কোরআনের পরিচয়

কোরআনের পরিচয়11%

কোরআনের পরিচয় লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: কোরআন বিষয়ক জ্ঞান

কোরআনের পরিচয়
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 33 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 22598 / ডাউনলোড: 3656
সাইজ সাইজ সাইজ
কোরআনের পরিচয়

কোরআনের পরিচয়

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

অত্র গ্রন্থে কোরআন মজীদের বেশ কিছু আয়াত উদ্ধৃত হয়েছে এবং এ সব আয়াতের মধ্যে এমন আয়াতও রয়েছে যাতে আল্লাহ্ তা আলা নিজের জন্য উত্তম পুরুষে বহুবচন অর্থাৎ আমরা শব্দ ব্যবহার করেছেন। তৎকালীন আরবী বাকরীতিতে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালীদের মুখে নিজের জন্য এক বচন অর্থেই আমরা ব্যবহারের প্রচলন ছিলো , এ কারণে তৎকালীন আরবের মোশরেকরা কোরআন মজীদে আল্লাহ্ তা আলা নিজের জন্য আমরা ব্যবহার করায় এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে নি তথা একে বহু ঈশ্বরবাদের সপক্ষে প্রমাণ বলে দাবী করে নি। কিন্তু যদিও বাংলা সহ আরো অনেক ভাষায় সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বা বিনয় প্রকাশের জন্য এর প্রচলন রয়েছে তথাপি বাংলা বাকরীতিতে অনেক ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিনয়স্বরূপ আমরা এবং কর্তৃত্বভাব প্রকাশের জন্য আমি ব্যবহারেরও প্রচলন আছে। এ কারণে বাংলা ভাষায় আল্লাহ্ তা আলার জন্য আমরা ব্যবহার বেখাপ্পা শুনায় বিধায় আমরা এক বচনে এর অনুবাদ করেছি। অত্র গ্রন্থে এ ধরনের সকল আয়াতের ক্ষেত্রেই আমরা এ রীতি অনুসরণ করেছি।

কোরআনের পরিচয়

নূর হোসেন মজিদী

ভূমিকা

বিসমিল্লাহির্ রাহমানির্ রাহীম্।

এ এক অনস্বীকার্য সত্য যে , কোরআন মজীদ ছাড়া অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থকেই ঐতিহাসিকভাবে প্রামাণ্য পদ্ধতিতে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে , যে সব ব্যক্তির নামে তা চালু আছে তা তাঁদের কাছ থেকে এসেছে। তেমনি ঐ সব ব্যক্তি যে নবী ছিলেন এটাও অকাট্যভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কারণ , ঐ সব ব্যক্তির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ঐতিহাসিকভাবে প্রামাণ্য পদ্ধতিতে অকাট্যভাবে প্রমাণ করা যায় না এবং তাঁদের জীবনেতিহাস ও ঐ সব গ্রন্থের বিকৃত হওয়ার বিষয়টি সর্বজনস্বীকৃত সত্য। একমাত্র হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব এবং কোরআন মজীদকে যে একটি ঐশী গ্রন্থ হিসেবে দাবী করে তিনিই রেখে গিয়েছেন , আর এ গ্রন্থটি যে তিনি যেভাবে রেখে গিয়েছেন ঠিক সেভাবেই অবিকৃত রয়ে গেছে এটাও ঐতিহাসিকভাবে প্রামাণ্য পদ্ধতিতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত।

বলা বাহুল্য যে , অমুসলিমরা রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) কে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মনোনীত নবী হিসেবে স্বীকার করে না , ফলতঃ স্বাভাবিকভাবেই তারা কোরআন মজীদকে আল্লাহর কিতাব বলেও স্বীকার করে না , বরং এটিকে তাঁর রচিত গ্রন্থ বলে অভিহিত করে থাকে। কিন্তু এ গ্রন্থটিকে যে তিনিই ঐশী গ্রন্থ হিসেবে দাবী করে পেশ করেছেন এবং তিনি যেভাবে রেখে গিয়েছেন হুবহু সেভাবেই অবিকৃতভাবে বর্তমান আছে তা আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে যে কোনো নিরপেক্ষ জ্ঞানগবেষকই স্বীকার করতে বাধ্য।

অবশ্য হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে আল্লাহর মনোনীত নবী হিসেবে গণ্যকারী মুসলমানদের জন্য কোরআন মজীদকে আল্লাহর কিতাব হিসেবে গণ্য করা একটি স্বাভাবিক বিষয় এবং এটি যে , সংরক্ষিত তথা অবিকৃত আছে তা মেনে নেয়ার জন্য তাদের কাছে স্বয়ং কোরআন মজীদের দাবীই যথেষ্ট। কারণ , আল্লাহ্ তা আলা এরশাদ করেছেন যে , তিনিই এ গ্রন্থ নাযিল করেছেন এবং তিনিই এর সংরক্ষণকারী। মুসলমানদের জন্য কেবল এতোটুকু জানাই যথেষ্ট - যা থেকে প্রমাণিত হয় যে , কোরআন মজীদ অবিকৃতরূপে আমাদের কাছে পৌঁছার জন্য অন্য কারো কাছেই ঋণী নয়।

তবে অবিকৃত বিচারবুদ্ধি ও মুক্ত চিন্তার অধিকারী অমুসলিমদের কাছে কোরআন মজীদের প্রামাণ্যতা ও বিকৃতিহীনতা সম্পর্কে এতোটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে , এ গ্রন্থটি অল্প অল্প করে দীর্ঘ তেইশ বছরে নাযিল হয়েছে এবং নাযিল হওয়ার সাথে সাথেই তা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে , আর রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর বহু সংখ্যক ছ্বাহাবী (সহচর) সাথে সাথে এবং পরে তাঁদের কাছ থেকে শুনে আরো অসংখ্য ছ্বাহাবী তা মুখস্ত করেছেন। এভাবে তা বিকৃতির আশঙ্কা থেকে সংরক্ষিত থেকেছে। তাই সকল যুগেই সমগ্র মানবজাতির মধ্যে কোরআন মজীদের একটিমাত্র সংস্করণ বিদ্যমান ছিলো এবং রয়েছে।

বস্তুতঃ কোরআন মজীদের অন্যতম প্রধান পরিচয় হচ্ছে এই যে , এটি হচ্ছে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) কে প্রদত্ত স্থায়ী মু জিযাহ্ অর্থাৎ তিনি যে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মনোনীত নবী ছিলেন তার প্রমাণ বহনকারী অবিনশ্বর অলৌকিক নিদর্শন যা এ বিশ্বজগত ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত প্রোজ্জ্বল মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় মানবকুলের সামনে দেদীপ্যমান হয়ে বিরাজমান থাকবে।

কোরআন মজীদের মু জিযাহ্ (অলৌকিকতা)র বিভিন্ন দিক আছে। এ সব দিকের মধ্যে সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে এর ভাষার বিস্ময়কর প্রাঞ্জলতা ও প্রকাশক্ষমতার সূক্ষ্মতা সহকারে সংক্ষিপ্ত আয়তনে সীমাহীন জ্ঞানগর্ভতা ও বিষয়বস্তুর ব্যাপক বৈচিত্র্য। এ সব বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কোরআন মজীদ তার বিরোধীদেরকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে যে , তাদের পক্ষে সম্ভব হলে সবাই মিলে অন্ততঃ এর একটি ছোট সূরাহর সম মানের একটি সূরাহ্ রচনা করে নিয়ে আসুক। আজ পর্যন্ত এ চ্যালেঞ্জ কেউ গ্রহণ করে নি। এছাড়া কোরআন মজীদের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে ; এটাও এর ঐশী গ্রন্থ হওয়ার আরেকটি প্রমাণ।

যা-ই হোক , মুসলমানরা কোরআন মজীদকে আল্লাহর কিতাব বলেই জানে এবং প্রতিটি মুসলিম পরিবারেই কোরআন মজীদের কপি রয়েছে , আর তারা সকলেই কম-বেশী কোরআন তেলাওয়াত্ করে এবং এ গ্রন্থকে সম্মান ও যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করে। এমতাবস্থায় তাদের সামনে কোরআন মজীদকে নতুন করে পরিচিত করিয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠতে পারে। হয়তোবা এ কারণেই অন্ততঃ বাংলা ভাষায় ইসলাম সম্পর্কে ছোট-বড় হাজার হাজার গ্রন্থ রচিত হলেও কোরআন মজীদের পরিচয় সম্পর্কে স্বতন্ত্র কোনো গ্রন্থ রচিত হয়েছে বলে অন্ততঃ অত্র গ্রন্থকারের জানা নেই।

কোরআন মজীদের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া সম্ভব কেবল এটিকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে ও একে জীবনের নিত্যসঙ্গী করলে। অবশ্য সে নিত্যসঙ্গী হতে হবে সবাক তথা পদে পদে পথনির্দেশ প্রদানকারী , বোবা নিত্যসঙ্গী নয়। এ কথা এ কারণে বলছি যে , অধিকাংশ মুসলমানই কোরআন মজীদকে সযত্নে সংরক্ষণ করে এবং তেলাওয়াত করে বটে , তবে জানে না যে , তাতে কী বলা হয়েছে , আর তা জানে না বলেই তা মানা সম্ভব নয় , ফলতঃ এর অবস্থা হচ্ছে বোবা সঙ্গীর ন্যায় যার উচ্চারিত শব্দাবলী থেকে পথনির্দেশ পাওয়া সম্ভব নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে , এমনটা হওয়ার কারণ কী ? কোরআন মজীদের সাথে অন্ততঃ শিক্ষিত লোকদের এহেন আচরণ বিস্ময়ের সৃষ্টি না করে পারে না। এ আচরণ হচ্ছে দূর থেকে আগত এমন কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়ের প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শনের ন্যায় - যার সম্পর্কে কেবল এতোটুকু জানা আছে যে , তিনি আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন মুরুব্বী , কিন্তু তাঁর যোগ্যতা ও গুণাবলী সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানা নেই। ফলে আমরা অনেক সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাতের কাছে পাওয়া হাতুড়ে ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে জীবন বিসর্জন দেই , অথচ ঘরে বেড়াতে আসা ঐ শ্রদ্ধেয় মুরুব্বী হয়তো ঐ রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার , কিন্তু তা জানা ছিলো না বলে তাঁর কাছে সাহায্য চাই নি।

অবশ্য কোরআন মজীদকে এরূপ কোনো ডাক্তারের সাথে এমনকি সর্বরোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে তুলনা করা হলেও তা হবে দুর্বল উপমা (مثال ناقص ) , কারণ , মানব প্রজাতির জন্য এমন কোনো সমস্যা ও জিজ্ঞাস্য নেই এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত উদ্ভব হবে না - যার সমাধান ও জবাব কোরআন মজীদে নেই। কারণ , কোরআন মজীদ নিজের অন্যতম পরিচয় দিয়েছে সকল কিছুর বর্ণনা বা জ্ঞান (تبيانا لکل شيء ) বলে।

কোরআন মজীদের সাথে আমাদের এ আচরণের কারণ হচ্ছে আমরা এর ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পরিচয়ের সাথেও পরিচিত নই। এ কারণেই আমরা একে তেলাওয়াত করাই যথেষ্ট মনে করি , একে অনবরত অধ্যয়ন করি না এবং এর কাছ থেকে সবাক নিত্যসঙ্গীর ন্যায় পদে পদে পথনির্দেশ গ্রহণ করি না। আফসোস্ , আমাদের ওলামায়ে কেরাম এবং ইসলাম চর্চাকারীগণও হাজার হাজার ইসলামী গ্রন্থ অধ্যয়ন বা মানুষের রচিত হাজার হাজার পৃষ্ঠা আয়তনের বহু ফিক্ব্হী গ্রন্থ বা তাফসীর অধ্যয়ন এবং ক্ষেত্রবিশেষে লক্ষ লক্ষ হাদীছ মুখস্ত করা ও সে জন্য গর্ব অনুভব করা সত্ত্বেও সরাসরি পুরো কোরআন মজীদ থেকে পথনির্দেশ গ্রহণ করতে জানেন না , এমনকি অনেকেই তা শুধু মূল ভাষায় পাঠ করে তার তাৎপর্য অনুধাবন করতে সক্ষম নন। অথচ এটি হচ্ছে মানুষের কাছে আল্লাহ্ তা আলার প্রেরিত সর্বশেষ গ্রন্থ এবং মুসলমানদের জন্য নাযিলকৃত একমাত্র গ্রন্থ - যে কারণে তিনি এ গ্রন্থে হে মানবকুল! বলে বার বার সম্বোধন করে এটির মূলমর্ম [তাওহীদ , আখেরাত্ ও নবুওয়াতে মুহাম্মাদী (ছ্বাঃ)-এর সত্যতা] মেনে নেয়ার জন্য সকল মানুষের প্রতি এবং আরো অনেক বেশী বার হে ঈমানদারগণ! বলে সম্বোধন করে এটি থেকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে পথনির্দেশ গ্রহণের জন্য ঈমানদারদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা কোরআন মজীদের সাথে কী আচরণ করছি ? এ কারণেই , আমরা কোরআন মজীদকে সসম্মানে ও সশ্রদ্ধভাবে সর্বোচ্চ ও পরিচ্ছন্ন স্থানে রাখা সত্ত্বেও এবং তেলাওয়াতের আগে-পরে যে কোনো সময় তাতে চুম্বন করে ও তাতে বুকে লাগিয়ে তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা সত্ত্বেও হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) ক্বিয়ামতের দিনে আল্লাহ্ তা আলার কাছে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন ; তিনি বলবেন:

) ي َا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا( .

হে আমার রব! অবশ্যই আমার লোকেরা এই কোরআনকে অপরিচিত-অবজ্ঞাত ও বর্জিত করে রেখেছিলো। (সূরাহ্ আল্-ফুরক্বান্: ৩০)

অবশ্য অত্র গ্রন্থের উদ্দেশ্য কোরআন মজীদ থেকে মুসলমানদেরকে কী কী বিষয়ে পথনির্দেশ নিতে হবে তা উল্লেখ করা নয়। কারণ , আগেই উল্লেখ করেছি যে , ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানব প্রজাতির জীবনে এমন কোনো সমস্যা ও প্রশ্ন নেই ও উদ্ভব হবে না যার সমাধান ও জবাব কোরআন মজীদে নেই। সুতরাং এ ধরনের বিষয়বস্তুর পরিচয় তুলে ধরতে গেলে তা হবে এক বিশাল গ্রন্থ। কিন্তু এরূপ কোনো গ্রন্থ রচিত হলেও তা রচনার পরবর্তী কালে আরো বহু সমস্যা ও প্রশ্নের উদ্ভব হবে এবং সে সব সমস্যা ও প্রশ্নের সমাধান ও জবাবের জন্য সরাসরি কোরআনের কাছেই যেতে হবে ; কোরআনের পরিচয়মূলক এ ধরনের গ্রন্থ কখনোই সরাসরি কোরআন থেকে পথনির্দেশ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থেকে আমাদেরকে বেনিয়ায করবে না।

বরং বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কোরআন মজীদ সম্পর্কে বিদ্যমান কতক ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন - যে সব ভ্রান্ত ধারণার কারণে আমরা কোরআন মজীদকে বর্জিত করে রেখেছি , যদিও পুরো কোরআন মজীদের সাধারণ ও সুগভীর তাৎপর্য সম্পর্কে পাণ্ডিত্য অর্জন না করলেও অন্ততঃ এর বাহ্যিক সাধারণ তাৎপর্য সরাসরি এ গ্রন্থ থেকে জেনে নেয়া প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরয। কারণ , এ গ্রন্থে প্রতিটি মুসলমানকেই সম্বোধন করা হয়েছে।

এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে , বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি মূলতঃ একটি পর্যালোচনামূলক গ্রন্থ - যাতে কেবল সর্বজনজ্ঞাত ও মশহূর তথ্যগুলো উল্লেখ করে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এ কারণে , সূত্রভারাক্রান্ততা এড়ানো ও আয়তনকে সীমিত রাখার লক্ষ্যে কোরআন মজীদের সূরাহ্ ও আয়াত নম্বর ছাড়া ঐতিহাসিক তথ্যসমূহের ক্ষেত্রে প্রতিটি স্থানে স্বতন্ত্রভাবে তথ্যসূত্রনির্দেশ করা হয় নি। অবশ্য গ্রন্থের শেষে সাধারণভাবে সহায়ক সূত্রসমূহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মূল গ্রন্থে যে সব ব্যাখ্যামূলক পাদটীকা রয়েছে ইউনিকোডে রূপান্তরের পর সেগুলোকে মূল পাঠের ভিতরে সমন্বিত বা তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

অত্র গ্রন্থের প্রাথমিক পাণ্ডুলিপি খৃস্টীয় বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে তৈরী করা হয়েছিলো এবং পরে তা কম্পিউটার-কম্পোজও করা হয়েছিলো। একটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তা ২০০৪ খৃস্টাব্দের মার্চ মাসে প্রকাশের কথা ছিলো। কিন্তু প্রধানতঃ আর্থিক সমস্যার কারণে উক্ত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা প্রকাশ করা সম্ভব হয় নি। এর কয়েক বছর পর সংশ্লিষ্ট কম্পিউটারটির হার্ড ডিস্ক্ ক্র্যাশ্ হয়ে যাওয়ায় গ্রন্থটির কম্পোজ পুরোপুরি বিনষ্ট হয়ে যায়। সৌভাগ্যক্রমে এর সর্বশেষ প্রুফ্ কপিটি রক্ষা পেয়েছিলো।

যেহেতু এ ধরনের গ্রন্থের জন্য প্রকাশক পাওয়া দুরূহ ব্যাপার এবং স্বয়ং গ্রন্থকারেরও তা প্রকাশ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য হয়ে উঠে নি , সেহেতু এটি এতো বছর যাবত এভাবেই ছিলো। অবশেষে , প্রধানতঃ অনলাইনের পাঠক-পাঠিকাদের জন্যে পরিবেশনের লক্ষ্যে এটি নতুন করে কম্পোজে হাত দেই। কারণ , অন্ততঃ একজন পাঠক বা পাঠিকাও যদি এর বক্তব্য অধ্যয়ন করেন ও তা থেকে কোরআন মজীদের সঠিক পরিচয় লাভ করেন তাহলেও আমার শ্রম-সাধনা সার্থক হবে বলে মনে করি। অবশ্য নতুন করে কম্পোজ করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই পুরো গ্রন্থের বিভিন্ন অংশে কিছুটা সংযোজন করা হয়েছে।

এ উপলক্ষ্যে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি যে , অত্র গ্রন্থকারের প্রণীত কোরআনের মু জিযাহ্ শিরোনামের একটি গ্রন্থ প্রাথমিক কম্পোজকৃত অবস্থায় রয়েছে - যার আয়তন আনুমানিক অত্র গ্রন্থের প্রায় দ্বিগুণ হবে ; আল্লাহ্ তা আলা তাওফীক্ব্ দিলে ভবিষ্যতে তা-ও পাঠক-পাঠিকাদের সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করবো।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। তা হচ্ছে , স্বাভাবিকভাবেই অত্র গ্রন্থে কোরআন মজীদের বেশ কিছু আয়াত উদ্ধৃত হয়েছে এবং এ সব আয়াতের মধ্যে এমন আয়াতও রয়েছে যাতে আল্লাহ্ তা আলা নিজের জন্য উত্তম পুরুষে বহুবচন অর্থাৎ আমরা শব্দ ব্যবহার করেছেন। তৎকালীন আরবী বাকরীতিতে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালীদের মুখে নিজের জন্য এক বচন অর্থেই আমরা ব্যবহারের প্রচলন ছিলো , এ কারণে তৎকালীন আরবের মোশরেকরা কোরআন মজীদে আল্লাহ্ তা আলা নিজের জন্য আমরা ব্যবহার করায় এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে নি তথা একে বহু ঈশ্বরবাদের সপক্ষে প্রমাণ বলে দাবী করে নি। কিন্তু যদিও বাংলা সহ আরো অনেক ভাষায় সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বা বিনয় প্রকাশের জন্য এর প্রচলন রয়েছে তথাপি বাংলা বাকরীতিতে অনেক ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিনয়স্বরূপ আমরা এবং কর্তৃত্বভাব প্রকাশের জন্য আমি ব্যবহারেরও প্রচলন আছে। এ কারণে বাংলা ভাষায় আল্লাহ্ তা আলার জন্য আমরা ব্যবহার বেখাপ্পা শুনায় বিধায় আমরা এক বচনে এর অনুবাদ করেছি। অত্র গ্রন্থে এ ধরনের সকল আয়াতের ক্ষেত্রেই আমরা এ রীতি অনুসরণ করেছি।

আরেকটি কথা উল্লেখ করতে চাই এই যে , অমার অন্যান্য গ্রন্থ ও লেখার ন্যায় অত্র গ্রন্থেও যে সব আরবী-ফার্সী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে সে সবের বেলায় বাংলাভাষী পাঠক-পাঠিকাদের বোধগম্যতা ব্যাহতকরণ ব্যতীতই মূল আরবী-ফার্সী উচ্চারণ প্রতিফলিত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। এ ব্যাপারে আমি পুনরায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই যে , যারা বা যে সব প্রতিষ্ঠান সচেতনভাবেই হোক বা অসচেতনতার কারণেই হোক বাংলা ভাষায় আরবী-ফার্সী শব্দের বানানে হস্তক্ষেপ করে এ সব শব্দকে মূল বানান ও উচ্চারণ থেকে অধিকতর দূরে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন আমি তাঁদের সে মত ও প্রচেষ্টার বিরোধী , বরং নীতিগতভাবে , ভাষার ওপর প্রতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপের বিরোধী। এর বিপরীতে আমি মনে করি , ভাষাকে খরস্রোতা নদীর ন্যায় প্রাকৃতিকভাবে মুক্ত-স্বাধীন থেকে স্বীয় গতিপথ বেছে নিয়ে চলতে দেয়া উচিত।

ভূমিকার সমাপ্তি পর্যায়ে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। তা হচ্ছে , আমার কনিষ্ঠ পুত্র ও কনিষ্ঠা কন্যা অত্র গ্রন্থের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পরিমাণ কম্পোজ করে দিয়েছে। নচেৎ এ গ্রন্থের পুনঃকম্পোজের কাজ এতো তাড়াতাড়ি সমাপ্ত করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। আমি এ জন্য তাদের কাছে শুকরিয়া জানাচ্ছি এবং আল্লাহ্ তা আলার কাছে তাদের এ খেদমতের জন্য শুভ প্রতিদান প্রদানের আবেদন জানাচ্ছি।

আল্লাহ্ তা আলা অত্র গ্রন্থকে এর পাঠক-পাঠিকাদের জন্য মহাগ্রন্থ কোরআন মজীদের সঠিক পরিচয় জানার ক্ষেত্রে সহায়ক করে দিন , কোরআন মজীদ সম্পর্কে আমাদের মন-মস্তিষ্কে বিরাজমান ভ্রান্ত ধারণাসমূহের পর্দাগুলো অপসারিত করে দিন এবং পুরো কোরআন মজীদের তাৎপর্য সরাসরি ও সঠিকভাবে জানার জন্য আমাদেরকে আগ্রহী করে দিন ও তাওফীক্ব্ দান করুন। ফলতঃ অত্র গ্রন্থকে এর লেখক এবং প্রচার-প্রসারে সহায়তাকারী ও পাঠক-পাঠিকাদের জন্য ইহকালে হেদায়াতের সহায়ক ও পরকালে মুক্তির পাথেয় করে দিন। আমীন।

নূর হোসেন মজিদী

কোরআনের পরিচয়

اعوذ بالله من الشيطان الرجيم

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

) إ ِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ(

নিঃসন্দেহে এ কোরআন সেদিকেই পথপ্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সুপ্রতিষ্ঠিত। (সূরাহ্ আল্-ইসরা / বানী ইসরাঈল্: ৯)

কোরআন মজীদ আল্লাহ্ তা আলার কিতাব - এটাই তো কোরআনের পরিচয়। তবে এ হচ্ছে কোরআন মজীদের সংক্ষিপ্ততম সাধারণ পরিচয়। আর এর বিশেষ পরিচয় হচ্ছে কোরআন মজীদের পরিপূর্ণ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও এর বিষয়বস্তু তথা এতে নিহিত জ্ঞানের পরিধি সম্বন্ধে বিস্তারিত ধারণা। কিন্তু এর সংক্ষিপ্ততম সাধারণ পরিচয় অর্থাৎ কোরআন মজীদ যে আল্লাহ্ তা আলার কিতাব - এ পরিচয় কেবল মুসলমানদের নিকটই গ্রহণযোগ্য ; অমুসলমানরা এটা মানে না , আর এটাই স্বাভাবিক।

অমুসলমানদের মধ্যকার অনেক জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত-গবেষক কোরআন মজীদের সীমাহীন জ্ঞানভাণ্ডার হবার কথা স্বীকার করেছেন , কিন্তু এটি যে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ গ্রন্থ সে কথা স্বীকার করেন নি। তাঁরা রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) কে মানবজাতির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন , তাঁর উত্তম নৈতিক চরিত্র , আচার-আচরণ ও গুণাবলী , যোগ্যতা , সাফল্য ও অগাধ জ্ঞানের কথা স্বীকার করেছেন , কিন্তু আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ হতে মনোনীত নবী হিসেবে তাঁকে স্বীকার করেন নি। তাঁরা তাঁকে মানবজাতির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম প্রতিভা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং কোরআন মজীদকে তাঁর রচিত গ্রন্থ হিসেবে অভিহিত করে এ গ্রন্থকেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। এভাবে তাঁদের সমস্ত প্রশংসা লোকদেরকে সে উদ্দেশ্যের বিপরীত দিকে নিয়ে যাওয়ার কাজে সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে যে উদ্দেশ্যে তাঁকে নবী হিসেবে পাঠানো হয়েছিলো এবং কোরআন মজীদ নাযিল হয়েছিলো। অথচ কী দুর্ভাগ্য যে , মুসলমানদের অন্ততঃ একটি শিক্ষিত অংশকে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) ও কোরআন মজীদকে প্রদত্ত ঐ সব অমুসলিম জ্ঞানী-গুণীর সার্টিফিকেট্ সোৎসাহে প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় , যে উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের জন্য হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) কে নবী হিসেবে পাঠানো হয় এবং কোরআন মজীদ নাযিল হয় সে উদ্দেশ্য-লক্ষ্য হাছ্বিলের জন্য কোরআন মজীদ যে আল্লাহর কিতাব এবং হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) এ কিতাব যে অবস্থায় রেখে গিয়েছেন ঠিক সে অবস্থায়ই যে কোনো ধরনের হ্রাস-বৃদ্ধি ও পরিবর্তন তথা বিকৃতি থেকে সংরক্ষিতভাবে বিদ্যমান আছে তা প্রমাণ করা অপরিহার্য। আর এটা প্রমাণ করা মানে কোরআনের বিকৃতিহীনতা প্রশ্নে মুসলমানদের জন্মসূত্রে প্রাপ্ত অন্ধ বিশ্বাস নয়। বরং এ জন্য সর্বজনগ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা যারূরী ; এমন প্রমাণ চাই কোরআন মজীদের আল্লাহর কিতাব হওয়ার দাবী প্রত্যাখ্যানকারীদের পক্ষে যা খণ্ডন করা সম্ভব হবে না , তেমনি মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত যে সব ভ্রান্ত ধারণা কোরআনের অবিকৃত থাকার সত্যতাকে দুর্বল করে ফেলে এবং কোরআন-বিরোধীদের দ্বারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেগুলোরও অবসান ঘটাবে। আর কেবল তখনই কোরআনের সঠিক পরিচয় জানা সম্ভব হবে।

সুতরাং প্রথমে এ বিষয়টি সমগ্র মানবজাতির কাছে সমভাবে গ্রহণযোগ্য বিচারবুদ্ধিজাত ( আক্ব্লী) দলীল দ্বারা প্রমাণ করতে হবে এবং এর পরে কোরআন মজীদের পরিচিতির অন্যান্য দিকের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে।

আক্বলী দলীলের প্রয়োজনীয়তা

কেউ কেউ হয়তো মনে করতে পারেন যে , অমুসলিমরা কোরআন মজীদ সম্বন্ধে কী ভাবছে তাতে আমাদের কিছুই আসে-যায় না ; আমরা কোরআন মজীদকে আল্লাহর কিতাব বলে জানি - এটাই যথেষ্ট। এমনকি অনেক মুসলমান তো যুক্তিতর্কের আশ্রয়গ্রহণ তথা বিচারবুদ্ধির প্রয়োগকে দস্তুর মতো ভয় পান। তাঁরা মনে করেন যে , বিচারবুদ্ধির দ্বারস্থ হলে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তিনটি কারণে তাঁদের এ মত গ্রহণযোগ্য নয়:

প্রথমতঃ অন্ধ বিশ্বাসের নাম ঈমান নয় , বরং দ্বীনের মৌলিকতম উপস্থাপনাগুলো (উছূলে দ্বীন্) সম্বন্ধে বিচারবুদ্ধির ফয়সালায় উপনীত হওয়ার এবং তা স্বীকার করার নামই ঈমান। অবশ্য এ হচ্ছে ঈমানের সূচনাবিন্দু , নচেৎ এ ঈমানের মৌলিক দাবী পূরণ তথা মৌলিক আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং পরিকল্পিতভাবে ও ঔদ্ধত্যের সাথে তা লঙ্ঘন না করা ঈমানের অপরিহার্য দিক। অর্থাৎ ন্যূনতম শর্তাবলী সহকারে তাওহীদ , আখেরাত্ ও নবুওয়াতে মুহাম্মাদী (ছ্বাঃ) কে অন্তরে সত্য জানা , মুখে প্রকাশ ও তদনুযায়ী চলার নামই ঈমান। [এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখানে আমাদের উদ্দেশ্য নয় এবং অত্র গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়ের জন্য তা অপরিহার্যও নয়।]

অন্যান্য ধর্ম অন্ধ বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত , তাই বিচারবুদ্ধির মোকাবিলা করতে তাদের বড় ভয়। ইসলাম এ ধরনের অন্ধত্বের তথা দ্বীনের ক্ষেত্রে বাপ-দাদাদের অনুসরণে কতক ধারণার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস পোষণ ও পূর্ববর্তী ধর্মনেতাদের অন্ধ অনুসরণের কঠোর সমালোচনা করেছে। যারা বিচারবুদ্ধির বিপরীতে অন্ধ বিশ্বাসের অনুসরণ করে কোরআন মজীদ বার বার তাদেরকে তিরস্কার করেছে। বার বার এরশাদ হয়েছে:افلا تعقلون؟ - অতঃপর তোমরা কি বিচারবুদ্ধি কাজে লাগাবে না ?

শুধু তা-ই নয় , যারা বিচারবুদ্ধি কাজে লাগায় না কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে তারা মানুষ পদবাচ্য নয়। আল্লাহ্ তা আলা তাদের সম্পর্কে এরশাদ করেন:

নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জন্তু হচ্ছে সেই মূক-বধির গোষ্ঠী - যারা বিচারবুদ্ধিকে কাজে লাগায় না। (সূরাহ্ আল্-আনফাল্: 22)

অতএব , বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের বিরোধিতা করা মানে এ সব আয়াতের বিরোধিতা করা।

দ্বিতীয়তঃ বিচারবুদ্ধির কাছে আবেদন জানানো না হলে কেউই ইসলাম গ্রহণ করতো না ; সবাই নিজ নিজ ধর্মের অন্ধ বিশ্বাসের ওপর টিকে থাকতো , রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর আহবানে সাড়া দিতো না। ফলে আমরা যে এখন জন্মসূত্রে মুসলমান , সে সৌভাগ্য আমাদের হতো না। অমুসলমানরা কোরআন মজীদ সম্বন্ধে ভুল ধারণা নিয়ে বসে থাকবে , অথচ আমরা তা খণ্ডন করবো না - এমন অভিমত স্বয়ং কোরআন মজীদের উদ্দেশ্যেরই পরিপন্থী। তাই মুসলমানদের জন্য অমুসলিমদের কাছে কোরআন মজীদের পরিচয় সহ ইসলামের উছূলে দ্বীনকে বিচারবুদ্ধির আলোকে পেশ করা অপরিহার্য কর্তব্য ; এভাবেই আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাহদের সামনে তাঁর হুজ্জাত্ পূর্ণ করে দিতে হবে।

উল্লেখ্য , হুজ্জাত্ পূর্ণ করা (اتمام حجة ) মানে কোনো প্রতিপাদ্য বিষয়কে প্রয়োজনীয় যুক্তি-প্রমাণ সহকারে এমনভাবে তুলে ধরা যে , তা যেন তার পাঠক বা দর্শক-শ্রোতার কাছে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় এবং ঐ বিষয়ে তার অন্তরে কোনোই সন্দেহ অবশিষ্ট থাকার অবকাশ না থাকে , তা সে প্রকাশ্যে এর সত্যতা স্বীকার করুক বা না-ই করুক।

) ف َمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ(

অতঃপর যার ইচ্ছা ঈমান আনয়ন করুক , আর যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করুক। (সূরাহ্ আল্ - কাহ্ফ্ : 29 )

আর বলা বাহুল্য যে , তা করতে হলে স্বয়ং মুসলমানদেরকে তা বিচারবুদ্ধির আলোকে জানতে হবে।

তৃতীয়তঃ বর্তমানে সারা বিশ্বে , বিশেষ করে বাংলাদেশে পাশ্চাত্যের ক্রুসেডারদের অর্থনৈতিক সাহায্যপুষ্ট ও সেখানকার সরকারগুলোর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত খৃস্টান মিশনারীরা ও ইসলাম-বিরোধী বহু এনজিও ইসলামের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আক্রমণাভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের উছূলে দ্বীন সম্বন্ধে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তারা কোরআন মজীদকে তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তাই মুসলমানদেরকে ঈমান রক্ষা করতে হলে ইসলামের উছূলে দ্বীনকে বিচারবুদ্ধির আলোকে নতুন করে জানতে হবে এবং মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের সামনে নতুন করে পেশ করতে হবে। বিশেষ করে কোরআন মজীদ যে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত সর্বশেষ , পূর্ণাঙ্গ ও সুরক্ষাপ্রাপ্ত একমাত্র গ্রন্থ তা বিচারবুদ্ধির দলীল দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণ করা অপরিহার্য।

কোরআন মজীদ: একমাত্র অবিকৃত ঐশী কিতাব

আসমানী কিতাবকে কেন্দ্র করে যে সব ধর্ম প্রবর্তিত হয়েছে সে সব ধর্মের অনুসারীরা নবুওয়াত্ ও আসমানী কিতাবের ধারণায় বিশ্বাসী। ইয়াহূদী ধর্ম , খৃস্ট ধর্ম ও যরথুস্ত্রী ধর্ম এ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত - ইসলাম যাদেরকে আহলে কিতাব অর্থাৎ আসমানী কিতাবধারী বলে উল্লেখ করেছে। এমনকি হিন্দু ধর্মের মতো পৌত্তলিক ধর্মও অবতারবাদে বিশ্বাস করে - যা সম্ভবতঃ নবুওয়াতের ধারণারই বিকৃত রূপ। হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থ গীতা-কে শ্রীকৃষ্ণের - তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী যিনি তিন শীর্ষদেবতার অন্যতম বিষ্ণুর মানবীয় রূপ - বাণী বলে বিশ্বাস করে। অন্য কথায় , গীতা হিন্দুদের নিকট ঐশী গ্রন্থ স্বরূপ।

[এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , গীতা যার বাণী সেই শ্রীকৃষ্ণ ও গোপ জাতির উপাখ্যানের শ্রীকৃষ্ণ যে অভিন্ন ব্যক্তি নয় এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই ; দীর্ঘ কালের প্রবাহে উভয়কে অভিন্ন গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু গীতা-র শ্রীকৃষ্ণের অস্তিত্ব ও জীবনেতিহাস অকাট্য ঐতিহাসিক সূত্রে ও প্রত্যয় সৃষ্টিকারীরূপে প্রমাণ করা সম্ভব না হলেও গীতা যার বাণী তিনি যে অত্যন্ত উঁচু স্তরের বাগ্মী ও ধর্মজ্ঞানী ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। তবে গীতায় বিকৃতি প্রবেশ ও গীতা-র বক্তা শ্রীকৃষ্ণের জীবনেতিহাস হারিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি নবী ছিলেন কিনা তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব না হলেও উপাখ্যানের শ্রীকৃষ্ণের সাথে তাঁকে অভিন্ন গণ্য করে তাঁর প্রতি কটাক্ষ করা কোনো মুসলমানের জন্য ঠিক হবে না। বরং সতর্কতার নীতি অনুযায়ী তাঁর সম্পর্কে নীরব থাকা বাঞ্ছনীয়।]

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও তাদের ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটক-কে গৌতম বুদ্ধের উপদেশবাণী বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু ঐশী কিতাব হবার দাবীদার গ্রন্থাবলীর মধ্যে একমাত্র কোরআন মজীদ ছাড়া অন্য কোনো গ্রন্থকেই আজ ঐশী কিতাব হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কারণ:

(1) যে সব ব্যক্তির নামের সাথে এ সব গ্রন্থকে সম্পৃক্ত করা হয় ঐ সব নামে আদৌ কেউ ছিলেন কিনা তা ঐতিহাসিক সূত্র থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কারণ , কোনো ঐতিহাসিক পরম্পরাই প্রত্যয় (يقين ) সৃষ্টিকারীরূপে কথিত সময় ও ব্যক্তিদের পর্যন্ত পৌঁছে না।

(2) যদি যুক্তির খাতিরে ধরে নেয়া হয় যে , এ নামের ব্যক্তিগণের অস্তিত্ব ছিলো তথাপি তাঁরা যে নবী বা তথাকথিত অবতার বা ঐশী প্রেরণার অধিকারী মহাপুরুষ ছিলেন তা প্রত্যয় সৃষ্টিকারীরূপে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কারণ , তাঁদের জীবনকাহিনী , আচার-আচরণ ও অলৌকিক কাজকর্ম (মু জিযাহ্) ঐতিহাসিক সূত্রে ও প্রত্যয়সৃষ্টিকারী পরম্পরায় আমাদের কাছে পৌঁছে নি।

বিশেষ করে মু জিযাহ্ বা অলৌকিক কর্মের বৈশিষ্ট্যই এমন যা কেবল প্রত্যক্ষকারীদের জন্যই পূর্ণ মাত্রায় প্রত্যয়সৃষ্টিকারী হয়ে থাকে। এমনকি কথিত কোনো মু জিযাহ্ বা অলৌকিক কাজ প্রত্যক্ষকারী নয় এমন সমকালীন লোকদের জন্যও তা প্রত্যক্ষকারীদের কাছ থেকে শোনার পরেও প্রত্যক্ষকারীদের প্রত্যয়ের অনুরূপ প্রত্যয় সৃষ্টি হতে পারে না। কারণ , এরূপ বর্ণনার ওপর প্রত্যয়ের বিষয়টি তা প্রত্যক্ষ করার দাবীদারদের নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে শ্রোতাদের প্রত্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। এমতাবস্থায় মুতাওয়াতির্ বা প্রতি স্তরে ব্যাপকভিত্তিক অবিচ্ছিন্ন পরম্পরায় বর্ণনার অকাট্য দলীল-প্রমাণ ছাড়া এরূপ দাবী পরবর্তীকালীন লোকদের জন্য প্রত্যয় সৃষ্টি করতে পারে না। এমনকি মুতাওয়াতির্ বর্ণনা থেকে তা পাঠকারী বা শ্রবণকারীদের মধ্যে প্রত্যয় সৃষ্টি হলেও তা প্রত্যক্ষকারীদের প্রত্যয়ের সমমাত্রায় হয় না এবং অনেকের মধ্যে আদৌ প্রত্যয় সৃষ্টি না-ও হতে পারে।

(3) যদি যুক্তির খাতিরে ধরে নেয়া হয় যে , কথিত ব্যক্তিবর্গের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ছিলো এবং তাঁরা নবী , ঐশী প্রেরণার অধিকারী মহাপুরুষ বা তথাকথিত অবতার ছিলেন তথাপি এটা প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে , ঐ সব গ্রন্থ আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছিলো। কারণ , ঐ সব গ্রন্থে এমন সব বক্তব্য রয়েছে যা থেকে প্রমাণিত হয় যে , ঐ সব গ্রন্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয় নি ; অন্ততঃ যেভাবে ঐ সব গ্রন্থ বিদ্যমান সেভাবে নাযিল হয় নি। এ সব গ্রন্থ পাঠ করলেই সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে , এগুলো সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে আগত নয় , বরং মানুষের রচিত গ্রন্থ। শুধু তা-ই নয় , এ সব গ্রন্থ যাদের ওপর নাযিল হয়েছিলো বলে অনেকে মনে করেন , এগুলো তাঁদের নিজেদের রচিতও নয়। বরং এ সব গ্রন্থের বাচনভঙ্গি প্রমাণ করে যে , এগুলো ইতিহাস ও জীবনী গ্রন্থ রূপে পরবর্তীকালে রচিত।

বাইবেলের পুরাতন নিয়ম অংশের প্রথম পাঁচ পুস্তককে তাওরাত্ বলে দাবী করা হয়। কিন্তু এর প্রথম দুই পুস্তক - আদি পুস্তক/ সৃষ্টি পুস্তক যাত্রা পুস্তক - পুরোপুরি ইতিহাসগ্রন্থ ; বিশেষতঃ যাত্রা পুস্তক হযরত মূসা ( আঃ)-এর জীবনী বিষয়ক পুস্তক।

বাইবেলের নতুন নিয়ম অংশের প্রথম চার পুস্তককে ইনজীল্ বলে দাবী করা হয়। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তা চারজন ভিন্ন ভিন্ন লেখকের লেখা হযরত ঈসা ( আঃ)-এর জীবনকাহিনী মাত্র। মথি পুস্তকের প্রথম অধ্যায়ে হযরত ঈসা ( আঃ)-এর বংশের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ বংশবর্ণনাটি আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে হযরত ঈসা ( আঃ)-এর নিকট ওয়াহীরূপে নাযিল হয়েছিলো বলে কি কোনো বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব ? নাকি স্বয়ং খৃস্টানরা এরূপ বিশ্বাস করে ? তেমনি গীতায় শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ শুরু হবার পূর্বে যুদ্ধক্ষেত্রে দুই পক্ষের সৈন্যসমাবেশের যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাকে কি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের বাণী বলে মেনে নেয়া চলে ? নাকি স্বয়ং হিন্দুরাও এরূপ বিশ্বাস করে ?

(4) ঐ সব গ্রন্থের কোনোটিই মূল ভাষায় বর্তমান নেই এবং ক্ষেত্রবিশেষে , মূল ভাষার গ্রন্থ পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার কারণে অন্য ভাষার অনুবাদ থেকে মূল ভাষায় পুনরায় অনূদিত হয়েছে।

এ সব গ্রন্থে সংঘটিত বিকৃতি (অর্থাৎ সংশোধন , সংযোজন , পরিবর্তন ও অংশবিশেষ হারিয়ে যাওয়া) একটি অকাট্য সত্য - যা সংশ্লিষ্ট ধর্মের অনুসারী পণ্ডিতগণও স্বীকার করেন। এ কারণে এ ধরনের প্রতিটি গ্রন্থেরই বিভিন্ন সংস্করণ আছে এবং এ সব সংস্করণের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য ও পরস্পরবিরোধিতা বিদ্যমান। ইয়াহূদী ও খৃস্টানদের পুরাতন নিয়ম আলাদা এবং খৃস্টানদের বাইবেল্ (পুরাতন নিয়ম ও নতুন নিয়ম)-এর বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে , যেমন: রোম্যান ক্যাথলিক বাইবেল্ , এ্যাপোক্রাইফা বাইবেল্ , অর্থোডক্স্ বাইবেল্ ইত্যাদি।

নতুন নিয়ম্ -এর শুরুতে যে চারটি পুস্তক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে - যেগুলোকে ইনজীল্ (সুসমাচার) নামে অভিহিত করা হয় খৃস্টান্ পণ্ডিত ও ধর্মনেতাগণ বলছেন না যে , এগুলোর মধ্য থেকে কোনটি প্রকৃত ইনজীল্ ? নাকি এগুলোর মধ্য থেকে একটিও সঠিক নয় ? কারণ , একাধিক তো সঠিক হতে পারে না। যদি একটি পুস্তক সঠিক হয়ে থাকে তো বাকী তিনটিকে নতুন নিয়ম্ ভুক্ত করার কারণ কী ?

কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো , ইনজীলের সংস্করণ মাত্র চারটিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর সংস্করণসংখ্যা (মুদ্রণসংখ্যা নয়) অনেক বেশী। ইনজীলের 77টি সংস্করণের কথা লন্ডন্ থেকে 1813 খৃস্টাব্দে মুদ্রিত এক্সিহোমো গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এন্সাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা র ত্রয়োদশ মুদ্রণের 2য় খণ্ডের 179-180 পৃষ্ঠায় 25টি ইনজীলের (ইনজীলের 25টি সংস্করণের) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ তালিকার 6নং নামটি হচ্ছে বারনাবার ইনজীল্ ( Gospel of Barnabas) হযরত ঈসা ( আঃ)-এর নির্দেশে তাঁর প্রত্যক্ষ শিষ্য বারনাবা কর্তৃক সংকলিত এ ইনজীলকে মোটামুটি ছ্বহীহ্ বলা চলে। কিন্তু এতে হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর মুহাম্মাদ্ আহমাদ্ নাম , আল্লাহ্ তা আলা কর্তৃক কেবল তাঁকে সৃষ্টির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হিসেবে এ বিশ্বজগতকে সৃষ্টি করা এবং তাঁর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী , তাঁর পরিচয় ও মর্যাদা উল্লেখ থাকায় খৃস্ট জগতে এ ইনজীল্ নিষিদ্ধ রয়েছে। (অবশ্য খৃস্টান ধর্মগুরুদের আরোপিত এ নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে খৃস্টীয় বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এটি ইংরেজী ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয় এবং তার ভিত্তিতে বিশ্বের আরো বহু ভাষায় এটি অনূদিত হয়।)

কোরআন মজীদ ব্যতীত ঐশী গ্রন্থ হিসেবে পরিচয়কৃত অন্যান্য গ্রন্থের প্রতটিরই যে কেবল বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে তা নয় , বরং ঐ সব গ্রন্থে এমন সব বক্তব্য রয়েছে যে কারণে ঐ সব গ্রন্থকে আদৌ ঐশী কিতাব বলা চলে না। বিশেষ করে বাইবেলের বিভিন্ন পুস্তকে আল্লাহ্ তা আলা ও নবী-রাসূলগণ ( আঃ) সম্পর্কে এমন সব জঘন্য অপবাদ দেয়া হয়েছে যা মুখে উচ্চারণ করা যায় না। এ গ্রন্থের বিভিন্ন পুস্তকে নবী-রাসূলগণের ( আঃ) প্রতি মদপান , ব্যাভিচার , গণহত্যার নির্দেশ দান ইত্যাদি অপবাদ আরোপ করা হয়েছে। এ সব কথাকে যদি সত্য ও আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বলে মানতে হয় তাহলে যাদের নামে ঐ সব পুস্তককে পরিচিত করা হয়েছে তাঁদেরকে নবী-রাসূল্ ( আঃ) বলে গণ্য করা আদৌ সম্ভব নয়। অন্যদিকে তাঁদেরকে নবী-রাসূল্ ( আঃ) বলে গণ্য করলে ঐ সব তথ্য যে মিথ্যা ও ঐশী গ্রন্থে অনুপ্রবিষ্ট তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

বাইবেল্ নামে পরিচিত সকল গ্রন্থেই এ ধরনের বিকৃতি কম-বেশী ঘটেছে। হিন্দু ধর্মের সর্বপ্রধান গ্রন্থ গীতা য়ও প্রক্ষিপ্ত বা অনুপ্রবিষ্ট বক্তব্য রয়েছে বলে নিষ্ঠাবান হিন্দু ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্বীকার করেছেন। অবশ্য তিনি না বললেও যে কেউ এ গ্রন্থটি পাঠ করলেই বুঝতে পারবেন যে , এটি আদিতে যদি ঐশী বাণী থেকেও থাকে তথাপি এতে মানবরচিত বহু কথা অনুপ্রবেশ করেছে।

পূর্ববর্তী নবীদের ( আঃ) পক্ষে কোরআনের সাক্ষ্যের যুক্তি গ্রহণযোগ্য কি ?

বিশেষতঃ ইয়াহূদী ও খৃস্টান্ পণ্ডিতগণ হযরত মুহাম্মাদ্ (ছ্বাঃ)-এর পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের ( আঃ)- যাদেরকে তাঁরা নবী বলে মানেন - নবুওয়াত্ , তাঁদের মু জিযাহ্ ও তাঁদের নামে প্রচলিত গ্রন্থাবলীর ঐশী গ্রন্থ হবার সত্যতার সপক্ষে কোরআন মজীদের সাক্ষ্য ও মুসলমানদের ঈমানের যুক্তি উপস্থাপন করে থাকেন।

এ পণ্ডিতগণ বলেন: তোমরাই তো তাঁদেরকে নবী বলে স্বীকার করছো এবং এ-ও স্বীকার করছো যে , তাঁদের ওপর তাওরাত্ , ইনজীল্ , যাবূর্ ইত্যাদি ঐশী কিতাব নাযিল্ হয়েছিলো ; আমরা-ও তা-ই স্বীকার করি। অতএব , তাঁদের নবী হওয়া ও তাওরাত্-ইনজীলের ঐশী কিতাব হওয়ার ব্যাপারে বিতর্ক নেই। কিন্তু আমরা মুহাম্মাদকে নবী ও কোরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে মনে করি না। অতএব , আমরা যাদেরকে নবী মানি তাঁদের নবী হওয়ার বিষয়টি এবং আমরা যে সব কিতাবকে ঐশী কিতাব হিসেবে মানি সে সব কিতাবের ঐশী কিতাব হওয়ার বিষয়টি সর্বসম্মত ও সন্দেহাতীত , কিন্তু মুহাম্মাদের নবী হওয়া ও কোরআনের ঐশী কিতাব হওয়ার বিষয়টি সর্বসম্মত ও সন্দেহাতীত নয়।

তাঁদের এ বিভ্রান্তিকর ( fallacious)কূট যুক্তিতে অনেক সরলমনা ও দ্বীনী জ্ঞানে দক্ষতাহীন মুসলমান বিভ্রান্ত হয়।

ঐ সব ইয়াহূদী ও খৃস্টান্ পণ্ডিত আরো বলেন: কোরআনে হযরত মূসা ( আঃ)কে কালীমুল্লাহ্ (আল্লাহর সাথে কথোপকথনকারী) এবং হযরত ঈসা ( আঃ)কে কালিমাতুল্লাহ্ (কালিমাতুম্ মিনহু - আল্লাহ্ তা আলার বাণী বা তাঁর বাণীর জীবন্ত মূর্ত প্রতীক) বলে উল্লেখ করা হয়েছে , কিন্তু মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)কে এরূপ মর্যাদা দেয়া হয় নি। অতএব , তিনি যদি নবী হয়েও থাকেন তো হযরত মূসা ( আঃ) ও হযরত ঈসা ( আঃ)-এর মর্যাদা তাঁর ওপরে। তাই হযরত মূসা ( আঃ) ও হযরত ঈসা ( আঃ)-এর ধর্মেরই অনুসরণ করা উচিত , হযরত মুহাম্মাদের (ছ্বাঃ) ধর্মের নয়।

তাঁদের এ ধরনের যুক্তি হচ্ছে এক ধরনের অপযুক্তি - যুক্তিবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে ভ্রমাত্মক অপযুক্তি (مغالطة - fallacy) বলা হয়। কারণ , মুসলমানরা যে অতীতের নবী-রাসূলগণকে ( আঃ) নবী-রাসূল বলে গণ্য করে এবং তাঁদের ওপর তাওরাত্ , যাবূর্ , ইনজীল্ প্রভৃতি ঐশী গ্রন্থ নাযিল্ হয়েছিলো বলে স্বীকার করে , আর তাঁদের মু জিযাহ্ সমূহকে স্বীকার করে থাকে - তা ইয়াহূদী ও খৃস্টানদের দাবী , ঐ সব নামে প্রচলিত গ্রন্থাবলীর বক্তব্য অথবা ঐ সব নামের ব্যক্তি ও গ্রন্থের ঐতিহাসিকভাবে প্রত্যয়সৃষ্টিকারী প্রামাণ্যতার কারণে নয়। বরং হযরত মুহাম্মাদ্ (ছ্বাঃ)কে নবী ও কোরআন মজীদকে আল্লাহর কিতাব বলে মানে বিধায় এবং কোরআন মজীদে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের ( আঃ) ও তাঁদের ওপর নাযিলকৃত ঐশী কিতাব সমূহের কথা উল্লেখ থাকার কারণেই মুসলমানরা তাঁদেরকে নবী-রাসূল্ ( আঃ) বলে মনে করে এবং তাঁরা মু জিযাহ্ ও উল্লিখিত নামের বিভিন্ন ঐশী কিতাবের অধিকারী ছিলেন বলে প্রত্যয় পোষণ করে থাকে।

এখন হযরত মুহাম্মাদ্ (ছ্বাঃ) যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত নবী না হয়ে থাকেন এবং কোরআন মজীদ যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত কিতাব না হয়ে হযরত মুহাম্মাদ্ (ছ্বাঃ)-এর নিজের রচিত গ্রন্থ হয়ে থাকে তাহলে কোরআন মজীদের উক্তির ভিত্তিতে ঐ সব নবী-রাসূলের ( আঃ) ঐতিহাসিক অস্তিত্ব , নবুওয়াত্ , মু জিযাহ্ ও তাঁদের নামে প্রচলিত কিতাব সমূহ ঐশী কিতাব বলে প্রমাণিত হয় না ; এ সব ব্যাপারে কোরআন মজীদের সাক্ষ্য প্রত্যয় সৃষ্টি করতে পারে না। কারণ , হযরত মুহাম্মাদ্ (ছ্বাঃ) যদি নবী না হয়েও নবী হবার মিথ্যা দাবী করে থাকেন এবং নিজের রচিত কিতাবকে আল্লাহর কিতাব বলে দাবী করে থাকেন (না উযু বিল্লাহি মিন্ ক্বাওলি যালিক্) , তাহলে তাঁর ও তাঁর উপস্থাপিত গ্রন্থের দেয়া সাক্ষ্য ও তথ্যের কোনোই গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না।

সুতরাং এটা সুস্পষ্ট যে , কেবল হযরত মুহাম্মাদ্ (ছ্বাঃ)-এর নবুওয়াতের ও কোরআন মজীদের ঐশী গ্রন্থ হবার ওপরে ঈমানই এতে উল্লিখিত নবী-রাসূলগণের ( আঃ) , তাঁদের প্রদর্শিত মু জিযাহ্ ও ঐ সব আসমানী কিতাবের আসমানী কিতাব হওয়া সংক্রান্ত তথ্যের ওপর ঈমান সৃষ্টি করে থাকে। অতএব , কারো অন্তরে যদি কোরআন মজীদের আল্লাহর কিতাব হওয়ার ব্যাপারে প্রত্যয় সৃষ্টি হয় তাহলে তার জন্য কোরআন মজীদের সকল কথাকেই সত্য ও ঐশী প্রত্যাদেশ বলে জানা অপরিহার্য। সুতরাং কোরআন মজীদ আরো যা কিছু বলেছে তার জন্য তার সব কিছুর ওপর ঈমান পোষণ করা অপরিহার্য।

আর কোরআন মজীদ সাক্ষ্য দিয়েছে যে , ঐ সব নবী-রাসূলের ( আঃ) কাছে যে সব আসমানী গ্রন্থ নাযিল হয়েছিলো তাঁদের পরে তাঁদের অনুসারী হবার দাবীদার লোকেরা সে সব গ্রন্থকে বিকৃত করেছে এবং সেগুলোর অংশষবিশেষকে লুকিয়ে ফেলেছে। এছাড়া কোরআন মজীদ হযরত মুহাম্মাদ্ (ছ্বাঃ)কে রাহমাতাল্লিল্ আালামীন্ - সমগ্র জগতবাসীর জন্য দয়া ও অনুগ্রহের মূর্ত রূপ (সূরাহ্ আল্-আম্বিয়া : 107) এবং সমগ্র মানবমণ্ডলীর জন্য রাসূল্ (সূরাহ্ আল্-আ রাফ্: 158) হিসেবে ঘোষণা করে তাঁকে সকল নবী-রাসূলের ( আঃ) ওপর মর্যাদা দিয়েছে। কোরআনের সাক্ষ্যকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করতে হলে এ সব বিষয়েও কোরআনের সাক্ষ্যকে মেনে নিতে হবে।


3

4

5

6

7

8

9

10

11

12

13

14

15

16

17

18