সত্যের আলো

সত্যের আলো40%

সত্যের আলো লেখক:
প্রকাশক: যাহরা একাডেমী ক্বোম, ইরান
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

  • শুরু
  • পূর্বের
  • 19 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 8217 / ডাউনলোড: 3015
সাইজ সাইজ সাইজ
সত্যের আলো

সত্যের আলো

লেখক:
প্রকাশক: যাহরা একাডেমী ক্বোম, ইরান
বাংলা

সত্যের আলো

মোঃ নূরে আলম

যাহরা একাডেমী

ক্বোম , ইরান

সত্যের আলো

মোঃ নূরে আলম

প্রকাশক : যাহরা একাডেমী , ক্বোম , ইরান

প্রকাশকাল :

ভাদ্র ,১৪০৭ বাংলা

সেপ্টেম্বর , ২০০০খ্রী .

জামাদিউস সানি , ১৪২১ হিঃ

কম্পোজ : আশরাফ -উল -আলম

অবতরনিকা

সর্বশক্তিমান মহান স্রষ্টা আল্লাহর কৃপা ও দয়ার অন্ত নেই । তিনি আর-হামুররাহিমিন । তার অপার মহিমায় সৃষ্টিকুলের সকল কিছু গতিশীল । তিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী । তার ক্ষমতার পরিধি নিরূপন করা সম্ভব নয় কারো পক্ষে , কোন কালে । যখন কেউ ছিলো না তখনও তিনি ছিলেন আবার যখন সকল অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে তখনও তিনি থাকবেন অস্তিত্বমান ।

সমস্ত প্রশংসা ও নমনীয়তা সেই মহান শক্তিধর প্রভূর জন্যে , যার গুনাবলী ও জাতসত্বার মাঝে কোন পার্থক্য করা যায় না ।

অসংখ্য দরূদ ও সালাম তার প্রেরীত মহাপুরুষদের উপর , আদি পিতা আদম থেকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত এবং তার আহলে বাইতের উপর , ক্বিয়ামতপূর্বে আগমনকারী , ভূপৃষ্ঠ থেকে যুলুম-অত্যাচার বিলুপ্তকারী ইমাম মাহদী (আ.) পর্যন্ত ।

বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ । এ দেশের জনসংখ্যার অধিকাংশ সুন্নী মুসলমান । হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মত হিসেবে দাবী করে থাকলেও তার আহলে বাইত সম্পর্কে আমরা অনেকেই অজ্ঞাত । আবার অনেক জ্ঞানী ব্যাক্তিবর্গ আহলে বাইতের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনায় অনিচ্ছুক । কেননা প্রতিষ্ঠিত স্বার্থান্বেষী ও তাবেদার সরকারী ফতোয়াবাজ আলেমদের ফতোয়ার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় । ফলে সমাজে আহলে বাইতের সঠিক পরিচয় আজো ইসলামী সাহিত্যিক ও লেখক মহলের গন্ডি বহির্ভূত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত । যদিও অনেকে এ বিষয়ে লেখার চেষ্টা করেছেন , তাদের অনেকেই ধর্মীয় গোড়ামী ও সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে উঠে আহলে বাইতের সঠিক পরিচয় তুলে ধরতে অপারগ হয়েছেন । আবার অনেকে কিছু লেখালেখি করলেও ভোগবাদী তথাকথিত আলেমদের অপপ্রচারের রোষানলে পতিত হবার কারণে তা নিতান্তই অসহায় ।

এ পুস্তকটির উদ্ধৃতিসমূহ মূলতঃ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের প্রসিদ্ধ ও সর্বজন স্বীকৃত গ্রন্থাবলী থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে । পুস্তকটিতে উল্লেখিত সিহাহ সিত্তাহ , মাসানিদ ও ইতিহাস গ্রন্থাবলীর সব ক ’ টি আহলে সুন্নাত কর্তৃক গৃহীত ও সম্মানিত । আমাদের সমাজে এ ধরনের উদ্ধৃতিবহুল গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এ বইটি লেখা হয়েছে ।

এ বইটিতে আবেগ ও গতানুগতিক ধর্মীয় গোড়ামীর কোন স্থান দেয়া হয়নি । অনুরূপভাবে সব ধরনের ধর্মীয় স্পর্শকাতর শব্দ চয়ন , শিরোনাম ও বিবরণ থেকে যথাসাধ্য দূরে থাকার চেষ্টা করা হয়েছে ।

এ পুস্তকের উদ্ধৃতি সংগ্রহে যিনি সার্বক্ষণিকভাবে সাহায্য করেছেন তিনি হচ্ছেন বাগদাদ নগরীর অধিবাসী , বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক ও হাওযা-এ-ইলমিয়া ক্বোমের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব হযরত মাওলানা শেখ আস সামী আল-গুরাইরী । এ জন্য আমি তার কাছে কৃতজ্ঞতা পোষণ করছি । সাথে সাথে আমার এ কাজে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আন্তরিক সহযোগীতার জন্য সম্মানিত যাহরা একাডেমীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করাও যুক্তিযুক্ত মনে করছি । নবী করিম (সা.) এর আহলে বাইতের সত্য ও সঠিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে এটি একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র । সত্যের আলো ’ প্রতিটি পাঠক মহলের জ্ঞান বৃদ্ধি ও সঠিক পথ অবলম্বনে সামান্য উপকারে আসলেও নিজেকে ধন্য মনে করবো ।

মোঃ নূরে আলম

মানব জীবনে নেতার গুরুত্ব

পবিত্র আল কোরআনে আল্লাহ বলেন ,

) ي َوْمَ نَدْعُو كُلَّ أُنَاسٍ بِإِمَامِهِمْ(

অর্থাৎঃ- ক্বিয়ামতের দিবসে প্রত্যেক জনগোষ্ঠিকে তাদের ইমামদের সাথে ডাকা হবে ।

মানব জীবনে নেতা বা পরিচালকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্ববহ । মানুষ প্রতিনিয়ত তার বৈষয়ীক উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য কোন না কোন অবলম্বন ধারণ করে থাকে । মানব জীবনে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান কোন ক্রমেই অস্বীকার করা যায় না । আর এ গুরুত্ব অনুধাবন করেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন ,

তোমাদের মধ্যে তিনজন ব্যক্তি একত্রে অবস্থান করলে একজনকে আমীর বা নেতা বানিয়ে নাও ।

যেহতেু ইসলাম এসেছে মানবতার মুক্তির বার্তা নিয়ে তাই ইহজগতে মানবতার শান্তি ও কল্যাণ এবং পরকালে সৌভাগ্য ও মুক্তির কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষনা দেয়া হয়েছে আল কোরআনের বিভিন্ন স্থানে । আল কোরআনে সর্বশক্তিমান আল্লাহ ঐ সব লোকদের প্রশংসা করেছেন , যারা বলেন ,

) ر َ‌بَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَ‌ةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ‌(

অর্থাৎঃ হে আমাদের প্রতিপালক , তুমি আমাদেরকে এ জগতে মঙ্গল দান কর আর দান কর পরজগতে ।

মুসাফিরদের জন্যে তাদের ভ্রমন কাজ সুষ্ঠ পরিচালনার জন্যে মহানবীর এ শাশ্বত নির্দেশ এটাই প্রমান করে যে , মুসলমানদের সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় কর্মকান্ড সঠিক খাতে প্রবাহিত এবং সুষ্ঠ পরিচালনার লক্ষ্যে একজন আমীর বা নেতার প্রয়োজনীয়তা ভ্রমনকালের নেতৃত্বের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ । মহাপ্রভূ আমাদের ইহলৌকিক শান্তি ও কল্যাণ এবং পারলৌকিক চিরস্থায়ী মুক্তির জন্যে এমন অবলম্বন ও নেতৃত্বের সন্ধান দিবেন যারা সমস্ত পাপ-পংকিলতা থেকে থাকবেন মুক্ত , ঐশ্বরীক গুনাবলীতে হবেন পরিপূর্ণ এটাইতো প্রভূত্বের দাবী । আর তাই তিনি বান্দাদের সঠিক পথে পরিচালনার জন্যে আদি পিতা হযরত আদম (আ.) থেকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত মহাপুরুষদের প্রেরণ করেছেন বিভিন্ন সময়ে ।

তিনি আল কোরআনে বলেন ,

) إ ِنَّ اللَّـهَ اصْطَفَىٰ آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَ‌اهِيمَ وَآلَ عِمْرَ‌انَ عَلَى الْعَالَمِينَ(

অর্থাৎঃ নিশ্চয় আল্লাহ সমগ্র বিশ্বের বুকে আদম ও নূহ এবং ইব্রাহিমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরকে নির্বাচিত করেছেন ।

আল্লাহ আল কোরআনে অন্যত্র আরো বলেন ,

) إ ِنَّمَا أَنتَ مُنذِرٌ‌ وَلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ(

অর্থাৎঃ (হে নবী) নিশ্চয় তুমি (মানুষের জন্যে) ভয় প্রদর্শনকারী , আর প্রতিটি জাতির জন্যে পথ প্রদর্শনকারী বিদ্যমান ।

শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আরব জাহেলিয়াতের যুগে আল্লাহর অহি বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েত করেছেন । তৎকালীন অশান্ত আরবদেশে মানুষ ইসলামের পরশ পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে পেয়েছিল । তারা যখন ধ্বংসের অতল গহ্বরের সন্নিকটে পৌছে গিয়েছিল ,যখন তারা আপন কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দিত তখন ইসলামের শাশ্বত নির্দেশাবলী অনুসরণ করে অল্প দিনের মধ্যে তদানিন্তন বিশ্বের দুই পরাশক্তি তথা পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছিল ।

আল্লাহ তাআলা সে অবস্থার বর্ণনা আল-কোরআনে এভাবে দিচ্ছেন ,

) و َاذْكُرُ‌وا نِعْمَتَ اللَّـهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَ‌ةٍ مِّنَ النَّارِ‌ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا(

অর্থাৎঃ স্মরণ কর তোমাদের উপর আল্লাহর নেয়ামতকে , যখন তোমরা পরস্পরের শত্রু ছিলে , তিনি (আল্লাহ) তোমাদের অন্তরসমূহকে কাছাকাছি এনে দিয়েছেন ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিলে এবং তোমরা অগ্নিকুন্ডের পার্শ্বে অবস্থান করছিলে , তিনি সেখান থেকে তোমাদেরকে উদ্ধার করেছেন ।

ইসলামের ইমারত শেষ নবীর মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে । তিনিই পরিপূর্ণ দ্বীন ইসলামের প্রবর্তক । আল্লাহর কৃপা ও অনুগ্রহের কারণেই মানুষ মহানবীর ন্যায় পরশ পাথরের ছোয়া পেয়ে ধন্য হয়েছিল । তার অন্তর্ধানের পর কোন মতে এ দয়া ও অনুগ্রহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেনা মানবজাতির মধ্যে থেকে , এটাও মহানুভব প্রভুত্বের দাবী ।

নবুয়্যত ও রেসালাতের ধারা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটেছে । আল্লাহর এ মনোনীত দ্বীন ক্বিয়ামত অবধি অব্যাহত থাকবে । এ ব্যাপারে সমস্ত মুসলমান ঐক্যমত পোষণ করে থাকেন । তাই স্বভাবতঃ প্রশ্ন জাগে , নবী যে দ্বীনের প্রবর্তন ও প্রতিষ্ঠা করলেন অক্লান্ত পরিশ্রম , চরম আত্মত্যাগ ও জেহাদ এবং বহু শহীদের প্রাণের বিনিময়ে , তার সংরক্ষনের জন্যে কি কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাবেন না ? যিনি অবিকল তার মতই হবেন সমস্ত নেক গুনাবলীতে , যিনি মুহাম্মদী ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণসহ সংরক্ষন করে রাখবেন দ্বীন ইসলাম ও কোরআনকে ?

নিশ্চয় আল্লাহ রাব্বুল আ লামীন তার পবিত্র দ্বীন ইসলাম সংরক্ষনের জন্যে এমন ব্যক্তিবর্গকে নিয়োজিত রেখেছেন যারা আল-কোরআনের ন্যায় পবিত্র , যাদেরকে আল্লাহ নিজেই সমস্ত পাপ-পংকিলতা থেকে মুক্ত রেখেছেন ।

পবিত্র আর কোরআনে আল্লাহ তায়ারা বলেন ,

) إ ِنَّمَا يُرِ‌يدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّ‌جْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَ‌كُمْ تَطْهِيرً‌ا(

অর্থাৎঃ-আল্লাহ মনস্থ করলেন তোমাদেরকে কাছ থেকে সমস্ত পাপ-পংকিলতা দূরে রাখতে হে আহলে বাইত এবং মনস্থ করলেন তোমাদেরকে পুত-পবিত্র ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করতে ।

আল্লাহ তার পবিত্র দ্বীন ইসলামকে অপবিত্র কোন ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত অথবা সংরক্ষন করতে পারেন না । সুতরাং নিঃসন্দেহে শেষ নবীর পর কোরআনে উল্লেখিত ঐ সব পবিত্র মহা-পুরুষরাই হবেন দ্বীন ইসলামের সংরক্ষক , রাসূলের আদর্শ বাস্তবায়নকারী এবং কোরআনের সঠিক ও সহিহ অর্থ-ব্যাখ্যাদানকারী । আল কোরআনে উল্লেখিত আহলুল বাইত এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ এবং তারা কারা এ সমস্ত বিষয়ে আমাদের নিকট নবী কর্তৃক সহি হাদীস দ্বরা প্রমাণিত যে , তারা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব , হযরত ফাতিমা , হযরত হাসান ইবনে আলী এবং হযরত হুসাইন ইবনে আলী এবং হুসাইনের বংশধর থেকে পরবর্তী নয়জন ইমাম । আমাদের পরবর্তী আলোচনা সেদিকেই দিক নির্দেশনা দিচ্ছে ।

খলিফা নির্বাচনের পদ্ধতি

প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পরলোকগমণের পর সাহাবীগণ কর্তৃক প্রথম খলিফা হিসাবে হযরত আবু বকরের নিয়োগ এবং তার পক্ষে বাইয়াত গ্রহণকে কোনক্রমে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা যাবেনা।

বনি সকিফা নামক স্থান খলিফা নির্বাচনে অংশ গ্রহণকারী সকল সাহাবাদের রায় স্বস্থানে সম্মানের দাবী রাখে।

তবে প্রশ্ন হলো রাসূলের (সা.) খেলাফতের পদটি কি কোন বৈষয়িক ব্যাপার নাকি ঐশ্বরীক বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত ? দ্বীন ইসলাম মানবতার উভয় জগতের শান্তি ও মুক্তির বার্তা নিয়ে আগমন করেছে । তাই এ পদটিও নিশ্চয় একাধারে বৈষয়ীক ও ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত।

যখন সামান্য বৈষয়ীক ব্যাপারে মানুষ ভূল করতে পারে সেক্ষেত্রে এতবড় ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা নির্বাচন কোনক্রমেই ভূলের উর্ধে হতে পারে না ।

তর্কের খাতিরে যদিও বা মেনে নেই যে সাহাবীদের নির্বাচন সঠিক হয়েছে এবং খলিফা নির্বাচনের সঠিক পদ্ধতি হচ্ছে মদীনার কতিপয় সাহাবীদের নির্বাচন অন্যকথায় জনগন কর্তৃক নির্বাচন । কিন্তু এ ব্যাপারে দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি উত্থাপন হতে পারে তা হচ্ছে দ্বিতীয় , তৃতীয় ও চতুর্থ খলিফা তো জনগন কর্তৃক নির্বাচিত হননি , তাহলে তারা খলিফা হবেন কি করে ?

হযরত ওমর মনোনয়ন পেয়েছেন হযরত আবুবকরের কাছ থেকে , হযরত ওসমান খলিফা হয়েছেন হযরত ওমর কর্তৃক নির্ধারিত ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটা বোর্ডের মাধ্যমে , আর হযরত আলী ইবনে আবি তালিব খেলাফত লাভ করেছেন গন-বিপ্লবের মাধ্যমে। চার খলিফা চার পদ্ধতিতে খেলাফত লাভ করেছেন , তাহলে কি খলিফা নির্বাচনে ইসলামে সুনির্দিষ্ট কোন পদ্ধতি নেই ? আর যদি বলা হয় হযরত আবু বকর গনভোটে নির্বাচিত খলিফা হিসাবে তার মনোনয়ন অনুযায়ী হযরত ওমরের খেলাফত বৈধ হয়েছে , তাহলে আবারো প্রশ্ন হতে পারে , এ কাজটি কি রাসূল (সা.) করে যেতে পারতেন না ? যখন নির্বাচনের উপর কেউ আপত্তি তোলে তখন তাকে বলা হয় মহানবী (সা.) খেলাফতের ভার উম্মতের উপর ছেড়ে গিয়েছেন । তাহলে হযরত আবু বকর কি নবীজীর পদাংক অনুসরণ করে খেলাফতের ভার উম্মতের উপর ছেড়ে যেতে পারতেন না ? এর জটিলতার গিট উম্মুক্ত করে দিতে পারে আমাদের পরবর্তী আলোচনা ।

নবী (সা.) এর উত্তরাধীকার

প্রকৃতপক্ষে উম্মতের কান্ডারী দয়াল নবী নিশ্চয়ই হযরত আবু বকর , হযরত ওমর ও হযরত ওসমানের ন্যায় বিশিষ্ট সাহাবীদের চেয়েও বেশী জ্ঞান রাখতেন। তিনি সকল জ্ঞানের আধার। হযরত আবু বকর ও হযরত ওমরের এর মস্তিস্কে এ চিন্তা আসতে পারলো যে , উম্মতের জন্য পরবর্তী খলিফা নিয়োগ করে যেতে হবে। আর বিশ্বনবীর (সা.) মস্তিস্কে এ বিষয়ে চিন্তার উদ্রেক হবে না এটা কোন সুস্থ বিবেকবান ধার্মীক মুসলমান কিছুতেই যুক্তিযুক্ত বলে মেনে নিতে পারেন না । নভী (সা.) হলেন সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ট মহা-মানব । তিনি নিশ্চয়ই অন্যান্য সকলের চেয়ে অধিক জ্ঞানের অধিকারী । তাই তো তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে দ্বাযিত্ব প্রাপ্ত ছিলেন । তিনি নিঃসন্দেহে তার উম্মতের হেদায়েতের জন্যে কাউকে নিয়োগ করে গেছেন ।

আল কোরআন ও হাদীসে নববী থেকে খেলাফতের উত্তরাধীকার সম্পর্কিত প্রমাণ পেশ করার পূর্বে বিবেকবান ব্যক্তিদের কাছে সামান্য বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছি ।

ধরুন আপনাকে বলা হল আপনার এলাকার সমস্যাবলী তুলে ধরে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সমীপে একটি সুন্দর পত্র প্রেরণ করতে হবে যাতে তার কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয় । আপনার সামনে চারটি কাগজ রাখা আছে । প্রথম কাগজটির উপরিভাগ কালিমাখা ও আকাবাকা অনেক দাগে ভরপুর আর নিচের অংশ পরিস্কার । দ্বিতীয় কাগজের নিচের অংশ ময়লা ও কালিমাখা আর উপরের অংশ পরিস্কার । তৃতীয় কাগজটির সম্পূর্ণটাই কালো আর আর বহু আকাবাকা দাগ । আর চতুর্থ কাগজটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন , দাগের লেশ মাত্র নেই , সুন্দর একখানা কাগজ । আপনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি লেখার জন্য কোন ধরণের কাগজটি নির্বাচন করবেন ? নিশ্চয়ই প্রতিটি রুচিশীল ও বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্যে চতুর্থ প্রকার কাগজে চিঠি লেখাটাই হবে সর্বোত্তম কাজ ।

তাহলে বলুন নবী (সা.) এর এ মহাসম্মানিত খেলাফতের পদে নির্বাচনের জন্যে আপনি কি এমন কোন সাহাবীকে নির্বাচন করবেন যার কাজ কর্ম , চিন্তা-ধারায় ইসলাম পূর্ব কালে বহু কালিমা বিদ্যমান ছিল ? নাকি এমন কোন ব্যক্তিকে , যিনি ইসলাম পূরর্বকালে খুব ভাল লোক ছিলেন কিন্তু ইসলামের সুমহান আদর্শে নিজেকে আলোকিত করতে পারেন নি ? আর যার সবটুকুই অন্ধকারে নিমজ্জিত তাকে তো কোন মতে কেউ এ সম্মানিত পদের জন্যে নির্বাচন করবেন না । তাকেই নির্বাচন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে যার জীবনে সামান্য পরিমান কালিমা পড়েনি । যিনি এক মূহুর্তের জন্যেও শেরক করেন নি । যিনি বাল্যকাল থেকে মহানবীর (সা.) পবিত্র কোলে লালিত-পালিত হয়েছেন । যার জ্ঞানের তোরণ অতিক্রম করে মহানবীর জ্ঞানের মহানগরীতে পদার্পন করতে হয় ।

নবীজী (সা.) তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন ,

انا مدینة العلم و علی بابها

অর্থাৎঃ আমি হলাম জ্ঞানের নগরী আর আলী হচ্ছে তার দরজা ।

নবী (সা.) ও তার পরবর্তী উত্তরাধীকার নির্বাচনের প্রতি দিক-নির্দেশনার লক্ষ্যে আল কোরআন স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছে ।

) إ ِنَّمَا يُرِ‌يدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّ‌جْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَ‌كُمْ تَطْهِيرً‌ا(

অর্থাৎঃ-আল্লাহ মনস্থ করলেন তোমাদেরকে সমস্ত অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রাখতে হে আহলে বাইত এবং মনস্থ করলেন তোমাদেরকে পুত-পবিত্র করতে ।

নবীরআহলে বাইতের ভালবাসা

আল্লামা যামাখশারী ও আল্লামা ফাখরে রাযী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের প্রখ্যাত দু জন তাফসীরকারক ও বিজ্ঞ আলেম । তারা তাদের সুবিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থদ্বয় আল -কাশশাফ আল -কাবির - এ এভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন , যখন নাযিল হলো এ আয়াতঃ

) ق ُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرً‌ا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْ‌بَىٰ(

অর্থাৎঃ (হে রাসূল ) বলে দাওঃ আমি আমার রেসালতের বিনিময়ে কোন পার্থিব প্রতিদান ও পারিশ্রমিক চাই না । আমি চাই যে , শুধুমাত্র তোমরা আমার নিকটতম লোকদের (আহলে বাইতকে ) ভালবাসবে ।১০

তখন রাসূল (সা .) বলেনঃ

من مات علی حب آل محمد مات شهیدا

الا من مات علی حب آل محمد مات مغفورا له

الا من مات علی حب آل محمد مات تائبا

الا من مات علی حب آل محمد مات مؤمنا مستکملا للایمان

الا من مات علی حب آل محمد مات بشره ملک الموت بالجنة ثم منکر و نکیر

الا من مات علی حب آل محمد مات یزف الی الجنة کما تزف العروس الی بیت زوجها

الا من مات علی حب آل محمد مات فتح له فی قبربابان الی الجنة

الا من مات علی حب آل محمد مات جعل الله قبره مزار ملائکه الرحمن

الا من مات علی حب آل محمد مات مات علی السنة و الجماعة

الا من مات علی حب آل محمد مات جاء یوم القیامة مکتوبا بین عینه آیس من رحمه الله

الا من مات علی بغض آل محمد مات کافرا

الا من مات علی بغض آل محمد مات لم یشم رائحة الجنّة

অর্থাৎঃ যে ব্যক্তি অন্তরে মুহাম্মদ ( সা .) এর আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসা পোষণ করে মৃত্যুবরন করলো তার মৃত্যু শহীদের মৃত্যুর সমতুল্য ।

জেনে রেখোঃ যে ব্যাক্তি হৃদয়ের মাঝে আলে মুহাম্মদের ( সা .) প্রতি ভালবাসা লালন করে মৃত্যুবরন করলো তার মৃত্যু ক্ষমা প্রাপ্তির মৃত্যু হিসেবে পরিগনিত ।

মনে রেখোঃ যে ব্যক্তি আহলে বাইতের ভালবাসা অন্তরে নিয়ে মৃত্যু বরন করলো তার মৃত্যু তওবাকারীর মৃত্যু হিসাবে গন্য ।

স্মরণ রেখোঃ যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মদকে ( সা .) ভালবেসে মৃত্যুবরন করলো সে পরিপূর্ণ ঈমানের সাথে মৃত্যুবরন করলো ।

জেনে রেখোঃ যে ব্যক্তি হৃদয়ে আলে মুহাম্মদের ( সা .) ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরন করলো তাকে মৃত্যুদূত তথা আযরাইল ( আ .) অতঃপর মুনকির নাকিরও জান্নাতের সুসংবাদ পরিবেশন করবেন ।

স্মরণ রেখোঃ যে ব্যক্তি হৃদয়ে মুহাম্মদ ( সা .) এর আহলে বাইতের ভালবাসা লালন করে মৃত্যুবরন করলো তাকে বেহেশ্তে এমনভাবে সজ্জিত করে নিয়ে যাওয়া হবে যেমনিভাবে নববধুকে সাজিয়ে স্বামীগৃহে নিয়ে যাওয়া হয় ।

মনে রেখোঃ যে ব্যক্তি মনের মাঝে আলে মুহাম্মদ ( সা .) এর ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরন করলো তার কবরে জান্নাত মুখী দু টি দরজা খুলে দেয়া হবে ।

জেনে রেখোঃ যে ব্যক্তি রাসূলের ( সা .) আহলে বাইতকে ভালবেসে মৃত্যুবরন করলো মহান আল্লাহ তার কবরকে রহমতের ফেরেস্তাদের জিয়ারতগাহে পরিণত করবেন ।

স্মরণ রেখোঃ যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মদ ( সা .) কে ভালবেসে মৃত্যুবরন করলো সে রাসূলের সুন্নাতের পথে এবং মুসলমানদের দলভূক্ত হয়ে মৃত্যুবরন করলো ।

মনে রেখোঃ যে ব্যক্তি মুহাম্মদ ( সা .) এর আহলে বাইতের প্রতি শত্রুতা পেষণ করে মারা যায় সে ক্বিয়ামতের দিনে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে তার কপালে লিখা থাকবে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত

স্মরন রেখোঃ যে ব্যক্তি মুহাম্মদ ( সা .) এর আহলে বাইতের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে মৃত্যুবরন করলো তার মৃত্যু কাফেরের মৃত্যুর সমতুল্য ।

জেনে রেখোঃ যে ব্যক্তি রাসূলের ( সা .) আহলে বাইতের সাথে শত্রুতা পোষণ করে মারা যায় সে কখনো বেহেশ্তের সুঘ্রাণ পাবে না ।১১

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের চার ইমামের অন্যতম , ইমাম শাফেয়ী আহলে বাইতের শানে নিম্নলিখিতরূপে ভক্তি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন । তিনি কবিতা আবৃতি করেছেন এভাবেঃ

یَا آلَ بَیتِ رَسولِ الله حُبُّکُمُ

فَرضٌ مِنَ الله فی القُرآنِ أنزَلَهُ

یکَفیکُم مِن عظیمِ القَدرِ أنّکُم

مَن لَم یُصلِّ عَلَیکُم لَا صَلَاةَ لَهُ

وَ لَمَّا رَأیتُ النَّاسَ قَد ذَهَبَت بِهِم

وَ هُم آل بَیتِ المُصطفَی خَاتَمِ الرُّسُلِ

رَکِبتُ عَلَی اسمِ الله فِی سُفُنِ النَّجَا

فَرضٌ مِنَ الله فی القُرآنِ أنزَلَهُ

وَ أمسَکتُ حَبلَ اللهِ وَ هُوَ وَلاءوهُم

کَما قَد أُمِرنَا بالتَمسُّکِ بالحَبلِ

অর্থাৎঃ হে আল্লাহর রাসূলের আহলে বাইত , আপনাদের ভালবাসা আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ করা হয়েছে , যা কোরআনের উল্লেখ আছে ।

আপনাদের শ্রেষ্ঠ গৌরবের জন্যে এটাই যথেষ্ট যে , যে ব্যক্তি নামাজে আপনাদের উপর দরুদ পাঠ করে না তাদের নামাজই হয় না ।

যখন লোকজনদের দেখেছি তারা তাদের পথকে গোমরাহীর সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে , তখন আমি আল্লাহর নামে উঠে পড়লাম আহলে বাইতে মোস্তফার নাজাতের তরীতে ।

আল্লাহর রশ্মি আকড়ে ধরেছি যা হচ্ছে তাদের প্রতি ভালবাসা কেননা এ রশ্মিকে আকড়ে ধরে থাকার দেয়া হয়েছে নির্দেশ ।১২

ইমাম শাফেয়ী রাসূলের সেই হাদীসেরই সমর্থন করেছেন যেখানে মহানবী ( সা .) বলেছেন ,

اهل بیتی کسفینة نوح فمن رکبها نجی و من تخلف عنها غرق

অর্থাৎঃ আমার আহলে বাইত নূহের তরী সদৃশ্য । যে ব্যক্তি তাতে আরোহন করবে সে নাজাত পাবে আর যে ঐ তরী থেকে দূরে সরে থাকবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে ।১৩

উক্ত হাদীসটি এগারটি সূত্রে বিভিন্ন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে আর সাতটি সূত্রে শীয়া গ্রন্থাবলীতে বর্ণনা করা হয়েছে ।

আহলে বাইত

নবী করিম (সা.)-এর আহলে বাইতকে ভালবাসার ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই । তবে আহলে বাইত কারা এ ব্যাপারে যথেষ্ট মতানৈক্য বিদ্যমান । মুসলমানদের কোন এক সম্প্রদায় আহলে বাইত বলতে শুধুমাত্র তার সম্মানীতা স্ত্রীগণকে বুঝিয়ে থাকেন । আবার অন্য এক সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র হযরত ফাতিমা , তার স্বামী ও সন্তানদ্বয়কে রাসুলের সাথে সংযোগ করে থাকেন । আবার নবী (সা.) এর আহলে বাইতের মধ্যে হযরত আব্বাস , আক্বীল ও জাফর তাইয়্যারকেও শামিল করে থাকেন ।

প্রকৃতপক্ষে আহলে বাইতের সদস্যগণ কারা ? এ প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে আমরা আহল বাইত শব্দদ্বয়ের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থের উল্লেখ করে মূল অর্থের দিকে দৃষ্টিপাত করবো।

আরবী অভিধানে আহল এর অর্থ হচ্ছেঃ

اهل الرجال، عشیرته و ذو قرباه، جمع : اهلون و اهلان، و اهل یأهل یأهل اهولا تأهل و اتهل: اتخذ اهلا

অর্থাৎঃ-একটি পুরুষের পরিবার , তার আত্মীয়-স্বজন , আহল এর বহুবচন হচ্ছে আহলুন অতীত কাল বুঝানোর জন্য আহালা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের জন্যে ইয়াহেলুন বা ইয়াহালু ব্যবহৃত হয়ে থাকে । আর আহুলান হচ্ছে মূল ক্রিয়া সূচক শব্দ । তায়াহহালা বা এত্তাহালার অর্থ হচ্ছে পরবিার গঠন করেন ।

و اهل الامر : ولایته وللبیت سکانه و للمذهب من یدیه به، و للرجل زوجته کأهلته. للنبی (ص) ازواجه و بناته و صهره علی (رضی الله عنه) او نسائه، و الرجال الذین هم و لکل نبی امنه

অর্থাৎঃ-কোন কাজের জন্যে আহল বলতে তার কতৃত্ব আর ঘরের জন্যে আহল বলতে গৃহবাসীদের বুঝায় । মাযহাবের জন্য আহল’– এর অর্থ হচ্ছে মাযহাবের পরিচালক । একটা পুরুষের আহল বলতে তার স্ত্রীকে বুঝানো হয় । নবী (সা.) এর জন্যে আহল বলতে বুঝায় তার স্ত্রীবর্গ কন্যাগণ , তার জামাতা আলী (রাজীঃ) এবং ঘরের মহিলারা অতঃপর নবীদের আহল হচ্ছে তাদের উম্মত…………………14

আহল শব্দটি পবিত্র আল কোরআনে 54 বার ব্যবহার হয়েছে । প্রতিবারে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে এ শব্দটিকে । আহল শব্দের অর্থ কখনো শুধুমাত্র স্ত্রী ও সন্তান উভয়কেই বুঝানো হয়েছে আল-কোরআনে । কোথাও আবার আহল বলতে আত্মীয়-স্বজনকেও বুঝানো হয়েছে ।

দৃষ্টান্ত স্বরূপ আল-কোরআনে আল্লাহ বলেনঃ

) ف َلَمَّا قَضَىٰ مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ‌ بِأَهْلِهِ آنَسَ مِن جَانِبِ الطُّورِ‌ نَارً‌ا قَالَ لِأَهْلِهِ امْكُثُوا إِنِّي آنَسْتُ نَارً‌ا لَّعَلِّي آتِيكُم مِّنْهَا بِخَبَرٍ‌ أَوْ جَذْوَةٍ مِّنَ النَّارِ‌ لَعَلَّكُمْ تَصْطَلُونَ(

অর্থাৎঃ-অতঃপর যখন মূসা (আঃ) তার প্রতিশ্রুত কর্মের সময়সীমা অতিক্রম করেন তখন তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে স্বদেশ পানে যাত্রা করেন । পথিমধ্যে তুর পর্বতের সন্নিকটে আগুন দেখতে পেলেন। তিনি তার স্ত্রীকে বললেন , তোমরা অপেক্ষা কর , আমি আগুন দেখতে পাচ্ছি । সম্ভবতঃ আমি সেখান থেকে তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসতে পারি অথবা তোমাদের জন্য আগুনের ব্যবস্থা করতে পারি ।15

উক্ত আয়াতে আল্লাহ দু বার আহল শব্দ ব্যবহার করেছেন । এখানে আহল শব্দের অর্থ স্ত্রী । উক্ত আয়াতে আহল শব্দের উদ্দেশ্য হযরত মুসা (আ.) এর স্ত্রী অন্য কেউ নয় ।

আল-কোরআনে আল্লাহ বলেনঃ

) إ ِنَّا مُنَجُّوكَ وَأَهْلَكَ إِلَّا امْرَ‌أَتَكَ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِ‌ينَ(

অর্থাৎঃ- নিশ্চয় আমি তোমাকে (হযরত লুত আ.) এবং তোমার পরিবারকে নাজাত দিব , তোমার স্ত্রী ব্যতীত , কেননা সে অভিশপ্ত এবং পশ্চাদপদের শিকার ।16

উক্ত আয়াতে আল্লাহ পাক আহল বলতে স্ত্রী , পরিবার পরিজন , সন্তান-সন্তুতি সকলকে বুঝিয়েছেন । যদিও লুতের স্ত্রীকে আল্লাহ অভিশপ্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন ।

আল্লাহ অন্যত্র হযরত লুত (আ.) সম্পর্কে বলেনঃ

) و َنَادَىٰ نُوحٌ رَّ‌بَّهُ فَقَالَ رَ‌بِّ إِنَّ ابْنِي مِنْ أَهْلِي وَإِنَّ وَعْدَكَ الْحَقُّ وَأَنتَ أَحْكَمُ الْحَاكِمِينَ قَالَ يَا نُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ‌ صَالِحٍ(

অর্থাৎঃ- নূহ (আঃ) তাঁর প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করলো-হে আমার প্রতিপালক , আমার পুত্র তো আমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ; আর আপনার ওয়াদাও নিঃসন্দেহে সত্য আর আপনিই সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞ ফয়সালাকারী । (আল্লাহ) বলেন , হে নূহ! নিশ্চয় সে (তোমার পুত্র) তোমার পরিবারভুক্ত নয়। নিশ্চই সে অসৎ!17

এক্ষেত্রে আহল অর্থ ঐ ব্যক্তির পদাংক অনুসরণকারী পরিবারের সদস্য । এ কারণে আল্লাহ হযরত নুহ (আ.) এর পুত্রকে তার আহল এর মধ্যে গন্য করেননি । কেননা সে অসৎ কাজে লিপ্ত ।

উপসংহারে বলা যায় আহল শব্দের একক কোন অর্থ নেই । স্থান ভেদে এর অর্থ বিভিন্ন হতে পারে ।

আর বাইত শব্দও কোরআন ও হাদীসের বহু স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে । বাইতের অর্থও বিভিন্ন ধরণের । কোথাও বাইত অর্থ মসজিদুল হারাম আবার কোথাও মসজিদুন্নাবী ইত্যাদি বুঝানো হয়েছে ।

তবে আল-কোরআনের বাইত শব্দ আহল শব্দের সাথে সংযোগ করে ব্যবহৃত হয়েছে দু বার ।

সূরা হুদে আল্লাহ বলেন ,

) ر َ‌حْمَتُ اللَّـهِ وَبَرَ‌كَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ(

অর্থাৎঃ-আল্লাহর রহমত ও বরকত আহলে বাইতের উপর বর্ষিত ।18

সূরা আহযাবে আল্লাহ আরো বলেন ,

) إ ِنَّمَا يُرِ‌يدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّ‌جْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَ‌كُمْ تَطْهِيرً‌ا(

অর্থাৎঃ-আল্লাহ মনস্থ করলেন তোমাদেরকে সমস্ত প্রকার অপবিত্রতা থেকে দূরে রাখতে হে আহলে বাইত এবং মনস্থ করলেন তোমাদেরকে পুত-পবিত্র করতে ।19

মহানবী (সা.) এর হাদীসেও আহলে বাইত শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হয়েছে । শিয়া-সুন্নি উভয় মাযহাবের বর্ণিত হাদীসগুলোতে প্রায় 80 পন্থায় আহলে বাইত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে । তার পরও মুসলমানদের মধ্যে আহলে বাইতের সংজ্ঞা ও অর্থ এবং সদস্যদের ব্যাপারে যথেষ্ট মতপার্থক্য ও অস্পষ্টতা বিদ্যমান । মুসলমানরা তাদের নিজ নিজ মাযহাবের পক্ষে আহলে বাইতের অর্থ করেই দায়িত্ব সমাপ্ত করে থাকেন । অনেকে বলে থাকেন , তাতহীরের আয়াতে উল্লেখিত আহলে বাইতের উদ্দেশ্য বনি হাশিমের লোকজন । আবার অনেকের মতে বনি হাশিমের মু মিন সন্তানগণ অর্থাৎ আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান ব্যতীত অন্য কেউ আহলে বাইতের মধ্যে গন্য নয় ।20

আবার কেউ কেউ বলেন , আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব ও তার সন্তানরা শুধুমাত্র আহলে বাইতের সদস্য ।21

কোন এক মুসলিম সম্প্রদায় বলেন , রাসুলের (সা.) সম্মানিতা স্ত্রীগণ , হযরত আলী ইবনে আবি তালিব , হযরত ফাতিমা , হযরত হাসান ইবনে আলী ও হযরত হুসাইন ইবনে আলী আহলে বাইতের সদস্যবৃন্দ ।22

অনেকে বলেন , নবীর স্ত্রীরা শুধুমাত্র আহলে বাইতের মধ্যে গন্য । কেননা আকরামাহ বিন আব্দুল্লাহ নাজদাহ আল হারুরী-যিনি আলীর সাথে শত্রুতার ক্ষেত্রে অন্যান্যদের অতিক্রম করেছে , সে নবীর (সা.) স্ত্রীগণ শুধুমাত্র আহলে বাইতের সদস্য বলে প্রচার করত । সে আরো বিশ্বাস করত খারেজী দল বহির্ভূত সকল মুসলমান কাফের । হজ্বের সময় সে চিৎকার করে বলত , যদি আমার হাতে শক্তি থাকতো তাহলে আমার ডানে বায়ে যত লোক আছে তাদের সকলকে হত্যা করতাম । সে মসজিদুল হারামে দাড়িয়ে উচ্চস্বরে ধ্বনি দিত , এখানে কাফের ব্যাতীত অন্য কেউ নেই । তার আক্বিদা-বিশ্বাসের মধ্যে আরেকটি দিক হলো যে সে বিশ্বাস করত ,

انما انزل الله متسابه القرآن لیضل به

অর্থাৎঃ আল্লাহ কোরআনের মুতাশাবেহ আয়াতগুলো মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য অবতীর্ণ করেছেন ।

সে সমসাময়িক কালে মিথ্যাবাদী বলে খ্যাতি লাভ করেছিল । আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব ও ইবনে মাসউদ বলেছেন , আকরামার হাদীস জালকারী ও মিথ্যাবাদী বলে কুখ্যাতি আছে । ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল আনসারী তার সম্পর্কে বলেছেন , সে একজন মিথ্যাবাদী ।23

আকরামার ন্যায় আরো একজন ব্যক্তি নবীর (সা.) স্ত্রীগণকে শুধুমাত্র আহলে বাইতের মধ্যে শামিল করেছেন । তিনি হচ্ছেন মাক্বাতিল ইবনে সুলাইমান আল-বালখী আল আযুদী আল খোরাসানী । তিনি তৌহিদ ও রেসালাতের ব্যাপারে অনেক আপত্তিমূলক বক্তব্য পেশ করেছেন যা আহলে সুন্নাতের আক্বিদার সম্পূর্ণ পরিপন্থি ।24

আকরামাহ ও মাক্বাতিল বিন সুলাইমান সূরা আহযাবের 33 নং আয়াতে উল্লেখিত আহলে বাইতের মধ্যে শুধুমাত্র নবীর (সা.) স্ত্রীগণকে গন্য করেছেন । যদিও আমরা উক্ত আয়াতের পূর্ববর্তী দু টি আয়াতে নবীর স্ত্রীগণের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাবধান বাণী পরিলক্ষিত করি । তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেননি যে তারা সমস্ত ধরণের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত । বরং তিনি আল কোরআনে উল্লেখ করেছেনঃ

) ي َا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُ(

অর্থাৎঃ হে নবীর স্ত্রীগণ , তোমরা তো অন্যান্য নারীদের মত নও যদি আল্লাহকে ভয় কর ।25

যদি নবীর (সা.) স্ত্রীরা পবিত্র এবং সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হতেন তাহলে আল্লাহ কখনো তাদের উল্লেখ করে এ ধরণের বক্তব্য পেশ করতেন না । সাথে সাথে নিম্নের আয়াতটিও যথার্থ বলে পরিগণিত হতো না ।

আল্লাহ বলেনঃ

) ي َا نِسَاءَ النَّبِيِّ مَن يَأْتِ مِنكُنَّ بِفَاحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ يُضَاعَفْ لَهَا الْعَذَابُ ضِعْفَيْنِ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّـهِ يَسِيرً‌ا(

অর্থাৎঃ-হে , নবীর স্ত্রীগণ , তোমাদের মধ্যে যে প্রকাশ্য কোন অপবিত্র কাজে লিপ্ত হয় তার আযাব ও শাস্তি অন্যদের চেয়ে দ্বিগুন পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং আল্লাহর জন্যে এ কাজ খুবই সহজ ।26

আর যদি নবীর (সা.) স্ত্রীগণ সকল পাপ-পংকিলতা থেকে মুক্ত হবেন তাহলে নবীকে (সা.) কষ্ট দেয়া কি পবিত্রতার পরিপন্থি নয় ?

আল বুখারী তার স্বীয় সহিহাতে এভাবে বর্ণনা দিচ্ছেন ,

انّ النبی هجر عایشة و حفصة شهرا کاملا و ذلک بسبب افشاء حفصة الحدیث الذی اسراه لها الی عایشة، قالت للنبی: انّک اقسمت ان لا تدخل علینا شهرا ؟

অর্থাৎঃ- নবী (সা.) পূর্ণ এক মাস আয়েশা ও হাফসাকে বয়কট করেছিলেন । এটা এ কারণে যে হাফসা নবীর গোপন কথা আয়েশার কাছে ফাস করে দিয়েছিল । আয়েশা নবীকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ আপনি নাকি প্রতিজ্ঞা করেছেন একমাস আমাদের সাথে সম্পর্ক রাখবেন না ?27

সহি আল-বুখারীতে অন্যত্র এভাবে উল্লেখ আছে যে , ইবনে আব্বাস বলেছেনঃ

ابن عباس یقول: لم ازل حریصا علی ان عمر بن خطاب عن المراتین من ازواج النبی (ص) التین قال الله تعالی فیها: ان تتوبا الی الله فقدصغت قلوبکما

অর্থাৎঃ-আমি ওমর বিন খাত্তাবকে সে দু জন নবীপত্নীর ব্যাপারে প্রশ্ন করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলাম , যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেনঃ যদি তারা দু জন আল্লাহর কাছে তওবা করে তাহলে সে কাজটিই সঠিক হবে । কেননা তোমাদের দু জনের অন্তর (বাতিলের দকে) ঝুকে গিয়েছিল ।28

অতঃপর আল-বুখারী এভাবে বর্ণনা দিচ্ছেনঃ

حتی حج و حججت معه.....................حنی قال ابن عباس، فقلت للخلیفه: من المراتین؟ فقال عمر بن خطاب:و اعجب لک یا ابن عباس ! هما عایشة و حفصة

অর্থাৎঃ- (ইবনে আব্বাস বলেন) ইতিমধ্যে তিনি (হযরত ওমর) হজ্জ সম্পন্ন করেন আর আমিও তার সাথে হজ্জ আদায় করি ।……… .ইবনে আব্বাস বলেনঃ আমি খলিফাকে জিজ্ঞেস করলাম ঐ দু জন মহিলা কারা ছিলেন ? ওমর বিন খাত্তাব উত্তর দিলেনঃ আশ্চর্য তো , তুমি তা জান না হে ইবনে আব্বাস ! তারা হলেন আয়েশা ও হাফসা………………… .29

বিখ্যাত সুন্নী আলেম ও তাফসীরকারক আল্লামা ফাখরে রাযী তার তাফসীর গ্রন্থ তাফসীর আল-কাবির -এ সূরা তাহরীমের চতুর্থ আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে , এ আয়াতটি হযরত আয়েশা ও হাফসাকে সম্বোধন করে নাযিল হয়েছে ।30

অন্যত্র এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে ,

ها هی عایشة تعقبها للنبی (ص) بعد ما فقدته فی لیالی نوبتها و قوله (ص) لها ما لک یا عایشة ! اغرت ؟ فقالت: و ما لی ان لا یغار مثلی علی مثلک ؟ فقال لها افاخذک شیطانک ؟ !

অর্থাৎঃ- যখন আয়েশা কয়েক রাত্র নবী (সা.) এর অনুপস্থিতি ও তার পালা অতিক্রম হওয়ায় চুপিসারে হযরতের পিছু লেগেছিল তখন মহানবী (সা.) তাকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ তোমার কি হয়েছে হে আয়েশা ? তুমি কেন আমাকে শুধু তোমার জন্য মনে করছো ? আয়েশা বলেনঃ আমার মত মানুষ কি আপনার মত ব্যক্তির ব্যাপারে ইর্ষা করতে পারে না ? অতঃপর নবী (সা.) তাকে বললেনঃ তোমাকে কি তোমার শয়তানে ধরেছে ?31

এভাবে প্রিয় নবী (সা.) এর পিছু লাগা এবং মহানবীর (সা.) উক্তি তোমাকে কি তোমার শয়তান ধরেছে ? কোনক্রমেই সূরা আহযাবের 33 নং আয়াতে উল্লিখিত আহলে বাইতকে আল্লাহ সমস্ত প্রকার অপবিত্রতা থেকে তুরে রেখেছেন এবং তাদেরকে পুত পবিত্র করেছেন ;- উক্তির সাথে সংগতিপূর্ণ হতে পারে না ।

হযরত আয়েশা নবী করিম (সা.) এর অমীয় বাণী ও ঐতিহাসিক নির্দেশ অমান্য করে হাওয়াব নামক স্থান অতিক্রম করে আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন । ইতিহাসে এ যুদ্ধ জঙ্গে জামাল বা উষ্টের যুদ্ধ নামে অভিহিত । এ যুদ্ধে উভয় পক্ষের বহু সাহাবী তাবেয়ীন ও হাফেজ-ক্বারী হতাহত হন । এ যুদ্ধের কারণ উদঘাটন করলেই বিবেকবান মানুষ মাত্রই উপলদ্ধি করতে পারবেন যে মা আয়েশা যদি কোরআনের পরিভাষায় রেজস বা অপবিত্রতা থেকে মুক্ত থাকতেন তাহলে কখনো এ যুদ্ধ সংঘটিত হত না । এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সম্বন্ধে অবগত হবার জন্য পাঠকদের নিম্নলিখিত পুস্তকগুলো অধ্যায়নের অনুরোধ করছি ।

1. কামেল ফি আত তারিখ , খণ্ড-3 , পৃঃ-107 ।

2. আল ফুতুহ , খণ্ড-1 , অধ্যায়-2 , পৃঃ-456 ও 457 ।

3. আনসাব আল আশরাফ , খণ্ড-2 , পৃঃ-228 , কায়রো ।

4. আত তাবাক্বাত আল কোবরা , খণ্ড-3 , পৃঃ-31 , বৈরুত ।

5. কানযুল উম্মাল , খণ্ড-3 , পৃঃ-161 ।

6. মুসনাদে আহমাদ , খণ্ড-6 , পৃঃ-97 , রৈুত ।

7. মাজমুআ আয-যাওয়ায়েদ , খণ্ড-7 , পৃঃ-34 ।

8. সহি আল বুখারী , কিতাব বিদয় আল খালক ।

9. সহি আল বুখারী , কিতাব আল জিহাদ ওয়াল মিযার বাবে আয়ওয আন নাবী , খণ্ড-4 , পৃঃ-46 ; খণ্ড-2 , পৃঃ-125 ।

10. সহি মুসলিম , খণ্ড-2 , পৃঃ-560 ; খণ্ড-8 , পৃঃ-181 , মিশর , শেবকাত এলাহিয়া , শারহেন নাবাবী ।

তাছাড়াও হযরত আয়েশা হযরত ওসমানকে কাফের ফতোয়া দিয়ে জনগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন খলিফাকে হত্যা করতে । তার ঐতিহাসিদ ফতোয়া ইতিহাস গ্রন্থসমূহে এভাবে উল্লেখ আছে যে তিনি বলেছেন ,

اقتلو نعثلا فقد کفر

অর্থাৎঃ- না সালকে হত্যা কর সে কাফের হয়ে গেছে ।

তিনি হযরত ওসমানকে না সাল বলে একজন ইয়াহুদী বৃদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন ।

আবার কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে এভাবে বর্ণীত আছে যে , তিনি ওসমানকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন ,

اقتلو نعثلا فقد فجر

অর্থাৎঃ- না সালকে হত্যা কর সে ফাজের হয়ে গেছে ।32

এত কিছুর পর কি করে তাতহীরের পবিত্র আয়াতটিতে উল্লেখিত আহলে বাইতের মধ্যে নবী (সা.) এর স্ত্রীগণও গণ্য হতে পারেন ?

বস্তুতঃ যদি আমারা তাফসীর ও হাদীস গ্রন্থাবলী পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাবো যে , সেখানে আহলে বাইত বলতে হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত আলী ইবনে আবি তালিব , হযরত ফাতিমা , হযরত হাসান ইবনে আলী ও হযরত হুসাইন ইবনে আলীকে বোঝানো হয়েছে । এ ধরণের হাদীসের সংখ্যা প্রচুর । তথাপি আমার সংক্ষিপ্ততার প্রতি দৃষ্টি রেখে নিম্নে বহুল উল্লেখিত ও প্রচারিত কয়েকটি হাদীস সম্মানিত পাঠকবৃন্দের জন্য উপস্থাপন করলাম । নিরপেক্ষ মন ও মুক্ত চিন্তা নিয়ে বিবেচনা করার অনুরোধ রইল ।

একঃ নবী পত্নী উম্মে সালমা থেকে বর্ণীত আছে যে তিনি

) إ ِنَّمَا يُرِ‌يدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّ‌جْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَ‌كُمْ تَطْهِيرً‌ا(

আয়াতটির শানে নুযুল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন , এ আয়াতটি আমার গৃহে অবতীর্ণ হয়েছে । তখন আমার গৃহে সাতজন লোক ছিলেন । তারা হলেনঃ জিবরাইল (আ.) , মিকাইল (আ.) , নবী (সা.) , আলী , ফাতিমা , হাসান ও হুসাইন । আর আমি ছিলাম দরজার মুখে । আরজ করলাম , ইয়া রাসুলুল্লাহ আমি কি আহলে বাইতের মধ্যে গন্য নই ? উত্তরে তিনি বললেনঃ (না , এরকম নয়) নিশ্চয় তুমি মঙ্গল পথের যাত্রী , তুমি আমার স্ত্রীদের মধ্যে গণ্য ।33

দুইঃ আব্দুল্লাহ বিন জা ফর বিন আবি তালিব থেকে বর্ণীত আছে যে তিনি বলেছেন ,

کما نظر رسول الله (ص) الی رحمه هابطه، قال: ادعو لی، ادعو لی ! فقالت صفیحه- بنت حیی بن اخطب زوجه رسول الله (ص): من یا رسول الله ؟ قال (ص): اهل بیتی: علیا و فاطمة و الحسن و الحسین

অর্থাৎঃ একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) জিবরাইল (আ.) এর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন । তিনি বলেন , তাদেরকে আমার নিকট ডেকে আন , তাদেরকে আমার নিকট ডেকে পাঠাও ! সাফিয়্যা (নবী পত্নী , হুয়িয়্যা বিন আখতারের কন্যা) প্রশ্ন করলেনঃ কাদের কথা বলছেন হে আল্লাহর রাসুল ? প্রতিত্তোরে তিনি বললেনঃ তারা আমার আহলে বাইত-আলী , ফাতিমা , হাসান ও হুসাইন ।34

তিনঃ আনাস বিন মালেক থেকে বর্ণীত হেয়েছে যে তিনি বলেছেন , রাসুলুল্লাহ (সা.) ছয় মাস পর্যন্ত ফজর নামাজের সময় ফাতিমার গৃহের নিকট থেকে অতিক্রম করতেন এবং বলতেনঃ

الصلاة یا اهل البیت،) إِنَّمَا يُرِ‌يدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّ‌جْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَ‌كُمْ تَطْهِيرً‌ا (

অর্থাৎঃ-হে আহলে বাইত , সালাম ও দরুদ তোমাদের উপর । নিশ্চয় আল্লাহ মনস্থ করেছেন তোমাদের কাছ থেকে সকল প্রকার অপবিত্রতা দূরীভূত করতে হে আহলে বাইত এবং মনস্থ করেছেন তোমাদেরকে পুত-পবিত্র করতে ।35

চারঃ মুসলিম তার সহিহাতে এভাবে লিপিবদ্ধ করেছেনঃ যখন অবতীর্ণ হল নিম্নলিখিত আয়াতটি

) ف َقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنفُسَنَا وَأَنفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَل لَّعْنَتَ اللَّـهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ(

অর্থাৎঃ বল (হে নবী)-এসো , আমরা আমাদের সন্তানদের , মহিলাদের এবং নিজেদেরকে ডেকে আনি আর তোমারাও তাই কর । অতঃপর (এসো) চ্যালেঞ্জ করি আর মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষন করি ।36

তখন মহানবী (সা.) আলী , ফাতিমা , হাসান ও হুসাইনকে ডেকে আনলেন । তিনি বললেনঃ

الهی هولاء اهلی

অর্থাৎঃ হে আল্লাহ এরা আমার আহলে বাইত ।37

পাঁচঃ সহি তিরমিযি গ্রন্থে নিম্নলিখিতভাবে বর্ণীত আছেঃ

তাতহীরের আয়াত নাযিল হবার পর থেকে ছয় মাস পর্যন্ত প্রতিদিন যোহর নামাজের সময় আল্লাহর রাসুল ফাতিমার গৃহে আগমন করে উক্ত আয়াত পাঠ করতেন । প্রিয় নবী (সা.) উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় বলেছেনঃ

اللهم اهل بیتی و خاصتی فاذهب عنهم الرجس و طهرهم تطهیرا

অর্থাৎঃ হে আল্লাহ আমার আহলে বাইত থেকে তুমি সকল অপবিত্রতা দূরীভূত কর এবং পূত-পবিত্র কর ।38

ছয়ঃ সহি মুসলিম ও জামেয় উসূল গ্রন্থদ্বয়ে এভাবে বর্ণীত আছে যে , হাসীন বিন সামারাহ যায়েদ বিন আরকামকে জিজ্ঞেস করলেন , নবীর পত্নীগণও কি আহলে বাইতের মধ্যে গণ্য ? তিনি উত্তরে বললেন , আল্লাহর শপথ , না এরকম নয় । কেননা স্ত্রী জীবনের কিছু সময় স্বামীর সাথে অবস্থান করে । অতঃপর স্বামী তালাক দিয়ে দিলে সে তার পিতা-মাতা আত্মীয়-স্বজনের কাছে প্রত্যাবর্তন করে এবং স্বামী থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক হয়ে যায় । কিন্তু রাসুলের আহলে বাইত এমন সব ব্যক্তিবর্গ যাদের জন্য সাদকা গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে , তারা যেখানেই যান না কেন কখনো পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন না ।39

সাতঃ অন্যত্র এরূপ উল্লেখ আছে যে , তাতহীরের আয়াত পাঁচজন তথা নবী (সা.) , হযরত আলী ইবনে আবি তালিব , হযরত ফাতিমা , হযরত হাসান ইবনে আলী ও হযরত হুসাইন ইবনে আলীর জন্য অবতীর্ণ হয়েছে ।40

আটঃ বুখারী ও মুসলিম উভয়েই হযরত আয়েশার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে , মুসআব বিন শাইবাহ তার বোন সাফিয়্যা থেকে বর্ণনা করেছেন , তিনি হযরত আয়েশা থেকে বর্ণনা করেছেনঃ একদা রাসুল (সা.) একটি কালো আ বা পরিধান করে গৃহের বাইরে আসলেন । পথিমধ্যে হাসান ইবনে আলীর সাথে দেখা হল । তিনি হাসানকে স্বীয় আ বার ভিতর প্রবেশ করালেন । অতঃপর হুসাইন ইবনে আলী আগমন করলে তাকেও পূর্বানুরূপভাবে তার আ বার ভিতরে নিয়ে নিলেন । অতঃপর ফাতিমা ও আলী ইবনে আবি তালিব আগমন করলে তারাও নবীর আ বার ভিতরে প্রবেশ করলেন । আর পরক্ষণে তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করেনঃ

) إ ِنَّمَا يُرِ‌يدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّ‌جْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَ‌كُمْ تَطْهِيرً‌ا(

অর্থাৎঃ-নিশ্চিয়ই আল্লাহ মনস্থ করলেন তোমাদের নিকট থেকে সমস্ত প্রকার অপবিত্রতা থেকে দূরীভূত করতে হে আহলে বাইত এবং মনস্থ করলেন তোমাদেরকে পুত-পবিত্র করতে ।41


3

4

5