কোরআনের পরিচয়

কোরআনের পরিচয়11%

কোরআনের পরিচয় লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: কোরআন বিষয়ক জ্ঞান

কোরআনের পরিচয়
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 33 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 22596 / ডাউনলোড: 3656
সাইজ সাইজ সাইজ
কোরআনের পরিচয়

কোরআনের পরিচয়

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

অত্র গ্রন্থে কোরআন মজীদের বেশ কিছু আয়াত উদ্ধৃত হয়েছে এবং এ সব আয়াতের মধ্যে এমন আয়াতও রয়েছে যাতে আল্লাহ্ তা আলা নিজের জন্য উত্তম পুরুষে বহুবচন অর্থাৎ আমরা শব্দ ব্যবহার করেছেন। তৎকালীন আরবী বাকরীতিতে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালীদের মুখে নিজের জন্য এক বচন অর্থেই আমরা ব্যবহারের প্রচলন ছিলো , এ কারণে তৎকালীন আরবের মোশরেকরা কোরআন মজীদে আল্লাহ্ তা আলা নিজের জন্য আমরা ব্যবহার করায় এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে নি তথা একে বহু ঈশ্বরবাদের সপক্ষে প্রমাণ বলে দাবী করে নি। কিন্তু যদিও বাংলা সহ আরো অনেক ভাষায় সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বা বিনয় প্রকাশের জন্য এর প্রচলন রয়েছে তথাপি বাংলা বাকরীতিতে অনেক ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিনয়স্বরূপ আমরা এবং কর্তৃত্বভাব প্রকাশের জন্য আমি ব্যবহারেরও প্রচলন আছে। এ কারণে বাংলা ভাষায় আল্লাহ্ তা আলার জন্য আমরা ব্যবহার বেখাপ্পা শুনায় বিধায় আমরা এক বচনে এর অনুবাদ করেছি। অত্র গ্রন্থে এ ধরনের সকল আয়াতের ক্ষেত্রেই আমরা এ রীতি অনুসরণ করেছি।


1

2

3

4

5

6

কোরআনের মু জিযাহ্

নবী-রাসূলগণ ( আঃ)-এর নবুওয়াত্ প্রমাণের মূল দলীল ছিলো তাঁদের বিচারবুদ্ধিগ্রাহ্য অস্তিত্ব। তাঁদের আখ্লাক্ব্ , আচরণ ও জীবনধারা থেকে সমকালীন মানুষেরা বুঝতে পারতো যে , তাঁরা কোন মিথ্যা দাবী করতে পারেন না , অতএব , তাঁরা যখন নবুওয়াত্ দাবী করছেন তখন নিঃসন্দেহে তাঁরা নবী। এছাড়া অনেক নবীকে ( আঃ) পূর্ববর্তী নবীগণ ( আঃ) নবী হিসেবে পরিচিত করে দিয়ে গেছেন বা এমন নিদর্শনাদি সহ ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন যাতে আবির্ভাবকালে তাঁকে বা তাঁদেরকে নবী হিসেবে সহজেই চেনা যায়।

কিন্তু এছাড়া অনেক নবীকেই ( আঃ) , বিশেষ করে পূর্ববর্তী নবী ( আঃ) সরাসরি পরিচয় করিয়ে দেন নি (কালগত ব্যবধানের কারণে) এমন নবীদেরকে ( আঃ) , আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের অলৌকিক নিদর্শন ও ঘটনা (মু জিযাহ্) দেয়া হয় যা প্রত্যক্ষ করে লোকদের মধ্যে নবীর নবী হওয়ার ব্যাপারে প্রত্যয় উৎপাদন হতো। কারণ , তাঁরা এমন কাজ করতেন বা তাঁদেরকে কেন্দ্র করে আল্লাহ্ তা আলা এমন ঘটনা ঘটাতেন যা সমকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মানবিক উপায়-উপকরণের দ্বারা সম্ভবপর হতো না।

এ সব মু জিযাহ্ সেগুলো প্রত্যক্ষকারীদের জন্যে যতোখানি প্রত্যয়উৎপাদনকারী হতো শ্রবণকারীদের জন্যে তা থেকে সমপরিমাণ প্রত্যয় উৎপাদন সম্ভব ছিলো না , কারণ , তা বর্ণনাকারীর ওপরে শ্রবণকারীর প্রত্যয়ের ওপর নির্ভর করতো। পরবর্তীকালীন শ্রোতাদের জন্য তার প্রত্যয়ের মাত্রা হয় আরো কম। অবশ্য পূর্ব থেকে মওজূদ ঐশী গ্রন্থে ঈমানের কারণে উক্ত ঐশী গ্রন্থভুক্ত বর্ণনা পাঠেও সংশ্লিষ্ট নবীর মু জিযাহ্ সম্পর্কে প্রত্যয় সৃষ্টি হতে পারে , কিন্তু তা প্রত্যক্ষকারীর মতো হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণেই ক্বিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য যার নবুওয়াত কার্যকর সেই শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে ঐ ধরনের বহু মু জিযাহর পাশাপাশি একটি অবিনশ্বর মু জিযাহ্ দেয়া হয় , তা হচ্ছে কোরআন মজীদ।

কোরআন মজীদ হচ্ছে এমন একটি মু জিযাহ যা স্থান-কাল নির্বিশেষে সবখানে ও সব সময় প্রত্যক্ষ করা সম্ভব এবং যে মু জিযাহ্কে বিচারবুদ্ধিগ্রাহ্য করা হয়েছে। কোরআনের মু জিযাহ্ তার রচনাশৈলী , বাচনভঙ্গি , জ্ঞানগর্ভতা , সূক্ষ্ম ভাব প্রকাশ ও সংক্ষিপ্ততার মধ্যে নিহিত। এ ধরনের মধ্যম আয়তনের একটি কিতাবে এতো বিপুল সংখ্যক বিষয়ে এতো সুগভীর জ্ঞান দেয়া হয়েছে , অথচ এর সাহিত্যিক মান সর্বোচ্চে - এটা মানবিক ক্ষমতার উর্ধে। এর ভিত্তিতেই কোরআন মজীদ তার সমমানের কোন গ্রন্থ বা নিদেন পক্ষে একটি সূরাহ্ পেশ করার চ্যালেঞ্জ প্রদান করেছে , যে চ্যালেঞ্জ আজ পর্যন্ত কেউই গ্রহণ করতে পারে নি।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , মানবজাতির মধ্যে উদ্ভুত ভাষাসমূহের মধ্যে আরবী ভাষা হচ্ছে সর্বাধিক সম্ভাবনাময়।

মানুষের ভাষা হিসেবে এর সম্ভাবনাকে সীমাহীন বলে অভিহিত করা চলে না বটে , তবে সে সম্ভাবনা এতোই বেশী যে , কোনো মানুষের পক্ষে তা পুরোপুরি আয়ত্ত করা ও কাজে লাগানো সম্ভব নয় ; কেবল আল্লাহ্ তা আলার পক্ষেই সম্ভব।

আরবী ভাষা সূক্ষ্মতম ভাব প্রকাশ ও তাৎপর্যে সূক্ষ্মতম পার্থক্য প্রকাশের জন্য সর্বাধিক উপযোগী। কেবল শব্দের বানানে পরিবর্তন করে - দু একটি হরফ যোগ ও হারাকাত পরিবর্তন এবং বাক্যের মধ্যে শব্দের অবস্থান অগ্র-পশ্চাত করে - অর্থে এতো বেশী সংখ্যক পরিবর্তন সাধন সম্ভব যা অন্য কোনো ভাষার ক্ষেত্রে চিন্তাও করা যায় না।

আরবী ভাষার এ অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই আরবরা নিজেদের ভাষাকে আরাবী (عربی ) অর্থাৎ প্রাঞ্জল ভাষা বলে অভিহিত করতো এবং সে তুলনায় অনারবদের ভাষার সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা লক্ষ্য করে অনারবদের আজামী (عجمی ) বা বোবা বলে বিদ্রুপ করতো।

হযরত মুহাম্মাদ(ছ্বাঃ)-এর আবির্ভাবের যুগে আরবী ভাষা তার বিকাশের চরমতম শিখরে উপনীত হয়। ঐ সময় আরবী ভাষায় এমন সব কবিতা রচিত হয় যা আজো এ ভাষার শ্রেষ্ঠতম কবিতার আসন দখল করে আছে। ঐ সময় আরবী গদ্যও (যদিও মৌখিক) বিকাশের চরমতম পর্যায়ে উপনীত হয় এবং আরবী ভাষার সূচনাকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আরবী বক্তা ও বাচনশিল্পীদের আবির্ভাব ঘটে ঐ সময়ই।

বস্তুতঃ বিশ্ববাসীর ওপর আরবদের গর্ব করার মতো কেবল এই একটি বিষয়ই ছিলো। তা সত্ত্বেও আরবী বাচনশিল্পের (কবিতা ও ভাষণের) সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম নায়কগণও কোরআন মজীদের বাচনসৌন্দর্যের কাছে অক্ষম হয়ে পড়েছিলো। তাই সমগ্র কোরআনের বিকল্প রচনা করা তো দূরের কথা , এর ছোট একটি সূরাহর সমমানসম্পন্ন সূরাহ্ও তারা রচনা করতে সক্ষম হয় নি। তাই স্বভাবতঃই লোকেরা কোরআন মজীদের বাণী শুনে অভিভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতো।

লোকেরা এভাবে কোরআনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকায় আরবী ভাষার শ্রেষ্ঠতম বাচনশিল্পীগণ লোকদেরকে কোরআন শোনা থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্যে শেষ পর্যন্ত কোরআনকে জাদু বলে অভিহিত করে। বলা বাহুল্য যে , জাদুর মন্ত্র কখনো জ্ঞানবিজ্ঞানে পরিপূর্ণ এবং রাজনৈতিক , সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিবিধান সম্বলিত হয় না , বরং তা হয় দুর্বোধ্য। তা সত্ত্বেও কোরআনের বাচনসৌন্দর্যের কাছে এমনকি কোরআন-বিরোধী মানুষও দলে দলে আত্মসমর্পণ করতো বিধায় তারা একে জাদু বলে অভিহিত করে।

কোরআন মজীদের মু জিযাহর এ-ও অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে , এতো জ্ঞানপূর্ণ ও উন্নত সাহিত্যিক ভাবধারা বিশিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তার ভাষা খুবই সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ; এ গ্রন্থ মুখস্ত করা ও মনে রাখা সহজ এবং বার বার পড়লে বা শুনলেও কখনোই বিরক্তি আসে না , পড়া ও শুনার আগ্রহ হ্রাস পায় না। এছাড়া এর পঠন-পাঠন মানুষের মন-মগয ও আচরণকে প্রভাবিত করে। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য মানবরচিত কোনো গ্রন্থেই নেই।

কোরআন মজীদের মু জিযাহ্ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করে আরবী ও ফার্সী ভাষায় বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এ সব গ্রন্থ অধ্যয়ন করে কোরআন মজীদের মু জিযাহ্ সম্বন্ধে বিস্তারিত ও গভীরতর ধারণা লাভ করা যেতে পারে। [এ বিষয়ে অত্র গ্রন্থকারের কোরআনের মু জিযাহ্ শীর্ষক একটি অপ্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে।]

কোরআনের মু জিযাহ্ প্রসঙ্গে একটি বিষয় উল্লেখ না করলে নয়। তা হচ্ছে , সাম্প্রতিক কালে মিসরের এক ব্যক্তি দাবী করেন , তিনি কম্পিউটারের সাহায্যে কোরআনের বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে , কোরআন মজীদের বর্ণ , শব্দ , হরফে মুক্বাত্বত্বা আত্ , নামসমূহ ইত্যাদি ১৯ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য। অতঃপর এ নিয়ে বহির্বিশ্বে কোথাও কোথাও , বিশেষ করে বাংলাদেশে খুবই উৎসাহ সৃষ্টি হয় এবং এ নিয়ে অনেকে বইপুস্তক ও প্রবন্ধ রচনা করেন। অথচ বিগত চৌদ্দশ ' বছরে যে সব কোরআন-বিশেষজ্ঞ কোরআনের মু জিযাহ্ সম্বন্ধে গ্রন্থাদি রচনা করেছেন তাঁদের কেউই ১৯ সংখ্যা দ্বারা কোরআনের মু জিযাহ্ প্রমাণের চেষ্টা করেন নি। এমনকি এ বিষয়টি ময়দানে আসার পরেও বর্তমানে যে সব দেশে ইসলামী জ্ঞানচর্চা ব্যাপক ও সুগভীর অর্থাৎ ইরান , ইরাক , লেবানন , সিরিয়া ও মিসরে এ দাবীটি গ্রহণযোগ্য হয় নি।

পরীক্ষা করে দেখা গেছে , কথিত দাবী অনুযায়ী কোরআন মজীদের কতক বিষয় ১৯ দ্বারা বিভাজ্য হলেও সবকিছু ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়। (এ সম্বন্ধে অত্র গ্রন্থকারের অপ্রকাশিত কোরআনের মু জিযাহ্ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।) যথাসম্ভব এ তত্ত্বের পিছনে বাহাইদের ষড়যন্ত্র ক্রিয়াশীল রয়েছে। কারণ , বাহাই ধর্মাবলম্বীরা ১৯ সংখ্যাকে পবিত্র গণ্য করে। উল্লেখ্য , বাহাই ধর্ম যথাসম্ভব যায়নবাদী ইয়াহূদীদের ষড়যন্ত্রের ফলে অস্তিত্বলাভ করে ঠিক যেভাবে ইংরেজদের ষড়যন্ত্রে কাদিয়ানী ধর্ম অস্তিত্বলাভ করে।

১৯ সংখ্যার মু জিযাহ্ তত্ত্ব প্রবর্তনের উদ্দেশ্য সম্ভবতঃ এই যে , মুসলমানদের একাংশ প্রথমতঃ এ তত্ত্বে বিশ্বাস স্থাপন করবে , অতঃপর তাদের মধ্যে কতক লোক কোরআনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ১৯ সংখ্যা দ্বারা পরীক্ষা করে দেখবে এবং যে সব ক্ষেত্রে ১৯ সংখ্যা দ্বারা বিভাজ্য পাবে না সে সব ক্ষেত্রে কোরআনের বিকৃতি ঘটেছে বলে তাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হবে , অতঃপর তা তাদের কাছ থেকে অন্যদের মধ্যে বিস্তারলাভ করবে। তাই এ ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক থাকা যরূরী।

কোরআনের ভবিষ্যদ্বাণী

বলা বাহুল্য যে , কোরআন মজীদের বাচনসৌন্দর্য বা মু জিযাহর সাথে কেবল তাদের পক্ষেই পুরোপুরি পরিচিত হওয়া সম্ভব যারা আরবী ভাষার উন্নততম প্রকাশসৌন্দর্য (ফাছ্বাহাত্ ও বালাগ্বাত্)-এর সাথে পরিচিত। তবে যারা আরবী ভাষার ফাছ্বাহাত্ ও বালাগ্বাতের সাথে পরিচিত নন তাঁদের পক্ষেও এ কিতাবের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থেকে বুঝা সম্ভব যে , এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত কিতাব। এ সব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কোরআন মজীদের বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণী ও তার বাস্তবে পরিণত হওয়া। এখানে আমরা এরূপ কয়েকটি ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর অত্যন্ত সংক্ষেপে আলোকপাত করবো।

এক : রোমের বিজয়

৬১৫ খৃস্টাব্দে তৎকালীন পারস্য সম্রাটের নিকট রোম সম্রাট যুদ্ধে পরাজিত হন। রোমানরা আহলে কিতাব (খৃস্টান) ও পারস্য সম্রাট অগ্নিপূজারী ছিলেন বিধায় মক্কায় কুরাইশরা তাওহীদবাদী মুসলমানদের উপহাস করতে শুরু করে। তখন কোরআন মজীদের সূরাহ্ আর-রূম্ নাযিল করে আল্লাহ্ তা 'আলা জানিয়ে দেন যে , খুব শীঘ্রই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে রোমানরা বিজয়ের অধিকারী হবে (আয়াত নং ২-৩)। এরপর নয় বছরের মাথায় ৬২৪ খৃস্টাব্দে রোমান বাহিনী পারস্যভুক্ত আযারবাইজান দখল করে নেয় এবং পরবর্তী কয়েক বছর পর্যন্ত বিজয়ের ধারা অব্যাহত থাকে।

দুই : আবূ লাহাবের স্ত্রীর মৃত্যুকালীন অবস্থা

মক্কায় থাকাকালে হযরত রসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর সবচেয়ে বড় দুশমন ছিলো আবূ লাহাব। আবূ লাহাবের স্ত্রীও তাঁর দুশমন ছিলো। এমতাবস্থায় কোরআন মজীদে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় যে , আবূ লাহাবের স্ত্রী জ্বালানী কাষ্ঠের (লাকড়ির) বোঝা বহনরত অবস্থায় গলায় খেজুর পাতার তৈরি রশির ফাঁস লেগে মারা যাবে (সূরাহ্ লাহাব : ৩-৫ )। শেষ পর্যন্ত সে এভাবেই মারা যায়।

আবূ লাহাবের স্ত্রীর এভাবে মৃত্যু ঘটার সত্যতা সম্বন্ধে এ পর্যন্ত কোরআন-বিরোধীদের পক্ষ থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হয় নি। তারপরও কেউ যদি এর সত্যতা সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলতে চায় তো তার সংশয় নিরসনের জন্যে এতোটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে , আবূ লাহাবের স্ত্রীর মৃত্যু এভাবে না হয়ে অন্য কোনোভাবে হলে তখনকার আরবের কাফের , মোশরেক ও ইয়াহূদী-খৃস্টানরা হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর নবুওয়াতের দাবীকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্যে একে প্রমাণ হিসেবে পেশ করার সুযোগ মোটেই হাতছাড়া করতো না। বরং তারা রোম , পারস্য , মিসর ও আবিসিনিয়ায় পর্যন্ত তা ব্যাপকভাবে প্রচার করতো এবং এই একটি ঘটনাই ইসলামের মৃত্যু ঘটার জন্য যথেষ্ট হতো।

তিন : মক্কাহ্ বিজয়

হুদায়বীয়াহর সন্ধি বাহ্যিক বিচারে মুসলমানদের জন্য ছিলো অপমানজনক , এ কারণে অনেক ছ্বাহাবী এ সন্ধি সম্পাদনের বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু হযরত নবী করীম (ছ্বাঃ) আল্লাহর নির্দেশে সন্ধি করেন এবং আল্লাহ্ তা আলা কোরআন মজীদের সূরাহ্ আল্ ফাৎহ্ নাযিল্ করে জানিয়ে দেন যে , মুসলমানরা অচিরেই মক্কাহ্ বিজয় করতে পারবে (আয়াত নং ১ ও ২৭)। অচিরেই এ ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব রূপ লাভ করে। উল্লেখ্য , সূরাহ্ আল্-ক্বাছ্বাছ্বের ৮৫ নং আয়াতেও এর ইঙ্গিত রয়েছে এবং সূরাহ্ আন্-নাছ্বর্-এও একই ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে।

চার : ফির্ আউনের মৃতদেহ সংরক্ষণ

হযরত মূসা (আঃ)-এর পিছু ধাওয়াকারী ফির্ আউন্ তার দলবলসহ লোহিত সাগরে ডুবে মারা যায়। এ ঘটনা বাইবেলের পুরাতন নিয়মের যাত্রাপুস্তকে এবং কোরআন মজীদে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে যে , ফিরআউনের মৃত্যুর সময় আল্লাহ্ তা আলা তাকে সম্বোধন করে বলেন :

অতএব , আজ আমি তোমার শরীরকে রক্ষা করবো যাতে তা তোমার পরবর্তী লোকদের জন্যে একটি নিদর্শনস্বরূপ হয় , যদিও এতে সন্দেহ নেই যে , অধিকাংশ মানুষই আমার নিদর্শনসমূহের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। ( সূরাহ্ ইউনুস : ৯২)

বাইবেলের যাত্রাপুস্তকে এ বিষয়ে কোনো কথা উল্লেখ নেই এবং হযরত নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর যুগে কারোই জানা ছিলো না যে , হযরত মূসা ( আঃ)-এর সময় ডুবে মরা ফির্ আউনের মৃতদেহ কোথাও সংরক্ষিত আছে। কোরআন মজীদের এ আয়াত নাযিল হবার তেরশ বছর পর উক্ত ফির্ আউনের লাশ একটি পিরামিডের মধ্যে আবিষ্কৃত হয়। (নিঃসন্দেহে তার উত্তরাধিকারীরা লাশটি সমুদ্র থেকে উদ্ধারের পর মমি করে পিরামিডে রেখেছিলো।) লাশটি এখনও কায়রোর জাদুঘরে আছে। এ লাশের ওপরকার লবণের আস্তরণ থেকে এটিকে হযরত মূসা ( আঃ)-এর সময় ডুবে মরা ফির্ আউনের লাশ বলে সনাক্ত করা হয়।

পাঁচ : রাসূলুল্লাহ্ র (ছ্বাঃ) বংশধারা সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী

হযরত নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর দুই পুত্র ক্বাসেম ও আবদুল্লাহ্ শিশু বয়সে ইন্তেকাল করলে তাঁর দুশমন আবূ লাহাব তাঁকে আব্তার্ (ابتر -লেজকাটা - নির্বংশ অর্থে) বলে উপহাস করতো। তখন কোরআন মজীদের সূরাহ্ আল্-কাওছার্ নাযিল্ হয়। এতে আল্লাহ্ তা আলা হযরত নবী করীম (ছ্বাঃ) কে কাওছার্ (کوثر -প্রচুর) দেয়ার কথা বলেন এবং তাঁর দুশমনকে আব্তার্ বলে ঘোষণা করেন। অবশ্য অনেক মুফাসসির কাওছার্ বলতে বেহেশতে নবী করীম (ছ্বাঃ) যে হাউযে কাওছার্ -এর অধিকারী হবেন - এ অর্থ করেছেন। অনেক আয়াতে একাধিক ইঙ্গিত থাকে , তাই এ অর্থও গ্রহণীয়। কিন্তু কাফের শত্রুর পক্ষ থেকে নির্বংশ বলে উপহাসের জবাব এটা হতে পারে না। তাই অনেক মুফাসসিরের মতে এর প্রকাশ্য অর্থ হচ্ছে এই যে , নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর বংশধরের সংখ্যা প্রচুর হবে । বাস্তবেও তা-ই দেখা যায়। হযরত ফাতেমাহ্ (সালামুল্লাহ্ আলাইহা)-এর মাধ্যমে হযরত রসূলুলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর বংশধারায় সারা দুনিয়ায় যতো লোক রয়েছেন তাঁর যুগের অন্য কোনো লোকের বংশধারায় এতো লোক আছে বলে জানা নেই। অন্যদিকে তাঁর দুশমন আবূ লাহাবের ঐ সময় সন্তানসন্ততির সংখ্যা অনেক থাকলেও যা নিয়ে সে গর্ব করতো - অচিরেই তার বংশধারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

কোরআন মজীদে বৈজ্ঞানিক তথ্য

কোরআন মজীদ যে আল্লাহর কিতাব তার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে , এতে এমন বহু বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে যা কোরআন নাযিলের যুগের মানুষের পক্ষে জানা তো দূরের কথা , পরবর্তী প্রায় তেরশ বছর পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ছিলো এবং মোটামুটি বিগত এক শতাব্দীকালে আবিষ্কৃত হয়েছে। এ সবের মধ্য থেকে কয়েকটি সম্বন্ধে এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।

এক : উদ্ভিদের প্রাণ

উদ্ভিদের প্রাণ আছে এ তথ্যটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আবিষ্কৃত হয়। অতি সাম্প্রতিককালে এ-ও প্রমাণিত হয়েছে যে , উদ্ভিদ তার পারিপার্শ্বিকতা সম্বন্ধে সচেতন ; পারিপার্শ্বিকতার সব কিছুকে ও সবাইকে চিনতে পারে এবং অন্যদের আচরণের মোকাবিলায় সাড়া দিতে পারে। অথচ এখন থেকে চৌদ্দশ বছর আগেই কোরআন মজীদে বলা হয়েছে যে , উদ্ভিদ আল্লাহ্কে সিজ্দাহ্ করে (সূরাহ্ আর্-রাহমান : ৬) , অর্থাৎ উদ্ভিদ ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন প্রাণশীল সৃষ্টি।

দুই : জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি

বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে , প্রাণীকুল ও উদ্ভিদকুলের প্রতিটি প্রজাতিরই নারী-পুরুষ রয়েছে। দৃশ্যতঃ কোনো উদ্ভিদের নারী-পুরুষ না থাকলেও একই বৃক্ষে নারী ফুল ও পুরুষ ফুল ধরে অথবা একই ফুলে গর্ভকেশর ও পুংকেশর রয়েছে। এমনকি পরমাণু পর্যন্ত ধনাত্মক এ ঋণাত্মক বিদ্যুত দ্বারা গঠিত। হযরত নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর যুগে কতক উদ্ভিদের নারী-পুরুষ থাকার কথা জানা থাকলেও সকল উদ্ভিদের নারী-পুরুষ থাকার বা একই ফুলের গর্ভকেশর-পুংকেশর থাকার কথা জানা ছিলো না , পরমাণুর দু ধরনের বিদ্যুতের কথা জানা থাকা তো দূরের কথা। কিন্তু কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে :

পরমপ্রমুক্ত তিনি যিনি ধরণীর বুকে গজানো সব কিছুকে এবং তাদের নিজেদেরকেও , আর তারা যে সব কিছুকে জানে না তার সব কিছুকেই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। '' (সূরাহ্ ইয়া-সীন্ : ৩৬)

এখানে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে , লোকেরা যে সব কিছুর জোড়া হওয়ার কথা জানতো না (বা এখনো অনেক কিছুর ব্যাপারে জানে না) তা-ও জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে।

তিন : মাতৃগর্ভে সন্তানের বিকাশপ্রক্রিয়া

মাতৃগর্ভে সন্তানের বিকাশ ও বৃদ্ধির পর্যায়ক্রম সম্বন্ধে কোরআন নাযিলের যুগের মানুষ কিছুই জানতো না। আল্লাহ্ তা আলা জানিয়ে দেন যে , মাতৃগর্ভে শুক্র একটি জড়িত বস্তুর রূপ লাভ করে , তারপর তা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয় , এরপর তা থেকে অস্থি সৃষ্টি হয় , এরপর অস্থির ওপর মাংসের আস্তরণ তৈরী হয় , এরপর তাকে নতুন সৃষ্টিতে পরিণত করা হয় (সূরাহ্ আল্-মু মিনূন্ : ১৪)। সাম্প্রতিক কালে বিজ্ঞানীরাও এ প্রক্রিয়ার সত্যতা স্বীকার করেছেন।

চার : পৃথিবীর গতিশীলতা

কোরআন মজীদ নাযিলের যুগের মানুষ পৃথিবীকে স্থির মনে করত। কিন্তু কোরআন মজীদ তার গতিশীলতার কথা বলেছে। আল্লাহ্ তা আলা এরশাদ করেছেন :

) ه ُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الأرْضَ ذَلُولا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا(

তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সুনিয়ন্ত্রিত গতি সম্পন্ন (ذَلُول ) বানিয়েছেন , অতএব , তোমরা তার স্কন্ধসমূহে বিচরণ করো। (সূরাহ্ আল্-মুল্ক্ : ১৫)

বাহনপশুকে প্রশিক্ষণ দেয়ার ফলে তার গতি তার পিঠে আরোহণকারীর জন্য নিরাপদমূলকভাবে নিয়ন্ত্রণের উপযোগী হলে ঐ পশুকে যালূল অর্থাৎ সুগতিসম্পন্ন বা সুনিয়ন্ত্রিত গতি সম্পন্ন বলা হয়।

উক্ত আয়াতে পৃথিবীকে যালূল্ অর্থাৎ সুগতিসম্পন্ন বা সুনিয়ন্ত্রিত গতি সম্পন্ন বলা হয়েছে। পৃথিবীকে যালূ্‌ল্ বলার মধ্যে দিয়ে তার গতিশীলতার কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে , তার গতি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বাসোপযোগী ভারসাম্যপূর্ণ।

পাঁচ : পরাগায়ণ ও বৃষ্টিবর্ষণে বায়ুর ভূমিকা

কোরআন মজীদে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে বায়ু প্রবাহিত করার কথা বলতে গিয়ে তাকে লাওয়াক্বেহ্ (لواقح ) বলা হয়েছে (সূরাহ্ আল্-হিজ্র্ : ২২)। ইতিপূর্বে মুফাসসিরগণ শব্দটির অর্থ করতেন গর্ভবতী অর্থাৎ বৃষ্টিবর্ষণকারী মেঘ গর্ভে ধারণকারী বায়ু । কিন্তু প্রকৃত পক্ষে শব্দটির মানে হচ্ছে গর্ভসঞ্চারক । কারণ ,لواقح শব্দটিلاقح শব্দের বহুবচন। আরلاقح একটি পুরুষবাচক শব্দ , স্ত্রীবাচক হচ্ছেلاقحة এবং এ দুই শব্দের অর্থ যথাক্রমে গর্ভসঞ্চারক গর্ভবতী

ইতিপূর্বে বায়ুর গর্ভসঞ্চারক হওয়ার বিষয়টি বোধগম্য ছিলো না বলেইلواقح -এর অর্থ গর্ভবতী করা হয়। অথচ বায়ু মেঘকে তার গর্ভে ধারণ করে না , বরং তা বায়ুর সাথে মিশে থাকে। অন্যদিকে সম্প্রতিক কালে বিজ্ঞান বায়ুর গর্ভসঞ্চারক হওয়ার বিষয়টি দুই ক্ষেত্রে প্রমাণ করেছে। প্রথমতঃ অনেক উদ্ভিদেরই পরাগায়ণ বায়ুপ্রবাহের দ্বারা হয়ে থাকে। দ্বিতীয়তঃ জলীয় বাষ্প বায়ুর মধ্যে পুঞ্জিভূত হলেই বৃষ্টি হয় না , বরং বায়ুপ্রবাহের ফলে জলীয় বাষ্পের অণুগুলো পরস্পরের সংস্পর্শে এসে প্রথমে পানিবিন্দুতে ও পরে পানির ফোঁটায় পরিণত হয় , অতঃপর বৃষ্টি হয়। এখানে বায়ু মেঘের গর্ভসঞ্চারকের ভূমিকা পালন করে যার ফলে জলীয়বাষ্প গঠিত মেঘে পানির জন্ম হয়।

ছয় : পানি থেকে প্রাণের উৎপত্তি

বিজ্ঞান বলে , পানি থেকেই প্রাণের উৎপত্তি হয়েছে। কোরআন মজীদ চৌদ্দশ ' বছর আগেই এ কথা বলে দিয়েছে। এরশাদ হচ্ছে :

) و َجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ(

আর আমি পানি থেকেই প্রতিটি জিনিসকে প্রাণশীল করেছি। (সূরাহ্ আল্-আম্বিয়া : ৩০)

সাত : নভোমণ্ডল গ্যাসীয় ছিল

বিজ্ঞানীদের মতে , গ্রহ-নক্ষত্রাদি সৃষ্টির পূর্বে নভোমণ্ডল গ্যাসীয় আকারে ছিলো। কোরআন মজীদে একথা চৌদ্দশ বছর আগেই বলা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে :

) ث ُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ(

অতঃপর তিনি আকাশকে সুনিয়ন্ত্রিত করলেন ,আর তখন তা ছিলো ধোঁয়া (গ্যাসীয় অবস্থায়)। (সূরাহ্ হা-মীম্ আস্-সাজ্দাহ্/ ফুছ্বছ্বিলাত্ : ১১)

আট : আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী একত্র ছিলো

বিজ্ঞানীদের মতে , সূর্য থেকে তার গ্যাসীয় পদার্থ বিচ্ছিন্ন হয়ে গ্রহসমূহ সৃষ্টি হয়েছে এবং তারও পূর্বে নভোমণ্ডলের নক্ষত্রসমূহ গ্যাসীয় আকারে একত্রিত ছিল , পরে তা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয় , ঘন হয় ও আকার লাভ করে। কোরআন মজীদেও এ একত্র থাকার কথা বলা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে :

) أ َوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا(

কাফেররা কি দেখে নি যে , আসমান সমূহ ও পৃথিবী পরস্পর সংযুক্ত ছিল , অতঃপর আমি এতদুভয়কে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করেছি ? ' (সূরাহ্ আল্-আম্বিয়া : ৩০)

কোরআন মজীদে এ ধরনের আরো বহু বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে।

শেষ নবী (ছ্বাঃ) ও কোরআন মজীদের অপরিহার্যতা

ইয়াহূদী ও খৃস্টানরা হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে আল্লাহর মনোনীত নবী হিসেবে ও কোরআন মজীদকে আল্লাহর প্রেরিত গ্রন্থ হিসেবে স্বীকার করে না। সেই সাথে ইয়াহূদীরা হযরত ঈসা ( আঃ)কেও নবী হিসেবে স্বীকার করে না। এ দু টি ধর্মীয় জনগোষ্ঠী নিজেদেরকে নবী-রাসূলগণের ( আঃ) ও ঐশী কিতাবের অনুসরণকারী বলে দাবী করে থাকে। কিন্তু খৃস্টানরা বিগত প্রায় দুই হাজার বছর কালের মধ্যে এবং ইয়াহূদীরা আরো বেশীকালের মধ্যে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে কোনো নবীর আগমন ও কোনো আসমানী কিতাব নাযিলের দাবী ও প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নেয় নি।

এমতাবস্থায় ইয়াহূদী ও খৃস্টানদের জন্য বিচারবুদ্ধির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কতগুলো প্রশ্নের জবাব প্রদান করা অপরিহার্য বলে মনে করি। প্রশ্নগুলো হচ্ছে :

এক : হযরত ঈসা ( আঃ)-এর পূর্বে বা তাঁর মাধ্যমে কি নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে এবং মানুষের কাছে কি ঐশী প্রত্যাদেশের সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাদেশ ঐ সময়ই পৌঁছে গিয়েছিলো ? পৌঁছে গিয়ে থাকলে তা কোথায় ? ইয়াহূদীদের অনুসৃত বাইবেলের পুরাতন নিয়ম অথবা খৃস্টানদের অনুসৃত পুরাতন নিয়ম ও ইনজীল্ হিসেবে দাবীকৃত বাইবেল্-ই কি সেই পূর্ণাঙ্গ ও সর্বশেষ ঐশী কিতাব ? যদি তা-ই হয়ে থাকে তো তাহলে ঐ দুই কিতাবে নবুওয়াতের ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ও ঐ দু টি কিতাবের পূর্ণাঙ্গ ও সর্বশেষ ঐশী কিতাব হওয়ার কথা উল্লেখ নেই কেন ? তাহলে সে গ্রন্থকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে তার মূল ভাষায় অবিকৃত ও সংরক্ষিত রাখা হয় নি কেন ? তেমনি তা সংশ্লিষ্ট নবী বা নবীদের দ্বারা কিতাব হিসেবে সর্বজনীন বিচারবুদ্ধির কাছে প্রত্যয় সৃষ্টিকারী রূপে মুতাওয়াতির্ সূত্রে ও অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ্যতা সহকারে আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয় নি কেন ? বিচারবুদ্ধির দাবী অনুযায়ী এটা কি সৃষ্টিকর্তার জন্য অপরিহার্য নয় যে , নবুওয়াতের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটানোর পর তিনি তাঁর পরিপূর্ণ পথনির্দেশকে যে কোনো প্রকার বিকৃতি ও সংশয়ের হাত থেকে রক্ষা করবেন ?

দুই : নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা যদি শেষ হয়ে গিয়ে থাকবে এবং মানবজাতির জন্য আর কোনো নবীর প্রয়োজনীয়তা না থাকবে তাহলে শেষ নবী কে ? তিনি নিজেকে শেষ নবী হিসেবে ঘোষণা করেন নি কেন ? করে থাকলে সে ঘোষণা কোথায় ? তার প্রামাণ্যতাই বা কী ? বাইবেলের পুরাতন নিয়ম নতুন নিয়ম এ উভয় অংশের বিভিন্ন পুস্তকে যে একাধিক মহাপুরুষের আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে তা কি নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা হযরত ঈসা ( আঃ)-এর পূর্বে বা তাঁর মাধ্যমে সমাপ্ত না হওয়ার প্রমাণ বহন করে না ? তাহলে বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকে যাদের আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে তা কা র বা কা দের সম্বন্ধে ? খৃস্টানদের দাবী অনুযায়ী হযরত ঈসা ( আঃ) যে পারাক্লিতাস্ -এর আগমনের অগ্রিম সুসংবাদ দিয়ে গিয়েছেন তা যদি তাঁর নিজের পুনরাগমন সম্পর্কে হয়ে থাকে (যদিও তা নয় , কারণ , তিনি আমি আসবো বলেন নি) সে ক্ষেত্রে বিগত প্রায় দুই হাজার বছরেও তিনি আসেন নি কেন ? এমতাবস্থায় এ দীর্ঘ সময়ের মানুষদের মধ্যে যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তাদের পথভ্রষ্টাতার দায়-দায়িত্ব কা র ?

তিন : হযরত ঈসা ( আঃ)-এর পূর্বে বা তাঁর মাধ্যমে যদি নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা শেষ না হয়ে থাকবে এবং ঐশী পথনির্দেশও যদি পূর্ণতাপ্রাপ্ত না হয়ে থাকবে , আর যে সব ঐশী পথনির্দেশ ঐ সময় পর্যন্ত অবতীর্ণ হয়েছিলো তা-ও যখন মূল ভাষায় ও অবিকৃতভাবে বর্তমান নেই এমতাবস্থায় কি বিগত প্রায় দুই হাজার বছরেও কোনো নবীর আগমন ও কোনো ঐশী কিতাব নাযিল্ হওয়া অপরিহার্য ছিলো না ?

মানুষের জন্য কোনো অবিকৃত ঐশী পথনির্দেশ মওজূদ থাকবে না অথচ সৃষ্টিকর্তা প্রায় দুই হাজার বছরেও কোনো ঐশী পথনির্দেশ সহ কোনো নবীকে পাঠাবেন না - মানুষের প্রতি এহেন নির্দয়তা প্রদর্শন করা কি পরম পূর্ণতার অধিকারী দয়াময় ও মেহেরবান সৃষ্টিকর্তার পক্ষে সম্ভব ? ঐশী কিতাব বলে দাবী করে কোরআন-পূর্ববর্তী যে সব কিতাব পেশ করা হচ্ছে সেগুলোর অবস্থা যখন (প্রামাণ্যতার অভাব , মূল ভাষায় না থাকা , হ্রাস-বৃদ্ধি ও জঘন্যতার সংমিশ্রণের কারণে) এমন যে , সেগুলোকে ঐশী কিতাব বলে এবং সেগুলোতে নবী হিসেবে উল্লেখকৃত ব্যক্তিদেরকে নবী হিসেবে প্রত্যয়ের সাথে গ্রহণ করা সুস্থ বিচারবুদ্ধির পক্ষে সম্ভব হয় না এমতাবস্থায় নতুন পথনির্দেশ সহ কোনো নতুন নবীর আগমন ছাড়া মানবতার মুক্তির কোনো পথ থাকে কি ?

অবশ্য খৃস্টানরা দাবী করে থাকে যে , খোদার পুত্র যীশূ [হযরত ঈসা ( আঃ)] তাঁর ভক্ত ও অনুসারীদের পাপের বোঝা কাঁধে তুলে নিয়ে শূলে মৃত্যুবরণ করে তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করে গিয়েছেন। কিন্তু সুস্থ বিচারবুদ্ধির কাছে তাদের এ দাবী অগ্রহণযোগ্য , কারণ , তাদের এ দাবী (খোদার পুত্র থাকা) একেশ্বরবাদবিরোধী , অংশীবাদী , অযৌক্তিক , বিচারবুদ্ধিবিরোধী কুসংস্কারাচ্ছন্ন মিথ্যা দাবী। কারণ , খোদার পুত্র থাকার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারা তো দূরের কথা , তারা যেখানে যীশূ নামের কোনো ঐতিহাসিক ঐস্তিত্বকেই বিচারবুদ্ধির কাছে প্রত্যয় সৃষ্টিকারী প্রামাণ্য পন্থায় প্রমাণ করতে সক্ষম নয় , তখন তাঁর মাধ্যমে তাঁর ভক্ত-অনুসারীদের মুক্তির মতো আজগুবী দাবী কী করে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে ? বিশেষ করে তাদের এ দাবী অত্যন্ত বিপজ্জনক দাবী। কারণ , একজন মানুষ যতোই পাপাচারে নিমজ্জিত হোক , কেবল যীশূকে খোদার পুত্র বলে অন্ধ বিশ্বাস পোষণ করলে এবং তাঁকে ভালোবাসলেই যদি মুক্তি পাওয়া যায় তাহলে দ্বীন-ধর্ম ও খোদার পক্ষ থেকে নবী প্রেরণের কোনো প্রয়োজন ও যৌক্তিকতাই থাকে না। মানুষ আক্ষরিক অর্থে এ বিশ্বাস পোষণ করলে মানুষের হাতে সমগ্র মানব প্রজাতি সহ এ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতো।

এমতাবস্থায় বিগত প্রায় দুই হাজার বছরে অর্থাৎ খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীর মাঝামাঝিকালের পরে কোনো সময় যদি ঐশী পথনির্দেশ সহ কোনো নবী বা নবীগণ আগমন করে থাকেন তো তিনি বা তাঁরা কে বা কা রা এবং তাঁর বা তাঁদের আনীত ঐশী পথনির্দেশ কোথায় ?

অতএব , এটা নিঃসন্দেহ যে , হযরত ঈসা ( আঃ)-এর আগে বা তাঁর মাধ্যমে নবুওয়াত্ ও ঐশী পথনির্দেশ নাযিলের ধারা শেষ হয় নি। সুতরাং তাঁর পরে কেউ নবুওয়াতের দাবী করলে এবং ঐশী কিতাব বলে দাবী করে কোনো কিতাব পেশ করলে সে দাবী অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

এ ব্যাপারে বিতর্কের অবকাশ নেই যে , হযরত ঈসা ( আঃ) আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে সমুন্নত লোকে নীত হবার (এবং খৃস্টান ও ইয়াহূদীদের মতে , নিহত হবার) পর বিগত প্রায় দু হাজার বছরে যে সব ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবী করেছেন এবং ঐশী কিতাব হিসেবে দাবী করে নতুন কিতাব পেশ করেছেন তাঁদের মধ্যে একমাত্র হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর মধ্যে নবীর গুণাবলী পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিলো এবং একমাত্র কোরআন মজীদেই পূর্ণতম ঐশী গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যসমূহ বিদ্যমান রয়েছে।

সর্বজনস্বীকৃত অকাট্য ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) ছিলেন একজন নিরক্ষর ব্যক্তি - যিনি নবুওয়াত দাবী করার পূর্বে দীর্ঘ চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত মক্কাহর জনগণের মাঝে বসবাস করেন এবং সেখানকার সকলের কাছে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সৎ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত থাকলেও জ্ঞানী , গুণী , দার্শনিক , সমাজসংস্কারক বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি অথবা কবি , সাহিত্যিক , বাচনশিল্পী বা বাগ্মী কোনোটাই ছিলেন না। হঠাৎ করে চল্লিশ বছর বয়সকাল থেকে তিনি পরম জ্ঞানে পরিপূর্ণ কোরআন নামে এক কিতাব পর্যায়ক্রমিকভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করলেন। কিন্তু তিনি নিজে এ কিতাব রচনার বাহাদুরী দাবী করলেন না , বরং এ কিতাবকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত কিতাব হিসেবে পেশ করলেন। এ কিতাব স্বীয় ঐশিতার দাবী প্রমাণের লক্ষ্যে এই বলে চ্যালেঞ্জ প্রদান করলো যে , লোকেরা যদি এ কিতাবকে মানুষের রচিত বলে মনে করে তাহলে তারা যেন এর যে কোনো সূরাহর (এমনকি ক্ষুদ্রতম সূরাহর) সমমানসম্পন্ন একটি সূরাহ্ রচনা করে নিয়ে আসে এবং প্রয়োজনে এ কাজের জন্য দুনিয়ার সমস্ত মানুষের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করে। কিন্তু মধ্যম আয়তনের এ কিতাবখানির বক্তব্যের সংক্ষিপ্ততা , রচনাশৈলী , বাগ্মিতা , জ্ঞানগর্ভতা ও পথনির্দেশ এমনই অনন্য যে , আজ পর্যন্ত সে চ্যালেঞ্জ কেউ একক বা যৌথভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয় নি।

এহেন ব্যক্তিকে নবী হিসেবে না মানা এবং এহেন কিতাবকে আল্লাহর কিতাব হিসেবে না মানা সুস্থ বিচারবুদ্ধির অধিকারী কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কেবল অন্ধ বিদ্বেষ অথবা পার্থিব লাভ-লোভ ও প্রবৃত্তির দাসত্বই এ সত্য গ্রহণ করা থেকে কাউকে বিরত রাখতে পারে।

এ মহাগ্রন্থ হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে শেষ নবী এবং নিজেকে সমগ্র মানবজাতির জন্য অনন্তকালীন পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান ও সকল কিছুর পূর্ণ জ্ঞানের আধার (تبيانا لکل شيء ) বলে উল্লেখ করেছে। অতএব , এ গ্রন্থের নাযিল্ সমাপ্ত হওয়ার ও হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ইন্তেকালের পরে ক্বিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন ব্যক্তি নবুওয়াতের দায়িত্বে অভিষিক্ত হতে ও নতুন কোনো ঐশী কিতাব নাযিল্ হতে পারে না। এ কারণেই বিগত প্রায় চৌদ্দশ বছরে যে সব ব্যক্তি নবুওয়াত্ দাবী করেছে এবং ঐশী কিতাব হিসেবে দাবী করে কিতাব পেশ করেছে , এমনকি অমুসলিম মনীষীদের নিকটও তাদের সে সব দাবী আদৌ বিবেচনাযোগ্য বলে পরিগণিত হয় নি।

এ প্রসঙ্গে মীর্যা গোলাম আহমদ কাদীয়ানীকে নবী হিসেবে গ্রহণকারী নিজেদের জন্য আহমাদীয়াহ্ পরিচয় গ্রহণকারী ও মুসলিম উম্মাহর কাছে কাদীয়ানী নামে সমধিক পরিচিত ধর্মীয় গোষ্ঠীটির দাবীর অসারতার ওপর অত্যন্ত সংক্ষেপে আলোকপাত করছি।

প্রথমতঃ আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান সম্বলিত গ্রন্থ কোরআন মজীদ নাযিল্ হওয়ার পরে নতুন কোনো পথনির্দেশক ওয়াহীর ও কোনো নতুন নবীর প্রয়োজন নেই। এমতাবস্থায় কোনো নবী প্রেরণ ও কোনো পথনির্দেশক ওয়াহী নাযিল্ করা হবে একটি বাহুল্য কাজ। আর বলা বাহুল্য যে , পরম জ্ঞানময় আল্লাহ্ তা আলা কোনো বাহুল্য কাজ করার মতো দুর্বলতা থেকে মুক্ত।

উল্লেখ্য যে , এখানে ওয়াহী বলতে আমরা পারিভাষিক অর্থে যে পথনির্দেশক ওয়াহী তা-কেই বুঝাচ্ছি - যা লোকদেরকে পথনির্দেশ প্রদানের লক্ষ্যে নবী-রাসূলগণের ( আঃ) নিকট নাযিল্ হতো এবং যা তাঁদের ওপর নবুওয়াতের দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার প্রমাণ বহন করে। এ পারিভাষিক অর্থ ছাড়া ওয়াহী শব্দের যে সব আভিধানিক অর্থ রয়েছে , যেমন : প্রাণীকুলের সহজাত প্রবণতা , প্রত্যক্ষ অনুভূতি ( intuition), স্বপ্নযোগে কোনো সত্য জানতে পারা বা কোনো সমস্যার সমাধান লাভ , হঠাৎ করেই কারো মনে কোনো কোনো সমস্যার সমাধান বা গূঢ় সত্য জাগ্রত হওয়া (ইলহাম্) ইত্যাদি - যা শুধু মু মিনের বেলায়ই ঘটে না , অনেক সময় কাফেরের বেলায়ও ঘটে থাকে - তা আমাদের এখানকার আলোচ্য বিষয় নয়।

দ্বিতীয়তঃ কাদীয়ানীরা দাবী করে যে , হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে যেহেতু কোরআন মজীদে খাতামুন্নাবীয়্যীন্ অর্থাৎ নবীগণের সীলমোহর বলা হয়েছে সেহেতু তাঁর মোহর ধারণ করে নতুন নবী আগমনের পথ খোলা রয়েছে। কিন্তু তাদের এ কথা দ্বারা হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর পরে নতুন কোনো নবীর আবির্ভাবের সম্ভাবনা প্রমাণিত হয় না। কারণ , হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) নবীগণের সীলমোহর - এ কথার মানে হচ্ছে , তিনি যাদেরকে নবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন কেবল তাঁদের নবী হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ধারণা বা ইয়াক্বীন পোষণ করতে হবে ; এদের বাইরে কারো নবুওয়াত দাবীর সত্যতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার কোনোই উপায় নেই।

অতএব , কোরআন মজীদে ও অকাট্যভাবে ছ্বহীহ্ হিসেবে প্রমাণিত হাদীছে যাদেরকে নবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁরা নিঃসন্দেহে নবী। তাঁর পরে নবী হিসেবে আসবেন বলে কতক ব্যক্তির নাম-পরিচয় যদি কোরআন মজীদে উল্লেখ থাকতো বা তিনি বলে যেতেন তাহলে এ ধরনের ব্যক্তিদের আবির্ভাবের পর অবশ্যই তাদেরকে নবী বলে মানতে হতো। কিন্তু এমন কোনো নবীর আবির্ভাব সম্বন্ধে না কোরআন মজীদে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে , না হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করে যান। সুতরাং হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর পরে নতুন কোনো নবীর আবির্ভাবের প্রশ্নই ওঠে না।

কাদীয়ানীরা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর মোহর ধারণ করে নতুন নবী আগমনের অর্থ বলে দাবী করেছে যে , নতুন নবী হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে নবী বলে স্বীকার করবেন। কিন্তু এটা একটা হাস্যস্কর অপযুক্তি। কারণ , এর দ্বারা নতুন নবুওয়াতের দাবীদার ব্যক্তি কর্তৃক হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর সীলমোহর ধারণ করা বুঝায় না , বরং নতুন নবুওয়াতের দাবীদার ব্যক্তি কর্তৃক হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ওপর নবুওয়াতের স্বীকৃতিসূচক সীলমোহর প্রয়োগ করা বুঝায় - যা থেকে তিনি মুখাপেক্ষিতাহীন।

বস্তুতঃ হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে নবী বলে স্বীকার করাই যদি কোনো ব্যক্তির নবুওয়াত-দাবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট হতো তাহলে যে কোনো ভণ্ড-প্রতারকের জন্যই নবী সাজার পথ উন্মুক্ত হয়ে যেতো। কিন্তু বিচারবুদ্ধির নিকট এ ধরনের হাস্যস্কর অপযুক্তির বিন্দুমাত্র গ্রহণযোগ্যতা নেই।

মোদ্দা কথা , যেহেতু কোরআন মজীদের দাবী ও বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর আবির্ভাবের পূর্বে নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা শেষ হয় নি এবং পূর্ণাঙ্গ , সর্বশেষ ও সংরক্ষিত ঐশী গ্রন্থ নাযিল্ হয় নি , অন্যদিকে তাঁর পরে বিগত প্রায় দেড় হাজার বছরে নবুওয়াতের দাবীদার কোনো ব্যক্তির দাবী ও উপস্থাপিত গ্রন্থ সর্বজনীন বিচারবুদ্ধি ও কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে বিবেচনাযোগ্য বলে পরিগণিত হয় নি , তেমনি স্বয়ং কোরআন মজীদ হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে সর্বশেষ নবী এবং কোরআন মজীদকে সংরক্ষিত ও পরিপূর্ণ পথনির্দেশ সম্বলিত ঐশী কিতাব হিসেবে দাবী করেছে , তেমনি কোরআনের কোনো সূরাহর সমমানসম্পন্ন কোনো নতুন সূরাহ্ রচনা কোনো মানুষ বা সকল মানুষের পক্ষেও সম্ভব হয় নি সেহেতু হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) ও কোরআন মজীদ সংক্রান্ত এ দাবী গ্রহণ করে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

দু টি ভিত্তিহীন অভিযোগ

কোরআন-বিরোধীরা , বিশেষ করে খৃস্টান পণ্ডিত ও পাশ্চাত্য জগতের প্রাচ্যবিদগণ কোরআন মজীদের বিরুদ্ধে দু টি অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে।

একটি অভিযোগ এই যে , কোরআন তার পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহের তেলাওয়াত্ বাতিল করে দিয়েছে এবং ঐ সব কিতাবের কতক বিধিবিধান পরিবর্তন করে দিয়েছে। তাদের মতে , কোরআন যদি আল্লাহর কিতাবই হবে তাহলে ইতিপূর্বে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত কিতাব সমূহের তেলাওয়াত্ বাতিল ও কতক বিধান পরিবর্তন করবে কেন ? তাদের দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছে , কোরআনে কতক স্ববিরোধী কথা আছে ; আল্লাহর কিতাব হলে তাতে স্ববিরোধী কথা থাকবে কেন ?

তাদের উত্থাপিত প্রথম অভিযোগের দু টি অংশ : পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের তেলাওয়াত্ বাতিল করা হলো কেন এবং কতক বিধানে পরিবর্তন সাধন করা হলো কেন ?

বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে তাদের এ অভিযোগ বিবেচনাযোগ্য নয়। কারণ , প্রথমতঃ পূর্ববর্তী ঐশী কিতাব সমূহে একদিকে যেমন ব্যাপকভাবে বিকৃতি ঘটেছে - যা তারা নিজেরাও স্বীকার করতে বাধ্য , অন্যদিকে তা মূল ভাষায় বর্তমান নেই। ক্ষেত্রবিশেষে মূল ভাষা থেকে হারিয়ে যাবার পর অন্য ভাষার অনুবাদ থেকে পুনরায় মূল ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সুতরাং মূল ভাষায় যেভাবে নাযিল্ হয়েছিলো সেভাবে না থাকায় এবং মূল ভাষায় থাকা বা না-থাকা প্রশ্নে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও এবং কোনো কোনেটি যদি মূল ভাষায় বর্তমান থেকেও থাকে তথাপি সেগুলোতে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত কথার সাথে মানুষের কথা মিশ্রিত হওয়ার ফলে ঐ সব কিতাবের কথাগুলো আর আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত কথা নেই। সুতরাং সেগুলো আর পবিত্র ঐশী বাণী হিসেবে তেলাওয়াতযোগ্য নেই।

দ্বিতীয়তঃ ঐ সব কিতাবের বিকৃতি কেবল তার পাঠ ( text)-এর পঠন - পাঠনের মধ্যেই ঘটে নি , বরং বিধি - বিধানের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। অন্যদিকে ঐ সব কিতাবের কোনোটিই স্থান ও কাল নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল্ হয় নি , বরং মানবসভ্যতার বিকাশের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন নবী - রাসূল প্রেরণ করা হয় এবং তাদের জন্য নাযিলকৃত কিতাব সমূহে কতক স্থায়ী বিধানের পাশাপাশি কতক বিধান শামিল করা হয়েছিলো একান্তভাবেই তাদের নিজস্ব ও সাময়িক প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে। এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর অপরাধের শাস্তি হিসেবে বা তাদের ঈমান ও আনুগত্য পরীক্ষার লক্ষ্যেও কতক বিধান নাযিল্ করা হয়েছিলো।

বলা বাহুল্য যে , স্থান ও কাল নির্বিশেষে ক্বিয়ামত্ পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুসরণীয় ঐশী বিধান হিসেবে সেগুলোর কোনোই কার্যকরিতা ছিলো না। অবশ্যঃ সন্দেহ নেই যে , ঐ সব গ্রন্থের সবগুলো ঐশী বিধানই স্থান-কাল ও গোষ্ঠীর জন্য নাযিলকৃত সাময়িক বিধান ছিলো না এবং যে সব স্থায়ী বিধান ছিলো তার সবগুলোই যে বিকৃত হয়ে গিয়েছিলো তা নয় ; কতক বিধান অবশ্যই অবিকৃত অবস্থায় র য়ে গিয়েছে। কিন্তু স্থান-কাল ও বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে ক্বিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় বিধান হিসেবে কেবল ঐ বিধানগুলোই যথেষ্ট ছিলো না , বরং আরো অনেক বিধানের প্রয়োজন ছিলো। এমতাবস্থায় সামগ্রিক বিধানের গ্রন্থ হিসেবে ঐ সব গ্রন্থের ব্যবহার হতো এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টিকারী কাজ এবং নতুন নাযিলকৃত গ্রন্থের পাশাপাশি ঐ সব গ্রন্থের ব্যবহারের কোনোই উপযোগিতা ছিলো না। এ কারণেই ঐ সব গ্রন্থের স্থায়ী বিধানগুলোকে কোরআনের অন্তর্ভুক্ত করে পুনরায় নাযিল্ করা বা স্বয়ং হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর বিধানিক আচরণের মাধ্যমে অব্যাহত রাখাই (যেমন : খাৎনাহর বিধান) যথেষ্ট ছিলো। [স্মর্তব্য যে , কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) কোরআনের বাইরে যে সব নীতিগত , আইনগত বা শিক্ষণীয় তথা নবুওয়াতের দায়িত্বসংশ্লিষ্ট যে সব কথা বলতেন তার কোনোটিই তাঁর প্রবৃত্তি থেকে বলতেন না , বরং আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওয়াহী হিসেবে বলতেন - যাকে ওয়াহীয়ে গ্বায়রে মাত্লূ (পঠন-অযোগ্য ওয়াহী) বলা হয়।]

পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহে প্রদত্ত বিভিন্ন বিধিবিধান এবং সে সব কিতাবের আয়াত্ ভুলিয়ে দেয়া বা সে সবের তেলাওয়াত রহিত করে দেয়ার বিরুদ্ধে ইয়াহূদী ও খৃস্টানদের উত্থাপিত আপত্তির জবাবে আল্লাহ্ তা আলা এরশাদ করেন :

) م َا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا(

আমি কোনো আয়াতকে তার চেয়ে অধিকতর উত্তম বা তার অনুরূপ (আয়াত্) আনয়ন ব্যতীত কোনো আয়াত্ রহিত করে দেই না বা ভুলিয়ে দেই না। (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : 106)

এ প্রসঙ্গে আমরা ইতিপূর্বে ক্বিয়ামত পর্যন্ত স্থান-কাল নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য সর্বশেষ স্থায়ী বিধান দিতে গিয়ে পূর্ববর্তী কতক বিধিবিধানে রদবদল সাধনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছি। এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে , কতক বিধিবিধান হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কাজ বা বস্তুর প্রকৃতিগত অনিবার্য দাবী। এরূপ ক্ষেত্রে বিধান অপরিবর্তিত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। উদাহরণস্বরূপ , যে সব কাজ বা খাদ্য-পানীয় মানুষের জন্য শারীরিক , মানসিক , নৈতিক , চারিত্রিক বা আত্মিক ক্ষতি ডেকে আনে তা অবশ্যই হারাম হওয়া উচিত এবং এ কারণে প্রথম মানুষ হযরত আদম ( আঃ) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূলের ( আঃ) শরী আতেই তা হারাম ছিলো। যেমন : মিথ্যা বলা , চুরি-ডাকাতি , যেনা , নরহত্যা , মাদক দ্রব্য সেবন ইত্যাদি।

কিন্তু অন্য অনেক বিধানের ক্ষেত্রগুলো এমন যে , এ সব ক্ষেত্রে বিধানের জন্য কোনো প্রাকৃতিক মানদণ্ড নেই , ফলে স্থান-কাল নির্বিশেষে অভিন্ন বিধান হওয়া অপরিহার্য নয়। এ সব ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা আলা চাইলে কোনো বিধানকে স্থায়ীভাবেও দিতে পারেন , আবার চাইলে কোনো বিধানকে অস্থায়ীভাবেও দিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ , ইবাদত-বন্দেগী সংক্রান্ত বিধি-বিধান - যা দ্বারা আল্লাহ্ তা আলার প্রতি বান্দাহর আনুগত্য পরীক্ষা করাই উদ্দেশ্য। যেমন : ইবাদত দৈনিক কতো বার ও কোন্ নিয়মে করতে হবে তার কোনো প্রাকৃতিক মানদণ্ড নেই ; আল্লাহ্ তা আলা যেভাবে চান বান্দাহ্কে সেভাবেই তা আঞ্জাম দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা আলা বিভিন্ন নবীর সময় বিভিন্ন ধরনের হুকুম দিলে তা তাঁর অধিকার।

অনুরূপভাবে সামাজিক বিধি-বিধান এবং অপরাধের শাস্তি বা দণ্ডবিধানেরও কোনো প্রাকৃতিক মানদণ্ড নেই। এ সব ক্ষেত্রেও আল্লাহ্ যখন যেভাবে চান হুকুম দিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ , আল্লাহ্ তা আলা যদি যেনার শাস্তি চাবূকের একশ ঘা নির্ধারণ না করে দু বা পঞ্চাশ ঘা নির্ধারণ করে দিতেন তাহলেও কারো কিছু বলার ছিলো না।

এছাড়া আল্লাহ্ তা আলা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে পরীক্ষা করার বা শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে অস্থায়ী বিশেষ বিধান নাযিল্ করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ বানী ইসরাঈলের জন্য শনিবারের বিধান ও চর্বি ভক্ষণ হারাম করার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।


9

10

11

12

13

14

15

16

17

18