জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম

জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম28%

জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 30 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 8873 / ডাউনলোড: 3232
সাইজ সাইজ সাইজ
জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম

জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

জ্ঞানতত্ত্ব সম্বন্ধে যথেষ্ট জানার আছে এবং লেখক , সাংবাদিক ও জ্ঞানগবেষকদের জন্য এ বিষয়ে বিস্তারিত অধ্যয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। এ পুস্তকে এ বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা দেয়া হয়েছে মাত্র। আশা করি এ পুস্তক পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যে এ বিষয়ে অধিকতর অধ্যয়নের আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। আর তাহলেই অত্র পুস্তকের সফলতা।

জ্ঞানতত্ত্ব ও ইসলাম

নূর হোসেন মজিদী

ভূমিকা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

জ্ঞানতত্ত্ব ( Epistemology -علم المعرفة/ نظرة المعرفة/ شناخت شناسی )হচ্ছে এমন একটি মানবিক বিজ্ঞান যা স্বয়ং জ্ঞান নিয়ে চর্চা করে। অর্থাৎ জ্ঞান বলতে কী বুঝায় , জ্ঞানের বিভিন্ন প্রকরণ , জ্ঞানের উৎসসমূহ , জ্ঞান আহরণের মাধ্যমসমূহ ও তার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই , সঠিক জ্ঞানের পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ ও তা দূরীকরণের পন্থা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে।

প্রশ্ন হচ্ছে , ইসলামের সাথে জ্ঞানতত্ত্বের সম্পর্ক কী ?

ইসলাম হচ্ছে জ্ঞানের ধর্ম ; বরং একমাত্র ইসলামই জ্ঞানের ধর্ম। কোরআন মজীদের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে:اِقراء - পড়ো। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা আলা মানুষের কাছ থেকে সর্বপ্রথম যা দাবী করলেন তা হচ্ছে , মানুষ পড়বে - জ্ঞান অর্জন করবে। কিন্তু এ জ্ঞান হতে হবে নির্ভুল জ্ঞান। কারণ , জ্ঞানে যদি বড় ধরনের ভুল থাকে তাহলে সে জ্ঞান অজ্ঞতা বা অজ্ঞানতার চেয়েও অধিকতর অবাঞ্ছিত এবং সে জ্ঞান কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশী নিয়ে আসে।

বস্তুতঃ ভ্রান্ত ও ত্রুটিপূর্ণ জ্ঞান মানুষকে এমনভাবে বিপথে নিয়ে যেতে পারে যে , তার পক্ষে আর সুপথে ফিরে আসার সুযোগ ও সম্ভাবনা লাভের পথ খোলা না-ও থাকতে পারে। এ বিষয়টি কোরআন মজীদেও সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে:

) أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلا تَذَكَّرُونَ( .

(হে রাসূল!) তাহলে আপনি কি তাকে দেখেছেন যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিকে স্বীয় ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহ্ জ্ঞানের ওপরে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন , আর তার (অন্তরের) শ্রবণশক্তি ও ক্বলবের ওপর মোহর মেরে দিয়েছেন , আর তার (অন্তরের) দর্শনশক্তির ওপর আবরণ তৈরী করে দিয়েছেন ? অতঃপর আল্লাহর পরে আর কে তাকে পথ দেখাবে ? অতঃপর তোমরা কি (এ থেকে) শিক্ষা গ্রহণ করবে না ? (সূরাহ্ আল্-জাছিয়াহ্: ২৩)

এভাবে জ্ঞান যাদের পথভ্রষ্টতার কারণ তাদের কতকের পরিচয় আল্লাহ্ তা আলা পরবর্তী আয়াতেই পেশ করেছেন। আল্লাহ্ তা আলা এরশাদ করেন:

) وَقَالُوا مَا هِيَ إِلا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلا الدَّهْرُ وَمَا لَهُمْ بِذَلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلا يَظُنُّونَ(

আর তারা বলে: আমাদের এ পার্থিব জীবন ছাড়া আর কী আছে ? আমরা মৃত্যুবরণ করি , আর জীবিত থাকি এবং মহাকাল ব্যতীত কোনো কিছু আমাদেরকে ধ্বংস করে না। (আসলে এ ব্যাপারে) তাদের (প্রকৃত) জ্ঞান নেই ; তারা তো কেবল ধারণা-বিশ্বাস পোষণ করে মাত্র। (সূরাহ্ আল্-জাছিয়াহ্: ২৪)

এ যুগেও অনেক তথাকথিত জ্ঞানী ও দার্শনিক এ ধরনের মত পোষণ করেন। বলা বাহুল্য যে , তাঁদের এ সব মতামত অকাট্য জ্ঞান ভিত্তিক নয় , বরং এগুলো তাঁদের ধারণা বা বিশ্বাস মাত্র। অতএব , কোনো জ্ঞান নির্ভুল ও অকাট্য কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। জ্ঞানতত্ত্ব এ প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করে থাকে।

অবশ্য কেউ হয়তো বলতে পারেন যে , নির্ভুল জ্ঞান ও পথনির্দেশের জন্য আল্লাহ্ তা আলার কিতাব কোরআন মজীদের দ্বারস্থ হওয়াই যথেষ্ট , অতঃপর আর জ্ঞানতত্ত্বের সাহায্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থাকে না।

তিনটি কারণে এ যুক্তি অর্থাৎ জ্ঞানতত্ত্বের মুখাপেক্ষিতা প্রয়োজন না হওয়ার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।প্রথমতঃ জন্মসূত্রে যারা মুসলমান আল্লাহ্ তা আলা কোরআন মজীদকে কেবল তাদের হেদায়াতের জন্যই নাযিল করেন নি। (বস্তুতঃ যখন কোরআন মজীদ নাযিল শুরু হয় তখন এবং তার পরেও বহু বছর যাবত কোনো জন্মসূত্রে মুসলমান ছিলো না।) বরং সমস্ত মানুষের সামনে উপস্থাপন ও গ্রহণের জন্য তাদের প্রতি আহবান জানানোর লক্ষ্যেই কোরআন মজীদ নাযিল করা হয়েছে। অতএব , যাদের সামনে কোরআন মজীদের দাও আত পেশ করা হবে তাদের ভ্রান্ত ও ত্রুটিপূর্ণ জ্ঞানের ভ্রান্তি ও ত্রুটি চিহ্নিত ও খণ্ডন করার যোগ্যতা অর্জন করা মুসলমানদের জন্য , বিশেষ করে ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামী জ্ঞানগবেষকদের জন্য অপরিহার্য।

দ্বিতীয়তঃ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দার্শনিকতার নামে এমন বহু বিভ্রান্তিকর ধারণার অস্তিত্ব রয়েছে যার মুখোমুখি হলে খুব কম লোকের পক্ষেই তুখোড় অপযুক্তির বেড়াজাল ছিন্ন করে সে সবের ভ্রান্তি বুঝতে পারা সম্ভব হয়। ফলে অনেকে , এমনকি কোরআন মজীদকে একনিষ্ঠভাবে আঁকড়ে ধরেছিলো এমন অনেক লোকও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। এভাবে অনেকের ঈমান হুমকির সম্মুখীন হয়।

তৃতীয়তঃ কোরআন মজীদের তাৎপর্য গ্রহণের ক্ষেত্রে বহু বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা যায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে এ মতপার্থক্য অত্যন্ত গুরুতর হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ , নবী-রাসূলগণ (আঃ)-এর পক্ষে পাপকাজ সম্পাদন করা সম্ভব কিনা এ ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে এবং এ মতপার্থক্যের উৎস কোরআন মজীদের এতদসংশ্লিষ্ট আয়াত সমূহের তাৎপর্য গ্রহণে মতপার্থক্য। আর শোষোক্ত ক্ষেত্রে মতপার্থক্যের জন্য যে সব কারণ দায়ী তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্ঞানের সঠিক সংজ্ঞা এবং সঠিক জ্ঞান ও ভুল জ্ঞান চিহ্নিত করার মানদণ্ডের সাথে অনেকেরই পরিচয় না থাকা। এ পরিচয় অর্জনে সহায়তা করাই জ্ঞানতত্ত্বের কাজ।

শুধু ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামী চিন্তাবিদগণই নন , যে কোনো শাস্ত্রের জ্ঞানচর্চাকারীদের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি ( مقدمات ) হিসেবে মানবিক বিজ্ঞানের কয়েকটি শাখার সাথে ভালোভাবে পরিচয় থাকা প্রয়োজন বলে মনে করি। সেগুলো হচ্ছে : যুক্তিবিজ্ঞান , জ্ঞানতত্ত্ব , দর্শন ও তাৎপর্যবিজ্ঞান এবং সেই সাথে যে ভাষার তথ্যসূত্রাদি ব্যবহার করা হবে (উৎস ভাষা - source language- زبان مبدء ) ও যে ভাষায় লেখা হবে (লক্ষ্য ভাষা - target language- زبان مقصد ) এবং তার ওপরে ব্যাকরণের ব্যাপক ও গভীর জ্ঞান সহ দক্ষতা।

বক্ষ্যমাণ পুস্তকটি মূলতঃ জ্ঞানতত্ত্ব সম্বন্ধে অত্যন্ত সংক্ষেপে কিছুটা ধারণা দেয়ার লক্ষ্য একটি ছোট বৈঠকের জন্য প্রবন্ধ আকারে লেখা হয়েছিলো। পরে এটি অধিকতর সংক্ষিপ্ত আকারে সাপ্তাহিক রোববার-এ প্রকাশিত হয়েছিলো। এরপর কয়েক বছর আগে (২০১০-এর শেষার্ধে) একটি লেখক-সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কোর্সের ক্লাস নিতে গিয়ে সেখানকার শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে কিছুটা ধারণা দিতে গিয়ে অনেক দিন আগেকার এ প্রবন্ধটি খুঁজে বের করি এবং কম্পিউটারে কম্পোজ করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেই। কম্পোজ করতে গিয়ে এটিকে কিছুটা পরিমার্জন ও সামান্য সম্প্রসারণ করেছি।

জ্ঞানতত্ত্ব সম্বন্ধে যথেষ্ট জানার আছে এবং লেখক , সাংবাদিক ও জ্ঞানগবেষকদের জন্য এ বিষয়ে বিস্তারিত অধ্যয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। এ পুস্তকে এ বিষয়ে ন্যূনতম ধারণা দেয়া হয়েছে মাত্র। আশা করি এ পুস্তক পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যে এ বিষয়ে অধিকতর অধ্যয়নের আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। আর তাহলেই অত্র পুস্তকের সফলতা।

গ্রন্থটি থেকে যদি পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যকার একজনও উপকৃত হন তাহলেই লেখকের পরিশ্রম সার্থক হবে। যদিও জ্ঞানতত্ত্বের সাথে পরিচিতি সকল ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষকের জন্যই অপরিহার্য , তবে ইসলামী জ্ঞানচর্চাকারীদের জন্য অনেক বেশী অপরিহার্য এবং কেবল এ কারণেই অত্র বিষয়ে লিখতে উদ্যোগী হই। তাই আল্লাহ্ তা আলার কাছে প্রার্থনা , তিনি অত্র গ্রন্থ থেকে এর সকল পাঠক-পাঠিকাকে উপকৃত হবার তাওফীক্ব দিন এবং এটিকে এর লেখক , পাঠক-পাঠিকা এবং প্রচার-প্রসারে সহায়তাকারী সকলের পরকালীন নাজাতের জন্য সহায়ক হিসেবে কবূল্ করে নিন।

বিনীত

নূর হোসেন মজিদী

জ্ঞানতত্ত্বের ওপর এক নযর

জ্ঞান অর্জন সম্ভব কি ?

জ্ঞানতত্ত্বের প্রথম আলোচ্য বিষয় হচ্ছে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব কিনা। এ প্রসঙ্গে এক বাক্যে জ্ঞানের সংজ্ঞা উল্লেখ করা যেতে পারে: জ্ঞান হচ্ছে যে কোনো বস্তুগত ও অবস্তুগত অস্তিত্ব , ঘটনা , সম্পর্ক ও তাৎপর্য সম্বন্ধে এমন মনোলোকীয় রূপ যা হুবহু প্রকৃত অবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী হবে। অর্থাৎ মানবমস্তিষ্কের ধারণক্ষমতার আওতায় কোনো কিছুর সঠিক প্রতিনিধিত্বকারী অবস্তুগত রূপই হচ্ছে সে সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান।

কিন্তু সুপ্রাচীন কাল থেকেই এ প্রশ্ন ছিলো এবং এখনো আছে যে , কোনো কিছু সম্পর্কে সত্যকে জানা তথা সত্যিকারের জ্ঞান অর্জন করা আদৌ সম্ভব কিনা ? এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনেককেই বলতে শোনা যায়: যখন যার কথা শুনি তখন তা-ই সত্য বলে মনে হয় , সকলের কথায়ই যুক্তি আছে ; আসলে কোনটি সত্য তা কে জানে! হয়তো কোনোটিই সত্য নয় , হয়তো সত্যকে জানা আদৌ সম্ভব নয়।

এ জাতীয় বক্তব্য অনেক সময় দৃশ্যতঃ খুবই যুক্তিসিদ্ধভাবে উপস্থাপন করা হয় , ফলে অনেকের কাছে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয় এবং তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে , সত্যকে জানা যায় না।

এ ধরনের বিভ্রান্তিকর চিন্তা নতুন নয়। বরং যদ্দূর জানা যায় , প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে এ ধরনের চিন্তাধারার সূচনা হয়েছিলো। খৃস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রীসে প্রোতাগোরাস ( Protagoras) ও গর্জিয়াস ( Gorigias) প্রমুখ একদল পণ্ডিত দাবী করেন যে , সত্য ও মিথ্যার কোনো অকাট্য মানদণ্ড নেই , বরং সত্য ও মিথ্যা ধারণা-কল্পনা মাত্র। প্রোতাগোরাস বলেন , প্রত্যেকেই নিজে যেমন বুঝেছে ঠিক সেভাবেই কোনো বিষয়ে মত ব্যক্ত করে , আর যেহেতু লোকদের বুঝ-সমঝ বিভিন্ন সেহেতু একই বিষয়ে তাদের মতামতও বিভিন্ন হয়ে থাকে। সুতরাং হতে পারে যে , একটি বিষয় সত্যও , আবার মিথ্যাও

এ ধরনের চিন্তাধারা পোষণকারীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে খুবই সুদক্ষ ছিলেন এবং প্রতিপক্ষের লোকেরা সাধারণতঃ তাঁদের মতামত খণ্ডন করতে পারতেন না। তাই তাঁরা সমাজে জ্ঞানী ( sophist)বলে পরিচিত হন। সক্রেটিস , প্লেটো ও এরিস্টোটল এদের বিভ্রান্তিকর মতাদর্শের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন।

সক্রেটিসের যুগের পরবর্তীকালে সন্দেহবাদীদের উদ্ভব ঘটে। সফিস্ট ও সন্দেহবাদীদের চিন্তাধারার মধ্যে পার্থক্য এই যে , সফিস্টরা যেখানে সত্যকে ধারণা-কল্পনাভিত্তিক মনে করতেন অর্থাৎ পরস্পরবিরোধী ধারণাসমূহের সবগুলোকেই তথা প্রত্যেকের জন্য নিজ নিজ ধারণাকে সত্য বলে তথ্য সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের কোনো সর্বজনীন মানদণ্ড নেই বলে মনে করতেন , সেখানে সন্দেহবাদীদের অভিমত ছিলো এই যে , সত্যকে আদৌ জানা সম্ভব নয়। তাঁদের মতে , জ্ঞান আহরণের মাধ্যম পঞ্চেন্দ্রিয় ও বিচারবুদ্ধি ( عقل - reason) উভয়ই ভুল তথ্য সরবরাহ করে , অতএব , প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। সন্দেহবাদী গ্রীক পণ্ডিত পিরহো ( Pyrho) জ্ঞানার্জন সম্ভব নয় - এ মতের সপক্ষে দশটি প্রমাণ উপস্থাপন করেন।

সন্দেহবাদীদের কথা হচ্ছে , ইন্দ্রিয় ও বিচারবুদ্ধি উভয় জ্ঞানমাধ্যমই ভুল করে। প্রতিটি ইন্দ্রিয়ই ভুল তথ্য সরবরাহ করে। পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশী তথ্য সরবরাহকারী ইন্দ্রিয় হচ্ছে চক্ষু , কিন্তু চক্ষু কয়েকশ ধরনের ভুল করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ , চক্ষু দূরের বড় জিনিসকে ছোট দেখতে পায়। অন্যান্য ইন্দ্রিয়ও ভুল করে , যেমন: ত্বক । উদাহরণস্বরূপ , দু টি উষ্ণ ও শীতল পানির পাত্রে দু হাত ডুবিয়ে অতঃপর দুয়ের মাঝামাঝি তাপমাত্রার পানির পাত্রে উভয় হাত ডুবালে এক হাতে গরম ও এক হাতে ঠাণ্ডা অনুভূত হবে , অথচ একই পানি , অতএব , তা একই সময় ঠাণ্ডা ও গরম দুইই হতে পারে না। আর বিচারবুদ্ধির ভুল আরো বেশী। তাঁরা বলেন , যে এক জায়গায় ভুল করেছে তার সব জায়গায়ই ভুল করার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। অতএব , ইন্দ্রিয়নিচয় ও বিচারবুদ্ধি কোনোটির ওপরই আস্থা রাখা যায় না। সুতরাং সত্যে উপনীত হওয়া বা জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়।

তাঁরা আরো একটি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন স্বপ্নের স্বরূপের দৃষ্টান্ত দিয়ে। তাঁরা বলেন , আমরা যখন স্বপ্ন দেখি তখন তাকে বাস্তব বলেই মনে করি। স্বপ্নে হাসি আছে , কান্না আছে , আনন্দ আছে , বেদনা আছে ; রূপ , রস , বর্ণ , গন্ধ , স্বাদ তথা সব কিছুই আছে। স্বপলোকের সব কিছুই আমাদের কাছে বাস্তব বলে মনে হয়। কিন্তু ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমরা বুঝতে পারি যে , তা স্বপ্ন ছিলো , বাস্তব ছিলো না। অতএব , আমরা যাকে বাস্তব বলি অর্থাৎ আমাদের এ জীবনও যে এক ধরনের স্বপ্ন নয় তার নিশ্চয়তা কোথায় ? হয়তো এ-ও স্বপ্ন - মৃত্যুতে যার অবসান ঘটবে এবং আমরা প্রকৃত বাস্তবতায় ফিরে যাবো। অতএব , মোদ্দা কথা , সত্যকে জানা বা জ্ঞানার্জন করা সম্ভব নয়।

কিছু কিছু অকাট্য জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব

ইন্দ্রিয়নিচয় ও বিচারবুদ্ধি যে ভুল করে থাকে তা অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। অতএব , এতদুভয়ের প্রদত্ত তথ্যের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা যেতেই পারে। আর কোনো কিছু সম্বন্ধে সন্দেহ হওয়ার মানেই হচ্ছে তার যথার্থতা যেমন নিশ্চিত নয় তেমনি তার সঠিক হওয়াও অসম্ভব নয়। তাই তা চোখ বুঁজে গ্রহণ করা যেমন উচিত হবে না , ঠিক সেভাবেই তা চোখ বুঁজে প্রত্যাখ্যান করাও উচিত হবে না। বরং পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার ভ্রান্তিগুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে। আর যতই ভ্রান্তি চিহ্নিত করা যাবে ততই সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। এভাবে কতক বিষয়ে অবশ্যই অকাট্য জ্ঞানে উপনীত হওয়া সম্ভব হবে। ইমাম গাযযালী ও দেকার্তে ( Descartes)সংশয় থেকে শুরু করে প্রত্যয়ে উপনীত হন এবং সংশয়বাদীদের মোকাবিলা করেন।

এ ব্যাপারে দেকার্তের যুক্তি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন , সকল বিষয়ে সংশয় পোষণ করতে পারি , কিন্তু সংশয় পোষণের ব্যাপারে তো আর সংশয় পোষণ করতে পারে না। তাহলে অন্ততঃ এই একটি বিষয়ে প্রত্যয় পোষণ করছি। আর যেহেতু আমি সংশয় পোষণ করি সেহেতু আমি আছি - এ ব্যাপারেও প্রত্যয় পোষণ করি। এছাড়া এমন কিছু বা এমন অনেক কিছু আছে যে ব্যাপারে আমি সংশয় পোষণ করছি। তাহলে এরূপ কিছু আছে যার স্বরূপ জানি না বলে সে সম্পর্কে সংশয় পোষণ করছি। তেমনি এ ব্যাপারেও প্রত্যয় পোষণ করি যে , ইন্দ্রিয়নিচয় ও বিচারবুদ্ধির অস্তিত্ব আছে এবং তারা ভুল করে থাকে। অতএব , এখানে আমরা কয়েকটি অস্তিত্বের ব্যাপারে সংশয়মুক্ত ও প্রত্যয়ের অধিকারী , সেগুলো হচ্ছে: সংশয় নামক একটি অবস্থা , সংশয় পোষণকারী ব্যক্তি , যে বিষয় সম্পর্কে সংশয় পোষণ করা হয় , জ্ঞান আহরণের দু টি মাধ্যম - ইন্দ্রিয়নিচয় ও বিচারবুদ্ধি এবং এতদুভয় ভুল করে থাকে। আর যেহেতু বিচারবুদ্ধি ভুল চিহ্নিত করতে সক্ষম এবং উক্ত বিষয়গুলোতে নির্ভুল সিদ্ধান্ত ও প্রত্যয়ে উপনীত হতে সক্ষম হয়েছে সেহেতু বিচারবুদ্ধির পক্ষে ভুল চিহ্নিত করে অন্ততঃ কতক বিষয়ে নির্ভুল জ্ঞানে উপনীত হওয়া সম্ভব।

আরেকটি যুক্তি সংশয়বাদীদের চিন্তা ও দর্শনের ভিত্তিকে পুরোপুরি ধ্বসিয়ে দিতে সক্ষম। তা হচ্ছে: সমস্ত বিষয়ই সংশয়ের আবর্তে নিমজ্জিত - এ ধারণাকে যদি তারা নির্ভুল ও অকাট্য বলে প্রত্যয় পোষণ করে তাহলে এ থেকে প্রমাণিত হয় যে , অন্ততঃ এই একটি ব্যাপারে তাদের সংশয় নেই। সে ক্ষেত্রে সব কিছুই সংশয়ের আবর্তে নিমজ্জিত - এ দাবী ভুল প্রমাণিত হয়ে যায় । অর্থাৎ অন্ততঃ কিছু বিষয়ে সংশয়মুক্ত প্রত্যয় হাসিল করা যায়। আর সব কিছুই সংশয়ের আবর্তে নিমজ্জিত - এ ধারণা সত্য হবার ব্যাপারেও যদি তাদের সংশয় থেকে থাকে তাহলে তাদের এ সংশয়ই তাদের তত্ত্বকে অগ্রহণযোগ্য করে দেয়। কারণ , যে তত্ত্বের সঠিক হবার ব্যাপারে সংশয় আছে তার ভিত্তিতে অন্য কোনো তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই ও সে সম্বন্ধে সংশয় পোষণ করা যেতে পারে না।

জ্ঞানের স্তরভেদ

যে কোনো প্রপঞ্চ বা বিস্তারিতভাবে বিবৃত বিষয় ( phenomena- پدیده ) সম্বন্ধে বিভিন্ন ব্যক্তির জ্ঞান বিভিন্ন স্তরের হতে পারে। (এখানে আমরা ভুলজ্ঞান বা ভুলমিশ্রিত জ্ঞানকে আমাদের আলোচ্য বিষয়ের বাইরে রাখছি।) কারো জ্ঞান হাল্কা ও অগভীর এবং কারো জ্ঞান গভীর হতে পারে। আবার কারো জ্ঞান সম্পূর্ণ ও কারো জ্ঞান অসম্পূর্ণ হতে পারে এবং অসম্পূর্ণ জ্ঞানের ক্ষেত্রেও অসম্পূর্ণতা বিভিন্ন পর্যায়ের হতে পারে। যেমন: প্রথম বারের মতো কেউ যখন সকাল বেলা পূর্বাকাশে সূর্যকে উদয় হওয়ার অবস্থায় দেখতে পায় তখন সে তাকে একটি অস্তিত্ব হিসেবে বুঝতে পারে ; তার এ জ্ঞান সত্য , তবে খুবই অগভীর , অসম্পূর্ণ ও প্রাথমিক স্তরের। কারণ , সে এটাকে একটা সোনালী চাকতি বলে মনে করতে পারে। সে ক্ষেত্রে এর পরিচয় বা স্বরূপ সম্বন্ধে তার ধারণা ভুল , কিন্তু এর অস্তিত্ব সম্বন্ধে তার ধারণা সঠিক তথা জ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত। পরে যদি সে বুঝতে পারে যে , এটি একটি আলোদানকারী অস্তিত্ব তাহলে সূর্য সম্বন্ধে তার জ্ঞান পূর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও উন্নততর স্তরের হলো। এভাবে সে এর আয়তন , অবস্থান , উপাদান , গঠনপ্রক্রিয়া , গতি , অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক আলোড়ন , এর অণু-পরমাণুগুলোর অবস্থান ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি সম্বন্ধে অবহিত হতে পারে।

জ্ঞানের আরেকটি স্তরগত ব্যবধান হচ্ছে স্বয়ং জ্ঞাত অস্তিত্বটি (বস্তুগত-অবস্তুগত নির্বিশেষে) যখন ব্যক্তির কাছে হাযির থাকে এবং যখন তা হাযির না থাকে শুধু সে সংক্রান্ত অবস্তুগত রূপ তার মস্তিষ্কে বিদ্যমান থাকে। যেমন: সূর্য সামনে থাকাকালে সূর্য সংক্রান্ত জ্ঞান এবং সূর্য আকাশে অনুপস্থিত থাকাকালে মস্তিষ্কে বিদ্যমান সে সংক্রান্ত ধারণা।

তেমনি আরেকটি স্তরগত ব্যবধান হচ্ছে , জ্ঞানের বিষয়টি জ্ঞানের অধিকারীর স্মৃতি বা অনুভূতিতে শক্তিশালী বা হাল্কাভাবে বা সুপ্তভাবে উপস্থিত থাকতে পারে। যেমন: জ্ঞানের অধিকারীর কাছে তীব্র ক্ষুধার অবস্থায় , হাল্কা ক্ষুধার অবস্থায় ও ক্ষুধা না থাকা অবস্থায় ক্ষুধা সংক্রান্ত জ্ঞান। এটাকে জ্ঞানের শক্তি ও দুর্বলতার স্তরগত ব্যবধান বলা যেতে পারে।

জ্ঞানের আরেকটি স্তরগত বিভিন্নতা হচ্ছে এই যে , কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্ঞানের অধিকারী , জ্ঞান ও জ্ঞানের বিষয়বস্তু অভিন্ন , কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিভিন্ন। ব্যক্তির নিজস্ব সত্তা এবং তার বিভিন্ন অবস্তুগত বৈশিষ্ট্য , যেমন: ক্ষুধা , তৃষ্ণা , যৌনানুভূতি ইত্যাদি সংক্রান্ত জ্ঞান প্রকৃত পক্ষে তার নিজস্ব সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। অন্যদিকে তার বিভিন্ন ধারণা ও কল্পনা - প্রকৃত পক্ষে সে নিজেই যেগুলোর স্রষ্টা , সেগুলোর তার নিজ সত্তার বাইরে কোনো অস্তিত্ব নেই , কিন্তু তা তার সত্তার অপরিহার্য অংশ বা বৈশিষ্ট্যও নয় । অন্যদিকে তার সত্তার বাইরের বস্তুগত ও অবস্তুগত জগতসমূহের বিভিন্ন অস্তিত্ব তার সত্তায় নিহিত নেই , কিন্তু সে সম্পর্কে তার জ্ঞান আছে।

তেমনি কারো জ্ঞান কোনো কিছুর সমগ্র সম্পর্কে হতে পারে , অথবা তার অংশবিশেষ সম্বন্ধে হতে পারে। কারো সামনে সমগ্র অস্তিত্বের সকল সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক , বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা সহকারে সদাবিদ্যমানতা হচ্ছে জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তর এবং এ জ্ঞান কেবল আল্লাহ্ তা আলারই রয়েছে।

জ্ঞানের বিভিন্ন প্রকরণ

জ্ঞানকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন প্রকরণে বিভক্ত করা যায়। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের ভিত্তিতে বিবেচনা করলে অনেক সময় কোনো জ্ঞান মাত্র একটি বিভাগে পড়ে এবং কোনো জ্ঞান একাধিক বিভাগে পড়তে পারে। জ্ঞানের বিভিন্ন ধরনের বিভাগের ক্ষেত্রে কতক বিভাগের নাম একাধিক ধরনের বিভাগে অভিন্ন এবং কতক নাম বিভিন্ন অর্থাৎ অভিন্ন নামের বিভাগের সংজ্ঞা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথক হতে পারে।

মাধ্যমবিহীন ও মাধ্যমনির্ভর জ্ঞান

এ সব দৃষ্টিকোণের মধ্যে এক বিবেচনায় জ্ঞান দুই প্রকারের: মাধ্যমবিহীন বা স্বতঃ জ্ঞান ও মাধ্যমনির্ভর জ্ঞান। জ্ঞানের অধিকারী কোনো কিছুর সাহায্য ছাড়াই , এমনকি স্বীয় ইন্দ্রিয়নিচয়ের সাহায্য ছাড়াই যে জ্ঞানের অধিকারী তা-ই মাধ্যমবিহীন বা স্বতঃ জ্ঞান। আর কোনো না কোনো মাধ্যমের সাহায্যে সে যে জ্ঞানের অধিকারী হয় তা মাধ্যমনির্ভর জ্ঞান। জ্ঞানের অধিকারীর স্বীয় অভ্যন্তরীণ সত্তা এবং তার সত্তার বিভিন্ন গুণ-বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা , যেমন: ক্ষুধা , তৃষ্ণা , আনন্দ , বিষাদ ইত্যাদি সম্বন্ধে তার জ্ঞান প্রথম পর্যায়ের। এ সব বিষয়ের জ্ঞান যে , মাধ্যমনির্ভর নয় , শুধু তা-ই নয় , বরং জ্ঞানের অধিকারী , জ্ঞান ও জ্ঞানের বিষয়বস্তু অভিন্ন। তবে জ্ঞানের অধিকারীর শরীর ও এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ এ সব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ , এ সবের জ্ঞানের অধিকারী হবার জন্য তাকে ইন্দ্রিয়ের সাহায্য নিতে হয়।

এক বিবেচনায় জ্ঞান তিন প্রকারের: অনর্জিত (غير اکتسابی ) , অর্জিত (اکتسابی ) ও বিচারবুদ্ধি কর্তৃক উৎপাদিত (تولیدی عقلی ) জ্ঞান। অনর্জিত জ্ঞান তা-ই যার অধিকারী হওয়ার জন্য তাকে কোনো রকমের ইন্দ্রিয়গত বা চৈন্তিক চেষ্টাসাধনা করতে হয় নি। এ ধরনের জ্ঞান দুই রকমের: (১) স্বীয় সত্তা , স্বীয় সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সত্যতা , স্বীয় ক্ষুধা-তৃষ্ণা ইত্যাদি সহজাত জ্ঞান (علم فطری ) এবং (২) অন্তরে উদ্ভূত জ্ঞান (علم قلبی ) যেমন: ওয়াহী ও ইলহামের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান। অর্জিত জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান ও পরীক্ষালব্ধ বা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। এছাড়া মানুষের বিচারবুদ্ধি (عقل ) অন্যান্য জ্ঞান পর্যালোচনা করে বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন জ্ঞান উদ্ভাবন করে থাকে।

উৎসভিত্তিক বিভাগ

জ্ঞানবিভাগের দৃষ্টিকোণসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে উৎসভিত্তিক দৃষ্টিকোণ।

মানুষের জ্ঞানের দু টি উৎস চিন্তা করা যায়: অভ্যন্তরীণ উৎস ও বাইরের উৎস। অভ্যন্তরীণ উৎস মানে স্বয়ং তার সত্তা অর্থাৎ যে জ্ঞান তার সত্তায় নিহিত থাকে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উদ্ভূত হয় সে জ্ঞানের উৎস হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ে স্বয়ং তার সত্তাকেই গণ্য করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে বলার উদ্দেশ্য এই যে , তার সত্তায় নিহিত জ্ঞান অন্য কোনো সত্তা থেকে নিহিত রাখা হয়ে থাকতে পারে বা উদ্ভূত করা হয়ে থাকতে পারে ( থাকতে পারে যুক্তির খাতিরে বলা হয়েছে , আসলে রাখা হয়েছে উদ্ভূত করা হয়েছে )। অর্থাৎ দৃশ্যতঃ এ ধরনের জ্ঞান তার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উৎসারিত। অন্য কথায় , সে বাহ্যিক তথ্যমাধ্যম , যেমন: ইন্দ্রিয়নিচয়ের সাহায্য ছাড়াই এ জ্ঞানের অধিকারী হয়ে থাকে। এ ধরনের কোনো কোনো জ্ঞান জন্মের পর থেকে স্বতঃপ্রকাশিত হয় অর্থাৎ তার সত্তায় নিহিত থাকে , যেমন: ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্ঞান। আবার কোনো জ্ঞান তার মধ্যে সম্ভাবনা আকারে সুপ্ত থাকে যা উপযুক্ত সময়ে ও পরিবেশে তার মধ্যে জাগ্রত হয় , যেমন: যৌনক্ষুধার জ্ঞান। এছাড়া কোনো কোনো জ্ঞান সরাসরি তার মধ্যে অন্য কোনো অপার্থিব উৎস থেকে সঞ্চারিত হতে পারে , যেমন: ওয়াহী , ইলহাম , যথাযথ চিন্তা-গবেষণা ছাড়াই অন্তরে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্যের উদ্ভব ইত্যাদি।

এর বিপরীতে রয়েছে তার সত্তার বাইরে অবস্থিত জ্ঞানসূত্রসমূহ ; প্রাকৃতিক জগত সহ তার সত্তাবহির্ভূত যত কিছু থেকে সে জ্ঞান লাভ করে তার সব কিছুই বাইরের জ্ঞানসূত্র।

প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ভিত্তিক বিভাগ

জ্ঞানকে তার প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: উপস্থিত জ্ঞান বা প্রত্যক্ষ জ্ঞান (علم حضوری ) ও অর্জনীয় জ্ঞান (علم حصولی ) । প্রত্যক্ষ জ্ঞান হচ্ছে তা-ই কোনো রকম মাধ্যম ছাড়াই যে জ্ঞান ব্যক্তির সত্তায় বিদ্যমান থাকে। প্রত্যক্ষ জ্ঞান কয়েক ধরনের হতে পারে: (1) সত্তায় সরাসরি বিদ্যমান জ্ঞান , যেমন: ব্যক্তির নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে জ্ঞান , স্বীয় উৎস বা সৃষ্টিকর্তা সম্বন্ধে সাধারণ ধারণা রূপ জ্ঞান , ক্ষুধাতৃষ্ণা সংক্রান্ত জ্ঞান , যৌনক্ষুধার জ্ঞান ইত্যাদি যাকে সহজাত জ্ঞান (علم فطری )ও বলা যেতে পারে। (2) ব্যক্তির ধারণা-কল্পনাজাত অবস্তুগত অস্তিত্ব সমূহ সংক্রান্ত জ্ঞান এবং (3) ওয়াহী ও ইলহাম জাতীয় জ্ঞান যা বাইরের অপার্থিব উৎস থেকে ব্যক্তির সত্তায় জাগ্রত হওয়ার পর স্থিতিলাভ করে।

অর্জনীয় জ্ঞান হচ্ছে ইন্দ্রিয়নিচয় ও অন্যান্য তথ্যমাধ্যম বা জ্ঞানমাধ্যমের সাহায্যে বাইরের উৎস থেকে অর্জিত জ্ঞান বা চিন্তা-গবেষণার মাধমে উদ্ঘাটিত জ্ঞান।

অর্জনীয় জ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুসমূহের সরাসরি প্রত্যক্ষণ বা সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত হতে পারে , অথবা লেখ্য ও কথনীয় ভাষা , ছবি , আকার-ইঙ্গিত ইত্যাদি প্রতীকের সাহায্যে হতে পারে।

জ্ঞানকে ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যভাবেও ভাগ করা যেতে পারে। যেমন: (1) সহজাত জ্ঞান (علم فطری ) , (2) প্রত্যক্ষ জ্ঞান (علم حضوری ) ও (3) অর্জনীয় জ্ঞান (علم حصولی ) । এ ধরনের বিভাগে জ্ঞানের অধিকারীর সত্তা এবং তার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা সমূহ সংক্রান্ত জ্ঞানকে সহজাত জ্ঞান , এর বহির্ভূত বিষয়াদি সংক্রান্ত অনর্জিত জ্ঞান তথা অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞানকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যাদিকে ও তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিচারবুদ্ধি কর্তৃক গৃহীত উপসংহারকে অর্জনীয় জ্ঞান -এর পর্যায়ে ফেলা হয়। তেমনি সহজাত জ্ঞানকেও অনেকে প্রত্যক্ষ জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর কারণ , সহজাত জ্ঞানের বিষয়বস্তু ব্যক্তির সত্তার মধ্যে প্রকাশিত হবার পর সদা বিদ্যমান থাকে।

প্রত্যক্ষ জ্ঞান

ইতিমধ্যেই যেমন আভাস দেয়া হয়েছে , প্রত্যক্ষ জ্ঞান (علم حضوری ) হচ্ছে জ্ঞানের অধিকারী বা জ্ঞানী (عالم )-এর সত্তায় নিহিত অনর্জিত জ্ঞান এবং সে জ্ঞানের বিষয়বস্তু বা জ্ঞাত বিষয় (معلوم ) হচ্ছে স্বয়ং সেই সত্তা এবং তার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা সমূহ। অর্থাৎ এখানে জ্ঞানী , জ্ঞান ও জ্ঞাত অভিন্ন। বস্তুতঃ সমস্ত রকমের জ্ঞানের মধ্যে একমাত্র প্রত্যক্ষ জ্ঞানের যথার্থতা সম্বন্ধে যে কারো পক্ষেই শতকরা একশ ভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

এখানে জ্ঞানীর সত্তার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা সমূহ সম্পর্কে একটি প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই যে , বাইরে থেকে প্রাপ্ত বা অর্জিত জ্ঞান এবং তার সত্তায় উৎপাদিত জ্ঞান (বিচারবুদ্ধির উদ্ভাবন ও ধারণা-কল্পনা নির্বিশেষে) যখন জ্ঞানীর সত্তায় স্থিতিলাভ করে তখন তা তার সত্তার সাথে অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায় এবং জ্ঞানী অন্য কোনো মাধ্যম ব্যতীতই সে সম্পর্কে অবহিত থাকে। এ কারণে তা-ও প্রত্যক্ষ জ্ঞানের বিষয়বস্তুর অন্যতম হয়ে যায়। অর্থাৎ এ ধরনের জ্ঞানকে যখন লাভ করার পন্থা ও উৎসের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয় তখন তা প্রাপ্ত বা অর্জিত জ্ঞান , আর যখন বিদ্যমানতার ভিত্তিতে দেখা হয় তখন তা প্রত্যক্ষ জ্ঞান। অন্যদিকে জ্ঞানী যখন তার সত্তায় নিহিত এ জ্ঞানের সাহায্যে জ্ঞানের মূল বিষয়বস্তুর প্রতি মনোযোগ দেয় তখন তা প্রাপ্ত বা অর্জিত জ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত হয় , আর যখন স্বয়ং জ্ঞানের দিকে মনোযোগ দেয় অর্থাৎ তার সত্তায় নিহিত ঐ সব বিষয়বস্তুর অবস্তুগত রূপের দিকে মনোযোগ দেয় তখন তা প্রত্যক্ষ জ্ঞান।

এ বিষয়টি সম্বন্ধে একটি চমৎকার উপমা দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে: আমরা যখন একটি আয়নার দিকে এ উদ্দেশ্যে তাকাই যে , তার আকার-আকৃতি ও আয়তন এবং তার বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রত্যক্ষ করবো অর্থাৎ তা পুরোপুরি ঠিকঠাক আছে কিনা , নাকি তাতে কোনো ত্রুটি আছে , আয়নাটির প্রতি এভাবে তাকানোর সাথে আয়নাটিতে চেহারা বা তাতে প্রতিফলিত অন্য কোনো দৃশ্য দেখার উদ্দেশ্যে তার দিকে তাকানোর পার্থক্য আছে। প্রথম ক্ষেত্রে আয়নাটিই লক্ষ্য এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আয়নাটি লক্ষ্য নয় , মাধ্যম মাত্র। অনুরূপভাবে জ্ঞানীর সত্তার বাইরের যে কোনো বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞানীর জ্ঞান তার সত্তার অংশ হিসেবে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্থাৎ তা নিজেই একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় ও সত্তার সাথে অবিচ্ছেদ্য এবং বাইরের সেই বিষয়বস্তুর প্রতি মনোযোগের মাধ্যম হিসেবে তা অর্জিত জ্ঞান।

মাধ্যম যখন বিষয়বস্তু

ওপরের আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে , অভিন্ন বিষয় অভিন্ন জ্ঞানীর জন্য কখনো জ্ঞানের মাধ্যম ও কখনো জ্ঞাত বিষয় হতে পারে। এ কথাটি জ্ঞানার্জনের জন্য ব্যবহৃত প্রতীক সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। লেখ্য ও কথনীয় ভাষা , এতে ব্যবহৃত বিভিন্ন বর্ণ , চিহ্ন ও ধ্বনি এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের চিত্র , চলচ্চিত্র , অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি এ সবের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন বস্তুগত ও অবস্তুগত বিষয়বস্তু সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যম হতে পারে , আবার স্বয়ং এগুলো সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করা হতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে এ সব প্রতীক হচ্ছে জ্ঞানার্জনের মাধ্যম বা প্রতীক এবং দ্বিতীয়োক্ত ক্ষেত্রে আর এগুলো জ্ঞানার্জনের মাধ্যম বা প্রতীক নয় , বরং স্বয়ং জ্ঞানের বিষয়বস্তু বা জ্ঞাত

স্বতঃপ্রকাশিত ও তাত্ত্বিক জ্ঞান

আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে জ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে: (1) স্বতঃপ্রকাশিত জ্ঞান (علم بدیهی ) ও (2) তাত্ত্বিক জ্ঞান (علم نظری ) ।

স্বতঃপ্রকাশিত জ্ঞান হচ্ছে এমন জ্ঞান যা মানুষের সত্তার কাছে নিজে নিজেই ধরা পড়ে এবং যা যুক্তিতর্ক ও দলীল দ্বারা প্রমাণের মুখাপেক্ষী নয়। যেমন: অভিন্ন স্থান ও কালে একটি বস্তু আছে এবং নেই - এটা হওয়া অসম্ভব। তেমনি: যে কোনো বস্তুর অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে , তার অস্তিত্বদানকারী রয়েছে। অনুরূপভাবে , ব্যক্তির কাছে তার নিজের অস্তিত্বের সত্যতা কোনোরূপ প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। স্বতঃপ্রকাশিত জ্ঞানের উপমা দিতে গিয়ে বলা হয়: সূর্যের উদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ ; এ জন্য অন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই।

তাত্ত্বিক জ্ঞান হচ্ছে তা-ই যা যুক্তিতর্ক , দলীল-প্রমাণ বা বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করা অপরিহার্য। তাত্ত্বিক জ্ঞান দুই ধরনের। এক ধরনের তাত্ত্বিক জ্ঞান হচ্ছে বস্তুধর্মের বহির্ভূত বিষয়াদির জ্ঞান অর্থাৎ অবস্তুগত জগতের ও মানবিক বিষয়াদির জ্ঞান যার বিপরীতে রয়েছে বস্তুবিজ্ঞানের জ্ঞান। দর্শন , আক্বায়েদ , সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি এ ধরনের তাত্ত্বিক জ্ঞান। আর দ্বিতীয় ধরনের তাত্ত্বিক জ্ঞান হচ্ছে বস্তুধর্ম সম্পর্কে হাতেকলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে কেবল অধ্যয়ন বা শ্রবণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান। এ শেষোক্ত ধরনের জ্ঞান সম্পর্কে কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভবপর। যেমন: পানি 100 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ফুটতে থাকে - এটি একটি তত্ত্ব যা পরীক্ষাগারে বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেই কেবল গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

জ্ঞানর মাধ্যমভিত্তিক প্রকরণ:

মানুষ যে সব মাধ্যমের বদৌলতে জ্ঞানের অধিকারী হয় সাধারণতঃ তার ভিত্তিতেই জ্ঞানের প্রকরণ নির্ধারণ করা হয়। আমরা এখন জ্ঞান আহরণের মাধ্যমসমূহ ও তার ভিত্তিতে জ্ঞানের প্রকরণসমূহের দিকে দৃষ্টি দেবো।

মানুষ চারটি মাধ্যম থেকে জ্ঞান লাভ করে এবং এর ভিত্তিতে জ্ঞানকে চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এ চারটি জ্ঞানমাধ্যম হচ্ছে: স্বভাব-প্রকৃতি (فطرة - ফিতরাত্) , ইন্দ্রিয়নিচয় , বিচারবুদ্ধি (عقل - আক্বল্) ও অন্তঃকরণ (قلب - ক্বালব্)। এ চার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানকে যথাক্রমে স্বভাবজাত বা সহজাত জ্ঞান , ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান , বিচারবুদ্ধিলব্ধ জ্ঞান ও অন্তঃকরণে উদ্ভূত জ্ঞান নামে অভিহিত করা যেতে পারে।

সহজাত জ্ঞান

সহজাত বা স্বভাবজাত জ্ঞান হচ্ছে ঐ সব জ্ঞান মানুষ জন্মগতভাবেই যার অধিকারী হয়। যেমন: ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্ঞান , শারীরিক আরাম ও কষ্টের জ্ঞান ইত্যাদি। মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীও সহজাত জ্ঞানের অধিকারী। বরং অন্যান্য প্রাণীর সহজাত জ্ঞানের আওতা মানুষের সহজাত জ্ঞানের আওতার চেয়ে ব্যাপকতর।

সহজাত জ্ঞান দুই ধরনের। এক ধরনের জ্ঞান ব্যক্তির সত্তায় কোনোরূপ মাধ্যম ছাড়াই জাগ্রত হয়। যেমন: শরীরে খাদ্য-পানীয়ের প্রয়োজন হলেই ব্যক্তি নিজে নিজেই তা বুঝতে পারে। এ ধরনের জ্ঞানকে ভিন্ন এক বিবেচনায় প্রত্যক্ষ জ্ঞান (علم حضوری - ইলমে হুযূরী)ও বলা যেতে পারে।

আরেক ধরনের জ্ঞান মানুষের সত্তায় সম্ভাবনা আকারে বিদ্যমান থাকে যা তার কাছে যথা সময়ে ও উপযুক্ত পরিবেশে প্রকাশ পায়। যেমন: যৌনতার জ্ঞান - যা শিশুর মধ্যে সম্ভাবনা আকারে নিহিত থাকে এবং বয়সের একটি সুনির্দিষ্ট স্তর পার হবার পর নিজ থেকেই ক্রমান্বয়ে তার মধ্যে এ জ্ঞান জন্ম নেয়।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , যৌনতার জ্ঞান ও যৌন ক্ষুধার জ্ঞান এক পর্যায়ের নয়। যৌন ক্ষুধার জ্ঞান ক্ষুধা-তৃষ্ণার মতোই প্রত্যক্ষ জ্ঞান। কিন্তু যৌন ক্ষুধার বয়সে উপনীত হবার অব্যবহিত পূর্ববর্তী একটি ক্রান্তিকালে যৌনতা সম্বন্ধে নিজ থেকেই যে ধারণা ও আগ্রহ গড়ে ওঠে তা এতদসংক্রান্ত সম্ভাবনার বিকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান

চক্ষু , কর্ণ , নাসিকা , জিহবা ও ত্বক - এই পাঁচটি শারীরিক ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে যে জ্ঞান অর্জিত হয় তা-ই ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান (علم حسی - ইলমে হিসসী) বা অভিজ্ঞতাজাত ও পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান (علم تجربی - ইলমে তাজরাবী)।

এক হিসেবে ইন্দ্রিয়নিচয়কে জ্ঞানমাধ্যম না বলে স্রেফ তথ্যসংগ্রহ মাধ্যম বলাই অধিকতর সঠিক। কারণ , ইন্দ্রিয়নিচয় অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করে মাত্র ; বিচারবুদ্ধিই এসব তথ্যকে সমন্বিত করে জ্ঞানে পরিণত করে। উদাহরণস্বরূপ , কোনো ব্যক্তির নাকে যখন সুগন্ধ অনুভূত হয় তখন তার নাকের স্নায়ুতন্ত্র তার মস্তিষ্কে এ তথ্যটি পাঠিয়ে দেয় এবং তার চোখ যখন একটি ফুল দেখতে পায় তখন চোখের স্বায়ুতন্ত্রী মস্তিষ্কে সে তথ্য পাঠিয়ে দেয়। এমতাবস্থায় তার বিচারবুদ্ধি এ দুই তথ্যের সমন্বয়ে গবেষণা করে এ উপসংহারে উপনীত হয় যে , ঐ ফুলটিই নাকে ভেসে আসা সুগন্ধির উৎস। এমনকি সে ঐ সময় চোখে ঐ ফুলটি দেখতে না পেলেও অতীত অভিজ্ঞতা থেকে মস্তিষ্কে সঞ্চিত তথ্যের সাথে বর্তমান তথ্য অর্থাৎ নাকের মাধ্যমে সংগৃহীত সর্বসাম্প্রতিক তথ্যকে মিলিয়ে নিয়ে বিচারবুদ্ধি উপসংহারে উপনীত হয় যে , আশেপাশে কোথাও অমুক ফুল রয়েছে এবং তা থেকেই এ সুঘ্রাণ আসছে।

বিচারবুদ্ধিজাত জ্ঞান

বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্) হচ্ছে মানুষের বস্তুগত শরীরকে আশ্রয় করে অবস্থানরত একটি অবস্তুগত শক্তি। বিচারবুদ্ধি হচ্ছে স্বয়ং জ্ঞানের উৎস , অন্যান্য তথ্য-আহরণ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদির পর্যালোচনা ও সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী তথা জ্ঞানের উৎপাদনকারী এবং তথ্য-আহরণ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদির ভুলত্রুটি নির্ণয়কারী।

বিচারবুদ্ধি স্বীয় অস্তিত্ব সম্বন্ধে জ্ঞানের অধিকারী ; এজন্য সে অন্য কোনো তথ্য-আহরণ মাধ্যমের দ্বারস্থ নয়। বিচারবুদ্ধি জ্ঞানের অস্তিত্বও অবগত - যা কোনো বস্তুগত বিষয় নয়। বিচারবুদ্ধি এমন অনেক অকাট্য বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক তথ্যাদি অবগত হতে পারে যা ইন্দ্রিয়নিচয়ের ধারণক্ষমতার বাইরে। যেমন: বিচারবুদ্ধি এ বিশ্বজগতের অস্তিত্বের পিছনে একজন স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্বন্ধে ধারণা করতে ও প্রত্যয়ে উপনীত হতে সক্ষম যদিও কোনো ইন্দ্রিয়েই স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রতিফলিত হয় না (অর্থাৎ ব্যক্তি চোখ দ্বারা স্রষ্টাকে দেখে নি , কান দ্বারা স্রষ্টার কথা শোনে নি , হাত দ্বারা তাঁকে স্পর্শ করে নি , ...)। তেমনি বিচারবুদ্ধি কোনো বস্তুর সাহায্য ছাড়াই সংখ্যার ধারণা করতে পারে , একমাত্রিক ও দ্বিমাত্রিক অস্তিত্ব (যা অবস্তুগত) সম্বন্ধে এবং অবস্তুগত ত্রিমাত্রিক অস্তিত্ব সম্বন্ধেও ধারণা করতে পারে। সে কল্পনা করতে পারে এবং কল্পনায় অনেক কিছু সৃষ্টি করতে পারে। তেমনি সে বস্তুগত সৃষ্টিতে রূপান্তর সাধনের পরিকল্পনা করতে পারে অর্থাৎ বাস্তবে রূপান্তর সাধনের পূর্বে সে কল্পনায় রূপান্তর সাধনের কাজ করে থাকে। আর এ সবের কোনোটিই ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান নয় যদিও এসব ক্ষেত্রে সে ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যাদি থেকে সাহায্য নিয়ে থাকতে পারে।

অতএব , বিচারবুদ্ধি হচ্ছে একটি স্বাধীন জ্ঞানমাধ্যম ও জ্ঞান-উৎস।

অনেকে (বস্তুবাদীরা) বিচারবুদ্ধির অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করে এবং দাবী করে যে , যে সব কাজকে বিচারবুদ্ধির কাজ বলে দাবী করা হয় তা আসলে মস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মাত্র। কিন্তু তাদের এ দাবী এ কারণে গ্রহণযোগ্য নয় যে , মস্তিষ্কের জ্ঞানকোষগুলো বস্তুগত উপাদানে তৈরী এবং তা প্রাপ্ত তথ্যাদি সঞ্চয় করে মাত্র ; এসব তথ্যের পর্যালোচনা , সমন্বয় সাধন , সংশোধন ও তা থেকে নতুন তথ্যে তথা উপসংহারে উপনীত হওয়ার জন্য অবশ্যই একটি স্বতন্ত্র হস্তক্ষেপকারী উপাদান অপরিহার্য। আর বস্তুজগতের বাইরের বিষয়ে তো নিজে নিজেই মস্তিষ্কে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হবার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ , এরূপ ক্ষেত্রে কোনোরূপ ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যের প্রভাব থাকে না। অতএব , এ ক্ষেত্রে একটি অবস্তুগত শক্তির প্রভাব বা হস্তক্ষেপ অপরিহার্য ; তা-ই হচ্ছে বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্)।

তাছাড়া বস্তুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া একমুখী অর্থাৎ হ্যা বা না হয়ে থাকে এবং প্রতিক্রিয়াটি টিকে থাকে বা বিলুপ্ত হয়ে যায়। বস্তুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা সন্দেহ-সংশয়ের বা বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় অনেক বিষয়েই উপসংহার বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে গিয়ে এ ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হই ; এ ধরনের অবস্থা বিচারবুদ্ধির অস্তিত্বই প্রমাণ করে।

এছাড়া সৌন্দর্যচেতনা , শিল্পকলা , সাহিত্য ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপেই বিচারবুদ্ধি ও অন্যান্য অবস্তুগত অভ্যন্তরীণ শক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট। উদাহরণস্বরূপ , একটি ছোটগল্প রচনা , গল্পটির সংক্ষেপণের প্রয়োজন অনুভব করা ও সংক্ষেপণের কাজ আঞ্জাম দেয়া ইন্দ্রিয়নিচয়ের কাজ নয় , বিচারবুদ্ধির কাজ।

যাই হোক , মোদ্দা কথা , বিচারবুদ্ধি এক অবস্তুগত অভ্যন্তরীণ শক্তি। অবশ্য তার প্রধান কর্মক্ষেত্র মস্তিষ্ক। তবে বিচারবুদ্ধিকে মস্তিষ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা ঠিক হবে না।

বিচারবুদ্ধি সম্বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে , তা অন্যান্য তথ্যসংগ্রহ মাধ্যম কর্তৃক সংগৃহীত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে সে সবের ভুল নির্ণয় ও নিরসন করতে পারে। বিচারবুদ্ধি বুঝতে পারে , চোখ সূর্যকে ছোট দেখলেও আসলে সূর্য অত ছোট নয় ; একই পানি দুই হাতে গরম ও ঠাণ্ডা অনুভূত হলেও আসলে ঐ পানির তাপমাত্রা একটিই , দু টি নয় , বরং দুই হাত ইতিপূর্বে দুই ধরনের তাপমাত্রায় ছিলো বলেই এরূপ অনুভব করছে ; গত রাতের জীবন বাস্তব বা বস্তুগত জগতের অভিজ্ঞতা ছিলো , কিন্তু গত রাতের স্বপ্ন বস্তুগত জগতের অভিজ্ঞতা ছিলো না , যদিও দু টি অভিজ্ঞতার একটিও এখন বর্তমান নেই ; ....।

অবশ্য বিচারবুদ্ধিও ভুল করতে পারে এবং ভুল উপসংহারে উপনীত হতে পারে। তবে বিচারবুদ্ধি পর্যালোচনা ও গবেষণার মাধ্যমে স্বীয় ভুল চিহ্নিত করে তা সংশোধন করতে পারে। কিন্তু ইান্দ্রিয়নিচয়ের সে ক্ষমতা নেই। যেমন: কোনো যান্ত্রিক উপকরণের সাহায্য গ্রহণ ছাড়াই খোলা চোখ একই জায়গা থেকে সূর্যকে লক্ষ বার দেখলেও ছোটই দেখতে পাবে।


3

4

5

6

7