জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা5%

জীবন জিজ্ঞাসা লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

জীবন জিজ্ঞাসা
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 58 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42102 / ডাউনলোড: 4627
সাইজ সাইজ সাইজ
জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

বিগ্ ব্যাং তত্ত্বের মৌলিক দুর্বলতা

স্টিফেন হকিং-এর বিগ্ ব্যাং তত্ত্ব প্রকৃত অর্থে আদৌ কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয় , বরং এটি অনেকটা সায়েন্স ফিকশন ধরনের গালগল্প মাত্র। কারণ , বস্তুবিজ্ঞানে যে কোনো তত্ত্বই কেবল বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই তা গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু তিনি এমন এক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন যা প্রমাণ করা তাঁর এবং যে কারো সাধ্যের অতীত। কারণ , বিশ্বের সৃষ্টির সূচনা কীভাবে হয়েছিলো তা না গবেষণাগারে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব , না ঐ ঘটনার ভিডিও ছবি ধারণ করা ও তা দেখানো কারো পক্ষে সম্ভব।

এমনকি বস্তুবিজ্ঞানের আলোকেও বিগ্ ব্যাং তত্ত্বে যে সব মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে এবং তিনি যে সব প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম হন নি সেদিকে তেমন একটা দৃষ্টি দেয়া হয় নি। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে এখানে এ তত্ত্বের মাত্র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে।

তিনি আদি বস্তুকণা থেকে সৃষ্টির সূচনার দাবী করেছেন। কিন্তু তিনি বলেন নি এ আদি বস্তুকণা কোত্থেকে এলো ? কোনো অবস্তুগত সজ্ঞান শক্তি কর্তৃক পরিকল্পিত অস্তিত্ব প্রদান করা না হলে বস্তুকণা র অস্তিত্বমানতা কী করে সম্ভব হতে পারে ? এটি কী কোনো উৎস ছাড়াই অস্তিত্ব লাভ করেছিলো ? বস্তুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো উৎস বা উপাদান ছাড়া কি একটি বস্তুকণার অস্তিত্ব লাভ সম্ভব ? যদি তা বিভিন্ন উপাদানের দ্বারা তৈরী হয়ে থাকে তাহলে সে উপাদানগুলোর উৎস কী ? কোন্ নিয়মে এ সব উপাদানে এটি গঠিত হলো এবং সে সব নিয়মের উৎস কী ? আদি বস্তুকণা যদি যৌগিক হয়ে থাকে তাহলে এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে , আর যদি অ-যৌগিক হয়ে থাকে তাহলে তা বিভাজিত হয়ে সৃষ্টির সূচনা হতে পারে না।

বস্তুর ধর্ম হলো তাতে কোনো শক্তি (তা যে ধরনের শক্তিই হোক না কেন) ক্রিয়া না করলে একটি বস্তু অনন্ত কাল একই অবস্থায় (স্থির বা গতিশীল) থাকবে ; বিভাজন , বিস্ফোরণ , স্থানান্তর , গতিশীলতা অর্জন বা গতিরোধ হওয়া নির্বিশেষে কোনো ধরনের গতিশীলতাই তাতে সৃষ্টি হবে না। কিন্তু স্টিফেন হকিং আদি বস্তুকণায় যে বিস্ফোরণের কথা বলেছেন সে বিস্ফোরণ কোন্ শক্তির প্রভাবে হয়েছে তা তিনি বলতে পারেন নি।

কেবল কোনো শক্তি ক্রিয়া করলেই যে কোনো বস্তুতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সাধিত হবে না , বরং ঐ বস্তুর মধ্যে যে সম্ভাবনা নিহিত আছে কেবল সে ধরনের পরিবর্তনই সম্ভবপর এবং ঐ সম্ভাবনার বিকাশের জন্য যে কোনো শক্তির প্রভাবই যথেষ্ট নয় , বরং বিশেষ শক্তি ও বিশেষ ধরনের প্রয়োগই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দেবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে , আদি বস্তুকণায় কি বর্তমান বিশ্বলোকের সৃষ্টির সম্ভাবনা নিহিত ছিলো , নাকি ছিলো না ? থেকে থাকলে এ সম্ভাবনা কোন্ উৎস থেকে তাতে প্রদত্ত হয়েছিলো ? দ্বিতীয়তঃ তাতে যে শক্তির প্রভাবে বিস্ফোরণ ঘটে সৃষ্টিপ্রক্রিয়া শুরু হলো সে শক্তির উৎস কী ?

বস্তুর আরেকটি ধর্ম হলো কোনো বস্তু যদি সমভাবে বিন্যস্ত অভিন্ন উপাদানে গঠিত হয়ে থাকে তাহলে তার কেন্দ্রে শক্তি প্রয়োগ করা হলে তথা বিস্ফোরণ ঘটালে এবং তার বাইরে যদি কোনো কিছুই তার পথে বাধা না হয় বা তার ওপর প্রতিক্রিয়া না করে তাহলে তা সমভাবে ছড়িয়ে পড়বে ; একে একটি প্রসারমান গোলাকার বস্তুর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এ ধরনের বিস্ফোরণের পরিণতিতে বিচিত্র ধরনের সৃষ্টি সম্ভব নয়। কেবল কোনো পরিকল্পিত বিস্ফোরণ থেকেই বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি সম্ভব হতে পারে।

একটি আতশবাযী বিস্ফোরিত হয়ে আকাশে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে যাবার পর তা থেকে যে একটি ফুলের বা অন্য কোনো বস্তুর আকৃতি প্রকাশিত হয় তার কারণ আতশবাযীটি বিভিন্ন উপাদান দ্বারা তৈরী করা হয় এবং তা এমন সুপরিকল্পিতভাবে বিন্যস্ত করা হয় যে , তা বিস্ফোরিত হবার পর নির্দিষ্ট দূরত্বে গিয়ে একটি ফুলরূপে প্রকাশিত হবে। বলা বাহুল্য যে , এটা কেবল সজ্ঞান পরিকল্পনাবিদের পরিকল্পনার ফলেই সম্ভব। আর এর পরিবর্তে যদি কেবল একক কোনো বিস্ফোরণ-উপাদানের একটি গোলকের কেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটানো হয় তাহলে বাইরে কোনো শক্তি (মাধ্যাকর্ষণ বা অন্য কিছু) ক্রিয়া না করলে তা বিস্ফোরিত হয়ে গোলক আকারে তার প্রসারতা অব্যাহত থাকবে ; অবশ্য সে ক্ষেত্রেও তা বিস্ফোরণ সৃষ্টিকারী থেকে মুখাপেক্ষিতাহীন নয়।

এ থেকে সুস্পষ্ট যে , সুপরিকল্পিত বিস্ফোরণ ছাড়া আদি বস্তুকণা থেকে বর্তমান বিশ্বলোক অস্তিত্বলাভ করতে পারে না। কারণ , সে ক্ষেত্রে বস্তুকণাগুলো চতুর্দিকে অনন্তকাল ধরে অভিন্ন গতিতে ছুটে যেতে থাকবে এবং সেগুলোর কোনোটির সাথে কোনোটির সংঘাত হবে না বিধায় না কোনোটির গতি ব্যাহত হবে , না কোনোটিতে নতুন গতি সৃষ্টি হবে। ফলে জ্যেতিষ্কমণ্ডলীর অস্তিত্বলাভ সম্ভব নয়।

এরপর আসে নিষ্প্রাণ বস্তুকণা থেকে প্রাণের অস্তিত্বলাভের প্রশ্ন। অবশ্য এটা অপরিহার্য নয় যে , অন্য কোনো মাত্রার জগৎ থেকে প্রাণ এনে বস্তুতে প্রদান করে প্রাণীকুলের উদ্ভব ঘটাতে হবে , বরং সরাসরি বস্তুর ভিতরেও প্রাণের উৎপত্তি ঘটানো হতে পারে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট নিয়মে বস্তুতে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া না ঘটা পর্যন্ত তাতে প্রাণের সৃষ্টি হতে পারে না। আর সে জন্য কোনো না কোনো পরিকল্পনাবিদের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।

স্টিফেন হকিং যখন তাঁর বিগ ব্যাং তত্ত্ব পেশ করেন তখন বিশ্বজগতের কোনো স্রষ্টা আছেন কিনা সে সম্বন্ধে নির্লিপ্ততা দেখান। তিনি আদি বস্তুকণা থেকে শুরু করেন ; আদি বস্তুকণা কোত্থেকে এলো সে সম্বন্ধে নীরব থাকেন। অবশ্য তাঁর এ ব্রিফ্ হিস্ট্রি অব্ টাইম্ পুস্তকে যে চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে তা সৃষ্টিকর্তার অস্বীকৃতির চেতনা , যদিও তাতে তিনি সরাসরি সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করেন নি। এর মানে হচ্ছে তাঁর তত্ত্বকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের আওতায়ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব ছিলো। কারণ , নিয়মের রচয়িতা সৃষ্টিকর্তা এ বিশ্বজগৎকে কীভাবে বা কোন্ নিয়মে সৃষ্টি করবেন সে ব্যাপারে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম থাকতে পারে না। অতএব , কেউ যদি মনে করে যে , সৃষ্টিকর্তা প্রথমে প্রায় সীমাহীন সম্ভাবনা প্রদান সহ একটি আদি বস্তুকণা সৃষ্টি করেন এবং পরে তাতে পরিকল্পিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এ বিশ্বলোককে রূপ প্রদান করেন , তাহলে তাকে অসম্ভব মনে করার কোনো কারণ নেই (প্রকৃত পক্ষে সেভাবেই হয়ে থাক বা অন্যভাবেই হয়ে থাক)।

কিন্তু পরবর্তীকালে স্টিফেন হকিং সরাসরি সৃষ্টিকর্তা ও পরকালের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। তিনি ২০১০ সালে প্রকাশিত তাঁর দ্য গ্রান্ড্ ডিজাইন্ পুস্তকে বলেন যে , পদার্থবিজ্ঞানের অনেকগুলো ধারাবাহিক উন্নতির আলোকে বিশ্বসৃষ্টির তত্ত্বসমূহে কোনো দেবতার ( deity) আর কোনো স্থান নেই।

প্রকৃত ব্যাপার হলো বস্তুবিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্নতি পরম জ্ঞানী সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে অধিকতর অকাট্যভাবে প্রমাণ করে। কারণ , বস্তুর মধ্যে নিহিত এমন জটিল ধর্ম ও সীমাহীন সম্ভাবনা কিছুতেই ঘটনাক্রমে (accidentally)তৈরী হতে পারে না।

আসলে ঘটনাক্রমে বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। যা কিছু ঘটে সবই কারণ ও ফলশ্রুতি (cause and effect)বিধির আওতায় কোনো না কোনো কারণ বা কারণসমূহের প্রতিক্রিয়ায় ঘটে , আমরা যখন সে কারণ সম্পর্কে অবহিত না থাকি তখনই তাকে আমরা বলি ঘটনাক্রমে সংঘটিত।

বস্তুবিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতির সাথে সাথে ঘটনাক্রমে র কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণার আওতা ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। কারণ , বস্তুজগতের এতো সব বিস্ময়কর নিয়ম ও সম্ভাবনা কী করে একজন সজ্ঞান পরিকল্পনাকারী ব্যতিরেকে অস্তিত্বলাভ করতে পারে ? আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নিয়ম ও সম্ভাবনা উদ্ভূত হতে দেখেছেন কি ?

স্টিফেন হকিং-এর বিগ্ ব্যাং তত্ত্ব সম্বন্ধে ওপরে আমরা যে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি তা থেকেই একজন পরম জ্ঞানী সৃষ্টিকর্তার অপরিহার্যতা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়। তারপরও আমরা এখানে সৃষ্টিকর্তার অপরিহার্যতার সপক্ষে আরো কিছু প্রমাণ তুলে ধরছি।

সৃষ্টিলোকে স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ

আমরা এখানে গোটা সৃষ্টিলোকের আমাদের জানা অংশের সীমাহীন বিস্ময়ের মধ্য থেকে বিক্ষিপ্তভাবে কতগুলোর ওপর দৃষ্টিপাত করবো।

উদ্ভিদ প্রজাতিসমূহের মধ্যে বৈচিত্র্য , অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত কল্যাণকারিতা , পুষ্টি ও রোগনিরাময়ক্ষমতা , শিল্প-সভ্যতায় এ সবের অবদান ইত্যাদি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা যেতে পারে যা একজন সুপরিকল্পনাকারী পরম জ্ঞানী স্রষ্টার অস্তিত্ব নির্দেশ করে। আমরা সেদিকে না গিয়ে যদি শুধু এর সৌন্দর্যের দিকে তাকাই তো আমাদেরকে ভেবে বিস্মিত হতে হয় যে , কত বড় শিল্পী তিনি যিনি এ পৃথিবীকে বিচিত্র উদ্ভিদরাজি দিয়ে এমন সুন্দর করে সাজিয়েছেন!

উদ্ভিদরাজির সামগ্রিক সৌন্দর্য ছাড়াও বিভিন্ন উদ্ভিদের নিজস্ব সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণ করলে অধিকতর বিস্মিত হতে হয়। কতক উদ্ভিদের গঠনপ্রকৃতি দেখে মনে হয় , কোন সুনিপুণ শিল্পী বিশেষভাবে তাঁর পসন্দ মাফিক একে সৃষ্টি করেছেন।

বিভিন্ন শীতপ্রধান দেশে সার্ভ্ (سرو - cedar)নামক এক প্রকার চিরহরিৎ বৃক্ষ আছে যা প্রায় একশ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। কিন্তু ছোট - বড় সর্বাবস্থায়ই দূর থেকে দেখে মনে হয় যে , একটি বিশালায়তন কলার মোচাকে বোঁটা নীচের দিকে রেখে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। পান্থপাদক গাছের ( traveller s tree)দিকে লক্ষ্য করে চিন্তা করে দেখেছেন কি কীভাবে সে তার সুদীর্ঘ ও সুপ্রশস্ত ডাগরগুলোকে দুই বিপরীত দিকে বিন্যস্ত করে বিস্তার করে দিয়েছে এবং ভুলেও অপর দুই দিকে একটি ডাগরও বিস্তৃত হচ্ছে না ! ?

এর চেয়েও বিস্ময়কর এক ধরনের ছোট পুষ্প-উদ্ভিদ যার ফুলের পাপড়িগুলো পূর্ণ বিকশিত হলে দেখা যায় যে , ফুলটির কেন্দ্রস্থল থেকে সবগুলো পাপড়ির গোড়ার দিক জুড়ে একটি কালো প্রজাপতি অঙ্কিত রয়েছে , যেন কোনো খেয়ালী শিল্পী রং-তুলি দিয়ে ফুলটির বুকে প্রজাপতির ছবি এঁকে দিয়েছেন। কোন্ সে শিল্পী যিনি ফুলের বুকে এভাবে প্রজাপতি আঁকেন ? নাকি কোনো শিল্পী ছাড়াই এমনি এমনিই এ ধরনের ছবি অঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে ?

প্রাণীকুলের সৃষ্টিতেও এ ধরনের শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। কতক পাখী দেখতে খুবই সুন্দর এবং কতক পাখী সুকণ্ঠী ; এ সৌন্দর্য ও সুর ঐ সব পাখীর বস্তুগত প্রয়োজন পূরণের জন্য কী কাজে লাগে ? অন্যান্য পাখী যদি ঐ ধরনের সৌন্দর্য ও সুর ছাড়া তাদের অস্তিত্ব অব্যাহত রাখতে পারে তাহলে এগুলোর মধ্যে এ ধরনের সুর ও সৌন্দর্য এলো কেন ? নাকি তা অন্যদের দর্শনেন্দ্রিয় ও শ্রবণেন্দ্রিয়কে তৃপ্তি দানের উদ্দেশ্যে ? অন্যান্য পাখীর যখন পেখম নেই তখন ময়ূরের পেখমের কী দরকার ছিলো ? নাকি তার এ পেখম তার নিজের জন্য নয় , অন্যদের নয়ন তৃপ্ত করার জন্য ?

এবার আমরা প্রাণীদের বাহ্যিক দিকের পরিবর্তে তার অভ্যন্তরীণ জটিলতার দিকে দৃষ্টি দিতে পারি।

প্রাণীকুলের প্রজাতিসংখ্যাও এক মহাবিস্ময় যা একজন সীমাহীন জ্ঞানময় স্রষ্টার অস্তিত্ব নির্দেশ করে ।

এ পৃথিবীর বুকে ক্ষুদ্রতম প্রজাতির পিঁপড়া ও বৃহত্তম প্রাণশীল সৃষ্টি তিমির মাঝখানে অসংখ্য প্রাণশীল সৃষ্টি রয়েছে। প্রকৃত পক্ষে সৃষ্টিলোকে প্রাণশীল সৃষ্টিপ্রজাতিসমূহের সংখ্যা ও তার প্রকরণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা এখনো মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় নি। এ পর্যন্ত যে সব প্রজাতিকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে তার এক অসম্পূর্ণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধু পৃথিবীর বুকে কোটি কোটি প্রাণীপ্রজাতি রয়েছে। এখানে আমরা কেবল পিঁপড়া ও মানুষের প্রতি সংক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করবো।

খালি চোখে দেখার মতো ক্ষুদ্রতম প্রাণশীল সৃষ্টি হচ্ছে এক ধরনের ছোট পিঁপড়া যার শরীর একগাছি চুলের চেয়ে বেশী মোটা নয় এবং দৈর্ঘে সম্ভবতঃ এক সেন্টিমিটারের এক দশমাংশের বেশী নয়। আর তার পাগুলো তুলার আঁশের মত সরু , ফলে সে যখন পথ চলে তখন তার পাগুলো হাল্কা ছায়ার মতো মনে হয়। পিঁপড়া হচ্ছে সমাজবদ্ধ জীবন যাপনকারী প্রাণী যার সমাজবদ্ধতার মান মানুষের সমাজবদ্ধতার মানের সমান না হলেও খুবই কাছাকাছি। তেমনি পিঁপড়ারা অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী , যদিও মানুষের মতো বুদ্ধিমান নয় ।

ক্ষুদ্রতম প্রজাতির পিপিলিকাটির ছ টি পা রয়েছে , খাদ্য খাবার জন্য মুখ , কামড় দেয়ার জন্যে দু টি দাঁত , মাথায় দু টি এ্যান্টেনা (শিং) , শ্বাস-প্রশ্বাসযন্ত্র , খাদ্য ধারণের জন্যে পেট ও তা হযমের জন্যে পরিপাকযন্ত্র , মলদ্বার , যৌনাঙ্গ ইত্যাদি এবং মাথার মধ্যে মস্তিষ্ক তথা প্রয়োজনীয় সব কিছুই রয়েছে। এক ধরনের অন্ধ প্রজাতির পিঁপড়া চোখ ছাড়াই তার মাথায় অবস্থিত শিং-এর সাহায্যে দর্শনের কাজ অত্যন্ত ভালভাবে সম্পাদন করে থাকে ; এ ক্ষেত্রে সে মানুষের তুলনায় কোনো ধরনের অসুবিধারই সম্মুখীন হয় না। তারা যৌন সংসর্গ করে এবং তার ফলে স্ত্রী পিপিলিকা ডিম পাড়ে যার মাধ্যমে তাদের বংশবৃদ্ধি ঘটে। তাদের সমাজে কর্মবিভাজন আছে ; যেমন কাজ করার জন্যে শ্রমিক আছে , বাসা পাহারা দেয়া ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে সৈনিক আছে এবং সমাজকেন্দ্রে একজন রাণী আছে।

শত্রুকে কাবু করার জন্যে তাদের শরীরে বিষের থলি আছে। এ বিষ এতোই মারাত্মক যে , সুঁই-এর ডগার ক্ষুদ্রতম বিন্দুতে যতোটুকু বিষ ধারণ করা সম্ভব মাত্র ততোটুকু বিষ একজন মানুষের চামড়ার সামান্য অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়ে দিলেই তাতে যে অসহনীয় তীব্র জ্বালা হয় তা ঐ মানুষটিকে পরমাণুর অস্তিত্ব ও পারমাণবিক শক্তির ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। আর একটি সুঁই-এর পিছন দিক এ বিষে স্পর্শ করলে তাতে যে পরিমাণ বিষ লেগে যাবে এ বিষ ততোটুকু পরিমাণে কোনো মানুষের শরীরে প্রবেশ করালে সাথে সাথে তার মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু এ ভয়ঙ্কর বিষ স্বয়ং পিপিলিকার শরীরেই উৎপন্ন হয় এবং এ বিষের থলি বয়ে বেড়ানো সত্ত্বেও এতে তার নিজের সামান্যতম ক্ষতিও সাধিত হয় না। শুধু তা-ই নয় , এ বিষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সে অত্যন্ত সুদক্ষ ; কা র বিরুদ্ধে কী পরিমাণে ব্যবহার করতে হবে সে ব্যাপারে তার মাত্রাজ্ঞান বিস্ময়করভাবে নিখুঁত।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে , সে এ বিষ শুধু তার শত্রুকে কাবু করার জন্যেই ব্যবহার করে না , বরং খাদ্য সংগ্রহের জন্যে অর্থাৎ শিকার ধরার জন্যেও ব্যবহার করে। সে এমন নির্ভুল হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে সঠিক মাত্রায় শিকারের শরীরে বিষ প্রয়োগ করে যার ফলে শিকার মারা যায় না , বরং চলচ্ছক্তিরহিত হয়ে পড়ে। শিকারের শরীরে প্রয়োগকৃত বিষের মাত্রা প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে কম হলে শিকার চলচ্ছক্তি হারাবে না , বরং পালিয়ে যাবে ; অন্যদিকে পরিমাণ বেশী হলে বিষক্রিয়ার ফলে শিকারটি মারা যাবে এবং এমতাবস্থায় তা খেলে ভক্ষণকারীদের জন্যে স্বাস্থ্যসমস্যা সৃষ্টি হবে , এমন কি মৃত্যুও ঘটতে পারে। কিন্তু পিঁপড়া যখন শিকারের শরীরে বিষ প্রয়োগ করে তখন তা প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে বেশী হয় না। ফলে এ ধরনের শিকার দীর্ঘ কয়েক মাস যাবত পিঁপড়াদের গুদামে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকে , মারা যায় না।

এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কী হতে পারে! এতো বুদ্ধিমান , এতো কর্মঠ ও এতো সুশৃঙ্খল এ ক্ষুদ্রতম সামাজিক প্রাণীর সৃষ্টি এবং এর জীবনধারা , বুদ্ধিমত্তা , সমাজবদ্ধতা ও এক ধরনের রাষ্ট্রপরিচালনা ব্যবস্থা কি নিজে নিজেই এবং কোনো মহাজ্ঞানী ও নিখুঁত পরিকল্পনাকারী সৃষ্টিকর্তা ছাড়াই অস্তিত্বলাভ করা সম্ভবপর ?

একটি অত্যাধুনিক সুপার কম্পিউটার তৈরী করাই বেশী কঠিন , নাকি ক্ষুদ্রতম পিপিলিকাটিকে সৃষ্টি করাই বেশী কঠিন ? নিঃসন্দেহে পিপিলিকাটিকে সৃষ্টি করাই বেশী কঠিন। এ কারণে বিজ্ঞানীরা সুপার কম্পিউটার তৈরী করতে সক্ষম হলেও এবং কারখানায় তা বিপুল সংখ্যায় উৎপাদন করা সম্ভব হলেও অন্য পিপিলিকার সাহায্য ব্যতীত গবেষণাগারে একটি ক্ষুদ্র পিপিলিকা সৃষ্টি করা বিজ্ঞানীদের পক্ষে আজো সম্ভব হয় নি। তাঁরা যদি ভবিষ্যতে তা করতে সক্ষম হন তো তাতেও প্রমাণিত হবে যে , পিপিলিকা সৃষ্টি করা সুপার কম্পিউটার তৈরীর তুলনায় অধিকতর কঠিন , এ কারণেই বিজ্ঞানের যে পরিমাণ উন্নতি সুপার কম্পিউটার তৈরীকে সম্ভব করেছে পিপিলিকা সৃষ্টির জন্যে তার তুলনায় অনেক বেশী বৈজ্ঞানিক উন্নতি অপরিহার্য।

এমতাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে , যে পিপিলিকা সৃষ্টি করা সুপার কম্পিউটারের তুলনায় অনেক বেশী কঠিন ও জটিল কাজ তা কি কোনো মহাবিজ্ঞানী স্রষ্টা ছাড়াই কেবল প্রকৃতিতে ঘটনাক্রমে ( accidentally)সৃষ্টি হতে পেরেছে ?

জেনেটিক বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কার অনুযায়ী প্রাণীদেহের প্রতিটি কোষে এমন কতগুলো বিশেষ উপাদান-একক রয়েছে যা তার বংশগত বৈশিষ্ট্য বহন করে ; জীববিজ্ঞানীগণ এগুলোর নামকরণ করেছেন ডিএন্এ , আর ডিএন্এ-র গঠন-উপাদান বা অংশসমূহের নামকরণ করেছেন জিন্। এই সাথে থাকে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান। একটি জিনে ১৫০ থেকে ৬ ,০০০ নিউক্লিওটাইড্ থাকে। আর একটি ছোট ভাইরাস্-ডিএন্এ-তে ৫ ,৩৮৬ জোড়া নিউক্লিওটাইড্ বেস্ থাকে। মানবদেহের প্রতিটি কোষে ৪৬টি ক্রোমোজম্ থাকে যার মধ্যে ২৩টি পিতার ও ২৩টি মাতার বৈশিষ্ট্য বহন করে। (পিতার শুক্রকীটে ২৩টি ক্রোমোজম্ থাকে এবং এই ২৩টি ক্রোমোজমের মধ্যে একটি থাকে সেক্স ক্রোমোজম্ যা থেকে নির্ধারিত হয় সন্তানটি ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে।) মানবদেহের একেকটি কোষে (৪৬টি ক্রোমোজমে) এক লাখ জিন্ ও ৬৬০ কোটি নিউক্লিওটাইড্ বেস্ থাকে এবং এতে জৈব রাসায়নিক উপাদানের সংখ্যা ৩০০ কোটি।

বিভিন্ন মানুষের জিনের মধ্যে অভিন্নতা ও বিভিন্নতা রয়েছে এবং সব মিলিয়ে মানবিক জিনের সংখ্যা ৩০০ কোটি জোড়ার মতো - যার মধ্যে ১৯৯৯ খৃস্টাব্দের শেষ নাগাদ ১০০ কোটি জোড়া চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। ডিএন্এ - গুলোর গঠন মই - এর মতো বা বলা চলে , যিপারের ( zipper)মতো। এগুলো কত সূক্ষ্ম আর কত সরু তা এ থেকেই ধারণা করা যেতে পারে যে , আধা গ্রাম ডিএন্এ - কে সোজা করে সামনাসামনি জোড়া দিলে নয় কোটি ৩০ লাখ মাইল ( অর্থাৎ পৃথিবী থেকে সূর্য পর্যন্ত ) দীর্ঘ হবে।

প্রতিটি ডিএন্এ-র মধ্যে সংশ্লিষ্ট মানুষ বা প্রাণীর সারা জীবনের (দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া পর্যন্ত সময়ের) এবং তার পিতামাতার এভাবে প্রথম মানুষ পর্যন্ত (প্রতিটি স্তরে পিতা-মাতার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত সময়ের) পূর্বপুরুষদের জীবনের ইতিহাস (চিন্তা-চেতনার ধরন , চরিত্র ও কর্ম সহ) কোড্ আকারে লিপিবদ্ধ আছে যার মধ্য থেকে বড় বড় বৈশিষ্ট্যগুলো বর্তমানে গবেষণাগারে পরীক্ষা করে বের করা সম্ভব হচ্ছে।

কিন্তু কী আশ্চর্য! তার মস্তিস্কের কোষে কোষকেন্দ্র থাকলেও ক্রোমোজম্ নেই , ফলে কারো পক্ষে পূর্বপুরুষদের ইতিহাস , জ্ঞান ও চিন্তাধারা স্মরণ করা সম্ভব হয় না , বরং কেবল জ্ঞানার্জনের পন্থায়ই তা আয়ত্ত করা সম্ভব হয়। আর , একটি মানুষের মস্তিষ্কে রয়েছে একশ কোটি স্মৃতিকোষ সহ বিভিন্ন ধরনের এক হাজার কোটি স্নায়ুকোষ। একটি স্মৃতিকোষ বা নিউরনের ক্ষমতা একটি সুপার কম্পিউটারের চেয়ে বেশী। অধিকাংশ মানুষই তার মস্তিষ্কের ক্ষমতার হাজার ভাগের এক ভাগও সারা জীবনে ব্যবহার করে না।

এই হলো মহাবিস্ময়কর ও জটিলতম সৃষ্টি মানুষ। বিজ্ঞানীরা আজ কৃত্রিম জীবকোষ তৈরীর চেষ্টা করছেন। আর এ জন্য কতো আয়োজন! একটি জীবকোষ সৃষ্টির জন্যে জটিলতম যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ গবেষণাগার সহ লক্ষ লক্ষ ডলারের বাজেট নিয়ে কাজ করছেন বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীগণ। এমতাবস্থায় কোনো মহাবিজ্ঞানী স্রষ্টা ছাড়াই এমনি এমনিই প্রাণহীন পদার্থ থেকে এককোষ বিশিষ্ট জীবাণু ও তা থেকে পর্যায়ক্রমে প্রজাতিসমূহ এবং সবশেষে মহাবিস্ময়কর প্রাণশীল সৃষ্টি মানুষ অস্তিত্বলাভ করলো! ?

মানুষ আজ মঙ্গল গ্রহে যাবার চেষ্টা করছে। আগামী দিনে সেখানে গিয়ে যদি তারা একটি কম্পিউটার দেখতে পায় , তাহলে তারা কি বলবে যে , এটি এমনি এমনিই সৃষ্টি হয়েছে। ? নাকি বলবে যে , কেউ এটা সৃষ্টি করেছে। ?

তারা সমগ্র মঙ্গল গ্রহে অনুসন্ধান চালিয়েও যদি এরূপ একটা কম্পিউটার তৈরীর উপযুক্ত কোনো প্রাণীর সন্ধান না পায় , তখন তাদের সামনে তিনটি সম্ভাব্য জবাব থাকবে : ( ) এর স্রষ্টা কালের প্রবাহে মঙ্গলের মাটির সাথে মিশে গেছে , কিন্তু তার সৃষ্টি রয়ে গেছে , অথবা ( ) তৃতীয় কোনো গ্রহ থেকে অথবা অন্য কোনো নক্ষত্রলোক থেকে কোনো বুদ্ধিমান প্রজাতির প্রাণী এসেছিলো বা পৃথিবী থেকেই গোপনে কেউ এসেছিলো এবং সে বা তারা এটি রেখে চলে গেছে , অথবা ( ) এর স্রষ্টা এই মঙ্গল গ্রহেই আমাদের আশেপাশেই রয়েছে , কিন্তু আমাদের ও তার বা তাদের অস্তিত্বের মধ্যকার মাত্রাগত ( dimensional)পার্থক্যের কারণে আমরা তাকে বা তাদেরকে খুঁজে পাচ্ছি না।

কম্পিউটার তো এক বিরাট জটিল ব্যাপার ; এমন কি সেখানে যদি একটা ক্ষুদ্র আলপিনও পাওয়া যায় তাহলেও তারা এই একই উপসংহারে উপনীত হবে এবং ধরে নেবে না যে , কোনো স্রষ্টা ছাড়া নিজে নিজেই আলপিনটি সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু কী আশ্চর্য! অসংখ্য বিস্ময়কর সৃষ্টিতে গোটা প্রাকৃতিক জগৎ ভরপুর এবং তার প্রায় প্রতিটি সৃষ্টিই কম্পিউটারের চেয়ে বিস্ময়কর , কিন্তু তা সত্ত্বেও নাস্তিক লোকেরা এ বিশ্বজগতের পিছনে কোনো মহাজ্ঞানময় স্রষ্টার অস্তিত্ব মানতে রাযী নয়।

স্টিফেন হকিং তাঁর মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সাথে তুলনা করেছেন , কিন্তু এটা কেন তাঁর চিন্তায় এলো না যে , একটি কম্পিউটার যেখানে কোনো প্রাকৃতিক যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফসল নয় , বরং শত শত বিজ্ঞানীর শত শত বছরের সাধনার সমন্বিত ফসল , সেখানে বিস্ময়কর ধরনের জটিল একটি মানবমস্তিষ্ক কোনো পরম জ্ঞানী সুপরিকল্পনাবিদ স্রষ্টা ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাকৃতিক যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অস্তিত্বলাভ করতে পারে না ?

নবীর পাপমুক্ততা

কোনো ব্যক্তিকে নবী হিসেবে চিনতে পারার জন্য তাঁর মধ্যে অপর যে বৈশিষ্ট্যটি পাওয়া অপরিহার্য তা হচ্ছে , তাঁর গোটা জীবনই পাপমুক্ত হতে হবে।

নবুওয়াত দাবী করার পূর্বেই হোক বা পরেই হোক , যে ব্যক্তি সর্বজনীনভাবে বিচারবুদ্ধি কর্তৃক পাপ বা অপরাধ বা অন্যায় হিসেবে পরিগণিত কোনো কাজে কখনো লিপ্ত ছিলো , সুস্থ বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী সে ব্যক্তি নবী হতে পারে না। কারণ , এরূপ ক্ষেত্রে তার পাপ , অপরাধ বা অন্যায় কাজ সম্পর্কে অবগত ব্যক্তির পক্ষে তাকে নবী হিসেবে মনে করা সম্ভব হবে না। ফলে সে নবুওয়াতের দাবীদার ব্যক্তিকে ও তার দাবীকে প্রত্যাখ্যান করলে সৃষ্টিকর্তা ঐ ব্যক্তিকে নবীকে প্রত্যাখ্যান করা র অপরাধে অপরাধী বলে গণ্য করবেন না - এটা বিচারবুদ্ধির এক অকাট্য রায়। আর লোকেরা যদি নবীকে নবী হিসেবে চিনতেই না পারে , বরং তাঁর নবুওয়াত-দাবীর ব্যাপারে যুক্তিসঙ্গত কারণে সন্দেহ-সংশয়ে নিপতিত হয় তাহলে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে নবী প্রেরণের লক্ষ্যই অনর্জিত থেকে যাবে।

এ কারণে বিচারবুদ্ধির রায় হচ্ছে , সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার জন্য এটা অপরিহার্য যে , তিনি কোনো পাপমুক্ত ব্যক্তিকে নবী হিসেবে মনোনীত করবেন অথবা যাকে নবী হিসেবে মনোনীত করবেন তাঁকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পাপ থেকে রক্ষা করবেন। মানুষকে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য এটা অপরিহার্য।

বলা বাহুল্য যে , এখানে পাপ বলতে আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের দৃষ্টিতে যা অন্যায় বা অপরাধ তা-ই বিবেচ্য ; যে কাজের অন্যায় বা অপরাধ হওয়া বা না-হওয়া সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিতর্ক আছে তা এখানে বিবেচ্য নয়। তাই মিথ্যাচার , হত্যা , ধর্ষণ , ব্যভিচার , চুরি-ডাকাতি , ধোঁকা-প্রতারণা , বিশ্বাসঘাতকতা , অন্যের সম্পদ জবর দখল ও আত্মসাত , আমানতের খেয়ানত , যুলুম-অত্যাচার , নির্যাতন ইত্যাদি অন্যায় কাজ কখনোই একজন নবীকে স্পর্শ করতে পারে না। তেমনি তাঁর জীবনকে - নবুওয়াত-দাবীর পূর্বেও - দ্বিত্ববাদী , ত্রিত্ববাদী বা বহুত্ববাদী ধারণা ও কার্যকলাপ স্পর্শ করতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে , বিচারবুদ্ধি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও একত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হবার পর তাঁর নিকট জবাবদিহিতার অনুভূতি ও তাঁর পক্ষ থেকে পথনির্দেশের প্রয়োজনীয়তাবোধের কারণেই নবীর সন্ধান করে থাকে। এ পথের শুরুর দিকেই , একত্ববাদে উপনীত হতে গিয়েই সে দ্বিত্ববাদ , ত্রিত্ববাদ , বহুত্ববাদ ও অবতারবাদ ইত্যাদিকে প্রত্যাখ্যান করে। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের বিচারবুদ্ধির ওপরে বিভিন্ন ধরনের ভ্রমাত্মক যুক্তি , চিন্তা ও অন্ধ বিশ্বাসের আবরণ পড়তে পারে এবং এর ফলে তার অন্তরে বিচারবুদ্ধির রায় হাল্কা ও অগভীর হয়ে পড়তে পারে বা সে গতানুগতিকতার বিরোধী বিচারবুদ্ধির রায়কে স্বীয় মস্তিষ্কে পোষণ করতে ও লোকদের সামনে প্রকাশ করতে ভয় পেতে পারে ও সে কারণে তা জোর করে চাপা দিতে পারে ; অতঃপর নবী বা নবীর পক্ষ থেকে কেউ এসে তাকে সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার বিচারবুদ্ধির রায়কেই সুতীক্ষ্ণ করার চেষ্টা করতে পারেন।

অন্য কথায় , নবীর মূল কাজই হচ্ছে জীবন ও জগতের মহাসত্য সম্বন্ধে এবং নিজের , অন্যদের ও স্রষ্টার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য তথা ঔচিত্য-অনৌচিত্য সম্বন্ধে মানুষের বিচারবুদ্ধির রায়কে শানিত করা ; বিতর্কিত বিষয়াদিতে সঠিক ফয়সালা এ দায়িত্বেরই সম্প্রসারণ মাত্র। এমতাবস্থায় চিন্তা বা কর্মের দিক থেকে বা উভয় দিক থেকেই কখনো না কখনো দ্বিত্ববাদ , ত্রিত্ববাদ , বহুত্ববাদ বা অবতারবাদে বিশ্বাসী ছিলো , অথবা সর্বজনস্বীকৃত কোনো অন্যায় বা পাপ কাজে কখনো না কখনো নিশ্চিতভাবেই লিপ্ত ছিলো - এমন ব্যক্তিকে বিচারবুদ্ধির পক্ষে স্রষ্টার পক্ষ থেকে মনোনীত নবী হিসেবে মেনে নেয়া সম্ভব হতে পারে না।

দ্বিতীয়তঃ এরূপ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে , স্রষ্টার পক্ষে কি নবীর দায়িত্ব দেয়ার জন্য কোনো তাওহীদবাদী পাপমুক্ত মানুষ গড়ে তোলা অসম্ভব যে , কখনো না কখনো অংশীবাদে বা সর্বজনস্বীকৃত অন্যায় বা পাপে লিপ্ত ছিলো এমন একজন লোককে নবুওয়াতের দায়িত্ব দেবেন ?

তৃতীয়তঃ এরূপ পরিস্থিতি ভণ্ড নবীর আবির্ভাবের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরী করে দেয়। কারণ , নবুওয়াতের মর্যাদার পার্থিব সম্মান লাভ অথবা মানুষকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে যে কোনো পাপাচারী লোকের পক্ষে নবী সেজে বসা সম্ভব। এ অবস্থায় এরূপ ব্যক্তি দাবী করতে পারে যে , সে আগে অংশীবাদী বা পাপকর্মে লিপ্ত হয়ে থাকলেও সৃষ্টিকর্তা অনুগ্রহ করে তাকে নবী পদে অভিষিক্ত করেছেন এবং এ দায়িত্বে অভিষিক্ত হবার পর থেকে আর সে অংশীবাদ বা পাপ কর্মে লিপ্ত হয় নি।

চতুর্থতঃ এরূপ অবস্থায় যে কারো বিচারবুদ্ধি একজন প্রকৃত নবীকে ভণ্ড নবী মনে করে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে এ প্রত্যাখ্যানের জন্য তাকে অপরাধী গণ্য করা যাবে না। কারণ , এমনকি একজন অংশীবাদী বা পাপকর্মে লিপ্ত ব্যক্তি কর্তৃকও কাউকে নবী হিসেবে গ্রহণ করতে হলে তা বিচারবুদ্ধির রায়ের ভিত্তিতেই করতে হবে ; এর কোনো বিকল্প নেই। এমতাবস্থায় বিচারবুদ্ধিই যদি কাউকে ভণ্ড নবী বলে রায় দেয় তখন তাকে নবী হিসেবে গ্রহণ করা কারো জন্যই অপরিহার্য হতে পারে না।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে , অংশীবাদী বা কখনো না কখনো সর্বজনস্বীকৃত অন্যায় বা পাপ কর্ম সম্পাদনকারী ব্যক্তিকে নবুওয়াত প্রদান করা হলে নবী প্রেরণের মূল উদ্দেশ্যই ভণ্ডুল হয়ে যায়। অতএব , এ ব্যাপারে বিতর্কের অবকাশ নেই যে , একজন নবীকে তাঁর জীবনের নবুওয়াত দাবী করার পূর্ববর্তী অধ্যায়েও তাওহীদবাদী (একত্ববাদী) ও পাপমুক্ত হতে হবে।

এছাড়া যিনি নবী হবেন তাঁর জন্য তাঁর জীবনের নবুওয়াত দাবী করার পূর্ববর্তী অধ্যায়েও মনবতাবোধ , দয়ার্দ্রতা , সদাচরণ , পরোপকার , সাহসিকতা , নিঃস্বার্থপরতা , লোভহীনতা ইত্যাদি সদগুণের অধিকারী হওয়াও অপরিহার্য যাতে তাঁর নবী হওয়ার ব্যাপারে মানুষের মনে সহজেই আস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

তবে মনে রাখা দরকার যে , নবীর পাপমুক্ততার বিষয়টি এমন নয় যে , নবীর মধ্যে পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতাই থাকবে না। বরং মানুষ হিসেবে প্রাপ্ত স্বাধীনতার বিচারে নবী ও অন্য মানুষের মধ্যে পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতার ব্যাপারে কোনোই পার্থক্য থাকা সম্ভব নয়। কারণ , কোনো মানুষের পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতা কেড়ে নিলে সে আর মানুষ থাকবে না ; ফেরেশতার সমপর্যায়ভুক্ত হবে। আর বলা বাহুল্য যে , এরূপ ব্যক্তি মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হতে পারে না। কারণ , সে ক্ষেত্রে মানুষের জন্য এ যুক্তি তৈরী হয়ে যায় যে , নবীর মধ্যে তো পাপের ক্ষমতাই নেই , তাই সে পাপ করে না ; আমাদের মধ্যে পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতা রয়েছে , তাই আমাদের পক্ষে পাপে লিপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

বরং নবীর পাপমুক্ততার বিষয়টি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে স্বাভাবিক মানবিক কার্যকারণের মধ্য দিয়ে নিশ্চিতকরণই স্বাভাবিক ও সর্বজনীন বিচারবুদ্ধির নিকট গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ জন্মগতভাবে রক্তধারার পবিত্রতা ও সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নবীরূপে মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে এ মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তা , কথা ও কাজ পরিহারের স্বাভাবিক প্রবণতার কারণে নবীর মধ্যে শুরু থেকেই এমন একটি রুচিবোধ ও চরিত্র গড়ে ওঠে যার ফলে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পাপ কর্মের প্রতি তাঁর মধ্যে কোনোরূপ আগ্রহ সৃষ্টি হয় না , বরং ঘৃণা সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ , মানুষ পায়খানা-পেশাব ভক্ষণ ও পান করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কারো মধ্যে এর আগ্রহ সৃষ্টি হয় না (ব্যতিক্রম হিসেবে কদাচিৎ বহু কোটি মানুষের মধ্যে দু একটি চরম বিকৃতরুচি ব্যক্তিকে এ কাজ করতে দেখা গেলেও) , বরং সকল মানুষই এর প্রতি ঘৃণা বোধ করে থাকে। নবীর মধ্যে এই রূচিবোধই সর্বোচ্চ পর্যায়ের হয়ে থাকে যার ফলে সকল পাপ ও নোংরা কাজের প্রতি তাঁর মধ্যে ঘৃণা জন্ম নিয়ে থাকে।

এ প্রসঙ্গে আরো দু একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিস্কার হতে পারে। যেমন: একটি অবুঝ শিশু একটি ফণা-তোলা সাপের বা একটি প্রদীপের শিখার সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে তা ধরার জন্য আগ্রহী হতে পারে , কিন্তু কোনো বুদ্ধিমান মানুষ এ কাজে অগ্রসর হবে না বা আগ্রহ অনুভব করবে না। কারণ , শিশু সাপের সৌন্দর্য দেখলেও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এ সৌন্দর্যের আড়ালে সাক্ষাৎ মৃত্যু বা চরম যন্ত্রণা দেখে শিউরে ওঠে। তেমনি সংশ্লিষ্ট বস্তুর প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে অজ্ঞ একজন লোক বিদ্যুতবাহী তার স্পর্শ করতে বা পানি মনে করে এসিড পান করতে দ্বিধা করবে না এবং পিপাসার্ত অবস্থায় জানা না থাকার কারণে বিষমিশ্রিত শরবত পান করতে আগ্রহ অনুভব করবে। কিন্তু যার সংশ্লিষ্ট বস্তুর প্রকৃত অবস্থা জানা আছে সে সযত্নে এ সব থেকে দূরে থাকবে ; পিপাসায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও জানা অবস্থায় কিছুতেই সে এসিড বা বিষমিশ্রিত শরবত পান করবে না। ঠিক এভাবেই নবীর দৃষ্টিতে যে কোনো পাপকাজের ভয়াবহ পরিণাম সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে বিধায় তিনি এ থেকে দূরে থাকবেন এবং এর প্রতি কখনোই আগ্রহ অনুভব করবেন না - এটাই বিচারবুদ্ধির দাবী।

অনেক সময় কোনো কোনো নবী সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে বা এমনকি ধর্মগ্রন্থে এমন সব বর্ণনা পাওয়া যায় যা থেকে মনে হয় যে , তাঁরা কখনো কখনো পাপকার্যে লিপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু বিচারবুদ্ধি নবীর পাপে লিপ্ত হবার বিষয়টি গ্রহণ করে না , সেহেতু এ ক্ষেত্রে তিনটি অবস্থা হতে পারে। তা হচ্ছে , হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আদৌ নবী ছিলেন না , অথবা সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটি মিথ্যা বা বিকৃত , নয়তো বর্ণনাটির সঠিক তাৎপর্য গ্রহণ করা হয় নি।

নবী হচ্ছেন মানুষের কাছে স্রষ্টার পথনির্দেশ পৌঁছাবার প্রত্যক্ষ মাধ্যম এবং পূর্ণ শর্তাবলী বিশিষ্ট প্রতিনিধি , আর মানুষের জন্য স্রষ্টার মনোনীত নেতা ও শাসক। এ পদ মানুষের মধ্যকার সর্বোত্তম মর্যাদাপূর্ণ পদ। তাই যুগে যুগে সত্য নবী ছাড়াও বহু মিথ্যা নবীরও আবির্ভাব ঘটেছে । এরূপ ভণ্ড-প্রতারক ব্যক্তিরা স্বীয় প্রতারণার চক্রের সদস্যদের দ্বারা পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মু জিযাহও প্রচার করে থাকে। তাই নবুওয়াতের দাবীদার কোনো ব্যক্তির জীবন সম্বন্ধে ব্যাপক ও গভীরভাবে অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন। অনুসন্ধানে তার জীবনে কখনো কোনো পাপকর্ম অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলে সে ব্যক্তি যে নবী নয় , বরং নবী হওয়ার মিথ্যা দাবীদার , অথবা সে নিজে দাবী না করলেও স্বার্থান্বেষীরা তাকে তথাকথিত নবী বানিয়েছে - তাতে সন্দেহ নেই।

অন্যদিকে বিচারবুদ্ধি বলে , ভণ্ড-প্রতারক পাপাচারীরা কোনো কোনো নবীর বা অনেক নবীর বা নবীদের (আঃ) নামে পাপকর্মের মিথ্যা কাহিনী তৈরী করে থাকতে পারে। দু ধরনের লোকেরা এ কাজ করে থাকতে পারে। প্রথমতঃ কোনো নবীর বা নবীদের (আঃ) বিরোধীরা - যাদের উদ্দেশ্য ছিলো সংশ্লিষ্ট নবী বা নবীদের (আঃ) সম্বন্ধে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং তাঁর বা তাঁদের ওপর অনাস্থা সৃষ্টি করা । দ্বিতীয়তঃ কোনো নবীর বা নবীদের (আঃ) অনুসারী হবার দাবীদার পাপাচারী লোকেরা যারা নিজেদের পাপকর্মের সপক্ষে সাফাই ও অজুহাত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নবীর বা নবীদের (আঃ) নামে মিথ্যা রচনা করেছে।

কোনো বা কোনো কোনো ধর্মের মূল ধর্মীয় সূত্র থেকে কোনো বা কোনো কোনো নবীর দ্বারা পাপকর্ম সম্পাদিত হয়েছিলো বলে ধারণা পাওয়া গেলে সে ব্যাপারে বিচারবুদ্ধি তিনটি কারণ খুঁজে পায়। প্রথমতঃ সূত্রটি অকাট্যভাবে গ্রহণযোগ্য না হতে পারে। অর্থাৎ সূত্রটিকে যে বা যার সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে দাবী করা হয় তা তাঁর বা তাঁদের সাথে সম্পর্কিত না-ও হতে পারে এবং তাঁর বা তাঁদের নামে অন্য কারো রচিত হতে পারে। বিশেষ করে তাঁর বা তাঁদের থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরের বর্ণনাকারীদের ঐতিহাসিকতা ও ন্যায়নিষ্ঠতার অকাট্যতা এবং প্রতি স্তরে তাঁদের সংখ্যা বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে মিথ্যা রচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যানের জন্য যথেষ্ট বলে পরিগণিত না-ও হতে পারে। ফলে এরূপ সূত্রে কোনো নবী বা নবীদের (আঃ) দ্বারা পাপকার্য সম্পাদনের বর্ণনা বিচারবুদ্ধির নিকট মোটেই গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না।

দ্বিতীয়তঃ ধর্মীয় সূত্রটি উপরোক্ত মানদণ্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ থেকে উৎসারিত বলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলে এবং সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের গ্রহণযোগ্যতাও বিচারবুদ্ধির আদালতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সূত্রে কোনো বা কোনো কোনো নবীর (আঃ) পাপকর্মে লিপ্ত থাকার কথা উল্লিখিত পাওয়া গেলে তার দু টি অবস্থা হতে পারে। প্রথমতঃ পাঠকের নিকট পাপকর্মের যে সংজ্ঞা বা সীমারেখা রয়েছে তা বিচারবুদ্ধির নিকট সর্বজনীন ও অকাট্যভাবে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। অর্থাৎ নবীর বা নবীদের যে কাজের উল্লেখ দেখে পাঠক তাকে পাপকর্ম বলে মনে করতে পারেন , তা হয়তো আদৌ পাপকর্ম নয়। অর্থাৎ যে কাজের পাপ হওয়ার বিষয়টি বিতর্কিত পাঠক তাকেই অকাট্যভাবে পাপ বলে মনে করে নিয়েছেন। দ্বিতীয়তঃ পাঠক সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সূত্রের অর্থ গ্রহণে ভুল করে থাকতে পারেন। এ প্রসঙ্গে দু একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিস্কার হবে।

গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সূত্র তাওরাত ও কোরআন মজীদে প্রথম মানুষের নাম আদম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য যে , প্রথম মানুষ হিসেবে তিনি নবীও ছিলেন বটে। তাওরাত ও কোরআনে বলা হয়েছে যে , সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ ভুলে গিয়ে তিনি ও তাঁর স্ত্রী নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেন। অনেকেই এটিকে মানুষের প্রথম পাপ বলে মনে করে। (শুধু তা-ই নয় , অনেকেই মনে করে যে , এ পাপের কারণেই তাঁকে সস্ত্রীক বেহেশত থেকে বের করে দেয়া হয় ; নইলে মানব প্রজাতি আজো বেহেশতেই থাকতো , যদিও কোরআনে বলা হয়েছে যে , পৃথিবীর বুকে সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের জন্যই তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো।) কিন্তু ঐ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ সর্বজনীনভাবে বিচারবুদ্ধির নিকট অন্যায় বা পাপ বলে পরিগণিত কাজসমূহের (যার অনেকগুলোর কথাই আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি) অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। দ্বিতীয়তঃ উক্ত উভয় সূত্র থেকেই সুস্পষ্ট যে , তখন পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে হযরত আদম (আঃ)-কে কোনোরূপ ধর্মীয় বিধিবিধান প্রদান করা হয় নি। ফলে বিচারবুদ্ধি কেবল এটাই বলে না যে , ঐ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করার ফলে সর্বজনীনভাবে পাপ বা অন্যায় বলে পরিগণিত কোনো কাজ সম্পাদিত হয় নি , বরং এ-ও বলে যে , এর দ্বারা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত কোনো বিশেষ বিধান ও লঙ্ঘিত হয় নি। বরং এ ছিলো মানুষকে প্রদত্ত স্বাধীনতা মানুষ কীভাবে প্রয়োগ করতে পারে তার একটি পরীক্ষা মাত্র। পূর্ব-অভিজ্ঞতাবিহীন হযরত আদম ও হযরত হাওয়া (আঃ) কৌতুহলবশে ও শয়তানের দ্বারা প্রতারিত হয়ে ভুলবশতঃ উক্ত বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেন , যদিও এ ভুল কাজ করার কারণে তাঁরা কিছু না কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হন।6 তাছাড়া এ-ও হতে পারে যে , তখনো তাঁরা শর ঈ দায়িত্ব-কর্তব্য প্রযোজ্য হবার বয়সে উপনীত হন নি। অতএব , এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় না যে , নবী পাপকার্যে জড়িত হতে পারেন।

এবার ধর্মীয় সূত্র থেকে ভুল অর্থ গ্রহণের একটি দৃষ্টান্ত। কোরআন মজীদের বর্ণনা থেকে এরূপ তাৎপর্য গ্রহণ করা হয়েছে যে , হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রথমে নক্ষত্র , চন্দ্র ও সূর্যকে রব (প্রভু/ সৃষ্টিকর্তা) মনে করেছিলেন অর্থাৎ তিনি ঐ সময় সাময়িকভাবে হলেও অংশীবাদী ধারণা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু এ ঘটনার বর্ণনাকে তার পূর্ববর্তী আয়াত সমূহের সাথে মিলিয়ে পড়লে দেখা যায় যে , ঘটনাটি তাঁর নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য অভিষিক্ত হওয়ার পরবর্তী কালের। অতএব , সংশ্লিষ্ট অংশীবাদী কথাগুলো তাঁর নয় , বরং অন্য কারো। অর্থাৎ একজন অংশীবাদী ও হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মধ্যকার কথোপকথনকে এক ব্যক্তির অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর একার উক্তি বলে গণ্য করায় এরূপ ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে।

নবীগণের (আঃ) পাপমুক্ততা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনার দাবীদার।7 এখানে বিচারবুদ্ধির আলোকে মূল বিষয়টি প্রতিপাদনের লক্ষ্যে এতোটুকু আলোচনাই যথেষ্ট বলে মনে করি।

মহাসত্যের প্রশ্নে নবীর আপোসহীনতা

নবীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জীবন ও জগতের অস্তিত্বের পিছনে নিহিত মহাসত্য প্রশ্নে আপোসহীনতা। বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে কোনো রকম প্রলোভন , ভয়-ভীতি , এমনকি জীবনাশঙ্কার মুখেও নবী তাঁর নবুওয়াতের দাবী এবং জীবন ও জগতের অস্তিত্বের পিছনে নিহিত মহাসত্য প্রকাশ হতে বিরত থাকতে পারেন না। কারণ , তাঁকে নবী হিসেবে মনোনীত করার উদ্দেশ্যই এটা। আর মূল উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করলে নবী আর নবী থাকেন না বা বলা যেতে পারে যে , নবী ও অ-নবীর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাই নবী সর্বাবস্থায়ই মহাসত্য প্রকাশ ও প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখবেন।

অবশ্য নবীর আপোসহীনতার মানে এ নয় যে , তিনি জোর করে মানুষের ওপর মহাসত্যকে চাপিয়ে দেবেন বা সদাই সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকবেন। কারণ , সত্য চাপিয়ে দেয়ার বা জোর করে গ্রহণ করানোর বিষয় নয়। নবীর কাজ হচ্ছে মানুষের বিচারবুদ্ধিকে জাগ্রত করানো এবং তার সামনে মহাসত্যকে পেশ করা। বরং সষ্টার প্রতিনিধি স্বাধীনতার অধিকারী সৃষ্টি মানুষের ওপর কোনো চিন্তা ও কাজ জোর করে চাপিয়ে দেয়া মস্ত বড় অন্যায় , আর নবীর আবির্ভাবের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এ অন্যায় চর্চার অবসান ঘটানো। অতএব , অন্যদের ওপর স্বীয় বক্তব্য চাপিয়ে দিয়ে তিনি নিজেই এ উদ্দেশ্যের বিপরীত আচরণ করতে পারেন না। এমনকি কোনো জনগোষ্ঠী তাঁকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করলে এবং সেখানে তাঁর দাওয়াত আরো বিস্তারের কোনো সম্ভাবনা না থাকলে তিনি সংঘাত এড়াতে বা স্বীয় অনুসারীদের জীবন রক্ষার্থে এবং সত্য প্রকাশ ও প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে দেশ ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যেতে পারেন। অন্যদিকে বিচারবুদ্ধি এ-ও বলে যে , উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তিনি স্বীয় অনুসারীদের ওপর স্বীয় শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন এবং এটা তাঁর স্বাভাবিক অধিকার। আর এ কাজে কেউ বাধা দিলে ও সে ক্ষেত্রে সঙ্গতি থাকলে অথবা পরিস্থিতি বাধ্য করলে তিনি স্বীয় অনুসারীদেরকে সাথে নিয়ে সত্যকে রক্ষার জন্য যুদ্ধও করবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তিনি পার্থিব স্বার্থে সত্য প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে কমবেশী করবেন না। এ পথে তাঁকে জীবন দিতে হলেও এ ব্যাপারে তিনি আপোস করবেন না।

কেবল প্রয়োজনেই নবী প্রেরণ

নবুওয়াত সম্বন্ধে সবশেষে যে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলা অপরিহার্য তা হচ্ছে , মহান প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা কোনো বাহুল্য কাজ করতে পারেন না। অতএব , বিচারবুদ্ধির রায় হচ্ছে এই যে , অপরিহার্য প্রয়োজনীয় না হলে তিনি অযথাই কোনো নবী প্রেরণ করেন না। এখানে প্রয়োজন মানে মানুষের প্রয়োজন। অর্থাৎ মানব জাতির নিকট তাঁর প্রেরিত পথনির্দেশ পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ রূপে এবং অবিকৃতভাবে বিদ্যমান থাকলে তিনি এরপরও নতুন করে নবী ও পথনির্দেশ পাঠাবেন - এটা বিচারবুদ্ধির নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এরূপ পরিস্থিতিতে কেউ নবুওয়াত লাভের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দাবী করলে তার সে দাবী বিবেচনাযোগ্য নয়।


22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35