শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস25%

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস লেখক:
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 51 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 18519 / ডাউনলোড: 5244
সাইজ সাইজ সাইজ
শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

লেখক:
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বাংলা

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

মূল লেখক  : আল্লামা মুহাম্মাদ রেজা আল-মুজাফফর

ভাষান্তরে : মোঃ মাঈন উদ্দিন তালুকদার

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

মূল শিরোণাম      : আকাঈদ আল-ইমামীয়াহ

মূল লেখক  : আল্লামা মুহাম্মাদ রেজা আল-মুজাফফর

অনুবাদ: মোঃ মাঈন উদ্দিন তালুকদার

সম্পাদনা  : শেখ মোঃ শহীদুজ্জামান

প্রকাশক:

ভূমিকা

অনুসন্ধান ,জ্ঞান ,ইজতিহাদ ও তাকলীদ

১। অনুসন্ধান ও জ্ঞানার্জন সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস:

আমরা বিশ্বাস করি যে ,মহান আল্লাহ আমাদেরকে চিন্তাশক্তি দিয়েছেন এবং দিয়েছেন বুদ্ধিবৃত্তি (আকল) । আর এ কারণেই তিনি আমাদেরকে তার সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করতে এবং গভীর অনুসন্ধান ও অনুধাবন করতে আদেশ দিয়েছেন। অনুধাবন করতে বলেছেন সমগ্র সৃষ্টি নিদর্শন এবং স্বয়ং আমাদের সৃষ্টিতেও তার প্রজ্ঞা ও পরাক্রমকে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন-

“ আমরা বিশ্বজগতে ও তাদের মধ্যে আমাদের নিদর্শন দেখাতে থাকব যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের নিকট স্পষ্ট রূপে প্রতীয়মান হয় যে ,তিনি (মহান আল্লাহ) সত্য। ” (সুরা হামীম সেজদাহ- ৫৩)

যারা তাদের পূর্ব পুরুষদেরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে তাদেরকে ভৎসনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন-

“ তারা বলে ,আমরা বরং আমাদের পূর্ব পুরুষদের অনুসৃত পথই অনুসরণ করব এমনকি তাদের পূর্ব পুরুষগণের কোন জ্ঞান না থাকলেও ? ” (সুরা বাকারা -১৭০)

অনুরূপ ,মহান আল্লাহ তাদেরকেও ভৎসনা করেন যারা কেবলমাত্র তাদের অমূলক ধারণার উপর অনুসরণ করে। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেন-

“ তারা তাদের ( অমূলক ) ধারণা ব্যতীত অন্য কিছুই অনুসরণ করে না। ” (সুরা আন - আম - ১১৬ )

প্রকৃতপক্ষে ,আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিই আমাদেরকে বাধ্য করে সৃষ্টিকে অনুধাবন করতে ও তার সৃষ্টি কর্তাকে জানতে। তদ্রূপ কারো নবুওয়াতের দাবী ও তার কর্তৃক প্রদর্শিত মোজেযার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে ও তার দাবীর সত্যাসত্য পরীক্ষা করতে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি আমাদেরকে বাধ্য করে। এ বিচার বিশ্লেষণ ব্যতীত কাউকে অনুসরণ করা আমাদের জন্য সঠিক নয় যদিও বা তার জ্ঞান ও মর্যাদা অভূতপূর্ব হয়ে থাকে। পবিত্র কোরআনে আমাদেরকে চিন্তা করতে ও জ্ঞানার্জন করতে আহবান জানানো হয়েছে। আর পবিত্র কোরআনের এ আহবানের কারণ হলো আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির ফেতরাতগত ( সৃষ্টি প্রকরণগত ) স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান করা যার উপর অনুসরণ করে প্রত্যেক বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিই সিদ্ধান্ত প্রদান করে। সত্য অনুধাবনের ক্ষেত্রে ( সৃষ্টিগতভাবে ) আমাদের চিন্তা ও জ্ঞানগত যোগ্যতার ভিত্তিতেই পবিত্র কোরআন আমাদেরকে সতর্ক করছে এবং আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে আমাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তির উত্তরাধিকারগত চাহিদার দিকে পরিচালিত করছে।

অতএব এটা সঠিক নয় যে ,মানুষ স্বীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে অজ্ঞ থেকে যাবে কিংবা কোন শিক্ষক বা অন্যকোন ব্যক্তির অনুসরণ করবে। বরং তার জন্য আবশ্যক হলো ফিতরাতগত বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে গভীর অনুসন্ধান ও বিচার বিশ্লেষণ করে ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলোর উপর সুষ্পষ্ট জ্ঞান লাভ করা। ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলোকে উসূলে দ্বীন বলে নামকরণ করা হয় যে গুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো-

১। তাওহীদ বা একত্ববাদ

২। নবুওয়াত বা রিসালাত

৩। ইমামত

৪। মা আদ বা কিয়ামত

যে কেউ এসকল মৌলিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তার পূর্ব পুরুষ বা অন্য কাউকে অন্ধ অনুসরণ করবে সে নিশ্চিত রূপে মিথ্যা দ্বারা আবিষ্ট হবে এবং সরল পথ থেকে বিচ্যুত হবে। আর এ ব্যাপারে কখনোই কোন অজুহাত গ্রহনযোগ্য হবে না।

মৌলিক বিশ্বাসসমূহ দুটি মূলনীতির উপর নির্ভরশীল-

প্রথমত : মৌলিক বিশ্বাসগুলোকে বিচার বিশ্লেষণ ও অনুধাবন করা আবশ্যক এবং এক্ষেত্রে অন্য কাউকে অনুসরণ করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত: এ বিশ্বাসগুলো অর্জন করা শরীয়তগতভাবে আবশ্যক হওয়ার পূর্বেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আবশ্যক হয়ে পড়ে। (অর্থাৎ শুধু ধর্মীয় উৎস থেকে আমরা এগুলো অর্জন করবো না যদিও ধর্মে এগুলো নিশ্চিতরূপে বর্ণিত হয়েছে। বরং আমরা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার মাধ্যমে তা অর্জন করবো।) আর মৌলিক বিশ্বাস গুলোর ক্ষেত্রে জ্ঞানার্জন ,চিন্তা ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা ,বুদ্ধিবৃত্তিক অনুধাবন ব্যতীত বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আবশ্যকীয় হওয়ার কোন অর্থই থাকে না।

২। দ্বীনের গৌণ বিষয়সমূহের (ফুরুয়ে দ্বীন) ক্ষেত্রে অন্যের অনুসরণ (তাকলীদ) সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

দ্বীনের গৌণ বিষয়সমূহ বা ফুরুয়ে দ্বীন বলতে বুঝায় কার্যগত ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধানসমূহকে। এগুলোর ক্ষেত্রে (সবার জন্য) বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনা ও গবেষণা আবশ্যক নয়। বরং সেক্ষেত্রে আবশ্যক হলো নিম্নলিখিত পন্থাত্রয়ের মধ্যে একটিকে অবলম্বন করা (যদি না নামায ও রোজার মত দ্বীনের সুষ্পষ্টরূপে প্রমাণিত কোন বিষয় হয়) ।

ক) যোগ্যতা থাকলে গবেষণা (ইজতিহাদ) করতে হবে এবং আহকামের দলিলগুলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে।

খ) যদি সক্ষম হয় তবে তার কাজকর্মের ব্যাপারে সাবধানতা (এহতিয়াত) অবলম্বন করতে হবে।

গ) অনুমোদিত বা সুনির্দিষ্ট যোগ্যতার অধিকারী এমন কাউকে অনুসরণ করতে হবে যিনি জ্ঞানী এবং ন্যায়পরায়ণ (যিনি নিজেকে পাপ কর্ম থেকে বিরত রাখেন ,দ্বীনের রক্ষক ,স্বীয় কামনা বাসনার অনুসারী নন বরং তার প্রভুর আদেশ নিষেধ মেনে চলেন) ।

অতএব যদি কেউ মোজতাহিদ বা গবেষক না হয়ে থাকে ,কিংবা সাবধানতা বা এহতিয়াত অবলম্বন না করে ,অথবা নির্দিষ্ট শর্তের বা যোগ্যতার (প্রাগুক্ত) অধিকারী কাউকে অনুসরণ না করে তবে তার সমস্ত এবাদতই বাতিল হয়ে যাবে এবং তা থেকে কোন কিছুই কবুল হবে না ,এমনকি সারাজীবন নামায ,রোজা ,পালন করলেও। তবে তাকলীদ (বা পূর্ব বর্ণিত কোন ব্যক্তির অনুসরণ) করলে পূর্বে কৃত আমলসমূহ এ শর্তে কবুল হবে যে ,সেগুলো অনুসৃত মোজতাহিদের মতানুসারে ও আল্লাহর তুষ্টির জন্য করা হয়েছে।

৩। ইজতিহাদ সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,ফুরুয়ে দ্বীনের আহকামের ক্ষেত্রে ইমামের আত্মগোপনের সময়কালে ইজতিহাদ করা সমস্ত মুসলমানের জন্য ওয়াজীবে কেফায়া। অর্থাৎ এটা প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক মুসলমানের জন্যেই ওয়াজীব। কিন্তু যদি তাদের মধ্যে কেউ একজন এ যোগ্যতা অর্জন করে তবে অন্যরা এ দায়ভার থেকে অব্যাহতি পায়। যদি কেউ ইজতিহাদের দ্বারে পৌঁছে এবং সকল মনোনীত শর্ত বা যোগ্যতা অর্জন করে তবে ফুরুয়ে দ্বীনের ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ (বা তার তাকলীদ) করাই অন্যদের জন্য যথেষ্ট।

সকল যুগে মুসলমান মাত্রই স্বয়ং বিষয়টির প্রতি মনোযোগী হওয়া আবশ্যক। যখন কিছু ব্যক্তি ইজতিহাদের দ্বারে পৌছার জন্য নিজেদেরকে নিয়োজিত করে ও মুজতাহিদ হয় এবং যখন তারা অনুসরণীয় হওয়ার মত সকল শর্ত পূরণ করে ,তখন ফুরুয়ে দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদেরকে অনুসরণ করা অন্যদের জন্য আবশ্যক যারা ব্যক্তিগতভাবে ইজতিহাদ করতে চান না। ইজতিহাদের দ্বারে পৌঁছানো কঠোর পরিশ্রমী ব্যক্তি ব্যতীত সম্ভব নয়। যেক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষেই ইজতিহাদ করা সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে তাদের মধ্য থেকে কিছু ব্যক্তিকে এ মর্যাদায় পৌঁছার জন্য তৈরী করতে হবে। কিন্তু মৃত মুজতাহিদের তাকলীদ করা তাদের জন্য বৈধ নয়।

ইজতিহাদ হলো শরীয়তের বিভিন্ন দলিলের উপর বিচার বিশ্লেষণ করে মহানবী (সা.) ফুরুয়ে দ্বীনের ক্ষেত্রে যে আহকাম এনেছেন সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। মহানবীর (সা.) এ আহকাম কাল ও আধারের পরিবর্তনে কখনোই পরিবর্তিত হবে না। (মোহাম্মদ (সা.) এর হালাল কিয়ামত পর্যন্ত হালাল ,তার হারাম কিয়ামত পর্যন্ত হারাম) । আর শরীয়তের দলিলগুলোর উৎস হলো-পবিত্র কোরআন ,রাসুলের (সা.) ও ইমামগণের (আ.) সুন্নাত ,ইজমা (ফকীহগণের মতৈক্য) এবং বুদ্ধিবৃত্তি (আকল) যে সম্পর্কে উসুলে ফিকাহ শাস্ত্রে আলোচিত হয়েছে। ইজতিহাদের এ মর্যাদা লাভের জন্য এক দীর্ঘ সময়কালের অধ্যয়ন ও জ্ঞানার্জনের প্রয়োজন এবং এটা কখনোই অর্জিত হবে না যদি না কেউ এক্ষেত্রে একনিষ্ঠ ও পরিশ্রমী হয়।

৪। মোজতাহিদের মর্যাদা সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,সকল ইস্পিত শর্ত পূরণকারী মুজতাহিদ হলেন ইমামের (আ.) অবর্তমানে তার প্রতিনিধি। সুতরাং তিনি (মুজতাহিদ) হলেন সমস্ত মুসলিম জনতার পরিচালক এবং তিনি ইমামদের (আ.) সমস্ত দায়িত্ব (যেমন-মীমাংসা ,বিচার কার্য ,প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি) পালন করে থাকেন। এ কারণে আহলে বাইতের ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন-

“ মুজতাহিদকে প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হলো ইমামকে (আ.) প্রত্যাখ্যান করা। আর ইমামকে (আ.) প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হলো আল্লাহকে প্রত্যাখ্যান করা। আর এটা অংশীবাদ ও শিরকের নামান্তর বৈ কিছু নয়। ”

অতএব ,সকল মনোনীত যোগ্যতার অধিকারী মুজতাহিদ কেবলমাত্র ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রেই ক্ষমতাধর নন বরং তার সার্বজনীন বেলায়াত (অভিভাবকত্ব) বিদ্যমান। সুতরাং হুকুম ,মীমাংসা ,বিচার ইত্যাদি তার জন্য নির্ধারিত যে কোন আবশ্যকীয় ক্ষেত্রে তার নিকট ব্যতীত অন্য কারো শরনাপন্ন হওয়া বৈধ নয় ,যদি না তার অনুমতি থাকে। তদ্রূপ তার আদেশ ব্যতীত শাস্তি প্রদান বৈধ নয়। ইমামের (আ.) জন্য নির্ধারিত মালামালের ক্ষেত্রেও মুজতাহিদের শরনাপন্ন হতে হবে।

ইমামের (আ.) অনুপস্থিতিকালীন সময়ে ইমাম (আ.) এ সকল দায়িত্ব ও মর্যাদা দিয়েছেন তার প্রতিনিধি হিসেবে। আর এ জন্যই তাকে বলা হয় নায়েবে ইমাম বা ইমামের প্রতিনিধি।

পর্ব -১

তাওহীদ

মহান আল্লাহ সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,মহান আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় ,কোন কিছুই তার মত নয় ,তিনি অনাদি ও অনন্ত ,যার কোন শুরু বা শেষ নেই ,তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ ,তিনি সর্বজ্ঞ ,প্রজ্ঞাময় ,ন্যায়-পরায়ণ ,অস্তিত্বময় ,সর্বদ্রষ্টা। সৃষ্টির কোন গুণ দিয়ে তাকে গুনান্বিত করা যায় না। তার কোন দেহ নেই ,কোন অবয়ব নেই ,তিনি বস্তুসত্তা (জাওহার) নন এবং উপজাত (আরাজ) নন ,তিনি হাল্কা নন ও ভারী নন ,তিনি স্থিতিশীল নন ও গতিশীল নন ,তার কোন স্থান নেই ,কোন কাল নেই ,কেউই তার দিকে নির্দেশ করতে পারে না ,যেহেতু কোন কিছুই তার মত নয় ,কিছুই তার সমান নয় ,তার কোন বিপরীত নেই ,তার কোন স্ত্রী নেই ,কোন কিছুই তার তুল্য নয়। দৃষ্টিগুলো তাকে নিবদ্ধ করতে পারে না বরং তিনিই দৃষ্টিগুলোকে নিবদ্ধ করেন। যারা আল্লাহর রূপ ,মুখবায়ব ,হাত ও চোখ ইত্যাদি আছে বলে তুলনা করেন অথবা আকাশ থেকে তিনি পৃথিবীতে অবতরণ করেন কিংবা বেহেশতবাসীকে তিনি চন্দ্ররূপে দর্শন দিবেন ইত্যাদি বলে থাকেন ,তারা প্রকৃতপক্ষে তার সম্পর্কে কুফরি করেন। কারণ সর্বপ্রকার ঘাটতি থেকে পবিত্র আল্লাহর স্বরূপ সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। আমরা যা কিছুই ধারণা করি না কেন সবই আমাদের মত সৃষ্টি। ইমাম বাকের (আ.) বলেন-

তিনি বিজ্ঞদের ব্যাখ্যার উর্ধে এবং তিনি সূক্ষ্ম জ্ঞানের নাগালের বাইরে।

এরূপ সেব্যক্তি আল্লাহকে অস্বীকারকারীদের অন্তর্ভূক্ত বলে পরিগনিত হবে যে বলে-আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তার সৃষ্টিকে দর্শন দিবেন। যদিও মুখে তারা বলে থাকে যে ,আল্লাহর দেহ নাই। এ ধরনের দাবী করার কারণ হলো তারা কোরআন এবং হাদীসের বাহ্যিক অর্থকে গ্রহণ করেছে। তারা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে অস্বীকার করেছে। সত্যিই তারা তাদের অজ্ঞতার আড়ালে কোরআনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সঠিক দলিল ,ভাষাতত্ত্ব ও ব্যকরণের সাহায্য গ্রহণ করতঃ বাহ্যিক অবয়ব ভেদ করে এর গভীরে প্রবেশ করার চেষ্ঠা করেনি।

৬। তাওহীদ বা একত্ববাদ সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা মহান আল্লাহর সর্বময় একত্ববাদে বিশ্বাস করি। তার সত্তাগত (জাতগত) একত্ব থাকা আবশ্যক। আমাদের বিশ্বাস তিনি সত্তাগতভাবে এক এবং অত্যাবশ্যকীয় অস্তিত্ব। তেমনি (দ্বিতীয়তঃ) তার গুণগত একত্ববাদের আবশ্যকতা রয়েছে। এ কারণে আমাদের বিশ্বাস মতে তার গুণ ,তার সত্তা ভিন্ন কিছু নয় যার বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি যে ,তার সত্তাগত গুণের ক্ষেত্রেও তিনি অতুলনীয়। যেমন- তার জ্ঞান ও ক্ষমতার তুলনা কিছুই হতে পারে না। অনুরূপ তার সৃজনে বা সৃষ্টজীবের জীবিকা দানের ক্ষেত্রে তার কোন শরীক নেই। তার যে কোন পুর্ণতার ক্ষেত্রেই কোন কিছুই তার সমতুল্য নয়। এরূপভাবে আবশ্যক হলো (তৃতীয়তঃ) তার উপাসনার ক্ষেত্রে একত্ববাদ। সুতরাং তিনি ভিন্ন অন্য কারো উপাসনা বৈধ নয়। তদ্রূপ যে কোন প্রকার এবাদতে-হোক সে আবশ্যক যেমন (নামায) কিংবা অনাবশ্যক যেমন দোয়া- ইত্যাদি কোন এবাদতের ক্ষেত্রেই তার শরীক করা যাবে না। যদি কেউ এবাদতের ক্ষেত্রে তাকে ভিন্ন অন্য কাউকে শরীক করে তবে সে মোশরেক বলে পরিগণিত হবে। যেমন - কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এবাদত করল কিন্তু আল্লাহ ভিন্ন কোন কিছুর নৈকট্য কামনা করল (যেমন- দারিদ্র বিমোচন) । ইসলামের দৃষ্টিতে সে মোশরেক এবং মূর্তি পূজা বা অন্য কোন কিছুর পূজার সাথে তার এবাদতের কোন পার্থক্য নেই। তবে কবর জিয়ারত করা ও শোক প্রকাশ বা মাতম করা আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো এবাদতকরণ বলে পরিগণিত হবে না ,যার অপবাদ দিয়ে কিছু লোক ইমামীয়া অর্থাৎ শীয়াদেরকে আক্রমন করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তারা কবর যিয়ারতের অর্ন্তনিহিত তাৎপর্যকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু কিছু কল্যাণকর্ম সম্পাদন করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য এগুলো হলো কিছু পন্থা। যেমন- অসুস্থকে দর্শন করে ,জানাযাকে সমাধিস্থ করে ,দ্বীনের ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করে ও দরিদ্র মুসলমানকে সাহায্য করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। সুতরাং অসুস্থের সাথে সাক্ষাৎ করা হলো স্বয়ং একটি কল্যাণব্রত যার মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। অসুস্থের দর্শন ,আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো এবাদত বলে পরিগনিত হওয়ার কারণ নয় বা এবাদতের ক্ষেত্রে শিরক নয়। অনুরূপভাবে অন্যান্য কল্যাণব্রত যেমন-কবর যিয়ারত ,শোক পালন ,জানাযা সমাধিস্থকরণ এবং মুসলিম ভাইদের সাথে সাক্ষাৎকরাও শিরক নয়।

যাহোক কবর যিয়ারত ও শোক পালন যে শরীয়তগতভাবে কল্যাণকর্ম তা ফিকাহশাস্ত্রে প্রমানিত হয়েছে। এখানে তা প্রমানের সুযোগ নেই। সংক্ষেপে এ ধরনের কর্ম সম্পাদন কোন ভাবেই শিরক নয় যা কেউ কেউ ধারণা করে থাকে। ইমামদের (আ.) মাযার যিয়ারতের ক্ষেত্রে তাদের এবাদত করার কোন উদ্দেশ্য এখানে থাকে না। প্রকৃতপক্ষে সেখানে উদ্দেশ্য থাকে ইমামগণের (আ.) আদেশসমূহ পূনর্জীবিত করা। তাদেরকে নতুন করে স্মরণ করা এবং আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান প্রদর্শন করা। পবিত্র কোরআনের ভাষায়-

যারা আল্লাহর নিদর্শন সমূহকে সম্মান প্রদর্শন করে তবে তা তাদের অন্তরের তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ। (সূরা-হজ্জ-৩২)

শরীয়তে এ কর্মগুলো মুস্তাহাব বলে পরিগনিত। সুতরাং মানুষ যদি এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর তুষ্টি অর্জন করতে ,তার নৈকট্য লাভ করতে চায় তবে সে তার প্রতিদান তার (আল্লাহর) নিকটই পাবে এবং সে অবশ্যই পুরস্কৃত হবে।

৭। মহান আল্লাহর গুণাবলী (সিফাত) সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,মহান আল্লাহর প্রকৃত ও হ্যাঁ-বোধক গুণগুলোকে পূর্ণতাগুণ (কামাল) ও সৌন্দর্যগুণ (জামাল) বলে নামকরণ করা হয়। যেমন -জ্ঞান (এলম) ,শক্তি (কুদরাত) ,ঐশ্বর্যবান (গনি) ,প্রত্যয় (এরাদা) ও চিরঞ্জীব (হায়াত) । এগুলোর সবই হলো তার সত্তা ,সত্ত্বাবহির্ভূত কিছু নয় এবং আল্লাহর সত্তার অস্তিত্ব ব্যতীত এগুলোর কোন অস্তিত্ব নেই। সুতরাং তার শক্তিই তার জীবন ,আবার তার জীবনই তার শক্তি। যখন তিনি পরাক্রমশালী তখন তিনি চিরঞ্জীব ,আবার যখন তিনি চিরঞ্জীব তখন তিনি পরাক্রমশালী। তার অস্তিত্ব আর গুণের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই এবং তার অন্যান্য পূর্ণতাগুণগুলোও এরূপ।

হ্যাঁ অর্থ ও ভাবার্থগত দিক থেকে এগুলোর (গুণ ও সত্তা) মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান ,তবে বাস্তব ও অস্তিত্বগত ক্ষেত্রে নয়। যদি অস্তিত্বগত দিক থেকে তারা পৃথক হয় তবে আবশ্যকীয় অস্তিত্বের (ওয়াজীবুল ওজুদ) একাধিক্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যেমন-ধরা যাক অনাদিও আবশ্যকীয় অস্তিত্ব। অথচ তার কোন দ্বিতীয় নেই। সুতরাং এ ধরনের ধারণা একত্ববাদের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। হ্যাঁ-বোধক সংযুক্তি (এজাফী) গুণগুলো যেমন-সৃজনগত (খালেকিয়াত) ,অন্নদানগত (রাজেকিয়াত) ,প্রাচীণগত (তাকাদ্দুম) ,কারণগত (ইল্লিয়াত) গুণগুলো প্রকৃত (হাকীকী) গুণের অন্তর্ভূক্ত এবং একই। আর তা হলো তার স্বতঃ অস্তিত্বমান (কাইয়্যমিয়াত) হওয়া। যখন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ফলাফল থেকে বিবেচনা করা হয় তখন বর্ণিত গুণগুলো এ একটি গুণ থেকে উৎসারিত হয়। আবার না-বোধক গুণ যেগুলো সিফাতে জালাল (মহিমা গুণ) নামে পরিচিত ,এগুলোর সবই একটি না-বোধক গুণের অন্তর্ভূক্ত। আর তা হলো তার সৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাকে না করা। সুতরাং এ সম্ভাবনাকে প্রত্যাখ্যানের অর্থ হলো ,তার শরীর নেই ,তার চেহারা নেই ,তার গতি নেই ,স্থিতি নেই ,এবং তিনি ভারী নন ,হালকা নন এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়াবলী। অর্থাৎ সমস্ত ঘাটতি থেকে মহান আল্লাহ মুক্ত। পুনরায় বলা যায় সৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাকে না করার প্রকৃত অর্থ হলো তিনি আবশ্যকীয় অস্তিত্ব (ওয়াজিবুল ওজুদ) যা হ্যাঁ-বোধক পূর্ণতা গুণের অন্তর্ভূক্ত।

সুতরাং না-বোধক গুণগুলো অবশেষে হ্যাঁ-বোধক গুণেরই অন্তর্ভূক্ত হয়। অতএব মহান আল্লাহ সর্বদিক থেকেই এক ও অদ্বিতীয়। তার পবিত্র সত্তাকে খণ্ড করা যায় না। তিনি অংশ সমাহার নন। এটা আশ্চর্যের বিষয় যে ,কেউ কেউ বলে যে ,হ্যাঁ-বোধক গুণগুলো যেন না-বোধক গুণের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। তারা এটা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে ,তার গুণ হলো তারই সত্তা। ফলে তারা আল্লাহ সত্তাগতভাবে এক ও অদ্বিতীয়-এ বক্তব্যের নিশ্চয়তা দিতে গিয়ে ধারণা করে যে ,আল্লাহর হ্যাঁ-বোধক গুণগুলো না-বোধক গুণের উপর নির্ভরশীল। এভাবে তারা এক মারাত্মক ভ্রান্ত পথে পতিত হয়েছে। কারণ এভাবে তারা আল্লাহর অস্তিত্ব- যে সত্তা সকল প্রকার অপূর্ণতার সম্ভাবনা থেকে মুক্ত সেই সত্তাকে- পূর্ণরূপে অস্বীকার করে ফেলে। আর তার অর্থ দাড়ায় আল্লাহর অনস্তিত্বশীলতা।

অনুরূপ আশ্চর্যের বিষয় হলো তাদের কথা যারা বলে যে ,আল্লাহর গুণগুলো হলো তার অস্তিত্ববর্হিভূত। তারা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর গুণগুলো তার সত্তার মতই প্রাচীন। ফলে তার গুণগুলো তার কর্মের অংশীদার। এভাবে তাদের বিশ্বাসে আল্লাহর (যিনি হলেন আবশ্যকীয় অস্তিত্ব) শরীক করে। আবার অন্যরা বলে আল্লাহ হলেন তার গুণগুলোর সমাহার। কিন্তু মহান আল্লাহ এ ধরনের ধারণার উর্ধে। আমাদের মাওলা আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) যিনি একত্ববাদীদের সর্দার বলেন-

“ পূর্ণ ইখলাস হলো তার উপর কোন বিশেষণ আরোপ না করা। কারণ প্রত্যেকটি বিশেষণই তার বিশেষ্য থেকে পৃথক এবং প্রত্যেক বিশেষ্যই এর বিশেষণ থেকে স্বতন্ত্র। সুতরাং যে কেউ তাকে বিশেষায়িত করল সে যেন তার সদৃশ বানালো ,আর যে তার সদৃশ বানালো সে তার দ্বিতীয় বানালো ,যে তার দ্বিতীয় বানালো সে তাকে অংশ সমাহার বানালো ,আর যে তাকে অংশ সমাহার বানালো সে তাকে ভুলভাবে গ্রহণ করলো। (নাহাজুল বালাগা খুতবা-১)

অধ্যায় 3

সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ : নফসের সাথে যুদ্ধ

আমাদের জীবনের আরও একটি বছর পার হয়ে গেলো। তোমরা তরুণেরা বৃদ্ধ বয়সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছো , আর আমরা বৃদ্ধরা এগিয়ে যাচ্ছি মৃত্যুর দিকে। এই শিক্ষাবর্ষে তোমরা তোমাদের পড়াশুনা ও জ্ঞানার্জনের মাত্রা সম্পর্কে জানতে পেরেছো। তোমরা জানো কতদূর তোমরা অর্জন করেছো এবং তোমাদের শিক্ষার ইমারত কতটা উঁচু হয়েছে। যাই হোক , আচরণের বিশুদ্ধতা , ধর্মীয় আচরণ শিক্ষা করা , ঐশী শিক্ষা এবং আত্মার পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রে তোমরা কী করেছো ? কী কী ইতিবাচক পদক্ষেপ তোমরা নিয়েছো ? তোমরা কি পরিশুদ্ধি নিয়ে , অর্থাৎ নিজের সংস্কার নিয়ে কোনো চিন্তা করেছিলে ? এই দিকে কোনো কর্মসূচী গ্রহণ করেছো কি ? দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার স্বীকার করতে হচ্ছে যে তোমরা চোখে পড়ার মতো কিছু করোনি , এবং নিজের পরিবর্তন ও আত্মিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তোমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নাওনি।

অধ্যায় 4

ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রের প্রতি পরামর্শ

পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিষয়ের ( scholarly matters)পড়াশুনার পাশাপাশি ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার-ও প্রয়োজন আছে। আধ্যাত্মিক সক্ষমতা অর্জনের জন্য নৈতিক পথপ্রদর্শক ও প্রশিক্ষকের প্রয়োজন , দরকার উপদেশ-পরামর্শ সেশনের। নীতিশাস্ত্র ও নৈতিক সংস্কারমূলক কর্মসূচী , আচরণ ও পরিশুদ্ধির উপর ক্লাস , ঐশী জ্ঞানার্জনের (যা ছিলো নবীগণের (আ.) মিশনের মূল লক্ষ্য) দিকনির্দেশনা ইত্যাদি বিষয় অবশ্যই ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত , এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে যেটুকু মনোযোগ দেয়া হয় , তা অতি নগন্য। আধ্যাত্মিকতার পড়াশুনা এখন কমে যাচ্ছে , ফলস্বরূপ ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রগুলো ভবিষ্যতে আর নৈতিকতার উপর পণ্ডিত গড়ে তুলতে পারবে না , গড়ে তুলতে পারবে না বিশুদ্ধ-প্রাণ নৈতিক শিক্ষক , ঐশ্বরিক মানব। প্রাথমিক বিষয়ের আলোচনা-অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকার কারণে মৌলিক ও ভিত্তিমূলক বিষয়ের পড়াশুনার সুযোগ হয়ে ওঠে না। সেসব মৌলিক বিষয় , মহাগ্রন্থ আল কুরআন যা উপস্থাপন করেছে এবং মহানবী (সা.) এবং অন্যান্য নবী (আ.) ও আউলিয়াগণ (আ.) যা উপস্থাপন করেছেন। পণ্ডিতসমাজের উল্লেখযোগ্য আইনজ্ঞ ও খ্যাতনামা প্রফেসরগণের উচিত তাঁদের বিভিন্ন লেকচার ও আলোচনায় মানুষকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে গড়ে তোলা ; উচিত আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিষয়গুলির উপর অধিক জোর দেয়া। ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রের ছাত্রদের জন্য পাণ্ডিত্য ও আত্মিক বিশুদ্ধতা অর্জনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি তাদের মহান দায়িত্বের প্রতিও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

অধ্যায় 5

ধর্মশিক্ষার ছাত্রদের প্রতি পরামর্শ

আজকে তোমরা যারা এই মাদ্রাসাগুলোয় পড়াশুনা করছো , যারা আগামী দিনে সমাজের নেতৃত্ব ও পথপ্রদর্শনের দায়িত্ব নেবে ভেবোনা যে কেবলমাত্র কিছু ধর্মীয় টার্ম শেখা-ই তোমাদের দায়িত্ব ; কারণ তোমাদের অন্যান্য দায়িত্বও রয়েছে। এসব শিক্ষাকেন্দ্রে তোমাদের নিজেদেরকে অবশ্যই এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেনো যখন তোমরা কোনো গ্রাম বা শহরে যাবে , তখন সেখানের মানুষদের গাইড করতে পারবে এবং তাদেরকে আত্মশুদ্ধির পথ দেখাতে পারবে। যখন তোমরা ধর্মীয় আইনশিক্ষাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে পড়বে , তখন যেনো তোমরা নিজেরাই পরিশোধিত ও সুসংস্কৃত হও , যাতে মানুষকে ইসলামের নৈতিক আদবকায়দা , রীতিনীতি ইত্যাদি শিক্ষা দিয়ে সুশিক্ষিত করে তুলতে পারো এটাই কাম্য। আল্লাহ না করুন যদি তোমরা শিক্ষাকেন্দ্রে এসে নিজেদের সংস্কার করতে না পারো , আধ্যাত্মিক আদর্শকে উপলব্ধি করতে না পারো , তাহলে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন যেখানেই তোমরা যাবে , (তোমাদের শিক্ষায়) মানুষ বিকৃতমনা হবে , এবং তোমরা মানুষকে ইসলাম ও আলেমগণের ব্যাপারে নিচু ধারণা দেবে।

তোমাদের এক গুরুদায়িত্ব রয়েছে। তোমরা যদি মাদ্রাসায় নিজেদের দায়িত্ব পালন না করো , নিজের পরিশুদ্ধির পরিকল্পনা না করো ; যদি শুধুমাত্র কিছু টার্ম শেখা , আইনের কিছু ইস্যু কিংবা বিচারশাস্ত্র শেখার পিছনে ছোটো , তাহলে তোমরা ইসলাম ও ইসলামী সমাজের যে ক্ষতি করবে খোদা আমাদের সেটা থেকে রক্ষা করুন। আল্লাহ রক্ষা করুন , কিন্তু তোমাদের দ্বারা মানুষকে বিকৃত ও বিপথগামী করা সম্ভব। যদি তোমাদের কাজ , কর্ম ও অনুচিত আচণের কারণে কোনো ব্যক্তি পথচ্যুত হয়ে ইসলাম ত্যাগ করে , তবে তুমি সবচে বড় কবিরা গুনাহর দোষে দোষী হবে , আর তোমার তওবা আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়াও কঠিন হবে। অনুরূপভাবে , (যদি তোমাদের কাজ , কর্ম ও আচরণের কারণে) একজন ব্যক্তি সঠিক পথ খুঁজে পায় , তবে একটা বর্ণনা অনুযায়ী সেটা ঐ সকল কিছুর চেয়ে উত্তম , যার উপর সূর্যরশ্মি বিকীরিত হয়। তোমাদের দায়িত্ব অনেক কঠিন। সাধারণ মানুষের চেয়ে তোমাদের দায়িত্ব বেশি। সাধারণ মানুষের জন্য কত কিছুই বৈধ , যা তোমাদের জন্য অনুমিত নয় , এমনকি হারামও হতে পারে ! অনেককিছুই সাধারণ মানুষের জন্য বৈধ , কিন্তু তোমরা তা করো , সেটা মানুষ পছন্দ করে না। অনৈতিক কাজের সামনে তোমরা চুপ করে থাকবে , এটা তারা প্রত্যাশা করে না , আর আল্লাহ না করুন যদি তোমরা সেগুলো করো , তবে মানুষ ইসলাম সম্পর্কেই খারাপ ধারণা করে বসবে , আলেম সমাজ সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হবে।

সমস্যা হলো : মানুষ যদি তোমাদের কাজকর্মকে প্রত্যাশার বিপরীত দেখতে পায় , তাহলে তারা ধর্ম থেকেই সরে যায়। তারা গোটা আলেম সমাজ থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয় , কোনো নির্দিষ্ট একজনের থেকে নয়। যদি তারা শুধু ঐ একজন আলেমের থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতো এবং শুধু ঐ ব্যক্তির ব্যাপারেই নিচু ধারণা করতো ! কিন্তু তারা যদি একজন আলেমকে প্রত্যাশিত আচরণের বাইরে অনুচিত কাজ করতে দেখে , তারা বিষয়টাকে এভাবে পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ করে দেখে না যে একই সময়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও খারাপ ও বিকৃতরুচির লোক আছে , এবং অফিস-কর্মচারীদের মাঝেও দুর্নীতি ও নোংরা কাজকর্ম দেখা যায় , সুতরাং এটা সম্ভব যে আলেমগণের মাঝেও এক বা একাধিক অধার্মিক ও পথচ্যুত মানুষ থাকতে পারে। সুতরাং , যদি একজন মুদি দোকানী একটা দোষ করে , তখন বলা হয় যে ওমুক দোকানী একজন খারাপ লোক। যদি একজন ফার্মাসিস্ট কোনো নোংরা কাজের অপরাধে দোষী হয় , বলা হয় যে ওমুক ফার্মাসিস্ট খারাপ লোক। কিন্তু যদি একজন দায়ী কোনো অনুচিত কাজ করে , তখন লোকে বলে না যে ওমুক ধর্মপ্রচারকটি খারাপ , বরং বলা হয় যে ধর্মপ্রচারকেরাই খারাপ !

জানাশোনা মানুষের দায়িত্ব বড় কঠিন ; অন্যদের তুলনায় উলামাগণের দায়িত্ব বেশি। উলামাগণের দায়িত্ব বিষয়ে উসুলে কাফি কিংবা ওয়াসসাইল বইয়ের সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো যদি দেখো , তাহলে দেখবে কিভাবে তারা জানাশোনা মানুষদের কঠিন দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার কথা বর্ণনা করেছে ! বর্ণনায় পাওয়া যায় যে , যখন আত্মা গলা পর্যন্ত পৌঁছে যায় , তখন আর তওবা করার সুযোগ থাকে না , এবং তখন কারো তওবা কবুল-ও হবে না। অবশ্য যদিও অজ্ঞদের তওবা আল্লাহ তাদের জীবনের শেষ মিনিট পর্যন্ত কবুল করে থাকেন। আরেকটা বর্ণনা অনুযায়ী কোনো আলেমের একটি গুনাহ ক্ষমা হবার আগে একজন অজ্ঞ মানুষের 70টি পাপ ক্ষমা করা হবে। এর কারণ হলো একজন আলেমের পাপ ইসলাম ও ইসলামী সমাজের জন্য খুবই ক্ষতিকর। যদি কোনো অসভ্য মূর্খ মানুষ একটা পাপ করে , সে কেবল নিজেরই দুর্ভাগ্য ডেকে আনে। কিন্তু যদি একজন আলেম পথচ্যুত হয় , যদি সে নোংরা কাজে লিপ্ত হয় , সে গোটা একটা দুনিয়াকে (আলম) নষ্ট করে। সে ইসলাম ও ইসলামের উলামাদের ক্ষতিসাধন করে।

আরেকটা বর্ণনা অনুযায়ী জাহান্নামের বাসিন্দাদের ঐসব আলেমের দুর্গন্ধ দ্বারা কষ্ট দেয়া হবে , যাদের কাজ ( 'আমল) তাদের জ্ঞান ( 'ইলম) মোতাবেক ছিলো না। ঠিক এই কারণেই , ইসলাম ও ইসলামী সমাজের লাভ-ক্ষতির ক্ষেত্রে এই দুনিয়ায় একজন আলেম ও একজন অজ্ঞ ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য আছে। কোনো আলেম যদি পথচ্যুত হয় , তাহলে খুবই সম্ভব যে তার গোটা কমিউনিটিই ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। আবার একজন আলেম যদি বিশুদ্ধ হন এবং ইসলামী আচরণবিধি ও নীতি-নৈতিকতা মেনে চলেন , তিনি গোটা কমিউনিটিকেই পরিশুদ্ধির দিকে পরিচালিত করবেন। এই গ্রীষ্মে আমি কয়েকটা এলাকায় গিয়েছিলাম। আমি দেখলাম একটা এলাকার মানুষজন আচার-ব্যবহারে বেশ ভালো , তাদের আচার-আচরণে ধার্মিকতার ছাপ। আসল ব্যাপার হলো তাদের মাঝে একজন আলেম ছিলেন , যিনি নিজে ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ন ছিলেন। যদি কোনো সমাজে , এলাকায় কিংবা রাষ্ট্রে একজন ন্যায়পরায়ন ধার্মিক আলেম বাস করেন , শুধু তাঁর উপস্থিতিই ঐ এলাকার মানুষের পথপ্রদর্শন ও পরিশুদ্ধিকে উন্নত করবে , এমনকি যদিও তিনি মৌখিকভাবে দাওয়াত দেয়া , গাইড করা ইত্যাদি না করেন। আমরা এমন মানুষকে দেখেছি যাঁর কেবল উপস্থিতিই শিক্ষাগ্রহণ ঘটায় , শুধুমাত্র তাদেরকে দেখলে , তাদের দিকে তাকালেই মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে তেহরানের সম্পর্কে আমার কাছে যদ্দুর খবর আছে , সেখানে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকার অবস্থা ভিন্ন। যে এলাকায় একজন বিশুদ্ধ আলেম বাস করেন , সেখানের মানুষের নৈতিকতা উন্নত , ঈমান দৃঢ়। আরেক এলাকায় , যেখানে এক দূর্নীতিগ্রস্ত লোক পাগড়ি পরে , এবং সে নামাজের ইমাম-ও হয়েছে , ব্যবসা খুলে বসেছে , লক্ষ্য করে দেখবে সেখানের মানুষেরা পথভ্রষ্ট হয়েছে , তাদেরকে দূষিত করা হয়েছে , বিকৃত করা হয়েছে। এটা সেই একই দূষণ , জাহান্নামের বাসিন্দারা যার দুর্গন্ধ দ্বারা শাস্তি ভোগ করবে। এটা সেই একই দুর্গন্ধ , যা শয়তান আলেমরা দুনিয়ায় বয়ে নিয়ে এসেছে , যার দুর্গন্ধে জাহান্নামীদের শাস্তি দেয়া হবে ; এরা সেইসব কর্মহীন আলেম , বিকৃতমনা আলেম। বিষয়টা এমন না যে তাদের দ্বারা জাহান্নামীরা কষ্ট পাবে কারণ তাদের (অর্থাৎ সেসব আলেমদের) সাথে কিছু (পাপ) যুক্ত হবে , বরং পরকালে এই আলেমের কপালে যা ঘটবে , তা এই দুনিয়াতেই প্রস্তুত করা হয়েছে। আমরা যা করি তার বাইরে আমাদেরকে কিছুই দেয়া হয় না। একজন আলেম যদি দুর্নীতিগ্রস্ত ও খারাপ হয় , তবে সে গোটা সমাজকেই নষ্ট করে ফেলে , যদিও এই দুনিয়ায় আমরা সেটার দুর্গন্ধ বুঝতে পারি না। কিন্তু পরকালে সেটা টের পাওয়া যাবে। কোনো অসভ্য-মূর্খ মানুষের ক্ষমতা নেই যে ইসলামি সোসাইটিতে সেই পরিমাণ দূর্নীতি ও দূষণ প্রবেশ করাবে। অসভ্য-মূর্খ মানুষেরা কখনো নিজেদেরকে ইমাম কিংবা ইমাম মাহদি দাবী করবে না , কিংবা নবীও দাবী করবে না , অথবা বলবে না যে তার কাছে ওহী নাযিল হয়েছে। বরং এটা হলো দুর্নীতিগ্রস্ত আলেমদের কাজ , যারা দুনিয়াকে নষ্ট করে : যদি একজন আলেম নষ্ট হয় , গোটা একটা দুনিয়া (আলম)-ই নষ্ট হয়ে যায়।

অধ্যায় 3

সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ : নফসের সাথে যুদ্ধ

আমাদের জীবনের আরও একটি বছর পার হয়ে গেলো। তোমরা তরুণেরা বৃদ্ধ বয়সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছো , আর আমরা বৃদ্ধরা এগিয়ে যাচ্ছি মৃত্যুর দিকে। এই শিক্ষাবর্ষে তোমরা তোমাদের পড়াশুনা ও জ্ঞানার্জনের মাত্রা সম্পর্কে জানতে পেরেছো। তোমরা জানো কতদূর তোমরা অর্জন করেছো এবং তোমাদের শিক্ষার ইমারত কতটা উঁচু হয়েছে। যাই হোক , আচরণের বিশুদ্ধতা , ধর্মীয় আচরণ শিক্ষা করা , ঐশী শিক্ষা এবং আত্মার পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রে তোমরা কী করেছো ? কী কী ইতিবাচক পদক্ষেপ তোমরা নিয়েছো ? তোমরা কি পরিশুদ্ধি নিয়ে , অর্থাৎ নিজের সংস্কার নিয়ে কোনো চিন্তা করেছিলে ? এই দিকে কোনো কর্মসূচী গ্রহণ করেছো কি ? দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার স্বীকার করতে হচ্ছে যে তোমরা চোখে পড়ার মতো কিছু করোনি , এবং নিজের পরিবর্তন ও আত্মিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তোমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নাওনি।

অধ্যায় 4

ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রের প্রতি পরামর্শ

পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিষয়ের ( scholarly matters)পড়াশুনার পাশাপাশি ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার-ও প্রয়োজন আছে। আধ্যাত্মিক সক্ষমতা অর্জনের জন্য নৈতিক পথপ্রদর্শক ও প্রশিক্ষকের প্রয়োজন , দরকার উপদেশ-পরামর্শ সেশনের। নীতিশাস্ত্র ও নৈতিক সংস্কারমূলক কর্মসূচী , আচরণ ও পরিশুদ্ধির উপর ক্লাস , ঐশী জ্ঞানার্জনের (যা ছিলো নবীগণের (আ.) মিশনের মূল লক্ষ্য) দিকনির্দেশনা ইত্যাদি বিষয় অবশ্যই ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত , এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে যেটুকু মনোযোগ দেয়া হয় , তা অতি নগন্য। আধ্যাত্মিকতার পড়াশুনা এখন কমে যাচ্ছে , ফলস্বরূপ ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রগুলো ভবিষ্যতে আর নৈতিকতার উপর পণ্ডিত গড়ে তুলতে পারবে না , গড়ে তুলতে পারবে না বিশুদ্ধ-প্রাণ নৈতিক শিক্ষক , ঐশ্বরিক মানব। প্রাথমিক বিষয়ের আলোচনা-অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকার কারণে মৌলিক ও ভিত্তিমূলক বিষয়ের পড়াশুনার সুযোগ হয়ে ওঠে না। সেসব মৌলিক বিষয় , মহাগ্রন্থ আল কুরআন যা উপস্থাপন করেছে এবং মহানবী (সা.) এবং অন্যান্য নবী (আ.) ও আউলিয়াগণ (আ.) যা উপস্থাপন করেছেন। পণ্ডিতসমাজের উল্লেখযোগ্য আইনজ্ঞ ও খ্যাতনামা প্রফেসরগণের উচিত তাঁদের বিভিন্ন লেকচার ও আলোচনায় মানুষকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে গড়ে তোলা ; উচিত আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিষয়গুলির উপর অধিক জোর দেয়া। ধর্মশিক্ষাকেন্দ্রের ছাত্রদের জন্য পাণ্ডিত্য ও আত্মিক বিশুদ্ধতা অর্জনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি তাদের মহান দায়িত্বের প্রতিও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

অধ্যায় 5

ধর্মশিক্ষার ছাত্রদের প্রতি পরামর্শ

আজকে তোমরা যারা এই মাদ্রাসাগুলোয় পড়াশুনা করছো , যারা আগামী দিনে সমাজের নেতৃত্ব ও পথপ্রদর্শনের দায়িত্ব নেবে ভেবোনা যে কেবলমাত্র কিছু ধর্মীয় টার্ম শেখা-ই তোমাদের দায়িত্ব ; কারণ তোমাদের অন্যান্য দায়িত্বও রয়েছে। এসব শিক্ষাকেন্দ্রে তোমাদের নিজেদেরকে অবশ্যই এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেনো যখন তোমরা কোনো গ্রাম বা শহরে যাবে , তখন সেখানের মানুষদের গাইড করতে পারবে এবং তাদেরকে আত্মশুদ্ধির পথ দেখাতে পারবে। যখন তোমরা ধর্মীয় আইনশিক্ষাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে পড়বে , তখন যেনো তোমরা নিজেরাই পরিশোধিত ও সুসংস্কৃত হও , যাতে মানুষকে ইসলামের নৈতিক আদবকায়দা , রীতিনীতি ইত্যাদি শিক্ষা দিয়ে সুশিক্ষিত করে তুলতে পারো এটাই কাম্য। আল্লাহ না করুন যদি তোমরা শিক্ষাকেন্দ্রে এসে নিজেদের সংস্কার করতে না পারো , আধ্যাত্মিক আদর্শকে উপলব্ধি করতে না পারো , তাহলে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন যেখানেই তোমরা যাবে , (তোমাদের শিক্ষায়) মানুষ বিকৃতমনা হবে , এবং তোমরা মানুষকে ইসলাম ও আলেমগণের ব্যাপারে নিচু ধারণা দেবে।

তোমাদের এক গুরুদায়িত্ব রয়েছে। তোমরা যদি মাদ্রাসায় নিজেদের দায়িত্ব পালন না করো , নিজের পরিশুদ্ধির পরিকল্পনা না করো ; যদি শুধুমাত্র কিছু টার্ম শেখা , আইনের কিছু ইস্যু কিংবা বিচারশাস্ত্র শেখার পিছনে ছোটো , তাহলে তোমরা ইসলাম ও ইসলামী সমাজের যে ক্ষতি করবে খোদা আমাদের সেটা থেকে রক্ষা করুন। আল্লাহ রক্ষা করুন , কিন্তু তোমাদের দ্বারা মানুষকে বিকৃত ও বিপথগামী করা সম্ভব। যদি তোমাদের কাজ , কর্ম ও অনুচিত আচণের কারণে কোনো ব্যক্তি পথচ্যুত হয়ে ইসলাম ত্যাগ করে , তবে তুমি সবচে বড় কবিরা গুনাহর দোষে দোষী হবে , আর তোমার তওবা আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়াও কঠিন হবে। অনুরূপভাবে , (যদি তোমাদের কাজ , কর্ম ও আচরণের কারণে) একজন ব্যক্তি সঠিক পথ খুঁজে পায় , তবে একটা বর্ণনা অনুযায়ী সেটা ঐ সকল কিছুর চেয়ে উত্তম , যার উপর সূর্যরশ্মি বিকীরিত হয়। তোমাদের দায়িত্ব অনেক কঠিন। সাধারণ মানুষের চেয়ে তোমাদের দায়িত্ব বেশি। সাধারণ মানুষের জন্য কত কিছুই বৈধ , যা তোমাদের জন্য অনুমিত নয় , এমনকি হারামও হতে পারে ! অনেককিছুই সাধারণ মানুষের জন্য বৈধ , কিন্তু তোমরা তা করো , সেটা মানুষ পছন্দ করে না। অনৈতিক কাজের সামনে তোমরা চুপ করে থাকবে , এটা তারা প্রত্যাশা করে না , আর আল্লাহ না করুন যদি তোমরা সেগুলো করো , তবে মানুষ ইসলাম সম্পর্কেই খারাপ ধারণা করে বসবে , আলেম সমাজ সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হবে।

সমস্যা হলো : মানুষ যদি তোমাদের কাজকর্মকে প্রত্যাশার বিপরীত দেখতে পায় , তাহলে তারা ধর্ম থেকেই সরে যায়। তারা গোটা আলেম সমাজ থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয় , কোনো নির্দিষ্ট একজনের থেকে নয়। যদি তারা শুধু ঐ একজন আলেমের থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতো এবং শুধু ঐ ব্যক্তির ব্যাপারেই নিচু ধারণা করতো ! কিন্তু তারা যদি একজন আলেমকে প্রত্যাশিত আচরণের বাইরে অনুচিত কাজ করতে দেখে , তারা বিষয়টাকে এভাবে পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ করে দেখে না যে একই সময়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও খারাপ ও বিকৃতরুচির লোক আছে , এবং অফিস-কর্মচারীদের মাঝেও দুর্নীতি ও নোংরা কাজকর্ম দেখা যায় , সুতরাং এটা সম্ভব যে আলেমগণের মাঝেও এক বা একাধিক অধার্মিক ও পথচ্যুত মানুষ থাকতে পারে। সুতরাং , যদি একজন মুদি দোকানী একটা দোষ করে , তখন বলা হয় যে ওমুক দোকানী একজন খারাপ লোক। যদি একজন ফার্মাসিস্ট কোনো নোংরা কাজের অপরাধে দোষী হয় , বলা হয় যে ওমুক ফার্মাসিস্ট খারাপ লোক। কিন্তু যদি একজন দায়ী কোনো অনুচিত কাজ করে , তখন লোকে বলে না যে ওমুক ধর্মপ্রচারকটি খারাপ , বরং বলা হয় যে ধর্মপ্রচারকেরাই খারাপ !

জানাশোনা মানুষের দায়িত্ব বড় কঠিন ; অন্যদের তুলনায় উলামাগণের দায়িত্ব বেশি। উলামাগণের দায়িত্ব বিষয়ে উসুলে কাফি কিংবা ওয়াসসাইল বইয়ের সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো যদি দেখো , তাহলে দেখবে কিভাবে তারা জানাশোনা মানুষদের কঠিন দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার কথা বর্ণনা করেছে ! বর্ণনায় পাওয়া যায় যে , যখন আত্মা গলা পর্যন্ত পৌঁছে যায় , তখন আর তওবা করার সুযোগ থাকে না , এবং তখন কারো তওবা কবুল-ও হবে না। অবশ্য যদিও অজ্ঞদের তওবা আল্লাহ তাদের জীবনের শেষ মিনিট পর্যন্ত কবুল করে থাকেন। আরেকটা বর্ণনা অনুযায়ী কোনো আলেমের একটি গুনাহ ক্ষমা হবার আগে একজন অজ্ঞ মানুষের 70টি পাপ ক্ষমা করা হবে। এর কারণ হলো একজন আলেমের পাপ ইসলাম ও ইসলামী সমাজের জন্য খুবই ক্ষতিকর। যদি কোনো অসভ্য মূর্খ মানুষ একটা পাপ করে , সে কেবল নিজেরই দুর্ভাগ্য ডেকে আনে। কিন্তু যদি একজন আলেম পথচ্যুত হয় , যদি সে নোংরা কাজে লিপ্ত হয় , সে গোটা একটা দুনিয়াকে (আলম) নষ্ট করে। সে ইসলাম ও ইসলামের উলামাদের ক্ষতিসাধন করে।

আরেকটা বর্ণনা অনুযায়ী জাহান্নামের বাসিন্দাদের ঐসব আলেমের দুর্গন্ধ দ্বারা কষ্ট দেয়া হবে , যাদের কাজ ( 'আমল) তাদের জ্ঞান ( 'ইলম) মোতাবেক ছিলো না। ঠিক এই কারণেই , ইসলাম ও ইসলামী সমাজের লাভ-ক্ষতির ক্ষেত্রে এই দুনিয়ায় একজন আলেম ও একজন অজ্ঞ ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য আছে। কোনো আলেম যদি পথচ্যুত হয় , তাহলে খুবই সম্ভব যে তার গোটা কমিউনিটিই ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে। আবার একজন আলেম যদি বিশুদ্ধ হন এবং ইসলামী আচরণবিধি ও নীতি-নৈতিকতা মেনে চলেন , তিনি গোটা কমিউনিটিকেই পরিশুদ্ধির দিকে পরিচালিত করবেন। এই গ্রীষ্মে আমি কয়েকটা এলাকায় গিয়েছিলাম। আমি দেখলাম একটা এলাকার মানুষজন আচার-ব্যবহারে বেশ ভালো , তাদের আচার-আচরণে ধার্মিকতার ছাপ। আসল ব্যাপার হলো তাদের মাঝে একজন আলেম ছিলেন , যিনি নিজে ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ন ছিলেন। যদি কোনো সমাজে , এলাকায় কিংবা রাষ্ট্রে একজন ন্যায়পরায়ন ধার্মিক আলেম বাস করেন , শুধু তাঁর উপস্থিতিই ঐ এলাকার মানুষের পথপ্রদর্শন ও পরিশুদ্ধিকে উন্নত করবে , এমনকি যদিও তিনি মৌখিকভাবে দাওয়াত দেয়া , গাইড করা ইত্যাদি না করেন। আমরা এমন মানুষকে দেখেছি যাঁর কেবল উপস্থিতিই শিক্ষাগ্রহণ ঘটায় , শুধুমাত্র তাদেরকে দেখলে , তাদের দিকে তাকালেই মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে তেহরানের সম্পর্কে আমার কাছে যদ্দুর খবর আছে , সেখানে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকার অবস্থা ভিন্ন। যে এলাকায় একজন বিশুদ্ধ আলেম বাস করেন , সেখানের মানুষের নৈতিকতা উন্নত , ঈমান দৃঢ়। আরেক এলাকায় , যেখানে এক দূর্নীতিগ্রস্ত লোক পাগড়ি পরে , এবং সে নামাজের ইমাম-ও হয়েছে , ব্যবসা খুলে বসেছে , লক্ষ্য করে দেখবে সেখানের মানুষেরা পথভ্রষ্ট হয়েছে , তাদেরকে দূষিত করা হয়েছে , বিকৃত করা হয়েছে। এটা সেই একই দূষণ , জাহান্নামের বাসিন্দারা যার দুর্গন্ধ দ্বারা শাস্তি ভোগ করবে। এটা সেই একই দুর্গন্ধ , যা শয়তান আলেমরা দুনিয়ায় বয়ে নিয়ে এসেছে , যার দুর্গন্ধে জাহান্নামীদের শাস্তি দেয়া হবে ; এরা সেইসব কর্মহীন আলেম , বিকৃতমনা আলেম। বিষয়টা এমন না যে তাদের দ্বারা জাহান্নামীরা কষ্ট পাবে কারণ তাদের (অর্থাৎ সেসব আলেমদের) সাথে কিছু (পাপ) যুক্ত হবে , বরং পরকালে এই আলেমের কপালে যা ঘটবে , তা এই দুনিয়াতেই প্রস্তুত করা হয়েছে। আমরা যা করি তার বাইরে আমাদেরকে কিছুই দেয়া হয় না। একজন আলেম যদি দুর্নীতিগ্রস্ত ও খারাপ হয় , তবে সে গোটা সমাজকেই নষ্ট করে ফেলে , যদিও এই দুনিয়ায় আমরা সেটার দুর্গন্ধ বুঝতে পারি না। কিন্তু পরকালে সেটা টের পাওয়া যাবে। কোনো অসভ্য-মূর্খ মানুষের ক্ষমতা নেই যে ইসলামি সোসাইটিতে সেই পরিমাণ দূর্নীতি ও দূষণ প্রবেশ করাবে। অসভ্য-মূর্খ মানুষেরা কখনো নিজেদেরকে ইমাম কিংবা ইমাম মাহদি দাবী করবে না , কিংবা নবীও দাবী করবে না , অথবা বলবে না যে তার কাছে ওহী নাযিল হয়েছে। বরং এটা হলো দুর্নীতিগ্রস্ত আলেমদের কাজ , যারা দুনিয়াকে নষ্ট করে : যদি একজন আলেম নষ্ট হয় , গোটা একটা দুনিয়া (আলম)-ই নষ্ট হয়ে যায়।


4

5

6

7

8

9

10

11

12