জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা8%

জীবন জিজ্ঞাসা লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

জীবন জিজ্ঞাসা
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 58 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42094 / ডাউনলোড: 4626
সাইজ সাইজ সাইজ
জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

নবীর পাপমুক্ততা

কোনো ব্যক্তিকে নবী হিসেবে চিনতে পারার জন্য তাঁর মধ্যে অপর যে বৈশিষ্ট্যটি পাওয়া অপরিহার্য তা হচ্ছে , তাঁর গোটা জীবনই পাপমুক্ত হতে হবে।

নবুওয়াত দাবী করার পূর্বেই হোক বা পরেই হোক , যে ব্যক্তি সর্বজনীনভাবে বিচারবুদ্ধি কর্তৃক পাপ বা অপরাধ বা অন্যায় হিসেবে পরিগণিত কোনো কাজে কখনো লিপ্ত ছিলো , সুস্থ বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী সে ব্যক্তি নবী হতে পারে না। কারণ , এরূপ ক্ষেত্রে তার পাপ , অপরাধ বা অন্যায় কাজ সম্পর্কে অবগত ব্যক্তির পক্ষে তাকে নবী হিসেবে মনে করা সম্ভব হবে না। ফলে সে নবুওয়াতের দাবীদার ব্যক্তিকে ও তার দাবীকে প্রত্যাখ্যান করলে সৃষ্টিকর্তা ঐ ব্যক্তিকে নবীকে প্রত্যাখ্যান করা র অপরাধে অপরাধী বলে গণ্য করবেন না - এটা বিচারবুদ্ধির এক অকাট্য রায়। আর লোকেরা যদি নবীকে নবী হিসেবে চিনতেই না পারে , বরং তাঁর নবুওয়াত-দাবীর ব্যাপারে যুক্তিসঙ্গত কারণে সন্দেহ-সংশয়ে নিপতিত হয় তাহলে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে নবী প্রেরণের লক্ষ্যই অনর্জিত থেকে যাবে।

এ কারণে বিচারবুদ্ধির রায় হচ্ছে , সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার জন্য এটা অপরিহার্য যে , তিনি কোনো পাপমুক্ত ব্যক্তিকে নবী হিসেবে মনোনীত করবেন অথবা যাকে নবী হিসেবে মনোনীত করবেন তাঁকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পাপ থেকে রক্ষা করবেন। মানুষকে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য এটা অপরিহার্য।

বলা বাহুল্য যে , এখানে পাপ বলতে আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের দৃষ্টিতে যা অন্যায় বা অপরাধ তা-ই বিবেচ্য ; যে কাজের অন্যায় বা অপরাধ হওয়া বা না-হওয়া সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিতর্ক আছে তা এখানে বিবেচ্য নয়। তাই মিথ্যাচার , হত্যা , ধর্ষণ , ব্যভিচার , চুরি-ডাকাতি , ধোঁকা-প্রতারণা , বিশ্বাসঘাতকতা , অন্যের সম্পদ জবর দখল ও আত্মসাত , আমানতের খেয়ানত , যুলুম-অত্যাচার , নির্যাতন ইত্যাদি অন্যায় কাজ কখনোই একজন নবীকে স্পর্শ করতে পারে না। তেমনি তাঁর জীবনকে - নবুওয়াত-দাবীর পূর্বেও - দ্বিত্ববাদী , ত্রিত্ববাদী বা বহুত্ববাদী ধারণা ও কার্যকলাপ স্পর্শ করতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে , বিচারবুদ্ধি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও একত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হবার পর তাঁর নিকট জবাবদিহিতার অনুভূতি ও তাঁর পক্ষ থেকে পথনির্দেশের প্রয়োজনীয়তাবোধের কারণেই নবীর সন্ধান করে থাকে। এ পথের শুরুর দিকেই , একত্ববাদে উপনীত হতে গিয়েই সে দ্বিত্ববাদ , ত্রিত্ববাদ , বহুত্ববাদ ও অবতারবাদ ইত্যাদিকে প্রত্যাখ্যান করে। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের বিচারবুদ্ধির ওপরে বিভিন্ন ধরনের ভ্রমাত্মক যুক্তি , চিন্তা ও অন্ধ বিশ্বাসের আবরণ পড়তে পারে এবং এর ফলে তার অন্তরে বিচারবুদ্ধির রায় হাল্কা ও অগভীর হয়ে পড়তে পারে বা সে গতানুগতিকতার বিরোধী বিচারবুদ্ধির রায়কে স্বীয় মস্তিষ্কে পোষণ করতে ও লোকদের সামনে প্রকাশ করতে ভয় পেতে পারে ও সে কারণে তা জোর করে চাপা দিতে পারে ; অতঃপর নবী বা নবীর পক্ষ থেকে কেউ এসে তাকে সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার বিচারবুদ্ধির রায়কেই সুতীক্ষ্ণ করার চেষ্টা করতে পারেন।

অন্য কথায় , নবীর মূল কাজই হচ্ছে জীবন ও জগতের মহাসত্য সম্বন্ধে এবং নিজের , অন্যদের ও স্রষ্টার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য তথা ঔচিত্য-অনৌচিত্য সম্বন্ধে মানুষের বিচারবুদ্ধির রায়কে শানিত করা ; বিতর্কিত বিষয়াদিতে সঠিক ফয়সালা এ দায়িত্বেরই সম্প্রসারণ মাত্র। এমতাবস্থায় চিন্তা বা কর্মের দিক থেকে বা উভয় দিক থেকেই কখনো না কখনো দ্বিত্ববাদ , ত্রিত্ববাদ , বহুত্ববাদ বা অবতারবাদে বিশ্বাসী ছিলো , অথবা সর্বজনস্বীকৃত কোনো অন্যায় বা পাপ কাজে কখনো না কখনো নিশ্চিতভাবেই লিপ্ত ছিলো - এমন ব্যক্তিকে বিচারবুদ্ধির পক্ষে স্রষ্টার পক্ষ থেকে মনোনীত নবী হিসেবে মেনে নেয়া সম্ভব হতে পারে না।

দ্বিতীয়তঃ এরূপ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে , স্রষ্টার পক্ষে কি নবীর দায়িত্ব দেয়ার জন্য কোনো তাওহীদবাদী পাপমুক্ত মানুষ গড়ে তোলা অসম্ভব যে , কখনো না কখনো অংশীবাদে বা সর্বজনস্বীকৃত অন্যায় বা পাপে লিপ্ত ছিলো এমন একজন লোককে নবুওয়াতের দায়িত্ব দেবেন ?

তৃতীয়তঃ এরূপ পরিস্থিতি ভণ্ড নবীর আবির্ভাবের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরী করে দেয়। কারণ , নবুওয়াতের মর্যাদার পার্থিব সম্মান লাভ অথবা মানুষকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে যে কোনো পাপাচারী লোকের পক্ষে নবী সেজে বসা সম্ভব। এ অবস্থায় এরূপ ব্যক্তি দাবী করতে পারে যে , সে আগে অংশীবাদী বা পাপকর্মে লিপ্ত হয়ে থাকলেও সৃষ্টিকর্তা অনুগ্রহ করে তাকে নবী পদে অভিষিক্ত করেছেন এবং এ দায়িত্বে অভিষিক্ত হবার পর থেকে আর সে অংশীবাদ বা পাপ কর্মে লিপ্ত হয় নি।

চতুর্থতঃ এরূপ অবস্থায় যে কারো বিচারবুদ্ধি একজন প্রকৃত নবীকে ভণ্ড নবী মনে করে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে এ প্রত্যাখ্যানের জন্য তাকে অপরাধী গণ্য করা যাবে না। কারণ , এমনকি একজন অংশীবাদী বা পাপকর্মে লিপ্ত ব্যক্তি কর্তৃকও কাউকে নবী হিসেবে গ্রহণ করতে হলে তা বিচারবুদ্ধির রায়ের ভিত্তিতেই করতে হবে ; এর কোনো বিকল্প নেই। এমতাবস্থায় বিচারবুদ্ধিই যদি কাউকে ভণ্ড নবী বলে রায় দেয় তখন তাকে নবী হিসেবে গ্রহণ করা কারো জন্যই অপরিহার্য হতে পারে না।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে , অংশীবাদী বা কখনো না কখনো সর্বজনস্বীকৃত অন্যায় বা পাপ কর্ম সম্পাদনকারী ব্যক্তিকে নবুওয়াত প্রদান করা হলে নবী প্রেরণের মূল উদ্দেশ্যই ভণ্ডুল হয়ে যায়। অতএব , এ ব্যাপারে বিতর্কের অবকাশ নেই যে , একজন নবীকে তাঁর জীবনের নবুওয়াত দাবী করার পূর্ববর্তী অধ্যায়েও তাওহীদবাদী (একত্ববাদী) ও পাপমুক্ত হতে হবে।

এছাড়া যিনি নবী হবেন তাঁর জন্য তাঁর জীবনের নবুওয়াত দাবী করার পূর্ববর্তী অধ্যায়েও মনবতাবোধ , দয়ার্দ্রতা , সদাচরণ , পরোপকার , সাহসিকতা , নিঃস্বার্থপরতা , লোভহীনতা ইত্যাদি সদগুণের অধিকারী হওয়াও অপরিহার্য যাতে তাঁর নবী হওয়ার ব্যাপারে মানুষের মনে সহজেই আস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

তবে মনে রাখা দরকার যে , নবীর পাপমুক্ততার বিষয়টি এমন নয় যে , নবীর মধ্যে পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতাই থাকবে না। বরং মানুষ হিসেবে প্রাপ্ত স্বাধীনতার বিচারে নবী ও অন্য মানুষের মধ্যে পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতার ব্যাপারে কোনোই পার্থক্য থাকা সম্ভব নয়। কারণ , কোনো মানুষের পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতা কেড়ে নিলে সে আর মানুষ থাকবে না ; ফেরেশতার সমপর্যায়ভুক্ত হবে। আর বলা বাহুল্য যে , এরূপ ব্যক্তি মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হতে পারে না। কারণ , সে ক্ষেত্রে মানুষের জন্য এ যুক্তি তৈরী হয়ে যায় যে , নবীর মধ্যে তো পাপের ক্ষমতাই নেই , তাই সে পাপ করে না ; আমাদের মধ্যে পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতা রয়েছে , তাই আমাদের পক্ষে পাপে লিপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

বরং নবীর পাপমুক্ততার বিষয়টি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে স্বাভাবিক মানবিক কার্যকারণের মধ্য দিয়ে নিশ্চিতকরণই স্বাভাবিক ও সর্বজনীন বিচারবুদ্ধির নিকট গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ জন্মগতভাবে রক্তধারার পবিত্রতা ও সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নবীরূপে মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে এ মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তা , কথা ও কাজ পরিহারের স্বাভাবিক প্রবণতার কারণে নবীর মধ্যে শুরু থেকেই এমন একটি রুচিবোধ ও চরিত্র গড়ে ওঠে যার ফলে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পাপ কর্মের প্রতি তাঁর মধ্যে কোনোরূপ আগ্রহ সৃষ্টি হয় না , বরং ঘৃণা সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ , মানুষ পায়খানা-পেশাব ভক্ষণ ও পান করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কারো মধ্যে এর আগ্রহ সৃষ্টি হয় না (ব্যতিক্রম হিসেবে কদাচিৎ বহু কোটি মানুষের মধ্যে দু একটি চরম বিকৃতরুচি ব্যক্তিকে এ কাজ করতে দেখা গেলেও) , বরং সকল মানুষই এর প্রতি ঘৃণা বোধ করে থাকে। নবীর মধ্যে এই রূচিবোধই সর্বোচ্চ পর্যায়ের হয়ে থাকে যার ফলে সকল পাপ ও নোংরা কাজের প্রতি তাঁর মধ্যে ঘৃণা জন্ম নিয়ে থাকে।

এ প্রসঙ্গে আরো দু একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিস্কার হতে পারে। যেমন: একটি অবুঝ শিশু একটি ফণা-তোলা সাপের বা একটি প্রদীপের শিখার সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে তা ধরার জন্য আগ্রহী হতে পারে , কিন্তু কোনো বুদ্ধিমান মানুষ এ কাজে অগ্রসর হবে না বা আগ্রহ অনুভব করবে না। কারণ , শিশু সাপের সৌন্দর্য দেখলেও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এ সৌন্দর্যের আড়ালে সাক্ষাৎ মৃত্যু বা চরম যন্ত্রণা দেখে শিউরে ওঠে। তেমনি সংশ্লিষ্ট বস্তুর প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে অজ্ঞ একজন লোক বিদ্যুতবাহী তার স্পর্শ করতে বা পানি মনে করে এসিড পান করতে দ্বিধা করবে না এবং পিপাসার্ত অবস্থায় জানা না থাকার কারণে বিষমিশ্রিত শরবত পান করতে আগ্রহ অনুভব করবে। কিন্তু যার সংশ্লিষ্ট বস্তুর প্রকৃত অবস্থা জানা আছে সে সযত্নে এ সব থেকে দূরে থাকবে ; পিপাসায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও জানা অবস্থায় কিছুতেই সে এসিড বা বিষমিশ্রিত শরবত পান করবে না। ঠিক এভাবেই নবীর দৃষ্টিতে যে কোনো পাপকাজের ভয়াবহ পরিণাম সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে বিধায় তিনি এ থেকে দূরে থাকবেন এবং এর প্রতি কখনোই আগ্রহ অনুভব করবেন না - এটাই বিচারবুদ্ধির দাবী।

অনেক সময় কোনো কোনো নবী সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে বা এমনকি ধর্মগ্রন্থে এমন সব বর্ণনা পাওয়া যায় যা থেকে মনে হয় যে , তাঁরা কখনো কখনো পাপকার্যে লিপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু বিচারবুদ্ধি নবীর পাপে লিপ্ত হবার বিষয়টি গ্রহণ করে না , সেহেতু এ ক্ষেত্রে তিনটি অবস্থা হতে পারে। তা হচ্ছে , হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আদৌ নবী ছিলেন না , অথবা সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটি মিথ্যা বা বিকৃত , নয়তো বর্ণনাটির সঠিক তাৎপর্য গ্রহণ করা হয় নি।

নবী হচ্ছেন মানুষের কাছে স্রষ্টার পথনির্দেশ পৌঁছাবার প্রত্যক্ষ মাধ্যম এবং পূর্ণ শর্তাবলী বিশিষ্ট প্রতিনিধি , আর মানুষের জন্য স্রষ্টার মনোনীত নেতা ও শাসক। এ পদ মানুষের মধ্যকার সর্বোত্তম মর্যাদাপূর্ণ পদ। তাই যুগে যুগে সত্য নবী ছাড়াও বহু মিথ্যা নবীরও আবির্ভাব ঘটেছে । এরূপ ভণ্ড-প্রতারক ব্যক্তিরা স্বীয় প্রতারণার চক্রের সদস্যদের দ্বারা পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মু জিযাহও প্রচার করে থাকে। তাই নবুওয়াতের দাবীদার কোনো ব্যক্তির জীবন সম্বন্ধে ব্যাপক ও গভীরভাবে অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন। অনুসন্ধানে তার জীবনে কখনো কোনো পাপকর্ম অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলে সে ব্যক্তি যে নবী নয় , বরং নবী হওয়ার মিথ্যা দাবীদার , অথবা সে নিজে দাবী না করলেও স্বার্থান্বেষীরা তাকে তথাকথিত নবী বানিয়েছে - তাতে সন্দেহ নেই।

অন্যদিকে বিচারবুদ্ধি বলে , ভণ্ড-প্রতারক পাপাচারীরা কোনো কোনো নবীর বা অনেক নবীর বা নবীদের (আঃ) নামে পাপকর্মের মিথ্যা কাহিনী তৈরী করে থাকতে পারে। দু ধরনের লোকেরা এ কাজ করে থাকতে পারে। প্রথমতঃ কোনো নবীর বা নবীদের (আঃ) বিরোধীরা - যাদের উদ্দেশ্য ছিলো সংশ্লিষ্ট নবী বা নবীদের (আঃ) সম্বন্ধে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং তাঁর বা তাঁদের ওপর অনাস্থা সৃষ্টি করা । দ্বিতীয়তঃ কোনো নবীর বা নবীদের (আঃ) অনুসারী হবার দাবীদার পাপাচারী লোকেরা যারা নিজেদের পাপকর্মের সপক্ষে সাফাই ও অজুহাত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নবীর বা নবীদের (আঃ) নামে মিথ্যা রচনা করেছে।

কোনো বা কোনো কোনো ধর্মের মূল ধর্মীয় সূত্র থেকে কোনো বা কোনো কোনো নবীর দ্বারা পাপকর্ম সম্পাদিত হয়েছিলো বলে ধারণা পাওয়া গেলে সে ব্যাপারে বিচারবুদ্ধি তিনটি কারণ খুঁজে পায়। প্রথমতঃ সূত্রটি অকাট্যভাবে গ্রহণযোগ্য না হতে পারে। অর্থাৎ সূত্রটিকে যে বা যার সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে দাবী করা হয় তা তাঁর বা তাঁদের সাথে সম্পর্কিত না-ও হতে পারে এবং তাঁর বা তাঁদের নামে অন্য কারো রচিত হতে পারে। বিশেষ করে তাঁর বা তাঁদের থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরের বর্ণনাকারীদের ঐতিহাসিকতা ও ন্যায়নিষ্ঠতার অকাট্যতা এবং প্রতি স্তরে তাঁদের সংখ্যা বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে মিথ্যা রচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যানের জন্য যথেষ্ট বলে পরিগণিত না-ও হতে পারে। ফলে এরূপ সূত্রে কোনো নবী বা নবীদের (আঃ) দ্বারা পাপকার্য সম্পাদনের বর্ণনা বিচারবুদ্ধির নিকট মোটেই গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না।

দ্বিতীয়তঃ ধর্মীয় সূত্রটি উপরোক্ত মানদণ্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ থেকে উৎসারিত বলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলে এবং সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের গ্রহণযোগ্যতাও বিচারবুদ্ধির আদালতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সূত্রে কোনো বা কোনো কোনো নবীর (আঃ) পাপকর্মে লিপ্ত থাকার কথা উল্লিখিত পাওয়া গেলে তার দু টি অবস্থা হতে পারে। প্রথমতঃ পাঠকের নিকট পাপকর্মের যে সংজ্ঞা বা সীমারেখা রয়েছে তা বিচারবুদ্ধির নিকট সর্বজনীন ও অকাট্যভাবে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। অর্থাৎ নবীর বা নবীদের যে কাজের উল্লেখ দেখে পাঠক তাকে পাপকর্ম বলে মনে করতে পারেন , তা হয়তো আদৌ পাপকর্ম নয়। অর্থাৎ যে কাজের পাপ হওয়ার বিষয়টি বিতর্কিত পাঠক তাকেই অকাট্যভাবে পাপ বলে মনে করে নিয়েছেন। দ্বিতীয়তঃ পাঠক সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সূত্রের অর্থ গ্রহণে ভুল করে থাকতে পারেন। এ প্রসঙ্গে দু একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিস্কার হবে।

গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সূত্র তাওরাত ও কোরআন মজীদে প্রথম মানুষের নাম আদম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য যে , প্রথম মানুষ হিসেবে তিনি নবীও ছিলেন বটে। তাওরাত ও কোরআনে বলা হয়েছে যে , সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ ভুলে গিয়ে তিনি ও তাঁর স্ত্রী নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেন। অনেকেই এটিকে মানুষের প্রথম পাপ বলে মনে করে। (শুধু তা-ই নয় , অনেকেই মনে করে যে , এ পাপের কারণেই তাঁকে সস্ত্রীক বেহেশত থেকে বের করে দেয়া হয় ; নইলে মানব প্রজাতি আজো বেহেশতেই থাকতো , যদিও কোরআনে বলা হয়েছে যে , পৃথিবীর বুকে সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের জন্যই তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো।) কিন্তু ঐ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ সর্বজনীনভাবে বিচারবুদ্ধির নিকট অন্যায় বা পাপ বলে পরিগণিত কাজসমূহের (যার অনেকগুলোর কথাই আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি) অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। দ্বিতীয়তঃ উক্ত উভয় সূত্র থেকেই সুস্পষ্ট যে , তখন পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে হযরত আদম (আঃ)-কে কোনোরূপ ধর্মীয় বিধিবিধান প্রদান করা হয় নি। ফলে বিচারবুদ্ধি কেবল এটাই বলে না যে , ঐ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করার ফলে সর্বজনীনভাবে পাপ বা অন্যায় বলে পরিগণিত কোনো কাজ সম্পাদিত হয় নি , বরং এ-ও বলে যে , এর দ্বারা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত কোনো বিশেষ বিধান ও লঙ্ঘিত হয় নি। বরং এ ছিলো মানুষকে প্রদত্ত স্বাধীনতা মানুষ কীভাবে প্রয়োগ করতে পারে তার একটি পরীক্ষা মাত্র। পূর্ব-অভিজ্ঞতাবিহীন হযরত আদম ও হযরত হাওয়া (আঃ) কৌতুহলবশে ও শয়তানের দ্বারা প্রতারিত হয়ে ভুলবশতঃ উক্ত বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেন , যদিও এ ভুল কাজ করার কারণে তাঁরা কিছু না কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাছাড়া এ-ও হতে পারে যে , তখনো তাঁরা শর ঈ দায়িত্ব-কর্তব্য প্রযোজ্য হবার বয়সে উপনীত হন নি। অতএব , এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় না যে , নবী পাপকার্যে জড়িত হতে পারেন।

এবার ধর্মীয় সূত্র থেকে ভুল অর্থ গ্রহণের একটি দৃষ্টান্ত। কোরআন মজীদের বর্ণনা থেকে এরূপ তাৎপর্য গ্রহণ করা হয়েছে যে , হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রথমে নক্ষত্র , চন্দ্র ও সূর্যকে রব (প্রভু/ সৃষ্টিকর্তা) মনে করেছিলেন অর্থাৎ তিনি ঐ সময় সাময়িকভাবে হলেও অংশীবাদী ধারণা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু এ ঘটনার বর্ণনাকে তার পূর্ববর্তী আয়াত সমূহের সাথে মিলিয়ে পড়লে দেখা যায় যে , ঘটনাটি তাঁর নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য অভিষিক্ত হওয়ার পরবর্তী কালের। অতএব , সংশ্লিষ্ট অংশীবাদী কথাগুলো তাঁর নয় , বরং অন্য কারো। অর্থাৎ একজন অংশীবাদী ও হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মধ্যকার কথোপকথনকে এক ব্যক্তির অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর একার উক্তি বলে গণ্য করায় এরূপ ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে।

নবীগণের (আঃ) পাপমুক্ততা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনার দাবীদার। এখানে বিচারবুদ্ধির আলোকে মূল বিষয়টি প্রতিপাদনের লক্ষ্যে এতোটুকু আলোচনাই যথেষ্ট বলে মনে করি।

মহাসত্যের প্রশ্নে নবীর আপোসহীনতা

নবীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জীবন ও জগতের অস্তিত্বের পিছনে নিহিত মহাসত্য প্রশ্নে আপোসহীনতা। বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে কোনো রকম প্রলোভন , ভয়-ভীতি , এমনকি জীবনাশঙ্কার মুখেও নবী তাঁর নবুওয়াতের দাবী এবং জীবন ও জগতের অস্তিত্বের পিছনে নিহিত মহাসত্য প্রকাশ হতে বিরত থাকতে পারেন না। কারণ , তাঁকে নবী হিসেবে মনোনীত করার উদ্দেশ্যই এটা। আর মূল উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করলে নবী আর নবী থাকেন না বা বলা যেতে পারে যে , নবী ও অ-নবীর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাই নবী সর্বাবস্থায়ই মহাসত্য প্রকাশ ও প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখবেন।

অবশ্য নবীর আপোসহীনতার মানে এ নয় যে , তিনি জোর করে মানুষের ওপর মহাসত্যকে চাপিয়ে দেবেন বা সদাই সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকবেন। কারণ , সত্য চাপিয়ে দেয়ার বা জোর করে গ্রহণ করানোর বিষয় নয়। নবীর কাজ হচ্ছে মানুষের বিচারবুদ্ধিকে জাগ্রত করানো এবং তার সামনে মহাসত্যকে পেশ করা। বরং সষ্টার প্রতিনিধি স্বাধীনতার অধিকারী সৃষ্টি মানুষের ওপর কোনো চিন্তা ও কাজ জোর করে চাপিয়ে দেয়া মস্ত বড় অন্যায় , আর নবীর আবির্ভাবের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এ অন্যায় চর্চার অবসান ঘটানো। অতএব , অন্যদের ওপর স্বীয় বক্তব্য চাপিয়ে দিয়ে তিনি নিজেই এ উদ্দেশ্যের বিপরীত আচরণ করতে পারেন না। এমনকি কোনো জনগোষ্ঠী তাঁকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করলে এবং সেখানে তাঁর দাওয়াত আরো বিস্তারের কোনো সম্ভাবনা না থাকলে তিনি সংঘাত এড়াতে বা স্বীয় অনুসারীদের জীবন রক্ষার্থে এবং সত্য প্রকাশ ও প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে দেশ ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যেতে পারেন। অন্যদিকে বিচারবুদ্ধি এ-ও বলে যে , উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তিনি স্বীয় অনুসারীদের ওপর স্বীয় শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন এবং এটা তাঁর স্বাভাবিক অধিকার। আর এ কাজে কেউ বাধা দিলে ও সে ক্ষেত্রে সঙ্গতি থাকলে অথবা পরিস্থিতি বাধ্য করলে তিনি স্বীয় অনুসারীদেরকে সাথে নিয়ে সত্যকে রক্ষার জন্য যুদ্ধও করবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তিনি পার্থিব স্বার্থে সত্য প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে কমবেশী করবেন না। এ পথে তাঁকে জীবন দিতে হলেও এ ব্যাপারে তিনি আপোস করবেন না।

কেবল প্রয়োজনেই নবী প্রেরণ

নবুওয়াত সম্বন্ধে সবশেষে যে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলা অপরিহার্য তা হচ্ছে , মহান প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা কোনো বাহুল্য কাজ করতে পারেন না। অতএব , বিচারবুদ্ধির রায় হচ্ছে এই যে , অপরিহার্য প্রয়োজনীয় না হলে তিনি অযথাই কোনো নবী প্রেরণ করেন না। এখানে প্রয়োজন মানে মানুষের প্রয়োজন। অর্থাৎ মানব জাতির নিকট তাঁর প্রেরিত পথনির্দেশ পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ রূপে এবং অবিকৃতভাবে বিদ্যমান থাকলে তিনি এরপরও নতুন করে নবী ও পথনির্দেশ পাঠাবেন - এটা বিচারবুদ্ধির নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এরূপ পরিস্থিতিতে কেউ নবুওয়াত লাভের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দাবী করলে তার সে দাবী বিবেচনাযোগ্য নয়।

ইরান : তদানীন্তন সভ্যতার লালনভূমি

যে কারণে আমরা রোমান সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা অধ্যয়ন করেছি সে একই কারণে আমরা সে সময়ের ইরানের সার্বিক পরিস্থিতি সম্মানিত পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরব। তবে এ বিষয়টির দিকেও দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক যে,আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের দুর্বল দিকগুলো বর্ণনা করে থাকি,তাহলে কেবল সত্য বিশ্লেষণ এবং ইসলাম ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা ব্যতীত আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। জাতীয় গর্ব ও স্বদেশপ্রেম যেন অবশ্যই আমাদের বাস্তববাদী হওয়া থেকে বিরত রাখতে না পারে। আমরা দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি পবিত্র ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ইরানে রাজত্ব করত তা বর্ণনা করতে,বাস্তবকে মেনে নিতে এবং (তদানীন্তন ইরানী সমাজে প্রচলিত) কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে কোন কিছু পরোয়া করি না। অ্যারিস্টটল তাঁর শিক্ষক প্লেটোর সাথে তাঁর মতবিরোধ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা-ই পুনরাবৃত্তি করছি। তিনি তাঁর এ মতপার্থক্যের ব্যাপারে এভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন: আমি প্লেটোকে ভালোবাসি। তবে সত্যকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি।”

সে যুগের ইরানী সরকার ও প্রশাসনের প্রধান দুর্বল দিকটি ছিল স্বৈরাচারী একনায়ক সরকার। নিঃসন্দেহে ব্যক্তিবিশেষের বিবেক-বুদ্ধি ও তাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা এবং একটি সংঘ বা দলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা মোটেও এক নয়। সামষ্টিক অর্থাৎ জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে ষড়যন্ত্র,পেশী প্রদর্শন ও জোর খাটানো অপেক্ষাকৃত কমই হয়ে থাকে। এ কারণেই ইরানীদের মহত্ত্ব,নেতৃত্ব অথবা দুর্বলতা ও অপদস্থ হওয়ার বিষয়টি তাদের কর্তৃত্বশীল একনায়কতন্ত্রের দুর্বলতা অথবা সামর্থ্যরে সাথে পূর্ণরূপে জড়িত। সাসানী সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংক্রান্ত আলোচনা ও অধ্যয়ন এবং তাদের প্রশাসনের ছায়ায় যে সব অস্থিতিশীলতার উদ্ভব হয়েছে সেগুলো আমাদের এ বক্তব্যের জীবন্ত দলিল।

ইসলামের আবির্ভাবকালে ইরানের সার্বিক অবস্থা

ইসলামের আবির্ভাব এবং 611 খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতপ্রাপ্তি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের (590-628 খ্রি.) শাসনামলের সমসাময়িক ঘটনা ছিল। মহানবী (সা.) সম্রাট খসরু পারভেজের রাজত্বকালেই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। (সে দিনটি ছিল শুক্রবার,16 জুলাই,622 খ্রি.)। আর এ তারিখ অর্থাৎ মহানবীর হিজরত দিবস থেকেই মুসলমানদের সন ও তারিখ গণনা শুরু হয়েছিল।

দু টি বৃহৎ পরাশক্তি (প্রাচ্যের রোমান সাম্রাজ্য ও সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য) ঐ সময়ের সভ্য দুনিয়ার বেশিরভাগ অংশ শাসন করত। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে এ দু টি সাম্রাজ্য সমগ্র বিশ্বে শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।

পারস্য সম্রাট আনুশীরওয়ান (নওশেরওয়ান) [531-589 খ্রি.]-এর রাজত্বকাল থেকে রোমানদের সাথে ইরানীদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা খসরু পারভেজের রাজত্বকাল পর্যন্ত দীর্ঘ 24 বছর স্থায়ী হয়েছিল।

পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যদ্বয় এ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যে বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছিল এবং ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সে কারণে উক্ত সাম্রাজ্যদ্বয়ের সরকার ও প্রশাসন কার্যত পঙ্গু ও অচল হয়ে গিয়েছিল;আসলে খোলস ছাড়া এ পরাশক্তিদ্বয়ের আর কিছুই তখন অবশিষ্ট ছিল না।

বিভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট থেকে ইরানের সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতি আলোচনা করতে হলে সম্রাট আনুশীরওয়ানের রাজত্বকালের শেষভাগ থেকে মুসলমানদের আগমন ও পারস্যবিজয় পর্যন্ত সে দেশের সরকার ও প্রশাসনের অবস্থা আমরা আলোচনা করব।

সাসানী শাসনামলে জৌলুস ও বিলাসিতা

সাসানী সম্রাটগণ সাধারণত বিলাসী ও আনুষ্ঠানিকতাপ্রিয় ছিলেন। সাসানী সম্রাটদের জাঁকজমকপূর্ণ শাহী দরবার এবং এর জৌলুস দর্শনার্থীদের চোখ ঝলসে দিত।

সাসানী শাসনামলে দারাফশেশে কভীয়নী’নামে ইরানীদের একটি পতাকা ছিল যা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা সাসানীয়দের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ উৎসবসমূহের সময় রাজকীয় প্রাসাদসমূহে উত্তোলন করা হতো। পতাকাটি মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত দ্বারা সুশোভিত করা হতো। একজন লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী,এ পতাকাটির মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত আসলেই অদ্বিতীয় ছিল যার মূল্য 12,00,000 দিরহাম অর্থাৎ 30,000 পাউন্ড।59

সাসানীদের কল্পকাহিনীর মতো জমকালো প্রাসাদসমূহে বিপুল সংখ্যক মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী,হীরা-জহরত,মণিমুক্তা এবং বিস্ময়কর চিত্রকলা ও ছবির সংগ্রহ ছিল যা দর্শনার্থীদের বিস্ময়াভিভূত করত। আমরা যদি এ সব শাহী প্রাসাদের বিস্ময়কর বিষয়াদি জানতে চাই তাহলে কেবল একটি বৃহদাকার সাদা কার্পেটের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই চলবে যা একটি (সাসানী) রাজপ্রাসাদে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। উক্ত কার্পেটের নাম ছিল বাহারিস্তানে কিসরা’অর্থাৎ সম্রাট কিসরা বা খসরুর বসন্তবাগান। সাসানী শাসকবর্গ এ কার্পেটটি এ কারণে তৈরি করিয়েছিলেন যাতে করে তাঁরা আমোদ-প্রমোদ করার সময় হর্ষোৎফুল্ল থাকতে পারেন এবং সর্বদা বসন্ত ঋতুর সুন্দর ও আনন্দদায়ক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।60

বর্ণনামতে এ কার্পেটের দৈর্ঘ্য ছিল 150 হাত এবং প্রস্থ 70 হাত;আর এর সমস্ত সুতা স্বর্ণ,হীরা-মুক্তা ও জহরত খচিত ছিল।61

সাসানী সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট খসরু পারভেজই অন্য সকল সম্রাটের চেয়ে বেশি জাঁকজমক,বিলাসিতা ও জৌলুসপ্রিয় ছিলেন। তাঁর শাহী হেরেমে নারী,দাসী,গায়িকা ও নর্তকীদের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

হামযাহ্ ইসফাহানী সানা মুলূকিল আরদ’গ্রন্থে সম্রাট খসরু পারভেজের শান-শওকত,জৌলুস ও বিলাসিতা ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছেন :

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের তিন হাজার স্ত্রী,12000 গায়িকা দাসী,6000 দেহরক্ষী পুরুষ সৈনিক,8500টি সওয়ারী ঘোড়া,960টি হাতী,মালপত্র বহন করার জন্য 12000টি গাধা এবং 1000টি উট ছিল।62

এরপর তাবারী আরো বলেছেন,এ সম্রাট অন্য সকলের চেয়ে বেশি মনিমুক্তা,হীরা-জহরত এবং মূল্যবান তৈজসপত্রের প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করতেন।63

ইরানের সামাজিক অবস্থা

সাসানী যুগে ইরানের সামাজিক অবস্থা সে দেশের দরবার ও রাজনৈতিক অবস্থার চেয়ে কোনভাবেই ভালো ছিল না। শ্রেণীশাসন ও শোষণ যা সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই ইরানে বিদ্যমান ছিল তা সাসানীদের যুগে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে।

অভিজাত ও পুরোহিতশ্রেণী অন্যান্য শ্রেণী অপেক্ষা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণী বলে বিবেচিত হতো। সকল ধরনের সামাজিক সংবেদনশীল পদ ও পেশা তাদেরই করায়ত্তে ছিল। পেশাজীবী ও কৃষকগণ সকল প্রকার ন্যায্য অধিকারভিত্তিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। কেবল কর প্রদান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ব্যতীত তাদের অন্য কোন পেশাই ছিল না।

সাসানীদের শ্রেণীবৈষম্যের বিষয়ে নাফীসী লিখেছেন :

“যে বিষয়টি ইরানী জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কপটতার প্রসার ও প্রচলন করেছিল তা ছিল অতি নিষ্ঠুর শ্রেণীবৈষম্য যা সাসানীরা ইরানে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আর শ্রেণীবৈষম্যের মূল পূর্বতন সভ্যতাসমূহের মাঝেই নিহিত ছিল। কিন্তু সাসানীদের যুগে কঠোরতা আরোপের বিষয়টি চরমভাবে বৃদ্ধি পায়।

পারস্য সমাজে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সাত অভিজাত বংশ এবং তাদের পর পাঁচটি শ্রেণী এমন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত যা থেকে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত ছিল। মালিকানা ও স্বত্বাধিকার প্রায় ঐ সাত পরিবার বা বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাসানী ইরানের জনসংখ্যা ছিল 140 মিলিয়ন (14 কোটি)। ঐ সাত বংশের প্রতিটির লোকসংখ্যা যদি এক লক্ষও ধরি তাহলে ঐ সাত বংশের সম্মিলিত লোকসংখ্যা 7,00,000 হবে। আর সৈন্য-সামন্ত এবং জমিদারশ্রেণী যাদেরও কিছুটা মালিকানা স্বীকৃত ছিল তাদের সংখ্যাও যদি আমরা 7,00,000 বলে অনুমান করি তাহলে এ চৌদ্দ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় 15,00,000 ব্যক্তির মালিকানা ছিল এবং বাকী জনগণ স্রষ্টাপ্রদত্ত এই স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।64

পেশাজীবী ও কৃষিজীবিগণ যারা সকল প্রকার অধিকার সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল,কিন্তু অভিজাতশ্রেণীর তাবৎ ব্যয়ভার যাদের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছিল তারা এ অবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের কোন স্বার্থ বা লাভের কথা চিন্তাও করতে পারত না। এ কারণেই অধিকাংশ কৃষিজীবী এবং সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোক নিজেদের পেশা ত্যাগ করে অসহনীয় কর থেকে বাঁচার জন্য মঠ অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের আস্তানায় আশ্রয়গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।65

‘সাসানীদের যুগে ইরান’নামক গ্রন্থের লেখক ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর দুর্ভাগ্য সম্পর্কে লিখেছেন : এমিয়ান মার্সেলিনোস নামক পাশ্চাত্যের এক ঐতিহাসিকের বাণী এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে : ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণী সাসানীদের যুগে চরম দীনতা ও দুর্ভাগ্যের মধ্যে দুর্বিষহ জীবনযাপন করত। তারা যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর পেছনে পায়ে হেঁটে যাত্রা করত। তাদেরকে এমনভাবে মর্যাদাহীন বলে গণ্য করা হতো যেন তাদের ললাটে চিরকালের জন্য দাসত্ব লিখে দেয়া হয়েছে। তারা তাদের শ্রমের বিনিময়ে কোন মজুরি লাভ করত না।”66

সাসানী সাম্রাজ্যের একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণী যারা জনসংখ্যায় শতকরা 1.5 ভাগের কম ছিল তারাই সব কিছুর অধিকারী ছিল। কিন্তু ইরানের জনসংখ্যার শতকরা 98 ভাগের বেশি দাসশ্রেণীর মতো জীবনের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

অভিজাতশ্রেণীই শিক্ষাগ্রহণের অধিকার রাখত

সাসানী যুগে কেবল অভিজাত ও উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন শিশুরাই বিদ্যার্জন করার অধিকার রাখত। সাধারণ জনতা ও সমাজের মধ্যবিত্তশ্রেণী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রাচীন ইরানের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় এ ত্রুটি এতটা প্রকট ছিল যে,এমনকি শাহনামা’ও রাজা-বাদশাদের উপাখ্যান রচয়িতাগণ যাঁদের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে বীরত্বগাথা রচনা করা তাঁরাও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন।

ইরানের বীরত্বগাথা রচয়িতা কবি ফেরদৌসী শাহনামা য় একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন যা এ বিষয়টির সর্বোত্তম সাক্ষ্য-প্রমাণ। কাহিনীটি সম্রাট আনুশীরওয়ানের শাসনামল অর্থাৎ যখন সাসানী সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ তখন সংঘটিত হয়েছিল। এ কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে,তাঁর শাসনামলে প্রায় সকল অধিবাসীরই শিক্ষা ও বিদ্যার্জন করার অধিকার ছিল না,এমনকি জ্ঞানপ্রেমিক সম্রাট আনুশীরওয়ানও অন্যান্য শ্রেণীর জনসাধারণকে জ্ঞানার্জনের অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন না।

ফেরদৌসী লিখেছেন : ইরান ও রোমের যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য একজন জুতা নির্মাতা (মুচি) তার স্বর্ণ ও রূপার ভাণ্ডার দান করতে চেয়েছিল। সে সময় সম্রাট আনুশীরওয়ান আর্থিক সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিলেন। কারণ ইরানের প্রায় তিন লক্ষ সৈন্য তখন তীব্র খাদ্য ও অস্ত্র সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। সম্রাট আনুশীরওয়ান এ অবস্থার কারণে খুবই উদ্বিগ্ন এবং তাঁর নিজ পরিণতি সম্পর্কেও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সম্রাট তাৎক্ষণিকভাবে জ্ঞানী প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করার জন্য ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেন যেন তিনি মাযেনদারান গমন করে যুদ্ধের খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু বুযুর্গমেহের সম্রাটকে বললেন, বিপদ অত্যাসন্ন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে একটি উপায় খুঁজে বের করা আবশ্যক।” তখন বুযুর্গমেহের জাতীয় ঋণ’অর্থাৎ জাতির কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার পরামর্শ দিলেন। সম্রাট আনুশীরওয়ানও তাঁর এ প্রস্তাবটি পছন্দ করলেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশও জারী করলেন। বুযুর্গমেহের নিকটবর্তী শহর,গ্রাম ও জনপদে রাজকীয় কর্মকর্তাদের প্রেরণ করে ঐ সকল স্থানের সচ্ছল ব্যক্তিদের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবগত করলেন।

তখন একজন জুতা নির্মাতা যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সে যা চেয়েছিল তা হলো : এর বিনিময়ে তার একমাত্র পুত্রসন্তান যে লেখাপড়া শিখতে অত্যন্ত আগ্রহী তাকে যেন লেখাপড়া শেখার অনুমতি দেয়া হয়। বুযুর্গমেহের ঐ মুচির আবেদনকে তার দানের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করেন এবং সম্রাটের কাছে ফিরে গিয়ে তার আর্জি সম্পর্কে সম্রাটকে অবহিত করেন। আনুশীরওয়ান এ কথা শুনে খুব রেগে যান এবং প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে তিরস্কার করে বলেন, তুমি এ কেমন আবেদন করছ? এ কাজ কল্যাণকর নয়। কারণ যে শ্রেণীবিন্যাসের আওতায় সে রয়েছে তা থেকে তার বের হয়ে আসার মাধ্যমে দেশের শ্রেণীপ্রথা ধসে পড়বে এবং তখন সে যে স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করছে তার মূল্যমান অপেক্ষা তার এ আর্জি অনেক বেশি ক্ষতি বয়ে আনবে।”

এরপর ফেরদৌসী সম্রাট আনুশীরওয়ানের কণ্ঠে তাঁর (সম্রাটের) মেকিয়াভ্যালি দর্শন’ব্যাখ্যা করেছেন:

বণিকপুত্র যদি হয় সচিব

গুণী,জ্ঞানী ও শিক্ষানবীশ

তাই যখন বসবে মোদের যুবরাজ সিংহাসন পরি

অবশ্যই পাবে সে তখন এক (দক্ষ ও গুণী) ভাগ্যমান সহকারী

আর কভু যদি মোজা বিক্রেতা করে এ গুণ ও জ্ঞান অর্জন

এ জ্ঞান দেবে তারে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন চক্ষু

আর নীচ বংশজাত জ্ঞানীকে দেবে অনুধাবনকারী কর্ণ

ব্যস্,তখন পরিতাপ ও শীতল বায়ু ছাড়া রইবে না আর কিছু।

এভাবেই ন্যায়পরায়ণ (!) বাদশার নির্দেশে জুতা নির্মাতা লোকটির টাকা-পয়সা ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ হতভাগা জুতা নির্মাতা তীব্র মনঃকষ্ট পায় এবং সে রাতের বেলা ন্যায়বিচারক স্রষ্টার দরবারে দু হাত উঠিয়ে এ ধরনের অত্যাচার ও ন্যায্য অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রার্থনা করে-যা হচ্ছে মজলুমদেরই রীতি। আর এভাবে সে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচারের ঘণ্টা ধ্বনিত করে।

প্রেরিত দূত ফিরে আসল এবং ঐ দিরহামগুলো দেখতে পেয়ে

ঐ মুচির অন্তর হলো তীব্র দুঃখভারাক্রান্ত

রাত হলে শাহের কথায় হলো সে দুঃখভারাক্রান্ত

মহান আল্লাহর দরবারে সে চাইল ঐশী আদালতের ঘণ্টাধ্বনি ধ্বনিত হোক। 67

এত কিছু সত্ত্বেও সম্রাট আনুশীরওয়ানের বিশাল প্রচারমাধ্যম ও প্রশাসন তাঁকে ন্যায়পরায়ণ বলে আখ্যায়িত করতে এবং ইরানী সমাজকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু তথাকথিত ন্যায়পরায়ণ এ শাহ তদানীন্তন ইরানী সমাজের মৌলিক সমস্যার জট খুলতে তো সক্ষম হননি;বরং ইরানীদের প্রভূত সামাজিক সমস্যার কারণও হয়েছিলেন। কেবল মাযদাক গোলযোগের ঘটনায় আশি হাজার এবং অপর একটি অভিমত অনুযায়ী এক লক্ষ ইরানীকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ধারণা করেছিলেন যে,উক্ত ফিতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে।68 অথচ এ ফিতনা যে মূলোৎপাটিত হয় নি তা তিনি মোটেও উপলব্ধি করতে পারেন নি। এ ধরনের শাস্তি আসলে ফলাফলের অস্তিত্ব নিশ্চি‎‎ হ্ন করে দেয়,তা কারণের অস্তিত্ব বিলোপ করে না। এ হচ্ছে পাপীদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সংগ্রাম-পাপ ও অপরাধের বিরুদ্ধে নয়। ফিতনার মূল কারণই ছিল সমাজে ভারসাম্যহীনতা,শ্রেণীবৈষম্য,দ্বন্দ্ব,বিশেষ একটি শ্রেণী কর্তৃক সম্পদ ও পদমর্যাদা কুক্ষিগতকরণ,নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা এবং অপরাপর দুর্নীতি ও অপরাধ। আর সম্রাট আনুশীরওয়ান অস্ত্র বল ও চাপ প্রয়োগ করে চাইতেন যে,জনগণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করুক।

এডওয়ার্ড ব্রাউন সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে লিখেছেন : সম্রাট আনুশীরওয়ান নাস্তিকদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি যারথুস্ত্রীয় (যারদোশ্ত) ধর্মযাজকদের প্রশংসা ও সম্মতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর ঐ সব ধর্মযাজকের হাতেই জাতীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে...।”69   এ সব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত ইতিহাসে সম্রাট আনুশিরওয়ানকে ন্যায়পরায়ণতা ও মানবতার পূর্ণ আদর্শ এক সম্রাট হিসাবে পরিচিত করানো হয়েছে। এ ব্যাপারে অনেক কাহিনীও রচনা করা হয়েছে।

খুবই আশ্চর্যজনক! এ দীর্ঘ সময় একমাত্র একটি বৃদ্ধ গাধা ব্যতীত আর কোন মজলুমই ন্যায়বিচারের ঘণ্টা বাজায় নি,অবশ্য এটিও জ্ঞাত বিষয় যে,ঐ গাধাটি তার নিজের সাহসের অপরাধের কথা জানত না;আর যদি সে তা জানত তাহলে সে ঘুণাক্ষরেও ন্যায়পরায়ণতার রজ্জুর নিকটবর্তী হতো না!!

আরো বলা হয় যে,একবার রোমের বাদশাহ্,আজম অর্থাৎ ইরানের বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের কাছে এক দূত প্রেরণ করেছিলেন। যখন ঐ দূত ইরানের বাদশার শানশওকত এবং বিশাল তাক-ই কিসরা প্রত্যক্ষ করলেন তখন তিনি দেখতে পেলেন যে,ইরানের বাদশাহ্ সিংহাসনে উপবিষ্ট;আর রাজারা তাঁর দরবারে উপস্থিত। তিনি এক ঝলক দৃষ্টি শাহী দ্বারমণ্ডপের ওপর নিবদ্ধ করলে উক্ত দ্বারমণ্ডপটি তাঁর দৃষ্টিতে খুবই জমকালো ও জাঁকজমকপূর্ণ বলে মনে হয়। কিন্তু ঐ দ্বারমণ্ডপের চারপাশ যেন একটু বাঁকা। দূত তখন দরবারে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন : দ্বারমণ্ডপে যে সামান্য বক্রতা আপনি দেখতে পাচ্ছেন আসলে এর কারণ হচ্ছে এখানে এক বৃদ্ধার ঘর ছিল যা বাদশাহ্ কিনে নিয়ে দ্বারমণ্ডপের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঐ বৃদ্ধা তার ঘর বিক্রি করতে রাজী না হওয়ায় বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানও তাকে বিক্রি করতে বাধ্য করেন নি। তাই ঐ বৃদ্ধার বাড়িটিই অবশেষে এ দ্বারমণ্ডপটির বক্রতার কারণ হয়েছে। তখন ঐ দূত শপথ করে বললেন যে,দ্বারমণ্ডপের এই বক্রতা আসলে এর সরল ও অবক্র হওয়া অপেক্ষা শ্রেয়।70

এটি আশ্চর্যজনক যে,এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ভবন ও দ্বারমণ্ডপ যে ব্যক্তি নির্মাণ করতে ইচ্ছুক তিনি কি পূর্ব থেকেই এর নকশা সংগ্রহ করবেন না এবং নকশা ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ভূমি ব্যতীতই কেউ কি এ ধরনের ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে! আর এর ফলে শাহী প্রাসাদ বাঁকা হবে। এ কি কখনো বিশ্বাস করা যায়?

আসলে এ ধরনের গালগল্প সম্রাটের দরবারের ব্যক্তিবর্গ ও যারথুস্ত্রীয় ধর্মযাজকগণ,মাযদাকী মতাবলম্বীদের দমন করে সম্রাট তাঁদের স্বার্থে যে মহামূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন সে কারণেই তাঁরা সম্রাটের অনুকূলেই রচনা করে থাকতে পারেন।

‘ইরান ও ইসলাম’গ্রন্থের লেখকের অভিমত অনুসারে এ সব কিছুর চেয়েও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই যে,কেউ কেউ সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতাকে শারয়ী ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণ করার জন্য এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের সূত্র থেকেও হাদীস বর্ণনা করতে বাধ্য হয়েছে। যেমন :ولدت في زمن الملك العادل আমি ন্যায়পরায়ণ বাদশার রাজত্বকালে জন্মগ্রহণ করেছি।”-প্রসিদ্ধ এ হাদীসটি। মহানবী (সা.) যেন এ কথা বলতে গর্ববোধ করতেন যে,তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছেন,অথচ মহানবীর সাথে তাঁর (বাদশার) ন্যায়পরায়ণতার কি কোন সম্পর্ক আছে?

অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : হযরত আলী মাদায়েনে এসে কিসরার প্রাসাদে গমন করলেন। সেখানে তিনি আনুশীরওয়ানকে জীবিত করে তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন হযরত আলীকে বলেছিলেন যে,কুফ্রী করার কারণে তিনি বেহেশত থেকে বঞ্চিত হয়েছেন,তবে ন্যায়পরায়ণ হবার কারণে জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্তও হচ্ছেন না।71 এখন আমরা পর্যালোচনা করব যে,সাসানীরা কি ধরনের অত্যাচার করেছে।

খসরু পারভেজের অপরাধসমূহের পর্দা উন্মোচন

সম্রাট খসরু পারভেজের অত্যাচারমূলক ও পাগলামিপূর্ণ আরেকটি কাজ ছিল প্রসিদ্ধ বুযুর্গমেহেরের সাথে তাঁর আচরণ। এ বুযুর্গমেহের আনুশীরওয়ানের দরবারে 13 বছর কর্মরত ছিলেন এবং তিনি প্রভূত যশ ও খ্যাতির অধিকারী হয়েছিলেন। অবশেষে সম্রাট খসরু পারভেজ তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সম্রাট কারাগারে বন্দী বুযুর্গমেহেরের কাছে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন : তোমার জ্ঞান,বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা অবশেষে তোমারই নিহত হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।” বুযুর্গমেহেরও উত্তরে লিখেছিলেন : যে পর্যন্ত ভাগ্য আমার প্রতি প্রসন্ন ছিল সে পর্যন্ত আমি আমার বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়েছি। এখন যখন ভাগ্য আমার অনুকূলে নেই তখন আমার ধৈর্য ও সহ্যশক্তিকে কাজে লাগাব। আমার হাত দিয়ে যদি অগণিত সৎকর্মসম্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে আমি আমার মন্দ কাজ থেকেও নিরাপদ ও নিশ্চিত হয়েছি। আমার কাছ থেকে মন্ত্রিত্ব পদ কেড়ে নেয়া হলেও আমা থেকে ঐ পদের অসংখ্য অন্যায় ও অত্যাচারের দুঃখ-কষ্টও দূর করা হয়েছে। অতএব,আমার আর ভয় কিসে?

যখন সম্রাট খসরু পারভেজের হাতে বুযুর্গমেহেরের উক্ত চিঠি পৌঁছালো তখন সম্রাট বুযুর্গমেহেরের নাক ও ঠোঁট কেটে ফেলার আদেশ দিলেন। যখন বুযুর্গমেহেরকে সম্রাটের এ আদেশ শুনানো হলো তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন : আমার ঠোঁট এর চেয়ে আরোও বেশি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।” সম্রাট খসরু পারভেজ তখন জিজ্ঞাসা করলেন : কি কারণে? বুযুর্গমেহের তখন বললেন : যেহেতু আপামর জনতার কাছে তোমার এমন সব গুণের প্রশংসা করেছি যা তোমার ছিল না এবং অসন্তুষ্ট অন্তঃকরণসমূহকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম। আমি তোমার এমন সব ভালো কাজ ও পুণ্যের কথা জনগণের মধ্যে প্রচার করেছি যার উপযুক্ত তুমি ছিলে না। হে নিকৃষ্ট অসৎকর্মশীল সম্রাট! যদিও আমার সততার ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত এতদ্সত্ত্বেও আমাকে কুধারণার বশবর্তী হয়ে হত্যা করছ? অতএব,তোমার কাছে সুবিচার আশা করা এবং তোমার কথায় ভরসা করা যায় কি?

সম্রাট খসরু পারভেজ বুযুর্গমেহেরের কথায় খুবই উত্তেজিত হয়ে তাঁর শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলেন।72

‘ইরানের সামাজিক ইতিহাস’গ্রন্থের রচয়িতা-যিনি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা সাসানী যুগের অরাজকতা,অধঃপতিত অবস্থা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল দেশের অভিজাতশ্রেণীর জন্য শিক্ষাগ্রহণের অধিকার ও সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়টি এভাবে চিত্রিত করেছেন :

“এ যুগে তখনকার প্রচলিত সকল জ্ঞান ও শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং শিক্ষা কেবল পুরোহিত,যাজক ও অভিজাতশ্রেণীর সন্তানগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল;আর ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।”73

হ্যাঁ,এ জাহেলী প্রথা সাসানী সম্রাটদের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। আর তাঁরা কোনভাবেই এ বিষয়টি পরিহার করতে চাইতেন না ।

এ কারণেই সৌভাগ্য ও সুখের ক্রোড়ে প্রতিপালিত এ সংখ্যালঘু শ্রেণীটির অপরিপক্ব ও অসংযত প্রবৃত্তি ও রিপুর কামনা-বাসনা ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে জ্ঞানার্জনের অধিকারসহ সকল বৈধ সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল।

ইরান : তদানীন্তন সভ্যতার লালনভূমি

যে কারণে আমরা রোমান সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা অধ্যয়ন করেছি সে একই কারণে আমরা সে সময়ের ইরানের সার্বিক পরিস্থিতি সম্মানিত পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরব। তবে এ বিষয়টির দিকেও দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক যে,আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের দুর্বল দিকগুলো বর্ণনা করে থাকি,তাহলে কেবল সত্য বিশ্লেষণ এবং ইসলাম ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা ব্যতীত আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। জাতীয় গর্ব ও স্বদেশপ্রেম যেন অবশ্যই আমাদের বাস্তববাদী হওয়া থেকে বিরত রাখতে না পারে। আমরা দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি পবিত্র ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ইরানে রাজত্ব করত তা বর্ণনা করতে,বাস্তবকে মেনে নিতে এবং (তদানীন্তন ইরানী সমাজে প্রচলিত) কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে কোন কিছু পরোয়া করি না। অ্যারিস্টটল তাঁর শিক্ষক প্লেটোর সাথে তাঁর মতবিরোধ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা-ই পুনরাবৃত্তি করছি। তিনি তাঁর এ মতপার্থক্যের ব্যাপারে এভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন: আমি প্লেটোকে ভালোবাসি। তবে সত্যকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি।”

সে যুগের ইরানী সরকার ও প্রশাসনের প্রধান দুর্বল দিকটি ছিল স্বৈরাচারী একনায়ক সরকার। নিঃসন্দেহে ব্যক্তিবিশেষের বিবেক-বুদ্ধি ও তাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা এবং একটি সংঘ বা দলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা মোটেও এক নয়। সামষ্টিক অর্থাৎ জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে ষড়যন্ত্র,পেশী প্রদর্শন ও জোর খাটানো অপেক্ষাকৃত কমই হয়ে থাকে। এ কারণেই ইরানীদের মহত্ত্ব,নেতৃত্ব অথবা দুর্বলতা ও অপদস্থ হওয়ার বিষয়টি তাদের কর্তৃত্বশীল একনায়কতন্ত্রের দুর্বলতা অথবা সামর্থ্যরে সাথে পূর্ণরূপে জড়িত। সাসানী সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংক্রান্ত আলোচনা ও অধ্যয়ন এবং তাদের প্রশাসনের ছায়ায় যে সব অস্থিতিশীলতার উদ্ভব হয়েছে সেগুলো আমাদের এ বক্তব্যের জীবন্ত দলিল।

ইসলামের আবির্ভাবকালে ইরানের সার্বিক অবস্থা

ইসলামের আবির্ভাব এবং 611 খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতপ্রাপ্তি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের (590-628 খ্রি.) শাসনামলের সমসাময়িক ঘটনা ছিল। মহানবী (সা.) সম্রাট খসরু পারভেজের রাজত্বকালেই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। (সে দিনটি ছিল শুক্রবার,16 জুলাই,622 খ্রি.)। আর এ তারিখ অর্থাৎ মহানবীর হিজরত দিবস থেকেই মুসলমানদের সন ও তারিখ গণনা শুরু হয়েছিল।

দু টি বৃহৎ পরাশক্তি (প্রাচ্যের রোমান সাম্রাজ্য ও সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য) ঐ সময়ের সভ্য দুনিয়ার বেশিরভাগ অংশ শাসন করত। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে এ দু টি সাম্রাজ্য সমগ্র বিশ্বে শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।

পারস্য সম্রাট আনুশীরওয়ান (নওশেরওয়ান) [531-589 খ্রি.]-এর রাজত্বকাল থেকে রোমানদের সাথে ইরানীদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা খসরু পারভেজের রাজত্বকাল পর্যন্ত দীর্ঘ 24 বছর স্থায়ী হয়েছিল।

পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যদ্বয় এ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যে বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছিল এবং ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সে কারণে উক্ত সাম্রাজ্যদ্বয়ের সরকার ও প্রশাসন কার্যত পঙ্গু ও অচল হয়ে গিয়েছিল;আসলে খোলস ছাড়া এ পরাশক্তিদ্বয়ের আর কিছুই তখন অবশিষ্ট ছিল না।

বিভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট থেকে ইরানের সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতি আলোচনা করতে হলে সম্রাট আনুশীরওয়ানের রাজত্বকালের শেষভাগ থেকে মুসলমানদের আগমন ও পারস্যবিজয় পর্যন্ত সে দেশের সরকার ও প্রশাসনের অবস্থা আমরা আলোচনা করব।

সাসানী শাসনামলে জৌলুস ও বিলাসিতা

সাসানী সম্রাটগণ সাধারণত বিলাসী ও আনুষ্ঠানিকতাপ্রিয় ছিলেন। সাসানী সম্রাটদের জাঁকজমকপূর্ণ শাহী দরবার এবং এর জৌলুস দর্শনার্থীদের চোখ ঝলসে দিত।

সাসানী শাসনামলে দারাফশেশে কভীয়নী’নামে ইরানীদের একটি পতাকা ছিল যা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা সাসানীয়দের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ উৎসবসমূহের সময় রাজকীয় প্রাসাদসমূহে উত্তোলন করা হতো। পতাকাটি মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত দ্বারা সুশোভিত করা হতো। একজন লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী,এ পতাকাটির মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত আসলেই অদ্বিতীয় ছিল যার মূল্য 12,00,000 দিরহাম অর্থাৎ 30,000 পাউন্ড।59

সাসানীদের কল্পকাহিনীর মতো জমকালো প্রাসাদসমূহে বিপুল সংখ্যক মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী,হীরা-জহরত,মণিমুক্তা এবং বিস্ময়কর চিত্রকলা ও ছবির সংগ্রহ ছিল যা দর্শনার্থীদের বিস্ময়াভিভূত করত। আমরা যদি এ সব শাহী প্রাসাদের বিস্ময়কর বিষয়াদি জানতে চাই তাহলে কেবল একটি বৃহদাকার সাদা কার্পেটের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই চলবে যা একটি (সাসানী) রাজপ্রাসাদে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। উক্ত কার্পেটের নাম ছিল বাহারিস্তানে কিসরা’অর্থাৎ সম্রাট কিসরা বা খসরুর বসন্তবাগান। সাসানী শাসকবর্গ এ কার্পেটটি এ কারণে তৈরি করিয়েছিলেন যাতে করে তাঁরা আমোদ-প্রমোদ করার সময় হর্ষোৎফুল্ল থাকতে পারেন এবং সর্বদা বসন্ত ঋতুর সুন্দর ও আনন্দদায়ক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।60

বর্ণনামতে এ কার্পেটের দৈর্ঘ্য ছিল 150 হাত এবং প্রস্থ 70 হাত;আর এর সমস্ত সুতা স্বর্ণ,হীরা-মুক্তা ও জহরত খচিত ছিল।61

সাসানী সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট খসরু পারভেজই অন্য সকল সম্রাটের চেয়ে বেশি জাঁকজমক,বিলাসিতা ও জৌলুসপ্রিয় ছিলেন। তাঁর শাহী হেরেমে নারী,দাসী,গায়িকা ও নর্তকীদের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

হামযাহ্ ইসফাহানী সানা মুলূকিল আরদ’গ্রন্থে সম্রাট খসরু পারভেজের শান-শওকত,জৌলুস ও বিলাসিতা ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছেন :

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের তিন হাজার স্ত্রী,12000 গায়িকা দাসী,6000 দেহরক্ষী পুরুষ সৈনিক,8500টি সওয়ারী ঘোড়া,960টি হাতী,মালপত্র বহন করার জন্য 12000টি গাধা এবং 1000টি উট ছিল।62

এরপর তাবারী আরো বলেছেন,এ সম্রাট অন্য সকলের চেয়ে বেশি মনিমুক্তা,হীরা-জহরত এবং মূল্যবান তৈজসপত্রের প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করতেন।63

ইরানের সামাজিক অবস্থা

সাসানী যুগে ইরানের সামাজিক অবস্থা সে দেশের দরবার ও রাজনৈতিক অবস্থার চেয়ে কোনভাবেই ভালো ছিল না। শ্রেণীশাসন ও শোষণ যা সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই ইরানে বিদ্যমান ছিল তা সাসানীদের যুগে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে।

অভিজাত ও পুরোহিতশ্রেণী অন্যান্য শ্রেণী অপেক্ষা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণী বলে বিবেচিত হতো। সকল ধরনের সামাজিক সংবেদনশীল পদ ও পেশা তাদেরই করায়ত্তে ছিল। পেশাজীবী ও কৃষকগণ সকল প্রকার ন্যায্য অধিকারভিত্তিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। কেবল কর প্রদান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ব্যতীত তাদের অন্য কোন পেশাই ছিল না।

সাসানীদের শ্রেণীবৈষম্যের বিষয়ে নাফীসী লিখেছেন :

“যে বিষয়টি ইরানী জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কপটতার প্রসার ও প্রচলন করেছিল তা ছিল অতি নিষ্ঠুর শ্রেণীবৈষম্য যা সাসানীরা ইরানে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আর শ্রেণীবৈষম্যের মূল পূর্বতন সভ্যতাসমূহের মাঝেই নিহিত ছিল। কিন্তু সাসানীদের যুগে কঠোরতা আরোপের বিষয়টি চরমভাবে বৃদ্ধি পায়।

পারস্য সমাজে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সাত অভিজাত বংশ এবং তাদের পর পাঁচটি শ্রেণী এমন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত যা থেকে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত ছিল। মালিকানা ও স্বত্বাধিকার প্রায় ঐ সাত পরিবার বা বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাসানী ইরানের জনসংখ্যা ছিল 140 মিলিয়ন (14 কোটি)। ঐ সাত বংশের প্রতিটির লোকসংখ্যা যদি এক লক্ষও ধরি তাহলে ঐ সাত বংশের সম্মিলিত লোকসংখ্যা 7,00,000 হবে। আর সৈন্য-সামন্ত এবং জমিদারশ্রেণী যাদেরও কিছুটা মালিকানা স্বীকৃত ছিল তাদের সংখ্যাও যদি আমরা 7,00,000 বলে অনুমান করি তাহলে এ চৌদ্দ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় 15,00,000 ব্যক্তির মালিকানা ছিল এবং বাকী জনগণ স্রষ্টাপ্রদত্ত এই স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।64

পেশাজীবী ও কৃষিজীবিগণ যারা সকল প্রকার অধিকার সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল,কিন্তু অভিজাতশ্রেণীর তাবৎ ব্যয়ভার যাদের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছিল তারা এ অবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের কোন স্বার্থ বা লাভের কথা চিন্তাও করতে পারত না। এ কারণেই অধিকাংশ কৃষিজীবী এবং সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোক নিজেদের পেশা ত্যাগ করে অসহনীয় কর থেকে বাঁচার জন্য মঠ অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের আস্তানায় আশ্রয়গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।65

‘সাসানীদের যুগে ইরান’নামক গ্রন্থের লেখক ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর দুর্ভাগ্য সম্পর্কে লিখেছেন : এমিয়ান মার্সেলিনোস নামক পাশ্চাত্যের এক ঐতিহাসিকের বাণী এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে : ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণী সাসানীদের যুগে চরম দীনতা ও দুর্ভাগ্যের মধ্যে দুর্বিষহ জীবনযাপন করত। তারা যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর পেছনে পায়ে হেঁটে যাত্রা করত। তাদেরকে এমনভাবে মর্যাদাহীন বলে গণ্য করা হতো যেন তাদের ললাটে চিরকালের জন্য দাসত্ব লিখে দেয়া হয়েছে। তারা তাদের শ্রমের বিনিময়ে কোন মজুরি লাভ করত না।”66

সাসানী সাম্রাজ্যের একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণী যারা জনসংখ্যায় শতকরা 1.5 ভাগের কম ছিল তারাই সব কিছুর অধিকারী ছিল। কিন্তু ইরানের জনসংখ্যার শতকরা 98 ভাগের বেশি দাসশ্রেণীর মতো জীবনের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

অভিজাতশ্রেণীই শিক্ষাগ্রহণের অধিকার রাখত

সাসানী যুগে কেবল অভিজাত ও উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন শিশুরাই বিদ্যার্জন করার অধিকার রাখত। সাধারণ জনতা ও সমাজের মধ্যবিত্তশ্রেণী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রাচীন ইরানের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় এ ত্রুটি এতটা প্রকট ছিল যে,এমনকি শাহনামা’ও রাজা-বাদশাদের উপাখ্যান রচয়িতাগণ যাঁদের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে বীরত্বগাথা রচনা করা তাঁরাও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন।

ইরানের বীরত্বগাথা রচয়িতা কবি ফেরদৌসী শাহনামা য় একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন যা এ বিষয়টির সর্বোত্তম সাক্ষ্য-প্রমাণ। কাহিনীটি সম্রাট আনুশীরওয়ানের শাসনামল অর্থাৎ যখন সাসানী সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ তখন সংঘটিত হয়েছিল। এ কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে,তাঁর শাসনামলে প্রায় সকল অধিবাসীরই শিক্ষা ও বিদ্যার্জন করার অধিকার ছিল না,এমনকি জ্ঞানপ্রেমিক সম্রাট আনুশীরওয়ানও অন্যান্য শ্রেণীর জনসাধারণকে জ্ঞানার্জনের অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন না।

ফেরদৌসী লিখেছেন : ইরান ও রোমের যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য একজন জুতা নির্মাতা (মুচি) তার স্বর্ণ ও রূপার ভাণ্ডার দান করতে চেয়েছিল। সে সময় সম্রাট আনুশীরওয়ান আর্থিক সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিলেন। কারণ ইরানের প্রায় তিন লক্ষ সৈন্য তখন তীব্র খাদ্য ও অস্ত্র সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। সম্রাট আনুশীরওয়ান এ অবস্থার কারণে খুবই উদ্বিগ্ন এবং তাঁর নিজ পরিণতি সম্পর্কেও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সম্রাট তাৎক্ষণিকভাবে জ্ঞানী প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করার জন্য ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেন যেন তিনি মাযেনদারান গমন করে যুদ্ধের খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু বুযুর্গমেহের সম্রাটকে বললেন, বিপদ অত্যাসন্ন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে একটি উপায় খুঁজে বের করা আবশ্যক।” তখন বুযুর্গমেহের জাতীয় ঋণ’অর্থাৎ জাতির কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার পরামর্শ দিলেন। সম্রাট আনুশীরওয়ানও তাঁর এ প্রস্তাবটি পছন্দ করলেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশও জারী করলেন। বুযুর্গমেহের নিকটবর্তী শহর,গ্রাম ও জনপদে রাজকীয় কর্মকর্তাদের প্রেরণ করে ঐ সকল স্থানের সচ্ছল ব্যক্তিদের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবগত করলেন।

তখন একজন জুতা নির্মাতা যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সে যা চেয়েছিল তা হলো : এর বিনিময়ে তার একমাত্র পুত্রসন্তান যে লেখাপড়া শিখতে অত্যন্ত আগ্রহী তাকে যেন লেখাপড়া শেখার অনুমতি দেয়া হয়। বুযুর্গমেহের ঐ মুচির আবেদনকে তার দানের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করেন এবং সম্রাটের কাছে ফিরে গিয়ে তার আর্জি সম্পর্কে সম্রাটকে অবহিত করেন। আনুশীরওয়ান এ কথা শুনে খুব রেগে যান এবং প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে তিরস্কার করে বলেন, তুমি এ কেমন আবেদন করছ? এ কাজ কল্যাণকর নয়। কারণ যে শ্রেণীবিন্যাসের আওতায় সে রয়েছে তা থেকে তার বের হয়ে আসার মাধ্যমে দেশের শ্রেণীপ্রথা ধসে পড়বে এবং তখন সে যে স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করছে তার মূল্যমান অপেক্ষা তার এ আর্জি অনেক বেশি ক্ষতি বয়ে আনবে।”

এরপর ফেরদৌসী সম্রাট আনুশীরওয়ানের কণ্ঠে তাঁর (সম্রাটের) মেকিয়াভ্যালি দর্শন’ব্যাখ্যা করেছেন:

বণিকপুত্র যদি হয় সচিব

গুণী,জ্ঞানী ও শিক্ষানবীশ

তাই যখন বসবে মোদের যুবরাজ সিংহাসন পরি

অবশ্যই পাবে সে তখন এক (দক্ষ ও গুণী) ভাগ্যমান সহকারী

আর কভু যদি মোজা বিক্রেতা করে এ গুণ ও জ্ঞান অর্জন

এ জ্ঞান দেবে তারে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন চক্ষু

আর নীচ বংশজাত জ্ঞানীকে দেবে অনুধাবনকারী কর্ণ

ব্যস্,তখন পরিতাপ ও শীতল বায়ু ছাড়া রইবে না আর কিছু।

এভাবেই ন্যায়পরায়ণ (!) বাদশার নির্দেশে জুতা নির্মাতা লোকটির টাকা-পয়সা ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ হতভাগা জুতা নির্মাতা তীব্র মনঃকষ্ট পায় এবং সে রাতের বেলা ন্যায়বিচারক স্রষ্টার দরবারে দু হাত উঠিয়ে এ ধরনের অত্যাচার ও ন্যায্য অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রার্থনা করে-যা হচ্ছে মজলুমদেরই রীতি। আর এভাবে সে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচারের ঘণ্টা ধ্বনিত করে।

প্রেরিত দূত ফিরে আসল এবং ঐ দিরহামগুলো দেখতে পেয়ে

ঐ মুচির অন্তর হলো তীব্র দুঃখভারাক্রান্ত

রাত হলে শাহের কথায় হলো সে দুঃখভারাক্রান্ত

মহান আল্লাহর দরবারে সে চাইল ঐশী আদালতের ঘণ্টাধ্বনি ধ্বনিত হোক। 67

এত কিছু সত্ত্বেও সম্রাট আনুশীরওয়ানের বিশাল প্রচারমাধ্যম ও প্রশাসন তাঁকে ন্যায়পরায়ণ বলে আখ্যায়িত করতে এবং ইরানী সমাজকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু তথাকথিত ন্যায়পরায়ণ এ শাহ তদানীন্তন ইরানী সমাজের মৌলিক সমস্যার জট খুলতে তো সক্ষম হননি;বরং ইরানীদের প্রভূত সামাজিক সমস্যার কারণও হয়েছিলেন। কেবল মাযদাক গোলযোগের ঘটনায় আশি হাজার এবং অপর একটি অভিমত অনুযায়ী এক লক্ষ ইরানীকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ধারণা করেছিলেন যে,উক্ত ফিতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে।68 অথচ এ ফিতনা যে মূলোৎপাটিত হয় নি তা তিনি মোটেও উপলব্ধি করতে পারেন নি। এ ধরনের শাস্তি আসলে ফলাফলের অস্তিত্ব নিশ্চি‎‎ হ্ন করে দেয়,তা কারণের অস্তিত্ব বিলোপ করে না। এ হচ্ছে পাপীদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সংগ্রাম-পাপ ও অপরাধের বিরুদ্ধে নয়। ফিতনার মূল কারণই ছিল সমাজে ভারসাম্যহীনতা,শ্রেণীবৈষম্য,দ্বন্দ্ব,বিশেষ একটি শ্রেণী কর্তৃক সম্পদ ও পদমর্যাদা কুক্ষিগতকরণ,নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা এবং অপরাপর দুর্নীতি ও অপরাধ। আর সম্রাট আনুশীরওয়ান অস্ত্র বল ও চাপ প্রয়োগ করে চাইতেন যে,জনগণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করুক।

এডওয়ার্ড ব্রাউন সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে লিখেছেন : সম্রাট আনুশীরওয়ান নাস্তিকদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি যারথুস্ত্রীয় (যারদোশ্ত) ধর্মযাজকদের প্রশংসা ও সম্মতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর ঐ সব ধর্মযাজকের হাতেই জাতীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে...।”69   এ সব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত ইতিহাসে সম্রাট আনুশিরওয়ানকে ন্যায়পরায়ণতা ও মানবতার পূর্ণ আদর্শ এক সম্রাট হিসাবে পরিচিত করানো হয়েছে। এ ব্যাপারে অনেক কাহিনীও রচনা করা হয়েছে।

খুবই আশ্চর্যজনক! এ দীর্ঘ সময় একমাত্র একটি বৃদ্ধ গাধা ব্যতীত আর কোন মজলুমই ন্যায়বিচারের ঘণ্টা বাজায় নি,অবশ্য এটিও জ্ঞাত বিষয় যে,ঐ গাধাটি তার নিজের সাহসের অপরাধের কথা জানত না;আর যদি সে তা জানত তাহলে সে ঘুণাক্ষরেও ন্যায়পরায়ণতার রজ্জুর নিকটবর্তী হতো না!!

আরো বলা হয় যে,একবার রোমের বাদশাহ্,আজম অর্থাৎ ইরানের বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের কাছে এক দূত প্রেরণ করেছিলেন। যখন ঐ দূত ইরানের বাদশার শানশওকত এবং বিশাল তাক-ই কিসরা প্রত্যক্ষ করলেন তখন তিনি দেখতে পেলেন যে,ইরানের বাদশাহ্ সিংহাসনে উপবিষ্ট;আর রাজারা তাঁর দরবারে উপস্থিত। তিনি এক ঝলক দৃষ্টি শাহী দ্বারমণ্ডপের ওপর নিবদ্ধ করলে উক্ত দ্বারমণ্ডপটি তাঁর দৃষ্টিতে খুবই জমকালো ও জাঁকজমকপূর্ণ বলে মনে হয়। কিন্তু ঐ দ্বারমণ্ডপের চারপাশ যেন একটু বাঁকা। দূত তখন দরবারে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন : দ্বারমণ্ডপে যে সামান্য বক্রতা আপনি দেখতে পাচ্ছেন আসলে এর কারণ হচ্ছে এখানে এক বৃদ্ধার ঘর ছিল যা বাদশাহ্ কিনে নিয়ে দ্বারমণ্ডপের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঐ বৃদ্ধা তার ঘর বিক্রি করতে রাজী না হওয়ায় বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানও তাকে বিক্রি করতে বাধ্য করেন নি। তাই ঐ বৃদ্ধার বাড়িটিই অবশেষে এ দ্বারমণ্ডপটির বক্রতার কারণ হয়েছে। তখন ঐ দূত শপথ করে বললেন যে,দ্বারমণ্ডপের এই বক্রতা আসলে এর সরল ও অবক্র হওয়া অপেক্ষা শ্রেয়।70

এটি আশ্চর্যজনক যে,এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ভবন ও দ্বারমণ্ডপ যে ব্যক্তি নির্মাণ করতে ইচ্ছুক তিনি কি পূর্ব থেকেই এর নকশা সংগ্রহ করবেন না এবং নকশা ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ভূমি ব্যতীতই কেউ কি এ ধরনের ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে! আর এর ফলে শাহী প্রাসাদ বাঁকা হবে। এ কি কখনো বিশ্বাস করা যায়?

আসলে এ ধরনের গালগল্প সম্রাটের দরবারের ব্যক্তিবর্গ ও যারথুস্ত্রীয় ধর্মযাজকগণ,মাযদাকী মতাবলম্বীদের দমন করে সম্রাট তাঁদের স্বার্থে যে মহামূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন সে কারণেই তাঁরা সম্রাটের অনুকূলেই রচনা করে থাকতে পারেন।

‘ইরান ও ইসলাম’গ্রন্থের লেখকের অভিমত অনুসারে এ সব কিছুর চেয়েও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই যে,কেউ কেউ সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতাকে শারয়ী ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণ করার জন্য এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের সূত্র থেকেও হাদীস বর্ণনা করতে বাধ্য হয়েছে। যেমন :ولدت في زمن الملك العادل আমি ন্যায়পরায়ণ বাদশার রাজত্বকালে জন্মগ্রহণ করেছি।”-প্রসিদ্ধ এ হাদীসটি। মহানবী (সা.) যেন এ কথা বলতে গর্ববোধ করতেন যে,তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছেন,অথচ মহানবীর সাথে তাঁর (বাদশার) ন্যায়পরায়ণতার কি কোন সম্পর্ক আছে?

অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : হযরত আলী মাদায়েনে এসে কিসরার প্রাসাদে গমন করলেন। সেখানে তিনি আনুশীরওয়ানকে জীবিত করে তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন হযরত আলীকে বলেছিলেন যে,কুফ্রী করার কারণে তিনি বেহেশত থেকে বঞ্চিত হয়েছেন,তবে ন্যায়পরায়ণ হবার কারণে জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্তও হচ্ছেন না।71 এখন আমরা পর্যালোচনা করব যে,সাসানীরা কি ধরনের অত্যাচার করেছে।

খসরু পারভেজের অপরাধসমূহের পর্দা উন্মোচন

সম্রাট খসরু পারভেজের অত্যাচারমূলক ও পাগলামিপূর্ণ আরেকটি কাজ ছিল প্রসিদ্ধ বুযুর্গমেহেরের সাথে তাঁর আচরণ। এ বুযুর্গমেহের আনুশীরওয়ানের দরবারে 13 বছর কর্মরত ছিলেন এবং তিনি প্রভূত যশ ও খ্যাতির অধিকারী হয়েছিলেন। অবশেষে সম্রাট খসরু পারভেজ তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সম্রাট কারাগারে বন্দী বুযুর্গমেহেরের কাছে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন : তোমার জ্ঞান,বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা অবশেষে তোমারই নিহত হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।” বুযুর্গমেহেরও উত্তরে লিখেছিলেন : যে পর্যন্ত ভাগ্য আমার প্রতি প্রসন্ন ছিল সে পর্যন্ত আমি আমার বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়েছি। এখন যখন ভাগ্য আমার অনুকূলে নেই তখন আমার ধৈর্য ও সহ্যশক্তিকে কাজে লাগাব। আমার হাত দিয়ে যদি অগণিত সৎকর্মসম্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে আমি আমার মন্দ কাজ থেকেও নিরাপদ ও নিশ্চিত হয়েছি। আমার কাছ থেকে মন্ত্রিত্ব পদ কেড়ে নেয়া হলেও আমা থেকে ঐ পদের অসংখ্য অন্যায় ও অত্যাচারের দুঃখ-কষ্টও দূর করা হয়েছে। অতএব,আমার আর ভয় কিসে?

যখন সম্রাট খসরু পারভেজের হাতে বুযুর্গমেহেরের উক্ত চিঠি পৌঁছালো তখন সম্রাট বুযুর্গমেহেরের নাক ও ঠোঁট কেটে ফেলার আদেশ দিলেন। যখন বুযুর্গমেহেরকে সম্রাটের এ আদেশ শুনানো হলো তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন : আমার ঠোঁট এর চেয়ে আরোও বেশি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।” সম্রাট খসরু পারভেজ তখন জিজ্ঞাসা করলেন : কি কারণে? বুযুর্গমেহের তখন বললেন : যেহেতু আপামর জনতার কাছে তোমার এমন সব গুণের প্রশংসা করেছি যা তোমার ছিল না এবং অসন্তুষ্ট অন্তঃকরণসমূহকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম। আমি তোমার এমন সব ভালো কাজ ও পুণ্যের কথা জনগণের মধ্যে প্রচার করেছি যার উপযুক্ত তুমি ছিলে না। হে নিকৃষ্ট অসৎকর্মশীল সম্রাট! যদিও আমার সততার ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত এতদ্সত্ত্বেও আমাকে কুধারণার বশবর্তী হয়ে হত্যা করছ? অতএব,তোমার কাছে সুবিচার আশা করা এবং তোমার কথায় ভরসা করা যায় কি?

সম্রাট খসরু পারভেজ বুযুর্গমেহেরের কথায় খুবই উত্তেজিত হয়ে তাঁর শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলেন।72

‘ইরানের সামাজিক ইতিহাস’গ্রন্থের রচয়িতা-যিনি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা সাসানী যুগের অরাজকতা,অধঃপতিত অবস্থা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল দেশের অভিজাতশ্রেণীর জন্য শিক্ষাগ্রহণের অধিকার ও সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়টি এভাবে চিত্রিত করেছেন :

“এ যুগে তখনকার প্রচলিত সকল জ্ঞান ও শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং শিক্ষা কেবল পুরোহিত,যাজক ও অভিজাতশ্রেণীর সন্তানগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল;আর ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।”73

হ্যাঁ,এ জাহেলী প্রথা সাসানী সম্রাটদের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। আর তাঁরা কোনভাবেই এ বিষয়টি পরিহার করতে চাইতেন না ।

এ কারণেই সৌভাগ্য ও সুখের ক্রোড়ে প্রতিপালিত এ সংখ্যালঘু শ্রেণীটির অপরিপক্ব ও অসংযত প্রবৃত্তি ও রিপুর কামনা-বাসনা ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে জ্ঞানার্জনের অধিকারসহ সকল বৈধ সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল।


15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35