জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা5%

জীবন জিজ্ঞাসা লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

জীবন জিজ্ঞাসা
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 58 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42099 / ডাউনলোড: 4627
সাইজ সাইজ সাইজ
জীবন জিজ্ঞাসা

জীবন জিজ্ঞাসা

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

পরকালীন জীবন

স্টিফেন হকিং অতি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পরকালীন জীবনের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। এটাই স্বাভাবিক। কারণ , স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করার পর পরকালীন জীবনের অস্তিত্ব স্বীকার করার মানেই হয় না। তবে স্রষ্টার অস্তিত্বের অস্বীকৃতি যে এ বিষয়ে অজ্ঞতা থেকে উৎসারিত তা আমরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছি। অতঃপর পরকালীন জীবন সম্পর্কে কেবল এতোটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট বলে গণ্য হওয়া উচিত যে , যে পরম জ্ঞানী স্রষ্টা প্রথম বার সৃষ্টি করতে পেরেছেন তাঁর পক্ষে পুনরায় সৃষ্টি করা খুবই সহজ।

স্টিফেন হকিং পরকাল অস্বীকার করতে গিয়ে তাঁর মস্তিষ্ককে একটি কম্পিউটারের সাথে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন যে , এটি অচল হয়ে গেলে আর কাজ করবে না। তিনি এ যুগের সবচেয়ে নামকরা বস্তুবিজ্ঞানী হয়ে এমন কথা কীভাবে বললেন ভেবে বিস্মিত হতে হয়। কারণ , স্বয়ং বস্তুবিজ্ঞানই নষ্ট হয়ে যাওয়া সব কিছু পুনর্গঠনের সম্ভাবনার কথা স্বীকার করছে।

বিজ্ঞান সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্ট্ -এর রিপোর্ট অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা মৃতকে জীবিত করার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এ রিপোর্ট অনুযায়ী , মৃত্যুর কয়েকদিন পর মৃত ব্যক্তির দেহের কোষ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দিয়ে বিজ্ঞানীরা তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারবেন। মানুষ বিজ্ঞানীদের পক্ষে যদি এটা সম্ভব হয় তাহলে পরম জ্ঞানী স্রষ্টার পক্ষে পুনর্জীবন দান অসম্ভব মনে করার মতো অযৌক্তিক দাবী আর কী হতে পারে ?

অবশ্য শরীর পচে-গলে মাটিতে মিশে যাবার যুক্তি তোলা হতে পারে - যা অবশ্য সকল যুগের (এমনকি চৌদ্দশ বছর আগেও) পরকাল অস্বীকারকারীরা তুলতো।

এমনকি প্রথম সৃষ্টিকারীর পক্ষে পুনঃসৃষ্টি সম্ভব - এ অকাট্য যুক্তি ছাড়াও জেনেটিক বিজ্ঞান ও পদার্থ বিজ্ঞানের আলোকেও পুনঃসৃষ্টি অকাট্যভাবে সম্ভব বলে প্রমাণিত হয়। কারণ , একজন মানুষের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে ফেললে তার ব্যক্তিসত্তার পরিবর্তন হয় না।

শুধু তা-ই কেন , কয়েক বছরের ব্যবধানে একজন মানুষের গোটা শরীরের সকল কোষই পরিবর্তিত হয়ে যায় , কিন্তু তা সত্ত্বেও তার ব্যক্তিসত্তা পরিবর্তিত হয় না , বরং পুরনো কোষের সংস্পর্শে আসা নতুন কোষে পুরনো কোষের সকল বৈশিষ্ট্যই কপি হয়ে যায়। আর একটি মানুষ বা প্রাণীর শরীরের প্রতিটি ডিএন্এ-র মধ্যে সংশ্লিষ্ট মানুষ বা প্রাণীর সকল বৈশিষ্ট্য ও তার সারা জীবনের (দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া পর্যন্ত সময়ের) ইতিহাস কোড আকারে লিপিবদ্ধ থাকে। অতএব , একজন মানুষ বা প্রাণীকে পুনরায় সৃষ্টির জন্য তার একটি ডিএন্এ-ই যথেষ্ট। তবে একজন মানুষের বা একটি প্রাণীর বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া সকল ডিএন্এ-ও খুঁজে বের করা ও একত্র করা সম্ভব , কারণ , প্রতিটি প্রাণীর ডিএন্এ-র মধ্যে এমন কিছু স্বাতন্ত্র্য আছে যে , কোনো অবস্থায়ই তা অন্যের কোনো ডিএন্এ-র সাথে অভিন্ন বলে ভুল হবে না।

সেই সাথে বস্তুর ওপর মানসিক শক্তির প্রভাব সংক্রান্ত সর্বশেষ আবিষ্কার-উদ্ভাবনকেও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে সর্বাধিক বিস্ময়কর হলো ব্রেন্ ওয়েভের ক্ষমতা আবিষ্কার - যা বস্তুর ওপরে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে থাকে। আগামী দিনে ব্রেন ওয়েভ্ তথা ইচ্ছাশক্তির দ্বারা কম্পিউটার ও কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত বিমান চালানো আগামী কালের সূর্যোদয়ের মতোই সত্য।

এমতাবস্থায় সীমাহীন শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী পরম জ্ঞানময় মহান স্রষ্টা ইচ্ছা করার সাথে সাথেই প্রতিটি প্রাণীদেহই নিজ নিজ মৃত্যুকালীন শরীরের সবগুলো বা কতক ডিএনএ ও প্রাকৃতিক জগৎ থেকে আরো প্রয়োজনীয় উপাদান নিয়ে পুনরায় আবির্ভূত হবে - এটা সুস্থ বিচারবুদ্ধির অধিকারী কোনো মানুষের পক্ষেই অস্বীকার করা মোটেই সম্ভব নয়।

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক দিনকাল , ঢাকা: ১১ই জুন ২০১১।

পরিমার্জন: ৭ই ডিসেম্বর ২০১৩।

তথ্যসূত্র :

১ বিষয়টি যুক্তিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোন্ ধরনের তার ওপর নির্ভর করে। কারণ ,যুক্তিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো বক্তব্য পাঁচ ধরনের মধ্য থেকে যে কোনো একধরনের হতে পারে , তা হচ্ছে : অকাট্য প্রমাণিত বক্তব্য (برهان ) , বিতর্কে প্রতিষ্ঠিত বা আপাতঃ প্রমাণিত বিষয় (جدال ) , আবেগময় ভাষণ (خطاب ) ,কবিতা (شعر ) ও ভ্রমাত্মক যুক্তি বা অপযুক্তি (مغالطة ) । এর মধ্যে প্র মধরনের বক্তব্য সুস্থ বিচারবুদ্ধির নিকট অবশ্য গ্রহণযোগ্য । দ্বিতীয় ধরনের বক্তব্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে , পরস্পরবিরোধী বক্তব্যসমূহের মধ্য থেকে একটিও অকাট্যভাবে প্রমাণিত না হলেও যেটি বাদে বাকীগুলোর ভ্রান্তি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় আপাততঃ সেটিকে গ্রহণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই , যদিও ভবিষ্যতে নতুন কোনো তথ্য হাযির হয়ে সেটিকে বাতিল করে দেয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। বাকী তিন ধরনের বক্তব্য দ্বারা কোনো কিছু প্রমাণিত হয় না। অন্যদিকে বিষয়বস্তুর বিভক্তির ওপরও কোনো বক্তব্যের প্রামাণ্যতা নির্ভর করে। অর্থাৎ কোনো বিষয়কে তৃতীয়ভাগের সম্ভাবনা বিহীনভাবে পরস্পর বিরোধী দুই ভাগে বিভক্ত করা হলে অনিবার্যভাবে সত্য তার একদিকে থাকবে , কিন্তু যেখানে উপস্থাপিত দুইভাগের বাইরে তৃতীয় ভাগের সম্ভাবনা থাকে সেখানে উপস্থাপিত পরস্পর বিরোধী উভয় দাবীই ভ্রান্ত হতে পারে এবং প্রকৃত অবস্থা অজানা বাঅনুপস্থাপিত থেকে যেতে পারে। যেমন : একটি বস্তু রং বিশিষ্ট বা রংহীন-এর মধ্য হতে যে কোনো একটি হতে বাধ্য , কিন্তু তা সাদা বা কালোর মধ্যে যেকোনো একটি হতে বাধ্য নয় , কারণ তা সাদা-কালোর মাঝামাঝি বা তৃতীয় কোনো রং বিশিষ্ট হতে পারে।

২ এ এক ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা যে , উপযুক্ত পরিভাষা খুঁজে না পাওয়ার কারণে বাংলা ভাষায় ঈমান ’ (ايمان )-এর অনুবাদ করা হয়েছে বিশ্বাস ’ । অথচ প্রকৃত ব্যাপার হলোايمان -এর আভিধানিক অর্থ নিরাপদকরণ ’ । কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে :و آمنهم من خوف - আর যিনি তাদেরকে ভীতি থেকে নিরাপদ করেছেন। ” (সূরা আল্-ক্বুরাইশ্ : ৪) শব্দটির পারিভাষিক অর্থ হলো আল্লাহ্ , পরকালীন জীবন এবং আল্লাহর বাণী ও বাণীবাহক (নবী) কে আশ্রয় করে নিজেকে প্রকৃত ক্ষতি অর্থাৎ পরকালীন অনন্ত জীবনের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিতকরণ। আর বিশ্বাস ’ -এর আরবী প্রতিশব্দ হচ্ছেظن (বিশ্বাস বা ধারণা) ।ظن (বিশ্বাস) ওشک (সন্দেহ) - উভয়ই ধারণা ’ মাত্র ; কোনোটিই অকাট্য সত্য হওয়ার নিশ্চয়তার অধিকারী নয়। এ দু ’ টি পরিভাষার মধ্যে পার্থক্য কেবল এখানে যে ,ظن (বিশ্বাস) পোষণকারী ব্যক্তি একটি ধারণাকে সত্য বলে মনে করে এবংشک (সন্দেহ) পোষণকারী ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট একটি ধারণাকে অসত্য বলে মনে করে। কিন্তু প্রকৃত সত্য উভয়ের ধারণারই বিপরীত বা তা থেকে ভিন্ন কিছু হতে পারে।

যেমন : একটি দরযা বন্ধ ঘরের সামনে এসে কোনো ব্যক্তি মনে করতে পারে যে , ঘরের ভিতরে কোনো মানুষ আছে এবং অপর একজন মনে করতে পারে যে , ঘরের মধ্যে কেউ নেই। অতঃপর উভয়ে ঘরটিতে প্রবেশ করার সাথে সাথে তাদের ওপর একটি বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। আল্লাহ্ তা ‘ আলা এরশাদ করেন :

( ان الظن ل يغنی من الحق شيئا ) - নিঃসন্দেহে বিশ্বাস (বা ধারণা) সত্য থেকে মোটেই বেনিয়ায করে না ” (সূরা ইউনুস : ৩৪)

৩ জীবন ও জগতের পশ্চাতে নিহিত মহাসত্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে অত্র গ্রন্থে বিচারবুদ্ধিভিত্তিক যে আলোচনা করা হয়েছে আমাদেরকে তা কেবল পরম জ্ঞানময় সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও গুণাবলীতেই উপনীত করে না , বরং আমরা যে তাঁর কাছ থেকে পথনির্দেশের মুখাপেক্ষী এ সত্যেও উপনীত করে - যে উপসংহার অত্র আলোচনার ধারাবাহিকতায় আরো কিছু পরেই আসছে। এ মুখাপেক্ষিতার পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান চালিয়ে বিচারবুদ্ধি আমাদেরকে সে পথনির্দেশে উপনীত করে। সে পথনির্দেশের (কোরআন মজীদ) আলোকে পর্যালোচনা করে বিচারবুদ্ধি আমাদেরকে তাক্বদীর সংক্রান্ত সকল সমস্যার সমাধানে উপনীত করে। অত্র গ্রন্থকার প্রণীত অদৃষ্টবাদ ও ইসলাম শীর্ষক গ্রন্থে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে।

৪ এখানে আরবী শব্দتوجه অপেক্ষাকৃত বেশী উপযোগী - যার ব্যবহারিক তাৎপর্য ইচ্ছাকরণ -এর প্রায় সমার্থক , কিন্তু বাংলা ভাষায় অধিকতর উপযোগী পরিভাষা না পাওয়ায় বিষয়টি সহজ করে বুঝাবার জন্য মনোযোগ কথাটি ব্যবহার করতে হলো যদিও প্রকৃত অর্থে পরম প্রমুক্ত অপরিহার্য সত্তা সম্বন্ধে মনোযোগ না দেয়া বা না থাকা পরিভাষা প্রযোজ্য নয়।

৫ আমরা এখানে প্রথম বার কথাটি কালের গর্ভে সৃষ্ট সৃষ্টিসত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি। নয়তো যিনি কালোর্ধ সত্তা তথা আমাদের কালগত অবস্থানের দৃষ্টিতে অনাদি ও অনন্ত সত্তা , তাঁর জন্য প্রথম বার কথাটি প্রযোজ্য নয়। কারণ , তিনি অনাদি কাল থেকে অনবরত এই সৃষ্টিজগতের (আমরা যার অন্তর্ভুক্ত) ন্যায় অসংখ্য নব নব সৃষ্টিজগতের সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার সূচনা করে আসছেন এবং এভাবে অনন্ত কাল পর্যন্ত নব নব সৃষ্টিসূচনা অব্যাহত রাখবেন।

৬ যদিও বিচারবুদ্ধিভিত্তিক আমাদের এ আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক নয় , তবু উল্লেখ করা যেতে পারে যে , অধিকাংশ মানুষের ধারণার বিপরীতে , হযরত আদম (আঃ) ও তাঁর স্ত্রী হযরত হাওয়া (আঃ)-কে যে জান্নাতে রাখা হয়েছিলো তা পরকালে পুরষ্কার হিসেবে দেয় অনন্তকালীন অবিনশ্বর জান্নাত (বেহেশত) নয় , বরং এ পৃথিবীরই একটি বাগান (জান্নাত) ছিলো। তবে যেহেতু আল্লাহ্ তা আলা সেটিকে বিশেষভাবে তৈরী করেছিলেন তাই তা পার্থিব বাগানের সকল ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে মুক্ত থাকা তথা পরকালীন জান্নাতের একটি নমুনা হওয়াই স্বাভাবিক। এটি যে অবিনশ্বর জান্নাত ছিলো না এরূপ ধারণা করার পিছনে বিচারবুদ্ধিজাত কয়েকটি কারণ পাওয়া যায়। প্রথমতঃ হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টিই করা হয়েছিলো পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য এবং কোরআন মজীদের কোনো কোনো আয়াত থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে , তাঁকে পৃথিবীর উপাদান দিয়েই তৈরী করা হয়েছিলো। তাই পৃথিবীর প্রতিনিধিকে অবিনশ্বর জান্নাতে রাখার কথা অকল্পনীয়। দ্বিতীয়তঃ অবিনশ্বর জান্নাতে শয়তানের প্রবেশের কোনো সুযোগ থাকতে পারে না ; যাকে স্রষ্টার সন্নিধান থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে তাকে বেহেশতে প্রবেশের সুযোগ দেয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। আর বেহেশতে যে ঐশী সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে তাতে শয়তানের পক্ষে সেখানে প্রবেশ করতে পারার প্রশ্নই ওঠে না। তৃতীয়তঃ অবিনশ্বর বেহেশতে কেউ একবার প্রবেশ করলে সে সেখানকার অবিনশ্বর অধিবাসী হয়ে যায় এবং সেখান থেকে তাকে বের করে দেয়া অকল্পনীয়। কারণ , এরূপ কাজ বেহেশতের অবিনশ্বরতার বৈশিষ্ট্যের সাথে সাংঘর্ষিক।

৭ এ বিষয়ে অত্র গ্রন্থকারের নবী-রাসূলগণের (আঃ) পাপমুক্ততা শীর্ষক একটি পাণ্ডুলিপি আছে। আল্লাহ্ তা আলা তাওফীক দিলে ভবিষ্যতে তাকে যথাসাধ্য পরিপূর্ণতা প্রদান ও প্রকাশ করা হবে।

৮ এ বিষয়ে পরে অত্র প্রবন্ধের শেষ দিকে অপেক্ষাকৃত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

৯ খৃস্টানদের বিশ্বাস যে , তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কোরআন মজীদে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে , তাঁকে হত্যা করা হয় নি , বরং আল্লাহ্ তা আলা তাঁকে তুলে নিয়ে গেছেন , আর এ ব্যাপারে তারা (তৎকালীন ইয়াহূদী , রোমান ও খৃস্টানরা) চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছিলো। এ আয়াত ও কতক হাদীছের ভিত্তিতে মুসলমানরা মনে করেন যে , আল্লাহ্ তা আলা তাঁকে চতুর্থ আসমানে রেখেছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে , হযরত ইমাম মাহ্দী (আঃ)-এর আবির্ভাব-যুগে তিনি আসমান থেকে নেমে আসবেন ও হযরত ইমাম (আঃ) কে সহযোগিতা করবেন। কোরআন মজীদে উল্লিখিত তাদের বিভ্রান্তির মধ্যে পড়া সম্বন্ধে মুসলিম পণ্ডিতগণের ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে , হযরত ঈসা (আঃ)-এর যে বিশ্বাসঘাতক শিষ্য তাঁকে ধরিয়ে দিয়েছিলো তার চেহারা ঈসা (আঃ)-এর মতো হয়ে গিয়েছিলো এবং ফেরেশতারা ঈসা (আঃ)-কে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ঘরের মধ্যে ঐ ব্যক্তিকে একা পেয়ে রোমান শাসকের পুলিশরা তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং তাকেই শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হয়। অনেকে মনে করেন যে , ঐ ব্যক্তির চেহারা পরিবর্তিত হয় নি , বরং রোমানরা ঈসা (আঃ)-কে চিনতো না বিধায় ফেরেশতারা তাঁকে নিয়ে যাওয়ার পর ঐ ঘরের মধ্যে ঐ ব্যক্তিকে একা পেয়ে তাকেই ঈসা (আঃ) মনে করে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে।

১০ .অবশ্য এর পরে ছ্বাহাবী ও ইমামগণ থেকে বর্ণিত হাদীছ ও রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরের বর্ণনাকারীদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।

১১ অত্র উপশিরোনামে আমরা বিচারবুদ্ধির আলোকে যে মতামত ব্যক্ত করেছি কোরআন মজীদ ও সুন্নাতে রাসূলে (ছ্বাঃ) ও তার সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু আলোচনার বিচারবুদ্ধি ভিত্তিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে আমরা তার উল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম। তবে এগুলো এতোই সুস্পষ্ট যে , কোরআন ও হাদীছ অধ্যয়নে অভ্যস্ত পাঠক-পাঠিকাগণ খুব সহজেই এগুলো পেয়ে যাবেন।

১২ যদিও আমাদের এ আলোচনা বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে , তবে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর পরে তাঁর উম্মাতের মধ্যে সর্বাধিক ইলমী যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি সম্পর্কে মুতাওয়াততীর হাদীছে এবং পাপমুক্ত ব্যক্তিবর্গ সম্বন্ধে কোরআন মজীদের সূরা আল্-আযহাবের আয়াতে তাত্ব্হীরে উল্লিখিত হয়েছে।

১৩ আর ইসলামের ইতিহাস সাক্ষী যে , কোরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রগণ্য ব্যক্তিকে ইমাম ও শাসকের পদে অধিষ্ঠিত না করার পরিণাম উম্মাহর জন্য ভয়াবহ হয়েছিলো - যার যের আজো শেষ হয় নি। অর্থাৎ উম্মাহর মধ্যে রক্তক্ষয়ী মতপার্থক্য ও বিভক্তিই প্রমাণ করে যে , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পরে উম্মাহর নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য অনুসৃত পদ্ধতি সঠিক ছিলো না।

১৪ আহলে সুন্নাত্ ” , খুলাফায়ে রাশেদীন্ ” , ছ্বিহাহ্ সিত্তাহ্ ” ইত্যাদি পরিভাষা কোরআন মজীদ বা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হাদীছে রাসূল (ছ্বাঃ) থেকে প্রাপ্ত কোনো পরিভাষা নয় , বরং অনেক পরে বিশেষ উদ্দেশ্যে এগুলো তৈরী করা হয়। আহলে সুন্নাত্ ” পরিভাষা তৈরীর উদ্দেশ্য ছিলো এটাই বুঝানো যে , এর বহির্ভূত যে সব ইসলামী গোষ্ঠী ছিলো (বা রয়েছে) , বিশেষ করে শিয়া মায্হাবের অনুসারীরা , তারা রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর সুন্নাতের অনুসারী নয় , বরং বিদ্ ‘ আতী গোষ্ঠী। তেমনি ছ্বিহাহ্ সিত্তাহ্ ” পরিভাষা তৈরীর উদ্দেশ্য ছিলো এটাই বুঝানো যে , এর বহির্ভূত হাদীছ-সংকলনগুলো (শিয়া ধারার সংকলনগুলো এবং মুওয়াত্বত্বা ’ , মুসনাদে আহমাদ ইব্নে হাম্বাল্ , মুস্তাদরাকে হাকেম্ ইত্যাদি সুন্নী ধারার সংকলন) ছ্বাহীহ্ নয়। সুন্নী ” র ন্যায় আজকের পারিভাষিক অর্থে তথা মায্হাব্ হিসেবে শিয়া ” পরিভাষাও পরবর্তীকালের। অবশ্য শিয়া ” শব্দের ব্যবহার (আভিধানিক অর্থে ক্ষুদ্র গোষ্ঠী ’ ) পূর্বেও ছিলো ; রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর জীবদ্দশায় হযরত আলী (আঃ)- এর ঘনিষ্ঠ ভক্ত-অনুরক্তদেরকে“‘ আলীর শিয়া ” বলা হতো। কিন্তু তখন বিভিন্ন মায্হাবের অস্তিত্ব ছিলো না। পরবর্তীকালে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর আহলে বাইতের ইমামগণের অনুসারীদের বাইরে বিভিন্ন ফিক্ব্হী গোষ্ঠী তৈরী হলে এবং সেগুলোকে মালেকী ” , হানাফী ” ইত্যাদি ও সামগ্রিকভাবে সুন্নী ” নামকরণ করা হলে আহলে বাইতের ইমামগণের অনুসারীগণ শিয়া ” ও তাঁদের ফিক্বাহ্ শিয়া মায্হাব্ ” হিসেবে পরিচিত হয় , যদিও তাঁরা কোনো মায্হাব্ সৃষ্টি করেন নি। যা-ই হোক , আমরা এখানে আহলে সুন্নাত্ ” কথাটি প্রচলিত পারিভাষিক অর্থে ব্যবহার করেছি , এর আভিধানিক অর্থে নয়।

১৫ , অবশ্য পরবর্তীকালে ইমাম মালেক তাঁর নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং আব্বাসী সরকারের সাথে সহযোগিতা করেন ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় মালেকী মায্হাব্ প্রতিষ্ঠা করেন। অন্যদিকে ইমাম আবূ হানীফাহ্ সরকারের সাথে অসহযোগিতা করলেও এবং কোনো মায্হাব্ তৈরী না করলেও তাঁর শিষ্য আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ্ বিন্ হাসান শয়বানী সরকারের সাথে সহযোগিতা করেন এবং ইমাম আবূ হানীফার সুনাম কাজে লাগিয়ে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় হানাফী মাযহাব তৈরী করেন।

১৬ কারো কাছে একটি বিষয় এমনভাবে সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়া যে , তার মধ্যে এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ-সংশয় না থাকে। অতঃপর সে যদি বিষয়টি গ্রহণ না করে তাহলে তা নেফাক্বের পরিচায়ক হবে , নচেৎ নয়। এ কারণেই , কোনো নবীকে নবী হিসেবে মেনে নেয়ার বিষয়টিও ইত্মামে হুজ্জাত্-এর ওপর নির্ভরশীল ; কারো জন্য ইতমামে হুজ্জাত্ না হলে নবীকে নবী হিসেবে স্বীকার না করার কারণে শেষ বিচারে কাউকে পাকড়াও করা হবে না। তবে আল্লাহরমনোনীত নবী বা ইমামের প্রশ্ন বাদেও মানুষ তার এখ্তিয়ারাধীন বিষয়েও জ্ঞাতসারে সর্বোত্তমকে বেছে না নিলে , তা যদি অসদুদ্দেশ্যে হয় তো তাকে শেষ বিচারে জবাবদিহি করতে হবে এবং যদি অসাবধানতার কারণে হয় তবু তার নিজের বা অন্যদের ওপর এর ইহকালীন ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া বর্তাবেই।

১৭ এ ধরনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নবী-রাসূলগণের (আঃ) পাপমুক্ততা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে , কোরআন মজীদের কোনো আয়াতের হুকুম মানসূখ্ হতে পারে না এবং হুকুম বজায় রেখে কোনো আয়াতের তেলাওয়াত মানসূখ্ হতে পারে না ; শেষোক্ত ধরনের হুকুম থাকলে তা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) থেকে বলে গণ্য করতে হবে - যা আল্লাহ্ প্রদত্ত এখ্তিয়ার বলে তিনি প্রদান করেন। (মূলতঃ কোরআন মজীদের আয়াতে মানসূখ্ কথাটি পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে।)

১৮ ইজতিহাদ সম্পর্কিত আরো কিছু বিষয় নিয়ে পরে আলোচনা করা হয়েছে।

১৯ কতক হাদীছের বর্ণনার ভিত্তিতে অনেকে মনে করেন যে , ব্যাপারে কোরআন মজীদে আয়াত নাযিল হয়েছিলো , কিন্তু সংশ্লিষ্ট আয়াতের পাঠ ( text)পরবর্তী সময়ে রহিত (মানসূখ্ )হয়ে যায় , তবে তারহুকুম বহাল থেকে যায়। কিন্তু ইতিপূর্বে যেমন আমরা উল্লেখ করেছি , প্রকৃত পক্ষেকোরআন মজীদের কোনো আয়াতের পাঠ বা কোনো আয়াতের হুকমু রহিত হয় নি। কোরআন মজীদে যে আয়াতে আয়াত রহিতকরণ বা ভুলিয়ে দেয়া কথা বলা হয়েছে তাতে কোরআন মজীদের আয়াত রহিতকরণের কথা বলা হয় নি , বরং পূর্ববর্তীআসমানী কিতাব সমূহের আয়াত রহিতকরণের কথা বলা হয়েছে। বিষয়ে আমরা কোরআনের পরিচয় গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

নবীর পাপমুক্ততা

কোনো ব্যক্তিকে নবী হিসেবে চিনতে পারার জন্য তাঁর মধ্যে অপর যে বৈশিষ্ট্যটি পাওয়া অপরিহার্য তা হচ্ছে , তাঁর গোটা জীবনই পাপমুক্ত হতে হবে।

নবুওয়াত দাবী করার পূর্বেই হোক বা পরেই হোক , যে ব্যক্তি সর্বজনীনভাবে বিচারবুদ্ধি কর্তৃক পাপ বা অপরাধ বা অন্যায় হিসেবে পরিগণিত কোনো কাজে কখনো লিপ্ত ছিলো , সুস্থ বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী সে ব্যক্তি নবী হতে পারে না। কারণ , এরূপ ক্ষেত্রে তার পাপ , অপরাধ বা অন্যায় কাজ সম্পর্কে অবগত ব্যক্তির পক্ষে তাকে নবী হিসেবে মনে করা সম্ভব হবে না। ফলে সে নবুওয়াতের দাবীদার ব্যক্তিকে ও তার দাবীকে প্রত্যাখ্যান করলে সৃষ্টিকর্তা ঐ ব্যক্তিকে নবীকে প্রত্যাখ্যান করা র অপরাধে অপরাধী বলে গণ্য করবেন না - এটা বিচারবুদ্ধির এক অকাট্য রায়। আর লোকেরা যদি নবীকে নবী হিসেবে চিনতেই না পারে , বরং তাঁর নবুওয়াত-দাবীর ব্যাপারে যুক্তিসঙ্গত কারণে সন্দেহ-সংশয়ে নিপতিত হয় তাহলে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে নবী প্রেরণের লক্ষ্যই অনর্জিত থেকে যাবে।

এ কারণে বিচারবুদ্ধির রায় হচ্ছে , সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার জন্য এটা অপরিহার্য যে , তিনি কোনো পাপমুক্ত ব্যক্তিকে নবী হিসেবে মনোনীত করবেন অথবা যাকে নবী হিসেবে মনোনীত করবেন তাঁকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পাপ থেকে রক্ষা করবেন। মানুষকে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য এটা অপরিহার্য।

বলা বাহুল্য যে , এখানে পাপ বলতে আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের দৃষ্টিতে যা অন্যায় বা অপরাধ তা-ই বিবেচ্য ; যে কাজের অন্যায় বা অপরাধ হওয়া বা না-হওয়া সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিতর্ক আছে তা এখানে বিবেচ্য নয়। তাই মিথ্যাচার , হত্যা , ধর্ষণ , ব্যভিচার , চুরি-ডাকাতি , ধোঁকা-প্রতারণা , বিশ্বাসঘাতকতা , অন্যের সম্পদ জবর দখল ও আত্মসাত , আমানতের খেয়ানত , যুলুম-অত্যাচার , নির্যাতন ইত্যাদি অন্যায় কাজ কখনোই একজন নবীকে স্পর্শ করতে পারে না। তেমনি তাঁর জীবনকে - নবুওয়াত-দাবীর পূর্বেও - দ্বিত্ববাদী , ত্রিত্ববাদী বা বহুত্ববাদী ধারণা ও কার্যকলাপ স্পর্শ করতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে , বিচারবুদ্ধি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও একত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হবার পর তাঁর নিকট জবাবদিহিতার অনুভূতি ও তাঁর পক্ষ থেকে পথনির্দেশের প্রয়োজনীয়তাবোধের কারণেই নবীর সন্ধান করে থাকে। এ পথের শুরুর দিকেই , একত্ববাদে উপনীত হতে গিয়েই সে দ্বিত্ববাদ , ত্রিত্ববাদ , বহুত্ববাদ ও অবতারবাদ ইত্যাদিকে প্রত্যাখ্যান করে। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের বিচারবুদ্ধির ওপরে বিভিন্ন ধরনের ভ্রমাত্মক যুক্তি , চিন্তা ও অন্ধ বিশ্বাসের আবরণ পড়তে পারে এবং এর ফলে তার অন্তরে বিচারবুদ্ধির রায় হাল্কা ও অগভীর হয়ে পড়তে পারে বা সে গতানুগতিকতার বিরোধী বিচারবুদ্ধির রায়কে স্বীয় মস্তিষ্কে পোষণ করতে ও লোকদের সামনে প্রকাশ করতে ভয় পেতে পারে ও সে কারণে তা জোর করে চাপা দিতে পারে ; অতঃপর নবী বা নবীর পক্ষ থেকে কেউ এসে তাকে সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার বিচারবুদ্ধির রায়কেই সুতীক্ষ্ণ করার চেষ্টা করতে পারেন।

অন্য কথায় , নবীর মূল কাজই হচ্ছে জীবন ও জগতের মহাসত্য সম্বন্ধে এবং নিজের , অন্যদের ও স্রষ্টার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য তথা ঔচিত্য-অনৌচিত্য সম্বন্ধে মানুষের বিচারবুদ্ধির রায়কে শানিত করা ; বিতর্কিত বিষয়াদিতে সঠিক ফয়সালা এ দায়িত্বেরই সম্প্রসারণ মাত্র। এমতাবস্থায় চিন্তা বা কর্মের দিক থেকে বা উভয় দিক থেকেই কখনো না কখনো দ্বিত্ববাদ , ত্রিত্ববাদ , বহুত্ববাদ বা অবতারবাদে বিশ্বাসী ছিলো , অথবা সর্বজনস্বীকৃত কোনো অন্যায় বা পাপ কাজে কখনো না কখনো নিশ্চিতভাবেই লিপ্ত ছিলো - এমন ব্যক্তিকে বিচারবুদ্ধির পক্ষে স্রষ্টার পক্ষ থেকে মনোনীত নবী হিসেবে মেনে নেয়া সম্ভব হতে পারে না।

দ্বিতীয়তঃ এরূপ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে , স্রষ্টার পক্ষে কি নবীর দায়িত্ব দেয়ার জন্য কোনো তাওহীদবাদী পাপমুক্ত মানুষ গড়ে তোলা অসম্ভব যে , কখনো না কখনো অংশীবাদে বা সর্বজনস্বীকৃত অন্যায় বা পাপে লিপ্ত ছিলো এমন একজন লোককে নবুওয়াতের দায়িত্ব দেবেন ?

তৃতীয়তঃ এরূপ পরিস্থিতি ভণ্ড নবীর আবির্ভাবের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরী করে দেয়। কারণ , নবুওয়াতের মর্যাদার পার্থিব সম্মান লাভ অথবা মানুষকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে যে কোনো পাপাচারী লোকের পক্ষে নবী সেজে বসা সম্ভব। এ অবস্থায় এরূপ ব্যক্তি দাবী করতে পারে যে , সে আগে অংশীবাদী বা পাপকর্মে লিপ্ত হয়ে থাকলেও সৃষ্টিকর্তা অনুগ্রহ করে তাকে নবী পদে অভিষিক্ত করেছেন এবং এ দায়িত্বে অভিষিক্ত হবার পর থেকে আর সে অংশীবাদ বা পাপ কর্মে লিপ্ত হয় নি।

চতুর্থতঃ এরূপ অবস্থায় যে কারো বিচারবুদ্ধি একজন প্রকৃত নবীকে ভণ্ড নবী মনে করে প্রত্যাখ্যান করতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে এ প্রত্যাখ্যানের জন্য তাকে অপরাধী গণ্য করা যাবে না। কারণ , এমনকি একজন অংশীবাদী বা পাপকর্মে লিপ্ত ব্যক্তি কর্তৃকও কাউকে নবী হিসেবে গ্রহণ করতে হলে তা বিচারবুদ্ধির রায়ের ভিত্তিতেই করতে হবে ; এর কোনো বিকল্প নেই। এমতাবস্থায় বিচারবুদ্ধিই যদি কাউকে ভণ্ড নবী বলে রায় দেয় তখন তাকে নবী হিসেবে গ্রহণ করা কারো জন্যই অপরিহার্য হতে পারে না।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে , অংশীবাদী বা কখনো না কখনো সর্বজনস্বীকৃত অন্যায় বা পাপ কর্ম সম্পাদনকারী ব্যক্তিকে নবুওয়াত প্রদান করা হলে নবী প্রেরণের মূল উদ্দেশ্যই ভণ্ডুল হয়ে যায়। অতএব , এ ব্যাপারে বিতর্কের অবকাশ নেই যে , একজন নবীকে তাঁর জীবনের নবুওয়াত দাবী করার পূর্ববর্তী অধ্যায়েও তাওহীদবাদী (একত্ববাদী) ও পাপমুক্ত হতে হবে।

এছাড়া যিনি নবী হবেন তাঁর জন্য তাঁর জীবনের নবুওয়াত দাবী করার পূর্ববর্তী অধ্যায়েও মনবতাবোধ , দয়ার্দ্রতা , সদাচরণ , পরোপকার , সাহসিকতা , নিঃস্বার্থপরতা , লোভহীনতা ইত্যাদি সদগুণের অধিকারী হওয়াও অপরিহার্য যাতে তাঁর নবী হওয়ার ব্যাপারে মানুষের মনে সহজেই আস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

তবে মনে রাখা দরকার যে , নবীর পাপমুক্ততার বিষয়টি এমন নয় যে , নবীর মধ্যে পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতাই থাকবে না। বরং মানুষ হিসেবে প্রাপ্ত স্বাধীনতার বিচারে নবী ও অন্য মানুষের মধ্যে পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতার ব্যাপারে কোনোই পার্থক্য থাকা সম্ভব নয়। কারণ , কোনো মানুষের পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতা কেড়ে নিলে সে আর মানুষ থাকবে না ; ফেরেশতার সমপর্যায়ভুক্ত হবে। আর বলা বাহুল্য যে , এরূপ ব্যক্তি মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হতে পারে না। কারণ , সে ক্ষেত্রে মানুষের জন্য এ যুক্তি তৈরী হয়ে যায় যে , নবীর মধ্যে তো পাপের ক্ষমতাই নেই , তাই সে পাপ করে না ; আমাদের মধ্যে পাপে লিপ্ত হবার ক্ষমতা রয়েছে , তাই আমাদের পক্ষে পাপে লিপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

বরং নবীর পাপমুক্ততার বিষয়টি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে স্বাভাবিক মানবিক কার্যকারণের মধ্য দিয়ে নিশ্চিতকরণই স্বাভাবিক ও সর্বজনীন বিচারবুদ্ধির নিকট গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ জন্মগতভাবে রক্তধারার পবিত্রতা ও সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নবীরূপে মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে এ মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তা , কথা ও কাজ পরিহারের স্বাভাবিক প্রবণতার কারণে নবীর মধ্যে শুরু থেকেই এমন একটি রুচিবোধ ও চরিত্র গড়ে ওঠে যার ফলে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পাপ কর্মের প্রতি তাঁর মধ্যে কোনোরূপ আগ্রহ সৃষ্টি হয় না , বরং ঘৃণা সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ , মানুষ পায়খানা-পেশাব ভক্ষণ ও পান করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কারো মধ্যে এর আগ্রহ সৃষ্টি হয় না (ব্যতিক্রম হিসেবে কদাচিৎ বহু কোটি মানুষের মধ্যে দু একটি চরম বিকৃতরুচি ব্যক্তিকে এ কাজ করতে দেখা গেলেও) , বরং সকল মানুষই এর প্রতি ঘৃণা বোধ করে থাকে। নবীর মধ্যে এই রূচিবোধই সর্বোচ্চ পর্যায়ের হয়ে থাকে যার ফলে সকল পাপ ও নোংরা কাজের প্রতি তাঁর মধ্যে ঘৃণা জন্ম নিয়ে থাকে।

এ প্রসঙ্গে আরো দু একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিস্কার হতে পারে। যেমন: একটি অবুঝ শিশু একটি ফণা-তোলা সাপের বা একটি প্রদীপের শিখার সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে তা ধরার জন্য আগ্রহী হতে পারে , কিন্তু কোনো বুদ্ধিমান মানুষ এ কাজে অগ্রসর হবে না বা আগ্রহ অনুভব করবে না। কারণ , শিশু সাপের সৌন্দর্য দেখলেও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এ সৌন্দর্যের আড়ালে সাক্ষাৎ মৃত্যু বা চরম যন্ত্রণা দেখে শিউরে ওঠে। তেমনি সংশ্লিষ্ট বস্তুর প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে অজ্ঞ একজন লোক বিদ্যুতবাহী তার স্পর্শ করতে বা পানি মনে করে এসিড পান করতে দ্বিধা করবে না এবং পিপাসার্ত অবস্থায় জানা না থাকার কারণে বিষমিশ্রিত শরবত পান করতে আগ্রহ অনুভব করবে। কিন্তু যার সংশ্লিষ্ট বস্তুর প্রকৃত অবস্থা জানা আছে সে সযত্নে এ সব থেকে দূরে থাকবে ; পিপাসায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও জানা অবস্থায় কিছুতেই সে এসিড বা বিষমিশ্রিত শরবত পান করবে না। ঠিক এভাবেই নবীর দৃষ্টিতে যে কোনো পাপকাজের ভয়াবহ পরিণাম সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে বিধায় তিনি এ থেকে দূরে থাকবেন এবং এর প্রতি কখনোই আগ্রহ অনুভব করবেন না - এটাই বিচারবুদ্ধির দাবী।

অনেক সময় কোনো কোনো নবী সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে বা এমনকি ধর্মগ্রন্থে এমন সব বর্ণনা পাওয়া যায় যা থেকে মনে হয় যে , তাঁরা কখনো কখনো পাপকার্যে লিপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু বিচারবুদ্ধি নবীর পাপে লিপ্ত হবার বিষয়টি গ্রহণ করে না , সেহেতু এ ক্ষেত্রে তিনটি অবস্থা হতে পারে। তা হচ্ছে , হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আদৌ নবী ছিলেন না , অথবা সংশ্লিষ্ট বর্ণনাটি মিথ্যা বা বিকৃত , নয়তো বর্ণনাটির সঠিক তাৎপর্য গ্রহণ করা হয় নি।

নবী হচ্ছেন মানুষের কাছে স্রষ্টার পথনির্দেশ পৌঁছাবার প্রত্যক্ষ মাধ্যম এবং পূর্ণ শর্তাবলী বিশিষ্ট প্রতিনিধি , আর মানুষের জন্য স্রষ্টার মনোনীত নেতা ও শাসক। এ পদ মানুষের মধ্যকার সর্বোত্তম মর্যাদাপূর্ণ পদ। তাই যুগে যুগে সত্য নবী ছাড়াও বহু মিথ্যা নবীরও আবির্ভাব ঘটেছে । এরূপ ভণ্ড-প্রতারক ব্যক্তিরা স্বীয় প্রতারণার চক্রের সদস্যদের দ্বারা পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মু জিযাহও প্রচার করে থাকে। তাই নবুওয়াতের দাবীদার কোনো ব্যক্তির জীবন সম্বন্ধে ব্যাপক ও গভীরভাবে অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন। অনুসন্ধানে তার জীবনে কখনো কোনো পাপকর্ম অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলে সে ব্যক্তি যে নবী নয় , বরং নবী হওয়ার মিথ্যা দাবীদার , অথবা সে নিজে দাবী না করলেও স্বার্থান্বেষীরা তাকে তথাকথিত নবী বানিয়েছে - তাতে সন্দেহ নেই।

অন্যদিকে বিচারবুদ্ধি বলে , ভণ্ড-প্রতারক পাপাচারীরা কোনো কোনো নবীর বা অনেক নবীর বা নবীদের (আঃ) নামে পাপকর্মের মিথ্যা কাহিনী তৈরী করে থাকতে পারে। দু ধরনের লোকেরা এ কাজ করে থাকতে পারে। প্রথমতঃ কোনো নবীর বা নবীদের (আঃ) বিরোধীরা - যাদের উদ্দেশ্য ছিলো সংশ্লিষ্ট নবী বা নবীদের (আঃ) সম্বন্ধে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং তাঁর বা তাঁদের ওপর অনাস্থা সৃষ্টি করা । দ্বিতীয়তঃ কোনো নবীর বা নবীদের (আঃ) অনুসারী হবার দাবীদার পাপাচারী লোকেরা যারা নিজেদের পাপকর্মের সপক্ষে সাফাই ও অজুহাত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নবীর বা নবীদের (আঃ) নামে মিথ্যা রচনা করেছে।

কোনো বা কোনো কোনো ধর্মের মূল ধর্মীয় সূত্র থেকে কোনো বা কোনো কোনো নবীর দ্বারা পাপকর্ম সম্পাদিত হয়েছিলো বলে ধারণা পাওয়া গেলে সে ব্যাপারে বিচারবুদ্ধি তিনটি কারণ খুঁজে পায়। প্রথমতঃ সূত্রটি অকাট্যভাবে গ্রহণযোগ্য না হতে পারে। অর্থাৎ সূত্রটিকে যে বা যার সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে দাবী করা হয় তা তাঁর বা তাঁদের সাথে সম্পর্কিত না-ও হতে পারে এবং তাঁর বা তাঁদের নামে অন্য কারো রচিত হতে পারে। বিশেষ করে তাঁর বা তাঁদের থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরের বর্ণনাকারীদের ঐতিহাসিকতা ও ন্যায়নিষ্ঠতার অকাট্যতা এবং প্রতি স্তরে তাঁদের সংখ্যা বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে মিথ্যা রচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যানের জন্য যথেষ্ট বলে পরিগণিত না-ও হতে পারে। ফলে এরূপ সূত্রে কোনো নবী বা নবীদের (আঃ) দ্বারা পাপকার্য সম্পাদনের বর্ণনা বিচারবুদ্ধির নিকট মোটেই গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না।

দ্বিতীয়তঃ ধর্মীয় সূত্রটি উপরোক্ত মানদণ্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ থেকে উৎসারিত বলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলে এবং সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের গ্রহণযোগ্যতাও বিচারবুদ্ধির আদালতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সূত্রে কোনো বা কোনো কোনো নবীর (আঃ) পাপকর্মে লিপ্ত থাকার কথা উল্লিখিত পাওয়া গেলে তার দু টি অবস্থা হতে পারে। প্রথমতঃ পাঠকের নিকট পাপকর্মের যে সংজ্ঞা বা সীমারেখা রয়েছে তা বিচারবুদ্ধির নিকট সর্বজনীন ও অকাট্যভাবে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। অর্থাৎ নবীর বা নবীদের যে কাজের উল্লেখ দেখে পাঠক তাকে পাপকর্ম বলে মনে করতে পারেন , তা হয়তো আদৌ পাপকর্ম নয়। অর্থাৎ যে কাজের পাপ হওয়ার বিষয়টি বিতর্কিত পাঠক তাকেই অকাট্যভাবে পাপ বলে মনে করে নিয়েছেন। দ্বিতীয়তঃ পাঠক সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সূত্রের অর্থ গ্রহণে ভুল করে থাকতে পারেন। এ প্রসঙ্গে দু একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিস্কার হবে।

গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সূত্র তাওরাত ও কোরআন মজীদে প্রথম মানুষের নাম আদম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য যে , প্রথম মানুষ হিসেবে তিনি নবীও ছিলেন বটে। তাওরাত ও কোরআনে বলা হয়েছে যে , সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ ভুলে গিয়ে তিনি ও তাঁর স্ত্রী নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেন। অনেকেই এটিকে মানুষের প্রথম পাপ বলে মনে করে। (শুধু তা-ই নয় , অনেকেই মনে করে যে , এ পাপের কারণেই তাঁকে সস্ত্রীক বেহেশত থেকে বের করে দেয়া হয় ; নইলে মানব প্রজাতি আজো বেহেশতেই থাকতো , যদিও কোরআনে বলা হয়েছে যে , পৃথিবীর বুকে সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের জন্যই তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো।) কিন্তু ঐ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ সর্বজনীনভাবে বিচারবুদ্ধির নিকট অন্যায় বা পাপ বলে পরিগণিত কাজসমূহের (যার অনেকগুলোর কথাই আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি) অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। দ্বিতীয়তঃ উক্ত উভয় সূত্র থেকেই সুস্পষ্ট যে , তখন পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে হযরত আদম (আঃ)-কে কোনোরূপ ধর্মীয় বিধিবিধান প্রদান করা হয় নি। ফলে বিচারবুদ্ধি কেবল এটাই বলে না যে , ঐ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করার ফলে সর্বজনীনভাবে পাপ বা অন্যায় বলে পরিগণিত কোনো কাজ সম্পাদিত হয় নি , বরং এ-ও বলে যে , এর দ্বারা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত কোনো বিশেষ বিধান ও লঙ্ঘিত হয় নি। বরং এ ছিলো মানুষকে প্রদত্ত স্বাধীনতা মানুষ কীভাবে প্রয়োগ করতে পারে তার একটি পরীক্ষা মাত্র। পূর্ব-অভিজ্ঞতাবিহীন হযরত আদম ও হযরত হাওয়া (আঃ) কৌতুহলবশে ও শয়তানের দ্বারা প্রতারিত হয়ে ভুলবশতঃ উক্ত বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করেন , যদিও এ ভুল কাজ করার কারণে তাঁরা কিছু না কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হন।6 তাছাড়া এ-ও হতে পারে যে , তখনো তাঁরা শর ঈ দায়িত্ব-কর্তব্য প্রযোজ্য হবার বয়সে উপনীত হন নি। অতএব , এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় না যে , নবী পাপকার্যে জড়িত হতে পারেন।

এবার ধর্মীয় সূত্র থেকে ভুল অর্থ গ্রহণের একটি দৃষ্টান্ত। কোরআন মজীদের বর্ণনা থেকে এরূপ তাৎপর্য গ্রহণ করা হয়েছে যে , হযরত ইবরাহীম (আঃ) প্রথমে নক্ষত্র , চন্দ্র ও সূর্যকে রব (প্রভু/ সৃষ্টিকর্তা) মনে করেছিলেন অর্থাৎ তিনি ঐ সময় সাময়িকভাবে হলেও অংশীবাদী ধারণা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু এ ঘটনার বর্ণনাকে তার পূর্ববর্তী আয়াত সমূহের সাথে মিলিয়ে পড়লে দেখা যায় যে , ঘটনাটি তাঁর নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য অভিষিক্ত হওয়ার পরবর্তী কালের। অতএব , সংশ্লিষ্ট অংশীবাদী কথাগুলো তাঁর নয় , বরং অন্য কারো। অর্থাৎ একজন অংশীবাদী ও হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মধ্যকার কথোপকথনকে এক ব্যক্তির অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর একার উক্তি বলে গণ্য করায় এরূপ ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে।

নবীগণের (আঃ) পাপমুক্ততা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনার দাবীদার।7 এখানে বিচারবুদ্ধির আলোকে মূল বিষয়টি প্রতিপাদনের লক্ষ্যে এতোটুকু আলোচনাই যথেষ্ট বলে মনে করি।

মহাসত্যের প্রশ্নে নবীর আপোসহীনতা

নবীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জীবন ও জগতের অস্তিত্বের পিছনে নিহিত মহাসত্য প্রশ্নে আপোসহীনতা। বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে কোনো রকম প্রলোভন , ভয়-ভীতি , এমনকি জীবনাশঙ্কার মুখেও নবী তাঁর নবুওয়াতের দাবী এবং জীবন ও জগতের অস্তিত্বের পিছনে নিহিত মহাসত্য প্রকাশ হতে বিরত থাকতে পারেন না। কারণ , তাঁকে নবী হিসেবে মনোনীত করার উদ্দেশ্যই এটা। আর মূল উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করলে নবী আর নবী থাকেন না বা বলা যেতে পারে যে , নবী ও অ-নবীর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাই নবী সর্বাবস্থায়ই মহাসত্য প্রকাশ ও প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখবেন।

অবশ্য নবীর আপোসহীনতার মানে এ নয় যে , তিনি জোর করে মানুষের ওপর মহাসত্যকে চাপিয়ে দেবেন বা সদাই সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকবেন। কারণ , সত্য চাপিয়ে দেয়ার বা জোর করে গ্রহণ করানোর বিষয় নয়। নবীর কাজ হচ্ছে মানুষের বিচারবুদ্ধিকে জাগ্রত করানো এবং তার সামনে মহাসত্যকে পেশ করা। বরং সষ্টার প্রতিনিধি স্বাধীনতার অধিকারী সৃষ্টি মানুষের ওপর কোনো চিন্তা ও কাজ জোর করে চাপিয়ে দেয়া মস্ত বড় অন্যায় , আর নবীর আবির্ভাবের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এ অন্যায় চর্চার অবসান ঘটানো। অতএব , অন্যদের ওপর স্বীয় বক্তব্য চাপিয়ে দিয়ে তিনি নিজেই এ উদ্দেশ্যের বিপরীত আচরণ করতে পারেন না। এমনকি কোনো জনগোষ্ঠী তাঁকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করলে এবং সেখানে তাঁর দাওয়াত আরো বিস্তারের কোনো সম্ভাবনা না থাকলে তিনি সংঘাত এড়াতে বা স্বীয় অনুসারীদের জীবন রক্ষার্থে এবং সত্য প্রকাশ ও প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে দেশ ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যেতে পারেন। অন্যদিকে বিচারবুদ্ধি এ-ও বলে যে , উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তিনি স্বীয় অনুসারীদের ওপর স্বীয় শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন এবং এটা তাঁর স্বাভাবিক অধিকার। আর এ কাজে কেউ বাধা দিলে ও সে ক্ষেত্রে সঙ্গতি থাকলে অথবা পরিস্থিতি বাধ্য করলে তিনি স্বীয় অনুসারীদেরকে সাথে নিয়ে সত্যকে রক্ষার জন্য যুদ্ধও করবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তিনি পার্থিব স্বার্থে সত্য প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে কমবেশী করবেন না। এ পথে তাঁকে জীবন দিতে হলেও এ ব্যাপারে তিনি আপোস করবেন না।

কেবল প্রয়োজনেই নবী প্রেরণ

নবুওয়াত সম্বন্ধে সবশেষে যে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলা অপরিহার্য তা হচ্ছে , মহান প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা কোনো বাহুল্য কাজ করতে পারেন না। অতএব , বিচারবুদ্ধির রায় হচ্ছে এই যে , অপরিহার্য প্রয়োজনীয় না হলে তিনি অযথাই কোনো নবী প্রেরণ করেন না। এখানে প্রয়োজন মানে মানুষের প্রয়োজন। অর্থাৎ মানব জাতির নিকট তাঁর প্রেরিত পথনির্দেশ পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ রূপে এবং অবিকৃতভাবে বিদ্যমান থাকলে তিনি এরপরও নতুন করে নবী ও পথনির্দেশ পাঠাবেন - এটা বিচারবুদ্ধির নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এরূপ পরিস্থিতিতে কেউ নবুওয়াত লাভের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দাবী করলে তার সে দাবী বিবেচনাযোগ্য নয়।


22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35