শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস0%

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস লেখক:
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

লেখক: আল্লামা মুহাম্মাদ রেজা আল -মুজাফফর
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বিভাগ:

ভিজিট: 9050
ডাউনলোড: 1910

পাঠকের মতামত:

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 51 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 9050 / ডাউনলোড: 1910
সাইজ সাইজ সাইজ
শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

লেখক:
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বাংলা

22। ইসলাম ও তৎপূর্ববর্তী ঐশী ধর্মসমূহকে প্রতিপাদন করার উপায়ঃ

যদি কেউ ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে আমাদের নিকট প্রশ্ন তোলে তাহলে আমরা এক চিরন্তন মোজেযাকে প্রমাণের মাধ্যমে ইসলামের সত্যতা প্রতিপাদন করতে পারি। আর তা হলো পবিত্র কোরআন যার সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। অনুরূপভাবে তা আমাদের প্রাথমিক প্রশ্ন বা দ্বিধাকে দূরীভূত করে আমাদের অন্তরকে তুষ্ট করারও উপায়। মুক্ত চিন্তার অধিকারী কিছু মানুষ যারা তাদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে চায় ,তাদের মনে কখনো কখনো কিছু প্রশ্নের উদয় হয়। এ পন্থা অবলম্বন করে আমরা তাদেরকেও তুষ্ট করতে পারি।

পূর্ববর্তী শরীয়তসমূহ যেমন- ইহুদী ,খ্রীষ্টান ,ইত্যাদিতে সন্দেহ করলে তাদের সত্যতা প্রমাণ করতে আমাদের নিজেদেরকে ও প্রশ্নকারীকে তুষ্ট করার কোন পন্থা নেই যদি না সর্বাগ্রে কোরআনের সত্যতা প্রমাণ করি ও ইসলামের প্রতি আমাদের বিশ্বাস থেকে তা নিষ্কাশন করি। কারণ কোরআনের মত এমন কোন মোজেযা ঐগুলোর জন্য আজ আর আমাদের হাতে অবশিষ্ট নেই। পূর্ববর্তী নবীগণের (আ.) মোজেযা ও অলৌকিক ঘটনা তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়। বর্ণনার ধরনে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আবার পূর্ববর্তী নবীদের গ্রন্থ বলে পরিগণিত যে সমস্ত গ্রন্থ আমাদের নিকট আছে যেমন- তৌরাত ,ইঞ্জিল তা কোনভাবেই চিরন্তন মোজেযা নয়। যা দ্বারা কাঙ্ক্ষিতরূপে ঐ ধর্মগুলোর সত্যতা প্রমাণের জন্য এমন কোন তুষ্টকারী দলিল হিসেবে ব্যবহার করা যায় যেটি ইসলামের সত্যতাকে স্বীকার করলে করা যায়।

স্পষ্টতঃই আমাদের জন্য (যেহেতু আমরা মুসলমান) পূর্ববর্তী ধর্মের নবীদেরকে স্বীকার করা যুক্তিসঙ্গত। কারণ আমরা যখন ইসলাম ধর্মকে স্বীকার করে নিব তখন ইসলামে যা কিছু আছে কিংবা যা কিছুকে সত্যায়িত করে তার সবগুলোকে মেনে নেয়া আমাদের জন্য আবশ্যক। আর ইসলামের একটি শিক্ষা হলো পূর্ববর্তী নবীগণের নবুওয়াতকে স্বীকার করে নেয়া যা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

অতএব ,মুসলমানগণ ইসলামের শিক্ষাকে বক্ষে ধারণ করার পর ইহুদী ও খ্রীষ্টান ধর্মের ও তৎপূর্ববর্তী ধর্মগুলোর সত্যতা প্রমাণের মুখাপেক্ষী নয়। কারণ ইসলামের সত্যতা স্বীকার করার মানেই হলো পূর্ববর্তী ধর্মসমূহের সত্যতা স্বীকার করা। ইসলামে বিশ্বাস করার মানেই হলো পূর্ববর্তী রাসুলগণে বিশ্বাস স্থাপন করা। সুতরাং মুসলমানদের জন্য ঐ ধর্মগুলো সম্পর্কে পর্যালোচনা এবং ঐগুলোর বাহকের মোজেযা সম্পর্কে অনুসন্ধানের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। কারণ ইসলামে বিশ্বাস করার কারণেই পূর্ববর্তী ধর্ম ও নবীগণের উপর বিশ্বাস করা তার জন্য আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে।

হ্যাঁ ,যদি কেউ ইসলামের সত্যতা প্রমাণের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান করেও তুষ্ট না হতে পারে (তার জ্ঞান ও পরিচিতির সীমাবদ্ধতার কারণে) তবে তাকে খ্রীষ্টান ধর্মের সত্যতা অনুসন্ধান করতে হবে। কারণ ইসলামের পূর্বে সর্বশেষ ধর্ম হলো এটিই। অতঃপর তাতে অনুসন্ধান করল কিন্তু তাতেও বিশ্বাস আনতে পারল না। তবে তাকে এর অব্যবহতি পূর্বের ধর্ম নিয়ে গবেষণা চালাতে হবে। আর এ ধর্মটি হলো ইহুদী ধর্ম। তাতেও যদি ফল না হয় তবে তাকে কোন ধর্ম সম্পর্কে ইয়াকীন বা বিশ্বাস অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত একে একে সব ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে।

বিপরীতক্রমে ,যে ইহুদী বা খ্রীষ্টানবাদে বিশ্বাসী তার ব্যাপার এর বিপরীত। সুতরাং একজন ইহুদীকে নিজের ধর্মের ব্যাপারে বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে খ্রীষ্টবাদ বা ইসলামের সত্যতা অনুসন্ধানের কোন অর্থ থাকতে পারে না। বরং (কোন ধর্মের প্রতি বদ্ধমূল ধারণার পূর্বে) বুদ্ধিবৃত্তির দাবী হলো গবেষণা ও অনুসন্ধান চালানো। অনুরূপ ,খ্রীষ্টানদেরও কেবলমাত্র খ্রীষ্টবাদ নিয়ে তুষ্ট থাকা উচিৎ নয়। বরং তার জন্য আবশ্যক হলো ইসলাম ধর্ম ও এর সত্যতা সম্পর্কে গবেষণা ও অনুসন্ধান করা। গবেষণা ও অনুসন্ধান ব্যতীত কোন ধর্মে তুষ্ট থাকার কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। কারণ ইহুদী ধর্ম এবং তদানুরূপ খ্রীষ্টান ধর্মের কোনটিই তাদের পরবর্তী এমন কোন ধর্মের আবির্ভাবকে অস্বীকার করে না যা এদের স্থলাভিষিক্ত ও এতদ্ভয়ের রহিতকারী হবে। মূসা (আ.) ও ঈসা (আ.) দু জনের কেউই বলেননি যে ,তাদের পরে কোন নবী আসবে না।

অতএব ,কিরূপে ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা তাদের বিশ্বাসের উপর নিশ্চিত থাকতে পারে এবং তাদের দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকতে পারে যদিও তারা তাদের পরবর্তী শরীয়তের উপর অনুসন্ধান চালায়নি ?যেমন- ইহুদীরা খ্রীষ্টান ধর্মের উপর ;অনুরূপ ,খ্রীষ্টানরা ও ইহুদীরা ইসলামের উপর। কিন্তু ফিতরাতগত (স্বভাবগত) বুদ্ধিবৃত্তির চাহিদা হলো পরবর্তী দাবীর সত্যতার উপর অনুসন্ধান চালানো। কারণ যদি তখন এর সত্যতা প্রমাণিত হয় ,তবে স্বীয় দ্বীন ত্যাগ করে শেষোক্ত দ্বীনে বিশ্বাস আনয়ন করবে এবং যদি এর সত্যতা প্রমাণিত না হয় তা ’ হলে বুদ্ধিবৃত্তির বিধান মোতাবেক তাদের পূর্ববর্তী ধর্মে বহাল থাকাই সঠিক।

তবে মুসলমান (যা ইতিপূর্বে বলেছিলাম) যেহেতু ইসলামে বিশ্বাস করে ,সেহেতু তার জন্য অন্য কোন ধর্মে অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই ,হোক সে এর পূর্ববর্তী ধর্ম কিংবা এর পরবর্তী কোন ধর্ম। পূর্ববর্তী ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা করার প্রয়োজন না থাকার কারণ ইসলাম ঐগুলোকে সত্যায়িত করছে। সুতরাং ঐগুলো সম্পর্কে দলিল অনুসন্ধানের প্রয়োজন কী ?ঐগুলো সম্পর্কে ইসলামের মতামত হলো- ইসলাম ঐগুলোকে রদ করেছে। সুতরাং ঐ ধর্মের বিধি বা কিতাব মোতাবেক মুসলমানদেরকে আমল করতে হবে না। অপরদিকে ইসলাম পরবর্তী কোন ধর্ম সম্পর্কে অনুসন্ধানের প্রয়োজন না থাকার কারণ হিসেবে হযরত মোহাম্মাদ (সা.) এর বাণী তুলে ধরা যায়।

তিনি বলেন-

আমার পর কোন নবী আসবে না।

আর প্রত্যেক মুসলমানরেই বিশ্বাস যে তিনি হলেন সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত। পবিত্র কোরআনের ভাষায়-

তিনি {হযরত মোহাম্মদ (সা.) }নিজের মনগড়া কোন কথা বলেন না যদি না তা তার উপর অবতীর্ণ ওহী হয়। (সুরা নাজম-3-4)

সুতরাং ইসলাম পরবর্তী কোন ধর্ম (যদি কেউ দাবী করে থাকে) সম্পর্কে কেনইবা আমরা দলিল অনুসন্ধান করব ?কারণ তা তো কিয়ামত পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয়েই আছে।

তবে এখন মুসলমানদের জন্য এ প্রশ্ন এসে দাড়ায় যে কোন পন্থায় সঠিকভাবে হযরত মোহাম্মদের (সা.) উপর অবতীর্ণ শরীয়তের হুকুম আহকুম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যাবে ?কারণ নবীর (সা.) রিসালাতের সময়কাল থেকে অনেক যুগ ও বর্ষের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। আর ইতিমধ্যেই নানা মাযহাব ,ফেরকা ও মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে। তাহলে কোনটি সঠিক ?কারণ মুসলমানদের দায়িত্ব হলো সমস্ত হুকুম যেরূপে নাযিল হয়েছে সেরূপ আমল করা। কিন্ত কি করে একজন মুসলমান নিশ্চিত হবে যে ,এ হুকুমগুলো ঠিক যে রকম নাযিল হয়েছে সেরকমই। কারণ ,মুসলমানরা একাধিক দল ও মতে বিভক্ত ,তাদের নামায একরকম নয়। তাদের এবাদত ও তাদের আচরণ বিভিন্ন্। তাহলে তার কী করা উচিৎ ?কোন পদ্ধতিতে সে নামায পড়বে ?কোন পদ্ধতি সে অবলম্বন করবে তার এবাদত ও লেনদেনের ক্ষেত্রে। যেমন- বিবাহ ,তালাক ,উত্তরাধিকার ,ক্রয়-বিক্রয় ,ফৌজদারী ,বিধি ,শাস্তি প্রদান ,রক্তদান ,ইত্যাদি।

একজন মুসলমানের জন্য এটা সঠিক নয় যে সে তার পূর্ব পুরুষদেরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করবে কিংবা তার বন্ধু-বান্ধবকে অনুসরণ করবে। বরং তার ও তার নিজের মধ্যে যা কিছু আছে কিংবা তার ও তার মহান আল্লাহর মধ্যে যা কিছু আছে সে ব্যাপারে তাকে নিশ্চিত হতে হবে। এখানে পক্ষপাতিত্ব ,কপটতা ও কুসংস্কারের কোন সুযোগ নেই বা কোন অজুহাতই গ্রহণযোগ্য নয়। সে যাতে ভাল বিশ্বাস রাখে তার জন্য তা যৌক্তিকভাবে গ্রহণ করা আবশ্যক ,যাতে সে তার ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা এবং তার প্রভুর প্রতি তার দায়িত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে। আর তখন আল্লাহ তাকে তার কৃতকর্মের ব্যাপারে শাস্তি দিবেন না যখন সে নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে কাজটি সম্পন্ন করবে।

পবিত্র কোরআনের ভাষায়-

মানুষ কি মনে করে কোন উদ্দেশ্য ব্যতীতই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। (সুরা কিয়ামাহ- 36)

মহান আল্লাহ আরও বলেন-

প্রকৃতপক্ষে ,মানুষ নিজেই তার নিজের বিরুদ্ধে সুষ্পষ্ট প্রমাণ। (সুরা কিয়ামাহ-14)

নিশ্চয়ই এ কোরআন হলো স্মারক ,যে কেউ ইচ্ছা করলে তার প্রভুর পথ বেছে নিতে পারে। (সুরা মুজাম্মিল -19)

সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটি একজন মুসলমান তার নিজেকে করতে পারে তা হলো- সে আহলে বাইতের ” পথ নির্বাচন করবে না অন্য কারো পথ ?যদি আহলে বাইতের পথ বেছে নেয় ,তবে তা কি দ্বাদশ ইমামীয়াদের পথটি সঠিক ,না-কি এ ধরনের অন্য কোন ফেরকা ?আর যদি আহলে বাইতের পথ ভিন্ন অন্য কোন পথ ,যেমন- আহলে সুন্নতের পথ ,বেছে নেয় তবে তাকে চার মাযহারের কোন একটিকে অনুসরণ করতে হবে ,না কি অন্য কোন একটিকে ?এ প্রশ্নগুলো সমস্ত মুক্ত চিন্তার অধিকারী মানুষের মধ্যেই জাগতে পারে ,যতক্ষণ পর্যন্ত না সঠিক কোন পথ খুঁজে পায়।

অতএব ,আমাদের জন্য ইমামতের আলোচনা করা সমীচীন। যা দ্বাদশ ইমামীয়ারা বিশ্বাস করে।

পর্ব - 3

ইমামত

23। ইমামত সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,ইমামত হলো দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহের একটি যার উপর বিশ্বাস ব্যতীত ঈমান পরিপূর্ণ হয় না। এক্ষেত্রে পূর্বপুরুষ ,আত্মীয়-স্বজন ও শিক্ষক কাউকেই অনুসরণ করা বৈধ নয় যদিও তারা উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকে। বরং এর উপর অনুসন্ধান এবং পরীক্ষা ও নিরীক্ষা চালানো জরুরী। যেমন- তা জরুরী হলো তাওহীদ ও নবুওয়াতের ক্ষেত্রে।

ন্যূনতমপক্ষে ,কারো উপর অর্পিত শরীয়তের কোন বিষয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে তার ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক বিশ্বাসের উপর। সুতরাং যদি কেউ মনে করে যে ,ইমামতের ব্যাপারটি দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহের অন্তর্গত নয় ,তথাপি তাকে ইমামতের ধারণাকে পরীক্ষা করে নিতে হবে যদি এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে চায়। কিন্তু কারো অন্ধ অনুসরণ করা যাবে না। আমরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ধরে নিই যে আমরা সকলেই ইসলামী বিধান অনুসারে চলতে বাধ্য কিন্তু আমরা সঠিকভাবে সে হুকুমগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত নই। তবে ঐ সকল ব্যাপারে আমাদেরকে বিশ্বস্ত কারো শরনাপন্ন হতে হবে যার ফলে আমরা এর (ভুল-ত্রুটি) দায়-দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে পারি। শীয়া মাযহাবের বিশ্বাস মোতাবেক বর্ণিত এমন ব্যক্তিবর্গ হলেন আহলে বাইতের ইমামগণ (আ.) । আবার অন্যদের দৃষ্ঠিকোণ থেকে অন্য কেউ।

আমরা বিশ্বাস করি যে ,নবুওয়াতের মতই ইমামতও হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া ও করুণা। সুতরাং প্রত্যেক যুগেই পথ প্রদর্শক ইমাম থাকা আবশ্যক যিনি মানুষের হেদায়াতকারী এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের সংবাদদাতা হিসেবে মহানবীর (সা.) প্রতিনিধিত্ব করবেন। মহানবী (সা.) সর্বসাধারণের উপর যেরূপ সার্বজনীন বেলায়াত বা কর্তৃত্ব করতেন তিনি সেরূপ কর্তৃত্ব করবেন জনগণকে যাবতীয় কল্যাণের পথে পরিচালনা করার জন্য ,ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ,অন্যায়-অত্যাচার নির্মূল করার জন্য এবং তাদের পারস্পরিক শত্রুতা দূর করার জন্য।

অতএব ,ইমামত হলো প্রকারন্তরে নবুওয়াতের মিশনেরই ধারাবাহিকতা। নবী ও রাসূল প্রেরণ যে কারণে আবশ্যক ঠিক একই কারণেই রাসূলের পরে ইমাম নিযুক্ত করাও আবশ্যক। আর একারণেই আমরা বলি ,ইমাম কেবলমাত্র মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই নবীর মাধ্যমে অথবা পূর্ববর্তী ইমামের মাধ্যমেই নিয়োগ লাভ করেন। মানুষের ইচ্ছা বা রায়ের কোন অধিকার এখানে নেই। সুতরাং বিষয়টি এমন নয় যে মানুষ যখন যাকে ইচ্ছে করবে তাকে ইমাম বানাবে ,আবার যখন যাকে ইচ্ছে করবে তাকে প্রত্যাখান করবে। অনুরূপভাবে ,তাদের পক্ষে ইমাম ব্যতীত টিকে থাকা সম্ভব নয়। মহানবী (সা.) থেকে এক মোস্তাফিজ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে

যদি কেউ তার যামানার ইমামকে না চিনে মৃত্যুবরণ করে ,তবে তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়্যাতের মৃত্যু।

সুতরাং এমন কোন সময় থাকা সম্ভব নয় যখন আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত কোন ইমাম থাকবেন না। এখন মানুষ তাকে ইমাম হিসেবে গ্রহণ করুক বা না করুক ,তাকে সাহায্য করুক বা না করুক ,তাকে মান্য করুক বা না করুক ,তিনি প্রকাশ্যে থাকুন বা লোক চক্ষুর আড়ালে থাকুন তাতে কিছু যায় আসে না। যদি মানুষের নিকট থেকে গুহায় এবং পাহাড়ী পথে আত্মগোপন করা মহানবীর (সা.) জন্যে সঠিক হয় ,তবে ইমামের জন্যও তা সঠিক। অপরদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ আত্মগোপন সুদীর্ঘ হোক বা নাতিদীর্ঘ হোক তাতে কোন তফাৎ নেই। মহান আল্লাহ বলেন-

প্রত্যেক জাতির জন্য্ইে রয়েছে পথ প্রদর্শক। (সূরা রা দ- 8)

তিনি আরও বলেন-

এমন কোন জাতি ছিলনা যেখানে ভয় প্রদর্শনকারী ছিল না। (সুরা ফাতির -22)

24। ইমামের পবিত্রতা সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,ইমামগণেরও (আ.) নবীগণের (আ.) মতই প্রকাশিত অপ্রকাশিত সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকা আবশ্যক। অনুরূপ তারা সকল প্রকার ভুল-ত্রুটির উর্ধে। কারণ ইমামগণ (আ.) হলেন শরীয়তের রক্ষাকারী ও প্রতিষ্ঠাতা ,যেরূপ করেছিলেন নবী (সা .) । যে কারণে নবীদের পবিত্রতায় বিশ্বাস করা আমাদের জন্য আবশ্যক ঠিক একই কারণে ইমামগণের (আ.) পবিত্রতায় বিশ্বাস করাও আমাদের জন্য আবশ্যক। এ ব্যাপারে কোন পার্থক্য নেই। আরবীতে একটা প্রবাদ আছে-

আল্লাহর পক্ষে এটা অসম্ভব নয় যে তিনি সমস্ত গুণকে একজনের মধ্যে পুঞ্জীভূত করতে পারেন।

25। ইমামের জ্ঞান ও গুণাবলী সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,ইমামেরও মহানবীর (সা.) মত বীরত্ব ,মহত্ত্ব ,আত্মসম্মান ,সত্যবাদিতা ,ন্যায় পরায়ণতা ,বিচক্ষনণতা ,জ্ঞান ,প্রজ্ঞা ও নৈতিকতা ইত্যাদি পরিপূর্ণ গুণের ক্ষেত্রে সবার সেরা হওয়া আবশ্যক। আর এক্ষেত্রে নবীর (সা.) শ্রেষ্টত্বের জন্য যে দলিল প্রযোজ্য ইমামের শ্রেষ্ঠত্বের জন্যও সেই একই দলিল প্রযোজ্য।

ইমাম তার শিক্ষা ,ঐশী হুকুমসমূহ এবং সমস্ত জ্ঞান নবীর মাধ্যমে কিংবা তার পূর্ববর্তী ইমামের মাধ্যমে লাভ করে থাকেন। যদি কোন নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হয় তবে তিনি তা আল্লাহ প্রদত্ত তার পবিত্র আত্মিক যোগ্যতার কারণে এলহামের মাধ্যমে জানতে পারেন। সুতরাং তিনি যখন কোন কিছুর প্রতি মনোনিবেশ করেন ও তার স্বরূপ উদঘাটন করতে প্রয়াসী হন তখন কোন প্রকার ভুল-ত্রুটি ব্যতীতই ঐ বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত হন। আর এ জন্য তাকে কোন প্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল কিংবা বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হয় না। তথাপি তাদের জ্ঞান ততোধিক বৃদ্ধি ও দৃঢ়করণ সম্ভব। (অর্থাৎ এমন নয় যে তাদের জ্ঞান এমন পর্যায়ে আছে যে আর বাড়তে পারে না।)

এ জন্যে মহানবী (সা.) তার দোয়ায় বলতেন-

প্রভু হে! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি কর।

মনস্তাত্বিক আলোচনায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে ,প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এমন ঘটনা অন্ততঃ দু একবার ঘটে থাকে যে ,সে তার অনুমান শক্তির মাধ্যমে কোন বিষয়ের জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটিও এলহামের একটি অংশ। কারণ ,মহান আল্লাহই তাকে এ শক্তি দিয়েছেন। আর এ অনুমান-শক্তি ব্যক্তিভেদে দুর্বল বা শক্তিশালী কিংবা কম বা বেশী হতে পারে। যাহোক এমন একটি মুহুর্তে মানুষের অন্তর এক ধরনের জ্ঞান লাভ করে থাকে। অথচ এজন্য তাকে চিন্তা ,দলিলের অবতারণা কিংবা শিক্ষকের শরণাপন্ন হতে হয় না। প্রত্যেকেই তার জীবনে অসংখ্যবার এ ধরনের সুযোগ লাভ করে। সুতরাং মানুষের পক্ষে এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ উৎকর্ষে পৌঁছা সম্ভব। আর এ ব্যাপারে সমসাময়িক ও প্রাক্তন উভয় যুগের দার্শনিকগণ আলোচনা করেছেন।

সুতরাং আমরা মনে করি ইমাম এলহাম লাভের সর্বোচ্চ যোগ্যতায় পৌঁছে যান এবং আমরা বলি এটা আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি। ফলে তার পবিত্র পরিশুদ্ধ আত্মার মাধ্যমে তিনি যে কোন অবস্থায় যে কোন মুহুর্তে যে কোন বিষয় সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন। সুতরাং তিনি যখন কোন বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন ও সে সম্পর্কে জানতে চান তখন কোন প্রকার নাম ভূমিকা বা শিক্ষা ব্যতীতই তার এ পবিত্র এলহাম শক্তির মাধ্যমেই ঐ বিষয়ে অবগত হন। তিনি যখন কোন বিষয় সম্পর্কে জানতে চান তখন তা তার পবিত্র আত্মার উপর সুষ্পষ্টরূপে আপতিত হয় যেমন আপতিত হয় নির্মল আয়নার উপর কোন বস্তুর প্রতিচ্ছবি।

পবিত্র ইমামগণের (আ.) জীবন ইতিহাস থেকে এ ব্যাপারটি সুষ্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়। আমরা দেখতে পাই যে ,মহানবীর (সা.) মত ইমামগণও শৈশব জীবনের কোন সময়ই কারো নিকট প্রশিক্ষণ লাভ করেননি ,কোন শিক্ষকের শরণাপন্ন হননি-এমনকি লেখাপড়াও করেননি। তাদের জীবনে এমন কোন লেখক ও শিক্ষক দেখা যায় না যে তাদেরকে জ্ঞান দিয়েছেন। অথচ তারা হলেন পৃথিবীতে সমস্ত জ্ঞানের আধার এবং অতুলনীয়। সুতরাং তাদের জীবনে এমন কোন প্রশ্ন আসেনি যার তাৎক্ষনিক জবাব তারা দেননি। তারা কখনো "জানিনা ’ কথাটি উচ্চারণ করেননি। এমন কোন প্রশ্ন ছিল না যার জন্যে তারা কালক্ষেপণ করেছিলেন কিংবা চিন্তার আশ্রয় নিয়েছিলেন।

অপরদিকে এমন কোন ইসলামী পন্ডিত বক্তা কিংবা বিশেষজ্ঞ খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি তার জীবনী গ্রন্থে লিখেছেন যে ,তিনি পড়ালেখা করেননি কিংবা কোন পন্ডিতের নিকট জ্ঞানার্জন করেননি অথবা কোন বিষয়ের জ্ঞানে তার কোন সন্দেহ নেই। কারণ মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতি এরকমই।