জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা5%

জীবন জিজ্ঞাসা লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

জীবন জিজ্ঞাসা
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 58 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42076 / ডাউনলোড: 4625
সাইজ সাইজ সাইজ
জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণের দায়িত্ব কা র ?

এখানে মতপার্থক্যের বিষয়টি সম্পর্কে অত্যন্ত সংক্ষেপে বলা যেতে পারে যে , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পরে তাঁর দ্বীনী ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বা স্থলাভিষিক্ততা তথা নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্বের অধিকার প্রশ্নে ছ্বাহাবীগণ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যান এবং এ মতপার্থক্যের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে মুসলিম উম্মাহ্ দু টি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে , যদিও আরো পরে অন্য কতক বিষয়কে কেন্দ্র করে এ উভয় ধারার প্রতিটি থেকেই একাধিক উপধারার সৃষ্টি হয়।

মুসলমানদের দু টি প্রধান ধারার মধ্যকার একটি ধারার (শিয়া) বক্তব্য এই যে , নবীর অবর্তমানে তাঁর উম্মাহর পরিচালনা , নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্বের জন্য হুবহু নবীর গুণাবলী সম্পন্ন তথা নিষ্পাপ ও নির্ভুল ঐশী নেতৃত্ব অপরিহার্য। যদিও শেষ নবীর আগমন এবং খোদায়ী ওয়াহীর পরিপূর্ণতা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত হওয়ার পর আর নতুন কোনো ওয়াহী ও নবীর প্রয়োজন থাকছে না , কিন্তু ওয়াহী ও দ্বীনের বিধি-বিধানের সঠিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং তার ভিত্তিতে উম্মাহর পরিচালনা , নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্বের জন্য নবীর অনুরূপ গুণাবলীর অধিকারী তথা পাপ ও ভুল থেকে সংরক্ষিত নেতৃত্ব না থাকলে এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের দায়িত্ব মানুষের হাতে ছেড়ে দেয়া হলে ভুল ও নিম্ন মানের নেতৃত্ব নির্বাচনের আশঙ্কা থেকে যায় এবং এ ধরনের নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্বের কারণে উম্মাহর পথভ্রষ্টতা , নিদেন পক্ষে তার মানের অধঃগমন অনিবার্য। তাই হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর স্থলাভিষিক্ততার জন্য আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে পাপ ও ভুল থেকে সংরক্ষিত নেতৃত্ব মনোনীত হওয়া অপরিহার্য।

এ মূলনীতির ভিত্তিতে এ ধারাটির দাবী হচ্ছে , আল্লাহ্ তা আলা রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর অবর্তমানে তাঁর পর্যায়ক্রমিক স্থলাভিষিক্ততা ও উম্মাহকে নেতৃত্বদানের জন্য তাঁর মাধ্যমে বারো জন ইমামকে মনোনীত ও তাঁদের নাম ঘোষণা করেছেন - যাদেরকে তিনি সকল প্রকার গুনাহ্ ও ভুলভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেছেন। এই বারো জন ইমাম হলেন হযরত আলী (আঃ) , হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) এবং হযরত ইমাম হোসেন (আঃ)-এর নয়জন পর্যায়ক্রমিক বংশধর। এদের মধ্যে সর্বশেষ হলেন একাদশ ইমাম হাসান আসকারী (আঃ)-এর পুত্র প্রতিশ্রুত ইমাম মাহ্দী (আঃ)- যিনি হিজরী ২৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং বর্তমানে আত্মগোপনরত আছেন । আল্লাহ্ তা আলা নিজ কুদরতে তাঁকে দীর্ঘজীবী করেছেন এবং পরে কোনো উপযুক্ত সময় তিনি আত্মপ্রকাশ ও মুসলিম উম্মাহর মধ্যে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করে বিশ্ব ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবেন।

দ্বিতীয় ধারাটির (সুন্নী) মতে , যেহেতু কোরআন মজীদ ক্বিয়ামত পর্যন্তকার সকল মানুষের জন্য পরিপূর্ণ পথনির্দেশ সেহেতু হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পর কোরআন মজীদ ও রাসূলের (ছ্বাঃ) সুন্নাহর অনুসরণই যথেষ্ট ; আর যেহেতু কোরআন মজীদে নামোল্লেখ সহ কাউকে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে উম্মাহর ইমাম ও শাসক মনোনীত করার কথা উল্লেখ করা হয় নি , সুতরাং মুসলমানরা নিজেরাই নিজেদের নেতা ও শাসক নির্বাচিত করবে।

এর জবাবে শিয়া ধারার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে , যেহেতু মুসলমানদের প্রধান দুই ধারার বিভিন্ন হাদীছে বারো জন ইমামের কথা নাম সহ উল্লিখিত হয়েছে , বিশেষ করে মুতাওয়াতির্ হাদীছ অনুযায়ী , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) তাঁর ইন্তেকালের কয়েক মাস আগে হজ্ব সমাপনের পর মক্কাহর অদূরস্থ গ্বাদীরে খুম্ নামক স্থানে এক মহাসমাবেশে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তাঁর পরে মুসলমানদের মাওলা অর্থাৎ নেতা ও শাসক হিসেবে হযরত আলী (আঃ) কে মনোনীত করে গিয়েছেন সেহেতু তাঁদেরকে আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত ইমাম হিসেবে মেনে নেয়া অপরিহার্য।

কিন্তু সুন্নী ধারা বারো জন ইমাম সংক্রান্ত হাদীছগুলোকে মুতাওয়াতির্ মনে না করায় এবং হযরত আলী (আঃ)-এর মাওলা হওয়া সংক্রান্ত হাদীছে এ শব্দটিকে বন্ধু অর্থে ব্যবহৃত বলে দাবী করে হযরত আলী (আঃ) কে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর অব্যবহিত পরবর্তী নেতা ও শাসক মনোনীতকরণ সংক্রান্ত ধারণা প্রত্যাখ্যান করে।

এর জবাবে শিয়া ধারার যুক্তি হচ্ছে এই যে , যেহেতু কোরআন মজীদে মুসলমানদেরকে পরস্পরের বন্ধু ও একটি ভ্রাতৃসম্প্রদায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে সেহেতু নতুন করে ও আলাদাভাবে হযরত আলী (আঃ) কে মুসলমানদের বন্ধু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া - তা-ও এক বিরাট আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে - নিঃসন্দেহে একটি বাহুল্য কাজ , আর নবী-রাসূলগণ (আঃ) বাহুল্য কাজ করেন না। অতএব , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) উক্ত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে হযরত আলী (আঃ) কে স্বীয় উত্তরাধিকারী এবং অব্যবহিত পরবর্তী ইমাম ও শাসক নিয়োগ করে গিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) উত্তরাধিকারিত্ব: বিচারবুদ্ধির দাবী ১১

আল্লাহ্ তা আলা যে সব মুখ্য উদ্দেশ্যে মানুষের কাছে স্বীয় বাণী সহ যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে (আঃ) পাঠিয়েছেন তা হচ্ছে লোকদেরকে আল্লাহ্ ও পরকাল সংক্রান্ত সঠিক ধারণার সাথে পরিচিত করা , তাদের কাছে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ সমূহ পৌঁছে দেয়া , আল্লাহর বাণী ও আদেশ-নিষেধের ব্যাখ্যা প্রদান , মূল বিধিবিধানের ছোটখাট শাখা-প্রশাখা প্রণয়ন , সর্বাবস্থায় স্বীয় অনুসারীদের নেতৃত্ব প্রদান এবং সম্ভবপর হলে তথা রাষ্ট্রক্ষমতা আয়ত্তাধীন হলে জনগণের ওপর শাসনক্ষমতা পরিচালনা।

পূর্ণাঙ্গ দ্বীন নাযিল হওয়ার পরে নতুন কোনো ওয়াহী নাযিলের প্রয়োজন নেই , অতএব , নতুন কোনো নবী আগমনেরও প্রয়োজন নেই। কিন্তু মওজূদ ওয়াহীর ব্যাখ্যাকরণ , মুসলমানদেরকে পথনির্দেশ প্রদান এবং তাদের ওপর শাসনকর্তৃত্ব পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থেকে যায়। মূলতঃ এ সব কাজের জন্যই নবীর প্রয়োজন হতো , নইলে আল্লাহ্ তা আলা ফেরেশতার মাধ্যমে স্বীয় পরিচয় ও আদেশ-নিষেধ সম্বলিত কিতাব পাঠাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা পাঠান নি , বরং সব সময়ই তা নবী-রাসূলগণের (আঃ) মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে , নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা সমাপ্ত হয়ে যাবার পর নবীর অবর্তমানে যিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন তাঁর জন্য কী ধরনের গুণাবলীর অধিকারী হওয়া প্রয়োজন ?

বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী , এ কাজ সম্পাদনকারীর জন্য যে সব গুণাবলীর অধিকারী হওয়া প্রয়োজন সেগুলোকে সংক্ষেপে তিনটি গুণের মধ্যে সমন্বিত করা যায় , তা হচ্ছে: জ্ঞান , পাপমুক্ততা ও অন্তর্দৃষ্টি বা দূরদর্শিতা। অবশ্য একজন নেতার মধ্যে অন্তর্দৃষ্টি বা দূরদর্শিতা আছে কিনা তা কেবল কালের প্রবাহে উদ্ভূতব্য সঙ্কটের অবস্থাগুলোতে তাঁর দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে ; আগেই তা জানা যায় না। কিন্তু অপর দু টি গুণ তাঁর মধ্যে আছে কিনা তা তাঁর দায়িত্বগ্রহণকালেই সুস্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

আমাদের এ কথার মানে হচ্ছে , নবীর স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তির মধ্যে নবীর রেখে যাওয়া জ্ঞান পরিপূর্ণ ও উচ্চতম মাত্রায় থাকা অপরিহার্য এবং সেই সাথে তাঁর দ্বারা পাপ সংঘটিত না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত থাকতে হবে।

ইমাম বা শাসক যদি নবীর রেখে যাওয়া পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী না হন তাহলে তিনি ভুল করবেন এবং তাঁর ভুলের দ্বারা উম্মাহকে ইহকালে ও পরকালে ক্ষতির মধ্যে নিক্ষেপ করবেন। অন্যথায় তাঁকে তাঁর চেয়ে বেশী জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিদের পরামর্শ ও পথনির্দেশের ওপর নির্ভর করতে হবে। সে ক্ষেত্রে তা হবে তাঁর দুর্বলতার পরিচায়ক। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কেন্দ্র দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হওয়া কাম্য নয়। তাছাড়া জ্ঞানের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রগণ্য না হলে তিনি সঠিক ও ভুল পরামর্শের মধ্যে পার্থক্য করতে ও সঠিক পরামর্শ অনুসরণ করতে সক্ষম হবেন তারও নিশ্চয়তা নেই। শুধু তা-ই নয় , পদের মর্যাদা রক্ষার্থে তিনি তাঁর তুলনায় অধিকতর জ্ঞানী ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ থেকে পুরোপুরিও বিরত থাকতে পারেন , বা সব সময় তা গ্রহণ না করে কখনো কখনো স্বীয় ভিত্তিহীন মতের অনুসরণ করতে পারেন।

অন্যদিকে ইমাম যদি পাপমুক্ত না হন তাহলে তিনি সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করবেন না , সর্বাবস্থায় ন্যায়বিচার করবেন না , পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত থাকবেন না , বায়তুল মালের (রাষ্ট্রীয় কোষাগারের) সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন করবেন না। মোট কথা , পাপমুক্ত না হলে তিনি ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি রূপে নিজেকে পেশ করবেন না এবং নবীর যথার্থ উত্তরাধিকারী ও স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নিজেকে অন্যদের সামনে দৃষ্টান্তে পরিণত করতে পারবেন না। ফলে তাঁর প্রশাসন যালেম , দুর্নীতিবায , চাটুকার ও স্বার্থান্বেষী আত্মসাৎকারীদের থেকে মুক্ত থাকার কোনোই নিশ্চয়তা থাকবে না ।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , ইলমী যোগ্যতা ও পাপমুক্ততার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কারণ , কোনো ব্যক্তি পরিপূর্ণ দ্বীনী ইলমের অধিকারী না হলে তার পক্ষে ছোট-বড় প্রতিটি ফরয ও হারাম সম্বন্ধে জানা না থাকার কারণে প্রতিটি ফরয আঞ্জাম দেয়া ও প্রতিটি হারাম থেকে বিরত থাকা সম্ভব নয়।

অবশ্য কেউ ইলমের অধিকারী হলেই গুনাহ্ থেকে মুক্ত থাকবে তার নিশ্চয়তা নেই , কিন্তু ইলমের অধিকারী না হলে গুরুদায়িত্ব কাঁধে বহনকারী ব্যক্তি কোনোভাবেই পাপমুক্ত থাকতে পারবে না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে , আমরা যদি মেনে নেই যে , ইমামের অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর স্থলাভিষিক্তের জন্য পরিপূর্ণ দ্বীনী জ্ঞানের অধিকারী ও পাপমুক্ত হওয়া প্রয়োজন সে ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যক্তিকে বেছে নেয়ার দায়িত্ব কার ? আল্লাহ্ই কি এ ধরনের ব্যক্তিকে মনোনীত করবেন , নাকি জনগণ তাকে বেছে নেবে ?

আমরা লোকদের জ্ঞানের অধিকারী হওয়া-নাহওয়ার বিষয়টি মোটামুটি নির্ণয় করতে পারি , কিন্তু পাপমুক্ততার ক্ষেত্রে কারো প্রকাশ্যে পাপ না করা সম্বন্ধে জানতে পারলেও তার গোপন পাপ থাকলে তা জানা কেবল আল্লাহ তা আলার পক্ষেই সম্ভব।

এমতাবস্থায় বিচারবুদ্ধির দাবী হচ্ছে এই যে , স্বয়ং আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে এ ধরনের ব্যক্তিকে বেছে নেয়া হলে তা হবে বান্দাহদের প্রতি বিরাট অনুগ্রহ। কিন্তু আল্লাহ্ তা আলা এ ধরনের কোনো ব্যক্তিকে বেছে নিয়ে নামোল্লেখপূর্বক মনোনয়ন দিয়েছেন কিনা তা যদি আমাদের জানা না থাকে তাহলে আমাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতে এতদসংক্রান্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পথনির্দেশ কী আছে তা দেখতে হবে এবং এতদুভয়ে নিহিত ইঙ্গিত যার বেলায় প্রযোজ্য তাঁকে খুঁজে বের করে তাঁকেই আল্লাহর পসন্দনীয় ব্যক্তি মনে করে তাঁর হাতে এ দায়িত্ব সোপর্দ করতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতে পরিপূর্ণ ইলমের অধিকারী ব্যক্তির ও পাপমুক্ত ব্যক্তির কথা উল্লেখ থাকলে তা যার বেলায় প্রযোজ্য হয় তাঁকেই ইমাম ও শাসক হিসেবে বরণ করে নিতে হবে।১২

যদিও বিচারবুদ্ধির উপরোক্ত রায়ের সাথে দ্বিমত করার এবং অপেক্ষাকৃত কম জ্ঞানের অধিকারী ও পাপমুক্ততার নিশ্চয়তা বিহীন ব্যক্তিকে ইমাম ও শাসকের পদে বসানোর কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না তথাপি এ প্রসঙ্গে উত্থাপিত একটি প্রশ্নের জবাব পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না , যদিও বিষয়টির সম্পর্ক অংশতঃ বিচারবুদ্ধির সাথে ও অংশতঃ ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে।

বলা হয় যে , মুসলমানরা যদি তাদের নিজেদের জন্য ইমাম ও শাসক বেছে নেয় এবং তিনি যদি ইলমী দিক থেকে সর্বাগ্রগণ্য না-ও হন এবং পাপমুক্ততার নিশ্চয়তা না থাকলেও দৃশ্যতঃ তিনি পাপাচারী না হন , আর তিনি যদি কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে তাদেরকে শাসন ও পরিচালনা করেন তাহলে তা-ই যথেষ্ট। অতএব , আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে কোনো ইমাম ও শাসক মনোনীত করা অপরিহার্য নয়।

এ যুক্তি এ কারণে গ্রহণযোগ্য নয় যে , উম্মাতের হেদায়াত ও পরিচালনার ক্ষেত্রে ইমাম বা শাসক কোনো প্রশ্নের বা সমস্যার সম্মুখীন হবার পর কোরআন ও সুন্নাহ্ থেকে তার জবাব বা সমাধান খুঁজে বের করবেন এবং এরপর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জবাব বা উদ্ভূত সমস্যার সমাধান দেবেন - এর পরিবর্তে তাঁর মস্তিষ্কে ইতিমধ্যেই মওজূদ কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞানের দ্বারা জবাব দেবেন এটাই হওয়া উচিত। অর্থাৎ ইমাম বা শাসকের কাছে জবাব বা সমাধান পূর্ব থেকেই মওজূদ থাকতে হবে। কারণ , ক্ষেত্রবিশেষে তাঁর কাছে সমাধান খোঁজার মতো যথেষ্ট সময় না-ও থাকতে পারে।

দ্বিতীয়তঃ রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) ইন্তেকালের পর কোরআন মজীদ যেভাবে লিপিবদ্ধ আকারে হাতের কাছে ছিলো সুন্নাহ্ কখনোই সেভাবে লিপিবদ্ধ আকারে মওজূদ ছিলো না। সুন্নাহ্ অনেক বিলম্বে এমন সময়ে ও এমন অবস্থায় লিপিবদ্ধ হয়েছে যখন তাতে অনেক মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটেছিলো। এমনকি কোরআন মজীদ লিপিবদ্ধ আকারে মওজূদ থাকলেও কতক ক্ষেত্রে তার ব্যাখ্যা রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর কাছ থেকে জানা প্রয়োজন ছিলো। এমতাবস্থায় , ইমাম ও শাসক পদের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর কাছ থেকে কোরআন ও সুন্নাহর পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জনকারী ব্যক্তির কোনো বিকল্প ছিলো না।১৩

অবশ্য সতর্কতার নীতির দাবীও এটাই ছিলো। কারণ , আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নেতা ও শাসক মনোনীত না হয়ে থাকলেও মুসলমানদের জন্য উচিত ছিলো সেই ব্যক্তিকে এ দায়িত্ব অর্পণ করা যার আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত না হলেও এর সম্ভাবনা ছিলো। কারণ , হাদীছে গ্বাদীরে ব্যবহৃত মাওলা শব্দের উদ্দেশ্য যদি বন্ধু হয়ে থাকে তাহলেও অন্য কারো পরিবর্তে হযরত আলী (আঃ)কে এ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করায় কোনো সমস্যা ছিলো না। কিন্তু এর উদ্দেশ্য যদি নেতা ও শাসক বুঝানো হয়ে থাকে তাহলে অন্যকে এ দায়িত্ব অর্পণ করা ঠিক হয় নি। আর সতর্কতার নীতির দাবী হচ্ছে দু টি পন্থার যেটিতে ঝুঁকি নেই সেটি অনুসরণ করতে হবে।

ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে মতপার্থক্য

শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে সকল মুসলমানই শেষ যমানায় রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর বংশে হযরত ইমাম মাহ্দীর (আঃ) আবির্ভাব বা আত্মপ্রকাশ ও বিশ্ব ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার ধারণা পোষণ করে। কিন্তু এতদসংক্রান্ত কতক বিষয়ে উভয় ধারার মতের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

আল্লাহ্ তা আলা কর্তৃক মনোনীত বারো জন ইমামের ধারণা পোষণকারী শিয়া ধারার মতে , হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ) হলেন এ বারো জন ইমামের মধ্যকার সর্বশেষ ইমাম ; তিনি এখন থেকে পৌনে বারশ বছর আগে (হিজরী ২৫৫ সালে) জন্মগ্রহণ করেছেন এবং পাঁচ বছর বয়স থেকে আত্মগোপন করে আছেন ; আল্লাহ্ তাঁকে দীর্ঘজীবী করেছেন এবং যথাযথ ক্ষেত্র প্রস্তুত হবার পর তিনি আত্মপ্রকাশ করবেন। কিন্তু সুন্নী ধারার মতে , হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ) এখনো জন্মগ্রহণ করেন নি।

অনেক সময় , কারো পক্ষে হাজার বছরেরও বেশীকাল আয়ুর অধিকারী হওয়া সম্ভব কিনা - এ প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে এ প্রশ্ন গুরুত্ব বহন করে না। কারণ , এটা সম্ভব হতেই পারে ; ইতিহাসে এর চেয়েও দীর্ঘজীবী ব্যক্তিদের কথা উল্লিখিত আছে। হযরত নূহ্ (আঃ) কমবেশী হাজার বছর বেঁচে ছিলেন। হযরত খিযির্ (আঃ) এখনো বেঁচে আছেন বলে ইসলামের সকল ধারার অনুসারীদের বিশ্বাস - যার মানে তিনি তিন হাজার বছরেরও বেশীকাল যাবত বেঁচে আছেন।

অতএব , হযরত ইমাম হাসান্ আসকারী (আঃ)-এর পুত্র ইমাম মাহ্দী কিনা - এটাই পর্যালোচনার বিষয় ; তিনি ইমাম মাহ্দী হলে আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর হাজার বছরের বেশীকাল বেঁচে থাকা ও প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে সমাজে অবস্থান করা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। তবে তিনিই ইমাম মাহ্দী কিনা - এটা সম্পূর্ণই সংশ্লিষ্ট হাদীছ সমূহের পর্যালোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। এ ব্যাপারে বিচারবুদ্ধি স্বাধীনভাবে কোনো রায় দিতে পারে না , সংশ্লিষ্ট হাদীছ সমূহ পর্যালোচনার কাজে সাহায্য করতে পারে মাত্র।

তবে এ ব্যাপারে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই যে , মুসলমানদের দু টি প্রধান ধারার মধ্যে শিয়া ধারার মতে , হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ) শৈশবে - পাঁচ বছর বয়সে তাঁর পিতার ইন্তেকালের সাথে সাথেই আত্মগোপন করেন এবং পরবর্তী ষাট বছর তাঁর পিতার চারজন ঘনিষ্ঠ শিষ্যের মাধ্যমে বাইরের লোকদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং এদের মধ্যকার সর্বশেষ ব্যক্তির ইন্তেকালের পর তিনি স্বীয় পরিচিতি সহকারে বাইরের লোকদের সাথে আর যোগাযোগ রাখেন না যদিও তিনি সমাজে স্বীয় মতামত পেশ করে থাকেন। তাই পঁয়ষট্টি বছর বয়সের পর থেকে আত্মপ্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর জীবনকালের ইতিহাস অজ্ঞাত রয়েছে এবং থাকবে।

আক্বীদাহ্ অনুযায়ী হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ) তাঁর প্রকৃত পরিচয় গোপন করে সমাজে বিচরণ করায় তাঁকে কেউ না চেনার কারণে তাঁর আনুষ্ঠানিক আবির্ভাবের পূর্বে তাঁকে গ্রহণ করা বা না করা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিচ্ছে না।

অন্যদিকে সুন্নী ধারার মতে , হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ) এখনো জন্মগ্রহণ করেন নি। কিন্তু তিনি যখন জন্মগ্রহণ করবেন তখন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের দাবীদার হবার তথা পারিভাষিক অর্থে আবির্ভাবের বা আত্মপ্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর জীবন কেমন হবে সে সম্পর্কে এ ধারার হাদীছ সমূহে কোনো বক্তব্য নেই। এ থেকেও তাঁর আত্মগোপন -এর একটি পরোক্ষ ধারণা পাওয়া যায় , যদিও তা থেকে তাঁর জন্মকাল সম্বন্ধে কোনো ধারণা করা সম্ভব নয় ।

ইমাম মাহ্দী (আঃ) সম্পর্কে উভয় ধারার তথ্যসূত্রাদি থেকে একটি বিষয় সুস্পষ্ট যে , তাঁকে গ্রহণ করা বা না করার প্রশ্নটি তাঁর আনুষ্ঠানিক আবির্ভাবের পরেই দেখা দেবে , তার আগে নয়। আর তাঁর গুণাবলী ও আবির্ভাব-পরবর্তী কর্মতৎপরতা সম্বন্ধে উভয় ধারার বর্ণনায় উল্লেখ করার মতো বড় ধরনের কোনো পার্থক্য নেই। ফলে হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছেন অথবা করবেন এ সম্পর্কিত মতপার্থক্যের বিষয়টি বর্তমানে কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ; বর্তমানে বাস্তব জীবনে এ মতপার্থক্যের কোনো কার্যকরিতা নেই।

মানুষ বিশেষ পথনির্দেশের মুখাপেক্ষী

আমরা জানি যে , মানুষ অন্যান্য প্রাণী প্রজাতির ন্যায় বেঁচে থাকা ও বিকাশের জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত সহজাত পথনির্দেশের অধিকারী। এছাড়াও ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের জ্ঞানও সে সহজাত পথনির্দেশের মাধ্যমে পেয়ে থাকে। কিন্তু মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীপ্রজাতির মধ্যকার একটি মৌলিক পার্থক্য এই যে , তার জন্য পথনির্দেশের ক্ষেত্র ও প্রয়োজন অনেক বেশী , কিন্তু সে অনুপাতে তার প্রাপ্ত সহজাত পথনির্দেশের পরিমাণ ও মাত্রা অপেক্ষাকৃত কম। তবে সহজাত পথনির্দেশ বিহীন এই ক্ষেত্রগুলোতে পথনির্দেশ গ্রহণের জন্য তার মধ্যে বিরাট সম্ভাবনা নিহিত রাখা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ , বাবুই পাখীর আশ্রয়ের জন্য যে ধরনের গৃহের (বাসার) প্রয়োজন সহজাতভাবেই সে তা তৈরীর জ্ঞানের অধিকারী। এ ক্ষেত্রে কোনো বাবুই পাখীই ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু মানবসন্তান সহজাতভাবে এরূপ বা অন্য কোনো ধরনের একটি শিল্পগুণ সমৃদ্ধ বাসগৃহ তৈরীর সহজাত জ্ঞানের অধিকারী নয়। তবে তার মধ্যে বিভিন্ন ও বিচিত্র ধরনের গৃহ নির্মাণের কৌশল আয়ত্ত করার সম্ভাবনা (প্রতিভা) নিহিত রয়েছে। সে গৃহনির্মাণের কৌশল শিক্ষা করে এবং বিচিত্র ধরনের গৃহ তৈরী করে ; বাবুই পাখীর মতো শুধু এক ধরনের গৃহ নির্মাণ করে না। অন্যদিকে গৃহনির্মাণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে সব বাবুই পাখী অভিন্ন হলেও এ ক্ষেত্রে সকল মানুষ সমান নয়। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ধরনের গৃহ নির্মাণ করতে সক্ষম ; সকলে সকল ধরনের গৃহ নির্মাণ করতে সক্ষম নয়। অন্যান্য শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই কথা।

এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় এই যে , মানুষ তার মধ্যে নিহিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা করে এবং আগ্রহ , ঝোঁকপ্রবণতা , মনোযোগ , নিষ্ঠা ও সুযোগ-সুবিধার পার্থক্যের কারণে এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন লোকের মধ্যে পার্থক্য ঘটে থাকে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে , যে কোনো শিল্প বা জ্ঞানের প্রথম উদ্ভাবক অন্য কোনো মানুষের কাছ থেকে তা শিখে নি। তাহলে সে তা পেলো কোথায় ? এ ক্ষেত্রে সে দু টি সূত্র থেকে তা পেতে পারে: হয় বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে চিন্তাগবেষণার মাধ্যমে , নয়তো সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত পথনির্দেশের মাধ্যমে। দ্বিতীয়োক্ত ক্ষেত্রে অনেক সময় সে বুঝতেও পারে না যে , সে সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে পথনির্দেশ পাচ্ছে।

মানব জাতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও আবিষ্কার-উদ্ভাবনের সূচনার ইতিহাস হচ্ছে এরূপ যে , ব্যক্তি তা স্বপ্নে দেখেছে অথবা সহসাই তার মনে বিষয়টি খেলে গেছে - যার পিছনে কোনো পার্থিব কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় তা যে সৃষ্টিকর্তার পথনির্দেশ তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় এই যে , এ ধরনের পথনির্দেশ সকল মানুষের কাছে আসে না। একেকটি বিষয়ের পথনির্দেশ একজন বা দু জন লাভ করেন এবং তারা তা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেন। এভাবে গোটা মানবজাতি তা থেকে উপকৃত হতে পারে।

বস্তুতঃ একেকটি বিষয়বস্তুর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই এরূপ ঘটে থাকে। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের নিকট এ ধরনের পথনির্দেশ আসা যরূরী নয় ; একজনের কাছে আসা এবং অন্যদের তার কাছ থেকে শিখে নেয়াই যথেষ্ট। অন্যথায় প্রতিটি মানুষকে এ ধরনের পথনির্দেশ দেয়া হলে প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে অনাগত ভবিষ্যতের শেষ মানুষটি পর্যন্ত প্রত্যেকের নিকটই সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আবিষ্কার-উদ্ভাবনের পথনির্দেশ আসতে হতো। তাহলে আর একে জ্ঞান-বিজ্ঞান বা আবিষ্কার-উদ্ভাবন বলা যেতো না , বরং বলতে হতো সহজাত জ্ঞান। সে ক্ষেত্রে মানবজাতির সদস্যদের মধ্যে জ্ঞানসাধনা ও অধ্যবসায় বলতে কিছু থাকতো না ; তাদের কাজের মধ্যে তেমন কোনো বৈচিত্র্যও থাকতো না। তাদের ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে তেমন কোনো গুণগত পার্থক্য থাকতো না। কারণ , সে ক্ষেত্রে , বিশেষ অর্থে মানুষ যে স্বাধীনতার অধিকারী , তার তা থাকতো না। তার স্বাধীনতা হতো পশুপাখীর স্বাধীনতার সমতুল্য। সে পরিণত হতো জৈবিক যন্ত্রে। এ অবস্থায় মেধা-প্রতিভা , জ্ঞান , জ্ঞানের বিকাশ , জ্ঞানচর্চা , অধ্যবসায় ইত্যাদি বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকতো না।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা এ উপসংহারে উপনীত হতে পারি যে , মানবপ্রজাতি যে সর্বজনীন সহজাত পথনির্দেশের অধিকারী তার বাইরে মানবজীবনের এমন সব ক্ষেত্র রয়েছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং যে জন্য পথনির্দেশের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এ পথনির্দেশ সর্বজনীন হওয়া প্রয়োজন বা বাঞ্ছনীয় নয়। বরং এটাই স্বাভাবিক যে , কিছু লোক এ ধরনের পথনির্দেশ লাভ করবেন এবং অন্যদেরকে তা পৌঁছে দেবেন বা শিক্ষা দেবেন।

মানুষের জন্য এ ধরনের বিশেষ পথনির্দেশের প্রয়োজন কেবল শিল্প , বস্তুবিজ্ঞান ও তদসংক্রান্ত আবিষ্কার-উদ্ভাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সামাজিক , রাজনৈতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে এর অধিকতর প্রয়োজন। বলা চলে যে , যদিও শিল্প , বস্তুবিজ্ঞান ও তদসংক্রান্ত আবিষ্কার-উদ্ভাবন সম্পর্কিত পথনির্দেশ খুবই কাম্য , তথাপি তা না পেলেও খুব বড় ধরনের ক্ষতি নেই। কারণ , মানুষ যদি বাড়ীঘর ও সভ্যতার উপকরণ নির্মাণ করতে না জানতো , চিকিৎসা শাস্ত্রের বিকাশ ঘটাতে না পারতো , শিল্প ও কলা সৃষ্টি করতে না পারতো , বরং বনে-জঙ্গলে , পাহাড়-পর্বতে , গাছের ডালে/ নীচে/ কোটরে বা পাহাড়ের গুহায় বসবাস করতো , বুনো ফল-শাকসব্জি ও কাঁচা মাছ-মাংস খেতো এবং রোদ-বৃষ্টি , হিংস্র বন্য প্রাণী ও রোগব্যাধির কারণে স্বল্পজীবী হতো ; তাতে তার তেমন কোনো ক্ষতি হতো না। কারণ , শেষ পর্যন্ত তো তাকে মৃত্যুবরণ করতেই হয়। অতএব , তার আয়ু বিশ বছর , নাকি বিশ হাজার বছর তাতে তেমন কোনো পার্থক্য হতো না।

কিন্তু মানুষ যখন জানে যে , তার জন্য মৃত্যুর পরে এক অনন্ত জীবন অপেক্ষা করছে যেখানে তাকে ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পরিপূর্ণ প্রতিফল ভোগ করতে হবে , তখন তার জন্য সামষ্টিক জীবনে সঠিক আচরণ তথা অন্যদের অধিকার বিনষ্ট না করা , বরং তার ওপর অন্যদের যে অধিকার রয়েছে তা যথাযথভাবে আদায় করা অপরিহার্য। কিন্তু এ ব্যাপারে তার মধ্যে যে সহজাত পথনির্দেশ রয়েছে তাকে সে যথেষ্ট মনে করে না।

মানুষের এ বিশেষ পথনির্দেশের প্রয়োজনীয়তা কতোগুলো ক্ষেত্রে খুবই প্রকট হয়ে ধরা পড়ে। যেমন: মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। প্রকৃতিতে পান ও ভক্ষণের উপযোগী অনেক কিছু রয়েছে এবং মানুষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে প্রাকৃতিক উপাদানের দ্বারা নতুন নতুন কৃত্রিম বা যৌগিক খাদ্য-পানীয় প্রস্তুত করতে পারে। কিন্তু কতক খাদ্য-পানীয় তার শরীর , মন ও চরিত্রের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে এর ক্ষতিকারকতা অত্যন্ত দেরীতে প্রকাশ পেতে পারে এবং তার প্রভাব অত্যন্ত দীর্ঘ মেয়াদী , এমনকি পুরুষানুক্রমে বিস্তৃত হতে পারে। এসব ক্ষতিকারক খাদ্য-পানীয় ব্যক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার (অভিজ্ঞতার) মাধ্যমে চিহ্নিত করা খুবই ঝুঁকিবহুল ; এমনকি ঝুঁকি নিয়েও যথাসময়ে তা চিহ্নিত করা সম্ভব না-ও হতে পারে , বরং ঐ সব বস্তু ভক্ষণের ক্ষতি প্রকাশ পেতে বিলম্ব হওয়ায় ইতিমধ্যে আরো অনেকে তা পান বা ভক্ষণ করে বসতে পারে। অতএব , এরূপ ক্ষেত্রে বিশেষ পথনির্দেশের প্রয়োজন যাতে পথনির্দেশ লাভকারী ব্যক্তি অন্যদেরকে তা পৌঁছে দিতে পারেন।

দ্বিতীয়তঃ মানুষের স্বাধীনতার দাবী হচ্ছে পথনির্দেশ লঙ্ঘনের ক্ষমতার অধিকারী হওয়া এবং তার এরূপ ক্ষমতার অধিকারী হওয়া মানে তা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু এ ধরনের লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়ায় মানুষের বিচারবুদ্ধি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে , ফলে তার মধ্যকার সহজাত পথনির্দেশ , বিশেষতঃ ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দের অনুভূতি বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে ; অন্ততঃ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে তার জন্য এমন কোনো পথনির্দেশকের প্রয়োজন যার মধ্যে কোনো অবস্থায়ই ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের সহজাত অনুভূতি বিন্দু পরিমাণেও বিনষ্ট বা দুর্বল হবে না। এরূপ ব্যক্তি সৃষ্টকর্তা অপরিহার্য সত্তার কাছ থেকে পথনির্দেশ লাভ করবেন এবং তা অন্যদের নিকট পৌঁছে দেবেন।

তৃতীয়তঃ কারণ ও ফলশ্রুতি বিধির আওতাধীন জগতে মানুষ ক্ষেত্রবিশেষে এমন এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে পারে যে , সহজাত পথনির্দেশের ভিত্তিতে সে যে সব কর্তব্যবোধ অনুভব করে তার মধ্যকার দু টি কর্তব্যবোধ পরস্পরের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। এমতাবস্থায় সে বুঝতে পারছে না তার করণীয় কী। উদাহরণস্বরূপ , সহজাত পথনির্দেশের মাধ্যমে সে জানে যে , মিথ্যা বলা অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ। অন্যদিকে সে এ-ও জানে যে , কোনো যালেমকে সাহায্য করা বা সরাসরি সাহায্য না করলেও যার ফলে যালেমের জন্য যুলুম করার পথ খুলে যায় এমন কাজ সম্পাদন করা মস্ত বড় অন্যায়। একই সাথে , যে কোনো মূল্যে নিজেকে যুলুম-নির্যাতন ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য তার মধ্যে রয়েছে দুর্বার সহজাত আকাঙ্ক্ষা। এমতাবস্থায় , ধরা যাক , এক ব্যক্তি কোনো যালেমের দ্বারা তাড়িত হয়ে এসে এই ব্যক্তির গৃহে আত্মগোপন করলো। অতঃপর অচিরেই উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে একজন যালেম এসে তার কাছে জানতে চাইলো পলাতক ব্যক্তিকে দেখেছে কিনা। এ ক্ষেত্রে সে বুঝতে পারছে না , সত্য বলবে , নাকি মিথ্যা বলে মযলূম লোকটিকে বাঁচাবার চেষ্টা করবে , নাকি সত্য বলবে কিন্তু মযলূমকে যালেমের হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করে নিজের নিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখীন করবে। এমতাবস্থায় সে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে বিশেষ পথনির্দেশ কামনা করে।

চতুর্থতঃ মানুষ তার নিজের ও পারিপার্শ্বিক বিশ্বের পিছনে নিহিত বিস্ময়কর সৃষ্টিকুশলতা এবং সুশৃঙ্খল পরিচালনা লক্ষ্য করে সৃষ্টিকর্তার মহানত্ব ও মহত্ব স্মরণ করে বিস্ময়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়। সেই সাথে সে তার নিজের প্রতি স্রষ্টার সীমাহীন অনুগ্রহ দেখেও কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে দেয়। তার মন বলে , মহান সৃষ্টিকর্তা এ বিশ্বজগৎকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেন নি। নিঃসন্দেহে এর কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। তেমনি তার মতো বিস্ময়কর ও জটিল বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন প্রাণী সৃষ্টি এবং তার প্রতি এতো দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন , তার জন্মের আগে থেকেই মাতৃদুগ্ধ , স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা , খাদ্য-পানীয় , আলো-বাতাস ইত্যাদি প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। এ কোনো অর্থহীন বা উদ্দেশ্যহীন কাজ হতে পারে না। পরম জ্ঞানী স্রষ্টার পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যহীন কাজ হতে পারে না। তার মনে প্রশ্ন জাগে , কী সে উদ্দেশ্য ?

সে চিন্তা করে , স্রষ্টার সাথে তার সম্পর্ক কী ? তার নিকট স্রষ্টার কোনো দাবী আছে কি ? থাকলে কী সে দাবী ? কীভাবে সে দাবী পূরণ করতে হবে ? কীভাবে সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করা যাবে ? এ জন্যও সে সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে পথনির্দেশ কামনা করে। সে চায় , সৃষ্টিকর্তাই তাকে তাঁর পসন্দনীয় পথ দেখিয়ে দিন।

আইনপ্রণেতার প্রয়োজনীয়তা

মানুষ সামাজিক প্রাণী। কিন্তু পিপিলিকা বা মৌমাছির ন্যায় সামাজিক প্রাণীর জীবন থেকে মানুষের সামাজিক জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। অন্যান্য সামাজিক প্রাণীর সমাজবদ্ধতা সম্পূর্ণরূপে বা প্রায় সম্পূর্ণরূপে সহজাত পথনির্দেশের অধীন যার লঙ্ঘন তাদের পক্ষে সম্ভব নয় , বা একান্তই ব্যতিক্রম। ফলে ঐ সব প্রাণীর সামাজিক শৃঙ্খলা ও শাসন-প্রশাসনও সহজাত এবং জটিলতামুক্ত।

কিন্তু মানুষের সামাজিক জীবন পুরোপুরি সহজাত প্রবণতার অধীন নয়। মানুষের মধ্যে একদিকে যেমন সমাজবদ্ধ জীবনের সহজাত প্রবণতা রয়েছে , অন্যদিকে রয়েছে স্বাধীনতার সহজাত অনুভূতি। ফলে মানুষ চাইলে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন বা সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতেও সক্ষম। অন্যান্য সমাজবদ্ধ প্রাণীকুলের সমাজে শাসন-প্রশাসন এবং কর্মবিভাজনও সহজাত। ফলে সেখানে শাসন-প্রশাসন ও কর্মবিভাজন নিয়ে কোনোরূপ অসন্তোষ , বিরোধ , বিসম্বাদ ও বিদ্রোহের প্রশ্ন আসে না। (অবশ্য সর্বসাম্প্রতিক আবিষ্কার অনুযায়ী পিপিলিকা সমাজ ব্যতিক্রম ; সেখানে অসন্তোষ এবং বিদ্রোহ-ষড়যন্ত্রও আছে , তবে নিঃসন্দেহে মানব সমাজের পর্যায়ের নয়।) কিন্তু মানবসমাজে শাসন-প্রশাসন এবং কর্মবিভাজন ও ভালোমন্দ কর্মের প্রতিদান নিয়ে অহরহ মতপার্থক্য ও সংঘাত দেখা দেয়। তাই মতপার্থক্য ও সংঘাত এড়ানোর লক্ষ্যে মানুষের সমাজের জন্য আইন প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে , এ আইন প্রণয়ন করবে কে ? এ আইন প্রণয়নের দায়িত্ব যিনি বা যারা পালন করবেন তাঁকে বা তাঁদেরকে অবশ্যই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। নয়তো তাঁরা তাঁদের প্রণীত আইনের দ্বারা সমাজের অন্ততঃ কিছু মানুষকে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত করবেন।

মানুষের সমাজ পরিচালনার লক্ষ্যে যিনি একদিকে মানুষের জন্য কল্যাণকর , অন্যদিকে নির্ভুল ও ক্ষতিকারকতামুক্ত - এমন আইন , বিশেষতঃ মৌলিক আইন প্রণয়ন করতে চাইবেন তাঁর জন্য যে যোগ্যতা প্রয়োজন সংক্ষেপে তা হচ্ছে:

1) তাঁকে মানুষ বিষয়ক জ্ঞানের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ বিশেষজ্ঞ হতে হবে। অর্থাৎ তাঁকে মানুষের শরীর ও মনের ছোট-বড় সকল তথ্য , সকল বৈশিষ্ট্য ও রহস্য , তার সহজাত প্রবণতাসমূহ , আবেগ-উদ্দীপনা , আশা-আকাঙ্ক্ষা , সুপ্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তি এবং শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে খুটিনাটি সহ পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে।

2) তাঁকে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সব রকমের সম্ভাব্য পারস্পরিক সম্পর্ক ও তা থেকে সমাজে যে সব পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়া সম্ভব এবং মানুষের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্বন্ধে পুরোপুরি ওয়াকিফহাল হতে হবে।

3) ব্যক্তি-মানুষের ও মানব সমাজের মধ্যে যে সব প্রতিভা ও সম্ভাবনা এবং পূর্ণতার বীজ সুপ্ত বা লুক্কায়িত রয়েছে সে সম্বন্ধে তাঁর পুরোপুরি জানা থাকতে হবে।

4) নিকট ও দূর ভবিষ্যতে মানবসমাজে যে সব ঘটনা সংঘটিত হবার সম্ভাবনা আছে এবং তা ব্যক্তি ও সমাজের ওপর কী ধরনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে সে সম্পর্কে তাঁর জানা থাকতে হবে।

5) যে সব নীতি অনুসরণ করে মানুষের পক্ষে পূর্ণতায় উপনীত হওয়া সম্ভব তার সব কিছু সম্বন্ধে এবং যে সব নীতি তার পূর্ণতায় উপনীত হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে সে সম্বন্ধেও তাঁকে ওয়াকিফহাল থাকতে হবে। তেমনি তাঁকে পূর্ণতা অভিমুখী বিভিন্ন পথের মধ্য থেকে নিকটতম পথ বেছে চিহ্নিত করা ও মানুষকে সেদিকে চালিত করার যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে।

6) সমাজে তাঁর এমন কোনো স্বার্থ থাকবে না যা আইন প্রণয়নকালে তাঁকে সমাজের বা সমাজের সদস্যদের একাংশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও স্বীয় স্বার্থ সংরক্ষণে প্ররোচিত করতে পারে ।

7) তাঁকে সকল প্রকার অপরাধপ্রবণতা এবং ভুল-ত্রুটি ও অপরাধের সম্ভাবনা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে হবে এবং ভাবাবেগ , অনুনয়-বিনয় ও তোষামোদীতে নরম না হওয়া ও কোনো রকম চাপের মুখে নতি স্বীকার না করার মতো দৃঢ়তার অধিকারী হতে হবে।

নিঃসন্দেহে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বিশেষ পথনির্দেশ ও জ্ঞান এবং তাঁর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সংরক্ষণের অধিকারী ব্যক্তি ছাড়া কারো পক্ষে এরূপ গুণের অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়।

স্রষ্টা মনোনীত পথনির্দেশক

বলা বাহুল্য যে , এ ধরনের পথনির্দেশ প্রত্যেকের নিকট আসার প্রয়োজন হয় না। কারণ , তাহলে তা হতো সহজাত পথনির্দেশ এবং তার ফলে মানুষের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যেতো। আর বাস্তব অভিজ্ঞতায় আমরা দেখতে পাই যে , আমাদের সকলের নিকট এ ধরনের পথনির্দেশ আসে নি। তাই কোনো জনগোষ্ঠীর উদ্দেশে এ ধরনের পথনির্দেশ পাঠাতে হলে তা দু একজনের নিকট আসাই যথেষ্ট - যারা তা অন্যদের নিকট পৌঁছে দেবেন। শুধু তা-ই নয় , তাঁরা লোকদেরকে তা শিক্ষা দেবেন এবং তদনুযায়ী চলতে সাহায্য করবেন।

এ ধরনের ব্যক্তিদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের মধ্যে বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্)-কে জাগ্রত ও শানিত করা এবং অসুস্থতা ও বিকৃতি থেকে সুস্থ ও মুক্ত করা , মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ , ন্যায়-অন্যায় ও ঔচিত্য-অনৌচিত্যের যে সহজাত পথনির্দেশ রয়েছে তাকে শক্তিশালী ও দ্বিধাদ্বন্দ্বমুক্ত করা , মানুষের বিচারবুদ্ধি যে সব বিষয়ে সঠিক ধারণায় পৌঁছতে সক্ষম নয় বা সঠিক ও ভুল সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে সক্ষম নয় সে সব বিষয়ে সঠিক পথনির্দেশ প্রদান করা এবং যারা সহজাত পথপ্রদর্শন লঙ্ঘন করে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে অথচ সঠিক পথে ফিরে আসতে চায় তাদেরকে হাত ধরে সঠিক পথে তুলে আনা ও সে পথে চলতে সহায়তা করা।

বিচারবুদ্ধির দাবী এই যে , এ ধরনের ব্যক্তি সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে শুধু পথনির্দেশই লাভ করবেন না , বরং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া ও যারা তা গ্রহণ করবে তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনার দায়িত্বও লাভ করবেন এবং সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর বিশেষ পথনির্দেশ লাভ ও দায়িত্ব প্রাপ্তির বিষয়টি তাঁর নিজের নিকট এমনভাবে সুস্পষ্ট থাকবে যে , এ ব্যাপারে তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা অস্পষ্টতা থাকবে না। এ কারণেই কোনো রকমের বিপদাপদ , এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও তাঁকে স্বীয় দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারবে না। তাঁর নিকট এ বিষয়ের সুস্পষ্টতা হতে হবে সাধারণ মানুষের নিকট পার্থিব বিষয়াদির সুস্পষ্টতারই অনুরূপ। অর্থাৎ তিনি পার্থিব জগতের পাশাপাশি ভিন্ন মাত্রার অপার্থিব জগতসমূহের সাথে , বিশেষতঃ সৃষ্টিকর্তার সাথে - পার্থিব জগতের সাথে আমাদের সম্পর্কের ন্যায় - সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীত সম্পর্কের অধিকারী হবেন।

এ ধরনের লোকদেরকে আরবী ভাষায় নবী , ও রাসূল , ফার্সী ভাষায় পায়াম্বার্ পয়গাম্বর এবং ইংরেজী ভাষায় প্রোফেট্ বলা হয় । অন্যান্য ভাষায়ও একই তাৎপর্য বুঝাবার জন্য তাদের নিজ নিজ বিশেষ পরিভাষা আছে বা উল্লিখিত পরিভাষাসমূহের কোনো কোনোটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যে ভাষায় যে পরিভাষাই ব্যবহৃত হোক না কেন , যুগে যুগে এ দায়িত্বের অধিকারী বহু ব্যক্তির আগমন ঘটে।

অবশ্য যে কোনো খাঁটি জিনিসের যেমন নকল থাকতে পারে তেমনি যুগে যুগ নবী-রাসূল হবার মিথ্যা দাবীদার লোকের আবির্ভাবও কম ঘটে নি। তাই এ দায়িত্ব লাভের দাবীদারদের দাবী অবশ্যই বিচারবুদ্ধির আলোকে পরীক্ষা করে নেয়া উচিত যাতে সত্য দাবীদার ও মিথ্যা দাবীদারদের মধ্যে পার্থক্য করা যায় এবং মিথ্যা দাবীদারদের প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকা ও সত্য দাবীদারদের অনুসরণ করা সম্ভবপর হয়।


20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35