মুক্তির পথে

মুক্তির পথে30%

মুক্তির পথে লেখক:
প্রকাশক: যাহরা একাডেমী ক্বোম, ইরান
বিভাগ: আল্লাহর একত্ববাদ

মুক্তির পথে
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 34 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 17354 / ডাউনলোড: 3768
সাইজ সাইজ সাইজ
মুক্তির পথে

মুক্তির পথে

লেখক:
প্রকাশক: যাহরা একাডেমী ক্বোম, ইরান
বাংলা

এ বইটিতে অত্যন্ত শক্তিশালী তাত্ত্বিক আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। কোন অন্ধ অনুকরণ এবং বিশ্বাস সম্পর্কিত উদ্দীপনাময়ী ও চলমান গতানুগতিক আলোচনা এতে স্থান পায়নি বরং গ্রন্থটির সকল আলোচনাই হয়েছে সম্পূর্ণ সত্য এবং সুপ্রমানিত তথ্যসমূহের উপর ভিত্তি করে। আমরা সুস্থ বুদ্ধি ও বিবেককে কখনো বিতাড়িত করি না বরং একই সঙ্গে রাসূল (সঃ) কর্তৃক বর্ণিত দলীলের উপর স্থবির বুদ্ধিবৃত্তি এবং মানব বুদ্ধিবৃত্তির সমান ব্যবহারের পক্ষপাতি। কেননা তালাবদ্ধ চিন্তা-ভাবনা থেকে মুক্তির চাবি কাঠি হচ্ছে এ বুদ্ধিবৃত্তি। ফলে এরই মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সঠিক দিক নির্দেশনা পেতে পারি। সাথে সাথে এ বুদ্ধিবৃত্তি আমাদেরকে এও বলে দেয় যে কোন্ বিষয়টি বিবেক প্রসূত আর কোনটি বিবেক-বহির্ভূত। এ গ্রন্থে বিভিন্ন সহজ বোধগম্য উদাহরণের মাধ্যমে চিন্তার বিকাশ সাধনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে যথার্থভাবে ,যেন পরবর্তীতে অন্যান্য চিন্তাবিদ ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিবর্গ এ পথে নিজেদের পরিশ্রম ব্যয় করতে এগিয়ে আসেন।

প্রাকৃতিক বিশ্বে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত

এখন আপনাদের সমক্ষে বিশ্ব প্রকৃতিতে প্রতিষ্ঠিত সুশৃঙ্খল বিধি-বিধানের উপর এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও হৃদয়স্পর্শী আলোচনার সুত্রপাত করবো ,যা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিন্তাবিদদের মতামতে সমৃদ্ধ।

উদ্ভিদ জগতে শৃঙ্খলা :

এ বিষয়ে সর্বপ্রথম উদ্ভিদের বপন বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়ে নিহিত কারণসমূহে ব্যাপারে একজন উদ্ভিদ ও ভূমিবিদের মতামত পেশ করছি।

Lester John Zimmerman নামক একজন উদ্ভিদ ও ভূমিবিদ বলেন : উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্যে প্রয়োজনীয় উপাদান বায়ু ও মাটি থেকে নেয়া হয়ে থাকে। তবে একটা প্রশ্ন এখানে থেকে যায় ,মাটির উৎপত্তি কোত্থকে এবং কেমন করে মৃত্তিকা উদ্ভিদের খাদ্য উপাদান সঞ্চয় করে রাখে ? উর্বর মাটি খনিজ উপাদান থেকে গঠিত এবং সে মাটি যথেষ্ট পরিমাণ কার্বন ধারণ করে রাখতে সক্ষম। যা আদিম বৃক্ষ ও প্রাণীদেহের ধ্বংসাবশেষ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। পানি ,বায়ু ,আলো ও রাসায়নিক উপাদানগুলো যদিওবা উদ্ভিদের বৃদ্ধির সহায়ক তথাপি এগুলোর কোনটাই একাজের জন্যে যথেষ্ট নয়। বরং এক অদৃশ্য শক্তি এসব সূক্ষ্ম ও জটিল কাজে কার্যকর ,যা প্রতিটি বীজের অভ্যন্তরে লুকায়িত। সেই শক্তিই একটি উপযোগী পরিবেশে একটি বৃক্ষের বৃদ্ধিতে সর্বাত্মক সহযোগীতা করে থাকে। এ শক্তির সময়োপযগী পরিবেশে একটি বৃক্ষের বৃদ্ধিতে সর্বাত্তক সহযোগীতা করে থাকে। এ শক্তির সময়োপযগী পদক্ষেপ অত্যন্ত সূক্ষ্মতা ও নিপুণতার সাথে সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রথমে বিভিন্ন কাজে পারদর্শী উপাদানসমূহের সমন্বয়ে গঠিত ডিম্বানুর সূক্ষ্ম দুটি কোষ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ শুরু করে দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলো পৃথক পৃথকভাবে বৃদ্ধি ও পরিপূর্ণতার পথে অগ্রসর হতে থাকে। যে বীজ মাটিতে ফেলা হয়ে থাকে পরবর্তীতে বৃদ্ধি পেয়ে হুবহু সে বৃক্ষেরই রূপ ধারণ করে থাকে। গমের বীজ থেকে গম গাছই উৎপন্ন হয়ে থাকে। যদি ওক বীজ বপন করা হয় তাহলে পরিণতিতে ওক বৃক্ষই পাওয়া যাবে। যদি কেউ স্বচ্ছ ধারণা ও নিরপেক্ষ অন্তঃকরণ নিয়ে এ ধরণের ক্রিয়া-কর্ম এবং বীজের বৃদ্ধি ও পরিপূর্ণতার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাহলে নিঃসন্দেহে সে এ বিশ্ব জগতে বিরাজমান সৌন্দর্য ও প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি সাক্ষ্য প্রদান করতে বাধ্য হবে১৩

এটোমের অভ্যন্তরে নিয়ম-শৃঙ্খলা :

জনাব কুরেন বলেন ,নিঃসংকোচে বলা যায় ,বস্তুজগত এক নিয়ম-শৃঙ্খলা ও আইন-কানুনের জগত ,বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার জগত নয়। এটা এমন এক জগত যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনের অনুসরণ করা হয়ে থাকে। দুর্ঘটনার পথ এখানে অবরুদ্ধ।

অতঃপর তিনি এটোমের দেহে এবং সেখানে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম শৃঙ্খলার ব্যাপারে এরূপ বলেন ,‘‘ প্রতিটি এটোম তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত।

এক : প্রোটন (পজেটিভ) ,

দুই : ইলেকট্রন (নেগেটিভ) ,

তিন : নিউট্রন (পজেটিভ ও নেগেটিভের সংমিশ্রণ বা নিউট্রাল)

প্রতিটি এটোমের সকল প্রোটন তার কেন্দ্র বিন্দুতে অবস্থিত। ইলেকট্রন সংখ্যার প্রোটনের সমপর্যায়ে অবস্থিত। তারা সকলে কেন্দ্র বিন্দুর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ এবং বিভিন্ন কক্ষপথে প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতে থাকে। তাদের সাথে কেন্দ্র বিন্দুর দূরত্ব এতই অধিক যে একজন মানুষ এ ধরণের দূরত্ব অবলোকন করে এটোমের সাথে সৌরজগতের তুলনা দিয়ে বসতে পারে। সৌরজগতের ন্যয় এটোমের আকারও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শূন্যাকাশে আবৃত থাকে। উল্লেখ্য যে ,এটোমের একটি উপাদানের সাথে অন্য আরেক উপাদানের পার্থক্য শুধুমাত্র সংখ্যাগত দিক দিয়ে কেন্দ্র বিন্দুতে প্রোটন আর কেন্দ্রবিন্দুর চতুর্দিকে ইলেকট্রন ও নিউট্রনের পার্থক্য এবং অবস্থানের ভিন্নতার সমতুল্য। অতএব ,কোটি কোটি মৌলিক ও যৌগিক পদার্থ অবশেষে এই তিন প্রকার বৈদ্যুতিক অণু থেকে সৃষ্টি হয়েছে। যা প্রকৃতপক্ষে একটি বস্তুর তিনটি রূপ। সেই বস্তুটির নাম বৈদ্যুতিক শক্তি বাElectricity আর এটাও এক অদৃশ্য শক্তির বহিঃপ্রকাশ’’১৪

অতি ক্ষুদ্রতম অণু কোষের ভিতর শৃঙ্খলা :

যদি আমরা এক ফোটা পানি পরীক্ষাগারের একটা নির্দিষ্ট কাচের উপর রেখে লক্ষ্য করি তাহলে প্রকৃতির এক অত্যাশ্চর্য প্রাণীর নড়াচড়া প্রত্যক্ষ করতে পারবো। এর ভিতর অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটা প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যাবে যাকেAmibe ধীরে ধীরে হজম করে ফেলে। ফলে শুধুমাত্র ঐ ক্ষুদ্র প্রাণীর মলমূত্র অবশিষ্ট রয়ে যায়। যদি আমরা অধিক সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে প্রত্যক্ষ করবো যেAmibe নিজেকে লম্বা করে দুটি অংশে বিভক্ত করে ফেলেছে। যার ফলে দুটি যুবক ও শিশুAmibe এর উৎপত্তি ঘটে। এ ক্ষেত্রে আমরা একটি কোষকে দেখতে পাব যে বেঁচে থাকার জন্যে সে সব ধরণের গুরুত্বপূর্ণ কর্ম সম্পাদন করে যাচ্ছে। অন্যদিকে এসব ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্যে বৃহদাকার প্রাণীরা পর্যন্ত বহু সহস্র কোষের প্রয়োজন অনুভব করে থাকে। শুধু তাই নয় ,কোন কোন ক্ষেত্রে তারা বহু সহস্র মিলিয়ন কোষেরও মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। এটা দিবালোকের ন্যয় স্পষ্ট যে এ ধরণের ক্ষুদ্র প্রাণীর জন্মদাতা কোন দুর্ঘটনা নয়। বরং সর্বপ্রকার ঘটনা প্রবাহের ঊর্দ্ধের কোন শক্তিই এ অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও বিষ্ময়কর প্রাণীর সৃষ্টিকর্তা । বিষয়টি বলেছেন ,জীব বিজ্ঞানীCecil Boyce Hamam । তিনি প্রাণীদেহের অভ্যন্তরে ক্রিমি জাতীয় জীবাণুর বিভিন্ন ভাগে বিভক্ততে বিশেষজ্ঞ এবং তারিশিন নামক এক প্রকার জীবাণু থেকে বিভিন্ন রোগের বিষাক্ত গ্যাস নির্ণায়ক।১৫

মৌলিক পদার্থের ছকে যথার্থ হিসেব ও শৃঙ্খলা :

মৌলিক পদার্থের চক্রাকার ছক এবং ব্যবস্থা ,এমন এক বিধি ব্যবস্থার সুন্দরতম চিত্র যা এ বিশ্বের জন্যে বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এ ছকটি এমন পদ্ধতিতে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়েছে যে ,বিশেষ ও সমগুণসম্পন্ন উপাদানগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে ঐ ছকের চতুর্দিকে সর্বদা ঘূর্ণয়মান থাকে। এ চক্রাকার ছকে সমস্ত উপাদানগুলো ইলেকট্রোন সংখ্যার প্রতি লক্ষ্য রেখে সন্নিবেশিত করা হয়ছে। ইলেকট্রোন সংখ্যা তার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রোটনের সংখ্যার সমতুল্য। এভাবে হাইড্রোজেনের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি প্রোটন ,দু টি হেলয়ুম এবং তিনটি ওয়ালিটিউম ছাড়াও আরো অনেক উপাদান বিদ্যমান। যখন উপাদানসমূহ এটোমের ওজন অনুযায়ী ক্রমানুষারে সন্নিবেশিত থাকে তখন তাদের বিশেষ উপাদানগুলোর পরিবর্তন চক্রাকারে এবং বৈকল্পিকভাবে পূনরাবৃত্তি হতে থাকে। যে সমস্ত উপাদান সমান্তরাল সারীতে অবস্থিত তারা তাদের প্রতিবেশীদের সাথে শুধুমাত্র একটি প্রোটন এবং একটি ইলেকট্রোনের পার্থক্য রাখে। আর যেগুলো দৈর্ঘ্যভাবে সারীতে অবস্থিত তাদের বাইরের কক্ষগুলোতে ইলেকট্রোনের সংখ্যা পরস্পর সমান। ইলেকট্রোনের সংখ্যা সমপরিমাণ হওয়ার কারণে যে সমস্ত উপাদান দৈর্ঘ্যভাবে সারীতে অবস্থিত তারা সমগুণ সম্পন্ন। যেহেতু প্রতিটি লিটুয়্যাম ,সোডিয়াম ,পটাশিয়াম ,রোবিডিয়াম ,কাইযিয়াম ও ফ্রানসিয়ামের বহির্কক্ষে একটি করে ইলেকট্রন বিদ্যমান সেহেতু তারা সমগুণ সম্পন্ন এবং একই পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিগণিত। আর যেহেতু ছয়টি উপাদান যথা হেলিয়াম ,নেউন ,আরগুণ ,কারিপটুন ,যানুন ও রাদুন এর চতুরপার্শ্বে কতগুলো অপরিবর্তনশীল মিশ্রণবেষ্টনী দিয়ে রেখেছে তাই তারা অন্যান্য উপাদানের সাথে মিলিত হওয়ার প্রবণতা প্রদর্শন করে না। এ কারণে সেগুলোকে অকেজো গ্যাস বলা হয়ে থাকে । অনুরূপভাবে অন্যান্য সকল উপাদানগুলোও তাদের সমগুণসম্পন্ন উপাদান এবং ইলেকট্রোনের সংখ্যার অনুপাতে বিভিন্ন পরিবারে বিভক্ত হয়েছে। আমাদের সাধারণ বিবেকই বলে দিবে যে ,এ ধরণের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং বিষ্ময়কর সন্নিবিষ্টতা কখনো কোন দূর্ঘটনার ফসল হতে পারে না।

নভোপুঞ্জ এবং পৃথিবীর কল্পনাতীত বিশালতা :

কোন সুস্থ মস্তিস্ক ব্যক্তির পক্ষে ভূ-মন্ডলের অস্তিত্ব অস্বীকার করার জো নেই। তেমনি নভোপুঞ্জও কেউ অস্বীকার করতে পারে না। ভূ-মন্ডলের ওজন ও আয়তনের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেশী। পৃথিবীর ওজন আনুমানিক ৬৬০০ বর্গ বিলিয়ন টন। যেখানে এক মিলিয়ন টনের প্রকৃত অনুমাপ মানুষের জন্যে এক দুস্কর ব্যাপার সেখানে এক বিলিয়ন অথবা বর্গ বিলিয়ন তো অনেক দুরের কথা। এত বৃহৎ এ ভূ-মন্ডলের ব্যাপারে স্বভাবতঃ-ই প্রশ্ন জাগ্রত হয় , এ বৃহৎ গ্রহ যার নাম ভূ-মন্ডল ,তা কোত্থকে এসেছে ?

বিশিষ্ট জ্যোতিষবিদগণ বলেন ,আমাদের ছায়াপথের ন্যায় একলক্ষ ছায়াপথ বিশ্ব-প্রকৃতিতে বিদ্যমান। প্রশ্ন হতে পারে ,এ আকাশপুঞ্জের সর্বমোট ওজন কত হবে ? শুধুমাত্র এ বিষয়ে সামান্য একটু চিন্তা একজন মানুষকে বিষ্মিত করে তুলতে যথেষ্ট। তাই এ বৃহৎপুঞ্জের চির বিদ্যমানতার ধারণা একটি অর্থহীন বিশ্বাসের শিকার। কেননা ,সকল বস্তু পরিবর্তনশীল অর্থাৎ বৃদ্ধি পায় এবং পর্যায়ক্রমে প্রসার লাভ করে। এমনকি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান যথেষ্ট মনোযোগের মাধ্যমে প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টি-সূচনা নির্ণয় করে দিতে সক্ষম। সুতরাং সঠিক ও বিবেক সমর্থিত ধারণাটি হচ্ছে যে ,এগুলো সৃষ্ট বস্তু বৈ অন্য কিছু নয়। এ ধরনের বৃহৎ ও সুশৃঙ্খল সৃষ্টি ব্যবস্থা কি কোন প্রস্তুতকারক বা শক্তিশালী স্রষ্টার প্রয়োজন অনুভব করে না ?

কয়েকটি আকর্ষণীয় দৃষ্টান্ত :

প্রাণীদেহের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্যে ভূ-মন্ডলে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কার্যক্রম সংঘটিত হয়ে থাকে। তন্মোধ্যে নিম্নে কয়েকটি কার্যক্রম উল্লেখ করা হলো :

এক : ভূমির উপরিপৃষ্ঠে জীবন রক্ষী গ্যাস থেকে যে বায়ুমন্ডল গঠিত হয়ে থাকে তার ঘনত্ব ও বেধ প্রায় আটশত কিলোমিটার। এত অধিক ঘনত্ব থাকার কারনেই তা ভূ-পৃষ্ঠকে ঢাল স্বরূপ ,শূন্যাকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত প্রতিদিন বিশ মিলিয়ন প্রাণহরণকারী প্রস্তর থেকে প্রতিরক্ষা করতে পারে। এসমস্ত পাথর প্রতি সেকেন্ড প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার বেগে ভূ-পৃষ্ঠে আঘাত হেনে থাকে।

দুই : বায়ুমন্ডল ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রাকে জীবন ধারণের উপযোগী করে গড়ে তোলে এবং মহাসাগর থেকে বাস্প ও প্রয়োজনীয় পানি শুস্ক এলাকায় স্থানান্তরিত করে থাকে। আর এরূপ কার্য সম্পন্ন না হলে মহাদেশগুলো বসবাসের অনুপযুক্ত এক একটি বৃহৎ শুস্ক মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যেত।

তিন : পানির দৃষ্টি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ,দীর্ঘ শীত মৌসুমে মহাসাগর ,সাগর ও নদীগুলোতে জীবন যাত্রা অব্যাহত রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তন্মোধ্যে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষন এবং স্বীয় ওজন বরফে রূপান্তরিত হওয়ার তাপমাত্রার চেয়ে চার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উপরে ধারণ অন্যতম। এ কারণেই নদী ও সাগরের তলদেশে পানি জমাট হতে বাধাগ্রস্থ হয়। অন্য আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্য হচ্ছে ,পানির ওজন বরফের ওজনের চেয়ে বেশী করে সংরক্ষিত রাখা। সেজন্যে বরফ পানির উপর ভেসে থাকতে সমর্থ হয়। আবার যখন পানি বরফে পরিণত হতে থাকে তখন প্রচুর পরিমাণ তাপ পানির নিম্নভাগ থেকে নিঃসৃত হয়ে বরফ গলানোর কাজে সহায়তা করে থাকে।

চার : মৃত্তিকা তার স্বগর্ভে এমন সব খনিজ পদার্থ ধারণ করে রাখে যেগুলোকে উদ্ভিদ সংগ্রহণ করে প্রাণী জগতের প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যরূপে বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

পাঁচ : ভূ-মন্ডলের আয়তম যদি চন্দ্রের ন্যয় ক্ষুদ্র অথবা বর্তমান আয়তনের এক চর্তুাংশ হতো তা হলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পানি ও বায়ু ধারণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতো আর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছতো যেখানে প্রাণীর জীবনাবসান নিশ্চিত হয়ে পড়তো। অপরদিকে যদি পৃথিবী স্বীয় ওজন অপরিবর্তীত রেখে সূর্যের ন্যয় বৃহৎ আকার ধারণ করতো তা হলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি একশত পঞ্চাশ গুণ অধিক বেড়ে যেতো আর বায়ুমন্ডলের উচ্চতা প্রায় দশ কিলোমিটার নিচে নেমে আস্তো। পরিণতিতে পানির বাষ্প হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়তো আর বায়ুর চাপ প্রায় ১৫০ বর্গকিলোগ্রামে উপনীত হতো। তদর্থে এক কিলোগ্রাম ওজনের প্রাণী একশত পঞ্চাশ কিলোগ্রামে পরিণত হয়ে যেতো আর তখন মানুষের উচ্চতা কমে কাঠবিড়ালীর ন্যায় ক্ষুদ্রাকৃতিতে পরিণত হতো।

ছয় : যদি ভূ-মন্ডল থেকে সূর্যের দূরত্ব বর্তমান দূরত্বের দ্বিগুণ হতো তা হলে সূর্য থেকে গৃহীত তাপমাত্রা বর্তমান তাপমাত্রার এক চর্তুাংশে অবতরণ করতো আর সূর্যের চতুর্দিকে প্রদক্ষিনরত পৃথিবীর গতিবেগ বর্তমান গতিবেগের অর্ধেকে নেমে আসতো। ফলে বিশ্বের সকল প্রাণী ঠান্ডায় জমাট বেধে যেতো। আর যদি পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব বর্তমান দূরত্বের অর্ধেক হতো তা হলে উষ্ণতা চারগুন ,সূর্যের চতুর্দিকে প্রদক্ষিনের গতিবেগ দ্বিগুন ,ঋতুর সময়কাল অর্ধেক (ঋতুর সময়কাল পরিবর্তন সাপেক্ষে) হয়ে যেতো এবং ভূ-পৃষ্ঠে এতবেশী উত্তপ্ত হয়ে উঠতো যে সেখানে জীবন ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়তো।

এগুলো ছিল বিশ্ব প্রকৃতিতে প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত সুষ্ঠ ও সূক্ষ্ম আইন-কানুন ,বিধি-বিধান এবং অত্যাশ্চর্য সু-শৃঙ্খলার তাক লাগানো প্রকান্ডতার কয়েকটি দৃষ্টান্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ শীর্ষক গ্রন্থে আরো অধিক দৃষ্টান্তের অবতারণা করা হয়েছে। বর্তমান গ্রন্থে উল্লেখিত একটি উদাহরণ-ই একজন বুদ্ধিমান ন্যয়বিচারকের সমক্ষে সৃষ্টি সূচনার পরিচয়ের এক মহাগ্রন্থ উন্মোচন করে দিতে সক্ষম।

তাই জনৈক পারস্য কবি যথার্থই বলেছেন :

সচেতন ব্যক্তির দৃষ্টিতে সবুজ পাতা বৃক্ষলতার

প্রতিটি পাতা-ই এক একটি গ্রন্থ আল্লাহকে চেনার।

দুর্ঘটনা নাকি কোন মহাশক্তির পরিচালনা ?

সৃষ্টিজগতের বিশালতা ও তার বিষ্ময়কর শৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধান প্রাথমিক নিম্নের দুটি সম্ভাবনার ফলাফল ধরে নেয়া যেতে পারে।

এক : সব কিছুই কোন একটি সংঘর্ষ এবং পারস্পরিক মিশ্রনের ফল অর্থাৎ দর্শনের পরিভাষায় সৃষ্টির অস্তিত্ব ও তার বিষ্ময়কর নিয়মশৃঙ্খলার জন্যে কোন বস্তুগত কার্যকারণ-ই যথেষ্ট ,অন্য কোন ক্রিয়াশীল কার্যকারণের প্রয়োজন নেই।

দুই : বিশ্ব সৃষ্টি ও তার সূক্ষ্ম নিপুণতার যথাযথ ও অপরিবর্তনীয় বিধি-বিধান ,সুউচ্চ কোন বিবেক-শক্তি ও প্রজ্ঞার পরিচালনার-ই কারণ আর তিনিই হচ্ছেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্রিয়াশীল সূচনাশক্তি ।

এখন আমাদের বিবেককে উপরোক্ত দু টি মতামতের মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্যে আহ্বান জানানো উচিত। এক্ষেত্রে তো আর পরীক্ষা নিরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অনুসন্ধান চলে না। একটি মাত্র উপায়ে অন্বেষণ ও গবেষণা চালানো যেতে পারে ,আর তা হলো সুস্থ বুদ্ধি-বিবেকের প্রয়োগ যা অকলুষিত প্রকৃতি এবং গোড়ামী ও একগুয়েমী বিবর্জিত অন্তর আত্মার সমন্বয়ে গঠিত। এ পর্যায়ে আমরা দু জন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর মতামত উপস্থাপন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছি।

পদার্থবিদ এ্যাডভিন ফ্যাষ্ট বলেন : তিনটি মূল উপাদান যথা হাইড্রোজেন ,অক্সিজেন ও কার্বন হচ্ছে প্রতিটি প্রাণীদেহের সর্ব প্রাথমিক সামগ্রী। আর উক্ত তিনটি উপাদানের সাথে সামান্য নাইট্রোজেন গ্যাস ও অন্যান্য উপাদানের মিশ্রন আছে। এটা কি সম্ভব যে প্রনীদেহে তার উপাদানেরও স্বেচ্ছাকৃত মিশ্রণ কোন এক দুর্ঘটনার ফসল ? কেন আমরা দৃঢ় প্রত্যয় সহকারে ব্যক্ত করছি না যে ,প্রাণীকুলের সৃষ্টিকর্তাই এরকম ইচ্ছা পোষন করেছেন ? কেন আমরা সৃষ্টি অস্তিত্বের আলোচনায় একটি সহজ শব্দ আল্লাহ্ উচ্চারণ থেকে বিরত রয়েছি ? যদিও এ শব্দটি অত্যন্ত সাধারণ ও সহজ তথাপি এর মর্যাদা ও আড়ম্বরতা গগন চুম্বী।১৬

জন এ্যাডওয়ালক বুহলের নামক একজন রসায়নবিদ বলেন : যদি সম্ভবনাময়ী হিসেবের ভিত্তিতে প্রকৃতির যে কোন একটি কাজের ফলাফল অর্জনের জন্যে দুর্ঘটনাকে আমরা কারণ হিসেবে ধরে নেই তা হলে প্রত্যক্ষ করতে পারবো যে ,এ সময়কাল উক্ত কাজের জন্যে যথেষ্ট নয় ,যদিও ভূ-পৃষ্ঠের বয়স তিন বিলিয়ন বৎসর ধরা হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ প্রোটনের আদি উপাদান থেকে তার কণার সৃষ্টি । শুধুমাত্র স্বাধীন ও প্রত্যয়শীল একটি পথ প্রদর্শকের অস্তিত্ব স্বীকারের মাধ্যমেই সুশৃঙ্খল ও সুসামঞ্জস্য ব্যবস্থাপনা থেকে দুর্ঘটনা বা সংঘর্ষের ধারণাকে পৃথক করা যেতে পারে।১৭

রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীর সংখ্যা

ইসলামের নবী (সা.) খাদিজার পর একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সাওদা , আয়েশা , গাজিয়া , হাফসাহ , উম্মে হাবিবা , উম্মে সালামাহ , যয়নাব বিনতে যাহেশ , যয়নাব বিনতে খুযাইমাহ , মাইমুনাহ , জুয়াইরিয়াহ , সাফিয়াহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

এখন যে পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-কে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে হয়েছে , সে সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।

মূলতঃ কয়েকটি উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) একাধিক বিয়ে করেছিলেন:

1.অনাথ ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের আত্মসম্মান রক্ষা করার জন্যে , যারা ইতোপূর্বে সম্মান ও প্রতিপত্তির সাথে জীবন যাপন করতেন , কিন্তু স্বীয় অভিভাবককে হারানোর ফলে তাদের সম্মান প্রতিপত্তি এখন বিপর্যস্ত , মহানবী (সা.) তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। নতুবা তাদের গোত্র তাদেরকে ফিরিয়ে নিত এবং তাদেরকে কুফর করতে ও ইসলামের অস্বীকৃতিতে বাধ্য করত। যেমন : সাত্তদা , যার স্বামী হাবাশায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার পর পরলোক গমন করেছিলেন। ফলে তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিলেন।

রাসূল (সা.) খাদিজাকে হারানোর পর বিপত্নীক ছিলেন এবং সাওদার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

যয়নাব বিনতে খুযাইমা ছিলেন রাসূলের অপর এক স্ত্রী। তিনি এক বিধবা রমণী ছিলেন যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর একদিকে অভিবাবকহীন এবং অপরদিকে দারিদ্রকবলিত হয়ে পড়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন দানশীলা , উদার এবং উম্মুল মাসাকীন (নিঃস্বদের মাতা) আল্লাহর রাসূল (সা.) যয়নাবের সম্মান রক্ষার্থে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যয়নাব বিনতে খুযাইমা রাসূলের জীবদ্দশায়ই পরলোক গমন করেন।

উম্মে সালমাও ছিলেন বয়স্কা ও অনাথ সন্তানের মাতা , ঈমানদার। তিনিও নবী (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

2.প্রচলিত অবস্থার পরিবর্তন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভ্রান্ত রীতি-নীতির প্রাচীর চূর্ণ করে দেয়ার জন্যে তাঁর ফুফাত বোন যয়নাব বিনতে জাহাশের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন , যিনি রাসূলের পালক পুত্র যায়েদ ইবনে হারিসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যায়েদের সাথে যয়নাবের যে বিবাহ মহানবী (সা.)-এর নির্দেশানুসারে সম্পন্ন হয়েছিল তা স্বয়ং ইসলামের শ্রেণী বৈষম্যহীন বিশেষত্বেরই দৃষ্টান্ত। কারণ , যয়নাব ছিলেন কোরাইশ অধিপতি আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্রাদের মধ্যে একজন , আর যায়িদ ছিল পারিবারিক দিক থেকে কৃতদাস , যিনি রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে মুক্তি পেয়েছিলেন।

যয়নাব যেহেতু অভিজাত পরিবারের ছিলেন , সেহেতু যায়েদের সাথে দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ করত ; আর এভাবে নিজের দাম্পত্য জীবনে তিক্ততা সৃষ্টি করত এবং রাসূল (সা.) তাদেরকে শতভাবে উপদেশ দিলেও তাতে কোন ফল হয়নি। অবশেষে যায়েদ যয়নাবের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিল এবং তাকে তালাক দিয়েছিল।

যয়নাব তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর আদেশে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন , যাতে মানুষের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার ও অযৌক্তিক রীতি-নীতির মূলোৎপাটিত হয়। (যেহেতু তারা পালক পূত্রকে স্বীয় প্রকৃত পুত্র বলে মনে করত এবং তার স্ত্রীকে নিজের জন্যে নিষিদ্ধ মনে করত)।35

খ্রিস্টবাদী কিছু লেখক এ বিষয়টির ক্ষেত্রে (হযরতের একাধিক বিবাহ) এতটা বিচ্যুত ও কুরটনাকারী হয়েছিল যে লিখেছিল : আল্লাহর রাসূল যয়নাবের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়েছিলেন! এ বক্তব্যটি এতটা অনর্থক ও অযৌক্তিক যে তা সমস্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির পরিপন্থী। কারণ যদি নবী (সা.) কুমন্ত্রনা ও এ ধরনের ধ্যান- ধারণার বশবর্তী হতেন কিংবা যয়নাবের রূপ সৌন্দর্য এতটা মনোহারী ছিল যে , হযরতকে প্রেমাসক্ত করে ফেলেছিল যদি তাই হতো , তবে কেন যখন যয়নাব কুমারী ও বিশেষ আকর্ষণের অধিকারী ছিল আর রাসূলও (সা.) উদ্দাম যৌবনের অধিকারী ছিলেন , তখন কেন তার প্রতি আসক্ত হলেন না ; বিশেষ করে এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে যয়নাব তো তখনও তার নিকট অপরিচিত ছিল না ? বরং রাসূলের নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই তিনি পরিগণিত হতেন এবং পারিবারিক পরিচিতের মাধ্যমে তারা পরস্পরের সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

3.বন্দী ও দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্যে ; যেমন , জুয়াইরিয়াকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। জুয়াইরিয়া ছিলেন সম্ভ্রান্ত বনি মুসতালিক গোত্রের কন্যা , যিনি ইসলামী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দী হয়েছিলেন। মহানবী (সা.) হারেসের কন্যা জুবাইরিয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। হারেস ছিলেন গোত্রপতি। মুসলমানরা যখন দেখল যে , বন্দীরা হযরতের আত্মীয়দের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে , তখন তাদের (বন্দীদের) অনেককেই মুক্তি দিয়েছিলেন। ইবনে হিশামের মতে এ বিবাহের সুবাদে বনি মুসতালিকের একশতটি পরিবার মুক্তি পেয়েছিল।36

4.আরবের বৃহত্তর গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংরক্ষণ করার জন্যে নবী (সা.) আয়েশা , হাফসা , উম্মে হাবিবা , সাফিয়া ও মাইমূনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

উম্মে হাবিবা ছিলেন সেই আবু সুফিয়ানের কন্যা যার বংশ (ইসলামের) রেসালতের ধারক সম্মানিত (হাশেমী) পরিবারের সাথে আপোসহীন শত্রুতা প্রদর্শন করত। তার স্বামী হাবাশে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হয়েছিল এবং অতঃপর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিল। উম্মে হাবিবা কঠিন সঙ্কটময় অবস্থায় দিনাতিপাত করছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন মুসলমান ; অপর দিকে তার পিতা ছিল নবী (সা.)-এর ঘোর শত্রু । ফলে তিনি তার পিতা (আবু সুফিয়ানের) নিকট আশ্রয় নিতে পারছিলেন না। সুতরাং উম্মে হাবিবা অভিভাবকহীন ও বঞ্চিত নারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন।

মহানবী (সা.) বনি উমাইয়্যাদের অন্তর জয় করার জন্যে এবং সেই সাথে উম্মে হাবিবার অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।37

সাফিয়া ছিলেন হাই ইবনে আখতাবের কন্যা , যিনি বনি নাযির গোত্রের প্রধান ছিলেন। ইহুদী বন্দীরা মুসলমানদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার পর হযরত (সা.) সাফিয়ার ব্যক্তিত্ব রক্ষা করার জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে অবদ্ধ হলেন। আর এ প্রক্রিয়ায় বনি ইসরাইলের একটি শ্রেষ্ঠ গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।38

বৃহত্তর গোত্র বনি মাখযুমের রমণী ছিলেন মায়মূনা , যাকে মহানবী (সা.) সপ্তম হিজরীতে বিবাহ সম্পন্ন করেন।39

নবী (সা.)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে আয়েশা ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় সকলেই বিধবা ছিলেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই যৌবনের উচ্ছলতা ও অভিলাষ হারিয়ে ছিলেন। আর এটাই এর সপক্ষে শ্রেষ্ঠ দলিল যে , রাসূল (সা.)-এর একাধিক বিবাহ বৃহত্তর কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। সুতরাং রাসূলের প্রতি কুমন্ত্রণা ইত্যাদির অপবাদ প্রদান কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না।

নবুওয়াত লাভের পূর্বে মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব

পারিপার্শ্বিকতার নীতি

মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে , পরিবেশ , কোন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ও চিন্তা-চেতনার ভিত্তি রচনা করে এবং পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধান ও অনুরূপ হওয়ার নীতি অনুসরণ তারা সামাজিক রীতি প্রথার পশ্চাদ্ধাবন করে।

যদিও এ ব্যাপারে একদল চরমপন্থা অবলম্বন করেছেন এবং এ মতবাদকে একটি সার্বিক ও সর্বজনীন নীতি বলে মনে করেছেন। তারা সকল সামাজিক বিষয় ও ঘটনাকে কোন প্রকার ব্যতিক্রম ব্যতীতই এ নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তবে ব্যক্তির মন মানসিকতার উপর পরিবেশের প্রভাব অনস্বীকার্য।

অতএব , কল্যাণময় ও সংযমী পরিবেশ , সমাজের সন্তানদেরকে সংযমী ও সুশৃঙ্খল রূপে গড়ে তোলে। অপরদিকে বিচ্যুত ও কলুষিত পরিবেশ কোন না কোন ভাবে ব্যক্তিকে বিচ্যুতি ও অনাচারের দিকে ঠেলে দেয়। অতএব , যিনি স্বীয় পথকে কলুষিত পরিবেশ থেকে পৃথক করে থাকেন , নিঃসন্দেহে তিনি কোন সাধারণ ব্যক্তিত্ব নন।

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের পরিবেশ

পৃথিবী , বিশেষ করে আরবভূমি তখন অজ্ঞতা ও অন্যায়ের সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল এবং আরবের জনগণ কুসংস্কার ও অনাচারের আগুনে জ্বলছিল। অজ্ঞতার কৃষ্ণকায় মেঘগুলো আরববাসীর জীবন-দিগন্তকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলেছিল এবং তারা অন্ধকারের ঘনঘটায় জীবনাতিবাহিত করছিল। কতইনা সম্পদ লুটতরাজ হতো , কতইনা রক্ত অন্যায় ভাবে ঝরত।

নিকৃষ্টতম ব্যাপার ছিল , প্রাণহীন মূর্তিসমূহের উপাসনা। কুসংস্কার ও শ্রেণী বৈষম্য সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিল। যার অস্তিত্ব সেথায় ছিলনা তা হলো ন্যায়পরায়ণতা ও নিয়ম শৃঙ্খলা । নিষ্ঠুর শক্তিধররা অন্যের শ্রম এবং বিধবা ও অনাথের ঘামের বিনিময়ে স্বীয় ধন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলত। আর আত্মম্ভরিতা ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করত এবং খেঁটে খাওয়া মানুষের উপর আগ্রাসন ও নিপীড়ন চালাত।

তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যনীতি এতটা খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল যে , অক্ষম স্বামীর ঋণের মোকাবিলায় তারা স্ত্রীকে দায়ী মনে করতো ; আর যদি অক্ষম , অপারগ কোন স্ত্রীর নিকট ঋণ থাকত তবে তার জন্যে তার স্বামীকে গ্রেফতার করত।40

উৎকর্ষ ও জ্ঞানার্জনের কোন উদ্যোগ তাদের ছিলই না , বরং এর পরিবর্তে তাদের পূর্বপুরুষ ও লোক জনের সংখ্যাধিক্যের জন্যে অহঙ্কার করত । কখনো কখনো কোন গোত্রের জনবলের আধিক্য প্রমাণ করার জন্যে তারা গোরস্থানে যেয়ে কবরের সংখ্যা গণনা করে তাদের সংখ্যাধিক্য দেখাত।41

হিংসা বিদ্বেষ , কাম-ক্রোধ , মদ্যপান , রক্তারক্তি ছিল তাদের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

ইমরুল কাইস নামক এক বিখ্যাত আরব কবি , তার চাচাত বোন উনাইযার সাথে শয়তানী ও উন্মাদ প্রেম ঘটিত ঘটনাবহুল অতীত সম্পর্কে নির্লজ্জ ভাবে তার কবিতায় বর্ণনা করেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এ কাব্যসমূহই সাহিত্য কর্মের নিদর্শন স্বরূপ কাবা ঘরের দেয়ালে টানানো হয়েছিল।

এটাই ছিল সে সমাজের জনজীবন ও আচার ব্যবহারের চিত্র , যে সমাজের অন্ধকারময় দিগন্ত থেকে ইসলামের জ্যোতি আত্মপ্রকাশ করেছিল।

নিঃসন্দেহে যিনি এহেন সমাজের রঙে রঞ্জিত না হয়ে , বরং এতে অস্বস্থি বোধ করতেন এবং এর বিরোধিতায় রত হতেন , তিনি এক মহান ও ঐশী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর তিনিই জাতির নেতৃত্বের জন্যে এবং বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্তি দানের জন্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।

নবীগণ (আ.) সমাজ গঠন করতেন , সমাজের অনুসরণ করতেন না

সকলেই মূর্তিনগরের দিকে ধাবিত হতো ; কিন্তু মহানবী (সা.) কারো কাছে শিক্ষা গ্রহণ না করলেও42 হেরা পর্বতের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সেথায় , শক্তি ও মর্যাদার অধিকারী বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর সম্মুখে সিজদাবনত হয়ে তাঁরই উপাসনায় আত্মনিয়োগ করতেন।43

হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর করুণার ছোঁয়ায় শৈশব থেকেই তাঁর পথ (সঠিকরূপে) নির্বাচন করে নিয়েছিলেন এবং কোন প্রকার উৎকন্ঠা ও সন্দেহ ব্যতীতই স্বীয় গোত্রের ভ্রান্ত রীতিনীতি পরিহার করে চলতেন এবং এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন।44

তিনি তাঁর জীবনের কোন মুহূর্তেই মূর্তি পূজা করেন নি , এমনকি ঐগুলোর নাম শুনতেও অনীহা প্রকাশ করতেন। যেমনটি ইতোপূর্বেও আমরা উল্লেখ করেছিলাম।

যখন হযরত মাত্র 12 বছরের বালক ছিলেন এবং বোহাইরা তাঁকে দুটি কুখ্যাত মূর্তি লাত ও ওজ্জার কসম দিয়েছিল তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং সক্রোধে বলেছিলেন : আমি কোন কিছুকেই এ দুটির মত শত্রু মনে করি না।

তাঁর সততা ও মহত্বের খ্যাতি ছিল লোকের মুখে মুখে ; তাঁর আচার , ব্যবহার ও বিশ্বস্ততার কারণে তিনি আল আমীন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর এহেন কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের কারণেই , খাদিজা তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁর উপর ন্যস্ত করেছিলেন।

মহানবী (সা.)-এর আচার-আচরণ এতই মনোমুকর ও সমুন্নত ছিল যে , তা সকল মানুষকে তাঁর দিকে আকর্ষণ করত।

আম্মার বলেন : নবুয়াতের পূর্বে আমি ও মুহাম্মদ (সা.) রাখালী করতাম। একদিন আমি প্রস্তাব দিলাম যে , ফাখের চারণ ভূমিতে গেলে ভাল হয়। মুহাম্মদ (সা.) আমার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন। পরদিন সেখানে গেলাম । দেখলাম যে মুহাম্মদ (সা.) আমার পূর্বে সেখানে গিয়েছেন কিন্তু মেষগুলোকে সেখানে চরানো থেকে বিরত রাখছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : কেন মেষগুলোকে চরতে দিচ্ছেন না ? তিনি বললেন : যেহেতু তোমার সাথে কথা দিয়েছিলাম তাই তুমি আসার পূর্বে আমার মেষগুলো এ চারণ ভূমি থেকে আহার গ্রহণ করবে , তা পছন্দ করছিলাম না।

এভাবেই মুহম্মাদ (সা.) অন্য এক পথে নিজেকে পরিচালিত করেছিলেন এবং গোত্রের রীতিনীতির অনুগামী হন নি। আর অদৃশ্যলোকের সাহায্যে স্বীয় উৎকর্ষের পথে অগ্রসরমান ছিলেন।

আর এ জন্যেই মানুষ তাঁর প্রতি অধিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং কোন সমস্যার সমাধানে তাঁর দেয়া সিদ্ধান্তের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন ও তাঁর অনুসরণ করতেন।

হাজারুল আসওয়াদ স্থাপনের ক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত

মহানবীর বয়স ছিল তখন 35 বছর। কোরাইশ কাবা অর্থাৎ আল্লাহর গৃহ পুনঃনির্মাণ ও মেরামত করার জন্যে সিদ্ধান্ত নিল। যেহেতু কোরাইশের গোত্রসমূহের সকলেই এ গৃহ মেরামতকরণের মর্যাদার অধিকারী হতে চেয়েছিল , সেহেতু প্রত্যেকেই কাবার এক একটি অংশ মেরামত করার জন্যে ভাগাভাগি করে নিল।

প্রথমে ওয়ালিদ গৃহ ভাঙ্গার কাজ শুরু করল। অতঃপর অন্যরা তাকে সাহায্য করল। ফলে ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক নির্মিত স্তম্ভগুলো দৃশ্যমান হলো। অতঃপর প্রত্যেক গোত্র কাবাগৃহের নির্দিষ্ট অংশ মেরামত করার জন্যে নির্ধারণ করে নিল। যখন কাবা গৃহের মেরামত কাজ এমন এক স্থানে পৌঁছল যেখানে হাজারুল আসওয়াদ স্থাপন করতে হবে , তখন কোরাইশের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তুমুল বিবাদ শুরু হলো। কারণ প্রত্যেক গোত্রই স্বহস্তে এ কর্ম সম্পাদন করতে এবং এ মর্যাদার অধিকারী হতে চাইল।

ধীরে ধীরে এ বিরোধ প্রকট হতে লাগল এবং যুদ্ধ বাঁধার পর্যায়ে পৌঁছল। আব্দুদ্দারের পুত্ররা একটি বৃহৎ পাত্র রক্তে পূর্ণ করে এবং তাতে হস্ত সমূহ নিমজ্জিত করে পরস্পরের খুনে রঞ্জিত হওয়ার জন্যে শপথ গ্রহণ করল।

এ ভয়ঙ্কর বিরোধ চার অথবা পাঁচ রাত্রি স্থায়ী হয়েছিল। অতঃপর আবু উমাইয়া কোরাইশের বয়োজ্যেষ্ঠতম ব্যক্তি বলল : আমার প্রস্তাব হলো এই যে , (আগামী কাল প্রত্যুষে) সর্বপ্রথমেই যে ব্যক্তি মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে , তাকে এ বিরোধের মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিবে। তার এ প্রস্তাব সকলেই একবাক্যে গ্রহণ করল , যাতে সমস্যার সমাধান হয়।

কোরাইশ তার এ প্রস্তাব গ্রহণ করতঃ অপেক্ষা করতে লাগল যে , কে মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করছে। হঠাৎ দেখা গেল যে ইসলামের নবী (সা.) প্রবেশ করলেন। যখন তাদের দৃষ্টি তাঁর উপর পতিত হলো । বলল : এতো মুহাম্মদ , সে বিশ্বস্ত (আমীন) , আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত।

মুহাম্মদ (সা.) এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তিনি ঘটনার বিষয় সম্পর্কে অবহিত হয়ে বললেন : একটি জামা নিয়ে আস। কোরাইশরা যদিও তার উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারেনি তবু দ্রুত একটি জামা নিয়ে আসল। মহানবী (সা.) ঐ জামাটিকে বিছিয়ে দিলেন এবং হাজারুল আসওয়াদকে এর মাঝে রাখলেন। অতঃপর বললেন : প্রত্যেক গোত্র এ জামার এক একটি অংশ ধর যাতে প্রত্যেকেই এ মর্যাদায় অংশীদার হতে পার। কোরাইশের প্রত্যেক গোত্র জামার চারদিকে ধরল। অতঃপর ঐ নির্দিষ্ট স্থানে বয়ে নিল , যেখানে পাথরটি স্থাপন করতে হবে। তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) দেখলেন যদি এর সংস্থাপনের দায়িত্ব অন্যকে দেন , তবে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে । তাই তিনি স্বয়ং হাজারুল আসওয়াদ তুলে নিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। আর এ উন্নত বিচারের মাধ্যমে বিরোধ সম্পূর্ণ রূপে দূর করলেন।

এ ঘটনা রাসূল (সা.)-এর মহান সামাজিক ব্যক্তিত্বের প্রমাণবহ। আর সে সাথে সঠিক চিন্তার মাধ্যমে এক রক্তাক্ত ভয়ঙ্কর গোলযোগের রক্তপাতহীন সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর সঠিক সিদ্ধান্ত ও সুবিচারের প্রকাশ ঘটায়।

আর এভাবেই অনুধাবন করা যায় যে , তিনি নবুওয়াতের জন্যে এবং পবিত্র ও ঐশী বিপ্লবের ধ্বজা ধারণ করার জন্যে যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

ওহীর অবতরণ

মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিশ্বজনীন রেসালত

এখন পর্যন্ত আমরা মহানবী (সা.)-এর জীবনের পাতাসমূহ থেকে কিছু পাতা দেখেছি মাত্র এবং তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের কিছু ঘটনা সেখানে আমরা পড়েছি। এবার আমরা তাঁর জীবনেতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করব।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশ বছর যাবৎ এমন এক অভিভাবকহীন ও লাগামহীন জনসমাজে বসবাস করেছিলেন যেখানে সভ্যতা ও সংস্কৃতির লেশ-মাত্র ছিল না। আর সমাজের এহেন অবস্থা মহানবী (সা.)-এর কোমল হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তুলত। মুহাম্মদ (সা.) সমাজে অজ্ঞতার তিমির ব্যতীত কিছুই দেখতে পাননি। কাবায় যেতেন , দেখতেন , খোদার পরিবর্তে তারা মূর্তি পূজা করছে ; কাবা ত্যাগ করে সমাজে আসতেন , সেখানের অবস্থা অবলোকনেও ব্যথিত হতেন ; মানুষের মাঝে যেতেন , গোত্রের নিকৃষ্ট চিন্তা-চেতনা ও রীতিনীতি দেখে হৃদয় ভারাক্রান্ত হতেন ; দরিদ্র নিপীড়িত , বঞ্চিত মানুষের অবস্থা দেখে ক্লেষ ভোগ করতেন।

নারীদের নিকৃষ্টতম সামাজিক অবস্থান , মদ , জুয়া , নরহত্যা , অনাচার ইত্যাদির বিস্তৃতিতে নিদারুণ কষ্ট অনুভব করতেন।

যখন ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন এবং মানুষের সাথে মেলামেশা করতেন , তখন মানুষের চারিত্রিক অবনতি তার কোমল হৃদয়কে ব্যথিত করত। তখন বাধ্য হয়ে বিশ্রাম ও ইবাদতের জন্যে এমন কোন স্থানে যেতেন , যেখানে তাঁর হৃদয় ক্লেশমুক্ত থাকে , তাঁর প্রাণে একটু সস্তি পেতে পারেন। এ জন্যে তিনি হেরা পর্বতে যেতেন এবং আল্লাহর রহমতের নিদর্শন ও সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করতেন।

চল্লিশ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (সা.)

মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশতম বছরে পদার্পণ করলেন এবং ঐশী ও বিশ্বজনীন রেসালতের দায়িত্ব পালন করার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করলেন। হঠাৎ তাঁর প্রতি ওহীর ফেরেশতা জিব্রাইল অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন : পড়! ...মুহাম্মদ (সা.) বললেন : কী পড়ব ? তিনি এক অভূতপূর্ব অনুভূতিতে নিমগ্ন হলেন। দ্বিতীয়বার একই শব্দ শুনতে পেলেন যে সুস্পষ্ট রূপে বলল : পড় , হে মুহাম্মদ!

তৃতীয়বার জিব্রাইল পুনরাবৃত্তি করে বললেন : তোমার প্রভুর নামে পাঠ কর , যিনি সৃষ্টি করেছেন , সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত পিণ্ড থেকে , পড় , এবং তোমার প্রভু সর্বাপেক্ষা দয়ালু , যে প্রভু লিখতে শিখিয়েছেন এবং মানুষ যা জানতো না , তা তাকে শিখিয়েছেন।45

এক অবর্ণনীয় আনন্দ ও উৎকণ্ঠা তাঁর সমস্ত অন্তরাত্মা , তাঁর অস্তিত্বকে বিমোহিত করে তুলেছিল। কারণ এক বৃহৎ ও সমুন্নত জগতের সাথে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ...ফেরেশতাদের সাথে ...জিব্রাইলের সাথে উর্ধ্বলোকের সাথে ...তাঁর আত্মা এক পবিত্র ও মহান আশ্রয়স্থলের সাথে নিবিঢ় ও সার্বক্ষণিক সম্পর্ক স্থাপন করল , তিনি স্বীয় অভ্যন্তরে নবুওয়াতের ক্ষমতা অনুভব করলেন এবং কোন প্রকার উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের লেশমাত্র তাঁর অস্তিত্বে পরিলক্ষিত হয়নি। যা ছিল তা হলো দৃঢ়তা ও প্রশান্তি।

তাহলে মুহাম্মদ (সা.) কি হেরা পর্বতে কোন প্রশিক্ষণকাল সম্পন্ন করেছিলেন ? এটি সে প্রশ্ন , যার ইতিবাচক জবাব দিয়েছিলেন কোন কোন প্রাচ্যবিদ ও লেখক এবং বলেছিলেন : মুহাম্মদ (সা.) হেরা পর্বতের গুহায় ইঞ্জিল ও নবীগণের (আ.) বক্তব্য ও শিক্ষার উপর গভীর ভাবে গবেষণা ও পর্যালোচনা চালিয়েছিলেন এবং এ (জ্ঞান) জগতের অনেক স্বাদ আস্বাদন করেছিলেন।

এ কথার অর্থ দাঁড়ায় মুহাম্মদ (সা.) স্বশিক্ষিত কোন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ইঞ্জিল ও তৌরাতের উপর গভীর অনুসন্ধান ও পড়াশুনার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে আবিস্কার করেছিলেন!

কিন্তু এ ধারণার বিপরীতে অনেক প্রমাণ রয়েছে , এ গুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

যদি ইসলামের নবী (সা.) কোরআনকে ইঞ্জিল ও পূর্ববর্তী নবীগণের (আ.) শিক্ষা থেকে গ্রহণ করতেন , তবে সঙ্গত কারণেই কোরআনের বিষয়-বস্তুসমূহ ইঞ্জিল ও তৌরাতের সদৃশ হতো। অথচ কোরআনের বিষয় বস্তু তৌরাত ও ইঞ্জিল থেকে সামগ্রিক ও মৌলিক ভাবে পৃথক ও স্বতন্ত্র।

কোরআনের বক্তব্য , প্রাঞ্জল ও অভূতপূর্ব ভাষাশৈলীর সম্মুখে তদানিন্তন ও পরবর্তী যুগের খ্যাতনামা সাহিত্যিকগণও নতশির। আর এটাই প্রমাণ করে যে , ইসলামের নবী (সা.) সরাসরি বিশ্ব সৃষ্টি কর্তার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন এবং নিঃসন্দেহে এ কথাগুলো ও বাক্যগুলো কোন পুস্তকেই বিদ্যমান ছিল না , যা থেকে নবী (সা.) উদ্ধৃতি দিবেন ও শিক্ষা নিবেন।

কোন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না ; বরং এ অপপ্রচারটি ছিল খ্রিস্টান পাদ্রী ও পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যপ্রবণ প্রাচ্যবিদদের সাজানো কথা।

যদি কোরআন বাইবেলের পুরাতন ও নতুন সংস্করণ থেকে অস্তিত্ব লাভ করত , তবে যারা কোরআনের বিরুদ্ধে কোন আয়াত উদ্ধৃতি করতে ও এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইত , তাহলে , যে তৌরাত ও ইঞ্জিল তাদের হাতে ছিল তারা তাতে খুঁজে দেখত এবং কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই স্বীয় লক্ষ্যে পৌঁছতে পারত।

সকলেই বিশ্বাস করেন যে , মুহম্মদ (সা.) (কারো নিকট) শিক্ষা গ্রহণ করেন নি।

কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি বিশ্বাস করবে যে , পড়াশুনা করেন নি এমন একজন ব্যক্তি , যিনি অজ্ঞ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের পাঠ্য পুস্তক থেকে দূরে বিদ্যমান এক সমাজে বড় হয়েছেন , তিনি এক জ্ঞানগর্ভ ও বিশ্বজনীন পুস্তক উপহার দিয়েছেন ? এ ধরনের ব্যক্তি বর্গের নিকট প্রশ্ন করা উচিৎ যে , কিরূপে ইসলামের নবী (সা.) তৌরাত ও ইঞ্জিলের উপর পড়াশুনা করতেন ? যে ব্যক্তি তার সমস্ত জীবনে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যান নি , কোন শিক্ষাগুরুর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন নি , কিরূপে তিনি অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে সংবাদ দিতে পারেন ?!

ওহী কী ?

যা সর্বজন স্বীকৃত তাতে বলা হয় , মহান আল্লাহ্ ও তাঁর নবী (আ.) গণের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং তারা সকল বাস্তবতার জ্ঞান বিশ্ব সৃষ্টির উৎস (অর্থাৎ মহান আল্লাহ্) থেকে লাভ করতেন। আর এ সম্পর্ক তাঁদের আত্মিক উৎকর্ষ ও দৃঢ়তার ফলে বিদ্যমান ছিল।

তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে , যদি নবীগণের (আ.) সাথে এ সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় তবে তাঁদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। নবীগণের (আ.) সকল মর্যাদার কারণ হলো যে , তারা বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কের যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। সুতরাং তাঁরা যা বলতেন তাতে কোন প্রকার সন্দেহ ও জটিলতা ছিলনা। বরং কী এবং কোথা থেকে এসেছে এ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণরূপে অবহিত ছিলেন , যা কারো কারো তথাকথিত অর্ন্তদৃষ্টির (كشف ) দাবির ব্যতিক্রম যেখানে যোগ সাধনা ও অন্যান্য পদ্ধতি ও নিয়ামকের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এর অধিকারীদের নিকট এমন কিছু বিষয় অর্জিত হয় যে তারা জানে না কোথা থেকে এসেছে। বরং প্রায়শঃই ধারণা ও অনুমানের বশবর্তী আবার কখনোবা প্রকৃত অবস্থার ব্যতিক্রম হয়ে থাকে।

যাহোক , এ দলের (যোগী) উপর নবীগণের (আ.) শ্রেষ্ঠত্ব এতটা সুস্পষ্ট যে , কোন প্রকার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আল্লাহর নবীগণ (আ.) যা বলেন ও দেখেন তা-ই বাস্তব ও সত্য। এমনকি উদাহরণত এক বিন্দু পরিমাণ সন্দেহও তাদের নিকট আশ্রয় পায় না। অতএব , ওহী হলো মহান আল্লাহ্ ও নবীগণের (আ.) মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল তা-ই। আর এ সম্পর্ক কখনো কখনো জিব্রাইলের মাধ্যমে , আবার কখনো কখনো কোন প্রকার মাধ্যম ব্যতীতই সম্পন্ন হতো।

রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীর সংখ্যা

ইসলামের নবী (সা.) খাদিজার পর একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সাওদা , আয়েশা , গাজিয়া , হাফসাহ , উম্মে হাবিবা , উম্মে সালামাহ , যয়নাব বিনতে যাহেশ , যয়নাব বিনতে খুযাইমাহ , মাইমুনাহ , জুয়াইরিয়াহ , সাফিয়াহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

এখন যে পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-কে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে হয়েছে , সে সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।

মূলতঃ কয়েকটি উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) একাধিক বিয়ে করেছিলেন:

1.অনাথ ও অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের আত্মসম্মান রক্ষা করার জন্যে , যারা ইতোপূর্বে সম্মান ও প্রতিপত্তির সাথে জীবন যাপন করতেন , কিন্তু স্বীয় অভিভাবককে হারানোর ফলে তাদের সম্মান প্রতিপত্তি এখন বিপর্যস্ত , মহানবী (সা.) তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। নতুবা তাদের গোত্র তাদেরকে ফিরিয়ে নিত এবং তাদেরকে কুফর করতে ও ইসলামের অস্বীকৃতিতে বাধ্য করত। যেমন : সাত্তদা , যার স্বামী হাবাশায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার পর পরলোক গমন করেছিলেন। ফলে তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিলেন।

রাসূল (সা.) খাদিজাকে হারানোর পর বিপত্নীক ছিলেন এবং সাওদার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

যয়নাব বিনতে খুযাইমা ছিলেন রাসূলের অপর এক স্ত্রী। তিনি এক বিধবা রমণী ছিলেন যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর একদিকে অভিবাবকহীন এবং অপরদিকে দারিদ্রকবলিত হয়ে পড়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন দানশীলা , উদার এবং উম্মুল মাসাকীন (নিঃস্বদের মাতা) আল্লাহর রাসূল (সা.) যয়নাবের সম্মান রক্ষার্থে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যয়নাব বিনতে খুযাইমা রাসূলের জীবদ্দশায়ই পরলোক গমন করেন।

উম্মে সালমাও ছিলেন বয়স্কা ও অনাথ সন্তানের মাতা , ঈমানদার। তিনিও নবী (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

2.প্রচলিত অবস্থার পরিবর্তন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভ্রান্ত রীতি-নীতির প্রাচীর চূর্ণ করে দেয়ার জন্যে তাঁর ফুফাত বোন যয়নাব বিনতে জাহাশের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন , যিনি রাসূলের পালক পুত্র যায়েদ ইবনে হারিসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। যায়েদের সাথে যয়নাবের যে বিবাহ মহানবী (সা.)-এর নির্দেশানুসারে সম্পন্ন হয়েছিল তা স্বয়ং ইসলামের শ্রেণী বৈষম্যহীন বিশেষত্বেরই দৃষ্টান্ত। কারণ , যয়নাব ছিলেন কোরাইশ অধিপতি আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্রাদের মধ্যে একজন , আর যায়িদ ছিল পারিবারিক দিক থেকে কৃতদাস , যিনি রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে মুক্তি পেয়েছিলেন।

যয়নাব যেহেতু অভিজাত পরিবারের ছিলেন , সেহেতু যায়েদের সাথে দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ করত ; আর এভাবে নিজের দাম্পত্য জীবনে তিক্ততা সৃষ্টি করত এবং রাসূল (সা.) তাদেরকে শতভাবে উপদেশ দিলেও তাতে কোন ফল হয়নি। অবশেষে যায়েদ যয়নাবের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিল এবং তাকে তালাক দিয়েছিল।

যয়নাব তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর আদেশে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন , যাতে মানুষের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার ও অযৌক্তিক রীতি-নীতির মূলোৎপাটিত হয়। (যেহেতু তারা পালক পূত্রকে স্বীয় প্রকৃত পুত্র বলে মনে করত এবং তার স্ত্রীকে নিজের জন্যে নিষিদ্ধ মনে করত)।35

খ্রিস্টবাদী কিছু লেখক এ বিষয়টির ক্ষেত্রে (হযরতের একাধিক বিবাহ) এতটা বিচ্যুত ও কুরটনাকারী হয়েছিল যে লিখেছিল : আল্লাহর রাসূল যয়নাবের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়েছিলেন! এ বক্তব্যটি এতটা অনর্থক ও অযৌক্তিক যে তা সমস্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির পরিপন্থী। কারণ যদি নবী (সা.) কুমন্ত্রনা ও এ ধরনের ধ্যান- ধারণার বশবর্তী হতেন কিংবা যয়নাবের রূপ সৌন্দর্য এতটা মনোহারী ছিল যে , হযরতকে প্রেমাসক্ত করে ফেলেছিল যদি তাই হতো , তবে কেন যখন যয়নাব কুমারী ও বিশেষ আকর্ষণের অধিকারী ছিল আর রাসূলও (সা.) উদ্দাম যৌবনের অধিকারী ছিলেন , তখন কেন তার প্রতি আসক্ত হলেন না ; বিশেষ করে এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে যয়নাব তো তখনও তার নিকট অপরিচিত ছিল না ? বরং রাসূলের নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই তিনি পরিগণিত হতেন এবং পারিবারিক পরিচিতের মাধ্যমে তারা পরস্পরের সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

3.বন্দী ও দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়ার জন্যে ; যেমন , জুয়াইরিয়াকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। জুয়াইরিয়া ছিলেন সম্ভ্রান্ত বনি মুসতালিক গোত্রের কন্যা , যিনি ইসলামী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাস্ত ও বন্দী হয়েছিলেন। মহানবী (সা.) হারেসের কন্যা জুবাইরিয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। হারেস ছিলেন গোত্রপতি। মুসলমানরা যখন দেখল যে , বন্দীরা হযরতের আত্মীয়দের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে , তখন তাদের (বন্দীদের) অনেককেই মুক্তি দিয়েছিলেন। ইবনে হিশামের মতে এ বিবাহের সুবাদে বনি মুসতালিকের একশতটি পরিবার মুক্তি পেয়েছিল।36

4.আরবের বৃহত্তর গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংরক্ষণ করার জন্যে নবী (সা.) আয়েশা , হাফসা , উম্মে হাবিবা , সাফিয়া ও মাইমূনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

উম্মে হাবিবা ছিলেন সেই আবু সুফিয়ানের কন্যা যার বংশ (ইসলামের) রেসালতের ধারক সম্মানিত (হাশেমী) পরিবারের সাথে আপোসহীন শত্রুতা প্রদর্শন করত। তার স্বামী হাবাশে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হয়েছিল এবং অতঃপর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিল। উম্মে হাবিবা কঠিন সঙ্কটময় অবস্থায় দিনাতিপাত করছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন মুসলমান ; অপর দিকে তার পিতা ছিল নবী (সা.)-এর ঘোর শত্রু । ফলে তিনি তার পিতা (আবু সুফিয়ানের) নিকট আশ্রয় নিতে পারছিলেন না। সুতরাং উম্মে হাবিবা অভিভাবকহীন ও বঞ্চিত নারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন।

মহানবী (সা.) বনি উমাইয়্যাদের অন্তর জয় করার জন্যে এবং সেই সাথে উম্মে হাবিবার অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।37

সাফিয়া ছিলেন হাই ইবনে আখতাবের কন্যা , যিনি বনি নাযির গোত্রের প্রধান ছিলেন। ইহুদী বন্দীরা মুসলমানদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার পর হযরত (সা.) সাফিয়ার ব্যক্তিত্ব রক্ষা করার জন্যে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে অবদ্ধ হলেন। আর এ প্রক্রিয়ায় বনি ইসরাইলের একটি শ্রেষ্ঠ গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।38

বৃহত্তর গোত্র বনি মাখযুমের রমণী ছিলেন মায়মূনা , যাকে মহানবী (সা.) সপ্তম হিজরীতে বিবাহ সম্পন্ন করেন।39

নবী (সা.)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে আয়েশা ব্যতীত রাসূল (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় সকলেই বিধবা ছিলেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই যৌবনের উচ্ছলতা ও অভিলাষ হারিয়ে ছিলেন। আর এটাই এর সপক্ষে শ্রেষ্ঠ দলিল যে , রাসূল (সা.)-এর একাধিক বিবাহ বৃহত্তর কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। সুতরাং রাসূলের প্রতি কুমন্ত্রণা ইত্যাদির অপবাদ প্রদান কখনোই যৌক্তিক হতে পারে না।

নবুওয়াত লাভের পূর্বে মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব

পারিপার্শ্বিকতার নীতি

মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে , পরিবেশ , কোন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ও চিন্তা-চেতনার ভিত্তি রচনা করে এবং পারস্পরিক সামঞ্জস্য বিধান ও অনুরূপ হওয়ার নীতি অনুসরণ তারা সামাজিক রীতি প্রথার পশ্চাদ্ধাবন করে।

যদিও এ ব্যাপারে একদল চরমপন্থা অবলম্বন করেছেন এবং এ মতবাদকে একটি সার্বিক ও সর্বজনীন নীতি বলে মনে করেছেন। তারা সকল সামাজিক বিষয় ও ঘটনাকে কোন প্রকার ব্যতিক্রম ব্যতীতই এ নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তবে ব্যক্তির মন মানসিকতার উপর পরিবেশের প্রভাব অনস্বীকার্য।

অতএব , কল্যাণময় ও সংযমী পরিবেশ , সমাজের সন্তানদেরকে সংযমী ও সুশৃঙ্খল রূপে গড়ে তোলে। অপরদিকে বিচ্যুত ও কলুষিত পরিবেশ কোন না কোন ভাবে ব্যক্তিকে বিচ্যুতি ও অনাচারের দিকে ঠেলে দেয়। অতএব , যিনি স্বীয় পথকে কলুষিত পরিবেশ থেকে পৃথক করে থাকেন , নিঃসন্দেহে তিনি কোন সাধারণ ব্যক্তিত্ব নন।

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের পরিবেশ

পৃথিবী , বিশেষ করে আরবভূমি তখন অজ্ঞতা ও অন্যায়ের সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল এবং আরবের জনগণ কুসংস্কার ও অনাচারের আগুনে জ্বলছিল। অজ্ঞতার কৃষ্ণকায় মেঘগুলো আরববাসীর জীবন-দিগন্তকে অন্ধকারে ঢেকে ফেলেছিল এবং তারা অন্ধকারের ঘনঘটায় জীবনাতিবাহিত করছিল। কতইনা সম্পদ লুটতরাজ হতো , কতইনা রক্ত অন্যায় ভাবে ঝরত।

নিকৃষ্টতম ব্যাপার ছিল , প্রাণহীন মূর্তিসমূহের উপাসনা। কুসংস্কার ও শ্রেণী বৈষম্য সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছিল। যার অস্তিত্ব সেথায় ছিলনা তা হলো ন্যায়পরায়ণতা ও নিয়ম শৃঙ্খলা । নিষ্ঠুর শক্তিধররা অন্যের শ্রম এবং বিধবা ও অনাথের ঘামের বিনিময়ে স্বীয় ধন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলত। আর আত্মম্ভরিতা ও দাম্ভিকতা প্রদর্শন করত এবং খেঁটে খাওয়া মানুষের উপর আগ্রাসন ও নিপীড়ন চালাত।

তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যনীতি এতটা খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল যে , অক্ষম স্বামীর ঋণের মোকাবিলায় তারা স্ত্রীকে দায়ী মনে করতো ; আর যদি অক্ষম , অপারগ কোন স্ত্রীর নিকট ঋণ থাকত তবে তার জন্যে তার স্বামীকে গ্রেফতার করত।40

উৎকর্ষ ও জ্ঞানার্জনের কোন উদ্যোগ তাদের ছিলই না , বরং এর পরিবর্তে তাদের পূর্বপুরুষ ও লোক জনের সংখ্যাধিক্যের জন্যে অহঙ্কার করত । কখনো কখনো কোন গোত্রের জনবলের আধিক্য প্রমাণ করার জন্যে তারা গোরস্থানে যেয়ে কবরের সংখ্যা গণনা করে তাদের সংখ্যাধিক্য দেখাত।41

হিংসা বিদ্বেষ , কাম-ক্রোধ , মদ্যপান , রক্তারক্তি ছিল তাদের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

ইমরুল কাইস নামক এক বিখ্যাত আরব কবি , তার চাচাত বোন উনাইযার সাথে শয়তানী ও উন্মাদ প্রেম ঘটিত ঘটনাবহুল অতীত সম্পর্কে নির্লজ্জ ভাবে তার কবিতায় বর্ণনা করেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এ কাব্যসমূহই সাহিত্য কর্মের নিদর্শন স্বরূপ কাবা ঘরের দেয়ালে টানানো হয়েছিল।

এটাই ছিল সে সমাজের জনজীবন ও আচার ব্যবহারের চিত্র , যে সমাজের অন্ধকারময় দিগন্ত থেকে ইসলামের জ্যোতি আত্মপ্রকাশ করেছিল।

নিঃসন্দেহে যিনি এহেন সমাজের রঙে রঞ্জিত না হয়ে , বরং এতে অস্বস্থি বোধ করতেন এবং এর বিরোধিতায় রত হতেন , তিনি এক মহান ও ঐশী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর তিনিই জাতির নেতৃত্বের জন্যে এবং বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্তি দানের জন্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।

নবীগণ (আ.) সমাজ গঠন করতেন , সমাজের অনুসরণ করতেন না

সকলেই মূর্তিনগরের দিকে ধাবিত হতো ; কিন্তু মহানবী (সা.) কারো কাছে শিক্ষা গ্রহণ না করলেও42 হেরা পর্বতের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সেথায় , শক্তি ও মর্যাদার অধিকারী বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর সম্মুখে সিজদাবনত হয়ে তাঁরই উপাসনায় আত্মনিয়োগ করতেন।43

হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর করুণার ছোঁয়ায় শৈশব থেকেই তাঁর পথ (সঠিকরূপে) নির্বাচন করে নিয়েছিলেন এবং কোন প্রকার উৎকন্ঠা ও সন্দেহ ব্যতীতই স্বীয় গোত্রের ভ্রান্ত রীতিনীতি পরিহার করে চলতেন এবং এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন।44

তিনি তাঁর জীবনের কোন মুহূর্তেই মূর্তি পূজা করেন নি , এমনকি ঐগুলোর নাম শুনতেও অনীহা প্রকাশ করতেন। যেমনটি ইতোপূর্বেও আমরা উল্লেখ করেছিলাম।

যখন হযরত মাত্র 12 বছরের বালক ছিলেন এবং বোহাইরা তাঁকে দুটি কুখ্যাত মূর্তি লাত ও ওজ্জার কসম দিয়েছিল তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং সক্রোধে বলেছিলেন : আমি কোন কিছুকেই এ দুটির মত শত্রু মনে করি না।

তাঁর সততা ও মহত্বের খ্যাতি ছিল লোকের মুখে মুখে ; তাঁর আচার , ব্যবহার ও বিশ্বস্ততার কারণে তিনি আল আমীন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর এহেন কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের কারণেই , খাদিজা তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁর উপর ন্যস্ত করেছিলেন।

মহানবী (সা.)-এর আচার-আচরণ এতই মনোমুকর ও সমুন্নত ছিল যে , তা সকল মানুষকে তাঁর দিকে আকর্ষণ করত।

আম্মার বলেন : নবুয়াতের পূর্বে আমি ও মুহাম্মদ (সা.) রাখালী করতাম। একদিন আমি প্রস্তাব দিলাম যে , ফাখের চারণ ভূমিতে গেলে ভাল হয়। মুহাম্মদ (সা.) আমার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন। পরদিন সেখানে গেলাম । দেখলাম যে মুহাম্মদ (সা.) আমার পূর্বে সেখানে গিয়েছেন কিন্তু মেষগুলোকে সেখানে চরানো থেকে বিরত রাখছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : কেন মেষগুলোকে চরতে দিচ্ছেন না ? তিনি বললেন : যেহেতু তোমার সাথে কথা দিয়েছিলাম তাই তুমি আসার পূর্বে আমার মেষগুলো এ চারণ ভূমি থেকে আহার গ্রহণ করবে , তা পছন্দ করছিলাম না।

এভাবেই মুহম্মাদ (সা.) অন্য এক পথে নিজেকে পরিচালিত করেছিলেন এবং গোত্রের রীতিনীতির অনুগামী হন নি। আর অদৃশ্যলোকের সাহায্যে স্বীয় উৎকর্ষের পথে অগ্রসরমান ছিলেন।

আর এ জন্যেই মানুষ তাঁর প্রতি অধিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন এবং কোন সমস্যার সমাধানে তাঁর দেয়া সিদ্ধান্তের প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন ও তাঁর অনুসরণ করতেন।

হাজারুল আসওয়াদ স্থাপনের ক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত

মহানবীর বয়স ছিল তখন 35 বছর। কোরাইশ কাবা অর্থাৎ আল্লাহর গৃহ পুনঃনির্মাণ ও মেরামত করার জন্যে সিদ্ধান্ত নিল। যেহেতু কোরাইশের গোত্রসমূহের সকলেই এ গৃহ মেরামতকরণের মর্যাদার অধিকারী হতে চেয়েছিল , সেহেতু প্রত্যেকেই কাবার এক একটি অংশ মেরামত করার জন্যে ভাগাভাগি করে নিল।

প্রথমে ওয়ালিদ গৃহ ভাঙ্গার কাজ শুরু করল। অতঃপর অন্যরা তাকে সাহায্য করল। ফলে ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক নির্মিত স্তম্ভগুলো দৃশ্যমান হলো। অতঃপর প্রত্যেক গোত্র কাবাগৃহের নির্দিষ্ট অংশ মেরামত করার জন্যে নির্ধারণ করে নিল। যখন কাবা গৃহের মেরামত কাজ এমন এক স্থানে পৌঁছল যেখানে হাজারুল আসওয়াদ স্থাপন করতে হবে , তখন কোরাইশের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তুমুল বিবাদ শুরু হলো। কারণ প্রত্যেক গোত্রই স্বহস্তে এ কর্ম সম্পাদন করতে এবং এ মর্যাদার অধিকারী হতে চাইল।

ধীরে ধীরে এ বিরোধ প্রকট হতে লাগল এবং যুদ্ধ বাঁধার পর্যায়ে পৌঁছল। আব্দুদ্দারের পুত্ররা একটি বৃহৎ পাত্র রক্তে পূর্ণ করে এবং তাতে হস্ত সমূহ নিমজ্জিত করে পরস্পরের খুনে রঞ্জিত হওয়ার জন্যে শপথ গ্রহণ করল।

এ ভয়ঙ্কর বিরোধ চার অথবা পাঁচ রাত্রি স্থায়ী হয়েছিল। অতঃপর আবু উমাইয়া কোরাইশের বয়োজ্যেষ্ঠতম ব্যক্তি বলল : আমার প্রস্তাব হলো এই যে , (আগামী কাল প্রত্যুষে) সর্বপ্রথমেই যে ব্যক্তি মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে , তাকে এ বিরোধের মীমাংসাকারী হিসেবে মেনে নিবে। তার এ প্রস্তাব সকলেই একবাক্যে গ্রহণ করল , যাতে সমস্যার সমাধান হয়।

কোরাইশ তার এ প্রস্তাব গ্রহণ করতঃ অপেক্ষা করতে লাগল যে , কে মসজিদের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করছে। হঠাৎ দেখা গেল যে ইসলামের নবী (সা.) প্রবেশ করলেন। যখন তাদের দৃষ্টি তাঁর উপর পতিত হলো । বলল : এতো মুহাম্মদ , সে বিশ্বস্ত (আমীন) , আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত।

মুহাম্মদ (সা.) এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তিনি ঘটনার বিষয় সম্পর্কে অবহিত হয়ে বললেন : একটি জামা নিয়ে আস। কোরাইশরা যদিও তার উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারেনি তবু দ্রুত একটি জামা নিয়ে আসল। মহানবী (সা.) ঐ জামাটিকে বিছিয়ে দিলেন এবং হাজারুল আসওয়াদকে এর মাঝে রাখলেন। অতঃপর বললেন : প্রত্যেক গোত্র এ জামার এক একটি অংশ ধর যাতে প্রত্যেকেই এ মর্যাদায় অংশীদার হতে পার। কোরাইশের প্রত্যেক গোত্র জামার চারদিকে ধরল। অতঃপর ঐ নির্দিষ্ট স্থানে বয়ে নিল , যেখানে পাথরটি স্থাপন করতে হবে। তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) দেখলেন যদি এর সংস্থাপনের দায়িত্ব অন্যকে দেন , তবে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে । তাই তিনি স্বয়ং হাজারুল আসওয়াদ তুলে নিয়ে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। আর এ উন্নত বিচারের মাধ্যমে বিরোধ সম্পূর্ণ রূপে দূর করলেন।

এ ঘটনা রাসূল (সা.)-এর মহান সামাজিক ব্যক্তিত্বের প্রমাণবহ। আর সে সাথে সঠিক চিন্তার মাধ্যমে এক রক্তাক্ত ভয়ঙ্কর গোলযোগের রক্তপাতহীন সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর সঠিক সিদ্ধান্ত ও সুবিচারের প্রকাশ ঘটায়।

আর এভাবেই অনুধাবন করা যায় যে , তিনি নবুওয়াতের জন্যে এবং পবিত্র ও ঐশী বিপ্লবের ধ্বজা ধারণ করার জন্যে যোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

ওহীর অবতরণ

মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিশ্বজনীন রেসালত

এখন পর্যন্ত আমরা মহানবী (সা.)-এর জীবনের পাতাসমূহ থেকে কিছু পাতা দেখেছি মাত্র এবং তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের কিছু ঘটনা সেখানে আমরা পড়েছি। এবার আমরা তাঁর জীবনেতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করব।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশ বছর যাবৎ এমন এক অভিভাবকহীন ও লাগামহীন জনসমাজে বসবাস করেছিলেন যেখানে সভ্যতা ও সংস্কৃতির লেশ-মাত্র ছিল না। আর সমাজের এহেন অবস্থা মহানবী (সা.)-এর কোমল হৃদয়কে ব্যথাতুর করে তুলত। মুহাম্মদ (সা.) সমাজে অজ্ঞতার তিমির ব্যতীত কিছুই দেখতে পাননি। কাবায় যেতেন , দেখতেন , খোদার পরিবর্তে তারা মূর্তি পূজা করছে ; কাবা ত্যাগ করে সমাজে আসতেন , সেখানের অবস্থা অবলোকনেও ব্যথিত হতেন ; মানুষের মাঝে যেতেন , গোত্রের নিকৃষ্ট চিন্তা-চেতনা ও রীতিনীতি দেখে হৃদয় ভারাক্রান্ত হতেন ; দরিদ্র নিপীড়িত , বঞ্চিত মানুষের অবস্থা দেখে ক্লেষ ভোগ করতেন।

নারীদের নিকৃষ্টতম সামাজিক অবস্থান , মদ , জুয়া , নরহত্যা , অনাচার ইত্যাদির বিস্তৃতিতে নিদারুণ কষ্ট অনুভব করতেন।

যখন ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন এবং মানুষের সাথে মেলামেশা করতেন , তখন মানুষের চারিত্রিক অবনতি তার কোমল হৃদয়কে ব্যথিত করত। তখন বাধ্য হয়ে বিশ্রাম ও ইবাদতের জন্যে এমন কোন স্থানে যেতেন , যেখানে তাঁর হৃদয় ক্লেশমুক্ত থাকে , তাঁর প্রাণে একটু সস্তি পেতে পারেন। এ জন্যে তিনি হেরা পর্বতে যেতেন এবং আল্লাহর রহমতের নিদর্শন ও সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করতেন।

চল্লিশ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মদ (সা.)

মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশতম বছরে পদার্পণ করলেন এবং ঐশী ও বিশ্বজনীন রেসালতের দায়িত্ব পালন করার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করলেন। হঠাৎ তাঁর প্রতি ওহীর ফেরেশতা জিব্রাইল অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন : পড়! ...মুহাম্মদ (সা.) বললেন : কী পড়ব ? তিনি এক অভূতপূর্ব অনুভূতিতে নিমগ্ন হলেন। দ্বিতীয়বার একই শব্দ শুনতে পেলেন যে সুস্পষ্ট রূপে বলল : পড় , হে মুহাম্মদ!

তৃতীয়বার জিব্রাইল পুনরাবৃত্তি করে বললেন : তোমার প্রভুর নামে পাঠ কর , যিনি সৃষ্টি করেছেন , সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত পিণ্ড থেকে , পড় , এবং তোমার প্রভু সর্বাপেক্ষা দয়ালু , যে প্রভু লিখতে শিখিয়েছেন এবং মানুষ যা জানতো না , তা তাকে শিখিয়েছেন।45

এক অবর্ণনীয় আনন্দ ও উৎকণ্ঠা তাঁর সমস্ত অন্তরাত্মা , তাঁর অস্তিত্বকে বিমোহিত করে তুলেছিল। কারণ এক বৃহৎ ও সমুন্নত জগতের সাথে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ...ফেরেশতাদের সাথে ...জিব্রাইলের সাথে উর্ধ্বলোকের সাথে ...তাঁর আত্মা এক পবিত্র ও মহান আশ্রয়স্থলের সাথে নিবিঢ় ও সার্বক্ষণিক সম্পর্ক স্থাপন করল , তিনি স্বীয় অভ্যন্তরে নবুওয়াতের ক্ষমতা অনুভব করলেন এবং কোন প্রকার উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের লেশমাত্র তাঁর অস্তিত্বে পরিলক্ষিত হয়নি। যা ছিল তা হলো দৃঢ়তা ও প্রশান্তি।

তাহলে মুহাম্মদ (সা.) কি হেরা পর্বতে কোন প্রশিক্ষণকাল সম্পন্ন করেছিলেন ? এটি সে প্রশ্ন , যার ইতিবাচক জবাব দিয়েছিলেন কোন কোন প্রাচ্যবিদ ও লেখক এবং বলেছিলেন : মুহাম্মদ (সা.) হেরা পর্বতের গুহায় ইঞ্জিল ও নবীগণের (আ.) বক্তব্য ও শিক্ষার উপর গভীর ভাবে গবেষণা ও পর্যালোচনা চালিয়েছিলেন এবং এ (জ্ঞান) জগতের অনেক স্বাদ আস্বাদন করেছিলেন।

এ কথার অর্থ দাঁড়ায় মুহাম্মদ (সা.) স্বশিক্ষিত কোন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ইঞ্জিল ও তৌরাতের উপর গভীর অনুসন্ধান ও পড়াশুনার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে আবিস্কার করেছিলেন!

কিন্তু এ ধারণার বিপরীতে অনেক প্রমাণ রয়েছে , এ গুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

যদি ইসলামের নবী (সা.) কোরআনকে ইঞ্জিল ও পূর্ববর্তী নবীগণের (আ.) শিক্ষা থেকে গ্রহণ করতেন , তবে সঙ্গত কারণেই কোরআনের বিষয়-বস্তুসমূহ ইঞ্জিল ও তৌরাতের সদৃশ হতো। অথচ কোরআনের বিষয় বস্তু তৌরাত ও ইঞ্জিল থেকে সামগ্রিক ও মৌলিক ভাবে পৃথক ও স্বতন্ত্র।

কোরআনের বক্তব্য , প্রাঞ্জল ও অভূতপূর্ব ভাষাশৈলীর সম্মুখে তদানিন্তন ও পরবর্তী যুগের খ্যাতনামা সাহিত্যিকগণও নতশির। আর এটাই প্রমাণ করে যে , ইসলামের নবী (সা.) সরাসরি বিশ্ব সৃষ্টি কর্তার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন এবং নিঃসন্দেহে এ কথাগুলো ও বাক্যগুলো কোন পুস্তকেই বিদ্যমান ছিল না , যা থেকে নবী (সা.) উদ্ধৃতি দিবেন ও শিক্ষা নিবেন।

কোন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না ; বরং এ অপপ্রচারটি ছিল খ্রিস্টান পাদ্রী ও পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যপ্রবণ প্রাচ্যবিদদের সাজানো কথা।

যদি কোরআন বাইবেলের পুরাতন ও নতুন সংস্করণ থেকে অস্তিত্ব লাভ করত , তবে যারা কোরআনের বিরুদ্ধে কোন আয়াত উদ্ধৃতি করতে ও এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইত , তাহলে , যে তৌরাত ও ইঞ্জিল তাদের হাতে ছিল তারা তাতে খুঁজে দেখত এবং কোন প্রকার কষ্ট ব্যতীতই স্বীয় লক্ষ্যে পৌঁছতে পারত।

সকলেই বিশ্বাস করেন যে , মুহম্মদ (সা.) (কারো নিকট) শিক্ষা গ্রহণ করেন নি।

কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি বিশ্বাস করবে যে , পড়াশুনা করেন নি এমন একজন ব্যক্তি , যিনি অজ্ঞ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের পাঠ্য পুস্তক থেকে দূরে বিদ্যমান এক সমাজে বড় হয়েছেন , তিনি এক জ্ঞানগর্ভ ও বিশ্বজনীন পুস্তক উপহার দিয়েছেন ? এ ধরনের ব্যক্তি বর্গের নিকট প্রশ্ন করা উচিৎ যে , কিরূপে ইসলামের নবী (সা.) তৌরাত ও ইঞ্জিলের উপর পড়াশুনা করতেন ? যে ব্যক্তি তার সমস্ত জীবনে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যান নি , কোন শিক্ষাগুরুর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন নি , কিরূপে তিনি অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে সংবাদ দিতে পারেন ?!

ওহী কী ?

যা সর্বজন স্বীকৃত তাতে বলা হয় , মহান আল্লাহ্ ও তাঁর নবী (আ.) গণের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং তারা সকল বাস্তবতার জ্ঞান বিশ্ব সৃষ্টির উৎস (অর্থাৎ মহান আল্লাহ্) থেকে লাভ করতেন। আর এ সম্পর্ক তাঁদের আত্মিক উৎকর্ষ ও দৃঢ়তার ফলে বিদ্যমান ছিল।

তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে , যদি নবীগণের (আ.) সাথে এ সম্পর্ক ছিন্ন করা হয় তবে তাঁদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। নবীগণের (আ.) সকল মর্যাদার কারণ হলো যে , তারা বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কের যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। সুতরাং তাঁরা যা বলতেন তাতে কোন প্রকার সন্দেহ ও জটিলতা ছিলনা। বরং কী এবং কোথা থেকে এসেছে এ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণরূপে অবহিত ছিলেন , যা কারো কারো তথাকথিত অর্ন্তদৃষ্টির (كشف ) দাবির ব্যতিক্রম যেখানে যোগ সাধনা ও অন্যান্য পদ্ধতি ও নিয়ামকের মাধ্যমে অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এর অধিকারীদের নিকট এমন কিছু বিষয় অর্জিত হয় যে তারা জানে না কোথা থেকে এসেছে। বরং প্রায়শঃই ধারণা ও অনুমানের বশবর্তী আবার কখনোবা প্রকৃত অবস্থার ব্যতিক্রম হয়ে থাকে।

যাহোক , এ দলের (যোগী) উপর নবীগণের (আ.) শ্রেষ্ঠত্ব এতটা সুস্পষ্ট যে , কোন প্রকার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আল্লাহর নবীগণ (আ.) যা বলেন ও দেখেন তা-ই বাস্তব ও সত্য। এমনকি উদাহরণত এক বিন্দু পরিমাণ সন্দেহও তাদের নিকট আশ্রয় পায় না। অতএব , ওহী হলো মহান আল্লাহ্ ও নবীগণের (আ.) মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল তা-ই। আর এ সম্পর্ক কখনো কখনো জিব্রাইলের মাধ্যমে , আবার কখনো কখনো কোন প্রকার মাধ্যম ব্যতীতই সম্পন্ন হতো।


4

5

6

7

8

9

10