শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস0%

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস লেখক:
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

লেখক: আল্লামা মুহাম্মাদ রেজা আল -মুজাফফর
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বিভাগ:

ভিজিট: 9502
ডাউনলোড: 1999

পাঠকের মতামত:

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 51 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 9502 / ডাউনলোড: 1999
সাইজ সাইজ সাইজ
শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

লেখক:
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বাংলা

26। ইমামগণের (আ.) আনুগত্য সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,ইমামগণ (আ.) হলেন সেই কর্তৃপক্ষ যাঁদের আনুগত্য করা মহান আল্লাহ আমাদের জন্যে বাধ্যতামূলক করেছেন। তারা মানুষের জন্য স্বাক্ষী। তারা হলেন আল্লাহর পথে দ্বার স্বরূপ ও পথ নির্দেশক। তার (আল্লাহর) জ্ঞানের সংরক্ষক ,ওহীর ব্যাখ্যাকারী ,তাওহীদের স্তম্ভ ,তার মারেফাতের তত্ত্বাবধায়ক। তারা পৃথিবীর মানুষের নিরাপত্তা বিধায়ক। যেমন- নক্ষত্ররাজি আকাশবাসীর নিরাপত্তা বিধায়ক ,যা মহানবীর (সা.) বক্তব্য থেকে আমরা জানতে পারি। মহানবী (সা.) আরও বলেন-

তাদের উপমা ,এ উম্মতের জন্য তারা হলেন নূহের কিস্তির মত-যে কেউ এতে আরোহন করল মুক্তি পেল ,আর এর অন্যথাকারীরা নিমজ্জিত হলো।

অনুরূপ ,পবিত্র কোরআনে এ উক্তির প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই যে ,ইমামগণ (আ.) হলেন-

সম্মানিত বান্দা যারা তার অগ্রে কোন কথা বলেন না এবং তারা তার (আল্লাহর) আদেশ (উত্তমরূপে) সম্পাদন করেন। (সূরা আম্বিয়া-27)

তারা হলেন সেই ব্যক্তিবর্গ যাঁদের সকল অপবিত্রতা দূর করে মহান আল্লাহ তাদেরকে পবিত্রের মত পবিত্র করে দিয়েছেন।

আমরা বিশ্বাস করি যে ,তাদের আদেশ হলো মহান আল্লাহরই আদেশ ,তাদের নিষেধ হলো মহান আল্লাহরই নিষেধ ,তাদের আনুগত্য আল্লাহরই আনুগত্য ,তাদের অবাধ্যতা আল্লাহরই অবাধ্যতা ,তাদের বন্ধু হওয়া আল্লাহরই বন্ধু হওয়া ,তাদের শত্রু হওয়া আল্লাহরই শত্রু হওয়া। তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়। মূলতঃ তাদেরকে অস্বীকার করার মানে হলো আল্লাহর রাসূলকে প্রত্যাখ্যান করা। আর আল্লাহর রাসূলকে প্রত্যাখ্যান করার মানে হলো মহান আল্লাহকে প্রত্যাখ্যান করা। সুতরাং তাদের নিকট আত্মসমর্পণ করা ,তাদের আদেশ মেনে চলা ও তাদের কথা অনুসরণ করা প্রত্যেকের জন্যই আবশ্যক।

আর এ কারণেই আমরা বিশ্বাস করি যে ,সকল ঐশী নির্দেশই তাদের শিক্ষা থেকে গ্রহণ করতে হবে ,তাদের ব্যতীত অন্য কারো নিকট থেকে তা গ্রহণ করা যাবে না। তাদের ব্যতীত অন্য কারো প্রতি সমর্পিত হলে দ্বীনী দায়িত্ব থেকে অব্যহতি পাওয়া যাবে না। কেউই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারবে না যে মহান আল্লাহর প্রতি কর্তব্য সম্পাদন করেছে কিংবা সঠিকরূপেই দায়িত্ব পালন করেছে। সেই নূহের তরীর মতই যে কেউ তাতে আরোহন করবে সে মুক্তি পাবে আর যে কেউ তা ত্যাগ করবে সে সন্দেহ ,অজ্ঞতা ,মিথ্যাচার ও বিরোধের ক্রুব্ধ তরঙ্গের অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত হবে।

অদ্য ইমামতের উপর আলোচনার উদ্দেশ্যে আহলে বাইত (আ.) যে বৈধ খলিফা বা ঐশী নেতৃত্ব তা প্রমাণ করা নয়। কারণ ,ইতিহাসের স্কন্ধে ভর করে যা অতীত হয়ে গিয়েছে তাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিংবা প্রকৃত হকদারের অধিকার ফিরিয়েও দেয়া যাবে না। বরং ঐশী আদেশ নিষেধের জন্য আহলে বাইতের (আ.) শরণাপন্ন হওয়ার আবশ্যকতাকে প্রতিপাদন করাই আমাদের প্রয়াস। আর সেই সাথে মহানবী (সা.) প্রকৃতপক্ষে যা বলেছেন তা খুজে বের করার চেষ্টা করছি।

যারা ইমামগণ (আ.) কর্তৃক প্রশিক্ষিত হয়নি কিংবা তাদের আলোয় যাদের অন্তর আলোকিত হয়নি প্রকৃতার্থে তারা ইসলামের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত। আর সে ক্ষেত্রে কেউ আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব সম্পাদনের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারে না। কারণ ,শরীয়তের আহকামের ক্ষেত্রে বিভিন্নদল ও গোত্রের মধ্যে বিদ্যমান আপোষহীন বিরোধের ফলে কারো জন্য এ অবকাশ থাকে না যে ,কোন এক মাযাহাবকে অন্ধভাবে অনুসরণ করবে। সুতরাং কোন মাযহাবের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এবং নিশ্চিতরূপে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন ও দায়িত্ব থেকে অব্যাহিত না পাওয়া পর্যন্ত তাকে অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে যাওয়া ব্যতীত তার কোন উপয়ান্তর নেই। শরীয়তের আহকাম সম্পর্কে নিশ্চিত হলে তা সম্পাদন করা আবশ্যক। আবার নিশ্চিত দায়িত্ব আসলে নিশ্চিত কর্তব্য সম্পাদন আবশ্যক।

আহলে বাইতের (আ.) শরণাপন্ন হওয়ার আবশ্যকতা এবং মহানবীর (সা.) পর তারাই যে আল্লাহর বিধানের প্রকৃত উৎস সে সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ও নিশ্চিত দলিল বিদ্যমান। ন্যূনতমপক্ষে মহানবীর (সা.) বক্তব্যই এক্ষেত্রে উত্তম উপস্থাপনা -শিয়া ও সুন্নী উভয়ই এ রেওয়ায়েতের ব্যাপারে একমত-

নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট আমি দু টি ভারীবস্তু রেখে যাচ্ছি যার একটি আরেকটি অপেক্ষা বেশী ভারী। একটি হলো আল্লাহর কিতাব যা আকাশ থেকে জমিন পর্যন্ত ঝুলন্ত রশির মত। আর অপরটি হলো আমার এতরাত - আহলে বাইত। হাউজে কাওসারে আমার সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কখনো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। যে কেউ এঁকে আঁকড়ে ধরবে কখনোই আমার পরে সে পথভ্রষ্ট হবে না।

যদি এ মূল্যবান হাদীসের প্রতি সূক্ষ্মভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি তাহলে আমরা এর অপরূপ অভিব্যক্তিতে মুগ্ধ হব। কারণ ,সর্বপ্রথম তা বলছে-

যদি তুমি এতদ্ভয়কে আঁকড়ে ধর তবে আমার পরে কখনোই বিচ্যুত হবে না।

আর আমাদের নিকট রেখে যাওয়া হয়েছে দু টিভারী বস্তু একই সাথে যেন একই বস্তুরূপে-এর কোন একটিকে আঁকড়ে ধরা যথেষ্ট নয়। কারণ তাদেরকে কেবলমাত্র একত্রে ধরে রাখলেই আমরা কখনো পথভ্রষ্ট হব না। ঐটা আরও সুষ্পষ্ট রূপে প্রতীয়মান হয় এ কথায় যে , হাউজে কাওসারে আমার সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত কখনোই পৃথক হবে না। ’ সুতরাং যদি কেউ এতদ্ভয় থেকে দূরে থাকে এবং এ গুলোকে আঁকড়ে না ধরে সে কখনোই হেদায়াত প্রাপ্ত হবে না। অনুরূপ ,তারা হলেন নাজাতের তরী ’ -পৃথিবীবাসীর রক্ষাকারী। যদি কেউ এর ব্যতিক্রম করে সে গোমরাহীর উত্তাল তরঙ্গে নিমজ্জিত হবে এবং সে ধ্বংস থেকে নিস্তার পাবে না।

সুতরাং এটা বলা সঠিক নয় যে ,এ হাদীসের অর্থ হলো ,আহলে বাইতকে (আ.) আন্তরিক ভাবে ভালবাসা ,তাদেরকে অনুসরণ করা বা মান্য করা শর্ত নয়। মূর্খ ব্যতীত কেউই একথা বিশ্বাস করতে পারে না। কারণ এটা হলো সুষ্পষ্ট আরবীর বিকৃত অর্থ।

27। আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসা সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

পবিত্র কোরআনের সূরা শুরা-র 23 নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন-

বলুন আমি তোমাদের নিকট আমার নিকটাত্মীদের সৌহার্দ ব্যতীত কিছুই চাই না।

আমরা বিশ্বাস করি যে ,মহানবীর (সা.) আহলে বাইতকে (আ.) দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে রাখার পাশাপাশি দ্বীনের দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য তাদের প্রতি ভালবাসা ও মাওয়াদ্দাত রাখা আবশ্যক। কারণ মহান আল্লাহ প্রাগুক্ত আয়াতে মানুষের জন্যে এটা বাধ্যতামূলক করেছেন।

মহানবীর (সা.) থেকে বর্ণিত এক বহুল আলোচিত হাদীসে বলা হয়-

নিশ্চয়ই আহলে বাইতের (আ.) প্রতি ভালবাসা ঈমানের লক্ষণ ,আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ হলো শঠতা বা মোনাফেকীর লক্ষণ। নিশ্চয়ই যে তাদেরকে ভালবাসে সে আল্লাহ ও তার রাসূলকেও ভালবাসে এবং যদি কেউ তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে সে আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে।

সুতরাং তাদের প্রতি ভালবাসা ইসলামের আবশ্যকীয় বিষয়সমূহের অন্তর্ভূক্ত। এ ব্যাপারে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। বিভিন্ন মাযহাব ও গোষ্ঠীর মধ্যে অন্যান্য বিষয়ে পারস্পরিক বিরোধ থাকলেও এ ব্যাপারে মতৈক্য রয়েছে। তবে নাসেবী নামে খ্যাত ক্ষুদ্র একটি দল আছে যারা আহলে বাইতের (আ.) প্রতি ভালবাসা যে ইসলামের আবশ্যকীয় বিষয় তা স্বীকার করে না। আর নামায ,যাকাত ইত্যাদির মত ইসলামের সন্দেহাতীত আবশ্যকীয় বিষয়সমূহকে অস্বীকার করার অর্থ প্রকারন্তারে মূল রেসালাতকে অস্বীকার করা। প্রকৃতই তারা রেসালাতাকে অস্বীকারকারী যদিও বাহ্যিকভাবে মুখে তারা শাহাদাতাইন বলে থাকে। আর এ কারণে আহলে বাইতের (আ.) প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা মোনাফেকীর লক্ষণ। আর তাদের প্রতি মহব্বত রাখা ঈমানের লক্ষণ। ফলে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা প্রকারন্তরে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা।

নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ মহব্বত ও অভিভাবকত্বের যোগ্য ব্যক্তিবিশেষ ব্যতীত আর কারো মহব্বত ও মাওয়াদ্দাত আবশ্যক করেন নি। কারণ তারা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা ,আল্লাহ নিকট রয়েছে তাদের মর্যাদা। তারা শিরক ,পাপাচার এবং যাবতীয় বিষয় যা কিছু আল্লাহর তুষ্টি ও করুণা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তা থেকে পবিত্র। আর এটা কখনোই সম্ভব নয় যে তিনি এমন কারো আনুগত্যকে আমাদের জন্যে বাধ্যতামূলক করবেন যারা গুনাহে লিপ্ত হয় ,তার আনুগত্য করে না ,যারা মহান আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত নয়। সমস্ত মানুষই তার বান্দা এবং সৃষ্টিগত দিক থেকে সমান। মানুষের মধ্যে একমাত্র যে যত বেশী তাকওয়ার অধিকারী মহান আল্লাহর কাছে সে তত বেশী মর্যাদার অধিকারী। সুতরাং তিনি যদি কাউকে ভালবাসতে আদেশ দেন ,তবে অবশ্যই ঐ ব্যক্তি সমস্ত মানুষের মধ্যে সর্বাধিক খোদাভীরু ও সবদিক থেকে উত্তম। নতুবা কেউ ভালবাসার জন্যে কারো উপর শ্রেষ্টত্ব পেত না। কিংবা মহান আল্লাহ কারো জন্যে কারো ভালবাসা আবশ্যক করতেন না। যদি তা করতেন তবে বেলায়াত অসার ও খেলনারূপে পর্যবসিত হত। এর কোন মহত্ত্ব ও বিশেষত্ব থাকত না।

28। ইমামগণের প্রতি আমাদের বিশ্বাস :

ইমামগণের (আ.) প্রতি আমাদের বিশ্বাস গোল্লাত ও হলুলিদের মত অতিরঞ্জিত নয়। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে-

----কত গুরুতর তাদের মুখের কথা। (সুরা কাহাফ-5)

বরং আমাদের বিশ্বাস হলো স্বতন্ত্র। আমরা বিশ্বাস করি যে ,তারা (আ.) আমাদের মতই মানুষ -- আমাদের যা আছে তাদের তা আছে ,আবার তাদের যা আছে আমাদেরও তা আছে। তথাপি তারা হলেন মর্যাদাবান ,মহান আল্লাহ তাদেরকে তার বিশেষ অনুগ্রহে ধন্য করেছেন ,দিয়েছেন বেলায়াত। কারণ তারা জ্ঞান ,তাকওয়া ,বীরত্ব ,আত্মসম্মান ,সকল সুন্দর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও প্রশংসিত গুণে সকল মানুষের সেরা এবং পরিপূর্ণ। এ সকল দিক থেকে কেউই তাদেরকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। সুতরাং ইমামতের ক্ষেত্রে তারাই যোগ্যতম ব্যক্তি। হেদায়াতকারী হিসেবে তারাই শ্রেষ্ট এবং শরীয়তের হুকুম আহকাম বর্ণনার ক্ষেত্রে ,কোরআন ও দ্বীনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মহানবীর (সা.) পর তারাই বিশ্ববাসীর জন্যে আশ্রয়স্থল। আমাদের ষষ্ঠ ইমাম সাদিক (আ.) বলেন-

আমাদের সম্পর্কে যা কিছু বলা হয় তা যদি সৃষ্টির জন্য অসম্ভব না হয়ে থাকে যদিও তুমি তা জান না বা বুঝ না তাকে প্রত্যাখ্যান করোনা বরং তা আমাদেরকে জিজ্ঞাসা কর। আর যদি সৃষ্টির জন্য সম্ভব নয় এমন কিছু আমাদের সম্পর্কে বলা হয় ,তবে তা প্রত্যাখ্যান কর এবং আমাদের উপর আরোপ করো না ।

29। ইমাম নিয়োগ সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,নবুওয়াতের মত ইমামতও রাসূল কিংবা নিযুক্ত কোন ইমামের মাধ্যমে আল্লাহ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হতে হবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ইমামত নবুওয়াতের মতই। এক্ষেত্রে কোন প্রভেদ নেই। সুতরাং যাকে মহান আল্লাহ মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক নেতারূপে প্রেরণ করেছেন তার সম্পর্কে বাদানুবাদ করা সমীচীন নয়। অনুরূপ তাকে নির্বাচন ,নির্ধারণ বা নিয়োগ দানের অধিকারও মানুষের নেই। কারণ যে ব্যক্তি পবিত্র আত্মার অধিকারী হবেন এবং মানুষের হেদায়েত ও নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতার অধিকারী হবেন তাকে কেবলমাত্র মহান আল্লাহ ব্যতীত কেহই পরিচিত করিয়ে দিতে পারে না। কিংবা নিয়োগ ও অনুমোদন দিতে পারে না।

আমরা বিশ্বাস করি যে ,মহানবী (সা.) তার উত্তরাধিকারী ও ইমামের নাম ঘোষনা করেছিলেন। তিনি তার উত্তরাধিকারী হিসেবে তারই চাচাত ভাই হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের (আ.) কথা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি হলেন মহানবীর (সা.) পর মুমিনদের আমীর ,ওহীর অভিভাবক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের ইমাম। তার নিয়োগ এবং আমীরুল মুমিমীন হিসেবে তার প্রতি বাইয়াত গ্রহণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক গাদীর দিবসে। মহানবী (সা.) সেদিন বলেছিলেন-

হে মুমিনগণ! আমি যার মাওলা (অভিভাবক) এ আলীও তার মাওলা। হে আল্লাহ বন্ধু হও তার যে তার সাথে বন্ধুত্ব করে ,শত্রু হও তার যে তার সাথে শত্রুতা করে ,সাহায্য কর তাকে যে তাকে সাহায্য করে ,লাঞ্ছিত কর তাকে যে তাকে লাঞ্ছনা দেয় এবং সত্যকে সর্বদা তার (আলীর) সাথে রাখ।

হযরত আলীর (আ.) ইমামত ও বেলায়াতের কথা সর্বপ্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল সেদিন ,যেদিন সকল নিকট-আত্মীয়কে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। মহানবী (সা.) সেদিনও ঘোষণা করেছিলেন-

তিনি (আলী) আমার ভাই ,উত্তরাধিকারী (ওয়াসী) এবং আমার পরে আমার প্রতিনিধি। সুতরাং তোমরা তার কথা মেনে চলবে এবং তাকে অনুসরণ করবে।

মহানবী (সা.) যখন তাকে একথা বলেছিলেন তখন হযরত আলী (আ.) শিশু ও অপরিণত বয়সের ছিলেন।

মহানবী (সা.) আলীর (আ.) উত্তরাধিকারীর ব্যাপারটি একাধিকবার ঘোষণা করেছিলেন। যেমন বলেছিলেন-

তুমি আমার নিকট সেরূপ ,যেরূপ মূসার নিকট হারুন। তবে আমার পরে কোন নবী আসবে না।

হযরত আলীর (আ.) বেলায়াতের প্রমাণস্বরূপ হাদীস ব্যতীত একাধিক আয়াতও বিদ্যমান। যেমন-পবিত্র কোরআনে সুরা মায়েদা-র 55 নং আয়াতে বলা হয়েছে -

নিশ্চয়ই তোমাদের ওয়ালী হলেন কেবলমাত্র আল্লাহ ,তার রাসূল এবং যাঁরা ঈমান এনেছে ,যাকাত দিয়েছে রুকু অবস্থায়।

উপরোক্ত আয়াতের সর্বশেষ অংশ নাযিল হয়েছিল হযরত আলী (আ.) প্রসংগে যিনি রুকু অবস্থায় তার আংটি ভিক্ষুককে প্রদান করেছিলেন। ইমামতের স্বপক্ষে যে সকল আয়াত ,রেওয়ায়েত এসেছে তার সবগুলো বর্ণনা করা কিংবা সেগুলো সম্পর্কে যুক্তির অবতারণা করা এ পুস্তিকার ক্ষুদ্র কলেবরে অসম্ভব। 2

30। ইমামগণের (আ.) সংখ্যা সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

আমরা বিশ্বাস করি যে ,ইমামগণ যাঁদের সত্যিকার অর্থে ইমামত্বের বৈশিষ্ট্য আছে এবং যাঁরা মহানবীর (সা.) পর আমাদের জন্য শরীয়তের আহকামের উৎসরূপে নিয়োগ লাভ করেছেন তারা হলেন বারজন। মহানবী (সা.) তাদের সকলকে নাম উল্লেখ পূর্বক নিয়োগ দিয়েছিলেন। অতঃপর তাদের অগ্রজ নিয়োগ দিয়েছিলেন অনুজকে। আর তা নিম্নরূপ :-

1। আবুল হাসান আলী ইবনে আবি তালিব (আল-মুর্তাজা) যাঁর জন্ম 23 হিজরী পূর্বাব্দ এবং হিজরী 40 সালে শাহাদাৎ বরণ করেন।

2। আবু মোহাম্মদ আল হাসান ইবনে আলী (আযযাকি) (2হিঃ-50 হিঃ)

3। আবু আব্দুল্লাহ আল হুসাইন ইবনে আলী (সাইয়্যেদুশশোহাদা)(3 হিঃ-61 হিঃ)

4। আবু মোহাম্মদ আলী ইবনিল হুসাইন (যয়নুল আবেদীন) (38 হিঃ- 95হিঃ)

5। আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে আলী (আল বাকের) (57 হিঃ-114 হিঃ)

6। আবু আব্দুল্লাহ জাফর ইবনে মোহাম্মদ (আস-সাদিক)(83 হিঃ-148 হিঃ)

7। আবু ইব্রাহিম মূসা ইবনে জাফর (আল কাযিম) (128 হিঃ -183 হিঃ)

8। আবুল হাসান আলী ইবনে মূসা (আর রেযা)(148 হিঃ - 203 হিঃ)

9। আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে আলী (আল জাওয়াদ) (195 হিঃ - 220 হিঃ)

10। আবুল হাসান আলী ইবনে মোহাম্মদ (আল -হাদী) (212 হিঃ-254 হিঃ)

11। আবু মোহাম্মদ আল হাসান ইবনে আলী (আল আসকারী) (232 হিঃ- 260 হিঃ)

12। আবুল কাশেম মোহাম্মদ ইবনিল হাসান (আল মাহদী) (256 হিঃ -)

আর সর্বশেষ ইমামই হলেন আমাদের সময়কালের ইমাম যিনি লোকান্তরিত ,আমরা তার জন্য অপেক্ষামান ,মহান আল্লাহ তার আবির্ভাব তরান্বিত ও সহজ করুন যাতে তিনি পৃথিবীতে সেরূপে ন্যায়-নীতিতে পরিপূর্ণ করে দিতে পারেন ,যেরূপে পৃথিবী জুলুম ও অত্যাচারে পূর্ণ হয়ে গিয়েছে।

31। ইমাম মাহদীর (আ.) প্রতি আমাদের বিশ্বাস :

নিশ্চয়ই ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের সুসংবাদ মহানবীর (সা.) হাদীস থেকে তাওয়াতুর রূপে প্রমাণিত হয়েছে। ইমাম মাহদী (আ.) হবেন হযরত ফাতেমা যাহরা সালামুল্লাহ আলাইহার রক্তজ সন্তানের অন্তর্ভূক্ত। তিনি পৃথিবীকে সেরূপ ন্যায়-নীতিতে পূর্ণ করে দিবেন যেরূপ পৃথিবী অন্যায় ও অত্যাচারে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। ভাষার পার্থক্য থাকলেও মুসলমানদের সকল মাযহাব সামগ্রিকভাবে ইমাম মাহদীর (আ.) সুসংবাদ সম্পর্কে একমত। এটা শীয়া মাযহাব কর্তৃক উদ্ভাবিত কোন নতুন চিন্তা নয়। অত্যাচার ও জুলুম থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য এমন কারো স্বপ্নও নয় যিনি পৃথিবীকে জুলুম থেকে রক্ষা করবেন যা কুতার্কীকরা বলে গিয়েছে। বরং ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের বিষয়টি মহানবীর (সা.) বর্ণনা থেকে স্পষ্ট রূপে মুসলমানদের অন্তরে প্রথিত ও প্রতিষ্ঠিত আছে এবং সকল মুসলমান এতে বিশ্বাসী। এর প্রমাণস্বরূপ বলা যায় যে ,ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকেই একদল লোক নিজেকে মাহদী হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিয়েছিল। এদের মধ্যে কিসানিয়াহ ,আব্বাসীয়ীন এবং একদল আলাভীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তারা এ প্রক্রিয়া মানুষের মধ্যে প্রথিত বিশ্বাসকে ভ্রান্তিতে পতিত করে ক্ষমতা হস্তগত করার চেষ্টা চালিয়েছিল । সুতরাং মাহদীর ’ মিথ্যা দাবী তুলে তারা সাধারণের উপর প্রভাব খাটাতে চেয়েছিল। {কারণ মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের ব্যাপারটি সর্বজন স্বীকৃত }

আমরা দ্বীন ইসলামের সত্যতায় বিশ্বাস করার পাশাপাশি বিশ্বাস করি যে ,এ দ্বীন সর্বশেষ দ্বীন এবং মানব জাতির সংস্কারের জন্য অন্য কোন দ্বীন আসবে না। অপরদিকে আমরা দেখতে পাই যে ,ন্যায় ও কল্যাণকর্মের অভাবে জুলুম ও অত্যাচার ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। অথবা আমরা আরো দেখতে পাই যে ,মুসলমানরা স্বয়ং ইসলামের নিয়ম নিজেদের দেশেই উপেক্ষা করে চলছে। তারা এমনকি একহাজার ইসলামী বিধানের মধ্যে একটি বিধানও পালন করে না। তথাপি আমরা পূর্ণ শক্তিতে ইসলামের পুনঃ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জুলুম ও অত্যাচারে নিমজ্জিত এ বিশ্বের সংস্কারের আশায় অপেক্ষমান।

প্রাচীন যুগ থেকে অদ্যাবধি ইসলামী বিধানের বিকৃতি ও মুসলমানদের চিন্তা চেতনার ফলে যে পারস্পরিক ব্যবধান ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তাতে স্বীয় শক্তি ও আধিপত্য নিয়ে ইসলামের ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা দেখা যায় না। প্রকৃতার্থেই ইসলাম কখনো সশক্তিতে ফিরে আসবে না যদি না কোন মহান সংস্কারক আবির্ভূত হন এবং ঐশী অনুগ্রহ ও দিক নির্দেশনায় মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ইসলামের সাথে মিশে যাওয়া ভুল-ত্রুটি ও বিচ্যুতিকে দূর করেন। নিশ্চিতরূপে ঐ মহান সংস্কারকের থাকবে সুমহান মর্যাদা ,সর্বময় কর্তৃত্ব ,অলৌকিক শক্তি যার মাধ্যমে তিনি জুলুম ও অন্যায়ে পরিপূর্ণ পৃথিবীকে ন্যায় ও সাম্যে পরিপূর্ণ করে দিবেন।

সংক্ষেপে পরিদৃষ্ট হচ্ছে যে ,বিশ্বমানবতা আজ অত্যাচারে নিদারুণ ভাবে বিপর্যস্ত। এ দ্বীনই সঠিক দ্বীন ও সর্বশেষ দ্বীন এ বিশ্বাসের দাবী আমাদেরকে এমন এক সংস্কারের (আল-মাহদী) জন্য অপেক্ষমান থাকার জন্য আশান্বিত করে যিনি পৃথিবীকে এ অবস্থা থেকে উদ্ধার করবেন। মুসলমানদের সমস্ত মাযহাবই এ অপেক্ষায় বিশ্বাস করে। এমনকি অমুসলিম সম্প্রদায়ও এতে বিশ্বাসী। ইমামীয়াদের সাথে অন্যান্য সম্প্রদায়ের পার্থক্য শুধু এখানেই যে ইমামীয়ারা বিশ্বাস করে যে ,এ সংস্কারক হলেন মাহদী (আল্লাহর তার আবির্ভার ত্বরান্বিত করুন) । তাদের বিশ্বাস তিনি 256 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখনও বেঁচে আছেন। তিনি ইমাম হাসান আসকারীর (আ.) সন্তান যার নাম মোহাম্মাদ ’ । মহানবী (সা.) ও আহলে বাইতের (আ.) বর্ণিত হাদীস থেকে তার জন্ম ও আত্মগোপনের ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়েছে।

কোন কালে বা যুগেই ইমামতের এ মিশন ব্যাহত হবে না যদিও ইমাম লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছেন। তিনি মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুত দিন ব্যতীত আত্মপ্রকাশ করবেন না। আর সেই প্রতিশ্রুত দিবস একমাত্র মহান আল্লাহরই জানা। কারণ এটি এক ঐশী রহস্য।

এত সুদীর্ঘ সময় ধরে ইমামের বেঁচে থাকা এবং সুদীর্ঘ জীবন মোজেযা বহির্ভূত কোন কিছুই নয় যা মহান আল্লাহ তার জন্য নির্ধারণ করেছেন। এটা ইমামের জন্য বেশী কিছু নয় যে ,তার পাঁচ বছর বয়সে তার পিতা মহান আল্লাহর নিকট চলে যাবার পর তিনি বিশ্বমানবতার জন্য ইমাম নিযুক্ত হন। এটা (তার দীর্ঘজীবন লাভ) তার ইমাম হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তির চেয়ে বেশী আশ্চর্যের বিষয় নয়। এটা ঈসার (আ.) মোজেযা থেকে বেশী কিছু নয় যে শিশু বয়সে দোলনায় থেকে তিনি মানুষের সাথে কথা বলেছিলেন এবং নবীরূপে অভিষিক্ত হয়েছিলেন।

স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী দীর্ঘজীবি হওয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অসম্ভব নয় বা চিকিৎসা বিজ্ঞান একে অস্বীকার করে না। যদিও আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান মানুষের দীর্ঘজীবিতার ক্ষেত্রে এখনও অক্ষম। বিজ্ঞান এক্ষেত্রে অপারগ হলেও মহান আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তদুপরি নূহের (আ.) সুদীর্ঘ জীবন লাভ এবং ঈসার (আ.) এখনও জীবিত থাকার কথা পবিত্র কোরআন থেকে আমরা জানতে পারি। আর যদি কোন সন্দিগ্ধ ব্যক্তি কোরআনের অবিকৃত থাকার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করে তবে ইসলামকে সে চিরবিদায় জানাল। এটা আশ্চর্যের বিষয় যে মুসলমান নিজেকে কোরআনে বিশ্বাসী বলে দাবী করছে অথচ এর সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছে।

এখানে আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে ,ইমাম মাহদীর (আ.) জন্য অপেক্ষামান থাকার অর্থ এ নয় যে ,মুসলমানরা তাদের ধর্ম বিষয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে এবং তাদের জন্যে দ্বীনের সাহায্যে এগিয়ে আসা ও দ্বীনের পথে জিহাদ করা কিংবা দ্বীনের আহকাম পালন করা অথবা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের বারণ করা আবশ্যক নয়। বরং মুসলমানরা সব সময়ই দ্বীনের আহকাম পালন করার জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত। তার জন্য আবশ্যক হলো সঠিক পন্থায় সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য চেষ্টা চালানো। তার জন্য আবশ্যক হলো যতটুকু সম্ভব সৎ কাজের আদেশ করণ ও অসৎ কাজের নিষেধ করণ। মহানবী (সা.) বলেছেন-

তোমরা সকলেই পথ নির্দেশক আর সকলেই নিজ নিজ জাতির জন্য দায়িত্বশীল।

অতএব ,কেবলমাত্র মাহদীর (আ.) জন্য অপেক্ষমান থেকে সকল দ্বীনী দায়িত্বের ব্যাপারে উদাসীন থাকা মুসলমানদের জন্যে সমীচীন নয়। এর ফলে মুসলমানের দায়িত্ব সমাপ্ত হয় না কিংবা দায়িত্ব স্থগিত হয় না এবং পশুর মত মানুষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন নয়।