ইমাম মাহদী (আ.)

ইমাম মাহদী (আ.)20%

ইমাম মাহদী (আ.) লেখক:
: মীর আশরাফুল আলম
প্রকাশক: -
বিভাগ: ইমাম মাহদী (আ.)

ইমাম মাহদী (আ.)
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 28 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 13904 / ডাউনলোড: 4348
সাইজ সাইজ সাইজ
ইমাম মাহদী (আ.)

ইমাম মাহদী (আ.)

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

ইমাম মাহদী (আ.)

মূল :দার রাহে হাক প্রকাশনীর লেখকবৃন্দ

ভাষান্তরে : মীর আশরাফুল আলম

بسم الله الرحمن الرحیم

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু

আল্লাহর নামে

) و َلَقَدْ كَتَبْنا فِى الزِّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ اَنَّ الْأرْضَ يَرِثُها عِبادِىَ الصَّالِحُونَ (

তৌরাতের পরে যাবুরের মধ্যেও আমরা উল্লেখ করেছি যে আমার সৎকর্মশীলবান্দারাই হবে জমিনের উত্তরাধিকারী(আম্বিয়া : ১০৫)।

ভূমিকা

শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষার পর ,পাহাড়সম ধৈর্য্যের প্রতিমূর্তি ,দৃঢ় সংকল্প ও সিদ্ধান্তের অধিকারী এক অশ্বারোহী আসবে তাঁর ঐশী হাতের তরবারীটি হীন ,নীচ ও জঘন্য লোকদেরকে ধ্বংস করার জন্য ঝংকিত হবে। ভাল মানুষের হেদায়েতের জন্য তার নূরের ছটা প্রজ্জলিত হবে। তিনি আসবেন মানবতার সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন রজনীতে উজ্জ্বল এক উল্কার ন্যায় ,অসত্যের ভয়ংকর পদভূমিতে মহা সত্যের প্রতীক হিসাবে মুহাম্মদ (সা.)-এর পাগড়ি মাথায় ,তাঁর আলখেল্লা পরিধান করে ,তাঁর জুতা পায়ে দিয়ে ,তাঁর  কোরআন বুকে নিয়ে এবং আলী (আ.)-এর যুলফিকার (তরবারী) তার হাতে ,যাহরা (সা .আ.)- এর ভালবাসা অন্তরে ধারণ করে ,ইমাম হাসান (আ.)-এর  মতো ধৈর্য রয়েছে তাঁর ব্যক্তিত্বে ,ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মতো সাহসিকতা তার পদক্ষেপে ,ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর মত ইবাদতকারীর খ্যাতি নিয়ে ,ইমাম বাকির (আ.)-এর মত জ্ঞানের ভাণ্ডার ,ইমাম মূসা কাযেম (আ.)-এর মত মহানুভবতা ,ইমাম রেযা (আ.)-এর সন্তুষ্টি ,ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর দানশীলতা ,ইমাম হাদী (আ.)-এর হেদায়েত ,ইমাম আসকারী (আ.)-এর ভাবমূর্তি নিয়ে তিনি আসবেন ...।

মাথা থেকে পা পর্যন্ত নবুয়ত ও ইমামতের প্রতিচ্ছবি ,সমস্ত নবীর বৈশিষ্ট্যে তাঁর অস্তিত্বে প্রতিফলিত ,যেমন হযরত আদম (আ.)-এর মতো মনুষ্যত্বকে আলোকিত করা ,হযরত নূহ (আ.)-এর মতো শতবছর ধরে কষ্ট ও নিপীড়নের বোঝা বহন ,হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর মতো তাওহীদের ধ্বনি দিয়ে মূর্তিসমূহ ভেঙ্গে চুরমার করবেন ,যেমন হযরত মূসা (আ.)-এর ন্যায় ফিরাউনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন ,হযরত ঈসা (আ.)-এর ন্যায় মৃত মানুষকে জীবিত করবেন এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ন্যায় বিশ্ববাসীর কল্যাণ ও সফলতা বয়ে আনবেন ... ।

যখন তিনি নামায পড়বেন চিরন্তন সত্তার প্রকৃত ইবাদতকারীর প্রতীক স্বরূপ ,যখন তিনি উপদেশ দান করবেন তাঁর কথায় নবীদের উপর নাযিলকৃত ওহীর আওয়াজ ভেসে উঠবে ,তাঁর গর্জন শতাব্দীকে প্রকম্পিত করবে ,অত্যাচারীদের তলোয়ারের ঝন ঝনানি চির দিনের জন্য থামিয়ে দিবেন ,তাঁর কিয়াম কিয়ামতের ন্যায় পৃথিবীকে জাগরিত করবে ,যেহেতু তাঁর আবির্ভাবের অর্থই হচ্ছে ধার্মিকতার উত্থান সেহেতু দীন ইসলামকেই পৃথিবীর উপর প্রতিষ্ঠিত করবেন ,যেহেতু তাঁর হাতদুটি উর্বর ফলদায়ক গাছের ডাল পালার ন্যায় (অর্থাৎ ইমামতেরই অংশ বিশেষ) জমিন এবং আসমানের মধ্যে যোগ সূত্র স্থাপন করবে (অর্থাৎ পৃথিবীকে এমন আধ্যাত্মিকতায় ভরে দিবে যে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি হবে) ,যেহেতু তার বাণীসমূহ আল্লাহ্ তা য়ালার ওহীর সহগামী তাই ফেরেশতাদেরকেও মানুষের পাশা পাশি ডাকবেন ...।

যখন তাঁর উত্থান ঘটবে বিভ্রান্তিসমূহের বিলুপ্তি ঘটবে ,তিনি যখন শির উঁচু করবেন হেদায়েতের পতাকা উত্তোলিত হবে ,তাঁর উত্থানস্থল বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের বধ্যভূমি ,তাঁর নাম মানবতার শত্রুদের কাছে মৃত্যুদূতের স্মরণ ,তাঁর আবির্ভাব অত্যাচারীদের যবনিকা টানবে ,তাঁর অবস্থান সৎকর্মশীলদের জন্য কল্যাণকর ,তাঁর অন্তর্ধান নিপীড়িতদের জন্য দীর্ঘতম রজনী স্বরূপ এবং তাঁর আবির্ভাব প্রতীক্ষমান সত্যিকার প্রেমিকদের জন্য শুভ সকাল।

তিনি পৃথিবীর বুকে আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা করেবেন ,মানুষ যে আল্লাহর খলিফা তার প্রকৃত অর্থকে তাদের সামনে তুলে ধরবেন ,তাঁর অস্তিত্ব আল্লাহর উপর ঈমানের বৃহৎ অলৌকিক নিদর্শনসমূহের একটি ,তার অন্তর্ধান হচ্ছে অদৃশ্যের ব্যাখ্যাকারী ,তাঁর আবির্ভাব আখেরাতের সু-সংবাদদাতা ,তাঁর কিয়াম জিহাদ ও ঐশী প্রতিশ্রুতির ব্যাখ্যাকারী ,তাঁর ভাষ্যই কোরআনের ব্যাখ্যা ,পথহারাদের জন্য তাঁর দৃষ্টি নবীদের ভালবাসায় ভরা সমুদ্রের তরঙ্গ স্বরূপ অবশেষে তিনিই একমাত্র ভরসা যিনি দীনের প্রকৃত সৈনিকদেরকে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেবেন এবং নবীদের মিশন ও তাদের কষ্টকে ফলাফলে পৌঁছাবেন ...।

সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত

নাম : মাসুম (পাক ও পবিত্র) ইমামগণ তাদের অনুসারীদেরকে ইমাম মাহ্দী (আ.) -এর নাম উচ্চারণ করতে বারণ করেছেন। আর এ বিষয়ে এতটুকুই বলেছেন যে ,আমাদের নবী (সা.)-এর নাম ও ডাক নামই তার নাম ও ডাক নাম এবং তাঁর আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত তাঁর আসল নাম উচ্চারণ করা ঠিক হবে না।

উপাধি : এই মহান ব্যক্তির সব থেকে পরিচিত উপাধিগুলো হচ্ছে যথাক্রমে মাহ্দী ,কায়েম ,হুজ্জাত ও বাকিয়াতুল্লাহ্ ।

পিতা : ইমামতের আকাশের একাদশতম নক্ষত্র হযরত ইমাম হাসান আসকারী (আ.)।

মাতা : সম্মানীতা ও সম্ভ্রান্ত রমণী নারজীস। তিনি ছিলেন রোম সম্রাটের দৌহিত্রা।

জন্ম তারিখ : ২৫৫ হিজরীর ১৫ই শা বান রোজ শুক্রবার।

জন্মস্থান : ইরাকের সামাররা শহরে।

বয়স : এখন আরবী ১৪৩৬ সন ,আর তিনি আরবী ২৫৫ সনে জন্ম গ্রহণ করেছেন ;সে অনুযায়ী তাঁর বয়স আনুমানিক একহাজার একশ একাশি বছর চলছে। আর এভাবেই চলতে থাকবে যতদিন পর্যন্ত আল্লাহ্ রাব্বুল আ লামিন চান। আর তিনি একদিন আল্লাহ্ রাব্বুল আ লামিনের অনুমতিতেই পৃথিবীতে আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীকে অত্যাচার ও জুলুমের মধ্যে নিমজ্জিত অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়ে সমস্ত স্থানে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করবেন।

ইসলাম ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মে হযরত মাহ্দীর উপর বিশ্বাস

ইমাম মাহ্দী (আ.) যিনি আল্লাহর তরফ হতে পৃথিবীর বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য আসবেন। বিভিন্ন মাযহাব ও দীনের লোকদেরকে তাঁর উপর বিশ্বাস রাখতে দেখা যায়। শুধুমাত্র শিয়ারাই নয় বরং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা য়াত ও অন্যান্য দীন যেমন ইহুদী ,খৃস্টান ,অগ্নিপূজক ,হিন্দু সবাই আল্লাহর পক্ষ হতে একজন ঐশী সংস্কারকের আবির্ভাবের বিষয়টি স্বীকার করে এবং তাদের ধর্ম গ্রন্থ এরূপ ব্যক্তির আগমনের ঘোষণা দিয়েছে। তারা ও তাঁর অপেক্ষায় দিন গুনছে।

হিন্দু ধর্মের দিদ নামক ধর্মীয় গ্রন্থে এভাবে লেখা হয়েছে যে : এই পৃথিবী মন্দে (অত্যাচার ,জুলুম ,নিপীড়ন ,অন্যায় ,অবিচার) পূর্ণ হওয়ার পর শেষ জামানায় একজন বাদশাহ্ আসবেন যিনি সৃষ্টি কূলের জন্য পথ প্রদর্শক হবেন। তার নাম মানসুর বা সাহায্যপ্রাপ্ত। সমস্ত পৃথিবীকে তিনি তার হাতের মুঠোয় নিয়ে আসবেন। কে মু মিন আর কে কাফের চিনতে পারবেন। আর তিনি আল্লাহর কাছে যা কিছুই চাইবেন আল্লাহ্ রাব্বুল আ লামিন তাই তাকে দিবেন।

যারথুষ্ট্র ধর্মের প্রবক্তা যারথুষ্ট্রের এক শিষ্যের লেখা জামাসব নামক বইতে এভাবে উল্লেখ আছে যে : আরবের হাশেমী বংশ থেকে এমন এক লোকের আবির্ভাব হবে যার মাথা ,দেহ ও পা যুগল হবে বিশালাকারের। তাঁর পূর্বপূরুষের দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ঐ ব্যক্তি বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে ইরানে আসবে এবং এই দেশকে সুখ-শান্তি ,সত্য ও ন্যায়ে পূর্ণ করবেন। আর তাঁর ন্যায় পরায়ণ শাসনে বাঘ ও ছাগল একই ঘাটে পানি পান করবে।

যারথুষ্ট্রদের ধর্মীয় গ্রন্থ যানদ -এ বর্ণিত হয়েছে যে ,ঐ সময় ইয়ায্দানদের (অগ্নিপূজকদের খোদাদের) পক্ষ হতে বড় ধরনের বিজয় আসবে এবং আহরিমানকে (অশুভ আত্মাকে বা শয়তানকে) নিশ্চিহ্ন করবে। আর পৃথিবীতে  আহরিমানের (শয়তানের) সমস্ত অনুচরদেরকে নিরাশ্রয় করা হবে। ইয়াযদানদের বিজয় ও আহরিমানের পরাজয়ের পর এই পৃথিবী তার প্রকৃত পূর্ণতায় পৌঁছাবে এবং আদম সন্তানরা সৌভাগ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবে।

তওরাতে সেফরে তাকভীন হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশ থেকে যে বারজন ইমাম আসবেন ,তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে : ইসমাইলের জন্য তোমার দোয়া শুনেছি এ কারণে তাকে বরকতময় করেছি এবং বংশধরের মধ্যে বারজন নেতার আবির্ভাব ঘটাব এবং তাকে বিশাল উম্মত দান করব।

হযরত দাউদ (আ.)-এর মাযামিরে উল্লিখিত হয়েছে : অবশ্য সৎকর্মশীলদেরকে মহান আল্লাহ্ সাহায্য করবেন সৎকর্মশীলরা এমন এক ভূমির উত্তরাধিকারী হবে যার মধ্যে তারা স্থায়ী হবে।

আর পবিত্র কোরআনেও উল্লেখ করা হয়েছে :

) و َ لَقَدْ كَتَبْنا فِى الزَّبُورِ مِنْ بَعْدَ الذِّكْرِ أَنَّ الْاَرْضَ يَرِثُها عِيبادِىَ الصَّالِحُونَ ( .

নিশ্চয়ই আমরা জিকরের (অর্থাৎ তওরাতের) পর যাবুরের (দাউদ) ১০ মধ্যে লিখেছি যে আমার সৎকর্মশীল বান্দারাই জমিনের উত্তরাধিকারী হবে। ১১

পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে :

) و َعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَ عَمِلُوا الصَّالِحاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِى الْارْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الّذينَ مِنْ قَبْلِهِمْ و لَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِى ارْتَضَى لَهُمْ وَ لَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْناً يَعْبُدُونَنِى لا يُشْرِكُونَ بِى شَيْئاً (

আল্লাহ্ রাব্বুল আ লামিন তোমাদের মধ্যে থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে তাদের প্রতি ওয়াদা দিয়েছেন যে ,তাদেরকে জমিনের বুকে নিজের খলিফা ও প্রতিনিধি নিযুক্ত করবেন।  যেভাবে তাদের পূর্ববর্তীদের খেলাফত ও প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন। যে দীনকে আল্লাহ্ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন তাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং তাদের ভয়-ভীতিকে শান্তি ও নিরাপত্তায় পরিবর্তন করবেন , (এই শর্তে) যে ,শুধুমাত্র আমার ইবাদত করবে এবং কোন কিছুকে আমার সাথে শরিক করবে না। ১২

আরও উল্লেখ আছে যে

) و َ نُرِيدُ أَنْ نَمُنَّ عَلى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِى الْارْضِ وَ نَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَ نَجْعَلَهُمُ الْوارِثِينَ (

পৃথিবীতে যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল আমি চাইলাম তাদেরকে (আল্লাহর সেইসব বান্দা যারা অত্যাচারীর অত্যাচারের সামনে শক্তিহীন অবস্থায় ছিল) অনুগ্রহ করতে এবং তাদেরকে নেতৃত্ব দান ও জমিনের উত্তরাধিকারী করতে। ১৩

এই আয়াতগুলো যা নমুনা স্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে। তা থেকে এ ধারণা পাওয়া যায় যে ,অবশেষে এই পৃথিবীর দায়িত্ব আল্লাহর যোগ্য অর্থাৎ মু মিন বান্দাদের হাতে আসবে এবং তারাই এর উত্তরাধিকারী হবে। আর এই বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে তারা সমাসীন হবে। মানবজাতি যদি সঠিক পথ এবং আল্লাহর নির্দেশিত বিধান হতে দূরে সরে যায় তবে যতই সে দূরে সরতে থাকে বিচ্যুতির অতল গহবরে তলিয়ে যেতে থাকে। যখন সে পতনের প্রান্তসীমায় পৌঁছায় হঠাৎ তার বিবেক জাগ্রত হয় তখন বুঝতে পারে নিজের শক্তি ,চিন্তা ,জ্ঞান ,কৌশল ও বস্তুগত প্রযুক্তিসমূহ দিয়ে সে বিশ্বে শৃংখলা ,ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম নয়। আর এ অবস্থায় সে এ সত্যও উপলব্ধি করে যে,ওহী ও ঈমান নির্ভর ঐশী নেতৃত্ব অর্থাৎ শুধুমাত্র একজন বিশ্বজনীন ঐশী সংস্কারকই পারে বিশ্ব ও মানব জাতিকে পতন হতে রক্ষা করতে ও মুক্তি দিতে। শুধুমাত্র তার সাহায্যেই পারে তারা পূর্ণতার পথ অতিক্রম করে ন্যায় ,শান্তি ,নিরাপত্তা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বিশ্বজনীন শাসন প্রতিষ্ঠা করতে।

ইসলামী উৎসসমূহে প্রতিশ্রুত ইমাম মাহ্দীর উপর বিশ্বাস

ইসলামের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং নিষ্পাপ ইমামগণ ,বিভিন্ন সময়ে বা বিভিন্ন উপলক্ষ্যে হযরত মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব ,উত্থান ,দীর্ঘদিন মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থাকা এবং তার আরও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে খবরা খবর দিয়েছিলেন। তাদের অনেক অনুসারী বা ছাত্ররাই এই খবর বা হাদীসসমূহকে উল্লেখ করেছেন। ইমাম মাহ্দী গ্রন্থের লেখক তার এই গ্রন্থে নবী (সা.)-এর ৫০ জন সাহাবী ও ৫০ জন তাবেইন (যারা সরাসরি নবীকে (সা.) দেখেন নি কিন্তু তার সাহাবাদেরকে দেখেছেন) যারা হযরত মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসসমূহকে লিপিবদ্ধ করেছে তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। ১৪

কিছু সংখ্যক বিশিষ্ট ও নামকরা কবি অনেক বছর ধরে এমনকি ইমাম মাহ্দীর জন্মগ্রহণের একশত বছর আগে থেকেই এই হাদীসসমূহের ভাবার্থের উপর ভিত্তি করে তারা তাদের কবিতা রচনা করেছেন :

কুমাইত একজন বিপ্লবী শিয়া কবি (মৃত্যু ১২৬ হিজরী) ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর উপর রচিত একটি কবিতা ইমাম বাকির (আ.)-এর সামনে পাঠ করে তাঁর আবির্ভাবের সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। ১৫

ইসমাইল হামিরী (মৃত্যু ১৭৩ হিজরী ) ইমাম সাদিক (আ.)-এর সংস্পর্শে এসে তাঁর মাধ্যমে হেদায়েত পাওয়ার পর ,একই ছন্দে গাঁথা প্রশংসা মূলক একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করে যা নিম্নে উল্লিখিত হলো :

وَ اُشْهِدُ رَبِّى أَنَّ قَوْلَكَ حُجَّةٌ

عَلَى الْخَلْقِ طُرّاً مِنْ مُطِيعٍ وَ مُذْنِبٍ

بِاَنَّ وَلِىَّ الْامْرِ وَ الْقاَئِمَ الَّذِى

تَطَلَّعَ نَفْسِى نَحْوَهُ بِتَطَرُّبٍ

لَهُ غَيْبَةٌ لا بُدَّ مِنْ أَنْ يَغِيبَها

فَصَلِّىَ عَلَيْهِ اللَّهُ مِنْ مَتَغَيِّبٍ

فَيَمْكُثُ حِيناً ثُمَّ يَظْهَرُ حِينَهُ

فَيَمْلَأُ عَدْلاً كُلَّ شَرْقٍ وَ مَغْرِبٍ

(আর আমার আল্লাহকে সাক্ষী রাখছি যে আপনার (ইমাম সাদিক) মুখের কথা সমস্ত সৃষ্টির উপর যারা অনুগত ও যারা পাপী ,তাদের সবার উপর দলিল স্বরূপ।

(বলেছিলেন যে) ওয়ালীয়ে আমর (নির্দেশের অধিকর্তা) ও কায়েম (উত্থানকারী) যার জন্য আমার প্রাণ ব্যাকুল ,তাঁর অন্তর্ধান থাকবে যাতে কোন সন্দেহ নেই ,ঐ অন্তর্ধানের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক।

একটি নির্দিষ্ট সময় অদৃশ্যে থাকার পর আবির্ভূত হবেন। আর পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত অত্যাচার ও জুলুমকে অপসারণ করে আদর্শ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করবেন।

দে বেল খুযা ই হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর প্রথম দিকের একজন উচ্চমানের সাহিত্যিক ছিলেন (মৃত্যু ২৪৬ হিজরী)। তিনিও এসম্পর্কে একটি প্রশংসামূলক দীর্ঘ কবিতা রচনা করে ইমাম রেজা (আ.)-এর সামনে পাঠ করেন ,যা এরূপ :

فَلَوْلاَ الَّذِى اَرْجُوهُ فِى الْيَوْمِ اَوْ غَدٍ

تَقَطَّعَ نَفْسِى اَثْرَهُمْ حَسَراتٍ

خُرُوجَ اِمامٍ لاَ مُحالَةَ خاَرِجٌ

يَقُومُ عَلَى اسْمِ اللَّهِ وَ الْبَرَكاَتِ

يُمَيِّزُ فِيناَ كُلَّ حَقٍّ وَ باطِلٍ

وَ يَجْزِى عَلَى النَّعْماءِ وَ النَّقَماتِ

আজ অথবা কাল যা কিছু ঘটবে সে বিষয়ে যদি আমি আশান্বিত না থাকতাম তাহলে আমার অন্তর আহলে বাইতের দুঃখে ও অনুতাপে টুকরো টুকরো হয়ে যেত।

এবং সেই আশা ,এমন এক ইমামের অবির্ভাবের জন্য যিনি নিঃসন্দেহে আবির্ভূত হবেন। যিনি আল্লাহর নাম ও বরকত সাথে নিয়ে কিয়াম করবেন। আর তিনি আমাদের মধ্যকার সত্য ও বাতিলকেও পৃথক করবেন এবং ভাল কাজের পুরস্কার ও খারাপ কাজের শাস্তি দিবেন। ১৬

যখন দে বেল এই কবিতাটি পাঠ করলো ইমাম রেজা (আ.) মাথা তুলে বললেন : ওহে খুযা ই! এই কবিতাটিকে রুহুল কুদুস তোমার মুখ দিয়ে উচ্চারণ করিয়েছেন। আরও বললেন : তুমি কি জান সেই ইমাম কে ?

দে বেল : না জানিনা। শুধু এতটুকুই শুনেছি যে ,একজন ইমাম আপনার বংশ থেকে আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীতে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করবেন।

ইমাম : ওহে দে বেল! আমার পরে আমার ছেলে মুহাম্মদ (ইমাম জাওয়াদ) ইমাম ও তারপর তার ছেলে আলী (ইমাম হাদী) ,তারপর তার ছেলে হাসান (ইমাম আসকারী) এবং তারপর তার ছেলে হুজ্জাতে কায়েম যে থাকবে লোক চক্ষুর অন্তরালে আর মানুষ থাকবে তার অপেক্ষায়। যখন তাঁর আবির্ভাব ঘটবে সবাই তাকে অনুসরণ করে চলবে। যদি দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার মাত্র আর একদিনও বাকি থাকে আল্লাহ্ সেই দিনকে এতটা দীর্ঘ করে দিবেন যাতে করে সেই কায়েমের আবির্ভাব ঘটতে পারে এবং দুনিয়াতে অত্যাচার ও জুলুমের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে সেখানে আদর্শ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। অত্যাচার ও জুলুমের পরিমান যতই বেশী হোক না কেন। ১৭

অন্যান্য আরও কিছু সংখ্যক কবি ও লেখক যারা ইমামগণের সমসাময়িক অথবা ইমামগণের সমসাময়িক কবিদের ছাত্র ছিল ,তারা তাদের কবিতায় পরিষ্কারভাবে হযরত মাহ্দী (আ.)-এর বিষয়ে ইশারা করেছে। ১৮ কখনও কখনও এমন হয়েছে যে ইমামদের কাছে অনেকেই প্রশ্ন করত ,আপনি কি রাসূলের বংশের সেই উত্থানকারী (কায়েম আলে মুহাম্মদ) অথবা প্রতীক্ষিত মাহ্দী (মাহ্দী মুনতাযার) ?ইমামগণ তাদের প্রশ্নের উত্তরে স্থান ,কাল ,পাত্র ভেদে ইমাম মাহদী আল কায়েম (আ.)-এর পরিচয় তুলে ধরতেন।

আর এ সম্পর্কিত (ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের) হাদীসসমূহের প্রসিদ্ধির কারণেই তাঁর জন্মের পূর্ব থেকেই অনেকেই নিজেদেরকে মাহ্দী হওয়ার মিথ্যা দাবী করেছে অথবা তাদেরকে মাহ্দী বলে অভিহিত ও প্রচার চালিয়ে অন্যরা এই পথে সুবিধা আদায় করেছে। উদাহরণ স্বরূপ : কিসানিয়াহ্ ফেরকার অনুসারীরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর জন্মের প্রায় দুইশত বছর আগে মুহাম্মদ হানাফিয়াকে ইমাম ও প্রতীক্ষিত মাহ্দী বলে মনে করত। আর তাদের ধারণা ছিল যে ,সে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে। একদিন আবার আবির্ভূত হবে। তারা তাদের দাবি অনুযায়ী ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ব্যাপারে নবী (সা.) ও অতীত ইমামগণের নিকট থেকে যে সকল হাদীস শুনেছিল তা মুহাম্মদ হানাফিয়ার ব্যাপারে বলতে শুরু করলো। ১৯ আব্বাসীয় খলিফা মাহ্দীও নিজেকে প্রতিশ্রুত মাহ্দী বলে মানুষের মাঝে পরিচিত করাতে চেয়েছিল যাতে করে ইমাম মাহ্দীর অপেক্ষায় থাকা মানুষদের নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও শিয়া মাযহাবের অনেক আলেমই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ব্যাপারে বিভিন্ন রেওয়ায়েত ও হাদীস তাদের লিখিত বইতে লিপিবদ্ধ করেছেন। ২০ মুসনাদে আহমাদ বিন হাম্বাল (মৃত্যু ২৪১ হিজরী) ও সহীহ বুখারী (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) যা আহলে সুন্নতের আলেমদের কাছে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য তাতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর জন্মের অনেক আগেই তাঁর ব্যাপারে হাদীস লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ২১

হাসান বিন মাহবুব কর্তৃক লিখিত মাশিখাহ্ বইটি যা মরহুম তাবরাসীর ভাষ্য অনুযায়ী ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর দীর্ঘ কালীন অন্তর্ধানের একশত বছর পূর্বে লিখিত হয়েছে। তাতে ইমামের অন্তর্ধান সম্পর্কে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ২২ মরহুম তাবারসী আরও বলেন যে ,ইমাম বাকির ও সাদিক (আ.)-এর সময়কার শিয়া মুহাদ্দিসরা ইমাম মাহ্দীর অন্তর্ধানে থাকার বিষয়টিকে তাদের গ্রন্থসমূহে বর্ণনা করেছেন। ২৩

আরও কিছু শিয়া ও সুন্নি মনীষী প্রতীক্ষিত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ব্যাপারে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন ২৪ যার কিছু কিছু তার জন্মের পূর্বেই রচিত হয়েছে। রাওয়াজনী (মৃত্যু ২৫০ হিজরী) একজন সুন্নি আলেম ,তিনি ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর জন্মের আগেই তাঁর সম্পর্কে আখবারুল মাহ্দী নামে একটি বই লিখেন। ২৫ ইমামদের কিছু সাহাবাও যেমন : আনমাতী ,মুহাম্মদ বিন হাসান বিন জুমহুর ইমামের জন্ম ও তাঁর অন্তর্ধানের পূর্বেই তাঁর সম্বন্ধে বই লিখেন। ২৬

তাঁর বিষয়ে এত পরিমানে হাদীস ও রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে ,ইসলামের অন্য কোন বিষয়ে এত অধিক হাদীস বর্ণিত হয় নি। শিয়া ও সুন্নি উভয় মাযহাবের আলেমদের দৃষ্টিতে এই সকল হাদীসগুলো সহীহ এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত। শুধুমাত্র শিয়া আলেমরাই নন বরং অনেক সুন্নি আলেমও এগুলোকে মুতাওয়াতির বলে স্বীকার করেছেন। ২৭ যেমন সাজযী (মৃত্যু ৩৬৩ হিজরী) তার মানাকিবুস শাফিয়ী নামক গ্রন্থে লিখেছেন : হযরত মাহ্দী সংক্রান্ত হাদীসসমূহ যা নবী (সা.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা  হয়েছে তা মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে পড়ে। ২৮

শিয়া ও সুন্নি উভয় মাযহাবের সূত্রসমূহে ইমাম মাহ্দীর ব্যাপারে যত হাদীস পাওয়া গেছে তা যদি গণনা করা হয় নিঃসন্দেহে তা এত অধিক পরিমানে হবে যে ,ইসলামের নিশ্চিত বিশ্বাসের বিষয়েও অর্থাৎ যে সকল বিষয়ে মুসলমানরা কোন প্রকার সংশয় রাখেনা বা যে বিষয়গুলোকে মেনে চলা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করে তার ব্যাপারেও এত পরিমান হাদীস বর্ণিত হয় নি। ২৯

এ কারণেই মুসলমানরা ইসলামী ইতিহাসের সেই প্রথম থেকেই মাহ্দী মওউদের (প্রতিশ্রুত মাহদী) আবির্ভাব ও উত্থানের বিষয়ে অবগত ছিল। বিশেষ করে শিয়া মাযহাবের অনুসারী যারা নবী (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইতের হাতে দীন ও দুনিয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়েছিল। এ জন্যেই তারা এই বিষয়ের উপর শক্ত ও মজবুত বিশ্বাস রাখতো এবং অন্যান্য ইমামদের জীবদ্দশাতেও ইমাম মাহ্দীর জন্মের জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকতো।

বিভিন্ন হাদীসে হযরত মাহ্দীর ব্যাপারে বলা হয়েছে যে তিনি হাশেমী বংশের হযরত ফাতিমা (সা.)-এর সন্তান ,শহীদদের সর্দার ইমাম হুসাইনের বংশধারা হতে হবেন। তাঁর পিতার নাম হচ্ছে হাসান এবং তাঁর নিজের নাম ও ডাক নাম নবী (সাঃ)-এর নাম ও ডাক নামের অনুরূপ। গোপনে জন্মগ্রহণ করবেন ও লোকচক্ষুর অন্তরালে জীবন-যাপন করবেন। দুইটি অন্তর্ধান হবে। যার একটি স্বল্প মেয়াদী অপরটি দীর্ঘ মেয়াদী। যতদিন আল্লাহ্ চাইবেন অন্তর্ধানে থাকবেন। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে আবির্ভূত ও কিয়াম (মহাবিপ্লব) করবেন। আর সারা বিশ্বে দীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। পৃথিবীকে অত্যাচার ,জুলুম থেকে মুক্ত করে সেখানে আদর্শ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করবেন।

এই হাদীসগুলোতে দ্বাদশ ইমামের শারীরিক ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আমরা এখানে নমুনা স্বরূপ কয়েকটি হাদীস তুলে ধরব। সুন্নি ও শিয়া মাযহাবের হাদীসগুলোকে আমরা এখানে পৃথক পৃথকভাবে তুলে ধরবো যাতে করে পাঠকের বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।

সুন্নি মাযহাবের হাদীস থেকে

1-রাসূলে আকরাম (সা.) হযরত মাহ্দী (আ.)-এর অবশ্যম্ভাবী আবির্ভাবের ব্যাপারে বলেছেন : যদি দুনিয়ার বয়স শেষ হতে আর মাত্র একদিন বাকী থাকে ,আল্লাহ্ আমার বংশের থেকে একজনকে পাঠাবেন এই দুনিয়াতে সুবিচার ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করার জন্যে ,যতই অন্যায় ও অত্যাচার দুনিয়াকে গ্রাস করে  ফেলুক। 30

2-নবী (সা.) বলেছেন : ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত আসবে না যতদিন পর্যন্ত না আমার আহলে বাইতের মধ্য থেকে একজন এই দুনিয়ার নেতৃত্ব গ্রহণ করবে ,যার নাম আমার নামের অনুরূপ হবে। 31

3-মহানবী (সা.) বলেছেন : যেমন আলী আমার পরে উম্মতের ইমাম এবং প্রতীক্ষিত মাহদী (তাঁর সন্তানদের মধ্যে থেকে) যখন আবির্ভূত হবে জমিনকে ন্যায় ও সুবিচারে পূর্ণ করবে পৃথিবী তখন যতই জুলুম ও অত্যাচারে ভরে থাকুক না  কেন। তাঁর কসম যিনি আমাকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। সন্দেহাতীতভাবে যারা তাঁর অন্তর্ধানে থাকা অবস্থায়ও তাঁর উপর দৃঢ় ঈমান রাখবে তাদের সংখ্যা বিরল পরশমনির থেকেও কম হবে।

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ উঁঠে দাঁড়িয়ে বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ,আপনার সন্তান মাহ্দী কি অন্তর্ধানে থাকবেন ?

বললেন : হ্যাঁ। আমার আল্লাহর কসম। মুমিনরা পরীক্ষিত ও পরিশুদ্ধ হবে আর কাফেররা ধ্বংস হয়ে যাবে। হে জাবির! এই নির্দেশ আল্লাহরই একটি নির্দেশ। এই রহস্যপূর্ণ বিষয়টি তাঁর গুপ্ত বিষয়াবলীর মধ্যে একটি যা তাঁর বান্দাদের কাছে তিনি গোপন রেখেছেন ,এটার ব্যাপারে সন্দেহ করা থেকে দূরে থাক কেননা আল্লাহর নির্দেশের ব্যাপারে সন্দেহ করা কুফরী কাজ। 32

4-উম্মুল মু মিনীন উম্মে সালামা বলেন : রাসূলুল্লাহ্ প্রতিশ্রুত মাহ্দীর কথা স্মরণ করে বলেছিলেন : হ্যাঁ। সে সত্য এবং সে ফাতিমার বংশধর থেকে আসবে। 33

5-হযরত সালমান ফারসী বলেন : একদিন নবী (সা.)-এর নিকট গিয়ে দেখলাম ,হুসাইন বিন আলীকে নিজের উরুর উপর বসিয়ে তার চোখগুলোতে ও ঠোঁটে চুম্বন করছেন আর বলছেন : তুমি নেতা ,নেতার সন্তান ও নেতার ভাই ,তুমি ইমাম ,ইমামের সন্তান ও ইমামের ভাই ,তুমি আল্লাহর হুজ্জাত (স্পষ্ট ও প্রামাণ্য দলিল) ,আল্লাহর হুজ্জাতের সন্তান ও তাঁর হুজ্জাতের ভাই ,তুমি আল্লাহর নয়জন প্রামাণ্য দলিলের পিতা তাদের মধ্যে নবম ব্যক্তি হচ্ছে প্রতীক্ষিত মাহ্দী। 34

6-ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন : হাসান বিন আলী আসকারীর স্থলাভিষিক্ত উপযুক্ত সন্তানই সাহেবুজ্জামান (সময়ের অধিপতি) আর সেই হচ্ছে মাহ্দী মওউদ (প্রতীক্ষিত মাহ্দী)। 35

7-মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.) বলেছেন : তোমাদেরকে মাহ্দীর সুসংবাদ দিচ্ছি ,সে আমার উম্মতের মধ্য থেকেই অভিষিক্ত হবে। যখন আমার উম্মত মতপার্থক্যের ও পদস্খলনের মধ্যে থাকবে। সে জমিনকে পরিপূর্ণভাবে ন্যায় ও আদর্শে ভরে দেবে। তা যতই জুলুম ও অত্যাচারে ভরে থাকুক না কেন। আসমান ও জমিনের সকলেই তাঁর উপর সন্তুষ্ট হবে...। 36

8-ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন : যে লোকের তাকওয়া (খোদভীতি) থাকে না তাঁর কোন দীন নেই। তোমাদের মধ্যে সেই আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় যার পরহেজগারিতা সকলের চেয়ে অধিক। অতঃপর বলেন : আমার বংশধরের চতুর্থ সন্তান এক সম্ভ্রান্ত দাসীর সন্তান ,আল্লাহ্ তাঁর মাধ্যমে জমিনকে সব ধরনের জুলুম ও অন্যায় থেকে মুক্তি দিবেন এবং সে ঐ ব্যক্তি যার জন্মের বিষয়ে মানুষের সন্দেহ থাকবে। সে অন্তর্ধানে থাকবে। যখন আবির্ভূত হবেন তখন জমিন আল্লাহর নূরে আলোকিত হবে। আর মানুষের মাঝে ন্যায়ের মানদণ্ড স্থাপন করবে। যার কারণে কেউ অন্যের উপর অত্যাচার করতে পারবে না...। 37

9-আমিরুল মু মিনিন আলী (আ.) বলেছেন : আল্লাহ্ রাব্বুল আ লামিন এমন এক দল লোককে আনবেন যারা তাঁকে ভালবাসে এবং তিনিও তাদেরকে ভালবাসেন। এমন এক ব্যক্তি তাদের মধ্যে ঐশী নেতৃত্ব লাভ করবে যে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকবে। আর সে হচ্ছে মাহ্দী মওউদ (প্রতিশ্রুত মাহ্দী) ...। সে  জমিনকে সুবিচার ও ন্যায়ে পূর্ণ করবে এবং এ কাজ করতে তাঁর কোন প্রকার সমস্যা বা অসুবিধা হবে না। শিশু বয়সেই সে তাঁর বাবা-মার কাছ থেকে দূরে থাকবে মুসলিম দেশগুলোকে নির্বিঘ্নে জয় করবে। যুগের সব কিছু তাঁর অনুকূলে ও তাঁর জন্যে প্রস্তুত থাকবে। তাঁর বক্তব্য যুক্তিপূর্ণ হবে এবং নবীন প্রবীণ সকলেই তাকে অনুসরণ করে চলবে। তিনি পৃথিবীকে ন্যায় ও সুবিচারে পূর্ণ করবেন যতটাই তা অন্যায় ও অত্যাচারে পূর্ণ হোক না কেন আর ঠিক ঐ সময় তাঁর ইমামত পরিপূর্ণতায় পৌঁছাবে ও তাঁর খেলাফত বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হবে। এই পৃথিবী ইমাম মাহ্দীর পরশ পেয়ে তাঁর হারিয়ে যাওয়া রূপ বা সৌন্দর্যকে পুনরায় ফিরে পাবে। পৃথিবী তরতাজা ও নির্মল এবং নিয়ামতে পূর্ণ হবে ,নদ-নদীতে নির্মল পানির প্রবাহ বয়ে যাবে। পাপাচার ,শত্রুতা ,ফিতনা ,সকল অন্যায় পৃথিবী থেকে নিশ্চি হ্ন হবে ,বিদ্বেষ দূরীভূত হয়ে মানুষের অন্তরগুলি একে অপরের প্রতি ভালবাসায় পূর্ণ হবে ,সকল মানুষ ভালকাজে লিপ্ত হবে। আর তাদের সবকিছুই তখন বরকতময় হয়ে উঠবে। এর বেশী কিছু বলার প্রয়োজন দেখছি না শুধুমাত্র ঐ দিনের প্রতি আমার শুভেচ্ছা রইলো। 38

শিয়া মাযহাবের হাদীস থেকে

1-ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : মানুষ তাদের ইমামকে হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সে হজ মৌসুমে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে দেখবে। কিন্তু মানুষ তাকে দেখতে পাবে না। 39

2-আসবাগ বিন নাবাতাহ্ বলেন : আমিরুল মু মিনীন আলী (আ.)-এর সমীপে উপস্থিত হয়ে তাঁকে চিন্তায় মগ্ন থাকতে দেখলাম। তিনি আঙ্গুল মোবারক দিয়ে মাটিতে টোকা দিচ্ছিলেন। বললাম : আপনাকে কেন চিন্তিত লাগছে ,আপনি কী মাটির প্রতি ভালবাসা রাখেন ?

বললেন : না ,আল্লাহ্ সাক্ষী কখনই মাটি ও এই দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা আমার ছিল না বা এখনও নেই। এক জাতকের বিষয়ে চিন্তা করছি যে আমার বংশ থেকে আসবে এবং আমার সন্তানদের মধ্যে একাদশতম ব্যক্তি সে। তার নাম মাহ্দী । সে দুনিয়াকে ন্যায় ও আদর্শে ভরে দেবে। তা যতই জুলুম ও অত্যাচারে ডুবে থাকুক না কেন। সে অন্তর্ধানে থাকবে এ বিষয়ে একদল ধ্বংস প্রাপ্ত হবে এবং অন্য একদল হবে হেদায়ত প্রাপ্ত...। 40

3-ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : যদি তোমাদের কাছে খবর পৌঁছায় যে জামানার (যুগের) ইমাম অদৃশ্যে আছেন তবে তাঁর এই অদৃশ্য হওয়ার খবরটিকে অস্বীকার করবে না। 41

4-তিনি আরও বলেছেন : আল কায়েমের (ইমাম মাহ্দী) দুইটি অন্তর্ধান থাকবে যার একটি স্বল্প মেয়াদী এবং অন্যটি দীর্ঘ মেয়াদী। স্বল্প মেয়াদী অন্তর্ধানে তাঁর বিশেষ কিছু অনুসারী ছাড়া তাকে কেউ দেখতে পাবে না এবং দীর্ঘ মেয়াদী অন্তর্ধানে তাঁর অতি নিকটের লোকেরা ছাড়া অন্য কেউ তাঁর ব্যাপারে জানতে পারবে না। 42

5-তিনি আরও বলেছেন : আল কায়েম (ইমাম মাহ্দী) এমন অবস্থায় কিয়াম করবেন যে তিনি কারো সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ নন বা কেউ তাঁর হতে বাইয়াত গ্রহণ করে নি। 43

6-নবী করিম (সঃ) বলেছেন : আল কায়েম (ইমাম মাহ্দী) আমার সন্তান ,তার নাম ও ডাক নাম আমার নাম ও ডাক নামের অনুরূপ। দেখতেও অবিকল আমার মতো। শরীরের আকৃতি ও গঠন আমার মতোই। তার সুন্নত (অনুসৃত নীতি) হচ্ছে আমারই সুন্নত। মানুষদেরকে আমার দীন ও শরীয়তের এবং আল্লাহর কিতাবের প্রতি দাওয়াত দেবে। যারা তাঁকে অনুসরণ করবে তারা আমাকে অনুসরণ করলো এবং যারা তাঁর সাথে বিরোধিতা করবে তারা আমার সাথে বিরোধিতা করলো। আর যারা তাঁর অন্তর্ধানকে অস্বীকার করবে তারা আমাকে অস্বীকার করলো। 44

7-ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেন : আমাদের কায়েমের (ইমাম মাহ্দী) সাথে বিভিন্ন নবীর যেমন নূহ ,ইবরাহীম ,মূসা ,ঈসা ,আইয়ুব ও হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.)-এর মিল রয়েছে। নূহ নবীর সাথে বয়সের দিক দিয়ে। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে গোপনে ভুমিষ্ট হওয়া ও মানুষের থেকে দূরে থাকা। মূসা (আ.)-এর সাথে অদৃশ্য থাকা ও জীবন নাশের ভয়ের ব্যাপারে। ঈসা (আ.)-এর সাথে মানুষ যেভাবে তাঁর ব্যাপারে মতবিরোধ করেছিল সে দিক দিয়ে। আইয়ুব (আ.)-এর সাথে তার দুঃখ-বেদনা ও উদ্বেগ লাঘব হয়ে মুক্তির পথ সুগম হওয়ার দিক থেকে। নবী করীম (সা.)-এর সাথে তার মতো তলোয়ার হাতে সংগ্রাম করা। 45

8-ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন : এরূপ যে শেষ জামানার ইমাম অদৃশ্যে থাকবে। ঐ সময় আল্লাহর বান্দারা অবশ্যই যেন তাকওয়ার (পরহেযগারী) পথ অবলম্বন করে ও আল্লাহর দ্বীনকে আঁকড়ে থাকে। 46

9-তিনি আরও বলেছেন : মানুষের সামনে এমন এক সময় আসবে যখন তাদের ইমাম তাদের চোখের অন্তরালে (অদৃশ্যে) থাকবে।

যুরারাহ বলেন : তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম যে ,ঐ সময় মানুষের দায়িত্ব বা করণীয় কী ?

বললেন : যা কিছু তাদেরকে আগেই বলা হয়েছে বা তাদের কাছে আগেই পৌঁছেছে (অর্থাৎ দীনের প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর দেয়া আদেশ-নির্দেশসমূহ) তা জামানার ইমাম আবির্ভূত হওয়া পর্যন্ত মেনে চলা। 47

10-তিনি আরও বলেছেন : এই ঘটনাটি (ইমামের আবির্ভাব ও তার উত্থান) তখন সংঘটিত হবে যখন এমন কোন দল ও গোষ্ঠী অবশিষ্ট থাকবে না মানুষের উপর শাসনকার্য পরিচালনা করে নি। যাতে করে কেউ বলতে না পারে যে ,আমাদের হাতে ক্ষমতা থাকলে আমরাও ন্যায় ও আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতাম বা তার ভিত্তিতে শাসনকার্য পরিচালনা করতাম। অবশেষে কায়েম (ইমাম মাহ্দী) ন্যায় ও আদর্শের পক্ষে কিয়াম করবেন। 48

ইমামের জন্মলাভ

ইসলামের দ্বাদশ পথ নির্দেশক হযরত হুজ্জাত ইবনুল হাসান আল মাহ্দী (আ.) 255 হিজরীর 15ই শাবান (868 খৃস্টাব্দে) শুক্রবার ভোরে ইরাকের সামাররা শহরে একাদশ ইমামের গৃহে জন্ম গ্রহণ করেন। 49

তাঁর পিতামাতা হচ্ছেন যথাক্রমে ইসলামের একাদশ পথ নির্দেশক হযরত ইমাম হাসান আসকারী (আ.) ও সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিতা রমণী নারজীস। যিনি সুসান ও সাইকাল নামেও পরিচিত। তিনি রোমের বাদশার ছেলে ইউসায়া র কন্যা এবং সামউ ন (সে হযরত ঈসা (আ.) এর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিল)-এর বংশধর ছিলেন। তিনি এমনই সম্মানিতা ছিলেন যে ,ইমাম হাদী (আ.)-এর বোন হাকিমা খাতুন তাকে নিজের ও তার বংশের নেত্রী এবং নিজেকে তার সেবিকা হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন। 50

যখন নারজীস খাতুন রোমে থাকতেন রাতে অসাধারণ স্বপ্ন দেখতেন। একবার তিনি স্বপ্নে নবী আকরাম (সা.) ও ঈসাকে (আ.) দেখলেন যে ,তাকে ইমাম হাসান আসকারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করালেন। অন্য আরও একটি স্বপ্নে দেখলেন যে হযরত ফাতিমা (আ.)-এর দাওয়াতে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছেন। কিন্তু এ বিষয়টিকে তিনি তার পরিবারের কাছে ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে গোপন রেখেছিলেন।

তারপর মুসলমান ও রোমানদের সাথে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় রোমের বাদশাহ্ যুদ্ধের ময়দানের দিকে রওনা হলো। এদিকে নারজীস খাতুন স্বপ্নের মধ্যে নির্দেশ প্রাপ্ত হলেন যে ,সৈন্যদের সেবা করার জন্য যে সকল দাসী বা সেবিকা যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয় তাদের সাথে যেন অপরিচিতের মত একেবারে সীমান্তের কাছাকাছি সৈন্যদের যে তাঁবু আছে সেখানে চলে আসেন। তিনি তাই করলেন। তাদের সাথে যাওয়ার সময় এপাশের মুসলমান সীমান্ত রক্ষীরা তাদেরকে বন্দী করলো। তাকে রাজ পরিবারের সদস্য বুঝতে না পেরে বা সেবিকা ভেবেই বন্দীদের সাথে বাগদাদে নিয়ে গেল।

এই ঘটনাটি ইসলামের দশম পথ প্রদর্শক ইমাম হাদী (আ.)-এর ইমামতের শেষের দিকে ঘটেছিল। 51 ইমাম হাদী (আ.) রোমান ভাষায় লেখা একটি চিঠি যা তিনি নিজেই লিখেছিলেন তা তাঁর এক ভৃত্যকে দিয়ে বাগদাদে নারজীস খাতুনের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। ইমামের সেই ভৃত্য তাকে দাসী বিক্রয়ের স্থান থেকে কিনে নিয়ে সামাররায় ইমামের কাছে নিয়ে এল। তিনি স্বপ্নের মধ্যে যা কিছু দেখেছিলেন ইমাম সেগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন ,তিনি একাদশ ইমামের স্ত্রী ও এমন এক সন্তানের জননী যে এই পৃথিবীর অধিকর্তা হবে। আর পৃথিবীর বুকে ন্যায়-নীতির প্রতিষ্ঠাকারী। তারপর ইমাম হাদী (আ.) তাকে তাঁর বোন হাকিমা খাতুনের (যিনি নবী পরিবারের সম্মানিতা নারী ছিলেন) হাতে তুলে দেন। 52

হাকিমা খাতুন যখনই ইমাম আসকারী (আ.)-এর কাছে আসতেন তার ব্যাপারে দোয়া করতেন যে ,আল্লাহ্ যেন তাকে সন্তান দান করেন। তিনি বলেন : একদিন ইমাম আসকারীকে দেখতে গেলাম ও আগের দোয়ারই পুনরাবৃত্তি করলে তিনি বললেন : যে সন্তানের জন্য দোয়া করছেন আল্লাহ্ তা আমাকে দিয়েছেন। সে আজ রাতেই দুনিয়ায় আগমন করবে। 53

নারজীস খাতুন এগিয়ে এসে আমার পা থেকে জুতা খুলে নেওয়ার জন্য বলল :  আমার সম্মানিতা নেত্রী আপনার জুতোজোড়া আমাকে দিন।

বললাম : তুমিই তো আমার নয়ন মণি ও আমার কর্ত্রী। আল্লাহর কসম আপনাকে আমার জুতা খুলে নিতে বা আমার সেবা করতে দেব না। কেননা প্রকৃতপক্ষে আমিই আপনার সেবিকা।

ইমাম আসকারী (আ.) আমার কথাটি শুনতে পেয়ে বললেন : ফুফু আম্মা আল্লাহ্ আপনাকে উপযুক্ত পুরস্কারে পুরস্কৃত করবেন।

সন্ধ্যা পর্যন্ত তার কাছে থাকলাম। তারপর চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এক দাসীকে আমার পোশাক আনতে বললাম। ইমাম বললেন : ফুফু আম্মা ,আজ রাত আমাদের কাছে থেকে যান। কেননা আজ রাতে এমন এক শিশু ভূমিষ্ঠ হবে যে আল্লাহর কাছে অনেক সম্মানিত ও প্রিয়। যার মাধ্যমে আল্লাহ্ মৃত দুনিয়াকে আবার জীবিত করবেন।

বললাম : হে আমার পথনির্দেশক! আপনি কার ভুমিষ্ঠ হওয়ার কথা বলছেন ?আমি তো নারজীস খাতুনের মধ্যে গর্ভবতী থাকার কোন লক্ষণই দেখলাম না!

বললেন : নারজীসের মাধ্যমেই হবে ,অন্য কারো মাধ্যমে নয়।

আমি উঠে গেলাম এবং নারজীসকে দ্বিতীয় বারের মত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম। কিন্তু তার মধ্যে গর্ভবতী থাকার কোন লক্ষণই পেলাম না। ইমামের কাছে ফিরে এলাম এবং আমার পর্যবেক্ষণের কথা তাকে জানালাম। তিনি মুচকি হেসে বললেন : ভোরে আপনার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে যে ,তার গর্ভে সন্তান ছিল। কেননা সে মূসা কালিমুল্লাহর মায়ের ন্যায়। সে কারণেই তার গর্ভাবস্থা প্রকাশিত নয়। আর কেউ তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়কে জানতো না। কেননা ফেরাউন মূসার খোঁজে (এজন্য যে সে দুনিয়ায় আসতে না পারে) গর্ভবতী মহিলাদের পেট ফেঁড়ে বাচ্চা বের করে মেরে ফেলেছিল। আর যে শিশু আজ রাতে জন্ম নিবে সেও মূসার মতই (ফেরাউনদের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে ফেলবে) এবং তারাও তার খোঁজে আছে।

হাকিমা খাতুন বলেন : আমি ভোর পর্যন্ত নারজীস খাতুনের পরিচর্যায় ছিলাম। সে শান্ত হয়ে আমার পাশে ঘুমিয়ে ছিল। কোন প্রকার নড়া-চড়াও করেনি। রাতের শেষের দিকে অর্থাৎ ছুবহ্ সাদেকের সময় আচমকা নড়ে উঠলে আমি তাকে আমার কোলের মধ্যে নিয়ে আল্লাহর নাম পড়ে তার শরীরে ফুঁক দিলাম।

ইমাম পাশের ঘর থেকে সূরা কদর পড়ে তার মাথায় ফুঁ দিতে বললেন। আমি তাই করলাম। নারজীসের কাছে তার শরীরের অবস্থা জানতে চাইলাম। সে বলল : যা কিছু আমার মাওলা আপনাকে বলেছিল তা পরিস্কার হয়ে গেছে।

আমি ইমামের নির্দেশ অনুযায়ী সূরা কদর পড়ে তার মাথায় ফুঁ দিতে থাকলাম। এই সময় তার পেটের শিশুটিও আমার সাথে একই সুরে সূরা পড়তে শুরু করল। আমি যাই পড়ি সেও আমার সাথে তাই পড়ে। সে আমাকে সালাম দিল। আমি দারুণভাবে চমকে উঠলাম। ইমাম পাশের ঘর থেকে আবারও বললেন : আল্লাহ্ রাব্বুল আ লামিনের কর্মে আশ্চর্যান্বিত হবেন না। আল্লাহ্ তা য়ালা আমাদেরকে (ইমামদের) শিশু অবস্থাতেই তাঁর প্রজ্ঞা দ্বারা সজ্জিত করেন আর পরিপূর্ণ বয়সে দুনিয়াতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন।

ইমামের কথা শেষ না হতেই নারজীস আমার পাশ থেকে উধাও হয়ে গেল। বলা যায় যেন আমার ও তার মাঝে একটি পর্দা টাঙানো হয়েছে। কেননা তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। চিৎকার দিয়ে ইমামের কাছে ছুটে গেলাম। তিনি বললেন : ফুফু আম্মা ফিরে যান। তাকে অচিরেই আগের জায়গাতে দেখতে পাবেন।

ফিরে এলাম। কিছু সময় যেতে না যেতেই ঐ পর্দার প্রলেপটি আমাদের মধ্য থেকে সরে গেল। আমি নারজীসকে দেখলাম সে যেন নূরের আলোর মধ্যে ডুবে আছে। তাকে  দেখতে গেলে ঐ নূরের আলোক ছটায় আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসলো। যে পুত্র সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হয়েছে তাকেও দেখলাম ,সে সেজদারত অবস্থায় আছে এবং তর্জনী উঠিয়ে বলল :

اَشْهَدُ أَنْ لاَ اِلَهَ اِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَ أَنَّ جَدِّى مُحَمَّداً رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَ أَنَّ أَبِى اَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ

সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই ,তিনি অদ্বিতীয় ও তাঁর কোন শরিক নেই এবং বাস্তবিকই আমার পিতামহ মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল এবং মু মিনদের নেতা আলী (আ.) আমার পিতা।

তারপর একের পর এক নিজে সহ অন্যান্য ইমামগণের ইমামতের সাক্ষ্য দিয়ে বললেন : হে আল্লাহ্! আমার প্রতিশ্রুতি প্রদানের স্থান ও কালকে ত্বরান্বিত কর ,আমার কাজকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাও ,আমার প্রতিটি পদক্ষেপ দৃঢ় করতে দাও এবং আমার মাধ্যমেই এই দুনিয়াতে ন্যায় ও নীতির প্রতিষ্ঠা কর ... । 54


3

4

5

6

7

8

9

10