কোরআনের পরিচয়

কোরআনের পরিচয়16%

কোরআনের পরিচয় লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: কোরআন বিষয়ক জ্ঞান

কোরআনের পরিচয়
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 33 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 22593 / ডাউনলোড: 3656
সাইজ সাইজ সাইজ
কোরআনের পরিচয়

কোরআনের পরিচয়

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

অত্র গ্রন্থে কোরআন মজীদের বেশ কিছু আয়াত উদ্ধৃত হয়েছে এবং এ সব আয়াতের মধ্যে এমন আয়াতও রয়েছে যাতে আল্লাহ্ তা আলা নিজের জন্য উত্তম পুরুষে বহুবচন অর্থাৎ আমরা শব্দ ব্যবহার করেছেন। তৎকালীন আরবী বাকরীতিতে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালীদের মুখে নিজের জন্য এক বচন অর্থেই আমরা ব্যবহারের প্রচলন ছিলো , এ কারণে তৎকালীন আরবের মোশরেকরা কোরআন মজীদে আল্লাহ্ তা আলা নিজের জন্য আমরা ব্যবহার করায় এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে নি তথা একে বহু ঈশ্বরবাদের সপক্ষে প্রমাণ বলে দাবী করে নি। কিন্তু যদিও বাংলা সহ আরো অনেক ভাষায় সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বা বিনয় প্রকাশের জন্য এর প্রচলন রয়েছে তথাপি বাংলা বাকরীতিতে অনেক ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিনয়স্বরূপ আমরা এবং কর্তৃত্বভাব প্রকাশের জন্য আমি ব্যবহারেরও প্রচলন আছে। এ কারণে বাংলা ভাষায় আল্লাহ্ তা আলার জন্য আমরা ব্যবহার বেখাপ্পা শুনায় বিধায় আমরা এক বচনে এর অনুবাদ করেছি। অত্র গ্রন্থে এ ধরনের সকল আয়াতের ক্ষেত্রেই আমরা এ রীতি অনুসরণ করেছি।


1

2

3

বিসমিল্লাহ্ পাঠ নিয়ে বিতর্ক

এ বিষয়ে একটা আনুষঙ্গিক বিতর্ক এই যে , কোরআন মজীদের ১১৪টি সূরাহর মধ্যে সূরাহ্ আত্-তাওবাহ্ বাদে ১১৩টি সূরাহর শুরুতে যেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ রয়েছে তা সংশ্লিষ্ট সূরাহ্ সমূহের অংশ কিনা।

এ বিষয়ে ফক্বীহদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। ফক্বীহদের মধ্যে অনেকে মনে করেন যে , যে যে সূরাহর শুরুতেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ রয়েছে সে সে ক্ষেত্রে তা সংশ্লিষ্ট সূরাহর অংশ এবং কোরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে যেমন ঐ সবبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ যথাস্থানে তেলাওয়াত্ করতে হবে ঠিক সেভাবেই নামাযে কোনো সূরাহ্ পড়ার সময় (সূরাহ্ আত্-তাওবাহ্ বাদে) তাبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ সহ পাঠ করতে হবে।

অন্য একদল ফক্বীহ্ মনে করেন যে , সূরাহ্ সমূহের শুরুতে যেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ রয়েছে তার মধ্যে কেবল সূরাহ্ আল্-ফাতেহার শুরুতে তা ঐ সূরাহর অংশ , অন্যান্য সূরাহর শুরুতে তা সংশ্লিষ্ট সূরাহ্ সমূহের অংশ নয়। সুতরাং নামাযে ঐ সব সূরাহর শুরুতে তা পাঠ করতে হবে না। তাঁদের মতে , ঐ সব সূরাহর শুরুতেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ লেখা হয়েছে বিভিন্ন সূরাহকে পরস্পর থেকে পৃথক করে দেখানোর জন্য।

আবার কেউ কেউ মনে করেন যে , সূরাহ্ আন্-নামল্-এর ভিতরে যেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ রয়েছে কেবল তা-ই কোরআন মজীদের অংশ ; সূরাহ্ আত্-তাওবাহ্ বাদে সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহ্ সহ অন্যান্য সূরাহর শুরুতে যেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ রয়েছে তার কোনোটিই ঐ সব সূরাহর অংশ নয় , বরং কোরআন তেলাওয়াতبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ বলে শুরু করা যরূরী বিধায় সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহর শুরুতে এবং বিভিন্ন সূরাহর মধ্যে পার্থক্য নির্দেশের জন্য অন্যান্য সূরাহর শুরুতে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) স্বউদ্যোগে বা জিবরাঈলের পরামর্শে তা যোগ করেন।

কোরআন তেলাওয়াতের সময় সকল মুসলমানই কোরআন মজীদে লিখিত সবগুলোبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ যথাস্থানে তেলাওয়াত করে থাকেন। কিন্তু এ মতপার্থক্যের কারণে প্রথমোক্ত মতের অনুসারীরা নামাযে প্রতিটি সূরাহর শুরুতে (সূরাহ্ আত্-তাওবাহ্ বাদে)بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ পাঠ করেন , দ্বিতীয় মতের অনুসারীরা নামাযে কেবল সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহর শুরুতে তা পাঠ করেন এবং তৃতীয় মতের অনুসারীরা নামাযে কেবল প্রথম রাক্ আতে সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহর শুরুতে তা পাঠ করে থাকেন।

এ মতপার্থক্য সম্বন্ধে কেবল এতোটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে , এ মতপার্থক্য হচ্ছে কোরআন মজীদের ব্যাখ্যা ও ব্যবহার সংশ্লিষ্ট মতপার্থক্য ; এর সাথে কোরআন মজীদের অবিকৃত থাকা বা না-থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ , এ ব্যাপারে কোনোরূপ মতপার্থক্য নেই যে , স্বয়ং হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর নির্দেশে ১১৪টি সূরাহর মধ্যে ১১৩টির সূরাহর শুরুতেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ লেখা হয়েছে। সুতরাং এটা সন্দেহাতীত যে , কোরআন মজীদ তিনি যেভাবে রেখে গিয়েছেন তা সেভাবেই আছে ; তাতে কোনো ধরনের রদবদল হয় নি।

যদিও কোরআন মজীদ হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) যেভাবে রেখে গিয়েছেন ঠিক সেভাবেই আছে কিনা এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য ওপরের আলোচনাই যথেষ্ট এবং মুসলিম মনীষীদের মধ্যকার উপরোক্ত বিতর্কের সমাধান করা অপরিহার্য মনে না হতে পারে , কিন্তু যেহেতু কোরআন মজীদ নাযিল্ হয়েছে ইলমী ও ইবাদী ব্যবহারের জন্য সেহেতু এ বিতর্কের অবসানও অপরিহার্য বলে আমরা মনে করি এবং এ কারণে এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করছি।

যারা মনে করেন যে , কোরআন মজীদের ১১৪টি সূরাহর মধ্যে ১১৩টির সূরাহর শুরুতে যেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ লেখা হয়েছে তা এ সব সূরাহর বা অন্ততঃ সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহ্ বাদে ১১২টি সূরাহর অংশ নয় তাঁদের এ মত ঠিক নয় , বরং সূরাহ্ আত্-তাওবাহ্ বাদে বাকী ১১৩টি সূরাহর ক্ষেত্রেইبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ এ সব সূরাহর অংশ। কারণ , সূরাহ্ সমূহের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করাই যদি উদ্দেশ্য হতো তাহলে সে জন্য সূরাহ্ সমূহের শুরুতে ও/বা শেষে অন্য যে কোনো পার্থক্য নির্দেশক চিহ্ন বা সঙ্কেত বা শব্দ ব্যবহার করাই যথেষ্ট হতো , কোরআন মজীদেরই (সূরাহ্ আন্-নামল্-এর) একটি আয়াতকে এভাবে ব্যবহার করা হতো না।

এর পরেও আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে ,بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ দুই সূরাহর পার্থক্য নির্দেশের জন্য লেখা হয়েছে তাহলে সূরাহ্ আত্-তাওবাহর শুরুতেও তা লেখা হতো এবং কোনো সূরাহর শুরুতেই তা তেলাওয়াত্ করা হতো না। আর যদি তা কেবল সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহর শুরুতেই কোরআন মজীদের অংশ হতো তাহলে তা অন্য কোনো সূরাহর শুরুতে লেখা হতো না।

যারা মনে করেন যে , কোরআন তেলাওয়াতের জন্য যরূরী বিধায় এভাবে লেখা হয়েছে তাঁদের কথা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ , সে ক্ষেত্রে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর মৌখিক আদেশ ও আমলই যথেষ্ট হতো। এমনকি তা যদি সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহর শুরুতেও এর অংশ না হতো তাহলে সেখানেও তা লেখা হতো না।بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ বলে কোরআন তেলাওয়াত্ শুরু করার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে গোটা উম্মাহর মধ্যে মতপার্থক্য নেই , যদিও তা কি ফরয/ওয়াজিব্ নাকি সুন্নাত্ তা ভিন্ন আলোচ্য বিষয়। সুতরাং কোনো সূরাহর মাঝখান থেকে তেলাওয়াত্ শুরু করলে যেভাবে সংশ্লিষ্ট স্থানে লেখা না থাকা সত্ত্বেও নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর আমল অনুসরণেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ বলে তেলাওয়াত্ শুরু করা হয় , ঠিক সেভাবেই সূরাহর বা কোরআনের শুরু থেকে তেলাওয়াত্ করার ক্ষেত্রে সকলেই তা পড়ে তেলাওয়াত্ শুরু করতেন ; সূরাহ্ সমূহের শুরুতে লেখার প্রয়োজন হতো না।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে , কোরআন মজীদের শুরু থেকে বা কোনো সূরাহর শুরু থেকে বা কোনো সূরাহর মাঝখান থেকে - তথা যেখান থেকেই তেলাওয়াত শুরু করা হোক না কেন তাاعوذ بالله من الشيطان الرجيم বলে শুরু করা অপরিহার্য। কারণ , আল্লাহ্ তা আলা এরশাদ করেন:

অতএব , (হে রাসূল!) আপনি যখন কোরআন পাঠ করবেন তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। (সূরাহ্ আন্-নাহল্: ৯৮)

এমতাবস্থায় হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) যদি কোরআন তেলাওয়াতের শুরু সংক্রান্ত হুকুম পালনের কথা সকলকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য এবং সূরাহ্ সমূহের মধ্যকার পার্থক্য নির্দেশের জন্য কোনো কিছু যোগ করতে চাইতেন তাহলে প্রত্যেক সূরাহর শুরুতেاعوذ بالله من الشيطان الرجيم যোগ করাই হতো অধিকতর উত্তম। এমনকি সে ক্ষেত্রে সূরাহ্ আত্-তাওবাহর শুরুতেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ না লেখার যে কারণ সম্পর্কে সকলে একমতاعوذ بالله من الشيطان الرجيم লেখা হলে সে কারণ সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াতো না।

এ থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে , কোরআন মজীদের ১১৪টি সূরাহর মধ্যে ১১৩টির শুরুতে যেبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ লেখা হয়েছে তা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) নিজের পক্ষ থেকে বা জিব্রাঈলের পরামর্শে লিপিবদ্ধ করান নি , বরং ঐ সূরাহ্গুলোبِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ সহই নাযিল্ হয়েছে এবং তা ঐ সব সূরাহর প্রথম আয়াত বা প্রথম আয়াতের অংশ।

এ মতের বরখেলাফে কোনোই অকাট্য দলীল বর্তমান নেই।

কতক কপিতে শব্দগত পার্থক্যের অভিযোগ

কোনো কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে , কোনো কোনো ছ্বাহাবীর নিকট কোরআন মজীদের যে নিজস্ব কপি ছিলো তাতে বর্তমানে প্রচলিত কোরআন মজীদ অর্থাৎ মুছ্বহাফে উছমান্ থেকে কতক শব্দের ও কতক শব্দের বানানে পার্থক্য ছিলো। এ ব্যাপারে ছ্বাহাবী উবাই বিন্ কা ব্-এর কপি সম্পর্কে বলা হয় যে , তাতে সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহরو لا الضالين স্থলেغير الضالين লেখা ছিলো।

এ সম্বন্ধে বলতে হয় যে , যেহেতু এ সব বর্ণনা খবরে ওয়াহেদ্ , সেহেতু এগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ , যেভাবে সকল শীর্ষস্থানীয় ছ্বাহাবীর সহায়তাক্রমে সর্বত্র মুছ্বহাফে উছমান্ প্রচার করা হয়েছিলো এবং সকলকে নিজ নিজ কপি তার সাথে মিলিয়ে নিয়ে সংশোধনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো , আর এ নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিলো , এমতাবস্থায় কোনো ছ্বাহাবীর কপিতে তা থেকে কোনো শব্দগত পার্থক্য থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ , ছ্বাহাবীরা যে কোরআন তেলাওয়াত করতেন তা কোনো গোপনীয় বিষয় ছিলো না , বিশেষ করে প্রত্যেক মুসলমানকে যেহেতু দৈনিক কয়েক বার নামাযে সূরাহ্ আল্-ফাতেহাহ্ পাঠ করতে হয় সেহেতু কারো পক্ষ থেকেو لا الضالين স্থলেغير الضالين পড়া ও তা গোপন রাখা সম্ভব ছিলো না , ফলে তাঁর মুছ্বহাফে কীরূপ লেখা ছিলো তা-ও গোপন থাকতো না। এমতাবস্থায় তাঁকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদের সম্মুখীন হতে হতো এবং এ নিয়ে সংঘাতের সৃষ্টি হতো না। কিন্তু এ ধরনের কোনো বিরোধ-সংঘাতের কথা কোনো অকাট্য সূত্রেই জানা যায় না।

সুতরাং সর্বোচ্চ মুতাওয়াতির্ সূত্রে বর্ণিত গ্রন্থ কোরআন মজীদের মোকাবিলায় সন্দেহ সৃষ্টিকারী এ ধরনের দাবী সম্বলিত খবরে ওয়াহেদ্ বর্ণনাকে আদৌ সত্য বলে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। বরং এ ধরনের বর্ণনাসমূহ যে ইসলামের দুশমনদের দ্বারা অনুপ্রবিষ্ট মিথ্যা ছিলো এ ব্যাপারে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।

ক্বিরাআতে বিভিন্নতার প্রশ্ন

অনেকে কোরআন মজীদের সাত , দশ বা ততোধিক বিখ্যাত পাঠ বা তেলাওয়াৎকেও কোরআনের অবিকৃত থাকার ওপর সংশয় সৃষ্টিকারী বলে মনে করেন। এ প্রশ্নটি তোলা হয় বিষয়টি সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণার অভাবে।

কোরআন মজীদের সাত , দশ বা ততোধিক বিখ্যাত পাঠ ( তেলাওয়াত্ )- এর উদ্ভব হয় কোরআন নাযিল্ ও গ্রন্থাবদ্ধ হওয়ার এবং অভিন্ন কপি প্রচারিত হওয়ার অ নেক পরে। আর এ বিষয়টি প্রায় পুরোপুরি তেলাওয়াতের সৌন্দর্যের সাথে সম্পৃক্ত ; এর সাথে কোরআন মজীদের পাঠ ( text)-এর কোনোই সাংঘর্ষিকতা নেই। অন্যদিকে তেলাওয়াত্ - সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টি রেখে এ ধরনের বিভিন্ন পাঠের উদ্ভাবন এক ধরনের ইজতিহাদী বিষয় - যার কোনোটিকেই গ্রহণ ক রা অপরিহার্য নয় এবং এর বাইরেও যে কেউ যে কোনোভাবে তেলাওয়াত্ করতে পারে , কেবল শর্ত এই যে , কোরআন মজীদের পাঠ ( text)-এ কোনো রকমের হ্রাস - বৃদ্ধি করতে পারবে না , দীর্ঘ ও স্বল্পবিরতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যাকরণিক বিষয়গুলো মেনে চলবে এবং অর্থে যাতে পরিবর্তন না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখবে।

কতক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে , উপরোক্ত পাঠসমূহের উদ্ভাবকগণের মধ্যে কদাচিৎ কতক ক্ষেত্রে বর্ণ ও শব্দ সংক্রান্ত মতপার্থক্য ছিলো। আসলে এ ধরনের মতপার্থক্য আদৌ ছিলো কিনা তা নিশ্চিত নয়। কারণ , এ সব বর্ণনা মিথ্যাও হতে পারে। এমনকি এ সব বর্ণনা সত্য হলেও তাতে কিছুই আসে যায় না। কারণ , ছ্বাহাবীদের যুগ থেকে সর্বসম্মতভাবে চলে আসা মুছ্বহাফে উছ্মানের কোনো শব্দ বা বর্ণের ব্যাপারে পরবর্তীকালে কেউ ভিন্নমত পোষণ করে থাকলে (সত্যিই যদি কেউ করে থাকেন) তার যে কোনোই মূল্য নেই তা সুস্থ বিচারবুদ্ধির অধিকারী যে কেউই স্বীকার করতে বাধ্য।

অন্যদিকে তাঁদের মধ্যে হারাকাত , ই রাব্ ও যতির ব্যাপারেও কদাচিৎ মতপার্থক্য হয়েছে , কিন্তু তাতে কোরআন মজীদের মূল পাঠে (যাতে এগুলো ছিলো না) কোনোই পার্থক্য ঘটছে না। এরূপ ক্ষেত্রে যথাযথ ইলমী যোগ্যতার অধিকারীরা ব্যাকরণসম্মত ও সঠিক তাৎপর্যের প্রতি দৃষ্টি রেখে এ ধরনের মতপার্থক্যের নিরসন করতে সক্ষম। অবশ্য হারাকাত , ই রাব্ ও যতি সংক্রান্ত মতপার্থক্যগুলো খুবই গৌণ ও সংখ্যায়ও খুবই কম।

মতপার্থক্য যখন অকাট্যতার প্রমাণ

কোরআন মজীদের পাঠের বেলায় কতক ক্ষেত্রে হারাকাত , ই রাব্ ও যতির ব্যাপারে যে মতপার্থক্য ঘটেছে - তাৎপর্যের দৃষ্টিতে যা নেহায়েতই গৌণ , তা থেকে প্রমাণিত হয় যে , অতীতের কোরআন-বিশেষজ্ঞগণ এর নির্ভুল ও সুন্দরতম উচ্চারণ নিশ্চিতকরণ এবং তাৎপর্যের ক্ষেত্রে সামান্যতম দুর্বলতাকেও এড়াবার জন্য দারুণভাবে চেষ্টিত ছিলেন। এ কারণে তাঁরা তাঁদের পূর্ববর্তীদের দেয়া হারাকাত্ ও ই রাবের সাথে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মতপার্থক্য করেছেন। এ মতপার্থক্যের ভিত্তি ছিলো এই যে , যেহেতু এগুলো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) থেকে আসে নি সেহেতু তাঁদের বিবেচনায় এগুলোতে কোনো দুর্বলতা থাকলে তা অবশ্যই সংশোধন করা উচিত। এ থেকে সুস্পষ্ট যে , যারা এহেন খুটিনাটি বিষয়ে এতো যত্নবান তাঁরা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) থেকে সর্বোচ্চ মুতাওয়াতির্ সূত্রে বর্ণিত কোরআন মজীদের মূল পাঠে সামান্যতম এদিক-সেদিক হওয়া থেকেও কতো সচেতন ছিলেন। আর এ সচেতনতা ও সতর্কতা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের হারাকাত্ প্রশ্নে মতপার্থক্য প্রসঙ্গে

অত্র গ্রন্থকারের জানামতে কোরআন মজীদের পাঠের ক্ষেত্রে হারাকাত্ সংক্রান্ত ভিন্নমতের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে কেবল একটি হারাকাতের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আমলী তথা ফিক্বহী প্রশ্ন জড়িত। তা হচ্ছে ওযূর আয়াত। এ আয়াতে এরশাদ হয়েছে:

) ي َا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ(

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নামাযে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দণ্ডায়মান হবে তখন তোমরা তোমাদের চোহারাসমূহ ও হাতগুলো কনুই পর্যন্ত ধৌত করো এবং তোমাদের মাথাগুলো মাসেহ্ করো ও পাগুলো টাখনু পর্যন্ত (মাসেহ্ করো)। (সূরাহ্ আল্-মাএদাহ্: ৬)

এখানে উক্ত আয়াতেরارجلکم শব্দের লাম (ل ) হরফের হারাকাত্ নিয়ে মতপার্থক্য হয়েছে। অধিকাংশের মতে এর উচ্চারণ হবে আরজুলাকুম্ এবং কতকের মতে এটির উচ্চারণ হবে আরজুলেকুম্ । প্রথমোক্ত উচ্চারণ সঠিক গণ্য করলে পায়ের আঙ্গুলের অগ্রভাগ থেকে পায়ের গিরা (টাখনু) পর্যন্ত হাত টেনে পুরো পায়ের পাতা মাসেহ্ করতে হবে , আর দ্বিতীয়োক্ত উচ্চারণকে সঠিক গণ্য করলে পায়ের পাতার অগ্রভাগ থেকে টাখনুর দিকে হাত টেনে আংশিক মাসেহ্ করলেই যথেষ্ট হবে।

এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য সন্দেহ নেই , কিন্তু এর সমাধান আদৌ কঠিন নয়। এখানে দু টো উচ্চারণই ব্যাকরণসম্মত। কিন্তু যেহেতু মতপার্থক্য হয়েছে সেহেতু ইসলামী বিধিবিধান নির্ণয় সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি - সতর্কতার নীতির আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। তা হচ্ছে , পুরো পায়ের পাতাই মাসেহ্ করতে হবে। কারণ , এমনকি যদি আংশিক মাসেহ্ করারই হুকুম দেয়া হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রেও পুরো পায়ের পাতা মাসেহর মধ্যে উক্ত অংশ শামিল থাকায় এবং আংশিক নাকি পুরো এ ব্যাপারে সংশয় দেখা দেয়ায় পুরো পায়ের পাতা মাসেহ্ করলে ভুল হবে না।

এখানে উক্ত আয়াতের তাৎপর্য থেকে সুস্পষ্ট যে , উপরোক্ত আরজুলাকুম্ আরজুলেকুম্ উচ্চারণবিতর্কে পা ধোয়ার অথবা জুতা বা মোযার (যে ধরনের চামড়ার মোযার কথা বলা হয় তা আসলে এক ধরনের জুতা) ওপর মাসেহ্ করার হুকুমের অর্থ করার কোনোই সুযোগ নেই। কারণ , উক্ত আয়াতে দু টি ক্রিয়াপদের আওতায় দু টি বাক্য রয়েছে ও বাক্যদ্বয়ে দু টি করে চারটি কর্ম রয়েছে এবং সংযোজক ওয়াও দ্বারা বাক্য দু টিকে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে জুতা বা মোযা-র তো কোনো উল্লেখই নেই। উক্ত আয়াতে আরজুলাকুম্ কর্মকে মাসেহ্ ক্রিয়াপদের আওতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধৌতকরণ ক্রিয়াপদের অধীনে গণ্য করার কোনো সুযোগই নেই। কোরআন মজীদে বা আরবী সাহিত্যের অন্যত্র এভাবে সংশ্লিষ্ট ক্রিয়াপদকে উপেক্ষা করে কোনো কর্মের ওপর অন্য বাক্যস্থ ক্রিয়াপদের ক্রিয়া করার কোনো দৃষ্টান্ত আদৌ নেই। পা ধোয়ার হুকুমের সপক্ষে যে সব হাদীছ হাযির করা হয় রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ওফাতের দুই শতাধিক বছর পরে সংকলিত সে সব খবরে ওয়াহেদ্ হাদীছের কোনোই গ্রহণযোগ্যতা নেই।

অন্যদিকে কতক লোক হাতের চেয়ে পায়ে ধুলাময়লা বেশী লাগার যুক্তি দেখিয়ে ওযূর হুকুমের পিছনে মনগড়া কারণ নির্দেশ করে , অথচ আল্লাহ্ তা আলা এ ধরনের কারণ বলেন নি। বস্তুতঃ ওযূর হুকুমের পিছনে স্রেফ্ আল্লাহ্ তা আলার আনুগত্য পরীক্ষা করা ছাড়া কোনো বস্তুগত কারণ নিহিত নেই। তা থাকলে তায়াম্মুম্ (যাতে চেহারায় ও হাতে মাটি তথা ধুলা লাগাতে হয়) ওযূ ও গোসলের বিকল্প হতে পারতো না। অবশ্য পা সহ শরীরের কোনো অংশে বাহ্যিক নাপাকী থাকলে ওযূ শুরু করার আগে অবশ্যই তা অপসারণ করে ও পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে , (বেশী ধুলাবালি ও কাদার ক্ষেত্রেও তা-ই করতে হবে ,) অতঃপর ওযূ করতে হবে - যার শেষ রুকন্ হচ্ছে পা মাসেহ্ করা।

ওয়াহাবীদের উপস্থাপিত দলিলের পর্যালোচনা

প্রথম দলিল

পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি ওয়াহাবীরা তাদের মতের সপক্ষে নিম্নোক্ত হাদীসটি উপস্থাপন করে থাকে যে,মহানবী (সা.) বলেছেন : যখন কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে তখন তার সকল সৎকর্ম বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ব্যতীত যথা সাদকায়ে জারীয়া (মসজিদ,মাদ্রাসা,স্কুল,হাসপাতাল,ইয়াতিম খানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা),তার রেখে যাওয়া যে জ্ঞান হতে অন্যান্যরা লাভবান হয় এবং সৎকর্মশীল (নেক) সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।

তারা উপরিউক্ত হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চায় মৃত্যুর মাধ্যমে এ পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে তারা এ পৃথিবী হতে কোন কল্যাণ প্রাপ্ত হয় না এবং এ পৃথিবীতে তারা কোন প্রভাবও রাখতে সক্ষম নন।

আমাদের উত্তর

উপরিউক্ত হাদীসটিতে তিনটি কর্ম ব্যতীত মৃতব্যক্তি নিজের জন্য অন্য কোন কর্ম করতে পারে না বলা হয়েছে অর্থাৎ যে কর্মসমূহ মৃতব্যক্তি তার জীবদ্দশায় পরবর্তী জীবনের জন্য করতে পারত তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে ঐ তিনটি ব্যতীত অন্য কোন কর্মের সওয়াব সে অনবরত লাভ করতে পারবে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে,অন্য কোন ব্যক্তি তার পক্ষে কোন কাজ করলে তা হতে সে লাভবান হবে না বরং অন্য কোন ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর তার নিয়তে কোন সৎকর্ম করলে সে সওয়াব পেতে পারে। কারণ তা তার নিজ কর্মের উপর নির্ভরশীল নয়।৯৭

দ্বিতীয় দলিল

পবিত্র কোরআনের কোন কোন আয়াত হতে বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় মৃতরা শুনতে পায় না। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন :

( فَإِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ)

সুতরাং নিশ্চয়ই (হে নবী!) তুমি মৃতদের (যাদের অন্তর মৃত) শোনাতে সক্ষম নও এবং বধিরদের কর্ণেও তা পৌঁছাতে সক্ষম নও যখন তারা( নিজেরাই) পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। ৯৮

অন্য আয়াতে এসেছে :

( وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَاءُ وَلَا الْأَمْوَاتُ إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَنْ يَشَاءُ وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ)

অবশ্যই জীবিত ও মৃত সমান নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে চান শোনান। তুমি যে ব্যক্তি কবরে আছে তাকে শোনাতে সক্ষম নও। ৯৯

আমাদের উত্তর

প্রথমত উপরিউক্ত আয়াতের লক্ষ্য কবরে শায়িত প্রাণহীন দেহ হতে পারে যা মাটিতে পরিণত হয়েছে ফলে কোন কিছু বুঝতে সক্ষম নয়।

দ্বিতীয়ত শুনতে সক্ষম নয় অর্থ কোন কল্যাণ অর্জনে সক্ষম নয় হতে পারে যা বধিরতার সমার্থক বলা হয়েছে। ফলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় এই মুশরিক পৌত্তলিকরা কোরআনের আয়াত শোনে কিন্তু তা হতে কোন কল্যাণ লাভ করে না যেমন কবরে শায়িতরা তোমার কথা শুনে কিন্তু কোন কল্যাণ প্রাপ্ত হয় না। কারণ তাদের সময় (কল্যাণ লাভের সুযোগ) শেষ হয়ে গেছে।

ইবনে কাইয়্যেম জাওযিয়াوما أنتَ بِمُسمعٍ من فی القبور আয়াতটির তাফসীরে বলেছেন : আয়াতটির  লক্ষ্য সে সকল কাফের যাদের অন্তর মৃত,ফলে (হে নবী!) তুমি তাদের কর্ণে সত্যকে পৌঁছাতে সক্ষম নও যা হতে তারা লাভবান হতে পারে। যেমন কবরে শায়িতদের এমনভাবে শোনাতে সক্ষম নও যা হতে কল্যাণ লাভ করতে পারে।

( فَإِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ)

ইবনে কাইয়্যেম এ আয়াতের তাফসীরে বলেছেন : তাদের শ্রবণের অক্ষমতা এ অর্থে যে,যেহেতু মুশরিকদের অন্তর মৃত সেহেতু তুমি  সত্যকে তাদের নিকট পৌঁছাতে সক্ষম নও যেমনটি মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। ১০০

হাসান ইবনে আলী সাক্কাফ আশশাফেয়ীو ما أنت بمسمعٍ من فی القبور আয়াতটির তাফসীরে বলেছেন : আয়াতটির লক্ষ্য সে সকল কাফের যারা বাতিলের পথে একগুয়েমি  প্রদর্শন করে। ফলে তোমার উপদেশ হতে লাভবান হয় না যেমন কবরে শায়িতরা তোমার উপদেশ হতে কল্যাণ পায় না। অতঃপর তিনি তাফসীরে সাবুনী থেকে বর্ণনা করেছেন যে,আয়াতটির অর্থ হল যেমনভাবে মৃত কাফিররা তোমার হেদায়েত ও আহ্বান হতে কল্যাণ প্রাপ্ত হয় না দূর্ভাগা মুশরিকরাও তেমনি তোমার সৎপথ প্রদর্শন হতে লাভবান হয় না।১০১

( إنک لا تسمع الموتی ولا تسمع الصم الدعاء)

আয়াতটির তাফসীরে তিনি বলেছেন : এর অর্থ হে নবী! যার অন্তরে বাতিলের মোহর অঙ্কিত হয়েছে তার নিকট তুমি সত্য পৌঁছাতে সক্ষম নও,কারণ তারা নিজেরাই সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।১০২

কবর জিয়ারত 

ইসলামী ইতিহাসের পরিক্রমায় মুসলমানগণ কবর জিয়ারতকে শুধু বৈধই মনে করেন নি;বরং আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশে সফরকে মুস্তাহাব জানেন এবং এ বিষয়ে তাদের মধ্যে ইজমা (শারয়ী ঐকমত্য) রয়েছে। কিন্তু প্রথমবারের মতো এ বিষয়টিকে ইবনে তাইমিয়া নিষিদ্ধ ও অবৈধ ঘোষণা করেন এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে হারাম বলে ফতোয়া দেন। তার পরবর্তীকালে তার শিষ্য ও চিন্তার প্রচারকগণ এ ফতোয়ার পক্ষাবলম্বন করেন এবং তা প্রতিষ্ঠার ব্রত নেন। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব ও তার অনুসারীরা কবর জিয়ারতকে হারাম বলে মনে করে এবং এ ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। যেহেতু এ বিষয়টির বিশেষ ধর্মীয় প্রভাব রয়েছে সেহেতু বিষয়টির বৈধতার বিষয়ে আমরা এখানে পর্যালোচনা করব।

কবর জিয়ারত সম্পর্কে ওয়াহাবীদের ফতোয়া

১। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, মহানবী (সা.) হতে বর্ণিত কবর জিয়ারত সম্পর্কিত সকল হাদীস শুধু জাইফই (দুর্বল) নয় বরং জাল ও বানোয়াট। ১০৩

আসকালানী ইবনে তাইমিয়া হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একচেটিয়াভাবে নবী ও ওলীদের কবর জিয়ারতকে হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। এমনকি নবী ও ওলীদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ও এজন্য প্রস্তুতি গ্রহণকেও নিষিদ্ধ বলেছেন। ১০৪

ইবনে তাইমিয়া তাঁর আত তাওয়াসসুল ওয়াল ওয়াসিলাহ গ্রন্থে বলেছেন, কবর জিয়ারত সম্পর্কিত মহানবী (সা.) হতে বর্ণিত হাদীস দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। এ কারণেই সিহাহ্ সিত্তাহ্  ও সুনান লেখকদের কেউই এই হাদীসগুলি বর্ণনা করেন নি। তাঁদের মধ্যে যারা জাইফ (দুর্বল) হাদীস বর্ণনায় অভ্যস্ত তাঁরাই কেবল এমন হাদীস বর্ণনা করেছেন যেমন দারে কুতনী,বাজ্জার ও অন্যান্যরা। ১০৫

তিনি অন্যত্র বলেছেন, কবর জিয়ারত সম্পর্কিত মহানবীর সকল হাদীস দুর্বলই শুধু নয় মিথ্যা ও বানোয়াটও বটে। ১০৬

২। আবদুল আজীজ ইবনে বিজবায বলেছেন, সকলের জন্য জিয়ারত বিশেষত মহানবী (সা.) ও তাঁর সঙ্গে শায়িত দুই সঙ্গীঁর (সাহাবী) কবর জিয়ারত করা মুস্তাহাব। কিন্তু জিয়ারতের নিয়ত করা এবং জিয়ারতের নিয়তে সফর ও সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করা বৈধ নয়। কারণ মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমরা কবর জিয়ারত কর,কারণ তা তোমাদের আখেরাতের (ও মৃত্যুর) কথা স্মরণ করিয়ে দেয়,কিন্তু জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা বৈধ নয়। ১০৭

৩। ওয়াহাবীদের ফতোয়া ও ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর প্রদানের জন্য গঠিত স্থায়ী কমিটি তাদের একটি ফতোয়ায় এভাবে বলেছেন, আল্লাহর নবিগণ ও সৎকর্মশীল বান্দাসহ অন্যান্য মুসলমানের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা বৈধ নয়। বরং তা বিদআত বলে পরিগণিত। ১০৮

উপরিউক্ত ফতোয়াসমূহ হতে বোঝা যায়,কবর জিয়ারতের বৈধতার বিষয়ে ওয়াহাবীদের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। ওয়াহাবী চিন্তাধারার পথিকৃত ইবনে তাইমিয়া সম্পূর্ণরূপে কবর জিয়ারতকে নিষিদ্ধ বলেছেন। কিন্তু একই ধারার সাম্প্রতিক আলেমগণ কবর জিয়ারতকে ঐ ক্ষেত্রে অবৈধ ও বিদআত বলেছেন যখন কেউ তার বাসস্থান হতে কবর জিয়ারতের নিয়তে বের হবে। কিন্তু যদি কেউ হজ্জ্ব করতে যেয়ে মহানবীর কবরও জিয়ারত করে আসে তবে সেক্ষেত্রে কোন অসুবিধা নেই।

পবিত্র কোরআন ও কবর জিয়ারত

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে বর্ণিত বিবরণ হতে আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারত বৈধ ও মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করা যায়। আমরা এখানে এরূপ কয়েকটি আয়াতের প্রতি ইশারা করব।

১। মহান আল্লাহ মহানবীকে মুনাফিকদের কবরের নিকট দণ্ডায়মান হতে নিষেধ করে বলেছেন:وَ لا تقم علی قبره আপনি তাদের (মুনাফিকদের) কবরের নিকট দণ্ডায়মান হবেন না।

উপরিউক্ত আয়াতটিতে মুনাফিকদের ব্যক্তিত্ব ও মূল্যহীনতার দিকে লক্ষ্য করে তাদের মৃত্যুর পর দাফনের মুহূর্তে অথবা পরবর্তীকালে তাদের কবরের নিকট জিয়ারতের উদ্দেশ্যে দাঁড়াতে নিষেধ করা হয়েছে।

বাইদ্বাভী তাঁর আনওয়ারুত্ তানযীল ১০৯ গ্রন্থে এবং আলূসী তাঁর রুহুল মায়ানী ১১০ তাফসীরে উপরিউক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেছেন তাদের কবরের নিকট দাঁড়ানোর অর্থ দাফনের সময় অথবা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে।

মুনাফিক ও কাফিরের কবরের নিকট জিয়ারতের উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো নিষিদ্ধ হওয়া হতে বোঝা যায় মুমিন ও মুসলমানের কবরের নিকট দাঁড়ানো ও তাদের জিয়ারত করা বৈধ এবং এতে কোন অসুবিধা নেই।

২। মহান আল্লাহ আসহাবে কাহফের বিষয়ে ও তাঁদের প্রতি মানুষদের সম্মান প্রদর্শনের ধরণ কী হওয়া উচিত তা নিয়ে যে দ্বন্দ্ব হয়েছে তার উল্লেখ করে বলেছেন,

( إِذْ يَتَنَازَعُونَ بَيْنَهُمْ أَمْرَهُمْ فَقَالُوا ابْنُوا عَلَيْهِمْ بُنْيَانًا رَبُّهُمْ أَعْلَمُ بِهِمْ قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَى أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِمْ مَسْجِدًا)

যখন তারা নিজেদের মধ্যে তাদের (সম্মান প্রদর্শনের) বিষয়ে পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হল এবং তারা (একদল) বলেছিল : তাদের (কবরের) উপর সৌধ নির্মাণ করব। তাদের প্রতিপালক তাদের বিষয়ে অধিক অবগত। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল তারা বলল : আমরা অবশ্যই তাদের উপর (কবরস্থানে) মসজিদ নির্মাণ করব। (সূরা কাহ্ফ : ২১)

মুফাসসিরগণ বলেছেন, অনেকের মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব হতে বোঝা যায় তারা মুসলমান ও একত্ববাদী ছিল। তাদের মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাবও এ লক্ষ্যে ছিল যে,সবসময় যেন লোকজন সেখানে যায় এবং তাদের (আসহাবে কাহ্ফ)  মাজারও জিয়ারতের স্থানে পরিণত হয়।

কবর যিয়ারত সম্পর্কিত হাদীসসমূহ

মহানবী (সা.) কবর জিয়ারতের কেবল নির্দেশই দান করেন নি,বরং তিনি নিজেও কবর জিয়ারতে যেতেন যাতে করে এ বিষয়টি জায়েয ও মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও প্রমাণিত হয়। আমরা তাই কবর জিয়ারতের বৈধতার বিষয়টি হাদীস এবং মহানবীর অনুসৃত কর্ম (সীরাত) উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই পর্যালোচনা করছি।

ক)হাদীসসমূহে কবর জিয়ারতের বৈধতার দলিল :  ইসলামী শরীয়তে কবর জিয়ারত বৈধ হওয়ার বিষয়টিতে তিনটি পর্যায় লক্ষণীয়।

প্রথম পর্যায় : এ পর্যায়ে পূর্ববর্তী শরিয়তের বৈধতার বিষয়টিই বহাল ছিল।

দ্বিতীয় পর্যায় : ইসলামের প্রাথমিক যুগে কোন কোন গোষ্ঠী বিশেষত আহলে কিতাবের অনুসারীদের শিরক বা অংশীবাদমিশ্রিত বিশ্বাস যা তারা তাদের মৃত ঐশী ব্যক্তিবর্গের বিষয়ে পোষণ করত (যেমন কবরের উপর সিজদা করা) রোধ করার লক্ষ্যে তৎকালীন সময়ের জন্য তা নিষিদ্ধ করা হয়।

তৃতীয় পর্যায় : এই পর্যায়ে পুনরায় কবর জিয়ারতকে বৈধ (জায়েয) করা হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য কবর জিয়ারতকে নিষিদ্ধ করেছি,কিন্তু এখন হতে তা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল তবে  জিয়ারতের সময় এমন কথা বলো না যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। ১১১

খ) মহানবী (সা.)-এর অনুসৃত কর্মপদ্ধতিতে কবর জিয়ারত:

১। বুরাইদা আসলামী মহানবী (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে,তিনি বলেছেন : আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু আমাকে আমার মাতার কবর জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তোমরা তোমাদের মৃতদের কবর জিয়ারত কর। কারণ তা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।১১২

২। হাকিম নিশাবুরী বুরাইদাহ হতে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী সহস্র ফেরেশতাসহ তাঁর মাতার কবর জিয়ারত করেন। সেদিনের ন্যায় এত অধিক ক্রন্দন করতে আমি তাঁকে কখনোই দেখি নি।১১৩

আবু হুরাইরা বলেছেন, মহানবী (সা.) তাঁর মাতার কবর জিয়ারত করার সময় এতটা ক্রন্দন করেছিলেন যে,অন্যরা তাঁর কান্নায় প্রভাবিত হয়ে কাঁদতে শুরু করেছিল। ১১৪

৩। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ্ বলেছেন, আমরা রাসুলের সাথে শহীদদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনা হতে বের হলাম। যখন আমরা হাররে ওয়াকিম নামক স্থানে পৌঁছালাম কয়েকটি কবর লক্ষ্য করে তাঁকে বললাম : হে আল্লাহর নবী! এগুলো কি আমাদের মুসলিম ভ্রাতাদের কবর? তিনি বললেন : এ কবরগুলো আমার সাহাবীদের। যখন আমরা শহীদদের কবরের নিকট পৌঁছালাম তিনি বললেন : এ কবরগুলো আমাদের ভ্রাতৃবর্গের। ১১৫

৪। মুসলিম হযরত আয়েশা হতে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী (সা.) শেষ রাত্রে জান্নাতুল বাকীর গোরস্তানে যেয়ে এভাবে সালাম করতেন আস্ সালামু আলা দারে কাওমি মুমিনীন। ১১৬

৫। ইবনে আবি শাইবাহ বলেছেন, মহানবী (সা.) প্রতি বছরের শুরুতে ওহুদের শহীদদের কবরের নিকটে গিয়ে এভাবে সালাম দিতেন, আসসালামু আলাইকুম বিমা সাবারতুম ফানি মা উকবাদ্দার। ১১৭

গ)পূর্ববর্তীগণের জীবন ও কর্মধারায় কবর জিয়ারত : সাহাবী,তাবেয়ী ও ইসলামী উম্মাহর আলেমগণের জীবন ও কর্মধারায় আমরা কবর জিয়ারতের প্রচলন লক্ষ্য করি। এখানে আমরা এরূপ ব্যক্তিবর্গের এরূপ কর্মের নমুনা পেশ করছি।

১। হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (আ.) ও কবর জিয়ারত : হাকিম নিশাবুরী তাঁর নিজস্ব সনদ সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে,তিনি মহানবীর জীবদ্দশায় প্রতি শুক্রবার হযরত হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের (ওহুদের যুদ্ধে শহীদ রাসূলের চাচা) কবর জিয়ারতে যেতেন। সেখানে নামাজ পড়তেন এবং ক্রন্দন করতেন।১১৮

২।খলিফা উমর ইবনে খাত্তাব এবং কবর জিয়ারত : মুহিবুদ্দিন তাবারী বর্ণনা করেছেন যে,হযরত উমর কয়েকজন সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে হজ্জ্বে যাওয়ার সময় পথে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি তার কাছে সাহায্য চাইল। তিনি হজ্জ্ব হতে ফেরার সময় ঐ স্থানে পৌঁছে উপরিউক্ত ব্যক্তির খোঁজ খবর জানতে চাইলেন। তাকে বলা হলো সে মৃত্যুবরণ করেছে। এ কথা শুনে তিনি দ্রুত তার কবরের নিকট যেয়ে নামাজ পড়লেন ও সেখানে বসে ক্রন্দন করলেন।১১৯

৩।হযরত আয়েশা ও কবর জিয়ারত : ইবনে আবি মালিকা বলেছেন : একদিন হযরত আয়েশা  কবরস্থানে প্রবেশ করলেন আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম : কেন কবরস্থানে প্রবেশ করছেন? তিনি বললেন : আমার ভাই আবদুর রহমানের কবর জিয়ারত করতে। আমি বললাম : মহানবী (সা.) কি কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেন নি? তিনি বললেন : তিনি নিষেধ করেছিলেন,কিন্তু পরে অনুমতি দিয়েছেন।১২০

৪। হযরত আলী (আ.) ও কবর জিয়ারত : খাব্বাব ইবনে আরত প্রাথমিক মুসলমানদের একজন তিনি কুফায় বসবাসকালীন সময়ে গুরুতর অসুস্থতার কারণে হযরত আলীর সঙ্গে সিফ্ফিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেন নি। যখন ইমাম আলী (আ.) সিফ্ফিন হতে ফিরে এসে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনলেন তখন তাঁর কবরের নিকট গিয়ে জিয়ারত করলেন।১২১

৫।মুহাম্মদ ইবনে হানাফীয়াহ ও কবর জিয়ারত : ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) শাহাদাত বরণের পর মুহাম্মদ ইবনে হানাফীয়াহ তাঁর কবরের নিকট পৌঁছলে তাঁর কণ্ঠরোধ হয়ে আসল। কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক হলে তিনি ইমাম হাসানের প্রশংসা করতে লাগলেন।১২২

৬।আবু খাল্লাল ও কবর জিয়ারত : স্বীয়যুগে হাম্বলী ফিকাহর ইমাম আবু খাল্লাল বলেছেন, যখনই আমি কোন সমস্যায় পড়তাম হযরত মূসা ইবনে জাফরের (আ.) নিয়ত করতাম এবং তাঁর উসিলায় আল্লাহর নিকট চাইতাম। আল্লাহর ইচ্ছায় আমার সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। ১২৩

৭।ইবনে খোজাইমা ও কবর জিয়ারত : আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুয়াম্মাল বলেছেন : আহলে হাদীসের ইমাম আবি বাকর ইবনে খোজাইমা,ইবনে আলী সাকতী ও স্বনামধন্য কয়েকজন আলেমের সঙ্গে হযরত আলী ইবনে মূসা আর রেজার কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। লক্ষ্য করলাম ইবনে খোজাইমা এমনভাবে আলী ইবনে মূসার কবরের প্রতি সম্মান ও বিনয় প্রদর্শন করলেন যে,আমরা হতভম্ব হলাম।১২৪

আহলে সুন্নাতের আলেমদের ফতোয়া

১। ইবনে ইদ্রিস শাফেয়ী বলেছেন : কবর জিয়ারতে কোন সমস্যা নেই। তবে জিয়ারতের মুহূর্তে এমন কিছু বলা যাবে না যাতে মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। ১২৫

২। হাকিম নিশাবুরী বলেছেন : কবর জিয়ারত মুস্তাহাব সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। ১২৬

৩। শেখ মানুসর আলী নাসেফ বলেছেন : আহলে সুন্নাতের আলেমদের দৃষ্টিতে কবর জিয়ারত করা মুস্তাহাব।১২৭

৪। ইবনে হাজম,আবু হামিদ গাজ্জালী এবং আবদুর রহমান জায়িরী হতে বর্ণিত হয়েছে তাঁরা মৃত ব্যক্তির জিয়ারতকে মুস্তাহাব মনে করতেন।১২৮

আল কোরআনের দৃষ্টিতে মহানবীর কবর জিয়ারত

মহানবীর কবর জিয়ারতের বৈধতার বিষয়টি প্রমাণকারী কয়েকটি আয়াত রয়েছে,যেমন :

( وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا)

আর যদি তারা (মুনাফিকরা) নিজেদের উপর জুলুম করার পর তোমার (রাসূলের) নিকট আসত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত সেই সাথে রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তবে তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী ও দয়াবান হিসেবে পেত। ১২৯ অবশ্য কোন কোন মুফাসসিরের মতে উপরিউক্ত আয়াত মহানবীর  জীবদ্দশার সাথে জড়িত অর্থাৎ যেসব ব্যক্তি নিজের উপর অন্যায় করার পর তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে অন্যায় (গুনাহ) স্বীকার করে তাঁকে তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানাত এবং তিনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তখন আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন। কিন্তু এ বিষয়টি মহানবীর  মৃত্যুর পরও প্রমাণযোগ্য।

সাবকী তাঁর শিফাউস সিকাম গ্রন্থে বলেছেন, যদিও আয়াতটি রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশার সাথে সম্পর্কিত তদুপরি মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর এ মর্যাদার পরিসমাপ্তি ঘটে নি। এ কারণে বলা যায় সকলের জন্যই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার এ পদ্ধতির সর্বজনীনতা রয়েছে,তাই আলেমগণ উপরিউক্ত আয়াত হতে সর্বজনীনতা বুঝে থাকেন এবং রাসূলের  কবরের নিকট উক্ত আয়াত পাঠ করা মুস্তাহাব।১৩০

সাবকীর বক্তব্যে সর্বজনীনতার যে কারণটি উল্লেখ করা হয়েছে তার ব্যাখ্যায় বলতে চাই গুনাহকারী ব্যক্তিকে রাসূলের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শটি তাঁর শাফায়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং নিঃসন্দেহে তাঁর মৃত্যুর পরও গুনাহকারীদের জন্য এরূপ মাধ্যমের (স্বয়ং নবী অথবা আল্লাহর কোন ওলীর শাফায়াতের) প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কবর জিয়ারতে যাওয়া ও তাঁর মধ্যস্থতায় আল্লাহর নিকট চাওয়ায় কোন সমস্যা নেই।

সুফিয়ান ইবনে আম্বার উতবা হতে (যাঁরা উভয়েই ইমাম শাফেয়ীর হাদীসের শিক্ষক) বর্ণনা করেছেন : আমি মহানবীর কবরের নিকট বসেছিলাম এ সময় একজন বেদুইন আরব রাসূল (সা.)-এর কবরের নিকট এসে বলল : হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর আমার সালাম। অতঃপর সূরা নিসার উপরিউক্ত আয়াতটি পাঠ করে বলল : হে নবী! আমি আপনার নিকট এসে আমার গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আল্লাহর নিকট আপনাকে শাফি (মধ্যস্থতা ও সুপারিশকারী) হিসেবে পেশ করছি। এ কথা বলে সে ক্রন্দন করতে লাগল এবং রাসূলের শানে কবিতা আবৃত্তি করল।১৩১

সামআনী একই রকম ঘটনা হযরত আলী হতে বর্ণনা করেছেন।১৩২   তিনি বলেছেন, যদি এই কর্ম সঠিক ও বৈধ না হতো তবে সাহাবিগণ,বিশেষত হযরত আলী (আ.) ঐ স্থানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেন নিষেধ করলেন না?১৩৩

হাদীসের দৃষ্টিতে মহানবী (সা.)-এর কবর জিয়ারত

আহলে সুন্নাতের হাদীস গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সহীহ্ হাদীস পাওয়া যায় যা রাসূলের কবর জিয়ারত মুস্তাহাব হওয়াকে প্রমাণ করে। এখানে এরূপ কয়েকটি হাদীসের উল্লেখ করছি।

১। দারে কুতনী সহীহ্ সূত্রে আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী (সা.) বলেছেন, যে কেউ আমার কবর জিয়ারত করবে তার জন্য শাফায়াত (সুপারিশ) করা আমার জন্য আবশ্যক হবে। ১৩৪

২। দারে কুতনী সহীহ্ সূত্রে রাসূল (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে,তিনি বলেছেন, যে কেউ হজ্জ্ব করার পর আমার কবর জিয়ারত করতে আসবে সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করল।১৩৫

৩। বায়হাকী সহীহ্ সূত্রে আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণনা করেছেন,মহানবী (সা.) বলেছেন, যে কেউ দুই হারামে (মক্কা ও মদীনায়) মৃত্যুবরণ করবে সে নিরাপত্তা লাভকারীদের (আল্লাহর আজাব হতে) অন্তর্ভুক্ত হিসেবে কিয়ামত দিবসে পুনরুত্থিত হবে এবং যে কেউ আমাকে ইখলাসের সাথে (নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর উদ্দেশ্যে) জিয়ারত করবে,সে কিয়ামতের দিন আমার সাথে থাকবে। ১৩৬

৪। ইবনে আদী আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী (সা.) বলেছেন, যে কেহ আল্লাহর ঘর (কাবা) জিয়ারত করল ও হজ্জ্ব সম্পাদন করল,কিন্তু আমার কবর জিয়ারত করল না,সে আমার প্রতি অবিচার করল (অর্থাৎ আমার প্রতি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করল না। ১৩৭

৫। আনাস ইবনে মালিক মহানবী (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে,তিনি বলেছেন, যে কেউ আমার মৃত্যুর পর আমাকে জিয়ারত করল সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমাকে জিয়ারত করল। যে কেউ আমার কবর জিয়ারত করল তার শাফায়াত (সুপারিশ) করা আমার জন্য কিয়ামতের দিন অপরিহার্য হয়ে পড়বে এবং কোন স্বচ্ছল ব্যক্তি ও সুস্থ ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত হতে বিরত থাকলে তার জন্য কিয়ামতে কোন ওজরই গৃহীত হবে না।১৩৮

ওয়াহাবীদের উপস্থাপিত দলিলের পর্যালোচনা

প্রথম দলিল

পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি ওয়াহাবীরা তাদের মতের সপক্ষে নিম্নোক্ত হাদীসটি উপস্থাপন করে থাকে যে,মহানবী (সা.) বলেছেন : যখন কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে তখন তার সকল সৎকর্ম বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ব্যতীত যথা সাদকায়ে জারীয়া (মসজিদ,মাদ্রাসা,স্কুল,হাসপাতাল,ইয়াতিম খানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা),তার রেখে যাওয়া যে জ্ঞান হতে অন্যান্যরা লাভবান হয় এবং সৎকর্মশীল (নেক) সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।

তারা উপরিউক্ত হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চায় মৃত্যুর মাধ্যমে এ পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে তারা এ পৃথিবী হতে কোন কল্যাণ প্রাপ্ত হয় না এবং এ পৃথিবীতে তারা কোন প্রভাবও রাখতে সক্ষম নন।

আমাদের উত্তর

উপরিউক্ত হাদীসটিতে তিনটি কর্ম ব্যতীত মৃতব্যক্তি নিজের জন্য অন্য কোন কর্ম করতে পারে না বলা হয়েছে অর্থাৎ যে কর্মসমূহ মৃতব্যক্তি তার জীবদ্দশায় পরবর্তী জীবনের জন্য করতে পারত তা উল্লেখ করে বলা হয়েছে ঐ তিনটি ব্যতীত অন্য কোন কর্মের সওয়াব সে অনবরত লাভ করতে পারবে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে,অন্য কোন ব্যক্তি তার পক্ষে কোন কাজ করলে তা হতে সে লাভবান হবে না বরং অন্য কোন ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর তার নিয়তে কোন সৎকর্ম করলে সে সওয়াব পেতে পারে। কারণ তা তার নিজ কর্মের উপর নির্ভরশীল নয়।৯৭

দ্বিতীয় দলিল

পবিত্র কোরআনের কোন কোন আয়াত হতে বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় মৃতরা শুনতে পায় না। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন :

( فَإِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ)

সুতরাং নিশ্চয়ই (হে নবী!) তুমি মৃতদের (যাদের অন্তর মৃত) শোনাতে সক্ষম নও এবং বধিরদের কর্ণেও তা পৌঁছাতে সক্ষম নও যখন তারা( নিজেরাই) পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে। ৯৮

অন্য আয়াতে এসেছে :

( وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَاءُ وَلَا الْأَمْوَاتُ إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَنْ يَشَاءُ وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ)

অবশ্যই জীবিত ও মৃত সমান নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে চান শোনান। তুমি যে ব্যক্তি কবরে আছে তাকে শোনাতে সক্ষম নও। ৯৯

আমাদের উত্তর

প্রথমত উপরিউক্ত আয়াতের লক্ষ্য কবরে শায়িত প্রাণহীন দেহ হতে পারে যা মাটিতে পরিণত হয়েছে ফলে কোন কিছু বুঝতে সক্ষম নয়।

দ্বিতীয়ত শুনতে সক্ষম নয় অর্থ কোন কল্যাণ অর্জনে সক্ষম নয় হতে পারে যা বধিরতার সমার্থক বলা হয়েছে। ফলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় এই মুশরিক পৌত্তলিকরা কোরআনের আয়াত শোনে কিন্তু তা হতে কোন কল্যাণ লাভ করে না যেমন কবরে শায়িতরা তোমার কথা শুনে কিন্তু কোন কল্যাণ প্রাপ্ত হয় না। কারণ তাদের সময় (কল্যাণ লাভের সুযোগ) শেষ হয়ে গেছে।

ইবনে কাইয়্যেম জাওযিয়াوما أنتَ بِمُسمعٍ من فی القبور আয়াতটির তাফসীরে বলেছেন : আয়াতটির  লক্ষ্য সে সকল কাফের যাদের অন্তর মৃত,ফলে (হে নবী!) তুমি তাদের কর্ণে সত্যকে পৌঁছাতে সক্ষম নও যা হতে তারা লাভবান হতে পারে। যেমন কবরে শায়িতদের এমনভাবে শোনাতে সক্ষম নও যা হতে কল্যাণ লাভ করতে পারে।

( فَإِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ)

ইবনে কাইয়্যেম এ আয়াতের তাফসীরে বলেছেন : তাদের শ্রবণের অক্ষমতা এ অর্থে যে,যেহেতু মুশরিকদের অন্তর মৃত সেহেতু তুমি  সত্যকে তাদের নিকট পৌঁছাতে সক্ষম নও যেমনটি মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। ১০০

হাসান ইবনে আলী সাক্কাফ আশশাফেয়ীو ما أنت بمسمعٍ من فی القبور আয়াতটির তাফসীরে বলেছেন : আয়াতটির লক্ষ্য সে সকল কাফের যারা বাতিলের পথে একগুয়েমি  প্রদর্শন করে। ফলে তোমার উপদেশ হতে লাভবান হয় না যেমন কবরে শায়িতরা তোমার উপদেশ হতে কল্যাণ পায় না। অতঃপর তিনি তাফসীরে সাবুনী থেকে বর্ণনা করেছেন যে,আয়াতটির অর্থ হল যেমনভাবে মৃত কাফিররা তোমার হেদায়েত ও আহ্বান হতে কল্যাণ প্রাপ্ত হয় না দূর্ভাগা মুশরিকরাও তেমনি তোমার সৎপথ প্রদর্শন হতে লাভবান হয় না।১০১

( إنک لا تسمع الموتی ولا تسمع الصم الدعاء)

আয়াতটির তাফসীরে তিনি বলেছেন : এর অর্থ হে নবী! যার অন্তরে বাতিলের মোহর অঙ্কিত হয়েছে তার নিকট তুমি সত্য পৌঁছাতে সক্ষম নও,কারণ তারা নিজেরাই সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।১০২

কবর জিয়ারত 

ইসলামী ইতিহাসের পরিক্রমায় মুসলমানগণ কবর জিয়ারতকে শুধু বৈধই মনে করেন নি;বরং আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশে সফরকে মুস্তাহাব জানেন এবং এ বিষয়ে তাদের মধ্যে ইজমা (শারয়ী ঐকমত্য) রয়েছে। কিন্তু প্রথমবারের মতো এ বিষয়টিকে ইবনে তাইমিয়া নিষিদ্ধ ও অবৈধ ঘোষণা করেন এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে হারাম বলে ফতোয়া দেন। তার পরবর্তীকালে তার শিষ্য ও চিন্তার প্রচারকগণ এ ফতোয়ার পক্ষাবলম্বন করেন এবং তা প্রতিষ্ঠার ব্রত নেন। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব ও তার অনুসারীরা কবর জিয়ারতকে হারাম বলে মনে করে এবং এ ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। যেহেতু এ বিষয়টির বিশেষ ধর্মীয় প্রভাব রয়েছে সেহেতু বিষয়টির বৈধতার বিষয়ে আমরা এখানে পর্যালোচনা করব।

কবর জিয়ারত সম্পর্কে ওয়াহাবীদের ফতোয়া

১। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, মহানবী (সা.) হতে বর্ণিত কবর জিয়ারত সম্পর্কিত সকল হাদীস শুধু জাইফই (দুর্বল) নয় বরং জাল ও বানোয়াট। ১০৩

আসকালানী ইবনে তাইমিয়া হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একচেটিয়াভাবে নবী ও ওলীদের কবর জিয়ারতকে হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। এমনকি নবী ও ওলীদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ও এজন্য প্রস্তুতি গ্রহণকেও নিষিদ্ধ বলেছেন। ১০৪

ইবনে তাইমিয়া তাঁর আত তাওয়াসসুল ওয়াল ওয়াসিলাহ গ্রন্থে বলেছেন, কবর জিয়ারত সম্পর্কিত মহানবী (সা.) হতে বর্ণিত হাদীস দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য। এ কারণেই সিহাহ্ সিত্তাহ্  ও সুনান লেখকদের কেউই এই হাদীসগুলি বর্ণনা করেন নি। তাঁদের মধ্যে যারা জাইফ (দুর্বল) হাদীস বর্ণনায় অভ্যস্ত তাঁরাই কেবল এমন হাদীস বর্ণনা করেছেন যেমন দারে কুতনী,বাজ্জার ও অন্যান্যরা। ১০৫

তিনি অন্যত্র বলেছেন, কবর জিয়ারত সম্পর্কিত মহানবীর সকল হাদীস দুর্বলই শুধু নয় মিথ্যা ও বানোয়াটও বটে। ১০৬

২। আবদুল আজীজ ইবনে বিজবায বলেছেন, সকলের জন্য জিয়ারত বিশেষত মহানবী (সা.) ও তাঁর সঙ্গে শায়িত দুই সঙ্গীঁর (সাহাবী) কবর জিয়ারত করা মুস্তাহাব। কিন্তু জিয়ারতের নিয়ত করা এবং জিয়ারতের নিয়তে সফর ও সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করা বৈধ নয়। কারণ মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমরা কবর জিয়ারত কর,কারণ তা তোমাদের আখেরাতের (ও মৃত্যুর) কথা স্মরণ করিয়ে দেয়,কিন্তু জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা বৈধ নয়। ১০৭

৩। ওয়াহাবীদের ফতোয়া ও ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর প্রদানের জন্য গঠিত স্থায়ী কমিটি তাদের একটি ফতোয়ায় এভাবে বলেছেন, আল্লাহর নবিগণ ও সৎকর্মশীল বান্দাসহ অন্যান্য মুসলমানের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা বৈধ নয়। বরং তা বিদআত বলে পরিগণিত। ১০৮

উপরিউক্ত ফতোয়াসমূহ হতে বোঝা যায়,কবর জিয়ারতের বৈধতার বিষয়ে ওয়াহাবীদের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। ওয়াহাবী চিন্তাধারার পথিকৃত ইবনে তাইমিয়া সম্পূর্ণরূপে কবর জিয়ারতকে নিষিদ্ধ বলেছেন। কিন্তু একই ধারার সাম্প্রতিক আলেমগণ কবর জিয়ারতকে ঐ ক্ষেত্রে অবৈধ ও বিদআত বলেছেন যখন কেউ তার বাসস্থান হতে কবর জিয়ারতের নিয়তে বের হবে। কিন্তু যদি কেউ হজ্জ্ব করতে যেয়ে মহানবীর কবরও জিয়ারত করে আসে তবে সেক্ষেত্রে কোন অসুবিধা নেই।

পবিত্র কোরআন ও কবর জিয়ারত

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে বর্ণিত বিবরণ হতে আল্লাহর ওলীদের কবর জিয়ারত বৈধ ও মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করা যায়। আমরা এখানে এরূপ কয়েকটি আয়াতের প্রতি ইশারা করব।

১। মহান আল্লাহ মহানবীকে মুনাফিকদের কবরের নিকট দণ্ডায়মান হতে নিষেধ করে বলেছেন:وَ لا تقم علی قبره আপনি তাদের (মুনাফিকদের) কবরের নিকট দণ্ডায়মান হবেন না।

উপরিউক্ত আয়াতটিতে মুনাফিকদের ব্যক্তিত্ব ও মূল্যহীনতার দিকে লক্ষ্য করে তাদের মৃত্যুর পর দাফনের মুহূর্তে অথবা পরবর্তীকালে তাদের কবরের নিকট জিয়ারতের উদ্দেশ্যে দাঁড়াতে নিষেধ করা হয়েছে।

বাইদ্বাভী তাঁর আনওয়ারুত্ তানযীল ১০৯ গ্রন্থে এবং আলূসী তাঁর রুহুল মায়ানী ১১০ তাফসীরে উপরিউক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেছেন তাদের কবরের নিকট দাঁড়ানোর অর্থ দাফনের সময় অথবা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে।

মুনাফিক ও কাফিরের কবরের নিকট জিয়ারতের উদ্দেশ্যে দাঁড়ানো নিষিদ্ধ হওয়া হতে বোঝা যায় মুমিন ও মুসলমানের কবরের নিকট দাঁড়ানো ও তাদের জিয়ারত করা বৈধ এবং এতে কোন অসুবিধা নেই।

২। মহান আল্লাহ আসহাবে কাহফের বিষয়ে ও তাঁদের প্রতি মানুষদের সম্মান প্রদর্শনের ধরণ কী হওয়া উচিত তা নিয়ে যে দ্বন্দ্ব হয়েছে তার উল্লেখ করে বলেছেন,

( إِذْ يَتَنَازَعُونَ بَيْنَهُمْ أَمْرَهُمْ فَقَالُوا ابْنُوا عَلَيْهِمْ بُنْيَانًا رَبُّهُمْ أَعْلَمُ بِهِمْ قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَى أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِمْ مَسْجِدًا)

যখন তারা নিজেদের মধ্যে তাদের (সম্মান প্রদর্শনের) বিষয়ে পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হল এবং তারা (একদল) বলেছিল : তাদের (কবরের) উপর সৌধ নির্মাণ করব। তাদের প্রতিপালক তাদের বিষয়ে অধিক অবগত। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল তারা বলল : আমরা অবশ্যই তাদের উপর (কবরস্থানে) মসজিদ নির্মাণ করব। (সূরা কাহ্ফ : ২১)

মুফাসসিরগণ বলেছেন, অনেকের মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব হতে বোঝা যায় তারা মুসলমান ও একত্ববাদী ছিল। তাদের মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাবও এ লক্ষ্যে ছিল যে,সবসময় যেন লোকজন সেখানে যায় এবং তাদের (আসহাবে কাহ্ফ)  মাজারও জিয়ারতের স্থানে পরিণত হয়।

কবর যিয়ারত সম্পর্কিত হাদীসসমূহ

মহানবী (সা.) কবর জিয়ারতের কেবল নির্দেশই দান করেন নি,বরং তিনি নিজেও কবর জিয়ারতে যেতেন যাতে করে এ বিষয়টি জায়েয ও মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও প্রমাণিত হয়। আমরা তাই কবর জিয়ারতের বৈধতার বিষয়টি হাদীস এবং মহানবীর অনুসৃত কর্ম (সীরাত) উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই পর্যালোচনা করছি।

ক)হাদীসসমূহে কবর জিয়ারতের বৈধতার দলিল :  ইসলামী শরীয়তে কবর জিয়ারত বৈধ হওয়ার বিষয়টিতে তিনটি পর্যায় লক্ষণীয়।

প্রথম পর্যায় : এ পর্যায়ে পূর্ববর্তী শরিয়তের বৈধতার বিষয়টিই বহাল ছিল।

দ্বিতীয় পর্যায় : ইসলামের প্রাথমিক যুগে কোন কোন গোষ্ঠী বিশেষত আহলে কিতাবের অনুসারীদের শিরক বা অংশীবাদমিশ্রিত বিশ্বাস যা তারা তাদের মৃত ঐশী ব্যক্তিবর্গের বিষয়ে পোষণ করত (যেমন কবরের উপর সিজদা করা) রোধ করার লক্ষ্যে তৎকালীন সময়ের জন্য তা নিষিদ্ধ করা হয়।

তৃতীয় পর্যায় : এই পর্যায়ে পুনরায় কবর জিয়ারতকে বৈধ (জায়েয) করা হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য কবর জিয়ারতকে নিষিদ্ধ করেছি,কিন্তু এখন হতে তা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল তবে  জিয়ারতের সময় এমন কথা বলো না যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। ১১১

খ) মহানবী (সা.)-এর অনুসৃত কর্মপদ্ধতিতে কবর জিয়ারত:

১। বুরাইদা আসলামী মহানবী (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে,তিনি বলেছেন : আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু আমাকে আমার মাতার কবর জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তোমরা তোমাদের মৃতদের কবর জিয়ারত কর। কারণ তা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।১১২

২। হাকিম নিশাবুরী বুরাইদাহ হতে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী সহস্র ফেরেশতাসহ তাঁর মাতার কবর জিয়ারত করেন। সেদিনের ন্যায় এত অধিক ক্রন্দন করতে আমি তাঁকে কখনোই দেখি নি।১১৩

আবু হুরাইরা বলেছেন, মহানবী (সা.) তাঁর মাতার কবর জিয়ারত করার সময় এতটা ক্রন্দন করেছিলেন যে,অন্যরা তাঁর কান্নায় প্রভাবিত হয়ে কাঁদতে শুরু করেছিল। ১১৪

৩। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ্ বলেছেন, আমরা রাসুলের সাথে শহীদদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনা হতে বের হলাম। যখন আমরা হাররে ওয়াকিম নামক স্থানে পৌঁছালাম কয়েকটি কবর লক্ষ্য করে তাঁকে বললাম : হে আল্লাহর নবী! এগুলো কি আমাদের মুসলিম ভ্রাতাদের কবর? তিনি বললেন : এ কবরগুলো আমার সাহাবীদের। যখন আমরা শহীদদের কবরের নিকট পৌঁছালাম তিনি বললেন : এ কবরগুলো আমাদের ভ্রাতৃবর্গের। ১১৫

৪। মুসলিম হযরত আয়েশা হতে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী (সা.) শেষ রাত্রে জান্নাতুল বাকীর গোরস্তানে যেয়ে এভাবে সালাম করতেন আস্ সালামু আলা দারে কাওমি মুমিনীন। ১১৬

৫। ইবনে আবি শাইবাহ বলেছেন, মহানবী (সা.) প্রতি বছরের শুরুতে ওহুদের শহীদদের কবরের নিকটে গিয়ে এভাবে সালাম দিতেন, আসসালামু আলাইকুম বিমা সাবারতুম ফানি মা উকবাদ্দার। ১১৭

গ)পূর্ববর্তীগণের জীবন ও কর্মধারায় কবর জিয়ারত : সাহাবী,তাবেয়ী ও ইসলামী উম্মাহর আলেমগণের জীবন ও কর্মধারায় আমরা কবর জিয়ারতের প্রচলন লক্ষ্য করি। এখানে আমরা এরূপ ব্যক্তিবর্গের এরূপ কর্মের নমুনা পেশ করছি।

১। হযরত ফাতিমাতুয যাহরা (আ.) ও কবর জিয়ারত : হাকিম নিশাবুরী তাঁর নিজস্ব সনদ সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে,তিনি মহানবীর জীবদ্দশায় প্রতি শুক্রবার হযরত হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের (ওহুদের যুদ্ধে শহীদ রাসূলের চাচা) কবর জিয়ারতে যেতেন। সেখানে নামাজ পড়তেন এবং ক্রন্দন করতেন।১১৮

২।খলিফা উমর ইবনে খাত্তাব এবং কবর জিয়ারত : মুহিবুদ্দিন তাবারী বর্ণনা করেছেন যে,হযরত উমর কয়েকজন সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে হজ্জ্বে যাওয়ার সময় পথে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি তার কাছে সাহায্য চাইল। তিনি হজ্জ্ব হতে ফেরার সময় ঐ স্থানে পৌঁছে উপরিউক্ত ব্যক্তির খোঁজ খবর জানতে চাইলেন। তাকে বলা হলো সে মৃত্যুবরণ করেছে। এ কথা শুনে তিনি দ্রুত তার কবরের নিকট যেয়ে নামাজ পড়লেন ও সেখানে বসে ক্রন্দন করলেন।১১৯

৩।হযরত আয়েশা ও কবর জিয়ারত : ইবনে আবি মালিকা বলেছেন : একদিন হযরত আয়েশা  কবরস্থানে প্রবেশ করলেন আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম : কেন কবরস্থানে প্রবেশ করছেন? তিনি বললেন : আমার ভাই আবদুর রহমানের কবর জিয়ারত করতে। আমি বললাম : মহানবী (সা.) কি কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেন নি? তিনি বললেন : তিনি নিষেধ করেছিলেন,কিন্তু পরে অনুমতি দিয়েছেন।১২০

৪। হযরত আলী (আ.) ও কবর জিয়ারত : খাব্বাব ইবনে আরত প্রাথমিক মুসলমানদের একজন তিনি কুফায় বসবাসকালীন সময়ে গুরুতর অসুস্থতার কারণে হযরত আলীর সঙ্গে সিফ্ফিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেন নি। যখন ইমাম আলী (আ.) সিফ্ফিন হতে ফিরে এসে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনলেন তখন তাঁর কবরের নিকট গিয়ে জিয়ারত করলেন।১২১

৫।মুহাম্মদ ইবনে হানাফীয়াহ ও কবর জিয়ারত : ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) শাহাদাত বরণের পর মুহাম্মদ ইবনে হানাফীয়াহ তাঁর কবরের নিকট পৌঁছলে তাঁর কণ্ঠরোধ হয়ে আসল। কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক হলে তিনি ইমাম হাসানের প্রশংসা করতে লাগলেন।১২২

৬।আবু খাল্লাল ও কবর জিয়ারত : স্বীয়যুগে হাম্বলী ফিকাহর ইমাম আবু খাল্লাল বলেছেন, যখনই আমি কোন সমস্যায় পড়তাম হযরত মূসা ইবনে জাফরের (আ.) নিয়ত করতাম এবং তাঁর উসিলায় আল্লাহর নিকট চাইতাম। আল্লাহর ইচ্ছায় আমার সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। ১২৩

৭।ইবনে খোজাইমা ও কবর জিয়ারত : আবু বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুয়াম্মাল বলেছেন : আহলে হাদীসের ইমাম আবি বাকর ইবনে খোজাইমা,ইবনে আলী সাকতী ও স্বনামধন্য কয়েকজন আলেমের সঙ্গে হযরত আলী ইবনে মূসা আর রেজার কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। লক্ষ্য করলাম ইবনে খোজাইমা এমনভাবে আলী ইবনে মূসার কবরের প্রতি সম্মান ও বিনয় প্রদর্শন করলেন যে,আমরা হতভম্ব হলাম।১২৪

আহলে সুন্নাতের আলেমদের ফতোয়া

১। ইবনে ইদ্রিস শাফেয়ী বলেছেন : কবর জিয়ারতে কোন সমস্যা নেই। তবে জিয়ারতের মুহূর্তে এমন কিছু বলা যাবে না যাতে মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। ১২৫

২। হাকিম নিশাবুরী বলেছেন : কবর জিয়ারত মুস্তাহাব সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। ১২৬

৩। শেখ মানুসর আলী নাসেফ বলেছেন : আহলে সুন্নাতের আলেমদের দৃষ্টিতে কবর জিয়ারত করা মুস্তাহাব।১২৭

৪। ইবনে হাজম,আবু হামিদ গাজ্জালী এবং আবদুর রহমান জায়িরী হতে বর্ণিত হয়েছে তাঁরা মৃত ব্যক্তির জিয়ারতকে মুস্তাহাব মনে করতেন।১২৮

আল কোরআনের দৃষ্টিতে মহানবীর কবর জিয়ারত

মহানবীর কবর জিয়ারতের বৈধতার বিষয়টি প্রমাণকারী কয়েকটি আয়াত রয়েছে,যেমন :

( وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا)

আর যদি তারা (মুনাফিকরা) নিজেদের উপর জুলুম করার পর তোমার (রাসূলের) নিকট আসত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত সেই সাথে রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তবে তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী ও দয়াবান হিসেবে পেত। ১২৯ অবশ্য কোন কোন মুফাসসিরের মতে উপরিউক্ত আয়াত মহানবীর  জীবদ্দশার সাথে জড়িত অর্থাৎ যেসব ব্যক্তি নিজের উপর অন্যায় করার পর তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে অন্যায় (গুনাহ) স্বীকার করে তাঁকে তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানাত এবং তিনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তখন আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন। কিন্তু এ বিষয়টি মহানবীর  মৃত্যুর পরও প্রমাণযোগ্য।

সাবকী তাঁর শিফাউস সিকাম গ্রন্থে বলেছেন, যদিও আয়াতটি রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশার সাথে সম্পর্কিত তদুপরি মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর এ মর্যাদার পরিসমাপ্তি ঘটে নি। এ কারণে বলা যায় সকলের জন্যই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার এ পদ্ধতির সর্বজনীনতা রয়েছে,তাই আলেমগণ উপরিউক্ত আয়াত হতে সর্বজনীনতা বুঝে থাকেন এবং রাসূলের  কবরের নিকট উক্ত আয়াত পাঠ করা মুস্তাহাব।১৩০

সাবকীর বক্তব্যে সর্বজনীনতার যে কারণটি উল্লেখ করা হয়েছে তার ব্যাখ্যায় বলতে চাই গুনাহকারী ব্যক্তিকে রাসূলের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শটি তাঁর শাফায়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং নিঃসন্দেহে তাঁর মৃত্যুর পরও গুনাহকারীদের জন্য এরূপ মাধ্যমের (স্বয়ং নবী অথবা আল্লাহর কোন ওলীর শাফায়াতের) প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কবর জিয়ারতে যাওয়া ও তাঁর মধ্যস্থতায় আল্লাহর নিকট চাওয়ায় কোন সমস্যা নেই।

সুফিয়ান ইবনে আম্বার উতবা হতে (যাঁরা উভয়েই ইমাম শাফেয়ীর হাদীসের শিক্ষক) বর্ণনা করেছেন : আমি মহানবীর কবরের নিকট বসেছিলাম এ সময় একজন বেদুইন আরব রাসূল (সা.)-এর কবরের নিকট এসে বলল : হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর আমার সালাম। অতঃপর সূরা নিসার উপরিউক্ত আয়াতটি পাঠ করে বলল : হে নবী! আমি আপনার নিকট এসে আমার গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আল্লাহর নিকট আপনাকে শাফি (মধ্যস্থতা ও সুপারিশকারী) হিসেবে পেশ করছি। এ কথা বলে সে ক্রন্দন করতে লাগল এবং রাসূলের শানে কবিতা আবৃত্তি করল।১৩১

সামআনী একই রকম ঘটনা হযরত আলী হতে বর্ণনা করেছেন।১৩২   তিনি বলেছেন, যদি এই কর্ম সঠিক ও বৈধ না হতো তবে সাহাবিগণ,বিশেষত হযরত আলী (আ.) ঐ স্থানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেন নিষেধ করলেন না?১৩৩

হাদীসের দৃষ্টিতে মহানবী (সা.)-এর কবর জিয়ারত

আহলে সুন্নাতের হাদীস গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সহীহ্ হাদীস পাওয়া যায় যা রাসূলের কবর জিয়ারত মুস্তাহাব হওয়াকে প্রমাণ করে। এখানে এরূপ কয়েকটি হাদীসের উল্লেখ করছি।

১। দারে কুতনী সহীহ্ সূত্রে আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী (সা.) বলেছেন, যে কেউ আমার কবর জিয়ারত করবে তার জন্য শাফায়াত (সুপারিশ) করা আমার জন্য আবশ্যক হবে। ১৩৪

২। দারে কুতনী সহীহ্ সূত্রে রাসূল (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে,তিনি বলেছেন, যে কেউ হজ্জ্ব করার পর আমার কবর জিয়ারত করতে আসবে সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করল।১৩৫

৩। বায়হাকী সহীহ্ সূত্রে আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণনা করেছেন,মহানবী (সা.) বলেছেন, যে কেউ দুই হারামে (মক্কা ও মদীনায়) মৃত্যুবরণ করবে সে নিরাপত্তা লাভকারীদের (আল্লাহর আজাব হতে) অন্তর্ভুক্ত হিসেবে কিয়ামত দিবসে পুনরুত্থিত হবে এবং যে কেউ আমাকে ইখলাসের সাথে (নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর উদ্দেশ্যে) জিয়ারত করবে,সে কিয়ামতের দিন আমার সাথে থাকবে। ১৩৬

৪। ইবনে আদী আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী (সা.) বলেছেন, যে কেহ আল্লাহর ঘর (কাবা) জিয়ারত করল ও হজ্জ্ব সম্পাদন করল,কিন্তু আমার কবর জিয়ারত করল না,সে আমার প্রতি অবিচার করল (অর্থাৎ আমার প্রতি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করল না। ১৩৭

৫। আনাস ইবনে মালিক মহানবী (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন যে,তিনি বলেছেন, যে কেউ আমার মৃত্যুর পর আমাকে জিয়ারত করল সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমাকে জিয়ারত করল। যে কেউ আমার কবর জিয়ারত করল তার শাফায়াত (সুপারিশ) করা আমার জন্য কিয়ামতের দিন অপরিহার্য হয়ে পড়বে এবং কোন স্বচ্ছল ব্যক্তি ও সুস্থ ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত হতে বিরত থাকলে তার জন্য কিয়ামতে কোন ওজরই গৃহীত হবে না।১৩৮


7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18