ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জন্ম
অষ্টম ইমাম হযরত আলী ইবনে মূসা আর রেজা (আ.)-এর বয়স তখন চল্লিশেরও বেশি। কিন্তু তদোবধি কোন সন্তান তার ঘরে আসেনি। এ বিষয়টি শিয়াদের জন্য বেশ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল। কেননা তারা রাসূল (সা.) ও পবিত্র ইমামগণের রেওয়ায়েত থেকে এ বিশ্বাসে উপনীত হয়েছিলেন যে ,নবম ইমাম হবেন অষ্টম ইমামেরই সন্তান। উপরোক্ত কারণেই তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান ছিলেন যে আল্লাহ্তায়ালা ইমাম রেজাকে একটি পুত্র সন্তান দান করুন। এমনকি তারা কখনো কখনো ইমাম রেজা (আ.)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করার অনুরোধ জানাতেন ,যেন মহান আল্লাহ্ তাঁকে একটি পুত্র সন্তান দান করেন। ইমাম রেজা (আ.) তাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন :
“ আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে এমন এক পুত্র সন্তান দান করবেন যে আমার উত্তরাধিকারী ও আমার পরবর্তী ইমাম হবে ” (বিহারুল আনওয়ার,৫০তম
খণ্ড ,পৃ. ১৫ ;উয়ুনুল মুজিযাত পৃ. ১০৭) ।
অবশেষ ১৯৫ হিজরীর ১০ই রজব ,মতান্তরে রমযান মাসে ইমাম মুহাম্মদ তাকী (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম মুহাম্মদ ,কুনিয়াহ আবু জাফর এবং তাঁর প্রসিদ্ধ উপাধি হচ্ছে‘
তাকী ’ এবং‘
জাওয়াদ ’ ।
তাঁর জন্মের সুসংবাদে সমস্ত শিয়ারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন এবং তাদের ঈমান ও আকিদা আরও দৃঢ়তর হয়। কেননা হযরতের জন্ম বিলম্বে হওয়ায় শিয়াদের মধ্যে সন্দেহের যে সম্ভাবনা ছিল ,তা দূর হয়ে গেল ।
ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর মাতার নাম‘
সাবিকাহ ’ । ইমাম রেজা (আ.) তাঁকে‘
খিযরান ’ বলতেন। এই মহীয়ষী রমণী রাসূল (সা.)-এর স্ত্রী মারিয়া কিবতির বংশের ছিলেন। তিনি চারিত্রিক গুণাবলীর দিক থেকে সে যুগের শ্রেষ্ঠা রমণী ছিলেন। রাসূল (সা.) এক রেওয়ায়েতে তাঁকে (সাবিকাহ)خير الاماء
বা সর্বোত্তম দাসী হিসাবে উল্লেখ করেছেন। (উসূলে কাফী ,১ম খণ্ড ,পৃ. ৩২৩) এই রমণী ইমাম রেজা (আ.)-এর গৃহে আসার পূর্বেই ইমাম মূসা ইবনে জাফর তার কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছিলেন এবং ইয়াযিদ ইবনে সালিতের মাধ্যমে তাকে সালাম পৌঁছিয়েছিলেন (উসূলে কাফী ,১ম খণ্ড ,পৃ. ৩১৫) ।
ইমাম রেজা (আ.)-এর বোন হাকিমাহ বলেন : ইমাম রেজা (আ.) আমাকে ইমাম মুহাম্মদ তাকী (আ.)-এর জন্মের সময় খিযরানের কাছে থাকার নির্দেশ দেন। নবজাতক জন্মের তৃতীয় দিবসে আকাশের দিকে তাকাল অতঃপর ডানে ও বায়ে দেখল এবং বলল :
اشهدُ ان لا اله الاّ الله و اشهد انّ محمّداً رسول الله
‘ অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে,আল
্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল। ’
আমি এই বিস্ময়কর ঘটনা অবলোকন করে তড়িৎ ভাইয়ের কাছে গিয়ে যা দেখেছি তা বর্ণনা করলাম। ইমাম রেজা (আ.) বললেন ,‘
যা দেখেছ তার চেয়ে আরও বেশি আশ্চর্যজনক ঘটনা ভবিষ্যতে তার থেকে দেখতে পাবে ’ (মানাকেব ,৪র্থ খণ্ড ,পৃ. ৩৯৪) ।
আবু ইয়াহিয়া সানয়ানী বলেন : ইমাম রেজা (আ.)-এর খেদমতে ছিলাম। এমন সময় ছোট্ট শিশু ইমাম জাওয়াদকে তাঁর কাছে আনা হলে তিনি বলেন :‘
এই শিশু এমন শিশু যে ,শিয়াদের জন্য তাঁর থেকে বরকতময় আর কেউই দুনিয়াতে আসেনি।’
সম্ভবতঃ উল্লিখিত কারণেই (শিয়াদের মধ্যে সন্দেহ দূরীকরণের জন্য) হয়তো ইমাম এরূপ বর্ণনা করেছেন। কেননা ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জন্মের মাধ্যমেই ইমামের উত্তরাধিকারের প্রশ্নে শিয়াদের উদ্বেগের অবসান ঘটে। আর এভাবে শিয়াদের ঈমান সন্দেহের কলুষতা থেকে মুক্তি লাভ করে।
নোফেলি বলেন : ইমাম রেজা (আ.)-এর সাথে একত্রে খোরাসান যাওয়ার পথে তাঁকে সবিনয়ে নিবেদন করলাম : আমার প্রতি কোন আদেশ উপদেশ আছে কি ? তিনি বললেন :‘
তোমার প্রতি নির্দেশ হলো : আমার পর আমার পুত্র মুহাম্মদের অনুসরণ করবে। জেনে রাখ আমি এমন এক সফরে যাচ্ছি যেখান থেকে আর কোনদিন ফিরব না (উয়ুনু আখবারুর রেজা ,২য় খণ্ড ,পৃ. ২১৬) ।
ইমাম রেজা (আ.)-এর ব্যক্তিগত লেখক মুহাম্মদ ইবনে আবি ইবাদ বলেন ,ইমাম রেজা (আ.) তাঁর পুত্র ইমাম জাওয়াদকে কুনিয়া ধরে সম্বোধন করতেন। (আরবদের মধ্যে যখন কাউকে সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয় তখন তাকে কুনিয়া ধরে সম্বোধন করা হয়) । যখন ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর কাছ থেকে কোন পত্র আসত ,ইমাম রেজা (আ.) খুশী হয়ে বলতেন ,‘
আবুজাফর আমাকে লিখেছে... ।’ আবার যখন ইমাম রেজা (আ.) আমাকে ইমাম জাওয়াদ (আ.)
-এর কাছে চিঠি লিখতে বলতেন ,তাঁকে সম্মানের সাথে খেতাব করতেন। আর ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর পক্ষ থেকে যে সমস্ত পত্র আসত ,তা খুবই সুন্দর বাচন ভঙ্গি ও বাক্যালংকারে পূর্ণ থাকত।
মুহাম্মদ ইবনে আবি ইবাদ আরও বলেন ,ইমাম রেজাকে বলতে শুনেছি যে ,তিনি বলতেন ,‘
আমার পরে আবু জাফর হচ্ছে আমার উত্তরাধিকারী ও স্থলাভিষিক্ত ’ (উয়ুনু আখবারুর রেজা ,২য় খণ্ড ,পৃ. ২৪০) ।
মুয়াম্মার ইবনে খাল্লাদ বলেন ,ইমাম রেজা (আ.) কিছু কথা স্মরণ করে বলেন : আমার থেকে শোনার প্রয়োজন নেই ,আবু জাফরকে আমার স্থলাভিষিক্ত করেছি ,যে কোন প্রশ্ন ও সমস্যা থাকলে তাকে প্রশ্ন করো সে জবাব দিবে। আমাদের পরিবার এমন এক পরিবার যে এ পরিবারের সন্তানরা তাঁদের মহান পিতাগণের কাছ থেকে ইলমের হাকিকাত (জ্ঞানের নিগুঢ় রহস্য) ও মারেফাত পূর্ণরূপে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকেন।
(উদ্দেশ্য এটাই যে পূর্বের ইমামের সমস্ত মর্যাদা এবং জ্ঞান পরবর্তী ইমামের কাছে স্থানান্তরিত হয়। আর এটা শুধুমাত্র ইমামগণের বেলায় প্রযোজ্য ইমামগণের অন্যান্য সন্তানদের বেলায় নয়।
খাইরানী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন ,খোরাসানে ইমাম রেজা (আ.)-এর খেদমতে ছিলাম ,কেউ প্রশ্ন করল : যদি আপনি আমাদের মাঝ থেকে চলে যান তাহলে কার শরণাপন্ন হব ? ইমাম রেজা (আ.) বলেন :‘
আমার পুত্র আবু জাফরের শরণাপন্ন হবে। ’
প্রশ্নকারী হয়ত ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর বয়সকে ইমামতের জন্য উপযুক্ত মনে করেনি এবং মনে করেছিল একটি বালক কিভাবে ইমামতের উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারে ? ইমাম রেজা (আ.) বললেন :‘
আল্লাহ্তায়ালা হযরত ঈসাকে শৈশবে দোলনাতেই নবুওয়াত দান করেছেন। আর আবু জাফরতো এখন ৮ বছরের বালক ,আল্লাহর কাছে কিছুই অসম্ভব নয় ” (উসূলে কাফী ,১ম খণ্ড ,পৃ. ৩২২ ,এরশাদে শেখ মুফিদ ,পৃ. ২৯৯) ।
আবদুল্লাহ্ ইবনে জাফর বলেন ,ইয়াহিয়া ইবনে সাফওয়ানের সাথে ইমাম রেজা (আ.)-এর নিকটে উপস্থিত হলাম। সেখানে তিন বছরের বালক ইমাম জাওয়াদও ছিলেন। ইমাম রেজাকে সবিনয়ে নিবেদন করলাম : আল্লাহ না করুন ,আপনি যদি আমাদেরকে ছেড়ে চলে যান ,তাহলে আপনার উত্তরাধিকারী কে হবেন ? ইমাম রেজা (আ.) আবু জাফরের দিকে ইশারা করে বললেন ,আমার এ সন্তানই আমার উত্তরাধিকারী ও স্থলাভিষিক্ত। বললাম : এত কম বয়সে ? তিনি বললেন : হ্যাঁ ,এ বয়সেই। আল্লাহ্ তায়ালা হযরত ঈসা (আ.)-কে শৈশবেই নবুওয়াত দান করেছেন ,অথচ তখন তাঁর বয়স তিন বছরও ছিল না (কেফায়াতুল আছার ,পৃ. ৩২৪ ;বিহারুল আনওয়ার ,৫০তম খণ্ড ,পৃ. ৩৫) ।