জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম

জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম28%

জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 30 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 8872 / ডাউনলোড: 3232
সাইজ সাইজ সাইজ
জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম

জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

জ্ঞানতত্ত্ব সম্বন্ধে যথেষ্ট জানার আছে এবং লেখক , সাংবাদিক ও জ্ঞানগবেষকদের জন্য এ বিষয়ে বিস্তারিত অধ্যয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। এ পুস্তকে এ বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা দেয়া হয়েছে মাত্র। আশা করি এ পুস্তক পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যে এ বিষয়ে অধিকতর অধ্যয়নের আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। আর তাহলেই অত্র পুস্তকের সফলতা।

সহজাত জ্ঞান:

কোরআন মজীদে আমরা মানুষের সত্তা (نفس ) বা প্রকৃতি (فطرة )-এর মধ্যে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে সহজাত জ্ঞান নিহিত রাখার কথা উল্লেখ দেখতে পাই। এরশাদ হয়েছে:

) وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا(

শপথ সেই প্রাণসত্তার এবং তার তিনি যা সুসংহত করেছেন , অতঃপর তার মধ্যে তার পাপের (ও ধ্বংসের) আর (তা থেকে) বেঁচে থাকা (-এর জ্ঞান) ইলহাম্ করে (সত্তায় প্রদান করে) দিয়েছেন। (সূরাহ্ আশ্-শামস্: ৭-৮)

বলা বাহুল্য যে , ক্ষুধা-তৃষ্ণা ইত্যাদি সংক্রান্ত সহজাত জ্ঞান এতোই সুস্পষ্ট ও সর্বজনগ্রাহ্য যে , কোরআন মজীদ তার উল্লেখের প্রয়োজন বোধ করে নি , বরং এমন এক সহজাত জ্ঞানের কথা বলেছে যে সম্বন্ধে অনেকেই চিন্তা করে না , তবে উল্লেখের পর যে কেউই সামান্য চিন্তা করলেই তা অনুধাবন করতে সক্ষম।

এমন কতোগুলো কাজ আছে যা আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের কাছেই ভালো বা উচিত বলে মনে হয় , যেমন: সত্য কথা বলা , বিশ্বস্ততা রক্ষা করা , বড়কে সম্মান করা , ছোটকে স্নেহ করা , দরিদ্র ও অসহায়কে সাহায্য ও সহায়তা করা , আমানত প্রত্যর্পণ করা ইত্যাদি। অন্যদিকে এমন কতোগুলো কাজ আছে যা প্রতিটি মানুষের কাছেই মন্দ বা বর্জনীয় বলে মনে হয় , যেমন: মিথ্যা বলা , বিশ্বাসঘাতকতা করা , আমানত আত্মসাৎ করা , চুরি-ডাকাতি করা , নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেয়া , অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা ইত্যাদি। কোনোরূপ ধর্মীয় বা নৈতিক শিক্ষা না পেলেও সহজাতভাবেই মানুষের মধ্যে এ জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে (তা কার্যতঃ সে তা অনুসরণ করুক বা না-ই করুক)।

ইন্দ্রিয়নিচয়:

ইন্দ্রিয়নিচয় যে জ্ঞান আহরণের মাধ্যম তা কোরআন মজীদে সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন , এরশাদ হয়েছে:

) وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ(

আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের গর্ভ থেকে (এমন অবস্থায়) বের করে এনেছেন যে , তোমরা কোনো কিছুই জানো না এবং তিনি তোমাদের জন্য শ্রবণশক্তি , দর্শনশক্তি ও অন্তঃকরণ সৃষ্টি করেছেন ; আশা করা যায় যে , তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। (সূরাহ্ আন্-নাহল্: ৭৮)

কোরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে ইন্দ্রিয়নিচয় ব্যবহারের মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের জন্য উপদেশ দেয়া হয়েছে। যেমন , ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের সবচেয়ে বড় মাধ্যম চোখ ; কোরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে চর্মচক্ষুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আয়াতে বিদেশ ভ্রমণের কথা বলা হয়েছে এবং বলা বাহুল্য যে , বিদেশ ভ্রমণের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে নতুন নতুন জিনিস ও দৃশ্য চাক্ষুষভাবে দর্শন। তবে আল্লাহ্ তা আলা উচ্চতর লক্ষ্যে অর্থাৎ শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে ভ্রমণকে ব্যবহারের জন্য উপদেশ দিয়েছেন। এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে:

) قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلُ( .

(হে রাসূল! তাদেরকে) বলুন , তোমরা ধরণীর বুকে পরিভ্রমণ করো এবং (দেখে) মনোযোগ সহকারে অনুধাবন করো যে , (তোমাদের) পূর্ববর্তীদের পরিণতি কেমন হয়েছিলো। (সূরাহ্ আর্-রূম্: ৪২)

সুস্পষ্ট যে , এখানে চাক্ষুষ দেখাকে অনুসন্ধিৎসা সহকারে তথ্য সংগ্রহ করার কাজে ব্যবহার করতে তথা পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে অর্থাৎ বিচারবুদ্ধির সাহায্যে ইন্দ্রিয়জ চক্ষু লব্ধ তথ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

অন্য বহু আয়াতে শ্রবণশক্তির সাহায্যে যে তথ্য সংগ্রহ করা হয় সেদিকে ইঙ্গিত রয়েছে। যেমন , এরশাদ হয়েছে:

) فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ( .

অতঃপর সে (ইমরাআতুল আযী্য্) যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনলো । (সূরাহ্ ইউসুফ: ৩১)

এ আয়াতে কথা কানে আসা থেকে তথ্য সংগ্রহ বা জ্ঞান হাছ্বিলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যত্র মনোযোগ দিয়ে শুনে জ্ঞানার্জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে:

) فَبَشِّرْ عِبَادِ الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ(

অতএব , (হে রাসূল!) সেই বান্দাহদেরকে সুসংবাদ দিন যারা বক্তব্য শ্রবণ করে এবং এরপর তার মধ্য থেকে যা অধিকতর উত্তম তার অনুসরণ করে। (সূরাহ্ আয্-যুমার্: ১৭-১৮)

এ আয়াত থেকেও শ্রবণশক্তির তথ্যসংগ্রহমাধ্যম হওয়ার বিষয়টির স্বীকৃতি প্রমাণিত হয়। তবে তথ্য যাচাই-বাছাই করা যে শ্রবণযন্ত্রের কাজ নয় , বরং বিচারবুদ্ধির কাজ সে ইঙ্গিতও এতে রয়েছে।

অন্যত্র এরশাদ হয়েছে:

) أَوَلَمْ يَرَوْا كَيْفَ يُبْدِئُ اللَّهُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ (১৯) قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ(

তারা কি (কতক ক্ষেত্রে হলেও) (চাক্ষুষভাবে) দেখে নি যে , আল্লাহ্ কীভাবে সৃষ্টির সূচনা করেন ? আর এরপর তিনিই তাকে প্রত্যাবর্তন করাবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহর জন্য এ কাজ খুবই সহজ। (হে রাসূল! তাদেরকে) বলুন , তোমরা ধরণীর বুকে পরিভ্রমণ করো এবং (চাক্ষুষভাবে দেখে) মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে ভেবে দেখো যে , কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছিলেন। (সূরাহ্ আল্- আনকাবূত্: ১৯-২০)

বলা বাহুল্য যে , এখানে দর্শনেন্দ্রিয়ের সাথে বিচারবুদ্ধির সংযোগেরও ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

কোরআন মজীদে আস্বাদনের কথা বহু আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে জিহবা দ্বারা আস্বাদন প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াতের দৃষ্টান্ত পেশ করা যেতে পারে। হযরত আদম ( আঃ) ও হযরত হাওয়া ( আঃ) যে ইবলীসের দ্বারা প্রতারিত হয়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের স্বাদ গ্রহণ করেন সে প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে:

) فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ(

অতঃপর তারা উভয়ে যখন বৃক্ষটির স্বাদ গ্রহণ করলো। (সূরাহ্ আল্-আ রাফ: ২২)

লক্ষণীয় , এখানে খাওয়ার কথা বলা হয় নি , স্বাদগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। যদিও খাওয়ার মাধ্যমে একই সাথে ক্ষুন্নিবৃত্তি ও স্বাদগ্রহণ দুইই ঘটে থাকে , কিন্তু খাওয়া বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষুন্নিবৃত্তি বুঝানো। অন্যদিকে না খেয়েও (গলাধঃকরণ না করেও) শুধু জিহবা দ্বারা স্বাদ গ্রহণ করা যায়। জিহবা দ্বারা বিভিন্ন বস্তুর বিভিন্ন স্বাদ সম্পর্কে ও তা ভক্ষণোপযোগী কিনা সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জিত হয়। কিন্তু জিহবায় না লাগিয়ে সরাসরি পাকস্থলীতে বিভিন্ন বস্তু পৌঁছানো হলে পাকস্থলী বিভিন্ন ধরনের স্বাদ সম্পর্কে বা কী কী ধরনের বস্তু তার মধ্যে পৌঁছানো হয়েছে সে সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করতে পারবে না।

ত্বকের স্পর্শ-অনুভূতি সম্পর্কে বহু আয়াতে উল্লেখ রয়েছে ; বিশেষভাবে হাত দিয়ে স্পর্শের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন , এরশাদ হয়েছে:

) قَالَ فَاذْهَبْ فَإِنَّ لَكَ فِي الْحَيَاةِ أَنْ تَقُولَ لَا مِسَاسَ(

(মূসা সামেরীকে) বললো: সুতরাং দূর হয়ে যাও ; অবশ্যই তোমার জন্য এটাই নির্ধারিত যে , সারা জীবন (অনারোগ্য জঘন্য চর্মরোগের কারণে ) তুমি বলবে: আমাকে স্পর্শ করো না। (সূরাহ্ ত্বা-হা: ৯৭)।

মোট কথা , কোরআন মজীদ যে , ইন্দ্রিয়নিচয়কে জ্ঞান বা তথ্য আহরণের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। অবশ্য কোরআন মজীদে ইন্দ্রিয়নিচয়ের মধ্যে শ্রবণেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয়ের কথা সর্বাধিক বার উল্লিখিত হয়েছে। আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ , মানুষ এ দু টি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই , বিশেষ করে দর্শনেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সর্বাধিক পরিমাণে তথ্যসংগ্রহের কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকে।

বিচারবুদ্ধি:

কোরআন মজীদ বিচারবুদ্ধি (عقل )কে শুধু অন্যতম জ্ঞানমাধ্যম হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় নি , বরং এর ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। কোরআন মজীদেعقل শব্দমূল হতে নিষ্পন্ন শব্দাবলী ৪৯ বার ব্যবহৃত হয়েছে ; এর মধ্যে আট জায়গায় বিভিন্ন বিষয় উল্লেখের পর বলা হয়েছে যে , এতে সেই সব লোকের জন্য নিদর্শন/ নিদর্শনাদি রয়েছে যারা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে। যেমন , এরশাদ হয়েছে:

) وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِنْ رِزْقٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ آيَاتٌ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ (.

আর দিনরাত্রির পরিবর্তনে (বা পার্থক্য ঘটার মধ্যে) এবং আল্লাহ্ আকাশ থেকে যে রিয্ক্ব (বৃষ্টি) নাযিল করেছেন এবং তার সাহায্যে ধরণীকে এর মৃত্যুর পরে পুনর্জীবিত করেছেন তাতে , আর বায়ুর আবর্তন-পরিবর্তনে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগকারীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সূরাহ্ আল্-জাছিয়াহ্: ৫)

অনেকেلقوم يعقلون -এর অর্থ করেছেন বুদ্ধিমান লোকদের জন্য ; এটা সঠিক অর্থ নয়। কারণ , সে ক্ষেত্রেلقوم عاقلون বলা হতো । আর মানসিক প্রতিবন্ধী ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে নি এমন শিশু ছাড়া সকলেইعاقل বা বুদ্ধিমান। আলোচ্য আয়াতেيعقلون ক্রিয়াপদ ব্যবহার থেকে সুস্পষ্ট যে , এতে বুদ্ধিমানদের বুঝানো উদ্দেশ্য নয় , এমনকি বিচারবুদ্ধির অধিকারী সকল লোককে বুঝানোও উদ্দেশ্য নয় , বরং বিচারবুদ্ধি প্রয়োগকারীদের বুঝানোই উদ্দেশ্য।

এছাড়া কোরআন মজীদে ১৩ বার তাকিদ করে বলা হয়েছেافلا تعقلون - অতঃপর তোমরা কি বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবে না ? অনেকে এর অর্থ করেছেন: তোমরা কি বোঝো না ? কিন্তু এরূপ অর্থ গ্রহণ করা ঠিক নয়। কারণ , তা বলতে চাওয়া হলে বলা হতো:افلا تفهمون অর্থাৎ বিষয়টি কি তোমাদের জন্য কঠিন বা জটিল এবং এ কারণে তোমরা বুঝতে পারছো না ? তাছাড়া বুঝতে না পারা বলতে অনিচ্ছাকৃত বা সাধ্যাতীত অক্ষমতা বুঝায় এবং সে জন্য কাউকে তিরস্কার করা চলে না।

বস্তুতঃ আক্বল্ বা বিচারবুদ্ধির দ্বারা যা বুঝা সম্ভব তা সর্বজনীনভাবে সহজবোধগম্য বিষয় ; বিচারবুদ্ধির সাহায্যে সহজেই তা বুঝা যেতে পারে। কিন্তু লোকেরা ইচ্ছাকৃতভাবেই বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ থেকে দূরে থাকে। এ কারণেই এ জন্য তারা তিরস্কারের উপযুক্ত বিধায় কোরআন মজীদ তাদেরকে তিরস্কার করেছে।

অন্তঃকরণ:

কোরআন মজীদেقلب (অন্তঃকরণ)কে একটি জ্ঞানমাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত জিবরাঈল ( আঃ) হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর অন্তঃকরণে কোরআন মজীদ পৌঁছে দেন। এরশাদ হয়েছে:

) قُلْ مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِجِبْرِيلَ فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللَّهِ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَهُدًى وَبُشْرَى لِلْمُؤْمِنِينَ(

(হে রাসূল!) বলুন: যে ব্যক্তি জিবরাঈলের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে (সে জেনে রাখুক যে) , অবশ্যই সে (জিবরাঈল্) আল্লাহর অনুমতিক্রমেই আপনার অন্তঃকরণে তা (কোরআন) নাযিল করে যা , (পূর্ব থেকে) যা তাদের সামনে বিদ্যমান আছে তার সত্যায়নকারী এবং তা (এ কোরআন) হচ্ছে মু মিনদের জন্য হেদায়াত ও সুসংবাদস্বরূপ। (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্: ৯৭)

আরো এরশাদ হয়েছে:

) نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ(

তা (কোরআন) সহ বিশ্বস্ত চেতনা (জিবরাঈল্) আপনার অন্তঃকরণে নাযিল হয়েছে যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্যতম হন। (সূরাহ্ আশ্-শু আরা: ১৯৩-১৯৪)।

অন্য এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে:

) لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ( .

তাদের অন্তঃকরণ আছে , কিন্তু তা দ্বারা তারা হৃদয়ঙ্গম করে না। (সূরাহ্ আল্-আরাফ: ১৭৯)

তবে এখানে উল্লেখযোগ্য যে , কোরআন মজীদেقلب শব্দটি ব্যাপকতর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ; বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ , হৃদয়ঙ্গমকরণ , অনুধাবন এবং ওয়াহী ও ইলহাম্ গ্রহণকেقلب -এর সাথে সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করাقلب -এরই কাজ। কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে:

) أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا(

তাহলে তারা কি ধরণীর বুকে পরিভ্রমণ করেনি যাতে তাদের এমন অন্তঃকরণ (قلب ) হয় যার সাহায্যে তারা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবে ? (সূরাহ্ আল্-হাজ্জ: ৪৬)

এখানে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করাকেقلب -এর কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবেقلب -কে এ ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করে বলতে হবে ,قلب -এর মধ্যে দুই ধরনের জ্ঞান-আহরণ ক্ষমতা নিহিত রয়েছে: একটি হচ্ছে বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা , অপরটি হচ্ছে সহজাত জ্ঞান , ইন্দিয়লব্ধ তথ্যাদি এবং বিচারবুদ্ধির জ্ঞান ও তথ্যাদি বহির্ভূত তথা পার্থিব কার্যকারণ বহির্ভূত অনুভূতি এবং ওয়াহী ও ইলহাম্ ধারণের ক্ষমতা। আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের ভাষায় এ দু টি অভ্যন্তরীণ শক্তিকে দু টি স্বতন্ত্র জ্ঞানমাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং প্রথমটিকে বিচারবুদ্ধি (عقل ) নাম দেয়া হয়েছে , আর দ্বিতীয়টিকে অন্তঃকরণ (قلب ) নামেই অভিহিত করা হয়েছে। তবে এ কারণে আমাদের প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে না। কারণ , কোরআন মজীদেقلب -এর এ ঊভয় ধরনের ক্ষমতার সপক্ষেই প্রমাণ রয়েছে যার কিছু আমরা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি।

অন্তঃকরণের ইন্দ্রিয়নিচয়:

এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে , মানুষের মধ্যে অন্তঃকরণ (قلب ) নামে যে অবস্তুগত জ্ঞানমাধ্যম রয়েছে বা এ কালের পরিভাষায় , বিচারবুদ্ধি ও অন্তঃকরণ নামে যে শক্তি রয়েছে বস্তুদেহের ইন্দ্রিয়নিচয়ের মতো তারও (অবস্তুগত) ইন্দ্র্রিয়নিচয় রয়েছে। বস্তুদেহের ইন্দ্রিয়নিচয়ের সাহায্য ছাড়াই মানুষের বিচারবুদ্ধি ও অন্তঃকরণ তার এ সব নিজস্ব ইন্দ্রিয়াদির দ্বারা জ্ঞান আহরণ করতে পারে। অর্থাৎ অন্তঃকরণের শ্রবণ , দর্শন , স্পর্শকরণ , আঘ্রাণ ও স্বাদ গ্রহণের ক্ষমতা আছে। কল্পনার চোখে অনেক দৃশ্য দর্শন করার অভিজ্ঞতা কমবেশী সকলেরই রয়েছে। এমনকি শুধু কল্পনাশক্তির সাহায্যে বস্তুদেহের ইন্দ্রিয়নিচয়ের দ্বারা শ্রবণ , স্পর্শকরণ , আঘ্রাণ ও স্বাদ গ্রহণের অভিজ্ঞতার হুবহু অনুরূপ কিছু কিছু অভিজ্ঞতাও অনেকের থাকতে পারে।

মানুষের বস্তুদেহের ইন্দ্রিয়নিচয়ের বাইরে অন্তঃকরণের ইন্দ্রিয়নিচয় থাকার কথা কোরআন মজীদ থেকেও প্রমাণিত হয়। যেমন , এরশাদ হয়েছে:

) أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً( .

(হে রাসূল!) আপনি কি তাকে দেখেছেন যে তার প্রবৃত্তিকে স্বীয় ইলাহ্ রূপে গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহ্ তাকে জ্ঞানের ওপরে গোমরাহ্ করেছেন , আর তার শ্রবণের ও তার অন্তঃকরণের ওপর মোহর করে দিয়েছেন এবং তার দর্শনক্ষমতার ওপর আবরণ তৈরী করে দিয়েছেন ? (সূরাহ্ আল্-জাছিয়াহ্: ২৩)

নিঃসন্দেহে এখানে বস্তুদেহের কান ও চোখের কথা বলা হয় নি।

অন্যত্র অধিকতর সুস্পষ্ট ভাষায় এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে:

) وَمِنْهُمْ مَنْ يَسْتَمِعُونَ إِلَيْكَ أَفَأَنْتَ تُسْمِعُ الصُّمَّ وَلَوْ كَانُوا لَا يَعْقِلُونَ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنْظُرُ إِلَيْكَ أَفَأَنْتَ تَهْدِي الْعُمْيَ وَلَوْ كَانُوا لَا يُبْصِرُونَ(

আর তাদের মধ্যে কতক লোক আছে যারা (হে রাসূল!) আপনার কথা (বস্তুদেহের কান দ্বারা) শোনে ; আপনি কি বধিরকে (আপনার কথা) শুনাতে চান যদিও তারা বিচারবুদ্ধি কাজে লাগায় না ? আর তাদের মধ্যে কতক লোক আছে যারা আপনার দিকে (বস্তুদেহের চক্ষু দ্বারা) মনোযোগ সহকারেই দৃষ্টিপাত করে ; আপনি কি অন্ধকে পথ দেখাতে পারবেন যদিও তারা (অন্তঃকরণের চোখ দ্বারা) দেখতে পায় না ? (সূরাহ্ ইউনুস: ৪২-৪৩)

এখানে সুস্পষ্ট যে , যাদেরকে বধির ও অন্ধ বলা হয়েছে তাদের বস্তুদেহের কান ও চোখ অকেজো নয়।

এ ধরনের আয়াত কোরআন মজীদে আরো আছে।

উৎসভিত্তিক বিভাগ

জ্ঞানবিভাগের দৃষ্টিকোণসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে উৎসভিত্তিক দৃষ্টিকোণ।

মানুষের জ্ঞানের দু টি উৎস চিন্তা করা যায়: অভ্যন্তরীণ উৎস ও বাইরের উৎস। অভ্যন্তরীণ উৎস মানে স্বয়ং তার সত্তা অর্থাৎ যে জ্ঞান তার সত্তায় নিহিত থাকে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উদ্ভূত হয় সে জ্ঞানের উৎস হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ে স্বয়ং তার সত্তাকেই গণ্য করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে বলার উদ্দেশ্য এই যে , তার সত্তায় নিহিত জ্ঞান অন্য কোনো সত্তা থেকে নিহিত রাখা হয়ে থাকতে পারে বা উদ্ভূত করা হয়ে থাকতে পারে ( থাকতে পারে যুক্তির খাতিরে বলা হয়েছে , আসলে রাখা হয়েছে উদ্ভূত করা হয়েছে )। অর্থাৎ দৃশ্যতঃ এ ধরনের জ্ঞান তার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উৎসারিত। অন্য কথায় , সে বাহ্যিক তথ্যমাধ্যম , যেমন: ইন্দ্রিয়নিচয়ের সাহায্য ছাড়াই এ জ্ঞানের অধিকারী হয়ে থাকে। এ ধরনের কোনো কোনো জ্ঞান জন্মের পর থেকে স্বতঃপ্রকাশিত হয় অর্থাৎ তার সত্তায় নিহিত থাকে , যেমন: ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্ঞান। আবার কোনো জ্ঞান তার মধ্যে সম্ভাবনা আকারে সুপ্ত থাকে যা উপযুক্ত সময়ে ও পরিবেশে তার মধ্যে জাগ্রত হয় , যেমন: যৌনক্ষুধার জ্ঞান। এছাড়া কোনো কোনো জ্ঞান সরাসরি তার মধ্যে অন্য কোনো অপার্থিব উৎস থেকে সঞ্চারিত হতে পারে , যেমন: ওয়াহী , ইলহাম , যথাযথ চিন্তা-গবেষণা ছাড়াই অন্তরে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্যের উদ্ভব ইত্যাদি।

এর বিপরীতে রয়েছে তার সত্তার বাইরে অবস্থিত জ্ঞানসূত্রসমূহ ; প্রাকৃতিক জগত সহ তার সত্তাবহির্ভূত যত কিছু থেকে সে জ্ঞান লাভ করে তার সব কিছুই বাইরের জ্ঞানসূত্র।

প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ভিত্তিক বিভাগ

জ্ঞানকে তার প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: উপস্থিত জ্ঞান বা প্রত্যক্ষ জ্ঞান (علم حضوری ) ও অর্জনীয় জ্ঞান (علم حصولی ) । প্রত্যক্ষ জ্ঞান হচ্ছে তা-ই কোনো রকম মাধ্যম ছাড়াই যে জ্ঞান ব্যক্তির সত্তায় বিদ্যমান থাকে। প্রত্যক্ষ জ্ঞান কয়েক ধরনের হতে পারে: (1) সত্তায় সরাসরি বিদ্যমান জ্ঞান , যেমন: ব্যক্তির নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে জ্ঞান , স্বীয় উৎস বা সৃষ্টিকর্তা সম্বন্ধে সাধারণ ধারণা রূপ জ্ঞান , ক্ষুধাতৃষ্ণা সংক্রান্ত জ্ঞান , যৌনক্ষুধার জ্ঞান ইত্যাদি যাকে সহজাত জ্ঞান (علم فطری )ও বলা যেতে পারে। (2) ব্যক্তির ধারণা-কল্পনাজাত অবস্তুগত অস্তিত্ব সমূহ সংক্রান্ত জ্ঞান এবং (3) ওয়াহী ও ইলহাম জাতীয় জ্ঞান যা বাইরের অপার্থিব উৎস থেকে ব্যক্তির সত্তায় জাগ্রত হওয়ার পর স্থিতিলাভ করে।

অর্জনীয় জ্ঞান হচ্ছে ইন্দ্রিয়নিচয় ও অন্যান্য তথ্যমাধ্যম বা জ্ঞানমাধ্যমের সাহায্যে বাইরের উৎস থেকে অর্জিত জ্ঞান বা চিন্তা-গবেষণার মাধমে উদ্ঘাটিত জ্ঞান।

অর্জনীয় জ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুসমূহের সরাসরি প্রত্যক্ষণ বা সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত হতে পারে , অথবা লেখ্য ও কথনীয় ভাষা , ছবি , আকার-ইঙ্গিত ইত্যাদি প্রতীকের সাহায্যে হতে পারে।

জ্ঞানকে ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যভাবেও ভাগ করা যেতে পারে। যেমন: (1) সহজাত জ্ঞান (علم فطری ) , (2) প্রত্যক্ষ জ্ঞান (علم حضوری ) ও (3) অর্জনীয় জ্ঞান (علم حصولی ) । এ ধরনের বিভাগে জ্ঞানের অধিকারীর সত্তা এবং তার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা সমূহ সংক্রান্ত জ্ঞানকে সহজাত জ্ঞান , এর বহির্ভূত বিষয়াদি সংক্রান্ত অনর্জিত জ্ঞান তথা অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞানকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যাদিকে ও তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিচারবুদ্ধি কর্তৃক গৃহীত উপসংহারকে অর্জনীয় জ্ঞান -এর পর্যায়ে ফেলা হয়। তেমনি সহজাত জ্ঞানকেও অনেকে প্রত্যক্ষ জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর কারণ , সহজাত জ্ঞানের বিষয়বস্তু ব্যক্তির সত্তার মধ্যে প্রকাশিত হবার পর সদা বিদ্যমান থাকে।

প্রত্যক্ষ জ্ঞান

ইতিমধ্যেই যেমন আভাস দেয়া হয়েছে , প্রত্যক্ষ জ্ঞান (علم حضوری ) হচ্ছে জ্ঞানের অধিকারী বা জ্ঞানী (عالم )-এর সত্তায় নিহিত অনর্জিত জ্ঞান এবং সে জ্ঞানের বিষয়বস্তু বা জ্ঞাত বিষয় (معلوم ) হচ্ছে স্বয়ং সেই সত্তা এবং তার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা সমূহ। অর্থাৎ এখানে জ্ঞানী , জ্ঞান ও জ্ঞাত অভিন্ন। বস্তুতঃ সমস্ত রকমের জ্ঞানের মধ্যে একমাত্র প্রত্যক্ষ জ্ঞানের যথার্থতা সম্বন্ধে যে কারো পক্ষেই শতকরা একশ ভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

এখানে জ্ঞানীর সত্তার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা সমূহ সম্পর্কে একটি প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই যে , বাইরে থেকে প্রাপ্ত বা অর্জিত জ্ঞান এবং তার সত্তায় উৎপাদিত জ্ঞান (বিচারবুদ্ধির উদ্ভাবন ও ধারণা-কল্পনা নির্বিশেষে) যখন জ্ঞানীর সত্তায় স্থিতিলাভ করে তখন তা তার সত্তার সাথে অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায় এবং জ্ঞানী অন্য কোনো মাধ্যম ব্যতীতই সে সম্পর্কে অবহিত থাকে। এ কারণে তা-ও প্রত্যক্ষ জ্ঞানের বিষয়বস্তুর অন্যতম হয়ে যায়। অর্থাৎ এ ধরনের জ্ঞানকে যখন লাভ করার পন্থা ও উৎসের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয় তখন তা প্রাপ্ত বা অর্জিত জ্ঞান , আর যখন বিদ্যমানতার ভিত্তিতে দেখা হয় তখন তা প্রত্যক্ষ জ্ঞান। অন্যদিকে জ্ঞানী যখন তার সত্তায় নিহিত এ জ্ঞানের সাহায্যে জ্ঞানের মূল বিষয়বস্তুর প্রতি মনোযোগ দেয় তখন তা প্রাপ্ত বা অর্জিত জ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত হয় , আর যখন স্বয়ং জ্ঞানের দিকে মনোযোগ দেয় অর্থাৎ তার সত্তায় নিহিত ঐ সব বিষয়বস্তুর অবস্তুগত রূপের দিকে মনোযোগ দেয় তখন তা প্রত্যক্ষ জ্ঞান।

এ বিষয়টি সম্বন্ধে একটি চমৎকার উপমা দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে: আমরা যখন একটি আয়নার দিকে এ উদ্দেশ্যে তাকাই যে , তার আকার-আকৃতি ও আয়তন এবং তার বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রত্যক্ষ করবো অর্থাৎ তা পুরোপুরি ঠিকঠাক আছে কিনা , নাকি তাতে কোনো ত্রুটি আছে , আয়নাটির প্রতি এভাবে তাকানোর সাথে আয়নাটিতে চেহারা বা তাতে প্রতিফলিত অন্য কোনো দৃশ্য দেখার উদ্দেশ্যে তার দিকে তাকানোর পার্থক্য আছে। প্রথম ক্ষেত্রে আয়নাটিই লক্ষ্য এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আয়নাটি লক্ষ্য নয় , মাধ্যম মাত্র। অনুরূপভাবে জ্ঞানীর সত্তার বাইরের যে কোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞানীর জ্ঞান তার সত্তার অংশ হিসেবে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্থাৎ তা নিজেই একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় ও সত্তার সাথে অবিচ্ছেদ্য এবং বাইরের সেই বিষয়বস্তুর প্রতি মনোযোগের মাধ্যম হিসেবে তা অর্জিত জ্ঞান।

মাধ্যম যখন বিষয়বস্তু

ওপরের আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে , অভিন্ন বিষয় অভিন্ন জ্ঞানীর জন্য কখনো জ্ঞানের মাধ্যম ও কখনো জ্ঞাত বিষয় হতে পারে। এ কথাটি জ্ঞানার্জনের জন্য ব্যবহৃত প্রতীক সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। লেখ্য ও কথনীয় ভাষা , এতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বর্ণ , চিহ্ন ও ধ্বনি এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের চিত্র , চলচ্চিত্র , অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি এ সবের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন বস্তুগত ও অবস্তুগত বিষয়বস্তু সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যম হতে পারে , আবার স্বয়ং এগুলো সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করা হতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে এ সব প্রতীক হচ্ছে জ্ঞানার্জনের মাধ্যম বা প্রতীক এবং দ্বিতীয়োক্ত ক্ষেত্রে আর এগুলো জ্ঞানার্জনের মাধ্যম বা প্রতীক নয় , বরং স্বয়ং জ্ঞানের বিষয়বস্তু বা জ্ঞাত

স্বতঃপ্রকাশিত ও তাত্ত্বিক জ্ঞান

আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে: (1) স্বতঃপ্রকাশিত জ্ঞান (علم بدیهی ) ও (2) তাত্ত্বিক জ্ঞান (علم نظری ) ।

স্বতঃপ্রকাশিত জ্ঞান হচ্ছে এমন জ্ঞান যা মানুষের সত্তার কাছে নিজে নিজেই ধরা পড়ে এবং যা যুক্তিতর্ক ও দলীল দ্বারা প্রমাণের মুখাপেক্ষী নয়। যেমন: অভিন্ন স্থান ও কালে একটি বস্তু আছে এবং নেই - এটা হওয়া অসম্ভব। তেমনি: যে কোনো বস্তুর অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে , তার অস্তিত্বদানকারী রয়েছে। অনুরূপভাবে , ব্যক্তির কাছে তার নিজের অস্তিত্বের সত্যতা কোনোরূপ প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। স্বতঃপ্রকাশিত জ্ঞানের উপমা দিতে গিয়ে বলা হয়: সূর্যের উদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ ; এ জন্য অন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই।

তাত্ত্বিক জ্ঞান হচ্ছে তা-ই যা যুক্তিতর্ক , দলীল-প্রমাণ বা বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করা অপরিহার্য। তাত্ত্বিক জ্ঞান দুই ধরনের। এক ধরনের তাত্ত্বিক জ্ঞান হচ্ছে বস্তুধর্মের বহির্ভূত বিষয়াদির জ্ঞান অর্থাৎ অবস্তুগত জগতের ও মানবিক বিষয়াদির জ্ঞান যার বিপরীতে রয়েছে বস্তুবিজ্ঞানের জ্ঞান। দর্শন , আক্বায়েদ , সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি এ ধরনের তাত্ত্বিক জ্ঞান। আর দ্বিতীয় ধরনের তাত্ত্বিক জ্ঞান হচ্ছে বস্তুধর্ম সম্পর্কে হাতেকলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে কেবল অধ্যয়ন বা শ্রবণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান। এ শেষোক্ত ধরনের জ্ঞান সম্পর্কে কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভবপর। যেমন: পানি 100 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ফুটতে থাকে - এটি একটি তত্ত্ব যা পরীক্ষাগারে বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেই কেবল গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

জ্ঞানর মাধ্যমভিত্তিক প্রকরণ:

মানুষ যে সব মাধ্যমের বদৌলতে জ্ঞানের অধিকারী হয় সাধারণতঃ তার ভিত্তিতেই জ্ঞানের প্রকরণ নির্ধারণ করা হয়। আমরা এখন জ্ঞান আহরণের মাধ্যমসমূহ ও তার ভিত্তিতে জ্ঞানের প্রকরণসমূহের দিকে দৃষ্টি দেবো।

মানুষ চারটি মাধ্যম থেকে জ্ঞান লাভ করে এবং এর ভিত্তিতে জ্ঞানকে চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এ চারটি জ্ঞানমাধ্যম হচ্ছে: স্বভাব-প্রকৃতি (فطرة - ফিতরাত্) , ইন্দ্রিয়নিচয় , বিচারবুদ্ধি (عقل - আক্বল্) ও অন্তঃকরণ (قلب - ক্বালব্)। এ চার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানকে যথাক্রমে স্বভাবজাত বা সহজাত জ্ঞান , ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান , বিচারবুদ্ধিলব্ধ জ্ঞান ও অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান নামে অভিহিত করা যেতে পারে।

সহজাত জ্ঞান

সহজাত বা স্বভাবজাত জ্ঞান হচ্ছে ঐ সব জ্ঞান মানুষ জন্মগতভাবেই যার অধিকারী হয়। যেমন: ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্ঞান , শারীরিক আরাম ও কষ্টের জ্ঞান ইত্যাদি। মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীও সহজাত জ্ঞানের অধিকারী। বরং অন্যান্য প্রাণীর সহজাত জ্ঞানের আওতা মানুষের সহজাত জ্ঞানের আওতার চেয়ে ব্যাপকতর।

সহজাত জ্ঞান দুই ধরনের। এক ধরনের জ্ঞান ব্যক্তির সত্তায় কোনোরূপ মাধ্যম ছাড়াই জাগ্রত হয়। যেমন: শরীরে খাদ্য-পানীয়ের প্রয়োজন হলেই ব্যক্তি নিজে নিজেই তা বুঝতে পারে। এ ধরনের জ্ঞানকে ভিন্ন এক বিবেচনায় প্রত্যক্ষ জ্ঞান (علم حضوری - ইলমে হুযূরী)ও বলা যেতে পারে।

আরেক ধরনের জ্ঞান মানুষের সত্তায় সম্ভাবনা আকারে বিদ্যমান থাকে যা তার কাছে যথা সময়ে ও উপযুক্ত পরিবেশে প্রকাশ পায়। যেমন: যৌনতার জ্ঞান - যা শিশুর মধ্যে সম্ভাবনা আকারে নিহিত থাকে এবং বয়সের একটি সুনির্দিষ্ট স্তর পার হবার পর নিজ থেকেই ক্রমান্বয়ে তার মধ্যে এ জ্ঞান জন্ম নেয়।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , যৌনতার জ্ঞান ও যৌন ক্ষুধার জ্ঞান এক পর্যায়ের নয়। যৌন ক্ষুধার জ্ঞান ক্ষুধা-তৃষ্ণার মতোই প্রত্যক্ষ জ্ঞান। কিন্তু যৌন ক্ষুধার বয়সে উপনীত হবার অব্যবহিত পূর্ববর্তী একটি ক্রান্তিকালে যৌনতা সম্বন্ধে নিজ থেকেই যে ধারণা ও আগ্রহ গড়ে ওঠে তা এতদসংক্রান্ত সম্ভাবনার বিকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান

চক্ষু , কর্ণ , নাসিকা , জিহবা ও ত্বক - এই পাঁচটি শারীরিক ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যে জ্ঞান অর্জিত হয় তা-ই ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান (علم حسی - ইলমে হিসসী) বা অভিজ্ঞতাজাত ও পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান (علم تجربی - ইলমে তাজরাবী)।

এক হিসেবে ইন্দ্রিয়নিচয়কে জ্ঞানমাধ্যম না বলে স্রেফ তথ্যসংগ্রহ মাধ্যম বলাই অধিকতর সঠিক। কারণ , ইন্দ্রিয়নিচয় অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করে মাত্র ; বিচারবুদ্ধিই এসব তথ্যকে সমন্বিত করে জ্ঞানে পরিণত করে। উদাহরণস্বরূপ , কোনো ব্যক্তির নাকে যখন সুগন্ধ অনুভূত হয় তখন তার নাকের স্নায়ুতন্ত্র তার মস্তিষ্কে এ তথ্যটি পাঠিয়ে দেয় এবং তার চোখ যখন একটি ফুল দেখতে পায় তখন চোখের স্বায়ুতন্ত্রী মস্তিষ্কে সে তথ্য পাঠিয়ে দেয়। এমতাবস্থায় তার বিচারবুদ্ধি এ দুই তথ্যের সমন্বয়ে গবেষণা করে এ উপসংহারে উপনীত হয় যে , ঐ ফুলটিই নাকে ভেসে আসা সুগন্ধির উৎস। এমনকি সে ঐ সময় চোখে ঐ ফুলটি দেখতে না পেলেও অতীত অভিজ্ঞতা থেকে মস্তিষ্কে সঞ্চিত তথ্যের সাথে বর্তমান তথ্য অর্থাৎ নাকের মাধ্যমে সংগৃহীত সর্বসাম্প্রতিক তথ্যকে মিলিয়ে নিয়ে বিচারবুদ্ধি উপসংহারে উপনীত হয় যে , আশেপাশে কোথাও অমুক ফুল রয়েছে এবং তা থেকেই এ সুঘ্রাণ আসছে।

বিচারবুদ্ধিজাত জ্ঞান

বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্) হচ্ছে মানুষের বস্তুগত শরীরকে আশ্রয় করে অবস্থানরত একটি অবস্তুগত শক্তি। বিচারবুদ্ধি হচ্ছে স্বয়ং জ্ঞানের উৎস , অন্যান্য তথ্য-আহরণ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদির পর্যালোচনা ও সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী তথা জ্ঞানের উৎপাদনকারী এবং তথ্য-আহরণ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদির ভুলত্রুটি নির্ণয়কারী।

বিচারবুদ্ধি স্বীয় অস্তিত্ব সম্বন্ধে জ্ঞানের অধিকারী ; এজন্য সে অন্য কোনো তথ্য-আহরণ মাধ্যমের দ্বারস্থ নয়। বিচারবুদ্ধি জ্ঞানের অস্তিত্বও অবগত - যা কোনো বস্তুগত বিষয় নয়। বিচারবুদ্ধি এমন অনেক অকাট্য বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক তথ্যাদি অবগত হতে পারে যা ইন্দ্রিয়নিচয়ের ধারণক্ষমতার বাইরে। যেমন: বিচারবুদ্ধি এ বিশ্বজগতের অস্তিত্বের পিছনে একজন স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্বন্ধে ধারণা করতে ও প্রত্যয়ে উপনীত হতে সক্ষম যদিও কোনো ইন্দ্রিয়েই স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রতিফলিত হয় না (অর্থাৎ ব্যক্তি চোখ দ্বারা স্রষ্টাকে দেখে নি , কান দ্বারা স্রষ্টার কথা শোনে নি , হাত দ্বারা তাঁকে স্পর্শ করে নি , ...)। তেমনি বিচারবুদ্ধি কোনো বস্তুর সাহায্য ছাড়াই সংখ্যার ধারণা করতে পারে , একমাত্রিক ও দ্বিমাত্রিক অস্তিত্ব (যা অবস্তুগত) সম্বন্ধে এবং অবস্তুগত ত্রিমাত্রিক অস্তিত্ব সম্বন্ধেও ধারণা করতে পারে। সে কল্পনা করতে পারে এবং কল্পনায় অনেক কিছু সৃষ্টি করতে পারে। তেমনি সে বস্তুগত সৃষ্টিতে রূপান্তর সাধনের পরিকল্পনা করতে পারে অর্থাৎ বাস্তবে রূপান্তর সাধনের পূর্বে সে কল্পনায় রূপান্তর সাধনের কাজ করে থাকে। আর এ সবের কোনোটিই ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান নয় যদিও এসব ক্ষেত্রে সে ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যাদি থেকে সাহায্য নিয়ে থাকতে পারে।

অতএব , বিচারবুদ্ধি হচ্ছে একটি স্বাধীন জ্ঞানমাধ্যম ও জ্ঞান-উৎস।

অনেকে (বস্তুবাদীরা) বিচারবুদ্ধির অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করে এবং দাবী করে যে , যে সব কাজকে বিচারবুদ্ধির কাজ বলে দাবী করা হয় তা আসলে মস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মাত্র। কিন্তু তাদের এ দাবী এ কারণে গ্রহণযোগ্য নয় যে , মস্তিষ্কের জ্ঞানকোষগুলো বস্তুগত উপাদানে তৈরী এবং তা প্রাপ্ত তথ্যাদি সঞ্চয় করে মাত্র ; এসব তথ্যের পর্যালোচনা , সমন্বয় সাধন , সংশোধন ও তা থেকে নতুন তথ্যে তথা উপসংহারে উপনীত হওয়ার জন্য অবশ্যই একটি স্বতন্ত্র হস্তক্ষেপকারী উপাদান অপরিহার্য। আর বস্তুজগতের বাইরের বিষয়ে তো নিজে নিজেই মস্তিষ্কে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হবার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ , এরূপ ক্ষেত্রে কোনোরূপ ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যের প্রভাব থাকে না। অতএব , এ ক্ষেত্রে একটি অবস্তুগত শক্তির প্রভাব বা হস্তক্ষেপ অপরিহার্য ; তা-ই হচ্ছে বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্)।

তাছাড়া বস্তুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া একমুখী অর্থাৎ হ্যা বা না হয়ে থাকে এবং প্রতিক্রিয়াটি টিকে থাকে বা বিলুপ্ত হয়ে যায়। বস্তুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা সন্দেহ-সংশয়ের বা বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় অনেক বিষয়েই উপসংহার বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে গিয়ে এ ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হই ; এ ধরনের অবস্থা বিচারবুদ্ধির অস্তিত্বই প্রমাণ করে।

এছাড়া সৌন্দর্যচেতনা , শিল্পকলা , সাহিত্য ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপেই বিচারবুদ্ধি ও অন্যান্য অবস্তুগত অভ্যন্তরীণ শক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট। উদাহরণস্বরূপ , একটি ছোটগল্প রচনা , গল্পটির সংক্ষেপণের প্রয়োজন অনুভব করা ও সংক্ষেপণের কাজ আঞ্জাম দেয়া ইন্দ্রিয়নিচয়ের কাজ নয় , বিচারবুদ্ধির কাজ।

যাই হোক , মোদ্দা কথা , বিচারবুদ্ধি এক অবস্তুগত অভ্যন্তরীণ শক্তি। অবশ্য তার প্রধান কর্মক্ষেত্র মস্তিষ্ক। তবে বিচারবুদ্ধিকে মস্তিষ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা ঠিক হবে না।

বিচারবুদ্ধি সম্বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে , তা অন্যান্য তথ্যসংগ্রহ মাধ্যম কর্তৃক সংগৃহীত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে সে সবের ভুল নির্ণয় ও নিরসন করতে পারে। বিচারবুদ্ধি বুঝতে পারে , চোখ সূর্যকে ছোট দেখলেও আসলে সূর্য অত ছোট নয় ; একই পানি দুই হাতে গরম ও ঠাণ্ডা অনুভূত হলেও আসলে ঐ পানির তাপমাত্রা একটিই , দু টি নয় , বরং দুই হাত ইতিপূর্বে দুই ধরনের তাপমাত্রায় ছিলো বলেই এরূপ অনুভব করছে ; গত রাতের জীবন বাস্তব বা বস্তুগত জগতের অভিজ্ঞতা ছিলো , কিন্তু গত রাতের স্বপ্ন বস্তুগত জগতের অভিজ্ঞতা ছিলো না , যদিও দু টি অভিজ্ঞতার একটিও এখন বর্তমান নেই ; ....।

অবশ্য বিচারবুদ্ধিও ভুল করতে পারে এবং ভুল উপসংহারে উপনীত হতে পারে। তবে বিচারবুদ্ধি পর্যালোচনা ও গবেষণার মাধ্যমে স্বীয় ভুল চিহ্নিত করে তা সংশোধন করতে পারে। কিন্তু ইান্দ্রিয়নিচয়ের সে ক্ষমতা নেই। যেমন: কোনো যান্ত্রিক উপকরণের সাহায্য গ্রহণ ছাড়াই খোলা চোখ একই জায়গা থেকে সূর্যকে লক্ষ বার দেখলেও ছোটই দেখতে পাবে।


3

4

5

6

7