জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা5%

জীবন জিজ্ঞাসা লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

জীবন জিজ্ঞাসা
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 58 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42103 / ডাউনলোড: 4627
সাইজ সাইজ সাইজ
জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

ইজতিহাদে মতপার্থক্য ও তার ক্ষেত্র

হাদীছ সংকলনের ও হাদীছ-বর্ণনাকারীর গ্রহণযোগ্যতা ও অগ্রহণযোগ্যতা এবং হাদীছ পরীক্ষার মূলনীতি ও ইজতিহাদের মূলনীতি প্রশ্নে মতপার্থক্য সহ বিভিন্ন কারণে অনেক বিষয়ে বিভিন্ন মুজতাহিদের রায়ে বিভিন্নতা দেখা যায়।

এছাড়া যারা ইজতিহাদের বিরোধী ও শুধু কোরআন-হাদীছের অনুসরণের পক্ষপাতী এবং এ হিসেবে নিজেদেরকে হাদীছপন্থী (আহলে হাদীছ) বলে অভিহিত করে থাকে তাদের মধ্যেও একাধিক গোষ্ঠী রয়েছে , যেমন: সুন্নী ধারার হাদীছপন্থীরা আহলে হাদীছ নামে এবং শিয়া ধারার হাদীছপন্থীরা আখবারী নামে পরিচিত।

সুন্নী ধারার আহলে হাদীছ গোষ্ঠীর মধ্যে এমনও অনেকে আছে যারা আহ্কামের ক্ষেত্রে কোরআনকে বাদ দিয়ে শুধু হাদীছকেই যথেষ্ট গণ্য করে এবং কোরআনকে শুধু তেলাওয়াত করে থাকে। কারণ , তাদের কথা , হাদীছ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) কর্তৃক কোরআনের মৌখিক ও কার্যতঃ ব্যাখ্যা। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে সচেতন নয় যে , যা কিছুই রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর নামে বর্ণিত হয়েছে তার সব কিছুই সত্যি সতিই তাঁর থেকে এসেছে এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয়ার উপায় নেই ।

এ সব গোষ্ঠীর মধ্যকার মতপার্থক্যের কারণ , ক্ষেত্র ও গুরুত্ব নির্ণয় এবং এ থেকে উদ্ভূত সমস্যা নিরসনের পন্থার ওপর সংক্ষেপে হলেও আলোকপাত করা অপরিহার্য বলে মনে হয়। আমরা ইতিপূর্বে হাদীছ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পূর্বশর্তাবলী উল্লেখ করেছি। এখানে আরো কতোগুলো বিষয় উল্লেখ করছি।

এ প্রসঙ্গে প্রথমেই মানব জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ইসলাম প্রদত্ত বিধিবিধান সমূহের মধ্যকার প্রকৃতিগত পার্থক্যের ওপর আলোকপাত করতে হয়।

ইবাদত সংক্রান্ত বিধিবিধানের কোনো প্রাকৃতিক মানদণ্ড নেই ; এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত এবং তাঁর অনুমোদন সাপেক্ষে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) কর্তৃক নির্ধারিত বিধিবিধানসমূহই চূড়ান্ত। কারণ , এ সব বিধিবিধানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ্ তা আলার প্রতি বান্দাহর আনুগত্য পরীক্ষা করা। এ কারণে , যে সব আদেশ প্রদান করা হয়েছে তার পরিবর্তে যদি ভিন্ন ধরনের কোনো আদেশ দেয়া হতো তাহলে বান্দাহর জন্য তা-ই মেনে চলা অপরিহার্য হতো। তাই এ জাতীয় আদেশের পিছনে কোনো বাস্তব বা পার্থিব কারণ অনুসন্ধান করা অনুচিত। যদিও এ ধরনের কোনো কোনো বিধান পালনের পার্থিব সুফল অনুসন্ধান করলে অনেক সুফল আবিষ্কৃত হতে পারে , কিন্তু এ সব সুফলের লক্ষ্যেই এ আদেশ দেয়া হয়েছে বলে মনে করলে ভুল হবে এবং এ সব সুফল পাওয়ার উদ্দেশ্যে আদেশ পালন করলে তা ইবাদত বলে গণ্য হবে না অর্থাৎ প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ্ তা আলার আদেশ পালন করা হবে না।

কতগুলো বিধিবিধান প্রাকৃতিক মানদণ্ডের ওপর ভিত্তিশীল। যেমন: খাদ্যদ্রব্যের হালাল-হারামের বিষয়টি। মানুষের শরীর , মন , নৈতিকতা ও চরিত্রের মধ্য থেকে একটির ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়বে না এমন কোনো বস্তুকে হারাম করবেন অথবা বিরূপ প্রভাব পড়বে এমন কোনো বস্তুকে হালাল করবেন - এরূপ দুর্বলতা থেকে আল্লাহ্ তা আলা প্রমুক্ত। অতএব , সন্দেহ নেই যে , হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) পর্যন্ত এ তালিকা অভিন্ন। অবশ্য কখনো কোনো জনগোষ্ঠীর আনুগত্য পরীক্ষা করা বা কোনো অপরাধের শাস্তিস্বরূপ শুধু ঐ জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো চিরন্তন হালাল বস্তুকে সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে হারাম করা হতে পারে , সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী ও মেয়াদের বাইরে যার কোনো কার্যকরিতা থাকে না এবং যে সম্পর্কে জানা থাকে যে , পরীক্ষা বা শাস্তির উদ্দেশ্যেই সংশ্লিষ্ট বস্তুকে হারাম করা হয়েছে।

সামাজিক বিধিবিধান। এ ক্ষেত্রে স্থান-কাল ও পরিস্থিতির পরিবর্তনশীলতার প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা আলা কতক সাধারণ মূলনীতি ও কতক গুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রদান করেছেন ; অবশিষ্ট বিষয়গুলো হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের এখতিয়ারে এবং প্রচলিত রীতিপ্রথার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। যেমন: বিবাহে দেনমোহর ও নাফাক্বাহ্ (ভরণ-পোষণ)-এর বিধান দেয়া হয়েছে , কিন্তু তার পরিমাণ রীতিপ্রথা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক অবস্থা ও সামাজিক অবস্থানের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রায় অনুরূপ অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। যেমন: কোরআন মজীদে মীরাছ বণ্টনের সুনির্দিষ্ট বিধান দেয়া হয়েছে ও খুমস্ সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে , কিন্তু যাকাত ফরয করা হলেও তার নেছ্বাব্ ও হার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় নি , বরং তা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছে।

দণ্ডবিধির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। কতক ক্ষেত্রে কোরআন মজীদে সুনির্দিষ্ট বিধান দেয়া হয়েছে এবং কতক ক্ষেত্রে বিষয়টি হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন: বিবাহিত স্বাধীন নারী-পুরুষের যেনা বা ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে প্রস্তরাঘাতে হত্যার বিধান কোরআন মজীদে নেই ,১৯ কিন্তু হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) যে এ শাস্তি কার্যকর করতেন সে ব্যাপারে দ্বিমত নেই।

রাজনৈতিক , কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে কতক স্থায়ী মূলনীতি প্রদান করে বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয় - যা তাঁর অবর্তমানে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ও উত্তরাধিকারীদের অধিকার।

এবার ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক। তা হচ্ছে , আল্লাহ্ তা আলা যে সব মৌলিক দায়িত্ব পালনের জন্য নবী-রাসূলগণকে (আঃ) প্রেরণ করেন তা সংক্ষেপে তিনটি: (১) মানুষের নিকট জীবন ও জগতের অন্তরালে নিহিত মহাসত্য সম্পর্কে সঠিক বিষয় তুলে ধরা ও তার প্রচার , (২) আল্লাহ্ তা আলা মানুষের জন্য যে সব কাজ অপরিহার্য কর্তব্য (ফরয) রূপে নির্ধারণ করেছেন ও যে সব কাজ নিষেধ (হারাম) করেছেন তা জানিয়ে দেয়া এবং (৩) নবীর দাও আত্ গ্রহণকারীদের নেতৃত্ব দান ও পরিচালনা।

এখানে দ্বিতীয় বিষয়টি সম্পর্কে বলতে হয় যে , ফরয ও হারাম সম্পর্কে জানানো যেহেতু নবীর মৌলিক দায়িত্ব সেহেতু নবী তাঁর অনুসারীদেরকে সর্বজনীনভাবেই তা অবগত করাবেন ; এ বিষয়ে তিনি তাঁর অল্প সংখ্যক অনুসারীকে জানাবেন তা সম্ভব নয়। অতএব , আমরা এ উপসংহারে উপনীত হতে পারি যে , চারটি সূত্রে ফরয ও হারাম প্রমাণিত হতে পারে: (১) কোরআন মজীদের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা , (২) হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর যুগ থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা উম্মাহর অভিন্ন আমল (ইজমা ), (৩) মুতাওয়াতির হাদীছ ও (৪) আক্বলের অকাট্য রায়। অর্থাৎ খবরে ওয়াহেদ হাদীছ দ্বারা ফরয বা হারাম প্রমাণিত হয় না। অবশ্য খবরে ওয়াহেদ হাদীছের অন্যবিধ গুরুত্বপূর্ণ বহু ক্ষেত্র রয়েছে , যেমন: জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্য সম্বলিত হাদীছ এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট ছোটখাটো বা বিস্তারিত বিধান সংশ্লিষ্ট হাদীছ।

আল্লাহ্ তা আলা যা কিছু ফরয করেছেন তা সম্পাদন না করলে বান্দাহ্ অবশ্যই শাস্তিযোগ্য হবে এবং তিনি যা কিছু হারাম করেছেন সে সব কাজ সম্পাদন করলেও শাস্তিযোগ্য হবে (যদিও অন্যের অধিকার হরণ বা বিনষ্ট বা লঙ্ঘন করা ব্যতীত যে সব অপরাধ করা হয়েছে আন্তরিক অনুতাপ সহ তার পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকলে আল্লাহ্ তা আলা তার শাস্তি মওকুফ করে দেবেন)। এই ফরয ও হারাম ব্যতিরেকে মানব জীবনের বাকী সকল ক্ষেত্রে বান্দাহ্ পুরোপুরি স্বাধীন। অবশ্য এই স্বাধীন ক্ষেত্রের মধ্যে কতক কাজ ফরয না হলেও উত্তম , কল্যাণকর ও আল্লাহ্ তা আলার পসন্দনীয় ; হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) এ ধরনের কাজ সম্পাদন করতেন ও তা করার জন্য অন্যদেরকে উৎসাহিত করতেন এবং যে সব কাজ হারাম না হলেও অপসন্দনীয় ও রুচিবিগর্হিত , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) তা থেকে বিরত থাকতেন ও তাঁর অপসন্দ প্রকাশ করতেন। এ ধরনের বিষয়ের বেশীর ভাগই খবরে ওয়াহেদ হাদীছে পাওয়া যায়।

এই শেষোক্ত বিষয় সমূহে অর্থাৎ পসন্দনীয় ও অপসন্দনীয় বিষয়সমূহে ক্ষেত্রবিশেষে তথ্যগত মতপার্থক্য রয়েছে এবং ক্ষেত্র-বিশেষে তথ্যগত মতপার্থক্য না থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ তথা হাদীছের ব্যবহারিক দিক নির্ণয়ে মতপার্থক্য হয়েছে। অর্থাৎ কোনো বিষয়কে কেউ হয়তো ফরয অর্থে গ্রহণ করেছেন , আবার কেউ পসন্দনীয় অর্থে গ্রহণ করছেন। তেমনি কোনো বিষয়কে কেউ হারাম অর্থে গ্রহণ করেছেন , আবার কেউ অপসন্দনীয় অর্থে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সঠিক কথা হচ্ছে এই যে , বিতর্কিত মতামত দ্বারা ফরয বা হারাম নির্ধারিত হয় না। কারণ , আল্লাহ্ তা আলা বা তাঁর পক্ষ থেকে তাঁর রাসূল (ছ্বাঃ) কোনো কাজকে ফরয বা হারাম বলে নির্ধারণ করলে তা খবরে ওয়াহেদ হাদীছের মতো খুবই সীমিত সংখ্যক সূত্রের বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো না।

কতগুলো মতপার্থক্য ঘটেছে বিস্তারিত বা বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে অথবা গৌণ বিষয়ে , অথবা একটি বিষয় আদৌ বিধান হিসেবে গণ্য কিনা সে ব্যাপারে। যেমন: দৈনিক পাঁচ ওয়াক্তে সতেরো রাক্ আত্ নামায ফরয হবার ব্যাপারে বিতর্ক নেই , নামাযের পূর্বপ্রস্তুতি ও নামাযের মধ্যকার ফরয কাজগুলো নিয়েও বিতর্ক নেই। কিন্তু সূরা ফাতেহার পরে একটি পুরো সূরা পড়তে হবে , নাকি আংশিক পড়লেই যথেষ্ট হবে - এ ব্যাপারে বিতর্ক আছে। এ বিতর্কই প্রমাণ করে যে , বিষয়টি ফরয সংক্রান্ত নয় , অর্থাৎ পূর্ণ সূরা পড়া অপরিহার্য নয়। কারণ , অপরিহার্য হলে স্বয়ং হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর যুগ থেকে এ ব্যাপারে মুসলমানদের ধারণা ও আমল অভিন্ন হতো এবং বিতর্কের সৃষ্টি হতো না। তেমনি নামাযের তাশাহ্হুদ্ , দরূদ ও সালামের বাক্যাবলীতে শব্দগত বিভিন্নতা দেখা যায় - যা প্রমাণ করে যে , এর মূল বিষয়টা যরূরী , তবে এর শব্দাবলীতে বিভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক রাক্ আতে সূরা ফাতেহার পূর্বে বিসমিল্লাহির্ রাহমানির রাহীম পড়তে হবে কিনা সে প্রশ্নের সমাধান আক্বলী দলীলের দ্বারা করতে হবে। তা হচ্ছে , যেহেতু সূরা তাওবাহর শুরুতে বিসমিল্লাহ্ নেই সেহেতু অন্যান্য সূরার শুরুতে যে বিসমিল্লাহ্ রয়েছে তা ঐ সব সূরার (সূরা ফাতেহাহ্ সহ) অংশ , অতএব , তা না পড়লে ঐ সব সূরা পাঠ সম্পূর্ণ হবে না।

নামাযের ভিতরে পঠনীয় তাশাহ্হুদ্ ও দরূদের পাঠে মতপার্থক্য থেকে বুঝা যায় যে , হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শব্দাবলী ব্যবহার করেছেন ; এ ব্যাপারে তিনি সব সময় অভিন্ন শব্দাবলী ব্যবহার করলে মতপার্থক্য হতো না। তেমনি নামাযে হাত কী অবস্থায় থাকবে তার সাথে নামাযের আদৌ কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে বলে মনে হয় না। তাই এ ব্যাপারে তিন ধরনের মত ও আমল দেখা যায় , তবে কেউই বিষয়টিকে নামাযের অন্যতম ফরয কাজ বলে গণ্য করেন না বা তাঁদের মতের অন্যথা হলে নামায বাতিল হয়ে যাবে বলেও মনে করেন না। তা সত্ত্বেও অনেকে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবড়ি করে থাকেন যা বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মতপার্থক্যের কতগুলো বিষয় হচ্ছে সামাজিক , অর্থনৈতিক ও বিচার-ফয়সালা সংক্রান্ত। এ সব ক্ষেত্রে সাধারণতঃ বিভিন্ন হাদীছে প্রাপ্ত তথ্যাদির মধ্যকার পার্থক্য থেকে মতপার্থক্য ঘটেছে। যেমন: কোনো কোনো দ্রব্যে যাকাত প্রযোজ্য হওয়া বা না-হওয়া প্রশ্নে মতপার্থক্য। কিন্তু এ জাতীয় শাখাগত বিধান যেহেতু সরাসরি আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত নয় , সেহেতু নিঃসন্দেহে তা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর এখ্তিয়ারাধীন বিষয় ছিলো। এ কারণে হয়তো তিনি বিভিন্ন সময়ে গৃহীত সিদ্ধান্তে পার্থক্য করে থাকবেন। হয়তো তিনি কোনো এক সময় একটি দ্রব্যের ওপর যাকাত আরোপ করে থাকবেন এবং অন্য এক সময় তিনি দ্রব্যটিকে যাকাত-বহির্ভূত রেখে থাকবেন। অথবা হয়তো বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় তিনি একই দ্রব্যের ক্ষেত্রে কারো কাছ থেকে যাকাত গ্রহণ করে থাকবেন এবং কাউকে ঐ বস্তুর জন্য যাকাত প্রদান থেকে রেহাই দিয়ে থাকবেন।

বলা বাহুল্য যে , আর্থ-সামাজিক বিষয়ে স্বীয় এখ্তিয়ারাধীন ক্ষেত্রে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর জন্য বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখ্তিয়ার ছিলো এবং এরূপ ক্ষেত্রে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর উত্তরাধিকারীদের জন্যও বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখ্তিয়ার রয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রায়োগিক ব্যাপারে , ইতিপূর্বে খবরে ওয়াহেদ্ হাদীছ গ্রহণের জন্য যে সব শর্তের উল্লেখ করা হয়েছে তা পূরণ সাপেক্ষে বিভিন্ন হাদীছের মধ্য থেকে যার কাছে যেটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য মনে হয় তিনি সেটির অনুসরণ করলে বা স্বীয় বিবেচনা অনুযায়ী নতুন সিদ্ধান্ত নিলেও অসুবিধা নেই।

আল্লাহ্ তা আলা যেভাবে ধরণীর বুকে তাঁর প্রকৃত প্রতিনিধি নবী-রাসূলগণকে (আঃ) বিধিবিধানের ক্ষেত্রে পুরোপুরি হাত-পা বেঁধে দেন নি , বরং কিছু ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখ্তিয়ার দিয়েছেন , তেমনি তিনি নবী-রাসূলগণের (আঃ) উত্তরাধিকারী ও প্রতিনিধিগণকেও পুরোপুরি হাত-পা বেঁধে দেন নি , যদিও তাঁদের স্বাধীন এখ্তিয়ারের ক্ষেত্র অবশ্যই নবী-রাসূলগণের (আঃ) স্বাধীন এখতিয়ারের ক্ষেত্রের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সঙ্কুচিত এবং নবী-রাসূলগণের (আঃ) এখ্তিয়ার আল্লাহ্ তা আলার বিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ হলেও তাঁদের এখ্তিয়ার একই সাথে সংশ্লিষ্ট নবীর অকাট্য ও শর ঈ বিধান দ্বারাও সীমাবদ্ধ।

কিন্তু নবীর উত্তরাধিকারী ও প্রতিনিধি যখন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদির আওতাভুক্ত কোনো বিষয়ে নবীর সিদ্ধান্তটিকে নীতিগত বা শর ঈ সিদ্ধান্ত নয় , বরং সমাজনেতা ও রাষ্ট্রনেতা হিসেবে তাঁর পক্ষ থেকে আর্থ-সামাজিক বা রাজনৈতিক গৌণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে পান - যা বিশেষ স্থান , কাল বা পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কযুক্ত , সে ক্ষেত্রে তিনি যথাযথ মনে করলে স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তও গ্রহণ করতে পারেন , যদিও নবীর সিদ্ধান্তের হুবহু অনুসরণ ও বাস্তবায়নে কোনো অসুবিধা না হলে তিনি তাকেই অগ্রাধিকার দেবেন।

এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) তাঁর পালকপুত্র হযরত যায়দ্কে (রাঃ) স্বীয় স্ত্রীকে ত্বালাক্ব দেয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু এরপরও যায়দ্ (রাঃ) স্বীয় স্ত্রীকে ত্বালাক্ব দিয়েছিলেন। কারণ , হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর এ নিষেধ কোনো শর ঈ নির্দেশ ছিলো না , বরং তাঁর এ নির্দেশ ছিলো যায়দ্ (রাঃ)-এর মুরুব্বী হিসেবে তাঁর কল্যাণকামিতা। যেহেতু আল্লাহ্ তা আলা ত্বালাক্ব দানের অনুমতি দিয়েছেন , অতএব , রাসূলের (ছ্বাঃ) কথা না শুনে স্বীয় স্ত্রীকে ত্বালাক্ব দেয়ায় যায়দ্-এর কোনো গুনাহ্ হয় নি।

যদিও , কোরআন মজীদের ঘোষণা অনুযায়ী , মুসলমানদের ওপর তাদের নিজেদের চেয়েও রাসূলের (ছ্বাঃ) বেশী অধিকার রয়েছে - এ দৃষ্টিতে বলা যেতে পারে যে , যায়দের পক্ষে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর নিষেধ অমান্য করা ঠিক হয় নি। তবে দেখতে হবে যে , এ নিষেধটি কোন্ পর্যায়ের ; নিঃসন্দেহে এ নিষেধ কোনো দৃঢ় পর্যায়ের নিষেধ ছিলো না , বরং এ ছিলো যায়দ্-দম্পতির কল্যাণকামনা থেকে উদ্ভূত নছ্বীহত্ মাত্র যা মেনে নেয়া বা না নেয়ার বিষয়টি তিনি ব্যক্তি যায়দের (রাঃ) ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) একজন ছ্বাহাবীর প্রতি তাঁর কন্যাকে অপর একজন ছ্বাহাবীর (যিনি ছিলেন নিঃস্ব) সাথে বিবাহ দিতে বললে কন্যার পিতা তাতে রাযী হন নি ; এতেও ঐ ছ্বাহাবী কোনো শর ঈ আদেশ লঙ্ঘন করেন নি। কিন্তু মেনে নেয়া অপরিহার্য না হওয়া সত্ত্বেও উক্ত কন্যা কেবল হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) সন্তুষ্ট হবেন বিবেচনায় উক্ত নিঃস্ব ছ্বাহাবীকে বিবাহ করেন। তবে মুসলমানদের ওপর তাদের নিজেদের চেয়েও রাসূলের (ছ্বাঃ) যে বেশী অধিকার , রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক-সামষ্টিক ব্যাপারে তা মুসলমানদের জন্য ফরয পর্যায়ভুক্ত , একান্ত ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে নয়।

এ জাতীয় ঘটনাবলী থেকে প্রমাণিত হয় যে , হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর সকল আদেশ বা কাজই তাঁর উম্মাতের জন্য শর ঈ আদেশ অথবা অপরিহার্যভাবে মেনে চলার পর্যায়ের আদেশ বা অবশ্য অনুসরণীয় কাজ ছিলো না।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে , যেহেতু নবী মু মিনদের ওপর তাদের নিজেদের চেয়েও বেশী অধিকার রাখেন সেহেতু তিনি উম্মাত্ , রাষ্ট্র , সমাজ ও ব্যক্তিদের জন্য কল্যাণ বিবেচনা করলে তাদের ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ করার তথা ব্যক্তিগত অধিকারকে সঙ্কুচিত করার অধিকার রাখেন। অর্থাৎ নবী কাউকে হারাম কাজের নির্দেশ দিতে পারেন না (যা আসলে নবীর পক্ষ থেকে ঘটার প্রশ্নই ওঠে না) , কিন্তু তিনি কল্যাণ বা অপরিহার্য বিবেচনা করলে তাদেরকে হালাল থেকে বিরত রাখার অধিকার রাখেন। উদাহরণস্বরূপ , মূলগতভাবে ইসলামী শরী আতে দু জন মু মিন নর-নারীর মধ্যে বিবাহ অনুমোদিত হলেও নবী ইসলামী রাষ্ট্রের বাইরের কোনো নর-নারীর সাথে (যদিও তারা মুসলিম) ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিবাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন। তবে এটা কোনো স্থায়ী শর ঈ বিধান হবে না , বরং এ হবে সাময়িক রাষ্ট্রীয় বিধান এবং তা কার্যকর রাখা যতোদিন অপরিহার্য বিবেচিত হবে ততোদিন তা কার্যকর থাকবে ; অতঃপর নবী বা তাঁর উত্তরাধিকারী প্রয়োজনবোধে তা তুলে নিতে ও পুনরায় প্রয়োজন হলে তা পুনরায় আরোপ করতে পারেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ , সম্পদ জাতীয়করণ বা ভূমি অধিগ্রহণ এ পর্যায়ের কাজ যে ক্ষেত্রে নবীর যেমন স্বাধীন এখ্তিয়ার রয়েছে , তেমনি নবীর উত্তরাধিকারী বা প্রতিনিধিরও স্বাধীন এখ্তিয়ার রয়েছে।

এছাড়া হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর সুন্নাত্ (তাঁর প্রবর্তিত ঐতিহ্য) নিয়েও মতপার্থক্য হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ , মুসলমান পুরুষদের দাড়ি রাখার প্রশ্নে ওলামায়ে ইসলামের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে , কিন্তু দাড়ি ছাঁটা বা ছোট করা প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। অতএব , সন্দেহ নেই যে , দাড়ি রাখাই সুন্নাত্ , সুনির্দিষ্ট মাপের দাড়ি রাখা সুন্নাত্ নয়। কারণ , সুনির্দিষ্ট মাপের দাড়ি রাখা সুন্নাত্ হলে এ বিষয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হতো না। তেমনি কোরআন মজীদে তাক্ব্ওয়ার পোশাক পরিধান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে , কিন্তু হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) যে লম্বা ঢোলা জামা পরিধান করতেন , তা কি তাক্ব্ওয়ার পোশাক হিসেবে পরতেন , নাকি আরবদের ঐতিহ্য ও আবহাওয়াগত কারণে পরতেন (যাতে অবশ্য তাক্ব্ওয়ার শর্তও পূরণ হতো) - এ ব্যাপারে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু এ ব্যাপারে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে সেহেতু আরবদের পোশাকের মতো পোশাক পরিধান করা যে সুন্নাত্ নয় তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কারণ , তা সুন্নাত্ হলে এ ব্যাপারে মতপার্থক্য সৃষ্টি হতো না।

এ আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে , মতপার্থক্যের বিষয়গুলো মৌলিক বা মুখ্য নয়। তাই এ সব ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকা সম্ভব হয়েছে এবং এসব বিষয়ে মতপার্থক্য থাকায় কোনো সমস্যাও নেই। সমস্যা হয় তখনই যখন এ সব বিষয়ের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয় অথবা এর ভিত্তিতে ফরয বা হারাম নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়।

অবশ্য ইজতিহাদী মতপার্থক্যের কতগুলো বিষয় ইজতিহাদী নীতিমালা নির্ধারণে দুর্বলতা থেকে উৎসারিত। এ বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ইজতিহাদের অব্যাহত চর্চা , মতপার্থক্যের বিষয়গুলোতে পারস্পরিক দলীল-প্রমাণকে আবেগমুক্তভাবে বিশ্লেষণ এবং ইজতিহাদী নীতিমালা ও মুজতাহিদের গুণাবলী সম্পর্কে পুনর্বিবেচনার জন্য মানসিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। অর্থাৎ একজন মুজতাহিদের নিকট যখনই কোনো সত্য উদ্ঘাটিত হবে তখনি তা গ্রহণ করে নেয়ার জন্য তাঁর মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। তেমনি একজন মুজতাহিদ জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখা সমূহে , বিশেষ করে মানবিক বিজ্ঞান সমূহে যতো বেশী ব্যুৎপত্তির অধিকারী হবেন তাঁর পক্ষে বিভিন্ন সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা ও তার সঠিক সমাধান উদ্বাবন করা ততোই সহজতর হবে।

এ কারণে , ইতিপূর্বে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে , একজন মুজতাহিদের জন্য কোরআন নাযিলকালীন ও জাহেলিয়্যাত্ যুগের আরবদের ভাষার ব্যাকরণগত খুটিনাটি বিষয়ের সাথে পরিচিত থাকার পাশাপাশি জ্ঞানতত্ত্ব , তাৎপর্যবিজ্ঞান , ভাষাতত্ত্ব , যুক্তিবিজ্ঞান ও দর্শনে ব্যুৎপত্তির এবং ইসলামের মৌলিক উপস্থাপনা সমূহ (তাওহীদ , আখেরাত্ ও রিসালাত্)কে বিচারবুদ্ধির আলোকে ও কোরআন মজীদের আলোকে পেশ করার যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। এছাড়া তাঁকে পরিবর্তনশীল চলমান জীবন ও জগতের পরিস্থিতি সম্পর্কে সদা অবহিত থাকতে হবে। তাঁকে বিভিন্ন ধারার উছূলে হাদীছ (হাদীছ শাস্ত্রের মূলনীতি) ও দেরায়াতে হাদীছ (হাদীছ পরীক্ষণ শাস্ত্র)-এর মানদণ্ড এবং উছূলে ফিক্বহ্ (ইজতিহাদের মূলনীতি) সম্পর্কে গভীর ধারণার অধিকারী হতে হবে। এভাবে তাঁকে পূর্ববর্তী হাদীছ সংগ্রাহক , হাদীছ বিশেষজ্ঞ ও মুজতাহিদগণের নির্ধারিত উছূলের ভুলত্রুটি চিহ্নিতকরণ ও সংশোধনের যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। কেবল তখনই তাঁর পক্ষে সকল ব্যাপারে প্রায় নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছা ও মতপার্থক্য নিরসনে অবদান রাখা সম্ভব হবে।

কৃতজ্ঞতা

পুরোপুরি বিচারবুদ্ধির আলোকে জীবন ও জগতের অন্তরালে নিহিত মহাসত্য উদ্ঘাটন করে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা সম্ভবতঃ বাংলা ভাষায় এটাই প্রথম। এ পর্যায়ে ইতিপূর্বে বাংলা ভাষায় যে সব গ্রন্থ রচিত হয়েছে তার মধ্যে পুরোপুরি সুবিন্যস্ত ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ , বিশেষ করে বিচারবুদ্ধির ভাবাবেগমুক্ত উপস্থাপন অত্র গ্রন্থকারের চোখে পড়ে নি। তবে বিন্যাসে দুর্বলতা , অপূর্ণাঙ্গতা ও ভাবাবেগের সংমিশ্রণ সত্ত্বেও ইতিপূর্বে এ পথে যারা অবদান রেখেছেন তাঁরা বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। বিশেষ করে সূচনাকারীর গুরুত্ব অনেক বেশী। তাঁদের লেখা দ্বারা আমি যথেষ্ট অনুপ্রাণিত হয়েছি। অন্যদিকে আরবী ও ফার্সী ভাষায় এ বিষয়ে প্রচুর সংখ্যক সুবিন্যস্ত , পূর্ণাঙ্গ ও ভাবাবেগমুক্ত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে । বিশেষ করে ফার্সী ভাষায় লেখা এতদসংক্রান্ত কতক গ্রন্থ লেখককে বিচারবুদ্ধির সুসংহত প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করেছে।

বিচারবুদ্ধির দলীল ব্যক্তিবিশেষের সম্পদ নয় , বরং সর্বজনীন সম্পদ এবং যে কেউ তা অধ্যয়ন করার পর তাকে সঠিক হিসেবে দেখতে পায় তখন তা তার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়ে যায়। এ বিষয়টি অত্র গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছি। তা সত্ত্বেও যে সব মনীষীর এ বিষয়ক লেখা অত্র গ্রন্থকারের বিচারবুদ্ধিকে শানিত করেছে এবং অত্র গ্রন্থ রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে , বিচারবুদ্ধির দলীলকে দুর্বল না করার লক্ষ্যে গ্রন্থমধ্যে তাঁদের নাম তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার না করলেও এবং ভূমিকায় তাঁদের নাম উল্লেখ না করলেও তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করাকে নিজের জন্য অপরিহার্য গণ্য করছি। তাই এখানে তাঁদের কথা স্মরণ করতে চাই।

এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম যার কথা স্মরণ করছি তিনি হলেন আমার দ্বীনী শিক্ষক পিতৃপ্রতীম হযরত মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রঃ)। তাঁর লেখা মহাসত্যের সন্ধানে গ্রন্থ এ ব্যাপারে আমার মন-মগযকে যথষ্ট প্রভাবিত করেছে। অতঃপর স্মরণ করছি ইরানের স্বনামখ্যাত ইসলামী মনীষী হযরত আয়াতুল্লাহ্ জা ফার্ সোব্হানী , হযরত আয়াতুল্লাহ্ তাক্বী মেছ্ববাহ্ ইয়ায্দী ও হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন মোহাম্মাদ মোহাম্মাদী রেইশাহরী-কে (আল্লাহ্ তা আলা তাঁদেরকে শুভ প্রতিদান প্রদান করুন)। তাঁদের এতদ্বিষয়ক লেখা আমাকে জীবন ও জগতের অন্তরালে নিহিত মহাসত্যকে বিচারবুদ্ধির আলোকে দেখার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছে।

এ ছাড়া কতক ক্ষেত্রে হযরত ইমাম খোমেইনী (রঃ) , শহীদ হযরত আয়াতুল্লাহ্ মোরতাযা মোতাহ্হারী (রঃ) ও হযরত আয়াতুল্লাহ্ মোহাম্মাদ তাক্বী জা ফারী (রঃ)-এর কোনো কোনো লেখা আমাকে তাৎপর্যের গভীরে প্রবেশে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে হযরত আয়াতুল্লাহ্ মোহাম্মাদ তাক্বী জা ফারী (রঃ) বিষয়বস্তুর এতো গভীরে প্রবেশ করেছেন ও বিচারবুদ্ধির প্রয়োগকে এমনভাবে দূরতম ও সূক্ষ্মতম দুর্বলতা থেকেও মুক্ত করেছেন যে , তা আমাকে দারুণভাবে বিস্মিত ও অভিভূত করেছে। (আল্লাহ্ তা আলা এ মহান মনীষীদেরকে আলমে বারযাখের বেহেশতে সুখে-শান্তিতে রাখুন এবং শেষ বিচারে অবিনশ্বর জান্নাত্ নছ্বীব্ করুন।)

নবী চেনার উপায়

সর্বশক্তিমান ও মহাজ্ঞানময় সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকে বিশেষ পথনির্দেশের প্রয়োজনীয়তা মানব প্রজাতির সৃষ্টিপ্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। কাজেই এটা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে , প্রথম মানুষ থেকেই মানব প্রজাতি এ প্রয়োজন অনুভব করে আসছে। যদিও প্রথম মানুষের নিজের জন্য শুরুর দিকে বিশেষ পথনির্দেশের প্রয়োজনীয়তা খুব বেশী ছিলো না। কারণ , তখন কোনো সামষ্টিক ও সামাজিক সমস্যা ছিলো না এবং স্বভাবতঃই ধরে নেয়া যেতে পারে যে , প্রকৃতির সাথে প্রথম মানুষের সম্পর্ক ছিলো সরল ও সীমিত। যেমন: প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ভক্ষণযোগ্য দ্রব্যাদির মধ্যে কী খাওয়া উচিত ও কী খাওয়া উচিত নয় , কেবল সে সম্পর্কে তাঁর নিশ্চিত ধারণার প্রয়োজন ছিলো।

অন্যদিকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও তাঁর সাথে মানুষের সম্পর্ক বিচারবুদ্ধিজাত এমন জ্ঞান যা অনেকটা সহজাত জ্ঞানের কাছাকাছি সুনিশ্চিত জ্ঞান। তবে এ সম্পর্কের কারণে কোনো কিছু করণীয় আছে কিনা বা তার কার্যতঃ বহিঃপ্রকাশ কীভাবে ঘটাতে হবে প্রথম মানুষের জন্য তা জানারও প্রয়োজন ছিলো। তেমনি তাঁর সঙ্গিনীর সাথে তাঁর আচরণ , তাঁর কাছ থেকে প্রাপ্তব্য অধিকার ও তাঁর প্রতি পালনীয় দায়িত্ব-কর্তব্য কী হবে তা-ও জানার প্রয়োজন ছিলো বলে মনে হয়। অতএব , নিঃসন্দেহে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে এ সব ব্যাপারে তাঁকে বিশেষ পথনির্দেশ পৌঁছানো হয়ে থাকবে। শুরুতে এর বেশী কিছু পথনির্দেশের প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়।

বিচারবুদ্ধির দাবী অনুযায়ী প্রথম মানুষের জন্ম ছিলো পিতামাতা বিহীন। কারণ , তাঁর আগে কোনো মানুষ ছিলেন না যে , তাঁর পিতামাতা হবেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন সরাসরি সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি-ইচ্ছার ফসল - তা স্রষ্টা তাঁকে যে প্রক্রিয়ায়ই সৃষ্টি করে থাকুন না কেন (যা আমাদের অত্র আলোচনায় অপরিহার্য প্রসঙ্গ নয়)। তাই নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন কলুষমুক্ত। কারণ , পিতার প্রাণবীজ থেকে মাতৃগর্ভে জন্মগ্রহণকারী মানবশিশুই পিতামাতার ও তাদের পূর্বপুরুষদের শারীরিক-মানসিক বৈশিষ্ট্য জিনে ধারণ করে ভ্রুণে পরিণত হয় এবং সে ভ্রুণ মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে তার মাতার শারীরিক-মানসিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হয় । আর জন্ম নেয়ার পর থেকে সে পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ হতে প্রভাব গ্রহণ করতে থাকে। সৃষ্টিকর্তার প্রত্যক্ষ সৃষ্টি হওয়ার কারণে প্রথম মানুষ ও তাঁর সঙ্গিনী অবশ্যই এ ধরনের বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন , বরং তাঁদের মধ্যে স্রষ্টাপ্রদত্ত বৈশিষ্ট্যসমূহই ছিলো একমাত্র বৈশিষ্ট্য। তাই তাঁদের নিষ্কলুষতা বা পাপমুক্ততা প্রশ্নাতীত।

কিন্তু প্রথম মানুষের সন্তানদের নিয়ে সমাজের বিকাশ শুরু হলে এ ক্ষুদ্র সমাজের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও স্বার্থ নির্ণয় করতে গিয়ে বিশেষ পথনির্দেশের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। নিঃসন্দেহে সৃষ্টিকর্তার প্রত্যক্ষ সৃষ্টি নির্মল অন্তঃকরণের অধিকারী ও সকল সদস্যের নিকট সমভাবে গ্রহণযোগ্যতার অধিকারী হিসেবে প্রথম মানুষটিই ছিলেন এ পথনির্দেশ লাভের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। অবশ্য তখনো প্রয়োজনীয় পথনির্দেশের ক্ষেত্র ও মাত্রা ছিলো খুবই সীমিত। কিন্তু তাঁর সন্তানদের বংশধরদের ও তদ্পরবর্তীদের নিয়ে বৃহত্তর সমাজের গঠনপ্রক্রিয়ায় পথনির্দেশের ক্ষেত্র ও তার প্রয়োজনের মাত্রা ক্রমান্বয়েই সম্প্রসারিত হচ্ছিলো এবং নিঃসন্দেহে সে প্রয়োজন অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত পথনির্দেশের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছিলো।

পরবর্তীকালে মানবসমাজের অধিকতর বিস্তার লাভ এবং প্রথম মানুষ তথা প্রথম নবীর কাছ থেকে প্রাপ্ত পথনির্দেশ যথাযথভাবে সংরক্ষিত না থাকা , তদ্সহ স্থান-কালের ব্যবধান থেকে উদ্ভূত মানবিক সমস্যাবলীর সমাধানের লক্ষ্যে নতুন নতুন নবীর আবির্ভাব প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

যেহেতু সীমালঙ্ঘন , অপরাধ ও মিথ্যাচারের মতো নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যসমূহের সম্ভাবনা স্বাধীনতার অনিবার্য দাবী , সেহেতু নবীকে অস্বীকার করা এবং নবী না হয়েও নিজেকে নবী বলে দাবী করার সম্ভাবনা থেকে যায়। কারণ , জন্মগত ও সকলের জন্য সম-অবস্থানগত মর্যাদার অধিকারী প্রথম মানুষের নবী হওয়ার বিষয়টি যেভাবে সকলের বিচারবুদ্ধির কাছে সমভাবে ও অকাট্যভাবে সুস্পষ্ট ছিলো , পরবর্তী নবুওয়াত-দাবীকারীদের ক্ষেত্রে তা সকলের কাছে তদ্রূপ সমভাবে ও অকাট্যভাবে সুস্পষ্ট হওয়া সম্ভব ছিলো না। এ কারণেই প্রথম নবীর পরবর্তী নবীগণকে সঠিকভাবে চেনার জন্য এক বা একাধিক নির্ভুল পথ থাকা অপরিহার্য।

নবী হবার দাবীদার কোনো ব্যক্তি নবী কিনা সে সম্পর্কে কয়েকটি পন্থায় নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। প্রথম পন্থা এই যে , প্রথম নবী কর্তৃক বা পরবর্তী যে কোনো নবী (যার নবুওয়াত অকাট্যভাবে প্রমাণিত) কর্তৃক কাউকে নবী হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেয়া হবে। এভাবে নিশ্চিত নবী কর্তৃক নবী হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেয়া ব্যক্তি যে সত্যি সত্যিই নবী , তাতে কোনোই সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। কারণ , এরূপ ব্যক্তির নবী হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা মানে হচ্ছে উক্ত নিশ্চিত নবীর কথার সত্যতায় তথা তাঁর নবুওয়াতেই সন্দেহ পোষণ করা , যেহেতু বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী নবী মিথ্যা বলতে পারেন না এবং মিথ্যাবাদী ব্যক্তি নবী হতে পারে না।

একজন নবী কর্তৃক পরবর্তী কোনো নবীকে পরিচিত করিয়ে দেয়ার কাজটি দুইভাবে সম্পাদিত হতে পারে। প্রথমতঃ নবী সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে নবী হিসেবে পরিচিত করিয়ে দিতে পারেন। এটা কেবল নবীর সমসাময়িক ব্যক্তি সম্পর্কেই সম্ভব। দ্বিতীয়তঃ পরবর্তীকালে আবির্ভূত হবেন এমন কোনো নবীর পরিচয় এমনভাবে পেশ করা হতে পারে (যেমন: ভবিষ্যত নবীর পিতার নাম-ঠিকানা , জন্মস্থান , জন্মকাল , বিশেষ বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি) - যাতে লোকদের পক্ষে খুব সহজেই তাঁকে নবী হিসেবে চিনতে পারা সম্ভব হয়।

দ্বিতীয়োক্ত ক্ষেত্রে ভবিষ্যদ্বাণীকারী নবী ও ভবিষ্যদ্বাণীকৃত নবীর মধ্যকার স্থানগত , কালগত ও ভাষাগত ব্যবধান নবীকে চেনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে এ ব্যবধান যদি খুবই বেশী হয় , যেমন: হাজার হাজার মাইল , শত শত বছর এবং পারস্পরিক সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য ভাষাগত ব্যবধান। এছাড়া ভবিষ্যদ্বাণীকারী নবীর প্রকাশ্য বিরোধিতাকারীরা এবং বাহ্যতঃ অনুসারী ভণ্ড-প্রতারকরা নবীর ভবিষ্যদ্বাণীকে বিকৃত করতে পারে। এ বিকৃতি মূল বক্তব্যেও হতে পারে , হতে পারে অনুবাদে অথবা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে। যদিও এতদসত্ত্বেও সূক্ষ্মদর্শী গবেষকদের পক্ষে গবেষণা করে সত্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব , কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়। অন্যদিকে গবেষকগণ যে এতদসংক্রান্ত গবেষণা করবেনই , বা গবেষণায় সফল হবেনই অথবা সত্যের সন্ধান পেলেই সে সত্য প্রকাশ করবেনই - তার নিশ্চয়তা নেই। তেমনি সত্যের দুশমনরা এ সব গবেষণালব্ধ ফলাফলকে বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

এ সব কারণে দ্বিতীয়োক্ত ক্ষেত্রে নবীকে চেনার জন্যে আরো পন্থার প্রয়োজন রয়েছে। সে পন্থা এমন হওয়া চাই যার ফলে পূর্ববর্তী নবীর পক্ষ থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করা হোক বা না-ই হোক এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়ে থাকলে তা অবিকৃত থাকুক বা না-ই থাকুক , উভয় অবস্থায়ই যেন নবুওয়াত দাবীকারীর দাবীর সত্যাসত্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। এ পন্থাটি হচ্ছে অলৌকিক ঘটনা - যাকে আরবী পরিভাষায় বলা হয় মু জিযাহ্ (معجزة ) ।

মু জিযাহ্ কী ?

মু জিযাহ্ হচ্ছে মানুষের জানা কারণ ও ফলশ্রুতি বিধি বহির্ভূত অলৌকিক ঘটনা যা কোনোরূপ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ও উপায়-উপকরণ ছাড়াই ঘটানো হয় এবং যিনি ঘটান তিনি সে ঘটনাকে স্বীয় নবুওয়াত-দাবীর সত্যতার প্রমাণ হিসেবে পেশ করে থাকেন।

সাধারণ কারণ ও ফলশ্রুতি বিধির আওতায় যে সব ঘটনা সংঘটিত হয় তা যত বড় ধরনের ঘটনাই হোক না কেন , তা মু জিযাহ্ নয়। যেমন: চন্দ্রগ্রহণ , সূর্যগ্রহণ , ঝড়-বৃষ্টি , প্লাবন , ভূমিকম্প ইত্যাদি। বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বারা হিসাব-নিকাশ করে কেউ হয়তো দাবী করতে পারে যে , সে অমুক তারিখে বা দিনে অমুক সময় সূর্যগ্রহণ ঘটাবে এবং কথিত সময়ে তা-ই ঘটলো। এটা মু জিযাহ্ রূপে গণ্য হবে না। কারণ , সূর্যগ্রহণ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা ; সে হয়তো হিসাব-নিকাশ করে এর সঠিক সময় বের করতে পেরেছিলো। তেমনি বৈজ্ঞানিক উপায়-উপকরণের দ্বারা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটানো হলে তা মু জিযাহ্ নয়। যেমন: মুরগী তা দিয়ে তিন সপ্তাহে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটায়। এমতাবস্থায় কেউ ইনকিউবেটরের সাহায্যে বা , ধরুন , কোনো রাসায়নিক উপাদান মাখিয়ে দিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে দেখালো। এটাও মু জিযাহ্ হিসেবে গণ্য হবে না।

কিন্তু কেউ যদি কোনোরূপ যন্ত্রপাতির আশ্রয় না নিয়ে এবং রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার না করে শুধু মৌখিক নির্দেশের দ্বারা মুহূর্তের মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা বের করে আনতে পারেন তাহলে সে কাজটি মু জিযাহ্ হবার সম্ভাবনা থাকে। তেমনি কেউ যদি মাটিতে বিশেষ ধরনের সার ও ওষুধ প্রয়োগ করে খেজুর বীচি লাগিয়ে তিন বছরের পরিবর্তে তিন মাসে খেজুর ফলাতে পারে , তো তার সে কাজ মু জিযাহ্ হবে না। কিন্তু কেউ যদি সাধারণ মাটিতে সাধারণ খেজুর বীচি লাগিয়ে আধ ঘণ্টার মধ্যে পাকা খেজুর সরবরাহ করতে পারেন তাহলে তা-ই হবে মু জিযাহ্।

নবুওয়াতের দাবীদার ব্যক্তি স্বীয় নবুওয়াতের প্রমাণ হিসেবে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে ও অনুমতিক্রমে লোকদের সামনে মু জিযাহ্ প্রদর্শন করেন , অথবা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই তাঁর নবুওয়াতের প্রমাণ স্বরূপ তাঁকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন। অবশ্য জাদুকররাও অনেক ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটিয়ে থাকে । কিন্তু জাদুকরের জাদুর ও নবীর মু জিযাহর উদ্দেশ্য-লক্ষ্য ও প্রদর্শনক্ষমতার উৎস সম্পূর্ণ আলাদা।

জাদুকর দীর্ঘদিনের সাধনা ও চর্চার মাধ্যমে জাদুকরী ক্ষমতা অর্জন করে থাকে এবং ভালোভাবে অনুসন্ধান করলে খুব সহজেই তার রহস্য উদ্ঘাটন ও অন্যদের পক্ষে সে কলাকৌশল আয়ত্ত করা সম্ভব। কোনো জাদুকরের পক্ষেই , কমবেশী যা-ই হোক , শিক্ষা , সাধনা ও চর্চা ব্যতিরেকে জাদু আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। সে যতো গোপনেই তা শিক্ষা করুক এবং যতো কম পরিমাণেই শিক্ষা করুক (আর পরে নিজে গোপনে ব্যাপকভাবে চর্চা করে দক্ষতা অর্জন করুক) , অন্ততঃ যে তাকে জাদু শিক্ষা দিয়েছে সেই ওস্তাদ-জাদুকরের কাছে তার জাদুকর হওয়ার বিষয়টি গোপন থাকে না। তাই তার এ কাজ যে জাদু - এ সত্যটি যে কোনো সময় ফাশ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। তাই জাদুকর কখনো কখনো বিশেষ পরিবেশে লোকদেরকে চমকে দেয়া বা প্রতারিত করার লক্ষ্যে নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবী করলেও সাধারণতঃ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের জাদুকর পরিচয় গোপন করে না। কিন্তু নবী যে অলৌকিক ঘটনা দেখান তার পিছনে এরূপ কোনো সাধনা ও চর্চা থাকে না , বরং একমাত্র সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ও অনুগ্রহেই তা সম্ভব হয়ে থাকে।

দ্বিতীয়তঃ জাদুকরের জাদু প্রদর্শনের পিছনে নিম্নোক্ত উদ্দেশ্যসমূহের এক বা একাধিক বা সবগুলো উদ্দেশ্যই নিহিত থাকে: (1) আনন্দ লাভ ও মানুষকে আনন্দ দান , (2) সরলমনা লোকদেরকে বোকা বানিয়ে আনন্দ লাভ , (3) মানুষকে বিভ্রান্ত করে প্রতারণা করা , (4) মানুষকে আনন্দদানের বিনিময়ে অর্থোপার্জন , (5) খ্যাতি ও সুনাম অর্জন।

সাধারণতঃ একজন ছোট জাদুকর জাদুকর হিসেবে জীবন শুরু করে দীর্ঘ সাধনার মাধ্যমে বড় জাদুকরে পরিণত হয়ে থাকে এবং বড় জাদুকর হিসেবে পরিচিত হওয়াই তার লক্ষ্য থাকে ও তাতেই সে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করে। সাধারণতঃ কখনোই সে নিজেকে নবী বলে দাবী করে না , বরং এরূপ দাবী করতে ভয় পায়। অন্যদিকে নবীর মু জিযাহ্ প্রদর্শনের উদ্দেশ্য জাদুকরের জাদু প্রদর্শনের উদ্দেশ্যসমূহ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ; তাঁর প্রদর্শিত মু জিযাহর উদ্দেশ্য মানুষকে সৃষ্টিকর্তার প্রদর্শিত পথ অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে স্বীয় নবুওয়াতের প্রতি তাদের অন্তরে আস্থা সৃষ্টি করা বা তা দৃঢ়তর করা।

পেশাদার জাদুকর ছাড়াও কোনো কোনো লোক মানসিক শক্তির উপর্যুপরি ও ব্যাপক চর্চার মাধ্যমে প্রায় জাদুকরের অনুরূপ অস্বাভাবিক কাজ সম্পাদনে সক্ষম হতে পারে। যেমন: পানির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া বা হিংস্র প্রাণীদের অনুগত করা। আর সরাসরি কারো কাছ থেকে শিক্ষা না করার কারণে তার স্বরূপ ও চর্চার বিষয়টি গোপন রাখাও সম্ভব হতে পারে। এ ধরনের শক্তি দ্বারা অনেক সময় মানুষের চিকিৎসা করা হয় বা মন নিয়ন্ত্রণ করা হয় , যেমন হিপনোটিজম বা সম্মোহনী শক্তির দ্বারা করা হয়।

তবে এ ধরনের শক্তি কেবল দীর্ঘ সাধনা ও চর্চার মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। অন্যদিকে , আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে যে , মু জিযাহ্ কোনো চর্চার ফসল নয়। তাছাড়া এ ধরনের কাজ ও মু জিযাহর মধ্যে গুণগত পার্থক্য থাকে ; মু জিযাহ্ হয় অনেক উঁচু ধরনের কাজ - যা চর্চার দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয় , যেমন: মৃতকে জীবিতকরণ , মাটির পাখীকে প্রকৃত পাখীতে পরিণত করে আকাশে উড়িয়ে দেয়া , লাঠিকে সক্রিয় সাপে পরিণত করা , চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণ ইত্যাদি যা কোনো মানসিক শক্তির দ্বারা সম্ভব নয়।

জাদুতুল্য মানসিক শক্তির অধিকারী ব্যক্তি ও নবীর মধ্যে আরেকটি পার্থক্য এই যে , এ ধরনের ব্যক্তিরা কখনো না কখনো তাদের এ শক্তিকে স্বীয় পার্থিব স্বার্থ হাসিল , প্রতিশোধ গ্রহণ , প্রতিহিংসা চরিতার্থকরণ ও এ ধরনের অন্যান্য নেতিবাচক লক্ষ্যে বা সমুন্নত নয় এমন ধরনের লক্ষ্যে ব্যবহার করে থাকে - যা নবীর দ্বারা কখনোই ঘটে না।

মু জিযাহ্ এমন ধরনের হওয়া চাই যে , সংশ্লিষ্ট কাজটির মু জিযাহ্ হওয়া সম্পর্কে তা প্রত্যক্ষকারীদের নিকট যেন কোনোরূপ অস্পষ্টতা , দুর্বোধ্যতা ও সংশয় না থাকে। এ কারণে মু জিযাহ্ এমন বিষয়ের হওয়া চাই যে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সমাজে বহু বড় বড় বিশেষজ্ঞ থাকবে , কিন্তু নবুওয়াতের দাবীদার ব্যক্তি ঐ বিষয়ে এমন উন্নততম মানের কাজ সম্পাদন করবেন যা ঐ সব বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতেও মানুষের পক্ষে সম্পাদন করা অসম্ভব। অন্যথায় যে সমাজে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নেই সে সমাজে ঐ বিষয়ের মু জিযাহ্ দেখানো হলে লোকেরা ঐ কাজটির মু জিযাহ্ হওয়া সম্পর্কে সন্দিহান হতে পারে। তাদের মনে হতে পারে যে , এ ব্যক্তি এ বিষয়ে বিরাট বিশেষজ্ঞ ; এখানে এ বিষয়ের কোনো বড় বিশেষজ্ঞ নেই বলেই তাঁর বিশেষজ্ঞত্ব কেউ ধরতে পারছেন না এবং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এ ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন।

উপরোক্ত কারণেই , মানবজাতির ইতিহাসে নবুওয়াতের দাবীদার যে সব ব্যক্তির মু জিযাহর কাহিনী নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায় , তাঁদের বেলায় দেখা যায় যে , তাঁদের প্রত্যেকের প্রদর্শিত মু জিযাহ্ সমূহের অন্ততঃ দু একটি এমন , যে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সমাজে বড় বড় বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন।

হযরত মূসা (আঃ)-এর সময় মিসরে জাদুবিদ্যা উন্নতির চরম শিখরে উপনীত হয়েছিলো এবং তখন সে দেশে এমন সব বড় বড় জাদুকর ছিলো যাদের সেরা জাদুকর হবার ব্যাপারে সকলেরই পরিপূর্ণ আস্থা ছিলো। কিন্তু হযরত মূসা (আঃ)-এর লাঠি সাপে পরিণত হয়ে ঐ সব ওস্তাদ জাদুকরের সর্বোচ্চ মানের জাদুসমূহকে অকেজো করে দেয়। ফলে জাদুকররা বুঝতে পারে যে , মূসা (আঃ) যা নিয়ে এসেছেন তা জাদু নয়।

তেমনি হযরত ঈসা (আঃ)-এর সময়ে তাঁর আবির্ভাবস্থল ফিলিস্তিনে ও ফিলিস্তিন শাসনকারী রোমানদের মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের চরমোন্নতি ঘটেছিলো। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ) তৎকালীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসম্ভব এমন কিছু কাজ সম্পাদন করেন , যেমন: তিনি কুষ্ঠরোগীদেরকে কোনোরূপ ওষুধপত্র বা অস্ত্রোপচার ছাড়াই কেবল স্পর্শ দ্বারাই সুস্থ করে দেন , মৃতকে জীবিত করেন ও মাটি দ্বারা পাখী বানিয়ে তাকে প্রাণশীল করে উড়িয়ে দেন। এ থেকে সকলের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে , তিনি কোনো উঁচু দরের চিকিৎসাবিজ্ঞানী নন , বরং তাঁর দাবী অনুযায়ী যথার্থই সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক মনোনীত নবী।

একইভাবে হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর সময় মানবজাতির শ্রেষ্ঠতম সম্ভাবনাময় ভাষা আরবী তার প্রকাশক্ষমতার চরমোৎকর্ষে উপনীত হয়েছিলো এবং ঐ সময় আরবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কবি ও বাচনশিল্পীর উদ্ভব ঘটেছিলো। বস্তুতঃ সংক্ষেপে ব্যাপকতম ও সূক্ষ্মতম ভাব সুন্দরতম কথার মধ্য দিয়ে প্রকাশের ক্ষেত্রে অন্যান্য ভাষা ও আরবী ভাষার মধ্যে এমনই আসমান-যমীনতুল্য পার্থক্য ছিলো যে , আরবরা নিজেদেরকে আরাবী বা সংক্ষেপে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব প্রকাশক প্রাঞ্জলভাষী ও অন্যদেরকে আজামী বা বোবা/ তোৎলা বলে অভিহিত করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহঙ্কার প্রকাশ করতো। কিন্তু হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) যে কোরআন নিয়ে এলেন তার সামনে আরবদের শ্রেষ্ঠতম কবি ও বাচনশিল্পীগণ অক্ষম ও অসহায় হয়ে রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হন।


21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35