মযাজকগণ,মাযদাকী মতাবলম্বীদের দমন করে সম্রাট তাঁদের স্বার্থে যে মহামূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন সে কারণেই তাঁরা সম্রাটের অনুকূলেই রচনা করে থাকতে পারেন।

‘ইরান ও ইসলাম’গ্রন্থের লেখকের অভিমত অনুসারে এ সব কিছুর চেয়েও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই যে,কেউ কেউ সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতাকে শারয়ী ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণ করার জন্য এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের সূত্র থেকেও হাদীস বর্ণনা করতে বাধ্য হয়েছে। যেমন :ولدت في زمن الملك العادل আমি ন্যায়পরায়ণ বাদশার রাজত্বকালে জন্মগ্রহণ করেছি।”-প্রসিদ্ধ এ হাদীসটি। মহানবী (সা.) যেন এ কথা বলতে গর্ববোধ করতেন যে,তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছেন,অথচ মহানবীর সাথে তাঁর (বাদশার) ন্যায়পরায়ণতার কি কোন সম্পর্ক আছে?

অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : হযরত আলী মাদায়েনে এসে কিসরার প্রাসাদে গমন করলেন। সেখানে তিনি আনুশীরওয়ানকে জীবিত করে তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন হযরত আলীকে বলেছিলেন যে,কুফ্রী করার কারণে তিনি বেহেশত থেকে বঞ্চিত হয়েছেন,তবে ন্যায়পরায়ণ হবার কারণে জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্তও হচ্ছেন না।71 এখন আমরা পর্যালোচনা করব যে,সাসানীরা কি ধরনের অত্যাচার করেছে।

খসরু পারভেজের অপরাধসমূহের পর্দা উন্মোচন

সম্রাট খসরু পারভেজের অত্যাচারমূলক ও পাগলামিপূর্ণ আরেকটি কাজ ছিল প্রসিদ্ধ বুযুর্গমেহেরের সাথে তাঁর আচরণ। এ বুযুর্গমেহের আনুশীরওয়ানের দরবারে 13 বছর কর্মরত ছিলেন এবং তিনি প্রভূত যশ ও খ্যাতির অধিকারী হয়েছিলেন। অবশেষে সম্রাট খসরু পারভেজ তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সম্রাট কারাগারে বন্দী বুযুর্গমেহেরের কাছে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন : তোমার জ্ঞান,বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা অবশেষে তোমারই নিহত হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।” বুযুর্গমেহেরও উত্তরে লিখেছিলেন : যে পর্যন্ত ভাগ্য আমার প্রতি প্রসন্ন ছিল সে পর্যন্ত আমি আমার বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়েছি। এখন যখন ভাগ্য আমার অনুকূলে নেই তখন আমার ধৈর্য ও সহ্যশক্তিকে কাজে লাগাব। আমার হাত দিয়ে যদি অগণিত সৎকর্মসম্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে আমি আমার মন্দ কাজ থেকেও নিরাপদ ও নিশ্চিত হয়েছি। আমার কাছ থেকে মন্ত্রিত্ব পদ কেড়ে নেয়া হলেও আমা থেকে ঐ পদের অসংখ্য অন্যায় ও অত্যাচারের দুঃখ-কষ্টও দূর করা হয়েছে। অতএব,আমার আর ভয় কিসে?

যখন সম্রাট খসরু পারভেজের হাতে বুযুর্গমেহেরের উক্ত চিঠি পৌঁছালো তখন সম্রাট বুযুর্গমেহেরের নাক ও ঠোঁট কেটে ফেলার আদেশ দিলেন। যখন বুযুর্গমেহেরকে সম্রাটের এ আদেশ শুনানো হলো তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন : আমার ঠোঁট এর চেয়ে আরোও বেশি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।” সম্রাট খসরু পারভেজ তখন জিজ্ঞাসা করলেন : কি কারণে? বুযুর্গমেহের তখন বললেন : যেহেতু আপামর জনতার কাছে তোমার এমন সব গুণের প্রশংসা করেছি যা তোমার ছিল না এবং অসন্তুষ্ট অন্তঃকরণসমূহকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম। আমি তোমার এমন সব ভালো কাজ ও পুণ্যের কথা জনগণের মধ্যে প্রচার করেছি যার উপযুক্ত তুমি ছিলে না। হে নিকৃষ্ট অসৎকর্মশীল সম্রাট! যদিও আমার সততার ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত এতদ্সত্ত্বেও আমাকে কুধারণার বশবর্তী হয়ে হত্যা করছ? অতএব,তোমার কাছে সুবিচার আশা করা এবং তোমার কথায় ভরসা করা যায় কি?

সম্রাট খসরু পারভেজ বুযুর্গমেহেরের কথায় খুবই উত্তেজিত হয়ে তাঁর শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলেন।72

‘ইরানের সামাজিক ইতিহাস’গ্রন্থের রচয়িতা-যিনি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা সাসানী যুগের অরাজকতা,অধঃপতিত অবস্থা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল দেশের অভিজাতশ্রেণীর জন্য শিক্ষাগ্রহণের অধিকার ও সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়টি এভাবে চিত্রিত করেছেন :

“এ যুগে তখনকার প্রচলিত সকল জ্ঞান ও শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং শিক্ষা কেবল পুরোহিত,যাজক ও অভিজাতশ্রেণীর সন্তানগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল;আর ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।”73

হ্যাঁ,এ জাহেলী প্রথা সাসানী সম্রাটদের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। আর তাঁরা কোনভাবেই এ বিষয়টি পরিহার করতে চাইতেন না ।

এ কারণেই সৌভাগ্য ও সুখের ক্রোড়ে প্রতিপালিত এ সংখ্যালঘু শ্রেণীটির অপরিপক্ব ও অসংযত প্রবৃত্তি ও রিপুর কামনা-বাসনা ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে জ্ঞানার্জনের অধিকারসহ সকল বৈধ সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল।

ইরান : তদানীন্তন সভ্যতার লালনভূমি

যে কারণে আমরা রোমান সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা অধ্যয়ন করেছি সে একই কারণে আমরা সে সময়ের ইরানের সার্বিক পরিস্থিতি সম্মানিত পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরব। তবে এ বিষয়টির দিকেও দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক যে,আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের দুর্বল দিকগুলো বর্ণনা করে থাকি,তাহলে কেবল সত্য বিশ্লেষণ এবং ইসলাম ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা ব্যতীত আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। জাতীয় গর্ব ও স্বদেশপ্রেম যেন অবশ্যই আমাদের বাস্তববাদী হওয়া থেকে বিরত রাখতে না পারে। আমরা দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি পবিত্র ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ইরানে রাজত্ব করত তা বর্ণনা করতে,বাস্তবকে মেনে নিতে এবং (তদানীন্তন ইরানী সমাজে প্রচলিত) কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে কোন কিছু পরোয়া করি না। অ্যারিস্টটল তাঁর শিক্ষক প্লেটোর সাথে তাঁর মতবিরোধ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা-ই পুনরাবৃত্তি করছি। তিনি তাঁর এ মতপার্থক্যের ব্যাপারে এভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন: আমি প্লেটোকে ভালোবাসি। তবে সত্যকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি।”

সে যুগের ইরানী সরকার ও প্রশাসনের প্রধান দুর্বল দিকটি ছিল স্বৈরাচারী একনায়ক সরকার। নিঃসন্দেহে ব্যক্তিবিশেষের বিবেক-বুদ্ধি ও তাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা এবং একটি সংঘ বা দলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা মোটেও এক নয়। সামষ্টিক অর্থাৎ জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে ষড়যন্ত্র,পেশী প্রদর্শন ও জোর খাটানো অপেক্ষাকৃত কমই হয়ে থাকে। এ কারণেই ইরানীদের মহত্ত্ব,নেতৃত্ব অথবা দুর্বলতা ও অপদস্থ হওয়ার বিষয়টি তাদের কর্তৃত্বশীল একনায়কতন্ত্রের দুর্বলতা অথবা সামর্থ্যরে সাথে পূর্ণরূপে জড়িত। সাসানী সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংক্রান্ত আলোচনা ও অধ্যয়ন এবং তাদের প্রশাসনের ছায়ায় যে সব অস্থিতিশীলতার উদ্ভব হয়েছে সেগুলো আমাদের এ বক্তব্যের জীবন্ত দলিল।

ইসলামের আবির্ভাবকালে ইরানের সার্বিক অবস্থা

ইসলামের আবির্ভাব এবং 611 খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতপ্রাপ্তি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের (590-628 খ্রি.) শাসনামলের সমসাময়িক ঘটনা ছিল। মহানবী (সা.) সম্রাট খসরু পারভেজের রাজত্বকালেই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। (সে দিনটি ছিল শুক্রবার,16 জুলাই,622 খ্রি.)। আর এ তারিখ অর্থাৎ মহানবীর হিজরত দিবস থেকেই মুসলমানদের সন ও তারিখ গণনা শুরু হয়েছিল।

দু টি বৃহৎ পরাশক্তি (প্রাচ্যের রোমান সাম্রাজ্য ও সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য) ঐ সময়ের সভ্য দুনিয়ার বেশিরভাগ অংশ শাসন করত। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে এ দু টি সাম্রাজ্য সমগ্র বিশ্বে শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।

পারস্য সম্রাট আনুশীরওয়ান (নওশেরওয়ান) [531-589 খ্রি.]-এর রাজত্বকাল থেকে রোমানদের সাথে ইরানীদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা খসরু পারভেজের রাজত্বকাল পর্যন্ত দীর্ঘ 24 বছর স্থায়ী হয়েছিল।

পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যদ্বয় এ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যে বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছিল এবং ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সে কারণে উক্ত সাম্রাজ্যদ্বয়ের সরকার ও প্রশাসন কার্যত পঙ্গু ও অচল হয়ে গিয়েছিল;আসলে খোলস ছাড়া এ পরাশক্তিদ্বয়ের আর কিছুই তখন অবশিষ্ট ছিল না।

বিভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট থেকে ইরানের সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতি আলোচনা করতে হলে সম্রাট আনুশীরওয়ানের রাজত্বকালের শেষভাগ থেকে মুসলমানদের আগমন ও পারস্যবিজয় পর্যন্ত সে দেশের সরকার ও প্রশাসনের অবস্থা আমরা আলোচনা করব।

সাসানী শাসনামলে জৌলুস ও বিলাসিতা

সাসানী সম্রাটগণ সাধারণত বিলাসী ও আনুষ্ঠানিকতাপ্রিয় ছিলেন। সাসানী সম্রাটদের জাঁকজমকপূর্ণ শাহী দরবার এবং এর জৌলুস দর্শনার্থীদের চোখ ঝলসে দিত।

সাসানী শাসনামলে দারাফশেশে কভীয়নী’নামে ইরানীদের একটি পতাকা ছিল যা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা সাসানীয়দের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ উৎসবসমূহের সময় রাজকীয় প্রাসাদসমূহে উত্তোলন করা হতো। পতাকাটি মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত দ্বারা সুশোভিত করা হতো। একজন লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী,এ পতাকাটির মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত আসলেই অদ্বিতীয় ছিল যার মূল্য 12,00,000 দিরহাম অর্থাৎ 30,000 পাউন্ড।59

সাসানীদের কল্পকাহিনীর মতো জমকালো প্রাসাদসমূহে বিপুল সংখ্যক মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী,হীরা-জহরত,মণিমুক্তা এবং বিস্ময়কর চিত্রকলা ও ছবির সংগ্রহ ছিল যা দর্শনার্থীদের বিস্ময়াভিভূত করত। আমরা যদি এ সব শাহী প্রাসাদের বিস্ময়কর বিষয়াদি জানতে চাই তাহলে কেবল একটি বৃহদাকার সাদা কার্পেটের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই চলবে যা একটি (সাসানী) রাজপ্রাসাদে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। উক্ত কার্পেটের নাম ছিল বাহারিস্তানে কিসরা’অর্থাৎ সম্রাট কিসরা বা খসরুর বসন্তবাগান। সাসানী শাসকবর্গ এ কার্পেটটি এ কারণে তৈরি করিয়েছিলেন যাতে করে তাঁরা আমোদ-প্রমোদ করার সময় হর্ষোৎফুল্ল থাকতে পারেন এবং সর্বদা বসন্ত ঋতুর সুন্দর ও আনন্দদায়ক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।60

বর্ণনামতে এ কার্পেটের দৈর্ঘ্য ছিল 150 হাত এবং প্রস্থ 70 হাত;আর এর সমস্ত সুতা স্বর্ণ,হীরা-মুক্তা ও জহরত খচিত ছিল।61

সাসানী সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট খসরু পারভেজই অন্য সকল সম্রাটের চেয়ে বেশি জাঁকজমক,বিলাসিতা ও জৌলুসপ্রিয় ছিলেন। তাঁর শাহী হেরেমে নারী,দাসী,গায়িকা ও নর্তকীদের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

হামযাহ্ ইসফাহানী সানা মুলূকিল আরদ’গ্রন্থে সম্রাট খসরু পারভেজের শান-শওকত,জৌলুস ও বিলাসিতা ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছেন :

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের তিন হাজার স্ত্রী,12000 গায়িকা দাসী,6000 দেহরক্ষী পুরুষ সৈনিক,8500টি সওয়ারী ঘোড়া,960টি হাতী,মালপত্র বহন করার জন্য 12000টি গাধা এবং 1000টি উট ছিল।62

এরপর তাবারী আরো বলেছেন,এ সম্রাট অন্য সকলের চেয়ে বেশি মনিমুক্তা,হীরা-জহরত এবং মূল্যবান তৈজসপত্রের প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করতেন।63

ইরানের সামাজিক অবস্থা

সাসানী যুগে ইরানের সামাজিক অবস্থা সে দেশের দরবার ও রাজনৈতিক অবস্থার চেয়ে কোনভাবেই ভালো ছিল না। শ্রেণীশাসন ও শোষণ যা সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই ইরানে বিদ্যমান ছিল তা সাসানীদের যুগে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে।

অভিজাত ও পুরোহিতশ্রেণী অন্যান্য শ্রেণী অপেক্ষা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণী বলে বিবেচিত হতো। সকল ধরনের সামাজিক সংবেদনশীল পদ ও পেশা তাদেরই করায়ত্তে ছিল। পেশাজীবী ও কৃষকগণ সকল প্রকার ন্যায্য অধিকারভিত্তিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। কেবল কর প্রদান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ব্যতীত তাদের অন্য কোন পেশাই ছিল না।

সাসানীদের শ্রেণীবৈষম্যের বিষয়ে নাফীসী লিখেছেন :

“যে বিষয়টি ইরানী জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কপটতার প্রসার ও প্রচলন করেছিল তা ছিল অতি নিষ্ঠুর শ্রেণীবৈষম্য যা সাসানীরা ইরানে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আর শ্রেণীবৈষম্যের মূল পূর্বতন সভ্যতাসমূহের মাঝেই নিহিত ছিল। কিন্তু সাসানীদের যুগে কঠোরতা আরোপের বিষয়টি চরমভাবে বৃদ্ধি পায়।

পারস্য সমাজে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সাত অভিজাত বংশ এবং তাদের পর পাঁচটি শ্রেণী এমন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত যা থেকে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত ছিল। মালিকানা ও স্বত্বাধিকার প্রায় ঐ সাত পরিবার বা বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাসানী ইরানের জনসংখ্যা ছিল 140 মিলিয়ন (14 কোটি)। ঐ সাত বংশের প্রতিটির লোকসংখ্যা যদি এক লক্ষও ধরি তাহলে ঐ সাত বংশের সম্মিলিত লোকসংখ্যা 7,00,000 হবে। আর সৈন্য-সামন্ত এবং জমিদারশ্রেণী যাদেরও কিছুটা মালিকানা স্বীকৃত ছিল তাদের সংখ্যাও যদি আমরা 7,00,000 বলে অনুমান করি তাহলে এ চৌদ্দ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় 15,00,000 ব্যক্তির মালিকানা ছিল এবং বাকী জনগণ স্রষ্টাপ্রদত্ত এই স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।64

পেশাজীবী ও কৃষিজীবিগণ যারা সকল প্রকার অধিকার সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল,কিন্তু অভিজাতশ্রেণীর তাবৎ ব্যয়ভার যাদের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছিল তারা এ অবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের কোন স্বার্থ বা লাভের কথা চিন্তাও করতে পারত না। এ কারণেই অধিকাংশ কৃষিজীবী এবং সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোক নিজেদের পেশা ত্যাগ করে অসহনীয় কর থেকে বাঁচার জন্য মঠ অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের আস্তানায় আশ্রয়গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।65

‘সাসানীদের যুগে ইরান’নামক গ্রন্থের লেখক ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর দুর্ভাগ্য সম্পর্কে লিখেছেন : এমিয়ান মার্সেলিনোস নামক পাশ্চাত্যের এক ঐতিহাসিকের বাণী এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে : ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণী সাসানীদের যুগে চরম দীনতা ও দুর্ভাগ্যের মধ্যে দুর্বিষহ জীবনযাপন করত। তারা যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর পেছনে পায়ে হেঁটে যাত্রা করত। তাদেরকে এমনভাবে মর্যাদাহীন বলে গণ্য করা হতো যেন তাদের ললাটে চিরকালের জন্য দাসত্ব লিখে দেয়া হয়েছে। তারা তাদের শ্রমের বিনিময়ে কোন মজুরি লাভ করত না।”66

সাসানী সাম্রাজ্যের একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণী যারা জনসংখ্যায় শতকরা 1.5 ভাগের কম ছিল তারাই সব কিছুর অধিকারী ছিল। কিন্তু ইরানের জনসংখ্যার শতকরা 98 ভাগের বেশি দাসশ্রেণীর মতো জীবনের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

অভিজাতশ্রেণীই শিক্ষাগ্রহণের অধিকার রাখত

সাসানী যুগে কেবল অভিজাত ও উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন শিশুরাই বিদ্যার্জন করার অধিকার রাখত। সাধারণ জনতা ও সমাজের মধ্যবিত্তশ্রেণী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রাচীন ইরানের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় এ ত্রুটি এতটা প্রকট ছিল যে,এমনকি শাহনামা’ও রাজা-বাদশাদের উপাখ্যান রচয়িতাগণ যাঁদের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে বীরত্বগাথা রচনা করা তাঁরাও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন।

ইরানের বীরত্বগাথা রচয়িতা কবি ফেরদৌসী শাহনামা য় একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন যা এ বিষয়টির সর্বোত্তম সাক্ষ্য-প্রমাণ। কাহিনীটি সম্রাট আনুশীরওয়ানের শাসনামল অর্থাৎ যখন সাসানী সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ তখন সংঘটিত হয়েছিল। এ কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে,তাঁর শাসনামলে প্রায় সকল অধিবাসীরই শিক্ষা ও বিদ্যার্জন করার অধিকার ছিল না,এমনকি জ্ঞানপ্রেমিক সম্রাট আনুশীরওয়ানও অন্যান্য শ্রেণীর জনসাধারণকে জ্ঞানার্জনের অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন না।

ফেরদৌসী লিখেছেন : ইরান ও রোমের যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য একজন জুতা নির্মাতা (মুচি) তার স্বর্ণ ও রূপার ভাণ্ডার দান করতে চেয়েছিল। সে সময় সম্রাট আনুশীরওয়ান আর্থিক সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিলেন। কারণ ইরানের প্রায় তিন লক্ষ সৈন্য তখন তীব্র খাদ্য ও অস্ত্র সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। সম্রাট আনুশীরওয়ান এ অবস্থার কারণে খুবই উদ্বিগ্ন এবং তাঁর নিজ পরিণতি সম্পর্কেও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সম্রাট তাৎক্ষণিকভাবে জ্ঞানী প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করার জন্য ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেন যেন তিনি মাযেনদারান গমন করে যুদ্ধের খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু বুযুর্গমেহের সম্রাটকে বললেন, বিপদ অত্যাসন্ন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে একটি উপায় খুঁজে বের করা আবশ্যক।” তখন বুযুর্গমেহের জাতীয় ঋণ’অর্থাৎ জাতির কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার পরামর্শ দিলেন। সম্রাট আনুশীরওয়ানও তাঁর এ প্রস্তাবটি পছন্দ করলেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশও জারী করলেন। বুযুর্গমেহের নিকটবর্তী শহর,গ্রাম ও জনপদে রাজকীয় কর্মকর্তাদের প্রেরণ করে ঐ সকল স্থানের সচ্ছল ব্যক্তিদের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবগত করলেন।

তখন একজন জুতা নির্মাতা যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সে যা চেয়েছিল তা হলো : এর বিনিময়ে তার একমাত্র পুত্রসন্তান যে লেখাপড়া শিখতে অত্যন্ত আগ্রহী তাকে যেন লেখাপড়া শেখার অনুমতি দেয়া হয়। বুযুর্গমেহের ঐ মুচির আবেদনকে তার দানের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করেন এবং সম্রাটের কাছে ফিরে গিয়ে তার আর্জি সম্পর্কে সম্রাটকে অবহিত করেন। আনুশীরওয়ান এ কথা শুনে খুব রেগে যান এবং প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে তিরস্কার করে বলেন, তুমি এ কেমন আবেদন করছ? এ কাজ কল্যাণকর নয়। কারণ যে শ্রেণীবিন্যাসের আওতায় সে রয়েছে তা থেকে তার বের হয়ে আসার মাধ্যমে দেশের শ্রেণীপ্রথা ধসে পড়বে এবং তখন সে যে স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করছে তার মূল্যমান অপেক্ষা তার এ আর্জি অনেক বেশি ক্ষতি বয়ে আনবে।”

এরপর ফেরদৌসী সম্রাট আনুশীরওয়ানের কণ্ঠে তাঁর (সম্রাটের) মেকিয়াভ্যালি দর্শন’ব্যাখ্যা করেছেন:

বণিকপুত্র যদি হয় সচিব

গুণী,জ্ঞানী ও শিক্ষানবীশ

তাই যখন বসবে মোদের যুবরাজ সিংহাসন পরি

অবশ্যই পাবে সে তখন এক (দক্ষ ও গুণী) ভাগ্যমান সহকারী

আর কভু যদি মোজা বিক্রেতা করে এ গুণ ও জ্ঞান অর্জন

এ জ্ঞান দেবে তারে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন চক্ষু

আর নীচ বংশজাত জ্ঞানীকে দেবে অনুধাবনকারী কর্ণ

ব্যস্,তখন পরিতাপ ও শীতল বায়ু ছাড়া রইবে না আর কিছু।

এভাবেই ন্যায়পরায়ণ (!) বাদশার নির্দেশে জুতা নির্মাতা লোকটির টাকা-পয়সা ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ হতভাগা জুতা নির্মাতা তীব্র মনঃকষ্ট পায় এবং সে রাতের বেলা ন্যায়বিচারক স্রষ্টার দরবারে দু হাত উঠিয়ে এ ধরনের অত্যাচার ও ন্যায্য অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রার্থনা করে-যা হচ্ছে মজলুমদেরই রীতি। আর এভাবে সে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচারের ঘণ্টা ধ্বনিত করে।

প্রেরিত দূত ফিরে আসল এবং ঐ দিরহামগুলো দেখতে পেয়ে

ঐ মুচির অন্তর হলো তীব্র দুঃখভারাক্রান্ত

রাত হলে শাহের কথায় হলো সে দুঃখভারাক্রান্ত

মহান আল্লাহর দরবারে সে চাইল ঐশী আদালতের ঘণ্টাধ্বনি ধ্বনিত হোক। 67

এত কিছু সত্ত্বেও সম্রাট আনুশীরওয়ানের বিশাল প্রচারমাধ্যম ও প্রশাসন তাঁকে ন্যায়পরায়ণ বলে আখ্যায়িত করতে এবং ইরানী সমাজকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু তথাকথিত ন্যায়পরায়ণ এ শাহ তদানীন্তন ইরানী সমাজের মৌলিক সমস্যার জট খুলতে তো সক্ষম হননি;বরং ইরানীদের প্রভূত সামাজিক সমস্যার কারণও হয়েছিলেন। কেবল মাযদাক গোলযোগের ঘটনায় আশি হাজার এবং অপর একটি অভিমত অনুযায়ী এক লক্ষ ইরানীকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ধারণা করেছিলেন যে,উক্ত ফিতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে।68 অথচ এ ফিতনা যে মূলোৎপাটিত হয় নি তা তিনি মোটেও উপলব্ধি করতে পারেন নি। এ ধরনের শাস্তি আসলে ফলাফলের অস্তিত্ব নিশ্চি‎‎ হ্ন করে দেয়,তা কারণের অস্তিত্ব বিলোপ করে না। এ হচ্ছে পাপীদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সংগ্রাম-পাপ ও অপরাধের বিরুদ্ধে নয়। ফিতনার মূল কারণই ছিল সমাজে ভারসাম্যহীনতা,শ্রেণীবৈষম্য,দ্বন্দ্ব,বিশেষ একটি শ্রেণী কর্তৃক সম্পদ ও পদমর্যাদা কুক্ষিগতকরণ,নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা এবং অপরাপর দুর্নীতি ও অপরাধ। আর সম্রাট আনুশীরওয়ান অস্ত্র বল ও চাপ প্রয়োগ করে চাইতেন যে,জনগণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করুক।

এডওয়ার্ড ব্রাউন সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে লিখেছেন : সম্রাট আনুশীরওয়ান নাস্তিকদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি যারথুস্ত্রীয় (যারদোশ্ত) ধর্মযাজকদের প্রশংসা ও সম্মতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর ঐ সব ধর্মযাজকের হাতেই জাতীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে...।”69   এ সব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত ইতিহাসে সম্রাট আনুশিরওয়ানকে ন্যায়পরায়ণতা ও মানবতার পূর্ণ আদর্শ এক সম্রাট হিসাবে পরিচিত করানো হয়েছে। এ ব্যাপারে অনেক কাহিনীও রচনা করা হয়েছে।

খুবই আশ্চর্যজনক! এ দীর্ঘ সময় একমাত্র একটি বৃদ্ধ গাধা ব্যতীত আর কোন মজলুমই ন্যায়বিচারের ঘণ্টা বাজায় নি,অবশ্য এটিও জ্ঞাত বিষয় যে,ঐ গাধাটি তার নিজের সাহসের অপরাধের কথা জানত না;আর যদি সে তা জানত তাহলে সে ঘুণাক্ষরেও ন্যায়পরায়ণতার রজ্জুর নিকটবর্তী হতো না!!

আরো বলা হয় যে,একবার রোমের বাদশাহ্,আজম অর্থাৎ ইরানের বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের কাছে এক দূত প্রেরণ করেছিলেন। যখন ঐ দূত ইরানের বাদশার শানশওকত এবং বিশাল তাক-ই কিসরা প্রত্যক্ষ করলেন তখন তিনি দেখতে পেলেন যে,ইরানের বাদশাহ্ সিংহাসনে উপবিষ্ট;আর রাজারা তাঁর দরবারে উপস্থিত। তিনি এক ঝলক দৃষ্টি শাহী দ্বারমণ্ডপের ওপর নিবদ্ধ করলে উক্ত দ্বারমণ্ডপটি তাঁর দৃষ্টিতে খুবই জমকালো ও জাঁকজমকপূর্ণ বলে মনে হয়। কিন্তু ঐ দ্বারমণ্ডপের চারপাশ যেন একটু বাঁকা। দূত তখন দরবারে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন : দ্বারমণ্ডপে যে সামান্য বক্রতা আপনি দেখতে পাচ্ছেন আসলে এর কারণ হচ্ছে এখানে এক বৃদ্ধার ঘর ছিল যা বাদশাহ্ কিনে নিয়ে দ্বারমণ্ডপের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঐ বৃদ্ধা তার ঘর বিক্রি করতে রাজী না হওয়ায় বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানও তাকে বিক্রি করতে বাধ্য করেন নি। তাই ঐ বৃদ্ধার বাড়িটিই অবশেষে এ দ্বারমণ্ডপটির বক্রতার কারণ হয়েছে। তখন ঐ দূত শপথ করে বললেন যে,দ্বারমণ্ডপের এই বক্রতা আসলে এর সরল ও অবক্র হওয়া অপেক্ষা শ্রেয়।70

এটি আশ্চর্যজনক যে,এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ভবন ও দ্বারমণ্ডপ যে ব্যক্তি নির্মাণ করতে ইচ্ছুক তিনি কি পূর্ব থেকেই এর নকশা সংগ্রহ করবেন না এবং নকশা ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ভূমি ব্যতীতই কেউ কি এ ধরনের ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে! আর এর ফলে শাহী প্রাসাদ বাঁকা হবে। এ কি কখনো বিশ্বাস করা যায়?

আসলে এ ধরনের গালগল্প সম্রাটের দরবারের ব্যক্তিবর্গ ও যারথুস্ত্রীয় ধর্মযাজকগণ,মাযদাকী মতাবলম্বীদের দমন করে সম্রাট তাঁদের স্বার্থে যে মহামূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন সে কারণেই তাঁরা সম্রাটের অনুকূলেই রচনা করে থাকতে পারেন।

‘ইরান ও ইসলাম’গ্রন্থের লেখকের অভিমত অনুসারে এ সব কিছুর চেয়েও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই যে,কেউ কেউ সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতাকে শারয়ী ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণ করার জন্য এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের সূত্র থেকেও হাদীস বর্ণনা করতে বাধ্য হয়েছে। যেমন :ولدت في زمن الملك العادل আমি ন্যায়পরায়ণ বাদশার রাজত্বকালে জন্মগ্রহণ করেছি।”-প্রসিদ্ধ এ হাদীসটি। মহানবী (সা.) যেন এ কথা বলতে গর্ববোধ করতেন যে,তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছেন,অথচ মহানবীর সাথে তাঁর (বাদশার) ন্যায়পরায়ণতার কি কোন সম্পর্ক আছে?

অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : হযরত আলী মাদায়েনে এসে কিসরার প্রাসাদে গমন করলেন। সেখানে তিনি আনুশীরওয়ানকে জীবিত করে তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন হযরত আলীকে বলেছিলেন যে,কুফ্রী করার কারণে তিনি বেহেশত থেকে বঞ্চিত হয়েছেন,তবে ন্যায়পরায়ণ হবার কারণে জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্তও হচ্ছেন না।71 এখন আমরা পর্যালোচনা করব যে,সাসানীরা কি ধরনের অত্যাচার করেছে।

খসরু পারভেজের অপরাধসমূহের পর্দা উন্মোচন

সম্রাট খসরু পারভেজের অত্যাচারমূলক ও পাগলামিপূর্ণ আরেকটি কাজ ছিল প্রসিদ্ধ বুযুর্গমেহেরের সাথে তাঁর আচরণ। এ বুযুর্গমেহের আনুশীরওয়ানের দরবারে 13 বছর কর্মরত ছিলেন এবং তিনি প্রভূত যশ ও খ্যাতির অধিকারী হয়েছিলেন। অবশেষে সম্রাট খসরু পারভেজ তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সম্রাট কারাগারে বন্দী বুযুর্গমেহেরের কাছে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন : তোমার জ্ঞান,বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা অবশেষে তোমারই নিহত হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।” বুযুর্গমেহেরও উত্তরে লিখেছিলেন : যে পর্যন্ত ভাগ্য আমার প্রতি প্রসন্ন ছিল সে পর্যন্ত আমি আমার বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়েছি। এখন যখন ভাগ্য আমার অনুকূলে নেই তখন আমার ধৈর্য ও সহ্যশক্তিকে কাজে লাগাব। আমার হাত দিয়ে যদি অগণিত সৎকর্মসম্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে আমি আমার মন্দ কাজ থেকেও নিরাপদ ও নিশ্চিত হয়েছি। আমার কাছ থেকে মন্ত্রিত্ব পদ কেড়ে নেয়া হলেও আমা থেকে ঐ পদের অসংখ্য অন্যায় ও অত্যাচারের দুঃখ-কষ্টও দূর করা হয়েছে। অতএব,আমার আর ভয় কিসে?

যখন সম্রাট খসরু পারভেজের হাতে বুযুর্গমেহেরের উক্ত চিঠি পৌঁছালো তখন সম্রাট বুযুর্গমেহেরের নাক ও ঠোঁট কেটে ফেলার আদেশ দিলেন। যখন বুযুর্গমেহেরকে সম্রাটের এ আদেশ শুনানো হলো তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন : আমার ঠোঁট এর চেয়ে আরোও বেশি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।” সম্রাট খসরু পারভেজ তখন জিজ্ঞাসা করলেন : কি কারণে? বুযুর্গমেহের তখন বললেন : যেহেতু আপামর জনতার কাছে তোমার এমন সব গুণের প্রশংসা করেছি যা তোমার ছিল না এবং অসন্তুষ্ট অন্তঃকরণসমূহকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম। আমি তোমার এমন সব ভালো কাজ ও পুণ্যের কথা জনগণের মধ্যে প্রচার করেছি যার উপযুক্ত তুমি ছিলে না। হে নিকৃষ্ট অসৎকর্মশীল সম্রাট! যদিও আমার সততার ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত এতদ্সত্ত্বেও আমাকে কুধারণার বশবর্তী হয়ে হত্যা করছ? অতএব,তোমার কাছে সুবিচার আশা করা এবং তোমার কথায় ভরসা করা যায় কি?

সম্রাট খসরু পারভেজ বুযুর্গমেহেরের কথায় খুবই উত্তেজিত হয়ে তাঁর শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলেন।72

‘ইরানের সামাজিক ইতিহাস’গ্রন্থের রচয়িতা-যিনি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা সাসানী যুগের অরাজকতা,অধঃপতিত অবস্থা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল দেশের অভিজাতশ্রেণীর জন্য শিক্ষাগ্রহণের অধিকার ও সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়টি এভাবে চিত্রিত করেছেন :

“এ যুগে তখনকার প্রচলিত সকল জ্ঞান ও শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং শিক্ষা কেবল পুরোহিত,যাজক ও অভিজাতশ্রেণীর সন্তানগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল;আর ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।”73

হ্যাঁ,এ জাহেলী প্রথা সাসানী সম্রাটদের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। আর তাঁরা কোনভাবেই এ বিষয়টি পরিহার করতে চাইতেন না ।

এ কারণেই সৌভাগ্য ও সুখের ক্রোড়ে প্রতিপালিত এ সংখ্যালঘু শ্রেণীটির অপরিপক্ব ও অসংযত প্রবৃত্তি ও রিপুর কামনা-বাসনা ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে জ্ঞানার্জনের অধিকারসহ সকল বৈধ সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল।


12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35