সত্য কাহিনী সম্ভার

সত্য কাহিনী সম্ভার0%

সত্য কাহিনী সম্ভার লেখক:
: মাওলানা আলী আক্কাস
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: চরিত্র গঠনমূলক বই

সত্য কাহিনী সম্ভার

লেখক: শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহহারী
: মাওলানা আলী আক্কাস
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 26939
ডাউনলোড: 2706

সত্য কাহিনী সম্ভার
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 79 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 26939 / ডাউনলোড: 2706
সাইজ সাইজ সাইজ
সত্য কাহিনী সম্ভার

সত্য কাহিনী সম্ভার

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

এ বইটি তার বিষয়ের সর্বপ্রথম ও অনন্য অবতারণা হোক অথবা না হোক , এর জন্য প্রাপ্য ফুলের মামলার যোগ্য পাত্র আমি নই , অর্থাৎ যদি এ বইটি কাহিনী রচনার জগতে কোন গুরুত্বপূর্ণ নতুন অবতারণার দাবিদার হয় তাহলে তার গোড়াপত্তনকারী আমি নই। বরং প্রকাশনা ও প্রচারণার একটি প্রতিষ্ঠানে দেশের বিজ্ঞ বিজ্ঞ বিজ্ঞানী-গুণী কতিপয় ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি সম্পাদনা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ অধমও সে বোর্ডের একজন সদস্য। দেশের খ্যাতনামা লেখক ও বিজ্ঞতম ব্যক্তিত্ব সমৃদ্ধ সে বোর্ডের এক বৈঠকে প্রস্তাব রাখা হলো যে , এমন একটি গ্রন্থ রচিত হওয়া উচিত যার মধ্যে চারিত্রিক সুন্দর ও গুণাবলী কাহিনী আকারে উপস্থাপিত থাকবে। আর সে কাহিনীগুলো লেখকের নিজের মস্তিষ্ক থেকে আবিস্কৃত বা নিজের খেয়াল মোতাবেক তৈরি হবে না। বরং তার ভিত্তিমূল ও উৎস হবে হাদীস , বাস্তব জীবন ও ইতিহাসের গ্রন্থরাজি। এর সংকলনের উদ্দেশ্য থাকবে মুসলিম সমাজকে শিক্ষা দান এবং যুব সমাজকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন ও পরিচালনা করা।

66

বয়স্ক শিক্ষার্থী

সাক্কাকী একজন দক্ষ কারিগর ছিলেন। তিনি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক একটি দোয়াত তৈরি করলেন। যা বাদশাহর দরবারে পেশ করা যেতে পারে। তার আশা ছিল যে , বাদশাহ তার এ নিপুণ কারিগরি দক্ষতা দেখে এর প্রশংসা করে তাকে আরো উৎসাহিত করবেন। তাই তিনি অনেক আশা নিয়ে সে দোয়াতটি বাদশাহকে উপহার হিসাবে পেশ করলেন। প্রথমে বাদশাহ এর কারুকার্য দেখে খুব আকৃষ্ট হলেন। কিন্তু পরে এমন একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার অবতারণা হলো যা সাক্কাকীর জীবনে এবং চিন্তায় একটা অসাধারণ পরিবর্তন এনে দেয়।

যখন সময় বাদশাহ সে সুন্দর দোয়াতটির কারিগরি নিপুণতা লক্ষ্য করছিলেন এবং সাক্কাকী নানাবিধ কল্পনার জগতে হারিয়ে গিয়েছিলেন , ঠিক সে সময় লোকেরা এসে দরবারে সংবাদ দিল , একজন বড় আলেম , সাহিত্যিক ও ফকীহ (ইসলামী আইনজ্ঞ) বাদশাহর দরবারে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আলেম ব্যক্তি দরবারে এসে হাজির হলেন। বাদশাহ তাকে স্বাগতম জানানো ও তার সাথে কথাবার্তায় এমনভাবে লিপ্ত হলেন যে , সাক্কাকী ও তার কর্ম নিপুণতার কথা বাদশাহর স্মৃতি জগত থেকে হারিয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে সাক্কাকীর মনে গভীর পরিবর্তন সূচিত হলো।

তিনি বুঝতে পারলেন যে , এখন আর বাদশাহর পক্ষ থেকে তাকে উৎসাহিত করার মতো অবস্থা অবশিষ্ট নেই। এ অবস্থায় শাহী দরবারে কোন কিছু প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র। কিন্তু সাক্কাকীর নিপুণ কর্মদক্ষতা তাকে নিরবে বসে থাকতে দিল না। তিনি ভাবতে লাগলেন যে , এখন তিনি কি করবেন ? তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে , এখন আমাকে সে কাজটিই করতে হবে যা অন্যরা করেছেন। আমাকেও সে পন্থাই অবলম্বন করতে হবে যা এ পর্যন্ত অন্যরা অবলম্বন করে কৃতকার্য হয়েছেন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে , আমি আমার সমস্ত আশা-আকাঙ্খা জ্ঞান-গরিমা বই-পুস্তকের পাঠের মাধ্যমে সন্ধান করবো। কিন্তু এমন একজন বয়স্ক লোকের পক্ষে যিনি তার জীবনের যৌবন অংশটা অন্যান্য কাজে ব্যয় করেছেন , এখন ছোট ছোট শিশুদের সাথে লেখাপড়া করাটা সহজ ব্যাপার ছিল না। তথাপিও তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তখন এ ছাড়া তার জন্য বিকল্প কোন উপায়ও ছিল না। মাছ যখনই পানি থেকে তোলা হয় তখন তা তাজা থাকে।

কিন্তু সবচেয়ে বেশী অসুবিধার ব্যাপার ছিল এটা যে , প্রথম তার অন্তরে লেখাপড়ার প্রতি আন্তরিক আগ্রহ লক্ষ্য করলো না। হয়তো দীর্ঘকাল পর্যন্ত কারিগরি শিল্পে লিপ্ত থাকার কারণে তার শিক্ষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে একটা স্থবিরতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। তথাপিও তার বার্ধক্য ও যোগ্যতার স্বল্পতা তার সিদ্ধান্তের পথে বাধা হয়ে দাড়াতেঁ পারেনি। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে লেখাপড়ায় মনোযোগ দিলেন। এ সময় একটা ঘটনা ঘটলো :

শাফেঈ ফেকাহ-এর ওস্তাদ তাকে এ মাসআলাটি শিখিয়েছিলেন যে , ওস্তাদের আকীদা-বিশ্বাস হচ্ছে যে , কুকুরের চামড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পাকা করার পর তা পবিত্র হয়ে যায়। সাক্কাকী এ কথাটি কমপক্ষে দশবার পড়ে মুখস্থ করেছেন। যাতে করে পরীক্ষায় আসলে সঠিকভাবে লিখে পরীক্ষায় ভালো নম্বর লাভ করতে পারেন। কিন্তু পরীক্ষার সময় যখন তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে তখন তিনি জবাবে বললেন , কুকুরের আকীদা-বিশ্বাস হচ্ছে যে , ওস্তাদের চামড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পাকা করার পর তা পাক হয়ে যায়।

তার উত্তর শুনে উপস্থিত সকলেই হাসতে লাগলো। সকলেই ভাবতে লাগলো যে , বৃদ্ধ মানুষের মধ্যে লেখাপড়ার কোন যোগ্যতা নেই। এ ঘটনার পর সাক্কাকী সে মাদ্রাসা ছেড়েই শুধু চলে যাননি , বরং সে শহর ছেড়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেলেন। ঘটনাক্রমে তিনি এমন একটি পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে উপস্থিত হলেন যেখানে তিনি দেখতে পেলেন যে , একটি পাথরের উপর ফোঁটা ফোঁটা করে উপর থেকে পানি পড়ছে। আর এ ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার কারণে এ শক্ত পাথরটিতেও একটি ছিদ্র সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ তিনি বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন। ব্যাপারটি তার অন্তরে একটি বিরাট প্রভাব বিস্তার করলোতিনি বললেন , আমার মন লেখাপড়ারি প্র ত যদিও অনরক্ত নয় কিন্তু সেটা পাথরের মতো তো আর শক্ত নয়। কাজেই এটা ঠিক নয় যে , আমি রীতিমত পরিশ্রম করে লেখাপড়া করবো আর আমার জ্ঞান হাসিল হবে না। এ কথা ভেবেই তিনি আবার লেখাপড়ায় ফিরে গেলেন এবং জ্ঞান অর্জনের কাজে পূর্ণাঙ্গরূপে আত্মনিয়োগ করলেন। যার ফলে দেখা গেল অল্প কিছুদিন পর তিনি সে কালের নামকরা সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন।77

67

উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ

সার্ল-ডু-লিনা এর শিক্ষকমণ্ডলী তার ব্যাপারে একেবারে নিরাশ ও হতাশ হয়ে সকলে মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে , তার পিতার কাছে , যিনি ছিলেন শহরের পাদ্রী , প্রস্তাব রাখবেন যে , তিনি যেন তার ছেলেকে হস্তশিল্প ইত্যাদি কাজের প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করেন। কেননা তার মধ্যে লেখাপড়ার কোনো যোগ্যতা নেই। লেখাপড়া শেখার আশায় সময় নষ্ট করা একেবারে নিস্ফল। অতএব বেকার সময় নষ্ট করার চাইতে উত্তম কাজ হচ্ছে এটাই যে , এ সময়ে সে অন্য কোনো একটা ভালো কাজ শিখুক।

শিক্ষকমণ্ডলীর কথাবার্তা শুনে লিনার পিতামাতার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। তাদের বড় আশা ছিল যে , তাদের ছেলে লেখাপড়া করে একজন নামকরা বিজ্ঞ ব্যক্তি হবে। তাই তারা এ হতাশা-নিরাশার মধ্যেও তাদের ছেলেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু ক্ষমতার অভাবে তার লেখাপড়ার খরচ বাবদ তাকে খুব কম টাকা-পয়সাই দিয়েছিল , যার ফল এ দাঁড়ালো যে , যদি তার এক বন্ধু তাকে এ ক্ষেত্রে সাহায্য না করতো তাহলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে না খেয়ে মরতে হতো। লিনার পিতা-মাতার পছন্দ চিকিৎসাশাস্ত্রের ব্যাপারে তার মোটেও আগ্রহ ছিল না। বরং উদ্ভিদশাস্ত্রে তার ছিল বেশী ঝোঁক। শিশুকাল থেকেই সে ঘাস-পাতা ইত্যাদি খুব বেশি ভালোবাসে। তার এ অভ্যাস তার পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত। তার পিতার বাগানটি ছিল নানা রকম সুন্দর সুন্দর চারাগাছ ও লতা-পাতায় ভরপুর। লিনার যখন শিশু বয়স তখন সে যদি কান্নাকাটি করতো , তার মা তাকে বাগানে নিয়ে গিয়ে শান্ত্বনা দেবার জন্য তার হাতে একটি সুন্দর ফুল তুলে দিতেন। এতে লিনা সে সুন্দর ফুলটি হাতে নিয়ে খুব খুশি হতো।

সে যখন মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়ন করছিল তখন ফ্রান্সের প্রখ্যাত উদ্ভিদ বিজ্ঞানীর একটি বই হাতে পেয়েছিল। বইটি পড়ে গাছপালা , তরুলতা , পত্র-পল্লব অর্থাৎ উদ্ভিদ সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্জনের স্পৃহা তার মধ্যে জেগে উঠলো। সে সময়ে উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞদের সামনে উদ্ভিদের শ্রেণী বিন্যাসের বিষয়টি খবু জোরেশোরে আলোচনা চলছিল। এ বিজ্ঞানে বিশেষ ঝোঁক প্রবণতা থাকার কারণে লিনা উদ্ভিদের নর-মাদীর ভিত্তিতে এক বিশেষ শ্রেণী বিন্যাস নিরূপণের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণরূপে সফলতা অর্জন করে। তাই সে এ বিষয়ে একটি বিরাট গ্রন্থ রচনা করে যা সেকালের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটা বিরাট অবদান রেখেছিল এবং অত্যন্তখ্যাতি অর্জন করেছিল। তার সে গ্রন্থটি প্রকাশিত হবার পর মেডিকেল কলেজের কর্তৃপক্ষ ভাবতে লাগলেন যে , লিনাকে তার গবেষণা-কার্যে সহযোগিতা করার জন্য কলেজের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে। কিন্তু অন্য কিছু লোকের প্রতিহিংসার কারণে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

লিনা তার সফলতার সিঁড়ি অতিক্রম করে শীর্ষে উপনীত হলো। সে তার জীবনে প্রথম বারের মতো সফলতা অর্জন করার স্বাদ আস্বাদন করলো। কিন্তু তার এ সফলতার বিশেষ গুরুত্ব সে অনুধাবন করতে পারেনি। সে এ উদ্ভিদ জগতে নতুন নতুন আবিষ্কার উদ্ভাবনের কাজে নিজেকে পুরোদমে আত্মনিয়োগ করলো। কিছুদিন পর সে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধিক দক্ষতা অর্জনের জন্য এক দীর্ঘ সফরের উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। সফর সামগ্রী হিসেবে একটি বাক্স , কিছু কাপড়-চোপড় , একটা ক্যামেরা ও কিছু কাগজপত্র নিজের সঙ্গে নিল। তারপর পদব্রজে সফর শুরুকরলো। সে সীমাহীন কষ্ট-ক্লেশ স্বীকার করে প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার রাস্তা ভ্রমণ করেছে। এ সফরে সে নানাবিধ মূল্যবান জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অসামান্য অভিজ্ঞতার এক অমূল্য ধনভাণ্ডার সাথে নিয়ে দেশে ফিরেছে। প্রায় তিন বছর পর 1735 সালে দেশের অবস্থা-পরিবেশ প্রতিকূল হওয়ার কারণে সে সুইডেন থেকে হামবুর্গ চলে গেল। এ সফরে লিনা অনেক দুর্লভ বস্তু সংগ্রহ করেছিল। তাই সে এ বস্তুগুলো হামবুর্গের যাদুঘরের পরিচালককে দেখিয়েছিল। এ জিনিসগুলোর মধ্যে নীল রংয়ের একটি সাপও ছিল যার মাথা ছিল সাতটি। সাপটির সাতটি মাথাই ছিল একই ধরনের। যাদুঘর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করলেন। বিচারপতি লিনার আগমনের ব্যাপারটিকে কুলক্ষণ ধারণা পোষণ করে খুবই অসন্তুষ্ট হলেন এবং তাকে শহর থেকে বের করে দেয়ার জন্য নির্দেশ জারী করলেন। এর পরও সে তার সফর অব্যাহত রাখলো। এ সফরের মধ্যেই সে তার চিকিৎসা শাস্ত্রের ডাক্তারীর সনদ হাসিল করার জন্য নিজের গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি করে নিল। এ পর্যায়ে সে তার রচিত বিরাট গ্রন্থ প্রকৃতির শক্তি তার সফরকালেই লীদন শহর থেকে প্রকাশ করলো। এ গ্রন্থ প্রকাশের ফলে তার অসাধারণ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জিত হলো। এর ফলে আমস্টারডামের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী তার সামনে একটি প্রস্তাব রাখলো , আমি আপনার জন্য একটি বিরাট ও সুন্দর বাগানের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি , যেখানে বসে আপনি ব্যাপক গবেষণা কার্য চালাতে পারেন। সে এ কথা মেনে নিল এবং নিজের একজন সহকারীকে সাথে নিয়ে সে বাগানে বসে তার জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণা-কার্য শুরুকরে দিল। এরপর সে ফ্রান্সেও ভ্রমণ করেছে। সেখানে সে মাউদন নামক জঙ্গল থেকে নানা প্রকার উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করেছে। অবশেষে লিনা বিদেশ-বিভূঁইয়ে কষ্টের কারণে এবং নিজের মাতৃভূমির ভালোবাসায় অনুরক্ত হয়ে সুইডেনে ফিরে আসে। এবার তার দেশবাসীরা তার বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার কারণে তাকে এক অসাধারণ সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করলো। তাকে তার কাজের জন্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা সহজ করে দিল। এটাই তার সে মাতৃভূমি-যেখানে তার শিক্ষকরা তাকে শিক্ষা দানে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন।78

68

বক্তা

ডুমুসটেন্স প্রাচীন গ্রীসের একজন বিখ্যাত বক্তা ও রাজনীতিক ছিলেন। তিনি প্রখ্যাত দাশনির্ক এরিস্টোটলের সাথে একই বছরে জন্মগ্রহণ এবং একই বছরে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার কিছুদিন পূর্বে একটা বক্তৃতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ বক্তৃতা দ্বারা তার উদ্দেশ্য কেবল এটাই ছিল না যে , তিনি লোকদের উপর তার জ্ঞানের প্রভাব বিস্তার করবেন। তিনি তার এ বক্তৃতা দ্বারা এটাও প্রমাণ করতে চাননি যে , তিনি আদালতের দরবারে দাঁড়িয়ে ওকালতির কাজ পরিচালনার ব্যাপারে যোগ্যতার অধিকারী। বরং তিনি তার বক্তৃতার মাধ্যমে সে সমস্তলোকের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করতে চাচ্ছিলেন , যারা তার শিশুকালে পিতার পরিত্যক্ত বিরাট সম্পত্তি দখল করে নিয়েছিল। অথচ তারা তার পিতার ওসী ছিল ও আর তার অভিভাবক ছিল।

প্রথমে তিনি সম্ভাব্য সকল চেষ্টাই করেছিলেন। কিন্তু পৈত্রিক সম্পত্তি কোন কিছুই হস্তগত করতে সক্ষম হননি। তাতে তিনি এ আমানতের খেয়ানতের বিষয়টি জনসাধারণের সামনে আলোচনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রথম প্রথম তার বক্তৃতায় লোকদের অন্তর জয় করতে পারেননি। এ কারণে লোকেরা তাকে একটু সাহস যোগানোর বদলে তার বক্তৃতার খুঁত বের করতে লাগলো। কেউ কেউ তার বিষয়বস্তুর ভুল-ভ্রান্তিতুলে ধরতো। আবার কেউ তার বাচনভঙ্গির দোষত্রুটি বের করতো। কিন্তু এতোসব প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও তিনি তার অসাধারণ যোগ্যতা , পরিশ্রম এবং বন্ধু-বান্ধবদের অনুপ্রেরণায় উৎসাহিত হয়ে এ জাতীয় সকল দুর্বলতা সম্পূর্ণরূপে দূর করলেন। তিনি নির্জন একটি স্থান বেছে নিলেন এবং সেখানে একাকী বক্তৃতার অনুশীলন শুরু করলেন। তিনি তার ভাষার ত্রুটিকে দূর করার জন্য মুখের মধ্যে নুড়ি রেখে অত্যন্ত উচ্চস্বরে কবিতা আবত্তিৃ করতেন। যাতে করে তার আওয়াজ ভাল হয়ে যায়। তিনি তার শ্বাসকে দীর্ঘ ও শক্তিশালী করার জন্য বড় বড় কবিতাগুলোকে উচ্চস্বরে পাঠ করতেন। অধিকাংশ সময় তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতার অনুশীলনও করতেন। যাতে করে নিজেই নিজের বক্তৃতার সময়কালীন মুখের বিভিন্ন আকৃতি ও ভঙ্গিমার চিত্রগুলো দেখে অনুমান করতে পারেন। আর তাতে যেনো তার ভয়-ভীতি দূর হয়ে যায়। যা হোক এভাবে শ্রম-সাধনা ও আগ্রহ-উদ্দীপনার দ্বারা বক্তৃতার ময়দানে অত্যন্ত উন্নিত করেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই তিনি বিশ্বের একজন নামকরা বক্তারূপে পরিগণিত হতে লাগলেন।79

69

তায়েফ সফরের ফল

রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর চাচা জনাব আবু তালিব (আঃ) ও স্ত্রী হযরত খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদ অল্প দিনের ব্যবধানে দুইজনই এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। এভাবে আল্লাহর নবী (সাঃ) এমন একজন চাচার স্নেহ-মায়া থেকে বঞ্চিত হলেন যিনি বাইরের সমস্তবিপদ প্রতিহত করতেন এবং তাকে রক্ষা করতেন। এর অল্প কিছুদিন পরেই তার জীবন সঙ্গিনী হযরত খাদিজা (আঃ)-কে হারালেন। যিনি ঘরের অভ্যন্তরে তার আত্মার প্রশান্তি যোগাতেন।

হযরত আবু তালিবের মৃত্যুতে রাসূল (সাঃ) খুবই দুঃখ ভারাক্রান্ত হলেন। তার মৃত্যুর কারণে কোরাইশ কাফেররা আল্লাহর নবীকে নানাভাবে কষ্ট দেবার এবং উত্যক্ত করার সুযোগ পেয়ে যায়। তাই তারা ইসলাম প্রচারের পথে সম্ভাব্য সব রকমের বাধা সৃষ্টি করতে লাগলো। জনাব আবু তালিবের মৃত্যু হয়েছে বেশী দিন হয়নি , এমন সময় একদিন মহানবী (সাঃ) রাস্তা দিয়ে পথ চলছিলেন , তখন লোকেরা রাসূলের মাথার উপর নোংরা-ময়লা নিক্ষেপ করলো। এতে তাঁর সমস্ত দেহ ধুলা-বালি-ময়লায় ভরে গেল। এ অবস্থায় তিনি বাড়ি ফিরে আসলেন। এ সময় তার প্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমা যাহরা (রাঃ) দৌঁড়ে কাছে এলেন এবং পিতার মাথা ও দেহ থেকে ময়লাগুলো সাফ করতে লাগলেন। রাসূল (সাঃ) লক্ষ্য করে দেখলেন যে , প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতিমার দুইচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তিনি বললেন , মা আমার! কেঁদো না! আর খুব বেশী দুঃখও করো না। তোমার আব্বা একা নন। বরং মহান আল্লাহ তার সহায় আছেন।

এ ঘটনার পর একদিন আল্লাহর নবী (সাঃ) ইসলাম প্রচারের কাজে মক্কা নগরী থেকে একা একা বের হলেন। ছাকীফ কাবিলার মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য তিনি তায়েফের দিকে চললেন। তায়েফ ভালো আবহাওয়া ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের স্থান হিসেবে পরিচিত। মক্কার ধনী লোকেরা এখানে ভ্রমণের জন্য আসা-যাওয়া করে থাকে।

তায়েফের লোকদের ব্যাপারে তেমন কোনো আশাপ্রদ অবস্থা ছিল না। তাদের ধ্যান-ধারণাও ঠিক তেমনি ছিল যেমনটি ছিল কা বা ঘরের আশপাশে বসবাসকারী মক্কার অন্যান্য অধিবাসীদের। এখানকার লোকেরাও মূর্তিপূজার ছায়াতলে থেকে আরাম-আয়েশের জীবন যাপনে বিশ্বাসী ছিল।

কিন্তু রাসূলে আকরাম (সাঃ) নিঃরাশ ও হতাশ হবার পাত্র ছিলেন না। তিনি এ সমস্তকষ্ট-ক্লেশের ব্যাপারে বরাবর চিন্তা-ভাবনা করতেন। শুধু তাই নয় বরং তিনি লোকদের অন্তর জয় করার জন্য বড়ো থেকে বড়ো কঠোর বিপদাপদের মোকাবিলা করতেও সব সময় প্রস্তুত থাকতেন।

তিনি তায়েফ নগরীতে গেলেন। তায়েফবাসীদের কাছ থেকেও সে সব কথাবার্তাই শুনলেন যা অধিকাংশ সময় মক্কাবাসীদের কাছ থেকে শুনতে পেতেন। একজন বললো , জগতে কি আর কোনো লোক ছিল না যে , মহান আল্লাহ তোমাকেই নবী বানিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। আরেকজন বললো , কা বা ঘরের গিলাফের কসম করে বলছি তুমি আল্লাহর নবী নও। অপর এক ব্যক্তি তাকে বললো , আমি তোমার সাথে কোনো কথা বলতে আদৌ প্রস্তুত নই। মোটকথা তায়েফের লোকেরা এভাবে রাসূলের মন ভেঙ্গে দেয়ার মত জবাব দিতে আরম্ভ করলো।

এক কথায় বলা যায় যে , তায়েফের লোকেরা রাসূলে খোদা (সাঃ)-এর দাওয়াতে মোটেও সাড়া দিল না। শুধু তাই নয় বরং তারা শহরের গুণ্ডা-পাণ্ডাদের লেলিয়ে দিয়ে বললো , একে শহর থেকে বের করে দাও। আবার এমনটি না হয়ে যায় যে , সহজ-সরল লোকেরা তার দাওয়াতের শিকারে পরিণত হয়ে যায়। সুতরাং তারা আল্লাহর নবীর উপর পাথর নিক্ষেপ করতে লাগলো। তার সাথে সাথে নানা রকম গালিও দিতে থাকলো। এভাবে মারাত্মকভাবে আহত করে রাসূল (সাঃ) কে শহর থেকে বের করে দিল। আহত ও যখমপ্রাপ্ত হয়ে মহানবী (সাঃ) শহরের বাইরে একটি বাগানে চলে গেলেন। এ বাগানটি ছিল কোরাইশের ওতবা ও শাইবা নামক দুইজন ধনী ব্যবসায়ীর। ঘটনাক্রমে বাগানের মালিক দুইজনও তখন বাগানে উপস্থিত ছিল। তারা দূর থেকে দাঁড়িয়ে রাসূলের সাথে কৃত এ দৃশ্যাবলী প্রত্যক্ষ করছিল। আল্লাহর নবীর এ অবস্থা দেখে তারা খুব খুশী হলো।

কিছুক্ষণ পর তায়েফের পাষণ্ডরা ফিরে চলে গেল। মহানবী (সাঃ) ওতবা ও শাইবার থেকে দূরে এক স্থানে গাছতলায় বসে গেলেন। তিনি ছিলেন একেবারে একা। কেবলমাত্র তার প্রভুই তাঁর সাথে ছিলেন। সুতরাং তিনি মহান আল্লাহর কাছে নিজের মনের সমস্তভেদ খুলে বলতে লাগলেন।

তিনি বললেন , হে আমার মালিক আল্লাহ! তোমার দরবারে আমার দুর্বলতা ও শক্তিহীনতার ফরিয়াদ জানাই , এ জনপদের লোকদের দুর্ব্যবহার ও কষ্ট দেয়ার অভিযোগ জানাই। এরা আমার পথে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করেছে। হে পরম দয়ালু খোদা! তুমিই নিঃস্ব-অসহায় লোকদের প্রভু। তুমিই আমারি প্রতিপালক। তুমি আমাকে কোন সমাজে ছেড়ে দিয়েছো ? এরা আমাকে আহত করছে। আমার সাথে অচেনা-অজানা অনাত্মীয়দের মতো আচরণ করছে। তুমি কি দুশমনকে আমার উপর প্রাধান্য দান করছো ? হে বিশ্ব জাহানের মালিক! আমি খুব ভালোভাবে জানি যে , আমার উপর যে সব জুলুম-অত্যাচার চাপানো হচ্ছে , আমি তার যোগ্য পাত্র নই। তবুও সর্বাবস্থায় তোমার সন্তুষ্টি বিধানই আমার কাম্য। তুমি যদি আমার প্রতি রাজী থাকো , তাহলে এসব কিছুকে আমি মোটেও পরোয়া করবো না। আমি তোমার মহান নূরের সে ছায়াতলে আশ্রয় চাচ্ছি , যা সমগ্র বিশ্বের অন্ধকারকে বিদূরিত করেছে এবং অন্ধকার পৃথিবী উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে। তোমারই নির্দেশে ইহকাল ও পরকালের সব কিছু সন্নিবেশিত হয়েছে। তুমি যদি তোমার পক্ষ থেকে আমার উপর আযাব নাযিল করো তাতেও আমি তোমার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সব কিছুকে নত শিরে গ্রহণ করে নিতে প্রস্তুত রয়েছি। প্রতিনিয়ত আমার চেষ্টা-সাধনা কেবল এটাই যে , তুমি আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকো। নিখিল জাহানে তোমার চেয়ে বড় শক্তিশালী আর কেউ নেই। তুমিই সমস্তসৃষ্টির উপর ক্ষমতাবান।

বাগানের মালিক ওতবা ও শাইবা রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর এ অবস্থা দেখে খুশী হয়েছিল ঠিকই। কিছু আত্মীয়ের বিবেচনায় তারা তাদের গোলাম আদ্দাসকে হুকুম দিল , কিছু আঙ্গুর নিয়ে গিয়ে ঐ লোকটির সামনে রেখে দাও। তারা খৃস্টধর্মে বিশ্বাসী সে গোলামটিকে আরো বলে দিল , আঙ্গুর দিয়ে সাথে সাথেই সেখান থেকে চলে আসবে।

আদ্দাস আঙ্গুর নিয়ে বিশ্বনবীর কাছে এলো এবং আঙ্গুর সামনে রেখে দিয়ে বললো , এগুলো খেয়ে নিন। রাসূলে আকরাম (সাঃ) আঙ্গুর হাতে নিলেন এবং খাবার আগে বললেন , আল্লাহর নামে।

আদ্দাস এর আগে কখনোও এ কথা শুনেনি। জীবনে প্রথম বারের মতো সে এ ধরনের কথা শুনতে পেলো। সে রাসূলের মুখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বললো , এ কথা তো এখানকার লোকদের প্রচলিত কথা নয়। আমি তো এ এলাকার লোকদের মুখে এ জাতীয় কথা কোনোদিন শুনতে পাইনি। আপনি এটা কি কথা বললেন ?

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বললেন , হে আদ্দাস! তুমি কোথাকার অধিবাসী ? তোমার ধর্ম কি ?

জবাবে সে বললো , মূলত আমি নাইনেওয়ার অধিবাসী। আর আমি খৃস্ট ধর্মে বিশ্বাসী।

রাসূল (সাঃ) বললেন , তুমি নাইনেওয়াবাসী অর্থাৎ ইউনুস বিন মাত্তা-এর মতো খোদার নেক বান্দার দেশ ?

সে বললো , আমি হতবাক হচ্ছি! আমি বুঝতে পারছি না যে , ইউনুস বিন মাত্তা-এর নাম আপনি কি করে জানালেন ? যে সময় আমি নাইনেওয়াতে বসবাস করতাম সেখানে তখন এমন দশজন লোকও ছিল না যারা ইউনূসের মা-বাবার নাম জানতো। আমার আশ্চর্য লাগছে যে , আপনি কি করে তার নাম জানলেন ?

মহানবী (সাঃ) বললেন , ইউনুস আমার ভাই! তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী। আমিও আল্লাহর নবী।

ওতবা ও শাইবা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল যে , আদ্দাস আলাপ-আলোচনায় লিপ্ত। তারা অস্থির হয়ে গেল। বরাবরই তাদের চেষ্টা-তদবির এটাই থাকতো যে , কোনো লোক যেন নবীর সাথে দেখা- সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা বলতে না পারে। তারা খুব ভালোভাবে জানতো যে , অল্প কিছু সময় আলাপ- আলোচনা করার পরই লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। যা হোক তারা যা ভেবেছিল তাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। হঠাৎ তারা দেখতে পেলো যে , আদ্দাস মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর হাত-পায়ে চুম্বন করতে লাগলো। তারা একজন আরেকজনকে উদ্দেশ্য করে বললো , দেখলে এ গোলামটিকেও সে পথভ্রষ্ট করেছে।80

70

আবু ইসহাক সাবী

আবু ইসহাক সাবী চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর একজন খ্যাতানাম বিজ্ঞ পন্ডিত। তিনি কিছুদিন আব্বাসীয় খলিফার দরবারে এবং একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইযযুদ্দৌলা বখতিয়ার আলে বুইয়ার দরবারে চাকরি করতেন। আবু ইসহাক সাবী যে খান্দানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন , সে বংশের লোকেরা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু নবুয়্যতে ছিল তারা অবিশ্বাসী। ইযযুদ্দৌলার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল যে , আবু ইসহাক ইসলাম গ্রহণ করুক। কিন্তু তিনি তার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হন। আবু ইসহাক রমযান মাসে মুসলমানদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রোযাও রাখতেন। পবিত্র কোরআন মজীদও তার মুখস্থ ছিল। তিনি তার চিঠিপত্র ও অন্যান্য লিপিপত্রে কোরআনের আয়াতের উদ্ধৃতির উল্লেখ করতেন।

আবু ইসহাক একজন বিজ্ঞ সাহিত্যিক ও নামকরা কবি ছিলেন। তার সময়ে সম্মানের উচ্চাসনে সমাসীন এবং কালের শ্রেষ্ঠ কবি সাইয়্যেদ শরীফ রাজীর সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। 384 হিজরী সালে আবু ইসহাক মৃত্যুবরণ করেন। সাইয়্যেদ রাজী তার এ প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে সমবেদনা জ্ঞাপন করে একটি শোকগাঁথা রচনা করেছেন যার বিষয়বস্তু হলো এই :

*তোমরা কি দেখেছো , কতো উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের মৃত্যু ঘটেছে ? তোমরা কি প্রত্যক্ষ করেছো , কিভাবে স্তব্ধ হয়ে গেছে জলসা মাহফিলের মোমবাতিটি ?

*এমন এক হিমাদ্রি লুটিয়ে পড়েছে ভুতলে , এ ভার-ভারিক্কি পাহাড় যদি সমুদ্রে নিপতিত হতো , তাহলে সমুদ্র উঁপচে উঠতো আর তার উপরিভাগ কানায় কানায় ভরে যেতো।

*তোমার মৃত্যুর আগে আমার বিশ্বাস জগতে কখনও এ কথা স্থান করে নিতে পারেনি যে , মাটি তোমার মত এক মহাপর্বতকেও তার অভ্যন্তরে লুকিয়ে নিতে পারে।81

এরপর কিছু সংখ্যক ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন লোক সাইয়্যেদ রাজীকে তিরস্কার করে বলতে লাগলো , আপনার ন্যায় একজন রাসূল সন্তানের পক্ষে কখনো সঙ্গত হয়নি যে , সাবীর মতো একজন বিধর্মী লোকের মৃত্যুতে শোকগাঁথা লিখে দুঃখ প্রকাশ করা। সাবী যেখানে ইসলামকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে।

জবাবে সাইয়্যেদ রাজী বললেন , আমি আবু ইসহাক সাবীর শোকগাঁথা তার জ্ঞান ও মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি রেখে লিখেছি , বরং বস্তুত পক্ষে আমার এ শোকগাঁথা তার জ্ঞান ও মর্যাদার প্রতিই নিবেদিত।82