জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা8%

জীবন জিজ্ঞাসা লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

জীবন জিজ্ঞাসা
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 58 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42096 / ডাউনলোড: 4626
সাইজ সাইজ সাইজ
জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাবপূর্ব দ্বীনী নেতৃত্ব

হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ) - তা তিনি জন্মগ্রহণ করে থাকুন বা না-ই করে থাকুন - আবির্ভূত না হওয়ায় বা আত্মপ্রকাশ না করায় এবং জনসমক্ষে উপস্থিত হয়ে নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্ব দাবী না করায় তাঁর নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্ব মেনে নেয়ার বিষয়টি বর্তমানে শিয়া-সুন্নী উভয়ের জন্য প্রায় অভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে। এমতাবস্থায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে চার খলীফাহ্ ও আহলে বাইতের ইমামগণ - উভয়ের অনুপস্থিতিতে আজকের দিনে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্বের প্রশ্নটির সমাধান কীভাবে করণীয়।

এ প্রশ্নটি তাত্ত্বিক ছাঁচে ফেলে উপস্থাপন করতে হলে বলতে হবে যে , আজকে সুন্নীদের সামনে প্রশ্ন: হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর অবর্তমানে উম্মাহর পথনির্দেশ , নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্বের দায়িত্ব ও অধিকার কা র ? তেমনি শিয়াদের সামনে প্রশ্ন: হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর অনুপস্থিতিকালে উম্মাহর পথনির্দেশ , নেতৃত্ব ও শাসন-কর্তৃত্বের দায়িত্ব ও অধিকার কা র ?এ প্রশ্নের জবাবে সুন্নীদের অনেকের মনে হতে পারে যে , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর অবর্তমানে উম্মাহর নেতৃত্বের দায়িত্ব চার খলীফাহর তথা চার খলীফাহ্ ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর পর্যায়ক্রমিক উত্তরাধিকারী। আবার কেউবা তাত্ত্বিকভাবে ছ্বাহাবী , তাবে ঈন্ ও তাবে তাবে ঈন্-কে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর পর্যায়ক্রমিক উত্তরাধিকারী বলে মনে করতে পারে। কিন্তু এ ধরনের জবাব উক্ত প্রশ্নের তাত্ত্বিক জবাব হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বরং এর জবাব হতে হবে একটি ব্যক্তিনিরপেক্ষ জবাব ; চার খলীফাহকে বাস্তব প্রায়োগিক ক্ষেত্রে উক্ত জবাবে প্রাপ্তব্য কাঠামোর আওতায় ফেলার চেষ্টা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়তঃ ছ্বাহাবী , তাবে ঈন্ বা তাবে তাবে ঈনের মতো সুনির্দিষ্ট কয়েকটি প্রজন্মের ব্যক্তিগণও এ প্রশ্নের জবাব হতে পারেন না। বরং এর জবাব হতে হবে এমন একটি তাত্ত্বিক জবাব যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য হবার উপযোগী - যে কাঠামোতে উক্ত তিনটি প্রজন্ম থেকেও উপযুক্ত নেতৃত্ব পাওয়া যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে বিচারবুদ্ধির রায় এই যে , যিনি বা যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের (ছ্বাঃ) আদেশ-নিষেধ ও পথনির্দেশ সম্বন্ধে তথা ইসলামের সকল দিক-বিভাগ সম্বন্ধে পুরোপুরি অবগত তিনি বা তাঁরাই উম্মাহকে নেতৃত্ব ও পথনির্দেশ দেবেন এবং উম্মাহর শাসনকর্তৃত্ব পরিচালনা করবেন ; এটা একই সাথে তাঁর বা তাঁদের কর্তব্য ও অধিকার দুইই। আর শিয়া মাযহাবের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে হযরত ইমাম মাহদী (আঃ)-এর আত্মগোপনে থাকার যুগে নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্বের প্রশ্নের জবাবও এটাই।

অবশ্য , ইতিপূর্বেও যেমন উল্লেখ করা হয়েছে , এ ধরনের ব্যক্তিকে বা ব্যক্তিবর্গকে উপরোক্ত ধরনের জ্ঞানগত যোগ্যতার অধিকারী হওয়ার পাশাপাশি আরো দু টি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে। একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে , তাঁকে বা তাঁদেরকে চিন্তা - চেতনায় , জীবন ও আচরণে এবং মানুষকে শিক্ষা ও পথনির্দেশ দানের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ভারসাম্যের অধিকারী হতে হবে ; এ ধরনের ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ চরমপন্থী ( ইফরাতী - extremist)ওহবেন না , শিথিলপন্থী ( তাফরীতী - liberal)ওহবেন না , বরং আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল ( ছ্বাঃ ) ও তাঁর আহলে বাইতের ইমামগণ ( আঃ ) যে বিষয়ের ওপর যতোটুকু গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি বা তাঁরা সে বিষয়ের ওপর ঠিক ততোটুকু গুরুত্ব আরোপ করবেন।

অপর বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে , তাঁকে বা তাঁদেরকে যুগসচেতন হতে হবে ; পরিস্থিতির দাবী অনুযায়ী উম্মাহকে নেতৃত্ব দানের মতো দূরদর্শিতা বা অন্তর্দৃষ্টি (বাছ্বীরাত্)-এর অধিকারী হতে হবে। ইতিপূর্বে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে , নবীর মাধ্যমে পথনির্দেশের প্রয়োজনীয়তা এখানেই নিহিত। নয়তো আল্লাহ্ তা আলা চাইলে ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁর পথনির্দেশসমূহ এমনভাবে পাঠাতে পারতেন যে সম্পর্কে কারো মনেই সন্দেহ সৃষ্টি হতো না। কিন্তু তার পরিবর্তে নবী-রাসূলগণের (আঃ) মাধ্যমে পথনির্দেশ পাঠানো হয় এবং তাঁরা পরিস্থিতি অনুযায়ী লোকদেরকে পরিচালনা করেন।

আমরা রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর জীবনে দেখতে পাই , তিনি মক্কায় তিন বছর গোপনে বাছাই করা লোকদের মধ্যে তাঁর আদর্শ প্রচার করেন এবং পরবর্তী দশ বছর প্রকাশ্যে প্রচারকার্য চালান। এ সময় তিনি কোনোরূপ সংঘাত বা প্রতিরোধের পন্থা অনুসরণ করেন নি ; যুলুম-অত্যাচার সহ্য করেছেন , কিন্তু প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করেন নি। এরপর তিনি দেশত্যাগ করে মদীনায় চলে যান। সেখানে অনুকূল পরিবেশ পেয়ে তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন ও ইয়াহূদীদের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন। মদীনার জীবনের দশ বছরে তিনি দ্বীন প্রচারের পাশাপাশি প্রশাসন গড়ে তোলেন এবং কূটনৈতিক তৎপরতাও চালান। এ সময় যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠায় তিনি একদিকে যেমন একাধিক বার যুদ্ধ করেন , তেমনি ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ বিবেচনায় যুদ্ধ এড়ানোর জন্য , দৃশ্যতঃ অপমানজনক শর্তাবলী সত্ত্বেও তিনি সন্ধি করেন (হুদায়বিয়ায়)। অর্থাৎ ইসলামী নেতৃত্বের জন্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে পদক্ষেপ গ্রহণের যোগ্যতা তথা দূরদর্শিতা একটি অপরিহার্য মৌলিক গুণ।

অতএব , যথাযথ ও পরিপূর্ণ দ্বীনী জ্ঞান , ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা-চেতনা , চরিত্র ও আচরণ এবং দূরদর্শিতা - এই তিনটি গুণের অধিকারী ব্যক্তিই ইসলামী নেতৃত্বের উপযুক্ত - ইসলামী পরিভাষায় যাকে যুগসচেতন ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নিষ্ঠাবান মুজতাহিদ বলা যেতে পারে। ইসলামী উম্মাহর নেতৃত্ব প্রদান এরূপ ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের শুধু অধিকারই নয় , দায়িত্বও বটে। কোরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে এরূপ ব্যক্তিদের মর্যাদার ওপর আলোকসম্পাৎ করা হয়েছে। অন্যদিকে শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে সকল মুসলমানের নিকট অভিন্নভাবে গ্রহণযোগ্য একটি হাদীছে বলা হয়েছে:

العلماء ورثة الانبياء

আলেমগণ নবীগণের উত্তরাধিকারী।

বলা বাহুল্য যে , এ হাদীছে আলেম বলতে বর্তমানে প্রচলিত অর্থে প্রথাগত বা প্রতিষ্ঠানিক আলেম বুঝানো হয় নি , বরং এমন ব্যক্তিদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা নবী না হয়েও নবীর গুণাবলী (জ্ঞান , আচরণ ও দূরদর্শিতা)-এর অধিকারী ; তাঁদের কাছে নতুন কোনো ওয়াহী নাযিল হয় না , কিন্তু তাঁরা মওজূদ ওয়াহীর পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। অন্যথায় তাঁদের পক্ষে নবীদের (আঃ) উত্তরাধিকারী হওয়া সম্ভব নয়। কারণ , নবীদের (আঃ) উত্তরাধিকারী হওয়া মানে নবীদের (আঃ) অবর্তমানে তাঁদের সকল দায়িত্ব পালন করা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে , এ ধরনের ব্যক্তিত্ব কীভাবে উম্মাহর নেতৃত্ব ও শাসনকর্তৃত্বের অধিকারী হবেন এবং উম্মাহর সাথে তাঁর বা তাঁদের সম্পর্ক কেমন হবে ?

বলা বাহুল্য যে , একজন নবীকে যেভাবে বিচারবুদ্ধি দ্বারা চিনে নিতে হয় সেভাবেই নবীর (ও নিষ্পাপ ইমামের) উত্তরাধিকারী যুগসচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা-চরিত্রের অধিকারী মুজতাহিদকেও বিচারবুদ্ধি দ্বারা চিনে নেয়া অপরিহার্য। বিচারবুদ্ধির আলোকে বিশ্লেষণ করে কারো নবী হবার ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পর তাঁকে গ্রহণ ও আশ্রয় করার নামই নবীর প্রতি ঈমান। অন্ধ বিশ্বাসের দ্বারা এ ঈমান হাছ্বিল হয় না। কারণ , অন্ধ বিশ্বাস এমন এক কর্মপদ্ধতি যার আশ্রয় নিলে ঘটনাক্রমে যেমন প্রকৃত নবীকে নবী বলে মেনে নেয়া ও আশ্রয় করা হতে পারে , তেমনি ভণ্ড নবীকেও নবী বলে মেনে নেয়া ও আশ্রয় করা হতে পারে - যার পরিণতি ব্যক্তি ও সমাজের ইহ-পরকালের জন্য , অন্ততঃ পরকালের জন্য , অত্যন্ত মারাত্মক।

একইভাবে কোনো ব্যক্তি প্রকৃতই নবীদের (আঃ) , এবং শিয়া মাযহাবের মতে , নবীদের (আঃ) ও একই সাথে নিষ্পাপ ইমামের (আঃ) , উত্তরাধিকারী হবার যোগ্যতাসম্পন্ন কিনা সে ব্যাপারে বিচারবুদ্ধির আলোকে যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হওয়ার পরেই তাঁকে আশ্রয় করতে হবে এবং তাঁর সমস্ত আদেশ-নিষেধ ও পথনির্দেশ মেনে চলতে হবে ; প্রয়োজনে তাঁর আদেশে ধন-সম্পদ , স্বজনসম্পর্ক , এমনকি জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হবে। অর্থাৎ ব্যক্তির ওপর নবীর যে অধিকার আছে , নবীর উত্তরাধিকারীরও তদনুরূপ অধিকার আছে।

কাউকে প্রকৃত ওয়ারেছে নবী (নবীর উত্তরাধিকারী) জানার পর তাঁকে গ্রহণ না করা বা তাঁর কথা অমান্য করা এবং নবীকে গ্রহণ না করা ও তাঁর কথা অমান্য করার মধ্যে কার্যতঃ কোনো পার্থক্য নেই। এ কারণে ওয়ারেছে নবীকে অবশ্যই বিচারবুদ্ধি দ্বারা চিহ্নিত করে গ্রহণ করতে হবে। এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্ধ বিশ্বাস ও অন্যের অন্ধ অনুসরণ অত্যন্ত ঝুঁকিবহুল কর্মনীতি। কারণ , এ ক্ষেত্রে স্বার্থান্বেষী ভণ্ড-প্রতারকের খপ্পরে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। বলা বাহুল্য যে , এরূপ প্রতারকের খপ্পরে পড়লে ব্যক্তির ইহকাল ও পরকাল উভয়ই , অন্ততঃ পরকাল ধ্বংস হওয়া অনিবার্য।

এ আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে , ব্যক্তির জন্য নবীর অবর্তমানে নবীর উত্তরাধিকারীর অনুসরণ অপরিহার্য। অতএব , তাকে অবশ্যই উপরোক্ত শর্তাবলী বিশিষ্ট মুজতাহিদের সন্ধান করতে হবে এবং পাওয়া মাত্রই তাঁকে আশ্রয় করতে হবে। মুসলিম সমাজের জন্য এরূপ কোনো না কোনা মুজতাহিদের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে ফরযে কেফায়ী। অর্থাৎ উম্মাহর মধ্যে কমপক্ষে একজন অনুসরণযোগ্য মুজতাহিদ থাকতেই হবে , না থাকলে গোটা উম্মাহ্ই এক অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কবলে নিক্ষিপ্ত হবে। ব্যক্তি যদি এ ধরনের কোনো অনুসরণযোগ্য মুজতাহিদ খুঁজে না পায় তাহলে তার জন্য স্বয়ং মুজতাহিদ হওয়ার চেষ্টা করা বা সমাজে যাতে কমপক্ষে একজন মুজতাহিদ তৈরী হতে পারেন এ জন্য একটি প্রক্রিয়ার সূচনা করা অপরিহার্য কর্তব্য।

নবীর উত্তরাধিকারিত্ব প্রসঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন এই যে , রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পরে [শিয়া মাযহাব অনুযায়ী হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আত্মগোপনের পরে] নবীগণের (আঃ) উত্তরাধিকারী অভিন্ন সময়ে একজন হওয়া অপরিহার্য , নাকি একাধিক হতে পারেন ? এ প্রশ্নের জবাব হচ্ছে এই যে , একজনও হতে পারেন , একাধিক হতেও বাধা নেই।

অতীতে একই সময় বিশ্বের বুকে একাধিক নবী (আঃ) থাকার বিষয়টি একটি প্রমাণিত বিষয়। শুধু এক নবীর সহযোগী অন্য নবীই ছিলেন না , বরং একই সময় বিভিন্ন ভূখণ্ডে স্বতন্ত্রভাবে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক নবীর দৃষ্টান্তও রয়েছে । যেমন: হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত লূত্ব (আঃ) , হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও হযরত ইসহাক (আঃ) এবং হযরত শু আইব (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ) । দ্বিতীয়তঃ পূর্বোক্ত হাদীছে আলেম ও উত্তরাধিকারী উভয় ক্ষেত্রেই বহুবচন ব্যবহৃত হয়েছে।

এছাড়াও আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত অনেক হাদীছের তাৎপর্য অনুযায়ী আলেমগণ রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর প্রতিনিধি (নায়েবে নবী)। অন্যদিকে শিয়া মাযহাবের বিভিন্ন হাদীছ অনুযায়ীও হাদীছ বর্ণনাকারীগণ তথা ওলামায়ে কেরাম হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর ও নিষ্পাপ ইমামগণের (আঃ) প্রতিনিধি। অন্যদিকে রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। দ্বীন প্রচার ও শিক্ষাদান , কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা , যুদ্ধ ও শাসনকার্য ইত্যাদি সব কিছুই ছিলো তাঁদের দায়িত্ব। কখনো একজন প্রতিনিধির ওপর একটি দায়িত্ব অর্পিত থাকতো , কখনো একাধিক বা সবগুলো দায়িত্ব অর্পিত হতো। মোদ্দা কথা , একই সময় তাঁর একাধিক প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁরা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর নিকট থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও দিকনির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতেন এবং কোনো ক্ষেত্রে নতুন সমস্যার সম্মুখীন হলে উক্ত শিক্ষা ও দিকনির্দেশের আলোকে বিচারবুদ্ধির সাহায্যে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করে সমাধানে উপনীত হতেন অথবা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর নিকট এসে সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান জেনে নিতেন।

বস্তুতঃ হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর পক্ষ থেকে কোথাও প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরিত কোনো ছ্বাহাবী যখন তাঁর কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও দিকনির্দেশের আলোকে বিচারবুদ্ধির সাহায্যে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করে কোনো সমস্যার সমাধানে উপনীত হতেন তা ছিলো এক ধরনের ইজতিহাদ।

হযরত রাসূলে আকরাম ( ছ্বাঃ )- এর জীবদ্দশায় কতক ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থানস্থল থেকে স্থানগত ব্যবধানের কারণে এবং যোগাযোগ যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সরাসরি তাঁর নিকট থেকে কোনো প্রশ্নের জবাব জানার সুযোগ না থাকায় তাঁর কতক প্রতিনিধি যেভাবে কোরআন মজীদ ও তাঁর দিকনির্দেশের আলোকে চিন্তা - গবেষণা করে কোনো সমস্যার সমাধান উদ্ভাবন করতেন , তাঁর ইন্তেকালের পর কালগত ব্যবধানে অবস্থানকারী মুজতাহিদগণও একই পন্থায় , বরং অধিকতর সুবিন্যস্ত ( systematic)পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে , সমস্যাবলীর সমাধান উদ্ভাবন করে থাকেন।

প্রকৃত পক্ষে মুজতাহিদের কাজ হচ্ছে এ দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা করা যে , স্বয়ং নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর নিকট (এবং শিয়া মতে , সেই সাথে নিষ্পাপ ইমামের কাছে) এ প্রশ্ন করা হলে তাঁর পক্ষ থেকে কী উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো ? অর্থাৎ মুজতাহিদের কাজ নিজের পক্ষ থেকে মনগড়া সমাধান পেশ করা নয় , বরং হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর প্রদত্ত সমাধান চিহ্নিত করা বা তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া হতে পারতো এমন সম্ভাব্য সমাধান উদ্ঘাটন করা। আর যেহেতু হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর জীবদ্দশায় একই সময় তাঁর একাধিক প্রতিনিধি ছিলেন সেহেতু তাঁর ইন্তেকালের পরে একই সময় একাধিক ওয়ারেছে নবী থাকায় কোনোই বাধা নেই।

আমাদের এ আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে , নবীর প্রতিনিধিত্ব বা উত্তরাধিকারিত্বের বিষয়টি নবুওয়াতের কর্মগত (ওয়াহী আগমনগত নয়) সম্প্রসারণ ও ধারাবাহিকতা মাত্র। অর্থাৎ হযরত নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর জীবদ্দশায় তাঁর মনোনীত প্রতিনিধির যে দায়িত্ব-কর্তব্য ও অধিকার-মর্যাদা ছিলো , তাঁর ইন্তেকালের পরে তাঁর উত্তরাধিকারী (যথাযথ শর্তাবলীর অধিকারী মুজতাহিদ)-এর দায়িত্ব-কর্তব্য ও অধিকার-মর্যাদা তা-ই। অতএব , হযরত নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর জীবদ্দশায় কোনো ব্যক্তিকে তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে জানার পরে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও তাঁকে অমান্য করা যেরূপ স্বয়ং হযরত নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর প্রতি আনুগত্য ও তাঁকে অমান্য করার সমার্থক ছিলো , তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর উত্তরাধিকারী যথাযথ শর্তাবলীর অধিকারী মুজতাহিদ হিসেবে কারো ব্যাপারে প্রত্যয় সৃষ্টি হবার পর তাঁর আনুগত্য ও তাঁকে অমান্য করা প্রত্যয়ের অধিকারী ঐ ব্যক্তির জন্য অনুরূপভাবে হযরত নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর আনুগত্য ও তাঁকে অমান্য করার সমার্থক বলে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

বলা বাহুল্য যে , কোনো ব্যক্তি যদি কারো ব্যাপারেই ওয়ারেছে নবী বলে প্রত্যয়ের অধিকারী হতে না পারে , সে ক্ষেত্রেও সে এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে না। কারণ , সে ক্ষেত্রে তাকে দুনিয়ার অপর কোনো প্রান্তে গিয়ে হলেও এরূপ ওয়ারেছে নবী খুঁজে পাবার চেষ্টা করতে হবে , অথবা নিজে ওয়ারেছে নবী হবার জন্য প্রয়োজনীয় চেষ্টাসাধনা ও অধ্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করতে হবে অথবা সমাজে যাতে এরূপ কোনো ওয়ারেছে নবী গড়ে উঠতে পারে সে জন্যে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে বা এরূপ প্রক্রিয়া বিদ্যমান থাকলে তাতে সম্ভব সব রকম সহায়তা প্রদান করতে হবে।

যথাযথ শর্তাবলীর অধিকারী মুজতাহিদ-নেতৃত্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে যখন যে ধরনের সম্পর্ক ও আচরণ নির্ধারণ করে দেবেন তাঁর অনুসারীদের জন্য তখন সে ধরনের সম্পর্ক রক্ষা ও আচরণ করা অপরিহার্য হবে। আর তিনি যদি পরিস্থিতি উপযুক্ত বিবেচনা করে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তগত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন তাঁর অনুসারীদের জন্য তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং এ জন্য তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী যে কোনো ত্যাগ স্বীকার অপরিহার্য হবে। তিনি কোন্ পদ্ধতিতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তগত করার চেষ্টা করবেন পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি নিজেই তা নির্ধারণ করবেন ; এ ব্যাপারে তিনি কোনো ধরাবাঁধা নিয়মের অনুসরণ করতে বাধ্য নন।

একই সময় বিশ্বের বিভিন্ন অংশে একাধিক মুজতাহিদ নেতৃত্ব কর্তৃক একাধিক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা নেই , আবার তাঁরা যদি প্রয়োজন বা উত্তম মনে করেন তো এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়ও বাধা নেই। অবশ্য কাছাকাছি অবস্থানরত একাধিক মুজতাহিদের পক্ষে ভৌগোলিক কারণে একাধিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বিধায় তাঁদের জন্য একটিমাত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া গত্যন্তর নেই। যেমন: একই শহরে অবস্থানরত একাধিক মুজতাহিদ-নেতৃত্ব - যাদের অনুসারীরা স্বতন্ত্র এলাকাসমূহে বসবাস করে না , বরং সকল এলাকায় মিশ্রিত অবস্থায় বসবাস করে , তাঁদের প্রত্যেকেই ওয়ারেছে নবীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থেকেই নিজেদের মধ্য থেকে কাউকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর ক্ষমতা ও এখ্তিয়ার , রাষ্ট্রশাসন পদ্ধতি এবং তার ক্ষমতার মেয়াদকাল তাঁরা মতৈক্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করে দেবেন। তিনি দেশ শাসনের ব্যাপারে তাঁদের পরামর্শ মেনে চলতে বাধ্য থাকবেন এবং তিনি শারীরিক , মানসিক , নৈতিক বা রাজনৈতিক যোগ্যতা হারিয়েছেন বলে মনে করলে তাঁরা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবেন। কারণ , তাঁদের প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর উত্তরাধিকারী ও প্রতিনিধি এবং নতুন ওয়াহী প্রাপ্তি ছাড়া রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর সকল দায়িত্ব-কর্তব্য ও অধিকার-মর্যাদা-এখতিয়ারের অধিকারী। তাঁরা তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারের একটি অংশ সমঝোতার ভিত্তিতে আমানত স্বরূপ একজনের ওপর অর্পণ করেছেন মাত্র যা তাঁরা ফিরিয়ে নেয়ার অধিকারও রাখেন।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , কেউ কেউ মনে করেন , কাউকে দ্বীনী নেতা বা দ্বীনী শাসক হিসেবে কবূল করে শপথ গ্রহণ করলে অতঃপর আর তা প্রত্যাহার করার সুযোগ থাকে না বা তিনি যতোদিন জীবিত থাকবেন ততোদিন পর্যন্ত তাঁর অনুকূলে শপথ গ্রহণকারীদের জন্য তাঁর পরিবর্তে অন্য কাউকে নেতারূপে গ্রহণ করা বৈধ হবে না। কিন্তু তাঁদের এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ , ওয়ারেছে নবী বা নায়েবে নবী কোনো নবী নন এবং তাঁর গুনাহ্ ও ভুল থেকে বেঁচে থাকা নবীর মতো (শিয়া মাযহাবের মতে , নবী ও ইমামের মতো) নিশ্চিত নয়। বরং শব্দ সহযোগে উল্লেখ করা হোক বা না-ই হোক , এ ধরনের নেতার ওপর নেতৃত্ব অর্পণ ও তাঁর অনুকূলে শপথ গ্রহণ হয় শর্তাধীন এবং যতোক্ষণ তাঁর মধ্যে সংশ্লিষ্ট সকল শর্ত বিদ্যমান থাকে ততোক্ষণই তিনি আনুগত্যের উপযুক্ত থাকেন।

দু টি কারণে তাঁর ওপর নেতৃত্ব অর্পণ ও তাঁর অনুকূলে আনুগত্য-শপথ শর্তাধীন।

প্রথমতঃ তাঁকে চিহ্নিত করা হয় শুধু বাহ্যিক অবস্থা বিবেচনা করে ; নবীর মতো মু জিযাহ্ তাঁর থাকে না এবং থাকা অপরিহার্যও নয়। তাছাড়া বাহ্যিক মানদণ্ডও তাঁর ও নবীর ক্ষেত্রে হুবহু এক নয়। যেমন: জীবনে কখনো কোনো পাপ না থাকা নবীর জন্য (এবং শিয়া মতে , ইমামের জন্যও) অপরিহার্য। কিন্তু নায়েবে নবী বা ওয়ারেছে নবীর জন্য এ শর্ত এরূপ কঠোর নয়। হতে পারে একজন মুজতাহিদের দ্বারা যৌবনে বা মুজতাহিদ হওয়ার আগে কোনো গুনাহ্ সংঘটিত হওয়ার বিষয় জানা আছে , কিন্তু মুজতাহিদ হবার পরে ও দীর্ঘ বহু বছর যাবত তাঁর মধ্যে অকাট্যভাবে গুনাহ্ বলে বিবেচিত কোনো দোষ দেখা যায় নি। এমতাবস্থায় ব্যক্তি ও সমষ্টি তাঁকে অনুসরণ করতে পারে এবং তাঁর অনুকূলে আনুগত্য-শপথ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর মধ্যে আরো এমন ধরনের দোষ ধরা পড়তে পারে যা আগেও ছিলো , কিন্তু আনুগত্যকারী ব্যক্তি তা লক্ষ্য করে নি , অথবা বিচারবুদ্ধির যে মানদণ্ডে বিচার করে ব্যক্তি বা সমষ্টি তাঁকে আনুগত্যের উপযুক্ত মনে করে তাঁর অনুকূলে শপথ গ্রহণ করেছিলো এখন দেখতে পাচ্ছে যে , সে মানদণ্ড যথেষ্ট ছিলো না এবং প্রকৃত পক্ষে ঐ ব্যক্তি আনুগত্যের উপযুক্ত ছিলেন না।

দ্বিতীয়তঃ হতে পারে যে , ব্যক্তি বা সমষ্টি যার অনুকূলে আনুগত্য-শপথ গ্রহণ করেছিলো তিনি ঐ সময় যথাযথ শর্তের অধিকারী ছিলেন , কিন্তু পরবর্তীকালে কোনো শর্ত হারিয়ে ফেলেছেন। আর যেহেতু তিনি নবী নন , এবং শিয়া মতে , নবী বা আল্লাহ্-মনোনীত ইমাম কোনোটাই নন , এ কারণে তিনি নবী বা ইমামের মতো পাপ ও ভুল থেকে খোদায়ী সংরক্ষণের অধিকারী নন , সেহেতু তাঁর যোগ্যতা হারানো অসম্ভব কিছু নয়। এমতাবস্থায় তাঁর প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখা মানে ব্যক্তিদের পরকালীন জীবনকে (এবং ক্ষেত্রবিশেষে ইহকালীন জীবনকেও) হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া।

অবশ্য কারো অনুকূলে আনুগত্য-শপথ গ্রহণ করা ও শপথ প্রত্যাহার করে নেয়া উভয়ই আন্তরিকভাবে (ইখ্লাছ্বের সাথে) যথার্থ মনে করে করতে হবে ; এর পিছনে কোনো পার্থিব স্বার্থ (যেমন: অর্থ , পদ , সম্মান , মর্যাদা বা সুযোগ-সুবিধা লাভ বা পার্থিব ঝুঁকি এড়ানো) থাকলে সে অবশ্যই আল্লাহ্ তা আলার নিকট অপরাধী বা কপটাচারী বলে পরিগণিত হবে , এমনকি তার সিদ্ধান্তটি (গ্রহণের বা বর্জনের) প্রকৃত পক্ষে সঠিক হলেও। আর ব্যক্তি যদি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে সে ক্ষেত্রে সাধ্যানুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য চেষ্টা করা সত্ত্বেও প্রকৃতই যদি সিদ্ধান্তটি ভুল হয় , তাতে পার্থিব ক্ষতি হলেও পরকালীন ক্ষতি থেকে সে আল্লাহ্ তা আলার অনুগ্রহমূলক সুরক্ষার অধিকারী হবে বলে আশা করা যায়।

অন্যদিকে কাউকে নেতৃত্ব অর্পণ বা তাঁর প্রতি আনুগত্য-শপথের বিষয়টি মূলগতভাবেই সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য হতে ইসলামের দৃষ্টিতে আপত্তির কোনো কারণ নেই। কারণ , যেহেতু নবীর উত্তরাধিকারী বা ওয়ারেছ নবী স্বয়ং নবীর মতো নিষ্পাপ বা নির্ভুল হবার নিশ্চয়তার অধিকারী নন , সেহেতু তাঁর প্রতি অন্যদের আজীবনের জন্য আনুগত্য তাঁর মধ্যে অহঙ্কারসহ অন্যবিধ বিচ্যুতি , এমনকি সীমালঙ্ঘনপ্রবণতা তৈরী করতে পারে। অন্যদিকে স্বয়ং হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) বিভিন্ন সময় যাদেরকে প্রতিনিধি নিয়োগ করেন তাঁদের প্রত্যেককেই স্থায়ীভাবে নিয়োগদান করেন নি। অতএব , নীতিগতভাবেই ওয়ারেছে নবী বা নায়েবে নবীর পদমর্যাদা কারো জন্য স্থায়ী হবেই এমন কোনো কথা নেই। বিশেষ করে স্বয়ং হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর মনোনয়নের তুলনায় মুসলমানদের নিজেদের মনোনয়ন দুর্বলতর হবার সম্ভাবনা বেশী। তাই নেতৃত্বের বিষয়টি সীমিত সময়ের জন্য ও শর্তাধীন হতে বাধা নেই।

নেতৃত্বের শর্তাধীনতার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই যে , মুজতাহিদগণ যে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর উত্তরাধিকারী ও প্রতিনিধি , তা তাঁর অবর্তমানে তাঁর সকল দায়িত্ব পালনের জন্য। কিন্তু তাঁরা নিজেদের মধ্য থেকে যাকে রাজনৈতিক নেতা বা রাষ্ট্রনেতা নির্বাচন করবেন , তাঁকে নির্বাচন করবেন কেবল রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের জন্য অর্থাৎ তাঁদের নেতৃত্বের রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় অংশটি তাঁরা এক ব্যক্তির ওপর অর্পণ করবেন এবং তিনি তা যথাযথভাবে পালন করেন কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন । এই অর্পণের ফলে তাঁদের নিজেদের উত্তরাধিকারিত্ব ও প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা রহিত হয়ে যাবে না। অতএব , রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বহির্ভূত বিষয়াদিতে যে সব গৌণ ক্ষেত্রে তাঁদের ভিন্ন মত রয়েছে সে সব ক্ষেত্রে তাঁদের প্রত্যেকের অনুসারীরা পূর্বের ন্যায়ই নিজ নিজ মুজতাহিদ-নেতার মতের অনুসরণ করবেন। এ সব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে উক্ত নেতার মত বা সংখ্যাগুরুর মত সকলের ওপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা বিশেষ জরুরী। তা হচ্ছে , অ-মুজতাহিদগণের জন্য সর্বাবস্থায়ই কোনো না কোনো জীবিত মুজতাহিদের অনুসরণ করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে কোনো মৃত মুজতাহিদের অনুসরণ করা যথেষ্ট নয়। কারণ , মৃত মুজতাহিদের পক্ষে যেমন নবজাগ্রত যুগজিজ্ঞাসার জবাব দেয়া সম্ভব নয় , তেমনি পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বা ভুল ধরা পড়ার কারণে ইতিপূর্বে প্রদত্ত স্বীয় রায় পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়।

একজন মুজতাহিদ যত উঁচু দরের মুজতাহিদই হন না কেন , যেহেতু তিনি নবী নন (শিয়া মতে , নবী বা ইমাম নন) , সেহেতু তাঁর ইজতিহাদে ভুল হতেই পারে এবং মৃত্যুর পূর্বে তাঁর নিজের কাছে সে ভুল ধরা না-ও পড়তে পারে। দ্বিতীয়তঃ কালগত সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে মৃত মুজতাহিদের অনুসরণ যদি যথেষ্ট হতো তাহলে ইজতিহাদ ও মুজতাহিদের আদৌ প্রয়োজন হতো না। কারণ , সে ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহ্ই যথেষ্ট হতো । কিন্তু যেহেতু স্থানগত ও কালগত ব্যবধানের কারণে কোরআন-হাদীছ থেকে সঠিক তাৎপর্য ও ফয়সালা বের করার জন্য ইজতিহাদ ও মুজতাহিদের প্রয়োজন রয়েছে , সেহেতু মৃত মুজতাহিদের প্রদত্ত রায়ের ভুল সংশোধন ও নবজাগ্রত যুগজিজ্ঞাসার জবাব উদ্ঘাটনের জন্য নতুন মুজতাহিদের প্রয়োজন রয়েছে। তাই যারা মুজতাহিদ নয় তাদের জন্য জীবিত মুজতাহিদের অনুসরণ করা অপরিহার্য ; তারা মৃত মুজতাহিদের ফয়সালা ততোটাই অনুসরণ করবে যতোটা জীবিত মুজতাহিদ অনুমোদন করবেন।

এখানে ইজতিহাদ-বিরোধীদের বক্তব্যের ওপর সংক্ষেপে হলেও আলোকপাত করা অপরিহার্য বলে মনে হয়।

বর্তমানে মুসলমানদের মধ্যে এমন কয়েকটি ধারা-উপধারার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় যারা ইজতিহাদকে শুধু অপ্রয়োজনীয় মনে করে না , বরং দ্বীন ও ঈমানের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করে। তাদের মধ্যকার কোনো কোনো দলের মতে , শুধু কোরআনের এবং অন্যদের মতে , কোরআন ও হাদীছের অনুসরণই যথেষ্ট এবং মুজতাহিদের ফয়সালা মেনে চলা মানে আল্লাহ্ তা আলা ও তাঁর রাসূলের (আঃ) সাথে সংশ্লিষ্ট মুজতাহিদগণকে শরীক করা।

তাদের এ ধরনের চরমপন্থী অভিমত মোটেই সঠিক নয়। কোরআন-হাদীছের বর্তমানে ইজতিহাদের প্রয়োজন কেন সে সম্পর্কে ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মুজতাহিদের কাজ হচ্ছে কোরআন-হাদীছের সঠিক তাৎপর্য উদ্ধার এবং হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর ও শিয়া মতে , সেই সাথে নিষ্পাপ ইমামের (আঃ) , তথা এক কথায় মা ছূমের (নিষ্পাপ ব্যক্তিত্বের) তথা বিধানদাতা বা শরীয়তদাতার (আল্লাহর) প্রকৃত ফয়সালা ও সম্ভাব্য ফয়সালা উদ্ঘাটন। [মা ছূমগণের (আঃ) ফয়সালাকে আল্লাহর ফয়সালা গণ্য করার কারণ , মা ছূমগণ নিজের পক্ষ থেকে মনগড়া কোনো কথা বলেন না , বরং আল্লাহ্ তা আলার ওয়াহীর ভিত্তিতে কথা বলেন বা ওয়াহীর সঠক ও নির্ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করেন।]

অতএব , এখানে আল্লাহ্ ও রাসূল (ছ্বাঃ)-এর সাথে শরীক করার প্রশ্নই ওঠে না। বিশেষ করে এ ধরনের মতামতের প্রায়োগিক তাৎপর্য ক্ষেত্রবিশেষে খুবই গুরুতর হতে পারে। কারণ , একই যুক্তির ভিত্তিতে কেউ দাবী করতে পারে (এবং কেউ কেউ করছেও) যে , কোরআনের বর্তমানে হাদীছের প্রয়োজন নেই। কারণ , হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) নিজ থেকে কোনো কথা বলেন নি , বরং তিনি কোরআনের প্রচার-প্রতিষ্ঠার জন্যই আগমন করেন এবং সে দায়িত্বই পালন করে যান। অতএব , হাদীছ নামে হযরত রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর বাণী , কাজ ও অনুমোদন নামে যা কিছু বলা হয় তার যতোটুকু কোরআনের অনুরূপ তার প্রয়োজন নেই , কারণ , তা তো কোরআনেই রয়েছে। আর এর বাইরে যা কিছু রয়েছে তা তাঁর নামে তৈরী করে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় তারা বলতে পারে যে , হাদীছ মানার অর্থ হচ্ছে কোরআনের সাথে হাদীছকে তথা আল্লাহর সাথে রাসূল (ছ্বাঃ)-কে শরীক করা। কিন্তু আমরা জানি যে , এ ধরনের যুক্তি ঠিক নয়। কারণ , অনেক বিষয়ে কোরআন মজীদে সাধারণ বিধান নাযিল হয়েছে ; বিস্তারিত বা প্রায়োগিক বিধান দেয়া হয় নি ; এ সব ক্ষেত্রে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর কথা , আচরণ ও অনুমোদনই অবশ্য অনুসরণীয় বিধান। যেমন: নামাযের ন্যূনতম শর্তাবলী , রাকা আত-সংখ্যা ও প্রক্রিয়া (তারতীব্) , যাকাতের নেছাব ও হার ইত্যাদি।

একইভাবে কোরআন মজীদের আয়াতের সঠিক তাৎপর্য গ্রহণ ও হাদীছ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর বা মা ছূম-এর প্রকৃত ফয়সালা ও সম্ভাব্য ফয়সালা বের করার জন্য বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন ; মুজতাহিদই হচ্ছেন সেই বিশেষজ্ঞ। অসংখ্য জাল হাদীছ এবং ছ্বাহীহ্ নামে অভিহিত অসংখ্য পরস্পর বিরোধী হাদীছের উপস্থিতিই এ ধরনের বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে।

এছাড়া , ইতিপূর্বে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে , সর্বসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হাদীছ অনুযায়ী আলেমগণ নবী-রাসূলগণের (আঃ) উত্তরাধিকারী ও প্রতিনিধি - বিচারবুদ্ধিও যা গ্রহণ করে। এভাবে ইজতিহাদ-বিরোধীরা যখন হাদীছকে যথেষ্ট গণ্য করে ইজতিহাদ ও মুজতাহিদের প্রয়োজনীয়তাকে প্রত্যাখ্যান করছেন , তখন হাদীছই ইজতিহাদ ও মুজতাহিদকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। তাছাড়া স্বয়ং কোরআন মজীদ (সূরা আত্-তাওবাহ্: ১২২) থেকেও সমাজের জন্য ফক্বীহ্ বা ইসলাম-বিশেষজ্ঞ থাকা ফরযে কেফায়ী বলে প্রমাণিত হয় এবং মুজতাহিদই হচ্ছেন সেই ফক্বীহ্ বা ইসলাম-বিশেষজ্ঞ।

অন্যদিকে , যারা ইজতিহাদের বিরোধিতা করেন ও কোরআন-হাদীছের অনুসরণকে যথেষ্ট বলে দাবী করেন , তাঁরাও কিন্তু প্রকারান্তরে এক ধরনের ইজতিহাদ করে থাকেন এবং এক ধরনের ইজতিহাদ অনুসরণ করে থাকেন। তাঁদের মধ্যেও পরস্পরবিরোধী হাদীছ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গ্রহণ-বর্জন করার জন্য হাদীছ-বিশেষজ্ঞ (মুহাদ্দিছ) রয়েছেন এবং হাদীছ সংকলকগণ (হাদীছের ইমামগণ) নিজেরা হাদীছ পরীক্ষার কতোগুলো নিয়মনীতি উদ্ভাবন করে তার ভিত্তিতে হাদীছ বাছাই করে সংকলিত করেন এবং হাদীছকে যথেষ্ট গণ্যকারী ইজতিহাদ-বিরোধীরা সেই সব সংকলনের ওপর নির্ভর করেন।

মুজ্তাহিদগণের ন্যায় হাদীছ-সংকলনসমূহের সংকলকগণও নবী-রাসূল বা মা ছ্বূম ইমাম ছিলেন না এবং ভুলের উর্ধে ছিলেন না। হাদীছ সংকলনের মাধ্যমে ইসলামের যে বিরাট খেদমত তাঁরা করেছেন সে জন্য তাঁদেরকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা সত্ত্বেও এ সত্যটি স্বীকার করতে হবে। এমতাবস্থায় তাঁদের ওপর অন্ধ নির্ভরতা যদি আল্লাহ্ ও রাসূলের (ছ্বাঃ) সাথে শরীক করা না হয় , তাহলে মুজতাহিদের অন্ধ অনুসরণ (অ-মুজতাহিদ সাধারণ মুসলমানের জন্য) আল্লাহ্ ও রাসূলের (ছ্বাঃ) সাথে শরীক করা বলে গণ্য করা হবে কেন ?

বস্তুতঃ হাদীছ বাছাই করার মূলনীতি নির্ধারণ ও তার প্রয়োগও এক ধরনের ইজতিহাদ বৈ নয়। ইজতিহাদের মূলনীতি নির্ধারণ ও তা প্রয়োগ তথা ইজতিহাদ একই ধরনের কাজ , তবে তা অধিকতর বিশেষজ্ঞত্বের সাথে আঞ্জাম দেয়া হয়।

একজন মুজতাহিদ যখন একজন মুহাদ্দিছ কর্তৃক ছ্বাহীহ্ বলে চিহ্নিত কোনো হাদীছকে প্রত্যাখ্যান করেন তখন তার মানে এ নয় যে , তিনি হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর (এবং শিয়া মতে , সেই সাথে কোনো নিষ্পাপ ইমামের) কোনো কথা , কাজ বা কাজের অনুমোদনকে প্রত্যাখ্যান করছেন। বরং প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে , হাদীছ যাচাই-বাছাই করার এক ব্যাপকতর ও নির্ভুলতর মানদণ্ডে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে , এটা আদৌ ছ্বাহীহ্ হাদীছ নয় অর্থাৎ হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) বা যে নিষ্পাপ ব্যক্তিত্বের নামে এটি বর্ণিত হয়েছে তিনি আদৌ এ কথা বলেন নি বা এ কাজ করেন নি বা এরূপ কাজের অনুমোদন দেন নি , অথবা এটি ছিলো স্থান , কাল বা পরিস্থিতি দ্বারা সীমাবদ্ধ কোনো বিষয়ের সাথে জড়িত যা উচ্চতর মূলনীতি অনুযায়ী আলোচ্য বিষয়ে প্রযোজ্য নয় তথা যে বিষয়ের ফয়সালা করা হবে তা দৃশ্যতঃ হাদীছে বর্ণিত বিষয়ের সাথে অভিন্ন হলেও প্রকৃত পক্ষে তা ভিন্ন বিষয় , অতএব , তার ফয়সালাও হবে ভিন্ন। বস্তুতঃ এভাবে তিনি নব-উদ্ভূত বিষয়ে সঠিক ফয়সালা উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেন।

উদাহরণস্বরূপ , কোরআন মজীদে আঙ্গুরের রস (খামর্)-কে হারাম করা হয়েছে। কিন্তু একজন মুজতাহিদ জানেন যে , ইসলাম-পূর্ব যুগে আরব মুশরিকরা আঙ্গুরের রসকে আগুনে জ্বাল দিয়ে বা রোদে উত্তপ্ত করে তাতে মাদকতার গুণ সৃষ্টি হবার পর তা পান করতো ; আঙ্গুর থেকে রস বের করে তাজা তাজাই তা পান করতো না। তাই মুজতাহিদ মাদকতার গুণবিহীন আঙ্গুরের তাজা রসকে (বর্তমান যুগে যার যথেষ্ট ব্যবহার আছে) কোরআন মজীদে বর্ণিত উক্ত হুকুমের বহির্ভূত ভিন্ন বিষয় বলে গণ্য করেন। একইভাবে , আঙ্গুরের রসে মাদকতা সৃষ্টির পরেও তা জ্বাল দেয়া অব্যাহত রাখলে তা কমে এক চতুর্থাংশের নীচে নেমে সির্কায় পরিণত হলে তাতে আর মাদকতা থাকে না বিধায় মুজতাহিদ এ ঘনীভূত আঙ্গুর-রসকে তৃতীয় একটি বিষয় বলে গণ্য করেন এবং এর প্রতি খামর্-এর হুকুম প্রযোজ্য মনে করেন না। অন্যদিকে ভাত পচানো মদ বা তালের রসের তাড়ির কথা কোরআন মজীদে বা হাদীছে উল্লেখ না থাকলেও মুজতাহিদ অভিন্ন গুণের কারণে খামর্-এর হুকুম এতদুভয়ের প্রতি প্রযোজ্য গণ্য করেন।

ইরান : তদানীন্তন সভ্যতার লালনভূমি

যে কারণে আমরা রোমান সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা অধ্যয়ন করেছি সে একই কারণে আমরা সে সময়ের ইরানের সার্বিক পরিস্থিতি সম্মানিত পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরব। তবে এ বিষয়টির দিকেও দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক যে,আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের দুর্বল দিকগুলো বর্ণনা করে থাকি,তাহলে কেবল সত্য বিশ্লেষণ এবং ইসলাম ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা ব্যতীত আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। জাতীয় গর্ব ও স্বদেশপ্রেম যেন অবশ্যই আমাদের বাস্তববাদী হওয়া থেকে বিরত রাখতে না পারে। আমরা দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি পবিত্র ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ইরানে রাজত্ব করত তা বর্ণনা করতে,বাস্তবকে মেনে নিতে এবং (তদানীন্তন ইরানী সমাজে প্রচলিত) কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে কোন কিছু পরোয়া করি না। অ্যারিস্টটল তাঁর শিক্ষক প্লেটোর সাথে তাঁর মতবিরোধ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা-ই পুনরাবৃত্তি করছি। তিনি তাঁর এ মতপার্থক্যের ব্যাপারে এভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন: আমি প্লেটোকে ভালোবাসি। তবে সত্যকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি।”

সে যুগের ইরানী সরকার ও প্রশাসনের প্রধান দুর্বল দিকটি ছিল স্বৈরাচারী একনায়ক সরকার। নিঃসন্দেহে ব্যক্তিবিশেষের বিবেক-বুদ্ধি ও তাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা এবং একটি সংঘ বা দলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা মোটেও এক নয়। সামষ্টিক অর্থাৎ জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে ষড়যন্ত্র,পেশী প্রদর্শন ও জোর খাটানো অপেক্ষাকৃত কমই হয়ে থাকে। এ কারণেই ইরানীদের মহত্ত্ব,নেতৃত্ব অথবা দুর্বলতা ও অপদস্থ হওয়ার বিষয়টি তাদের কর্তৃত্বশীল একনায়কতন্ত্রের দুর্বলতা অথবা সামর্থ্যরে সাথে পূর্ণরূপে জড়িত। সাসানী সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংক্রান্ত আলোচনা ও অধ্যয়ন এবং তাদের প্রশাসনের ছায়ায় যে সব অস্থিতিশীলতার উদ্ভব হয়েছে সেগুলো আমাদের এ বক্তব্যের জীবন্ত দলিল।

ইসলামের আবির্ভাবকালে ইরানের সার্বিক অবস্থা

ইসলামের আবির্ভাব এবং 611 খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতপ্রাপ্তি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের (590-628 খ্রি.) শাসনামলের সমসাময়িক ঘটনা ছিল। মহানবী (সা.) সম্রাট খসরু পারভেজের রাজত্বকালেই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। (সে দিনটি ছিল শুক্রবার,16 জুলাই,622 খ্রি.)। আর এ তারিখ অর্থাৎ মহানবীর হিজরত দিবস থেকেই মুসলমানদের সন ও তারিখ গণনা শুরু হয়েছিল।

দু টি বৃহৎ পরাশক্তি (প্রাচ্যের রোমান সাম্রাজ্য ও সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য) ঐ সময়ের সভ্য দুনিয়ার বেশিরভাগ অংশ শাসন করত। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে এ দু টি সাম্রাজ্য সমগ্র বিশ্বে শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।

পারস্য সম্রাট আনুশীরওয়ান (নওশেরওয়ান) [531-589 খ্রি.]-এর রাজত্বকাল থেকে রোমানদের সাথে ইরানীদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা খসরু পারভেজের রাজত্বকাল পর্যন্ত দীর্ঘ 24 বছর স্থায়ী হয়েছিল।

পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যদ্বয় এ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যে বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছিল এবং ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সে কারণে উক্ত সাম্রাজ্যদ্বয়ের সরকার ও প্রশাসন কার্যত পঙ্গু ও অচল হয়ে গিয়েছিল;আসলে খোলস ছাড়া এ পরাশক্তিদ্বয়ের আর কিছুই তখন অবশিষ্ট ছিল না।

বিভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট থেকে ইরানের সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতি আলোচনা করতে হলে সম্রাট আনুশীরওয়ানের রাজত্বকালের শেষভাগ থেকে মুসলমানদের আগমন ও পারস্যবিজয় পর্যন্ত সে দেশের সরকার ও প্রশাসনের অবস্থা আমরা আলোচনা করব।

সাসানী শাসনামলে জৌলুস ও বিলাসিতা

সাসানী সম্রাটগণ সাধারণত বিলাসী ও আনুষ্ঠানিকতাপ্রিয় ছিলেন। সাসানী সম্রাটদের জাঁকজমকপূর্ণ শাহী দরবার এবং এর জৌলুস দর্শনার্থীদের চোখ ঝলসে দিত।

সাসানী শাসনামলে দারাফশেশে কভীয়নী’নামে ইরানীদের একটি পতাকা ছিল যা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা সাসানীয়দের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ উৎসবসমূহের সময় রাজকীয় প্রাসাদসমূহে উত্তোলন করা হতো। পতাকাটি মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত দ্বারা সুশোভিত করা হতো। একজন লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী,এ পতাকাটির মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত আসলেই অদ্বিতীয় ছিল যার মূল্য 12,00,000 দিরহাম অর্থাৎ 30,000 পাউন্ড।59

সাসানীদের কল্পকাহিনীর মতো জমকালো প্রাসাদসমূহে বিপুল সংখ্যক মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী,হীরা-জহরত,মণিমুক্তা এবং বিস্ময়কর চিত্রকলা ও ছবির সংগ্রহ ছিল যা দর্শনার্থীদের বিস্ময়াভিভূত করত। আমরা যদি এ সব শাহী প্রাসাদের বিস্ময়কর বিষয়াদি জানতে চাই তাহলে কেবল একটি বৃহদাকার সাদা কার্পেটের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই চলবে যা একটি (সাসানী) রাজপ্রাসাদে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। উক্ত কার্পেটের নাম ছিল বাহারিস্তানে কিসরা’অর্থাৎ সম্রাট কিসরা বা খসরুর বসন্তবাগান। সাসানী শাসকবর্গ এ কার্পেটটি এ কারণে তৈরি করিয়েছিলেন যাতে করে তাঁরা আমোদ-প্রমোদ করার সময় হর্ষোৎফুল্ল থাকতে পারেন এবং সর্বদা বসন্ত ঋতুর সুন্দর ও আনন্দদায়ক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।60

বর্ণনামতে এ কার্পেটের দৈর্ঘ্য ছিল 150 হাত এবং প্রস্থ 70 হাত;আর এর সমস্ত সুতা স্বর্ণ,হীরা-মুক্তা ও জহরত খচিত ছিল।61

সাসানী সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট খসরু পারভেজই অন্য সকল সম্রাটের চেয়ে বেশি জাঁকজমক,বিলাসিতা ও জৌলুসপ্রিয় ছিলেন। তাঁর শাহী হেরেমে নারী,দাসী,গায়িকা ও নর্তকীদের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

হামযাহ্ ইসফাহানী সানা মুলূকিল আরদ’গ্রন্থে সম্রাট খসরু পারভেজের শান-শওকত,জৌলুস ও বিলাসিতা ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছেন :

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের তিন হাজার স্ত্রী,12000 গায়িকা দাসী,6000 দেহরক্ষী পুরুষ সৈনিক,8500টি সওয়ারী ঘোড়া,960টি হাতী,মালপত্র বহন করার জন্য 12000টি গাধা এবং 1000টি উট ছিল।62

এরপর তাবারী আরো বলেছেন,এ সম্রাট অন্য সকলের চেয়ে বেশি মনিমুক্তা,হীরা-জহরত এবং মূল্যবান তৈজসপত্রের প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করতেন।63

ইরানের সামাজিক অবস্থা

সাসানী যুগে ইরানের সামাজিক অবস্থা সে দেশের দরবার ও রাজনৈতিক অবস্থার চেয়ে কোনভাবেই ভালো ছিল না। শ্রেণীশাসন ও শোষণ যা সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই ইরানে বিদ্যমান ছিল তা সাসানীদের যুগে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে।

অভিজাত ও পুরোহিতশ্রেণী অন্যান্য শ্রেণী অপেক্ষা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণী বলে বিবেচিত হতো। সকল ধরনের সামাজিক সংবেদনশীল পদ ও পেশা তাদেরই করায়ত্তে ছিল। পেশাজীবী ও কৃষকগণ সকল প্রকার ন্যায্য অধিকারভিত্তিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। কেবল কর প্রদান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ব্যতীত তাদের অন্য কোন পেশাই ছিল না।

সাসানীদের শ্রেণীবৈষম্যের বিষয়ে নাফীসী লিখেছেন :

“যে বিষয়টি ইরানী জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কপটতার প্রসার ও প্রচলন করেছিল তা ছিল অতি নিষ্ঠুর শ্রেণীবৈষম্য যা সাসানীরা ইরানে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আর শ্রেণীবৈষম্যের মূল পূর্বতন সভ্যতাসমূহের মাঝেই নিহিত ছিল। কিন্তু সাসানীদের যুগে কঠোরতা আরোপের বিষয়টি চরমভাবে বৃদ্ধি পায়।

পারস্য সমাজে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সাত অভিজাত বংশ এবং তাদের পর পাঁচটি শ্রেণী এমন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত যা থেকে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত ছিল। মালিকানা ও স্বত্বাধিকার প্রায় ঐ সাত পরিবার বা বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাসানী ইরানের জনসংখ্যা ছিল 140 মিলিয়ন (14 কোটি)। ঐ সাত বংশের প্রতিটির লোকসংখ্যা যদি এক লক্ষও ধরি তাহলে ঐ সাত বংশের সম্মিলিত লোকসংখ্যা 7,00,000 হবে। আর সৈন্য-সামন্ত এবং জমিদারশ্রেণী যাদেরও কিছুটা মালিকানা স্বীকৃত ছিল তাদের সংখ্যাও যদি আমরা 7,00,000 বলে অনুমান করি তাহলে এ চৌদ্দ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় 15,00,000 ব্যক্তির মালিকানা ছিল এবং বাকী জনগণ স্রষ্টাপ্রদত্ত এই স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।64

পেশাজীবী ও কৃষিজীবিগণ যারা সকল প্রকার অধিকার সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল,কিন্তু অভিজাতশ্রেণীর তাবৎ ব্যয়ভার যাদের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছিল তারা এ অবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের কোন স্বার্থ বা লাভের কথা চিন্তাও করতে পারত না। এ কারণেই অধিকাংশ কৃষিজীবী এবং সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোক নিজেদের পেশা ত্যাগ করে অসহনীয় কর থেকে বাঁচার জন্য মঠ অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের আস্তানায় আশ্রয়গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।65

‘সাসানীদের যুগে ইরান’নামক গ্রন্থের লেখক ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর দুর্ভাগ্য সম্পর্কে লিখেছেন : এমিয়ান মার্সেলিনোস নামক পাশ্চাত্যের এক ঐতিহাসিকের বাণী এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে : ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণী সাসানীদের যুগে চরম দীনতা ও দুর্ভাগ্যের মধ্যে দুর্বিষহ জীবনযাপন করত। তারা যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর পেছনে পায়ে হেঁটে যাত্রা করত। তাদেরকে এমনভাবে মর্যাদাহীন বলে গণ্য করা হতো যেন তাদের ললাটে চিরকালের জন্য দাসত্ব লিখে দেয়া হয়েছে। তারা তাদের শ্রমের বিনিময়ে কোন মজুরি লাভ করত না।”66

সাসানী সাম্রাজ্যের একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণী যারা জনসংখ্যায় শতকরা 1.5 ভাগের কম ছিল তারাই সব কিছুর অধিকারী ছিল। কিন্তু ইরানের জনসংখ্যার শতকরা 98 ভাগের বেশি দাসশ্রেণীর মতো জীবনের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

অভিজাতশ্রেণীই শিক্ষাগ্রহণের অধিকার রাখত

সাসানী যুগে কেবল অভিজাত ও উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন শিশুরাই বিদ্যার্জন করার অধিকার রাখত। সাধারণ জনতা ও সমাজের মধ্যবিত্তশ্রেণী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রাচীন ইরানের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় এ ত্রুটি এতটা প্রকট ছিল যে,এমনকি শাহনামা’ও রাজা-বাদশাদের উপাখ্যান রচয়িতাগণ যাঁদের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে বীরত্বগাথা রচনা করা তাঁরাও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন।

ইরানের বীরত্বগাথা রচয়িতা কবি ফেরদৌসী শাহনামা য় একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন যা এ বিষয়টির সর্বোত্তম সাক্ষ্য-প্রমাণ। কাহিনীটি সম্রাট আনুশীরওয়ানের শাসনামল অর্থাৎ যখন সাসানী সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ তখন সংঘটিত হয়েছিল। এ কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে,তাঁর শাসনামলে প্রায় সকল অধিবাসীরই শিক্ষা ও বিদ্যার্জন করার অধিকার ছিল না,এমনকি জ্ঞানপ্রেমিক সম্রাট আনুশীরওয়ানও অন্যান্য শ্রেণীর জনসাধারণকে জ্ঞানার্জনের অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন না।

ফেরদৌসী লিখেছেন : ইরান ও রোমের যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য একজন জুতা নির্মাতা (মুচি) তার স্বর্ণ ও রূপার ভাণ্ডার দান করতে চেয়েছিল। সে সময় সম্রাট আনুশীরওয়ান আর্থিক সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিলেন। কারণ ইরানের প্রায় তিন লক্ষ সৈন্য তখন তীব্র খাদ্য ও অস্ত্র সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। সম্রাট আনুশীরওয়ান এ অবস্থার কারণে খুবই উদ্বিগ্ন এবং তাঁর নিজ পরিণতি সম্পর্কেও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সম্রাট তাৎক্ষণিকভাবে জ্ঞানী প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করার জন্য ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেন যেন তিনি মাযেনদারান গমন করে যুদ্ধের খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু বুযুর্গমেহের সম্রাটকে বললেন, বিপদ অত্যাসন্ন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে একটি উপায় খুঁজে বের করা আবশ্যক।” তখন বুযুর্গমেহের জাতীয় ঋণ’অর্থাৎ জাতির কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার পরামর্শ দিলেন। সম্রাট আনুশীরওয়ানও তাঁর এ প্রস্তাবটি পছন্দ করলেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশও জারী করলেন। বুযুর্গমেহের নিকটবর্তী শহর,গ্রাম ও জনপদে রাজকীয় কর্মকর্তাদের প্রেরণ করে ঐ সকল স্থানের সচ্ছল ব্যক্তিদের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবগত করলেন।

তখন একজন জুতা নির্মাতা যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সে যা চেয়েছিল তা হলো : এর বিনিময়ে তার একমাত্র পুত্রসন্তান যে লেখাপড়া শিখতে অত্যন্ত আগ্রহী তাকে যেন লেখাপড়া শেখার অনুমতি দেয়া হয়। বুযুর্গমেহের ঐ মুচির আবেদনকে তার দানের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করেন এবং সম্রাটের কাছে ফিরে গিয়ে তার আর্জি সম্পর্কে সম্রাটকে অবহিত করেন। আনুশীরওয়ান এ কথা শুনে খুব রেগে যান এবং প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে তিরস্কার করে বলেন, তুমি এ কেমন আবেদন করছ? এ কাজ কল্যাণকর নয়। কারণ যে শ্রেণীবিন্যাসের আওতায় সে রয়েছে তা থেকে তার বের হয়ে আসার মাধ্যমে দেশের শ্রেণীপ্রথা ধসে পড়বে এবং তখন সে যে স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করছে তার মূল্যমান অপেক্ষা তার এ আর্জি অনেক বেশি ক্ষতি বয়ে আনবে।”

এরপর ফেরদৌসী সম্রাট আনুশীরওয়ানের কণ্ঠে তাঁর (সম্রাটের) মেকিয়াভ্যালি দর্শন’ব্যাখ্যা করেছেন:

বণিকপুত্র যদি হয় সচিব

গুণী,জ্ঞানী ও শিক্ষানবীশ

তাই যখন বসবে মোদের যুবরাজ সিংহাসন পরি

অবশ্যই পাবে সে তখন এক (দক্ষ ও গুণী) ভাগ্যমান সহকারী

আর কভু যদি মোজা বিক্রেতা করে এ গুণ ও জ্ঞান অর্জন

এ জ্ঞান দেবে তারে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন চক্ষু

আর নীচ বংশজাত জ্ঞানীকে দেবে অনুধাবনকারী কর্ণ

ব্যস্,তখন পরিতাপ ও শীতল বায়ু ছাড়া রইবে না আর কিছু।

এভাবেই ন্যায়পরায়ণ (!) বাদশার নির্দেশে জুতা নির্মাতা লোকটির টাকা-পয়সা ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ হতভাগা জুতা নির্মাতা তীব্র মনঃকষ্ট পায় এবং সে রাতের বেলা ন্যায়বিচারক স্রষ্টার দরবারে দু হাত উঠিয়ে এ ধরনের অত্যাচার ও ন্যায্য অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রার্থনা করে-যা হচ্ছে মজলুমদেরই রীতি। আর এভাবে সে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচারের ঘণ্টা ধ্বনিত করে।

প্রেরিত দূত ফিরে আসল এবং ঐ দিরহামগুলো দেখতে পেয়ে

ঐ মুচির অন্তর হলো তীব্র দুঃখভারাক্রান্ত

রাত হলে শাহের কথায় হলো সে দুঃখভারাক্রান্ত

মহান আল্লাহর দরবারে সে চাইল ঐশী আদালতের ঘণ্টাধ্বনি ধ্বনিত হোক। 67

এত কিছু সত্ত্বেও সম্রাট আনুশীরওয়ানের বিশাল প্রচারমাধ্যম ও প্রশাসন তাঁকে ন্যায়পরায়ণ বলে আখ্যায়িত করতে এবং ইরানী সমাজকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু তথাকথিত ন্যায়পরায়ণ এ শাহ তদানীন্তন ইরানী সমাজের মৌলিক সমস্যার জট খুলতে তো সক্ষম হননি;বরং ইরানীদের প্রভূত সামাজিক সমস্যার কারণও হয়েছিলেন। কেবল মাযদাক গোলযোগের ঘটনায় আশি হাজার এবং অপর একটি অভিমত অনুযায়ী এক লক্ষ ইরানীকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ধারণা করেছিলেন যে,উক্ত ফিতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে।68 অথচ এ ফিতনা যে মূলোৎপাটিত হয় নি তা তিনি মোটেও উপলব্ধি করতে পারেন নি। এ ধরনের শাস্তি আসলে ফলাফলের অস্তিত্ব নিশ্চি‎‎ হ্ন করে দেয়,তা কারণের অস্তিত্ব বিলোপ করে না। এ হচ্ছে পাপীদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সংগ্রাম-পাপ ও অপরাধের বিরুদ্ধে নয়। ফিতনার মূল কারণই ছিল সমাজে ভারসাম্যহীনতা,শ্রেণীবৈষম্য,দ্বন্দ্ব,বিশেষ একটি শ্রেণী কর্তৃক সম্পদ ও পদমর্যাদা কুক্ষিগতকরণ,নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা এবং অপরাপর দুর্নীতি ও অপরাধ। আর সম্রাট আনুশীরওয়ান অস্ত্র বল ও চাপ প্রয়োগ করে চাইতেন যে,জনগণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করুক।

এডওয়ার্ড ব্রাউন সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে লিখেছেন : সম্রাট আনুশীরওয়ান নাস্তিকদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি যারথুস্ত্রীয় (যারদোশ্ত) ধর্মযাজকদের প্রশংসা ও সম্মতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর ঐ সব ধর্মযাজকের হাতেই জাতীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে...।”69   এ সব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত ইতিহাসে সম্রাট আনুশিরওয়ানকে ন্যায়পরায়ণতা ও মানবতার পূর্ণ আদর্শ এক সম্রাট হিসাবে পরিচিত করানো হয়েছে। এ ব্যাপারে অনেক কাহিনীও রচনা করা হয়েছে।

খুবই আশ্চর্যজনক! এ দীর্ঘ সময় একমাত্র একটি বৃদ্ধ গাধা ব্যতীত আর কোন মজলুমই ন্যায়বিচারের ঘণ্টা বাজায় নি,অবশ্য এটিও জ্ঞাত বিষয় যে,ঐ গাধাটি তার নিজের সাহসের অপরাধের কথা জানত না;আর যদি সে তা জানত তাহলে সে ঘুণাক্ষরেও ন্যায়পরায়ণতার রজ্জুর নিকটবর্তী হতো না!!

আরো বলা হয় যে,একবার রোমের বাদশাহ্,আজম অর্থাৎ ইরানের বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের কাছে এক দূত প্রেরণ করেছিলেন। যখন ঐ দূত ইরানের বাদশার শানশওকত এবং বিশাল তাক-ই কিসরা প্রত্যক্ষ করলেন তখন তিনি দেখতে পেলেন যে,ইরানের বাদশাহ্ সিংহাসনে উপবিষ্ট;আর রাজারা তাঁর দরবারে উপস্থিত। তিনি এক ঝলক দৃষ্টি শাহী দ্বারমণ্ডপের ওপর নিবদ্ধ করলে উক্ত দ্বারমণ্ডপটি তাঁর দৃষ্টিতে খুবই জমকালো ও জাঁকজমকপূর্ণ বলে মনে হয়। কিন্তু ঐ দ্বারমণ্ডপের চারপাশ যেন একটু বাঁকা। দূত তখন দরবারে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন : দ্বারমণ্ডপে যে সামান্য বক্রতা আপনি দেখতে পাচ্ছেন আসলে এর কারণ হচ্ছে এখানে এক বৃদ্ধার ঘর ছিল যা বাদশাহ্ কিনে নিয়ে দ্বারমণ্ডপের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঐ বৃদ্ধা তার ঘর বিক্রি করতে রাজী না হওয়ায় বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানও তাকে বিক্রি করতে বাধ্য করেন নি। তাই ঐ বৃদ্ধার বাড়িটিই অবশেষে এ দ্বারমণ্ডপটির বক্রতার কারণ হয়েছে। তখন ঐ দূত শপথ করে বললেন যে,দ্বারমণ্ডপের এই বক্রতা আসলে এর সরল ও অবক্র হওয়া অপেক্ষা শ্রেয়।70

এটি আশ্চর্যজনক যে,এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ভবন ও দ্বারমণ্ডপ যে ব্যক্তি নির্মাণ করতে ইচ্ছুক তিনি কি পূর্ব থেকেই এর নকশা সংগ্রহ করবেন না এবং নকশা ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ভূমি ব্যতীতই কেউ কি এ ধরনের ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে! আর এর ফলে শাহী প্রাসাদ বাঁকা হবে। এ কি কখনো বিশ্বাস করা যায়?

আসলে এ ধরনের গালগল্প সম্রাটের দরবারের ব্যক্তিবর্গ ও যারথুস্ত্রীয় ধর্মযাজকগণ,মাযদাকী মতাবলম্বীদের দমন করে সম্রাট তাঁদের স্বার্থে যে মহামূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন সে কারণেই তাঁরা সম্রাটের অনুকূলেই রচনা করে থাকতে পারেন।

‘ইরান ও ইসলাম’গ্রন্থের লেখকের অভিমত অনুসারে এ সব কিছুর চেয়েও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই যে,কেউ কেউ সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতাকে শারয়ী ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণ করার জন্য এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের সূত্র থেকেও হাদীস বর্ণনা করতে বাধ্য হয়েছে। যেমন :ولدت في زمن الملك العادل আমি ন্যায়পরায়ণ বাদশার রাজত্বকালে জন্মগ্রহণ করেছি।”-প্রসিদ্ধ এ হাদীসটি। মহানবী (সা.) যেন এ কথা বলতে গর্ববোধ করতেন যে,তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছেন,অথচ মহানবীর সাথে তাঁর (বাদশার) ন্যায়পরায়ণতার কি কোন সম্পর্ক আছে?

অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : হযরত আলী মাদায়েনে এসে কিসরার প্রাসাদে গমন করলেন। সেখানে তিনি আনুশীরওয়ানকে জীবিত করে তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন হযরত আলীকে বলেছিলেন যে,কুফ্রী করার কারণে তিনি বেহেশত থেকে বঞ্চিত হয়েছেন,তবে ন্যায়পরায়ণ হবার কারণে জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্তও হচ্ছেন না।71 এখন আমরা পর্যালোচনা করব যে,সাসানীরা কি ধরনের অত্যাচার করেছে।

খসরু পারভেজের অপরাধসমূহের পর্দা উন্মোচন

সম্রাট খসরু পারভেজের অত্যাচারমূলক ও পাগলামিপূর্ণ আরেকটি কাজ ছিল প্রসিদ্ধ বুযুর্গমেহেরের সাথে তাঁর আচরণ। এ বুযুর্গমেহের আনুশীরওয়ানের দরবারে 13 বছর কর্মরত ছিলেন এবং তিনি প্রভূত যশ ও খ্যাতির অধিকারী হয়েছিলেন। অবশেষে সম্রাট খসরু পারভেজ তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সম্রাট কারাগারে বন্দী বুযুর্গমেহেরের কাছে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন : তোমার জ্ঞান,বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা অবশেষে তোমারই নিহত হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।” বুযুর্গমেহেরও উত্তরে লিখেছিলেন : যে পর্যন্ত ভাগ্য আমার প্রতি প্রসন্ন ছিল সে পর্যন্ত আমি আমার বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়েছি। এখন যখন ভাগ্য আমার অনুকূলে নেই তখন আমার ধৈর্য ও সহ্যশক্তিকে কাজে লাগাব। আমার হাত দিয়ে যদি অগণিত সৎকর্মসম্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে আমি আমার মন্দ কাজ থেকেও নিরাপদ ও নিশ্চিত হয়েছি। আমার কাছ থেকে মন্ত্রিত্ব পদ কেড়ে নেয়া হলেও আমা থেকে ঐ পদের অসংখ্য অন্যায় ও অত্যাচারের দুঃখ-কষ্টও দূর করা হয়েছে। অতএব,আমার আর ভয় কিসে?

যখন সম্রাট খসরু পারভেজের হাতে বুযুর্গমেহেরের উক্ত চিঠি পৌঁছালো তখন সম্রাট বুযুর্গমেহেরের নাক ও ঠোঁট কেটে ফেলার আদেশ দিলেন। যখন বুযুর্গমেহেরকে সম্রাটের এ আদেশ শুনানো হলো তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন : আমার ঠোঁট এর চেয়ে আরোও বেশি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।” সম্রাট খসরু পারভেজ তখন জিজ্ঞাসা করলেন : কি কারণে? বুযুর্গমেহের তখন বললেন : যেহেতু আপামর জনতার কাছে তোমার এমন সব গুণের প্রশংসা করেছি যা তোমার ছিল না এবং অসন্তুষ্ট অন্তঃকরণসমূহকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম। আমি তোমার এমন সব ভালো কাজ ও পুণ্যের কথা জনগণের মধ্যে প্রচার করেছি যার উপযুক্ত তুমি ছিলে না। হে নিকৃষ্ট অসৎকর্মশীল সম্রাট! যদিও আমার সততার ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত এতদ্সত্ত্বেও আমাকে কুধারণার বশবর্তী হয়ে হত্যা করছ? অতএব,তোমার কাছে সুবিচার আশা করা এবং তোমার কথায় ভরসা করা যায় কি?

সম্রাট খসরু পারভেজ বুযুর্গমেহেরের কথায় খুবই উত্তেজিত হয়ে তাঁর শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলেন।72

‘ইরানের সামাজিক ইতিহাস’গ্রন্থের রচয়িতা-যিনি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা সাসানী যুগের অরাজকতা,অধঃপতিত অবস্থা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল দেশের অভিজাতশ্রেণীর জন্য শিক্ষাগ্রহণের অধিকার ও সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়টি এভাবে চিত্রিত করেছেন :

“এ যুগে তখনকার প্রচলিত সকল জ্ঞান ও শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং শিক্ষা কেবল পুরোহিত,যাজক ও অভিজাতশ্রেণীর সন্তানগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল;আর ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।”73

হ্যাঁ,এ জাহেলী প্রথা সাসানী সম্রাটদের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। আর তাঁরা কোনভাবেই এ বিষয়টি পরিহার করতে চাইতেন না ।

এ কারণেই সৌভাগ্য ও সুখের ক্রোড়ে প্রতিপালিত এ সংখ্যালঘু শ্রেণীটির অপরিপক্ব ও অসংযত প্রবৃত্তি ও রিপুর কামনা-বাসনা ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে জ্ঞানার্জনের অধিকারসহ সকল বৈধ সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল।

ইরান : তদানীন্তন সভ্যতার লালনভূমি

যে কারণে আমরা রোমান সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা অধ্যয়ন করেছি সে একই কারণে আমরা সে সময়ের ইরানের সার্বিক পরিস্থিতি সম্মানিত পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরব। তবে এ বিষয়টির দিকেও দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক যে,আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের দুর্বল দিকগুলো বর্ণনা করে থাকি,তাহলে কেবল সত্য বিশ্লেষণ এবং ইসলাম ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা ব্যতীত আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। জাতীয় গর্ব ও স্বদেশপ্রেম যেন অবশ্যই আমাদের বাস্তববাদী হওয়া থেকে বিরত রাখতে না পারে। আমরা দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি পবিত্র ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক যে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ইরানে রাজত্ব করত তা বর্ণনা করতে,বাস্তবকে মেনে নিতে এবং (তদানীন্তন ইরানী সমাজে প্রচলিত) কুসংস্কারাচ্ছন্ন আকীদা-বিশ্বাস ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে কোন কিছু পরোয়া করি না। অ্যারিস্টটল তাঁর শিক্ষক প্লেটোর সাথে তাঁর মতবিরোধ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা-ই পুনরাবৃত্তি করছি। তিনি তাঁর এ মতপার্থক্যের ব্যাপারে এভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন: আমি প্লেটোকে ভালোবাসি। তবে সত্যকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি।”

সে যুগের ইরানী সরকার ও প্রশাসনের প্রধান দুর্বল দিকটি ছিল স্বৈরাচারী একনায়ক সরকার। নিঃসন্দেহে ব্যক্তিবিশেষের বিবেক-বুদ্ধি ও তাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা এবং একটি সংঘ বা দলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা মোটেও এক নয়। সামষ্টিক অর্থাৎ জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে ষড়যন্ত্র,পেশী প্রদর্শন ও জোর খাটানো অপেক্ষাকৃত কমই হয়ে থাকে। এ কারণেই ইরানীদের মহত্ত্ব,নেতৃত্ব অথবা দুর্বলতা ও অপদস্থ হওয়ার বিষয়টি তাদের কর্তৃত্বশীল একনায়কতন্ত্রের দুর্বলতা অথবা সামর্থ্যরে সাথে পূর্ণরূপে জড়িত। সাসানী সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংক্রান্ত আলোচনা ও অধ্যয়ন এবং তাদের প্রশাসনের ছায়ায় যে সব অস্থিতিশীলতার উদ্ভব হয়েছে সেগুলো আমাদের এ বক্তব্যের জীবন্ত দলিল।

ইসলামের আবির্ভাবকালে ইরানের সার্বিক অবস্থা

ইসলামের আবির্ভাব এবং 611 খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতপ্রাপ্তি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের (590-628 খ্রি.) শাসনামলের সমসাময়িক ঘটনা ছিল। মহানবী (সা.) সম্রাট খসরু পারভেজের রাজত্বকালেই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। (সে দিনটি ছিল শুক্রবার,16 জুলাই,622 খ্রি.)। আর এ তারিখ অর্থাৎ মহানবীর হিজরত দিবস থেকেই মুসলমানদের সন ও তারিখ গণনা শুরু হয়েছিল।

দু টি বৃহৎ পরাশক্তি (প্রাচ্যের রোমান সাম্রাজ্য ও সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য) ঐ সময়ের সভ্য দুনিয়ার বেশিরভাগ অংশ শাসন করত। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে এ দু টি সাম্রাজ্য সমগ্র বিশ্বে শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।

পারস্য সম্রাট আনুশীরওয়ান (নওশেরওয়ান) [531-589 খ্রি.]-এর রাজত্বকাল থেকে রোমানদের সাথে ইরানীদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা খসরু পারভেজের রাজত্বকাল পর্যন্ত দীর্ঘ 24 বছর স্থায়ী হয়েছিল।

পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যদ্বয় এ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যে বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছিল এবং ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সে কারণে উক্ত সাম্রাজ্যদ্বয়ের সরকার ও প্রশাসন কার্যত পঙ্গু ও অচল হয়ে গিয়েছিল;আসলে খোলস ছাড়া এ পরাশক্তিদ্বয়ের আর কিছুই তখন অবশিষ্ট ছিল না।

বিভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট থেকে ইরানের সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতি আলোচনা করতে হলে সম্রাট আনুশীরওয়ানের রাজত্বকালের শেষভাগ থেকে মুসলমানদের আগমন ও পারস্যবিজয় পর্যন্ত সে দেশের সরকার ও প্রশাসনের অবস্থা আমরা আলোচনা করব।

সাসানী শাসনামলে জৌলুস ও বিলাসিতা

সাসানী সম্রাটগণ সাধারণত বিলাসী ও আনুষ্ঠানিকতাপ্রিয় ছিলেন। সাসানী সম্রাটদের জাঁকজমকপূর্ণ শাহী দরবার এবং এর জৌলুস দর্শনার্থীদের চোখ ঝলসে দিত।

সাসানী শাসনামলে দারাফশেশে কভীয়নী’নামে ইরানীদের একটি পতাকা ছিল যা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে অথবা সাসানীয়দের অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ উৎসবসমূহের সময় রাজকীয় প্রাসাদসমূহে উত্তোলন করা হতো। পতাকাটি মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত দ্বারা সুশোভিত করা হতো। একজন লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী,এ পতাকাটির মূল্যবান মণিমুক্তা ও হীরা-জহরত আসলেই অদ্বিতীয় ছিল যার মূল্য 12,00,000 দিরহাম অর্থাৎ 30,000 পাউন্ড।59

সাসানীদের কল্পকাহিনীর মতো জমকালো প্রাসাদসমূহে বিপুল সংখ্যক মূল্যবান দ্রব্য-সামগ্রী,হীরা-জহরত,মণিমুক্তা এবং বিস্ময়কর চিত্রকলা ও ছবির সংগ্রহ ছিল যা দর্শনার্থীদের বিস্ময়াভিভূত করত। আমরা যদি এ সব শাহী প্রাসাদের বিস্ময়কর বিষয়াদি জানতে চাই তাহলে কেবল একটি বৃহদাকার সাদা কার্পেটের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই চলবে যা একটি (সাসানী) রাজপ্রাসাদে বিছিয়ে রাখা হয়েছিল। উক্ত কার্পেটের নাম ছিল বাহারিস্তানে কিসরা’অর্থাৎ সম্রাট কিসরা বা খসরুর বসন্তবাগান। সাসানী শাসকবর্গ এ কার্পেটটি এ কারণে তৈরি করিয়েছিলেন যাতে করে তাঁরা আমোদ-প্রমোদ করার সময় হর্ষোৎফুল্ল থাকতে পারেন এবং সর্বদা বসন্ত ঋতুর সুন্দর ও আনন্দদায়ক দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।60

বর্ণনামতে এ কার্পেটের দৈর্ঘ্য ছিল 150 হাত এবং প্রস্থ 70 হাত;আর এর সমস্ত সুতা স্বর্ণ,হীরা-মুক্তা ও জহরত খচিত ছিল।61

সাসানী সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট খসরু পারভেজই অন্য সকল সম্রাটের চেয়ে বেশি জাঁকজমক,বিলাসিতা ও জৌলুসপ্রিয় ছিলেন। তাঁর শাহী হেরেমে নারী,দাসী,গায়িকা ও নর্তকীদের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

হামযাহ্ ইসফাহানী সানা মুলূকিল আরদ’গ্রন্থে সম্রাট খসরু পারভেজের শান-শওকত,জৌলুস ও বিলাসিতা ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছেন :

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের তিন হাজার স্ত্রী,12000 গায়িকা দাসী,6000 দেহরক্ষী পুরুষ সৈনিক,8500টি সওয়ারী ঘোড়া,960টি হাতী,মালপত্র বহন করার জন্য 12000টি গাধা এবং 1000টি উট ছিল।62

এরপর তাবারী আরো বলেছেন,এ সম্রাট অন্য সকলের চেয়ে বেশি মনিমুক্তা,হীরা-জহরত এবং মূল্যবান তৈজসপত্রের প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করতেন।63

ইরানের সামাজিক অবস্থা

সাসানী যুগে ইরানের সামাজিক অবস্থা সে দেশের দরবার ও রাজনৈতিক অবস্থার চেয়ে কোনভাবেই ভালো ছিল না। শ্রেণীশাসন ও শোষণ যা সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই ইরানে বিদ্যমান ছিল তা সাসানীদের যুগে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে।

অভিজাত ও পুরোহিতশ্রেণী অন্যান্য শ্রেণী অপেক্ষা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণী বলে বিবেচিত হতো। সকল ধরনের সামাজিক সংবেদনশীল পদ ও পেশা তাদেরই করায়ত্তে ছিল। পেশাজীবী ও কৃষকগণ সকল প্রকার ন্যায্য অধিকারভিত্তিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। কেবল কর প্রদান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ব্যতীত তাদের অন্য কোন পেশাই ছিল না।

সাসানীদের শ্রেণীবৈষম্যের বিষয়ে নাফীসী লিখেছেন :

“যে বিষয়টি ইরানী জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কপটতার প্রসার ও প্রচলন করেছিল তা ছিল অতি নিষ্ঠুর শ্রেণীবৈষম্য যা সাসানীরা ইরানে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আর শ্রেণীবৈষম্যের মূল পূর্বতন সভ্যতাসমূহের মাঝেই নিহিত ছিল। কিন্তু সাসানীদের যুগে কঠোরতা আরোপের বিষয়টি চরমভাবে বৃদ্ধি পায়।

পারস্য সমাজে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সাত অভিজাত বংশ এবং তাদের পর পাঁচটি শ্রেণী এমন সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত যা থেকে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত ছিল। মালিকানা ও স্বত্বাধিকার প্রায় ঐ সাত পরিবার বা বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাসানী ইরানের জনসংখ্যা ছিল 140 মিলিয়ন (14 কোটি)। ঐ সাত বংশের প্রতিটির লোকসংখ্যা যদি এক লক্ষও ধরি তাহলে ঐ সাত বংশের সম্মিলিত লোকসংখ্যা 7,00,000 হবে। আর সৈন্য-সামন্ত এবং জমিদারশ্রেণী যাদেরও কিছুটা মালিকানা স্বীকৃত ছিল তাদের সংখ্যাও যদি আমরা 7,00,000 বলে অনুমান করি তাহলে এ চৌদ্দ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় 15,00,000 ব্যক্তির মালিকানা ছিল এবং বাকী জনগণ স্রষ্টাপ্রদত্ত এই স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।64

পেশাজীবী ও কৃষিজীবিগণ যারা সকল প্রকার অধিকার সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল,কিন্তু অভিজাতশ্রেণীর তাবৎ ব্যয়ভার যাদের স্কন্ধে অর্পিত হয়েছিল তারা এ অবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের কোন স্বার্থ বা লাভের কথা চিন্তাও করতে পারত না। এ কারণেই অধিকাংশ কৃষিজীবী এবং সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোক নিজেদের পেশা ত্যাগ করে অসহনীয় কর থেকে বাঁচার জন্য মঠ অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের আস্তানায় আশ্রয়গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।65

‘সাসানীদের যুগে ইরান’নামক গ্রন্থের লেখক ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর দুর্ভাগ্য সম্পর্কে লিখেছেন : এমিয়ান মার্সেলিনোস নামক পাশ্চাত্যের এক ঐতিহাসিকের বাণী এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে : ইরানের কৃষিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণী সাসানীদের যুগে চরম দীনতা ও দুর্ভাগ্যের মধ্যে দুর্বিষহ জীবনযাপন করত। তারা যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর পেছনে পায়ে হেঁটে যাত্রা করত। তাদেরকে এমনভাবে মর্যাদাহীন বলে গণ্য করা হতো যেন তাদের ললাটে চিরকালের জন্য দাসত্ব লিখে দেয়া হয়েছে। তারা তাদের শ্রমের বিনিময়ে কোন মজুরি লাভ করত না।”66

সাসানী সাম্রাজ্যের একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণী যারা জনসংখ্যায় শতকরা 1.5 ভাগের কম ছিল তারাই সব কিছুর অধিকারী ছিল। কিন্তু ইরানের জনসংখ্যার শতকরা 98 ভাগের বেশি দাসশ্রেণীর মতো জীবনের সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

অভিজাতশ্রেণীই শিক্ষাগ্রহণের অধিকার রাখত

সাসানী যুগে কেবল অভিজাত ও উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন শিশুরাই বিদ্যার্জন করার অধিকার রাখত। সাধারণ জনতা ও সমাজের মধ্যবিত্তশ্রেণী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রাচীন ইরানের সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় এ ত্রুটি এতটা প্রকট ছিল যে,এমনকি শাহনামা’ও রাজা-বাদশাদের উপাখ্যান রচয়িতাগণ যাঁদের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে বীরত্বগাথা রচনা করা তাঁরাও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন।

ইরানের বীরত্বগাথা রচয়িতা কবি ফেরদৌসী শাহনামা য় একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন যা এ বিষয়টির সর্বোত্তম সাক্ষ্য-প্রমাণ। কাহিনীটি সম্রাট আনুশীরওয়ানের শাসনামল অর্থাৎ যখন সাসানী সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ তখন সংঘটিত হয়েছিল। এ কাহিনী থেকে প্রমাণিত হয়ে যায় যে,তাঁর শাসনামলে প্রায় সকল অধিবাসীরই শিক্ষা ও বিদ্যার্জন করার অধিকার ছিল না,এমনকি জ্ঞানপ্রেমিক সম্রাট আনুশীরওয়ানও অন্যান্য শ্রেণীর জনসাধারণকে জ্ঞানার্জনের অধিকার দিতে প্রস্তুত ছিলেন না।

ফেরদৌসী লিখেছেন : ইরান ও রোমের যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য একজন জুতা নির্মাতা (মুচি) তার স্বর্ণ ও রূপার ভাণ্ডার দান করতে চেয়েছিল। সে সময় সম্রাট আনুশীরওয়ান আর্থিক সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিলেন। কারণ ইরানের প্রায় তিন লক্ষ সৈন্য তখন তীব্র খাদ্য ও অস্ত্র সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছিল। সম্রাট আনুশীরওয়ান এ অবস্থার কারণে খুবই উদ্বিগ্ন এবং তাঁর নিজ পরিণতি সম্পর্কেও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সম্রাট তাৎক্ষণিকভাবে জ্ঞানী প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করার জন্য ডেকে পাঠিয়ে নির্দেশ দেন যেন তিনি মাযেনদারান গমন করে যুদ্ধের খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু বুযুর্গমেহের সম্রাটকে বললেন, বিপদ অত্যাসন্ন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে একটি উপায় খুঁজে বের করা আবশ্যক।” তখন বুযুর্গমেহের জাতীয় ঋণ’অর্থাৎ জাতির কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার পরামর্শ দিলেন। সম্রাট আনুশীরওয়ানও তাঁর এ প্রস্তাবটি পছন্দ করলেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশও জারী করলেন। বুযুর্গমেহের নিকটবর্তী শহর,গ্রাম ও জনপদে রাজকীয় কর্মকর্তাদের প্রেরণ করে ঐ সকল স্থানের সচ্ছল ব্যক্তিদের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে অবগত করলেন।

তখন একজন জুতা নির্মাতা যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সে যা চেয়েছিল তা হলো : এর বিনিময়ে তার একমাত্র পুত্রসন্তান যে লেখাপড়া শিখতে অত্যন্ত আগ্রহী তাকে যেন লেখাপড়া শেখার অনুমতি দেয়া হয়। বুযুর্গমেহের ঐ মুচির আবেদনকে তার দানের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করেন এবং সম্রাটের কাছে ফিরে গিয়ে তার আর্জি সম্পর্কে সম্রাটকে অবহিত করেন। আনুশীরওয়ান এ কথা শুনে খুব রেগে যান এবং প্রধানমন্ত্রী বুযুর্গমেহেরকে তিরস্কার করে বলেন, তুমি এ কেমন আবেদন করছ? এ কাজ কল্যাণকর নয়। কারণ যে শ্রেণীবিন্যাসের আওতায় সে রয়েছে তা থেকে তার বের হয়ে আসার মাধ্যমে দেশের শ্রেণীপ্রথা ধসে পড়বে এবং তখন সে যে স্বর্ণ ও রৌপ্য দান করছে তার মূল্যমান অপেক্ষা তার এ আর্জি অনেক বেশি ক্ষতি বয়ে আনবে।”

এরপর ফেরদৌসী সম্রাট আনুশীরওয়ানের কণ্ঠে তাঁর (সম্রাটের) মেকিয়াভ্যালি দর্শন’ব্যাখ্যা করেছেন:

বণিকপুত্র যদি হয় সচিব

গুণী,জ্ঞানী ও শিক্ষানবীশ

তাই যখন বসবে মোদের যুবরাজ সিংহাসন পরি

অবশ্যই পাবে সে তখন এক (দক্ষ ও গুণী) ভাগ্যমান সহকারী

আর কভু যদি মোজা বিক্রেতা করে এ গুণ ও জ্ঞান অর্জন

এ জ্ঞান দেবে তারে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন চক্ষু

আর নীচ বংশজাত জ্ঞানীকে দেবে অনুধাবনকারী কর্ণ

ব্যস্,তখন পরিতাপ ও শীতল বায়ু ছাড়া রইবে না আর কিছু।

এভাবেই ন্যায়পরায়ণ (!) বাদশার নির্দেশে জুতা নির্মাতা লোকটির টাকা-পয়সা ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ হতভাগা জুতা নির্মাতা তীব্র মনঃকষ্ট পায় এবং সে রাতের বেলা ন্যায়বিচারক স্রষ্টার দরবারে দু হাত উঠিয়ে এ ধরনের অত্যাচার ও ন্যায্য অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রার্থনা করে-যা হচ্ছে মজলুমদেরই রীতি। আর এভাবে সে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচারের ঘণ্টা ধ্বনিত করে।

প্রেরিত দূত ফিরে আসল এবং ঐ দিরহামগুলো দেখতে পেয়ে

ঐ মুচির অন্তর হলো তীব্র দুঃখভারাক্রান্ত

রাত হলে শাহের কথায় হলো সে দুঃখভারাক্রান্ত

মহান আল্লাহর দরবারে সে চাইল ঐশী আদালতের ঘণ্টাধ্বনি ধ্বনিত হোক। 67

এত কিছু সত্ত্বেও সম্রাট আনুশীরওয়ানের বিশাল প্রচারমাধ্যম ও প্রশাসন তাঁকে ন্যায়পরায়ণ বলে আখ্যায়িত করতে এবং ইরানী সমাজকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু তথাকথিত ন্যায়পরায়ণ এ শাহ তদানীন্তন ইরানী সমাজের মৌলিক সমস্যার জট খুলতে তো সক্ষম হননি;বরং ইরানীদের প্রভূত সামাজিক সমস্যার কারণও হয়েছিলেন। কেবল মাযদাক গোলযোগের ঘটনায় আশি হাজার এবং অপর একটি অভিমত অনুযায়ী এক লক্ষ ইরানীকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি ধারণা করেছিলেন যে,উক্ত ফিতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে।68 অথচ এ ফিতনা যে মূলোৎপাটিত হয় নি তা তিনি মোটেও উপলব্ধি করতে পারেন নি। এ ধরনের শাস্তি আসলে ফলাফলের অস্তিত্ব নিশ্চি‎‎ হ্ন করে দেয়,তা কারণের অস্তিত্ব বিলোপ করে না। এ হচ্ছে পাপীদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সংগ্রাম-পাপ ও অপরাধের বিরুদ্ধে নয়। ফিতনার মূল কারণই ছিল সমাজে ভারসাম্যহীনতা,শ্রেণীবৈষম্য,দ্বন্দ্ব,বিশেষ একটি শ্রেণী কর্তৃক সম্পদ ও পদমর্যাদা কুক্ষিগতকরণ,নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা এবং অপরাপর দুর্নীতি ও অপরাধ। আর সম্রাট আনুশীরওয়ান অস্ত্র বল ও চাপ প্রয়োগ করে চাইতেন যে,জনগণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করুক।

এডওয়ার্ড ব্রাউন সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে লিখেছেন : সম্রাট আনুশীরওয়ান নাস্তিকদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি যারথুস্ত্রীয় (যারদোশ্ত) ধর্মযাজকদের প্রশংসা ও সম্মতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর ঐ সব ধর্মযাজকের হাতেই জাতীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে...।”69   এ সব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃত ইতিহাসে সম্রাট আনুশিরওয়ানকে ন্যায়পরায়ণতা ও মানবতার পূর্ণ আদর্শ এক সম্রাট হিসাবে পরিচিত করানো হয়েছে। এ ব্যাপারে অনেক কাহিনীও রচনা করা হয়েছে।

খুবই আশ্চর্যজনক! এ দীর্ঘ সময় একমাত্র একটি বৃদ্ধ গাধা ব্যতীত আর কোন মজলুমই ন্যায়বিচারের ঘণ্টা বাজায় নি,অবশ্য এটিও জ্ঞাত বিষয় যে,ঐ গাধাটি তার নিজের সাহসের অপরাধের কথা জানত না;আর যদি সে তা জানত তাহলে সে ঘুণাক্ষরেও ন্যায়পরায়ণতার রজ্জুর নিকটবর্তী হতো না!!

আরো বলা হয় যে,একবার রোমের বাদশাহ্,আজম অর্থাৎ ইরানের বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের কাছে এক দূত প্রেরণ করেছিলেন। যখন ঐ দূত ইরানের বাদশার শানশওকত এবং বিশাল তাক-ই কিসরা প্রত্যক্ষ করলেন তখন তিনি দেখতে পেলেন যে,ইরানের বাদশাহ্ সিংহাসনে উপবিষ্ট;আর রাজারা তাঁর দরবারে উপস্থিত। তিনি এক ঝলক দৃষ্টি শাহী দ্বারমণ্ডপের ওপর নিবদ্ধ করলে উক্ত দ্বারমণ্ডপটি তাঁর দৃষ্টিতে খুবই জমকালো ও জাঁকজমকপূর্ণ বলে মনে হয়। কিন্তু ঐ দ্বারমণ্ডপের চারপাশ যেন একটু বাঁকা। দূত তখন দরবারে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা তাঁকে বলেছিলেন : দ্বারমণ্ডপে যে সামান্য বক্রতা আপনি দেখতে পাচ্ছেন আসলে এর কারণ হচ্ছে এখানে এক বৃদ্ধার ঘর ছিল যা বাদশাহ্ কিনে নিয়ে দ্বারমণ্ডপের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঐ বৃদ্ধা তার ঘর বিক্রি করতে রাজী না হওয়ায় বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানও তাকে বিক্রি করতে বাধ্য করেন নি। তাই ঐ বৃদ্ধার বাড়িটিই অবশেষে এ দ্বারমণ্ডপটির বক্রতার কারণ হয়েছে। তখন ঐ দূত শপথ করে বললেন যে,দ্বারমণ্ডপের এই বক্রতা আসলে এর সরল ও অবক্র হওয়া অপেক্ষা শ্রেয়।70

এটি আশ্চর্যজনক যে,এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ভবন ও দ্বারমণ্ডপ যে ব্যক্তি নির্মাণ করতে ইচ্ছুক তিনি কি পূর্ব থেকেই এর নকশা সংগ্রহ করবেন না এবং নকশা ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ভূমি ব্যতীতই কেউ কি এ ধরনের ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে! আর এর ফলে শাহী প্রাসাদ বাঁকা হবে। এ কি কখনো বিশ্বাস করা যায়?

আসলে এ ধরনের গালগল্প সম্রাটের দরবারের ব্যক্তিবর্গ ও যারথুস্ত্রীয় ধর্মযাজকগণ,মাযদাকী মতাবলম্বীদের দমন করে সম্রাট তাঁদের স্বার্থে যে মহামূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন সে কারণেই তাঁরা সম্রাটের অনুকূলেই রচনা করে থাকতে পারেন।

‘ইরান ও ইসলাম’গ্রন্থের লেখকের অভিমত অনুসারে এ সব কিছুর চেয়েও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই যে,কেউ কেউ সম্রাট আনুশীরওয়ানের ন্যায়পরায়ণতাকে শারয়ী ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণ করার জন্য এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের সূত্র থেকেও হাদীস বর্ণনা করতে বাধ্য হয়েছে। যেমন :ولدت في زمن الملك العادل আমি ন্যায়পরায়ণ বাদশার রাজত্বকালে জন্মগ্রহণ করেছি।”-প্রসিদ্ধ এ হাদীসটি। মহানবী (সা.) যেন এ কথা বলতে গর্ববোধ করতেন যে,তিনি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ্ আনুশীরওয়ানের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছেন,অথচ মহানবীর সাথে তাঁর (বাদশার) ন্যায়পরায়ণতার কি কোন সম্পর্ক আছে?

অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : হযরত আলী মাদায়েনে এসে কিসরার প্রাসাদে গমন করলেন। সেখানে তিনি আনুশীরওয়ানকে জীবিত করে তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তখন হযরত আলীকে বলেছিলেন যে,কুফ্রী করার কারণে তিনি বেহেশত থেকে বঞ্চিত হয়েছেন,তবে ন্যায়পরায়ণ হবার কারণে জাহান্নামে শাস্তিপ্রাপ্তও হচ্ছেন না।71 এখন আমরা পর্যালোচনা করব যে,সাসানীরা কি ধরনের অত্যাচার করেছে।

খসরু পারভেজের অপরাধসমূহের পর্দা উন্মোচন

সম্রাট খসরু পারভেজের অত্যাচারমূলক ও পাগলামিপূর্ণ আরেকটি কাজ ছিল প্রসিদ্ধ বুযুর্গমেহেরের সাথে তাঁর আচরণ। এ বুযুর্গমেহের আনুশীরওয়ানের দরবারে 13 বছর কর্মরত ছিলেন এবং তিনি প্রভূত যশ ও খ্যাতির অধিকারী হয়েছিলেন। অবশেষে সম্রাট খসরু পারভেজ তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সম্রাট কারাগারে বন্দী বুযুর্গমেহেরের কাছে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন : তোমার জ্ঞান,বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা অবশেষে তোমারই নিহত হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।” বুযুর্গমেহেরও উত্তরে লিখেছিলেন : যে পর্যন্ত ভাগ্য আমার প্রতি প্রসন্ন ছিল সে পর্যন্ত আমি আমার বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়েছি। এখন যখন ভাগ্য আমার অনুকূলে নেই তখন আমার ধৈর্য ও সহ্যশক্তিকে কাজে লাগাব। আমার হাত দিয়ে যদি অগণিত সৎকর্মসম্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে আমি আমার মন্দ কাজ থেকেও নিরাপদ ও নিশ্চিত হয়েছি। আমার কাছ থেকে মন্ত্রিত্ব পদ কেড়ে নেয়া হলেও আমা থেকে ঐ পদের অসংখ্য অন্যায় ও অত্যাচারের দুঃখ-কষ্টও দূর করা হয়েছে। অতএব,আমার আর ভয় কিসে?

যখন সম্রাট খসরু পারভেজের হাতে বুযুর্গমেহেরের উক্ত চিঠি পৌঁছালো তখন সম্রাট বুযুর্গমেহেরের নাক ও ঠোঁট কেটে ফেলার আদেশ দিলেন। যখন বুযুর্গমেহেরকে সম্রাটের এ আদেশ শুনানো হলো তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন : আমার ঠোঁট এর চেয়ে আরোও বেশি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।” সম্রাট খসরু পারভেজ তখন জিজ্ঞাসা করলেন : কি কারণে? বুযুর্গমেহের তখন বললেন : যেহেতু আপামর জনতার কাছে তোমার এমন সব গুণের প্রশংসা করেছি যা তোমার ছিল না এবং অসন্তুষ্ট অন্তঃকরণসমূহকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম। আমি তোমার এমন সব ভালো কাজ ও পুণ্যের কথা জনগণের মধ্যে প্রচার করেছি যার উপযুক্ত তুমি ছিলে না। হে নিকৃষ্ট অসৎকর্মশীল সম্রাট! যদিও আমার সততার ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত এতদ্সত্ত্বেও আমাকে কুধারণার বশবর্তী হয়ে হত্যা করছ? অতএব,তোমার কাছে সুবিচার আশা করা এবং তোমার কথায় ভরসা করা যায় কি?

সম্রাট খসরু পারভেজ বুযুর্গমেহেরের কথায় খুবই উত্তেজিত হয়ে তাঁর শিরচ্ছেদ করার আদেশ দিলেন।72

‘ইরানের সামাজিক ইতিহাস’গ্রন্থের রচয়িতা-যিনি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা সাসানী যুগের অরাজকতা,অধঃপতিত অবস্থা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল দেশের অভিজাতশ্রেণীর জন্য শিক্ষাগ্রহণের অধিকার ও সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়টি এভাবে চিত্রিত করেছেন :

“এ যুগে তখনকার প্রচলিত সকল জ্ঞান ও শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং শিক্ষা কেবল পুরোহিত,যাজক ও অভিজাতশ্রেণীর সন্তানগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল;আর ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।”73

হ্যাঁ,এ জাহেলী প্রথা সাসানী সম্রাটদের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। আর তাঁরা কোনভাবেই এ বিষয়টি পরিহার করতে চাইতেন না ।

এ কারণেই সৌভাগ্য ও সুখের ক্রোড়ে প্রতিপালিত এ সংখ্যালঘু শ্রেণীটির অপরিপক্ব ও অসংযত প্রবৃত্তি ও রিপুর কামনা-বাসনা ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে জ্ঞানার্জনের অধিকারসহ সকল বৈধ সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল।


22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35