সত্য কাহিনী সম্ভার

সত্য কাহিনী সম্ভার0%

সত্য কাহিনী সম্ভার লেখক:
: মাওলানা আলী আক্কাস
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: চরিত্র গঠনমূলক বই

সত্য কাহিনী সম্ভার

লেখক: শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহহারী
: মাওলানা আলী আক্কাস
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 18394
ডাউনলোড: 1821

সত্য কাহিনী সম্ভার
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 79 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 18394 / ডাউনলোড: 1821
সাইজ সাইজ সাইজ
সত্য কাহিনী সম্ভার

সত্য কাহিনী সম্ভার

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

এ বইটি তার বিষয়ের সর্বপ্রথম ও অনন্য অবতারণা হোক অথবা না হোক , এর জন্য প্রাপ্য ফুলের মামলার যোগ্য পাত্র আমি নই , অর্থাৎ যদি এ বইটি কাহিনী রচনার জগতে কোন গুরুত্বপূর্ণ নতুন অবতারণার দাবিদার হয় তাহলে তার গোড়াপত্তনকারী আমি নই। বরং প্রকাশনা ও প্রচারণার একটি প্রতিষ্ঠানে দেশের বিজ্ঞ বিজ্ঞ বিজ্ঞানী-গুণী কতিপয় ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি সম্পাদনা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ অধমও সে বোর্ডের একজন সদস্য। দেশের খ্যাতনামা লেখক ও বিজ্ঞতম ব্যক্তিত্ব সমৃদ্ধ সে বোর্ডের এক বৈঠকে প্রস্তাব রাখা হলো যে , এমন একটি গ্রন্থ রচিত হওয়া উচিত যার মধ্যে চারিত্রিক সুন্দর ও গুণাবলী কাহিনী আকারে উপস্থাপিত থাকবে। আর সে কাহিনীগুলো লেখকের নিজের মস্তিষ্ক থেকে আবিস্কৃত বা নিজের খেয়াল মোতাবেক তৈরি হবে না। বরং তার ভিত্তিমূল ও উৎস হবে হাদীস , বাস্তব জীবন ও ইতিহাসের গ্রন্থরাজি। এর সংকলনের উদ্দেশ্য থাকবে মুসলিম সমাজকে শিক্ষা দান এবং যুব সমাজকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন ও পরিচালনা করা।

74

ধারাশায়ীকে পদাঘাত

আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ান তার একুশ বছরের জুলুম-নির্যাতনের শাসন চালাবার পর দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। তার মৃত্যুর পর তারই পুত্র ওয়ালিদ ক্ষমতা লাভ করে। ক্ষমতার চাবি-কাঠি হাতে নিয়ে ওয়ালিদ সিদ্ধান্ত নিল যে , জনসাধারণের মধ্যে বিদ্যমান অসন্তোষ এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ নিরসনের জন্য সে লোকদের সাথে কিছুটা নম্র আচরণ ও সদ্ব্যবহারের নীতি অবলম্বন করবে। বিশেষভাবে সে মদীনাবাসীদের সাথে অত্যন্ত ভালো আচরণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। এর কারণ হলো এই যে , এখনো সে মোকাদ্দাস ও পবিত্র শহরে রাসূলের অসংখ্য সাহাবী , ফকিহ ও মুহাদ্দিস বর্তমান রয়েছেন । এছাড়াও এ শহরটি বিশেষ পবিত্রতার কারণে মর্যাদার অধিকারী। সুতরাং সে মদীনার শাসনকর্তার পদ থেকে হিশাম ইবনে ইসমাঈল মাখযুনীকে সরিয়ে দিল। কেননা তার অত্যাচার-নিপীড়নে সেখানকার লোকেরা ছিল জর্জরিত। প্রত্যেক মানুষ অন্তরের মধ্যে এ কামনা রাখতো যে , আল্লাহ যেন এ জালিমকে ধ্বংস করে দেন। এখানে স্মরণ রাখতে হবে যে , হিশাম ছিল ওয়ালিদের নানা।

হিশাম ইবনে ইসমাঈল মদীনাবাসীদের প্রতি নির্মম অবিচার চালায়। সীমাহীন জুলুম-অত্যাচার করে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব সকল মদীনাবাসী নিকট ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তিনি হিশামের বাইআত করতে অস্বীকার করেছিলেন। এ কারণে হিশাম তাকে 60টি চাবুকের দণ্ড দিয়ে ছিল। শুধু এখানেই শেষ নয় , বরং চাবুকাঘাত করার পর তাকে একটি মোটা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে মদীনার বাইরে এক মরুভূমিতে ফেলে দিয়েছিল। হযরত আলী (আঃ) এর অনুসারীদের সাথে , বিশেষত আলী ইবনুল হোসাইন তথা ইমাম যয়নুল আবেদীন (আঃ) এর সাথে অমানবিক নিপীড়ন আর নির্যাতনের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

যা হোক ওয়ালিদ মদীনার গভর্নরের পদ থেকে হিশামকে অপসারণ করে তদস্থলে তার চাচাতো ভাই ওমর ইবনে আব্দুল আযীযকে নিয়োগ করে। লোকেরা ওমর ইবনে আব্দুল আযীযের সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতার জন্য আকৃষ্ট হয়েছিল। তিনি গভর্নরের পদে অধিষ্ঠিত হয়ে নির্দেশ জারী করলেন যে , হিশামকে গ্রেফতার করে মারওয়ান ইবনে হাকামের বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা হবে। আর জনসাধারণের মধ্যে ঘোষণা করে দিতে হবে যে , যার যার সাথে হিশাম ক্ষমতায় থাকাকালীন জুলুম অবিচার করেছিল , সে সমস্ত লোকেরা এসে এখন তার থেকে প্রতিশোধ নিতে পারবে। সুতরাং লোকেরা দলে দলে এসে হিশামকে গালিগালাজ ও অভিশাপের বৃষ্টি বর্ষণ করতে থাকলো।

কিন্তু হিশাম নিজেই ইমাম যয়নুল আবেদীন ও তার অনুসারীদের সম্পর্কে শংকিত ছিল। কেননা সে ইমাম ও তার সাথীদের প্রতি সবচেয়ে বেশী জুলুম চালিয়েছিল এবং নবী বংশের সাথে সর্বাধিক অন্যায় অপরাধ করেছিল। সে জানতো যে তাদের প্রতি নির্বিচারে জুলুমের প্রতিশোধ মৃত্যুর চেয়ে কম কিছু হবে না। এদিকে ইমাম তাঁর সঙ্গী-সাথীদেরকে ডেকে বললেন , ধরাশায়ীকে পদাঘাত করা আমাদের নীতি নয়। আমরা দুশমনদের দুর্বলতার সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তাদের থেকে প্রতিশোধ নেই না। বরং আমাদের চরিত্র হলো যে , আমরা অসহায় লোকদের প্রতি যথা সম্ভব সদয় থাকি। ইমাম (আঃ) যখন তার সাথীদেরকে সাথে নিয়ে হিশামের কাছে যাচ্ছিলেন তখন তাদেরকে দেখে হিশামের চেহারার রং বিবর্ণ হয়ে গেল। সে ভাবলো যে , সে সময় খুব বেশী দূরে নয় যে , তাকে মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু তার চিন্তার বিপরীতে ইমাম তার কাছে পৌঁছে উচ্চস্বরে বললেন , সালামুন আলাইকুম। অতঃপর তার সাথে করমর্দন করে বললেন , তোমার যথা সম্ভব সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি।

এ ঘটনার পর মদীনাবাসীরা হিশামের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করা থেকে বিরত হলো।86

75

অচেনা পুরুষ

এক অসহায় রমণী কাঁধে পানির মশক ঝুলিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। পথে একজন অচেনা পুরুষ সে অসহায় মহিলার কাছ থেকে মশকটি নিয়ে নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে মহিলার সাথে সাথে চলতে লাগলেন। মহিলার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাদের মায়ের আগমনের অপেক্ষা করছিল। এ মাছুম ছেলে-মেয়েরা দেখতে পেলো যে , একজন অচেনা-অজানা লোক তাদের মায়ের সাথে তাদের বাড়ির দিকে আসছেন। আর পানির মশকটি তার স্কন্ধে। বাড়িতে এসে অপরিচিত লোকটি পানির মশক মাটিতে রেখে মহিলাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন , আপনার অবস্থা দেখে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারা যায় যে , আপনার ঘরে কোনো পুরুষ লোক নেই। কিন্তু বলুন তো , আপনি এভাবে অসহায় হলেন কিভাবে ?

জবাবে মহিলা বললেন , আমার স্বামী ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা। আলী ইবনে আবী তালিব তাকে ইসলামী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। যুদ্ধে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। এখন এ ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ছাড়া জগতে আর আমার কেউ নেই ?

অচেনা লোকটি আর কোনো কথা বললেন না , বরং মাথা ঝুকিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেলেন। কিন্তু তিনি এরপর শুধু এ অসহায় স্ত্রী লোকটি ও তার কচি কচি শিশু সন্তানের কথাই ভাবতে থাকলেন। রাতে তার নিদ্রা হলো না। সকালে তিনি একটি থলিতে কিছু গোশত , আটা , খুরমা ও আরো কিছু খাদ্যদ্রব্য নিলেন এবং সে অসহায় রমণীর বাড়িতে গেলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে আওয়াজ দিলেন। মহিলা ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা করলেন , কে আপনি ?

আগন্তুক জবাব দিলেন , আমি খোদার সে বান্দা , যে কাল আপনার পানির মশক এনে দিয়েছিলাম। আজ আমি আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু খাদ্য-খাবার নিয়ে এসেছি।

মহিলা ভেতর থেকে বললেন , হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। আমার ও আলী ইবনে আবী তালিবের মধ্যে আল্লাহই ফয়সালা করবেন।

অতঃপর দরজা খুলে দিলেন। অচেনা লোকটি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। খাদ্য সামগ্রীগুলো মহিলাকে দিয়ে বললেন , আমার মন চাচ্ছে যে , কিছু সওয়াবের কাজ করবো। অতএব , আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি নিজে আটা খামির করে রুটি বানিয়ে দেবো অথবা আমি ছেলে-মেয়েদের দেখাশোনা করি আর আপনি আটা খামির করে রুটি বানিয়ে নিন।

মহিলা বললেন , আচ্ছা ঠিক আছে আমিই আটা খামির করে রুটি তৈরি করছি আর আপনি ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করুন।

তারপর ভদ্র মহিলা আটা খামির করে রুটি তৈরিতে ব্যস্ত হলেন। আর অপরিচিত লোকটি থলে থেকে খুরমা বের করে নিজের হাতে এ ছেলেমেয়েদেরকে খুরমা খাওয়াতে লাগলেন। নিজের হাতে বাচ্চাদেরকে খুরমা খাওয়াবার সময় তিনি তাদেরকে বার বার এ কথাটাই বলতে থাকলেন , হে আমার প্রিয় সন্তানরা! আলী ইবনে আবী তালিবকে মাফ করে দাও। যদিও তিনি তোমাদের ব্যাপারে কার্পণ্য করেছেন।

এতোক্ষণে আটা খামির হয়ে গেছে। সে মহিলা ডেকে বললেন , হে আল্লাহর বান্দা! আটা খামির করা হয়ে গেছে। এবার তন্দুর জ্বালিয়ে দিন।

অচেনা লোকটি সাথে সাথে উঠে গিয়ে তন্দুরে আগুন ধরালেন। আগুনের ভাপ তন্দুর থেকে বের হতে লাগলো। লোকটি নিজের চেহারাকে আগুনের কাছে নিয়ে নিজে নিজে এভাবে বলতে লাগলেন , আগুনের তাপের স্বাদ আস্বাদন করো। একজন বিধবা রমণী ও ইয়াতিম বাচ্চাদের খোঁজ খবর নেবার ব্যাপারে কার্পণ্য করার এটাই শাস্তি।

তিনি যখন এ কাজে ব্যস্ততখনি প্রতিবেশী এক মহিলা এ বাড়িতে এলো এবং ঘরে ঢুকেই এ অপরিচিত লোকটিকে চিনতে পারলো। তারপরে সে বিধবা মহিলাকে বললো , ধিক তোমার প্রতি! তুমি কি এ লোকটিকে চেনো না ? তাকে দিয়ে এভাবে কাজ করিয়ে নিচ্ছো ? তিনি হলেন আমীরুল মু মিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব।

অসহায় বিধবা মহিলাটি হযরত আলী (আঃ) এর সামনে এসে বলতে লাগলেন , আমি আমার এ কাজের জন্য আপনার নিকট খুবই লজ্জিত। আমি আপনার নিকট ক্ষমা চাইছি।

আলী (আঃ) বললেন , না! আমিই বরং আপনার নিকট ক্ষমা চাচ্ছি। কেননা আমি আপনার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে কার্পণ্য করেছি।87