কোরআনের মু‘জিযাহ্

কোরআনের মু‘জিযাহ্ 5%

কোরআনের মু‘জিযাহ্ লেখক:
: নূর হোসেন মজিদী
প্রকাশক: -
বিভাগ: কোরআন বিষয়ক জ্ঞান

কোরআনের মু‘জিযাহ্
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 60 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 48371 / ডাউনলোড: 4672
সাইজ সাইজ সাইজ
কোরআনের মু‘জিযাহ্

কোরআনের মু‘জিযাহ্

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

কোরআনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ (!)

হুসনুল্ ঈজাায্ (حسن الايجاز ) নামক পুস্তিকার লেখক বলেন : কোরআনের প্রদত্ত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ এবং কোরআনের অনুরূপ বা বিকল্প গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। [জনৈক খৃস্টান লেখক কর্তৃক লিখিত এ পুস্তিকাটি ১৯১২ খৃস্টাব্দে মিসরের বুলাক্ (নীল নদের তীরবর্তী কায়রোর বন্দর) থেকে প্রকাশিত হয়।]

পুস্তিকার লেখক তাঁর দাবীর সপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ স্বয়ং কোরআন মজীদেরই কিছু বাক্য গ্রহণ করে তার কিছু শব্দ রদবদল করে উপস্থাপন করেছেন। আসলে এভাবে তিনি তাঁর জ্ঞানের দৌড়কেই তুলে ধরেছেন এবং আরবী ভাষার বালাগ্বাত্ ও ফাছ্বাহাত্ সম্পর্কে তাঁর কতোখানি ধারণা আছে তা-ও প্রকাশ করে দিয়েছেন।

লেখক কোরআন মজীদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ ও এ মহাগ্রন্থের বিকল্প উপস্থাপনের নামে যা পেশ করেছেন আমরা তা এখানে উদ্ধৃত করবো , অতঃপর তাঁর লেখার দুর্বলতা সমূহ অভিজ্ঞ পাঠক-পাঠিকাদের সামনে তুলে ধরবো।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে , মরহূম্ আল্লামাহ্ খূয়ী লিখিত নুফ্হাতুল্ ঈজাায্ (نفحات الايجاز ) নামক পুস্তকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে এখানে আমরা সংক্ষিপ্ত আলোচনাকেই যথেষ্ট মনে করছি। [হুসনুল্ ঈজাায্ (حسن الايجاز ) পুস্তিকার জবাবে আল্লামাহ্ খূয়ী (রহ্ঃ)-এর লেখা এ পুস্তকখানি ইরাকের নাজাফ শহর থেকে প্রকাশিত হয়েছে।]

সূরাহ্ ফাতেহার বিকল্প !

কল্পনাবিলাসী উক্ত লেখক সূরাহ্ ফাতেহার বিকল্প রচনার নামে লিখেছেন :

الحمد للرحمان. رب الاکوان. الملک الديان. لک العبادة و بک المستعان. اهدنا صراط الايمان

সমস্ত প্রশংসা পরম দয়াবানের যিনি সৃষ্টিসমূহের প্রভু ও প্রতিদান প্রদানকারী বাদশাহ। উপাসনা ও দাসত্ব তোমার জন্য এবং সাহায্য প্রার্থনা তোমার কাছে। আমাদেরকে ঈমানের পথে পরিচালিত করো।

লেখক স্বীয় কল্পনাবিলাসিতার কারণে ধারণা করেছেন যে , তাঁর উপস্থাপিত এ বাক্যগুলোতে সূরাহ্ ফাতেহার সমস্ত দিক ও সমগ্র তাৎপর্য শামিল রয়েছে , অথচ সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহ্ থেকে তা সংক্ষিপ্ততর।

যে লেখক দুর্বল ও নিম্ন মানের লেখা এবং তাৎপর্যপূর্ণ ও ভারী উঁচু মানের লেখার মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এমনই সীমাবদ্ধ ও সঙ্কীর্ণ বিচারশক্তির অধিকারী তাঁর সম্পর্কে কী বলা যেতে পারে! তাঁর জন্য তো এটাই উত্তম ছিলো যে , প্রকাশের পূর্বে তিনি তাঁর লেখাটি আরবী ভাষার সাহিত্যরীতি ও বালাগ্বাত্-ফাছ্বাহাতের সাথে পরিচিত খৃস্টান পণ্ডিতদেরকে দেখাতেন এবং নিজেকে এভাবে খেলো প্রমাণ না করতেন।

তিনি এ ন্যূনতম বিষয়টিও লক্ষ্য করেন নি যে , কোনো কবি বা কোনো লেখক যদি অন্য কারো কোনো লেখার বিকল্প উপস্থাপন করতে চান , সে ক্ষেত্রে তাঁকে এমন লেখা উপস্থাপন করতে হয় যা শব্দচয়ন , বাক্যগঠন ও সাহিত্যের আঙ্গিকতার দিক থেকে হবে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও নিজস্ব ; দু টি লেখার মধ্যে কেবল একটি দিক থেকে মিল ও অভিন্নতা থাকবে। তা হচ্ছে , উভয় লেখার লক্ষ্য বা মূল আবেদন তথা বিষয়বস্তু হবে অভিন্ন।

কোনো লেখককে চ্যালেঞ্জ করা বা তাঁর লেখার বিকল্প উপস্থাপনের মানে এ নয় যে , বিকল্প উপস্থাপনকারী ব্যক্তি প্রতিপক্ষের লেখার বাক্যগঠন ও সাহিত্যরীতির অনুসরণ করবেন এবং প্রতিপক্ষের লেখার কিছু শব্দ পরিবর্তন করে একটি নতুন ( ?!) লেখা তৈরী করবেন , আর এ কাজকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ বা বিকল্প উপস্থাপন হিসেবে নামকরণ করবেন।

এটাই যদি হয় চ্যালেঞ্জ বা বিকল্প উপস্থাপন তাহলে যে কোনো কালামকেই চ্যালেঞ্জ করা ও তার বিকল্প উপস্থাপন করা সম্ভব। আর তাহলে হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর সমসাময়িক যে কোনো আরবের পক্ষেই কোরআন মজীদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ ও বিকল্প উপস্থাপন করা সম্ভব ছিলো। কিন্তু যেহেতু তারা কোনো কালামের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ ও বিকল্প উপস্থাপনের তাৎপর্য ভালোভাবেই অবগত ছিলো এবং কোরআন মজীদের বালাগ্বাত্ ও ফাছ্বাহাতের রহস্যাবলী প্রত্যক্ষ করছিলো , এ কারণেই তারা কোরআন মজীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অগ্রসর হয় নি এবং এর সামনে তাদের অক্ষমতার কথা স্বীকার করে একদল কোরআন মজীদের ওপর ঈমান আনয়ন করে ও অপর একদল একে জাদু বলে আখ্যায়িত করে এবং বলে:

) ان هذا الا سحر يوثر( .

(তারা বলে :) এ তো জাদু ছাড়া কিছু নয় - যা তাকে শিক্ষা দেয়া হয়। (সূরাহ্ আল্-মুদ্দাছছির্ : ২৪)

এছাড়া , আলোচ্য লেখকের উদ্ধৃত বাক্যগুলোতে যেখানে নকল ও কৃত্রিমতা সুস্পষ্টরূপে ধরা পড়ছে , সেখানে কী করে একে সূরাহ্ ফাতেহার সাথে তুলনাযোগ্য বলে মনে করা যেতে পারে ? পুস্তিকাটির লেখক যে আরবী ভাষার বালাগ্বাত্ ও ফাছ্বাহাত্ সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ তা কি তিনি সূরাহ্ ফাতেহার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ ও বিকল্প রচনার দাবী করে ও উক্ত বাক্যসমূহ সর্বসমক্ষে প্রদর্শন করে অধিকতর সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন নি ?

এবারে লেখকের লেখার দুর্বল দিকসমূহের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক :

(১) লেখকের রচিত বাক্যالحمد للرحمان (সমস্ত প্রশংসা পরম দয়াবানের) এবং সূরাহ্ ফাতেহার বাক্যالحمد لله (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর) - এ দু টি বাক্যকে অর্থ ও তাৎপর্যের দিক থেকে কী করে অভিন্ন পর্যায়ের বলা যেতে পারে ? কারণ , আল্লাহ্ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার পরম প্রমুক্ত সত্তার সত্তাগত নাম যাতে তাঁর সমস্ত রকমের গুণ-বৈশিষ্ট্য ও পূর্ণতা শামিল রয়েছে ; রাহমান্ (পরম দয়াবান) তাঁর এ সব গুণ-বৈশিষ্ট্যের অন্যতম রহমত (দয়া)-এর পরিচায়ক গুণবাচক নাম মাত্র। অতএব ,الحمد لله (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর) বাক্যটিতে প্রশংসার লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহ্ তা আলার সমস্ত রকমের পূর্ণতাবাচক গুণ-বৈশিষ্ট্য। কিন্তুالحمد للرحمان (সমস্ত প্রশংসা পরম দয়াবানের) বাক্যটিতে প্রশংসার লক্ষ্য হচ্ছে শুধু তাঁর রহমত বা দয়া। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা আলার অন্যান্য গুণ-বৈশিষ্ট্য প্রশংসার মধ্যে শামিল নেই।

(২) সূরাহ্ ফাতেহারرب العالمين. الرحمان الرحيم (যিনি জগতসমূহের প্রভু - যে প্রভু পরম দয়াবান ও মেহেরবান) কথাটির মোকাবিলায়رب الاکوان (যিনি সৃষ্টি সমূহের প্রভু) বাক্যটি খুবই দুর্বল , ত্রুটিপূর্ণ ও অসংহত। সূরাহ্ ফাতেহার বাক্যটির তাৎপর্য ও লক্ষ্য কোনোটিই এতে প্রতিফলিত হয় নি। কারণ , সূরাহ্ ফাতেহার উক্ত বাক্য থেকে প্রমাণিত হয় যে , জগত মাত্র একটি নয় , বরং বহু সংখ্যক জগত রয়েছে এবং আল্লাহ্ তা আলা এ সমস্ত জগতের প্রভু ও পরিচালক। তেমনি তাঁর রহমত (দয়া) সব সময়ের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে এই সমস্ত জগতকে পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে।

কী করেرب الاکوان (যিনি সৃষ্টিসমূহের প্রভু) বাক্যটিকে সূরাহ্ ফাতেহার উক্ত বাক্যের সাথে তুলনা করা যেতে পারে ? কারণ ,کون শব্দের (যার বহুবচন হচ্ছেاکوان ) মানে হচ্ছেحدوث (ঘটনা) ওوقوع (সংঘটিত হওয়া)। (এছাড়াওکون শব্দটির আরো অর্থ আছে , যেমন : প্রত্যাবর্তন , স্থলাভিষিক্ত হওয়া , স্থিতি ইত্যাদি।)

তাছাড়াاکوان হচ্ছেکون -এর বহু বচন যা একটি ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য (مصدر ) যার প্রকৃত অর্থ হওয়া বা থাকা (স্থিতিবাচক ক্রিয়ানাম - ইংরেজীতে যাকে Be Verb বলা হয়।) একেرب শব্দের সাথে যুক্তকরণ আরবী সাহিত্যের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্যرب -এর পরিবর্তে যদিخالق শব্দটি ব্যবহার করা হতো অর্থাৎخالق الاکوان বলা হতো , তাহলে আরবী সাহিত্যরীতি অনুযায়ী তা সিদ্ধ হতো , কিন্তু লেখক তা করেন নি ; হয়তোবা লেখকের এটা জানাও ছিলো না। অবশ্য সে ক্ষেত্রেও স্বয়ংاکوان শব্দের দুর্বলতা থেকেই যেতো। কারণ ,اکوان শব্দ দ্বারা জগতের বহুত্বও যেমন বুঝানো যায় না , তেমনি আল্লাহ্ তা আলার রহমত যে সমস্ত জগতে পরিব্যাপ্ত তা-ও বুঝানো সম্ভব নয়।

(৩) সূরাহ্ ফাতেহাহরمالک يوم الدين (প্রতিফল দিবসের অধিকর্তা) কথাটিকেالملک الديان (প্রতিদান প্রদানকারী বাদশাহ)-তে পরিবর্তিত করায় তাতে সূরাহ্ ফাতেহার কথাটির তাৎপর্য ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হওয়া সম্ভব নয়। কারণ , সূরাহ্ ফাতেহার কথাটির মানে হচ্ছে , আল্লাহ্ তা আলা প্রতিফল দিবসের একমাত্র অধিকর্তা ও বাদশাহ্। কিন্তু লেখকের বাক্যটিতে আল্লাহ্ হচ্ছেন প্রতিদান বা প্রতিফল প্রদানকারী বাদশাহ্। এতে তাঁকে একমাত্র প্রতিফলদাতা বলা হয় নি।

তাছাড়া সূরাহ্ ফাতেহার আয়াতে যেখানে প্রতিফল দানের জন্য অপর একটি জগতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে লেখকের কথাটিতে তার প্রতি বিন্দুমাত্র ইঙ্গিতও নেই। ফলে পুনরুত্থান ও প্রতিফল দিবসের একমাত্র অধিকর্তা , বাদশাহ্ ও বিচারক যে আল্লাহ্ তা আলা এবং ঐ দিন যে অন্য কারো বিন্দুমাত্রও ক্ষমতা বা এখতিয়ার থাকবে না তা-ও তাঁর কথা থেকে বোঝার উপায় নেই।

সূরাহ্ ফাতেহার আয়াতে এ তাৎপর্য নিহিত রয়েছে যে , প্রতিফল দিবসের একমাত্র ও একক অধিকর্তা , হুকুমদাতা , বিচারক ও পরিচালক আল্লাহ্ তা আলা ; তিনি একাই প্রতিটি ব্যক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণকারী থাকবেন , আর তাঁর বিচারের পরিণতিতে কিছু লোক বেহেশতে যাবে ও কিছু লোক দোযখে যাবে। কিন্তু লেখকের বাক্যে প্রতিফল দিবস উল্লেখ না থাকায় এবং বাক্যগঠনের পার্থক্যের কারণে , আল্লাহ্ তা আলা একমাত্র প্রতিফলদাতা বাদশাহ্ রূপে প্রতিভাত না হওয়ায় উল্লিখিত তাৎপর্য সমূহও তাতে অন্তর্ভুক্ত হয় নি।

বস্তুতঃالملک الديان কথাটিতেمالک يوم الدين আয়াতের এ ব্যাপক তাৎপর্যের একটিও অন্তর্ভুক্ত হয় নি। উল্লিখিত কথাটিতে একমাত্র যে তাৎপর্যটি প্রতিফলিত হয়েছে তা এই যে , আল্লাহ্ তা আলা প্রতিফলদানকারী মালিক ও বাদশাহ্ - যিনি মানুষের কাজের প্রতিফল প্রদান করে থাকেন। আর এ তাৎপর্য ও সূরাহ্ ফাতেহার উক্ত আয়াতের তাৎপর্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান বিদ্যমান।

এছাড়া সূরাহ্ ফাতেহার আয়াতটিতেمالک يوم الدين কথাটি সম্বন্ধবাচক। যেমন , যদি বলা হয় : অমুক ব্যক্তি এই বাড়ীর মালিক , তাহলে এর মধ্যে এ তাৎপর্যও নিহিত রয়েছে যে , অন্য কেউ এ বাড়ীর মালিকানায় অংশীদার নয়। কিন্তু হুসনুল্ ঈজায্ (حسن الايجاز ) পুস্তিকার লেখকেরالملک الديان কথাটি গুণবাচক। যেমন , যদি বলা হয় : অমুক ব্যক্তি বাড়ীওয়ালা , তাহলে এর মানে এ নয় যে , সে ছাড়া আর কোনো বাড়ীওয়ালা নেই। তেমনি আল্লাহ্ তা আলাকেمالک يوم الدين (প্রতিফল দিবসের অধিকর্তা) বলার মানে হচ্ছে প্রতিফল দিবসের ওপর আর কোনো অধিকর্তা ও বাদশাহ্ নেই। কিন্তু আল্লাহ্কেالملک الديان (প্রতিদান প্রদানকারী বাদশাহ) বলার মানে হচ্ছে , আল্লাহ্ প্রতিফলদাতা মালিক ও বাদশাহ্ , তবে প্রতিদানকারী মালিক ও বাদশাহ্ আরো থাকতে পারেন।

(৪) সূরাহ্ ফাতেহার আয়াতاياک نعبد و اياک نستعين (আমরা কেবল তোমারই উপাসনা ও দাসত্ব-আনুগত্য করি এবং আমরা কেবল তোমার কাছেই সাহায্য চাই) থেকে লেখক শুধু বুঝেছেন যে , উপাসনা ও দাসত্ব শুধু আল্লাহরই হওয়া উচিত এবং সাহায্যপ্রার্থনাও কেবল আল্লাহর কাছেই হওয়া উচিত। এ কারণেই তিনি উক্ত আয়াতকে সামান্য রদবদল করে লিখেছেন :لک العبادة و بک المستعان (উপাসনা ও দাসত্ব তোমার জন্য এবং সাহায্য প্রার্থনা তোমার কাছে)।

কিন্তু এ সত্যের পাশাপাশি উক্ত আয়াতে আরো যে সত্য নিহিত রয়েছে লেখক তা বুঝতে পারেন নি। তা হচ্ছে , এ আয়াত আল্লাহর বান্দাহদেরকে এ শিক্ষা প্রদান করছে যে , তারা যেন তাদের ইবাদত ও আনুগত্যের মধ্য দিয়ে তাওহীদকে সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত করে এবং ঘোষণা করে যে , তারা শুধু আল্লাহরই ইবাদত ও দাসত্ব-আনুগত্য করে থাকে এবং ইবাদত-উপাসনা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে থাকে।

এ আয়াতের দাবী হচ্ছে এই যে , মু মিন বান্দাহ্ এ সত্যটি স্বীকার করুক যে , সে এবং অন্য সমস্ত মু মিন বান্দাহ্ আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো ইবাদত-উপাসনা ও আনুগত্য করে না এবং আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে না , বরং শুধু আল্লাহরই ইবাদত ও আনুগত্য করে এবং শুধু আল্লাহ্ তা আলার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে। কিন্তু উক্ত লেখকের বক্তব্যلک العبادة و بک المستعان (উপাসনা ও দাসত্ব তোমার জন্য এবং সাহায্য প্রার্থনা তোমার কাছে) বাক্যে কি এ ব্যাপক তাৎপর্য রয়েছে ?

অধিকন্তু লেখকের বাক্যটিতে কেবল এ ঘোষণা আছে যে , ইবাদত ও দাসত্ব-আনুগত্য এবং সাহায্য প্রার্থনা পাওয়ার একমাত্র হক্ব্দার আল্লাহ তা আলা , কিন্তু বান্দাহ্ নিজে একমাত্র তাঁর ইবাদত ও দাসত্ব-আনুগত্য করে কিনা এবং একমাত্র তাঁরই কাছে সাহায্য চায় কিনা সে সম্পর্কে কোনো সাক্ষ্য নেই যা সূরাহ্ ফাতেহার আয়াতে রয়েছে। তাছাড়া কোরআন মজীদের আয়াতটিতে বান্দাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে ভবিষ্যতে একমাত্র তাঁর ইবাদত ও দাসত্ব-আনুগত্য করার এবং একমাত্র তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়ার যে অঙ্গীকার বা আশাবাদ নিহিত আছে উক্ত লেখকের বাক্যটিতে তা নেই।

প্রসঙ্গতঃ এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে যে , অনেকে এরূপ ভুল ধারণা পোষণ করেন যে , আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য করা এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো কাছে কোনো ধরনের সাহায্য চাওয়া বুঝি আদৌ বৈধ নয়। বরং এ আয়াতে ইবাদত বলতে যা বুঝানো হয়েছে তার মধ্যে উপাসনা কেবল আল্লাহরই জন্য - এ ব্যাপারে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। কিন্তু দাসত্ব আনুগত্য আল্লাহ্ তা আলার হুকুম-আহ্কামের আনুগত্যের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে অন্যের জন্যও অবৈধ নয়। এ কারণেই কোরআন মজীদে দাস-দাসীদের সাথে মনিবের সম্পর্ক এবং তাদের অধিকার ও কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে , অন্যদিকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের (ছ্বাঃ) আনুগত্যের অধীনে উলীল্ আমর্ (কর্মদায়িত্বশীল)-এর আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতএব , সূরাহ্ ফাতেহার এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে , মনিব ও কর্মদায়িত্বশীলদের আনুগত্যের ফলে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের (ছ্বাঃ) আনুগত্যের লঙ্ঘন হলে মনিব ও কর্মদায়িত্বশীলদের আনুগত্য করা যাবে না , তাতে যে কোনো পরিণতিই আসুক না কেন।

অন্যদিকে একমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার অর্থ এ নয় যে , স্বাভাবিকভাবে মানুষ একে অন্যের কাছে বা পরস্পর যে সাহায্য চায় তা বৈধ নয়। কারণ , কোরআন মজীদেও নেক আমল ও তাক্ব্ওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (সূরাহ্ আল্-মাাএদাহ্ : ২) কিন্তু বান্দাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার ক্ষেত্রে কখনোই এমন মানসিকতা পোষণ করা বৈধ নয় যে , যে ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া হচ্ছে সে নিরঙ্কুশভাবে ও অনন্যমুখাপেক্ষী হিসেবে সাহায্য করতে সক্ষম এবং এরূপ মনে করাও বৈধ নয় যে , ঐ ব্যক্তি সাহায্য না করলে তার সমস্যা সমাধানের বা বিপদমুক্তির আর কোনো পথই ছিলো না বা থাকবে না। বরং স্মরণ রাখতে হবে যে , বান্দাহর জন্য বান্দাহর সাহায্যও আল্লাহ্ তা আলার সৃষ্ট কার্যকারণ বিধি ও সৃষ্টির প্রতি তাঁর অনুগ্রহের অংশবিশেষ এবং আল্লাহ্ না চাইলে ঐ ব্যক্তি তাকে সাহায্য করতে পারতো না বা করতো না অথবা সে সাহায্য না করলেও আল্লাহ্ তা আলা চাইলে তার সাহায্য ও বিপদমুক্তির জন্য অন্য কোনো পথ বের করে দিতেন।

এ হচ্ছে এ আয়াত থেকে মুসলমানদের জন্য সাধারণ কর্মনির্দেশনা। মুসলমানদেরকে আমলের ক্ষেত্রে এ আয়াতের এ কর্মনির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার জন্য চেষ্টা করা উচিত। অর্থাৎ এটা হবে সর্বোচ্চ লক্ষ্য। কিন্তু আল্লাহর খাছ্ব্ বান্দাহ্গণ ছাড়া সাধারণতঃ কেউ এ কর্মনির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে না , বরং কখনো কখনো এ থেকে বিচ্যুত হয় , বিশেষ করে প্রবৃত্তির আনুগত্য করে ছোট-বড় গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে , তা যতোই না পরে তা থেকে তাওবাহ্ ও ইস্তিগ্বফার্ করুক। তাছাড়া অনেক সময় আমরা অন্যের সাহায্য চাইতে গিয়ে মনে করি যে , ঐ ব্যক্তি সাহায্য না করলে আমাদের এ সমস্যা সমাধানের কোনোই পথ নেই। এরূপ মনে করা প্রচ্ছন্ন শিরক্।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে , এ ধরনের বিচ্যুতির অবস্থায় আল্লাহ্ তা আলার সামনে দাঁড়িয়ে এ সাক্ষ্য দেয়া উচিত কিনা যে , আমরা কেবল তোমারই দাসত্ব ও আনুগত্য করি এবং আমরা কেবল তোমার কাছেই সাহায্য চাই। ? কারণ , এরূপ সাক্ষ্য সুস্পষ্টতঃই মিথ্যা। আর আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সম্বন্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দান অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপার। অথচ নামাযে সূরাহ্ ফাতেহাহ্ পাঠ করা অপরিহার্য ; সূরাহ্ ফাতেহাহ্ পাঠ ছাড়া নামায ছ্বহীহ্ হয় না। এমতাবস্থায় কী করণীয় ? কোনো কোনো আারেফ মুফাসসিরের অভিমত হচ্ছে এই যে , পুরো সূরাহ্ ফাতেহাহ্ , বা অন্ততঃ উক্ত আয়াতটিকে নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহ্ তা আলার সামনে সাক্ষ্য হিসেবে উচ্চারণ করা ঠিক হবে না , বরং কোরআন মজীদের আয়াত পাঠ করার নিয়তে পড়তে হবে , যতোদিন না নিজেকে উক্ত আয়াতের দিকনির্দেশনার বিচ্যুতি থেকে মুক্ত করা যায়। আল্লাহর খাছ্ব্ বান্দাহ্গণ - যাদের আমল উক্ত আয়াতের দিকনির্দেশনার বিচ্যুতি থেকে মুক্ত তাঁরা পুরো সূরাহ্ ফাতেহাকে আল্লাহর সামনে নিজের বক্তব্য হিসেবে পাঠ করে থাকেন। আর নিজেকে এ স্তরে উপনীত করাই হওয়া উচিত বান্দাহর সর্বোচ্চ লক্ষ্য।

আলোচ্য আয়াত কেবল বান্দাহর নিজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সাক্ষ্যই নির্দেশ করে না , বরং ভবিষ্যত সম্পর্কে অঙ্গীকারও নির্দেশ করে। কারণ , এখানেمضارع ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়েছে যা বর্তমান ও ভবিষ্যত উভয়কেই বুঝায়। আর ব্যক্তি যখন নিজে ভবিষ্যতে কোনো কাজ করবে বলে ঘোষণা করে তখন তা কেবল সম্ভাবনাকে বুঝায় না , বরং অনেক ক্ষেত্রে অঙ্গীকারকেও বুঝায় এবং এ আয়াতে অঙ্গীকার অর্থই প্রযোজ্য ; তবে ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে এটিকে আশাবাদ অর্থেও গণ্য করা চলে।

(৫) সূরাহ্ ফাতেহারاهدنا الصراط المستقيم (আমাদেরকে সহজ-সরল , সঠিক , সুদৃঢ় ও মধ্যম পথে পরিচালিত করো) আয়াতের লক্ষ্য হচ্ছে এই যে , বান্দাহ্ তার ইবাদত-উপাসনার মাধ্যমে স্বীয় উপাস্যের নিকট এ মর্মে প্রার্থনা জানাবে যে , তিনি যেন স্বীয় বান্দাহকে সংক্ষিপ্ততম ও সহজতম পথে লক্ষ্যে পৌঁছে দেন। তেমনি এতে এ-ও শামিল রয়েছে যে , তিনি যেন তাকে সৎকর্মসমূহ , সদ্গুণাবলী ও সঠিক আক্বেএদের দিকে পথপ্রদর্শন করেন। এ আয়াত শুধু ঈমানের পথে পরিচালিত করার আবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। কিন্তুاهدنا صراط الايمان (আমাদেরকে ঈমানের পথে পরিচালিত করো) বাক্যে এ তাৎপর্য অন্তর্ভুক্ত নেই।

এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষ্য করা দরকার। তা হচ্ছে , সূরাহ্ ফাতেহাহ্ পড়লে এটা সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয় যে , এ সূরাহটি আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণকারী ব্যক্তির পক্ষ থেকে আল্লাহ্ তা আলার কাছে সপ্রশংস দো আ স্বরূপ। অতএব , ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষ থেকে ঈমানের পথে পরিচালিত করার জন্য আল্লাহর কাছে দো আ করা খুব বেশী খাপ খায় না।

অবশ্য ঈমানের পথ বলতে যদি ঈমানের সাথে সঙ্গতিশীল পথ বুঝানো হয়ে থাকে তাহলে তাতে কোনো অসঙ্গতি নেই - এটা স্বীকার করতে হবে। তবে ঈমানের পথ কথাটির এ অর্থ কথাটির পরোক্ষ ও আরোপিত অর্থ , স্বতঃপ্রকাশিত অর্থ নয়। অর্থাৎ কথাটি শোনার সাথে সাথেই শ্রোতার মনে বিষয়টি এভাবে রেখাপাত করবে না , বরং প্রথমেই মনে হবে যে , ঈমানে উপনীত হবার পথের জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছে ; তদনুযায়ী চলার পথ প্রার্থনার বিষয়টি প্রথমেই শ্রোতার মনে রেখাপাত করবে না। এর পরিবর্তে ঈমানদার ব্যক্তি তাকে ছ্বিরাতুল্ মুস্তাক্বীম্ বা সহজ-সরল , সঠিক , সুদৃঢ় ও মধ্যম পথে পরিচালিত করার জন্য আল্লাহর কাছে দো আ করবে এটাই অধিকতর সঙ্গত। অন্যদিকে ছ্বিরাতুল্ মুস্তাক্বীম্ -এর তাৎপর্যে পার্থিব মোবাহ্ কাজের বেলায় অর্থাৎ যে সব ক্ষেত্রে পাপ-পুণ্য কোনোটিরই সংশ্লিষ্টতা নেই এমন কাজেও সহজতম ও কম আয়াসসাধ্য কষ্টহীন পথ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে , যা ঈমানের পথ -এর মধ্যে শামিল নেই।

দ্বিতীয়তঃ সূরাহ্ ফাতেহার আয়াতে পথ কে বিশেষ্য-বিশেষণ রূপে (الصراط المستقيم ) উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাকেال দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয়েছে যা দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে , বান্দাহ্ বহুবিধ পথের মধ্য থেকে কেবল সেই একমাত্র পথটিকে চাচ্ছে যা সহজ-সরল , সঠিক , সুদৃঢ় ও মধ্যম পথ । আর বলা বাহুল্য যে , এরূপ পথ কেবল একটিই হতে পারে। অন্যদিকে তথাকথিত বিকল্প বাক্যটিতে পথ কে সম্বন্ধ পদ রূপে (صراط الايمان ) উল্লেখ করা হয়েছে যা থেকে এ অর্থ গ্রহণ করার উপায় নেই যে , ঈমানের পথ একাধিক হতে পারে না। বরং এর অর্থ হচ্ছে এই যে , ঈমানের পথ সমূহের মধ্য থেকে যে কোনো একটি পথ দেখাবার জন্য আবেদন জানানো হচ্ছে।

এছাড়া উক্ত বাক্যের তাৎপর্য এদিক থেকেও অসম্পূর্ণ যে , এতে শুধু ঈমানের পথ প্রদর্শন বা তাতে পরিচালনার কথাই বলা হয়েছে , কিন্তু ঈমানের পথ যে , সহজ-সরল , সঠিক , সুদৃঢ় ও মধ্যম পথ - যে পথের পথিক কখনো পথভ্রষ্ট হবে না - সেদিকে কোনোরূপ ইঙ্গিত করা হয় নি।

অন্যদিকে সূরাহ্ ফাতেহারصراط الذين انعمت عليهم غير المغضوب عليهم و لا الضالين (তাদের পথ যাদেরকে তুমি নে আমত দিয়েছো - যারা গযবের শিকার নন বা পথভ্রষ্টও নন।) আয়াত ব্যক্ত করে যে , এমন এক সহজ-সরল , সঠিক , সুদৃঢ় ও মধ্যম পথ রয়েছে আল্লাহ্ তা আলার ক্ষমা ও অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ যে পথ অবলম্বন করেছেন। এ পথ নবী-রাসূলগণ ( আঃ) এবং সত্যের সাক্ষ্যের মূর্ত প্রতীক ব্যক্তিদের পথ।

এছাড়া এ আয়াত এটাও প্রমাণ করে যে , সহজ-সরল , সঠিক , সুদৃঢ় ও মধ্যম পথের পাশাপাশি বিভিন্ন বক্র পথেরও অস্তিত্ব রয়েছে ; আল্লাহ্ তা আলার গযব ও অসন্তুষ্টিতে নিপতিত লোকেরা সে ধরনের পথসমূহ অবলম্বন করেছে। সে ধরনের পথ হচ্ছে তাদের পথ যারা জিদ , গোয়ার্তুমি ও গোঁড়ামি বশতঃ সত্যের বিরোধিতা করে এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে , যারা অজ্ঞতাবশতঃ হেদায়াতের পথ থেকে বহু দূরে সরে গেছে এবং পথভ্রষ্টতার সীমাহীন প্রান্তরে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। এ লোকেরা সত্য ও হেদায়াতের পথের সন্ধান করে নি , বরং তাদের পূর্বপুরুষদের পথকেই বেছে নিয়েছে এবং তাদের অন্ধ অনুসরণ করছে। তারা এমন পথ অবলম্বন করেছে যে পথ আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে তাদের জন্য নির্ধারিত হয় নি।

যে কেউ এ আয়াতটি পড়বে ও আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করবে , সে-ই এ বিষয়টি বুঝতে পারবে এবং তার চিন্তায় এ সমুন্নত বিষয়টি ও চারিত্রিক রহস্যটি ধরা পড়বে যে , মানুষের উচিত আল্লাহর অলীগণের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং তাঁদের চরিত্র , আচার-আচরণ ও আক্বীদাহর অনুসরণ করা , অন্যদিকে যারা খোদাদ্রোহিতার পথ অবলম্বন করেছে এবং স্বীয় কৃতকর্মের কারণে খোদায়ী আযাবের উপযুক্ত হয়েছে তাদের পথ থেকে দূরে থাকা।

সূরাহ্ ফাতেহার উক্ত আয়াতে নিহিত এ চারিত্রিক ও মানবিক সঞ্জীবনী শক্তির অধিকারী সত্যটি থেকে কি দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখা সম্ভব , নাকি একে গুরুত্বহীন মনে করা ও উপেক্ষা করা সম্ভব ? অথচ আলোচ্য কল্পনাবিলাসী লেখক ধারণা করেছেন যে , বিষয়টি নেহায়েতই গুরুত্বহীন , অতএব , উপেক্ষাযোগ্য।

অপচয়-অপব্যয় নিষিদ্ধ

কোরআন মজীদের উপরোক্ত আয়াতে এবং এ ধরনের আরো যে সব আয়াতে মানুষকে দানে উৎসাহিত ও কার্পণ্যে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে , তার পাশাপাশি এমন অনেক আয়াতের উল্লেখ করা যেতে পারে যাতে অপচয় ও অপব্যয়ে নিষেধ করা হয়েছে এবং এর ক্ষতিকারকতা সম্বন্ধে মানুষকে জানানো হয়েছে। যেমন , এরশাদ হয়েছে :

) ولا تسرفوا انه لا يحب المسرفي( .

আর তোমরা অপচয় করো না ; নিঃসন্দেহে তিনি (আল্লাহ্) অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। (সূরাহ্ আল্-আন্ আাম্ : 141)

) ان المبذرين کانوا اخوان الشياطين( .

নিঃসন্দেহে অপচয়কারীরা শয়তানদের ভাই। (সূরাহ্ বানী ইসরাাঈল্ : 27)

ধৈর্যধারণে উৎসাহ প্রদান

কোরআন মজীদ বিপদাপদের মুখে ধৈর্য-সহ্য ও দৃঢ়তার নির্দেশ প্রদান করেছে , ধৈর্যশীল ও অটল লোকদের প্রশংসা করেছে এবং তাদের জন্য বিরাট পুরষ্কারের সুসংবাদ দিয়েছে। যেমন , এরশাদ হয়েছে :

) انما يوفی الصابرون اجراهم بغير حساب( .

অবশ্যই ধৈর্যশীল লোকেরা তাদের প্রাপ্য সীমাহীন সুপ্রতিদান লাভ করবে। (সূরাহ্ আয্-যুমার : 10)

) و الله يحب الصابرين( .

আর আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন। (সূরাহ্ আালে ইমরাান্ : 146)

কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে যে , কোরআন মজীদ যালেমের মোকাবিলায় ময্লূমের হাত-পা বেঁধে রাখে নি এবং তাকে তার অধিকার আদায়েও নিষেধ করে নি। বরং যুলুমের মূলোৎপাটন ও ধরণীর বুকে সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যালেম-অত্যাচারীর মোকাবিলায় রুখে দাঁড়ানো ও ন্যায়সঙ্গতভাবে যালেমের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কোরআন মজীদ ময্লূমকে অনুমতি প্রদান করেছে। এ প্রসঙ্গে কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে :

) فمن اعتدی عليکم فاعتدوا عليه بمثل ما اعتدی عليکم.(

অতএব , যে তোমাদের বিরুদ্ধে চড়াও হয়েছে তোমরাও তার বিরুদ্ধে চড়াও হও ঠিক যেভাবে সে তোমাদের বিরুদ্ধে চড়াও হয়েছে। (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : 194)

নরহত্যার শাস্তি

কেউ যদি স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে কাউকে হত্যা করে সে ক্ষেত্রে কোরআন মজীদের বিধানে ঘাতককে হত্যা করার জন্য নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনদেরকে অধিকার দেয়া হয়েছে। কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে :

) و من قتل مظلوماً فقد جعلنا لئليه سلطاناً فلا يسرف فی القتل( .

যে কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছে আমি তার অভিভাবককে পরিপূর্ণ অধিকার প্রদান করেছি (প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য) , কিন্তু সে-ও যেন (ঘাতককে) হত্যার ব্যাপারে অপচয় না করে (বাড়াবাড়িমূলক কাজ না করে)। (সূরাহ্ বানী ইসরাাঈল্ : 33)

ইহ-পারলৌকিক বিধিবিধানের সমন্বয়

কোরআন মজীদ যেহেতু ভারসাম্য ও মধ্যম পন্থা ভিত্তিক আইন-কানূন্ ও শর ঈ বিধান প্রবর্তন করেছে , সেহেতু ইহজাগতিক সমাজব্যবস্থা ও সামাজিক বিধিবিধানে পরজাগতিক বিধিবিধানের সাথে সঙ্গতি বিধান করেছে এবং এ উভয় জগতের বিধিবিধানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছে।

কোরআন মজীদ একদিকে যেমন মানুষের ইহজাগতিক বিষয়াদিকে সংশোধন ও পরিশুদ্ধ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে , অন্যদিকে মানুষের পারলৌকিক সৌভাগ্যেরও নিশ্চয়তা বিধান করেছে। হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ) এ সব মহান আইন-বিধান সম্বলিত কোরআন মজীদ নিয়ে এসেছেন যার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বমানবতাকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জগতের সৌভাগ্যে উপনীত করা।

কোরআন মজীদ বর্তমানে প্রচলিত তাওরাতের ন্যায় নয় যার আইন-বিধান সমূহ কেবল বস্তুগত জগতের সাথে সংশ্লিষ্ট - যাতে ইহজগতের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয়েছে , কিন্তু অপর জগতের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয় নি।

হ্যা , বর্তমানে প্রচলিত তাওরাত্ বস্তুজগতের মধ্যে এমনভাবে সীমাবদ্ধ যে , পরজগতের প্রতি সামান্যতম দৃষ্টিও প্রদান করে নি। এমনকি নেক কাজের পুরষ্কারকেও ইহজগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে। বর্তমানে প্রচলিত তাওরাত্ বলেছে যে , নেক কাজের পুরস্কার হচ্ছে জাগতিক ধনসম্পদ বৃদ্ধি এবং ইহজগতে অন্যদের ওপর আধিপত্য। অন্যদিকে পাপের শাস্তিকেও ইহজগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রূপে দেখিয়েছে , বলেছে , পাপের শাস্তি হচ্ছে ধনসম্পদ ও ক্ষমতা-আধিপত্য হাতছাড়া হয়ে যাওয়া।

অন্যদিকে কোরআন মজীদ বর্তমানে প্রচলিত ইনজীলের অনুরূপও নয় - যার আইন-কানূন্ ও বিধিবিধান শুধু পরকালের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং ইহজাগতিক বিষয়াদি তথা সমাজব্যবস্থা ও জীবনবিধানের প্রতি যা উপেক্ষা প্রদর্শন করেছে।

বর্তমানে প্রচলিত তাওরাত্ ও ইনজীল্ উভয়ের বিপরীতে কোরআন মজীদের আইন-কানূন্ ও বিধিবিধান হচ্ছে সর্বাত্মক ও পূর্ণাঙ্গ - যাতে ইহকালীন বৈষয়িক জীবন ও সমাজব্যবস্থা যেমন শামিল রয়েছে , তেমনি পরকালীন জীবনের সাফল্য ও কল্যাণের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। কোরআন মজীদে মানুষের জীবনের বস্তুগত ও অবস্তুগত কোনো বিষয়ের প্রতিই উপেক্ষা প্রদর্শন করা হয় নি।

কোরআন মজীদ তার ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষার মাধ্যমে একদিকে যেমন মানুষকে পরকালীন জীবনের প্রতি মনোযোগী করে তুলেছে , অন্যদিকে তাকে পার্থিব জীবনের বিষয়াদির প্রতিও মনোযোগ দিতে বলেছে। যেমন , পরকালীন জীবনের প্রতি মানুষকে আগ্রহী করে তোলার জন্য কোরআন মজীদ এরশাদ করেছে :

) و من يطع الله و رسوله يدخله جنات تجری من تحتها الانهار خالدين فيها و ذالک الفوز العظيم.(

আর যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে সে বেহেশতে প্রবেশ করবে - যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হচ্ছে ; সেখানে সে চিরদিন থাকবে। আর এ হচ্ছে এক বিরাট সাফল্য। (সূরাহ্ আন্-নিসাা : 13)

) و من يعص الله و رسوله و يتعد حدوده يدخله ناراً خالداً فيها و له عذاب مهين(

আর যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে ও তাঁর নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন করবে সে দোযখে প্রবেশ করবে ও চিরদিন সেখানে থাকবে , আর তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। (সূরাহ্ আন্-নিসাা : 14)

) فمن يعمل مثقال ذرة خيراً يره( .

অতএব , যে কেউ অণুমাত্রও সৎকর্ম করবে (পরকালে) সে তা দেখতে পাবে। (সূরাহ্ আয্-যিলযালাহ্ : 7)

) و من يعمل مثقال ذرة شراً يره(

আর যে কেউ অণুমাত্রও পাপকর্ম করবে (পরকালে) সে তা দেখতে পাবে। (সূরাহ্ আয্-যিলযালাহ্ : 8)

) و ابتغ فيما اتاک الله الدار الآخرة و لا تنس نصيبک من الدنيا(

(হে রাসূল!) আল্লাহ্ আপনাকে যে পরকালের গৃহ প্রদান করেছেন তাকে আঁকড়ে ধরুন (এবং তা ঠিক রাখার জন্য যথাযথ কাজ করুন) , আর পার্থিব জগতে আপনার অংশকেও ভুলে যাবেন না। (সূরাহ্ আল্-ক্বাছ্বাছ্ব্ : 77)

কোরআন মজীদের বহু আয়াতেই জ্ঞানার্জন ও তাক্ব্ওয়া-পরহেযগারীর জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে , একই সাথে পার্থিব জীবনের স্বাদ-আনন্দ ও আল্লাহর দেয়া নে আমত সমূহের সঠিক ব্যবহারকে বৈধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কোরআন মজীদ এরশাদ করেছে :

) قل من حرم زينة الله التی اخرج لعباده و الطيبات من الرزق(

(হে রাসূল!) বলুন , আল্লাহ্ তাঁর বান্দাহদের জন্য যে সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন এবং যে সব পবিত্র রিয্ক্ব্ প্রদান করেছেন কে তা হারাম করেছে ? (সূরাহ্ আল্-আ রাাফ্ : 32)

পারস্পরিক সম্পর্ক

কোরআন মজীদ মানুষকে আল্লাহ্ তা আলার ইবাদত ও আনুগত্য করা , সৃষ্টিলোকের নিদর্শনাদি ও শর ঈ বিধিবিধান নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা এবং সৃষ্টিলোকের অস্তিত্ব , মানুষের রহস্য ও তার সত্তায় নিহিত বিভিন্ন সত্য সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য বার বার আহবান জানিয়েছে। কিন্তু কোরআন মজীদ শুধু মানুষকে আল্লাহ্ তা আলার সান্নিধ্যে পৌঁছে দিয়ে তথা বান্দাহ্ ও স্রষ্টার মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিয়েই নিজের দায়িত্ব শেষ করে নি , বরং মানবজীবনের অপর দিকটি অর্থাৎ মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতিও দৃষ্টি প্রদান করেছে , বিশেষ করে মানুষের মধ্যে মায়া-মহব্বত ও আন্তরিক সুসম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছে।

কোরআন মজীদ বেচাকিনা ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে বৈধ ঘোষণা করেছে এবং রেবা ও নির্বিচার সম্পদ বৃদ্ধি করার প্রবণতাকে হারাম করেছে। যেমন , এরশাদ হয়েছে :

) و احل الله البيع و حرم الربا( .

আর আল্লাহ্ ব্যবসায়কে হালাল করেছেন এবং রেবাকে হারাম করেছেন। (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : 275)

[আভিধানিক অর্থে রেবা মানে বৃদ্ধি। কিন্তু পারিভাষিক অর্থে অবাণিজ্যিক প্রয়োজনে গৃহীত ঋণের ওপর আসলের চেয়ে অতিরিক্ত গ্রহণই হচ্ছে রেবা। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ধানের ওপর টাকা লাগানো র যে রেওয়াজ আছে যাতে ধান ওঠার আগে ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট দরে ধানের অগ্রিম মূল্য দেয়া হয় যার দর ঐ সময়কার ও ধান ওঠার সময়কার বাজার দরের চেয়ে কম। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের লেনদেন বেচাকিনা হিসেবে ছ্বহীহ্ নয়। ফলে এর মাধ্যমে ঋণদাতা যে মুনাফা করে তা রেবা। অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যাঙ্ক , আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিস্তিতে বাজার-মূল্যের চেয়ে বেশী মূল্যে গার্হস্থ্য সামগ্রী সরবরাহ করে যে অতিরিক্ত মুনাফা করে তা-ও রেবা। কোনো দোকানদার নগদ বেচাকিনার ক্ষেত্রে একই পণ্য বিভিন্ন মূল্যে বিক্রি করলে বাকী বিক্রির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম মূল্যে বিক্রি না করলে হাদীছ অনুযায়ী এর অতিরিক্ত মুনাফা হবে রেবা।]

কোরআন মজীদ মানুষের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং তা ভঙ্গ না করার জন্য আদেশ দিয়েছে। যেমন , এরশাদ করেছে :

) يا ايها الذين آمنوا اوفوا بالعقود(

হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিশ্রুতিসমূহ রক্ষা করো। (সূরাহ্ আল্-মাাএদাহ্ : 1)

অবশ্য এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে , কোনো যুলুম , অন্যায় বা পাপাচারের কাজের প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার করলে বা ভালো কাজ না করার অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করা ও শর ঈ বিধান অনুযায়ী অঙ্গীকার ভঙ্গের কাফ্ফারাহ্ দেয়া ফরয ; এরূপ ক্ষেত্রে অঙ্গীকার রক্ষা করা কঠিন গুনাহ্। তেমনি কোনো মোবাহ্ কাজে (যেমন : তালাক্ব্ প্রদানের) অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করার মধ্যে কল্যাণ মনে করলে তা ভঙ্গ করে কাফ্ফারাহ্ প্রদান জায়েয আছে।

বিবাহে উৎসাহ প্রদান

যেহেতু মানব প্রজাতির অস্তিত্ব ও ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নারী ও পুরুষের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়া অপরিহার্য , সেহেতু কোরআন মজীদ এ স্বভাবসম্মত কাজটি সম্পাদন অর্থাৎ বিবাহ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। এরশাদ হয়েছে :

) و انکحوا الايامی منکم و الصالحين من عبادکم و امائکم. ان يکونوا فقراء يغنهم الله من فضله و الله واسع عليم(

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার স্বামী বা স্ত্রী বিহীন নারী ও পুরুষদেরকে এবং তোমাদের বিবাহযোগ্য দাস-দাসীদেরকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দাও। আর এরা যদি দরিদ্র ও নিঃসম্বল হয়ে থাকে তো আল্লাহ্ তাঁর অনুগ্রহ দ্বারা তাদেরকে সচ্ছলতা দান করবেন। আর আল্লাহ্ সীমাহীন উদারতার অধিকারী ও সর্ববিষয়ে সদা ওয়াকেফহাল। (সূরাহ্ আন্-নূর্ : 32)

) فانکحوا ما طاب لکم من النساء مثنی و ثلاث و رباع فان خفتم ان لا تعدلوا فواحدة( .

তোমাদের জন্য যারা উত্তম এমন নারীদের মধ্য থেকে বিবাহ করো দু জন , তিন জন বা চারজনকে , কিন্তু তোমরা যদি ভয় করো যে , তাদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে না তাহলে মাত্র একজনকে বিবাহ করো। (সূরাহ্ আন্-নিসাা : 3)

সদাচরণ ও কল্যাণকর কাজ

কোরআন মজীদ স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করতে ও তার সমস্ত স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণের জন্য স্বামীর প্রতি নির্দেশ দিয়েছে। তেমনি কোরআন মজীদ সমস্ত মুসলমানের সাথে , বিশেষ করে পিতা-মাতা , আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ জনদের সাথে সদাচরণের জন্য আদেশ দিয়েছে। বরং কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে সদাচরণ হচ্ছে মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য ব্যাপক ভিত্তিক ও সর্বজনীন কর্মসূচী। তাই শুধু মুসলমানদের সাথেই নয় , বরং মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে মানব প্রজাতির প্রতিটি সদস্যের সাথেই সদাচরণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে :

) و عاشروهن بالمعروف(

আর তোমরা তাদের (তোমাদের স্ত্রীদের) সাথে সদাচরণ করো। (সূরাহ্ আন্-নিসাা : 19)

) و لهن مثل الذی عليهن بالمعروف(

আর তাদের ওপরে যেভাবে (তোমাদের অধিকার) রয়েছে ঠিক সেভাবেই (তোমাদের ওপর) রয়েছে তাদের জন্য ন্যায়সঙ্গত অধিকার। (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : 228)

) و اعبدوا الله و لا تشرک به شيئاً و بالوالدين احساناً و بذی القربی و اليتامی و المساکين و الجاری ذی القربی و الجاری ذی الجنب و الصاحب بالجنب و ابن السبيل و ما ملکت ايمانکم ان الله لا يحب من کان مختالاً فخوراً(

তোমরা আল্লাহর বন্দেগী ও দাসত্ব করো এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না। আর পিতামাতার সাথে সদাচরণ করো এবং সদাচরণ করো আত্মীয়-স্বজন , ইয়াতীম , মিসকীন্ , নিকট প্রতিবেশী , দূর প্রতিবেশী , বন্ধু-বান্ধব , পথিক এবং তোমাদের দাস-দাসী (ও অধীনস্থ)দের সাথে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ উদ্ধত-অহঙ্কারী লোকদেরকে পসন্দ করেন না। (সূরাহ্ আন্-নিসাা : 36)

) و احسن کما احسن الله اليک و لا تبغ الفساد فی الارض ان الله لا يحب المفسدين(

আর (অন্যদের প্রতি) কল্যাণকামী ও দয়ার্দ্র হও ঠিক যেভাবে আল্লাহ্ তোমার প্রতি দয়া করেছেন। আর ধরণীর বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি , দুষ্কৃতি ও পাপাচার করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ বিপর্যয়সৃষ্টিকারী ও দুর্বৃত্ত-পাপাচারীদেরকে পসন্দ করেন না। (সূরাহ্ আল্-ক্বাছ্বাছ্ব্ : 77)

) ان رحمة الله قريب من المحسنين(

অবশ্যই আল্লাহর রহমত্ সৎকর্মশীল ও কল্যাণকারীদের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করছে। (সূরাহ্ আল্-আ রাাফ্ : 56)

) و احسنوا ان الله يحب المحسنين(

আর তোমরা (অন্যদের) কল্যাণ সাধন করো ; নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ কল্যাণকারীদের পসন্দ করেন। (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : 195)

এ হচ্ছে কোরআন মজীদের ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যম পন্থা অবলম্বনের শিক্ষাসমূহের কিছু দৃষ্টান্ত মাত্র।

ভালো কাজে আদেশ দান ও মন্দ কাজ প্রতিরোধ

কোরআন মজীদ মুসলিম উম্মাহর সমস্ত সদস্যের ওপর ভালো কাজের আদেশ দান ও মন্দ কাজের প্রতিরোধকে অপরিহার্য কর্তব্য রূপে নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং এ দায়িত্বকে কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠী বা মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয় নি। কোরআন মজীদ তার এ মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ব্যাপক আইন-বিধান প্রণয়ন করেছে , বরং এর মাধ্যমেই স্বীয় শিক্ষাকে প্রাণময় ও চিরস্থায়ী করেছে।

ইসলাম সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিকে এবং প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে পরস্পরের জন্য পর্যবেক্ষক ও পথনির্দেশকের দায়িত্ব প্রদান করেছে এবং প্রতিটি ব্যক্তিকেই অন্যদের ওপর দায়িত্বশীল করেছে। প্রকৃত পক্ষে ইসলাম প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তির ওপর একেক জন পুলিশের দায়িত্ব প্রদান করেছে যে অন্যদেরকে নেক কাজ , কল্যাণ ও চিরন্তন সৌভাগ্যের দিকে পথনির্দেশ প্রদান করবে এবং যুলুম-শোষণ , নির্যাতন , লুণ্ঠন , পাপ ও দুষ্কৃতি থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে রাখবে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে সমস্ত মুসলমানই ইসলামের প্রচার-প্রসার এবং ইসলামী আইন-বিধান বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বশীল।

এমতাবস্থায় , এর চেয়ে বৃহত্তর এবং এর চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কথা কল্পনা করাও সম্ভব কি ?

বর্তমান যুগে যে কোনো দেশেই রাষ্ট্রীয় আইন-কানূন্ কার্যকরী করার জন্য বিরাট পরিচালকমণ্ডলী ও শান্তিশৃঙ্খলা বাহিনীর আশ্রয় নেয়া হয় , কিন্তু তা সত্ত্বেও আইনলঙ্ঘন প্রতিরোধ করা সম্ভবপর হয় না। কারণ , পরিচালনা ও শান্তিশৃঙ্খলা বাহিনী যতোই বিশাল এবং যতোই সুসজ্জিত হোক না কেন , তাদের পক্ষে জাতির প্রতিটি মানুষের সাথে প্রতিটি স্থানে ও প্রতিটি সময়ে অবস্থান করে তাদের সমস্ত কাজকর্মের ওপর দৃষ্টি রাখা সম্ভবপর নয়।

কিন্তু ইসলাম এক সমুন্নত মহান পরিকল্পনা ও কর্মসূচীর আশ্রয় নিয়ে এবং ভালো কাজের আদেশ দান ও মন্দ কাজ প্রতিরোধ কে প্রতিটি মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়ে কার্যতঃ শক্তিশালী ও বিশালায়তন এক বাহিনী সৃষ্টি করেছে। আর অন্যান্য বাহিনী ও এ বাহিনীর মধ্যে রয়েছে এক বিরাট পার্থক্য। তা হচ্ছে , কোনোরূপ ব্যয়বাজেট ছাড়াই এ বাহিনী যথারীতি তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং সর্বত্র , সব সময় ও সব বিষয়ে দৃষ্টি রাখছে , আর সেই সাথে ইসলামের সমুন্নত আইন-বিধান বাস্তবায়নেরও নিশ্চয়তা বিধান করছে।

শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড জ্ঞান ও ন্যায়নিষ্ঠা

কোরআন মজীদ একের ওপর অন্যের প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য একমাত্র যে বিষয়টিকে মানদণ্ডরূপে গ্রহণ করেছে তা হচ্ছে জ্ঞান ও ন্যায়নিষ্ঠা - নীতিনিষ্ঠতা তথা খোদাভীরুতা। যেমন , কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে :

) ان اکرمکم عند اببه اتقاکم(

অবশ্যই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানের পাত্র সেই ব্যক্তি যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক ন্যায়নিষ্ঠ ও খোদাভীরু। (সূরাহ্ আল্-হুজুরাাত্ : 13)

) قل هل يستوی الذين يعلمون و الذين لا يعلمون( .

(হে রাসূল!) বলুন : , যারা জানে (জ্ঞানের অধিকারী) আর যারা জানে না (অজ্ঞ) তারা কি সমান হতে পারে ? (সূরাহ্ আয্-যুমার : 9)

সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠা

কোরআন মজীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গভীরতম আইন-বিধান ও শিক্ষাসমূহের অন্যতম হচ্ছে সাম্য ও সমতা। কোরআন মজীদ তার এ সাম্যের বিধানের আওতায় সমস্ত মুসলমানের মধ্যে ঐক্য , অভিন্নতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে , সবাইকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে এবং যে কোনো ধরনের বিশেষ অগ্রাধিকার ও বর্ণগত ভেদাভেদের মূলোৎপাটন করেছে , তেমনি একের ওপর অন্যের প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্বের মূলোচ্ছেদ করেছে।

হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ) এরশাদ করেন : জাহেলীয়াতের যুগে যারা ঘৃণ্য , নীচ ও পদদলিত ছিলো মহান আল্লাহ্ তা আলা ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় দান করে তাদেরকে সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী করেছেন এবং ইসলামের মাধ্যমে জাহেলী যুগের গর্ব-অহঙ্কার - বর্ণ , গোত্র আত্মীয়-স্বজন ও পূর্বপুরুষের গৌরব , আর সব রকমের বর্ণ ও শ্রেণীগত ভেদাভেদের মূলোৎপাটন করেছেন। সাদা-কালো , আরব-অনারব নির্বিশেষে সমস্ত মানুষই আদমের বংশধর , আর আল্লাহ্ আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। বস্তুতঃ শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর নিকট প্রিয়তম লোক হিসেবে তারাই গণ্য হবে যারা সর্বাধিক ন্যায়নিষ্ঠ - খোদাভীরু। (فروع کافی-٢، باب ٢١: ان المؤمن کفو المؤمنة .)

হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ) আরো এরশাদ করেছেন : সাধারণ জনগণের ওপর জ্ঞানীদের মর্যাদার তুলনা হচ্ছে তোমাদের মধ্যকার মুষ্টিমেয় সংখ্যক (শ্রেষ্ঠতর) লোকদের ওপর আমার মর্যাদা। (الجامع الصغير با شرح مناوی ٤/٤٣٢ .)

ইসলাম ঈমানী পূর্ণতার কারণে হযরত সালমান ফার্সীকে অন্য মুসলমানদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছে (যদিও তিনি ছিলেন অনারব) , এমনকি তাঁকে হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর পরিবারের সদস্য হিসেবে পর্যন্ত ঘোষণা করেছে (بحار الانوار- ٤، باب ٧٦: فضائل سلمان .) , অন্যদিকে স্বয়ং হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর চাচা হওয়া সত্ত্বেও আবূ লাহাব্-কে তার কুফরী ও খোদাদ্রোহিতার কারণে জাহান্নামী হিসেবে ঘোষণা করেছে।

হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর জীবনচরিতও প্রমাণ করে যে , তিনি কখনোই এবং কোনো অবস্থায়ই স্বীয় বংশ-গোত্র বা বর্ণকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য প্রদান করেন নি। তেমনি ঐ যুগের মানুষ যে সব বিষয়কে গৌরবের কারণ রূপে গণ্য করতো এবং তৎকালে প্রচলিত গর্ব-অহঙ্কার , শ্রেষ্ঠত্ব , মর্যাদা ও বিশেষ সুবিধার আরো যে সব মানদণ্ড বিদ্যমান ছিলো সেগুলোর ভিত্তিতে তিনি কোনোদিনই গর্ব-অহঙ্কার করেন নি বা বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করেন নি। বরং তিনি মানুষকে আল্লাহ্ তা আলার একত্ব , নবুওয়াত্ , পরকাল ও নেক আমলের দিকে আহবান করেছেন।

হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ) লোকদেরকে চিন্তা ও কর্মের ঐক্য এবং এক খোদার ইবাদত্-বন্দেগী ও আনুগত্যের দিকে পথনির্দেশ দিয়েছেন ও পরিচালনা করেছেন। এ পন্থায় তিনি মানুষের অন্তঃকরণের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে , তাদের অন্তর থেকে অযৌক্তিক গর্ব-অহঙ্কারের মূলোৎপাটন করতে এবং তার পরিবর্তে তাদের হৃদয়ে প্রেম-ভালোবাসা , মায়া-মহব্বত , সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের অঙ্কুরোদ্গম ঘটাতে সক্ষম হন। এর ফলে দেখা গেছে , অনেক সম্পদশালী ও সম্ভ্রান্ত লোক , ইতিপূর্বে ছোটলোকরূপে পরিগণিত দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের সাথে নিজেদের মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন প্রতিষ্ঠা করেছেন।

কালোত্তীর্ণ পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান

সার্বিকভাবে আমরা বলতে পারি যে , কোরআন মজীদের ধর্মীয় বিধিবিধান ও পার্থিব আইন-কানূনে এবং ইসলামের নৈতিক শিক্ষায় ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের কল্যাণের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। ইসলাম এমন আইন-বিধান ও সমাজব্যবস্থা প্রদান করেছে যা সকল যুগের সকল দেশের সকল মানবগোষ্ঠীর প্রয়োজন পূরণে তথা তাদের সকল সমস্যার সমাধানে সক্ষম।

ইসলামের আইন-বিধানে একদিকে যেমন মানুষের বস্তুগত ও পার্থিব জীবনের প্রতিটি দিক-বিভাগের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয়েছে , তেমনি মানুষের অবস্তুগত , মনোজাগতিক , নৈতিক , আধ্যাত্মিক ও পারলৌকিক প্রতিটি দিক-বিভাগের প্রতিও দৃষ্টি দেয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে , যিনি এহেন নিখুঁত , পূর্ণাঙ্গ , সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপক আইন-বিধান উপস্থাপন করেছেন তাঁর নবুওয়াতে কোনোরূপ সন্দেহের অবকাশ আছে কি ? বিশেষ করে হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ) যখন একদল সভ্যতার আলো বর্জিত ও নিরক্ষর মানুষের মাঝে দুনিয়ায় আগমন করেছেন এবং এমন লোকদের মধ্যে বড় হয়েছেন যারা আসমানী কিতাবের শিক্ষার সাথে এক বিন্দুও সম্পর্ক রাখতো না - এর সাথে পরিচিতও ছিলো না , ফলতঃ এ পর্যায়ের আইন-বিধান ও শিক্ষা ছিলো তাদের চিন্তাশক্তির , বরং তাদের কল্পনাশক্তিরও উর্ধে। তাই এ আইন-বিধান না তিনি কারো কাছ থেকে শিখে নিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন , না নিজে রচনা করেছিলেন , বরং তা আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকেই তাঁকে প্রদান করা হয়েছিলো - এতে আর কোনোরূপ সন্দেহের অবকাশ থাকে কি ?


21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38