মিরেকলস অব দ্য কোরআন

মিরেকলস অব দ্য কোরআন 30%

মিরেকলস অব দ্য কোরআন লেখক:
: ডাঃ উম্মে কাউসার হক
প্রকাশক: -
বিভাগ: কোরআন বিষয়ক জ্ঞান

মিরেকলস অব দ্য কোরআন
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 14 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 25337 / ডাউনলোড: 4266
সাইজ সাইজ সাইজ
মিরেকলস অব দ্য কোরআন

মিরেকলস অব দ্য কোরআন

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

1

2

প্রচুর উৎপাদনশীল বায়ু

বায়ুপ্রবাহের প্রচুর উৎপাদন ক্ষমতা কিংবা উর্বরা ক্ষমতা রয়েছে। এটি বায়ুর একটি বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যটি আর তারই ফলস্বরূপ বৃষ্টি উৎপাদনের কথা বর্ণিত হয়েছে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতে।

আর আমিই প্রেরণ করি বায়ুরাশিকে যা বহন করে পানিপূর্ণ মেঘমালাগুলোকে ; তারপর আমিই আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করাই ( কোরআন , ১৫ : ২২ ) বৃষ্টিপাতের বা বৃষ্টি উৎপাদনের প্রথম পর্যায় যে বায়ুপ্রবাহ - আয়াতটিতে সে বিষয়েই মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে । বাতাস বা বায়ুপ্রবাহ মেঘমালাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় - বায়ুপ্রবাহ আর বৃষ্টির মধ্য কার এই একটি মাত্র সম্পর্কের কথাই জানা ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত। যাই হোক না কেন আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞান থেকে প্রাপ্ত তথ্যাগুলো হাতে কলমে দেখিয়ে দিচ্ছে যে বৃষ্টি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাতসের উৎপাদনশীল বা উর্বরা ক্ষমতার ভূমিকা রয়েছে।

বায়ুর এই উর্বরা বা প্রচুর উৎপাদনশীলতার ক্ষমতা নিম্নরূপে কাজ করে :

পানির ফেনিল বা ফেনায়িত কার্যাবলীর জন্য মহাসমুদ্র আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরিপৃষ্ঠ থেকে অগণিত বায়ুর বুদবুদ তৈরী হয়। ঠিক যে মুহূর্তে বুদবুদ গুলি ফেটে যায় তখনই মাত্র ১০০ ভাগের এক ভাগ পরিধির হাজার হাজার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণিকা বের হয়ে এসে উপরে বাতাসে উত্থিত হয়। এরোসোল নামের এই কণিকাগুলো স্থলভাগ থেকে বায়ু বাহিত ধূলিকণার সঙ্গে মিশে ভূমি থেকে উপরে বায়ুমন্ডলের উপরের স্তরগুলোয় উঠে যায়। বাতাসের মাধ্যমে এই কণিকাগুলো আরো উচুঁতে উত্থিত হয়ে পানি বাষ্পের সংস্পর্শে আসে। পানিবাষ্প এই কণিকাগুলোর চারপার্শ্বে ঘনীভূত হয়ে পানিকণিকায় রূপ নেয়। প্রথমে এই পানিকণাগুলো এক সঙ্গে মিশে মেঘ উৎপন্ন করে আর বারিধারা হিসেবে নেমে আসে ধরাতলে।

দেখা গেল যে , সমুদ্র থেকে বয়ে নিয়ে আসা কণিকাগুলোসহ বাতাসে ভাসমান পানি বাষ্প প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয় এই বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে আর তারই ফলস্বরূপ বৃষ্টির মেঘ তৈরীতে সাহায্য করে এই বায়ুপ্রবাহ।

যদি বায়ুর এই বৈশিষ্ট্যটি না থাকতো তাহলে বায়ুমন্ডলের উপরের স্তরে কখনো পানি বিন্দু তৈরী হতো না , ফলে বৃষ্টি নামের এই পদার্থটি উৎপন্ন হতো না।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো শত শত বছর পূর্বে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতে বায়ুমন্ডলের অতি প্রয়োজনীয় ভূমিকাটি বর্ণিত হয়েছিল তখনই , যখন মানুষ প্রাকৃতিক ব্যাপার স্যাপার খুবই কম জানতো ।

উপরের চিত্রটি একটি ঢেউ উৎপাদনের পর্যায়সমূহ প্রদর্শন করছে। পানি পৃষ্ঠের উপরে বাহিত বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমেই এই ঢেউগুলো উৎপন্ন হয়। বাতাসের দ্বারা এই পানিবিন্দুগুলো একটি গোলাকার আবর্তে আবর্তিত হতে থাকে। এই প্রবাহের বা গতিশীলতার মাধ্যমে একের পর একটি ঢেউ তৈরী হয়। এই ঢেউগুলো তৈরী করে বুদবুদসমূহ-যারা বাতাসে যায় ছড়িয়ে। বৃষ্টি উৎপাদনের প্রথম পর্যায় এটি। এই পদ্ধতিটিই ঘোষিত হয়েছে এভাবে : আমিই প্রেরণ করি বায়ুরাশিকে যা বহন করে পানিপূর্ণ মেঘমালাকে তারপর আমিই আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করাই........।

সাগরসমূহ কখনো মিশে যায়না

কেবলি সেদিন সমুদ্রের একটি বৈশিষ্ট্য উদঘাটিত হয়েছে-যা কিনা পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত , নিম্নে সেই আয়াতটি হলো :

তিনিই মুক্তভাবে প্রবাহিত করেন দুই দরিয়া , যারা পরস্পর মিলিত হয়ে থাকে , কিন্তু উভয়ের মাঝখানে রয়েছে একটি পর্দা , যা তারা অতিক্রম করতে পারে না। (কোরআন , ৫৫ : ১৯ -২০)

সমুদ্রগুলো পাশাপাশি বয়ে যায় , কাছাকছি আসে কিন্তু কখনোই মিশে যায়না-সাগরগুলোর এই বৈশিষ্ট্যটি সাম্প্রতিক কালে মহাসমুদ্রবিদগণ কর্তৃক উদঘাটিত হয়েছে।Surface Tension বা বহিপৃষ্ঠের টান নামক এক প্রাকৃতিক শক্তির কারণেই প্রতিবেশী সমুদ্রের পানি কখনই একত্রে মিশ্রিত হয় না। বহিপৃষ্ঠের টান নামক এই বলটির সূত্রপাত ঘটে সাগরের পানির ঘনত্বের তারতম্যের কারণে যা কিনা এক সমুদ্রের পানিকে অপর সমুদ্রের সঙ্গে মিশ্রিত হতে দেয় না। বরং দুটি সমুদ্রের পানির মাঝে একটি পাতলা আবরণ হিসেবে বিদ্যমান থাকে।১১

যে যুগের মানুষ পদার্থবিদ্যা , পৃষ্ঠটান কিংবা মহাসমুদ্রবিদ্যা-এগুলো সম্পর্কে কোন জ্ঞান বা ধারণাই রাখতো না , ঠিক সে সময়েই এই বিষয়টি কোরআনে প্রকাশিত হয় এটি একটি বিরাট আশ্চর্যের ব্যাপার।

ভূমধ্য সাগর আর আটলান্টিক মহাসাগরে রয়েছে বিরাট বিরাট ঢেউ , শক্তিশালী প্রবাহ আর বিদ্যুত। জিব্রাল্টার প্রণালীর মাধ্যমে ভূমধ্য সাগরের পানি আটলান্টিক মহাসাগরে চালিত হয়। কিন্তু যে একটি প্রাচীর বা দেয়াল এদের আলাদা করে রেখেছে সেটির কারণেই এদের তাপমাত্রা , লবণত্ত্ব ও ঘনত্তের মাঝে কোন পরিবর্তন ঘটে না।

সমুদ্রের গভীর অন্ধকার আর আভ্যন্তরীণ তরঙ্গমালা

সমুদ্রের গভীর অন্ধকার আর আভ্যন্তরীণ তরঙ্গমালা অথবা তাদের কার্যাবলী অত্যন্ত গভীর সমুদ্রের তলদেশের অন্ধকারের ন্যায় , যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের পর তরঙ্গ , যার উপরে রয়েছে কালোমেঘ ; অন্ধকারের উপর অন্ধকার। এমনকি যখন কেউ তার হাত বের করবে , তখন সে আদৌ তা দেখতে পাবে না। আর যাকে আল্লাহ হেদায়েতের নূর দান করেন না তার জন্য কোথাও কোন নূর নেই। (কোরআন , ২৪ : ৪০)

Oceans নামক বইটিতে গভীর সমুদ্রের সাধারণ পরিবেশের কথা বর্ণিত হয়েছে : গভীর সমুদ্র ও মহাসমুদ্রসমূহের গভীরে ২০০ মিটার ও তারও নীচে এক আঁধার পরিবেশ বিরাজ করে। এ পরিমাণ গভীরতায় প্রায় কোন আলো নেই। আর প্রায় ১০০০ মিটার গভীরতায় একদমই কোন আলো থাকে না। ১২

অধুনা সমুদ্রের সাধারণ গঠনপ্রণালী , এর মাঝে বিদ্যমান জীবসমূহের বৈশিষ্ট্যাবলী , এর ঘনত্ব , এর ধারণকৃত পানির পরিমাণ , এর পৃষ্ঠতল আর গভীরতা সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে তৈরী ডুবো জাহাজ ও বিশেষ যন্ত্রাদির মাধ্যমে বিজ্ঞানীগণ এই তথ্যসমূহ পেতে পারেন।

কোন ধরনের বিশেষ যন্ত্রাদির সাহায্য ছাড়া মানুষ সাগরের ৪০ মিটার গভীরে বা আরো নীচে ডুব দিতে বা যেতে পারে না। যেমন , ২০০মিটার গভীরে সমুদ্রের গভীর অন্ধকার অংশে কোন প্রকার সহায়তা ছাড়া বেঁচে থাকতে পারবে না মানুষ । এ সমস্ত কারণেই বিজ্ঞানীগণ সম্প্রতি সমুদ্র সম্পর্কে সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম তথ্যাদি উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। অথচ ১৪০০ বছর আগেই সূরা নূরে সমুদ্রের আঁধার শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এটা অবশ্যই কোরআনের অলৌকিকত্ব প্রমাণের পক্ষে একটি যুক্তি কেননা এ তথ্যটি কোরআনে এমন সময় প্রদান করা হয়েছে , যখন মানুষ মহাসমুদ্রের গভীরে গিয়ে তথ্যাদি খুঁজে আনার মত কোন যন্ত্রাদির অস্তিত্বই ছিল না।

অধিকন্তু , তরঙ্গের পর তরঙ্গ , যার উপরে রয়েছে কালোমেঘ ; অন্ধকারের উপর অন্ধকার -সূরা নূরের এ আয়াতটিও কোরআনে বর্ণিত আরেকটি অলৌকিক বিষয় হিসেবে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে।

সাম্প্রতিক কালে বিজ্ঞানীগণ উদঘাটন করেছেন যে , সেখানে রয়েছে আভ্যন্তরীন তরঙ্গমালা যারা পানির ভিন্ন ভিন্ন ঘনত্বের স্তরের মাঝে সৃষ্টি হয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্তরের ভিন্ন ভিন্ন রূপে অবস্থান করে আভ্যন্তরীন তরঙ্গমালা বা ঢেউসমূহ সাগর ও মহাসাগর সমূহের গভীর পানির স্তরগুলো ঢেকে থাকে , কেননা উপরকার পানির চেয়ে ভেতরের পানির রয়েছে বেশী মাত্রার ঘনত্ব।

আজকের প্রযুক্তি দিয়ে পরিমাপ করে দেখা গেছে যে , সমদ্রপৃষ্ঠে শতকরা ৩৩০ অংশ সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়। এর পর আলোর বর্ণালীর প্রায় সাতটি রং প্রথম ২০০ মিটারে শোষিত হয় কেবল নীল আলো ছাড়া। (বামের চিত্রটি) প্রায় ১০০০মিটার তলদেশে একেবারেই কোন আলো নেই। (উপরের চিত্র) ১৪০০ বছর আগে এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি সূরা নূরের ৪০নং আয়াতে নির্দেশ করা হয়েছিল।

আভ্যন্তরীন তরঙ্গমালা উপরি পৃষ্ঠের তরঙ্গমালার ন্যায় কাজ করে থাকে। উপরিপৃষ্ঠের তরঙ্গমালার মতো আভ্যন্তরীন তরঙ্গমালাও ভাঙ্গতে পারে। কোন মানব চক্ষু দিয়ে নয় বরং কোন একটি নির্দিষ্ট অবস্থানের তাপমাত্রা বা লবণের ঘনত্বের পরিবর্তনের পরীক্ষা - পর্যবেক্ষন করেই তবে আভ্যন্তরীন তরঙ্গমালাকে সণাক্ত করা হয়ে থাকে। ১৩

উপরের ব্যাখ্যাগুলোর সঙ্গে কোরআনের উক্তিসমূহ সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোন প্রকার গবেষণা ব্যতীত একজন কেবল সমুদ্রপৃষ্ঠের ঢেউগুলোকেই চর্মচক্ষে অবলোকন করতে পারে। সমুদ্রের আভ্যন্তরীন তরঙ্গ সম্পর্কে অবহিত হওয়া একজনের পক্ষে অসাধ্য ব্যাপার। তারপরেও সূরা নূরে আল্লাহ তাআলা সমুদ্রের বিভিন্ন ঘনত্বে আরেক ধরণের তরঙ্গের প্রতি আমাদের মনোযোগ আকষর্ণ করেছেন। নিশ্চিতভাবেই অতি সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীগন যা উদঘাটন করতে পেরেছেন , তা আরো একবার প্রমাণ করে যে , কোরআনের প্রতিটি কথাই আল্লাহ সোবহানাল্লাহু তাআলার কথা।

মস্তিস্কের যে অংশটুকু আমদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে

আর এরূপ করা কখনই উচিত নয় , যদি সে এরূপ করা থেকে ফিরে না আসে , তবে আমি তাকে অবশ্যই ললাটের কেশগুচ্ছ ধরে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাব।

যে কেশগুচ্ছমিথ্যাচারী পাপাচারীর। ( কোরআন , ৯৬ : ১৫ - ১৬ )

যে কেশগুছ মিথ্যাচারী , পাপাচারীর -উপরের আয়াতের এই অভিব্যক্তিটি সবচাইতে কৌতুহলকর। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চালানো গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে যে , মস্তিস্কের প্রিফ্র্রন্টাল অঞ্চল যা মস্তিস্কের বিশেষ বিশেষ কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করে থাকে , তা মাথার খুলির অভ্যন্তরে সম্মুখভাগে বিদ্যমান । বিজ্ঞানীগণ এই অঞ্চলের কার্যাবলী গত ষাট বছরে উদঘাটন করেছেন , যা কিনা কোরআনে ১৪০০ বছর আগেই নির্দেশিত হয়েছিল। আমরা যদি মাথার খুলির ভেতরের আর সম্মুখের অংশে দৃষ্টিপাত করি তাহলে আমরা সেরিব্রামের ফ্রন্টাল অঞ্চলটি খুঁজে পাব।Essentials of Anatomy and Physiology নামের একটি বই , যাতে এই অঞ্চলের কার্যাবলীর উপরের সর্বশেষ গবেষণার ফলাফলের কথা উল্লেখ রয়েছে , সেই বইটি বলে :

পরিকল্পনা করার আর নড়াচড়া শুরু করার জন্য উদ্বুদ্ধতা আর দুরদশির্তা মস্তিস্কের -সামনের লোবের (Frontal Lobe ) সম্মুখের অংশে অর্থাৎ প্রিফ্রন্টাল-অঞ্চলে ঘটে থাকে। এটি সহযোগী কর্টেক্সের অঞ্চল...।১৪

বইটি আরো বলে : প্রিফ্রন্টাল অঞ্চলের উদ্বুদ্ধ করার কাজে জড়িত থাকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে এটিও ধারণা করা হয় যে , এই অঞ্চলটি আগ্রাসনের কার্যকর কেন্দ্র ।১৫

তাই সেরিব্রামের এই অঞ্চলটি পরিকল্পনা , উদ্বুদ্ধ করা আর ভাল ও মন্দ আচরণ শুরু করা এবং সত্যমিথ্যা বলার জন্য দায়ী। এটি পরিস্কার বুঝা গেল যে , যে কেশগুছ পাপাচারী , মিথ্যাচারীর - উক্তিটির সঙ্গে উপরের ব্যাখ্যাটি সম্পূর্ণরূপে সঙ্গতিপূর্ণ । বিজ্ঞানীগণ গত ষাট বছরে যে বিষয়টি আবিষ্কার করেছে , তাই অনেক অনেক বছর আগে মহান আল্লাহ কোরআনে উল্লেখ করেন।

মানব শিশুর জন্ম

মানুষকে বিশ্বাসের পথে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে কোরআনে বহু বৈচিত্রময় বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। কখনো বা আকাশ , কখনো প্রাণী জগৎ , কখনো বা উদ্ভিদসমূহকে আল্লাহ মানুষের জন্য সাক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অনেক আয়াতে মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছে নিজেদের সৃষ্টি সম্পর্কে মনোযোগী হতে। প্রায়ই মানুষকে মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে যে , সে কিভাবে এ পৃথিবীতে আসল , কি কি পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে সে এলো , তার মৌলিক স্বভাব কি ?

আমিই তোমাদের সৃষ্টি করেছি , তবে তোমরা কেন বিশ্বাস করছ না ? তোমরা কি ভেবে দেখেছ তোমাদের বীর্যপাত সম্পর্কে ? তোমরা কি তা সৃষ্টি কর , না আমি তার স্রষ্টা ? (কোরআন , ৫৬ : ৫৭ -৫৯)

বহু আয়াতে মানুষের জন্ম আর জন্মের অলৌকিক অংশগুলোর উপর জোর দেয়া হয়েছে। এই আয়াতগুলোয় কিছু কিছু বিষয়ের তথ্যাদি এত পুংখানুপুংখ যে , সপ্তম শতাব্দীতে বিদ্যমান কোন লোকের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল । এদের কিছু কিছু নিম্নরূপ :

১. সম্পূর্ণ বীর্য থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়নি , এর অত্যন্ত ক্ষুদ্রাংশ থেকে তা সৃষ্টি হয়েছে (শুক্রাণু)।

২. পুরুষ থেকেই শিশুর লিংগ নির্ধারিত হয়।

৩. মানুষের ভ্রুণ জরায়ুর গায়ে জোঁকের মত লেগে থাকে।

৪. মানব শিশু জরায়ুতে তিনটি অন্ধকার অঞ্চলে বেড়ে উঠে ।

কোরআন যে সময়ে নাযিল হয়েছে , সে সময়ের মানুষেরা জানতো যে , যৌনমিলনের সময় বের হয়ে আসা বীর্যের সঙ্গে মানব জন্মের মৌলিক বিষয়টির সম্পর্ক রয়েছে। আর নয় মাস সময়সীমা পরে বাচ্চা জন্ম গ্রহন করে যা স্পষ্টভাবেই দৃষ্টিগ্রাহ্য একটি বিষয় ছিল ; এটিকে আরো ঘাটিয়ে দেখার প্রয়োজন ছিল না। যাই হোক এই আয়াতগুলোয় বর্ণিত বিষয়গুলো সে সময়ের মানুষের জানার পরিধি থেকে আরো অধিক দূরের ব্যাপার ছিল । যা বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান কর্তৃক সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।

এখন চলুন একের পর এক বিষয়গুলোয় যাই।

একবিন্দু বীর্য

যৌন মিলনের সময় পুরুষের দেহ থেকে প্রতিবারে ২৫০ মিলিয়ন শুক্রকীট বের হয়ে আসে। মায়ের দেহে শুক্রকীট একটি দুরারূহ যাত্রা চালায় ডিম্বাণুতে পৌছা পর্যন্ত । ২৫০ মিলিয়নের মাঝে কেবলমাত্র এক হাজারটি শুক্রাণু ডিম্বাণু পর্যন্ত পৌছুতে সফল হয়ে থাকে। এই পাঁচ মিনিটের দৌড় শেষে একটি লবণের দানার অর্ধেক আকারের একটি ডিম্বাণু কেবলি একটি শুক্রাণুকে তার ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়। তাই মানুষের জন্মের সারংশ পুরু বীর্য নয় , বরং এটি তার একটি ক্ষুদ্রাংশ মাত্র। কোরআনে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে :

মানুষ কি মনে করে যে , তাকে এমনি বেহিসাব ছেড়ে দেয়া হবে ? সে কি একবিন্দু শুক্র ছিলনা , যা মাতৃগর্ভে নিক্ষেপ করা হয়েছিল ? (কোরআন , ৭৫ : ৩৬ -৩৭)

আমরা দেখেছি যে , মানুষ সবটুকু বীর্য থেকে নয় বরং এর অতি অল্প অংশ থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া এই উক্তিটি এমন একটি বিষয়ের ঘোষণা করছে যা কেবলি আধুনিক বিজ্ঞান কর্তৃক আবিষ্কৃত হয়েছে । তাই এই উক্তিটি যে স্বর্গীয় এটি তারই প্রমাণ।

বামের ছবিটিতে আমরা দেখি যে , জরায়ুতে বীর্য উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে। পুরুষের দেহ হতে বের হওয়া ২৫০মিলিয়ন শুক্রকীটের মধ্যে মাত্র অল্প সংখ্যক শুক্রকীটই ডিম্বাণুর দিকে পরিচালিত হতে পারে। যে হাজার খানেক শুক্রকীট বেঁচে থাকতে পারে তাদের মাঝে মাত্র একটি শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে পারে। মানুষ পুরো বীর্য নয় বরং একটি ক্ষুদ্রাংশ থেকে সৃষ্ট হয়েছে সেটি কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এক বিন্দু শুক্র হিসেবে।

বীযের্র মিশ্রণ

বীর্য নামক তরল পদার্থটি শুধুমাত্র শুক্রাণু নিয়েই গঠিত নয়। বিপরীতক্রমে এটি আসলে বিভিন্ন তরল পদার্থের মিশ্রণ। এই তরল পদার্থটির বিভিন্ন কাজ রয়েছে। যেমন , এতে শুক্রকীটের শক্তি সরবরাহের জন্য শর্করা থাকে , জরায়ুতে শুক্রের প্রবেশ পথের এসিড নিষ্ক্রিয় করে থাকে এই তরল পদার্থটি , আর শুক্রকীটটির সহজ গতিবিধির জন্য একটি পিচ্ছিল পরিবেশ বজায় রাখে।

যথেষ্ট কৌতূহলের বিষয় হলো যে , কোরআনে এই বীর্যের কথা উল্লেখিত আছে আর এটিকে তরল পদার্থের মিশ্রণ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অথচ আধুনিক বিজ্ঞান কেবল সেদিন এটি আবিষ্কার করলঃ

আমিতো মানুষকে মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্টি করেছি তাকে পরীক্ষা করার জন্য ; এ কারণে আমি তাকে করেছি শ্রবণশক্তি সম্পন্ন ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন। (কোরআন , ৭৬ : ২)

অন্য একটি আয়াতে বীর্যকে আবার মিশ্র তরল পদার্থ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আর মানুষকে যে এই তরলের নির্যাস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেটি জোর দিয়ে বলা হয়েছে।

যিনি অত্যন্ত সুন্দররূপে তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সৃজন করেছেন এবং মানুষ সৃষ্টির সূচনা করেছেন কাদামাটি দিয়ে , তারপর তার বংশধরকে সৃষ্টি করেন নগণ্য পানির নির্যাস থেকে। (কোরআন , ৩২ : ৭৮)

আরবী শব্দ সুলালার অনুবাদ করা হয়েছে নির্যাস হিসেবে , যার মানে হলো কোন কিছুর দরকারী অথবা উত্তম অংশ হিসেবে। ব্যঞ্জণার্থেও এর অর্থ একটি অখণ্ড জিনিষের একটি অংশ। এটি দেখিয়ে দেয় যে , কোরআন এক মহাশক্তির কথা যিনি মানুষের সৃষ্টির প্রতিটি অণু পরমাণু অংশ জানেন। আর এই মহাশক্তিশালীই হলেন আল্লাহ , মানুষের সৃষ্টিকর্তা।

শিশুর লিঙ্গ

এইতো সেদিন পর্যন্ত ধারণা করা হতো যে , মাতৃকোষ দিয়ে বাচ্চার লিঙ্গ নির্ণয় হয়ে থাকে। অথবা এটুকু অন্তত বিশ্বাস করা হতো যে বাবামা উভয়ের কোষ দিয়ে বা চ্চার লিঙ্গ নির্ণিত হয়। অথচ পবিত্র কোরআন আমাদের ভিন্ন তথ্য দিয়ে থাকে যা বলে যে , নির্গত শুক্রবিন্দু থেকে মেয়ে বা ছেলে লিঙ্গ নির্ণিত হয়।

আর তিনিই সৃষ্টি করেছেন জোড়া নর ও নারী শুক্রবিন্দু থেকে যখন তা গর্ভপাত করা হয়। (কোরআন , ৫ : ৪৫ -৪৬)

ক্রমে উন্নত জেনেটিকস আর মলিকিউলার বায়োলজীর শাখা কোরআনে প্রদত্ত এই তথ্যটি সত্য বলে প্রমাণ করেছে। এখন বুঝা গেছে যে , পুরুষের শুক্রকীট থেকেই লিঙ্গ নির্ণিত হয় আর এ প্রক্রিয়ায় নারীর কোন ভূমিকা নেই। লিঙ্গ নির্ধারণের ব্যাপারে ক্রোমোজোমই প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করে থাকে। সনাক্ত করা গেছে যে ৪৬টি ক্রোমোজমের মাঝে দুইটি মানুষের গঠন প্রকৃতি নির্ণয় করে আর এগুলোকে বলে সেক্স ক্রোমোজোম। পুরুষে এ দুটি ক্রোমোজোম হলো XY আর নারীতে এ দুটি XX কেননা এ দুটি ক্রোমোজোমের আকৃতি এ দুটি অক্ষরের মতোই। Y ক্রোমোজোমে বিদ্যমান জীনগুলো পুরুষালী ভাবের কোড বা সংকেত বহন করে আর X ক্রোমোজোম স্ত্রীসুলভ ভাবের কোড বহন করে থাকে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যে , নির্গত এক বিন্দু শুক্রের উপর পুরুষত্ব বা নারীত্ব বিষয়টি নির্ভর করে। যাই হোক মোটামুটিভাবে সাম্প্রতিক কালেও বিশ্বাস করা হতো যে , মাতৃকোষ হতেই শিশুর লিঙ্গ নির্ধারিত হয়। কোরআনে প্রদত্ত এই তথ্যটি বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান উদঘাটন করেছে। মানুষের জন্ম সম্বন্ধে এটি এবং বহু তথ্যাদি শতাব্দী পূর্বে কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Y ক্রোমোজোম পুরুষালী বৈশিষ্ট্যসমূহ ধারণ করে থাকে আর X ক্রোমোজোমে নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। মায়ের ডিম্বাণূতে থাকে শুধু X ক্রোমোজোম যা নারীর স্বভাব নির্ণয় করে। পিতার বীর্যে শুক্রাণুতে থাকে হয় X ক্রোমোজোম অথবা Y ক্রোমোজোম। সুতরাং বাচ্চার লিংগ নির্ভর করে-পিতার শুক্রাণুর X অথবা Y ক্রোমোজোম ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে কিনা তার উপর। অন্য কথায় আয়াতটিতে বলা হয়েছে ঠিক তেমনি বাচ্চার লিংগ নির্ধারণকারী উপাদান আসে পুরুষ থেকে নির্গত বীর্য থেকে। এই জ্ঞানটি কোরআন নাযিল হওয়ার সময়ে মানুষের জানা ছিল না যা কিনা প্রমাণ করে যে কোরআন আল্লাহরই কথা।

এ ক্রোমোজোমদ্বয়ের যে কোন একটির ক্রস কম্বাইনেশনের মাধ্যমে নুতন এক মানব সন্তানের জন্মের সূত্রপাত ঘটে আর এ ক্রোমোজোমগুলো পুরুষ আর নারীতে জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে। অভ্যূলেশনের ( ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু বের হওয়ার সময় ) সময় নারীর সেক্স কোষের দুটি অংশ দুটিভাগে বিভক্ত হয় , এদুটি অংশই X ক্রোমোজোম বহন করে থাকে। অন্যদিকে পুরুষের সেক্স কোষ দু ধরণের শুক্রকীট বা স্পার্ম তৈরী করে , এদের একটিতে থাকে X ক্রোমোজোম আর অন্যটিতে Y ক্রোমোজোম। যখন নারীর X ক্রোমোজোম পুরুষের Y ক্রোমোজোমের সঙ্গে মিলিত হয় তখন বাচ্চাটি হবে মেয়ে। আর যদি তা পুরুষের শুক্রাণুর Y ক্রেমোজোমের সঙ্গে মিলিত হয় তবে বাচ্চাটি হবে ছেলে।

অন্য কথায় পুরুষের যে ক্রোমোজোমটি নারীর ডিম্বাণুর ক্রোমোজোমের সঙ্গে মিলিত হয় সেটির উপরই নিভর্র করছে বাচ্চার সেক্স বা লিঙ্গ।

বিংশ শতাব্দীতে জেনেটিক্স আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত এই তথ্যগুলো জানা সম্ভব ছিল না। বাস্তবে বহু সংস্কৃতিতেই বিশ্বাস ছিল যে , বাচ্চার লিঙ্গ নির্ধারিত হয় নারীর দেহ দ্বারা। আর সেজন্যেই কন্যা সন্তান জন্ম নিলে নারীকেই দোষী সাব্যস্ত করা হত।

মানুষের জীন আবিষ্কৃত হওয়ার আগে তেরোশত বছর পূর্বে কোরআন তথ্য দিয়েছিল যা অন্ধ বিশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে এবং লিংগ নির্ণয়ে পুরুষের ভূমিকার কথা বলে।

হীরা ও গাসসান রাজ্যসমূহ

আরব উপদ্বীপের যে সব অঞ্চলের জলবায়ু ও আবহাওয়া ভালো ছিল সে সব অঞ্চল ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে সর্বশেষ শতাব্দীতে পুরোপুরি তিন বৃহৎ শক্তি অর্থাৎ ইরান,রোম ও আবিসিনিয়ার অধীন ছিল। আরব উপদ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ইরানের প্রভাবাধীন,উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল রোমের অনুগত এবং মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল হাবাশাহ্ অর্থাৎ আবিসিনিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। এ সব সভ্য রাষ্ট্রের পাশে থাকার কারণে এবং ঐ সব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বদা দ্বন্দ্ব থাকার কারণে আরব উপদ্বীপের সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহে অর্ধ-স্বাধীন ও অর্ধ-সভ্য বেশ কিছু রাজ্যের পত্তন হয়েছিল যেগুলোর প্রতিটিই ছিল নিজ নিজ প্রতিবেশী সভ্য বৃহৎ সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের অনুগত। হীরা,গাসসান ও কিন্দাহ্ ছিল ঐ ধরনের রাজ্য যেগুলোর প্রতিটি ছিল পারস্য,রোম ও আবিসিনীয় সাম্রাজ্যের যে কোন একটির প্রভাবাধীন।50

ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণাদি অনুযায়ী খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমাংশে আশকানীয় যুগের শেষের দিকে কতিপয় আরব গোত্র ফোরাত নদীর পাড়ে অবস্থিত এলাকায় বসতি স্থাপন করে এবং ইরাকের একটি অংশকে নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে আসে। তারা ধীরে ধীরে এ সব বসতি স্থাপনকারী আরব গ্রাম,দুর্গ,শহর ও নগর প্রতিষ্ঠা করে যেগুলোর মধ্যে হীরা’নগরটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ নগরীটি বর্তমান কুফা নগরীর নিকটেই অবস্থিত ছিল।

এ শহরটি ছিল দুর্গ-নগরী। আর এ বিষয়টি এ শহরের নামকরণ থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে যায়।51 এ নগরীতে আরবগণ বসবাস করত। তবে ধীরে ধীরে তা শহরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ফোরাত অঞ্চলের ভালো জলবায়ু এবং প্রচুর নদ-নদীর অস্তিত্ব ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকূল হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চল আবাদ হয়েছিল। ঐ অঞ্চলের অধিবাসিগণ মরুবাসী আরব সর্দারদেরকে কৃষ্টি ও সভ্যতার আহবান জানাতে সক্ষম হয়েছিল। হীরা অঞ্চলের অধিবাসিগণ পারস্যের প্রতিবেশী হওয়ার কারণে পারস্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা উপকৃত হয়েছিল। খওরানাক প্রাসাদের ন্যায় হীরার সন্নিকটে বেশ কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিল যা উক্ত নগরীকে এক বিশেষ সৌন্দর্য দান করেছিল। এ অঞ্চলের আরবগণ লিপি ও লিখনপ্রণালীর সাথে পরিচিত হয়েছিল এবং সম্ভবত সেখান থেকেই লিপি ও লিখনপ্রণালী আরব উপদ্বীপের অন্যান্য স্থানে প্রচলিত হয়েছিল।52

হীরার শাসনকর্তা ও আমীরগণ বনি লাখম গোত্রের আরব ছিলেন এবং পারস্যের সাসানীয় সম্রাটগণ তাঁদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। হীরার আমীরদের সাসানীয় সম্রাটগণ এ কারণে সমর্থন করতেন যাতে করে তাঁরা তাঁদের (হীরার আমীরগণ) ইরান ও আরব বেদুইনদের মাঝে অন্তরায় হিসাবে গড়ে তুলতে এবং তাঁদের সহায়তায় পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহে লুণ্ঠনকারী আরব বেদুইন ও যাযাবরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন। (হীরার) এ সব আমীরের নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। হামযাহ্ ইসফাহানী এ সব আমীরের নাম ও আয়ুষ্কাল এবং যে সব সাসানীয় সম্রাট তাঁদের সমসাময়িক ছিলেন তাঁদের একটি তালিকা প্রদান করেছেন।53

যা হোক বনি লাখম বংশের রাজ্য ছিল হীরা অঞ্চলের বৃহত্তম আরবীয় রাজ্য যা ছিল অর্ধসভ্য। এ বংশের সর্বশেষ বাদশাহ্ ছিলেন নূমান বিন মুনযির যিনি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ কর্তৃক অপসারিত ও নিহত হয়েছিলেন। তাঁর অপসারণ ও হত্যার কাহিনী ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।54

পঞ্চম শতাব্দীর শেষে অথবা ষষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে একদল বহিরাগত আরব আরব উপদ্বীপের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে যা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী। এ দেশটি রোমান সাম্রাজ্যের ছত্রছায়ায় ছিল এবং ঠিক যেমনি হীরার শাসকবর্গ পারস্য সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল ঠিক তেমনি গাসসানীয় রাজ্যের শাসকবর্গও বাইজান্টাইনীয় সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল।

গাসসান দেশটি কিছুটা সভ্য ছিল। যেহেতু দেশটির সরকারের কেন্দ্র একদিকে দামেস্কের কাছাকাছি,অন্যদিকে বসরার নিকটবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সেহেতু এ দেশটি রোমান প্রভাবাধীন আরব অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। আর অত্র এলাকাতে রোমান সভ্যতা ও সংস্কৃতি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।

গাসসানিগণ হীরার লাখম গোত্রভুক্ত শাসকবর্গ এবং ইরানীদের সাথে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব থাকার কারণে রোমান সাম্রাজ্যের মিত্র হয়েছিল। প্রায় 9 অথবা 10 গাসসানী আমীর একের পর এক এ দেশটিতে শাসনকার্য পরিচালনা করেছে।

হিজাযে প্রচলিত ধর্ম

হিজাযে যে ধর্ম প্রচলিত ছিল তা ছিল পৌত্তলিক ধর্ম। কেবল ইয়াসরিব (মদীনা) ও খাইবারে ইয়াহুদী সংখ্যালঘুরা বসবাস করত। ইয়েমেন ও হিজাযের সীমান্তবর্তী শহর নজরানের অধিবাসীরা যেমনি খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ছিল,ঠিক তদ্রূপ আরব উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন এলাকা হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চলেও খ্রিষ্টধর্ম প্রচলিত ছিল। যদি এ তিন সংবেদনশীল এলাকা বাদ দেই তাহলে হিজাযের অন্য সব এলাকায় মূলত বিভিন্ন আকার-অবয়বে মূর্তিপূজা এবং বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।

তবে হানীফ’(حنيف ) নামে পরিচিত অতি মুষ্টিমেয় ব্যক্তি তাওহীদী মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যারা নিজেদের হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর ধর্মের অনুসারী বলে জানত। তাদের সংখ্যা আসলেই খুব কম ছিল। তদানীন্তন পৌত্তলিক আরব জনসংখ্যার তুলনায় তাদের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল।55

হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সময় থেকে ধর্মীয় ও চারিত্রিক আচার-প্রথা ও বিধিসমন্বিত একত্ববাদী ধর্ম হিজাযে প্রবর্তিত ও প্রচলিত হয়েছিল। পবিত্র কাবার সম্মানার্থে হজ্বব্রত পালন ছিল ঐ সব প্রথারই অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীকালে আমর বিন কুসাই নামের খুযাআ গোত্রের এক ব্যক্তি-যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব ছিল তার মাধ্যমে পবিত্র মক্কা নগরীতে মূর্তিপূজার প্রচলন হয়। এ ব্যক্তি শাম (সিরিয়া) ভ্রমণ করার সময় দেখতে পেয়েছিল যে,আমালাকা সম্প্রদায় সুন্দর সুন্দর প্রতিমার পূজা করে। তাদের এ কাজ তার মনঃপূত হয় এবং সে হুবাল’নামের একটি সুন্দর প্রতিমা শাম থেকে মক্কায় আনয়ন করে এবং জনগণকে তা পূজা করার ব্যাপারে আহবান জানায়।56

প্রসিদ্ধ প্রতিমাসমূহ : 1. হুবাল 2. আসাফ 3. নায়েলাহ্ 4. লাত 5. উয্যা 6. মানাত 7. আমইয়ানুস 8. সা দ 9. যূল খালসাহ্ 10. মান্নাফ।

এগুলোই ছিল আরবদের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রতিমা। এ সব প্রতিমা ছাড়াও আরবদের অন্যান্য প্রতিমার উপাসনাও প্রচলিত ছিল। কখনো কখনো কোন গোত্র,এমনকি কোন কোন বংশের নিজস্ব প্রতিমা ও মূর্তি ছিল যাকে তারা পূজা করত।

হিজাযে জ্ঞান ও শিক্ষা

হিজাযের জনগণ ও অধিবাসীদের উম্মী’বলা হতো। উম্মী’শব্দের অর্থ অশিক্ষিত। অর্থাৎ ঐ ব্যক্তিকে উম্মী বলা হয় যে মায়ের পেট থেকে যে অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিল ঠিক সে অবস্থায়ই রয়েছে। (জাহেলিয়াতের যুগে) আরবদের মধ্যে জ্ঞান ও শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে,ইসলামের শুভ অভ্যুদয়ের লগ্নে কুরাইশ গোত্রে কেবল 17 ব্যক্তি লেখাপড়া জানত। আর মদীনায় আওস’ও খাযরাজ’গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কেবল 11 জন লেখাপড়া জানত।57

আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত এ আলোচনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে মতাদর্শ,চিন্তা-চেতনা,বিশ্বাস,অর্থনীতি,চরিত্র,আচার-ব্যবহার এবং কৃষ্টি-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলাম ধর্মের শিক্ষা-দীক্ষার মাহাত্ম্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় এবং সব সময় সভ্যতাসমূহের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের ঐ সব সভ্যতার পূর্ববর্তী অধ্যায় অধ্যয়ন করতেই হবে। অধ্যয়নের পরই কেবল উক্ত সভ্যতার মহত্ত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন করা উচিত।58

তৃতীয় অধ্যায় : দুই পরাশক্তি ইরান ও রোমের অবস্থা

ইসলাম ধর্মের পবিত্র আন্দোলনের প্রকৃত তাৎপর্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্য দু টি পরিবেশের সমুদয় অবস্থা অধ্যয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :

1. পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার পরিবেশ অর্থাৎ যে পরিস্থিতি ও পরিবেশের মধ্যে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ও এর বিকাশ ঘটেছিল।

2. ঐ সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য অঞ্চলসমূহে যে সব জাতি বসবাস করত তাদের চিন্তাধারা,চরিত্র,আচার,রীতি-নীতি,প্রথা ও সভ্যতা অধ্যয়ন।

ইতিহাস থেকে ঐ সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত যে অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা জানতে পারি তা হলো রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা ও পরিবেশ। আলোচনা পূর্ণ করার জন্য আমাদের অবশ্যই উক্ত দু দেশের অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলোচনা ও অধ্যয়ন করতে হবে। যার ফলে ইসলাম ধর্ম যে সুমহান সভ্যতা মানব জাতিকে উপহার দিয়েছে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যাবে।

তখনকার রোমান সাম্রাজ্যের অবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্যের অবস্থা অপেক্ষা কোন অংশে কম ছিল না। গৃহযুদ্ধ এবং আর্মেনিয়া ও অন্যান্য এলাকাকে কেন্দ্র করে ইরানের সাথে সংঘটিত যুদ্ধসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের জনগণকে এক নতুন বিপ্লব বরণ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল। ধর্মীয় মতপার্থক্যসমূহ অন্য সব কিছুর চেয়ে বেশি এ সব বিরোধ ও পার্থক্যকে বিস্তৃত করেছিল। মূর্তিপূজক ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে যুদ্ধের বহ্নিশিখা নির্বাপিত হতো না। যখন গির্জার পুরোহিতগণ শাসনকর্তৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁরা তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধীদের কঠিন চাপের মধ্যে রেখেছিলেন যা একটি অসন্তুষ্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটিয়েছিল। যে বিষয়কে রোমান সাম্রাজ্যের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অন্যতম বড় কারণ বলে গণ্য করা হয়েছে তা ছিল গির্জার পুরোহিতদের সহিংসতার কারণে উক্ত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বঞ্চনা ও নাগরিক অধিকারহীনতা। একদিকে পুরোহিত ও ধর্মযাজকদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের পথ ও মত দিন দিন রোমান সাম্রাজ্যের শক্তি,ক্ষমতা ও আধিপত্য নিঃশেষ করে দিচ্ছিল।

এ সব ছাড়াও উত্তর-পূর্ব দিকের শ্বেতাঙ্গ ও পীতবর্ণের লোকেরা সর্বদা ইউরোপ মহাদেশের উর্বর অঞ্চলসমূহ নিজেদের করায়ত্তে আনার ইচ্ছা পোষণ করত এবং কখনো কখনো সামরিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধসমূহে একে অপরের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি সাধন করত। এর ফলে রোমান সাম্রাজ্য দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিকগণ বিশ্বাস করেন যে,ষষ্ঠ শতাব্দীতে রোমের রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি পারস্য সাম্রাজ্যের ওপর রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি উক্ত সাম্রাজ্যের সামরিক পরাশক্তি হওয়ার প্রমাণ বলে গণ্য করা হতো না,বরং বিশ্বাস করা হতো যে,ইরানের পরাজয় আসলে সে দেশটির প্রশাসনের বিশৃঙ্খলারই ফসল ছিল। এ দু টি দেশ যা নিজেদের ওপর বিশ্ব রাজনীতি ও নেতৃত্বের মুকুট পরিধান করেছিল তা ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব কালে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছিল। এটি স্পষ্ট যে,এ ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি একটি সঠিক ধর্ম গ্রহণ করার জন্য অসাধারণ প্রস্তুতি ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছিল যা মানব জাতির জীবনের সার্বিক অবস্থা উন্নয়নে সক্ষম।

রোমের খণ্ডকালীন আলোচনাসভাসমূহ

কিছু কিছু দেশে একদল বেকার ও প্রবৃত্তিপূজারী ব্যক্তি নিজেদের অসদুদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কতগুলো অন্তঃসারশূন্য বিষয় জনসমক্ষে উত্থাপন ও প্রচার করত এবং এভাবে তারা জনগণের মূল্যবান জীবন নষ্ট করত। প্রাচ্যের অনেক দেশেই আমাদের এ বক্তব্যের পক্ষে প্রচুর দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান যা বর্তমানে আলোচনা করার কোন অবকাশ নেই। ঘটনাচক্রে তখনকার রোম অন্য সব দেশের চেয়ে বেশি এ ধরনের সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছিল। যেমন রোমান সম্রাট ও রাজনীতিকগণ কিছু কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুসারী হওয়ার কারণে বিশ্বাস করতেন যে,হযরত ঈসা মসীহ্ (আ.) দু ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। কিন্তু কিছু সংখ্যক ইয়াকুবী সম্প্রদায়ভুক্ত খ্রিষ্টান বিশ্বাস করত যে,হযরত ঈসা (আ.) কেবল এক ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। আর ভিত্তিহীন এ বিষয়টিই রোমান সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব,ঐক্য ও সংহতির ওপর তীব্র আঘাত হানে এবং তাদের মধ্যে এক গভীর ফাটলের উদ্ভব ঘটায় যার ফলে সরকার ও প্রশাসন নিজ আকীদা-বিশ্বাস সংরক্ষণ করতে বাধ্য হয়। আর এ কারণেই প্রশাসন বিরোধীদেরকে অতি নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়। উৎপীড়ন ও চাপের কারণে বেশ কিছুসংখ্যক বিরোধী ইরান সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এ সব বিরোধীই মুসলিম সেনাবাহিনীর সম্মুখে রণক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং মনে-প্রাণে মুসলিম সেনাবাহিনীকে বরণ করে নিয়েছিল।

তদানীন্তন রোমান সাম্রাজ্য ঠিক মধ্যযুগীয় ইউরোপের মতো ছিল। প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ফ্লামারীয়োন মধ্যযুগে ইউরোপীয় কৃষ্টির পর্যায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত কাহিনীটি বর্ণনা করেছেন : আধ্যাত্মিক সমগ্র’নামক গ্রন্থটি মধ্যযুগে স্কলাসটিক দর্শনের পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ও নিদর্শন বলে গণ্য হতো। এ গ্রন্থটি চারশ’বছর ধরে আনুষ্ঠানিক পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ইউরোপে পঠিত হতো। উক্ত গ্রন্থের একটি অংশে এ শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে : একটি সুঁইয়ের অগ্রভাগের সরু ছিদ্রের মধ্যে কত জন ফেরেশতার অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব?’‘ চিরন্তন পিতার বাম চোখের পুতুলী থেকে তাঁর ডান চোখের পুতুলী পর্যন্ত দূরত্ব কত ফারসাখ? (1 ফারসাখ = প্রায় 6 কিলোমিটার)

দুর্ভাগ্যপীড়িত রোমান সাম্রাজ্য বহিঃশক্তিগুলোর সাথে যুদ্ধে-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়ার একই সময় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিল। এ সব দ্বন্দ্ব-সংঘাত ধর্মীয় রূপ পরিগ্রহ করেছিল। আর এর ফলে দিন দিন দেশটি পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। ইয়াহুদিগণ যারা ছিল একটি ষড়যন্ত্রকারী জাতি,তারা যখন দেখল,রোমের খ্রিষ্টান সম্রাট কর্তৃক আরোপিত চাপ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে তখন তারা রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস ও এর মূলোৎপাটন করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা একবার আনতাকীয়া নগরীও দখল করে নিয়েছিল এবং নগরীর প্রধান ধর্মযাজকের কান,নাক ও ঠোঁট কর্তন করেছিল। রোম সরকার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আনতাকীয়ার ইয়াহুদীদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। রোমে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কয়েকবার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। আবার কখনো কখনো এ শত্রুতা দেশের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিল। উদাহরণস্বরূপ ইয়াহুদীরা একবার ইরান থেকে 80,000 খ্রিষ্টানকে ক্রয় করে দুম্বার মতো জবাই করেছিল।

এখানেই সম্মানিত পাঠকবর্গ ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক বিশ্বের অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অরাজক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে এবং স্বীকার করতে পারবেন যে,ইসলামের মুক্তিদানকারী শিক্ষা-দীক্ষা ও বিধি-বিধান ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে সৃষ্ট হয় নি এবং তা মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তাধারারও ফসল নয়। ঐক্য ও সহমর্মিতার মৃদুমন্দ এ সমীরণ এবং শান্তি ও মৈত্রীর সুর যা পবিত্র ইসলাম ধর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা আসলে ঐশ্বরিক উৎস থেকেই উৎসারিত হয়েছে। কিভাবে বলা সম্ভব যে,যে ইসলাম ধর্ম জীবজন্তু ও প্রাণীকুলকে পর্যন্ত জীবনধারণ করার অধিকার দিয়েছে আসলে তা এ ধরনের রক্তপিপাসু পরিবেশ থেকে উদ্ভূত?

ইসলাম ধর্ম হযরত ঈসা (আ.)-এর ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে ভিত্তিহীন এ সব আলোচনার অবসান ঘটিয়েছে এবং ঈসা (আ.)-কে ঠিক এভাবে পরিচিত করিয়েছে :

) ما المسيح بن مريم إلّا رسول قد خلت من قبله الرّسل و أمّه صدّيقة كانا يأكلان الطّعام(

“মরিয়ম তনয় মসীহ্ একজন নবীর চেয়ে বেশি কিছু নন যাঁর আগে অনেক নবী-রাসূল গত হয়েছেন। তাঁর মাতা ছিলেন একজন পূতঃপবিত্রা পরম সত্যবাদিনী। এমতাবস্থায় তাঁরা উভয়ই খাদ্য গ্রহণ করতেন এবং মানুষ ছিলেন।” (সূরা মায়েদাহ্ : 75)

পবিত্র কোরআনের এ আয়াত হযরত ঈসা (আ.)-এর আত্মা,রক্ত ও পরিচিতি সংক্রান্ত গীর্জার ধর্মযাজকদের অনর্থক আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে। এ ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ এবং মহৎ মানবীয় গুণাবলী পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে মানব জাতিকে অযথা যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত থেকে বিরত রেখেছে।

হীরা ও গাসসান রাজ্যসমূহ

আরব উপদ্বীপের যে সব অঞ্চলের জলবায়ু ও আবহাওয়া ভালো ছিল সে সব অঞ্চল ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে সর্বশেষ শতাব্দীতে পুরোপুরি তিন বৃহৎ শক্তি অর্থাৎ ইরান,রোম ও আবিসিনিয়ার অধীন ছিল। আরব উপদ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ইরানের প্রভাবাধীন,উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল রোমের অনুগত এবং মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল হাবাশাহ্ অর্থাৎ আবিসিনিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। এ সব সভ্য রাষ্ট্রের পাশে থাকার কারণে এবং ঐ সব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বদা দ্বন্দ্ব থাকার কারণে আরব উপদ্বীপের সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহে অর্ধ-স্বাধীন ও অর্ধ-সভ্য বেশ কিছু রাজ্যের পত্তন হয়েছিল যেগুলোর প্রতিটিই ছিল নিজ নিজ প্রতিবেশী সভ্য বৃহৎ সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের অনুগত। হীরা,গাসসান ও কিন্দাহ্ ছিল ঐ ধরনের রাজ্য যেগুলোর প্রতিটি ছিল পারস্য,রোম ও আবিসিনীয় সাম্রাজ্যের যে কোন একটির প্রভাবাধীন।50

ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণাদি অনুযায়ী খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমাংশে আশকানীয় যুগের শেষের দিকে কতিপয় আরব গোত্র ফোরাত নদীর পাড়ে অবস্থিত এলাকায় বসতি স্থাপন করে এবং ইরাকের একটি অংশকে নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে আসে। তারা ধীরে ধীরে এ সব বসতি স্থাপনকারী আরব গ্রাম,দুর্গ,শহর ও নগর প্রতিষ্ঠা করে যেগুলোর মধ্যে হীরা’নগরটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ নগরীটি বর্তমান কুফা নগরীর নিকটেই অবস্থিত ছিল।

এ শহরটি ছিল দুর্গ-নগরী। আর এ বিষয়টি এ শহরের নামকরণ থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত হয়ে যায়।51 এ নগরীতে আরবগণ বসবাস করত। তবে ধীরে ধীরে তা শহরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ফোরাত অঞ্চলের ভালো জলবায়ু এবং প্রচুর নদ-নদীর অস্তিত্ব ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকূল হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চল আবাদ হয়েছিল। ঐ অঞ্চলের অধিবাসিগণ মরুবাসী আরব সর্দারদেরকে কৃষ্টি ও সভ্যতার আহবান জানাতে সক্ষম হয়েছিল। হীরা অঞ্চলের অধিবাসিগণ পারস্যের প্রতিবেশী হওয়ার কারণে পারস্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা উপকৃত হয়েছিল। খওরানাক প্রাসাদের ন্যায় হীরার সন্নিকটে বেশ কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছিল যা উক্ত নগরীকে এক বিশেষ সৌন্দর্য দান করেছিল। এ অঞ্চলের আরবগণ লিপি ও লিখনপ্রণালীর সাথে পরিচিত হয়েছিল এবং সম্ভবত সেখান থেকেই লিপি ও লিখনপ্রণালী আরব উপদ্বীপের অন্যান্য স্থানে প্রচলিত হয়েছিল।52

হীরার শাসনকর্তা ও আমীরগণ বনি লাখম গোত্রের আরব ছিলেন এবং পারস্যের সাসানীয় সম্রাটগণ তাঁদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। হীরার আমীরদের সাসানীয় সম্রাটগণ এ কারণে সমর্থন করতেন যাতে করে তাঁরা তাঁদের (হীরার আমীরগণ) ইরান ও আরব বেদুইনদের মাঝে অন্তরায় হিসাবে গড়ে তুলতে এবং তাঁদের সহায়তায় পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহে লুণ্ঠনকারী আরব বেদুইন ও যাযাবরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন। (হীরার) এ সব আমীরের নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। হামযাহ্ ইসফাহানী এ সব আমীরের নাম ও আয়ুষ্কাল এবং যে সব সাসানীয় সম্রাট তাঁদের সমসাময়িক ছিলেন তাঁদের একটি তালিকা প্রদান করেছেন।53

যা হোক বনি লাখম বংশের রাজ্য ছিল হীরা অঞ্চলের বৃহত্তম আরবীয় রাজ্য যা ছিল অর্ধসভ্য। এ বংশের সর্বশেষ বাদশাহ্ ছিলেন নূমান বিন মুনযির যিনি পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ কর্তৃক অপসারিত ও নিহত হয়েছিলেন। তাঁর অপসারণ ও হত্যার কাহিনী ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।54

পঞ্চম শতাব্দীর শেষে অথবা ষষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে একদল বহিরাগত আরব আরব উপদ্বীপের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে যা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী। এ দেশটি রোমান সাম্রাজ্যের ছত্রছায়ায় ছিল এবং ঠিক যেমনি হীরার শাসকবর্গ পারস্য সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল ঠিক তেমনি গাসসানীয় রাজ্যের শাসকবর্গও বাইজান্টাইনীয় সম্রাটদের তাঁবেদার ছিল।

গাসসান দেশটি কিছুটা সভ্য ছিল। যেহেতু দেশটির সরকারের কেন্দ্র একদিকে দামেস্কের কাছাকাছি,অন্যদিকে বসরার নিকটবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সেহেতু এ দেশটি রোমান প্রভাবাধীন আরব অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। আর অত্র এলাকাতে রোমান সভ্যতা ও সংস্কৃতি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।

গাসসানিগণ হীরার লাখম গোত্রভুক্ত শাসকবর্গ এবং ইরানীদের সাথে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব থাকার কারণে রোমান সাম্রাজ্যের মিত্র হয়েছিল। প্রায় 9 অথবা 10 গাসসানী আমীর একের পর এক এ দেশটিতে শাসনকার্য পরিচালনা করেছে।

হিজাযে প্রচলিত ধর্ম

হিজাযে যে ধর্ম প্রচলিত ছিল তা ছিল পৌত্তলিক ধর্ম। কেবল ইয়াসরিব (মদীনা) ও খাইবারে ইয়াহুদী সংখ্যালঘুরা বসবাস করত। ইয়েমেন ও হিজাযের সীমান্তবর্তী শহর নজরানের অধিবাসীরা যেমনি খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ছিল,ঠিক তদ্রূপ আরব উপদ্বীপের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন এলাকা হওয়ার কারণে অত্র অঞ্চলেও খ্রিষ্টধর্ম প্রচলিত ছিল। যদি এ তিন সংবেদনশীল এলাকা বাদ দেই তাহলে হিজাযের অন্য সব এলাকায় মূলত বিভিন্ন আকার-অবয়বে মূর্তিপূজা এবং বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।

তবে হানীফ’(حنيف ) নামে পরিচিত অতি মুষ্টিমেয় ব্যক্তি তাওহীদী মতাদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যারা নিজেদের হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর ধর্মের অনুসারী বলে জানত। তাদের সংখ্যা আসলেই খুব কম ছিল। তদানীন্তন পৌত্তলিক আরব জনসংখ্যার তুলনায় তাদের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল।55

হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সময় থেকে ধর্মীয় ও চারিত্রিক আচার-প্রথা ও বিধিসমন্বিত একত্ববাদী ধর্ম হিজাযে প্রবর্তিত ও প্রচলিত হয়েছিল। পবিত্র কাবার সম্মানার্থে হজ্বব্রত পালন ছিল ঐ সব প্রথারই অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীকালে আমর বিন কুসাই নামের খুযাআ গোত্রের এক ব্যক্তি-যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব ছিল তার মাধ্যমে পবিত্র মক্কা নগরীতে মূর্তিপূজার প্রচলন হয়। এ ব্যক্তি শাম (সিরিয়া) ভ্রমণ করার সময় দেখতে পেয়েছিল যে,আমালাকা সম্প্রদায় সুন্দর সুন্দর প্রতিমার পূজা করে। তাদের এ কাজ তার মনঃপূত হয় এবং সে হুবাল’নামের একটি সুন্দর প্রতিমা শাম থেকে মক্কায় আনয়ন করে এবং জনগণকে তা পূজা করার ব্যাপারে আহবান জানায়।56

প্রসিদ্ধ প্রতিমাসমূহ : 1. হুবাল 2. আসাফ 3. নায়েলাহ্ 4. লাত 5. উয্যা 6. মানাত 7. আমইয়ানুস 8. সা দ 9. যূল খালসাহ্ 10. মান্নাফ।

এগুলোই ছিল আরবদের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রতিমা। এ সব প্রতিমা ছাড়াও আরবদের অন্যান্য প্রতিমার উপাসনাও প্রচলিত ছিল। কখনো কখনো কোন গোত্র,এমনকি কোন কোন বংশের নিজস্ব প্রতিমা ও মূর্তি ছিল যাকে তারা পূজা করত।

হিজাযে জ্ঞান ও শিক্ষা

হিজাযের জনগণ ও অধিবাসীদের উম্মী’বলা হতো। উম্মী’শব্দের অর্থ অশিক্ষিত। অর্থাৎ ঐ ব্যক্তিকে উম্মী বলা হয় যে মায়ের পেট থেকে যে অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিল ঠিক সে অবস্থায়ই রয়েছে। (জাহেলিয়াতের যুগে) আরবদের মধ্যে জ্ঞান ও শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে,ইসলামের শুভ অভ্যুদয়ের লগ্নে কুরাইশ গোত্রে কেবল 17 ব্যক্তি লেখাপড়া জানত। আর মদীনায় আওস’ও খাযরাজ’গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কেবল 11 জন লেখাপড়া জানত।57

আরব উপদ্বীপের অধিবাসীদের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত এ আলোচনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে মতাদর্শ,চিন্তা-চেতনা,বিশ্বাস,অর্থনীতি,চরিত্র,আচার-ব্যবহার এবং কৃষ্টি-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলাম ধর্মের শিক্ষা-দীক্ষার মাহাত্ম্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় এবং সব সময় সভ্যতাসমূহের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের ঐ সব সভ্যতার পূর্ববর্তী অধ্যায় অধ্যয়ন করতেই হবে। অধ্যয়নের পরই কেবল উক্ত সভ্যতার মহত্ত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন করা উচিত।58

তৃতীয় অধ্যায় : দুই পরাশক্তি ইরান ও রোমের অবস্থা

ইসলাম ধর্মের পবিত্র আন্দোলনের প্রকৃত তাৎপর্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্য দু টি পরিবেশের সমুদয় অবস্থা অধ্যয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :

1. পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার পরিবেশ অর্থাৎ যে পরিস্থিতি ও পরিবেশের মধ্যে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ও এর বিকাশ ঘটেছিল।

2. ঐ সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য অঞ্চলসমূহে যে সব জাতি বসবাস করত তাদের চিন্তাধারা,চরিত্র,আচার,রীতি-নীতি,প্রথা ও সভ্যতা অধ্যয়ন।

ইতিহাস থেকে ঐ সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত যে অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা জানতে পারি তা হলো রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সার্বিক অবস্থা ও পরিবেশ। আলোচনা পূর্ণ করার জন্য আমাদের অবশ্যই উক্ত দু দেশের অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলোচনা ও অধ্যয়ন করতে হবে। যার ফলে ইসলাম ধর্ম যে সুমহান সভ্যতা মানব জাতিকে উপহার দিয়েছে তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যাবে।

তখনকার রোমান সাম্রাজ্যের অবস্থা প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্যের অবস্থা অপেক্ষা কোন অংশে কম ছিল না। গৃহযুদ্ধ এবং আর্মেনিয়া ও অন্যান্য এলাকাকে কেন্দ্র করে ইরানের সাথে সংঘটিত যুদ্ধসমূহ রোমান সাম্রাজ্যের জনগণকে এক নতুন বিপ্লব বরণ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল। ধর্মীয় মতপার্থক্যসমূহ অন্য সব কিছুর চেয়ে বেশি এ সব বিরোধ ও পার্থক্যকে বিস্তৃত করেছিল। মূর্তিপূজক ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে যুদ্ধের বহ্নিশিখা নির্বাপিত হতো না। যখন গির্জার পুরোহিতগণ শাসনকর্তৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁরা তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধীদের কঠিন চাপের মধ্যে রেখেছিলেন যা একটি অসন্তুষ্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটিয়েছিল। যে বিষয়কে রোমান সাম্রাজ্যের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অন্যতম বড় কারণ বলে গণ্য করা হয়েছে তা ছিল গির্জার পুরোহিতদের সহিংসতার কারণে উক্ত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বঞ্চনা ও নাগরিক অধিকারহীনতা। একদিকে পুরোহিত ও ধর্মযাজকদের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের পথ ও মত দিন দিন রোমান সাম্রাজ্যের শক্তি,ক্ষমতা ও আধিপত্য নিঃশেষ করে দিচ্ছিল।

এ সব ছাড়াও উত্তর-পূর্ব দিকের শ্বেতাঙ্গ ও পীতবর্ণের লোকেরা সর্বদা ইউরোপ মহাদেশের উর্বর অঞ্চলসমূহ নিজেদের করায়ত্তে আনার ইচ্ছা পোষণ করত এবং কখনো কখনো সামরিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধসমূহে একে অপরের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি সাধন করত। এর ফলে রোমান সাম্রাজ্য দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিকগণ বিশ্বাস করেন যে,ষষ্ঠ শতাব্দীতে রোমের রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ও দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি পারস্য সাম্রাজ্যের ওপর রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি উক্ত সাম্রাজ্যের সামরিক পরাশক্তি হওয়ার প্রমাণ বলে গণ্য করা হতো না,বরং বিশ্বাস করা হতো যে,ইরানের পরাজয় আসলে সে দেশটির প্রশাসনের বিশৃঙ্খলারই ফসল ছিল। এ দু টি দেশ যা নিজেদের ওপর বিশ্ব রাজনীতি ও নেতৃত্বের মুকুট পরিধান করেছিল তা ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব কালে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছিল। এটি স্পষ্ট যে,এ ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি একটি সঠিক ধর্ম গ্রহণ করার জন্য অসাধারণ প্রস্তুতি ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করেছিল যা মানব জাতির জীবনের সার্বিক অবস্থা উন্নয়নে সক্ষম।

রোমের খণ্ডকালীন আলোচনাসভাসমূহ

কিছু কিছু দেশে একদল বেকার ও প্রবৃত্তিপূজারী ব্যক্তি নিজেদের অসদুদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কতগুলো অন্তঃসারশূন্য বিষয় জনসমক্ষে উত্থাপন ও প্রচার করত এবং এভাবে তারা জনগণের মূল্যবান জীবন নষ্ট করত। প্রাচ্যের অনেক দেশেই আমাদের এ বক্তব্যের পক্ষে প্রচুর দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান যা বর্তমানে আলোচনা করার কোন অবকাশ নেই। ঘটনাচক্রে তখনকার রোম অন্য সব দেশের চেয়ে বেশি এ ধরনের সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছিল। যেমন রোমান সম্রাট ও রাজনীতিকগণ কিছু কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুসারী হওয়ার কারণে বিশ্বাস করতেন যে,হযরত ঈসা মসীহ্ (আ.) দু ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। কিন্তু কিছু সংখ্যক ইয়াকুবী সম্প্রদায়ভুক্ত খ্রিষ্টান বিশ্বাস করত যে,হযরত ঈসা (আ.) কেবল এক ধরনের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। আর ভিত্তিহীন এ বিষয়টিই রোমান সাম্রাজ্যের স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব,ঐক্য ও সংহতির ওপর তীব্র আঘাত হানে এবং তাদের মধ্যে এক গভীর ফাটলের উদ্ভব ঘটায় যার ফলে সরকার ও প্রশাসন নিজ আকীদা-বিশ্বাস সংরক্ষণ করতে বাধ্য হয়। আর এ কারণেই প্রশাসন বিরোধীদেরকে অতি নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়। উৎপীড়ন ও চাপের কারণে বেশ কিছুসংখ্যক বিরোধী ইরান সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এ সব বিরোধীই মুসলিম সেনাবাহিনীর সম্মুখে রণক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং মনে-প্রাণে মুসলিম সেনাবাহিনীকে বরণ করে নিয়েছিল।

তদানীন্তন রোমান সাম্রাজ্য ঠিক মধ্যযুগীয় ইউরোপের মতো ছিল। প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ফ্লামারীয়োন মধ্যযুগে ইউরোপীয় কৃষ্টির পর্যায় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত কাহিনীটি বর্ণনা করেছেন : আধ্যাত্মিক সমগ্র’নামক গ্রন্থটি মধ্যযুগে স্কলাসটিক দর্শনের পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ও নিদর্শন বলে গণ্য হতো। এ গ্রন্থটি চারশ’বছর ধরে আনুষ্ঠানিক পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ইউরোপে পঠিত হতো। উক্ত গ্রন্থের একটি অংশে এ শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে : একটি সুঁইয়ের অগ্রভাগের সরু ছিদ্রের মধ্যে কত জন ফেরেশতার অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব?’‘ চিরন্তন পিতার বাম চোখের পুতুলী থেকে তাঁর ডান চোখের পুতুলী পর্যন্ত দূরত্ব কত ফারসাখ? (1 ফারসাখ = প্রায় 6 কিলোমিটার)

দুর্ভাগ্যপীড়িত রোমান সাম্রাজ্য বহিঃশক্তিগুলোর সাথে যুদ্ধে-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়ার একই সময় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিল। এ সব দ্বন্দ্ব-সংঘাত ধর্মীয় রূপ পরিগ্রহ করেছিল। আর এর ফলে দিন দিন দেশটি পতনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। ইয়াহুদিগণ যারা ছিল একটি ষড়যন্ত্রকারী জাতি,তারা যখন দেখল,রোমের খ্রিষ্টান সম্রাট কর্তৃক আরোপিত চাপ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে তখন তারা রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস ও এর মূলোৎপাটন করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা একবার আনতাকীয়া নগরীও দখল করে নিয়েছিল এবং নগরীর প্রধান ধর্মযাজকের কান,নাক ও ঠোঁট কর্তন করেছিল। রোম সরকার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আনতাকীয়ার ইয়াহুদীদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। রোমে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কয়েকবার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। আবার কখনো কখনো এ শত্রুতা দেশের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিল। উদাহরণস্বরূপ ইয়াহুদীরা একবার ইরান থেকে 80,000 খ্রিষ্টানকে ক্রয় করে দুম্বার মতো জবাই করেছিল।

এখানেই সম্মানিত পাঠকবর্গ ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের সমসাময়িক বিশ্বের অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অরাজক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করতে এবং স্বীকার করতে পারবেন যে,ইসলামের মুক্তিদানকারী শিক্ষা-দীক্ষা ও বিধি-বিধান ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে সৃষ্ট হয় নি এবং তা মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তাধারারও ফসল নয়। ঐক্য ও সহমর্মিতার মৃদুমন্দ এ সমীরণ এবং শান্তি ও মৈত্রীর সুর যা পবিত্র ইসলাম ধর্মের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা আসলে ঐশ্বরিক উৎস থেকেই উৎসারিত হয়েছে। কিভাবে বলা সম্ভব যে,যে ইসলাম ধর্ম জীবজন্তু ও প্রাণীকুলকে পর্যন্ত জীবনধারণ করার অধিকার দিয়েছে আসলে তা এ ধরনের রক্তপিপাসু পরিবেশ থেকে উদ্ভূত?

ইসলাম ধর্ম হযরত ঈসা (আ.)-এর ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে ভিত্তিহীন এ সব আলোচনার অবসান ঘটিয়েছে এবং ঈসা (আ.)-কে ঠিক এভাবে পরিচিত করিয়েছে :

) ما المسيح بن مريم إلّا رسول قد خلت من قبله الرّسل و أمّه صدّيقة كانا يأكلان الطّعام(

“মরিয়ম তনয় মসীহ্ একজন নবীর চেয়ে বেশি কিছু নন যাঁর আগে অনেক নবী-রাসূল গত হয়েছেন। তাঁর মাতা ছিলেন একজন পূতঃপবিত্রা পরম সত্যবাদিনী। এমতাবস্থায় তাঁরা উভয়ই খাদ্য গ্রহণ করতেন এবং মানুষ ছিলেন।” (সূরা মায়েদাহ্ : 75)

পবিত্র কোরআনের এ আয়াত হযরত ঈসা (আ.)-এর আত্মা,রক্ত ও পরিচিতি সংক্রান্ত গীর্জার ধর্মযাজকদের অনর্থক আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে। এ ধর্মের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ এবং মহৎ মানবীয় গুণাবলী পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে মানব জাতিকে অযথা যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত থেকে বিরত রেখেছে।


6

7

8

9

10