শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস0%

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস লেখক:
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

লেখক: আল্লামা মুহাম্মাদ রেজা আল -মুজাফফর
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বিভাগ:

ভিজিট: 9496
ডাউনলোড: 1999

পাঠকের মতামত:

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 51 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 9496 / ডাউনলোড: 1999
সাইজ সাইজ সাইজ
শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস

লেখক:
প্রকাশক: ইসলামী সেবা দপ্তর,কোম,ইরান
বাংলা

32। রাজআত (পুনরাবর্তন) সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

এ ক্ষেত্রে শিয়ারা তা-ই বিশ্বাস করে যা রাসূলের (সা.) আহলে বাইত (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। উক্ত বর্ণনা মতে মহান আল্লাহ একদল মৃতব্যক্তিকে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবেন পূর্বে ঠিক যে অবস্থায় তারা ছিল সে অবস্থায়। তখন মহান আল্লাহ একদলকে সম্মানিত করবেন এবং অপর দলকে লজ্জিত করবেন। তিনি সৎ কর্ম সম্পাদনকারীকে অসৎ কর্ম সম্পাদনকারীদের থেকে পৃথক করে দিবেন ,পৃথক করবেন অত্যাচারিত থেকে অত্যাচারীকে। আর ইমাম মাহদীর (সা.) আবির্ভাবের পর এ ঘটনা ঘটবে।

কাজেই পুনরাবর্তন ঘটবে না যদি না সে ঈমানের চুড়ান্ত শিখরে পৌঁছে কিংবা অনাচারের নিকৃষ্টতম স্তরে তলিয়ে যায়। এরপর তারা পুনরায় মৃত্যুবরণ করবে। অতঃপর তাদেরকে বিচার দিবসে পুনরায় জীবিত করা হবে এবং যার যার প্রাপ্তি অনুসারে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এ কারণে পবিত্র কোরআনে যারা পৃথিবীতে দু বার প্রত্যাবর্তন করেছিল তৃতীয়বার আসার জন্য তাদের ইচ্ছার কথা উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন-

তারা বলবে ,হে আমাদের প্রভু ! আপনি আমাদেরকে দু বার মৃত্যু দিয়েছেন এবং দু বার জীবন দিয়েছেন। আমরা আমাদের দোষ স্বীকার করছি। সুতরাং এখান থেকে বের হওয়ার কোন উপায় আছে কি ? (সুরা মুমিন -11)

হ্যাঁ ,পবিত্র কোরআনে এ পৃথিবীতেই রাজআত বা পুনরাবর্তনের সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে বক্তব্য এসেছে। এছাড়া পবিত্র আহলে বাইত (আ.) থেকেও এ সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা এসেছে। শীয়াদের একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যতীত সকলেই এ ব্যাপারে একমত। শীয়াদের ঐ ক্ষুদ্রাংশের মতে রাজআতের অর্থ হলো অপেক্ষমান ইমামের (আ.) ফিরে আসার মাধ্যমে আহলে বাইতের (আ.) নিকট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং আদেশ নিষেধের অধিকার ফিরে আসা। লোকদের প্রত্যাবর্তন বা মৃত্যুর পর পূর্নজীবন লাভ নয়।

রাজআতের ব্যাপারটি আহলে সুন্নত কর্তৃক অস্বীকৃত হয়ে আসছে। তাদের মতে এটা হলো ধর্ম বিরোধী বিশ্বাস। তাদের হাদীস সংকলনকারীরা রাজআত সম্পর্কে বর্ণনাকারী রাবীদের (হাদীস বর্ণনাকারী) উপর দূর্নাম দিয়েছেন যাতে করে তাদের বর্ণনাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা যায়। এমনকি তারা রাজআতে বিশ্বাসকারীদেরকে কাফের ও মোনাফেক অথবা তদপেক্ষা কুৎসিত কোন অ্যাখ্যা দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি। সুন্নি কর্তৃক শীয়ারা ধিকৃত ও নিন্দিত হওয়ার একটি বড় কারণ হলো রাজআতের এ বিশ্বাস।

নিঃসন্দেহে এ ধরনের ব্যাখ্যা হলো সেই অস্ত্র যা পূর্বে বিভিন্ন ইসলামী দলগুলো পরস্পরকে অপবাদ দিতে ব্যবহার করত এবং যা নিয়ে বিবাদ করত। প্রকৃতপক্ষে পরস্পরকে দোষারোপ করার কোন কারণই আমরা দেখি না। কারণ ,রাজআতের প্রতি বিশ্বাস না তাওহীদের বিশ্বাসকে খর্ব করে ,আর না নবুওয়াতের বিশ্বাসকে। বরং এগুলোর সত্যতার উপর গুরুত্বারোপ করে। কেননা রাজআত হলো পুনরুত্থান দিবসের মতই মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রমাণ। এটি হলো মহানবী (সা.) এবং তার আহলে বাইতগণের (আ.) অনুসৃত মোজেযা (অলৌকিক ঘটনা) কিংবা ঈসা (আ.) কর্তৃক মৃতকে জীবিতকরণের মোজেযার মত বরং তার চেয়েও বড়। কারণ ,পচে গলে যাওয়া লাশকে জীবিত করা হয়। পবিত্র কোরআনের ভাষায়-

বলে যে ,কে নষ্ট হয়ে যাওয়া হাড়গুলোতে প্রাণ সঞ্চার করবে ?বলুন ,তিনিই যিনি তাকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন এবং তিনি সকল সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। (সুরা ইয়াসীন- 79)

তবে যারা রাজআতকে অসার পুর্নজন্মবাদ (তানাসুখ) মনে করে অভিযোগ তুলছে তারা প্রকৃত পক্ষে এ তানাসুখ এবং শারীরিক পুনরুত্থানের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে নি। আর রাজআত হলো শারীরিক পুনরুত্থানের অনুপ্রকরণ। অপরদিকে তানাসুখ হলো পূর্বের দেহ ব্যতিরেকে অন্য কোন দেহে প্রত্যাবর্তন। অথচ শারীরিক পুনরুত্থানের অর্থ স্বতন্ত্র। কারণ ,এর মানে হলো পূর্বতন দেহে আত্মার প্রত্যাবর্তন। আর এরূপই হলো রাজআত বা পূনর্জীবন লাভ। যদি রাজাআত তানাসুখ হয় ,তবে ঈসা (আ.) কর্তৃক মৃতকে জীবন দানও তানাসুখ হবে। তদ্রূপ ,যদি রাজাআত তানাসুখ হয় ,তবে দৈহিক পুনরুত্থানও তানাসুখ হবে।

এখন রাজআতের উপর দুটি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

প্রথমত : এটা ঘটা অসম্ভব এবং

দ্বিতীয়তঃ রাজআত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলো সঠিক নয়।

বর্ণিত সমস্যা দু টিকে সঠিক ধরে নিলেও রাজআতের প্রতি বিশ্বাস এতটা ঘৃণ্য নয় যা শীয়াদের শত্রুরা করে থাকে। মুসলমানদের অন্যান্য দলগুলোর এমন কত বিশ্বাস আছে যা অসম্ভব কিংবা যা সঠিক উৎস দ্বারা প্রমাণিত হয়নি। অথচ এর কারণে কাফের বা ইসলাম থেকে বের করে দেয়া আবশ্যক হয়নি। আর এগুলোর উদাহরণও কম নয়। যেমন : নবী কর্তৃক ভুল-ত্রুটি ও পাপ হওয়া ,কোরআন অনাদি হওয়া ,কিংবা এ বিশ্বাস করা যে আল্লাহ যখন বললেন যে তিনি শাস্তি দিবেন ,তখন তিনি তা করতে বাধ্য (ওয়াযিব) । অথবা মহানবী (সা.) তার উত্তরসূরী নির্বাচন করেন নি ইত্যাদি।

যাহোক প্রাগুক্ত সমস্যাদ্বয়ের সত্যতার কোন ভিত্তি নেই। রাজআত অসম্ভব ’ এর জবাবে আমরা বলব- ইতিপূর্বে আমরা বলেছিলাম যে ,রাজআত হলো দৈহিক পনুরুত্থানের প্রকরণ। পার্থক্য শুধু এটুকু যে তা ইহকালেই হবে। সুতরাং সেই কিয়ামতের সম্ভাবনার দলিলই রাজআতকে প্রমাণিত করে। এখানে আশ্চার্যন্বিত হওয়ার কোন কারণ নেই। কেবলমাত্র ব্যতিক্রম এটুকু যে ,পার্থিব জীবনে আমরা এতে অভ্যস্ত নই। আমরা এর সংঘটিত হওয়ার কোন কারণ বা অন্তরায় সম্পর্কে জানিনা যে তা আমাদের একে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করার কাছাকাছি পৌঁছে দিবে। অপরদিকে মানুষের প্রকৃতি এরকম যে ,সে যাতে অভ্যস্ত নয় বা যার সাথে পরিচিত নয় তা গ্রহণ করা তার পক্ষে অসম্ভব। এটা সে রকম যে একদল কিয়ামত সম্পর্কে আশ্চার্যন্বিত হয়ে বলেছিল-

কে এ নষ্ট হাড়গুলোকে জীবন দিবে ? (সুরা ইয়াসিন-78)

জবাবে বলা হয়েছিল -

যিনি প্রথমবার একে সৃষ্টি করেছিলেন তিনিই একে জীবন দিবেন এবং তিনি সকল সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। (সুরা ইয়াসিন -79)

এমন এক পরিস্থিতিতে যেখানে রাজআতকে বিশ্বাস করার বা অগ্রাহ্য করার কোন বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল না থাকে কিংবা শুধু খেয়ালের বশবর্তী হয়ে আমরা বলে থাকি এর কোন দলিল নেই ,সেখানে আমাদেরকে ওহীর উৎস থেকে প্রাপ্ত দলিলসমূহের শরণাপন্ন হতে হবে। পবিত্র কোরআনে কোন কোন মৃতব্যক্তির ক্ষেত্রে পৃথিবীতে রাজাআত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ মেলে। যেমন- হযরত ঈসা (আ.) কর্তৃক মৃতকে জীবিত কারণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এসেছে-

আমি আল্লাহর অনুমতিক্রমে অন্ধকে আলো দেই ,কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করি আর মৃতকে জীবিত করি। (সুরা আল এমরান -49)

অনুরূপ ,মহান আল্লাহর বাণী-

কিরূপে আল্লাহ একে জীবন দিবেন মৃত্যুর পর ?সুতরাং আল্লাহ তাকে একশত বছরের জন্য মৃত্যু দিলেন। অতঃপর তাকে জীবিত করলেন। (সুরা বাকারা -259)

এছাড়া ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছিলাম-

হে প্রভু ! আমাদেরকে দু বার মৃত্যু দিয়েছেন। (সুরা মুমিন - 11)

অতএব মৃত্যুর পর পৃথিবীতে ফিরে আসা ব্যতীত এ আয়াতের কোন অর্থ করা যায় না। যদিও কোন কোন তাফসীরকারক এর অন্য ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন যা কোন বিশ্বস্ত রাবী থেকে বর্ণিত হয়নি এবং আয়াতের সাথে এর সামঞ্জস্য রক্ষা করে না।

যাহোক দ্বিতীয় সমস্যা যেখানে বলা হয়েছে যে এর স্বপক্ষে বর্ণিত হাদীসগুলো সঠিক নয় সে সম্পর্কে আমরা বলতে পারি যে ,এ কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ ,রাজআত আহলে বাইত (আ.) থেকে বর্ণিত বহুলালোচিত মোতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিষয় যার উপর বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন।

তদুপরি এটা আশ্চর্যের বিষয় যে ,আহাম্মদ আমীনের মত একজন প্রখ্যাত লেখক যিনি বিজ্ঞ বলে দাবী করে থাকেন তিনি ফাজরুল ইসলাম নামক পুস্তকে লিখেছেন-

রাজআতের কথায় শীয়াদের অবয়বে ইহুদীবাদের প্রকাশ ঘটে।

আমরা তাকে বলব ,তাহলে পবিত্র কোরআনেও ইহুদীবাদ রাজাআতের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। কারণ পূর্বে যে সকল আয়াত উল্লেখ করেছি তাতে রাজআতের কথাই বর্ণিত হয়েছে।

আমরা তাকে আরো বলব যে ,প্রকৃতপক্ষে ইসলামের অনেক বিশ্বাস ও আহকামে ইহুদীবাদ ও খ্রীষ্টবাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কারণ ,মহানবী (সা.) ঐশী বিধানের যে দৃষ্টান্ত এনেছিলেন এখন তার অনেক বিধানকেই পরিত্যাগ করা হয়েছে বা অকার্যকর করা হয়েছে। সুতরাং ইসলামের বিশ্বাসে ইহুদীবাদ ও খ্রীষ্টবাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তবে তা ইসলামের কোন ঘাটতি বা দোষ নয় যদি ধরেও নেয়া হয় যে ,রাজআত হলো ইহুদীবাদের বক্তব্য যা উক্ত লেখক দাবী করেছেন।

যাহোক রাজআত দ্বীনের এমন কোন মৌলিক বিষয় নয় যার উপর বিশ্বাস ও বিবেচনা আবশ্যক ,যদিও আমরা এতে বিশ্বাস করি সঙ্গত কারণেই। কারণ ,তা আহলে বাইতগণের (আ.) বর্ণনা থেকে সঠিকভাবে এসেছে। যাদেরকে আমরা মিথ্যাচার থেকে পবিত্র মনে করি। আর তা অদৃশ্যালোকের বিষয় যার সম্পর্কে সংবাদ দেয়া হয়েছে এবং তা সংঘটিত হতে কোন বাধা নেই।

33। তাকিয়্যা সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস :

ইমাম সাদিক (আ.) থেকে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

তাকিয়্যা হলো আমার দ্বীন ও আমার পূর্ব পূরুষের দ্বীন এবং যার তাকিয়্যা নেই তার দ্বীনও নেই।

এটা ছিল আহলে বাইত (আ.) ও তাদের অনুসারীদের জান-মাল হেফাজত করার জন্য তাদের শ্লোগান। এ শ্লোগানের মাধ্যমে তারা মুসলমানদের অবস্থার উন্নয়ন ও পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি রক্ষা করার এবং আনুগত্যের ছায়াতলে রাখার প্রয়াস পেয়েছিলেন।

এ তাকিয়্যা আজও শীয়াদের প্রতীক বলে চিহ্নিত হয়ে আসছে এবং তাদেরকে মুসলমানদের অন্যান্য দল থেকে পৃথক করে। যে কেউ তার বিশ্বাস প্রকাশিত হলে তার জান-মাল বিপদাপন্ন হবে বলে অনুভব করবে তাকে বাধ্য হয়েই গোপনীয়তা ও তাকিয়্যার আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। এটা হলো আমাদের স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তির দাবী। এটা সকলেরই জানা আছে ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় শীয়া ও তাদের ইমামগণ (আ.) সর্বদা নিষ্পেষিত ও স্বাধীনতা বঞ্চিত ছিলেন। কোন গোষ্ঠী ও কোন জাতিই তাদের মত এতটা নিপীড়নের স্বীকার হয়নি। সুতরাং তারা অধিকাংশ সময়ই তাকিয়্যা করতে এবং স্বীয় বিশ্বাসের ও আমলের গোপনীয়তা রক্ষা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে তারা দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষতির হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। আর এ কারণে তাকিয়্যার পরিচিতিতে তাদেরকে অন্যদের থেকে পৃথক করা হয়।

তাকিয়্যার জন্য আহকাম রয়েছে যা ক্ষতির আশংকা ভেদে নির্দেশ করে কখন তা আবশ্যক এবং কখন অনাবশ্যক। আর এ আহকাম সন্নিবেশিত আছে ফেকহের বিভিন্ন পুস্তকে। তাকিয়্যা সর্বদা ওয়াজীব বা আবশ্যক নয়। বরং অবস্থানুসারে কখনো তা আবশ্যক। আবার কখনো বা ইচ্ছাধীন। যদি সত্য প্রকাশ করা দ্বীনের জন্য সহায়ক ও দ্বীনের খেদমত হয় কিংবা দ্বীনের পথে জিহাদ বলে পরিগণিত হয় ,তবে জান-মাল সেখানে কোন বিশেষ গুরুত্ব পায় না। আবার যখন তাকিয়্যার কারণে কোন মহাত্মা মৃত্যুমুখে পতিত হয় ,মিথ্যা বিস্তৃতি লাভ করে ,দ্বীনের ফেসাদ সৃষ্টি হয় কিংবা অজ্ঞতার কারণে দ্বীনের মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে অথবা জুলুম ও অত্যাচার বৃদ্ধি পায় ,তবে সেখানে তাকিয়্যা করা হারাম। মোটকথা শীয়াদের নিকট এ দৃষ্টিকোণ থেকে নয় যে ,তারা এর মাধ্যমে গোপন কোন সংগঠন করে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাবে ,যেমনটি তাদের শত্রুরা যারা প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা বলে থাকে। এ ধরনের লোকেরা আমাদের কথা বুঝার জন্য কোন চেষ্টাই করে না। অনুরূপ তাকিয়্যার অর্থ এই নয় যে ,দ্বীন ও দ্বীনের আহকাম তাদের নিকট গোপন ও লুক্কায়িত রাখা ,যারা এতে বিশ্বাস করে না। অথচ শীয়াদের ইমামগণ (আ.) ও লেখকগণ ফিকাহ্ ,আহকাম ,কালামশাস্ত্র ও অন্যান্য বিশ্বাসের উপর বিপুল সংখ্যক বই লিখেছেন যা অন্য যে কোন সম্প্রদায়ের নিকট তাদের দ্বীন ও বিশ্বাসকে বর্ণনা করার জন্য যথেষ্ট। নিঃসন্দেহে আমাদের বিশ্বাস তাকিয়্যাকে তারাই বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে চায় যারা শীয়াদেরকে কলংকিত করতে চায়। তারা একে শীয়াদের দুর্বলতা বলে ধরে নিয়েছে। এ কারণেই শীয়াদের কন্ঠের উপর উমাইয়্যা ,আব্বাসীয় এবং ওসমানীয়দের মত শত্রুদের উন্মুক্ত তরবারী ঝুলে থাকলেও এবং একজন আহলে বাইতের (আ.) অনুসারীদের মৃত্যুর জন্য যখন শুধুমাত্র এটুকুই যথেষ্ট যে , সে একজন শীয়া ’ এমন এক পরিস্থিতিতেও তারা তুষ্ট হতে পারেনি।

যদি আমাদের শত্রুরা এ বলে আমাদের অপবাদ দেয় যে ,দ্বীনের দৃষ্টিকোণ থেকে তাকিয়্যার কোন ভিত্তি নেই ,তবে আমরা তাদেরকে বলব-

প্রথমত : আমরা আমাদের ইমামগণের (আ.) অনুগত এবং আমরা তাদের পথনির্দেশনায় পথ চলি। তারা (আ.) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রয়োজনে তাকিয়্যা করতে। তাদের কাছে এটা দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত বিষয়। বিশেষ করে ইমাম সাদিক (আ.) থেকে আমরা জানতে পারি-

যার তাকিয়্যা নেই ,তার দ্বীন ও নেই।

দ্বিতীয়ত : তাকিয়্যার বৈধতার ব্যাপারটি পবিত্র কোরআনেও এসেছে। যেমন ,সূরা নাহালের 106 নং আয়াতে বলা হয়েছে-

সে নয় যে বাধ্য হয় অথচ তার হৃদয়ে রয়েছে দৃঢ় ঈমান।

এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল আম্মার ইয়াসীর সম্পর্কে যিনি কাফেরদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য বাহ্যিকভাবে কাফের পরিচয় দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ আরও বলেন-

তোমরা কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। আর যে ব্যক্তি এরূপ করবে আল্লাহর কাছে তার জন্য কিছু্ই নেই। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশংকা কর ,তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে। (সূরা আল ইমান -28)

মহান আল্লাহ আরও বলেন-

আর একজন বিশ্বাসী ব্যক্তি যিনি তার ঈমানকে ফেরাউনের লোকদের নিকট গোপন করেছিল। (সুরা মুমিন - 28)

পর্ব-4

ম হানবীর ( সা .) আহলে বাইত থেকে শীয়াদের জন্য শিক্ষা

ভূমিকা

আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণ (আ.) জানতেন যে তাদের জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাদের হাতে ফিরে আসবে না। ফলে তাদেরকে (আ.) এবং তাদের অনুসারীদেরকে অন্যের শাসনাধীন থাকতে হবে। সুতরাং এমন শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে শক্তি ও প্রচণ্ডতা নিয়ে সংগ্রামে লিপ্ত হতে হবে।

সুতরাং এটা স্বাভাবিক (এক দৃষ্টিকোণ থেকে) তাদের ও তাদের অনুসারীদের দ্বীন ও অনুসৃত পন্থাকে গোপন করতে হবে। তাকিয়্যার ধারাবাহিকতায় তারা নিজেদেরকে রক্তপাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। অন্যের ক্ষতি বা দ্বীনের ক্ষতির জন্য নয় বরং তাদের প্রচেষ্টা ছিল ফেতনা ,শঠতা ও শত্রুতার উত্তাল সমুদ্রে টিকে থাকা।

তাদের ইমামতের দাবী মোতাবেক (অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে) আবশ্যক হলো তাদের অনুসারীদের ইসলামী শরীয়তের বিধান বিশেষ পন্থায় শিক্ষা দেয়ার পিছনে সময় দেয়া। সেই সাথে কল্যাণকর ও সঠিক সামাজিক নীতি সম্পর্কে জ্ঞান দেয়া ,যাতে তারা ন্যায়পরায়ণ ও প্রকৃত মুসলমানের দৃষ্টান্ত হতে পারে।

আহলে বাইতের (আ.) শিক্ষাপদ্ধতি এ পুস্তিকার ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তবে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ের উপর তাদের শিক্ষার উদাহরণস্বরূপ প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থগুলোর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এখানে আমরা আকায়েদের উপর ইমামদের (আ.) শিক্ষা সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করলে মন্দ হয় না যা ইমামগণ (আ.) তাদের অনুসারীদেরকে আল্লাহর নৈকট্যলাভের জন্য এবং মানুষের অন্তর থেকে পাপ-পংকিলতা দূর করে সত্যবাদী-ন্যায়পরায়ণ জনগোষ্ঠী সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে আমরা যে তাকিয়্যা সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম তা-ও এ কল্যাণময় শিক্ষারই অন্তর্ভূক্ত। আমরা নিম্নে আরো কিছু শিষ্টাচারমূলক শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করব।