কোরআনের মু‘জিযাহ্

কোরআনের মু‘জিযাহ্ 7%

কোরআনের মু‘জিযাহ্ লেখক:
: নূর হোসেন মজিদী
প্রকাশক: -
বিভাগ: কোরআন বিষয়ক জ্ঞান

কোরআনের মু‘জিযাহ্
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 60 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 48366 / ডাউনলোড: 4672
সাইজ সাইজ সাইজ
কোরআনের মু‘জিযাহ্

কোরআনের মু‘জিযাহ্

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

3

রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) ও কোরআনের বিশ্বজনীনতা

হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর নবুওয়াতের ও কোরআন মজীদের বিশ্বজনীনতা ও সর্বজনীনতা সম্পর্কে সংক্ষেপে এতোটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে , আল্লাহ্ তা আলা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব্ ও ছ্বহীফাহ্ সমূহ সংরক্ষণের জন্য কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা নেন নি , কিন্তু কোরআন মজীদকে অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করেছেন। এমনকি যারা রাসূলে আকরাম্ হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর নবুওয়াত স্বীকার করে না তারাও স্বীকার করতে বাধ্য যে , কোরআন মজীদ তিনি যেভাবে পেশ করে গেছেন কোনোরূপ বিকৃতি বা পরিবর্তন ছাড়াই হুবহু সেভাবেই বর্তমান আছে।

এছাড়া আল্লাহ্ তা আলা কোরআন মজীদের সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াতে দ্বীনকে পূর্ণতা দানের কথা বলেছেন এবং বিভিন্ন আয়াতে হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)কে সমগ্র মানবকুলের জন্য নবী , শেষ নবী ও জগতসমূহের বা সকল জগতবাসীর জন্য রহমত বলে উল্লেখ করেছেন। অতএব , নবী করীম (ছ্বাঃ) ও কোরআন মজীদ যে তাঁর যুগ থেকে শুরু করে ক্বিয়ামত্ পর্যন্ত স্থান-কাল ও পরিবেশ-পরিস্থিতি নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য নবী ও হেদায়াত তাতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।

এ প্রসঙ্গে হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর শেষ নবী হওয়া ও তাঁর নবুওয়াতের বিশ্বজনীনতা প্রসঙ্গে সংক্ষেপে হলেও কিছুটা আলোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে হয়। কারণ , ইয়াহূদী ও খৃস্টানরা তাঁকে নবী হিসেবে মানে না এবং কাদিয়ানীরা তাঁকে শেষ নবী হিসেবে স্বীকার করে না।

রাসূলে আকরাম্ হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর নবুওয়াত ও তাঁর নবুওয়াতের বিশ্বজনীনতার প্রমাণ এই যে , বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী মানুষের জন্য আল্লাহ্ তা আলার কাছ থেকে পথনির্দেশ পাওয়া অপরিহার্য। এমতাবস্থায় পূর্বে আগত পথনির্দেশ হারিয়ে গেলে বা বিকৃত হয়ে গেলে পুনরায় পথনির্দেশ আসাও অপরিহার্য। স্বয়ং ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিতগণও স্বীকার করেন যে , তাওরাত্ ও ইনজীল্ সহ বাইবেলের পুস্তকগুলোতে পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটেছে। বিশেষ করে বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকে নবী-রাসূলগণের ( আঃ) অনেকের চরিত্রের ওপর এমন কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে যা বিশ্বাস করলে তাঁদেরকে নবী-রাসূল ( আঃ) বলে গ্রহণ করা যায় না। শুধু তা-ই নয় , ঐ সব পুস্তক যে সব নবী-রাসূলের ( আঃ) নামে উল্লিখিত হয়েছে সে সব পুস্তক যে তাঁরা রেখে গেছেন তা অকাট্যভাবে ও ঐতিহাসিক ধারাক্রমে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। এ সব পুস্তকের সবগুলোই তাঁদের পরে লিখিত বা পুনর্লিখিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয় , সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ যে ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন এবং নবী ছিলেন তা-ও অকাট্যভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। অবশ্য মুসলমানরা তাঁদেরকে নবী-রাসূলরূপে স্বীকার করে ও শ্রদ্ধা করে , তবে তা ঐতিহাসিকভাবে তাঁদের অস্তিত্ব ও নবুওয়াত প্রমাণিত হবার কারণে নয় , বরং কোরআন মজীদে উল্লিখিত থাকার কারণে।

এহেন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ শত শত বছরেও কি আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্য কোনো নবীর আগমন অপরিহার্য ছিলো না ?

বিগত প্রায় দুই হাজার বছরের মধ্যে [হযরত ঈসা ( আঃ)-এর ঊর্ধলোকে আরোহণের পর/ খৃস্ট মতে , ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর] নবুওয়াতের দাবীদারদের মধ্যে একমাত্র হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) ছাড়া বিচারবুদ্ধির আলোকে আর কারো মধ্যেই নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় যদি তাঁকে নবী হিসেবে এবং কোরআন মজীদকে আল্লাহর কিতাব্ হিসেবে স্বীকার করা না হয় তাহলে বলতে হবে আল্লাহ্ তা আলা মানুষের জন্য পথনির্দেশের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে পথনির্দেশ বিহীন ফেলে রেখেছেন। কিন্তু তাঁর মহান সত্তা সম্বন্ধে এরূপ ধারণা করা অন্যায়।

তাছাড়া বিকৃতি সত্ত্বেও তাওরাত্ , ইনজীল্ ও আরো অনেক প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে আরবের বুকে শেষ নবী হিসেবে হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী এখনো বিদ্যমান আছে। বিগত প্রায় দুই হাজার বছরের মধ্যে নবুওয়াতের দাবীদার এমন দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে নি যার সম্পর্কে এ সব ভবিষ্যদ্বাণী প্রযোজ্য হতে পারে এবং ইয়াহূদী-খৃস্টান পণ্ডিত ও ধর্মনেতাগণ কাউকে উক্ত ভবিষ্যদ্বাণীসমূহে কথিত পারাক্লিতাস বা মেসিয়াহ্ বলে চিহ্নিত করেন নি। এমতাবস্থায় ঐশী গ্রন্থের দাবীদার একমাত্র অবিকৃত গ্রন্থ কোরআন মজীদ ও তাঁর উপস্থাপক হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর নবুওয়াত প্রত্যাখ্যান একান্তই অন্ধত্ব ও অযৌক্তিকতার পরিচায়ক। আর কোরআন মজীদ সমগ্র মানব প্রজাতির জন্য নিজেকে পথনির্দেশ এবং হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে বিশ্বজনীন নবী ও শেষ নবী বলে দাবী করেছে - যা প্রত্যাখ্যানের কোনো যুক্তিই তাদের কাছে নেই।

অন্যদিকে কাদিয়ানীরা রাসূলে আকরাম্ হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে স্বীকার করলেও শেষ নবী হিসেবে স্বীকার করে না। তাদের এ দাবী মিথ্যা হওয়া সম্পর্কে সংক্ষেপে বলতে হয় যে , আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ হেদায়াত-গ্রন্থ নাযিল্ হওয়ার এবং তা সংরক্ষিত থাকার পর নতুন নবীর প্রয়োজনীয়তা বিচারবুদ্ধির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

কোরআন মজীদে যে হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)কে খাতামুন্নাবীয়্যীন্ (নবীগণের মোহর) বলে উল্লেখ করা হয়েছে কাদিয়ানীরা এর বিকৃত ব্যাখ্যা করে এই যে , তাঁর মোহর ধারণ করে নতুন নবীর আগমনের ধারা বহাল আছে। তারা তাঁর মোহর ধারণ -এর ব্যাখ্যা করে এই যে , গোলাম আহমদ কাদিয়ানী তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে স্বীকার করেছে। অথচ এর মানে দাঁড়ায় এই যে , গোলাম আহমদ কাদিয়ানী তাঁকে নবী হিসেবে স্বীকার করলো , তিনি গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে নবী হিসেবে স্বীকার করেন নি। কোরআন মজীদে যদি গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী থাকতো কেবল তাহলেই বলা যেতো যে , সে হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর মোহরধারী নতুন নবী।

মোদ্দা কথা , ইয়াহূদী , খৃস্টান ও কাদিয়ানীদের পক্ষ থেকে হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর শেষ নবী হওয়ার সত্যতা অস্বীকার বিশেষ কোনো স্বার্থে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে সত্যকে প্রত্যাখ্যান বৈ নয়।

বুদ্ধিবৃত্তিক জবাবের পর্যালোচনা

কোরআন মজীদ কেন আরবী ভাষায় নাযিল্ হলো ? এ প্রশ্নের বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব দিতে গিয়ে অনেকে বলেছেন : যেহেতু হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ) আরবদের মধ্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর মাতৃভাষা ছিলো আরবী সেহেতু আল্লাহ্ তা আলা আরবী ভাষায় কোরআন নাযিল্ করেছেন। তিনি যদি অন্য ভাষাভাষী কোনো জাতির মধ্যে (উদাহরণস্বরূপ , ইংরেজীভাষীদের মধ্যে) আবির্ভূত হতেন তাহলে কোরআন মজীদ সে ভাষাতেই নাযিল্ হতো।

আল্লাহ্ তা আলা কেন হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)কে আরবদের মধ্যে পাঠালেন ? এ প্রশ্নেরও বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব দেয়া হয়। তা হচ্ছে , আরবদের তৎকালীন সমাজ-পরিবেশ শেষ নবীর আবির্ভাবের জন্য সর্বাধিক উপযুক্ত ছিলো।

আসলেই কি তা-ই ? প্রকৃত ব্যাপার কি এরূপ যে , যেহেতু ঐ যুগে আরবদের সমাজ-পরিবেশ সমকালীন বিশ্বে জঘন্যতম ছিলো সেহেতু আল্লাহ্ তা আলা তাদের মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠতম ও সর্বশেষ রাসূলকে (ছ্বাঃ) পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিলেন ? আর তৎকালীন বাংলাদেশের সমাজ-পরিবেশ যদি এর চেয়েও খারাপ হতো তাহলে কি আল্লাহ্ তা আলা তাঁকে বাংলাদেশে পাঠাতেন ? অথবা যদি বিশ্বের কোথাওই কখনোই ঐ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হতো তাহলে কি আল্লাহ্ তা আলা হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)কে পাঠাতেন না এবং কোরআন মজীদ নাযিল্ করতেন না ? নাকি তাঁকে পাঠাবার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তা আলা স্বয়ং তৎকালীন আরবের পরিবেশকে ঐ পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছিলেন ? কিন্তু আল্লাহ্ বান্দাহর কাজে কেবল ইতিবাচক হস্তক্ষেপই করে থাকেন এবং মানুষকে পাপাচারের ও অমানবিকতা তথা জাহেলিয়াতের দিকে ঠেলে দেয়ার মতো জঘন্য কাজের দুর্বলতা থেকে তিনি পরম প্রমুক্ত।

নবীর আবির্ভাব পূর্বনির্ধারিত

তাছাড়া আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে কোনো নবীকে পাঠানোর স্থান নির্বাচনের বিষয়টি যদি এ নীতির ওপরই ভিত্তিশীল হতো যে , যখন যেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশী পাপপঙ্কিল ও যুলুম-অত্যাচারপূর্ণ তিনি সেখানে তাঁর নবী পাঠাবেন তাহলে ইতিপূর্বে একই জায়গায় (যেমন : ফিলিস্তিনে) একই সময় বা পর পর একাধিক নবী পাঠানো এবং বিশ্বের অন্যান্য স্থানে পূর্ববর্তী নবীর পর দীর্ঘদিনের ব্যবধান সত্ত্বেও নবী না পাঠানোর কারণ কী ছিলো ? তাছাড়া পূর্ববর্তী কালে নবী-রাসূলগণ ( আঃ) , আল্লাহর ওয়ালীগণ ও ভবিষ্যদ্বক্তাগণ যে আরবের বুকে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী (ছ্বাঃ)-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা কীভাবে সম্ভব হয়েছিলো ?

এ সব ভবিষ্যদ্বাণীর মানে তো এটাই যে , হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর আরবে ও আরবদের মধ্যে আবির্ভূত হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত ছিলো। আর যখন তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত ছিলো তখন তথাকথিত পরিস্থিতির দাবী অনুযায়ী তাঁর অন্যত্র আবির্ভূত হওয়ার কথা ধারণা করা আদৌ সম্ভব কি ? এ ক্ষেত্রে কোনোরূপ যদি বলার অবকাশ থাকে কি ? এ ক্ষেত্রে বলা চলে কি তিনি যদি বাংলাভাষীদের মধ্যে আবির্ভূত বা প্রেরিত হতেন তাহলে কোরআন মজীদ বাংলা ভাষায় নাযিল্ হতো ?

[মজার ব্যাপার হলো , যারা বাংলা ভাষার কথা বলেন তাঁরা ভুলে যান যে , হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর আবির্ভাব ও কোরআন মজীদ নাযিল কালে বাংলা ভাষার আদৌ জন্ম হয় নি। কারণ , প্রধানতঃ ঐ সময় থেকে বহিরাগত ফার্সীভাষী ও ফার্সী-জানা ব্যবসায়ী ও ইসলাম-প্রচারকদের আগমন ও এতদ্দেশের জনগণের সাথে ভাববিনিময়ের ফলে সুদীর্ঘ কয়েক শতাব্দী কালের প্রক্রিয়ায় আরবী ও ফার্সী ভাষার এবং স্থানীয় জনগণের নাম ও সাহিত্য বিহীন কথ্য আঞ্চলিক ভাষাসমূহের শব্দাবলীর সংমিশ্রণে বাংলা ভাষা জন্মলাভ করে। এ বিষয়ে মৎপ্রণীত বাংলা ভাষার মাতৃপরিচয় গ্রন্থে (অপ্রকাশিত) বিস্তারিত আলোচনা করেছি।]

অতএব , প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে , এখানে কোনো যদি র অবকাশ নেই। বরং হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ) যে আরবদের মধ্যে আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর মাতৃভাষা আরবী হবে , আর কোরআন মজীদ আরবী ভাষায় নাযিল্ হবে তা অকাট্যভাবে পূর্বনির্ধারিত ছিলো ; এর ব্যতিক্রম হওয়া সম্ভব ছিলো না।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , আল্লাহ্ তা আলা মানুষকে তাঁর প্রতিনিধি (খলীফাহ্) বানিয়েছেন। এ কারণে তিনি তাদেরকে স্বাধীনতা ও এখতিয়ার দিয়েছেন এবং তার মধ্যে ভালো-মন্দ ও উন্নতি-অধোগতির প্রায় সীমাহীন সম্ভাবনা নিহিত রেখেছেন। অন্যথায় সে সীমাহীন জ্ঞান ও ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ্ তা আলার প্রতিনিধিত্ব করার উপযুক্ত বলে গণ্য হতো না। অর্থাৎ মানুষকে কোনো ছকবাঁধা পথে চলতে বাধ্য করা আল্লাহ্ তা আলার ইচ্ছা নয় , বরং তিনি তাকে বহু বিকল্প বিশিষ্ট এক ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।

এটা হচ্ছে সাধারণভাবে ও সামগ্রিকভাবে গোটা মানব প্রজাতি সংক্রান্ত অবস্থা। কিন্তু এ সৃষ্টিলোককে , বিশেষ করে মানুষকে সৃষ্টি করার পিছনে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা আলার এক বিশেষ সৃষ্টিলক্ষ্য রয়েছে। কারণ , সকল প্রকার প্রয়োজন ও দুর্বলতা থেকে প্রমুক্ত মহান আল্লাহ্ তা আলা উদ্দেশ্যহীন কিছু করবেন এটা তাঁর সম্পর্কে কল্পনাও করা যায় না। বরং তাঁর এ সৃষ্টিকর্মের পিছনে অবশ্যই কোনো ইতিবাচক উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। আর তিনি তাঁর এ সৃষ্টিলক্ষ্য বাস্তবায়নের বিষয়টিকে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও খেয়ালখুশীর ওপর ছেড়ে দিতে পারেন না। তাই নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর এ সৃষ্টিলক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যা কিছু অপরিহার্য তা তিনি সৃষ্টিকর্মের সূচনার আগেই তথা সৃষ্টিকর্মের পরিকল্পনার মধ্যেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। এভাবে যা ক্বাযাায়ে ইলাহীতে (খোদায়ী সিদ্ধান্তে/ পূর্বনির্ধারণে) নির্ধারিত রয়েছে তথা সৃষ্টিপরিকল্পনায় যা অনিবার্যরূপে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে কোনো অবস্থাতেই তার অন্যথা হতে পারে না।

অর্থাৎ বিষয়টি এমন নয় যে , আল্লাহ্ তা আলা পরিস্থিতির দাবী অনুযায়ী নবী পাঠাবেন বলে তাঁর সৃষ্টিপরিকল্পনায় নির্ধারণ করে রাখেন। বরং প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে , কোথায় কখন কোন্ নবীকে পাঠাবেন এবং তাঁদের পূর্বাপর ধারাক্রম ইত্যাদি কী হবে তা তিনি পূর্বেই নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। তাই তাঁদের অনেকের সম্পর্কে , বিশেষ করে রাসূলে আকরাম্ হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ ( আঃ) সুনির্দিষ্টভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করে যান। অতএব , নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর আরবী ভাষাভাষী হওয়া এবং কোরআন মজীদের আরবী ভাষায় নাযিল্ হওয়া যে পূর্বনির্ধারিত ছিলো তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। সেই সাথে এ-ও সন্দেহাতীত বিষয় যে , কোরআন নাযিলের জন্য উপযোগী ভাষার বিকাশ সাধন তথা আরবী ভাষার উৎপত্তি ও চূড়ান্ত বিকাশও আল্লাহ্ তা আলার সৃষ্টিপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

আরবী ভাষার বিকাশে খোদায়ী হস্তক্ষেপ

এখন প্রশ্ন হচ্ছে , আল্লাহ্ তা আলা কোরআন মজীদের জন্য আরবী ভাষাকে বেছে নিলেন কেন ? অন্য কোনো ভাষাকে কেন বেছে নিলেন না ?

এ প্রশ্নের জবাবে প্রথমে পাল্টা প্রশ্ন করতে হয় , আসলে কোরআন মজীদের মতো মহাগ্রন্থ - যাতে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মানুষকে দেয়ার উপযোগী সকল জ্ঞানের সমাহার ঘটানো হয়েছে তা আরবী ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় নাযিল্ হওয়া আদৌ সম্ভব কি ?

বলা হতে পারে , আল্লাহ্ তা আলার পক্ষে অসম্ভব কিছুই নেই। নিঃসন্দেহে। তবে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভাষার বিকাশপ্রক্রিয়াকে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে হতো যার ফলে তা আরবী ভাষায় পরিণত হতো। কারণ , কোরআন মজীদের ন্যায় সংক্ষিপ্ত আয়তনের গ্রন্থে সীমাহীন জ্ঞানের সমাহার ঘটাবার ও তাকে ক্বিয়ামত্ পর্যন্তকার স্থান-কাল নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য মু জিযায় পরিণত করার জন্যে এহেন প্রায় সীমাহীন সম্ভাবনার অধিকারী ভাষার উদ্ভব ঘটানো ছিলো অপরিহার্য।

যেহেতু আল্লাহ্ তা আলার এ গ্রন্থ নাযিলের জন্য এহেন সম্ভাবনাময় একটি ভাষার উদ্ভব অপরিহার্য ছিলো সেহেতু তিনি একটি ভাষার সূচনা ও বিকাশকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছেন যাতে সে ভাষায় কোরআন মজীদ নাযিল্ করা সম্ভবপর হয়। যেহেতু সৃষ্টিলক্ষ্য বাস্তবায়ন বা সৃষ্টির জন্যে প্রয়োজন ব্যতিরেকে আল্লাহ্ তা আলা মানুষের স্বাধীন কর্মক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেন না এবং তাঁর সৃষ্টিপরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্য এ ধরনের একটি ভাষার বিকাশ ঘটানো অপরিহার্য ছিলো সেহেতু তিনি একটিমাত্র ভাষার বিকাশকে এ লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রিত করেন। একাধিক ভাষাকে এ পর্যায়ে বিকশিত করানো অপরিহার্য ছিলো না বিধায় তিনি তা করেন নি। তাই অন্যান্য ভাষার সম্ভাবনার বিকাশ মানবিক প্রতিভা-প্রচেষ্টার ফলে যতোখানি সম্ভবপর ততোখানি সম্ভব হয়েছে বা হচ্ছে অথবা হবে। তাছাড়া মানুষের সকল ভাষাকে অভিন্ন মাত্রায় বিকশিত করলে শেষ পর্যন্ত তা একটিমাত্র ভাষায় পরিণত হতো এবং সে ক্ষেত্রে ভাষাবৈচিত্র্যের মধ্যে যে মহান লক্ষ্য নিহিত রয়েছে তা হাছ্বিল্ হতো না।

বিস্ময়কর সম্ভাবনাময় ভাষা আরবী

বস্তুতঃ মানুষের ভাষাসমূহের মধ্যে আরবী ভাষার প্রকাশক্ষমতার সম্ভাবনা বিস্ময়কর , বরং পারিভাষিক অর্থে (যদিও আক্ষরিক অর্থে নয়) সীমাহীন বললে অত্যুক্তি হবে না। প্রকাশক্ষমতার সম্ভাবনার তুলনামূলক বিচারে অন্যান্য ভাষার মধ্যে সর্বোচ্চ প্রকাশক্ষমতার অধিকারী ভাষাকেও আরবীর সাথে তুলনা করলে এক বনাম একশ র অনুপাতও খুবই কম বলে মনে হবে। হযরত রাসূলে আকরাম্ (ছ্বাঃ)-এর আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই আরবরা আরবী ভাষার এ প্রকাশসম্ভাবনা ও তার মোকাবিলায় অন্যান্য ভাষার দৈন্য সম্পর্কে অবগত ছিলো। এ কারণে তারা অন্যান্য ভাষাভাষী লোকদেরকে বলতোالاعجم (আল্-আ জাম্)- বোবা বা অস্পষ্টভাষী।

শুধু তা-ই নয় , মূলতঃ আরবী ভাষা (اللغة العربية ) বলতে তারা আরব উপদ্বীপের জনগণের ভাষা বুঝাতো না , বরং উচ্চাঙ্গের ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব প্রকাশক গতিশীল প্রাঞ্জল ভাষা বুঝাতো। আর এর বিপরীতে নিম্ন মানের ভাষার অধিকারী , অস্পষ্টভাষী বা দুর্বোধ্যভাষী বুঝাতে জাম্ বলতো।

এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে , আমরা যাকে আরবী ( ভাষা ) বলি তা এ ভাষার গুণ বা পরিচিতি বাচক নাম , প্রকৃত নাম ( Proper Name)নয়। বরং অনারব লোকেরাই এ নামটিকে প্রকৃত নাম ( Proper Name)- এ পরিণত করেছে। কারণ , আরবী ভাষায় আল্ - আরাবী (العربی )বিশেষ্য নয় , বিশেষণ। এখানে কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো যা থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে :

[আরবী ভাষায় বাক্যের বাইরে কেবল একটি শব্দ হিসেবে বিশেষ্য-বিশেষণের শেষ বর্ণে কোনো স্বরচিহ্ন থাকে না , যদি না তা উহ্য ক্রিয়াপদ বিশিষ্ট বাক্য বলে পরিগণিত হয়। কেবল বাক্যমধ্যে শব্দটির ভূমিকার ভিত্তিতেই স্বরচিহ্ন নির্ধারিত হয়। এছাড়া আরবী ভাষায় বাক্যশেষের স্বরচিহ্ন উচ্চারিত হয় না। কিন্তু বাংলাভাষীদের অনেকেই বাক্যবহির্ভূত আরবী বিশেষ্য-বিশেষণের এবং বাক্যশেষের স্বরচিহ্ন উচ্চারণ করে থাকে। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে শেষের স্বরচিহ্ন ছাড়া বাংলা ভাষায় আরবী শব্দের মৌখিক উচ্চারণে শব্দটির প্রকৃত লিখিত রূপ বুঝতে সমস্যা হতে পারে। তাই নীচের উদাহরণগুলোতে কেবল এ ধরনের কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত উচ্চারণ নির্দেশের ক্ষেত্রে আরবী নিয়ম অনুসরণে বাক্যবহির্ভূত বিশেষ্য-বিশেষণের এবং বাক্যশেষের স্বরচিহ্ন উচ্চারণ নির্দেশ করা হয় নি।]

العَرَب (আল্- আরাব্)- আরব , আরব উপদ্বীপের বাশিন্দা।

العَرَبِیّ (আল্- আরাবী)- খাঁটি আরব (পুং)।

العَرَبِيّة (আল্- আরাবীয়্যাহ্)- খাঁটি আরব (স্ত্রী)।

اللُّغَةُ العَرَبِيَّة (আল্-লুগ্বাতুল্ আরাবীয়্যাহ্) - খাঁটি আরব (অর্থাৎ খাঁটি আরবদের) ভাষা।

তারা কেন নিজেদেরকে আরব বলে ?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে , খাঁটি আরবদের ভাষা কেন বলা হলো ? এটা জানতে হলে আরবরা নিজেদেরকে কেন আল্- আরাব্ বা আল্- আরাবী বলে তা জানতে হবে এবং তা জানতে হলে অভিনعرب শব্দমূল থেকে নিষ্পন্ন শব্দাবলীর ব্যবহারিক তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

এখানে অভিধান থেকে এ শব্দমূল (عرب ) হতে নিষ্পন্ন শব্দাবলীর মধ্য থেকে কয়েকটির ব্যবহারিক উদাহরণ দেয়া যাক :

عَرَبَ ( আরাবা)- সে প্রাঞ্জল ভাষায় (অর্থাৎ আরবী ভাষায়) কথা বললো ; সে খাঁটি ও প্রাঞ্জল ভাষী (অর্থাৎ আরবী ভাষী) ছিলো।

عَرِبَ الرَّجُلُ ( আরিবার্ রাজুল্) - লোকটির যবান খুলে গেলো (সে কথা বলতে পারছিলো না ; এখন কথা বলতে পারছে) ; লোকটির তোৎলামি দূর হয়ে গেলো ; লোকটির বোবা অবস্থা দূর হয়ে গেলো।

عَرَّبَ المَنطِقَ ( আররাবাল্ মানত্বিক্ব) - সে তার কথাকে প্রাঞ্জল করলো।

عَرَّبَ عَنهُ لِسَانُهُ ( আররাবা আনহু লিসানুহ্) - ঐ ব্যাপারে তার ভাষা সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জল হলো (সে প্রাঞ্জলভাষী না হলেও ঐ বিষয়ে প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলতে সক্ষম হলো)।

عَرَّبَ عَن صَاحِبِهِ ( আররাবা আন্ ছ্বাহিবিহ্) - সে তার বন্ধুর পক্ষ সমর্থন করে কথা বললো ; সে তার বন্ধুর পরিবর্তে তার পক্ষ থেকে কথা বললো ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করলো।

عَرَّبَ بِحُجَّتِهِ ( আররাবা বিহুজ্জাতিহ্) - সে তার যুক্তিপ্রমাণকে খুব ভালোভাবে বর্ণনা করলো।

عَرَّبَ الاِسمَ الاَعجَمِيَّ ( আররাবাল্ ইসমাল্ আ জামিয়্যা) - সে অনারব নামটিকে মু আরাব্ করলো (অর্থাৎ উচ্চারণ সংক্রান্ত ভুলভ্রান্তি দূরীকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি বর্ণে প্রয়োজনীয় যের-যবর-পেশ বসালো - যা আরবরা একান্ত ব্যতিক্রম ছাড়া আরবী লেখায় বা আরবী শব্দের ক্ষেত্রে করে না)।

أَعرَبَ الشَّیءَ (আ রাবাশ্ শাইআ) - সে বিষয়টি বর্ণনা করলো ; সে বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরলো।

أَعرَبَ کَلامَهُ (আ রাবা কালামাহ্) - সে তার বক্তব্যকে খুব ভালোভাবে ও প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করলো।

أَعرَبَ الرَّجُلُ (আ রাবার রাজুল্) - লোকটি প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বললো।

العَرَبُ مِنَ الماءِ (আল্- আরাবু মিনাল্ মাই) অথবাالعَرِبَ مِنَ الماءِ (আল্- আরিবা মিনাল্ মাই) - অনেক বেশী পরিমাণে ও সুপেয় পানি।

رَجُلٌ عَرِبٌ (রাজুলুন্ আরিব্)- (যে কোনো) প্রাঞ্জলভাষী লোক।

بِئرٌ عَرِبَةٌ (বি রুন্ আরিবাহ্)- পানিতে পরিপূর্ণ কূপ।

العَربَانُ (আল্- আরবান্)- বাক্যবাগীশ ও প্রাঞ্জলভাষী ব্যক্তি।

উপরোক্ত উদাহরণসমূহের কোনোটি থেকেইعرب শব্দমূল থেকে নিষ্পন্ন শব্দে আরব উপদ্বীপের অধিবাসী অর্থ গ্রহণ করার সুযোগ নেই। এ ধরনের আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

এ থেকে সুস্পষ্ট যে , অনারবরা আরবী ভাষা বলতে যা মনে করে খোদ আরবী ভাষায় এ শব্দটি সে তাৎপর্য বহন করে না। বরং তারা আরবী ভাষা বলতে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব প্রকাশের ক্ষমতা সম্পন্ন উচ্চাঙ্গের প্রাঞ্জল ভাষা বুঝাতো - যা ছিলো তাদের নিজেদেরই ভাষা। দুর্বল ও নিম্ন মানের ভাষা সমূহের মোকাবিলায় তারা তাদের ভাষার জন্য এ বিশেষণ ব্যবহার করতো।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , আরবী ভাষা হচ্ছে সেমিটিক ভাষাগোষ্ঠীরই অন্যতম ভাষা। আরবী , কেন্ আানী , হিবরূ , ফিনীক্বী , আরামী ও ইথিওপীয় ভাষা এ সেমিটিক ভাষাগোষ্ঠীরই বিভিন্ন শাখা। প্রথমে এ সব ভাষার মধ্যে ব্যবধান ছিলো খুব কম। এ সব ভাষার অবস্থা ছিলো অনেকটা একই ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও উপভাষার সাথে তুলনীয়। কিন্তু এগুলোর মধ্য থেকে একটি আঞ্চলিক ভাষা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চরমোৎকর্ষের দিকে এগিয়ে যায় যা শুধু উন্নততম সাহিত্যই সৃষ্টি করে নি , বরং তার কথোপকথনের ভাষাও তার সাহিত্যের ভাষার সমমানসম্পন্ন হয়ে দাঁড়ায়। এটি হচ্ছে তৎকালীন পূর্ব আরবের ভাষা। ফলে সেমিটিক ভাষাগোষ্ঠীর পিছিয়েপড়া শাখাগুলোর মোকাবিলায় এ শাখাটির জন্য اللغة العربية ( প্রাঞ্জল ভাষা ) বিশেষণটি ব্যবহৃত হতে থাকে এবং কালে এ গুণবাচক নামটি , মূলতঃ অনারবদের দ্বারা , প্রকৃত নামে ( Proper Noun)পরিণত হয়ে যায়।

এই একই অর্থের সমর্থন পাওয়া যায় এর বিপরীত তাৎপর্য বাচক আল্-আ জাম (الاَعجَم ) শব্দের ব্যবহারিক তাৎপর্য থেকেও। জাম মানে হচ্ছে বোবা বা তোৎলা বা দুর্বোধ্যভাষী বা অস্পষ্টভাষী । তাই যখন কোনো আরবীভাষী লোকও অস্পষ্ট বা দুর্বোধ্য ভাষায় বই বা চিঠি লেখে - যাতে যা বুঝাতে চায় তা ঠিক মতো বুঝাতে ও সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করতে পারে না তখন বলা হয় :

اَعجَمَ الکِتابَ (আ জামাল্ কিতাব্) অথবাعَجَّمَ الکِتابَ ( আজ্জামাল্ কিতাব্) - সে তার বই বা পত্রকে দুর্বোধ্য করে ফেলেছে।

তেমনিالاَعجَم (আল্-আ জাম্) বলতে যেমন অ-আরবীভাষী বুঝায় , তেমনি মাতৃভাষা আরবী হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি উচ্চাঙ্গ প্রাঞ্জলভাষিতার অধিকারী নয় তাকেও বুঝানো হয়। একই অর্থে শব্দটির স্ত্রীবাচকالعَجماء (আল্- আজমা ) ব্যবহৃত হয়। তেমনি চতুষ্পদ ও প্রাণী অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয় , বাংলা ভাষায় যেভাবে বোবা প্রাণী শব্দটি ব্যবহৃত হয় ঠিক সে অর্থে। এর কারণ হচ্ছে এই যে , এ সব প্রাণীর নিজস্ব ভাবপ্রকাশক ভাষা থাকা সত্ত্বেও তারা মানুষের মতো সুস্পষ্টভাবে ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তাৎপর্য সহকারে সুন্দর ভাষায় ভাব প্রকাশ করতে পারে না। তেমনি তোৎলা বুঝাতেও উপরোক্ত শব্দ দু টি (যথাক্রমে পুরুষ ও নারীর জন্য) ব্যবহৃত হয় , তা হোক না কেন তারা আরব পরিবারের সন্তান।

তেমনি লোকেরা তাদের কথায় স্বীয় উদ্দেশ্য চেপে গেলে বা গোপন করলে বলা হয়تَعاجَمَ القَومُ (তা আাজামাল্ ক্বাওম্) - লোকগুলো বোবা হওয়ার ভান করলো অর্থাৎ আসল কথা গোপন করলো।

অনুরূপভাবেتَعاجَمَ الرَّجُلُ (তা আাজামার্ রাজুল) - লোকটি তোৎলা হবার ভান করলো।

اِنعَجَمَ عَلَيهِ القَولُ (ইন্ আজামা আলাইহিল্ ক্বাওল্) - তার নিকট কথাটি দুর্বোধ্য প্রতিভাত হলো ; কথাটি তার বোধগম্য হলো না।

اِستَعجَمَ (ইস্তা জামা ) - সে কথা বলতে পারলো না ; তার কথা আটকে গেলো।

এ ব্যাপারে আরো অনেক উদাহরণ দেয়া চলে।

শুধু সেমেটিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্যান্য ভাষা নয় , বরং যেহেতু অনারব ভাষাসমূহের মধ্য থেকে কোনো ভাষাই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব প্রকাশ ও উচ্চাঙ্গ প্রাঞ্জলভাষিতার বিচারে আরবী ভাষার ধারেকাছেও পৌঁছতে সক্ষম নয় , সেহেতু আরবরা অনারবদেরকে ও তাদের ভাষা সমূহকে ঢালাওভাবে জামী বলে অভিহিত করতো।

এ থেকে সুস্পষ্ট যে , কোরআন মজীদ যে আরবী ভাষায় নাযিল্ হয়েছে কোরআনে বার বার সে কথা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটাই বুঝানো যে , এ কিতাব্ অত্যন্ত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব প্রকাশক উচ্চাঙ্গ প্রাঞ্জল ভাষায় নাযিল্ হয়েছে - যা হযরত মুহাম্মাদ ( ছ্বাঃ )- এর মতো একজন লেখাপড়া নাজানা মানুষের পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয় , বরং এর রচনাশৈলী এতোই উচ্চাঙ্গের যে , সেদিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় যে , তা কোনো মানুষের পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয়। কারণ , এ প্রাঞ্জল ভাষায় ( আরবী ভাষায় ) প্রকাশসম্ভাবনা এমনই প্রায় সীমাহীন যে , একজন মানুষ যতো বড় প্রতিভার অধিকারীই হোক না কেন এবং যতো উঁচু মাত্রার প্রাঞ্জলভাষীই হোক না কেন , তার প্রতিটি বক্তব্যের প্রতিটি দিকেই প্রকাশসম্ভাবনার উচ্চতম বহিঃপ্রকাশ ঘটবে এবং অন্য কারো পক্ষে তা সংশোধন ( editing)করে অধিকতর উন্নত করা বিন্দুমাত্রও সম্ভব হবে না - নিজের লেখা বা কথা সম্বন্ধে এ নিশ্চয়তা দেয়া কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। এটা কেবল সকল ভাষার মূল উৎস স্বয়ং আল্লাহ্ তা আলার পক্ষেই সম্ভব। এ কারণেই কোরআন মজীদ এ ব্যাপারেই চ্যালেঞ্জ দিয়েছে এবং কোরআন - বিরোধী সকলেই এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় পরাস্ত হয়েছে।

হীরা ও গাসসান রাজ্যসমূহ

আরব উপদ্বীপের যে সব অঞ্চলের জলবায়ু ও আবহাওয়া ভালো ছিল সে সব অঞ্চল ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে সর্বশেষ শতাব্দীতে পুরোপুরি তিন বৃহৎ শক্তি অর্থাৎ ইরান,রোম ও আবিসিনিয়ার অধীন ছিল। আরব উপদ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ইরানের প্রভাবাধীন,উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল রোমের অনুগত এবং মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল হাবাশাহ্ অর্থাৎ আবিসিনিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। এ সব সভ্য রাষ্ট্রের পাশে থাকার কারণে এবং ঐ সব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বদা দ্বন্দ্ব থাকার কারণে আরব উপদ্বীপের সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহে অর্ধ-স্বাধীন ও অর্ধ-সভ্য বেশ কিছু রাজ্যের পত্তন হয়েছিল যেগুলোর প্রতিটিই ছিল নিজ নিজ প্রতিবেশী সভ্য বৃহৎ সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের অনুগত। হীরা,গাসসান ও কিন্দাহ্ ছিল ঐ ধরনের রাজ্য যেগুলোর প্রতিটি ছিল পারস্য,রোম ও আবিসিনীয় সাম্রাজ্যের যে কোন একটির প্রভাবাধীন।50

ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণাদি অনুযায়ী খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমাংশে আশকানীয় যুগের শেষের দিকে কতিপয় আরব গোত্র ফোরাত নদীর পাড়ে অবস্থিত এলাকায় বসতি স্থাপন করে এবং ইরাকের একটি অংশকে নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে আসে। তারা ধীরে ধীরে এ সব বসতি স্থাপনকারী আরব গ্রাম,দুর্গ,শহর ও নগর প্রতিষ্ঠা করে যেগুলোর মধ্যে হীরা’নগরটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ নগরীটি বর্তমান কুফা নগরীর নিকটেই অবস্থিত ছিল।

এ শহরটি ছিল দুর্গ-নগরী। আর এ বিষয়টি এ শহরের নামকরণ থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে যায়।51 এ নগরীতে আরবগণ বসবাস করত। তবে ধীরে ধীরে তা শহরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ফোরাত অঞ্চলের ভালো জলবায়ু এবং প্রচুর নদ-নদীর অস্তিত্ব ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকূল হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চল আবাদ হয়েছিল। ঐ অঞ্চলের অধিবাসিগণ মরুবাসী আরব সর্দারদেরকে কৃষ্টি ও সভ্যতার আহবান জানাতে সক্ষম হয়েছিল। হীরা অঞ্চলের অধিবাসিগণ পারস্যের প্রতিবেশী হওয়ার কারণে পারস্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা উপকৃত হয়েছিল। খওরানাক প্রাসাদের ন্যায় হীরার সন্নিকটে বেশ কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিল যা উক্ত নগরীকে এক বিশেষ সৌন্দর্য দান করেছিল। এ অঞ্চলের আরবগণ লিপি ও লিখনপ্রণালীর সাথে পরিচিত হয়েছিল এবং সম্ভবত সেখান থেকেই লিপি ও লিখনপ্রণালী আরব উপদ্বীপের অন্যান্য স্থানে প্রচলিত হয়েছিল।52

হীরার শাসনকর্তা ও আমীরগণ বনি লাখম গোত্রের আরব ছিলেন এবং পারস্যের সাসানীয় সম্রাটগণ তাঁদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। হীরার আমীরদের সাসানীয় সম্রাটগণ এ কারণে সমর্থন করতেন যাতে করে তাঁরা তাঁদের (হীরার আমীরগণ) ইরান ও আরব বেদুইনদের মাঝে অন্তরায় হিসাবে গড়ে তুলতে এবং তাঁদের সহায়তায় পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহে লুণ্ঠনকারী আরব বেদুইন ও যাযাবরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন। (হীরার) এ সব আমীরের নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। হামযাহ্ ইসফাহানী এ সব আমীরের নাম ও আয়ুষ্কাল এবং যে সব সাসানীয় সম্রাট তাঁদের সমসাময়িক ছিলেন তাঁদের একটি তালিকা প্রদান করেছেন।53

যা হোক বনি লাখম বংশের রাজ্য ছিল হীরা অঞ্চলের বৃহত্তম আরবীয় রাজ্য যা ছিল অর্ধসভ্য। এ বংশের সর্বশেষ বাদশাহ্ ছিলেন নূমান বিন মুনযির যিনি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ কর্তৃক অপসারিত ও নিহত হয়েছিলেন। তাঁর অপসারণ ও হত্যার কাহিনী ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।54

পঞ্চম শতাব্দীর শেষে অথবা ষষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে একদল বহিরাগত আরব আরব উপদ্বীপের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে যা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী। এ দেশটি রোমান সাম্রাজ্যের ছত্রছায়ায় ছিল এবং ঠিক যেমনি হীরার শাসকবর্গ পারস্য সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল ঠিক তেমনি গাসসানীয় রাজ্যের শাসকবর্গও বাইজান্টাইনীয় সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল।

গাসসান দেশটি কিছুটা সভ্য ছিল। যেহেতু দেশটির সরকারের কেন্দ্র একদিকে দামেস্কের কাছাকাছি,অন্যদিকে বসরার নিকটবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সেহেতু এ দেশটি রোমান প্রভাবাধীন আরব অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। আর অত্র এলাকাতে রোমান সভ্যতা ও সংস্কৃতি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।

গাসসানিগণ হীরার লাখম গোত্রভুক্ত শাসকবর্গ এবং ইরানীদের সাথে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব থাকার কারণে রোমান সাম্রাজ্যের মিত্র হয়েছিল। প্রায় 9 অথবা 10 গাসসানী আমীর একের পর এক এ দেশটিতে শাসনকার্য পরিচালনা করেছে।

হিজাযে প্রচলিত ধর্ম

হিজাযে যে ধর্ম প্রচলিত ছিল তা ছিল পৌত্তলিক ধর্ম। কেবল ইয়াসরিব (মদীনা) ও খাইবারে ইয়াহুদী সংখ্যালঘুরা বসবাস করত। ইয়েমেন ও হিজাযের সীমান্তবর্তী শহর নজরানের অধিবাসীরা যেমনি খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ছিল,ঠিক তদ্রূপ আরব উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন এলাকা হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চলেও খ্রিষ্টধর্ম প্রচলিত ছিল। যদি এ তিন সংবেদনশীল এলাকা বাদ দেই তাহলে হিজাযের অন্য সব এলাকায় মূলত বিভিন্ন আকার-অবয়বে মূর্তিপূজা এবং বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।

তবে হানীফ’(حنيف ) নামে পরিচিত অতি মুষ্টিমেয় ব্যক্তি তাওহীদী মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যারা নিজেদের হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর ধর্মের অনুসারী বলে জানত। তাদের সংখ্যা আসলেই খুব কম ছিল। তদানীন্তন পৌত্তলিক আরব জনসংখ্যার তুলনায় তাদের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল।55

হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সময় থেকে ধর্মীয় ও চারিত্রিক আচার-প্রথা ও বিধিসমন্বিত একত্ববাদী ধর্ম হিজাযে প্রবর্তিত ও প্রচলিত হয়েছিল। পবিত্র কাবার সম্মানার্থে হজ্বব্রত পালন ছিল ঐ সব প্রথারই অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীকালে আমর বিন কুসাই নামের খুযাআ গোত্রের এক ব্যক্তি-যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব ছিল তার মাধ্যমে পবিত্র মক্কা নগরীতে মূর্তিপূজার প্রচলন হয়। এ ব্যক্তি শাম (সিরিয়া) ভ্রমণ করার সময় দেখতে পেয়েছিল যে,আমালাকা সম্প্রদায় সুন্দর সুন্দর প্রতিমার পূজা করে। তাদের এ কাজ তার মনঃপূত হয় এবং সে হুবাল’নামের একটি সুন্দর প্রতিমা শাম থেকে মক্কায় আনয়ন করে এবং জনগণকে তা পূজা করার ব্যাপারে আহবান জানায়।56

প্রসিদ্ধ প্রতিমাসমূহ : 1. হুবাল 2. আসাফ 3. নায়েলাহ্ 4. লাত 5. উয্যা 6. মানাত 7. আমইয়ানুস 8. সা দ 9. যূল খালসাহ্ 10. মান্নাফ।

এগুলোই ছিল আরবদের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রতিমা। এ সব প্রতিমা ছাড়াও আরবদের অন্যান্য প্রতিমার উপাসনাও প্রচলিত ছিল। কখনো কখনো কোন গোত্র,এমনকি কোন কোন বংশের নিজস্ব প্রতিমা ও মূর্তি ছিল যাকে তারা পূজা করত।

হিজাযে জ্ঞান ও শিক্ষা

হিজাযের জনগণ ও অধিবাসীদের উম্মী’বলা হতো। উম্মী’শব্দের অর্থ অশিক্ষিত। অর্থাৎ ঐ ব্যক্তিকে উম্মী বলা হয় যে মায়ের পেট থেকে যে অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিল ঠিক সে অবস্থায়ই রয়েছে। (জাহেলিয়াতের যুগে) আরবদের মধ্যে জ্ঞান ও শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে,ইসলামের শুভ অভ্যুদয়ের লগ্নে কুরাইশ গোত্রে কেবল 17 ব্যক্তি লেখাপড়া জানত। আর মদীনায় আওস’ও খাযরাজ’গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কেবল 11 জন লেখাপড়া জানত।57

আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত এ আলোচনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে মতাদর্শ,চিন্তা-চেতনা,বিশ্বাস,অর্থনীতি,চরিত্র,আচার-ব্যবহার এবং কৃষ্টি-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলাম ধর্মের শিক্ষা-দীক্ষার মাহাত্ম্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় এবং সব সময় সভ্যতাসমূহের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের ঐ সব সভ্যতার পূর্ববর্তী অধ্যায় অধ্যয়ন করতেই হবে। অধ্যয়নের পরই কেবল উক্ত সভ্যতার মহত্ত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন করা উচিত।58

তৃতীয় অধ্যায় : দুই পরাশক্তি ইরান ও রোমের অবস্থা

ইসলাম ধর্মের পবিত্র আন্দোলনের প্রকৃত তাৎপর্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্য দু টি পরিবেশের সমুদয় অবস্থা অধ্যয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :

1. পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার পরিবেশ অর্থাৎ যে পরিস্থিতি ও পরিবেশের মধ্যে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ও এর বিকাশ ঘটেছিল।

2. ঐ সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য অঞ্চলসমূহে যে সব জাতি বসবাস করত তাদের চিন্তাধারা,চরিত্র,আচার,রীতি-নীতি,প্রথা ও সভ্যতা অধ্যয়ন।

ইতিহাস থেকে ঐ সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত যে অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা জানতে পারি তা হলো রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা ও পরিবেশ। আলোচনা পূর্ণ করার জন্য আমাদের অবশ্যই উক্ত দু দেশের অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলোচনা ও অধ্যয়ন করতে হবে। যার ফলে ইসলাম ধর্ম যে সুমহান সভ্যতা মানব জাতিকে উপহার দিয়েছে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যাবে।

তখনকার রোমান সাম্রাজ্যের অবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্যের অবস্থা অপেক্ষা কোন অংশে কম ছিল না। গৃহযুদ্ধ এবং আর্মেনিয়া ও অন্যান্য এলাকাকে কেন্দ্র করে ইরানের সাথে সংঘটিত যুদ্ধসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের জনগণকে এক নতুন বিপ্লব বরণ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল। ধর্মীয় মতপার্থক্যসমূহ অন্য সব কিছুর চেয়ে বেশি এ সব বিরোধ ও পার্থক্যকে বিস্তৃত করেছিল। মূর্তিপূজক ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে যুদ্ধের বহ্নিশিখা নির্বাপিত হতো না। যখন গির্জার পুরোহিতগণ শাসনকর্তৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁরা তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধীদের কঠিন চাপের মধ্যে রেখেছিলেন যা একটি অসন্তুষ্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটিয়েছিল। যে বিষয়কে রোমান সাম্রাজ্যের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অন্যতম বড় কারণ বলে গণ্য করা হয়েছে তা ছিল গির্জার পুরোহিতদের সহিংসতার কারণে উক্ত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বঞ্চনা ও নাগরিক অধিকারহীনতা। একদিকে পুরোহিত ও ধর্মযাজকদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের পথ ও মত দিন দিন রোমান সাম্রাজ্যের শক্তি,ক্ষমতা ও আধিপত্য নিঃশেষ করে দিচ্ছিল।

এ সব ছাড়াও উত্তর-পূর্ব দিকের শ্বেতাঙ্গ ও পীতবর্ণের লোকেরা সর্বদা ইউরোপ মহাদেশের উর্বর অঞ্চলসমূহ নিজেদের করায়ত্তে আনার ইচ্ছা পোষণ করত এবং কখনো কখনো সামরিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধসমূহে একে অপরের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি সাধন করত। এর ফলে রোমান সাম্রাজ্য দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিকগণ বিশ্বাস করেন যে,ষষ্ঠ শতাব্দীতে রোমের রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি পারস্য সাম্রাজ্যের ওপর রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি উক্ত সাম্রাজ্যের সামরিক পরাশক্তি হওয়ার প্রমাণ বলে গণ্য করা হতো না,বরং বিশ্বাস করা হতো যে,ইরানের পরাজয় আসলে সে দেশটির প্রশাসনের বিশৃঙ্খলারই ফসল ছিল। এ দু টি দেশ যা নিজেদের ওপর বিশ্ব রাজনীতি ও নেতৃত্বের মুকুট পরিধান করেছিল তা ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব কালে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছিল। এটি স্পষ্ট যে,এ ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি একটি সঠিক ধর্ম গ্রহণ করার জন্য অসাধারণ প্রস্তুতি ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছিল যা মানব জাতির জীবনের সার্বিক অবস্থা উন্নয়নে সক্ষম।

রোমের খণ্ডকালীন আলোচনাসভাসমূহ

কিছু কিছু দেশে একদল বেকার ও প্রবৃত্তিপূজারী ব্যক্তি নিজেদের অসদুদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কতগুলো অন্তঃসারশূন্য বিষয় জনসমক্ষে উত্থাপন ও প্রচার করত এবং এভাবে তারা জনগণের মূল্যবান জীবন নষ্ট করত। প্রাচ্যের অনেক দেশেই আমাদের এ বক্তব্যের পক্ষে প্রচুর দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান যা বর্তমানে আলোচনা করার কোন অবকাশ নেই। ঘটনাচক্রে তখনকার রোম অন্য সব দেশের চেয়ে বেশি এ ধরনের সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছিল। যেমন রোমান সম্রাট ও রাজনীতিকগণ কিছু কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুসারী হওয়ার কারণে বিশ্বাস করতেন যে,হযরত ঈসা মসীহ্ (আ.) দু ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। কিন্তু কিছু সংখ্যক ইয়াকুবী সম্প্রদায়ভুক্ত খ্রিষ্টান বিশ্বাস করত যে,হযরত ঈসা (আ.) কেবল এক ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। আর ভিত্তিহীন এ বিষয়টিই রোমান সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব,ঐক্য ও সংহতির ওপর তীব্র আঘাত হানে এবং তাদের মধ্যে এক গভীর ফাটলের উদ্ভব ঘটায় যার ফলে সরকার ও প্রশাসন নিজ আকীদা-বিশ্বাস সংরক্ষণ করতে বাধ্য হয়। আর এ কারণেই প্রশাসন বিরোধীদেরকে অতি নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়। উৎপীড়ন ও চাপের কারণে বেশ কিছুসংখ্যক বিরোধী ইরান সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এ সব বিরোধীই মুসলিম সেনাবাহিনীর সম্মুখে রণক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং মনে-প্রাণে মুসলিম সেনাবাহিনীকে বরণ করে নিয়েছিল।

তদানীন্তন রোমান সাম্রাজ্য ঠিক মধ্যযুগীয় ইউরোপের মতো ছিল। প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ফ্লামারীয়োন মধ্যযুগে ইউরোপীয় কৃষ্টির পর্যায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত কাহিনীটি বর্ণনা করেছেন : আধ্যাত্মিক সমগ্র’নামক গ্রন্থটি মধ্যযুগে স্কলাসটিক দর্শনের পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ও নিদর্শন বলে গণ্য হতো। এ গ্রন্থটি চারশ’বছর ধরে আনুষ্ঠানিক পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ইউরোপে পঠিত হতো। উক্ত গ্রন্থের একটি অংশে এ শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে : একটি সুঁইয়ের অগ্রভাগের সরু ছিদ্রের মধ্যে কত জন ফেরেশতার অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব?’‘ চিরন্তন পিতার বাম চোখের পুতুলী থেকে তাঁর ডান চোখের পুতুলী পর্যন্ত দূরত্ব কত ফারসাখ? (1 ফারসাখ = প্রায় 6 কিলোমিটার)

দুর্ভাগ্যপীড়িত রোমান সাম্রাজ্য বহিঃশক্তিগুলোর সাথে যুদ্ধে-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়ার একই সময় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিল। এ সব দ্বন্দ্ব-সংঘাত ধর্মীয় রূপ পরিগ্রহ করেছিল। আর এর ফলে দিন দিন দেশটি পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। ইয়াহুদিগণ যারা ছিল একটি ষড়যন্ত্রকারী জাতি,তারা যখন দেখল,রোমের খ্রিষ্টান সম্রাট কর্তৃক আরোপিত চাপ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে তখন তারা রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস ও এর মূলোৎপাটন করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা একবার আনতাকীয়া নগরীও দখল করে নিয়েছিল এবং নগরীর প্রধান ধর্মযাজকের কান,নাক ও ঠোঁট কর্তন করেছিল। রোম সরকার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আনতাকীয়ার ইয়াহুদীদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। রোমে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কয়েকবার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। আবার কখনো কখনো এ শত্রুতা দেশের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিল। উদাহরণস্বরূপ ইয়াহুদীরা একবার ইরান থেকে 80,000 খ্রিষ্টানকে ক্রয় করে দুম্বার মতো জবাই করেছিল।

এখানেই সম্মানিত পাঠকবর্গ ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক বিশ্বের অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অরাজক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে এবং স্বীকার করতে পারবেন যে,ইসলামের মুক্তিদানকারী শিক্ষা-দীক্ষা ও বিধি-বিধান ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে সৃষ্ট হয় নি এবং তা মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তাধারারও ফসল নয়। ঐক্য ও সহমর্মিতার মৃদুমন্দ এ সমীরণ এবং শান্তি ও মৈত্রীর সুর যা পবিত্র ইসলাম ধর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা আসলে ঐশ্বরিক উৎস থেকেই উৎসারিত হয়েছে। কিভাবে বলা সম্ভব যে,যে ইসলাম ধর্ম জীবজন্তু ও প্রাণীকুলকে পর্যন্ত জীবনধারণ করার অধিকার দিয়েছে আসলে তা এ ধরনের রক্তপিপাসু পরিবেশ থেকে উদ্ভূত?

ইসলাম ধর্ম হযরত ঈসা (আ.)-এর ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে ভিত্তিহীন এ সব আলোচনার অবসান ঘটিয়েছে এবং ঈসা (আ.)-কে ঠিক এভাবে পরিচিত করিয়েছে :

) ما المسيح بن مريم إلّا رسول قد خلت من قبله الرّسل و أمّه صدّيقة كانا يأكلان الطّعام(

“মরিয়ম তনয় মসীহ্ একজন নবীর চেয়ে বেশি কিছু নন যাঁর আগে অনেক নবী-রাসূল গত হয়েছেন। তাঁর মাতা ছিলেন একজন পূতঃপবিত্রা পরম সত্যবাদিনী। এমতাবস্থায় তাঁরা উভয়ই খাদ্য গ্রহণ করতেন এবং মানুষ ছিলেন।” (সূরা মায়েদাহ্ : 75)

পবিত্র কোরআনের এ আয়াত হযরত ঈসা (আ.)-এর আত্মা,রক্ত ও পরিচিতি সংক্রান্ত গীর্জার ধর্মযাজকদের অনর্থক আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে। এ ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ এবং মহৎ মানবীয় গুণাবলী পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে মানব জাতিকে অযথা যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত থেকে বিরত রেখেছে।

হীরা ও গাসসান রাজ্যসমূহ

আরব উপদ্বীপের যে সব অঞ্চলের জলবায়ু ও আবহাওয়া ভালো ছিল সে সব অঞ্চল ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে সর্বশেষ শতাব্দীতে পুরোপুরি তিন বৃহৎ শক্তি অর্থাৎ ইরান,রোম ও আবিসিনিয়ার অধীন ছিল। আরব উপদ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ইরানের প্রভাবাধীন,উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল রোমের অনুগত এবং মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল হাবাশাহ্ অর্থাৎ আবিসিনিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। এ সব সভ্য রাষ্ট্রের পাশে থাকার কারণে এবং ঐ সব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বদা দ্বন্দ্ব থাকার কারণে আরব উপদ্বীপের সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহে অর্ধ-স্বাধীন ও অর্ধ-সভ্য বেশ কিছু রাজ্যের পত্তন হয়েছিল যেগুলোর প্রতিটিই ছিল নিজ নিজ প্রতিবেশী সভ্য বৃহৎ সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের অনুগত। হীরা,গাসসান ও কিন্দাহ্ ছিল ঐ ধরনের রাজ্য যেগুলোর প্রতিটি ছিল পারস্য,রোম ও আবিসিনীয় সাম্রাজ্যের যে কোন একটির প্রভাবাধীন।50

ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণাদি অনুযায়ী খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমাংশে আশকানীয় যুগের শেষের দিকে কতিপয় আরব গোত্র ফোরাত নদীর পাড়ে অবস্থিত এলাকায় বসতি স্থাপন করে এবং ইরাকের একটি অংশকে নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে আসে। তারা ধীরে ধীরে এ সব বসতি স্থাপনকারী আরব গ্রাম,দুর্গ,শহর ও নগর প্রতিষ্ঠা করে যেগুলোর মধ্যে হীরা’নগরটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ নগরীটি বর্তমান কুফা নগরীর নিকটেই অবস্থিত ছিল।

এ শহরটি ছিল দুর্গ-নগরী। আর এ বিষয়টি এ শহরের নামকরণ থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে যায়।51 এ নগরীতে আরবগণ বসবাস করত। তবে ধীরে ধীরে তা শহরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ফোরাত অঞ্চলের ভালো জলবায়ু এবং প্রচুর নদ-নদীর অস্তিত্ব ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকূল হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চল আবাদ হয়েছিল। ঐ অঞ্চলের অধিবাসিগণ মরুবাসী আরব সর্দারদেরকে কৃষ্টি ও সভ্যতার আহবান জানাতে সক্ষম হয়েছিল। হীরা অঞ্চলের অধিবাসিগণ পারস্যের প্রতিবেশী হওয়ার কারণে পারস্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা উপকৃত হয়েছিল। খওরানাক প্রাসাদের ন্যায় হীরার সন্নিকটে বেশ কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিল যা উক্ত নগরীকে এক বিশেষ সৌন্দর্য দান করেছিল। এ অঞ্চলের আরবগণ লিপি ও লিখনপ্রণালীর সাথে পরিচিত হয়েছিল এবং সম্ভবত সেখান থেকেই লিপি ও লিখনপ্রণালী আরব উপদ্বীপের অন্যান্য স্থানে প্রচলিত হয়েছিল।52

হীরার শাসনকর্তা ও আমীরগণ বনি লাখম গোত্রের আরব ছিলেন এবং পারস্যের সাসানীয় সম্রাটগণ তাঁদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। হীরার আমীরদের সাসানীয় সম্রাটগণ এ কারণে সমর্থন করতেন যাতে করে তাঁরা তাঁদের (হীরার আমীরগণ) ইরান ও আরব বেদুইনদের মাঝে অন্তরায় হিসাবে গড়ে তুলতে এবং তাঁদের সহায়তায় পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহে লুণ্ঠনকারী আরব বেদুইন ও যাযাবরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন। (হীরার) এ সব আমীরের নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। হামযাহ্ ইসফাহানী এ সব আমীরের নাম ও আয়ুষ্কাল এবং যে সব সাসানীয় সম্রাট তাঁদের সমসাময়িক ছিলেন তাঁদের একটি তালিকা প্রদান করেছেন।53

যা হোক বনি লাখম বংশের রাজ্য ছিল হীরা অঞ্চলের বৃহত্তম আরবীয় রাজ্য যা ছিল অর্ধসভ্য। এ বংশের সর্বশেষ বাদশাহ্ ছিলেন নূমান বিন মুনযির যিনি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ কর্তৃক অপসারিত ও নিহত হয়েছিলেন। তাঁর অপসারণ ও হত্যার কাহিনী ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।54

পঞ্চম শতাব্দীর শেষে অথবা ষষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে একদল বহিরাগত আরব আরব উপদ্বীপের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে যা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী। এ দেশটি রোমান সাম্রাজ্যের ছত্রছায়ায় ছিল এবং ঠিক যেমনি হীরার শাসকবর্গ পারস্য সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল ঠিক তেমনি গাসসানীয় রাজ্যের শাসকবর্গও বাইজান্টাইনীয় সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল।

গাসসান দেশটি কিছুটা সভ্য ছিল। যেহেতু দেশটির সরকারের কেন্দ্র একদিকে দামেস্কের কাছাকাছি,অন্যদিকে বসরার নিকটবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সেহেতু এ দেশটি রোমান প্রভাবাধীন আরব অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। আর অত্র এলাকাতে রোমান সভ্যতা ও সংস্কৃতি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।

গাসসানিগণ হীরার লাখম গোত্রভুক্ত শাসকবর্গ এবং ইরানীদের সাথে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব থাকার কারণে রোমান সাম্রাজ্যের মিত্র হয়েছিল। প্রায় 9 অথবা 10 গাসসানী আমীর একের পর এক এ দেশটিতে শাসনকার্য পরিচালনা করেছে।

হিজাযে প্রচলিত ধর্ম

হিজাযে যে ধর্ম প্রচলিত ছিল তা ছিল পৌত্তলিক ধর্ম। কেবল ইয়াসরিব (মদীনা) ও খাইবারে ইয়াহুদী সংখ্যালঘুরা বসবাস করত। ইয়েমেন ও হিজাযের সীমান্তবর্তী শহর নজরানের অধিবাসীরা যেমনি খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ছিল,ঠিক তদ্রূপ আরব উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন এলাকা হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চলেও খ্রিষ্টধর্ম প্রচলিত ছিল। যদি এ তিন সংবেদনশীল এলাকা বাদ দেই তাহলে হিজাযের অন্য সব এলাকায় মূলত বিভিন্ন আকার-অবয়বে মূর্তিপূজা এবং বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।

তবে হানীফ’(حنيف ) নামে পরিচিত অতি মুষ্টিমেয় ব্যক্তি তাওহীদী মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যারা নিজেদের হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর ধর্মের অনুসারী বলে জানত। তাদের সংখ্যা আসলেই খুব কম ছিল। তদানীন্তন পৌত্তলিক আরব জনসংখ্যার তুলনায় তাদের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল।55

হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সময় থেকে ধর্মীয় ও চারিত্রিক আচার-প্রথা ও বিধিসমন্বিত একত্ববাদী ধর্ম হিজাযে প্রবর্তিত ও প্রচলিত হয়েছিল। পবিত্র কাবার সম্মানার্থে হজ্বব্রত পালন ছিল ঐ সব প্রথারই অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীকালে আমর বিন কুসাই নামের খুযাআ গোত্রের এক ব্যক্তি-যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব ছিল তার মাধ্যমে পবিত্র মক্কা নগরীতে মূর্তিপূজার প্রচলন হয়। এ ব্যক্তি শাম (সিরিয়া) ভ্রমণ করার সময় দেখতে পেয়েছিল যে,আমালাকা সম্প্রদায় সুন্দর সুন্দর প্রতিমার পূজা করে। তাদের এ কাজ তার মনঃপূত হয় এবং সে হুবাল’নামের একটি সুন্দর প্রতিমা শাম থেকে মক্কায় আনয়ন করে এবং জনগণকে তা পূজা করার ব্যাপারে আহবান জানায়।56

প্রসিদ্ধ প্রতিমাসমূহ : 1. হুবাল 2. আসাফ 3. নায়েলাহ্ 4. লাত 5. উয্যা 6. মানাত 7. আমইয়ানুস 8. সা দ 9. যূল খালসাহ্ 10. মান্নাফ।

এগুলোই ছিল আরবদের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রতিমা। এ সব প্রতিমা ছাড়াও আরবদের অন্যান্য প্রতিমার উপাসনাও প্রচলিত ছিল। কখনো কখনো কোন গোত্র,এমনকি কোন কোন বংশের নিজস্ব প্রতিমা ও মূর্তি ছিল যাকে তারা পূজা করত।

হিজাযে জ্ঞান ও শিক্ষা

হিজাযের জনগণ ও অধিবাসীদের উম্মী’বলা হতো। উম্মী’শব্দের অর্থ অশিক্ষিত। অর্থাৎ ঐ ব্যক্তিকে উম্মী বলা হয় যে মায়ের পেট থেকে যে অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিল ঠিক সে অবস্থায়ই রয়েছে। (জাহেলিয়াতের যুগে) আরবদের মধ্যে জ্ঞান ও শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে,ইসলামের শুভ অভ্যুদয়ের লগ্নে কুরাইশ গোত্রে কেবল 17 ব্যক্তি লেখাপড়া জানত। আর মদীনায় আওস’ও খাযরাজ’গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কেবল 11 জন লেখাপড়া জানত।57

আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত এ আলোচনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে মতাদর্শ,চিন্তা-চেতনা,বিশ্বাস,অর্থনীতি,চরিত্র,আচার-ব্যবহার এবং কৃষ্টি-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলাম ধর্মের শিক্ষা-দীক্ষার মাহাত্ম্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় এবং সব সময় সভ্যতাসমূহের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের ঐ সব সভ্যতার পূর্ববর্তী অধ্যায় অধ্যয়ন করতেই হবে। অধ্যয়নের পরই কেবল উক্ত সভ্যতার মহত্ত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন করা উচিত।58

তৃতীয় অধ্যায় : দুই পরাশক্তি ইরান ও রোমের অবস্থা

ইসলাম ধর্মের পবিত্র আন্দোলনের প্রকৃত তাৎপর্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্য দু টি পরিবেশের সমুদয় অবস্থা অধ্যয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :

1. পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার পরিবেশ অর্থাৎ যে পরিস্থিতি ও পরিবেশের মধ্যে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ও এর বিকাশ ঘটেছিল।

2. ঐ সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য অঞ্চলসমূহে যে সব জাতি বসবাস করত তাদের চিন্তাধারা,চরিত্র,আচার,রীতি-নীতি,প্রথা ও সভ্যতা অধ্যয়ন।

ইতিহাস থেকে ঐ সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত যে অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা জানতে পারি তা হলো রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা ও পরিবেশ। আলোচনা পূর্ণ করার জন্য আমাদের অবশ্যই উক্ত দু দেশের অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলোচনা ও অধ্যয়ন করতে হবে। যার ফলে ইসলাম ধর্ম যে সুমহান সভ্যতা মানব জাতিকে উপহার দিয়েছে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যাবে।

তখনকার রোমান সাম্রাজ্যের অবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্যের অবস্থা অপেক্ষা কোন অংশে কম ছিল না। গৃহযুদ্ধ এবং আর্মেনিয়া ও অন্যান্য এলাকাকে কেন্দ্র করে ইরানের সাথে সংঘটিত যুদ্ধসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের জনগণকে এক নতুন বিপ্লব বরণ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল। ধর্মীয় মতপার্থক্যসমূহ অন্য সব কিছুর চেয়ে বেশি এ সব বিরোধ ও পার্থক্যকে বিস্তৃত করেছিল। মূর্তিপূজক ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে যুদ্ধের বহ্নিশিখা নির্বাপিত হতো না। যখন গির্জার পুরোহিতগণ শাসনকর্তৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁরা তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধীদের কঠিন চাপের মধ্যে রেখেছিলেন যা একটি অসন্তুষ্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটিয়েছিল। যে বিষয়কে রোমান সাম্রাজ্যের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অন্যতম বড় কারণ বলে গণ্য করা হয়েছে তা ছিল গির্জার পুরোহিতদের সহিংসতার কারণে উক্ত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বঞ্চনা ও নাগরিক অধিকারহীনতা। একদিকে পুরোহিত ও ধর্মযাজকদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের পথ ও মত দিন দিন রোমান সাম্রাজ্যের শক্তি,ক্ষমতা ও আধিপত্য নিঃশেষ করে দিচ্ছিল।

এ সব ছাড়াও উত্তর-পূর্ব দিকের শ্বেতাঙ্গ ও পীতবর্ণের লোকেরা সর্বদা ইউরোপ মহাদেশের উর্বর অঞ্চলসমূহ নিজেদের করায়ত্তে আনার ইচ্ছা পোষণ করত এবং কখনো কখনো সামরিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধসমূহে একে অপরের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি সাধন করত। এর ফলে রোমান সাম্রাজ্য দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিকগণ বিশ্বাস করেন যে,ষষ্ঠ শতাব্দীতে রোমের রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি পারস্য সাম্রাজ্যের ওপর রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি উক্ত সাম্রাজ্যের সামরিক পরাশক্তি হওয়ার প্রমাণ বলে গণ্য করা হতো না,বরং বিশ্বাস করা হতো যে,ইরানের পরাজয় আসলে সে দেশটির প্রশাসনের বিশৃঙ্খলারই ফসল ছিল। এ দু টি দেশ যা নিজেদের ওপর বিশ্ব রাজনীতি ও নেতৃত্বের মুকুট পরিধান করেছিল তা ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব কালে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছিল। এটি স্পষ্ট যে,এ ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি একটি সঠিক ধর্ম গ্রহণ করার জন্য অসাধারণ প্রস্তুতি ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছিল যা মানব জাতির জীবনের সার্বিক অবস্থা উন্নয়নে সক্ষম।

রোমের খণ্ডকালীন আলোচনাসভাসমূহ

কিছু কিছু দেশে একদল বেকার ও প্রবৃত্তিপূজারী ব্যক্তি নিজেদের অসদুদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কতগুলো অন্তঃসারশূন্য বিষয় জনসমক্ষে উত্থাপন ও প্রচার করত এবং এভাবে তারা জনগণের মূল্যবান জীবন নষ্ট করত। প্রাচ্যের অনেক দেশেই আমাদের এ বক্তব্যের পক্ষে প্রচুর দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান যা বর্তমানে আলোচনা করার কোন অবকাশ নেই। ঘটনাচক্রে তখনকার রোম অন্য সব দেশের চেয়ে বেশি এ ধরনের সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছিল। যেমন রোমান সম্রাট ও রাজনীতিকগণ কিছু কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুসারী হওয়ার কারণে বিশ্বাস করতেন যে,হযরত ঈসা মসীহ্ (আ.) দু ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। কিন্তু কিছু সংখ্যক ইয়াকুবী সম্প্রদায়ভুক্ত খ্রিষ্টান বিশ্বাস করত যে,হযরত ঈসা (আ.) কেবল এক ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। আর ভিত্তিহীন এ বিষয়টিই রোমান সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব,ঐক্য ও সংহতির ওপর তীব্র আঘাত হানে এবং তাদের মধ্যে এক গভীর ফাটলের উদ্ভব ঘটায় যার ফলে সরকার ও প্রশাসন নিজ আকীদা-বিশ্বাস সংরক্ষণ করতে বাধ্য হয়। আর এ কারণেই প্রশাসন বিরোধীদেরকে অতি নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়। উৎপীড়ন ও চাপের কারণে বেশ কিছুসংখ্যক বিরোধী ইরান সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এ সব বিরোধীই মুসলিম সেনাবাহিনীর সম্মুখে রণক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং মনে-প্রাণে মুসলিম সেনাবাহিনীকে বরণ করে নিয়েছিল।

তদানীন্তন রোমান সাম্রাজ্য ঠিক মধ্যযুগীয় ইউরোপের মতো ছিল। প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ফ্লামারীয়োন মধ্যযুগে ইউরোপীয় কৃষ্টির পর্যায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত কাহিনীটি বর্ণনা করেছেন : আধ্যাত্মিক সমগ্র’নামক গ্রন্থটি মধ্যযুগে স্কলাসটিক দর্শনের পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ও নিদর্শন বলে গণ্য হতো। এ গ্রন্থটি চারশ’বছর ধরে আনুষ্ঠানিক পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ইউরোপে পঠিত হতো। উক্ত গ্রন্থের একটি অংশে এ শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে : একটি সুঁইয়ের অগ্রভাগের সরু ছিদ্রের মধ্যে কত জন ফেরেশতার অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব?’‘ চিরন্তন পিতার বাম চোখের পুতুলী থেকে তাঁর ডান চোখের পুতুলী পর্যন্ত দূরত্ব কত ফারসাখ? (1 ফারসাখ = প্রায় 6 কিলোমিটার)

দুর্ভাগ্যপীড়িত রোমান সাম্রাজ্য বহিঃশক্তিগুলোর সাথে যুদ্ধে-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়ার একই সময় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিল। এ সব দ্বন্দ্ব-সংঘাত ধর্মীয় রূপ পরিগ্রহ করেছিল। আর এর ফলে দিন দিন দেশটি পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। ইয়াহুদিগণ যারা ছিল একটি ষড়যন্ত্রকারী জাতি,তারা যখন দেখল,রোমের খ্রিষ্টান সম্রাট কর্তৃক আরোপিত চাপ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে তখন তারা রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস ও এর মূলোৎপাটন করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা একবার আনতাকীয়া নগরীও দখল করে নিয়েছিল এবং নগরীর প্রধান ধর্মযাজকের কান,নাক ও ঠোঁট কর্তন করেছিল। রোম সরকার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আনতাকীয়ার ইয়াহুদীদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। রোমে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কয়েকবার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। আবার কখনো কখনো এ শত্রুতা দেশের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিল। উদাহরণস্বরূপ ইয়াহুদীরা একবার ইরান থেকে 80,000 খ্রিষ্টানকে ক্রয় করে দুম্বার মতো জবাই করেছিল।

এখানেই সম্মানিত পাঠকবর্গ ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক বিশ্বের অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অরাজক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে এবং স্বীকার করতে পারবেন যে,ইসলামের মুক্তিদানকারী শিক্ষা-দীক্ষা ও বিধি-বিধান ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে সৃষ্ট হয় নি এবং তা মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তাধারারও ফসল নয়। ঐক্য ও সহমর্মিতার মৃদুমন্দ এ সমীরণ এবং শান্তি ও মৈত্রীর সুর যা পবিত্র ইসলাম ধর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা আসলে ঐশ্বরিক উৎস থেকেই উৎসারিত হয়েছে। কিভাবে বলা সম্ভব যে,যে ইসলাম ধর্ম জীবজন্তু ও প্রাণীকুলকে পর্যন্ত জীবনধারণ করার অধিকার দিয়েছে আসলে তা এ ধরনের রক্তপিপাসু পরিবেশ থেকে উদ্ভূত?

ইসলাম ধর্ম হযরত ঈসা (আ.)-এর ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে ভিত্তিহীন এ সব আলোচনার অবসান ঘটিয়েছে এবং ঈসা (আ.)-কে ঠিক এভাবে পরিচিত করিয়েছে :

) ما المسيح بن مريم إلّا رسول قد خلت من قبله الرّسل و أمّه صدّيقة كانا يأكلان الطّعام(

“মরিয়ম তনয় মসীহ্ একজন নবীর চেয়ে বেশি কিছু নন যাঁর আগে অনেক নবী-রাসূল গত হয়েছেন। তাঁর মাতা ছিলেন একজন পূতঃপবিত্রা পরম সত্যবাদিনী। এমতাবস্থায় তাঁরা উভয়ই খাদ্য গ্রহণ করতেন এবং মানুষ ছিলেন।” (সূরা মায়েদাহ্ : 75)

পবিত্র কোরআনের এ আয়াত হযরত ঈসা (আ.)-এর আত্মা,রক্ত ও পরিচিতি সংক্রান্ত গীর্জার ধর্মযাজকদের অনর্থক আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে। এ ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ এবং মহৎ মানবীয় গুণাবলী পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে মানব জাতিকে অযথা যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত থেকে বিরত রেখেছে।


7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18

19

20

21

22

23

24

25

26

27

28

29

30

31

32

33

34

35

36

37

38