সত্য কাহিনী সম্ভার

সত্য কাহিনী সম্ভার0%

সত্য কাহিনী সম্ভার লেখক:
: মাওলানা আলী আক্কাস
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: চরিত্র গঠনমূলক বই

সত্য কাহিনী সম্ভার

লেখক: শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহহারী
: মাওলানা আলী আক্কাস
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 18252
ডাউনলোড: 1810

সত্য কাহিনী সম্ভার
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 79 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 18252 / ডাউনলোড: 1810
সাইজ সাইজ সাইজ
সত্য কাহিনী সম্ভার

সত্য কাহিনী সম্ভার

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

এ বইটি তার বিষয়ের সর্বপ্রথম ও অনন্য অবতারণা হোক অথবা না হোক , এর জন্য প্রাপ্য ফুলের মামলার যোগ্য পাত্র আমি নই , অর্থাৎ যদি এ বইটি কাহিনী রচনার জগতে কোন গুরুত্বপূর্ণ নতুন অবতারণার দাবিদার হয় তাহলে তার গোড়াপত্তনকারী আমি নই। বরং প্রকাশনা ও প্রচারণার একটি প্রতিষ্ঠানে দেশের বিজ্ঞ বিজ্ঞ বিজ্ঞানী-গুণী কতিপয় ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি সম্পাদনা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ অধমও সে বোর্ডের একজন সদস্য। দেশের খ্যাতনামা লেখক ও বিজ্ঞতম ব্যক্তিত্ব সমৃদ্ধ সে বোর্ডের এক বৈঠকে প্রস্তাব রাখা হলো যে , এমন একটি গ্রন্থ রচিত হওয়া উচিত যার মধ্যে চারিত্রিক সুন্দর ও গুণাবলী কাহিনী আকারে উপস্থাপিত থাকবে। আর সে কাহিনীগুলো লেখকের নিজের মস্তিষ্ক থেকে আবিস্কৃত বা নিজের খেয়াল মোতাবেক তৈরি হবে না। বরং তার ভিত্তিমূল ও উৎস হবে হাদীস , বাস্তব জীবন ও ইতিহাসের গ্রন্থরাজি। এর সংকলনের উদ্দেশ্য থাকবে মুসলিম সমাজকে শিক্ষা দান এবং যুব সমাজকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন ও পরিচালনা করা।

71

সত্যের সন্ধানে

ওনওয়ান বসরী সত্যের সন্ধানে সব সময় লেগে থাকতো। তার যথাসাধ্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা এটাই যে , ইয়াক্বীনের সর্বশেষ প্রান্তসীমায় পৌঁছে যাবে। (ইয়াক্বীনের অবস্থা হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগতে পরিভ্রমণ করে ঈমানের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়া)।

একবার সে সফরের কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করে মদীনায় গিয়ে উপস্থিত হলো। সে সময় মদীনা ছিল ইসলাম প্রচারের প্রাণকেন্দ্র। সব সময় ফকীহ ও মুহাদ্দেসগণের ভীড় লেগে থাকতো। মদীনায় পৌঁছে সে তৎকালীন বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস মালিক ইবনে আনাসের শিষ্যদের অন্তর্ভুক্ত হলো।

প্রচলিত নিয়ম মাফিক মালিক ইবনে আনাসের এখানে রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর হাদীসসমূহ সংগ্রহ ও জমা করার ধারা অব্যাহত ছিল। অন্যদের মতো ওনওয়ান বসরীও রাসূলের হাদীস লেখা পড়ার কাজ শুরুকরে দিল। এখানে সমস্ত শিক্ষার্থীকেই হাদীসের শিক্ষা দান করা হতো। সাথে সাথে তাদেরকে এটাও শিক্ষা দেয়া হতো যে , হাদীসের সনদ কিভাবে নির্ণয় করা যায়।

ওনওয়ান বসরীর অন্তরে পূর্ব থেকেই সত্য সন্ধানের আগ্রহ বর্তমান ছিল। সুতরাং এ কাজে সে আত্মতৃপ্তি লাভ করলো এবং অত্যন্ত তুষ্টচিত্তে অনুসন্ধান কর্মের দ্বারা আত্মার খোরাক সংগ্রহ করতে থাকলো। সে সময় হযরত ইমাম জা ফর সাদিক (আঃ) মদীনায় উপস্থিত ছিলেন না। কিছুদিন পর তিনি মদীনায় ফিরে এলেন। ওনওয়ানের অন্তরে এ চিন্তা জাগলো যে , সে কিছুদিন ইমাম জা ফর সাদিক (আঃ)-এর শিষ্যত্বও গ্রহণ করবে। তাই সে মালিক ইবনে আনাসের দরবার ত্যাগ করে ইমাম সাদিক (আঃ)-এর খেদমতে চলে গেল।

কিন্তু ইমাম (আঃ) তার আগ্রহের মধ্যে আরো তীব্রতা আনয়নের জন্য কিছুদিন পর্যন্ত তার থেকে এড়িয়ে চললেন। একদিন ইমাম (আঃ) তার আবেদনের জবাবে বললেন , আমি অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। আমার একেবারেই অবসর নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শিক্ষা-দীক্ষার ধারা অব্যাহত রাখতে হয়। আমার কাছে এতটুকুন সময় নেই যে , আমি তোমার আশা পূরণ করবো। অতএব তুমি আগের মতোই মালিক ইবনে আনাসের শিক্ষাঙ্গনেই ফিরে যাও। আমি এখন তোমাকে শিক্ষা দানে অপারগ । আমার কাছে সময় থাকলে আমি অবশ্যই তোমার মনোবাঞ্ছা পূরণ করার চেষ্টা করতাম।

ইমামের জবাব শুনে সে খুবই দুঃখিত হলো। আর নিজেকে তিরস্কার করতে লাগলো। সে বললো , যদি আমার মধ্যে যোগ্যতা ও সামর্থ্য থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই ইমাম আমার আবেদন গ্রহণ করে নিতেন। তাই সে ভারাক্রান্তমনে মসজিদে নববীতে চলে গেল। নবীর রওজায় সালাম নিবেদন করে বাড়ীর দিকে চলে গেল। তার চোখে-মুখে ছিল বেদনা-ব্যথা ও দুঃখের ছাপ।

দ্বিতীয় দিন সে বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা চলে গেল রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর রওজা শরীফে। সেখানে গিয়ে সে দুই রাকাত নামায আদায় করে মহান আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে কান্নাকাটি করে ফরিয়াদ জানাতে লাগলো :

হে আমার পালনকর্তা আল্লাহ! তুমি সকলের অন্তর্যামী। তোমার দরবারে আমার আরাধনা কেবল এটাই যে , হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)-এর অন্তর আমার প্রতি সদয় করে দাও যেনো আমার প্রতি তাঁর সুদৃষ্টি পতিত হয়। আমি যেনো তারঁ শিষ্য হবার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি। তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করে যেনো তোমার সরল সঠিক পথের সন্ধানে কঠিন অবস্থার সম্মুখীন না হই।

নামায ও দোয়া প্রার্থনার পর সে বাড়ি ফিরে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে অনুভব করতে লাগলো যে , তার অন্তরে ইমাম সাদিক (আঃ)-এর ভালোবাসা বেড়েই চলেছে। ভালোবাসা বৃদ্ধির সাথে সাথে তার দুঃখ-বেদনাও বাড়তে থাকে। আর বলে , আফসোস! ইমাম সাদিক (আঃ)-এর শিষ্য হবার সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারলাম না। এ দুঃখ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাই সে নিজের ঘর ছেড়ে আর কোথাও যেতো না। কেবল ফরয নামায আদায় করার জন্য মসজিদে যেতো। বাকী সময় ঘরের মধ্যেই কাটিয়ে দিতো। আর তার মনের মধ্যে নানা রকম চিন্তা-ভাবনা আলোড়িত হতে থাকতো। একদিকে ইমামের অপারগতা প্রকাশ , অপর দিকে ইমামের শিষ্যত্ব গ্রহণের আগ্রহের আধিক্য তার হৃদয়ে বেড়েই চলছিল। তাই মাঝে মাঝে বলতো , হায় যদি এমন কোন পথ খুলে যেতো যে , ইমাম আমাকে তার শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। মোটকথা তার মধ্যে একটা অত্যাগ্রহের অবস্থা বিরাজিত করছিল। তার ব্যথা-বেদনা বেড়েই চলেছে। সীমাহীন দুঃখ-বেদনার কারণে দিনের পর দিন সে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অবশেষে একদিন তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। সে পুনরায় ইমামের দরবারে গিয়ে হাজির হলো।

দরবারের খাদেম জিজ্ঞাসা করলো , বলুন , কি কাজ।

সে বললো , তেমন কোন কাজ নেই। আমি তো কেবলমাত্র ইমামের খেদমতে সালাম নিবেদন করতে এসেছি।

খাদেম বললো , ইমাম এখন নামায আদায় করছেন।

কিছুক্ষণ পরে খাদেম এসে বললো , আসুন।

ওনওয়ান বসরী ঘরে প্রবেশ করলো। ইমামকে দেখেই সালাম নিবেদন করলো। ইমাম তার সালামের জবাব দিলেন এবং তার জন্য দোয়াও করলেন। তারপর ইমাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন , তোমার ডাক নাম কি ? সে বললো , আবু আব্দুল্লাহ।

ইমাম তার জন্য দোয়া করে বললেন , মহান আল্লাহ তোমার এ নামের হেফাজত করুন। তোমার তওফিক আরো বাড়িয়ে দিন।

ইমামের এ দোয়ার বাণী শুনে সে মনে মনে ভাবতে লাগলো যে , যদি আর কিছ নাও হাসিল হয় , তাহলে এ দোয়াই আমার জন্য যথেষ্ট। তারপর ইমাম জিজ্ঞাসা করলেন , বলো! তোমার কাজ কি ? কোন উদ্দশ্যে তুমি আমার এখানে এসেছো ?

সে বললো , আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম যে , আপনার অন্তরে আমার জন্য একটু স্থান করে দিতে যাতে করে আমি আপনার জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উপকৃত হতে পারি। আমার বিশ্বাস যে , আমার দোয়া মঞ্জুর হয়েছে।

ইমাম বললেন , হে আবু আবদুল্লাহ! আল্লাহর মা রেফাত ও ইয়াক্কীনের আলো এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে এবং দ্বারে দ্বারে তালাশ করে হাসিল হয় না। অন্য কেউ তোমাকে ইয়াক্কীনের নূর দিতে পারে না। এটা শিক্ষা করার বিষয় নয় , বরং এটা হচ্ছে সে নূর যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্জিত হয়। আল্লাহ যখন তাঁর কোন বান্দাকে হেদায়েত করার ইচ্ছা করেন , তখন তার অন্তরে এ নূরে-ইয়াক্কীন সৃষ্টি করে দেন। যদি তুমি খোদার মা রেফাত ও নূরে ইয়াক্কীনের সন্ধানী হও , তাহলে আল্লাহর গোলামী ও বন্দেগীর গভীরে নিজের অন্তর আত্মায় সন্ধান করো। আমলের পথেই ইলম খুঁজ। আর তাঁর কাছে দোয়া প্রার্থনা করো। তিনিই তোমার অন্তর নূরে ইয়াক্কীন দিয়ে ভরপুর করে দেবেন।83

72

ইয়াক্বীনের অনুসন্ধান

নিজামিয়া-ই-বাগদাদ ও নিজামিয়া-ই-নিশাপুর এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় সালজুকী শাসনামলের উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিরাট এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য ছাত্রের ভিড় লেগেই থাকতো। 450 থেকে 478 হিজরী পর্যন্ত সময়কালে নিজামিয়া-ই-নিশাপুরের উপাচার্যের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন আবুল মাআলী ইমামুল হারামাইন জুওয়াইনী । দূর-দূরান্ত থেকে আগত হাজার হাজার ছাত্র তার শিক্ষা ক্লাসে অংশগ্রহণ করতো। তার সমস্ত ছাত্রের মধ্যে থেকে তিনি তিনজন যোগ্য ছাত্রের প্রতিভা ও অসাধারণ স্মরণশক্তি প্রত্যক্ষ করে তাদের প্রতি অভিভূত ছিলেন। তারা হলেন মুহাম্মদ গাযযালী তুসী , কায়া হারাসী ও আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ খাওয়াফী।

এ তিনজন প্রতিভাবান ছাত্রের সম্পর্কে ইমামুল হারামাইনের একটি উক্তি বিশেষ ও সাধারণ মহলে সর্বত্রই ছিল প্রসিদ্ধ। কথাটি সকলের মুখে মুখে আলোচিত হতো এবং কানে কানে শোনা যেত। উক্তিটি ছিল এই গাযযালী একটি তরঙ্গায়িত সমুদ্র , কায়া হারাসী একটি ক্ষীপ্ত ব্যাঘ্র ও খাওয়াফী একটি প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা। এ তিজনের মধ্যে গাযযালী সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান। তাই তিনি ছিলেন নিশাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সকলে চোখের মণি ও প্রিয় পাত্র।

478 হিজরী সালে ইমামুল হারামাইন মৃত্যুবরণ করেন। সে সময়ে গাযযালী নিজেকে অদ্বিতীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী মনে করতেন। তার অন্তরে সালজুকী শাসকের বিজ্ঞ প্রধান মন্ত্রী খাজা নিজামুল মুলক তুসীর খেদমতে উপস্থিত হওয়ার স্পৃহা জাগলো। সেকালে তার এ বিজ্ঞ বন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দরবারে জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞদের ভীড় লেগেই থাকতো। গাযযালীকে উষ্ণ সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করলেন। তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কে তিনি বিজয়ীর গৌরবে গৌরবান্বিত হন। সে সময় নিজামিয়া-ই-বাগদাদের উপাচার্যের পদটি খালি হয়। কর্তৃপক্ষ এমন একজন বিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকের অনুসন্ধান করছিলেন যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-দীক্ষার দায়-দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করতে পারেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে , এ দায়িত্বভার অপর্ণ করার জন্য গাযযালীর চাইতে যোগ্য আর কোন লোক ছিলো না। 484 হিজরীতে গাযযালী বাগদাদে গমন করেন অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে এবং নিজামিয়া-ই-বাগদাদের সর্বোচ্চাসনে সমাসীন হন।

এভাবে গাযযালী তৎকালে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সর্বোচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হন। সুতরাং তিনি সেকালে সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় পন্ডিত এবং দ্বীনের পুরোধা হিসাবে পরিগণিত হতে লাগলেন। তিনি রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেও হস্তক্ষেপ করতেন। তৎকালীন খলিফা আল মুকতাদির বিল্লাহ ও তার পরে আল মুনতাযির বিল্লাহ তাকে খুব শ্রদ্ধার চোখে বিবেচনা করতেন। এরূপে তিনি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন সে যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। অর্থাৎ শিক্ষা বিভাগীয় নেতৃত্বের সর্বোচ্চাসনে পৌঁছেছিলেন। লোকদের অন্তরে তার এ অসাধারণ উন্নতির একটা প্রভাব বিস্তৃত ছিল। কিন্তু তখন তার হৃদয়ের গভীরে ছিল এক প্রজ্জ্বলিত বহ্নিশিখা যা তার সুশোভিত জীবন বাগানটিকে ও তার মান-মর্যাদ ,প্রভাব-প্রতিপত্তি , শ্রেষ্ঠত্ব , আড়ম্বরতা ইত্যাদি সব কিছুকে ভস্মীভূত করে দেয়।

ছাত্র জীবন থেকেই তার অন্তরে গভীরে এমন একটা গোপন অনুভূতি লালিত হয়ে আসছিল। যার কারণে তিনি সব সময় ব্যাপৃত থাকতেন একটা স্বস্তি-প্রশান্তিও ইয়াক্কীনের সন্ধানে। কিন্তু জাগতিক খ্যাতি-যশ , জনপ্রিয়তা ও তার সময়ের সমস্ত বিজ্ঞ পন্ডিতদের উপর সর্বশ্রেষ্ঠ আসনে সমাসীন হবার আকাঙ্ক্ষা তার সে গোপন অনুভূতিকে অনেকটা দাবিয়ে রেখেছিল। এ জন্যই সে বিষয়ে খুব একটা চিন্তা-ভাবনা করার সময়-সুযোগ তার হতো না। কিন্তু যখন তিনি পার্থিব উন্নতির সর্বশেষ সিঁড়িটি অতিক্রম করেছেন তখন তার সে গোপন অনুভূতিটি আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। শুরু করলেন তিনি সত্যের অনুসন্ধান অর ইয়াক্কীনের তালাশ। আর তার সামনে এ সত্যটিও সুস্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে যে , তার নিকট মওজুদ দলিল-প্রমাণাদি এবং তর্ক-বিতর্কের সময় উপস্থাপিত যুক্তি অন্য লোকদেরকে তো পরিতৃপ্ত করে থাকে। কিন্তু সে সমস্তদলিল-প্রমাণ দ্বারা তার নিজের অন্তরাত্মা পরিতৃপ্ত নয়। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন যে , শিক্ষা-দীক্ষা ও তর্ক-বিতর্ক ইয়াক্কীনের মনযিলে পৌঁছার জন্য যথেষ্ট নয় বরং এর জন্য অবশ্যম্ভাবী দরকার হচ্ছে চরিত্র-আখলাকের বিশুদ্ধতা , চেষ্টা- সাধনার অধ্যবসায় ও তাকওয়া পরহেযগারীর ভূষণ। সুতরাং তিনি নিজেকে উদ্দেশ্য করে নিজেই বললেন , মদের নাম উচ্চারণ করলে যেমন মাতলামির সৃষ্টি হয় না , রুটি রুটি করে যিকির দ্বারা যেমন উদর ভরে না ও ওষুধ ওষুধ করে চিৎকার করলে যেমন আরোগ্য লাভ হয় না , ঠিক তেমনি সত্য সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও তর্ক বতর্ক দ্বারা নিশ্চয়তা ও ইয়াক্কীনের পর্যায়ে উপনীত হওয়া যায় না। বরং এর জন্য প্রয়োজন নিরেট-নির্ভেজাল অনুসন্ধানের। আর পার্থিব শান-শওকত , পদমর্যাদা , চাকর- বাকর , খ্যাতি-প্রসিদ্ধি ও জনপ্রিয়তার ভালোবাসা এ ব্যাপারে মোটেও সম্পর্কযুক্ত নয়।

মোটকথা একটা আশ্চর্য দ্বন্দ-সংশয় তার অন্তরে আলোড়িত হচ্ছিল। এটা ছিল এমন একটা বেদনা যা কেবল তিনি ও তার প্রভুই জানতেন। এ ছাড়া আর কারো উপলব্ধিও ছিল না। প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত তিনি এ দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকেন। তার মধ্যে এ দ্বন্দ্বের পর্যায়টি এমন ছিল যে , তার পানাহার , শোয়া-বসা ইত্যাদি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ পর্যায়ে তার উপর নীরবতার ছাপ প্রতিষ্ঠিত হলো। অধিকাংশ সময় তিনি চুপচাপ থাকতেন এবং ধ্যানের জগতে হারিয়ে যেতেন। শিক্ষা-দীক্ষা দানের শক্তি তার মধ্যে আর অবশিষ্ট রইলো না। হজমশক্তি হ্রাস পেয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসকগণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নির্ণয় করলেন যে , তিনি মানসিক রোগে ভুগছেন। চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো পন্থাই বাকি রাখা হয়নি। মহান আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ তার আবেদনে সাড়া দেবার মতো ছিল না। তাই তিনি মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানালেন যে , এ দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি লাভ সহজ ব্যাপার নয়। একদিকে তার অন্তরের গোপন অনুভূতি দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে , অন্যদিকে এ দুনিয়ার উন্নতি , অসাধারণ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা জলাঞ্জলি দেয়া একটা সহজ ব্যাপার ছিল না। এরূপ চিন্তা-ভাবনা ও দ্বন্দ্ব-লড়াই অবশেষে এমন এক পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হলো যে , তার কাছে এখন আর এ দুনিয়ার জাঁকজমক , মর্যাদা-সম্মান , চাকর-বাকর , উচ্চপদ ইত্যাদির কোনই মূল্য ও কদর রইলো না। তাই তিনি দুনিয়ার যাবতীয় ঝামেলা থেকে মুক্ত হবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। কিন্তু এ কথা তিনি কোনো অবস্থাতেই প্রকাশ করেননি। কেননা তিনি জানতেন যে , তার সিদ্ধান্তের কথা লোকেরা টের পেলে তার বাঞ্ছিত লক্ষ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং তিনি মক্কা সফর করার বাহানা দিয়ে বাগদাদ ত্যাগ করলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর লোকেরা তাকে বিদায় জানিয়ে ফিরে গেলো।

লোকদের হাত থেকে মুক্তি লাভ করে তিনি তার সফরের গতিপথ মক্কার বদলে সিরিয়া ও বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। এ সফরে তিনি দরবেশের পোশাক পরিধান করলেন যাতে করে লোকেরা তার কারণে কষ্ট-ক্লেশের শিকারে পরিণত না হয়। আর কেউ যেন বুঝতে না পারে যে , তিনি কে ? তার এ মুসাফিরের জীবন দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকে। এভাবে দীর্ঘ দশ বছর যাবত কঠোর সাধনা ও কষ্ট-ক্লেশের পর তিনি যে ইয়াক্কীন ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলের সন্ধান করছিলেন , তা হাসিল করতে পেরেছিলেন।84

73

এক তৃষ্ণার্তের কাঁধে পানির মশক

গ্রীস্মকাল। প্রচণ্ড রৌদ্রতাপ। খরা ও দ্রব্যমূল্যের কারণে মদীনাবাসীদের জীবন বাঁচানো ছিল এক কঠিন ব্যাপার। লোকেরা সব সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকতো। হায় যদি বৃষ্টি হতো তাহলে লোকেরা স্বস্তির নিঃশ্বাস গ্রহণের সুযোগ লাভ করতে পারতো । এমনি অবস্থাতে মহানবী (সাঃ) সংবাদ পেলেন যে উত্তরপূর্ব দিকে বসবাসকারী মুসলমানদের জীবন রোমানদের কারণে হুমকির সম্মুখীন। রোমের সৈন্যবাহিনী যে কোনো সময় মুসলমানদের জীবননাশের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। সুতরাং তিনি মদীনাবাসীদের নির্দেশ দিলেন যে , তারা যেন শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য এক্ষুণিই প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খরার প্রচণ্ডতা মদীনার অধিবাসীদেরকে আগেই কাবু করে রেখেছিল। প্রত্যেকেরই আন্তরিক ইচ্ছা ছিল যে , নতুন ফসলের ফলমূল খাবে। খরার মৌসুমে তাজা ফলফলাদি ছেড়ে কাঠ ফাটা রোদ আর গরম হাওয়ার মধ্যে মদীনা থেকে সিরিয়া পর্যন্ত সফর করা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। এ অবস্থায় মোনাফিকদের জন্য অঙ্গীকার ভঙ্গ করার পরিবেশ ছিল অনুকূলে।

কিন্তু ভীষণ গরম , তপ্ত রোদের প্রখরতা , খরার প্রচণ্ডতা এবং মোনাফিকদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা ইসলামী বাহিনীর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রায় ত্রিশ হাজার মুসলিম সৈন্য রোমানদের সম্ভাব্য হামলার মোকাবিলা করার জন্য সিরিয়ার দিকে যাত্রা করলো। মরুভূমির পথ। সূর্য তাদের উপর আগুন বর্ষণ করছিল। তাদের সাথে পানাহার দ্রব্যও খুব বেশী ছিল না। বরং সম্ভাবনা এটাও ছিল যে , না জানি ইসলামী বাহিনীকে পানাহার দ্রব্যের অভাবের সম্মুখীন হতে হয়। তাই কোনো কোনো দুর্বল ঈমানদার লোকেরা পথিমধ্যেই সরে পড়লো। কিছু দূর পথ চলার পর কাআব ইবনে মালেক মদীনার দিকে ফিরে চলে যায়। সাথীরা গিয়ে রাসূল (সাঃ)-কে বললো , হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! কাআব ইবনে মালেক আমাদের সঙ্গ ছেড়ে মদীনায় ফিরে চলে গেছে। রাসূল (সাঃ) বললেন , তাকে যেতে দাও। যদি তার মধ্যে বিন্দুমাত্রও নেকীর অংশ থেকে থাকে তাহলে মহান আল্লাহ খুব শীঘ্রই তোমাদের কাছে ফিরিয়ে আনবেন। আর যদি তার মধ্যে নেকীর লেশমাত্র পাওয়া না যায় , তাহলে মনে করে নিও যে , আল্লাহ তোমাদেরকে তার অনিষ্টতা থেকে নাজাত দান করেছেন।

কিছুক্ষণ পরেই সাহাবারা আবার রাসূলের কাছে গিয়ে বললো , ইয়া রাসূলুলাহ! মারারা ইবনে রাবীও ইসলামী বাহিনী ত্যাগ করে চলে গেছে। রাসূল (সাঃ) বললেন , দেখো! যদি তার মধ্যে নেকীর লেশমাত্রও থেকে থাকে তাহলে মহান খোদা খুব শীঘ্রই তোমাদের সাথে দ্বিতীয়বার একত্র করে দেবেন। আর যদি এমনটি না হয় তাহলে বুঝে নেবে যে , আল্লাহ তোমাদেরকে তার অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করেছেন।

আরো কিছু পরে লোকেরা এসে রাসূলে খোদাকে জানালো ইয়া নাবী আল্লাহ! হেলাল ইবনে উমাইয়্যাও আমাদের দল ছেড়ে চলে গেছে। রাসূলে আকরাম (সাঃ) এবারও তাদেরকে একই জবাব দিলেন। তারা চুপ হয়ে গেল।

এমন সময় হযরত আবু যার গিফারীর উটটি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে গেল। আবু যার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন যেন কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়েন। কিন্তু সকল চেষ্টাই তার ব্যর্থ হলো। হঠাৎ কাফেলার লোকেরা লক্ষ্য করে দেখলো যে , হযরত আবু যার গিফারী কাফেলার সাথে নেই। তাই তারা রাসূলে খোদার খেদমতে গিয়ে সংবাদ দিল হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! জনাব আবু যারও আমাদের দলচ্যুত হয়েছেন। মহানবী (সাঃ) একটা মৃদু শ্বাস টেনে বললেন , যেতে দাও। যদি তার মধ্যে কোন নেকী থেকে থাকে তাহলে মহান আল্লাহ তাকে আবার তোমাদের সাথে একত্র করে দেবেন। আর যদি এমনটি না হয় তাহলে মনে করবে যে , মহান আল্লাহ তোমাদেরকে তার ক্ষতি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

এদিকে জনাব আবু যার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন কিন্তু উটটি স্বস্থান থেকে এক কদমও নড়লো না। বাধ্য হয়ে তিনি উটের পৃষ্ঠদেশ থেকে নিচে অবতরণ করলেন এবং সফর সামগ্রী নিজের স্কন্ধে ধারণ করে পায়ে হেঁটে চলতে লাগলেন। রোদের তীব্রতা তার মাথার উপরে বর্ষিত হচ্ছিল। আর তৃষ্ণার তীব্রতায় তার জিহবা বেরিয়ে আসার উপক্রম। কিন্তু তিনি তার এ অবস্থার কথা যেন ভুলে গেলেন। তার স্মরণে কেবল একটাই কথা। কি করে তিনি তাড়াতাড়ি গিয়ে রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর খেদমতে উপস্থিত হবেন এবং ইসলামী বাহিনীর সাথে অন্তর্ভুক্ত হবেন। তাই তিনি খুব দ্রুত পদে পথ চলতে লাগলেন। হঠাৎ আসমানের এক দিকে কিছু মেঘমালা দেখতে পেলেন যা দেখে মনে হচ্ছিল যে , বৃষ্টি হতে পারে। তিনি সেদিকে ঘুরলেন। হঠাৎ তার পা একটা ভারী পাথরের সাথে ধাক্কা খেল। তিনি চেয়ে দেখলেন সেখানে বৃষ্টির পানি জমা আছে। তিনি সামান্য পানি পান করলেন এবং পিপাসা পুরোপুরি নিবারণ না করেই দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন যে , হতে পারে আল্লাহর নবী (সাঃ) তৃষ্ণার্ত রয়েছেন। এ ভেবে তিনি স্কন্ধ থেকে খালি মশকটি নামালেন এবং সে পানি মশকে ভরে নিলেন। মশকটি কাঁধে করে চলতে লাগলেন। গরমের তীব্রতায় তার কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে উঁচু-নিচু পথ অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পথ চলার পর অনেক দূরে ইসলামী বাহিনীর অবস্থান দেখতে পেলেন। এ দেখে তিনি খুব খুশী হলেন এবং আরো দ্রুত পদে পথ চলতে লাগলেন।

এদিকে ইসলামী বাহিনীর একজন সৈনিক দেখতে পেল যে , কোন এক লোক দ্রুতগতিতে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। সুতরাং তারা রাসূল (সাঃ) এর কাছে গিয়ে বললো , হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! মনে হচ্ছে কেউ একজন আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। রাসূল (সাঃ) খুশীর ভাব প্রকাশ করে বললেন , হায়! সে যদি আবুযার হতো। আগমনকারীর ছায়া নিকটতর হতে থাকলো। একবার লোকেরা তাকে দেখে চিনতে পেরে চিৎকার করে উঠলো , খোদার কসম। আগন্তুক ব্যক্তিটি হযরত আবুযার ব্যতীত আর কেউ নন।

রাসূলে আকরাম (সাঃ) বললেন , হে পরোয়ারদিগার! আবু যারকে ক্ষমা করে দাও। সে একাই জীবনযাপন করে , একাই মৃত্যুবরণ করে আর একাই হাশরে উপস্থিত হয়।

এরপর মহানবী (সাঃ) আবুযারকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করলেন। আবুযার তার কাঁধের সমস্ত মালামাল মাটিতে রেখে দিলেন। ক্লান্তি-শ্রান্তির কারণে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন।

রাসূল (সাঃ) সাহাবীদেরকে বললেন , তাড়াতাড়ি পানি আনো। আবুযার বললেন , ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার সাথে পানি আছে।

রাসূল (সাঃ) বললেন , পানি তোমার সাথে ছিল , অথচ তুমি পিপাসায় কষ্ট করেছো ? তৃষ্ণা নিবারণ করোনি ?

তিনি বললেন , হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কোরবান হোক! পথে আমি একটি পাথরের সাথে ধাক্কা খেয়েছি। দেখলাম সেখানে পানি জমা আছে। আমি একটুখানি পানি পান করে দেখলাম যে , পানি ভাল আছে। তখন আমি ভাবলাম যে , আল্লাহর নবীকে পানি পান না করিয়ে আমি নিজে পানি পান করবো না।85