ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 47495
ডাউনলোড: 2048

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 47495 / ডাউনলোড: 2048
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

মনী ধর্ম (মনাভী)

সাসানী আমলের অন্যতম গতিশীল ও সজীব ধর্ম হলো মনী ধর্ম। মনী ধর্মের আচার-বিশ্বাস ও রীতিনীতি সম্পর্কে বলতে গেলে তা বেশ দীর্ঘ। মনী ধর্ম-বিশ্বাস ও আচার অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির। সাধারণত বলা হয়ে থাকে মনী ধর্ম বৌদ্ধ ,খ্রিষ্ট ও যারথুষ্ট্র ধর্মের বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে স্বয়ং মনী উদ্ভাবিত আচার-বিশ্বাসের সমন্বয়। জনাব সাইয়্যেদ হাসান তাকীযাদেহ্ ইরান পরিচিতি সংঘ -এ তাঁর উত্থাপিত গবেষণানির্ভর দু টি বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন ,

কোন কোন গবেষক মনে করেন মনী ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তি হলো প্রাচীন ইরানের বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাস , বিশেষত যারওয়ানী ধর্ম এবং আশকানি শাসনামলের শেষ দিকে ও সাসানী শাসনের প্রারম্ভে সৃষ্ট নব মতবাদ সমন্বিত যারথুষ্ট্র ধর্ম বিশ্বাস। কিন্তু যথাযথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এ সাদৃশ্য বাহ্যিক এবং এটি এ কারণে হয়েছে যে , মনী তাঁর ধর্ম বিশ্বাস প্রচারে বিশেষ জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় পরিভাষা ও শিক্ষাকেই ব্যবহার করতেন। তবে পরবর্তীতে খ্রিষ্টধর্মের বিশেষ কিছু বিশ্বাস এর সঙ্গে সমন্বিত করা হয়। কারণ খতিয়ে দেখা গেছে মনী ইরান ও ভারতের অন্যান্য ধর্ম অপেক্ষা খ্রিষ্টধর্মের বিষয়ে অধিকতর জানতেন। তবে তাঁর এই জ্ঞানের উৎস মূল ধারার খ্রিষ্টধর্ম নয় ; বরং বিশেষ ধারার খ্রিষ্টবাদ যাকে গোনুসী (Gnostic)বলা হয়। এ ধারার খ্রিষ্টবাদ হেলুনিজম প্রভাবিত যা গ্রীক দর্শনের প্লেটোনিক যে ধারাটি সিরিয়া ও দজলা - ফোরাতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে আলেকজাণ্ডারের পরবর্তী সময়ে প্রচলন লাভ করেছিল তার সঙ্গে প্রাচ্য দর্শনের মিশ্রণের ফলে সৃষ্ট হয়েছিল। এ ধারাটি খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে এতদঞ্চলে প্রসার ও বিস্তৃতি লাভ করেছিল। এ ধারার দু জন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেন মারকিউন বরদিসান যারা উভয়েই গোনুসী ছিলেন ও সানাভী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। 55

তাকী যাদেহ্ আরো বলেছেন , মনী ধর্মের উৎপত্তি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মত হলো যদিও মনী সকল প্রসিদ্ধ ধর্ম ও ফির্কা হতে কিছু কিছু চিন্তা-বিশ্বাস গ্রহণ করেছেন ,যেমন বৌদ্ধ ধর্ম হতে সামান্য ,যারথুষ্ট্র ও যারওয়ানী ধর্ম হতে আরো অধিক ,খ্রিষ্ট ধর্ম হতে বিশেষত গোনুসী (খ্রিষ্টীয় আধ্যাত্মিকদের) হতে সর্বাধিক ,তদুপরি মনী ধর্মকে এগুলোর সমন্বয় মাত্র বলা যায় না ;বরং এর মূল ভিত্তি মনীর নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত ও এ ধারার উদ্গাতা স্বয়ং মনীর ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। তাই যদি এ ধর্ম অন্যান্য প্রসিদ্ধ ধর্মের বৈশিষ্ট্য রং ধারণ করে থাকে তা এ ধর্মকে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচারের সুবিধার্থেই করা হয়েছিল। 56

যা হোক মনী ধর্মের বিষয়বস্তু কি ছিল বা স্বয়ং মনী কে ছিলেন তা আমাদের বর্তমান আলোচনার সাথে সম্পর্কশীল নয়। পরবর্তী অধ্যায়ে অবশ্য আমরা তাঁর সানাভী মতবাদ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করব এবং মনী ধর্মের অন্যান্য বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের বর্ণনা দেব। যে বিষয়টি আমাদের বর্তমান আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তা হলো ইসলামের আবির্ভাবের মুহূর্তে এ ধর্মের কি অবস্থা ছিল ,এর অনুসারীর সংখ্যা কিরূপ ছিল ও এ ধর্ম কতটুকু আকর্ষণ ও প্রভাব বিস্তার করেছিল ? সে মুহূর্তে তা উত্থানের পথে ছিল নাকি পতনের পথে ?

ঐতিহাসিক সত্য হলো এ ধর্মটি বিশ্বজনীনতা দাবি করে। স্বয়ং মনী নবুওয়াতের দাবি করতেন ,নিজেকে সর্বশেষ নবী এবং তাঁর ধর্মকে সর্বশেষ ধর্ম বলে প্রচার করতেন। যারথুষ্ট্র মতবাদের বিপরীতে মনীদের মাঝে পরবর্তী পর্যায়ে কয়েকজন শক্তিশালী ধর্মপ্রচারক আবির্ভূত হয়েছিলেন যাঁরা মনী ধর্মকে ইরানের সীমার বাইরে নিয়ে যেতে এবং অন্যান্য দেশের অনেক মানুষকেই প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যারথুষ্ট্র পুরোহিতদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত চাপ ও নিপীড়ন সত্ত্বেও ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত এ ধর্ম টিকে ছিল এবং যারথুষ্ট্র অপেক্ষা মনিগণ ইসলামের বিরুদ্ধে অধিকতর দৃঢ়তা প্রদর্শন করে। ইসলামী শাসনামলের কয়েক শতাব্দীব্যাপী তাদের অস্তিত্ব ছিল। তবে ধীরে ধীরে তারা নিশ্চি হ্ন হয়ে যায়।

সাসানী আমলের প্রারম্ভে মনীর আবির্ভাব ঘটে। তাঁর জন্ম দজলা-ফোরাতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে কিন্তু তিনি ইরানী বংশোদ্ভূত ছিলেন। আরদ্শিরের সময়কাল হতে কয়েকজন সাসানী শাসককে তিনি পেয়েছিলেন। সম্ভবত আরদ্শিরের পুত্র প্রথম শাপুরের সময় তিনি নবুওয়াতের দাবি করেন। কথিত আছে শাপুর মনীর দাওয়াতে প্রভাবিত হয়েছিলেন ও মনী ধর্মকে যারথুষ্ট্র ধর্মের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা দেবেন কিনা এ বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি অনুতপ্ত হয়ে এ চিন্তা হতে ফিরে আসেন।57 বলা হয়ে থাকে সপ্তম হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত মনী ধর্ম টিকে ছিল। সুতরাং এ ধর্মের উৎপত্তির সময় হতে সম্পূর্ণ নিশ্চি হ্ন হওয়া পর্যন্ত এক হাজার বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল।

মনী ধর্ম আবির্ভাবের পর অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। এ সম্পর্কে তাকী যাদেহ্ বলেছেন ,

মনীদের ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ ,মোগলদের উত্থানের সময়কাল পর্যন্ত এর অনুসারীরা বিদ্যমান ছিল। মনী ধর্ম আবির্ভাবের পর অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। মনীর মৃত্যুর পঁচিশ বছরের মধ্যে অর্থাৎ 300 খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ধর্ম সিরিয়া ,মিশর ,উত্তর আফ্রিকাসহ স্পেন ও গল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। 58

তিনি আরো বলেছেন ,

ইরানের মারভ ,বালখ ও তাখারিস্তানে মনী ধর্মের অসংখ্য অনুসারী ছিল। বিশিষ্ট চীনা পর্যটক হিউয়ান সাং সপ্তম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর প্রথম ভাগে মনী ধর্মকে ইরানের প্রধান ধর্ম বলে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য তাঁর এ কথার উদ্দেশ্য ইরানের পূর্বাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে এ অবস্থা ছিল অর্থাৎ তাখারিস্তানে মনী ধর্মের যথেষ্ট প্রভাব ছিল যা অষ্টম খ্রিষ্টাব্দের প্রথম ভাগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। 59

ক্রিস্টেন সেন তাদের সম্পর্কে বলেছেন ,

মনীদের ওপর যারথুষ্ট্র পুরোহিতদের চাপ ও কঠোরতা সত্ত্বেও এ নতুন ধর্মটি ইরানে টিকে ছিল তবে কিছুটা অপ্রকাশ্যভাবে। সামানী শাসক নারসী ও দ্বিতীয় হারমুযদের শাসনামলে মনীদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা কিবতী মনী গ্রন্থের শেষে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আরবের হীরা অঞ্চলের আরব শাসনকর্তা আমর ইবনে আদী মনীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। মনী ধর্মের উৎপত্তিস্থল ব্যাবিলন ও তিসফুনের প্রাদেশিক রাজধানীতে প্রচুর মনী বাস করত। কিন্তু তৎকালীন শাসকদের নির্যাতনে তাদের অনেকেই পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের ইরানীদের অঞ্চলে চলে যায়। সেখানকার সাগাদ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মনী বসবাস করত। এ অঞ্চলের মনীরা তাদের পশ্চিমাঞ্চলের স্বধর্মীদের হতে দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। 60

মনী ধর্ম পরবর্তীতে টিকে থাকতে পারে নি। নিঃসন্দেহে এ পরাজয়ের মূল কারণ ছিল ইসলাম। মনী ধর্ম দ্বিত্ববাদনির্ভর হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই চিন্তা ও মানব প্রকৃতিনির্ভর একত্ববাদী ধর্মের মোকাবিলায় টিকে থাকতে পারে নি। কারণ একত্ববাদী ধর্ম সহজেই প্রজ্ঞাবান ও দার্শনিক চিন্তাসম্পন্ন মানুষদের আকর্ষণ করতে সক্ষম। তদুপরি মনী ধর্ম কঠিন যোগ-সাধনা নির্ভর হওয়ায় এর বাস্তব অনুশীলনও অসম্ভব। বিশেষত বিবাহ ও যৌনাচার হতে বিরত থাকা এ ধর্মের অন্যতম পবিত্র নির্দেশ হওয়ায় অনেকেই এ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এর বিপরীতে মানুষ ইসলামের মত এমন এক ধর্ম পায় যা আত্মিক পরিশুদ্ধির সর্বোচ্চ মর্যাদাসহ বিবাহ ,বৈধ যৌনাচার ও সন্তান জন্মদানকে অত্যন্ত পবিত্র সুন্নাহ্ মনে করে।

যদি মুসলমানরা মনী ধর্মকে যারথুষ্ট্র ,ইহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্মের ন্যায় ঐশী ধর্ম মনে করত ও আহলে কিতাব হিসেব করত তবে মনীরা ইসলামের আবির্ভাবের সময়কালে যত অধিক ছিল তাতে সম্ভাবনা ছিল যারথুষ্ট্র ,ইহুদী ও খ্রিষ্টধর্মের ন্যায় সংখ্যালঘু হিসেবে টিকে থাকার। কিন্তু মুসলমানরা যেহেতু মনীদের অধার্মিক মনে করত সেহেতু সংখ্যালঘু হিসেবেও তাদের টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।