আল হাসানাইন (আ.)

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন শাসনের একটি চিত্র

0 বিভিন্ন মতামত 00.0 / 5

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশ-২১

 

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন শাসনের একটি চিত্র

 

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের সুসংবাদ দানকারী স্পষ্ট আয়াত ও রেওয়ায়েতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ঐশ্বরিক দায়িত্ব অত্যন্ত মহান এবং বিবিধ দিক, সুমহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যমণ্ডিত হবে। স্বয়ং এ বিষয়টিই হচ্ছে এমন এক সুমহান পদক্ষেপ যা পৃথিবীর বুকে মানুষের জীবনকে সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দেবে এবং মানব জাতির সামনে সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনা করবে।

এমনকি যদি তাঁর দায়িত্ব কেবল নতুনভাবে ইসলামের পুরুজ্জীবন ও পুনর্জাগরণ, ন্যায়ভিত্তিক ও ঐশ্বরিক সভ্যতা প্রতিষ্ঠা এবং পার্থিব জগতকে আলোকোজ্জ্বল করার সাথেই সংশ্লিষ্ট হয় তাহলে সেটাই হবে যথেষ্ট। তবে এতকিছু সত্ত্বেও তিনি তাঁর যুগে এবং এর পরে বস্তুগত দৃষ্টিকোণ থেকে মানব জীবনের উন্নতি ও পূর্ণতা এমনভাবে নিশ্চিত করবেন যে, যা এর পূর্ববর্তী পর্যায়গুলো উন্নত হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোর সাথে অতুলনীয় হবে।

আর অস্তিত্বের গভীরতা এবং ঊর্ধ্বলোক ও এর বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছানো ও প্রবেশাধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করার মিশন যা কিয়ামত ও পারলৌকিক জীবন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে গায়েবী অজড় জগৎ এবং দৃশ্যমান এ পার্থিব জগতের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ঐক্য ক্রিয়াশীল রাখার ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী ভূমিকা পালন করবে।

আমরা এখন এ গ্রন্থের কলেবর অনুসারে এ দায়িত্ব বা মিশনের বিভিন্ন দিক ও পর্যায়ের একটি খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরব।

অন্যায়-অত্যাচার ও জালিমদের থেকে পৃথিবীকে পবিত্র করা

প্রথম দর্শনে এমনটা মনে হতে পারে যে, জুলুম, তাগুতী শক্তিবর্গ এবং অত্যাচারীদের অস্তিত্ব মিটিয়ে দেয়া আসলে একটি অসম্ভব বিষয়। আর এ পৃথিবী যেন মজলুমদের আর্তনাদ ও ক্রন্দন ধ্বনিতে ভরে গেছে এবং এগুলোর সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যেন কোন ত্রাণকর্তা নেই। বিশ্ব যেন অত্যাচারীদের অশুভ অস্তিত্ব মেনে নিয়েছে। অবস্থা এতটাই সঙ্গিন যে, ইতিহাসে এমন কোন অধ্যায় বা যুগ আমাদের জানা নেই যা জালিমদের থেকে মুক্ত থেকেছে। কারণ, এসব জালিম আগাছা-পরগাছা ও অপবিত্র উদ্ভিদের ন্যায় সমাজের অভ্যন্তরে এমন সুদৃঢ় মূল বিস্তার করেছে যার একটিকে উপড়ে ফেলা হলে তার জায়গায় দশগুণ আগাছা-পরগাছা জন্মায়। আর কোন এক প্রজন্মে জালেমরা ধবংস হয়ে গেলেও অন্য প্রজন্মসমূহে দলে-দলে জালেম জন্ম লাভ করে।

কিন্তু মহান প্রজ্ঞাময় আল্লাহ্ এতেই কল্যাণ নিহিত রেখেছেন যে, মানবজীবন সত্য-মিথ্যা এবং ভালো ও মন্দের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ভিত্তিতে বিকাশ লাভ করবে। তিনি প্রতিটি পদার্থের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা, প্রতিটি সময় ও কালের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভাগ্য এবং পরিশেষে সকল অন্যায়-অবিচারের জন্যও তিনি একটি পরিণতি নির্ধারণ করেছেন।

“সেদিন অসৎকর্মশীল ব্যক্তিরা নিজেদের চেহারা ও মুখ-মণ্ডলের দ্বারা চি‎ি‎হ্নত হবে। অতঃপর...”

পবিত্র কোরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে :

“মহান আল্লাহ্ তাদেরকে সব সময় চেনেন। তবে উপরিউক্ত আয়াতটি আল কায়েম আল মাহ্দীর শানে অবতীর্ণ হয়েছে। সে পাপীদেরকে তাদের চেহারা ও মুখ-মণ্ডলের দ্বারা চিনবে এবং সে ও তার সাথীরা তরবারি দিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেয়ার মতো শাস্তি দেবে।”১

আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) বলেছেন : “মহান আল্লাহ্ আমাদের (আহলে বাইতের) মধ্য থেকে এক ব্যক্তির মাধ্যমে অকস্মাৎ (মুসলিম উম্মাহর জন্য) এক মহামুক্তির ব্যবস্থা করে দেবেন। আমার পিতা সর্বশ্রেষ্ঠা দাসীর সন্তানের (ইমাম মাহ্দী) জন্য কোরবান হোন...। দীর্ঘ আট মাসে শত্রুরা তার কাছ থেকে তরবারি ও হত্যাকাণ্ড ব্যতীত আর কিছুই পাবে না।”২

ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : “মহানবী (সা.) নিজ উম্মতের সাথে অত্যন্ত কোমল আচরণ প্রদর্শন করতেন এবং তিনি জনগণকে অন্তরঙ্গভাবে গ্রহণ করতেন। আর আল কায়েম আল মাহ্দী শত্রুদেরকে হত্যা করবে এবং কারো তাওবা সে গ্রহণ করবে না। তার সাথে সার্বক্ষণিক যে অঙ্গীকারপত্র আছে সে তার দ্বারাই এ কাজ করতে আদিষ্ট হয়েছে। ঐ ব্যক্তির জন্য আক্ষেপ যে তার সাথে শত্রুতা পোষণ করবে।”৩

‘যে অঙ্গীকারপত্রটি তার সাথে আছে’ সেটা হচ্ছে ঐ প্রসিদ্ধ অঙ্গীকারপত্র যা তিনি তাঁর প্রপিতামহ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাছ থেকে পেয়েছেন। রেওয়ায়েতসমূহের ভিত্তিতে ঐ অঙ্গীকারপত্রে এ বাক্যটিও বিদ্যমান : “হত্যা কর, আবারও হত্যা কর এবং কারো তাওবা গ্রহণ করবে না।”

ইমাম বাকির (আ.) আরো বলেছেন :  “তবে প্রপিতামহ মহানবী (সা.)-এর সাথে মাহ্দী (আ.)-এর সাদৃশ্য হলো সেও তরবারি সহকারে আবির্ভূত হবে এবং তার অভ্যুত্থানেরও লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের শত্রু এবং অত্যাচারী-তাগুতীদেরকে হত্যা করা। সে তরবারির দ্বারা শত্রুদের অন্তরে ভয়-ভীতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে বিজয়ী হবে এবং তার সেনাবাহিনী পরাজিত হবে না।”৪

ইমাম জাওয়াদ (আ.) বলেছেন : “মহান আল্লাহ্ সন্তুষ্ট হওয়া পর্যন্ত সে বিরামহীনভাবে মহান আল্লাহর শত্রুদেরকে হত্যা করতেই থাকবে। যখন সে তার অন্তরে দয়া ও করুণা অনুভব করবে তখনই সে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি সম্পর্কে অবগত হবে।”৫

এই একই হাদীসগ্রন্থে ইমাম জাওয়াদ (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “যখন তার সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা পর্যাপ্ত সংখ্যক অর্থাৎ দশ হাজার হবে তখন সে মহান আল্লাহর নির্দেশে আবির্ভূত হবে এবং মহান আল্লাহ্ এ ব্যাপারে পূর্ণ সন্তুষ্টি প্রকাশ না করা পর্যন্ত সে বিরামহীনভাবে খোদার শত্রুদেরকে হত্যা করতে থাকবে।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম : “তিনি কিভাবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির ব্যাপারে অবগত হবেন?” তিনি বলেছিলেন : “মহান আল্লাহ্ তখন তাঁর অন্তরে দয়া ও করুণার উদ্রেক করবেন।”

বরং রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কতিপয় সাহাবী তাঁর হাতে জালিমদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের কারণে তাঁর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করবে এবং তাঁর কাছে প্রতিবাদও জানাবে।

ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “যখন সে সালাবীয়ায় পৌঁছবে তখন তারই এক আত্মীয যে ইমাম মাহ্দী ব্যতীত জনগণের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ও শক্তিশালী হবে সে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করবে : হে অমুক! আপনি কি করছেন? মহান আল্লাহর শপথ, আপনি জনগণকে আপনার সামনে থেকে ছাগল-ভেড়ার মতো তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন যেমনভাবে রাখাল অথবা নেকড়ে দুম্বা-ভেড়ার পালকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে কি আপনার প্রতি কোন অঙ্গীকার পত্র বা অন্য কিছু আছে? এ সময় যে ব্যক্তি ইমাম মাহ্দীর পক্ষ থেকে জনগণের বাইআত গ্রহণ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকবে সে বলবে : চুপ কর! নইলে আমি তোমার গর্দান উড়িয়ে দেব। তখন আল কায়েম আল মাহ্দী (আ.) বলবে : হে অমুক! চুপ কর। হ্যাঁ, মহান আল্লাহর শপথ, আমার সাথে মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে একটি সনদ আছে। হে অমুক! ছোট সিন্দুকটি নিয়ে আস। ঐ ব্যক্তি তাঁর কাছে সিন্দুকটি নিয়ে আসবে। ইমাম মাহ্দী তখন মহানবীর সনদটি পাঠ করবে। ইত্যবসরে ঐ প্রতিবাদকারী লোকটি বলবে : আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত হই; অনুমতি দিলে আমি আপনার মাথায় চুম্বন করব। ইমাম মাহদী তখন তার পবিত্র মস্তক সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দেবে এবং ঐ ব্যক্তি তার দু’চোখের মাঝখানে চুম্বন করবে। সে আবারও বলবে : মহান আল্লাহ্ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করে দিন। আপনি আবারও আমাদের বাইআত নবায়ন করুন। আর ইমাম মাহ্দীও তাদের বাইয়াত নবায়ন করবে।”৬

নিঃসন্দেহে বেশ কিছু প্রমাণ অথবা এমন একটি নিদর্শন থাকবে যেগুলো বা যার মাধ্যমে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সঙ্গীরা অনুধাবন করতে পারবে যে, ঐ অঙ্গীকারপত্রটি মহানবী (সা.)-এর। তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে বাইয়াত নবায়ন করার জন্য তাদের পুনঃ আবেদন এ কারণে হবে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে (অর্থাৎ ব্যাপক রক্তপাত ও হত্যার ব্যাপারে) তাদের আপত্তি এক প্রকার বাইয়াত ভঙ্গকরণ বলে বিবেচিত হবে।

কতিপয় ব্যক্তি ইমাম মাহদী (আ.) কর্তৃক অত্যাচারীদেরকে হত্যা, ধ্বংস ও শাস্তিদানের বিষয়টি পাষণ্ডতা এবং হত্যাকাণ্যের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি বলে গণ্য করতে পারে । কিন্তু এ কাজ বাস্তবে একটি শল্য সিকিৎসা সদৃশ যা বিদ্রোহী ও অত্যাচারীদের অপবিত্র অস্তিত্ব থেকে মুসলিম সমাজ এবং বিশ্বের অন্য সব সমাজকে পবিত্র করার জন্য আবশ্যক । এটি ছাড়া কখনোই অন্যায় অত্যাচারের পরিসমাপ্তি হবে না এবং ন্যায় পরায়ণতা কর্তৃত্বশীল হবে না । যদি ইমাম মাহদী (আ.) তাদের সাতে কোমল আচরণ করেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন তাহলে কখনোই উদ্ধত সাম্রাজ্যবাদী চক্রের নতুন নতুন ষড়যন্ত্র ও প্রচারণা বন্ধ হবে না । উল্লেখ্য যে এ সব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির  জীবন আসলে এ সব ষড়যন্ত্র ও প্রচারণার উপরই নির্ভরশীল । কারণ, বর্তমান সমাজসমূহে অত্যাচারীরা একটি গাছের শুকনো ডালপালার মতো বরং তারা হচ্ছে  ক্যন্সারসদৃশ যা কষ্টকর হওয়া সত্বেও রোগীর প্রাণ রক্ষার জন্য অবশ্যই কেটে ফেলা উচিত ।

অবশ্য এ ধরণের নীতি-আবস্থানের ক্ষেত্রে যা সন্দেহ পোষণকারীদের চিত্ত প্রশান্ত করে তা হচ্ছে, ইমাম মাহদীর সাথে মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রদত্ত একটি বিখ্যাত অঙ্গীকারপত্র আছে । মহান আল্লাহ তাকে জনগণ ও তাদের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞান দান করবেন । তিনি মহান আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের আলোকে যে কোন লোকের দিকে তাকানো মাত্রই তাকে চিনে ফেলবেন এবং তার রোগের প্রতিষেধক সম্পর্কেও জ্ঞাত থাকবেন । সুতরাং ভয়ের কোন কারণ নেই যে, যে সব ব্যক্তির সুপথপ্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকবে তারা ইমাম মাহদীর হাতে নিহত হবে না । এ বিষয়টি যেন হযরত খিজির (আ.) ও হযরত মূসা (আ.)-এর কাহিনীতে হযরত খিজিরের হাতে শিশুটির নিহত হওয়ার মতোই । এ কাহিনীতে বর্ণিত হয়েচে যে, যাতে ঐ ছেলে বড় হয়ে পিতা-মাতাকে খোদাদ্রোহিতা ও কুফরীর পথে নিয়ে না যায় সেজন্য তিনি ছেলেটিকে হত্যা করেছিলেন । বরং রেওয়ায়েতসমূহ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, খিযির (আ.) ইমাম মাহদী (আ.) এর সাথে আবির্ভূত ও তার সঙ্গীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন ।বাহ্যত পরিদৃষ্ট হয় যে, খিযির (আ.) কল্যাণের বিকাশ এবং মুমিনদের থেকে অকল্যাণসমূহ দূর করা এবং এক শক্তিশালী অপবিত্র মহীরুহে পরিণত হবার আগেই ফিতনা-ফ্যাসাদ ও দুর্নীতির বীজ ধ্বংস করার ব্যাপারে মহান আল্লাহ প্রদত্ত ইলমে লাদুনী (আধ্যাত্মিক দিব্যজ্ঞান) ব্যবহার করবেন : “আমরা আমাদের পক্ষ থেকে দয়া প্রদর্শন করেছিলাম এবং আমাদের পক্ষ থেকে (দিব্য) জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলাম ।৭

শক্তিশালী সম্ভাবনার ভিত্তিতে বলা যায় যে, ইমাম মাহদী (আ.)-এর সরকার ও প্রশাসনে হযরত খিযির (আ.) ও তার সঙ্গীদের প্রকাশ্য ভূমিকা থাকবে । জনগণের ওপর এ সব মহান ব্যক্তির বেলায়েতের হক এবং ইমাম মাহদীর বিশ্ব-প্রশাসনে বাহ্যিক আইন কানুন এবং অবস্থা লঙ্ঘন করার অধিকার তাদের থাকবে । রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহদী (আ.) মহান আল্লাহর প্রকৃত বিধান অনুসারে জনগণের মাঝে বিচার কাজ সম্পন্ন করবেন । উল্লেখ্য যে, , মহান আল্লাহই ইমাম মাহদীকে প্রকৃত বিচার করার ক্ষমাত প্রদান করবেন । এ কারণেই তিনি কারো কাছে সাক্ষী অথবা দলিল-প্রমাণ চাইবেন না । তিনি অত্যাচারী ও ফিতনা সৃষ্টিকারীদেরকে নির্মূল করার ক্ষেত্রে তার খোদাপ্রদত্ত আধ্যাত্মিক ও প্রকৃত জ্ঞান প্রয়োগ করবেন । কখনো কখনো তার সঙ্গীরাও জনগণের সাঝে বিচার-ফয়সালা এবং অপরাধীদের ধ্বংস করার ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি বেছে নেবেন । কিন্তু অন্য সব ক্ষেত্রে তারা জনগণের সাথে তাদের প্রকাশ্য অবস্থার ভিত্তিতে আচরণ করবেন । তবে হযরত খিযির (আ.) ও তার সঙ্গীরাই ঐ সব বিশেষ যোগ্রতার অধিকারী হবেন ।

 

ইসলামের পুর্জাগরণ এবং ধর্মের সর্বজনীনতা

“তিনিই সেই আল্লাহ যিনি তার রাসূলকে সত্য ধর্ম এবং মানুষকে পথ প্রদর্শন করার জন্য প্রেরণ করেছেন যাতে তা সব ধর্মের ওপর জয়যুক্ত ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।”৮ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) বলেছেন : “মহান আল্লাহ কি এখন পর্যন্ত এ আয়াতের বাস্তব নমুনা প্রকাশ করেছেন? না, ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, এমন কোন জনপদ পৃথিবীর বুকে থাকবে না  যেখানে সকাল-সন্ধায় মহান আল্লাহর একত্ব এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করা হবে না ।৯

ইবনে আব্বাস বলেছেন : “ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ব্যতীত কোন ইহুদী, নাসারা অথবা অন্য ধর্মের অনুসারী থাকবে না । অবশেষে জিযিয়া কর (যিম্মী বিধর্মী কর্তৃক প্রদত্ত বিশেষ কর যার বিনিময়ে ইসলামী প্রশাসন তাদেরকে মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাস, নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের স্বাধীনতা প্রতান করে) উঠিয়ে দেয়া হবে, ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলা হবে এবং শুকুর হত্যা করা হবে । এটিই হবে নিম্নোক্ত আয়াতের বাস্তব নমুনা : ‘যাতে তিনি ইসলাম ধর্মকে সব ধর্মের ওপর বিজয়ী এবং শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেন যদিও কাফেররা তা পছন্দ করে না ।’ আর এ ঘটনা হযরত কায়েম আল মাহদীর হাতে বাস্তবায়িত হবে ।”১০

‘জিযিয়া কর উঠিযে নেয়া হবে’ (বিলুপ্ত করা হবে)-এ বাক্যের অর্থ হচ্ছে, আহলে কিতাবের কাছ থেকে ইসলাম ব্যাতীত আর কিছুই গ্রহণ করা হবে না ।

আবু বসীর বলেছেন : “নিম্নোক্ত এ আয়াত প্রসঙ্গে ইমাম সাদিক (আ.)-এর কাছে প্রশ্ন করলাম : ‘তিনিই সেই আল্লাহ যিনি রাসূলকে সত্য ধর্মসহ মানব জাতিকে হিদায়াত করার জন্য প্রেরণ করেছেন যাতে তিনি ইসলাম ধর্মকে সব ধর্মের ওপর জয়যুক্ত করেন যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে’ । ইমাম বললেন : মহান আল্লাহর শপথ, এ আয়াতের ব্যাখ্যা এখনো বাস্তবায়িত হয় নি । আমি জিজ্ঞাসা করলাম : আপনার জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গীকৃত হোক । এটি কখন বাস্তবায়িত হবে ? তিনি বললেন :যখন মাহন আল্লাহর ইচ্ছায় আল কায়েম আল মাহদী আবির্ভূত হবে ও সংগ্রাম করবে ।যখন সে আবির্ভূত হবে তখন কাফির ও মুশরিকরা তার আবির্ভাব, আন্দোলন ও সংগ্রামের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়বে ; কারণ, কোন পাথরের পিছনে যদি কোন কাফির বা মুশরিক লুকায় তাহলে ঐ পাথর সবাক হয়ে বলবে : হে মুসলমান! আমার আশ্যয়ে কাফির বা মুশরিক লুটিয়ে আছে; তাকে হত্যা কর । আর সেও তখন তাকে হত্যা করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবে ।১১

ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : “(শত্রুর অন্তরে) ভয়-ভীতিবোধের উদ্ভব হবার ফলে আল কায়েম আল মাহদী বিজয়ী হবে । সে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য পাবে ও সমর্থিত হবে । দেশ-দেশান্তর অতিক্রম করে তার কাছে লোকজন ছুটে আসবে । তার জন্য মাটির নিচে প্রেথিত গুপ্তধন বের হয়ে আসবে । তার রাজত্ব ও কর্তৃত্ব সমগ্র প্রাচ্য০পাশ্চাত্যকে শামিল করবে । মহান আল্লাহ তার ধর্মকে তার মাধ্যমে বিশ্বের সব ধর্ম ও মতাদর্শের ওপর বিজয়ী করবেন যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ ও এর বিরোধীতা করবে । সে প্রথিবীর বুকে বিধ্বস্ত ও বিরাণ হয়ে যাওয়া জনপদ ও অঞ্চলসশূহ আবাদ করবে । তখন ঈসা রুহুল্লাহ পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং তিনি তার পেছনে নামায পড়বেন ।” ১২

ইমাম বাকির (আ.) উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন : “সেদিন মহানবী (সা.) এর রিসালাত মেনে নেয়া ও তা স্বীকার করা ব্যতীত (ধরাণির বুকে) কোন ব্যক্তিই থাকবে না ।”১৩

ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন ;“আমার পিতাকে (ইমাম বাকির)‘তোমরা সকল মুশরিকের বিরুদ্ধে তেমনিভাবে যুদ্ধ করবে যেমনভা্বে তারা সবাই তার বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিল যাতে পৃথিবীতে ফিতনা না থাকে এবং ধর্ম পরিপূর্ণরূপে মহান আল্লাহর হয়ে যায়’- এ আয়াত প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল । তিনি বলেছিলেন ; এখনোও এ আয়াতের তাফসীররের সময়কাল উপস্থিত হয়নি ।যখন আল কায়েম আল মাহদী আবির্ভূত হবে ও বিপ্লব করবে তখন যারা তাকে পাবে তারা নিজেরাই এ আয়াতের ব্যাখ্যা-প্রক্রিয়াকে প্রত্যক্ষ করবে ।যেমনভাবে মহান আল্লাহ বলেছেন তেমনি অবশেষে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ধর্ম তিমির রাত্রি শেষে সত্য প্রভাতের (সূবহে সাদিকের) মতো আলোকোজ্জ্বল হয়ে যাবে এবং পৃথিবীর বুকে তখন শিরকের কোন চিহ্নই থাকবে না ।”১৪

একইভাবে এটি বিশ্ববাসীর জন্য স্মরণ ব্যাতীত আর টিছুই নয় এবং নিঃসন্দেহে ঐ সময়ের পরে এর সংবাদ সম্পর্কে তারা অবগত হবে ।’-এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : “এটি আল কায়েম আল মাহদীর আবির্ভাবকালে সংঘটিত হবে ।”১৫

‘অতি সত্বর আমরা তাদের কাছে আমাদের নিদর্শনসমূহ আকাশে এবং যমীনে স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করব যাতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তিনিই সত্য ।’১৬ –এ আয়াতের ব্যাখ্যায়ও ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “মহান আল্লাহর (বানর ও শুকরের আকৃতিতে) তাদের রূপান্তর হয়ে যাবার বিষয়টি স্বয়ং তাদেরকেই দেখবেন এবং দিগন্তে আকাশের কিদচক্রবাল রেখাসমূহের দেবে যাওয়া এবং তাদের শহর এবং নগরসমূহের অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা প্রত্যক্ষ করাবেন । আর তারাও নিজেদের মাঝে এবং সমগ্র বিশ্বজুড়ে মহান আল্লাহর মহিমা ও শক্তি অনুভব করবে এবং যাতে তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তিনিই সত্য ।-এআয়াতের প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য হচ্ছে আল কায়েম আল মাহদীর আবির্ভাব ও অভ্যুত্থান যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হবে বাস্তব ঘটনা; আর সমগ্র মানব জাতি অগত্যা তা প্রত্যক্ষ করবেই ।১৭

কতিপয় রেওয়াওয়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, কতিপয় কাফের, মুনাফিক এবং ইমাম মাহদী (আ.) এর বিরোধী হটাৎ করে বানর ও শুকরের আকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে । ‘দিগন্তের ভেঙ্গে পড়া’র অর্থ হচ্ছে শহর ও নগরসমূহে বিশৃঙ্খলা, গোলযোগ, অস্থিরতা ও বিদ্রোহ এবং আধিপত্য বিস্তারকারী শাসকবর্গের আধিপত্য থেকে জাতিসমূহের মুক্ত হওয়া এবং ‘আকাশের দিকচক্রবাল রেখার ভেঙ্গে পড়া’র অর্থ হচ্ছে তাদের জন্য নিদর্শনসমূহ প্রকাশিত হওয়া ।

‘আকাশসমূহ ও যমীনে সবাই ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক তার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে’-এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বাকির (আ.)বলেছেন : “উপরিউক্ত আয়াত আল কায়েম আল মাহদীর শানে অবতির্ণ হয়েছে । যখন সে আবির্ভূত হবে তখন বিশ্বের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ইহুদী, খ্রিষ্টান, তারকা পূজারী, বেদীন, মুরতাদ এবং কাফিরদের কাছে ইসলাম ধর্মকে উপস্থাপন করবে; তাই যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করবে তাকে তিনি নামায, যাকাত এবং যে সব বিধান মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব সেগুলো পালন করতে বাধ্য করবেন । আর যে ইসলাম ধর্ম পালন করতে সম্মত হবে না তাকে তিনি হত্যা করবেন । এভাবে সমগ্র বিশ্বে কেবল একত্ববাদী ব্যতীত আর কোন ধর্মাবলম্বী থাকবে না । আমি বললাম : আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত হই । কাফির ও বেদীনদের সংখ্যাই তো বেশী । তখন তিনি বলেছিলেন : অবশ্য যখন মহান আল্লাহ কোন কাজ করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি অগণিতকে নগণ্য করে দেন ।”১৮

তবে এতদপ্রসঙ্গে শিয়া ও সুন্নী সূত্রসমূহে বর্ণিত নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত হচ্ছে এটিই যে, ইমাম মাহদী (আ.)- এর কুনিয়াহ হচ্ছে আবুল কাসিম যা মহানবী (সা.)-এর কুনিয়াহ । মহানবী (সা.) বলেছেন : “মাহদী আমার বংশধারার অন্তর্ভুক্ত এবং ফাতিমার একজন বংশধর হবে । আমি যেভাবে ওহীর ভিত্তিতে সংগ্রাম করেছি তদ্রূপ সে আমার পথ ও পদ্ধতির ভিত্তিতে সংগ্রাম করবে ।”১৯

আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েচে : “যেভাবে আমি ইসলাম ধর্মের সূচনালগ্নে এ ধর্মসহ উত্তিত হয়েছি ও আন্দোলন করেছি তদ্রূপ সে সর্বশেষ যুগে ইসলাম ধর্মসহ উত্থিত হবে (বিপ্লব করবে)।”২০

একইভাবে তিনি বলেছেন : “বিশ্বে কেবল ইসলামের শাসনকর্তৃত্ব ছাড়া আর কিছুই থাকবে না । তখন পৃথিবী রূপালী ফলকের মতো আলোকোজ্জ্বল হয়ে যাবে ।”২১

অর্থাৎ পৃথিবী কুফর ও নিফাক থেকে পবিত্র হয়ে খাঁটি রূপার টুকরার মতো উজ্জ্বল ও সুশোভিত বেশ ধারণ করবে ।

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : “অন্যেরা যখন পবিত্র কোরআনকে নিজেদের ধ্যান-ধারণা, অভিরুচি ও বিশ্বাসের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় (অর্থাৎ নিজেদের অভিরুচির ভিত্তিতে অপব্যাখ্যা করবে) তখন সে পবিত্র কোরআন থেকে তার আকীদা-বিশ্বাস গ্রহণ করবে । সে বিশ্ববাসীকে ন্যায়প্রক্রিয়া কিভাবে অবলম্বন করতে হয় তা বাস্তবে দেখাবে এবং কিতাবে (কোরআন) ও সুন্নাহ যাকে পরিত্যাগ ও কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে তা পুনরুজ্জীবিত করবে ।”২২

ইমাম মাহদী (আ.) পবিত্র কোরআনের অনুসরণ করবেন এবং বিচ্যুতদের মতো এ গ্রন্থের ব্যাখ্যা বিকৃত করবেন না ।

ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোমাদের ধর্ম (ইসলাম) পলায়নরত রক্তে রঞ্জিত কাতর পাখির মতো, আমাদের আহলে বাইতের এক ব্যক্তি ব্যতীত কেউ তা তোমাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবে না ।তখন সে তোমাদেরকে বছরে দু’বার পুর্স্কার এবং মাসে দু’টি জীবিকা প্রদান করবে । তোমরা তার সময় এমনভাবে প্রজ্ঞা অর্জন করবে যে, মহিলারা নিজ নিজ ঘরে মহান আল্লাহর কিতাব এবং মহানবী (সা.)- এর সুন্নাহর ভিত্তিতে বিচার করবে ।”২৩

যেহেতু ইমাম বলেছেন ‘রক্তে রঞ্জিত কাতর পাখির মতো’ সেহেতু ইসলামের অবস্থা সংক্রান্ত একটি সূক্ষ্ণ উপমাস্বরূপ । ইসলাম হচ্ছে একটি আহত পাখির মতো যা পাখা মেলে ধরে এবং মুসলমানদেরকে ইসলামের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে । আর এ প্রক্রিয়া ঐ সময় পর্যন্ত চলতে থাকবে যখন মাহদী (আ.) এ ধর্মকে মুক্তি দেবেন, পুনরুজ্জীবিত করবেন এবং মুসলমানদের কাছে আবার ফিরিয়ে আনবেন । সে তোমাদেরকে বছরে দু’বার পুরস্কার এবং মাসে দু’টি জীবিকা প্রদান করবে’-এ বাক্যের অর্থ হচ্ছে বাইতুলমাল থেকে প্রতি ছয় মাস অন্তর একটি আর্থিক পুরস্কার এবং প্রতি দু’সপ্তাহ অন্তর খাদ্য-সামগ্রী এবং ভোজ্যদ্রব্য বন্টন করা হবে ।

ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “ইসলাম ধর্ম শ্রীহীন ও হীন হওয়ার পর মহান আল্লাহ এ ধর্মকে তার মাধ্যমে সম্মান প্রদান করবেন, পরিত্যাক্ত ও অপাঙক্তেয় থাকার পর এ ধর্মকে পুনরায় জীবিত করবেন, জিযিয়হ পুনঃপ্রত্যাবর্তন করবেন এবং তরবারি দিয়ে কাফির ও প্রত্যাখ্যানকারীদেরকে তার পথে আহবান করবেন; আর যে এর বিরোধিতা করবে সে নিহত হবে; আর যে তার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে সে-ই অপদস্ত হবে ।২৪

তিনি আরো বলেছেন : “মহান আল্লাহ তার মাধ্যমে সব ধরনের বিদআত দূরীভূত করবেন, প্রতিটি পথভ্রষ্টতাকে মিটিয়ে দেবেন এবং প্রতিটি সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করবেন ।”২৫

ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন :“পৃথিবীর বুকে এমন কোন বিরাণ ভূমি থাকবে না যা আবাদ হবে না । একমাত্র মহান আল্লাহ ব্যতীত প্রতিমা, মূর্তি ইত্যাদির মতো আর কোন উপাস্য থাকবে না যা অগ্নিদগ্ধ হয়ে ধ্বংস হবে না ।”২৬

মানুষ যদি বিস্ময়বশত নিজেকেই প্রশ্ন করে, যে সব অমুসলিম জাতি পার্থিব জীবন যাপনে পূর্ণরূপে অভ্যস্ত, ঈমান এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ থেকে বহু দূরে এবং ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের ব্যাপারে কুধারণা পোষণ করে তাদের মাঝে ইমাম মাহদী (আ.) কিভাবে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটাবেন, তাহলে এটিই স্বাভাবিক । তবে অবশ্যই প্রভূত বিশ্বাসভিত্তিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কার্যককারণ যেগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি আমরা ইতোমধ্যে ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের আন্দোলনের অধ্যায়ে আলোচনা করেছি সেগুলোর দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত । এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বিশ্বের জাতিসমূহ পার্থিব ও ধর্মবর্জিত জীবনকে পরীক্ষা করে দেখেছে, এর স্বাদ নিয়েছে এবং নিজেদের সমুদয় অস্তিত্ব ও বোধ দিয়ে এ জীবনের শূন্যতা এবং মানুষের বিবেকবোধের কাছে সঠিক জবাব দেয়ার ক্ষেত্রে এর অপারগতা অনুভব করতে পেরেছে।

ঐসব কার্যকারণের মধ্যে এটিও অন্তর্ভুক্ত যে, পবিত্র ইসলাম ধর্ম আসলে স্বভাবজাত (ফিতরাত) ধর্ম । যদি অত্যাচারী শাসনকর্তারা এ ধর্মের আলো আলেম এবং সত্যিকার মুমিনদের মাধ্যমে জাতিসমূহের কাছে পৌছতে দেয় তাহলে তারা এ আলোর দিকে আকৃষ্ট হবে এবং দলে দলে ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করবে । আরেকটি বিষয় হচ্ছে এমন সব নিদর্শন ও অলৌকিক বিষয় সংঘটিত হওয়া যা ইমাম মাহদী (আ.) কর্তৃক বিশ্বের জাতিসমূহের জন্য বাস্তবায়িত হবে ।এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও স্পষ্ট বিষয় হবে আসমানী আহবান যা ইতোমধ্যে আমরা আলোচনা করেছি । যদিও অত্যাচারী শাসকদের ওপর এ সব মুজিযার কার্যকরী প্রভাব ক্ষণস্থায়ী ও দুর্বল অথবা তা জনগণের ওপর ফলহীন, তবে তাদের নিজ নিজ জাতির ওপর এ সব মুজিযা বিভিন্নভাবে কার্যকরী প্রভাব রাখে । সম্ভবত তাদের ওপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারকারী কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে ইমাম মাহদীর একের পর এক বিজয় । কারণ, পশ্চাত্যের জাতিসমূহ স্বভাবতই বিজয়ী শক্তিকে ভালবাসে এবং এগুলোর প্রশংসা করে , এমনকি যদি সেগুলো তাদের শত্রুও হয় । আরেকটি কারণ হযরত ঈসা (আ.) এর পৃথিবীতে অবতরণ এবং ঐ সব মুজিযা ও নিদর্শন যেগুলো মহান আল্লাহ তার শক্তিশালী হাতে পাশ্চাত্য জাতিসমূহ এবং পৃথিবীবাসী জন্য প্রকাশ করবেন । বরং বাহ্যত স্পষ্ট যে, হযরত ঈসা (আ.)-এর ভূমিকা ও তৎপরতা মূলত পাশ্চাত্যবাসীর মধ্যেই হবে । আর স্বভাবতই পাশ্চাত্য জাতিসমূহ এবং তাদের শাসকরা শুরুতে তার সামনে উপস্থিতির কারণে আনন্দিত হয়ে তার প্রতি ঈমান আনবে । কিন্তু যখনই তিনি ইমাম মাহদী (আ.) এবং ইসলাম ধর্মের ব্যাপারে তার ঝোক ও অনুরাগ ব্যক্ত করবেন তখনই পাশ্চাত্য সরকারসমূহ তার ব্যাপারে সন্দিহান ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়বে এবং সে সাথে তার প্রতি সর্বজনীন সমর্থন কমে যাবে । তবে পাশ্চাত্য জাতিসমূহের মধ্য থেকে তার বেশ কিছু সঙ্গী ও সমর্থক থাকবে যাদের মধ্যে এমন এক আদর্শিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধিত হবে যে, তারা তাদের নিজ নিজ দেশে গণ আন্দোলনের জোয়াড় বইয়ে দেবে । আর এ বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি ।

অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক দিক । ইমাম মাহদী (আ.) এর হাতে মুসলিম বিশ্বে জনকল্যাণের যাবতীয় উপায়-উপকরণ ও সুযোগ-সুবিধা যথার্থভাবে পরিবর্তিত ও বিকশিত হবে । রেওয়ায়ে ও হাদীসসমূহের বক্তব্য অনুযায়ী মুসলমানরা তার যুগে এত বেশী নেয়ামতের প্রাচুর্য লাভ করবে যে, পৃথিবী ও জাতিসমূহের ইতিহাসে তা হবে অভূতপূর্ব । এ বিপরীতে অমুসলিম দেশসমূহে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট দেখা দেবে । আর নিশ্চিতভাবে এ ধরণের পরিস্থিতি পাশ্চাত্য জাতিসমূহের ওপর ব্যাপক প্রভা বিস্তার করবে ।

 

বস্তুগত জীবনের ব্যাপক পরিবর্তন এবং জনকল্যাণের ব্যাপক বিকাশ

ইমাম মাহদী (আ.) সংক্রান্ত হাদীস ও রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে তার শাসনামলে অর্থনৈতিক কল্যাণ ও প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি ও বিকাশ ।

বিশেষ করে যখন আমরা জানি যে, এ সব রেওয়ায়েত ও হাদীস মহানবী (সা.)-এর যুগে এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানসমূহে আজ যে সব ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে সেগুলোর আগেই বর্ণিত হয়েছে । আর মানব জাতির পার্থিব জীবনকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, দৈনন্দিন, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক জীবনের অনেক ক্ষেত্রে এ সব পরিবর্তন অতীতের তুলনায় ভিন্ন । অধিকন্তু ইমাম মাহদী (আ.)-এর যুগে মানুষের পার্থিব জীবনের যে ধরণের কথা রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত হয়েছে তা আমাদের জানা আধুনিক যুগের জীবনের চেয়েও ব্যাপক । আর যা আমাদেরকে জনকল্যাণ ও সমৃদ্ধির ঐ পর্যায়ে নিয়ে যাবে তা হচ্ছে মানব জাতির স্বাভাবিক চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের পরিবর্তন ও বিকাশ ।

এখন আমরা এতৎসংক্রান্ত কতিপয় রেওয়ায়েত উল্লেখ করব :

 

ভূ-গর্ভস্থ সম্পদ উত্তোলন এবং জনগণের মাঝে তা বন্টন

এতৎসংক্রান্ত প্রচুর রেওয়ায়েত ও হাদীস বিদ্যমান ।যেমন এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতটি প্রণিধানযোগ্য। মহানবী (সা.) বলেছেন : “পৃথিবী তার জন্য এর সমুদয় সম্পদ ও ঐশ্বর্য্য বের করে দেবে এবং সে জনগণের মধ্যে অগণিত ধন-সম্পদ বণ্টন করবে।”২৭

আরেকটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে : “…সে ভূ-গর্ভ থেকে স্তম্ভের মতো স্বর্ণ উত্তোলন করবে।”২৮

আর এ রেওয়ায়েতটি শিয়া ও সুন্নী সূত্রসমূহে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে এবং তা অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কল্যাণ নির্দেশ করে। আর সে সাথে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর দানশীলতা ও মানব জাতির প্রতি তাঁর মমত্ববোধ এবং ভালোবাসাও এ রেওয়ায়েত থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : “যখন আহলে বাইতের আল কায়েম আবির্ভূত হবে এবং আন্দোলন করবে তখন সে যাবতীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে জনগণের মাঝে বণ্টন করবে এবং সর্বত্র ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। যে কেউ তার আনুগত্য করবে সে আসলে মহান আল্লাহরই আনুগত্য করবে এবং যে কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করবে সে আসলে মহান আল্লাহরই বিরুদ্ধাচরণ করবে। সে আনতাকিয়ার একটি গুহা থেকে তাওরাত ও অন্যান্য আসমানী গ্রন্থ বের করে আনবে এবং তাওরাতের বিধানের ভিত্তিতে ইহুদীদের মধ্যে, ইঞ্জিলের বিধান অনুযায়ী খ্রিস্টানদের মধ্যে, যূবুরের বিধানের ভিত্তিতে এ গ্রন্থের অনুসারীদের মধ্যে এবং পবিত্র কোরআনের আয়াতসমূহের ভিত্তিতে মুসলমানদের মধ্যে বিচার ফয়সালা করবে। পৃথিবীর অভ্যন্তর ও বাইরের যাবতীয় সম্পদ তার কাছে সঞ্চিত হবে। আর সে জনগণকে আহবান করবে : তোমরা সবাই যে জিনিসের জন্য আত্মীয়তা ও রক্ত-সম্পর্ক ছিন্ন করেছ, পরস্পরের রক্ত ঝরানো হালাল বলে গণ্য করেছ এবং হারামসমূহ আঞ্জাম দিয়েছ সে দিকে চলে এসো...। সে প্রত্যেক ব্যক্তিকে এতটা দেবে যে, এর পূর্বে সে কারো কাছ থেকে তা পায় নি। সে পৃথিবীকে যেমনভাবে তা অন্যায়-অবিচার, বৈষম্য ও অকল্যাণ দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে তেমনি ন্যায়বিচার দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেবে।”২৯

মুসলিম উম্মাহর নেয়ামতসমূহের অধিকারী হওয়া এবং সমগ্র পৃথিবীর আবাদ ও পুনর্গঠিত হওয়া

মহানবী (সা.) বলেছেন : “মাহ্দীর যুগে আমার উম্মত এমন নেয়ামত লাভ করবে যে, তারা পূর্বে কখনই তা লাভ করে নি। আকাশ থেকে তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং তখন পৃথিবীর বুকে সব ধরনের উদ্ভিদই জন্মাবে।”৩০

তিনি আরো বলেছেন যে, তাঁর উম্মত তাঁর (মাহ্দী) কাছে এমনভাবে আশ্রয় নেবে যেমনভাবে মক্ষীরাণীর কাছে মৌমাছিরা আশ্রয় নিয়ে থাকে। তিনি পৃথিবীকে যেভাবে তা অন্যায়-অবিচার ও বৈষম্য দিয়ে পূর্ণ হয়ে যাবে ঠিক সেভাবে ন্যায়বিচার দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন। আর সমগ্র মানব জাতি ঠিক তাদের আদি সমাজের মতো হয়ে যাবে। তিনি কোন ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগ্রত করবেন না এবং কোন রক্ত ঝরাবেন না (অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করবেন না)।”৩১

মনে হচ্ছে ‘ঠিক তাদের আদি সমাজের মতো’- এ বাক্যাংশের অর্থ হচ্ছে আদি মানব সমাজ যা এক অখণ্ড জাতি ছিল। মানব জাতি স্বভাবজাত প্রকৃতি ও নির্মলতার ভিত্তিতে জীবন যাপন করত এবং তাদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য ছিল না। আর এ বিষয়টি পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে : “মানব জাতি এক অখণ্ড জাতি ছিল।”৩২

এ বিষয়টি কতিপয় রেওয়ায়েত ও হাদীসের মতামতকে সমর্থন করে। কারণ, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর যুগে মানব সমাজ প্রথমে দারিদ্র্যমুক্ত ও অভাবমুক্ত একটি সমাজে পরিণত হবে। অতঃপর তখন তা মতভেদ, টানাপড়েন ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতবিহীন প্রেম-প্রীতি, সৌহার্দ্র্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সমাজে পরিণত হবে যেখানে বিচারকার্য ও বিচারালয়ের কোন প্রয়োজন হবে না। এর পরবর্তী পর্যায়ে ঐ সমাজ এমন এক সমাজে রূপান্তরিত হবে যেখানে অর্থ ও টাকা-পয়সা ছাড়াই সব ধরনের লেন-দেন সম্পন্ন হবে। জনগণ তখন মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় একে অপরের সেবা করবে এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র বংশধরগণের ওপর দরূদ ও সালাম প্রেরণ করে নিজেদের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করবে।

মহানবী (সা.) আরো বলেছেন : “আসমান ও যমীনের বাসিন্দারা তার প্রতি সন্তুষ্ট হবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করার ব্যাপার কার্পণ্য করবে না এবং যমীনেও উদ্ভিদ, বৃক্ষ ও তরুলতা জন্মানোর পথে কোন বাধা থাকবে না অর্থাৎ পৃথিবী বৃক্ষ, তরুলতা, ফুলে-ফলে ভরে যাবে। এর ফলে জীবিতরা আকাঙ্ক্ষা করতে থাকবে : হায় যদি এ সব নেয়ামত ভোগ করার জন্য মৃতরা জীবিত হতো।”৩৩

ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন : “মহান আল্লাহ্ তার মাধ্যমে নিজ ধর্মকে বিজয়ী করবেন যদিও কাফের-মুশরিকরা তা পছন্দ করবে না এবং পৃথিবীর সমস্ত বিধ্বস্ত ও বিরাণ এলাকা তার মাধ্যমে আবাদ হয়ে যাবে।”৩৪

ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : “মাহ্দী মানব জাতির প্রাণপ্রিয় নেতা এবং মহান আল্লাহ্ তার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত ফিতনার প্রজ্বলিত অগ্নি নিভিয়ে দেবেন।”৩৫

مدهامّتان এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : “পবিত্র মক্কা ও মদীনা খেজুর গাছের দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে যাবে।”৩৬

সাঈদ ইবনে জুবাইর থেকে বর্ণিত হয়েছে : “যে বছর আল কায়েম আল মাহ্দী আবির্ভূত হবেন এবং কিয়াম করবেন সে বছর চব্বিশ বার পৃথিবীর ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষিত হবে যার বরকত ও কল্যাণকর প্রভাব সর্বত্র দৃষ্টিগোচর হবে।”৩৭

ইবনে হাম্মাদ বর্ণনা করছেন : “মাহ্দীর চি‎হ্ন হচ্ছে নিজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাপারে কঠোর আচরণ, মুক্ত হস্তে ধন-সম্পদ দান এবং দুঃস্থ, সহায়-সম্বলহীন মানুষের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হওয়া।”

আরো বর্ণিত হয়েছে :  “মাহ্দী যেন অসহায়দের মুখে মাখন পুরে দেবেন।”৩৮

 

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও জীবন-ধারণের উপায়-উপকরণের পরিবর্তন

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়েতসমূহে অতীত ও বর্তমান প্রজন্মসমূহের বহু অস্বাভাবিক বিষয় আলোচিত হয়েছে। যেমন : গণযোগাযোগের মাধ্যমসমূহ, গবেষণা কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, অডিও-ভিজুয়াল সামগ্রীসমূহ, বিভিন্ন প্রকার অস্ত্র, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসমূহ, সরকার ও প্রশাসন, বিচার-ব্যবস্থা এবং আরো অন্যান্য বিষয় যেগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি আবার বাহ্যত কারামত বা মুজিযাস্বরূপ। আর মহান আল্লাহ্ এগুলোই ইমাম মাহ্দী (আ.) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করবেন। তবে এসব বিষয়ের অনেকগুলোই আবার প্রাকৃতিক বিজ্ঞানসমূহে (পদার্থ, রসায়ন ও জীববিদ্যা) পরিবর্তন এবং মহান আল্লাহর ঐশী নিয়ম ও নেয়ামতসমূহের যথার্থ ব্যবহার থেকে উদ্ভূত হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, মহান আল্লাহর নেয়ামতসমূহ বিভিন্ন প্রকার মৌল ও খনিজ পদার্থ হিসাবে পৃথিবী ও মহাকাশে মানুষের হাতের নাগালেই আছে। বেশ কিছু রেওয়ায়েত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মাধ্যমে যে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে তা পৃথিবীতে মানব জীবনের যাবতীয় দিক ও পর্যায়ে উন্নতি ও প্রগতির ক্ষেত্রে এক বিরাট পদক্ষেপস্বরূপ।

এ কারণেই ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : “জ্ঞান সাতাশটি অক্ষর (শাখা-প্রশাখা) সমতুল্য। সকল নবী-রাসূল সম্মিলিতভাবে যা এনেছেন তা আসলে জ্ঞানের দু’টি অক্ষরস্বরূপ। মানব জাতি মাহ্দীর আবির্ভাবের দিবস পর্যন্ত এ দু’টি অক্ষরের বেশি কিছু জানতে পারবে না। আর যখন আল কায়েম আল মাহদী আবির্ভূত হবে ও কিয়াম করবে তখন সে জ্ঞানের অবশিষ্ট পঁচিশটি অক্ষর বের করে তা মানব জাতির মধ্যে প্রচার করবে; আর এভাবে সে জ্ঞানের সাতাশ ভাগই প্রচার করবে ও জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেবে।”৩৯

এ রেওয়ায়েতে যদিও মহান নবী-রাসূলদের আনীত জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকে দৃকপাত করা হয়েছে তবুও মহান আল্লাহর পরিচিতি (স্রষ্টাতত্ত্ব), রিসালাত ও আখিরাত সংক্রান্ত জ্ঞান ছাড়াও এ রেওয়ায়েতে প্রাকৃতি বিজ্ঞানসমূহের দিকেও দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। আর বর্ণিত হাদীসসমূহ অনুযায়ী মহান নবিগণ মানব জাতিকে এ সব জ্ঞানের কতিপয় মূলনীতিও শিখিয়েছেন এবং তাদেরকে এ দিকে ধাবিত করে তাদের সামনে এসব জ্ঞান-বিজ্ঞানের গুটিকতক প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করেছেন। যেমন : হযরত ইদ্রিস (আ.)-এর মাধ্যমে সেলাই শিক্ষা, হযরত নূহ (আ.)-এর মাধ্যমে জাহাজ নির্মাণ এবং কাঠের কাজ ও আসবাবপত্র প্রস্তুত করার পদ্ধতি এবং হযরত দাউদ ও সুলায়মান  (আ.)-এর মাধ্যমে বর্ম তৈরি করার পদ্ধতির শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এ রেওয়ায়েতে জ্ঞানের প্রকৃত অর্থ ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানও হতে পারে এতদর্থে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) মানব জাতিকে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখাবেন সেটার অনুপাত হবে ২ : ২৫।

ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন :  “তোমরা জেনে রাখ, যূলকারনাইন বশীভূত ও অবাধ্য মেঘদ্বয়ের মধ্যে একটি বেছে নেয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলে তিনি বশীভূত মেঘকে বেছে নেন এবং তোমাদের বন্ধু ও প্রিয়ভাজন ব্যক্তিটির (মাহ্দী) জন্য ঐ অবাধ্য মেঘটি বরাদ্দকৃত হয়েছে।” রাবী বলেন : “আমি প্রশ্ন করলাম : উদ্ধত মেঘ কোনটি?” তিনি বললেন : “যে মেঘে গর্জন, বিদ্যুত ও বজ্রপাত আছে সেই মেঘটি- যার ওপর তোমাদের প্রিয়ভাজন ব্যক্তিটি সওয়ার হবে। তোমরা জেনে রাখ, সে মেঘের ওপর আরোহণ করে যাবতীয় উপায়-উপকরণসমেত উর্ধ্বাকাশে উড়ে যাবে। এসব উপায়-উপকরণ হচ্ছে সাত আসমান ও যমীন যেগুলোর পাঁচ স্তর আবাদ এবং দুই স্তর বীরাণ সেগুলোর সকল উপায়-উপকরণ।”৪০

ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : “আল কায়েমের যুগে প্রাচ্যে বসবাসরত মুমিন ব্যক্তি পাশ্চাত্যে অবস্থানকারী নিজ ভাইকে দেখতে পাবে এবং যে ব্যক্তি পাশ্চাত্যে আছে সেও প্রাচ্যে বসবাসরত তার ভাইকে দেখতে পাবে।”৪১

ইমাম সাদিক (আ.) আরো বলেছেন : “যখন আল কায়েম আবির্ভূত হয়ে বিপ্লব করবে তখন মহান আল্লাহ্ আমাদের অনুসারীদের চোখ ও কান এতটা শক্তিশালী করে দেবেন যে, তাদের ও ইমামের মাঝে কোন মধ্যবর্তী মাধ্যম ও দূত বিদ্যমান থাকবে না। এটা এমনভাবে হবে যে, ইমাম যখনই তাদের সাথে কথা বলবে, তারা তা শুনতে পাবে এবং তাকে দেখতেও পাবে। অথচ ইমাম তার নিজ জায়গাতেই থাকবে।”৪২

ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “সাহিবুল আমরের (ইমাম মাহ্দী) হাতে যখন যাবতীয় বিষয় ও কাজ অর্পণ করা হবে তখন ভূ-পৃষ্ঠের নীচু স্থানগুলোকে উঁচু এবং উঁচু স্থানগুলোকে সমতল করে দেয়া হবে। আর তা এমনই হবে যে, তার কাছে পৃথিবী হাতের তালুর মতো হয়ে যাবে। তোমাদের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি আছে যে তার হাতের তালুতে একটি চুল থাকলে তা দেখতে পায় না?”

বর্ণিত হয়েছে যে, আলোর একটি স্তম্ভ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে আকাশ পর্যন্ত তাঁর জন্য স্থাপন করা হবে এবং তিনি তার মধ্যে বান্দাদের যাবতীয় কাজ প্রত্যক্ষ করবেন। আর মিশরের পিরামিডের একটি পাথরের নীচে তাঁর জন্য বেশ কিছু জ্ঞান গচ্ছিত রাখা আছে যেগুলো তাঁর আগে কারো হস্তুগত হয় নি।”৪৩

আরো কিছু রেওয়ায়েত আছে যেগুলো পূর্ণরূপে আলোচনা ও ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। যেমন : এগুলোর মধ্যে কতিপয় রেওয়ায়েতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পূর্ণ পরিবর্তন, মুমিনদের মানসিক যোগ্যতা ও তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট উপকরণসমূহের আমূল পরিবর্তন এবং ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের ব্যবহৃত উপায়-উপকরণ, যন্ত্রপাতি এবং কারামতসমূহের কথা বর্ণিত হয়েছে।

ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : “আমি যেন আল কায়েমের সঙ্গী-সাথীদেরকে দেখতে পাচ্ছি যারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং তাদের আজ্ঞাবহ, এমনকি ভূ-পৃষ্ঠের হিংস্র পশুকুল এবং আকাশের শিকারী পাখীরাও তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করার চেষ্টা করবে। সবকিছুই, এমনকি ভূ-পৃষ্ঠের এক অঞ্চল আরেক অঞ্চলের ওপর গর্ব করে বলবে : আজ আল কায়েমের একজন সঙ্গী আমার ওপর পদধুলি দিয়েছেন এবং আমাকে অতিক্রম করেছেন।”৪৪

ইমাম বাকির (আ.) থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে : “যখন আমাদের কায়েম আবির্ভূত হবে ও বিপ্লব করবে তখন পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলে যে ব্যক্তিকেই প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করবে তখন তাকে বলবে : তোমার হাতের তালুতেই তোমার কর্মসূচী ও প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা আছে। যখনই তোমার ক্ষেত্রে কোন ব্যাপার ঘটবে যা তুমি বুঝ নি এবং যার হিকমতও তোমার জানা নেই তখন তুমি তোমার হাতের তালুর দিকে তাকাবে এবং সেখানে যে নির্দেশনা বিদ্যমান আছে তদনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”৪৫

এ রেওয়ায়েত সম্পর্কে ‘ইয়াওমুল খালাস’ গ্রন্থে এমন সব সূত্র ও উৎসের কথা বর্ণিত হয়েছে যেগুলো অন্যান্য গ্রন্থে আমি পাই নি। আর তাঁদের ইমাম মাহ্দীর সঙ্গী-সাথীদের ক্ষেত্রে এসব ঘটনা মুজিযা ও কারামত আকারে ঘটা অথবা বৈজ্ঞানিক নিয়ম-নীতি এবং অত্যাধুনিক ও অতি উন্নত মাধ্যম ও যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সংঘটিত হওয়া সম্ভব।

 

 

তথ্যসূত্র :

১. নুমানী প্রণীত গাইবাত, পৃ. ১২৭

২. শারহু নাহজিল বালাগাহ্, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৭৮

৩. নুমানী প্রণীত গাইবাত, পৃ. ১২১

৪.  বিহার, ৫১তম খণ্ড, পৃ. ২১৮

৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭

৬. প্রাগুক্ত, ৫৩তম খণ্ড, পৃ. ৩৪৩

৭. সূরা কাহাফ :৬৫ ।

৮. সূরা তাওবাহ : ৩৩ ।

৯. বাহরানী প্রণীত আল মাহাজ্জাহ, পৃ. ৮৬ ।

১০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৭ ।

১১. বাহরানী প্রণীত আল মাহাজ্জাহ, পৃ. ৮৬ ।

১২. বিহার ৫২তম খণ্ড, পৃ. ১৯১

১৩. তাফসীরে আইয়াশী, ২য় খণ্ড, পৃ.৫৬ ।

১৪. প্রাগুক্ত ।

১৫. রওযাতুল কাফী, পৃ. ২৮৭ ।

১৬. সিজদাহ : ৫৩ ।

১৭. তাফসীরে আইয়াশী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৮৩ ।

১৮.বায়ান-ই শাফিয়ী, পৃ.১২৯ ।

১৯. প্রাগুক্ত, পৃ.৬৩ ।

২০. বিহার, ৫১তম খণ্ড, পৃ.৭৮ ।

২১. আল মালাহিম ওয়াল ফিতান, পৃ. ৬৬ ।

২২. শারহু নাহজিল বালাগাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৬ ।

২৩. বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ.৩৫২ ।

২৪. বিশারাতুল ইসলাম, পৃ. ২৯৭ ।

২৫. আল কাফী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪১২ ।

২৬. শেখ সাদুক প্রণীত কামালুদ্দীন, পৃ. ৩৩১ ।

২৭. বিহার, ৫১তম খণ্ড, পৃ. ৬৮

২৮. প্রাগুক্ত, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ৩৫১

২৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫১

৩০. ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯৮

৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৯

৩২. সূরা বাকারাহ্ : ২১৩ ।

৩৩. ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯৯ ।

৩৪. বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ১৯১ ।

৩৫. বিশারাতুল ইসলাম, পৃ. ১৮৫ ।

৩৬. বিহার, ৫৬তম খণ্ড, পৃ. ৪৯ ।

৩৭. কাশফুল গাম্মাহ্, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৫০ ।

৩৮. ইবনে হাম্মাদের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি, পৃ. ৯৮

৩৯. বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ৩৬৬

৪০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২১

৪১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯১

৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৬

৪৩. শেখ সাদুক প্রণীত কামালুদ্দীন, পৃ. ৫৬৫

৪৪. বিহার, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ৩২৭

৪৫. নুমানী প্রণীত গাইবাত, পৃ. ৩১৯

____________________________

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আত্মপ্রকাশ (আসরে যুহুর) গ্রন্থ থেকে সংকলিত

 

আপনার মতামত

মন্তব্য নেই
*
*

আল হাসানাইন (আ.)