মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার

 মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার42%

 মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার লেখক:
: এ.কে.এম. রশিদুজ্জামান
প্রকাশক: ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস
বিভাগ: ইমাম হোসাইন (আ.)

মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 29 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 10120 / ডাউনলোড: 3366
সাইজ সাইজ সাইজ
 মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার

মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার

লেখক:
প্রকাশক: ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস
বাংলা

ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর

মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার

সংকলনে

মুহাম্মাদ ইরফানুল হক

এ. কে. এম. রাশিদুজ্জামান

ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস

শিরোনাম : ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর

মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার

সংকলনে : মুহাম্মাদ ইরফানুল হক

এ.কে.এম. রাশিদুজ্জামান

প্রকাশক : ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস

২৭৯/৫ , মাসকান্দা , ময়মনসিংহ।

গ্রন্থস্বত্ব : প্রকাশক কর্তৃক সংরক্ষিত।

প্রকাশকাল : ২৫ মহরম , ১৪৩৪ হি. ,

২৬ অগ্রহায়ণ , ১৪১৯ বাং. ,

১০ ডিসেম্বর , ২০১২ খ্রি. ।

কম্পোজ প্রচ্ছদ : আলতাফ হোসাইন

ISBN : ৯৭৮-৯৮৪-৩৩-৬০৩৭-৩

Captive Family of Prophet (s.) ―After the Martyrdom of Imam Hossain (a.), Compiled by Md. Irfanul Huq & A.K.M. Rashiduzzaman, Published by Wiseman Publications, Mashkanda, Mymensingh, Bangladesh.

© Wiseman Publications, ২০১২.

ALL RIGHTS RESERVED FOR THE PUBLISHER.

Published in December ২০১২ (First Edition), Printed in Bangladesh, Pages-৫৬.

ForContact : wiseman১৪৭২৩১৩@yahoo.com, (৮৮০২) ০১৯২২৬৮৩০১৯

Topics : Historical incidences of Karbala – Martyrdom of Imam Hussain Ibne Ali (a.) – Heartrending Tragedy of Islam – Teachings of Sacrifice in Islam – Steadfastness of Ahlul Bayt (a.) – Captive Family of Prophet (s.).

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

নিশ্চয়ই হোসেইন হেদায়াতের বাতি ও নাজাতের নৌকা। ”

[মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-৪৩৩ ; সাফিনাতুল বিহার , খণ্ড-১ ;

মদিনাতুল মায়াজিয , খণ্ড-৪ , পৃষ্ঠা-৫২ ; খাসায়িসুল হোসেইনিয়া , পৃষ্ঠা-৪৫ ;

নাসিখুত্ তাওয়ারিখ , পৃষ্ঠা-৫৭]

ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর

মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার

ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাত

মহান আল্লাহর সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রিয় নাতি ইমাম হোসেইন (আ.) ছিলেন ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমার (আ.) প্রিয় সন্তান যাকে কারবালায় হিজরী ৬১ সনের ১০ই মুহাররম নির্মমভাবে পিপাসার্ত , ক্ষুধার্ত ও অসহায় অবস্থায় শহীদ করা হয়। সাইয়েদুশ্ শুহাদা ইমাম হোসেইন (আ.) সম্পর্কে মহানবীর (সা.) সবচেয়ে সুপরিচিত হাদীস যা সেখানকার উপস্থিত হত্যাকারীরা পর্যন্ত জানতো যে , হাসান ও হোসেইন বেহেশতের যুবকদের সর্দার। [জামে আত-তিরমিযী , হাদীস-৩৭২০]

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন , আর হোসেইনের (আ.) বিষয়ে — সে আমার থেকে , সে আমার সন্তান , আমার বংশ , মানবজাতির মধ্যে তার ভাইয়ের পরে শ্রেষ্ঠ। সে মুসলমানদের ইমাম , মুমিনদের অভিভাবক , জগতসমূহের রবের প্রতিনিধি , তাদের সাহায্যকারী যারা সাহায্য চায় , তাদের আশ্রয় যারা আশ্রয় খোঁজে , [সে] আল্লাহর প্রমাণ তাঁর পুরো সৃষ্টির ওপরে , সে বেহেশতের যুবকদের সর্দার , উম্মতের নাজাতের দরজা। তার আদেশই হলো আমার আদেশ। তার আনুগত্য করা হলো আমারই আনুগত্য করা। যে-ই তাকে অনুসরণ করে সে আমার সাথে যুক্ত হয় এবং যে তার অবাধ্য হয় সে আমার সাথে যুক্ত হতে পারে না। ’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-৪২৮]

ইমাম হোসেইন (আ.) ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার , বিনয়ী , জ্ঞানী , সাহসী এবং স্বাধীনতাকামী একজন নেতা। তিনি তার নানা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের সংশোধনের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে উদ্দ্যোগ নেন। কিন্তু সে সময়ের খলিফা [শাসক] ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়া তা অপছন্দ করে এবং তার সব ধরনের অন্যায় ও অপকর্মকে সম্মতি দিয়ে তার প্রতি আনুগত্য করার আদেশ দেয়। আর তা করা না হলে তাকে হত্যা করা হবে বলে জানিয়ে দেয়। ইমাম হোসেইন (আ.) তার সব অপকর্মের প্রতিবাদ করেন এবং আনুগত্য করতে অস্বীকার করেন।

কিন্তু তিনি জানতে পারেন ইয়াযীদ হজ্বের সময় তাকে হত্যার জন্য মক্কায় তার দূত পাঠিয়েছে। পবিত্র কাবা ঘরের কোন স্থানে তার রক্ত ঝরুক এটি তিনি পছন্দ করেন নি। তাই হজ্ব না করেই ৮ই জিলহজ্ব ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা থেকে মরুভূমির দিকে বেরিয়ে পড়েন। [বর্তমান ইরাকের] কুফা এলাকা থেকে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.)-কে চিঠি পাঠিয়েছিলেন যেন তিনি কুফায় যান এবং সেখানে গিয়ে তাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব দেন। এতে ইসলাম ধ্বংস ও বিকৃতি থেকে রক্ষা পাবে। এসব চিঠির কারণে ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা ত্যাগ করে কুফার দিকে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু পথে ইয়াযীদের নিয়োগ করা গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের আদেশে হুর বিন ইয়াযীদ ইমামকে বাধা প্রদান করে এবং কারবালা প্রান্তরে নিয়ে যায়। এখানে শত্রুরা প্রায় ত্রিশ হাজার সসস্ত্র সৈন্য মোতায়েন করে এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-কে জোরপূর্বক বাইয়াত [আনুগত্য] করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। তারা জানায় যে , যদি তা না করা হয় তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে।

ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সাথে ছিলো কেবল অল্প ক ’ জন বন্ধু ও সাহায্যকারী এবং তার পরিবারের নারী ও শিশুরা। যুদ্ধ করতে পারেন এমন পুরুষের সংখ্যা ছিলো ৭০ জনেরও কম। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সত্য ইসলামকে রক্ষার জন্য [আত্মরক্ষার] যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

শত্রুরা ইমাম হোসেইন (আ.)-কে কাবু করার জন্য পাশেই বয়ে যাওয়া ফোরাত নদীর তীর ঘেরাও করে রাখে যাতে ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার সাথীরা পানি থেকে বঞ্চিত হন। একটানা কয়েক দিন ইমামের পরিবারের নারী , শিশুরা ও সাথীরা পানি থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুরা পানির পিপাসায় কাতর হয়ে যায়। এমন অবস্থায় শত্রুরা ৯ই মহররম ইমামকে যুদ্ধ শুরুর জন্য অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে এবং ইমামের তাবুর দিকে তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। ইমাম হোসেইন (আ.) শত্রুদের কাছে তার দূত পাঠালেন এ বলে যে , তিনি একটি রাত ইবাদতের জন্য সময় চান। শত্রুরা এক রাতের জন্য তাকে সময় দেয়।

ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার সব সাথীরা জীবনের শেষ রাতটি আল্লাহর যিকির , দোয়া , নামায ও কুরআন তেলাওয়াতে কাটালেন। সকাল হলে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর বড় ছেলে হযরত আলী আকবর (আ.) আযান দিলেন এবং সবাই নামায আদায় করলেন। এরপর শত্রুরা বৃষ্টির মতো তীর ছুঁড়ে যুদ্ধ শুরু করে ইমামের একদল ক্লান্ত , ক্ষুধার্ত , পিপাসার্ত ও পরহেজগার সাথীদের বিরুদ্ধে। যাদের সংখ্যা নগন্য। ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সাথে থাকা শিশু সহ মোট সংখ্যা প্রায় ১০০ লোকের বিরুদ্ধে ৩০ ,০০০ সসস্ত্র সেনাদলের যুদ্ধ। পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম অসম যুদ্ধ আর দেখা যায় না।

জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এ যুদ্ধে ইমাম হোসেইন (আ.)-সহ মোট ৭২ জন শহীদ হন। শত্রুরা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সন্তান মাত্র ৬ মাসের শিশু আলী আসগরকেও তীর নিক্ষেপ করে হত্যা করে। জঘন্য ও নিকৃষ্টতম ঐ শত্রুরা তাদেরকে হত্যার পর তাদের লাশের মাথাগুলো কেটে বর্শার মাথায় বিদ্ধ করে এবং দশ জন ঘোড়সওয়ার দেহগুলোকে ঘোড়ার পায়ের আঘাতে আঘাতে পিষ্ট করে।

তারা তাবুগুলো লুট করে ও তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। লুট করার সময় শোকার্ত পরিবারের সদস্যদের চাবুক মারে। ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মেয়ে পাঁচ বছরের শিশু সাকিনার কানের দুল কান থেকে ছিঁড়ে নেয় এবং তা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। শিশুরা ভয়ে ও ব্যাথায় কাঁদতে থাকলে তাদের গালে চড় মারে। নারীদের মাথার চাদরও [বোরখা] কেড়ে নেয়। নবী পরিবারের নির্যাতিত অসহায় এসব সম্মানিত ব্যক্তিরা মরুভূমিতে আশ্রয়হীনভাবে খোলা আকাশের নীচে চলে আসেন।

চিত্র: [....] ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মদীনা থেকে যাত্রা করে

মক্কা হয়ে কারবালায় যাওয়ার রুট।

[― ] মহানবীর (সা.) পরিবারের বন্দী অবস্থায় কারবালা থেকে

কুফা হয়ে দামেস্কে গমনের রুট।

এরপর নবী পরিবারের বেঁচে থাকা সব সদস্যদের বন্দী করা হয় এবং তাদের সাথে নিকৃষ্ট ও অপমানজনক আচরণ করা হয়। সব বন্দীদের প্রথমে কুফায় উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের প্রাসাদে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে সিরিয়ার দামেস্কে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার রাজপ্রাসাদে নেওয়া হয়। কারবালা থেকে কুফা ছিল প্রায় ৭৬ কিলোমিটার এবং কুফা থেকে দামেস্ক ছিল প্রায় ১২০০ কিলোমিটার। কুফা থেকে দামেস্কে [শামে] যাওয়ার এ দীর্ঘ পথে কাফেলাটি বিভিন্ন যায়গায় মোট উনিশটি স্থানে বিশ্রামের জন্য থামে। থামার যায়গাগুলো ছিল প্রথম বিশ্রামের স্থান , তাফরিত্ , মাশহাদ আল-নুকতা , ওয়াদি আল-নুখলা , মুসাল , নাসিবুন , আ ’ ইনুল ওয়ারদা , রাক্কা , জুসাক্ব , দাওয়ায়াত , হাল্ব , ক্বিন্নাসরিন , মায়াররা আল-নুমান , শিযর , কাফরি তালিব , সিবুর , হামাত , হিমাস ও বালবাক।

মহানবীর (সা.) বন্দী পরিবারের নারী , শিশু ও একমাত্র জীবিত পুরুষ [অসুস্থ] ইমাম আলী ইবনে হোসেইন (আ.)-কে প্রায় ২০ দিন ধরে কয়েদিদের মতো দড়িতে হাত বাঁধা অবস্থায় জিন ছাড়া ও ছাউনি-বিহীন উটে ও খচ্চরে চড়ে ― আবার কখনোবা পায়ে হেঁটে ― মরুভূমির উত্তপ্ত দিনগুলোতে এ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।

আমরা এ সংকলনটিতে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর কারবালায় বেঁচে থাকা নবী পরিবারের সম্মানিত সদস্যদের সাথে এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-এর লাশ ও কেটে নেওয়া মাথার সাথে কি অমানবিক , অপমানজনক ও প্রতিশোধমূলক আচরণ করা হয়েছে এবং পথিমধ্যে নবী পরিবারে নির্যাতিত ও শোকার্ত সদস্যগণ যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো থেকে উপস্থাপন করবো। এ বর্ণনাগুলো প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা শেইখ আব্বাস কুম্মি রচিত শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস ’ [নাফাসুল মাহমুম] থেকে নেওয়া হয়েছে।

শাহাদাতের পরের ঘটনাবলী

বর্ণনাকারী বলে যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর তারা তার পোশাক লুট করে নিয়ে যায়। তার গায়ের জামা নিয়ে যায় ইসহাক বিন হেইওয়াহ হাযরামি , সে তা পরার পর তার কুষ্ঠ রোগ দেখা দিয়েছিল এবং তার চুল পড়ে গিয়েছিল।

ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর দেহে তেত্রিশটি বর্শার আঘাত ও চৌত্রিশটি তরবারির আঘাত ছিলো। তার পাজামা নিয়ে যায় বাহর বিন কা ’ আব তামিমি এবং বর্ণিত আছে যে সে শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছিল এবং তার পাগুলো অবশ হয়ে গিয়েছিল। তার পাগড়ি কেড়ে নেয় আখনাস বিন মুরসিদ হাযরামি যে তা মাথায় পরেছিল এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার স্যান্ডেলগুলো কেড়ে নেয় আসাদ বিন খালিদ এবং তার আংটি নেয় বাজদুল বিন সালীম কালবি যে তার আঙ্গুল কেটে তা নিয়ে গিয়েছিল [আল্লাহর অভিশাপ তার ওপরে] । যখন মুখতার তাকে [বাজদুলকে] গ্রেফতার করলো সে তার হাত ও পা কেটে ফেলেছিল , সে তার রক্ত প্রবাহিত হতে দিয়েছিল যতক্ষণ না তার মৃত্যু হয়। ইমামের গোসলের পর পরার জন্য পশমের তৈরী লম্বা জামা ছিলো যা লুট করে নিয়ে যায় ক্বায়েস বিন আল আশআস। তার বর্ম নিয়ে যায় উমর বিন সা ’ আদ এবং যখন তাকে হত্যা করা হয় মুখতার তা উপহার দেয় তার হত্যাকারী আবি উমরোহকে। তার তরবারি নিয়ে যায় জামী ’ বিন খালক আওদী ; আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে , এক তামিমি ব্যক্তি আসাদ বিন হানযালাহ অথবা ফালাফিস মুনশালি তা নিয়ে যায়। তার বিদ্যুৎগতি তরবারিটি যুলফিক্বার ছিলো না , ছিলো অন্য একটি যা ছিলো নবুয়ত ও ইমামতের একটি আমানত এবং তার বিশেষ আংটিও যা তার পরিবারের নিরাপদ হেফাযতে ছিলো।

শেইখ সাদুক্ব থেকে মুহাম্মাদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেন যে , ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল ইমাম হোসেইন (আ.)-এর আংটি সম্পর্কে যে , তার পোষাক লুটের সময় কে তা নিয়েছে। ইমাম (আ.) উত্তর দিলেন , যে রকম বলা হয় তেমন নয়। ইমাম হোসেইন (আ.) ওসিয়ত করে যান তার সন্তান ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.)-এর কাছে এবং হস্তান্তর করে গিয়েছিলেন তার আংটি এবং ইমামতের জিনিসপত্র যা এসেছিল আল্লাহর রাসূল (সা.) থেকে আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর কাছে। ইমাম আলী (আ.) তা ইমাম হাসান (আ.)-এর কাছে হস্তান্তর করেন এবং ইমাম হাসান (আ.) তা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কাছে দিয়ে যান , যা পরবর্তীতে আমার পিতা [ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.)]-এর কাছে আসে এবং তা আমার কাছে পৌঁছেছে। এটি আমার কাছে আছে এবং আমি জুম ’ আর দিন পরি এবং তা পরে নামাজ পড়ি। মুহাম্মাদ বিন মুসলিম বলেন যে , আমি শুক্রবার দিন তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম এবং তার সাথে নামাজ পড়লাম। যখন তিনি নামাজ শেষ করলেন তিনি তার হাত আমার দিকে লম্বা করলেন এবং আমি তার আঙ্গুলে আংটিটি দেখলাম যাতে খোদাই করে লেখা আছে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই , আমি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে প্রস্তুত। তখন ইমাম বললেন , এটি হলো আমার প্রপিতামহ আবু আব্দুল্লাহ হোসেইন (আ.)-এর আংটি।

শেইখ সাদুক্বের আমালি ’ ও রাওযাতুল ওয়ায়েযীন ’ -এ বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর ঘোড়া তার কেশর ও কপালকে তার রক্তে রঞ্জিত করে নিলো এবং দৌঁড়াতে শুরু করলো ও চিৎকার করতে থাকলো। যখন নবীর নাতনীরা তার চিৎকার শুনতে পেলেন তারা তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন এবং ঘোড়াটিকে দেখলেন তার আরোহী ছাড়া , এভাবে তারা জানতে পারলেন ইমাম হোসেইন (আ.) শহীদ হয়ে গেছেন।

ইবনে শাহর আশোব তার মানাক্বিব ’ -এ এবং মুহাম্মাদ বিন আবি তালিব বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর ঘোড়া সেনাবাহিনীর ঘেরাও থেকে পালিয়ে এলো এবং তার কপালের চুল রক্তে ভেজালো। সে দ্রুত নারীদের তাঁবুর দিকে ছুটে গেলো এবং চিৎকার করতে লাগলো। এরপর সে তাঁবুর পিছনে গেলো এবং তার মাথাকে মাটিতে আঘাত করতে লাগলো যতক্ষণ না মৃত্যুবরণ করলো। যখন সম্মানিতা নারীরা দেখলেন ঘোড়াটিতে আরোহী নেই তারা বিলাপ শুরু করলেন এবং সাইয়েদা উম্মে কুলসুম (আ.) তার মাথাতে হাত দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন এবং উচ্চকণ্ঠে বললেন , হে মুহাম্মাদ , হে নানা , হে নবী , হে আবুল ক্বাসিম , হে আলী , হে জাফর , হে হামযা , হে হাসান , এ হলো হোসেইন , যে মরুভূমিতে পড়ে গেছে এবং তার মাথা ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার পাগড়ী ও পোশাক লুট করে নিয়ে গেছে। এ কথা বলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।

ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জিনিসপত্র লুট এবং তার আহলুল বাইতের কান্না ও বিলাপ

সাইয়েদ ইবনে তাউস বর্ণনা করেন যে , একজন নারী গৃহকর্মী ইমাম হোসেইন (আ.)-এর তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো এবং এক ব্যক্তি তাকে বললো , হে আল্লাহর দাসী , তোমার সর্দারকে হত্যা করা হয়েছে। সে বলে যে , আমি আমার গৃহকর্তার কাছে দৌড়ে গেলাম এবং কাঁদতে শুরু করলাম , এ দেখে সব নারীরা উঠে দাঁড়ালেন এবং বিলাপ শুরু করলেন। বলা হয়েছে যে , তখন সেনাবাহিনী একত্রে এগিয়ে আসে রাসূলুল্লাহর (সা.) বংশধর ও যাহরা (আ.)-এর চোখের আলো হোসেইন (আ.)-এর তাঁবু লুট করার জন্য এবং নারীদের কাঁধ থেকে চাদর ছিনিয়ে নেয়ার জন্য। রাসূলুল্লাহর (সা.) পরিবারের কন্যারা এবং তার আহলুল বাইত একত্রে বিলাপ শুরু করলেন এবং কাঁদলেন তাদের সাথী ও বন্ধুদের হারিয়ে।

বলা হয়েছে , আল্লাহর শপথ আমি আলী (আ.)-এর কন্যা যায়নাব (আ.)-কে ভুলতে পারি না যিনি হোসেইনের (আ.) জন্য কাঁদছিলেন এবং শোকাহত কণ্ঠে বলেছিলেন , হে মুহাম্মাদ , আকাশের ফেরেশতাদের সালাম আপনার উপর , এ হলো হোসেইন , যে পড়ে গেছে [নিহত হয়েছে] , যার শরীর রক্তে ভিজে গেছে এবং তার শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছে এবং আপনার কন্যারা বন্দী হয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে অভিযোগ করি এবং মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সা.)-এর কাছে এবং আলী মুরতাযা (আ.) ও ফাতিমা যাহরা (আ.) এবং শহীদদের নেতা হামযার কাছে , হে মুহাম্মাদ (সা.) , এ হলো হোসেইন , যে মরুভূমিতে গড়িয়ে পড়েছে এবং বাতাস তার জন্য শ্বাসকষ্ট পাচ্ছে এবং সে নিহত হয়েছে অবৈধ সন্তানদের হাতে , আহ শোক , হায় মুসিবত , আজ আমার নানা রাসূল (সা.) পৃথিবী থেকে চলে গেছেন , হে মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাথীরা , আসুন ও দেখুন মুস্তাফা (সা.)-এর বংশকে কিভাবে কয়েদীদের মতো বন্দী করা হয়েছে।

অন্য আরেকটি বর্ণনায় নিচের কথাগুলো এসেছে , হে মুহাম্মাদ (সা.) , আপনার কন্যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আপনার বংশকে হত্যা করা হয়েছে। বাতাস তাদের উপর ধুলো ফেলছে। এ হলো হোসেইন , তার মাথা ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং তার পোশাক ও চাদর লুট করা হয়েছে। আমার বাবা কোরবান হোক তার জন্য যার দলকে সোমবার দিন হামলা করা হয়েছে। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার তাঁবুর দড়ি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার সাথে সাক্ষাৎ এখন আর সম্ভব নয় এবং তার আঘাতগুলো সুস্থ হবার নয়। আমার পিতার জীবন তার জন্য কোরবান হোক যার জন্য আমার জীবন কোরবান। আমার পিতা কোরবান হোক তার জন্য যিনি দুঃখের ভিতর ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় নিহত হয়েছেন। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার দাড়ি থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত পড়েছে। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার নানা মুহাম্মাদ আল মুস্তাফা (সা.) , আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার নানা আকাশগুলোর রবের রাসূল। আমার পিতা কোরবান হোক খাদিজাতুল কুবরা (আ.)-এর জন্য। আমার পিতা কোরবান হোক আলী আল-মুরতাযা (আ.)-এর জন্য। আমার পিতা কোরবান হোক ফাতিমা যাহরা (আ.)-এর উপর যিনি নারীদের সর্দার। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার জন্য সূর্য ফিরে এসেছিল যেন তিনি নামাজ পড়তে পারেন।

বর্ণনাকারী বলেন , আল্লাহর শপথ , এ কথাগুলো শুনে প্রত্যেকেই কেঁদেছিল ― হোক সে বন্ধু অথবা শত্রু । এরপর সাকিনা (আ.) তার পিতার দেহ জড়িয়ে ধরেন এবং বেদুইনরা চারিদিকে জমা হলো এবং তাকে তার কাছ থেকে টেনে সরিয়ে নিলো।

কাফ ’ আমির মিসবাহ ’ -তে আছে যে , সাকিনা (আ.) বলেছেন যে , যখন হোসেইন (আ.) শহীদ হয়ে যান , আমি তাকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম এবং আমি তাকে বলতে শুনলাম , হে আমার শিয়ারা [অনুসারীরা] আমাকে স্মরণ করো যখন পানি পান কর এবং আমার জন্য কাঁদো যখন ভ্রমণকারী অথবা শহীদের কথা শোন। তা শুনে আমি ভয়ে উঠে পড়ি এবং কান্নার কারণে আমার চোখ ব্যথা করছিল ; এরপর আমি আমার মুখে আঘাত করতে থাকি।

ইবনে আবদ রাব্বাহ তার ইক্বদুল ফারীদ ’ -এ বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ বিন মুসলিমাহ থেকে , তিনি সাবীত থেকে , তিনি বর্ণনা করেছেন আনাস বিন মালিক থেকে যে: যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দাফন করলাম , সাইয়েদা ফাতিমা যাহরা (আ.) আমার কাছে এলেন এবং বললেন , হে আনাস , কীভাবে তোমার অন্তর সায় দিলো রাসূলুল্লাহ (সা.) চেহারায় মাটি ঢালতে ? এ কথা বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং উচ্চকণ্ঠে বললেন , হে প্রিয় বাবা , আপনি রাজী হয়েছেন যখন আপনার রব আপনার সাক্ষাৎ চেয়েছেন , হে আমার প্রিয় বাবা যার নিকটবর্তী হলেন তার রব (শেষ পর্যন্ত) । ফাতিমা (আ.)-এর অবস্থা ছিলো এরকম তার পিতার দাফনের পর , তাহলে কী নেমে এসেছিল সাকিনা (আ.)-র উপর যখন তিনি তার পিতার রক্তাক্ত লাশ জড়িয়ে ধরেছিলেন , যা ছিলো মাথাবিহীন এবং তার পাগড়ী ও পোশাক লুট হয়ে যাওয়া , হাড়গুলো ভাঙ্গা ও বাঁকা পিঠসম্পন্ন ? এরপর তিনি তার অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেছেন: কিভাবে তোমাদের অন্তর সায় দিলো যখন তোমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তানকে হত্যা করলে ? কিভাবে তোমরা তার বুকের হাড়গুলো ভেঙ্গে পিষে ফেললে যা ছিলো পবিত্র জ্ঞান ’ -এর ভাণ্ডার ?

সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , উমর বিন সা ’ আদ তার সাঙ্গপাঙ্গদের মাঝে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলো , কে চায় স্বেচ্ছায় হোসেইনের পিঠ ও বুকের ওপর ঘোড়া চালাতে ? দশ জন লোক তা করার জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে এলো। তাদের মধ্যে ছিলো , ইসহাক বিন হাইওয়াহ হাযরামি , যে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জামা লুটে নিয়েছিলো , অন্যরা ছিলো আখনাস বিন মুরসিদ , হাকীম বিন তুফাইল সুমবোসি , উমর বিন সাবীহ সাইদাউই , রাজা ’ বিন মানকায আবাদি , সালীম বিন খাইসামাহ জুফী , ওয়াহেয বিন না ’ য়েম , সালেহ বিন ওয়াহাব জু ’ ফী , হানি বিন সাবীত হাযরামি এবং উসাইদ বিন মালিক [আল্লাহর অভিশাপ তাদের সবার উপর] । তারা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর দেহ ঘোড়ার খুরে পিষ্ট করে যতক্ষণ না তার বুক ও পিঠ পিষে যায়। বর্ণনাকারী বলে যে এ দশ জন উবায়দুল্লাহর কাছে আসে এবং উসাইদ বিন মালিক তাদের মধ্যে থেকে বলে যে , আমরা শক্তিশালী ঘোড়ার খুর দিয়ে পিঠের ওপরে বুক পিষেছি। [উবায়দুল্লাহ] ইবনে যিয়াদ বললো , তোমরা কারা ? তারা বললো , আমরা হোসেইনের পিঠ ঘোড়ার পায়ের নিচে পিষ্ট করেছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তার বুকের হাড়গুলো গুঁড়ো হয়ে গেছে। সে [উবায়দুল্লাহ] তাদেরকে কিছু উপহার দিলো।

আবু আমর যাহিদ বলে যে , আমরা ঐ দশ জন সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছি এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে , তাদের সবাই ছিলো জারজ। [পরে] মুখতার সাক্বাফি তাদের সবাইকে গ্রেফতার করেছিল এবং তাদের হাত ও পা লোহার বেড়িতে বেঁধেছিলো। এরপর সে আদেশ দিয়েছিল ঘোড়া দিয়ে তাদের পিঠ পিষ্ট করতে , যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা মারা যায়।

আল্লাহকর্তৃক হযরত আলীর মনোনয়ন

আহলে বাইতের শিরমনি , মা ফাতিমার প্রিয় স্বামী , বেহেশ্তের সর্দার ইমাম হাসান ও হুসাইনের সম্মানিত পিতা আলী হচ্ছেন মু মিনদের নেতা বা অভিভাবক । এ প্রসঙ্গে আল কোরআন উল্লেখ করেছেঃ

) إ ِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّـهُ وَرَ‌سُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَ‌اكِعُونَ(

অর্থাৎঃ নিশ্চয় তোমাদের অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ ও তার রাসূল এবং যারা ঈমান এনেছে , নামায ক্বায়েম করেছে আর রুকু অবস্থায় যাকাত প্রদান করেছে ।42

অধিকাংশ তাফসীরকারকদের মতে উক্ত আয়াতটি ইমাম আলীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে ।43

আবু ইসহাক বিন মুহাম্মদ আসসা লিব তার স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে হযরত আবুযার গিফারী থেকে নিম্নলিখিত ভাবে ঘটনাটি বর্ণনা করছেন । হযরত আবু যার গিফারী বলেছেন , আমি স্বীয় কর্নে শ্রবন করেছি যে রাসূল (সা .) বলেছেনঃ

علی قائد البرره، و قاتل الکفره، منصور من نصره، مخذول من خذله

অর্থাৎঃ আলী সৎ লোকদের নেতা , কাফেরদের হত্যাকারী , যে তাকে সাহায্য করবে সে ( আল্লাহ কর্তৃক ) সাহায্য প্রাপ্ত হবে , যে তাকে ত্যাগ করবে ( আল্লাহ ) তাকে ত্যাগ করবেন ।44

হযরত আবুযার গিফারী বলেন আমি একদা রাসূল ( সা .) এর সাথে যোহরের নামাজ আদায় করছিলাম । ইতিমধ্যে একজন ভিখারী মসজিদে প্রবেশ করে ভিক্ষা চাইলো । কিন্তু কেউ তাকে কোন সাহায্য করলো না । ভিক্ষুকটি দু হাত তুলে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানালোঃ হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থেকো , আমি মসজিদে প্রবেশ করে সাহায্য চাইলাম কিন্তু কেউ কিছু দিল না । তখন হযরত আলী ( আ .) নামাজে রুকু অবস্থায় ছিলেন । তিনি ইশারা করলে ঐ লোকটি আলীর হাতের আংটি খুলে নিয়ে যায় । আর এ ঘটনাটি নবীর চোখের সামনে ঘটে । নবীজি নামাজ শেষে দু হাত তুলে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করলেনঃ

হে আল্লাহ যখন হযরত মুসা ( আ .) তোমাকে বলেছিল ,

) و َاجْعَل لِّي وَزِيرً ‌ ا مِّنْ أَهْلِي هَارُ ‌ ونَ أَخِي اشْدُدْ بِهِ أَزْرِ ‌ ي وَأَشْرِ ‌ كْهُ فِي أَمْرِ ‌ ي(

অর্থাৎঃ (হে আল্লাহ ) তুমি আমার জন্যে আমার পরিবার থেকে আমার ভাই হারুনকে আমার পরামর্শদাতা নিয়োগ কর , তার মাধ্যমে আমার কোমরকে শক্তিশালী করে দাও এবং তাকে আমার কাজ কর্মে অংশিদার কর ।4 5

তখন অহি নাযিল হয়েছিল । তুমি তার ভাই হারুনকে দিয়ে তার বাহুবল শক্তিশালী করেছিলে ।

اللهم انا محمد بنیک و صفیک اللهم فاشرح لی صدری و یسرلی امری و اجعل لی وزیرا من اهلی علیا اخی و اشدد به ازری

অর্থাৎঃ হে প্রভু , নিশ্চয়ই আমি তোমার নবী এবং নির্বাচিত ব্যক্তি । হে আল্লাহ তুমি আমার অন্তরকে প্রশস্ত করে দাও এবং আমার কাজ সহজ করে দাও । আমার জন্য আমার আহল থেকে আলীকে পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োগ কর । তার মাধ্যমে আমার কোমরকে শক্তিশালী করে দাও ।

তখনও প্রিয় নবী ( সা .) এর মুনাজাত সমাপ্ত হয়নি এমনি সময় অব তীর্ণ হয় এ আয়াতঃ

) إ ِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّـهُ وَرَ‌سُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَ‌اكِعُونَ(

অর্থাৎঃ নিশ্চয় তোমাদের নেতা ও অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ ও তার রাসূল এবং যারা ঈমান এনেছে , নামায ক্বায়েম করেছে আর রুকু অবস্থায় যাকাত প্রদান করেছে ।46

এখানে লক্ষ্যনীয় যে , আল্লাহ ও তার রাসূলের নেতৃত্বের পাশাপাশি আলীর বেলায়েত বা অভিভাবকত্বের কথা আল কোরআন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করছে । প্রিয় নবী (সা .) তার মুনাজাতে আলীকে তার সাহায্যকারী এবং তার হাত শক্তিশালী করার লক্ষে হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকে পরামর্শদাতা হিসেবে পাবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন । আর তাই তার ইন্তেকালের পর আলীর অভিভাবকত্ব গ্রহন ইসলামকে শক্তিশালী করারই নামান্তর ।

নবীকর্তৃক হযরত আলীর মনোনয়ন

নবী পাক (সা .) এর নবুয়্যত লাভের তিন বৎসর পর নিম্ন আয়াতটি অবতির্ণ হয়ঃ

) و َأَنذِرْ‌ عَشِيرَ‌تَكَ الْأَقْرَ‌بِينَ(

অর্থাৎঃ (হে নবী ) তোমার নিকটতম আত্মীয় -স্বজনকে (দোযখের আযাবের প্রতি ) ভয় প্রদর্শন কর ।47

প্রায় সকল তাফসীরকারক ও ঐতিহাসিকদের মতে মহানবী (সা .) তখন বনি হাশেম গোত্রের 45জন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে দুপুরের আহারের নিমন্ত্রণ দেন । আপ্যায়ন শেষে তিনি মে হমানদের মু খোমুখী দাড়িয়ে মহান আল্লাহর প্রশংসার মধ্য দিয়ে তিনি তার বক্তব্য শুরু করেন । তিনি সুস্পষ্টভাবে তার রেসালাতের সুমহান বার্তা সকলের সামনে ব্যক্ত করেন ।

তিনি বলেনঃ

ان الرائد لا یکذب اهله و الله لا اله الا هو انی رسول الله الیکم خاصة و الی الناس عامة و الله لتموتن کما تنامون و لتبعثن کما تستیقظون و لتحاسبن بما تعملون و انها الجنه ابدا و النار ابدا

অর্থাৎঃ এটা অতি সত্যি কথা যে কোন এক জনগোষ্ঠির পথ প্রদর্শক তার লোকজনদের নিকট মিথ্যা বলতে পারেনা । আল্লাহর শপথ তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই , আমি বিশেষভাবে তোমাদের জন্যে আর সাধারণভাবে সবার জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি । আল্লাহর শপথ তোমরা নিদ্রার ন্যায় মৃত্যুমুখে ঢলে পড়বে এবং জাগ্রত ব্যক্তিদের ন্যায় পুনরুত্থিত হবে একদিন । তোমরা তোমাদের কর্মের ফলাফল ভোগ করবে সেদিন । নিশ্চয় জান্নাত চিরস্থায়ী আবাসস্থল (সৎ লোকদের জন্যে ) আর জাহান্নামের অগ্নি হবে চিরস্থায়ী আবাস (অসৎ লোকদের জন্যে )।48

অতঃপর তিনি বলেনঃ হে লোকসকল আমার মত উত্তম জিনিষ তোমাদের জন্যে অন্য কেউ আনেনি । আমি তোমাদের জন্যে ইহকাল ও পরকালের মঙ্গল নিয়ে আগমন করেছি । আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমাদেরকে সেই মঙ্গল কাজের দিকে আহবান জানাতে ।

অবশেষে তিনি বলেনঃ

فایکم یوازرنی علی هذا الامر علی ان یکون اخی و وصی وخلیفتی فیکم ؟

অর্থাৎঃ তোমাদের মধ্য থেকে আমার সাহায্যকারী হবার মত এমন কে আছো ? যার ফলে সে আমার ভ্রাতা , উত্তরাধীকারী ও খলিফা হিসাবে পরিগনিত হবে ?

যখন মহানবীর বক্তব্য এখানে এসে সমাপ্তি ঘটে তখন সমাবেশে নিঃশব্দ বিরাজ করছিলো । কেউ টু শব্দটুকু করেনি । ইত্যবসরে একজন যুবক হাত উচু করে নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দ্ব্যার্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করলো তিনি আর কেউ নন , তিনি হলেন শেরে খোদা হযরত আলী ( আ .) । রাসূল ( সা .) তাকে বসতে বললেন । আবারো তিনি পূর্ব প্রশ্নটির পুনরাবৃত্তি করেন । কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া গেলনা । আলী ছাড়া কারো কাছ থেকে । পুনরায় তিনি আলীকে বসতে বললেন । এভাবে তিন বার তিনি পুনরাবৃত্তি করেন এবং প্রতিবার আলীই হাত উচু করে তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন ।

এ পর্যায়ে রাসূল ( সা .) তার ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন । তিনি বলেনঃ

ان هذا اخی وصی و خلیفتی علیکم فاسمعوا له اطیعوا

অর্থাৎঃ নিশ্চয় এই যুবক (আলী ) আমার ভাই , আমার উত্তরাধীকারী এবং তোমাদের মাঝে আমার খলিফা । তোমরা সকলে তার কথা শ্রবণ করো এবং তাকে অনুসরণ করো ।49

পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে যে নবী (সা .) এর দাওয়াত তার নবুয়্যত লাভের তিন বৎসর পর সংঘটিত হয়েছির । তার দাওয়াতী মিশনের প্রথম ভাগেই এ ঘটনাটি সংঘটিত হয় । তখনও তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তৌহীদ ও নবুয়্যতের দাওয়াতই দিয়ে যাচ্ছিলেন ।

আল -কোরআনের ভাষায়ঃ

) قالوا لا اله الا الله تفلحون(

অর্থাৎঃ তোমরা বল আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই তাতেই তোমরা সফলকাম হবে । এবং

ان محمدا رسول الله

মোহাম্মদ আল্লাহর রাসূল ।

তবে এ ঐতিহাসিক দাওয়াতের ব্যবস্থাপনা , প্রিয় নবীর বক্তৃতা ও তৌহীদ -নবুয়্যতের ঘোষণার পাশাপাশি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের খেলাফতের ঘোষণা খেকে এটাই উপলদ্ধি করতে পারি যে , মহানবীর দাওয়াতের সূচনা পূর্বেই তিনি তার পরবর্তী খলিফা ও উত্তরাধীকারী নিযুক্তিতে ত্রুটি করেন নি । এটা এমন একটি বিষয় যা তৌহীদ ও নবুয়্যত থেকে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় । তৌহীদ ও নবুয়্যতের স্থায়িত্বের জন্যে ইমামতের ঘোষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায় সেদিন মহানবী (সা .) সবার সম্মুখে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছিলেন পরবর্তী নেতার মনোনয়নের বিষয়টি । এ দু টি পদ তথা নবুয়্যত ও খেলাফত , মর্যাদার ক্ষেত্রে একটি বৃক্ষের দু টি শাখার ন্যায় । রেসালাত দ্বীন ইসলামের প্রবর্তক এবং ইমামত বা খেলাফত সেই প্রবর্তীত দ্বীনের সংরক্ষক । সকল হাদীসবেত্তা ও ঐতিহাসিক তাদের স্ব -স্ব গ্রন্থে নিম্নোক্ত ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেছেন ।

মুহাম্মদ (সা .) তাবুকের যুদ্ধে যাবার প্রাক্কালে লোকজন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্যে তাকে সংঙ্গ দিয়েছিল । এ যুদ্ধে তিনি হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকে মদীনার গভর্নর করে তার উপর দায়িত্বভার অর্পন করে যান । মদিনার আভ্যন্তরীন অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে তিনি এ ব্যবস্থা নিয়ে ছিলেন । কিন্তু আলী জেহাদের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আবেদন করলেন , হে আল্লাহর রাসূল (সা .) আমি কি যুদ্ধে যেতে পারবো না ? নবী (সা .) উত্তরে বললেন , না । তৎক্ষণাৎ আলী ক্রন্দন শুরু করে দিলেন । তখন নবী (সা .) হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ

انت منی بمنزلة هارون من موسی الا لا نبی بعدی

অর্থাৎঃ (হে আলী ) তুমি আমার কাছে সে স্থানে অবস্থান করছো যে স্থানে হারুন মুসার কাছে ছিলো । তবে পার্থক্য হলো আমার পরে আর কোন নবী আগমন করবে না ।50

মহানবী (সা .) এর উপরোক্ত উক্তি থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে , নবুয়্যত ব্যতীত হযরত হারুনের সকল পদমর্যাদাই হযরত আলীর জন্যে সংরক্ষিত । আল -কোরআন উল্লেখ করছে , মুসা (আ .) আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে বলেছিলেনঃ

اجعل لی وزیا من اهلی هارون اخی اشدد به ازری و اشرکه فی امری

অর্থাৎঃ ( হে আল্লাহ ) তুমি আমার জন্যে আমার বংশ থেকে আমার ভাই হারুনকে আমার পরামর্শদাতা ও সাহায্যকারী হিসাবে নিয়োগ করো । তার মাধ্যমে আমার কোমর শক্তিশালী করে দাও এবং তাকে আমার কাজ কর্মে অংশীদার কর ।51

গাদীরেখুমের ঘটনা

হিজরী দশম বছর । রাসূল ( সা .) বিদায় হজ্ব সম্পন্ন করেছেন । এ নশ্বর পৃথিবী থেকে শেষ বিদায়ের জণ্যে প্রহর গুনছেন । প্রথম থেকে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন এ বৎসর তিনি শেষ হজ্ব সমাপন করবেন । চতুর্দিক থেকে নবীর সাথে হজ্বে অংশগ্রহনের জন্যে অশংখ্য লোকের সমাগম হয়েছিলো । ঐতিহাসকিদের মধ্যে হাজীদের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে । সর্বাপরী 90 হাজার থেকৈ 124 হাজার মানুষের সমাগম ইতিহাসে উল্লেখ আছে । এ বৎসর তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দান করেন যা বিদায় হজ্বের ভাষণ নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে ।

হজ্ব সমাপ্ত করে তিনি আসহাবকে সাথে নিয়ে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করেছেন । প্রচন্ড গরম , মাটি ফেটে চৌচির । পথিমধ্যে গাদীরে খুম নামক চৌরাস্তায় এসে তিনি থেমে গেলেন । এখানেই ঘটেছে সেই ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ গাদীরে খুমের ঘটনা । শীয়া - সুন্নী নির্বিশেষে সকল এতিহাসিক ও হাদীস বিশারদ এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে তাদের স্ব - স্ব গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন ।

নবী করিম ( সা .) তার কয়েকজন ঘনিষ্ট সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন এ স্থানে সকলকে সমবেত করতে । যারা এখনো পিছে পড়ে আছে তাদের জন্যে অপেক্ষা করতে বললেন । যারা সিরিয়া ও ইরাক অভিমুখে এ চৌরাস্তা থেকে রওয়ানা হয়ে গেছেন তাদেরকে এ স্থানে ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন । উত্তপ্ত বালুকাময় পথঘাট লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল কিছুক্ষনের মধ্যেই ।

নবী ( সা .)- এর জন্যে আসন প্রস্তুত করা হল । আসনের উপর সামিয়ানা টাংগানো হল । আসনটি এমন ভাবে উচু করে নির্মান করা হলো যেন বহুদূর থেকেও সকলে সুন্দরভাবে নবী করিম ( সা .) কে দেখতে পায় ।

এমনকি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার জন্যে নবী ( সা .) আসহাব ও হাজীদের কষ্ট দিবেন ? গাদীরে খুমে অবস্থান এবং ভাষণ দেয়ার জন্যে আসন তৈরী করার যে কারণ নিহিত আছে তাহলো অব্যবহিত পূর্বে অবতীর্ণ হওয়া নিম্ন আয়াত

) ي َا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ(

অর্থাৎঃ হে রাসূল আপনার রবের নিকট থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা পৌছিয়ে দিন । আর যদি এ কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম না হন তা হলে রেসালাতের দাওয়াত - ই পৌছাতে পারলেন না । আল্লাহ মানুষের অনিষ্ট থেকে আপনাকে রক্ষা করবেন । নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফের জনগোষ্ঠিকে হেদায়েত করবেন না ।52

উপরোল্লিখিত আয়াতটিতে রাসূল ( সা .) কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন । নিশ্চয়ই এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা শুধুমাত্র তিনি নবীকেই অবগত করিয়েছেন । আর তা এক্ষনে মানুষের সমক্ষে পেশ করতে হবে ? এমন কি আবতির্ণ করা হয়েছে যা এভাবে ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যক্ত করতে হবে ? সূরা মায়েদা হচ্ছে নবী ( সা .) এর উপর অবতীর্ণ সর্বশেষ সূরা । এ সূরাটি নবীর শেষ জীবনে নাযিল হয়েছে । ইতিপূর্বে তৌহীদ , শেরক , রেসালাত , ক্বিয়ামত , নামাজ , রোজা , হজ্ব , যাকাত ইত্যাদি সব ধরণের বিষয়ে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল । এমন কি বিষয় অবশিষ্ট রয়ে গেছে যা কোন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিতে হবে ? রাসূল ( সা .) তো কোন ভীতু ব্যক্তি নন । তিনি কঠোর বিপদেও মু মিনদের সান্তনাকারী ছিলেন । তিনি সকল ধরণের বিপদ সংকুল পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন অবশেষে তিনি মক্কা বিজয় করেছেন , বীর দর্পে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেছেন বিজয়ীর বেশে । কাবার মুর্তিগুলোকে তিনি ভেঙ্গে সেখানে নামাজ ক্বায়েম করেছেন ।

আল্লাহ তাকে এ আয়াতে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে দিচ্ছেন , যদি এ কাজটি আঞ্জাম দেয়া না হয় তাহলে রেসালাতের কোন কিছুই পৌছানো হলো না । এটা এমন একটা কাজ যার ফলে রেসালাত পরিপূর্ণ হবে । আর আল্লাহ রাসূলকে অভয় দিয়ে বলছেন আল্লাহ তোমাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন ।

মুলতঃ একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার জন্যেই প্রিয় নবী ( সা .) সবাইকে গাদীরে খুমে সমবেত হতে বলেছেন । মহানবী ( সা .) তার আসন অলংকৃত করেছেন । তিনি ভাষণ দিচ্ছেনঃ

“……………… হে মানব মন্ডলী । আমি কি সকল মু মিনদের চেয়ে সর্বোত্তম নেতানই ? .. তোমরা কি জানোনা আমি প্রতিটি মু মিনের প্রানের চেয়েও প্রিয় নেতা…… ..? তখন সকলে সমস্বরে বলে উঠলো , জ্বি ইয়া রাসূল আল্লাহ ! . অতঃপর তার পার্শ্বে উপবিষ্ট হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের হাত সকলের সম্মুখে উচু করে তুলে ধরলেন । ঐতিহাসিকগণ বলেন , নবী ( সা .) হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের হাত এমনভাবে উচুতে তুলে ধরেছিলেন যে তাদের উভয়ের বাহুমুলদ্বয় সবাই দেখতে পেয়েছেন ।

অতঃপর মহানবী ( সা .) বললেনঃ

ایها الناس! الله مولای و انا مولاکم، فمن کنت مولاه فهذا علی مولاه، اللهم وال من والاه و عاد من عاداه و انصر من نصره و اخذل من خذله............."

অর্থাৎঃ হে লোকসকল ! আল্লাহ আমার প্রভূ ও নেতা , আর আমি তোমাদের নেতা বা মওলা । সুতরাং আমি যার মওলা বা অভিভাবক আলীও তার মওলা বা অভিভাবক । হে আল্লাহ যে আলীকে ভালবাসে তুমিও তাকে ভালবাস , যে আলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে তুমিও তাকে শত্রু গণ্য কর । আর যে তাকে সাহায্য করে তুমিও তাকে সহায়তা দান কর এবং যে তাকে ত্যাগ করে তুমিও তাকে পরিত্যাগ কর………… .।

পরক্ষণই অবতীর্ণ হলো নিন্মোক্ত আয়াতটিঃ

) ال ْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا(

অর্থাৎঃ আজকে তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং দ্বীন ইসলামের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলাম ।53

সাথে সাথে রাসূল (সা .) বলেনঃ

الله اکبر علی اکمال الدین و اتمام النعمة و رضا الرب بر سالتی و الولایه لعلی

অর্থাৎঃ আল্লাহু আকবার , দ্বীন পরিপূর্ণতা লাভ করেছে এবং নেয়ামত সম্পূর্ণরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে । আমার রব আমার রেসালাত ও আলীর বেলায়াতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়েছেন ।

অতঃপর সকলে পর্যায়ক্রমে আলীকে অভিন্দন জ্ঞাপন করতে লাগলেন । ইত্যবসরে হযরত ওমর বলে উঠেলেন ,

هنیئا لک یا ابن ابی طالب اصبحت و امسیت مولی کل مؤمن و مؤمنه.

অর্থাৎঃ শুভ হোক আপনার জন্যে হে আলী বিন আবি তালিব । আজ থেকে আপনি সকল মুমিন নর নারীদের মওলা হিসেবে পরিগণিত হলেন ।

অন্য রেওয়ায়েত এরূপ আছে যে , হযরত ওমর বলেছেন ,

بخ بخ لک یا ابن ابی طالب

অর্থাৎঃ মারহাবা , ,মারহাবা হে আবু তালিবের পুত্র ।

গাদীরে খুমের এ ঐতিহাসিক ঘটনাটি 110 জন সাহাবী , 10জন সর্বজন শ্রদ্ধেয় তাবেয়ী এবং 360 জন বিশিষ্ট ওলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদ সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন । এ ঘটনাটির বর্ণনা সর্বস্তরের ইতিহাসবেত্তাগণ তাদের স্ব -স্ব পুস্তকে সহি হাদীস বলে আখ্যায়িত করেছেন । ইয়াক্বুবী এটাকে সুস্পষ্ট সহি হাদীস হিসাবে উল্লেখ করেন । পাঠকের গবেষণার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিম্নে কয়েকটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করছি মাত্র ।54

হযরতআবু বকরের খেলাফত লাভ

কথিত যে , নবী করিম ( সা .) হযরত আবুকবরকে খেলাফত দিয়ে গেছেন । তিনি হযরত আবুবকরকে নামাজের ইমামতি করার দায়িত্ব দিয়ে বিশ্ব মুসলিমকে এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে হযরত আবু বকরই খেলাফতের আসন অলংকৃত করার জন্যে অন্য সবার চাইতে বেশী যোগ্য । আর তাই বনি সাক্বিফার সমাবেশে সাহাবীরা তাকে খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন ।

কিন্তু ইতিহাস স্বীকৃত সত্য যে , বনি সাক্বিফাতে খলিফা নির্বাচনের প্রসংঙ্গ নিয়ে মোহাজের ও আনসারদের মধ্যে যে বাক -বিতন্ডা ও তর্ক বিতর্ক হয়েছিলো সেখানে কখনো নামাজের প্রসংঙ্গ উত্থাপিত হয়নি । উপস্থিত কেউ হযরত আবু বকরের খেলাফত লাভের জন্যে নামাজের ইমামতির যুক্তি উপস্থাপন করেন নি । সেখানে আমরা দেখতে পাই আনসাররা খেলাফতের জন্যে নিজেদেরকে সর্বাধিক যোগ্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন । আর মোহাজেররা খেলাফতের জন্যে নিজেদেরকে উপস্থাপন করেছিলন । তারা সেখানে কোন ক্রমেই আবুবকরের নামাজের ইমামতের ঘটনা তুলে ধরেননি । বরং হযরত ওমর সেখানে এগিয়ে এসে ঝগড়া ও মতভেদ এড়িয়ে ঘোষণা করলেন , আমি আবু বকরের হাতে বাইয়াত গ্রহন করলাম । এভাবে সেদিন বনি সক্বিফাতে উপস্থিত সাহাবীরা হযরত আবুবকরের হাতে বাইয়াত গ্রহন করেছিলেন ।

তখনও রাসূলের পবিত্র লাশ দাফন করা হয়নি খেলাফতের ব্যাপারে সাহাবীদের মধ্যে অনৈক্য শুরু হয়ে গিয়েছিল । বনি সক্বিফার সমাবেশে সাহাবীদের মাঝে উত্তপ্ত মতদগ্ধ কি প্রমাণ করে না যে তাদের মধ্যে খেলাফতের ব্যাপারে কোন প্রকার ঐক্যমত ছিল না ?55

মুলতঃ বনি সক্বিফার নির্বাচনী সমাবেশেরই বা কি প্রয়োজন ছিল ? নবী (সা .) তো হযরত আবু বকরকে খলিফা মনোনীত করে গেছেন -ই ! আর যদি তিনি নবী (সা .) কর্তৃক খলিফা মনোনীত হয়েই থ্কবেন তাহলে সেখানে সেদিন কারো মনে ছিলো না কেন ?

হযরত আব্বাস থেকে বর্ণিত যে , তিনি হযরত আবু বকর ও হযরত ওমরকে জিজ্ঞেস করেন , খেলাফতের ব্যাপারে নবী (সা .) আপনাকে কি কিছু বলে গেছেন ? তারা উভয়েই বললেন না । অতঃপর তিনি হযরত আলীকে বলেন , হে আলী তোমার হাত বাড়িয়ে দাও , আমি তোমার হাতে বাইয়াত গ্রহন করি । 56

বস্তুতঃপক্ষে নবী (সা .) কর্তৃক খেলাফতের মনোনয়ন হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকেই প্রদান করা হয়েছিল যা গাদীরে খুমের ঘটনায় আমরা স্পষ্ট উপলদ্ধি করতে পারি ।

আর নামাজে ইমামতির বিষয়টা কি করে খেলাফতের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে ? সাহাবী ও তাবেয়ীনের যুগে কখনো এ ধরণের ব্যাখ্যার অবতারণা করা হয়নি । তাবেয় ও তাবেয়ীনের যুগে যখন হযরত আবু বকরের খেলাফতের বৈধতার ব্যাপারে বিভিন্ন প্রশ্ন ও সংশয় উত্থাপিত হতে থাকে তখন তার নির্বাচনের বৈধতা প্রমাণের জন্যে নামাজে ইমামতির যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে । আর হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত হযরত আবু বকরের নামাজে ইমামতির হাদীস ছাড়াও হযরত হাফসা থেকে বর্ণিত হাদীসও বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে । তিনি বলেছেন , আবু বকর নামাজে ইমামতি করেন নি , বরং ওমর নামাজে ইমামতি করেছেন । 57

অন্যদিকে এমন সব হাদীস বিদ্যমান যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে , অসুস্থ অবস্থায়ও প্রিয় নবী (সা .) স্বয়ং নামাজে ইমামতি করেছেন ।58

সুতরাং নামাজে ইমামতির বিষয়টা কোনক্রমে খেলাফত লাভের বৈধ কারণ হতে পারে না ।

আর যদি হযরত আবু বকর রাসূলের খলিফা হিসেবে মনোনীত হয়ে থাকবেন তাহলে এত সাহাবীদের বিরোধীতার কারণ কি ?

আল্লাহকর্তৃক হযরত আলীর মনোনয়ন

আহলে বাইতের শিরমনি , মা ফাতিমার প্রিয় স্বামী , বেহেশ্তের সর্দার ইমাম হাসান ও হুসাইনের সম্মানিত পিতা আলী হচ্ছেন মু মিনদের নেতা বা অভিভাবক । এ প্রসঙ্গে আল কোরআন উল্লেখ করেছেঃ

) إ ِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّـهُ وَرَ‌سُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَ‌اكِعُونَ(

অর্থাৎঃ নিশ্চয় তোমাদের অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ ও তার রাসূল এবং যারা ঈমান এনেছে , নামায ক্বায়েম করেছে আর রুকু অবস্থায় যাকাত প্রদান করেছে ।42

অধিকাংশ তাফসীরকারকদের মতে উক্ত আয়াতটি ইমাম আলীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে ।43

আবু ইসহাক বিন মুহাম্মদ আসসা লিব তার স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে হযরত আবুযার গিফারী থেকে নিম্নলিখিত ভাবে ঘটনাটি বর্ণনা করছেন । হযরত আবু যার গিফারী বলেছেন , আমি স্বীয় কর্নে শ্রবন করেছি যে রাসূল (সা .) বলেছেনঃ

علی قائد البرره، و قاتل الکفره، منصور من نصره، مخذول من خذله

অর্থাৎঃ আলী সৎ লোকদের নেতা , কাফেরদের হত্যাকারী , যে তাকে সাহায্য করবে সে ( আল্লাহ কর্তৃক ) সাহায্য প্রাপ্ত হবে , যে তাকে ত্যাগ করবে ( আল্লাহ ) তাকে ত্যাগ করবেন ।44

হযরত আবুযার গিফারী বলেন আমি একদা রাসূল ( সা .) এর সাথে যোহরের নামাজ আদায় করছিলাম । ইতিমধ্যে একজন ভিখারী মসজিদে প্রবেশ করে ভিক্ষা চাইলো । কিন্তু কেউ তাকে কোন সাহায্য করলো না । ভিক্ষুকটি দু হাত তুলে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানালোঃ হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থেকো , আমি মসজিদে প্রবেশ করে সাহায্য চাইলাম কিন্তু কেউ কিছু দিল না । তখন হযরত আলী ( আ .) নামাজে রুকু অবস্থায় ছিলেন । তিনি ইশারা করলে ঐ লোকটি আলীর হাতের আংটি খুলে নিয়ে যায় । আর এ ঘটনাটি নবীর চোখের সামনে ঘটে । নবীজি নামাজ শেষে দু হাত তুলে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করলেনঃ

হে আল্লাহ যখন হযরত মুসা ( আ .) তোমাকে বলেছিল ,

) و َاجْعَل لِّي وَزِيرً ‌ ا مِّنْ أَهْلِي هَارُ ‌ ونَ أَخِي اشْدُدْ بِهِ أَزْرِ ‌ ي وَأَشْرِ ‌ كْهُ فِي أَمْرِ ‌ ي(

অর্থাৎঃ (হে আল্লাহ ) তুমি আমার জন্যে আমার পরিবার থেকে আমার ভাই হারুনকে আমার পরামর্শদাতা নিয়োগ কর , তার মাধ্যমে আমার কোমরকে শক্তিশালী করে দাও এবং তাকে আমার কাজ কর্মে অংশিদার কর ।4 5

তখন অহি নাযিল হয়েছিল । তুমি তার ভাই হারুনকে দিয়ে তার বাহুবল শক্তিশালী করেছিলে ।

اللهم انا محمد بنیک و صفیک اللهم فاشرح لی صدری و یسرلی امری و اجعل لی وزیرا من اهلی علیا اخی و اشدد به ازری

অর্থাৎঃ হে প্রভু , নিশ্চয়ই আমি তোমার নবী এবং নির্বাচিত ব্যক্তি । হে আল্লাহ তুমি আমার অন্তরকে প্রশস্ত করে দাও এবং আমার কাজ সহজ করে দাও । আমার জন্য আমার আহল থেকে আলীকে পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োগ কর । তার মাধ্যমে আমার কোমরকে শক্তিশালী করে দাও ।

তখনও প্রিয় নবী ( সা .) এর মুনাজাত সমাপ্ত হয়নি এমনি সময় অব তীর্ণ হয় এ আয়াতঃ

) إ ِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّـهُ وَرَ‌سُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَ‌اكِعُونَ(

অর্থাৎঃ নিশ্চয় তোমাদের নেতা ও অভিভাবক হচ্ছেন আল্লাহ ও তার রাসূল এবং যারা ঈমান এনেছে , নামায ক্বায়েম করেছে আর রুকু অবস্থায় যাকাত প্রদান করেছে ।46

এখানে লক্ষ্যনীয় যে , আল্লাহ ও তার রাসূলের নেতৃত্বের পাশাপাশি আলীর বেলায়েত বা অভিভাবকত্বের কথা আল কোরআন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করছে । প্রিয় নবী (সা .) তার মুনাজাতে আলীকে তার সাহায্যকারী এবং তার হাত শক্তিশালী করার লক্ষে হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকে পরামর্শদাতা হিসেবে পাবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন । আর তাই তার ইন্তেকালের পর আলীর অভিভাবকত্ব গ্রহন ইসলামকে শক্তিশালী করারই নামান্তর ।

নবীকর্তৃক হযরত আলীর মনোনয়ন

নবী পাক (সা .) এর নবুয়্যত লাভের তিন বৎসর পর নিম্ন আয়াতটি অবতির্ণ হয়ঃ

) و َأَنذِرْ‌ عَشِيرَ‌تَكَ الْأَقْرَ‌بِينَ(

অর্থাৎঃ (হে নবী ) তোমার নিকটতম আত্মীয় -স্বজনকে (দোযখের আযাবের প্রতি ) ভয় প্রদর্শন কর ।47

প্রায় সকল তাফসীরকারক ও ঐতিহাসিকদের মতে মহানবী (সা .) তখন বনি হাশেম গোত্রের 45জন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে দুপুরের আহারের নিমন্ত্রণ দেন । আপ্যায়ন শেষে তিনি মে হমানদের মু খোমুখী দাড়িয়ে মহান আল্লাহর প্রশংসার মধ্য দিয়ে তিনি তার বক্তব্য শুরু করেন । তিনি সুস্পষ্টভাবে তার রেসালাতের সুমহান বার্তা সকলের সামনে ব্যক্ত করেন ।

তিনি বলেনঃ

ان الرائد لا یکذب اهله و الله لا اله الا هو انی رسول الله الیکم خاصة و الی الناس عامة و الله لتموتن کما تنامون و لتبعثن کما تستیقظون و لتحاسبن بما تعملون و انها الجنه ابدا و النار ابدا

অর্থাৎঃ এটা অতি সত্যি কথা যে কোন এক জনগোষ্ঠির পথ প্রদর্শক তার লোকজনদের নিকট মিথ্যা বলতে পারেনা । আল্লাহর শপথ তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই , আমি বিশেষভাবে তোমাদের জন্যে আর সাধারণভাবে সবার জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি । আল্লাহর শপথ তোমরা নিদ্রার ন্যায় মৃত্যুমুখে ঢলে পড়বে এবং জাগ্রত ব্যক্তিদের ন্যায় পুনরুত্থিত হবে একদিন । তোমরা তোমাদের কর্মের ফলাফল ভোগ করবে সেদিন । নিশ্চয় জান্নাত চিরস্থায়ী আবাসস্থল (সৎ লোকদের জন্যে ) আর জাহান্নামের অগ্নি হবে চিরস্থায়ী আবাস (অসৎ লোকদের জন্যে )।48

অতঃপর তিনি বলেনঃ হে লোকসকল আমার মত উত্তম জিনিষ তোমাদের জন্যে অন্য কেউ আনেনি । আমি তোমাদের জন্যে ইহকাল ও পরকালের মঙ্গল নিয়ে আগমন করেছি । আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমাদেরকে সেই মঙ্গল কাজের দিকে আহবান জানাতে ।

অবশেষে তিনি বলেনঃ

فایکم یوازرنی علی هذا الامر علی ان یکون اخی و وصی وخلیفتی فیکم ؟

অর্থাৎঃ তোমাদের মধ্য থেকে আমার সাহায্যকারী হবার মত এমন কে আছো ? যার ফলে সে আমার ভ্রাতা , উত্তরাধীকারী ও খলিফা হিসাবে পরিগনিত হবে ?

যখন মহানবীর বক্তব্য এখানে এসে সমাপ্তি ঘটে তখন সমাবেশে নিঃশব্দ বিরাজ করছিলো । কেউ টু শব্দটুকু করেনি । ইত্যবসরে একজন যুবক হাত উচু করে নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দ্ব্যার্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করলো তিনি আর কেউ নন , তিনি হলেন শেরে খোদা হযরত আলী ( আ .) । রাসূল ( সা .) তাকে বসতে বললেন । আবারো তিনি পূর্ব প্রশ্নটির পুনরাবৃত্তি করেন । কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া গেলনা । আলী ছাড়া কারো কাছ থেকে । পুনরায় তিনি আলীকে বসতে বললেন । এভাবে তিন বার তিনি পুনরাবৃত্তি করেন এবং প্রতিবার আলীই হাত উচু করে তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন ।

এ পর্যায়ে রাসূল ( সা .) তার ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন । তিনি বলেনঃ

ان هذا اخی وصی و خلیفتی علیکم فاسمعوا له اطیعوا

অর্থাৎঃ নিশ্চয় এই যুবক (আলী ) আমার ভাই , আমার উত্তরাধীকারী এবং তোমাদের মাঝে আমার খলিফা । তোমরা সকলে তার কথা শ্রবণ করো এবং তাকে অনুসরণ করো ।49

পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে যে নবী (সা .) এর দাওয়াত তার নবুয়্যত লাভের তিন বৎসর পর সংঘটিত হয়েছির । তার দাওয়াতী মিশনের প্রথম ভাগেই এ ঘটনাটি সংঘটিত হয় । তখনও তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তৌহীদ ও নবুয়্যতের দাওয়াতই দিয়ে যাচ্ছিলেন ।

আল -কোরআনের ভাষায়ঃ

) قالوا لا اله الا الله تفلحون(

অর্থাৎঃ তোমরা বল আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই তাতেই তোমরা সফলকাম হবে । এবং

ان محمدا رسول الله

মোহাম্মদ আল্লাহর রাসূল ।

তবে এ ঐতিহাসিক দাওয়াতের ব্যবস্থাপনা , প্রিয় নবীর বক্তৃতা ও তৌহীদ -নবুয়্যতের ঘোষণার পাশাপাশি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের খেলাফতের ঘোষণা খেকে এটাই উপলদ্ধি করতে পারি যে , মহানবীর দাওয়াতের সূচনা পূর্বেই তিনি তার পরবর্তী খলিফা ও উত্তরাধীকারী নিযুক্তিতে ত্রুটি করেন নি । এটা এমন একটি বিষয় যা তৌহীদ ও নবুয়্যত থেকে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় । তৌহীদ ও নবুয়্যতের স্থায়িত্বের জন্যে ইমামতের ঘোষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায় সেদিন মহানবী (সা .) সবার সম্মুখে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছিলেন পরবর্তী নেতার মনোনয়নের বিষয়টি । এ দু টি পদ তথা নবুয়্যত ও খেলাফত , মর্যাদার ক্ষেত্রে একটি বৃক্ষের দু টি শাখার ন্যায় । রেসালাত দ্বীন ইসলামের প্রবর্তক এবং ইমামত বা খেলাফত সেই প্রবর্তীত দ্বীনের সংরক্ষক । সকল হাদীসবেত্তা ও ঐতিহাসিক তাদের স্ব -স্ব গ্রন্থে নিম্নোক্ত ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেছেন ।

মুহাম্মদ (সা .) তাবুকের যুদ্ধে যাবার প্রাক্কালে লোকজন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্যে তাকে সংঙ্গ দিয়েছিল । এ যুদ্ধে তিনি হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকে মদীনার গভর্নর করে তার উপর দায়িত্বভার অর্পন করে যান । মদিনার আভ্যন্তরীন অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে তিনি এ ব্যবস্থা নিয়ে ছিলেন । কিন্তু আলী জেহাদের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আবেদন করলেন , হে আল্লাহর রাসূল (সা .) আমি কি যুদ্ধে যেতে পারবো না ? নবী (সা .) উত্তরে বললেন , না । তৎক্ষণাৎ আলী ক্রন্দন শুরু করে দিলেন । তখন নবী (সা .) হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ

انت منی بمنزلة هارون من موسی الا لا نبی بعدی

অর্থাৎঃ (হে আলী ) তুমি আমার কাছে সে স্থানে অবস্থান করছো যে স্থানে হারুন মুসার কাছে ছিলো । তবে পার্থক্য হলো আমার পরে আর কোন নবী আগমন করবে না ।50

মহানবী (সা .) এর উপরোক্ত উক্তি থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে , নবুয়্যত ব্যতীত হযরত হারুনের সকল পদমর্যাদাই হযরত আলীর জন্যে সংরক্ষিত । আল -কোরআন উল্লেখ করছে , মুসা (আ .) আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে বলেছিলেনঃ

اجعل لی وزیا من اهلی هارون اخی اشدد به ازری و اشرکه فی امری

অর্থাৎঃ ( হে আল্লাহ ) তুমি আমার জন্যে আমার বংশ থেকে আমার ভাই হারুনকে আমার পরামর্শদাতা ও সাহায্যকারী হিসাবে নিয়োগ করো । তার মাধ্যমে আমার কোমর শক্তিশালী করে দাও এবং তাকে আমার কাজ কর্মে অংশীদার কর ।51

গাদীরেখুমের ঘটনা

হিজরী দশম বছর । রাসূল ( সা .) বিদায় হজ্ব সম্পন্ন করেছেন । এ নশ্বর পৃথিবী থেকে শেষ বিদায়ের জণ্যে প্রহর গুনছেন । প্রথম থেকে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন এ বৎসর তিনি শেষ হজ্ব সমাপন করবেন । চতুর্দিক থেকে নবীর সাথে হজ্বে অংশগ্রহনের জন্যে অশংখ্য লোকের সমাগম হয়েছিলো । ঐতিহাসকিদের মধ্যে হাজীদের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে । সর্বাপরী 90 হাজার থেকৈ 124 হাজার মানুষের সমাগম ইতিহাসে উল্লেখ আছে । এ বৎসর তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দান করেন যা বিদায় হজ্বের ভাষণ নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে ।

হজ্ব সমাপ্ত করে তিনি আসহাবকে সাথে নিয়ে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করেছেন । প্রচন্ড গরম , মাটি ফেটে চৌচির । পথিমধ্যে গাদীরে খুম নামক চৌরাস্তায় এসে তিনি থেমে গেলেন । এখানেই ঘটেছে সেই ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ গাদীরে খুমের ঘটনা । শীয়া - সুন্নী নির্বিশেষে সকল এতিহাসিক ও হাদীস বিশারদ এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে তাদের স্ব - স্ব গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন ।

নবী করিম ( সা .) তার কয়েকজন ঘনিষ্ট সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন এ স্থানে সকলকে সমবেত করতে । যারা এখনো পিছে পড়ে আছে তাদের জন্যে অপেক্ষা করতে বললেন । যারা সিরিয়া ও ইরাক অভিমুখে এ চৌরাস্তা থেকে রওয়ানা হয়ে গেছেন তাদেরকে এ স্থানে ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন । উত্তপ্ত বালুকাময় পথঘাট লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল কিছুক্ষনের মধ্যেই ।

নবী ( সা .)- এর জন্যে আসন প্রস্তুত করা হল । আসনের উপর সামিয়ানা টাংগানো হল । আসনটি এমন ভাবে উচু করে নির্মান করা হলো যেন বহুদূর থেকেও সকলে সুন্দরভাবে নবী করিম ( সা .) কে দেখতে পায় ।

এমনকি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার জন্যে নবী ( সা .) আসহাব ও হাজীদের কষ্ট দিবেন ? গাদীরে খুমে অবস্থান এবং ভাষণ দেয়ার জন্যে আসন তৈরী করার যে কারণ নিহিত আছে তাহলো অব্যবহিত পূর্বে অবতীর্ণ হওয়া নিম্ন আয়াত

) ي َا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ(

অর্থাৎঃ হে রাসূল আপনার রবের নিকট থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা পৌছিয়ে দিন । আর যদি এ কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম না হন তা হলে রেসালাতের দাওয়াত - ই পৌছাতে পারলেন না । আল্লাহ মানুষের অনিষ্ট থেকে আপনাকে রক্ষা করবেন । নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফের জনগোষ্ঠিকে হেদায়েত করবেন না ।52

উপরোল্লিখিত আয়াতটিতে রাসূল ( সা .) কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন । নিশ্চয়ই এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা শুধুমাত্র তিনি নবীকেই অবগত করিয়েছেন । আর তা এক্ষনে মানুষের সমক্ষে পেশ করতে হবে ? এমন কি আবতির্ণ করা হয়েছে যা এভাবে ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যক্ত করতে হবে ? সূরা মায়েদা হচ্ছে নবী ( সা .) এর উপর অবতীর্ণ সর্বশেষ সূরা । এ সূরাটি নবীর শেষ জীবনে নাযিল হয়েছে । ইতিপূর্বে তৌহীদ , শেরক , রেসালাত , ক্বিয়ামত , নামাজ , রোজা , হজ্ব , যাকাত ইত্যাদি সব ধরণের বিষয়ে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল । এমন কি বিষয় অবশিষ্ট রয়ে গেছে যা কোন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিতে হবে ? রাসূল ( সা .) তো কোন ভীতু ব্যক্তি নন । তিনি কঠোর বিপদেও মু মিনদের সান্তনাকারী ছিলেন । তিনি সকল ধরণের বিপদ সংকুল পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন অবশেষে তিনি মক্কা বিজয় করেছেন , বীর দর্পে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেছেন বিজয়ীর বেশে । কাবার মুর্তিগুলোকে তিনি ভেঙ্গে সেখানে নামাজ ক্বায়েম করেছেন ।

আল্লাহ তাকে এ আয়াতে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে দিচ্ছেন , যদি এ কাজটি আঞ্জাম দেয়া না হয় তাহলে রেসালাতের কোন কিছুই পৌছানো হলো না । এটা এমন একটা কাজ যার ফলে রেসালাত পরিপূর্ণ হবে । আর আল্লাহ রাসূলকে অভয় দিয়ে বলছেন আল্লাহ তোমাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন ।

মুলতঃ একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার জন্যেই প্রিয় নবী ( সা .) সবাইকে গাদীরে খুমে সমবেত হতে বলেছেন । মহানবী ( সা .) তার আসন অলংকৃত করেছেন । তিনি ভাষণ দিচ্ছেনঃ

“……………… হে মানব মন্ডলী । আমি কি সকল মু মিনদের চেয়ে সর্বোত্তম নেতানই ? .. তোমরা কি জানোনা আমি প্রতিটি মু মিনের প্রানের চেয়েও প্রিয় নেতা…… ..? তখন সকলে সমস্বরে বলে উঠলো , জ্বি ইয়া রাসূল আল্লাহ ! . অতঃপর তার পার্শ্বে উপবিষ্ট হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের হাত সকলের সম্মুখে উচু করে তুলে ধরলেন । ঐতিহাসিকগণ বলেন , নবী ( সা .) হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের হাত এমনভাবে উচুতে তুলে ধরেছিলেন যে তাদের উভয়ের বাহুমুলদ্বয় সবাই দেখতে পেয়েছেন ।

অতঃপর মহানবী ( সা .) বললেনঃ

ایها الناس! الله مولای و انا مولاکم، فمن کنت مولاه فهذا علی مولاه، اللهم وال من والاه و عاد من عاداه و انصر من نصره و اخذل من خذله............."

অর্থাৎঃ হে লোকসকল ! আল্লাহ আমার প্রভূ ও নেতা , আর আমি তোমাদের নেতা বা মওলা । সুতরাং আমি যার মওলা বা অভিভাবক আলীও তার মওলা বা অভিভাবক । হে আল্লাহ যে আলীকে ভালবাসে তুমিও তাকে ভালবাস , যে আলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে তুমিও তাকে শত্রু গণ্য কর । আর যে তাকে সাহায্য করে তুমিও তাকে সহায়তা দান কর এবং যে তাকে ত্যাগ করে তুমিও তাকে পরিত্যাগ কর………… .।

পরক্ষণই অবতীর্ণ হলো নিন্মোক্ত আয়াতটিঃ

) ال ْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا(

অর্থাৎঃ আজকে তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং দ্বীন ইসলামের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলাম ।53

সাথে সাথে রাসূল (সা .) বলেনঃ

الله اکبر علی اکمال الدین و اتمام النعمة و رضا الرب بر سالتی و الولایه لعلی

অর্থাৎঃ আল্লাহু আকবার , দ্বীন পরিপূর্ণতা লাভ করেছে এবং নেয়ামত সম্পূর্ণরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে । আমার রব আমার রেসালাত ও আলীর বেলায়াতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়েছেন ।

অতঃপর সকলে পর্যায়ক্রমে আলীকে অভিন্দন জ্ঞাপন করতে লাগলেন । ইত্যবসরে হযরত ওমর বলে উঠেলেন ,

هنیئا لک یا ابن ابی طالب اصبحت و امسیت مولی کل مؤمن و مؤمنه.

অর্থাৎঃ শুভ হোক আপনার জন্যে হে আলী বিন আবি তালিব । আজ থেকে আপনি সকল মুমিন নর নারীদের মওলা হিসেবে পরিগণিত হলেন ।

অন্য রেওয়ায়েত এরূপ আছে যে , হযরত ওমর বলেছেন ,

بخ بخ لک یا ابن ابی طالب

অর্থাৎঃ মারহাবা , ,মারহাবা হে আবু তালিবের পুত্র ।

গাদীরে খুমের এ ঐতিহাসিক ঘটনাটি 110 জন সাহাবী , 10জন সর্বজন শ্রদ্ধেয় তাবেয়ী এবং 360 জন বিশিষ্ট ওলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদ সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন । এ ঘটনাটির বর্ণনা সর্বস্তরের ইতিহাসবেত্তাগণ তাদের স্ব -স্ব পুস্তকে সহি হাদীস বলে আখ্যায়িত করেছেন । ইয়াক্বুবী এটাকে সুস্পষ্ট সহি হাদীস হিসাবে উল্লেখ করেন । পাঠকের গবেষণার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিম্নে কয়েকটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করছি মাত্র ।54

হযরতআবু বকরের খেলাফত লাভ

কথিত যে , নবী করিম ( সা .) হযরত আবুকবরকে খেলাফত দিয়ে গেছেন । তিনি হযরত আবুবকরকে নামাজের ইমামতি করার দায়িত্ব দিয়ে বিশ্ব মুসলিমকে এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে হযরত আবু বকরই খেলাফতের আসন অলংকৃত করার জন্যে অন্য সবার চাইতে বেশী যোগ্য । আর তাই বনি সাক্বিফার সমাবেশে সাহাবীরা তাকে খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন ।

কিন্তু ইতিহাস স্বীকৃত সত্য যে , বনি সাক্বিফাতে খলিফা নির্বাচনের প্রসংঙ্গ নিয়ে মোহাজের ও আনসারদের মধ্যে যে বাক -বিতন্ডা ও তর্ক বিতর্ক হয়েছিলো সেখানে কখনো নামাজের প্রসংঙ্গ উত্থাপিত হয়নি । উপস্থিত কেউ হযরত আবু বকরের খেলাফত লাভের জন্যে নামাজের ইমামতির যুক্তি উপস্থাপন করেন নি । সেখানে আমরা দেখতে পাই আনসাররা খেলাফতের জন্যে নিজেদেরকে সর্বাধিক যোগ্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন । আর মোহাজেররা খেলাফতের জন্যে নিজেদেরকে উপস্থাপন করেছিলন । তারা সেখানে কোন ক্রমেই আবুবকরের নামাজের ইমামতের ঘটনা তুলে ধরেননি । বরং হযরত ওমর সেখানে এগিয়ে এসে ঝগড়া ও মতভেদ এড়িয়ে ঘোষণা করলেন , আমি আবু বকরের হাতে বাইয়াত গ্রহন করলাম । এভাবে সেদিন বনি সক্বিফাতে উপস্থিত সাহাবীরা হযরত আবুবকরের হাতে বাইয়াত গ্রহন করেছিলেন ।

তখনও রাসূলের পবিত্র লাশ দাফন করা হয়নি খেলাফতের ব্যাপারে সাহাবীদের মধ্যে অনৈক্য শুরু হয়ে গিয়েছিল । বনি সক্বিফার সমাবেশে সাহাবীদের মাঝে উত্তপ্ত মতদগ্ধ কি প্রমাণ করে না যে তাদের মধ্যে খেলাফতের ব্যাপারে কোন প্রকার ঐক্যমত ছিল না ?55

মুলতঃ বনি সক্বিফার নির্বাচনী সমাবেশেরই বা কি প্রয়োজন ছিল ? নবী (সা .) তো হযরত আবু বকরকে খলিফা মনোনীত করে গেছেন -ই ! আর যদি তিনি নবী (সা .) কর্তৃক খলিফা মনোনীত হয়েই থ্কবেন তাহলে সেখানে সেদিন কারো মনে ছিলো না কেন ?

হযরত আব্বাস থেকে বর্ণিত যে , তিনি হযরত আবু বকর ও হযরত ওমরকে জিজ্ঞেস করেন , খেলাফতের ব্যাপারে নবী (সা .) আপনাকে কি কিছু বলে গেছেন ? তারা উভয়েই বললেন না । অতঃপর তিনি হযরত আলীকে বলেন , হে আলী তোমার হাত বাড়িয়ে দাও , আমি তোমার হাতে বাইয়াত গ্রহন করি । 56

বস্তুতঃপক্ষে নবী (সা .) কর্তৃক খেলাফতের মনোনয়ন হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকেই প্রদান করা হয়েছিল যা গাদীরে খুমের ঘটনায় আমরা স্পষ্ট উপলদ্ধি করতে পারি ।

আর নামাজে ইমামতির বিষয়টা কি করে খেলাফতের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে ? সাহাবী ও তাবেয়ীনের যুগে কখনো এ ধরণের ব্যাখ্যার অবতারণা করা হয়নি । তাবেয় ও তাবেয়ীনের যুগে যখন হযরত আবু বকরের খেলাফতের বৈধতার ব্যাপারে বিভিন্ন প্রশ্ন ও সংশয় উত্থাপিত হতে থাকে তখন তার নির্বাচনের বৈধতা প্রমাণের জন্যে নামাজে ইমামতির যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে । আর হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত হযরত আবু বকরের নামাজে ইমামতির হাদীস ছাড়াও হযরত হাফসা থেকে বর্ণিত হাদীসও বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে । তিনি বলেছেন , আবু বকর নামাজে ইমামতি করেন নি , বরং ওমর নামাজে ইমামতি করেছেন । 57

অন্যদিকে এমন সব হাদীস বিদ্যমান যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে , অসুস্থ অবস্থায়ও প্রিয় নবী (সা .) স্বয়ং নামাজে ইমামতি করেছেন ।58

সুতরাং নামাজে ইমামতির বিষয়টা কোনক্রমে খেলাফত লাভের বৈধ কারণ হতে পারে না ।

আর যদি হযরত আবু বকর রাসূলের খলিফা হিসেবে মনোনীত হয়ে থাকবেন তাহলে এত সাহাবীদের বিরোধীতার কারণ কি ?


4

5

6

7