ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 44563
ডাউনলোড: 1887

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 44563 / ডাউনলোড: 1887
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

আর্য বিশ্বাসসমূহ

আমরা তৎকালীন ইরানের ধর্মীয় অবস্থা সম্পর্কে মোটামুটি জানলাম। আমাদের নিকট স্পষ্ট হলো ,সে সময় ইরানে বিভিন্ন ধর্মের অস্তিত্ব ছিল এবং একক কোন ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল না। কোন্ ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা কত ছিল সঠিকভাবে তা বলা সম্ভব না হলেও এটি স্পষ্ট ,রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে যারথুষ্ট্র ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক এবং অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যাও কোন ক্রমে কম ছিল না।

ইসলাম চিন্তা ও বিশ্বাসগত কি কি বিষয় ইরান হতে নিয়েছে ও ইরানকে কি দিয়েছে তা জানার জন্য ইরানে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুপাত জানার আমাদের কোন প্রয়োজন নেই ;বরং এ জন্য আমাদের এ দেশের অধিবাসীদের খোদা ,বিশ্ব ,সৃষ্টি ইত্যাদি বিষয়ে লালনকৃত চিন্তা-বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে হবে।

ইরানী ইহুদীদের ধর্মীয় বিশ্বাসসমূহ সম্পর্কে আমাদের তেমন কিছু জানা নেই। বাহ্যত অন্যান্য ইহুদীদের মতই তারা তাওরাত ও তালমুদের অনুসরণ করত। তাদের বিশ্বাস যা-ই হোক যেহেতু তারা নগন্য সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত হতো সেহেতু তৎকালীন ইরানী সমাজে তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কোন প্রভাব ছিল না। কিন্তু খ্রিষ্টানদের সেসময়ে রমরমা অবস্থা ছিল। কারণ তারা ত্রিত্ববাদ ও ঈসা মাসীহের প্রভুত্বের ধারণা প্রচার করত। আমরা এখানে খ্রিষ্টধর্মের ত্রিত্ববাদ ও এর সঙ্গে একত্ববাদের ধারণার পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করব না । কারণ প্রথমত বিষয়টি পরিষ্কার বলে আলোচনার প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত খ্রিষ্টধর্ম সংখ্যালঘু হিসেবে ইরানে ছিল এবং এই সংখ্যালঘু খ্রিষ্টানদের খুব কমই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ইরানের অধিকাংশ মানুষ যারথুষ্ট্র ধর্মাবলম্বী ছিল এবং মনী ও মাযদাকীরা ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যারথুষ্ট্র ধর্মের অনুরূপ ছিল। তাই আমরা আমাদের আলোচনা মূলত যারথুষ্ট্র ধর্মবিশ্বাস নিয়ে এবং সেই সাথে মনী ও মাযদাকী বিশ্বাস নিয়েও কিছুটা আলোচনা রাখব। মোট কথা ,ইরানী আর্যদের মধ্য হতে উত্থিত ধর্মসমূহ নিয়েই মূলত আমাদের আলোচনা আবর্তিত।

প্রশ্ন হলো ইসলামের আবির্ভাবের সমকালীন যারথুষ্ট্র ,মনী ও মাযদাকী ধর্ম স্রষ্টা ও উপাসনা নিয়ে কিরূপ বিশ্বাস লালন করত ? তারা কি খোদা পরিচিতির ক্ষেত্রে একত্ববাদী ছিল নাকি দ্বিত্ববাদী ?

নিঃসন্দেহে ইসলামের আবির্ভাবের সমকালীন যারথুষ্ট্র ,মনী ও মাযদাকী সকলেই দ্বিত্ববাদী ছিল। ইসলাম পরবর্তী সময়েও তারা এ বিশ্বাস রাখত ,এমনকি মুসলিম শাসনামলেও তারা মুসলিম মনীষী ও আলেমদের সঙ্গে এ বিষয়ে বিতর্ক করত ও দ্বিত্ববাদের পক্ষাবলম্বন করত। মাত্র পঞ্চাশ বছর পূর্ব হতে তারা পূর্বের সকল কিছুকে অস্বীকার করে একত্ববাদী সেজেছে। এতে অবশ্য আমরা খুশী হয়েছি ,যারথুষ্ট্রগণ দ্বিত্ববাদের কুসংস্কার একেবারে ত্যাগ করে এক খোদার উপাসনা শুরু করেছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে এক খোদার উপাসনার অপরিহার্যতা হলো প্রকৃতই ধর্মীয় গোঁড়ামিসমূহ পরিত্যাগ করা ও সত্যকে স্বীকার করা। তাই একত্ববাদের প্রতি আহ্বানকারীদের জন্য ঠিক নয় তাদের অতীত ইতিহাসকে বাস্তবের বিপরীতরূপে উপস্থাপন করা।

অবশ্য এতে ভুল বোঝা ঠিক হবে না যে ,হয়তো ভাবা হবে আমরা বলতে চাচ্ছি যারথুষ্ট্র ধর্ম প্রকৃতই প্রথম হতে দ্বিত্ববাদী ছিল ও এ ধর্মের প্রধান ব্যক্তি যারদুশত মিথ্যা নবুওয়াতের দাবি করেছেন। না ,এমনটি নয়। আমরা এরূপ কথা বলছি না। মুসলমানরা প্রথম হতেই যারথুষ্ট্র ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আহলে কিতাবগণের ন্যায় আচরণ করত। কারণ তারা মনে করত এ ধর্ম মূলে একটি একত্ববাদী ও ঐশী ধর্ম ছিল ,পরবর্তী পর্যায়ে খ্রিষ্টধর্মের ন্যায় বিচ্যুত হয়েছে। খ্রিষ্টধর্ম যেরূপ ত্রিত্ববাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে ,এ ধর্মও সেরূপ দ্বিত্ববাদের জন্ম দেয়। এজন্যই স্বয়ং যারদুশত আমাদের নিকট সম্মানিত।

এখানে আমরা যা বলতে চাই তা হলো ইসলামের আবির্ভাবের সমসাময়িক কালে যারথুষ্ট্র ধর্ম একশ ভাগ দ্বিত্ববাদী ছিল এবং একত্ববাদের সঙ্গে তার কোন মিলই ছিল না। অর্ধ শতাব্দীকাল পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা বহাল ছিল।

আমাদের এখনকার আলোচনাকে তিনটি পর্যায়ে বিশ্লেষণ করব :

1. যারদুশতের আবির্ভাবের পূর্বের আর্য বিশ্বাসসমূহ কি ছিল ?

2. যারদুশত সেখানে কি পরিবর্তন ও সংস্কার করেছেন ?

3. ইসলামের আবির্ভাবের সময় পর্যন্ত যারথুষ্ট্র ধর্মে কিরূপ বিচ্যুতি সাধিত হয়েছিল ?

যারদুশতের আবির্ভাবের পূর্বে আর্যদের ধর্মীয় বিশ্বাস

1. প্রথম ভাগ: প্রাচীন যুগে ইরানী আর্যরা দ্বিত্ববাদী হিসেবে প্রকৃতির উপাসনা করত অর্থাৎ তারা প্রকৃতির কল্যাণকর ও অকল্যাণকর উপাদানসমূহের উপাসনা করত। একদিকে প্রকৃতির কল্যাণকর উপাদান হিসেবে মাটি ,পানি ,বৃষ্টি প্রভৃতির এবং অকল্যাণকর উপাদান হিসেবে মেঘ ,বজ্রপাত ,ক্ষতিকর প্রাণীসমূহ প্রভৃতির আরাধনা করত। কল্যাণকর উপাদানসমূহকে ইবাদাত করা হতো এ উদ্দেশ্যে যে ,তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে কল্যাণ অব্যাহত রাখা এবং অকল্যাণকর বস্তুসমূহের অকল্যাণ হতে রক্ষা পাওয়া। সম্ভবত তারা প্রকৃতির এ সকল উপাদানের প্রাণ ,অনুভব ও বোধশক্তিকে বিশ্বাস করত। এ পর্যায়ে দু ধরনের বস্তু ও উপাদানের তারা উপাসনা করত-ভাল বা কল্যাণকর উপাদান ও মন্দ বা অকল্যাণকর উপাদান। কল্যাণকর উপাদানসমূহকে মঙ্গলের আশায় এবং অকল্যাণকর উপাদানকে অমঙ্গলের ভয়ে উপাসনা করা হতো। বাস্তবে তারা প্রথম হতেই দু ধরনের উপাস্যে বিশ্বাসী ছিল।

পরবর্তী সময়ে তারা কল্যাণকর ও অকল্যাণকর প্রতিটি উপাদানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাস করা শুরু করে এবং এ সকল উপাদানের উপাসনার পরিবর্তে প্রতিটির খোদাকে ইবাদাত করার সিদ্ধান্ত নেয়। যেমন আগুনের প্রভু ,বাতাসের প্রভু ,মেঘের প্রভু ,বৃষ্টির প্রভু ,বজ্রপাতের প্রভু এভাবে অন্যান্য খোদাসমূহ। এ পর্যায়ে খোদাগণকে দু ভাগে বিভক্ত করা হতো এবং তাদের কল্যাণ ও অকল্যাণের ছায়ামূর্তি হিসেবে দেখা হতো। এ দু ধরনের খোদার কল্যাণকামী ও অকল্যাণকামী বা কল্যাণদানকারী ও ক্ষতিসাধনকারী বা সৎ আত্মা ও অসৎ আত্মা নামে অভিহিত করা হতো। অর্থাৎ এ যুগেও আর্যদের মাঝে দ্বিত্ববাদের রাজত্ব ছিল।

সাঈদ নাফিসী বলেছেন ,

ইরানের আর্যদের স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তারা স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য শহর গড়ে তোলা শুরু করল। তারা ধীরে ধীরে প্রকৃতির ভাল-মন্দ ,সুন্দর-অসুন্দর ,কল্যাণ-অকল্যাণ প্রভৃতিতে বিশ্বাস স্থাপন শুরু করল। ভাল উপাদানসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো সূর্য ,ঔজ্জল্য ,বৃষ্টি প্রভৃতি আর মন্দ উপাদানসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো রাত্রি ,শৈত্য ,খরা ,দুর্ভিক্ষ ,রোগ ,মৃত্যু ও অন্যান্য আপদসমূহ। তারা কল্যাণকর উপাদানসমূহের জন্য প্রার্থনা ,দোয়া ,উপহার ও নযর প্রেরণ করত। আর অকল্যাণকর বস্তুসমূহ হতে মুক্তির জন্য মন্ত্রসমূহ পাঠ করত। ধীরে ধীরে এ কর্ম যাদুবিদ্যা ও তাবিজ-কবজে পরিণত হলো। সম্ভবত সিরীয় ,আশিরীয় ও ব্যাবিলনের অধিবাসীদের সংস্পর্শে আসার সমকালীন সময়ে এ বিষয়টি ইরানী আর্যদের মধ্যে আসে। কারণ সেমিটিক আশিরীয় ব্যাবলনীয়রা যাদুমন্ত্র ও তাবিজ-কবজে যথেষ্ট বিশ্বাস করত। ইরানীরা তাদের থেকেই এগুলো গ্রহণ করেছে। এ সময়েই ইরানীদের মাঝে যারদুশতের আগমন ঘটে এবং তিনি এ সকল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। 70

ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

আর্যদের প্রাচীন ধর্ম প্রাকৃতিক শক্তিসমূহ ও আকাশমণ্ডলীর তারকা ও অন্যান্য উপাদানসমূহের উপাসনানির্ভর ছিল। তদুপরি প্রাকৃতিক এই উপাস্যসমূহ সামাজিক ও নৈতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ছিল। বাহ্যত ইরানী ও ভারতীয় আর্যদের মধ্যে বিভাজনের পূর্বেও এই উপাস্যসমূহ দু ভাগে বিভক্ত ছিল। একদিকে দেও বা দেবগণ যাদের প্রধান হলেন যুদ্ধবাজ দেবতা ইন্দ্র এবং অন্যদিকে ছিলেন অসুরগণ (ফার্সী ভাষায় অহুর) যাদের অন্যতম হলেন অরুণ মিত্র । অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন ইরানীদের প্রাচীন প্রভু মাযদা যার অর্থ জ্ঞানী তিনি অসুরদের প্রধান সেই অরুণ । কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর প্রকৃত নাম ইরানীরা ভুলে গিয়েছিল। 71

ভাল ও মন্দের দু টি উৎস রয়েছে এ অর্থে দ্বিত্ববাদ প্রাচীন আর্যদের চিন্তাতেও ছিল। প্রকৃতপক্ষে যে বিষয়টি প্রাচীন কাল হতে তাদের চিন্তামগ্ন করে রেখেছিল তা হলো সৃষ্টি জগতে দু ধরনের বস্তুর অস্তিত্ব-ভাল ও মন্দ।

ডক্টর মুহাম্মদ মুঈন বলেছেন ,

আর্যরা প্রাচীন কাল হতে কল্যাণ ও অকল্যাণের দু টি ভিন্ন উৎসে বিশ্বাস করত। একদিকে খোদাগণ আর অন্যদিকে আহ্রিমানগণ। ভাল ও কল্যাণকর বিষয়সমূহ ,যেমন আলো ও বৃষ্টিকে খোদাগণের সঙ্গে সম্পর্কিত করত আর মন্দ ও অকল্যাণকর বিষয়সমূহকে যেমন অন্ধকার ও খরাকে আহ্রিমানদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশ্বাস করত।

আকাশপুত্র অগ্নি আলো ,উষ্ণতা ও জীবনকে ধারণকারী হিসেবে ,অন্ধকার ,খরা ও মন্দ আত্মা বহনকারী সত্তার সঙ্গে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বজ্রপাত নিয়ে আবির্ভূত হয়।

দুমযিল তাঁর ইরানের প্রাচীন ধর্মসমূহ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন , আলো প্রাচুর্য ও উন্নতির প্রতিভূ খোদা ও ফেরেশতাদের বিরুদ্ধে মন্দ ও অন্ধকারের প্রতিভূ দেওগণ (দানব) অবস্থান নেয়। দ্বিত্ববাদ ইরানীদের প্রাচীন ধর্ম বৈশিষ্ট্য ছিল ,মন্দের জগতে ধ্বংস ,অন্ধকার ,অন্যায় ও পচনশীলতা ভিন্ন কিছু নেই। এই জগৎ আহ্রিমান বা আহরা মাইনিও নামের এক মন্দ আত্মা কর্তৃক পরিচালিত হয়। 72

ডক্টর মুঈন আরো বলেছেন ,

আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যের এই যুদ্ধ মহাশূন্যে সংঘটিত হয়। ভূমণ্ডলে বিক্ষুব্ধ যে পরিবর্তনসমূহ ঘটে আমরা খুব কমই তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি । কিন্তু প্রাচীন শৈল্পিক ও অনুভূতিশীল আর্য জাতির নিকট এটি এক সংঘর্ষের প্রতিরূপ হিসেবে প্রতিফলিত হতো যা মানবের ঊর্ধ্বের ভাল ও মন্দের দুই প্রতিভূ শক্তির মধ্যে সংঘটিত হচ্ছে। তারা তাদের মনের পর্দায় তা মঞ্চায়িত করত... ।

2. দ্বিতীয় ভাগ: যারদুশতের আগমনের পর যে সংস্কার সাধিত হয়েছিল। এ বিষয়ে আলোচনার পূর্বে মাযদিসনা নবী যারদুশত73 ও তাঁর আনীত ধর্মগ্রন্থ উসতা বা আভেস্তা নিয়ে যে সংশয় রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করব: যারদুশত রুস্তম বা ইসফানদিয়ারের ন্যায় একজন কাল্পনিক ব্যক্তি নাকি তাঁর বাস্তব অস্তিত্ব ছিল ? যদি তাঁর বাস্তব অস্তিত্ব থেকেই থাকে তাহলে তা কখন ?

যারদুশতের আগমন কালকে কেউ খ্রিষ্টপূর্ব ছয়শ বছর ,আবার কেউ ছয় হাজার বছর বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সমসাময়িক সম্রাট কে ছিলেন তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি কি প্রকৃতই ভীশতাসব বা গুশতাসব -এর সমকালীন ছিলেন ?

তাঁর জন্মস্থানই বা কোথায় ছিল ? আজারবাইজান নাকি বালখ ? ফার্স নাকি রেই ? খাওয়ারেজম নাকি মারভ ? হেরাত নাকি ফিলিস্তিন ? কোথায়ই তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ?

উপরিউক্ত বিষয়গুলো ঐতিহাসিকভাবে জানতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞগণ তাঁকে একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বলে মনে করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর জন্মস্থান আজারবাইজান এবং জন্মকাল খ্রিষ্টপূর্ব ছয়শ বছর বলা হয়েছে।

তাকী যাদেহ বলেছেন ,

দৃঢ়ভাবে ধারণা করা যায় যারদুশত আলেকজান্ডারের ইরান অভিযান ও সম্রাট দারার হত্যার (খ্রিষ্টপূর্ব 330-331) 258 বছর পূর্বে অথবা আলেকজান্ডারের মৃত্যুর (খ্রিষ্টপূর্ব 323) 272 বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। কোন কোন মতে তিনি নবুওয়াত পান। আবার কারো মতে সম্রাট গুশতাসব তাঁর প্রতি ঈমান আনেন। সুতরাং যারদুশতের জন্ম খ্রিষ্টপূর্ব 588 অথবা 618 অথবা 630। আর যদি আলেকজান্ডারের মৃত্যুর সময় হতে 272 বছর পূর্বে ধরি তবে তাঁর জন্ম বছর হবে খ্রিষ্টপূর্ব 595 অথবা 625 অথবা 637।

অন্যদিকে আভেস্তা সম্পর্কেও মতভেদ রয়েছে যে ,আসলেই কি আভেস্তা মাযদা ইয়াসনাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ যা যারথুষ্ট্র কর্তৃক আনীত কিন্তু লিখিত হয় নি ;বরং বংশ পরম্পরায় মুখস্থ করার মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছিল এবং মুসলিম শাসনামলে যারথুষ্ট্রগণ নিজেদের আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ ধর্মগ্রন্থের লিখিত রূপ দেয় নাকি তা পূর্বেই সংকলিত হয়েছিল পরে সুবিন্যাসিতরূপে উপস্থাপিত হয় ? যদি তা পূর্বে লিখিত ও সংকলিত হয়ে থাকে তাহলে তা কোন্ সময়ে হয়েছিল ?

কেউ কেউ বিশ্বাস করেন আভেস্তা হাখামানেশী আমলেই সংকলিত হয়েছিল। তবে আলেকজান্ডারের আক্রমণে তা ধ্বংস হয় অথবা আলেকজান্ডার তা পুড়িয়ে দেন। প্রাচ্যের ঐতিহাসিকদের মতে আলেকজান্ডার আভেস্তাকে ভস্মীভূত করেন ,কিন্তু পাশ্চাত্যের বিশেষজ্ঞদের মতে এ বিষয়টি অপ্রমাণিত। তাঁদের অনেকে অবশ্য বলেছেন ,আলেকজান্ডারের আক্রমণে আভেস্তা বিক্ষিপ্ত ও ছিন্নভিন্ন হয়েছিল। আশকানীদের শাসনামলে আভেস্তাকে পুনরায় সংকলনের পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু নিশ্চিত যে ,সাসানী শাসনামলের প্রারম্ভ পর্যন্ত আভেস্তা বিন্যস্ত ও সংকলিত হয় নি। সাসানী সম্রাট আরদশিরের নির্দেশে প্রথম একজন যারথুষ্ট্র পুরোহিত আভেস্তা সংকলন ও পুনর্বিন্যাসের কাজে হাত দেন। কিন্তু এই ধর্মজাযক কিসের ভিত্তিতে কাজটি করেছেন তা জানা যায় নি। সাসানী আমলে সংকলিত আভেস্তার সঙ্গে প্রকৃত আভেস্তার কতটা সাদৃশ্য রয়েছে ও কতটা বৈসাদৃশ্য তাও অজ্ঞাত। তবে এটি নিশ্চিত ,এ দু য়ের মাঝে ব্যাপক পার্থক্য ছিল। কেনই বা সাসানী আমলে সংকলিত আভেস্তার কিছু অংশ মাত্র এখনও অবশিষ্ট আছে তাও অজ্ঞাত।74

ক্রিস্টেন সেন এ বিষয়ে বলেছেন ,

কখনও কখনও কেউ হয়েতো এ বিষয়ে চিন্তা করতে পারেন কেন সাসানী আমলে সংকলিত আভেস্তার বেশির ভাগ অংশ ইসলামী আমলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। আমরা জানি মুসলমানগণ যারথুষ্ট্রদের আহলে কিতাব বলে মনে করে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থটির বিনাশের জন্য মুসলিমদের গোঁড়ামি নিশ্চয় দায়ী ছিল না। কারণ আভেস্তার অধিকাংশই নবম খ্রিষ্টাব্দ (তৃতীয় হিজরী শতক) পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল অথবা অন্তত আভেস্তার পাহলভী ভাষার ব্যাখ্যাসহ অনুবাদ যাকে যান্দ বলে অভিহিত করা হতো যারথুষ্ট্রদের হাতে ছিল। কিন্তু তৎকালীন সময়ে যারথুষ্ট্রগণ বস্তুগতভাবে যে অবস্থায় ছিল তাতে এরূপ বৃহৎ কলেবরের গ্রন্থটিকে পুনর্লিখনের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছান তাদের জন্য সম্ভব হয়নি।

আমরা এ থেকে বুঝতে পারি কেন এর বিধানাবলী বিস্মৃত হয়েছিল। তা এজন্য যে ,যেহেতু সে সময় যারথুষ্ট্র শাসন ছিল না সেহেতু আইনগত বিধি-বিধান অপ্রয়োজনীয় ও মূল্যহীন হয়ে পড়েছিল। তবে কেন স্রষ্টা ,আখেরাত ,সৃষ্টি জগৎ ও অন্যান্য মৌলিক বিষয়সমূহকে তারা সংরক্ষণ করেনি ? এর জবাবে বলা যায় আমাদের হাতে কিছু প্রমাণ রয়েছে যাতে বোঝা যায় যারথুষ্ট্র ধর্ম ইসলামের অবির্ভাবের পরবর্তী একশ বছরে অনেক সংস্কারকৃত ও পরিবর্তিত হয়েছিল। কারণ স্বয়ং যারথুষ্ট্রগণ আগ্রহী ছিলেন আভেস্তায় বর্ণিত কাল্পনিক ও বানোয়াট কাহিনীসমূহ ও ভিত্তিহীন বিশ্বাসসমূহকে পরিশুদ্ধ করতে ও মুছে ফেলতে। 75

ক্রিস্টেন সেন সাসানী আভেস্তা হতে সৃষ্টি সম্পর্কে কাল্পনিক যে বর্ণনা এসেছে তার উল্লেখ করে বলেন ,

...বিশ্ব জগতের বয়স বার হাজার বছর পূর্ণ হয়েছে। বিশ্ব সৃষ্টির তিন হাজার বছর পর্যন্ত আহুরমাযদা (আলোর স্রষ্টা) ও আহ্রিমান (অন্ধকারের স্রষ্টা) পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছিলেন। এ দু জগৎ তিন দিকে সীমাহীনভাবে প্রসারিত ছিল এবং এক দিকে মাত্র পরস্পর সীমিত ছিল। আলোর জগৎ ওপরে এবং অন্ধকারের জগৎ নীচে ছিল। এর মাঝামাঝি ছিল বায়ুমণ্ডল। এ তিন হাজার বছর আহুরমাযদার সৃষ্টিসমূহ সম্ভাব্যের পর্যায়ে ছিল। তা পূর্ণতা পেলে আহ্রিমান এর ঔজ্জ্বল্য দেখে তা ধ্বংস করতে মনস্থ করল। আহুরমাযদা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞাত থাকায় আহ্রিমানের সঙ্গে যুদ্ধ নয় হাজার বছর পিছিয়ে দিলেন। আহ্রিমান শুধু অতীত সম্পর্কে জ্ঞাত থাকায় তাঁর এ প্রস্তাবে রাজী হলো। আহুরমাযদা আহ্রিমানকে উদ্দেশ্য করে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন এ যুদ্ধে অন্ধকারের পরাজয়ের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটবে। এ কথা শুনে আহ্রিমান ক্রুদ্ধ হলো কিন্তু তিন হাজার বছরের জন্য অন্ধকারের জগতে স্থির হয়ে রইল। এ সময়ে আহুরমাযদা বিশ্ব সৃষ্টির কাজে হাত দিলেন এবং যখন সৃষ্টির কাজ সমাপ্ত হলো তখন একটি গাভী সৃষ্টি করলেন-যা সর্বপ্রথম গাভী। অতঃপর তিনি গিওমারদ (কিউমারস) নামে এক বৃহৎ মানুষ তৈরি করলেন-যা সর্বপ্রথম মানুষ । এ মুহূর্তে আহ্রিমান তার সৃষ্টি জগতে আক্রমণ করল ও বিষাক্ত পোকামাকড় ,সরীসৃপ ও সৃষ্টিকে কলুষিত করার উপাদানসমূহ তৈরি করল। আহুরমাযদা আকাশে একটি পরিখা খনন করলেন। আহ্রিমান তাঁর রাজ্যে উপর্যুপরি আক্রমণ করতে লাগল ও অবশেষে গিওমারদ ও গাভীটিকে হত্যা করল। কিন্তু গিওমারদদের বীজ যা মাটির নীচে প্রোথিত ছিল তা হতে চল্লিশ বছর পর প্রথম জোড়া মানুষ মেশিগ মেশইয়ানাগ -এর সৃষ্টি হলো। এ পর্যায়ে আলো ও অন্ধকারের সংমিশ্রণ যা গেমিজেশেন নামে অভিহিত তা শুরু হলো। মানুষ কল্যাণ ও অকল্যাণের এ যুদ্ধে ভাল ও মন্দ কর্মের মাধ্যমে এ দু দলের একটিকে বেছে নেয়। 76

এখন আমরা যারদুশতের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করব। যাঁরা যারদুশতকে একজন ঐতিহাসিক বাস্তব অস্তিত্বের ব্যক্তিত্ব মনে করেন তাঁরা স্বীকার করেছেন যারদুশত তাঁর সমাজের সামাজিক ,অর্থনৈতিক ও বিশ্বাসগত সংস্কার সাধন করেছেন।

যারদুশতের অন্যতম সংস্কার কর্ম ছিল দেও-দৈত্যদের উপাসনা নিষিদ্ধকরণ। যারদুশত শুধু আহুরমাযদার উপাসনার প্রতি আহ্বান জানাতেন এবং দেওদের অভিশপ্ত ,নিকৃষ্ট ও উপাসনার অযোগ্য বলে প্রচার চালাতেন। তিনি গরুসহ সকল প্রকার প্রাণীর কুরবানী নিষিদ্ধ করেন।

তামাদ্দুনে ইরানী গ্রন্থের অন্যতম প্রবন্ধ লেখক দুমযিল বলেছেন ,

যারদুশতের সংস্কার কার্যক্রম বেশ ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ ছিল। তিনি সামাজিক গঠনের নতুন কোন পদ্ধতির প্রয়োগ করেন নি ,তদুপরি তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কার অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। সাধারণ প্রচলিত ধারণা এটি যে ,আর্য জাতির একাংশ তখন যাযাবর অবস্থা হতে শহুরে ও গ্রামীণ সমাজ গঠনের অবস্থায় পৌঁছেছিল। তাই এ পর্যায়ে তারা পশু চারণের জন্য অনির্দিষ্ট চারণভূমিগুলোকে প্রত্যেক গোত্রের জন্য ভিন্ন ভিন্নভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়। গবাদি পশুনির্ভর হওয়ায় তারা নর ও মাদী গরুকে বিশেষ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখত। নতুন শহর বা গ্রাম নির্মাণে পশুর মলের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো ,এমনকি গরুর মূত্র পবিত্রকারী হিসেবে পরিগণিত হতো।

তিনি আরো উল্লেখ করেছেন ,

যারদুশত খ্রিষ্টের জন্মের ছয়শ অথবা এক হাজার বছর পূর্বে পশু কুরবানী ও নেশা সৃষ্টিকারী পানীয় ,যেমন সুমে -যা ইরানী ও ভারতীয়দের নিকট অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল এবং প্রাচীন ভারতীয় ধর্মেও প্রচলন ছিল বলে জানা যায়-এগুলোকে নিষিদ্ধ করেন।

যারদুশতের নিকট সৎ চিন্তা ,সৎ কর্ম ও সদুপদেশ ইবাদত বলে বিবেচিত হতো। মানুষের এই অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রচেষ্টাই মানুষকে ভাল-মন্দের চিরন্তন সংগ্রামে জয়ী হিসেবে বের করে আনে। অন্যান্য বিষয় কুসংস্কার ও গুনাহ বলে পরিত্যাজ্য। যারদুশত বলেছেন , নেশাকর পানীয় কিরূপে মানুষকে সৎ কর্মে উৎসাহিত করতে পারে যখন তা নিজেই নোংরা ? যে গরু গৃহস্থের কৃষি কাজের সহায়ক ও একান্ত প্রয়োজনীয় তা দেহহীন ও খাদ্যের প্রয়োজনশূন্য খোদার জন্য কুরবানীর কি প্রয়োজন ?

সুমে বা হুমে নামের যে পানীয়কে যারদুশত নিষিদ্ধ করেন তা এক বিশেষ বৃক্ষের রস হতে তৈরি হতো ,তবে কোন্ বৃক্ষ হতে তা প্রস্তুত হতো তা জানা যায় নি। নেশাকর এ পানীয়টি প্রাচীন আর্যগণ উপাসনার অনুষ্ঠানে পান করত।

ডক্টর মুঈন বলেছেন ,

আর্যদের দৃষ্টিতে... এ ধরনের অনুষ্ঠান উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সম্মানিত ব্যক্তিদের জন্য আয়োজন করা হতো।... খোদাগণ এরূপ বন্ধুদের দাওয়াত গ্রহণ করতেন। মানুষ যেমন খাদ্য গ্রহণে শক্তি অর্জন করে তেমনি খোদাগণও এ ধরনের আমন্ত্রণে খাদ্য গ্রহণ করে শক্তিশালী হন। বিশেষত এরূপ শক্তি সুমে নামক পবিত্র বৃক্ষের রসে রয়েছে। এর পানীয় প্রাণে সজীবতা আনয়ন করে...। পাহাড়ী এ বৃক্ষের কাণ্ড নরম ও আঁশযুক্ত এবং তা হতে দুধের ন্যায় সাদা রস নিঃসৃত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের গ্রন্থে এ বৃক্ষকে হাউমুল মাজুস বলা হয়ে থাকে।... এ বৃক্ষের রসকে রং ধারণ করা পর্যন্ত জ্বাল দেয়া হতো। এই পানীয়টি আর্যদের প্রাচীন ও জাঁকজমকপূর্ণ (সর্বোত্তম!) ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে কুরবানীর সময় ব্যবহার করা হতো। এতে অ্যালকোহল থাকায় আগুনের ওপর ছিটিয়ে দেয়া হতো। এতে আগুন দ্বিগুণ হারে জ্বলতে শুরু করত। এ ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পন্নের সময় পুরোহিতগণও পর্যাপ্ত পরিমাণ পানীয় পান করত। সুমে শুধু পবিত্র পানীয় হিসেবেই নয় ;বরং আর্যদের নিকট এর বৃক্ষ খোদার মর্যাদা লাভ করেছিল। 77

যারদুশত এই কুসংস্কারের অবসান ঘটান যদিও পরবর্তীতে সাসানী আমলে এ সংস্কৃতি পুনর্জীবিত হয় এবং যারথুষ্ট্রদের অন্যতম আচারে পরিণত হয়। বলা হয়ে থাকে সাসানী

আভেস্তাতে উল্লিখিত হয়েছে :

সকল মদের প্রতিক্রিয়ায়ই রক্ত গরম ও উষ্ণ হয়ে ওঠে ,কিন্তু সুম -এর পানীয় শান্তি ও স্বস্তিদায়ক। সুম -এর নেশা মানুষকে হালকা করে। যে ব্যক্তি সুম কে নিজ শিশু পুত্রের ন্যায় স্নেহ করে সুম তাদের দেহকে আরোগ্য দান করে। (ইয়াসনা 10 ,ধারা 8)

আমরা পুনরায় যারদুশতের সংস্কার কার্যক্রমে ফিরে আসি। জন নাস-এর ধর্মসমূহের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে :

যারদুশতের দৃষ্টিতে সঠিক ও মঙ্গল হলো ভূমি কর্ষণ ,বীজ বপন ,ফসল উৎপাদন ,শুষ্ক ভূমিকে আবাদকরণ ,পানি সেচন ,আগাছা-পরগাছা দূরীকরণ ,উপকারী প্রাণী সংরক্ষণ বিশেষত কৃষিকার্যে ব্যবহৃত বলদের যত্ন ,পরিচর্যা এবং খাদ্য প্রদান। ভাল মানুষ সব সময় সত্য কথা বলে ,মিথ্যা হতে দূরে থাকে। অন্যদিকে মন্দ লোক এর বিপরীত কাজ করে ও কৃষি কাজের বিষয়ে কখনও চিন্তা করে না। কারণ আনগারা মাইনিও (মন্দ আত্মা) কল্যাণকর কৃষিকর্মের শত্রু।

জন নাস আরো উল্লেখ করেছেন ,

যারথুষ্ট্রগণ প্রাচীন কালে তাদের প্রার্থনায় বলতেন: আমি দেওদের শত্রু মনে করি ও মাযদার উপাসনা করি। আমি ইয়াযদানদের নবী ও দেওগণের শত্রু যারদুশতের অনুসারী। আমি পবিত্র আত্মা এমশাসে পান্দী র প্রশংসা করি এবং জ্ঞানের খোদার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছি ,সব সময় সৎ কর্ম ও কল্যাণের পথ অনুসরণ করব ,সত্যকে গ্রহণ করব ,মহান প্রভুর উদ্দেশ্যে সর্বোত্তম কর্ম সম্পাদন করব। ব্যক্তির কল্যাণের জন্য যে গরু প্রেরণ করা হয়েছে তার প্রতি সহৃদয় হব। আকাশ ও ভূমণ্ডলের আলোকরশ্মি ও তারকাসমূহ এবং ন্যায়নীতি যা প্রভু ইয়াযদানের রহমতস্বরূপ-এ সকলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব। আমি এরমিতি (সেপানদার মায) পবিত্র ও কল্যাণের ফেরেশতাকে গ্রহণ করলাম। আশা করি তিনি আমার সহযোগী হবেন। আমি চুরি ,অকর্ম ,প্রাণীদের কষ্ট দান ও মাযদার উপাসনাকারীদের শহর ও গ্রামসমূহ নষ্ট করা হতে বিরত থাকব। 78

যারদুশতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্ম ছিল খোদা ,সৃষ্টি ও বিশ্ব জগৎকে নিয়ে। যারদুশত বিশ্বের স্রষ্টা খোদা সম্পর্কে কিরূপ ধারণা পোষণ করতেন ? তার দাওয়াত কি তাওহীদের দিকে ছিল নাকি তাওহীদ ভিন্ন অন্য কিছুর দিকে ? আমরা দ্বিত্ববাদ শিরোনামে ভিন্ন এক অধ্যায়ে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।

3. যারদুশতের পরবর্তী সময়ে আর্যদের ধর্মীয় বিশ্বাস কিরূপে পরিবর্তিত হয়েছিল :

ঐতিহাসিক ও গবেষকগণের কেউই এ বিষয়টি অস্বীকার করেননি ,যারদুশতের মৃত্যুর পরবর্তী যুগে বিশেষত সাসানী আমলে আর্য বিশ্বাসসমূহ অবক্ষয়ের শিকার হয়েছিল। যারদুশতের উচ্চতর ও সুন্দর শিক্ষাসমূহ কুৎসিত ও নিকৃষ্ট চিন্তায় পর্যবসিত হয়। সাসানী আমলে যারথুষ্ট্র ধর্মের মধ্যে অসংখ্য কুসংস্কার ও কাল্পনিক বিষয়সমূহ প্রবেশ করানো হয়। এ বিষয়ে সকলেই একমত। প্রসিদ্ধ পারস্য বিশারদ দুমযিল তাঁর যারদুশতের সংস্কার শিরোনামের প্রবন্ধে বলেছেন ,

প্রকৃতই যারদুশতের শিক্ষা ও চিন্তা অত্যন্ত অগ্রগামী ও সাহসিকতাপূর্ণ ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বর্তমানে প্রচলিত যারথুষ্ট্র ধর্ম ও অন্যান্য ধর্মের পরিণতি লাভ করেছিল। সহজভাবে বলা যায় তার শিক্ষা প্রচলিত রীতি ,প্রবণতা ও অনুসারীদের বস্তুগত প্রয়োজনের আবর্তে পরিবর্তিত হয়ে যায়। বিশেষ ধরনের র্শিক তাওহীদের স্থান অধিকার করে। ফেরেশতাগণকে মহান খোদার সমকক্ষ বানান হয়। জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদিতে পশু কুরবানী প্রচলন লাভ করল। নৈতিকতা বিবেকের হাতে মূল্যায়নের জন্য অর্পিত হলো। 79

পি. জে. দুমানাশেহ্ বলেছেন ,

যারদুশতের মৌলিক সংস্কারের পর পুনরায় প্রাচীন কাল্পনিক ধর্ম পুনরুজ্জীবিত হলো ,এমনকি যারদুশতকে তাদের নিজেদের মতো রূপ দিল ও গাতা সমূহে পরিবর্তিত করে সুমে পানোৎসবের মতো ধর্মবিরোধী বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হলো। এভাবে মহান খোদা আহুরমাযদা ও নিষ্পাপ ফেরেশতাগণ খোদা হিসেবে সমকক্ষ হয়ে গেলেন ,অথচ মাযদার ধর্ম এ চিন্তাকে দূরে নিক্ষেপ করেছিল। 80

পুর দাউদ এবং ডক্টর মুঈনও স্বীকার করেছেন প্রকৃত আভেস্তার সঙ্গে সাসানী আভেস্তার লক্ষণীয় পার্থক্য রয়েছে এবং সাসানী আভেস্তা যারদুশতের পূর্ববর্তী কুসংস্কারগুলোকে পুনর্জীবিত করেছে। তাঁরা দাবি করেছেন ,

যারথুষ্ট্র ধর্মের প্রকৃত বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে হলে গাতা সমূহ দেখতে হবে। পরবর্তীতে গাতা সমূহে পরিবর্তন ও বিকৃত সাধন করা হয়েছে। বিশেষত সাসানী আমলে যারথুষ্ট্র ধর্ম এর প্রকৃত উৎস হতে অনেক দূরে সরে পড়ে। 81

যে গাতা সমূহের বিষয়ে পুর দাউদ ও ডক্টর মুঈন বলেছেন ,তা সাসানী আভেস্তার (ইয়াসনাসত ওয়া ইয়াসনা) পাঁচটি অংশের একটি অংশ। গাতা সমূহ আভেস্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশ যা যারদুশতের নিকট হতে বর্ণিত বলে বিশ্বাস করা হয়। বিশেষজ্ঞদের হাতে এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে ,সম্পূর্ণ গাতা অথবা গাতাসমূহের যে অংশে কবিতা আকারে দোয়া ও মুনাজাত রয়েছে সে অংশ স্বয়ং যারদুশত কর্তৃক পঠিত হয়েছে। এ অংশ যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। অন্যান্য অংশে যে সকল কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণা ও বিশ্বাসের উপস্থিতি রয়েছে এ অংশে তা নেই অথবা খুবই কম রয়েছে ,কোন কোন ক্ষেত্রে অন্যান্য অংশের বিপরীত বক্তব্য রয়েছে। যাঁরা যারদুশতকে একত্ববাদী মনে করেন তাঁরা গাতাসমূহে বর্ণিত বিষয়সমূহ হতে এর সপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকেন। আভেস্তার অন্যান্য অংশ পরবর্তীতে সংযুক্ত হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।

যা হোক এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে ,পরবর্তী যুগে বিশেষত সাসানী শাসনামলে যারথুষ্ট্র ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস ও বিধি-বিধান সব বিষয়েই ব্যাপক অবক্ষয় ঘটেছিল। এর সপক্ষে সর্বোত্তম দলিল হলো পরবর্তী সময়ে আহুরমাযদার দৈহিক রূপ দেয়া হয়েছিল এবং বিভিন্ন স্থানে তাঁর প্রতিকৃতি ও মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল।

পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যারদুশত খোদার যে ধারণা প্রচার করতেন তাতে তাঁকে দেহহীন অবস্তুগত সত্তা বলে বিশ্বাস করতেন এবং এজন্যই কুরবানী না করার পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলতেন , খোদার দেহ নেই ,তাই তাঁর খাদ্যের প্রয়োজন নেই82

সাসানী আমলে খোদা আনুষ্ঠানিকভাবে দৈহিক আকৃতি ,শ্মশ্রুমণ্ডিত ও বস্ত্রাবৃত হয়ে লাঠিসহ আগমন করেন। রাজাব ,রুস্তম ও বুস্তানের শিলালিপি ও খিলানের ওপর যে সকল চিত্র অংকিত হয়েছে তাতে দেখা যায় আহুরমাযদা (খোদা) সাসানী সম্রাট আরদ্শির ,শাহপুর বা খসরুকে স্বহস্তে রাজমুকুট পড়িয়ে দিচ্ছেন। এ থেকে বোঝা যায় তৎকালীন সময়ে যারদুশতের নিরাকার খোদা (আহুরমাযদা) সাসানী আমলের যারথুষ্ট্র পুরোহিতদের মাধ্যমে কিভাবে মূর্তির আকার ধারণ করেছিল।

ক্রিস্টেন সেন রুস্তমের চিত্রকর্মকে বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে :

(আহুরমাযদা) একটি খাঁজকাটা মুকুট পরিধান করে রয়েছেন এবং তাঁর কুঞ্চিত দু বেণী মাথা ও মুকুটের মাঝ হতে বেরিয়ে ঝুলে রয়েছে। তাঁর দীর্ঘ শ্মশ্রু ,বলয়াকৃতি বেণী ও চৌকোণাকৃতি চেহারায় প্রাচীনত্বের ছাপ থাকলেও পোশাকের দৃষ্টিতে সাসানী সম্রাটের সঙ্গে তাঁর কোন পার্থক্য নেই ,তাঁর মুকুট হতেও কুঞ্চিত ফিতাসমূহ ঝুলে রয়েছে ,তাঁর ঘোড়াটিও সম্রাটের ঘোড়ার ন্যায় সজ্জিত। তবে এ খোদার ঘোড়ায় ফুল চিত্রিত রয়েছে। আর সম্রাটের ঘোড়ার অগ্রভাগে দু টি বাঘের ছবি চিত্রিত হয়েছে। 83

বর্তমান সময়েও যারথুষ্ট্রদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের জাতীয় প্রতীক হিসেবে শ্মশ্রুমণ্ডিত ,রাজদণ্ডধারী ,কেশরযুক্ত খোদার (আহুরমাযদা) চিত্র সাসানী আমলের চিন্তাগত অবক্ষয়ের চি হ্ন হিসেবে শোভিত হচ্ছে।

যারথুষ্ট্রগণ একদিকে নিজেদের একত্ববাদী বলে দাবি করে বলে , আহুরমাযদা মুসলমানদের সেই আল্লাহ্ যাঁকে কোরআনلا تدركه الأبصار و هو يدرك الأبصار و هو اللّطيف الْخبير দৃষ্টিসমূহ তাকে অনুধাবন করতে পারে না ,অবশ্য তিনি দৃষ্টিসমূহকে অনুধাবন করেন এবং তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী বিজ্ঞ 84 বলে উল্লেখ করেছে। আবর অন্যদিকে খোদার বিভিন্ন প্রতিকৃতি এঁকে ও তাঁর লাঠি ,দাড়ি ও মুকুটধারী মূর্তির আকৃতি দান করে।

যে ইরানের মানুষ চৌদ্দ শতাব্দী ধরে একত্ববাদের সর্বোচ্চ ধারণা অর্জন করেছে ও একত্ববাদের ওপর বিস্ময়কর কবিতা ও গদ্য রচনা করেছে আশ্চর্যের বিষয় হলো তাদের জন্য শিং ও ডানাযুক্ত খোদার প্রতিকৃতি তৈরি করে একদল লোক চায় তারা একে জাতীয় প্রতীকরূপে গ্রহণ করুক। যদি এটি অবক্ষয় না হয় তাহলে অবক্ষয় কোন্টি ? যদি এর নাম মূর্তি পূজা না হয় ,তবে মূর্তি পূজা বলে পৃথিবীতে কিছু নেই।

ইরানী মুসলমানগণ ইসলামী যে সকল পরিভাষা ফার্সীতে অনুবাদ করেছেন তন্মধ্যে একটি হলো আল্লাহ্ যার ফার্সী অনুবাদ হলো খোদা যা খুদঅ -এর সংক্ষিপ্ত রূপ যার অর্থ যিনি সৃষ্ট হন নি। ইরানিগণ আল্লাহ্ শব্দকে আহুরমাযদা অনুবাদ করে নি কারণ আহুরমাযদা শব্দটিকে যারথুষ্ট্রগণ এমন অবস্থায় এনেছিল যে ,তাঁর দৈহিক মূর্তি সৃষ্টি হয়েছিল। তাই এ মনীষীদের দৃষ্টিতে তা কখনই আল্লাহ্ শব্দের অনুবাদ হতে পারে না (বলে মনে করেছেন)।

আমরা জানি সাসানী আমলের ধর্মীয় পরিভাষাগুলোর একটি হলো র্ফারা আইযাদী । বাহ্যত এটি সাসানী রাজনীতিরই জন্ম যদিও প্রাথমিকভাবে একে একটি অবস্তুগত এবং নৈতিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দ মনে হয়। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় এ শব্দটিও বস্তুগত ও দৈহিক সত্তাসম্পন্ন।

ডক্টর মুঈন বলেছেন ,

আভেস্তার বর্ণনা মতে ফারেহ কে ঈগল বা চিল জাতীয় কোন পাখি হিসেবে ধারণা করা হয়..। জামশিদ (সম্রাট) মিথ্যা ও কটু কথা বললে ফার (অন্য সম্রাট) তার সঙ্গে প্রকাশ্য যুদ্ধে লিপ্ত হলেন... অন্যদিকে আরদ্শিরের জীবনীতে ফার একটি মেষ শাবক বা হরিণ শাবক হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে। 85

অতঃপর ডক্টর মুঈন আরদ্শির ও তাঁর দাসীর পালিয়ে যাবার ঘটনা ও আরদাওয়ান কর্তৃক তাঁদের অনুসরণের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছেন ,

আরদাওয়ান আরদ্শির ও তাঁর দাসীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলে অমুক স্থান দিয়ে তাদের দ্রুত ধাবমান হতে দেখেছে এবং একটি মেষ শাবকও তাঁদের পেছনে পেছনে ছুটছিল। আরদাওয়ান মেষ শাবকের ধাবিত হওয়ার বিষয়টি শুনে এক যারথুষ্ট্র পুরোহিতকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন এই খোদায়ী ফারেহ্ তাঁর নিকট পৌঁছার পূর্বেই আমাদের তাঁর নিকট পৌঁছা উচিত। হয়তো ফারেহ্ তাঁর নিকট পৌঁছানোর পূর্বেই আমরা তাঁকে ধরতে পারব। 86

সাসানী আমলে আগুন খোদার কন্যা বলে পরিচিত হয়ে ওঠে।87 যারথুষ্ট্র ধর্মের কোন কোন শিক্ষা মতে আহুরমাযদা সকল সৃষ্টির ঊর্ধ্বে বলে উল্লিখিত হয়েছে এবং পবিত্র জ্ঞানদাতা সেপান্ত মাইনিও ও মন্দ আত্মা (আনগারা মাইনিও বা আহ্রিমান) উভয়েই তাঁর সৃষ্টি ও পরস্পরের বিপরীতে স্থান নেয়। আবার আভেস্তার কোন কোন বর্ণনা মতে আহুরমাযদা আহ্রিমান উভয়েই যারওয়ান নামের তৃতীয় এক অস্তিত্বের সৃষ্টি। যারওয়ান হলো সীমাহীন সময়। এ সম্পর্কে একটি কাল্পনিক বর্ণনাও প্রস্তুত হয়েছে :

যারওয়ান হলেন প্রাচীন ও প্রকৃত খোদা ,তিনি সন্তান পাওয়ার লক্ষ্যে অনেকগুলো কুরবানী করেন ও সঙ্কল্প করেন সন্তানের নাম রাখবেন আহুরমাযদা । তিনি কুরবানী দেয়ার এক হাজার বছর পর সন্দেহে পতিত হলেন যে ,তাঁর কুরবানীসমূহের মধ্যে কোন্টি অধিকতর ফলপ্রসূ হয়েছে। পরিশেষে তার গর্ভে দু সন্তানের সৃষ্টি হলো। তাদের একজন হলেন আহুরমাযদা যাঁর নামে তিনি কুরবানী করেছিলেন এবং অন্যজন হলো আহ্রিমান যে তাঁর সন্দেহ ও দোদুল্যমানতা হতে সৃষ্টি হয়েছে। যারওয়ান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন ,যে প্রথম উদর হতে বেরিয়ে আসবে তাকেই রাজত্ব দেবেন। আহ্রিমান সর্বপ্রথম পিতার উদর ফেঁড়ে বেরিয়ে তাঁর নিকট উপস্থিত হলো। যারওয়ান তাকে প্রশ্ন করলেন: তুমি কে ? আহ্রিমান জবাব দিল: আমি তোমার পুত্র। যারওয়ান বললেন: আমার পুত্র সুন্দর ও সুগন্ধপূর্ণ ,কিন্তু তুমি কুৎসিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। এ সময় আহুরমাযদা উজ্জ্বল ও সুগন্ধযুক্ত দেহ নিয়ে আবির্ভূত হলেন। যারওয়ান তাঁকে পুত্র হিসেবে চিনতে পেরে বললেন: এতদিন আমি তোমার জন্য কুরবানী করতাম ,আজ হতে তুমি আমার জন্য কুরবানী করবে। 88

সাসানী আভেস্তার পাঁচ অংশের নাম হলো ভানদিদাদ যা তৎকালীন যারথুষ্ট্র ধর্মীয় বিধি ও আচার সম্বলিত গ্রন্থ। এর একটি অংশে দেওদের বন্দী করার দোয়া ও মন্ত্রসমূহ লেখা রয়েছে। ভানদিদাদ শব্দের অর্থ হলো দেওবিরোধী। এ শব্দটিও তৎকালীন সমাজের চিন্তার প্রতিনিধি। এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু তৎকালীন ধর্মীয় বিশ্বাসকে তুলে ধরেছে। ইরান দার যামানে সাসানীয়ান গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে পারস্য বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টেন সেন যারথুষ্ট্র ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যেমন অগ্নি উপাসনা পর্ব ,মাথার খুলির ওপর মৃতদের জন্য খাদ্য ও পানীয় উপস্থাপন ,হিংস্র প্রাণী বিতাড়ণ ,শতাব্দী বর্ষ উদযাপনে অগ্নিশিখার ওপর পাখিদের নিক্ষেপ ,আগুনের চারিদিকে সমাবেশ ও মদ্যপান প্রভৃতি বিষয়সমূহ।89

ক্রিস্টেন সেন তাঁর ইরান দার যামানে সাসানীয়ান গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলেছেন ,

ধর্মযাজকগণ সমাজে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন ,যেমন পবিত্রতার বিধি-বিধান কার্যকর করা ,পাপীদের স্বীকারোক্তি শ্রবণ ও তাদের ক্ষমা প্রদর্শন ,কাফ্ফারার (জরিমানা) পরিমাণ নির্ধারণ ,শিশুর জন্ম কালীন আচারাদি পালন ,পবিত্র কোমরবন্ধনী পরিধান করানো ,বিবাহ ,শবযাত্রা ,ধর্মীয় ঈদ উৎসব উদযাপন... ,প্রতিদিন চারবার সূর্যের উপাসনা ও একবার চন্দ্র ও পানির উদ্দেশে প্রতি দোয়া করা ইত্যাদি। বিভিন্ন সময়ে যেমন শয়ন ,জাগ্রত হওয়া ,ধৌতকরণ ,কোমরবন্ধনী পরিধান ,খাদ্য গ্রহণ ,মলমূত্র ত্যাগ ,হাঁচি দেয়া ,নখ কাটা ,বেণী বাঁধা ,প্রদীপ জ্বালানো প্রভৃতি কর্মের শুরুতে অবশ্যই সকলকে নির্দিষ্ট দোয়া পড়তে হবে। চুলার আগুন কখনও নেভানো যাবে না ,সূর্যের আলো যেন আগুনের ওপর না পড়ে ,পানি যেন আগুনের সঙ্গে মিশ্রিত না হয় ,ধাতব জিনিসে যেন মরিচা না পড়ে ,কারণ ধাতব বস্তুসমূহ পবিত্র। এ সকল বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। কোন ব্যক্তি যদি মৃত ব্যক্তিকে অথবা ঋতুমতী নারীকে বা যে নারী সদ্য বাচ্চা প্রসব করেছে তাকে বিশেষত যদি মৃত সন্তান প্রসব করে থাকে ,স্পর্শ করে তাদের পবিত্র করার জন্য ক্লান্তিকর ও কষ্টবহুল আচার পালন করা হতো। যারদুশতের অনুসারী আরদাই ভিরয নামের এক আউলিয়া মিরাজ অথবা মুকাশাফায় জাহান্নামের আযাবগ্রস্তদের ,যেমন হত্যাকারী ,সমকামী ,কাফের ,পাপী ও অপরাধীদের জাহান্নামের আগুনের মধ্যে বিভিন্ন রকম আযাবে রত দেখেন। গরম পানিতে গোসল করা ,নিকৃষ্ট বস্তু দ্বারা পানি ও আগুনকে অপবিত্র করা ,খাদ্য গ্রহণের সময় কথা বলা ,মৃতের জন্য কান্নাকাটি করা এবং জুতা ব্যতীত খালি পায়ে হাঁটার অপরাধে তারা অন্যান্য পাপীদের সঙ্গে আযাব ভোগ করছিল। 90

গরু বিশেষত ষাঁড় গরুর জন্য বিশেষ পবিত্র স্থান ছিল। যারদুশতের মৌল শিক্ষায় গরুসহ যে কোন প্রাণী কুরবানী নিষিদ্ধ ছিল এজন্য যে ,এর পূর্বে দরিদ্রদের খাদ্য দানের জন্য নয় ;বরং এ ধরনের প্রাণীর রক্ত ঝরানোর ফলে খোদাগণ শক্তিশালী হন এ বিশ্বাসে কুরবানী করা হতো। তাই যারদুশত তাগিদ দেন- যেন এ ধরনের পশু কৃষিকার্যে ব্যবহৃত হয়। এ শিক্ষার কারণে (সম্ভবত প্রাচীন কালের প্রকৃতি পূজার প্রভাবও ছিল) যারদুশতের পরবর্তী সময়ে গরু ধীরে ধীরে পবিত্র স্থান লাভ করে ও বিশ্ব সৃষ্টির কাল্পনিক গল্পে সৃষ্টির প্রথম প্রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ও প্রথম মানব (গিওমারদ)-এর সঙ্গে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করে। সেই সাথে গরুর মূত্র পবিত্রকারী হিসেবে স্বীকৃতি পায় । যেমনটি ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

ভানদিদাদ গ্রন্থে পানি এবং পবিত্রকরণে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে পানি হতে পবিত্রতর একমাত্র বস্তু হিসেবে গরুর মূত্রের উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসিদ্ধ আরব কবি আবুল আলা মুয়াররী তাঁর প্রসিদ্ধ এক কবিতায় ইসলাম ,খ্রিষ্ট ,ইহুদী ও যারথুষ্ট্র ধর্মকে একত্রে সমালোচনা করে বলেছেন ,

আশ্চর্য হই আমি পারস্য সম্রাট ও তাঁর অনুসারীদের জন্য

যখন গরুর মূত্র দিয়ে তাদের মুখমণ্ডল দেখি ধৌত করতে ,

আশ্চর্য হই আমি ইহুদীর জন্য যখন বলে তারা

পছন্দ করেন খোদা ভূনা মাংসের গন্ধ আর তরুণাস্থি খেতে।

আশ্চর্য হই আমি নাসারাদের ব্যাপারে যখন বলে প্রভু হয়েছেন নির্যাতিত

অথচ সাহায্য করা হয় নি তাকে যখন তিনি ছিলেন জীবিত!

দূরবর্তী শহর হতে এলো এক জাতি নতুন

পাথর ছুঁড়ে মারে আবার পাথরেই করে চুম্বন!

সাসানী আভেস্তার অন্যতম কঠোর নীতি হলো মাটিকে কলুষিত না করা এবং মৃতদের দাফন না করা। আভেস্তার একটি অংশ ভানদিদাদে অন্য সকল বিষয়ের চেয়ে এ বিষয়ে অধিকতর তাগিদ দেয়া হয়েছে। ভারতীয় হিন্দুদের ন্যায় যারথুষ্ট্রগণও অর্ধ শতাব্দীকাল পূর্ব পর্যন্ত মৃতদের দাফন করত না। যারথুষ্ট্রগণ তাদের মৃতদের একটি উঁচু স্তম্ভের ওপর রেখে আসত যাতে শকুন ও অন্যান্য পাখি তা ভক্ষণ করে। অর্ধ শতাব্দী হলো ইরান সরকার জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে এটি নিষিদ্ধ করে। সেই সাথে যারথুষ্ট্রদের সচেতনতার কারণে বিষয়টি বর্তমানে রহিত হয়ে গেছে। শুনেছি ইয়ায্দ শহরে এখনও মরদেহের জন্য স্থাপিত স্তম্ভ রয়েছে।

ডক্টর মুঈন এ বিষয়ে বলেছেন ,

মাযদা ধর্মে ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মবিশ্বাসের অনেক কিছু প্রতিফলিত হয়েছে। মাযদা ধর্মে মূল উপাদান হলো আগুন। বেদীতে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখাকে অবিরাম জ্বালানী সরবরাহের মাধ্যমে নির্বাপিত হওয়া হতে রক্ষা করা হতো... তদুপরি পারসিক ধর্মে প্রশংসা নিবেদনের রীতিতে বিশেষ ভিন্নতা ছিল। যেহেতু তারা বিশ্বাস করত আগুন ও মাটি পবিত্র উপাদান সেহেতু মৃতদেহ দাফন বা ভস্মীভূত করার মাধ্যমে একে অপবিত্র করাকে সঠিক মনে করত না। তাই শবদেহকে মরুভূমি বা উন্মুক্ত কোন প্রান্তরে বয়ে নিয়ে যাওয়া হতো এবং বিভিন্ন আচারাদি পালনের পর সেখানে ফেলে আসা হতো। 91

সুতরাং বোঝা যায় মাযদা ধর্মে পানি ,মাটি ও আগুনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। কিন্তু এ উপাদানগুলো অন্য বস্তুকে পবিত্র করতে পারে তাদের এ ধারণা ছিল না। ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

অগাটিয়াস স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন ,সাসানী আমলে শবদেহ বিশেষ স্থানে (ছাদহীন উন্মুক্ত সমাধিস্থলে) ফেলে আসার রীতি ইরানীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। হিউয়ান সাংও ইরানীদের রীতির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে বলেছেন তারা মৃতদেহকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে আসত। (বিল ,খ. 2 ,পৃ. 278)

তিনি সাসানী শাসক কাবাদের সেনাপতি সিয়াভাসের প্রতি পুরোহিতদের অসন্তুষ্টির বিষয়টি বর্ণনা করে বলেছেন ,

পুরোহিতদের সর্বোচ্চ বিচারালয় তাঁদের প্রতি গুরু অপরাধের অভিযোগ এনেছিল এজন্য যে ,তাঁরা প্রচলিত ধর্মীয় রীতিতে জীবন যাপনে আগ্রহী ছিলেন না এবং এর কাঠামোর বাইরে নতুন খোদাগণের উপাসনা করেছেন এবং প্রয়াত স্ত্রীকে যারথুষ্ট্র রীতি (শবদেহকে উন্মুক্ত সমাধিস্থলে শিকারী পাখিদের ভক্ষণের জন্য ফেলে আসা) লঙ্ঘন করে দাফন করেছেন। 92

ইরান দার যামানে সাসানীয়ান গ্রন্থের ফার্র্সী অনুবাদক রাশিদ ইয়াসেমী বলেছেন ,

...হাখামানেশী সম্রাটগণ যারথুষ্ট্র ধর্মের রীতি অনুযায়ী সকল আচরণ করেছেন কিনা তা বলা মুশকিল। কারণ তাঁদের আনাহিতা র উপাসনা ও মৃতদের দাফন করার রীতি যারথুষ্ট্র ধর্মরীতির পরিপন্থী ছিল। 93

জনাব ইয়াসেমী দাবি করেছেন হাখামানেশী আমলেও যারথুষ্ট্র ধর্মে মৃতদের দাফন করা নিষিদ্ধ ছিল।

যারথুষ্ট্র ধর্মে দ্বিত্ববাদ

ইসলামের আবির্ভাবের সময়ে ইরানে দ্বিত্ববাদ প্রচলিত ছিল কিনা তৎকালীন ইরানের চিন্তা ও বিশ্বাসগত অবস্থা জানার জন্য এ প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার। কারণ ইহুদী ,খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধগণ সংখ্যালঘু হিসেবে সামগ্রিক চিন্তা-বিশ্বাসে তেমন ভূমিকা রাখেনি। তাই ইসলামপূর্ব সময়ে এ ক্ষেত্রে ইরানে কিরূপ বিশ্বাস ছিল তা এখানে আমরা আলোচনা করব। পূর্ববর্তী আলোচনায় যারদুশতের আগমনের পূর্বে প্রকৃতি পূজার পর্যায়ে আর্যদের মধ্যে দ্বিত্ববাদী ধারণা প্রচলিত ছিল বলে উল্লেখ করেছি। দুমযিলের মতে দ্বিত্ববাদ ইরানী আর্যদের চিন্তাগত বিশেষত্ব। এটি প্রচলিত ধারা হলেও আমাদের জানতে হবে যারদুশত যিনি আর্যদের মাঝে

চিন্তাগত সংস্কার সাধন করেছেন তিনি এ বিষয়ে কি ধারণা পোষণ করতেন ? তিনি সেখানে কি ধরনের পরিবর্তন এনেছিলেন ?

যদি সাসানী আভেস্তাকে মানদণ্ড হিসেবে ধরি তবে নিঃসন্দেহে যারদুশত দ্বিত্ববাদী ছিলেন ,কিন্তু আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি বিশেষজ্ঞগণ সাসানী আভেস্তার একটি ক্ষুদ্র অংশ গাতাসমূহকেই কেবল যারদুশতের বলে মনে করেন এবং বাকী অংশকে নতুন সংযোজন বলে বিশ্বাস করেন। গাতাসমূহতে এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও এর বিষয়বস্তু দ্বিত্ববাদ অপেক্ষা একত্ববাদের নিকটবর্তী।

একত্ববাদের বিভিন্ন পর্যায় ও ভাগ রয়েছে ,যেমন সত্তাগত একত্ববাদ (তাওহীদে যাতী) ,গুণগত একত্ববাদ (তাওহীদে সিফাতী) ,কর্মগত একত্ববাদ (তাওহীদে আফআলী) এবং উপাসনাগত একত্ববাদ (তাওহীদে ইবাদী)।

সত্তাগত একত্বের অর্থ আল্লাহর সত্তা এক ,তাঁর কোন অংশীদার নেই ,তিনিই একমাত্র অসীম ,চিরন্তন ও স্বাধীন সত্তা। তিনি ভিন্ন বস্তুগত ও অবস্তুগত সকল সত্তা সসীম ও নির্ভরশীল এবং তাদের এ নির্ভরশীলতা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বয়ং আল্লাহ্ এ সম্পর্কে বলেছেন ,

ليس كمثله شيء কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয় 94 এবংو له المثل الأعلى সর্বোচ্চ মর্যাদা তাঁরই95

আল্লাহর গুণগত একত্বের অর্থ তাঁর সকল গুণাবলী তাঁর সত্তাগত। তিনি জ্ঞানী ,শক্তিমান ,জীবন্ত (প্রাণের অধিকারী) এবং আলোকিত। এর অর্থ তাঁর সত্তাই জ্ঞান ,শক্তি ,প্রাণ ও ঔজ্জ্বল্য এবং এগুলো সবই এক অর্থাৎ তিনি পূর্ণরূপে এক ও সত্তাগতভাবে একক।

তাঁর সত্তার অবশ্যম্ভাবিতা ও অসীমত্বের অর্থ তিনি ব্যতীত এরূপ কোন অস্তিত্ব নেই এবং তাঁর পর্যায়ে তিনি একক। অন্যভাবে তাঁর সত্তাগত পূর্ণতার অর্থ তাঁর গুণাবলী ও সত্তা একই বস্তু। কারণ সত্তা ও গুণাবলী পৃথক হবার অর্থ সীমাবদ্ধতা এবং শুধু সীমাবদ্ধ সত্তারই সত্তা ও গুণাবলী পৃথক হওয়া সম্ভব ;অসীম সত্তার নয়।

তাঁর কর্মগত একত্বের অর্থ বিশ্ব জগতে প্রকৃত কর্তা ও কার্যশীল সত্তা একমাত্র তিনি। অন্য সকল কর্তা ও প্রভাবশীল সত্তা তাঁর ইচ্ছা ও প্রভাবের সাহায্যে কর্ম সম্পাদন করে। বস্তুগত ও অবস্তুগত কোন সত্তাই তাঁর ইচ্ছা ও প্রভাব ব্যতীত স্বাধীনভাবে কার্য সম্পাদনে সক্ষম নয়। বিশ্বের কার্যকারণ সূত্রসমূহ তাঁরই ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ। অস্তিত্ব জগৎ তাঁরই মালিকানাধীন এবং এ ক্ষেত্রে কেউই তাঁর অংশীদার নয়।

لم يَتَّخِذ صاحبةً و لا وَلَداً و لم يكن له شريك في الملك و لم يكن له وليّ من الذّلّ و كبّره تكبيراً

যিনি কোন বন্ধু বা সন্তান গ্রহণ করেন নি ,যাঁর রাজত্বে কোন অংশীদার নেই ,যাঁর অসীম ক্ষমতায় কোন সহযোগীর প্রয়োজন নেই। তাঁরই উপযুক্ত মহত্ত্ব বর্ণনা কর। 96

তাঁর উপাসনাগত একত্বের অর্থ যেহেতু তিনি সত্তা ,গুণ ও কার্যগতভাবে একক সেহেতু মানুষ তাঁর বান্দা ও সৃষ্টি হিসেবে কেবল তাঁরই উপাসনা করবে।و ما أمروا إلّا ليعبدوا الله مخلصين له الدّين তাদের এ ছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয় নি ,তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরই ইবাদত করবে। 97

যারদুশতের বিষয়ে যা জানা যায় তা হলো তিনি ইবাদতের ক্ষেত্রে তাওহীদের দিকে আহ্বান জানাতেন। যারদুশতের দৃষ্টিতে মানুষ ও বিশ্ব জগতের সৃষ্টিকর্তা অদৃশ্যমান আহুরামাযদা উপাসনার জন্য একমাত্র উপযুক্ত সত্তা। তিনি নিজেকে আহুরমাযদার পক্ষ হতে অবতীর্ণ হিসেবে দাবি করে তৎকালে প্রচলিত দিভগণের (দৈত্যদের) উপাসনা করা হতে নিষেধ করেন।

যারদুশতের পূর্বে আর্যদের প্রকৃতির ক্ষতিকর শক্তি ও উপাদানের উপাসনার বিষয়টিকে ডক্টর মুঈন অস্বীকার করে বলেছেন ,তৎকালীন সময়েও আর্যরা শুধু উপকারী শক্তি ও আত্মাসমূহের উপাসনা করত। তিনি বলেন , আর্যগণ ক্ষতিকর আত্মা ও বস্তু হতে বিরক্ত বোধ করত এবং তাদের ওপর অভিশাপ বর্ষণ করত। তারা কখনই তাদের সন্তুষ্ট ও আকর্ষণ করার লক্ষ্যে কুরবানী ও তাদের উপাসনা করত না (যাতে করে তাদের রাগ রহমতে পরিবর্তিত হয় এ চেষ্টা করত না)। প্রাচীন তুর্কী ও মোঘল জাতির সঙ্গে এ ক্ষেত্রেই আর্যদের পার্থক্য ছিল। কারণ অনার্য এ সকল জাতির বিশ্বাস ছিল কুরবানী ও ইবাদতের মাধ্যমে ক্ষতিকর আত্মাকে সন্তুষ্ট করে তাদের ক্ষতিকর প্রভাব হতে রক্ষা পাওয়া যাবে।98

যদি ডক্টর মুঈনের এ কথা মেনে নিই তবে বলতে হবে যে ,যারদুশত আর্যদের মাঝে এ ক্ষেত্রে কোন সংস্কারই করেন নি। কারণ ক্ষতিকর আত্মাসমূহের (দিভগণের) উপাসনা আর্যদের মধ্যে ছিলই না যাতে করে নিষেধ করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাহ্যত এ ধারণাটি সঠিক নয় এবং সকল বিশেষজ্ঞই এর বিপরীত মত পোষণ করেন। বিশেষত স্বয়ং যারদুশতের পক্ষ হতে যতটা গুরুত্ব সহকারে এ কর্মটিকে নিষেধ করা হয়েছে বলে উদ্ধৃত আছে তা থেকে বোঝা যায় তৎকালীন সময়ে এরূপ উপাসনার প্রচলন ছিল।

জনাব আলী আসগার অনূদিত জন নাস-এর ধর্মসমূহের ইতিহাস গ্রন্থে আহুরা দিভ শব্দ দু টি ভারতীয় ও ইরানীদের নিকট অর্থগতভাবে কিরূপ পরিবর্তন লাভ করেছে তার উল্লেখ করে বলা হয়েছে :

যারদুশত... পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন দিভগণ (তুর্কী ও মুগদের উপাস্য) মন্দ আত্মার অধিকারী ও ক্ষতিকর। তারা ভাল আত্মার সঙ্গে সব সময় সংঘর্ষে লিপ্ত। তারা সকল অকল্যাণ ও মন্দ কর্মের উৎস ,তারা মিথ্যা ও প্রতারণার মাধ্যমে মানুষকে আহুরামাযদার উপাসনা হতে বিরত রাখে। তাই তিনি তাদের উপাসনা হতে নিষেধ করেছেন। 99

জন নাস যারদুশতের দাওয়াতকে সংক্ষেপে এভাবে তুলে ধরেছেন :

ক. তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তির ঘোষণা ও তাঁকে নবী হিসেবে মেনে নেয়ার জন্য মানুষের প্রতি আহ্বান।

খ. তৎকালীন সময়ে প্রচলিত সকল আত্মার বিশ্বাস হতে শুধু ভাল ও কল্যাণমূলক আত্মা আহুরামাযদার বিশ্বাসকে গ্রহণ এবং তাঁকে সৃষ্টিকর্তা ও জ্ঞানী হিসেবে সবচেয়ে মর্যাদাবান প্রভু বলে ঘোষণা দান। প্রাচীন লোকদের বিশ্বাসের বিপরীতে যারথুষ্ট্র সম্প্রদায়ের সাম্প্রতিক কিছু ব্যক্তি উল্লেখ করেছেন ,এই প্রাচীন নবীর মতে সকল সৃষ্টিই আহুরামাযদার ইচ্ছা ও শক্তিতে সৃষ্ট হয়েছে। গাতাসমূহের শেষাংশের ধারাসমূহে উল্লিখিত হয়েছে আহুরমাযদা আলো ও অন্ধকার উভয়েরই সৃষ্টিকর্তা।

গ. আহুরামাযদা তাঁর পবিত্র ও ঐশী ইচ্ছাকে সেপান্ত মাইনিও (পবিত্র জ্ঞান) নামের এক পবিত্র আত্মার মাধ্যমে সম্ভাব্য অবস্থা হতে কার্যকর অবস্থায় এনেছেন।100

ঘ. যদিও আহুরামাযদার সম্মানিত সিংহাসনের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই তদুপরি যারদুশত বিশ্বাস করেন প্রতিটি কল্যাণের বিপরীতে একটি অকল্যাণ রয়েছে। যেমন সত্য ও হকের বিপরীতে রয়েছে মিথ্যা ও বাতিল ,জীবনের বিপরীতে রয়েছে মৃত্যু। তেমনি পবিত্র আত্মা সেপান্ত মিনিউয়ের বিপরীতে রয়েছে অপবিত্র আত্মা আনগারা মাইনিও। ...প্রথম দিনই তারা একত্রে

অস্তিত্বে আসে ও পরস্পরের বিপরীতে একজন জীবন ও গঠন এবং অন্যজন মৃত্যু ও ধ্বংসের নীতি গ্রহণ করে। অবশেষে মিথ্যা ও মন্দের অনুসারীরা চিরস্থায়ী দোযখে স্থান নেবে এবং সত্যের অনুসারীরা পবিত্র চিন্তার চিরস্থায়ী বেহেশত লাভ করবে... বিশ্ব সৃষ্টির প্রথমে পবিত্র ও সৎ কর্মশীল আত্মা তার শত্রু অপবিত্র আত্মাকে বলে , আমরা চিন্তা ,কথা ও কর্মে দেহ ও আত্মার দু জগতের কোনটিতেই পরস্পরের সমমনের হতে পারব না।

ঙ. যারথুষ্ট্র ধর্মের নৈতিকতা এ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত যে ,প্রত্যেক মানব সন্তানের অন্তর ভাল ও মন্দের চিরন্তন সংগ্রামের ময়দান এবং মানুষের হৃদয় (বক্ষ) চুল্লীর ন্যায় যেখানে সব সময় এই যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। যে দিন আহুরামাযদা মানুষকে তৈরি করেন সে দিন তাকে স্বাধীন ক্ষমতা দান করেন। অর্থাৎ এ শক্তি দান করেন ,যেন সে স্বেচ্ছায় ঠিক ও ভুল পথ বেছে নিতে পারে।101

অবশ্য জন নাস যেরূপ স্পষ্টভাবে এ বিষয়গুলো বর্ণনা করেছেন তা গাতাসমূহের মুনাজাতসমূহে এভাবে পরিষ্কার করে বলা হয় নি। অবশ্য গাতাসমূহের কোন কোন বাক্য ও অংশ হতে এ বিষয়ে ধারণা করা যায় যদিও কোন কোন বাক্য বা শ্লোকে এর বিপরীত কথাও বলা হয়েছে। তাই সমগ্র গাতা যারদুশত হতে বর্ণিত হয়েছে কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। স্বয়ং জন নাস এ বিষয়ে সন্দেহে পতিত হয়েছেন যে ,যারদুশতের মতে আনগারা মাইনিও বা আহ্রিমানকে আহুরামাযদা স্বয়ং সৃষ্টি করেছেন নাকি তিনি তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারেন। এজন্য তিনি বলেছেন , যারথুষ্ট্র ধর্মের গ্রন্থসমূহে মন্দ আত্মা আহ্রিমানের উৎপত্তিতে আহুরামাযদার ভূমিকার বিষয়টি অস্পষ্ট। তাই বোঝা যায় না স্বয়ং আহুরামাযদার সঙ্গেই সৃষ্টির শুরুতে উৎপত্তি লাভ করেছে নাকি আহুরামাযদা তাকে পরবর্তীতে সৃষ্টি করেছেন। অন্যভাবে বলা যায় ,প্রশ্ন হলো: মন্দ আত্মা আহ্রিমানকে মাযদা সৃষ্টি করেছেন নাকি তার অস্তিত্ব ছিল ,মাযদা তাকে আবিষ্কার করেছেন এ অর্থে যে ,যেখানেই ভাল রয়েছে তার বিপরীতে মন্দও রয়েছে এবং যেখানে আলো রয়েছে তার সঙ্গে অন্ধকারও জন্ম লাভ করে।

জাওযাফ গিওর তাঁর প্রসিদ্ধ ধর্মসমূহ নামক গ্রন্থে দাবি করেছেন যারদুশত যখন বাল্খের সম্রাট গুশতাসবের দরবারে যান তখন রাজসভার পণ্ডিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন হয়। পণ্ডিতগণ তাঁকে প্রশ্ন করেন , সেই মহান সৃষ্টিকর্তা কে ? তিনি বলেন , বিশ্ব জগৎ ও জ্ঞানবানদের প্রতিপালক আহুরমাযদা। তাঁরা বলেন , তুমি কি মনে কর সমগ্র বিশ্ব জগৎ তিনি সৃষ্টি করেছেন ? যারদুশত বলেন , তিনি যা কিছু কল্যাণকর তা সৃষ্টি করেছেন। কারণ আহুরামাযদা কল্যাণ ব্যতীত অকল্যাণ করতে অক্ষম।

তাঁরা বলেন , তাহলে মন্দ ও অকল্যাণ (কুৎসিত) কার সৃষ্টি ?

তিনি বলেন , আনগারা মাইনিও মন্দ ও কুৎসিতকে এ পৃথিবীতে এনেছে।

তাঁরা বলেন , তাহলে বিশ্বে দু জন খোদার অস্তিত্ব রয়েছে।

তিনি বলেন , হ্যাঁ ,বিশ্বে দু জন সৃষ্টিকর্তা রয়েছে...।

বাহ্যত মনে হয় জাওযাফ গিওর ইতহাস হতে নয় যারথুষ্ট্রগণের বর্ণনা হতে উপরোক্ত বিষয়টি গ্রহণ করেছেন। যদি যারথুষ্ট্রদের প্রচলিত বর্ণনায় বিশ্বাস করি তবে নিঃসন্দেহে যারদুশত দ্বিত্ববাদী ছিলেন বলে মেনে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দলিল হলো সাসানী আভেস্তার অংশ ভানদিদাদ যাতে বিশ্ব জগৎকে দু ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যার এক ভাগ আহুরমাযদা র সৃষ্টি এবং পূর্ণ কল্যাণ ও বরকতময় এবং অন্যভাগ আহ্রিমানের সৃষ্টি ও অকল্যাণে পূর্ণ।

গাতাসমূহের বিভিন্নতার কারণে বিশেষজ্ঞগণ যারদুশতের একত্ববাদী বা দ্বিত্ববাদী হওয়ার বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন।

প্রসিদ্ধ ইরান বিশেষজ্ঞ গিরিশম্যান তাঁর প্রাচীন যুগ হতে ইসলামী যগ পর্যন্ত ইরান শীর্ষক গ্রন্থে বলেছেন ,

যারথুষ্ট্র ধর্ম একত্ববাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। কিন্তু সাসানী আমলে বৃহৎ এক ধর্মের (খ্রিষ্টবাদ) প্রভাবে একত্ববাদ গ্রহণ করে।

এর বিপরীতে দুমযিল বিশ্বাস করেন (যেমনটি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি) যারদুশত তাওহীদবাদী ছিলেন।

শাহরেস্তানী তাঁর মিলাল ওয়ান নিহাল গ্রন্থে যারদুশতকে একত্ববাদী বলে উল্লেখ করেছেন। শাহরেস্তানী ইসলামী দর্শন ও কালামশাস্ত্রের আলোকে ভাল-মন্দকে যেমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা শুধু ইসলামী চিন্তাশাস্ত্রের সঙ্গেই সমঞ্জস্যশীল ,যারদুশতের চিন্তাশাস্ত্রের সঙ্গে নয়।

বাস্তব কথা হলো একত্ববাদকে সকল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যারথুষ্ট্র ধর্মকে একত্ববাদী ধর্ম বলা সত্যিই মুশকিল। যারথুষ্ট্র ধর্ম একত্ববাদী নাকি দ্বিত্ববাদী তা জানার জন্য সাধারণত যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয় তা হলো যারদুশত আহুরামাযদাকে আহ্রিমানের সৃষ্টিকর্তা ও আহ্রিমানকে তাঁর দ্বারা সৃষ্ট বলে মনে করেন কিনা ? নাকি আহ্রিমানকে আহুরামাযদার মতই চিরন্তন মনে করেন ? তাঁরা ধরে নিয়েছেন যারদুশতের দৃষ্টিতে যদি আহ্রিমান আহুরামাযদার সৃষ্ট হয়ে থাকে তবে প্রমাণিত হবে যারথুষ্ট্র ধর্ম একত্ববাদী ছিল।

এ ধারণাটি সত্তাগত একত্ববাদের ক্ষেত্রে সঠিক হলেও কর্মগত একত্ববাদের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কারণ প্রচলিত যারথুষ্ট্র ধর্মগ্রন্থসমূহ বিশেষত গাতাসমূহ হতে যতটা বোঝা যায় যারদুশত প্রাচীন আর্যদের ন্যায় অমঙ্গলকে নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন । তাঁর দৃষ্টিতে বিশ্ব যুক্তিসঙ্গত শৃঙ্খলার ওপর প্রতিষ্ঠিত নেই। কারণ এতে একদিকে বাস্তবিক অর্থেই মন্দ ও কুৎসিতের

অস্তিত্বসমূহ রয়েছে যা পবিত্র অস্তিত্ব যেমন আহুরামাযদা অথবা সেপান্ত মিনিউয়ের প্রতি সম্পর্কিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই এই মন্দসমূহের অস্তিত্ব এমন এক অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত যা সত্তাগতভাবেই মন্দ ও কুৎসিত।

এ ধরনের বিশ্বাস পোষণ করলে আহুরামাযদা আহ্রিমানের সৃষ্টিকর্তা হোক বা না হোক ,একত্ববাদের ভিত্তি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। আহ্রিমান যদি আহুরামাযদার সৃষ্টি না হয় তবে বিষয়টি নিঃসন্দেহে তাওহীদ পরিপন্থী। আর যদি সে আহুরামাযদারই সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে প্রথমত প্রশ্ন আসে আহুরামাযদা নিজেই যখন অকল্যাণের কর্তা সেখানে তাঁর বা সেপান্ত মাইনিওয়ের বিপরীতে আনগারা মাইনিওয়ের অস্তিত্বের প্রয়োজন কি ? বরং এই মন্দকে অবশ্যম্ভাবী একক অস্তিত্ব হিসেবে আহুরমাযদার প্রতি অথবা তাঁর প্রথম সৃষ্টি (صدر أوّل ) হিসেবে সেপান্ত মাইনিওয়ের প্রতি সম্পর্কিত করব। যদি মন্দসমূহকে আহুরামাযদার সঙ্গে সম্পর্কিত করা না যায় তবে কিরূপে তিনি সকল অকল্যাণ ও মন্দের উৎস আনগারা মাইনিওকে সৃষ্টি করলেন ? দ্বিতীয়ত আনগারা মাইনিও জন্মের পর কি ভূমিকা পালন করছে ? সে কি স্বাধীনভাবে মন্দসমূহকে সৃষ্টি করছে নাকি আহুরমাযদার ইচ্ছার অধীনে তা করছে ? যদি সে স্বাধীনভাবে সৃষ্টি করে তবে আহুরামাযদার অংশীদার রয়েছে কারণ সৃষ্টি ও কর্মের ক্ষেত্রে সে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং এটিই র্শিক। আর যদি স্বাধীন না হয়ে থাকে ও কোরআনের এ আয়াতের উদাহরণو ما تشاؤون إلّا أن يشاء الله তারা কোন ইচ্ছাই করে না আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত -সে ক্ষেত্রে আনগারা মাইনিওয়ের উপস্থিতি আহুরামাযদা হতে মন্দকে দূরীভূত করার বিষয়ে কোন প্রভাবই রাখে না।

মূলত দ্বিত্ববাদের উৎপত্তি এখান হতে যে ,মানুষ সৃষ্টি জগৎকে দু ভাগে বিভক্ত দেখে: ভাল ও মন্দ। তারা ভালর জন্য এক উৎস ও মন্দের জন্য ভিন্ন উৎস রয়েছে বলে মনে করে। ভালর কর্তাকে তারা পূর্ণতম ও সর্বোচ্চ সকল গুণের অধিকারী হিসেবে কল্যাণময় ও ক্ষতিকর সকল অস্তিত্বকে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত করাকে সঠিক মনে করে নি। এজন্যই তাদের সৃষ্টিকে ভিন্ন এক সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত ধরে নিয়েছে যে সকল অকল্যাণের উৎস। অর্থাৎ খোদা কর্তৃক অমঙ্গলের সৃষ্টিকে অস্বীকার ,অমঙ্গলের জন্য ভিন্ন খোদার বিশ্বাসে পর্যবসিত হয়েছে।

যদি অমঙ্গলের উৎস ও সৃষ্টিকর্তা খোদার সমান্তরালে না হয় ;বরং তাঁরই সৃষ্টি হয় সে ক্ষেত্রে আল্লাহর পাশাপাশি স্বতন্ত্র স্বাধীন এক সত্তার উপস্থিতিকে অস্বীকার করলে ও অকল্যাণকর সৃষ্টিসমূহকে তাঁর প্রতি সম্পর্কিত না করার বিষয়টি থেকেই যায়। অন্যভাবে বললে যদিও আল্লাহর সত্তাগত পর্যায়ে কোন অংশীদারকে অস্বীকার করা হয়েছে ,কিন্তু তাঁরই এক সৃষ্টিকে তাঁর সৃষ্টিতে অংশীদার ধরে নেয়া হয়েছে। সৃষ্টির ক্ষেত্রেও খোদার সঙ্গে অংশীদার থাকার বিশ্বাস সকল নবীর শিক্ষার পরিপন্থী। দর্শনের উচ্চতর প্রজ্ঞায় সৃষ্টির ক্ষেত্রে অংশীদার সাব্যস্ত করা খোদার সত্তার সঙ্গে অংশীদারিত্বের শামিল।

বাস্তব বিষয় হলো ভাল-মন্দের বিষয়ে এরূপ সন্দেহে পতিত হওয়া কোন অর্ধ দার্শনিকের জন্যও মানানসই নয়। সেখানে কোন নবী বা পূর্ণ দার্শনিকের কথা তো ভাবাই যায় না। একজন নবী যিনি সমগ্র অস্তিত্ব জগৎকে ওপর হতে (উচ্চতর এক স্থান) দেখেন তাঁর দৃষ্টিতে সৃষ্টি জগতে আলো ,উজ্জ্বলতা ,মঙ্গল ,প্রজ্ঞা ও রহমত ছাড়া কিছুই নেই এবং একটি মাত্র ইচ্ছাই পূর্ণতম প্রজ্ঞার ভিত্তিতে কার্যকারণ সূত্রের এ বিশ্ব জগৎ পরিচালনা করছে ,অন্য কারো সেখানে অন্তর্ভুক্তি ও অংশীদারিত্ব নেই। একজন নবী ও আল্লাহর ওলীর জন্য অসম্ভব ,এরূপ দ্বন্দ্বের মধ্যে পতিত হবেন এবং এমন চিন্তার উপস্থাপন করবেন ,এমনকি একজন পূর্ণ দার্শনিকও সকল মন্দ ও অকল্যাণকে আপেক্ষিক ও অস্তিত্বহীন বলে মনে করেন। এই আপেক্ষিক ও সম্পর্কমূলক বিষয়গুলো নিয়েই বিশ্ব জগৎ পূর্ণতম ও সর্বোত্তম শৃঙ্খলা লাভ করেছে এবং মহান আল্লাহর পূর্ণতম প্রজ্ঞার ফলশ্রুতিতেই তা ঘটেছে। যদি তা না থাকত তাহলে বিশ্ব জগৎ অপূর্ণ হতো।

একত্ববাদী ধর্মের দৃষ্টিতে মহান আল্লাহ্ সকল দিক হতে পূর্ণতম। তিনি সকল রকম ত্রুটি হতে মুক্ত। সকল অস্তিত্বশীলই তাঁর পূর্ণ প্রজ্ঞা ও মহান ইচ্ছার মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ করেছে এবং তাঁর ইচ্ছায়ই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। তাঁর কোন সৃষ্টিই অর্থহীন নয়। বিশ্বের কিছুই প্রকৃত মন্দ (নিরঙ্কুশ মন্দ) নয়। সকল কিছুই কল্যাণকরভাবে সৃষ্ট হয়েছে।

তিনি বলেছেন ,الذي أحسن كلّ شيء خلقه তিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। 102 يحيي و يميت و يميت و يحيي তিনি অস্তিত্বে আনেন ,ধ্বংস করেন ,জীবন দান করেন ,মৃত্যু দান করেন অর্থাৎ তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যুবরণ করান এবং তিনিই মৃত্যু দান করেন ও তাকে পুনর্জীবিত করেন।103 يولج اللّيل في النّهار و يلج النّهار في اللّيل তিনিই দিবা-রাত্রি ও আলো-অন্ধকার আনয়ন করেন ,তিনিই রাত্রিকে দিনের মধ্যে এবং দিনকে রাত্রির মধ্যে প্রবেশ করান। 104 তিনিই আলো ও অন্ধকার সৃষ্টি করেনالحمد لله الّذي خلق السّماوات و الأرض و جعل الظّلمات و النّور সকল প্রশংসা আল্লাহরই জন্য যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকার ও আলোর উদ্ভব ঘটিয়েছেন। 105

আমরা পূর্বে জাওযাফ গিওরের প্রসিদ্ধ ধর্মসমূহ গ্রন্থ হতে যারদুশতের সঙ্গে সম্রাট গুশতাসবের সভাসদ পণ্ডিতদের কথোপকথনের উল্লেখ করেছি যেখানে যারদুশত খোদাকে শুধু ভাল ও কল্যাণের সৃষ্টিকর্তা বলে উল্লেখ করে মন্দ ও অকল্যাণসমূহকে অন্য এক সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বলেছেন। তিনি খোদাকে এরূপ সৃষ্টির ঊর্ধ্বে মনে করেন। যদিও এ ধরনের কোন সংলাপের অস্তিত্বের বিষয়ে আমরা সন্দেহ পোষণ করছি। তবে এটি সত্য ,এ সংলাপ সকল যারথুষ্ট্রের চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে। এই সংলাপের সঙ্গে আল্লাহর নবী হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আ.)-এর সঙ্গে ফিরআউনের সংলাপের যে বর্ণনা কোরআন দিয়েছে তা তুলনা করুন। ফিরআউন হযরত মূসা ও হারুনকে লক্ষ্য করে বলে , হে মূসা! তোমাদের দু জনের প্রতিপালক কে ? তিনি জবাবে বলেন , আমাদের প্রতিপালক তিনি যিনি প্রতিটি সৃষ্টিকে তার যোগ্য আকৃতি (যোগ্যতা অনুযায়ী) দিয়েছেন। অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন। 106

হযরত মূসা (আ.) একটি ক্ষুদ্র বাক্যের মাধ্যমে বলেছেন ,সকল কিছু আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁর মহান প্রজ্ঞা অনুযায়ী সৃষ্ট বস্তুসমূহের উপযুক্ততা অনুসারে তাদের দিয়েছেন ,কোন বস্তুই যতটুকু প্রাপ্য তার চেয়ে কম পায় নি ,প্রত্যেক বস্তুই তার স্থানে সুন্দর ,কোন বস্তুই নিরঙ্কুশ মন্দ নয় যে ,বলা যাবে তিনি তা সৃষ্টি করেন নি ;বরং অন্য কেউ তা সৃষ্টি করেছে। এটিই নবিগণের যুক্তি।

সুতরাং বোঝা গেল আনগারা মাইনিওকে মন্দের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে অকল্যাণকর জগতের উপস্থিতির ব্যাখ্যা দানের প্রচেষ্টা (যদিও এ ক্ষেত্রে সে আহুরমাযদার সৃষ্ট হয়েছে বলা হয়) একত্ববাদের মৌলনীতি বিরোধী এবং নবিগণের নিশ্চিত যুক্তির বিরোধী।

তাই যারথুষ্ট্র ধর্ম অপূর্ণ একত্ববাদী ধর্ম বলে ক্রিস্টেন সেন যে দাবি করেছেন তা সঠিক নয় ;বরং যারদুশতের কথাকে অপূর্ণ দর্শন বলা যেতে পারে যা কোন অর্ধ দার্শনিকের কথার সদৃশ হলেও কোনক্রমেই একজন নবী বা পূর্ণ দার্শনিকের কথা হতে পারে না।

পি.জে. দুমানাশের বরাত দিয়ে ডক্টর মুহাম্মদ মুঈন বর্ণনা করেছেন ,

কোরআনে অকল্যাণের উৎপত্তি ও মানুষের পাপের উৎস সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। মাযদায়ী ধর্ম এ বিষয়ে সহজ ও মৌলিক উত্তর দান করেছে এভাবে ,অকল্যাণকে খোদার বিপরীতে অপর এক অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছে যা খোদার মতই চিরন্তন। নিঃসন্দেহে মন্দ আত্মা শক্তি ও মর্যাদায় কখনই খোদার সমকক্ষ হতে পারে না এবং তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত হবে। কিন্তু যেহেতু তার প্রচেষ্টা খোদার কর্মকাণ্ডের অন্তরায় সৃষ্টি করে তাই তিনি তার কর্মকে সীমিত করে দিয়েছেন। ভাল-মন্দের বিষয়ে মাযদায়ী ধর্ম যে উত্তর দান করে তা অন্তত বিশ্বে বিদ্যমান মন্দসমূহের দায়িত্ব হতে খোদাকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। 107

বাহ! বাহ! কেমন সুন্দর এ যুক্তি! খোদা পি.জে. দুমানাশেহ এবং মাযদায়ী ধর্মের ছায়াকে নিজ ও ঊর্ধ্ব জগৎ হতে কম না করুন। কারণ তিনি (দুমানাশেহ) ও এ ধর্ম তাঁর মুখ রক্ষা করেছে।

মাযদায়ী ধর্ম যদি মূল হতে খোদাকে অস্বীকার করত তবে এই মন্দের দায়িত্ব হতে আরো উত্তমরূপে তিনি মুক্তি পেতেন। মাযদায়ী ধর্ম খোদার ভ্রূ সুন্দর করতে গিয়ে চোখই নষ্ট করে ফেলেছে। মন্দসমূহ যা একপ্রকার আপেক্ষিক বিষয় এবং গভীরতর ব্যাখ্যায় গেলে মূলত

অনস্তিত্বশীল ,তারা একে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কহীন করতে গিয়ে তাঁর সৃষ্টির অর্ধেককে তাঁর নিকট হতে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টায় রত হয়েছে।

মাযদায়ী ধর্মে মন্দের অস্তিত্বহীনতা ,প্রকৃতি হতে তথাকথিত এ মন্দের অবিচ্ছিন্নতা ,এরূপ বস্তুসমূহের উপকারিতা ও এদের সৃষ্টির পেছনে বিদ্যমান প্রজ্ঞার প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয় নি বলেই তারা এ সমস্যা হতে উত্তরণের উদ্দেশ্যে কুঠার হাতে মন্দের মূলোৎপাটনে উদ্যত হয়েছে।

আমরা এখানে ভাল-মন্দের আলোচনায় প্রবেশ করতে পারছি না। কারণ আলোচনাটি অত্যন্ত গভীর ,দীর্ঘ ও আকর্ষণীয় এবং এটি এমন এক ঘূর্ণাবর্ত যাতে সহস্র তরণি নিমজ্জিত হয়েছে-তীরে ফিরে আসতে পারে নি। মাযদায়ী ধর্ম তাদেরই একটি।

শয়তান

একটি বিষয় এখানে পরিষ্কার করা প্রয়োজন মনে করছি আর তা হলো এই যে ,কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যারথুষ্ট্র ধর্মের আহ্রিমানের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের শয়তানের কোন পার্থক্য নেই। অর্থাৎ আহ্রিমানকে আহুরমাযদার সৃষ্টি ধরে নিলেই সে আর শয়তান এক হয়ে যাবে এ দৃষ্টিতে যে ,শয়তানও আল্লাহর সৃষ্টি ও অকল্যাণের উৎস।

না ,এরূপ চিন্তা সঠিক নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে শয়তান সৃষ্টিতে কোন ভূমিকাই রাখে না। ইসলামে কোন কিছুর সৃষ্টিকেই শয়তানের ওপর আরোপ করা হয় না। ইসলামে এমন কোন

চিন্তার অস্তিত্ব নেই যে ,বলা যাবে বিশ্ব জগতে অনাকাক্সিক্ষত বস্তুসমূহের অস্তিত্ব রয়েছে যা না থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল ,কিন্তু যেহেতু আছে সেহেতু তা মন্দ কিছু হতে উৎসারিত হয়েছে। না ,এমনটি নয় ;বরং ইসলামের দৃষ্টিতে সকল বস্তু আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতায় সৃষ্ট হয়েছে এবং তিনি যা সৃষ্টি করেছেন সবই সুন্দর-الذي أحسن كلّ شيء خلقه তিনি সকল বস্তুকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন 108 এবংربّنا الذي أعطى كلّ شيء خلقه ثمّ هدى আমাদের পালনকর্তা তিনি ,যিনি প্রত্যেক সৃষ্টিকে তার যোগ্যতানুসারে দিয়েছেন ,অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন। 109

ইসলামের দৃষ্টিতে শয়তানের কেবল নির্দেশসূচক ক্ষমতা (তাশরীয়ী) রয়েছে ,বাধ্যকরণের ক্ষমতা (তাকভীনী) নেই। অর্থাৎ শয়তান আদম সন্তানদের পাপ কাজে উদ্বুদ্ধ করতে ও প্ররোচনা (ওয়াস্ওয়াসা) দিতে পারে। মন্দ কাজে আমন্ত্রণ জানান ব্যতীত মানুষের ওপর তার কোন শক্তি ও প্রভাবই নেই। কোরআনের বর্ণনা মতে কিয়ামতের দিন শয়তান নিজেই বলবে ,

و ما كان لي عليكم من سلطان إلّا أن دعوتكم فاستجبتم لي এবং তোমাদের ওপর তো আমার কোন ক্ষমতা ছিল না ,কিন্তু এতটুকু যে ,আমি তোমাদের আহ্বান জানিয়েছি। অতঃপর তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছ (আমার ডাকে সাড়া দিয়েছ)। 110

শয়তানের স্বরূপ যা-ই হোক না কেন ,মানুষ হওয়ার অর্থ সে বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন ,স্বাধীন ইচ্ছা শক্তির অধিকারী। প্রথমত যখন তার নির্বাচনের ক্ষমতা রয়েছে তখন দ্বিতীয় পর্যায়ে সম্ভাবনা রয়েছে তার সম্মুখে দু টি পথ আসার। এ দু টি শর্ত ও পর্যায় যদি না থাকে তাহলে স্বাধীনতার কোন অর্থ থাকে না এবং বাস্তবে মনুষ্যত্বই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। মহান আল্লাহ্ বলেছেন ,

إنّا خلقنا الإنسان من نطفة إمشاج نبتليه فجعلناه سميعا بصيرا. إنّا هدينا السّبيل إمّا شاكرا و إمّا كفورا

আমি মানুষকে মিশ্র শুক্রবিন্দু হতে সৃষ্টি করেছি এজন্য যে ,তাকে পরীক্ষা করব। অতঃপর তাকে আমি শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তিসম্পন্ন করেছি। আমি তাকে পথ দেখিয়েছি। এখন সে হয় কৃতজ্ঞ হবে ,না হয় অকৃতজ্ঞ। 111

মানুষকে প্ররোচিত করা শয়তান ও কুপ্রবৃত্তির কাজ। অন্যদিকে নির্বাচন ক্ষমতা মানুষের মনুষ্যত্বের অংশ। একদিকে যেমন ভালর দিকে আহ্বান ও ঐশী নির্দেশনা (ইলহাম) রয়েছে তেমনি অন্যদিকে মন্দের আহ্বান ও শয়তানী প্ররোচনাও রয়েছে যাতে করে মানুষ এ দু য়ের মধ্য হতে একটিকে বেছে নিয়ে মনুষ্যত্বের পথে পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমনটি মাওলানা রুমী বলেছেন ,

বিশ্বে রয়েছে দু দিক হতে বিপরীত আহ্বান

কোন্ আহ্বানে সাড়া দিয়ে পাতে সে কান

এক আহ্বান সেই পরিশুদ্ধ আত্মাসমূহের

অন্য আহ্বান কলুষিত নিন্দিত অসুরের।

কোরআনে জিন বা শয়তান ,ফেরেশতাদের সমান্তরালের কোন অস্তিত্ব নয় ;বরং প্রকৃতির অন্যান্য সৃষ্টির পাশাপাশি অবস্থানকারী এক অস্তিত্ব। কোরআনের দৃষ্টিতে ফেরেশতাগণ আল্লাহর সৃষ্টি জগৎ পরিচালনার দায়িত্ব পালনকারী (فالمدبّرات أمرا ) । কিন্তু জিন ও শয়তান সৃষ্টি জগতে সৃষ্টির কোন বিষয়েই সংশ্লিষ্ট নয়।112 তাই এ ক্ষেত্রে তারা পৃথিবীর অন্যান্য অস্তিত্বশীলদের ন্যায়। এখান হতে স্পষ্ট বোঝা যায় ,অকল্যাণকর বস্তুসমূহের অস্তিত্বের কারণে সৃষ্টি জগৎ অপূর্ণ-এরূপ ধারণার কোন অবকাশই কোরআনে নেই ।

এখানে প্রয়োজন মনে করছি একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার। আর তা হলো কেউ কেউ কোরআন বা হাদীসের অনুবাদ করতে গিয়ে শয়তানের ফার্সী অনুবাদ আহ্রিমান বা দিভ লিখে থাকেন যা সঠিক নয়। কারণ শয়তানের সমার্থক শব্দ ফার্সীতে নেই। তাই ফার্সীতে এটিই ব্যবহার করা উচিত অথবা আবরীতে শয়তানের অনুরূপ শব্দ ইবলিস লেখা যেতে পারে। কোরআনের দৃষ্টিতে আহ্রিমান বা দিভ -এর প্রকৃত অর্থে কোন অস্তিত্ব নেই এবং কোরআনে উল্লিখিত শয়তান ভিন্ন এক অস্তিত্ব।

ইসলামী ফিকাহ্শাস্ত্রের দৃষ্টিতে যারথুষ্ট্র ধর্ম

এ আলোচনার উপসংহারে উল্লেখ্য ,যারথুষ্ট্র ধর্ম একত্ববাদী ছিল না দ্বিত্ববাদী উপরোক্ত অংশে আমরা বিষয়টিকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ হতে আলোচনা করেছি। অর্থাৎ ইতিহাস ও ঐতিহাসিক সূত্রকে মানদণ্ড ধরলে প্রচলিত ঐতিহাসিক প্রমাণসমূহের সঙ্গে একত্ববাদী ধারণার তুলনামূলক বিশ্লেষণে যারথুষ্ট্র ধর্মকে একত্ববাদী ধর্ম বলা যায় না। এ সকল দলিল মতে বিশ্ব জগতের সৃষ্টি সম্পর্কে যারথুষ্ট্রের তত্ত্ব ,এমনকি যদি আহ্রিমানকে আহুরামাযদার সৃষ্টিও ধরি তবুও তা একত্ববাদের সঙ্গে সংগতিশীল নয়।

কিন্তু আমরা মুসলমানগণ যারথুষ্ট্র ধর্মকে অন্য একটি দৃষ্টিকোণ হতেও দেখতে পারি এবং ভিন্ন এক মানদণ্ডের আলোকে এ ধর্মকে বিচার করতে পারি। অর তা হলো ইসলামী ফিকাহ্ ,হাদীস গ্রন্থ ও ইসলামের নিজস্ব যে সকল মানদণ্ড রয়েছে। ঈমানদার মুসলমানদের নিকট এগুলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল ও ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য। এ দৃষ্টিকোণ হতে যারথুষ্ট্র ধর্মকে একত্ববাদী একটি ধর্ম বলে গ্রহণ করতে কোন অসুবিধা নেই। সে ক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে এ ধর্ম মূলে একত্ববাদী থাকলেও পরবর্তিতে দ্বিত্ববাদ ,অগ্নি উপাসনা ও অন্যান্য শিরকমিশ্রিত বিষয়সমূহ এতে সংযুক্ত হয়েছে । যদি ঐতিহাসিক ভিত্তিতে কোন ধর্মের মূল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় তদুপরি ফিকাহ্শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ হতেও তা বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। বিশেষত যারথুষ্ট্র ধর্মের মূল দ্বিত্ববাদী হওয়ার বিষয়টি যখন অনিশ্চিত তখন যদি ফিকাহর মানদণ্ডে তা তাওহীদী বলে প্রমাণিত হয় তাহলে যারথুষ্ট্রগণও আহলে কিতাব হিসেবে পরিগণিত হবে। অতীত সময়ে মুসলমানগণ তাদের আহলে কিতাব হিসেবে এ মানদণ্ডেই গ্রহণ করতেন যদিও ফকীহ্গণের মধ্যে এ বিষয়ে মতদ্বৈততা ছিল। ইরানী বংশোদ্ভূত ফকীহ্গণের মধ্যেও তাদের আহলে কিতাব না হওয়ার মত অন্যদের হতে কম নয়।

এ বিষয়ে ফিকাহ্ ও হাদীসশাস্ত্রগত আলোচনা এ গ্রন্থের বিষয় বহির্ভূত। তবে এ গ্রন্থের পারিবারিক ব্যবস্থা র আলোচনায় মাহ্রামগণের সঙ্গে বিবাহের বিষয়ে এতদ্সংক্রান্ত কিছু কথা বলব।

যারদুশতের পর দ্বিত্ববাদ

স্বয়ং যারদুশত ও মাযদায়ী যারথুষ্ট্র ধর্মের মূল একত্ববাদী ছিল না দ্বিত্ববাদী এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকলেও পরবর্তী সময়ে বিশেষত সাসানী আমল অর্থাৎ ইসলামের আবির্ভাবের সময়ের যারথুষ্ট্র ধর্মের দ্বিত্ববাদী হওয়ার বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। যে সকল ব্যক্তি যারদুশতকে একত্ববাদী বলে বিশ্বাস করেন তাঁরা আফসোস করে বলেন ,যারদুশতের একত্ববাদ দ্বিত্ববাদের দ্বারা কলুষিত হয়েছে। জন নাস যিনি মোটামুটিভাবে যারদুশতকে একত্ববাদী বলে মনে করেন তিনি বলেছেন , ত্রুটি ও ধ্বংসের স্বতন্ত্র কারণ এবং অকল্যাণের ভিন্ন উৎসের প্রতি বিশ্বাস যারথুষ্ট্র ধর্মকে যুগের পরিক্রমায় নৈতিকভাবে এক দ্বিত্ববাদী ধর্মে পরিণত করে।... সময়ের পরিবর্তনে শয়তানী শক্তি আনগারা মাইনিও শক্তি সঞ্চয় করে আহুরামাযদার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে ও তারা পরস্পর যেন সম দু শক্তি হিসেবে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। আভেস্তার নতুন সংকলনে (সাসানী আভেস্তা) আনগারা মাইনিও আহুরমাযদার সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় যেন আবির্ভূত হয়েছে। 113

যাঁরা যারথুষ্ট্রকে দ্বিত্ববাদী মনে করেন তাঁদের মতে যারদুশতের আবির্ভাবের পরেই দ্বিত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন পি.জে. দুমানাশেহ বলেছেন ,

গাতাসমূহের দ্বিত্ববাদী ধারণা যারদুশতের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত ও দৃঢ়তর হয়েছিল। কারণ তিনি সমগ্র অস্তিত্ব জগৎকে ভাল ও মন্দ এ দু ভাগে ভাগ করেন...। 114

বর্তমানে প্রচলিত আভেস্তার একাংশ যা ভানদিদাদ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে তাতে স্পষ্টভাবে আনগারা মাইনিওকে বিশ্বের মন্দসমূহের ,যেমন বরফজমা শীত ,চরম উষ্ণ গ্রীষ্মকাল ,সর্প ও অন্যান্য বিষধর সরীসৃপ প্রভৃতির সৃষ্টিকর্তা বলে উল্লেখ করেছে।

ইসলামের আবির্ভাবের পরবর্তী সময়েও যারথুষ্ট্রগণ স্বাধীনভাবে তাদের দ্বিত্ববাদী বিশ্বাস প্রকাশ করত ও পক্ষ সমর্থনে যুক্তি প্রদর্শন করত। তারা প্রায়ই নবী (সা.)-এর আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণ ,অন্যান্য আলেম ও কালামশাস্ত্রবিদদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হতো। শিয়া হাদীসগ্রন্থসমূহ ,যেমন শেখ সাদুকের তাওহীদ ,আল্লামা তাবারসীর ইহতিজাজ , উয়ুনু আখবারুর রিদ্বা ,আল্লামা মাজলিসীর বিহারুল আনওয়ার প্রভৃতি গ্রন্থে এ সকল বিতর্কের বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। সাসানী শাসনামলের যারথুষ্ট্রগণ যে দ্বিত্ববাদী ছিলেন এটি তার প্রমাণ। এই বিশ্বাস তারা ইসলামী শাসনামলেও সংরক্ষণ করেছে ও এর সপক্ষে বিতর্কে অংশ নিয়েছে ।

ইসলামী শাসনামলে (3য় হিজরী শতাব্দী) রচিত যারথুষ্ট্রগণের প্রসিদ্ধ একটি গ্রন্থ হলো দিনকারত । জানা যায় এ গ্রন্থের অর্ধাংশ জুড়ে ইহুদী ,খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের বিপরীতে দ্বিত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

ক্রিস্টেন সেন বিশ্বাস করেন ,সাসানী শাসনামলে যারওয়ানী ধারণা-প্রাচীনতম যে খোদা হতে আহুরামাযদার জন্ম হয়েছে (এ সম্পর্কে পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি)-যারথুষ্ট্রদের মধ্যে প্রচলন লাভ করে। যারওয়ানী ধারণা অত্যন্ত অস্পষ্ট ,জটিল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি বিশ্বাস। ক্রিস্টেন সেনের মতে ইসলামের আবির্ভাবের পর যারথুষ্ট্রগণ যারওয়ানী বিশ্বাস ত্যাগ করে ও আত্মপক্ষ সমর্থনযোগ্য কিছুটা যুক্তিসঙ্গত দ্বিত্ববাদের পক্ষাবলম্বন করে। তিনি বলেন ,

যারথুষ্ট্র ধর্ম সাসানী শাসনামলে রাষ্টধর্ম হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ধর্মটি তখন এমন কিছু ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে ,সাসানী আমলের শেষ দিকে তা অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছিল ও অবশ্যম্ভাবী অবক্ষয়ের মুখে দাঁড়িয়েছিল। ইসলাম যখন যারথুষ্ট্র পুরোহিতদের মদদপুষ্ট সাসানী সাম্রাজ্যের পতন ঘটায় তখন যারথুষ্ট্র ধর্মযাজকগণ উপলব্ধি করলেন এ ধর্মকে ধ্বংস ও পতন হতে রক্ষা করতে হলে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে। তাই যারওয়ানী ধারণাসহ অন্যান্য শিশুসুলভ কাল্পনিক বিশ্বাসসমূহকে বাদ দিয়ে মাযদায়ী ধর্মকে যারওয়ানী উপাসনা মুক্ত করলেন। ফলে বিশ্ব সৃষ্টির কাহিনী পরিবর্তিত হয়ে গেল। সূর্য উপাসনা পরিত্যাজ্য ঘোষিত হলো। এতে আহুরামাযদার উপাসনা কিছুটা একত্ববাদী রূপ নিল। মিত্রের (সূর্য) মর্যাদা প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ইয়াশত -এর অনুরূপ অবস্থায় নেয়া হলো। ধর্মীয় অসংখ্য বিবরণ হয় পরিবর্তিত করা হলো নতুবা পুরোটাই বাদ দেয়া হলো। সাসানী আভেস্তা ও তার ব্যাখ্যা গ্রন্থের যে অংশ যারওয়ানী ধারণামিশ্রিত ছিল তা গ্রন্থাগারের তাকেই পরিত্যাগ অথবা ধ্বংস করা হলো। বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কিত যে অংশসমূহ সংক্ষিপ্ত আকারে দিন কারত -এ এসেছে তার ওপর এতটা বিশ্লেষণ হয়েছে যে ,তা কয়েক লাইনে এসে দাঁড়িয়েছে এবং এ অংশ হতে সৃষ্টি সম্পর্কে কিছুই বোঝা যায় না। এই পরিবর্তনসমূহ যারথুষ্ট্র ধর্মের অন্ধকার যুগে (সাসানী সাম্রাজ্যের পতন) সাধিত হয়। ফার্র্সী ভাষার কোন গ্রন্থেই এই সংস্কারের বিষয়টি উল্লিখিত হয়নি । এই সংস্কারকৃত যারথুষ্ট্র ধর্ম তার প্রাচীন রূপ যেন দ্বিতীয়বার ফিরে পেয়েছে। 115

আমরা পরবর্তীতে উল্লেখ করব ,যারথুষ্ট্র ধর্ম ও এর অনুসারীদের প্রতি ইসলামের এ সেবা ইসলামের অন্যান্য অবদান হতে কোনক্রমেই কম নয়। ইসলাম যারথুষ্ট্র ধর্মে পরোক্ষ যে সংস্কার ঘটিয়েছে ইরানের প্রাচীন ধর্মে যারদুশতের সংস্কার হতে তার প্রভাব অবশ্যই অধিক ছিল।

মনী (মনাভী) ধর্মে দ্বিত্ববাদ

এতক্ষণ যারথুষ্ট্র ধর্মে দ্বিত্ববাদ সম্পর্কে আলোচনা হলো। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি যে ,তৎকালীন সময়ে প্রচলিত অন্য দু টি ধর্মও দ্বিত্ববাদনির্ভর ছিল। এ দু টি ধর্ম হলো মনী ও মাযদাকী। মনী ধর্মের দ্বিত্ববাদ যারথুষ্ট্র ধর্মের দ্বিত্ববাদ হতে অধিকতর স্পষ্ট। মাযদাকী দ্বিত্ববাদ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মনী ধর্মের দ্বিত্ববাদের অনুরূপ। শাহরেস্তানী তাঁর মিলাল ওয়া নিহাল গ্রন্থে যারদুশতকে দ্বিত্ববাদী না বলে মনীকে দ্বিত্ববাদী বলেছেন এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সাম্প্রতিক বিশেষজ্ঞ ও প্রাচ্যবিদগণ মনী ও তাঁর ধর্ম নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন। তাকী যাদেহ তাঁদের প্রথম সারির একজন। তাঁর বক্তব্য হতে কিছু অংশ আমরা এখানে উল্লেখ করছি :

... মনী ধর্ম ভাল-মন্দ বা আলো-অন্ধকার এবং তিন পর্যায়ের (অতীত ,বর্তমান ও ভবিষ্যৎ) মৌল ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। সকল অস্তিত্বের মূল হলেন দু জন খোদা। একজন আলো ,অন্যজন অন্ধকার। ফার্সী গ্রন্থসমূহে তাদের দুবোন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে এ দু জন পরস্পর স্বাধীন ও বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তাঁরা দু জন মনুয়ীদের ভাষায় অতীত নামে অভিহিত। আলোর জগৎ ওপর হতে পূর্ব ,পশ্চিম ও উত্তরে প্রসারিত ছিল এবং অন্ধকারের জগৎ নীচ হতে দক্ষিণ দিকে প্রসারিত ছিল। একই স্থানে সীমিত হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাঝে ব্যবধান ছিল। কোন কোন বর্ণনা মতে যেহেতু দক্ষিণ অংশের এক-তৃতীয়াংশও আলোর অধিকারে ছিল সেহেতু আলোর জগৎ অন্ধকার হতে পাঁচ গুণ বেশি ছিল। এ দু মৌল শক্তি নিজ অধিকৃত অংশে শান্তিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন। আলোর জগতে সকল সৎ গুণাবলী ,যেমন শৃঙ্খলা ,শান্তিপ্রিয়তা ,সাফল্য ,সৌভাগ্য ,বুদ্ধিমত্তা ,সমঝোতা প্রভৃতির আধিপত্য ছিল। কিন্তু অন্ধকারের জগৎ বিশৃঙ্খলা ,বিদ্রোহ ,আবর্জনা প্রভৃতিতে পূর্ণ ছিল। মনিগণ এ দু মৌল সত্তাকে কখনও কখনও দুই বৃক্ষ বলে অভিহিত করেছে। যার একটি হলো জীবন বৃক্ষ ও অন্যটি হলো মরণ বৃক্ষ। আলোর জগতে শ্রেষ্ঠত্বের সম্রাটের (পিতার) শাসন আর অন্ধকার জগতে মন্দ ও অন্ধকারের সম্রাটের শাসন। আলোর জগতের পাঁচ দিকে খোদার পাঁচ সদস্য যথাক্রমে বুদ্ধি ,চিন্তা ,বিশ্লেষণ ,ইচ্ছা ও খোদার প্রকাশস্বরূপ অসংখ্য চিরন্তন সৃষ্টিসমূহ বসবাস করে। অন্যদিকে অন্ধকারের জগতেও পাঁচ স্তর ওপর হতে নীচে যথাক্রমে ধোঁয়া ,আগুন ,ধ্বংসকারী বাতাস ,কর্দমাক্ত নোংরা পানি ও অন্ধকার। 116

আমাদের দাবির সপক্ষে যুক্তি হিসেবে উপরোল্লিখিত অংশটুকুই যথেষ্ট। আগ্রহীরা এ বিষয়ে লিখিত গ্রন্থসমূহ দেখতে পারেন।

মাযদাকী ধর্মে দ্বিত্ববাদ

মাযদাকী ধর্ম মনী ধর্মেরই বিচ্ছিন্ন একটি অংশ। তাই মনী ধর্মের কুসংস্কারসমূহ সামান্য কিছু তফাৎ ছাড়া পুরোটাই মাযদাকী ধর্মে স্থানান্তরিত হয়েছে। ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

বুনদেস (যারদুশতে ফাসায়ী) ও মাযদাকের মিলিত এ ধর্ম মূলত মনী ধর্মেরই একটি সংস্কৃারকৃত রূপ। মনী ধর্মের ন্যায় এ ধর্মটিও তার আলোচনা প্রাচীন দুই মৌল অস্তিত্ব আলো ও অন্ধকার দিয়ে শুরু করেছে। মনী ধর্মের সঙ্গে মাযদাকীদের এ ক্ষেত্রে পার্থক্য এতটুকু যে ,মাযদাকী মতে অন্ধকারের আন্দোলন ইচ্ছা ও পূর্বজ্ঞান নির্ভর ছিল না ;বরং আকস্মিকভাবে পূর্ণজ্ঞানহীনভাবে ঘটেছিল। এর বিপরীতে আলোকের আন্দোলন ইচ্ছা ও জ্ঞাননির্ভর ছিল। সুতরাং এ আলো ও অন্ধকারের মিশ্রণের মাধ্যমে বস্তুজগতের সৃষ্টি সম্পর্কে মনী ধর্মে যে পূর্ব পরিকল্পনার কথা রয়েছে তা মাযদাকীরা গ্রহণ করে নি ;বরং একে পরিকল্পনাহীন আকস্মিক ঘটনা বলে জানে। ফলে মাযদাকী ধর্মে আলোর শ্রেষ্ঠত্ব মনী ধর্ম হতে অধিকতর লক্ষণীয়।... 117

অগ্নি উপাসনা

ইসলামের আবির্ভাবের সমকালীন যারথুষ্ট্র ধর্মের চিন্তা ,বিশ্বাস ও ব্যবহারিক অবস্থার অন্যতম লক্ষণীয় দিক ছিল অগ্নিকে পবিত্র ও সম্মানিত মনে করে এর উপাসনা।

এ কর্ম প্রাচীন সময় হতেই প্রচলিত হয়ে এসেছে এবং এখনও এর প্রচলন রয়েছে। যেমন বু আলী সিনা তাঁর শিফা গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সপ্তম প্রবন্ধে প্রকৃতি ও বস্তু সম্পর্কিত আলোচনায় উল্লেখ করেছেন :

প্রাচীন সময়ে (পূর্ববর্তীদের) কেউ কেউ বৈপরীত্যের দর্শনে বিশ্বাসী ছিল। তারা মনে করত সকল কিছুই দু বিপরীত বস্তুর মিলনে অস্তিত্ব লাভ করে। এ কারণে ভাল-মন্দ ,আলো-অন্ধকারকেও বিপরীতমুখী দু টি শক্তি হিসেবে ভিন্নরূপ মূল্যায়ন করত। আগুনকে সম্মান প্রদর্শনের পথে বাড়াবাড়ি করে একে মহাপবিত্র ও উপাসনার উপযোগী বলে তারা মনে করত। কারণ আগুন আলোর উৎপত্তির উপাদান হিসেবে পরিচিত ছিল। এর বিপরীতে মাটি ও পৃথিবী অন্ধকারের উপাদান হিসেবে ঘৃণ্য ও অসম্মানিত ছিল।

যদি ইবনে সিনার কথাকে গ্রহণ করি তবে অস্তিত্বের দ্বৈততা ও ভাল-মন্দ এবং আলো-অন্ধকারের বৈপরীত্যের দর্শনের কারণেই অগ্নি উপাসনার চিন্তার উদ্ভব হয়েছে বলতে হবে। আর যদি আধুনিক বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে গ্রহণ করি তবে বলতে হবে ,প্রকৃতির উপাসনার যুগ হতেই অগ্নি উপাসনা ছিল এবং তার কল্যাণকর উপাদানসমূহ হতে অধিকতর কল্যাণ পাবার লক্ষ্যে এবং অকল্যাণকর উপাদানসমূহের ক্ষতি হতে নিজেদের রক্ষার জন্যই তাদের উপাসনা করত। অর্থাৎ বস্তুসমূহ ভাল-মন্দ বা আলো-অন্ধকারের মিশ্রণ হতে সৃষ্টি কিনা তা জানার পূর্ব হতেই তারা অগ্নি উপাসক ছিল। সময়ের এই পর্যায়ে তারা শুধু বস্তুসমূহকে ভাল ও মন্দ এ দু ভাগে ভাগ করত। সেই সাথে এ দু ধরনের অস্তিত্বের পেছনে ভিন্ন দুই খোদার হাত রয়েছে বলে মনে করত। কিন্তু প্রত্যেক বস্তুতেই দু টি উপাদান রয়েছে এবং যৌগ হিসেবে তারা দুই বিপরীত উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে এরূপ ধারণা পরবর্তী সময়ে মানুষের চিন্তার বিকাশের পর্যায়ে জন্ম লাভ করেছে। তবে এ বিষয়টি পরিষ্কার ,অগ্নির পবিত্রতা ও মর্যাদার বিশ্বাস আর্যদের মধ্যে প্রাচীনকাল হতেই ছিল এবং অন্য সকল উপাদান হতে আগুনের প্রতি আকর্ষণ অধিক ছিল।

ডক্টর মুঈন বলেছেন ,

সাতশ হতে এগারশ খ্রিষ্টপূর্ব সময়কালে লিখিত আভেস্তা বিশেষত গাতাসমূহের কথা বাদ দিলে ইরানের প্রাচীন নিদর্শনসমূহের অন্যতম যে নিদর্শনটি এখনও বিদ্যমান তা হলো

বেহেস্তানের (বিস্তুনের) দক্ষিণের আসহাক আভেন্দের নকশা যা খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে (মেডিয়ানদের সময়ে) খোদিত হয়েছিল। একই নকশাটি দুককানে দাউদ নামে পরিচিত এবং পাহাড়ের গায়ে খোদিত করে একে রূপ দেয়া হয়েছে। নকশাটি হলো একজন ইরানী আগুনের সামনে উপাসনার ন্যায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। গিরিশম্যান বলেছেন: আমরা হাখামানেশী আমলের তিনটি উপাসনালয়ের কথা জানি। সেগুলো হলো কুরেশের (সাইরাসের) নির্দেশে নির্মিত পাসারগাদের উপাসনালয় ,দ্বিতীয়টি তাঁরই নির্দেশে নির্মিত দারভীশের রণাঙ্গনের সমাধির নাকশে রুস্তম -এর উপাসনালয় এবং তৃতীয়টি দ্বিতীয় আরদ্শিরের সময়ে নির্মিত শুশ -এর উপাসনালয়। 118

এখন প্রশ্ন হলো অগ্নি উপাসনার বিষয়ে যারদুশতের দৃষ্টিভঙ্গি কি ছিল ? তিনি কি এ মর্মে নিষেধ করেছেন ? যদি নিষেধ করে থাকেন তবে কি তাঁর পরে এটি পুনরায় শুরু হয়েছিল ও যারথুষ্ট্র ধর্মের অন্যতম আচারে বা স্তম্ভে পরিণত হয়েছিল নাকি তিনি আগুনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রচলিত রীতিকেই সমর্থন করেছিলেন ? যদি যারথুষ্ট্রদের বর্ণনাসমূহ বিশেষত প্রচলিত আভেস্তাকে মানদণ্ড ধরি তবে বলতে হবে তিনি এ কর্মের সঙ্গে একমত ছিলেন।

ডক্টর মুঈন বলেছেন ,

অযার (অগ্নি) মাযদা ইয়াসনার (খোদার) একজন ফেরেশতার নাম। আভেস্তায় সাধারণত তাঁকে আহুরামাযদার পুত্র বলে সম্বোধন করা হয়েছে ।119 এ নামে অভিহিত করার মাধ্যমে তাঁর উচ্চ মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁরা পৃথিবীর সংরক্ষক ফেরেশতা ইসপানদারামেয কে আহুরামাযদার কন্যা বলে থাকে।120 আভেস্তার 25 নং ইয়াসনার 7 নং ধারায় উল্লিখিত হয়েছে ,আহুরমাযদার পুত্র অযারের গুণকীর্তন করি। হে পবিত্র অগ্নি! খোদার (আহুরামাযদা) পুত্র ও সত্যের নেতা! আমরা আপনার প্রশংসা করি। আমরা সকল প্রকার অগ্নির উপাসনা করি। যামইয়াদ ইয়াশতের 46-50 নম্বর ধারায় অযার ফেরেশতাকে অযীদাহাকের (অযীযাহাক) প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সেপান্ত মাইনিওয়ের পক্ষ হতে নিযুক্ত বলে উল্লিখিত হয়েছে। তিনি অযীদাহাকের ক্ষমতা লাভের পথকে রুদ্ধ করে রেখেছেন। 121

আগুনকে পবিত্র ও সম্মানিত মনে করে উপাসনার বিরুদ্ধে যারদুশতের কোন ভূমিকাই ইতিাহাসে পাওয়া যায় না। আভেস্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশ গাতাসমূহ যা স্বয়ং যারদুশতের বলে প্রসিদ্ধ তাতে তাঁর অগ্নির আরাধনার কথা রয়েছে। যদিও কেউ কেউ উপরোল্লিখিত ইয়াসনা ও ইয়াশতের ধারার বিষয়বস্তুর বিপরীত কথা বলেছেন। যেমন জন নাস বলেছেন ,

যারথুষ্ট্র ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় বিধানসমূহের কিছুই বর্তমানে নেই। শুধু এতটুকু জানা যায় ,প্রাচীন আর্যদের মধ্যে মূর্তিপূজা ,যাদু-মন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে যে সকল আচার-অনুষ্ঠানাদি ছিল যারদুশত তা পুরোপুরি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। যারদুশতের সময় হতে প্রচলিত শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। আর তা এ উপলক্ষে যে ,যারদুশত এক উপাসনা অনুষ্ঠানে পবিত্র অগ্নি বেদীর পাশে উপাসনারত অবস্থায় নিহত হন। গাতাসমূহে বর্ণিত এক সংগীতে উল্লিখিত হয়েছে যে ,যারদুশত বলেছেন: যখন পবিত্র অগ্নির প্রতি কিছু নিবেদন করি তখন সৎ কর্ম করেছি বলে অনুভব করি। অন্য স্থানে তিনি পবিত্র অগ্নিকে আহুরামাযদার পক্ষ হতে মানুষের জন্য উপহৃত এক ফেরেশতা বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমাদের জানতে হবে ,যারদুশত স্বয়ং অগ্নির উপাসনা করতেন না এবং তাঁর পূর্ববর্তী বংশধরগণ অগ্নির প্রতি যে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করত তিনি তা করতেন না। অগ্নির প্রতি তাঁর বিশ্বাস ,তাঁর পরবর্তীতে অগ্নি উপাসকগণের বিশ্বাস হতে ভিন্ন ছিল। তিনি অগ্নিকে আহুরমাযদার পক্ষ হতে উপহৃত মূল্যবান এক চিহ্ন ও পবিত্র রহস্য বলে মনে করতেন যার মাধ্যমে মহা জ্ঞানী খোদার স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায়। 122

যারদুশত অগ্নি উপাসনা করুন বা না-ই করুন বা করলেও তা যেভাবেই করুন না কেনো এ কথা সত্য যে ,তাঁর পরবর্তীতে অগ্নির প্রতি বিশেষভাবে সম্মান প্রদর্শন ও উপাসনা তুঙ্গে উঠেছিল এবং যারথুষ্ট্রগণের অন্যতম প্রধান চিহ্ন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল এবং এখনও তা রয়েছে। মুসলমান ও খ্রিষ্টানগণ যেরূপ মসজিদ ও গীর্জা তৈরি করে তেমনি যারথুষ্ট্রগণও বিপুল সংখ্যক অগ্নিমন্দির নির্মাণ করে।

সাসানী শাসনামলে যারথুষ্ট্রগণ অগ্নি উপাসক নামেই পরিচিত ছিল। সাসানী আমলের শেষ দিকে যখন খ্রিষ্টানগণ ইরানে স্বাধীনতা ও ক্ষমতা লাভ করেছিল ,এমনকি সাসানী রাজ দরবারেও প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছিল তখন প্রায়ই তারা যারথুষ্ট্রগণের সঙ্গে অগ্নি উপাসনা নিয়ে বিতর্ক করত। ক্রিস্টেন সেন আর্মেনিয়ায় খ্র্রিষ্টধর্মের প্রসারের কারণে ইরান সম্রাটের অস্থির ও উদ্বিগ্ন হওয়া এবং যারথুষ্ট্র পুরোহিতগণের সঙ্গে পরামর্শ করে তাদের খ্রিস্ট ধর্ম ত্যাগ করে যারথুষ্ট্র ধর্ম গ্রহণের নির্দেশ দান করে পত্র প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছেন ,তারা এর জবাবে ধৃষ্টতার সাথে লিখে , আমাদের ধর্মের মৌল নীতি সম্পর্কে এটি বলতে চাই যে ,আমরা তোমাদের মত সূর্য ,চন্দ্র ,অগ্নি ও বায়ুর মত উপাদানের উপাসনা করি না...। 123

তিনি তাঁর গ্রন্থের অষ্টম অধ্যায়ে লিখেছেন ,

...যারথুষ্ট্র ধর্মযাজকগণ প্রতিদিনই পিছু হটছিলেন। পূর্বের ন্যায় তাঁদের প্রতিরোধের ক্ষমতা ছিল না। ফলে বিভিন্ন ধারার বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ সৃষ্টিতে সক্ষম ছিলেন না। ধর্মীয় নিপীড়ন বেশ কমে এসেছিল। নতুন চিন্তার প্রসারের ফলে তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে সন্দেহ বাসা বাঁধতে লাগল। মাযদা ইয়াসনা ধর্মের প্রাচীনকালের যে কল্পকাহিনীসমূহ প্রবেশ করেছিল তা স্বয়ং এর ধর্মযাজকদের উদ্বিগ্ন ও সন্দেহপরায়ণ করে তুলেছিল। তাই তাঁরা এরূপ বিষয়সমূহের সপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা প্রদানের প্রচেষ্টায় রত হলেন। যারথুষ্ট্র ধর্মের একজন পুরোহিত খ্রিষ্টান ধর্মযাজক গিওরগিসের সঙ্গে আলোচনায় বলেন: আমরা কখনই অগ্নিকে খোদা মনে করি না ;বরং অগ্নির মাধ্যমে খোদারই উপাসনা করি যেমন তোমরা ক্রসের মাধ্যমে তাঁর উপাসনা কর। গিওরগিস একজন ধর্মান্তরিত ইরানী খ্রিষ্টান ছিলেন। তাই তিনি এর জবাবে আভেস্তা হতে কিছু অংশ পাঠ করেন যেখানে খোদার ন্যায় অগ্নির প্রতি সাহায্য চেয়ে দোয়া করা হয়েছে। পুরোহিত পরাজিত হওয়ার আশঙ্কায় বিচলিত হয়ে জবাব দেন: আমরা এজন্য অগ্নি উপাসনা করি যে ,অগ্নি ও আহুরামাযদা একই প্রকৃতির। গিওরগিস প্রশ্ন করলেন: যা কিছু অগ্নিতে আছে তার সবই কি আহুরামাযদার মধ্যেও রয়েছে ? পুরোহিত বললেন: হ্যাঁ। গিওরগিস বললেন: অগ্নি ঘোড়ার মলসহ সকল অপবিত্র বস্তুকে পুড়িয়ে ফেলে। যদি আহুরামাযদাও একই প্রকৃতির হয়ে থাকেন তবে তিনিও এগুলোকে পুড়িয়ে ফেলেন। তাই নয় কি ? এ কথায় পুরোহিত নির্বাক হয়ে গেলেন। 124

যারথুষ্ট্র পুরোহিতগণ ইসলামী শাসনামলে যখন মুসলিম মনীষীদের মুখোমুখি নিজ ধর্মের প্রতিরক্ষায় দাঁড়ালেন তখন অগ্নি ও আহুরামাযদা একই প্রকৃতির বলে আমরা অগ্নি উপাসনা করি এ কথা আর বললেন না ;বরং অগ্নি উপাসনাকে সম্পূর্ণরূপেই অস্বীকার করে বললেন , আমরা আহুরামাযদাকেই উপাসনা করি ,কিন্তু অগ্নিকে কিবলা হিসেবে গ্রহণ করি ,যেমন মুসলমানগণ কাবার উপাসনা করে না ,কিন্তু আল্লাহর উপাসনার লক্ষ্যে কাবার দিকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে

যারথুষ্ট্রগণ একদিকে পূর্ববর্তীদের অনুসরণে যেখানেই অগ্নির পবিত্রতার কথা আসত সেখানেই তার উপাসনার কথা বলত। অন্যদিকে মুসলমানদের আক্রমণ হতে বাঁচার জন্য উপাসনার স্থলে কিবলার ধারণা উপস্থাপন করত। বিশিষ্ট যারথুষ্ট্র কবি দাকীকী ,যিনি ফেরদৌসীর অগ্রণী এ অর্থে যে ,তিনিই সর্বপ্রথম শাহনামা রচনার কাজে হাত দেন এবং তাঁর পথ অনুসরণ করেই ফেরদৌসী এর পূর্ণতা দান করেন-যিনি যারথুষ্ট্র রীতি অনুযায়ী তাঁর কবিতায় অগ্নির উপাসনার কথা বলেছেন। তিনি যারদুশতের প্রতি ফেরেশতার অগ্নি সম্পর্কিত বাণীর উল্লেখ করে বলেছেন :

আমার পক্ষ হতে রাজা গুশতাসবের নিকট নিয়ে যাও বাণী

বল তাকে হে রাজাধিরাজ! হে মহান ও জ্ঞানী!

অর্পিত হয়েছে তোমার হস্তে অগ্নিকুণ্ডকে

যেন সকল দেশের অগ্নির হও তুমি রক্ষক।

এ অগ্নিকে হতে দিও না কখনও নির্বাপিত ,

কর না তাকে স্বচ্ছ সলিল বা মৃত্তিকা দ্বারা হত।

পুরোহিতগণের হও সহযাত্রী ও অনুসারী ,

মন্দগণ কর অন্তরকে পুতঃপবিত্র জন্য তারই।

এ ব্রত নিয়েই কর সাধনা ,

সকলে অগ্নির কর উপাসনা।

কবি ফেরদৌসীও যারথুষ্ট্র নীতির অনুসরণে অনেক স্থানেই উপাসনা শব্দটি এনেছেন। ফেরদৌসী তাঁর আগুন অবিষ্কার নামক প্রসিদ্ধ কল্পকাহিনীতে বলেছেন , হুশাঙ একটি বড় সাপ দেখে হত্যার নিমিত্তে এক বৃহৎ পাথর তার প্রতি ছুঁড়ে মারে। কিন্তু তা সাপকে আঘাত না করে অপর এক শিলায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রজ্বলিত হয় এবং এরূপেই অগ্নি আবিষ্কৃত হয়।

অতঃপর কবিতা আকারে বলেছেন :

দু শিলাখণ্ড হতে দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ল

শিলাভ্যন্তর যেন অগ্নি রং ধারণ করল।

সাপ না মরে এক রহস্য উদ্ঘাটিত হলো ,

ঐ শিলাদ্বয় হতেই অগ্নির সৃষ্টি হলো।

যদি লোহা দিয়ে আঘাত করে কেউ পাথরের ওপর

উৎপত্তি হয় তা হতে প্রজ্বলিত শিখার।

বিশ্বপ্রভু জানালেন তাকে নব সৃষ্টির অভিনন্দন

প্রশংসিত হলো সে ,পেল শুভ সম্ভাষণ।

অগ্নিদেব তাকে দিল এক মহান উপহার।

অগ্নি ঘোষিত হলো কিবলা সবার

অগ্নিদেব বলল তাকে এ মহাবীর

যদি হও বুদ্ধিমান কর উপাসনা অগ্নির।

ফেরদৌসী ইসলামের আবির্ভাবের পর অগ্নির মর্যাদা ও পবিত্রতার বিশ্বাসের প্রতি যুক্তি প্রদর্শন করে বলেছেন ,তারা অগ্নিকে কিবলা হিসেবে গ্রহণ করেছে যদিও তাঁর কবিতায় অগ্নির উপাসনার বিষয়টিও উল্লিখিত আছে।

ফেরদৌসী তাঁর কোন কবিতায় তাদের পক্ষাবলম্বন করে বলেছেন ,অগ্নিবেদী যারথুষ্ট্রগণের মেহরাব এবং অগ্নি হলো কেবলা। তিনি কেউকাউস ও কেইখসরুর অযার গুশাস্ব-এর মন্দিরে গমন সম্পর্কে বলেছেন :

সাত দিনব্যাপী অগ্নিদেবের নিকট পেয়েছিল তারা ছন্দ

ভেব না এই অগ্নি উপাসকগণ বড় মন্দ

কারণ অগ্নি তাদের নিকট মেহরাবের ন্যায়

উপাসনার সময় তাদের চক্ষুও সিক্ত হয়।

অন্যত্র বলেছেন :

সেখানে রাখা সুন্দর রঙের অগ্নিকে চেন ?

আরবদের পাথরে সাজান মেহরাব যেন।

ইবাদতের মেহরাব নাকি উপাস্য

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা দ্বিত্ববাদ সম্পর্কে আলোচনা করে বলেছি ,এটি বিশ্ব জগতের সৃষ্টিপদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং একত্ববাদী চিন্তার পরিপন্থী মতবাদ (সত্তাগত ও কর্মগত উভয় ধরনের একত্ববাদবিরোধী একটি মতবাদ)।

অগ্নিকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা ও এর উপাসনা করার সঙ্গে বিশ্ব সৃষ্টির ধারণার কোন সম্পর্ক নেই এবং এটি সত্তাগত ও কর্মগত একত্ববাদের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি বিষয়। বিষয়টি উপাসনাগত একত্ববাদের দৃষ্টিতে যারথুষ্ট্রগণ কি ছিলেন অথবা বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কিত তাদের ধারণা দ্বিত্ববাদী ছিল কিনা এ সবের আলোচনা এখানে করা আমাদের কাম্য নয় ;বরং এখানে আমরা দেখব উপাসনার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা কি ছিল। অর্থাৎ যদি ধরেও নিই ,বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে তাদের ধারণা সত্তাগত ও কর্মগত একত্ববাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তদুপরি আমাদের জানতে হবে যে ,বিশ্ব স্রষ্টার উপাসনার ক্ষেত্রে তারা একত্ববাদী ছিল না অংশীবাদী ? উপাসনাগতভাবে একত্ববাদী হওয়া সত্তা ও কর্মগতভাবে একত্ববাদী হওয়ার অবশ্যম্ভাবী ফল নয়। ইসলামের আবির্ভাবের সময়ে আরবগণ এ দৃষ্টিতে একত্ববাদী ছিল। যেমন কোরআনে উল্লিখিত হয়েছে :

و لئن سئلتهم من خلق السّماوات و الأرض ليقولنّ الله যদি তাদের প্রশ্ন কর ,আকাশ ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা কে ? তারা বলবে আল্লাহ্ 125 জাহেলী যুগের আবরগণও মূর্তিসমূহকে বিশ্বের স্রষ্টা বলত না ,কিন্তু এগুলোর উপাসনা করত। সাধারণত সকল মূর্তিপূজকই এরূপ ধারণা পোষণ করে। তাই যদি যারথুষ্ট্র ধর্মকে সত্তাগত ও কর্মগতভাবে একত্ববাদী বলে ধরেও নিই তবু তা উপাসনার ক্ষেত্রে একত্ববাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

যারথুষ্ট্রগণ প্রাচীনকাল হতেই অগ্নিমন্দিরে ও অগ্নিশিখার সামনে উপাসনা করে এসেছে। এ কর্মের উদ্দেশ্য কি ? তারা কি অগ্নির সামনে আহুরমাযদাকেই উপাসনা করত নাকি অগ্নিকেই ? যেমনটি জাহেলী যুগের আরবগণ মূর্তিসমূহকে তাদের মধ্যস্থতাকারী126 বলত আবার স্বীকার করতما نعبدهم إلّا ليقرّبونا إلى زلفى আমরা তাদের উপাসনা করি না এ উদ্দেশ্য ব্যতীত যে ,তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে।

ডক্টর মুঈন বলেছেন ,

...অগ্নির প্রতি বিশেষ দৃষ্টির কারণেই ইরানী মুসলমানগণ যারথুষ্ট্রদের অগ্নি উপাসক বলে অভিহিত করত। কিন্তু বাস্তবে তাদের নিকট অগ্নি স্বতন্ত্র কোন খোদা ছিল না (যেমনটি যারদুশতের পূর্বে প্রাচীন আর্যদের ধারণায় ছিল) ;বরং মুসলমানরা যেমন কাবার প্রশংসা করে তেমনি মাযদা ইয়াসনা ধর্মাবলম্বীরাও অগ্নির প্রশংসা করে ও এর পবিত্রতায় বিশ্বাস করে।

তিনি আরো বলেছেন , প্রকৃতির সকল সৃষ্টি ও অস্তিত্বের মধ্যে অগ্নি সুপ্তাবস্থায় বিদ্যমান। মানুষসহ সকল প্রাণীর অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা ও প্রাণ প্রবৃত্তির মূল হলো অগ্নি। এ অগ্নিই তার অস্তিত্ব ও কর্মকাণ্ডের উৎস। উদ্ভিদ ও পাথরের মধ্যেও এক ধরনের অগ্নিপ্রভাব রয়েছে।

মাওলানা রুমী তাঁর এক গজলে বলেছেন ,

বাঁশীতে প্রেমের অগ্নিই যেন বাজে

ভালবাসার উদ্যমেই সে সুর খুঁজে।

বাঁশীর সুরে নেই লালসা ,অগ্নি রয়েছে।

যার মাঝে নেই অগ্নি ,সেই ধ্বংস হয়েছে।

ডক্টর মুঈন তাঁর বক্তব্যে যে ভুল করেছেন সে ভুলের প্রতি আমরা পূর্বে ইঙ্গিত করেছি। তিনি উপাসনার ক্ষেত্রে অংশীবাদকে সৃষ্টির ক্ষেত্রে অংশীবাদ বলে ভুল করেছেন। তিনি ভেবেছেন উপাসনার ক্ষেত্রে র্শিক করার অর্থ যার উপাসনা করা হবে তিনি সৃষ্টি জগতে সৃষ্টিমূলক কোন কর্মকাণ্ড করেছে এরূপ বিশ্বাস রাখা এবং যেহেতু যারথুষ্ট্রগণ অগ্নির ক্ষেত্রে এরূপ বিশ্বাস রাখে না সেহেতু তারা মুশরিক বা অংশীবাদী বলে পরিগণিত হবে না। যদি এমনটিই হয়ে থাকে তবে অন্ধকার যুগের আরবরাও মুশরিক ছিল না। কারণ মূর্তিসমূহ সৃষ্টিকর্মে কোন ভূমিকা রেখেছে বলে তারা মনে করত না ;বরং তারা যে সকল কর্ম আল্লাহর জন্য করা উচিত (যেমন নামাজ ,কুরবানী) সেগুলো মূর্তির জন্য করত। কখনই হোবাল ,উজ্জা বা অন্যান্য মূর্তিকে স্বাধীন খোদা বলে মনে করত না। তাঁর অন্যতম ভুল হলো তিনি মনে করেছেন ,কোন কিছু মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও উপকারী হলে তার উপাসনা করা যাবে।

নামাজের সময় কাবার দিকে মুখ করাকে অগ্নি উপাসনার সঙ্গে তুলনার বিষয়টি একটি বড় ভুল। একজন সাধারণ মুসলমানও কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার সময় এ চিন্তা করে না যে ,কাবা পবিত্র ,তাই এর উপাসনা করতে হবে। ইসলাম কাবার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে নামাজের সময় কাবামুখী হওয়ার নির্দেশ দেয়নি। তাই নামাজে মুসলমানদের মাথায় কখনও এরূপ চিন্তা আসে না। কাবামুখী হওয়ার নির্দেশ ,মুসলমানদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে যদি দক্ষিণমুখী হয়ে নামাজ পড়ার নির্দেশ দেয়া হতো ,তার অনুরূপ বলেই পরিগণিত হতো। মসজিদুল হারাম বা কাবার সঙ্গে আল্লাহর বিশেষ কোন সম্পর্কের কথা কোরআন বলে নি ;বরং এর বিপরীতে কোরআনের শিক্ষা হলোفإينما تولّوا فثمّ وجه الله তোমরা যে দিকেই মুখ ফেরাও মহান আল্লাহ্ সে দিকেই রয়েছেন। কাবাকে বায়তুল্লাহ্ বলার অর্থ সকল গৃহই যেখানে আল্লাহর উপাসনা করা হয় তা আল্লাহর গৃহ (এ অর্থে সকল মসজিদই আল্লাহর গৃহ যদিও নামাজের সওয়াবের ক্ষেত্রে কোন কোন মসজিদের বিশেষত্ব রয়েছে)। তাই কাবামুখী হয়ে দাঁড়ানোর নির্দেশ বিশেষ এক সামাজিক দর্শনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। আর হা হলো প্রথমত মুসলমানগণ যেন ইবাদাতের (নামাজ) সময় বিভিন্ন দিক নির্বাচন না করে একটি দিককেই নির্ধারণ করে। দ্বিতীয়ত যে দিকটি তারা নির্ধারণ করবে তা যেন একক খোদার উপাসনার জন্য নির্মিত প্রথম স্থানটি হয় যা একক খোদার উপাসনার প্রতীক ও মহান খোদার প্রতি সম্মানের চিহ্ন।

অথচ যারথুষ্ট্রগণ ও স্বয়ং ডক্টর মুঈনের কথায় এর স্বীকারোক্তি রয়েছে ,তারা অগ্নিকেই সম্মানিত মনে করে উপাসনা করে। যদি তাই হয় তাহলে কিরূপে তা আহুরামাযদার উপাসনা বলে পরিগণিত হবে ?

ইসলামী জ্ঞানকোষে ইবাদাত (উপাসনা) শব্দের ব্যাপক অর্থ রয়েছে। আল্লাহর আনুগত্যের উদ্দেশ্য ভিন্ন যে কোন আনুগত্যই হোক ,তা প্রবৃত্তি বা অন্য মানুষের অনুসরণ-ইসলামের দৃষ্টিতে র্শিক হিসেবে ধরা হয়। অবশ্য এরূপ র্শিক শিরকের নিম্ন পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং এতে কেউ ইসলাম হতে বেরিয়ে গেছে বলা যায় না। কিন্তু যদি কোন কর্ম ইবাদাতের লক্ষ্যে বা উপাসনা প্রকাশার্থে করা হয় অর্থাৎ যে কর্ম উপাসনা ও আত্মিক পবিত্রতা লাভের উদ্দেশ্যে কোন সত্তার সামনে সম্পাদিত হয় ,যেমন রুকু ,সিজদাহ্ ,কুরবানী প্রভৃতি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো জন্য করা বৈধ নয় ,এমনকি নবী ,ইমাম ,ফেরেশতা সকলের ক্ষেত্রেই হারাম। এরূপ কর্মসমূহ একক মহান সত্তা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হলে তা র্শিক বলে বিবেচিত হবে। এরূপ উপাসনার সঙ্গে সত্তা ,সৃষ্টি ও গুণগত তাওহীদের সমন্বয় হোক বা না হোক তা র্শিক।

এ বিষয়টির ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। যে কোন কিছুর প্রতি সম্মান প্রদর্শনই র্শিক নয় ;বরং কোন কিছুকে পবিত্র মনে করে তার সামনে অবনত হওয়া ইবাদাত বলে গণ্য হবে। যদি কেউ নিজেকে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র দেখানোর লক্ষ্যে বিনয় প্রকাশ করে তাহলে একে নম্রতা নামে অভিহিত করা হয়। আবার অন্যকে সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে বিনয় প্রকাশ করলে তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন বলা যেতে পারে। এরূপ নম্রতা প্রদর্শন ও শ্রদ্ধা নিবেদনকে ইবাদাত বলা যায় না। বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্যে পার্থক্য হলো প্রথমটি নিজেকে ক্ষুদ্র হিসেবে উপস্থাপন এবং দ্বিতীয়টি অন্যকে সম্মানিত হিসেবে দেখানোর উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়।

কিন্তু কোন বস্তুকে পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত মনে করে তার সামনে অবনত হওয়া ইবাদত বলে গণ্য এবং আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো জন্য তা বৈধ নয়। কারণ একমাত্র ত্রুটিহীন ও পবিত্র সত্তা হিসেবে যাঁর সামনে অবনত হওয়া যায় তিনি হলেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্।

কোন বস্তুকে পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি দু ভাবে দেয়া যায় ,যথা মৌখিক ও কর্মের মাধ্যমে। মৌখিক পবিত্রতার ঘোষণা কোন শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে করা হয় ,যেমন সুবহানাল্লাহ্ অর্থাৎ পরম পবিত্র ও মহিমাময় আল্লাহ্ বা আলহামদুলিল্লাহ্ অর্থাৎ সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। এরূপে আল্লাহ্কে সকল পূর্ণতা ,কল্যাণ ,নিয়ামত ও বরকতের উৎস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এমনি আল্লাহু আকবার বলার মাধ্যমে তাঁকে সকল কিছু হতে শ্রেষ্ঠ ,এমনকি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনাতীত বলে তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তনের মৌখিক স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ সবই মৌখিক পবিত্রতা ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত। এরূপ শব্দমালা তাঁর পবিত্র সত্তা ব্যতীত অন্য কারো জন্য ব্যবহার বৈধ নয় ,এমনকি যদি সে সত্তা নবী বা নৈকট্যপ্রাপ্ত কোন ফেরেশতাও হয়ে থাকেন। এরূপ আরেকটি বাক্য হলোلا حول و لا قوّة إلّا بالله আল্লাহ্ ব্যতীত কোন শক্তি ও ক্ষমতা নেই।

কর্মের মাধ্যমে পবিত্রতা হলো এই যে ,মানুষ কোন সত্তার জন্য এমন কর্ম সম্পাদন করে যাতে ঐ সত্তার পবিত্রতার ধারণা প্রতিফলিত হয় ,যেমন রুকু ,সিজদাহ্ ও কুরবানী। অবশ্য কর্ম মৌখিক স্বীকৃতির ন্যায় সুস্পষ্ট পবিত্রতার ঘোষণা নয়। কারণ একই রকম সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যেও সম্পাদিত হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে তা ইবাদাত বলে পরিগণিত হবে না এবং এরূপ কর্ম পবিত্র হিসেবে স্বীকৃত নয় ;বরং সাধারণ একটি কর্ম বলে বিবেচিত। কিন্তু মূর্তি বা অগ্নির সামনে যে কর্ম সম্পাদিত হয় তা পবিত্রতার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ এগুলো পবিত্র মনে করেই তারা তা করে। মানুষের অভ্যন্তরীণ সত্তা (ফিতরাত) পবিত্রতার আকাঙ্ক্ষী এবং ফিতরাতগতভাবেই সে ত্রুটিহীন ,পূর্ণ ও পবিত্র কোন সত্তার সামনে দাঁড়িয়ে উপাসনা করতে চায়। যেহেতু পবিত্র সত্তার উপাসনা মানুষের সহজাতপ্রবৃত্তি সেহেতু এ সহজাত প্রবৃত্তি তাকে এ কর্মে বাধ্য করে। এ ক্ষেত্রে উপাস্য বস্তুটির স্বাধীনতার ধারণা সচেতন বা অচেতনভাবে তার মনে থাকে যদিও ভুলবশত সে কোন সত্তাকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। অন্যভাবে বলা যায় ,যেহেতু মানব প্রকৃতির অভ্যন্তরীণ তাড়নায় মানুষ পবিত্র সত্তার উপাসনা করে সেহেতু বাস্তব ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিতেও উপাস্য বস্তুটিকে সত্তাগতভাবে সে স্বাধীন ও ত্রুটিমুক্ত বলে বিশ্বাস করবে এমনটি নয়।

এটিই হলো উপাসনা। সুতরাং সম্মান প্রদর্শন ,বিনয় ও উপাসনা করার মধ্যে পার্থক্য যেমন আমাদের নিকট সুস্পষ্ট হলো তেমনি কিবলা হিসেবে গ্রহণ ও পবিত্রতার ধারণায় কোন সত্তার সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার মধ্যকার পার্থক্যও বোঝা গেল। তাই যারথুষ্ট্রগণ অগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে যা করেন তা বিনয় ও সম্মান প্রদর্শন যেমন নয় ,তেমনি একে কিবলা হিসেবে গ্রহণও বলা যায় না। কোন সত্তাকে (বস্তুকে) পবিত্র মনে করে তার মহিমা কীর্তন ঐ সত্তার ইবাদাত বলেই পরিগণিত ,যদিও এ কর্ম ঐ বস্তুর প্রতি প্রতিপালক ও খোদার বিশ্বাস বা ধারণা নিয়ে সম্পাদিত না হয়েও থাকে।

ডক্টর মুঈনের দাবির বিপরীতে যারথুষ্ট্রগণ অগ্নির জন্য খোদা হতে নিম্নতর কোন মর্যাদায় বিশ্বাসী নয় ;বরং তারা অগ্নির অলৌকিক (অতি প্রাকৃতিক) শক্তি ও আত্মিক প্রভাবে বিশ্বাসী ছিল এবং এখনও এ বিশ্বাস রাখে। পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি আভেস্তা তে অগ্নির ফেরেশতা অযার ইযাদ কে আহুরামাযদার পুত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ক্রিস্টেন সেন বলেছেন , এ ধর্মে অগ্নি অন্য সকল বস্তু হতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত।

তিনি তাঁর গ্রন্থের টীকায় উল্লেখ করেছেন ,

মি. হারটেল তাঁর ভারত ও ইরানী গবেষণামূলক উৎসসমূহ নামক ধারাবাহিক নিবন্ধে বলেছেন... ইরানীরা অগ্নিকে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ উভয় বিশ্বে প্রভাবশীল একটি উপাদান বলে বিশ্বাস করত।

অতঃপর তিনি মন্তব্য করেছেন , আমি মনে করি হারটেলের কথাটি অবাস্তব নয়।

স্বয়ং ডক্টর মুঈন ইরানের প্রাচীন তিনটি অগ্নিমন্দিরের অন্যতম অযার বারযিন মেহের-এর অগ্নিমন্দির সম্পর্কে বলেছেন ,

বুন্দহেশের সতেরতম অধ্যায়ের অষ্টম ধারায় উল্লিখিত হয়েছে অযার ,বারযিন ,মেহের-এর অগ্নিমন্দির গুশতাসবের শাসনামল পর্যন্ত প্রজ্বলিত ছিল এবং বিশ্বের আশ্রয় বলে পরিগণিত হতো। যখন যারদুশত অনুশেহ রাওয়ান নতুন ধর্ম আনয়ন করেন গুশতাসব তা গ্রহণ করে এবং অযার বারযিন মেহেরকে রিভান্দ পর্বতে যা পুশত ওয়া পুশতাসেপান নামে প্রসিদ্ধ সেখানে স্থাপন করেন।

অতঃপর তিনি আভেস্তার অংশবিশেষ হতে উল্লেখ করেছেন:

অগ্নির সাহায্য পেয়েই কৃষকগণ কৃষি কর্মে জ্ঞান ,দক্ষতা ও পবিত্র পথে উন্নতি করার সুযোগ পেয়েছে। এই অগ্নির সঙ্গেই গুশতাসব প্রশ্নোত্তর বিনিময় করেন।

তিনি যারথুষ্ট্রদের অন্যতম প্রধান অযার ফারানবাগ-এর অগ্নিমন্দির সম্পর্কে বলেছেন ,

এ অগ্নিমন্দির পুরোহিতগণের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। আভেস্তার প্রার্থনা সম্বলিত অংশের পাহলাভী তাফসীরের পঞ্চম ধারায় বাহরামের অগ্নির বর্ণনায় এসেছে ,এই অগ্নির নাম অযার ফারানবাগ । এ অগ্নিটিই সকল অগ্নির রক্ষক ও অগ্রগামী এবং এ অগ্নির সাহায্যেই পুরোহিগণ জ্ঞান ,সম্মান ও মর্যাদা (ক্ষমতা) লাভ করেন। এ অগ্নিই দাহাকের (যাহাক) সঙ্গে যুদ্ধ করে। 127

বুন্দহেশের সতের অধ্যায়ে তৃতীয় বৃহত্তম ও প্রধান অযার গুশতাসব -এর অগ্নিমন্দির সম্পর্কে স্বয়ং ডক্টর মুঈন তাঁর মাযদা ইয়াসনা ওয়া আদাবে পার্সী গন্থের 311 পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ,

সম্রাট কেইখসরু ও হোমারেহ্-এর শাসনামলে অযারগুশনাসবের অগ্নিমন্দির বিশ্ববাসীর আশ্রয়স্থল ছিল। যখন কেইখসরু চাচাস্ত হরদ ধ্বংস করেন তখন এই অগ্নিকুণ্ড তাঁর অশ্বসমূহের পদতলে মাটিতে দেবে যায় ও এর কালচে ভাব দূর হয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এর আলোতে তিনি মূর্তিসমূহ ধ্বংস করেন। অতঃপর তিনি তার নিকটবর্তী পর্বতে একটি উপাসনালয় নির্মাণ করে অযার গুশতাসবকে পুনঃস্থাপন করেন।

বুন্দহেশ হতে এ অগ্নি সম্পর্কে তিনি আরো বলেছেন , তিনটি স্বর্গীয় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের একটি বিশ্ববাসীকে সাহায্যের লক্ষ্যে আজারবাইজানে এসে অবস্থান নেয়।

ফেরদৌসী কায়কাউস ও কেইখসরুর অযারগুশাসবের অগ্নিমন্দিরে গমনের কাহিনীতে বর্ণনা করেছেন ,

অগ্নির পাদমূলে বসিয়া লইব সবক

মহান খোদা হইবেন মোর পথ প্রদর্শক

স্বয়ং না আসিয়া তিনি পবিত্র এ মন্দিরে

পাঠাইলেন প্রতিনিধি পথ দেখাইবার তরে।

আমরা কোন মূর্তিপূজককে ও তাদের মূর্তিরূপ প্রভুর বিষয়ে এরূপ অতি প্রাকৃতিক ও আত্মিক শক্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করতে দেখি না।

তেহরানের যারথুষ্ট্র সংস্থা হতে প্রকাশিত পত্রিকা হুখত -এ আরদ্শির অযারগুসাব নামের এক পুরোহিত তাঁর প্রবন্ধে দাবি করেছেন যারথুষ্ট্রগণ কখনই অগ্নি উপাসক ছিল না। অপপ্রচারের জবাব নামক এ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন ,

আমরা ঐশী গ্রন্থসমূহ হতে এ বিষয়টি প্রমাণ করব ,মহান খোদা স্বয়ং সকল জ্যোতির উৎস হিসেবেنور الأنوار বা জ্যোতিসমূহের জ্যোতি বলে গণ্য। যারথুষ্ট্রগণ উপাসনার সময় অগ্নির দিকে মুখ করে মূলত অগ্নির মাধ্যমে খোদার সঙ্গেই গোপন কথোপকথন করে থাকে ও তাঁর নিকট হতেই সাহায্য প্রার্থনা করে। এ বিষয়টি (আলো বা অগ্নির দিকে মুখ করে আহুরামাযদার উপাসনা) তাদের একত্ববাদী বিশ্বাসের পরিপন্থী নয়। কারণ অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও নামাজ পড়ার সময় কিবলামুখী হয় এবং তাদের এ কর্মকে কেউ মৃত্তিকা উপাসনা বা প্রস্তর উপাসনা বলে অভিহিত করে না।

এই যারথুষ্ট্র পুরোহিত আরদ্শির অযারগুশাসব পবিত্র একটি বস্তু হিসেবে অগ্নির নানাবিধ উপকারিতা বর্ণনা করে বলেছেন , প্রথম যুগের মানুষের সকল রকম উন্নতি এই লাল ও উজ্জ্বল অগ্নির কারণেই হয়েছিল। তাই অগ্নি তাদের নিকট সম্মানিত হওয়ার অধিকার রাখত এবং একে এক ঐশী শক্তি হিসেবে মানুষের সাহায্যে এসেছে বলেই ধারণা করা উচিত। এর জন্য উপাসনালয় প্রস্তুত করা ,ঘরের চুলাকে অবিরত জ্বালিয়ে রেখে নির্বাপিত হওয়া হতে বিরত রাখার চেষ্টা করা কর্তব্য ছিল।

পুরোহিত আরদ্শির অযারগুশাসবের কথার জবাবে বললেন , হ্যাঁ ,খোদা নুরুল আনওয়ার কথাটি সঠিক কিন্তু তা এ অর্থে নয় যে ,তারা বস্তুকে দু ভাগে ভাগ করত যার এক ভাগ আলো অন্যভাগ অন্ধকার। অতঃপর বলব খোদা জ্যোতিসমূহের জ্যোতি অন্ধকারসমূহের জ্যোতি নন ;বরং আল্লাহ্ সকল জ্যোতির জ্যোতি এ কথার অর্থ হলো সমগ্র অস্তিত্বই আলো (আলো = অস্তিত্ব) এবং অনস্তিত্ব হলো অন্ধকার। তাই মহান আল্লাহ্ সকল কিছুর জ্যোতি-

الله نور السّماوات و الأرض মহান আল্লাহ্ আকাশ ও ভূমণ্ডলের জ্যোতি । এ দৃষ্টিতে অগ্নি ,সূর্য ,প্রদীপের সঙ্গে মাটির ঢিলা ও পাথরের কোন পার্থক্য নেই। তাই যদি অগ্নির দিকে মুখ করি খোদার দিকে মুখ করেছি আর মাটির দিকে মুখ করলে খোদার দিকে মুখ করি নি বলা অর্থহীন।

তিনি বলেছেন , যারথুষ্ট্রগণ অগ্নির দিকে মুখ করার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে জ্যোতির সাহায্যে মহাজ্যোতির সঙ্গে গোপন সংলাপ করে থাকে।

কিন্তু আমরা বলব ,এক আল্লাহর উপাসনার অর্থ মানুষ যখন তাঁর প্রতি মুখ করবে কোন কিছুকেই যেন মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ না করে। তাই তিনি বলেছেন ,وإذا سألك عبادي عنّي فإنّي قريب যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে (তাকে বল) আমি তার নিকটবর্তী আছি। অর্থাৎ মহান খোদার দিকে মুখ করার জন্য কোন কিছুকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণের কোন প্রয়োজনই নেই।

হ্যাঁ ,অবশ্য যদি কোন মানুষ আল্লাহর দিকে অগ্রসর হয় (মুখ ফেরায়) এবং তাঁর পরিচয় লাভের মাধ্যমে আল্লাহর ওলীতে পরিণত হয় অর্থাৎ ইবাদাতের উচ্চতর পর্যায় অতিক্রমের মাধ্যমে মহান আল্লাহর জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয় (ফানাফিল্লাহ্) ,এ পর্যায়ে অন্যরা দোয়া ও গুনাহ মাফের (ইস্তিগফার বা পাপ মার্জনা) জন্য তাঁদের উসিলা বা মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। যেহেতু তাঁরা একদিকে আল্লাহর পূর্ণ ও সৎ কর্মশীল বান্দা ,অন্যদিকে জীবিত ,সেহেতু অন্যান্যরা তাঁদের হতে হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা ও পাপ মার্জনার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া প্রত্যাশা করেন যেন তিনি তাঁর করুণায় গুনাহসমূহকে মার্জনা করেন।

সাহায্য প্রার্থনা এজন্য বৈধ ,যাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা হচ্ছে তিনি জীবিত ,রিযিকপ্রাপ্ত এবং উপাসনার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছেন ;তিনি আমাদের চেয়ে উত্তমরূপে আল্লাহর উপাসনা ও সাহায্য প্রার্থনা করতে সক্ষম এবং এ কারণেই তিনি আল্লাহর অধিকতর নিকটবর্তী। আমরা মুসলমানগণ রাসূলে করিম (সা.)-এর যিয়ারতে পড়ে থাকি :

اللّهمّ إنّي أعتقد حرمة صاحب هذا المشهد الشريف في غيبته كما أعتقدها في حضرته و أعلم أنّ رسولك و خلفائك عليهم السّلام أحياء عندك يُرزقون,يرون مقامي و يسمعون كلامي و يردّون سلامي

হে আল্লাহ্! আমি এই পবিত্র স্থানের অধিকারীর সম্মান তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর জীবিতাবস্থার অনুরূপ মনে করি। আমি জানি তিনি আপনার রাসূল (সা.) এবং আপনার মনোনীত প্রতিনিধিগণ (আ.) সকলেই আপনার নিকট জীবিত ও আপনার নিকট হতে রিযিকপ্রাপ্ত। তাঁরা আমার অবস্থানকে দেখছেন ও আমার কথা শুনছেন এবং আমার সালামের জবাব দান করছেন।

এ যিয়ারতের শেষাংশে আমরা পড়ি:

أللّهمّ إنّك قلتَ: ((و لو أنّهم إذ ظلموا أنفسهم جاؤك فاستغفروا الله واستغفر لهم الرّسول لوجدوا الله توّاباً رحيماً.)) و إنّي أتيتك مستغفرا تائبا من ذنوبي و إنّي أتوجّه بك إلى الله ربّي و ربّك ليغفرلي ذنوبي

হে আল্লাহ্! নিশ্চয়ই আপনি (পবিত্র কোরআনে) বলেছেন: তারা যখন নিজেদের ওপর জুলুম করে ও আপনার নিকট আসে অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন অবশ্যই তারা আল্লাহ্কে ক্ষমাকারী ও দয়াশীলরূপে পাবে। (অতঃপর নবীকে উদ্দেশ করে পড়া হয়) হে প্রিয় নবী! আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনাকারী ও গুনাহ হতে অনুশোচনাকারী হয়ে প্রত্যাবর্তনকারী হিসেবে এসেছি। আপনি আল্লাহর সৎ কর্মশীল ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা হিসেবে আমার ও আমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে আপনার শরণাপন্ন হচ্ছি যাতে তিনি আমার গুনাহসমূহ মার্জনা করেন।

যেহেতু আল্লাহর ওলীদের শরণাপন্ন হয়ে দোয়া চাওয়া এরূপ বিশ্বাস নিয়ে সম্পাদিত হয় সেহেতু তা শিরক তো নয়ই ;বরং ইবাদাত হিসেবে পরিগণিত।

অগ্নিকে কাবার ন্যায় কিবলা হিসেবে গ্রহণের বিষয়টির জবাব আমরা পূর্বে দিয়েছি এবং বলেছি অগ্নির প্রতি পবিত্রতার ধারণা নিয়ে দণ্ডায়মান হওয়ার সঙ্গে কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার (আল্লাহর ইবাদাতের) মধ্যে কোন তুলনাই হতে পারে না।

পুরোহিত আরদ্শির বলেছেন ,

যেহেতু অগ্নি মানুষের প্রচুর উপকারে আসে সেহেতু মানুষের অধিকার রয়েছে অগ্নির প্রতি বিশেষ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখার ও একে মূল্য দেয়ার ।

তাঁর কথার সারবস্তু এখানেই। প্রকৃতপক্ষে নবিগণের আগমনের (নবী প্রেরণের) লক্ষ্য এটিই যে ,তাঁরা মানুষকে সকল কল্যাণ ,নিয়ামত ও বরকতের উৎসের সঙ্গে পরিচিত করাবেন এবং তাদের এমন চক্ষু দান করবেন যা দ্বারা মূল কারণকে তারা দেখতে পারে। তাঁরা এসেছিলেন মানুষকে কারণ হতে সকল কারণের মূলের দিকে নিয়ে যাবেন এবং তাদের বোঝাবেন

الحمد لله ربّ العالمين সকল প্রশংসা শুধু আল্লাহরই জন্য যিনি সমগ্র বিশ্বের প্রতিপালক।

তাছাড়া আমাদের দেখতে হবে শুধু অগ্নিই ঐশী বস্তু নয় যা মানুষকে সাহায্য করার জন্য আসমান হতে এসেছে। অবশ্য যদি আসমান বলতে আমাদের মাথার ওপর বিদ্যমান মহাশূন্য বোঝানো হয়ে থাকে তবে তা ঐশী বা বিশেষ কোন বস্তু বলে গণ্য নয়। আর যদি আসমান বলতে অদৃশ্য জগৎ বোঝানো হয় তবে সকল বস্তুই আসমান হতে এসেছে এবং এ ক্ষেত্রে অগ্নির কোন বিশেষত্ব নেই।

) و إن من شيء إلّا عندنا خزائنه و ما ننَزّله إلّا بقدر معلوم(

আমাদের নিকট প্রত্যেক বস্তুরই ভাণ্ডার রয়েছে এবং তা হতে নির্দিষ্ট পরিমাণেই আমরা অবতারণা করি। 128

ধর্মীয় আচার ও আনুষ্ঠানিকতা

অগ্নি উপাসনা বা অগ্নির প্রতি বিশেষ রীতিতে সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি সাধারণ নয় ;বরং শোনার মত একটি অনুষ্ঠান এটি। আমরা মাযদা ইয়াসনা ওয়া আদাবে পার্সী নামক গ্রন্থ থেকে এ অনুষ্ঠানের কিছু বিবরণ দান করব তাতে অগ্নির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দাবিদার ও পক্ষাবলম্বনকারীদের স্বরূপ উদ্ঘাটিত হবে। এ গ্রন্থ ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থেও এ অনুষ্ঠানের বিবরণ রয়েছে এবং বর্তমানে বিদ্যমান যারথুষ্ট্রগণের মধ্যেও এর প্রচলন লক্ষণীয়।

উক্ত গ্রন্থে বলা হয়েছে :

ইসলামের বিপরীতে যারথুষ্ট্র ধর্মে খ্রিষ্টধর্মের ন্যায় বিভিন্ন উপাদানের ব্যবহার ও বিশেষ ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বিদ্যমান। এরূপ আনুষ্ঠানিকতা অগ্নিমন্দিরগুলোতেও প্রচলিত। অগ্নিকুণ্ডকে এমন স্থানে রাখা হয় যাতে চারিদিক উন্মুক্ত থাকে। প্রতিটি অগ্নিমন্দিরের অগ্নি প্রজ্বলনের বিশেষ রীতি রয়েছে এবং অতারবান (অগ্নিরক্ষক পুরোহিত) ব্যতীত অন্য কেউ সেখানে প্রবেশের অধিকার রাখে না। অগ্নিরক্ষক পুরোহিতগণ অগ্নির দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় তাঁদের মুখমণ্ডল বেঁধে নেন যাতে করে তাঁদের নিঃশ্বাস অগ্নিকে অপবিত্র না করে ফেলে। অগ্নিকুণ্ডের ডানদিকে একটি চৌকোণা ঘর রয়েছে যা কয়েকটি সমান ভাগে বিভক্ত এবং এর প্রতিটি অংশ বিশেষ বিশেষ আচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই কক্ষকে ইয়াযশেনগাহ্ (বিশেষ ইবাদাত ও আচারের স্থান) বলা হয়।... যারথুষ্ট্র ধর্ম গ্রন্থে পুনঃপুন নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে সূর্য কখনই অগ্নির ওপর আপতিত না হয়।129 তাই অগ্নিমন্দিরসমূহ বিশেষ গঠন ও আকৃতিতে তৈরি করা হয়। অগ্নিমন্দিরের মাঝামাঝি অন্ধকার একটি কক্ষ তৈরি করা হতো এবং অগ্নিচুল্লীটি সেখানে স্থাপন করা হতো।...

ইরানের অভিজাত শ্রেণীর রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের অগ্নির উপস্থিতি ছিল ,যেমন গৃহের অগ্নি ,গোত্রের অগ্নি ,আঞ্চলিক অগ্নি ,প্রাদেশিক অগ্নি প্রভৃতি। গৃহের অগ্নিরক্ষককে মনবায বলা হতো এবং দু জন পুরোহিত এর রক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকতেন। আঞ্চলিক অগ্নির প্রতিরক্ষার জন্য একজন উচ্চ পর্যায়ের ধর্মযাজকের অধীনে গঠিত পুরোহিতগণের কমিটি ছিল...।

সাসানী আভেস্তার একটি অংশের নাম হলো সুযগার যেখানে অগ্নি উপাসনার প্রকৃতি ও এ সম্পর্কিত কিছু কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। যেমন এক অগ্নিমন্দির ধূলা ও অন্যান্য সুগন্ধীতে ভরপুর ছিল। এক পুরোহিতের নিজ নিঃশ্বাসে যাতে অগ্নি নির্বাপিত না হয় সেজন্য মুখমণ্ডল বেঁধে ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে পবিত্রকৃত কাঠের টুকরাসমূহ দ্বারা অগ্নিকে প্রজ্বলিত রাখার কাজে রত ছিলেন। এই কাঠের টুকরোসমূহ হাযানে আপতা নামক বৃক্ষ হতে সংগৃহীত হতো। ঐ পুরোহিত টুকরোগুলোকে বিশেষ রীতিতে বেরাসম নামক কাষ্ঠ দণ্ড দ্বারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে অগ্নিতে ফেলছিলেন ও বিশেষ মন্ত্র ও দোয়া পড়ছিলেন। অন্যান্য পুরোহিতরা হুমে 130 ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন এবং পান ও উৎসর্গ করছিলেন। দোয়া ও মন্ত্র পাঠের (আভেস্তা হতে) মাধ্যমে হুমের কাষ্ঠকে পবিত্র করে হুউন -এর দ্বারা আঘাত করছিলেন... অগ্নি উপাসনার বিশেষ স্থানে (ইয়াযশেনগাহ্) নিম্নোক্ত বস্তুসমূহ বিশেষ কাজে ব্যবহৃত হতো :

1. হাউন ও হাউনের দণ্ড যা খ্রিষ্টানদের ঘণ্টার ন্যায় এবং এক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় যদিও পূর্বে তা পবিত্র বৃক্ষ হুমের কাষ্ঠে আঘাত করার জন্য ব্যবহৃত হতো।

2. বেরাসম্ পবিত্র সিক্তবৃক্ষ ,যেমন ডালিম গাছ হতে প্রস্তুত হতো। বর্তমানে রৌপ্য বা ব্রোঞ্জ দণ্ড দ্বারা এটি প্রস্তুত করা হয়।

3. বেরাসম্দান।

4.বেরাসম্চিন যা ক্ষুদ্র ছুরি বিশেষ ।

5. পবিত্র পানি ও হুমের জন্য কয়েকটি পাত্র।

6. কয়েকটি বাটি বৌল বা গামলা।

7. ভারস যা গরুর লোম ও চুল (লেজের) দ্বারা তৈরি ছোট দড়ি যা বেরাসমের সঙ্গে বাঁধা হয়।

8. আরভিস নামের বড় এক পাথর খণ্ড (চৌকোণা) যার ওপর উপরোক্ত বস্তুসমূহ রাখা হতো ।

তিনি আরো উল্লেখ করেছেন :

ফার্সী অভিধানসমূহে এসেছে: বারসাম গিটহীন সরু এক বিঘত দৈর্ঘ্যরে হুম বৃক্ষের শাখা। এ বৃক্ষটি ঝাউ বৃক্ষের মত দেখতে। তাই যদি হুম বৃক্ষ না পাওয়া যায় ঝাউ বৃক্ষের শাখা নতুবা ডালিম গাছের ডাল ব্যবহৃত হবে। এই শাখা কাটার রীতি হলো বেরাসম্চিন নামক ছোট ছোরা যার হাতলটি লৌহ নির্মিত পানি দ্বারা ধৌত করতে হবে ও ধোয়ার সময় দোয়া পড়তে হবে অর্থাৎ অগ্নি উপাসনা ,গোসল করা ও খাওয়ার সময় পড়ার দোয়াসমূহ এ সময় পড়তে হবে ও শাখা কাটতে হবে।

তাঁর বর্ণনা মতে বর্তমান ইরানের যারথুষ্ট্রগণের অগ্নি উপাসনার রীতি হলো যখন একজন পুরোহিত প্রার্থনা করতে থাকেন অন্য পুরোহিত অগ্নির প্রতি দৃষ্টি রাখবেন (যাতে তা প্রজ্বলিত থাকে) ও বারসামদানের ওপর রাখা কাঠের টুকরোগুলোকে হাতে হাতে দিয়ে দিবেন এবং পরে তা পুনরায় বারসামদানের ওপর সাজিয়ে রাখবেন।

অন্যত্র তিনি বলেছেন :

দার মাসতাতার আভেস্তার ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ,দু ধরনের অগ্নিমন্দির রয়েছে। বড় অগ্নিমন্দিরকে অতাশ বাহরাম বলা হয় এবং ক্ষুদ্র মন্দিরকে অদারান বা অগইয়ারী বলা হয়। ভারতের মুম্বাই (বোম্বে) তিনটি বড় অগ্নিমন্দির ও প্রায় একশ টি ক্ষুদ্র অগ্নিমন্দির রয়েছে। অতাশ বাহরাম অগইয়ারী র মধ্যে অগ্নির আকৃতি ও প্রস্তুতরীতিগত পার্থক্য রয়েছে। অতাশ বাহরাম প্রস্তুতের জন্য এক বছর সময় লাগে ও তের ধরনের অগ্নি হতে তা প্রস্তুত হয়ে থাকে। এই তের ধরনের অগ্নিকে সকল ধরনের অগ্নির নির্যাস বলা যেতে পারে। এগুলোকে পবিত্রকরণের রীতি ও আনুষ্ঠানিকতা সাসানী আভেস্তার ভানদিদাদ অংশে বর্ণিত হয়েছে। যারথুষ্ট্র রীতি অনুযায়ী প্রতি অঞ্চলে অবশ্যই একটি অতাশ বাহরাম থাকতে হবে। কোন কোন যারথুষ্ট্র ধর্মযাজকের মতে এক অঞ্চলে একের অধিক অতাশ বাহরাম থাকতে পারবে না। কারণ এক দেশে কয়েক রাজা থাকতে পারে না।... যেহেতু সে রাজা তাই তার সিংহাসন দু ভাগে ভাগ করে সিংহাসন আকৃতিতে সাজিয়ে ধাপযুক্ত সিংহাসনের রূপ দেয়া হয়েছে।

এ হলো যারথুষ্ট্রগণের অগ্নি উপাসনার আনুষ্ঠানিকতা। এ আনুষ্ঠানিকতা কতটা তাওহীদভিত্তিক বা র্শিকমিশ্রিত তা নিয়ে এখন আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। একে মূর্তিপূজা বা খোদা উপাসনা কিছুই বলব না। শুধু সম্মানিত পাঠকগণকে এরূপ আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে চিন্তা করতে বলব যে ,এর হতে কুসংস্কারাচ্ছন্ন কোন আচার-অনুষ্ঠান পৃথিবীতে আছে কি ? অতঃপর ইসলামের আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে এগুলোর তুলনা করুন। যেমন নামাজ ,আযান ,জুমআ ,জামায়াত ,হজ্ব ,তাসবীহ-তাহলীল ,আল্লাহর শোকর আদায়ের প্রক্রিয়াসহ মসজিদকেন্দ্রিক অন্যান্য ইবাদতসমূহের সঙ্গে এ ধরনের আচারের তুলনা করে দেখুন এ দু য়ের মধ্যে পার্থক্য কত ? অতঃপর বলুন ,ইরানের জনসাধারণের এ অধিকার ছিল কি না যে এরূপ কুসংস্কারাচ্ছন্ন আচার-অনুষ্ঠান ত্যাগ করে ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করার ?

এ আলোচনার শেষে এক পেঁচার আর্তনাদের বর্ণনা দান করব যা থেকে সম্মানিত পাঠকবৃন্দ এরূপ আর্তনাদসমূহের মূল্য বুঝতে পারবেন।

ভারতের নওসারী শহরের ইরান শাহ নামের প্রসিদ্ধ অগ্নিমন্দির যা বড় অগ্নিমন্দিরের (অতাশ বাহরামের) অন্তর্ভুক্ত সে সম্পর্কে ইবরাহীম পুর দাউদ বলেছেন :

ইরানী মুহাজিররা ভারতবর্ষে অতাশ বাহরাম বহন করে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের এ কর্ম সঠিক বলেই প্রতিভাত হয়। কারণ তারিখে তাবারী ও মাসউদী থেকে জানা যায় ,পরাজয়ের যুগে ইরানীরা শত্রুর হাতে পড়ে নির্বাপিত হওয়ার ভয়ে অগ্নিকে দূরবর্তী স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায়।131 যদিও ইরানের জাঁকজমকপূর্ণ অগ্নিমন্দিরসমূহ মসজিদের রূপান্তরিত ও অগ্নিকুণ্ডসমূহ নিভে গিয়েছিল তদুপরি ইরানিগণ তাদের সাধ্যমত তা রক্ষায় চেষ্টা করেছেন। তৃতীয় ইয়াযদ গারদ নাহাভান্দের যুদ্ধে পরাজয়ের পর স্বয়ং রেই শহরের পবিত্র অগ্নিটিকে মারভে নিয়ে যান। যদিও ইরানশাহ অগ্নিমন্দির ইরানী মুহাজিরদের সেনজানে প্রবেশের পর নির্মিত হয়েছিল (716 খ্রিষ্টাব্দ) তদুপরি 1230 বছর হলো তারা সব সময় এই বিদেশ বিভূঁইয়ে শত্রু হতে এ অগ্নির বিষয়ে চিন্তিত ছিল। কিন্তু এই অগ্নি দিনের টানাপড়েনে রংহীন হয়ে পড়েনি ;বরং তার সহযোগীদের উষ্ণ কণ্ঠে সমবেদনা জানিয়ে উৎসাহিত করে এসেছে। সেনজানের পতনের পর সেটি নসারীতে আশ্রয় নেয় ও দীর্ঘ 235 বছর সেখানে বিদ্যমান ছিল। এই অগ্নি শুধু দু বছর (1733-1736) সূরাটে নির্বাপিত ছিল। কিন্তু এরপর 204 বছর হলো এই গ্রামে তা পুনঃস্থাপিত হয়েছে। পুরোহিতগণের নির্দেশে সহস্র যারথুষ্ট্র এই অগ্নির চারপাশে সমবেত হচ্ছে। ইরানী ও ভারতীয় পারসিকগণ সেখানে যিয়ারতে গিয়ে থাকেন।

বিশেষত ফার্সী বর্ষের উরদিবেহেশত অযার মাসে সেখানে যিয়ারতে ভীড় হয়। ইরানশাহ নামের এই অগ্নিমন্দির হতে প্রতিদিন সকাল ,মধ্যাহ্ন ও সন্ধ্যায় সাদা পোশাক পরিহিত পুরোহিতগণের আভেস্তার গজল পাঠের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়। ইরানশাহ অগ্নিমন্দিরের সেবকদের কণ্ঠধ্বনি সাসানী শাসনামলের জাঁকজমকপূর্ণ রেই ,শিজ ও ইসতাখরের অগ্নিমন্দিরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।132

কেউ কি বিশ্বাস করবেন ,বর্তমান শতাব্দীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার দাবিদার একজন শিক্ষক এতটা অজ্ঞতার পরিচয় দেবেন ? জানি না এটি অজ্ঞতা নাকি অজ্ঞতার ভান ? নাকি কালো সাম্রাজ্যবাদের হাতে প্রতিপালিতের কণ্ঠধ্বনি ?

মাযদা ইয়াসনা ওয়া আদাবে পার্সী এই শিরোনামেই ডক্টর মুঈন গ্রন্থটি লিখেছেন। আমরা আমাদের আলোচনায় এ গ্রন্থ হতে অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছি। এই গ্রন্থের নাম ও লেখকের ভূমিকা হতে বোঝা যায় ফার্সী সাহিত্যে মাযদা ইয়াসনা শব্দসমূহ ও এ চিন্তার প্রতিফলন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সাহিত্যিক দৃষ্টিতে এরূপ কর্ম উপকারীই শুধু নয় জরুরীও বটে। কিন্তু এ গ্রন্থের মূল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন তাঁর শিক্ষক ও নির্দেশক দাউদ ইবরাহীম। মূলত ডক্টর মুঈন তাঁর নির্দেশকের দ্বারা চরমভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। এ গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লিখিত হয়েছে ,ইরানী মানসিকতা গত কয়েক হাজার বছরে ,এমনকি ইসলামী শাসনামলেও পরিবর্তিত হয় নি ,কোন চিন্তাই তাকে প্রভাবিত করতে পারে নি এবং এখনও ইরানী মানসিকতা মাযদা ইয়াসনা মানসিকতা হিসেবেই বিদ্যমান রয়েছে ,এমনকি এ চিন্তা অন্য চিন্তাসমূহকেও তার দ্বারা প্রভাবিত করে ফেলে। তাই তিনি বলেছেন :

বিজয়ী আরবরা ইরানে যে ধর্ম এনেছিল (অর্থাৎ পৃকৃত ইসলাম) তা শিয়া রং ধারণ করে।

পুর দাউদের ধারণায় মানুষের মানসিকতার প্রভাবক উপাদানসমূহ প্রধানত ভূমি ,বংশ ও ভাষা। তিনি তাঁর দর্শনকে এ ভিত্তির ওপর রেখেই বলেছেন ,ইরানী মানসিকতা মাযদা ইয়াসনা মানসিকতা। কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই যে বলতে পারে আমি নিখাঁদ এক জাতির অন্তর্ভুক্ত। তুর্কী ,মোগল ,আরব ,এমনকি গ্রীক ও ভারতীয় রক্ত প্রাচীন ইরানীদের সঙ্গে এতটা মিশ্রিত হয়েছে যে ,বিশেষত অসংখ্য অসম বিবাহের ফলশ্রুতিতে তাতে কেউ আজকে দাবি করতে পারে না যে ,আমি খাঁটি আর্য ও ইরানী। তাই খোদ পুর দাউদের রক্তে কোন্ জাতির মিশ্রণ ঘটেছে বলা মুশকিল। হয়তো পিতৃ দিক হতে তিনি উমাইয়্যা আরব ও মাতৃ দিক হতে মোগল চেঙ্গিস খানের বংশধর হতে পারেন। আল্লাহ্ই ভাল জানেন।

ভাষার অবস্থাও জাতির মত। যদি ভিন্ন ভাষার শব্দের কথা বাদও দিই তবু বর্তমানের ফার্সী ভাষা ইরানের প্রাচীন ভাষাভাষীদের কোন ক্ষুদ্র অংশের ভাষা হয়ে থাকবে ,সমগ্র ইরানীর নয়। বিশেষত বর্তমান ফার্সীর সঙ্গে আভেস্তা আমলের ফার্সীর আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

শুধু বাকী থাকে ভূমি। কিন্তু স্বয়ং পুর দাউদের ভাষায় আমাদের বর্তমান ভূমিটি প্রাচীন ভূমির ক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র। তবে পুর দাউদের দর্শন অনুযায়ী সকল রহস্য মাটি ও পানির (জন্মভূমি) মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এবং ইরানী মানসিকতার ভিত্তিও এ ভূমির মাটি ও আবহাওয়ার মধ্যে নিহিত। তাই যে সকল কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও কাল্পনিক বিষয়ের নমুনা আমরা দেখলাম এ ভূমিতেই উৎপন্ন মাযদা ইয়াসনা ধর্মের মধ্যে রয়েছে বলে তাকেই আমরা ইরানী মানসিকতা বলব।

পুর দাউদ দাবি করেছেন :

জীবন ও চিন্তাধারা জাতিসত্তা ও ভাষার ন্যায় আমাদের কয়েক হাজার বছর পূর্বের প্রজন্ম হতে অপরিবর্তিতভাবে বংশগতভাবে বাহিত হয়ে এসেছে।

আমি বলব ,আমাদের জীবন ও চিন্তাধারা আমাদের জাতিসত্তা ও ভাষার ন্যায় নয় ;বরং এর থেকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ইরানীরা তাদের আল্লাহ্প্রদত্ত বুদ্ধিমত্তা ও সুপ্ত প্রতিভার গুণে দ্বিত্ববাদ ,অগ্নি উপাসনা , হুমে উপাসনা ,সূর্য ও মানব উপাসনা ও এরূপ হাজারো কুসংস্কারকে ইসলামী শিক্ষার ছত্রছায়ায় দূরে ছুঁড়ে ফেলেছে।

পুর দাউদ নিমজ্জমান ব্যক্তির ন্যায় যেন খড়কুটাকে ধরে বাঁচতে চান। তাই ইরফানের (অধ্যাত্মিক) বিশেষ ভাষায় যে সকল ইরানী কবি কথা বলেছেন তাঁদের কথাকে তাঁর পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন ,অথচ এই সকল কবি133 শতাব্দীকাল ধরে ইসলামের বিশ্বজনীন ধারণার রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়ে জাতি ,ভাষা ও জন্মভূমির অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার হতে মুক্তি লাভ করেছিলেন এবং সকল জাতি সমান -এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন। পুর দাউদ তাঁদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন ও তাঁদের কবিতায় ব্যবহৃত মদ ,পুরোহিত ,অগ্নি ,অগ্নিমন্দির প্রভৃতি শব্দের অধ্যাত্মিক অর্থকে পরিত্যাজ্য ও বিবর্তিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তাই তিনি বলেছেন ,

অগ্নিমন্দিরসমূহ নির্বাপিত হওয়ার পরও ইরানী কবিদের হৃদয় প্রেমের অগ্নিমন্দির হয়ে রয়েছে। এখনও তার ব্যথার আরোগ্যের জন্য দূরবর্তী অঞ্চলের পুরোহিতগণের শরণাপন্ন হতে চায় যদিও তাদের ভূমি হতে তারা উৎখাত হয়েছে এবং কেউ তাদের শরণাপন্ন হতে অক্ষম।

আমিও বলি একজন প্রকৃত ইরানী যার মধ্যে ইরানী জাতীয়তার জ্ঞান রয়েছে ,যেমন হাফিয ,সা দী ,মাওলানা রুমী ,জামী ও এরূপ শত কবির অন্তর প্রেমের অগ্নিমন্দির এবং তার মনের ব্যথা সারানোর জন্য বৃদ্ধ পুরোহিতের কাছে যেতে চায়। কিন্তু তার প্রেমের ঐ অগ্নিমন্দির প্রকৃতির উপাদানের উপাসনার উদ্দেশ্যে নির্মিত বারসাম ,বারসামদান ,বারসামচিন ,ছিদ্রহীন পানপাত্র বহনকারী চার দেয়ালের কোন অগ্নিমন্দির নয় এবং সে তার মনের ব্যথা আরোগ্যের জন্য যে বৃদ্ধ পুরোহিতের কাছে যেতে চায় তিনি সাদা পোশাক পরিহিত ,বারসামধারী অগ্নিকে নিয়ে কুসংস্কারপূর্ণ অনর্থক কর্মে লিপ্ত (জীবনের মূল্যবান সময়ক্ষেপণকারী) কোন যারথুষ্ট্র পুরোহিত নন ;বরং এই পুরোহিত একক আল্লাহর পথের যাত্রী ,আল্লাহর ওলী ও মানুষকে মহা সত্যের দিকে হেদায়েতকারী। তাঁরা ইসলামী শাসনামলে ইসলামের মহান মানবীয় উদ্দেশ্য ও ইরফানের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

তাই পুর দাউদ যে বৃদ্ধ পুরোহিতের কথা বলেছেন ইরানীরা সহস্র বছর পূর্বে তাঁদের ইরান হতে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। তাঁর বক্তব্য মতে কেউ তাঁদের নিকট পৌঁছতে অক্ষম। কথাটি ভুল এ অর্থে যে ,তাঁরা ইরানীদের নিকট পৌঁছতে সক্ষম নন। তবে অন্য কেউ তাঁদের নিকট পৌঁছতে অক্ষম হলেও পুর দাউদ যে তাঁদের নিকট পৌঁছতে সক্ষম তা বোঝা যায়। এই পুরোহিতগণের পকেট বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় নির্যাতিত মানুষের অর্থে (যা ইংরেজগণ তাঁদের সঙ্গে হাত মিলানোর কারণে দিত) পূর্ণ হয়েছে। তাঁরা মর্যাদাশীল ইরানী জাতিকে পেছন হতে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টায় রত হয়েছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন ইরানী জাতিকে পুনরায় তাঁদের প্রাচীন ক্ষয়প্রাপ্ত শেকল দিয়ে বাঁধতে যা অগ্নিধারক ,বারসাম ,বারসামচিন ,হুমে ও অন্যান্য কুসংস্কার দ্বারা প্রস্তুত।

দুঃখজনকভাবে ড. মুঈন তাঁর এ গ্রন্থ রচনায় পুর দাউদের চিন্তা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন যদিও তার জীবনের শেষদিকে দেয়া তাঁর কিছু সাক্ষাৎকারে তাঁকে ইসলামের মৌলনীতি ও কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি বলে মনে হয়েছে। তদুপরি কেন তিনি তাঁর উদ্দেশ্য হতে পশ্চাদ্ধাবন করেছেন ও ইসলামের উৎস হতে যারথুষ্ট্র ধর্মের আচারকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়।

উদাহরণস্বরূপ তিনি তাঁর গ্রন্থের 76 পৃষ্ঠায় যারথুষ্ট্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহের জবাব দিতে গিয়ে বলেছেন ,

কোন কোন ইতিহাসবিদ যেমন হুশানগের মতে যারথুষ্ট্র রুস্তম ,যাল ও ইসফানদিয়ায়ের মত এক কাল্পনিক অস্তিত্ব ,কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে নবী ও ধর্মীয় পুরোধাদের প্রত্যেকের অস্তিত্বের বিষয়ে মনীষিগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন।

অতঃপর টীকায় উল্লেখ করেছেন , এমনকি হযরত ঈসা ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কেও।

অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় ,কেউ যারথুষ্ট্রের ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে রাসূল (সা.)-এর অস্তিত্বের সাথে তুলনা করেন। একজন বিশেষজ্ঞের যারদুশত সম্পর্কে মতকে ইসলামের কোন শত্রু কর্তৃক রাসূল সম্পর্কে মন্তব্যের সাথে তুলনা সত্যিই আশ্চর্যের।

তিনি তাঁর গ্রন্থের 273 পৃষ্ঠায় অগ্নির পবিত্র হওয়া বিষয়ক আলোচনায় বলেছেন , আর্য ধর্মসমূহ ,যেমন ব্রাহ্মণ ধর্ম ,যারথুষ্ট্র এবং সামী ধর্মসমূহ ,যেমন ইহুদী ,খ্রিষ্টান ও ইসলাম ,এমনকি আফ্রিকার মূর্তিপূজকদের মধ্যেও অগ্নি বিশেষ গুরত্ব রাখে।

আমার নিকট বোধগম্য নয় ,বংশ পরম্পরায় মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং ঐশী গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করে তিনি কিরূপে এমন মন্তব্য করলেন ? ইসলামের কোথায় তিনি অগ্নির প্রতি মর্যাদা প্রদর্শনের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন ? কোরআনে যা এসেছে তা হল জ্বিন ও শয়তান আগুন হতে তৈরি হয়েছে এবং মানুষ সৃষ্টি হয়েছে মাটি হতে।

মাটির মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভে সক্ষম হলে অগ্নির শয়তান তাঁর রহমত থেকে বিতাড়িত হয়।

415 পৃষ্ঠায় ফার ইযাদি সম্পর্কে আলোচনায় বলেছেন ,

যামইয়াদিশতের বর্ণনা মতে ,ফার ইযাদির (অগ্নির ফেরেশতা)ই জ্যোতি তা যার ওপর আপতিত হয় সে সবার ওপরে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। এই জ্যোতির প্রভাবেই কেউ সম্রাট হন ,সিংহাসন ও রাজমুকুট পরিধান করেন ,সব সময় জয়ী ও সমৃদ্ধ থাকেন ,ন্যায়বান হন। এই জ্যোতির শক্তিতেই কেউ আত্মিক পূর্ণতা লাভ করেন এবং খোদার পক্ষ থেকে নবী হিসেবে মনোনীত হন।

420 পৃষ্ঠায় বলেছেন ,

আভেস্তার বর্ণনানুযায়ী (যামইয়াদিশত ,ধারা: 33 ও 40) তারা ফার কে পাখি ও ঈগলের মত বলে মনে করত।

415 পৃষ্ঠায় এ অন্ধবিশ্বাসকে বুদ্ধিবৃত্তিক হিসেবে দেখানোর উদ্দেশ্যে কোরআনের সুলতান শব্দকে ফার শব্দের সমার্থক বলা হয়েছে অথচ সুলতান শব্দটি কখনোই এই কুসংস্কারপূর্ণ ধারণার সমার্থক নয়। সুলতান কোরআনে কখনো শক্তি ও ক্ষমতা অর্থে ,কখনো ক্ষমতার উৎস ,কখনও হুজ্জাত ও প্রমাণ অর্থে ,কখনো সুলতান মানুষের ওপর শয়তানের আধিপত্য অর্থেও এসেছে। যেমনاِنّما سلْطانُهُ على الّذين يَتَولَّونَهُ তার আধিপত্য তো তাদের ওপরই চলে ,যারা তাকে বন্ধু মনে করে এবং অংশীদার মানে। 134 কখনও কোন বিশেষ কর্মের ওপর মানুষের প্রভাব ও ক্ষমতা অর্থে এসেছে। যেমন:و من قُتل مظلوما فقد جعلنا لوليّه سلطانا যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয় ,আমি তার উত্তরাধিকারীকে এ ক্ষেত্রে ক্ষমতা দিয়েছি। 135 এ অর্থের সাথে ইযাদির জ্যোতির কোন সম্পর্ক নেই যা কোন ব্যক্তির অন্তরে পতিত হওয়ার ফলে সম্রাট বা নবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জিত হয় এবং কখনও ভেড়া ,হরিণশাবক বা ঈগলের আকৃতি ধারণ করে এমন অস্তিত্ব ইসলামে নেই।

ডক্টর মুঈনের জন্য এটিই কি উত্তম ছিল না যে ,তিনি মাযদা ইয়াসনা ওয়া আদাবে পার্সী লিখেই ক্ষান্ত হবেন এবং মাসদা ইয়াসনা ওয়া আদাবে কোরআনী নিয়ে কিছু লিখার চেষ্টা করবেন না ?

ডক্টর মুঈন প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন যারদুশত শুধু চেয়েছেন অগ্নিকে কেবলা করতে ,কিন্তু এর উপাসনায় উৎসাহিত করতে চান নি। যেমনটি কাবা মুসলমানদের নিকট কেবলা হিসেবে পরিগণিত ,অথচ যে কেউ এমনকি স্বয়ং তিনিও জানেন মুসলমানগণ নামাজের জন্য যখন কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ান তখন কাবাকে সম্মান প্রদর্শন করা বা কাবা হতে শক্তি অর্জন করা বা ঐশী শক্তির অধিকারী হিসেবে তার সাহায্য কামনা কখনই তাদের লক্ষ্য নয় এবং তারা এরূপ বিশ্বাসও করে না ।

একজন মুসলমান নামাজের সময় সরাসরি আল্লাহর উদ্দেশে কথা বলেإياّك نَعْبُدُ و إياك نسْتعين একমাত্র আপনার ইবাদত করি ও আপনার কাছেই সাহায্য চাই। মুসলমানদের নিকট কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো ,ওযু করা ,পবিত্র কাপড় পরিধান ও সতর ঢাকার ন্যায়ই একটি বিষয়। অর্থাৎ এটি নামাজের নিয়ম (আদাব) ;নামাজের উদ্দেশ্য নয়। অথচ যারথুষ্ট্রগণ খোদ অগ্নির ঐশী প্রভাব রয়েছে বলে বিশ্বাস করে ইবাদাতের মাধ্যমে তার পবিত্রতা ও সম্মান ঘোষণা করে থাকে।

এর থেকেও দুঃখজনক ,তিনি তাঁর গ্রন্থের পুরোহিতগণের শরাব নামক অধ্যায়ে পুর দাউদের অনুকরণে ইরানী কবিদের কবিতায় পুরোহিত ,শরাব ও এরূপ শব্দের ব্যবহারকে তাঁদের যারথুষ্ট্র আচার-নীতির প্রতি ভক্তি হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। এ অধ্যায়ের শেষে হাতেফ ইসফাহানির অস্তিত্বের একতা (ওয়াহ্দাতে উজুদ) সম্পর্কিত একটি কবিতার পঙ্ক্তিমালা আনা হয়েছে যার প্রথম হলো এরূপ :

হে যার জন্য আমার জীবন ও অন্তর উৎসর্গীকৃত

যার পথে আমার এ দু সত্তা নিবেদিত।

ডক্টর মুঈনের কাছে এ কবিতার যে অংশগুলো তাঁর (কবির) ইরানের প্রাচীন রীতির প্রতি ভালবাসার নিদর্শন বলে মনে হয়েছে সেগুলোকে গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করেছেন। যেমন এই বাক্যটি আমি এ মুসলমান হওয়ায় লজ্জিত

ডক্টর মুঈন ভালভাবেই জানেন ,ইরফান ও সূফীধারার কবিগণ বাহ্যিক ধার্মিকতা ও মুসলমানিত্বের প্রকাশকে বিশেষ পরিভাষায় উপস্থাপন করে থাকেন। যেখানেই দুনিয়াত্যাগ বা কখনও কখনও মুসলমানিত্বকে তিরস্কার করেছেন সেখানেই এর উদ্দেশ্য মিথ্যা মুসলমানিত্ব ও দুনিয়াবিমুখতা। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে মুসলমানিত্ব ও দুনিয়াবিমুখতার ভান করাকে তাঁরা নিন্দা করেছেন যা প্রকৃত ইসলাম ও মুসলমানিত্বের অন্তরায় ,এমনকি যে সকল বড় আলেম ইজতিহাদের পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন এবং শরীয়তের মসনদে আরোহণ করে ফতোয়া দিতেন ,যেমন শেখ বাহায়ী136 (তিনি আরব তবে হিজরত করে ইরানে বসবাস শুরু করেন)।

হাজী মোল্লা মুহাম্মদ নারাকী137 ,মির্জা মোহাম্মদ তাকী সিরাজী ,হাজী মির্জা হাবিব রাযাভী খোরাসানী ,শেখ মুহাম্মদ হুসাইন ইসফাহানী এবং আল্লামা তাবাতাবায়ীর লেখাতেও এরূপ পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। তাই এ সকল কবিতা হতে কিরূপে পুর দাউদ ও ড. মুঈনের দাবি প্রমাণিত হয় ?

এমনকি কবি হাতেফ ইসফাহানীর যে কবিতা হতে ডক্টর মুঈন এরূপ যুক্তি দিয়েছেন তারই পঙ্ক্তিমালায় কবি উল্লেখ করেছেন ,এরূপ শব্দের ইরফানী বা আধ্যাত্মিক অর্থ ভিন্ন এবং এর বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা যাবে না। তিনি বলেছেন ,

হাতেফ! মারেফাতের পীরদের কখনও মাতাল হুশিয়ার বলা হয়েছে

যেন দফ ,বীণা ,শরাব ,পেয়ালা তাঁদের শরাবখানায় সাজানো রয়েছে।

জেনে রাখ ,নর্তকী ,সাকীর মধ্যে নিহিত রয়েছে রহস্য ও হেতু

ইশারায় তাঁরা বলতে চান যেন ভিন্ন কিছু।

এরূপ স্পষ্ট ব্যাখ্যা দান করার পরও আমরা কিরূপে এগুলোর বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করতে পারি ?

তদুপরি এই রূপক শব্দগুলো যারথুষ্ট্র পরিভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত মেই (বিশেষ মদ) ,মাগ (পুরোহিত) ও অগ্নিমন্দির শব্দগুলোর মধ্যেই সীমিত নয়। যদি তা হতো তবে আমরা বলতে পারতাম কেন ইরানী আরেফ ও সুফিগণ ইরফানী পরিভাষায় শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন ? যেহেতু তা নয় সেহেতু কি করে এগুলো তাঁদের প্রাচীন ধর্ম প্রীতির চিহ্ন হতে পারে ?

এ কবিগণ মূর্তি ,পাদ্রী ,মঠ ,ক্রশ ,দাবার গুটি ,জুয়ারী প্রভৃতি শব্দ ও পরিভাষা তাঁদের কবিতায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন। সুতরাং এগুলো তাঁদের মূর্তিপূজা ,খ্রিষ্টবাদ ও জুয়া খেলার প্রতি আসক্তির চিহ্ন বলতে হবে। কয়েক বছর পূর্বে একজন লেখক এমন চিন্তার ফাঁদে পড়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন ,হাফিযের নিম্নোক্ত প্রসিদ্ধ গজলটি তাঁর তীব্র জাতীয় চেতনার প্রমাণ। তিনি এর মাধ্যমে অতীতের স্মরণ করেছেন। যখন ইরানে ইসলামের আগমন ঘটেনি এবং পাহলভী ভাষা ইরানের রাষ্ট্রীয় ভাষা ও যারথুষ্ট্র ধর্ম রাষ্ট্রীয় ধর্ম ছিল তখনকার কথা তিনি বলেছেন। গজলটি এভাবে শুরু হয়েছে :

বুলবুলি সারভের138 ডালে বসে পাহলভীতে গাইছে

যেন আধ্যাত্মিকতার শিক্ষাই সে দিচ্ছে।

কবি এ কথার মাধ্যমে ইসলামপূর্ব ইরানের ধর্ম ও আচার-আচরণের প্রতি তাঁর ভালবাসার কথাই বলেছেন।

বস্তুবাদী চিন্তার লেখক ডক্টর আরানী তাঁর আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুবাদী নীতি শীর্ষক প্রবন্ধে এর জবাবে বলেছিলেন , যদি এমনটিই হয়ে থাকে তবে এর পরবর্তী কবিতায় যেখানে বলেছেন :

অগ্নির সন্ধানে গিয়ে মূসা পেলেন সর্বোত্তম ধ্বনি

শুনতে পেলেন বৃক্ষ হতে তাওহীদের বাণী -তা হাফিযের ইহুদীপ্রীতির আলামত।

আর এই গজলেই তিনি বলেছেন ,

এক আজব গল্প শোন এ ভাগ্য বিড়ম্বিত

থেকে ,ঈসায়ীদের বন্ধুত্বের কারণে তারা মোদের হত্যা করত।

এটিও তাঁর খ্রিষ্টপ্রীতির সাক্ষ্য বহন করে বলতে হবে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় ,এ সকল শব্দের ইরফানী অর্থ রয়েছে এবং তা বক্তার বিশেষ কোন ধর্মের ,যেমন খ্রিষ্টান ,ইহুদী বা যারথুষ্ট্রের প্রতি অনুরাগের প্রমাণ হতে পারে না। ইরফানী ধারার প্রসিদ্ধ কবি শামসুদ্দীন মাগরেবী (মৃত্যু নবম হিজরী শতাব্দী) এ ধরনের পরিভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতেন। তিনি তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন ,

লক্ষ্য কর এ সকল গজল ও কবিতায়

মাতাল ,মদ বিক্রেতা আর শুঁড়িখানার বিষয়-

মূর্তি ,ক্রস ,কটিবন্ধ ,জিকির ও তাসবীহ্ ,

সন্ন্যাসী-মঠ ,অগ্নিপূজক ,পাদ্রী আর ইহুদী

শরাব ,রূপসী ,মুসল্লির শয়ন কক্ষ আর বারান্দায়

জ্বলে প্রদীপ ,বীণা বাজে ,মাতালরা গান গায়।

প্রতিদ্বন্দ্বী ,সাকী ,জুয়াড়ী ,মুনাজাত

অরগানের সুর আর বাঁশীর আর্তনাদ।

মদ ,মদের দোকান ,মদ্যপায়ীদের আসর

পেয়ালার পর পেয়ালা পানে সকলে বিভোর।

পূর্ণ কর মদের পিপা ও শুঁড়িখানার পেয়ালা

শুরু হয়েছে শরাব পানের প্রতিযোগিতার পালা।

মসজিদ হতে পানশালার দিকে ধাবিত হওয়া

সেখানে কিছুক্ষণ শান্তি করে বিশ্রাম নেয়া।

নিজ পেয়ালাকে বন্ধক রেখে অপেক্ষা করা

দেহ-প্রাণ সবই মদের পায়ে উৎসর্গ করা।

পুষ্পোদ্যানে বসে মল্লিকার জন্য দিন গোনা

শিশির ,বৃষ্টি আর তুষারের কথা শোনা।

দেহের গড়ন ,উচ্চতা ,ভাঁজ ,ভ্রু ,তিলক

চেহারা ,মুখমণ্ডল ,বেণী ,গণ্ডদেশ ও চিবুক।

অধর ,চঞ্চল চোখ ,মাতাল নেশা

মাথা ,হাত ,পাঞ্জা ,পা আর মধ্যভাগ।

সাবধান! উত্তেজিত হয়ো না ,এ সব কথা থেকে

জেনে নাও এ সবের অর্থ জ্ঞানীদের হতে।

পরিভাষার বাহ্যিক অর্থে নিজেকে ফেল না গুলিয়ে

জ্ঞানীরা ইশারায় যা বোঝেন তার সাথে নাও মিলিয়ে।

যদি দৃষ্টিকে কর সুন্দর সবই সুন্দর লাগবে

খোসাকে অতিক্রম করে তার শাঁস দেখবে।

যদি না পার ফিরিয়ে রাখতে দৃষ্টি বাহ্যিকতা থেকে

কভু পারবে না তুমি রহস্যের অধিপতি হতে।

এর প্রতিটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে প্রাণ ,

প্রতিটি শব্দ যেন এক বিশ্ব ও জাহান।

দেহকে অতিক্রম করে প্রাণকে বোঝ ,

শব্দকে ভুলে গিয়ে নামকরণের রহস্য খোঁজ।

মুহূর্তকে নষ্ট না করে হও এর উপযোগী

যাতে হতে পার মহাসত্যের সহযোগী।

এ ছাড়া এরূপ পরিভাষা ফার্র্সীভাষী ইরানীদের বক্তব্যই শুধু নয় ,ভারতীয় ফার্সীভাষী ,আরবগণ ও আরবীভাষী আরেফগণের বক্তব্যেও লক্ষণীয়। যেমন মিশরীয় সুফী ইবনুল ফারেয মিসরী ও স্পেনীয় সুফী মুহিউদ্দীন আরাবী আন্দালুসীর বক্তব্যের পরিভাষা। তাই কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তিই এ কথা বলতে পারেন না ,তাঁদের ব্যবহৃত শরাব ও এ জাতীয় পরিভাষা তাঁদের যারথুষ্ট্র মতবাদের প্রতি আসক্তির কারণে ছিল।

তদুপরি ঐশী জ্ঞান লাভ ,ইলহাম অর্জন ,আধ্যাত্মিক দূরদৃষ্টি ও খোদায়ী দিকনির্দেশনার মাধ্যমে অন্তর আলোকিত হওয়ার ফলে আন্তরিক পরিতৃপ্তি লাভকে কোরআন ও নাহজুল বালাগায় কোথাও কোথাও শরাব বলে উল্লিখিত হয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সূরা দাহারের 21 নং আয়াতে বলা হয়েছে :

) و سقاهم ربّهم شرابا طهورا(

এবং তাদের পালনকর্তা তাদের পান করাবেন শরাবান তাহুরা মুফাসসিরগণের মতে যদিও এর বাহ্যিক অর্থ অত্যন্ত পবিত্র পানীয় বা শরাব ,তদুপরি এর প্রকৃত অর্থ হলো এমন কিছু তাদের দেয়া হবে যা সব কিছু থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত করবে। নাহজুল বালাগাতেও ঐশী ব্যক্তিত্বদের এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

و يغبقون كأس الحكمة بعد الصّبوح

সকালের শরাবের পর তাদের রাতের প্রজ্ঞার শরার পান করানো হয়। শাব্দিক অর্থেغبوق হলো রাতের শরাব এবংصبوح অর্থ সকালের শরাব। ডক্টর মুঈন এ ক্ষেত্রে কি বলবেন ? এ ক্ষেত্রেও কি বলা হবে বক্তাগণ যারথুষ্ট্র পুরোহিতগণের শরাবেরই আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন এবং এটি যারথুষ্ট্র আচার-নীতির প্রতি তাঁদের আসক্তির প্রমাণ ?

ডক্টর মুঈন তাঁর গ্রন্থের 13 পৃষ্ঠায় ঔদ্ধত্য সহকারে সার্জন ম্যালকমের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন , আরব নবীর অনুসারীরা ইরানের শহরগুলোকে ধূলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেয় ,অগ্নিমন্দিরগুলোকে জ্বালিয়ে দেয় ,যারথুষ্ট্র ধর্মযাজকদের হত্যা করে ,গ্রন্থসমূহ ও এর সংরক্ষকদের নিশ্চিহ্ন করে ,পুরোহিতদের যাদুকর বলে অভিহিত করে ও তাঁদের রক্ষিত গ্রন্থগুলোকে যাদুর গ্রন্থ বলে প্রচার করেন।

ডক্টর মুঈন স্যার জন ম্যালকম অপেক্ষা ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে অধিকতর অবগত এবং তিনি ভালভাবেই জানেন এ কথাগুলো সার্জন ম্যালকমের নিজস্ব কথা এবং এগুলোর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। দুঃখের বিষয় তদুপরি তিনি ইরান ও ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে অনবহিত যুবকদের ইসলামের প্রতি বিদ্বেষী করে তোলার লক্ষ্যে এরূপ ব্যক্তির নিকট থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

ডক্টর মুঈন তাঁর গ্রন্থের 22 পৃষ্ঠায় মুসলিম শাসনাধীনে যারথুষ্ট্রদের নির্যাতিত দেখানোর উদ্দেশ্যে বলেছেন ,

যে সকল মানুষ মাসদা ইয়াসনা ধর্মের ওপর বিদ্যমান থেকে এ দেশে বসবাস করত তাদেরকে বিজয়ী জাতি ও তাদের এ দেশীয় অনুসারীদের অনাকাক্সিক্ষত ও রুঢ় আচরণের শিকার হতে হয়েছিল। তারা সর্বদা তিরস্কার ,অপমান ও চাপের মুখে পিতৃধর্মকে গোপন করতে বাধ্য হতো। তাদের ধর্মীয় আচার-বিধি পালনের কোন স্বাধীনতা ছিল না। তাদেরকে তিক্ত সময় অতিবাহিত করতে হয়েছিল। তারিখে সিস্তান গ্রন্থের লেখক বলেছেন , যিয়াদ বিন আবিহ্ সিস্তান হতে রাবীকে অপসারণ করে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবি বাকরাহকে প্রেরণ করেন (51 হিজরী) ও নির্দেশ দেন সেখানে পৌঁছে সকল যারথুষ্ট্র পুরোহিতকে হত্যা করার ও তাদের অগ্নিমন্দিরগুলোকে জ্বালিয়ে দেবার। তিনি সেখানে পৌঁছলে সিস্তানের পুরোহিত ও সম্ভ্রান্তরা তাঁর বিরোধিতার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ডক্টর মুঈন সেখানে ঘটনাটির এ পর্যন্তই বর্ণনা করেছেন। এর উপসংহার টানেন নি। যারথুষ্ট্রগণ ধর্মীয় আচার পালনে স্বাধীন ছিল না ও তাদের পিতৃধর্মীয় বিশ্বাস গোপনে বাধ্য হতো তার সপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপনের লক্ষ্যে তিনি এ উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

তিনি তাঁর গ্রন্থের অপর একটি স্থানে (463 পৃষ্ঠায়) এ ঘটনার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করে বলেছেন ,সিস্তানের মুসলমানগণ এ নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ও বলে এটি নবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের নীতি বিরোধী ও ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। বিষয়টি সিরিয়ায় অবস্থানরত খলীফার নিকট জানানো হলে উত্তর আসে যারথুষ্ট্রগণ মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। তাই তাদের রক্ত ও সম্পদ সম্মানিত (পবিত্র) এবং কেউ তা হরণের অধিকার রাখে না।

ডক্টর মুঈন তাঁর গ্রন্থের অন্যত্র (27 পৃষ্ঠায়) সিস্তানের এ ইতিহাসই বর্ণনা করে বলেছেন ,46 হিজরীতে (অর্থাৎ এ ঘটনার পাঁচ বছর পূর্বে) রাবী যখন সিস্তানে আসেন তখন এর অধিবাসীদের সঙ্গে সদাচারণের নীতি গ্রহণ করেন ও মুসলমানদের কোরআন ,তাফসীর ও জ্ঞান শিক্ষায় বাধ্য করেন এবং ন্যায়বিচার কায়েম করেন। অনেক যারথুষ্ট্র তাঁর আচরণে প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়।

হ্যাঁ ,বাস্তবে খোলাফায়ে রাশেদীন ও মুয়াবিয়ার আমলে রাবীয়ুল হারেসীর অধীনস্থ এলাকায় যারথুষ্ট্রদের অবস্থা এরূপই ছিল। তাই যখন যিয়াদ ইবনে আবিহ্ অত্যাচারের পথ গ্রহণ করে মুসলমানদের প্রতিবাদের মুখোমুখি হয় তখন তিনি মুয়াবিয়ার ন্যায় অত্যাচারী শাসক ও তাঁর গভর্ণরের বিপরীতে সাধারণ মুসলমানদের সমর্থনে পত্র পাঠান।

তাই ইতিহাস হতে খণ্ডিত কিছু অংশ উদ্ধৃত করার মাধ্যমে যারথুষ্ট্ররা ধর্মবিশ্বাসকে গোপন রাখতে বাধ্য হয়েছিল প্রচার করে এর জন্য ক্রন্দনের কি প্রয়োজন ?

আমরা উমাইয়্যাদের অত্যাচার-নির্যাতনকে অস্বীকার করছি না ,কিন্তু তা সাসানী সম্রাটদের অত্যাচার ও নির্যাতনের তুলনায় কিছুই নয়। দ্বিতীয়ত উমাইয়্যাগণ তাদের তরবারীর ধারালো অংশটি হযরত আলী (আ.)-এর বংশধর ও অনুসারীদের প্রতিই উত্তোলন করে রেখেছিল। কারণ তাঁদের নিজ ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত। সুতরাং অবশ্যই যারথুষ্ট্ররা নবীর আহলে বাইত অপেক্ষা অনেক ভাল অবস্থায় ছিল।

অবশ্য উমাইয়্যাদের রাজনীতি জাতিভিত্তিক ছিল বিধায় তাদের শাসন ব্যবস্থা ছিল আরবীয় ;ইসলামী নয়। তাই তারা আরব-অনারবের মধ্যে পার্থক্য করত ,এমনকি তারা একজন আরব ও অনারব মুসলমানের মধ্যে পার্থক্যের নীতি গ্রহণ করেছিল। অর্থাৎ ধর্ম কোন বিষয়ই ছিল না। তাই যারথুষ্ট্ররা ইসলামী রাষ্ট্রে জিম্মীর সাধারণ শর্তানুসারে পূর্ণ নিরাপত্তাসহই জীবন যাপন করত।

যারথুষ্ট্ররা আব্বাসীয় শাসনামলে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। তারা আহলে বাইতের ইমাম ও মুসলিম আলেমগণের সঙ্গে ইসলাম ও যারথুষ্ট্র ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে বিতর্ক করত। এই গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে আমরা উল্লেখ করেছি যে ,যারথুষ্ট্র ধর্ম হতে অধিকাংশ ইরানীদের ইসলামে প্রবেশ ও অগ্নিমন্দিরসমূহ ধ্বংস করে মসজিদ প্রতিষ্ঠা আরবদের শাসনামলের অবসানের পর ইরানী আর্য শাসনামলেই ঘটেছিল। কয়েক জন মধ্যপ্রাচ্যবিদের রচিত গ্রন্থ তামাদ্দুনে ইরানী তে পি. জে. দুমানাশেহ যারথুষ্ট্র ধর্মের প্রতিরোধ ও অনুবর্তন নামক নিবন্ধে বলেছেন ,

আরবদের হাতে সাসানী সাম্রাজ্যের পতন ও পরাজয় ইরানী মানসিকতার হৃৎস্পন্দনকে স্তব্ধ করতে পারে নি এবং যারথুষ্ট্র ধর্মও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয় নি ;বরং ইরানীরা প্রশিক্ষিত ও পরিশোধিত এক সভ্যতা ইসলামের হাতে তুলে দিয়েছিল এবং ইসলাম ধর্ম এতে নতুন জীবন সঞ্চার করেছিল।

...ইরান এক দফায় মুসলমান হয় নি এবং এর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ একসঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করে নি। যারথুষ্ট্র ধর্ম এর বিপরীতে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তা উপেক্ষা করার মত নয়।

পি.জে. দুমানাশেহ বলেন , মুসলমানরা মাজুসীদের আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করত। তিনি বলেন ,

আরব ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদগণ (এ বিষয়ে আমাদের প্রধান উৎস) উল্লেখ করেছেন তৃতীয় ও চতুর্থ হিজরী পর্যন্ত ইরানের বিভিন্ন শহরে অগ্নিমন্দিরসমূহ ছিল । যদি অগ্নিমন্দিরসমূহ থেকে থাকে তাহলে নিশ্চিতভাবেই সেখানে যারথুষ্ট্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য পুরোহিতগণ ছিলেন ও তাঁরা এ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখতেন। তা ছাড়া যারথুষ্ট্রদের জীবনধারা অনুযায়ী অবশ্যই ধর্মীয় বিধিবিধান ও মৌলনীতি শিক্ষা দেয়ার জন্য মধ্যম পর্যায়ের শিক্ষিত লোকগণ উপস্থিত ছিলেন। সুতরাং যারথুষ্ট্র ধর্মে শ্রেণীবিভেদ বিদ্যমান ছিল ও এই শ্রেণী বৈষম্যের বিষয়টি সংখ্যালঘু যারথুষ্ট্রদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করত যে ,এ দু ধর্মের কোন্টি গ্রহণ করবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যারথুষ্ট্র পণ্ডিতগণ জ্ঞানগত সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। 139

সমাজ ব্যবস্থা

ইরানে ইসলামের প্রভাব ও অবদানকে মূল্যায়নের জন্য যে সমাজ ব্যবস্থাকে ইসলাম পরিবর্তিত করে নতুন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে তার পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

সাসানী আমলের ইরান শ্রেণীবিভক্ত সমাজ ছিল। শ্রেণীভেদের বিষয়টি কঠোরভাবে সেখানে আরোপিত হতো। অবশ্য শ্রেণীবিভক্ত সমাজ সাসানীদের উদ্ভূত বিষয় নয় ;বরং হাখামানেশী ও আশকানী আমলেও তা বিদ্যমান ছিল। তবে সাসানীরা তা নবায়ন ও শক্তিশালী করেছিল।

মাসউদী তাঁর মুরুজুয যাহাব গ্রন্থের 152 পৃষ্ঠায় বলেছেন , আরদ্শির ইবনে বাবাক সাসানী জনসাধারণকে সাতটি শ্রেণীতে ভাগ করেছিলেন।

তিনি তাঁর তাম্বীহ্ ওয়াল আশরাফ গ্রন্থের 76 পৃষ্ঠায় লিখেছেন ,

তাই কাভে যিনি একজন সাধারণ কামার ছিলেন তাঁর পোশাককে পতাকা ও ব্যানার হিসেবে ব্যবহার করে অত্যাচারী সম্রাট জাহাকের পতন ঘটাতে পেরেছিলেন। আরদ্শির তাঁর এক প্রসিদ্ধ বক্তব্যে তাঁর পরবর্তী সম্রাটদের সাধারণ ও নিম্নশ্রেণীর পক্ষ হতে বিপদের আশঙ্কা থেকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।

কামিলে ইবনে আসিরে এসেছে :

যখন মুসলমান ও পারস্যের (ইরানের) বাহিনী কাদেসিয়ায় পরস্পরের মুখোমুখি হলো তখন পারস্য সেনাপতি ফারাখযাদ মুসলিম সেনাদলের অগ্রগামী দলের নেতা যিনি প্রাথমিক সেনাদল নিয়ে সেখানে ক্যাম্প করেছিলেন তাঁকে ডেকে পাঠান। তাঁর এ কর্মের উদ্দেশ্য ছিল সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির ফয়সালা করা যাতে যুদ্ধের বিষয়টি অবধারিত না হয়। তিনি অগ্রদলের সেনাপতি যোহরা ইবনে আবদুল্লাহ্কে বলেন , তোমরা আবররা আমাদের প্রতিবেশী এবং আমরা তোমাদের প্রতি সদাচরণ করেছি ,শত্রু হতে রক্ষা করেছি ইত্যাদি ইত্যাদি। যোহরা ইবনে আবদুল্লাহ্ বললেন , তুমি যে আরবদের কথা বলছ তার সঙ্গে আমাদের অনেক পার্থক্য হয়ে গেছে। তাদের উদ্দেশ্যের সঙ্গেও আমাদের উদ্দেশ্যের ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। তারা দুনিয়ার উদ্দেশ্যে তোমাদের ভূমিতে পদার্পণ করত। আর আমরা আখেরাতের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি। তুমি যা বলেছ আমরা সেরূপই ছিলাম ,তবে আল্লাহ্ আমাদের মধ্য হতে একজনকে নবী হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং আমরা তাঁর আহ্বানকে গ্রহণ করেছি। তিনি আমাদের নিশ্চিত করেছেন ,যে এ ধর্ম গ্রহণ না করবে সে হীন ও লাঞ্ছিত হবে এবং যে তা গ্রহণ করবে সে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করবে। রুস্তম বলেন , তোমাদের ধর্মকে আমার নিকট বর্ণনা কর। যোহরা বলেন , আমাদের ধর্মের ভিত্তি হলো আল্লাহর একত্ব ও রাসূলের নবুওয়াতের স্বীকারোক্তি। রুস্তম বলেন , সুন্দর! তাতে আর কি রয়েছে ? যোহরা বললেন , আল্লাহর বান্দাদের মানুষের দাসত্ব হতে মুক্তি দেয়া যাতে তারা আল্লাহর বান্দা হয় ,মানুষের বান্দা নয়। তিনি বললেন , আর কি ? যোহরা বললেন , সকল মানুষ এক পিতা-মাতা (আদম ও হাওয়া) হতে সৃষ্ট হয়েছে এবং তারা সকলেই সমান। তিনি বললেন , এও সুন্দর! অতঃপর রুস্তম বললেন , যদি এগুলো মেনে নিই তাহলে তোমরা কি করবে ? ফিরে যেতে রাজী আছ ? যোহরা বললেন , আল্লাহর শপথ ,অবশ্যই এবং ব্যবসার প্রয়োজন ব্যতিরেকে তোমাদের শহরগুলোর নিকটবর্তী হওয়ারও প্রয়োজন পড়বে না। রুস্তম বললেন , তোমার কথাকে সত্যায়ন করছি ,কিন্তু দুঃখজনক হলো আরদ্শিরের সময়কাল হতে এ রীতি চালু হয়েছে ,নিম্ন শ্রেণীর লোকদের উচ্চ শ্রেণীর কাজ করতে দেয়া হবে না। কারণ যদি তারা নিজেদের পরিসরের বাইরে পা ফেলে তাহলে উচ্চ শ্রেণীর কর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। যোহরা ইবনে আবদুল্লাহ্ বললেন , সুতরাং সাধারণ মানুষদের জন্য আমরা সবার চেয়ে উত্তম। আমরা কখনই নিম্ন শ্রেণীর প্রতি এরূপ আচরণ করতে পারব না। আমরা নিম্ন শ্রেণীর ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী আমল করব যদি তারা আমাদের বিষয়ে তাঁর নির্দেশ পালন নাও করে। 140

পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিক ও বিশেষজ্ঞগণ গ্রীক ,রোমান ,সিরীয় ,আর্মেনীয় ও আরবী ভাষার ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়াও যেহেতু খনন কার্য হতে উদ্ঘাটিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাবলীও কাজে লাগিয়েছেন সেহেতু আরো উত্তমরূপে ইরানের শ্রেণীভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার প্রাচীনত্বকে অনুধাবনে সক্ষম হয়েছেন। ক্রিস্টেন সেন এ উৎসসমূহের সবগুলোকেই ব্যবহার করেছেন এবং সাসানী আমলের ইরান নিয়ে ত্রিশ বছর কাজ করেছেন। সম্ভবত অন্য কেউ এ বিষয়ে তাঁর সমকক্ষ নন। তিনি ইরানের শ্রেণীবিভক্ত সমাজ নিয়ে তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায় ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

ক্রিস্টেন সেন দাবি করেছেন ,মুসলিম ঐতিহাসিকগণ সাসানী আমলের উচ্চ শ্রেণীর যে বিভিন্ন নামকরণ করেছেন যেমন আল উযমা ,আহুলুল বুয়ুতাত আল আশরাফ তা যথাক্রমে পাহলভী ভাষার ওয়াসপুহ্রান , আযাযন এবং বুযুর্গান শব্দের অনুবাদ।

আমরা সাসানী আমলের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে ক্রিস্টেন সেন ও অন্যদের নিকট থেকে উদ্ধৃতি দেব। ক্রিস্টেন সেন তাঁর গ্রন্থের সপ্তম অধ্যায়ে মাযদাকী শীর্ষক আলোচনার ভূমিকায় ইরানের সামাজিক আইনের বিষয়ে বলেছেন ,

ইরানের সমাজ দু টি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। যথা: মালিকানা ও বংশ। তানসুরের পত্রানুযায়ী অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত বংশীয়দের থেকে নিম্ন শ্রেণীকে কঠোর আইন দ্বারা পৃথক করা হতো। তারা পোশাক ,বাহন ,বাসস্থান ,স্ত্রী ,সেবক ও বাগানের অধিকারী ছিল... তদুপরি বিভিন্ন শ্রেণী সামাজিকভাবে বিভিন্ন অবস্থান লাভ করেছিল এবং প্রত্যেকের জন্য স্বতন্ত্র স্থান নির্দিষ্ট ছিল। সাসানী আমলের কঠোর আইনের একটি হলো কেউ তার ওপরের পর্যায়ের কোন শ্রেণীর বলে দাবি করতে পারবে না।... রাষ্ট্রীয় আইন বংশসমূহের রক্তের বিশুদ্ধতা ও স্থাবর সম্পদের নিরাপত্তাকবচ ছিল। ফার্সনামা তে সম্ভবত সাসানী আমলের নামাগ আইন হতে বর্ণনা করা হয়েছে: পারস্য সাম্রাজ্যের নীতি ছিল তার পাশ্ববর্তী রোম ,তুরস্ক ,চীন ও ভারতের নারীদের বিবাহ করা যাবে ,কিন্তু তাদের নিকট কন্যা দান করা যাবে না। পারস্য নারীদের স্ববংশীয়দের সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। সম্ভ্রান্ত বংশীয়দের নাম বিশেষ দফতরে নথিবদ্ধ করা হতো ও রাষ্ট্র তার হেফাজত করত। সাধারণ লোকদের অভিজাতদের সম্পদ ক্রয়ের অধিকার ছিল না। এরূপ আইনসমূহের কারণে কোন কোন সম্ভ্রান্ত বংশ কয়েক প্রজন্ম পর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল... সাধারণ শ্রেণীর মাঝেও লক্ষণীয় পার্থক্য সৃষ্ট হতো। প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট অবস্থান ছিল এবং কেউ খোদাপ্রদত্ত ধারার বাইরে অন্য পেশায় নিয়োজিত হতে পারত না।

সাঈদ নাফিসী বলেছেন ,

ধর্মমতগত পার্থক্যের কথা বাদ দিলেও যে বিষয়টি মানুষের মধ্যে কপট চিন্তার জন্ম দিয়েছিল তা হলো সাসানীদের শ্রেণী বৈষম্যমূলক কঠোর নীতি যার মূল ইরানের প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে নিহিত ছিল। সাসানী আমলে তা আরো প্রকট করে তোলা হয়। প্রথম ধাপে সাতটি অভিজাত পরিবারের স্থান ছিল ,পরবর্তী ধাপে পাঁচটি বিশেষ পরিবারের অবস্থান নির্দিষ্ট ছিল। সাধারণ মানুষ এ দু গ্রুপের বিশেষ অধিকার হতে বঞ্চিত ছিল। মালিকানা প্রথম ধাপের সাত পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সাসানী সাম্রাজ্য একদিকে জাইহুন নদী হতে ককেশাস পর্বত ও ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত প্রসারিত ছিল ও সেখানে প্রায় 14 কোটি মানুষ বসবাস করত। যদি এই সাত পরিবারের (বংশের) প্রতিটির সদস্য সংখ্যা এক লক্ষ ধরে নিই তবে সম্পত্তির মালিকের সংখ্যা দাঁড়ায় সাত লক্ষ। যদি সৈনিক ,সীমান্ত রক্ষী ও কৃষকদের একাংশেরও মালিকানার অধিকার ছিল ধরে নিই তাহলেও তাদের সংখ্যা সাত লক্ষের অধিক ছিল না। তাই বলা যায় এ চৌদ্দ কোটি অধিবাসীর মধ্যে 14 লক্ষ লোক সম্পত্তির অধিকারী ছিল। বাকী সকলেই খোদাপ্রদত্ত এ অধিকার হতে বঞ্চিত ছিল। এ ক্ষেত্রে যে কোন নতুন ধর্ম এই বিশেষ সুবিধার অবসান ঘটিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠা করত ,কোটি কোটি বঞ্চিত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিত এবং শ্রেণী সুবিধার বিলুপ্তি ঘটাত সে ধর্মের প্রতি মানুষ উদ্দীপনা ও চরম আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে পড়ত।

ফেরদৌসীর শাহনামার সকল উৎস হলো ইরানী ও যারথুষ্ট্র চিন্তা। এতে একটি প্রসিদ্ধ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে যাতে স্পষ্টরূপে তৎকালীন শ্রেণীবিভক্ত ও শ্রেণী শৃংখলে আবদ্ধ সমাজের আশ্চর্য চিত্র ফুটে উঠেছে। তাতে দেখা যায় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার শুধু বিশেষ শ্রেণীর জন্য ছিল।

বর্ণিত হয়েছে রোম সম্রাট ও পারস্য অধিপতি অনুশিরওয়ানের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে রোম সম্রাট আনুশিরওয়ানের অধীনে শামাত অঞ্চলে সেনা অভিযান চালায়। ইরানী সেনাবাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইরানের কোষাগার শূন্য হয়ে পড়ে। অনুশিরওয়ান তাঁর পরামর্শদাতা বুজার জামহারের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যবসায়ীদের নিকট হতে ঋণ গ্রহণ করার। একদল ব্যবসায়ীকে দাওয়াত করা হলো যাঁদের মধ্যে একজন চামড়ার মোজা ব্যবসায়ীও ছিলেন। যেহেতু তিনি চর্মকার শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন সেহেতু নিম্ন শ্রেণীর বলে বিবেচিত ছিলেন। তিনি বললেন , আমি পূর্ণ ঋণ এক সাথে দিতে রাজী আছি যদি আমার একমাত্র শিশু সন্তানকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষকের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু এটি সে সময়ের নীতি বিরোধী হওয়ায় তাঁকে এ অনুমতি দেয়া হয়নি।

ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

এক শ্রেণী হতে অপর শ্রেণীতে উন্নীত হওয়া বৈধ ছিল ন। কিন্তু কখনও কখনও ব্যতিক্রম দেখা যেত। যখন প্রজা গোষ্ঠীর কোন এক সদস্য বিশেষ কোন যোগ্যতা বা শিল্প প্রতিভা প্রদর্শন করত তখন তা সম্রাটের নিকট উপস্থাপন করা হতো। অতঃপর পুরোহিতগণের পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যদি তাঁরা তাকে এর যোগ্য মনে করেন তবে সে ঐ শ্রেণীর সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার অনুমতি পেত।... শহরের অধিবাসীদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভাল ছিল যদিও তারা গ্রামের অধিবাসীদের মত মাথাপিছু কর প্রদান করত। কিন্তু তারা সামরিক কাজ হতে অব্যাহতি লাভ করত। তারা ব্যবসায় ও শিল্পের মাধ্যমে সম্পত্তির মালিক হতো ও সামাজিক অবস্থান লাভ করত। কিন্তু সাধারণ প্রজাদের অবস্থা বেশ শোচনীয় ছিল। তারা সারা জীবন এক স্থানে বসবাসে বাধ্য ছিল ও তাদের সামরিক বাহিনীতে বেকার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হতো। অমিউনুস মরসিলিনিউসের বর্ণনানুসারে গ্রামসমূহ হতে দলে দলে লোকেরা পদব্রজে সেনাদলে যোগ দিতে যেত যেন তারা চির দাসত্ব অর্জন করেছিল। কোন অবস্থাতেই তাদের পারিশ্রমিক বা পুরস্কার দেয়া হতো না।

... সম্ভ্রান্তদের অধীনে যে সকল প্রজা বাস করত তাদের অবস্থা সম্পর্কে তেমন কিছু তথ্য আমি পাই নি। অমিউনুসের মতে সম্ভ্রান্তগণ নিজেদের প্রজা ও দাসদের জীবনের মালিক বলে মনে করত। এ ক্ষেত্রে প্রজা ও দাসদের অবস্থার মধ্যে কোন পার্থক্যই ছিল না।... এতদ্সত্ত্বেও যারথুষ্ট্র ধর্মে কৃষি কাজের প্রতি খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে তাদের ধর্মগ্রন্থসমূহ বাড়াবাড়িও করেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই কৃষকদের অধিকার-আইন যথার্থ দৃষ্টি নিয়ে প্রণীত হয়েছিল। আভেস্তার কয়েকটি খণ্ড ও অধ্যায়ে এ সম্পর্কিত বিধান বর্ণিত হয়েছে। 141

তিনি আরো বলেন ,

ইরানের সমাজ সম্পর্কে প্রাচীন গ্রন্থের উৎসসমূহে যে সকল তথ্য পাওয়া যায় যদিও তা অসম্পূর্ণ ও বিক্ষিপ্ত ,তদুপরি তা আমাদের এমন এক সমাজের সঙ্গে পরিচিত করায় যার অভ্যন্তরীণ দৃঢ়তা ও সত্তাগত শক্তি অভিজাতদের মধ্যে বিদ্যমান প্রাচীন ও অবিচ্ছেদ্য গভীর সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। রক্ত ,বংশ ও সম্পদের সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আইন তৈরি করা হয়েছিল এবং এ পন্থায় শ্রেণীশ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্যের বিষয়টি সর্বোত্তমভাবে রক্ষার চেষ্টা করেছিল...। 142

ক্রিস্টেন সেন তাঁর গ্রন্থের অষ্টম অধ্যায়ে তৎকালীন সমাজে বিদ্যমান শ্রেণীগত কঠোর শোষণের চিত্র ও উদাহরণ তুলে ধরেছেন। দ্য মযিল প্রাচীন ইরানের সামাজিক শ্রেণীসমূহ শিরোনামের প্রবন্ধে এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

সাধারণ শিক্ষা ও ধর্মীয় পণ্ডিত হওয়ার মধ্যকার সম্পর্কটি একটি বিশেষ সম্পর্ক। সাঈদ নাফিসী বলেছেন ,

সে যুগে পুরোহিতগণ ইরানী সমাজের সকল শ্রেণীর ওপর পূর্ণ শ্রেষ্ঠত্ব রাখতেন। পুরোহিতগণ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিলেন। প্রথমত ধর্মযাজক শ্রেণী... ধর্মযাজকদের প্রধানকে মুবাদে মুবাদন বলা হতো। তিনি শাসনকেন্দ্রে অবস্থান করতেন ও রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন। তাঁর ক্ষমতা কোন আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ ছিল না... মুবাদনদের পরে অবস্থান ছিল ধর্মীয় শিক্ষক হিরাবদন দের যাঁরা বিচার কার্য ও তাঁদের নিকট প্রেরিত সন্তানদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান করতেন। তৎকালীন সময়ে কেবল ধর্মীয় পুরোহিত ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর সন্তানদের শিক্ষার অধিকার ছিল। অন্যান্য ইরানী এ অধিকার হতে বঞ্চিত ছিল। হিরাবদন দের পরে অবস্থান ছিল অগ্নিরক্ষক বা অযারাবদন দের। তাঁরা অগ্নিমন্দিরের অগ্নিসমূহের খাদেম ও মুতাওয়াল্লী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁরা অগ্নিমন্দির সমূহের সংরক্ষণ ,অগ্নিমন্দিরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদি ,যেমন নামায ,দোয়া ,শিশুদের বাজুবন্ধনী বাঁধা ,বিবাহ ,মৃতদের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া প্রভৃতির দায়িত্ব পালন করতেন। 143

ইরানের সামাজিক ব্যবস্থার একটি সাসানী শাসকবর্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সাসানী শাষক গোষ্ঠী স্বৈরাচারী ছিল। তারা নিজেদেরকে স্বর্গীয় বংশধারার ও খোদার প্রকাশস্থল বলে মনে করত। তাই সাধারণ মানুষের নিকট হতে সিজদা অপেক্ষা নিম্নতর আনুগত্যে সন্তুষ্ট ছিল না এবং তারাও এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন সামাজিক অবস্থাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ইচ্ছুকগণ এডওয়ার্ড ব্রাউনের তারিখে আদাবিয়াত (আলী পাশা সালেহ কর্তৃক অনূদিত) ,কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যবিদ রচিত তামাদ্দুনে ইরানী (ডক্টর বাহনাম অনূদিত) ,সাঈদ নাফিসীর তারিখে ইজতেমায়ীয়ে ইরান এবং দিনেমার (ডেনিস) লেখক ক্রিস্টেন সেনের ইরান দার যামানে সাসানীয়ান (রশিদ ইয়ামেনী অনূদিত) বইটি বিশেষভাবে অধ্যয়ন করতে পারেন।

আমরা এখানে এ বিষয়ে আর আলোচনার প্রয়োজন দেখছি না। আমাদের আলোচনার বিষয় ইসলামে ইরানের অবদান অংশে এ বিষয়ে আরো কিছু আলোচনা রাখব।

পারিবারিক ব্যবস্থা

সাসানী আমলের সামাজিক যে দিকটি পুরোহিতগণ কর্তৃক সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপ ,বিবর্তন ও ব্যবচ্ছেদের শিকার হয়েছিল তা ব্যক্তিগত অধিকার। বিশেষত বিবাহ ও উত্তরাধিকারের বিধানসমূহ এতটা জটিল ও অস্পস্ট ছিল ,তারা যা খুশি তাই করত। কোন ধর্মেই পুরোহিতদের এ বিষয়ে এতটা স্বাধীনতা দেয়া হয়নি।

একাধিক স্ত্রীর বিষয়টি সাসানী আমলে সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল। যদিও সম্প্রতি যারথুষ্ট্ররা এটি অস্বীকার করতে চায় ,কিন্তু অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কারণ সকল ঐতিহাসিকই তা লিখেছেন-হাখামানেশী শাসনামল হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত অর্থাৎ গ্রীক ঐতিহাসিক হিরুডুট ও ইসতারাবুন হতে ক্রিস্টেন সেন পর্যন্ত সকলেই। হিরোডেটাস হাখামানেশী আমলের সম্ভ্রান্ত শ্রেণী সম্পর্কে বলেছেন ,

তাদের প্রত্যেকেরই কয়েকজন স্ত্রী ছিল। এর বাইরে বিবাহ বন্ধনবহির্ভূত নারীর সংখ্যা আরো অধিক ছিল।

এদের সম্পর্কে ইসতারাবুন বলেছেন ,

তারা বহু স্ত্রী গ্রহণ করত এবং বিবাহ বহির্ভূত নারীর সংখ্যাও তাদের অনেক ছিল।

আশকানী শাসনামলের ঐতিহাসিক জুসতেন সে সময় সম্পর্কে বলেন ,

বিবাহ বহির্ভূত নারী রাখা বিশেষত শাসক গোষ্ঠীর মধ্যে শহুরে জীবনে ব্যক্তিগত সম্পদের অধিকারী হওয়ার সময় হতে প্রচলন লাভ করে। কারণ যাযাবর জীবনে অধিক স্ত্রী রাখা সম্ভব ছিল না।

প্রাচীন ইরানের অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে যা প্রচলিত ছিল তা কয়েকজন স্ত্রী রাখার মতো বিষয় হতে অনেক ব্যাপক ছিল অর্থাৎ এর কোন সীমা ছিল না। সংসার ক্ষেত্রে যেমন সাম্য ও ন্যায়ের ক্ষেত্রেও তেমনি নারীদের মধ্যে কোন সমতা রক্ষা করা হতো না। সামাজিক জীবনে যেরূপ চরম বৈষম্য ও শ্রেণীবিভক্তি লক্ষণীয় ছিল সেরূপ পারিবারিক ক্ষেত্রেও।

ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

কয়েকজন স্ত্রী রাখা পরিবারিক গঠনের অন্যতম শর্ত বলে বিবেচিত ছিল। একজন ব্যক্তির কতজন স্ত্রী থাকবে এ বিষয়টি ব্যক্তির আর্থিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করত। সম্ভবত আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তির একের অধিক স্ত্রী ছিল না। পরিবারের প্রধান অভিজাত শ্রেণীর প্রধান হওয়ার অধিকার রাখত। পরিবারে একজন নারী প্রধান স্ত্রী বা পদশা যান বলে স্বীকৃতি পেত। সম্মানিতা স্ত্রী হিসেবে তার পূর্ণ অধিকার ছিল। তার থেকে নিম্ন পর্যায়ে সেবিকা নারী থাকত যাদের খেদমতকার বা চাকর যান বলা হতো। এ দু ধরনের স্ত্রীর জন্য আইনগত অধিকার ছিল।...

প্রধান স্ত্রীকে সারা জীবন ভরণ-পোষণ দেয়া স্বামীর কর্তব্য বলে বিবেচিত ছিল। পুত্ররা প্রাপ্তবয়স্ক এবং কন্যারা বিবাহযোগ্যা হওয়া পর্যন্ত অনুরূপ অধিকার পেত। এর বিপরীতে খেদমতকার স্ত্রীদের শুধু পুত্র সন্তান পিতার বলে গৃহীত হতো। ফার্সী গ্রন্থসমূহে যদিও পাঁচ ধরনের বিবাহের কথা বলা হয়েছে ,কিন্তু সম্ভবত সাসানী আমলে উপরোক্ত দু ধরনের বিবাহ ব্যতীত অন্যরূপ বিবাহ ছিল না।

কন্যা সন্তান স্বামীর পূর্ণ অধিকারে থাকত না ;বরং বিবাহের পরও কন্যার ওপর পিতার পূর্ণ অধিকার ছিল। যদি পিতা জীবিত না থাকত তাহলে অন্য কারো ওপর বিবাহ দানের অধিকার বর্তাতো। প্রথমত মা এ অধিকার লাভ করত। যদি মাতাও জীবিত না থাকত তাহলে কোন চাচা বা মামা এ অধিকারপ্রাপ্ত হতো।

স্বামী স্ত্রীর সম্পদের ওপর পূর্ণ অধিকার রাখত। স্বামীর অনুমতি ব্যতীত স্ত্রী তার সম্পদ ব্যয় করতে পারত না। বিবাহ আইনে একমাত্র স্বামীর আইনগত ব্যক্তি অধিকার ছিল। সে স্ত্রীকে তার সম্পদে আইনগত সনদের ভিত্তিতে অংশীদার করতে পারত। এভাবে স্ত্রী স্বামীর অধিকার লাভ করত ও তা হতে ব্যয় করতে পারত। কেবল এ পদ্ধতিতেই স্ত্রী তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেনের অধিকারপ্রাপ্ত হতো।

কোন স্বামী যদি স্ত্রীকে বলত , এখন থেকে তুমি নিজের ওপর অধিকার প্রাপ্ত তাহলে স্ত্রী সে স্বামী হতে বিতাড়িত হতো না তবে স্বাধীনভাবে চাকর যান হিসেবে অন্য স্বামী গ্রহণ করতে পারত। প্রথম স্বামীর জীবদ্দশায় দ্বিতীয় স্বামী থেকে কোন সন্তান তার গর্ভে আসলে তা প্রথম স্বামীর বলে পরিগণিত হতো এবং সেও প্রথম স্বামীর স্ত্রী হিসেবেই থাকত।

স্বামী তার একমাত্র স্ত্রী বা কোন স্ত্রীকে (যদি প্রথম স্ত্রীও হয়ে থাকে) কোন অপরাধ ছাড়াই অন্য পুরুষের নিকট সমর্পণ করার অধিকার রাখত। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর মতামত শর্ত ছিল না। দ্বিতীয় স্বামী এই নারীর সম্পদে কোন অধিকার রাখত না এবং তাদের সন্তান প্রথম স্বামীর সন্তান বলে বিবেচিত হতো...। এ ধরনের কাজকে তারা সৎ কর্ম বলে মনে করত ও স্বধর্মী দরিদ্রদের প্রতি এক প্রকার অনুগ্রহ ও সাহায্য বলে বিশ্বাস করত।

ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

সাসানী ধর্মীয় আইনশাস্ত্রের অন্যতম বিশেষ বিধান ছিল প্রতিস্থাপন বিবাহ। তানসুর তাঁর পত্রে এর উল্লেখ করেছেন এবং আল বিরুনী তাঁর আল হিন্দ গ্রন্থে ইবনুল মুকাফ্ফার সূত্রে এর বিবরণ দিয়েছেন। বিষয়টি এরূপ যে ,যাতে করে বংশের নাম টিকে থাকে ও মালিকানার অধিকার প্রাপ্ত পরিবারসমূহের সম্পদের মালিকানা হাতছাড়া না হয় ও অন্যের হাতে হস্তান্তরিত না হয় সেজন্য কোন ব্যক্তি ,পুত্র সন্তান ব্যতিরেকে মারা গেলে তার জন্য প্রতিস্থাপন বা বদল বিবাহের ব্যবস্থা করত। এ বিবাহের নিয়ম ছিল তার নামে তার স্ত্রীকে ঐ ব্যক্তির নিকটতম কোন আত্মীয়ের সঙ্গে বিবাহ দান। যদি স্ত্রী জীবিত না থাকে তার কন্যা বা অন্য কোন নিকটতম নারীকে তার নামে নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে বিবাহ দান। যদি তার নিকট সম্পর্কীয় কোন নারী না থাকে তাহলে অন্য কোন নারীকে তার সম্পদ হতে যৌতুক দান করে তার নামে নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে বিবাহ দান। এই বিবাহ হতে যে পুত্র সন্তান জন্ম নেবে সে ঐ মৃত ব্যক্তির পুত্র হিসেবে তার সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে। যে ব্যক্তি এরূপ কর্মে রাজী না হবে সে যেন অনেক ব্যক্তির হত্যার ন্যায় অপরাধ করল। কারণ সে মৃত ব্যক্তির বংশধারাকে কর্তন করেছে ও তার নাম মুছে ফেলার ব্যবস্থা করেছে।

উত্তরাধিকার আইন এরূপ ছিল: প্রধান স্ত্রী ও তার পুত্ররা সমান সম্পত্তি পেত। অবিবাহিত কন্যারা তাদের অর্ধেক ভাগ পেত। খেদমতকার স্ত্রী ও তার সন্তানরা কোন সম্পত্তি পেত না। তবে পিতা মৃত্যুর পূর্বে তাদের কিছু ওসিয়ত বা হিবা করে যেতে পারত। ক্রিস্টেন সেন উল্লেখ করেছেন ,বংশধারার বিলুপ্তি প্রতিরোধে পোষ্যপুত্র গ্রহণের নীতির ব্যাপক প্রচলন ছিল। আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশংকায় তার উল্লেখ করছি না।

পারিবারিক আইনের বিধিবিধান বংশ ও সম্পত্তি এ দু টিকে রক্ষার চিন্তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো অর্থাৎ বংশ ও সম্পত্তিই পারিবারিক আইনের মানদণ্ড ছিল ।

মাহরামদের144 সঙ্গে বিবাহের যে রীতি সে সময় ও তার পূর্ব হতে প্রচলন লাভ করেছিল এ দু মৌল নীতির ভিত্তিতেই। অভিজাতরা ভিন্ন রক্তের মিশ্রণ প্রতিরোধ ও সম্পদ অন্যের হাতে চলে যাওয়া হতে রক্ষার উদ্দেশ্যে যথাসম্ভব নিকট সম্পর্কিত কাউকে বিবাহ করত। যেহেতু এ বিষয়টি মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি বিরোধী সেহেতু ধর্মীয়ভাবে ভীতি প্রদর্শন ও উৎসাহিত করে এরূপ সম্পর্ক স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করা হতো। যেমন বলা হতো ,যে এরূপ বিবাহ করে তার স্থান বেহেশতে এবং যে তা না করে তার স্থান দোযখে।

আবদারে ভিরফ নামেহ্ নামক যে গ্রন্থটি প্রথম খসরু অনুশিরওয়ানের আমলের নিক শাপুর নামের একজন পণ্ডিতের বলে উল্লিখিত হয়েছে তাতে আত্মার পরিভ্রমণ ও ঊর্ধ্বগমন নিয়ে আলোচিত হয়েছে। এ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে ভিরেফ দ্বিতীয় আসমানে এমন ব্যক্তিদের আত্মাকে দেখেছেন যারা মাহরামদের বিবাহ করার কারণে চিরতরে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছে এবং দোযখে চিরস্থায়ী আজাবের নারীদের দেখেছে যারা মাহরামদের বিবাহ করতে অস্বীকার করেছিল। শেষে উল্লিখিত হয়েছে ,ভিরফ স্বয়ং তাঁর সাত ভগ্নিকে বিবাহ করার কারণে এই ঐশী ভ্রমণের সৌভাগ্য লাভ করেছিল। দিনকারত নামক গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে এ ধরনের বিবাহের জন্য ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

আর তা হলো নিকট বিবাহ অর্থাৎ নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ। সেখানে পিতা-কন্যা এবং ভ্রাতা-ভগ্নির বিবাহের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। নওসায়ে বুরযমেহের নামের এক যারথুষ্ট্র পুরোহিত দিনকারদের এই অংশের ব্যাখ্যায় এরূপ বিবাহের বিভিন্ন কল্যাণকর দিক উল্লেখ করে বলেছেন ,নিকট বিবাহ যন্ত্রণাদায়ক গুনাহের ক্ষতিপূরণ করে।

ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

রক্ত-বংশের বিশুদ্ধতা ইরানী সমাজে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ,তারা মাহরামদের সঙ্গে বিবাহকে বৈধ মনে করত। এ ধরনের বিবাহকে আভেস্তায় খুইযোগাদস বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই রীতি হাখামানেশী আমল হতেই প্রচলিত ছিল। যদিও খুইযোগাদস বা খাওয়ায়েত ওয়াদাস শব্দটিকে বর্তমানের আভেস্তায় ব্যাখ্যা করা হয় নি ,কিন্তু প্রাচীন আভেস্তায় এটি মাহরামদের সঙ্গে বিবাহ অর্থে ব্যবহৃত হতো।

যারথুষ্ট্রগণ বিশেষত ভারতের পারসিকরা সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টির অপকৃষ্টতা অনুভব করে ত্যাগ করেছে। তাদের কেউ কেউ গোঁড়া হতেই বিষয়টিকে যারথুষ্ট্র ধর্মের অন্যতম রীতি হিসেবে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে। তারা এখন খাওয়ায়েত ওয়াদাস শব্দটির ভিন্ন অর্থ ও ব্যাখ্যা দান করেছেন।

ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

যারথুষ্ট্র সূত্রের বিভিন্ন গ্রন্থে ও সাসানী আমলের অ-ইরানী ঐতিহাসিকদের বিবরণ হতে স্পষ্টভাবে বলা যায় যে ,বর্তমানের ইরানীরা যারথুষ্ট্র ধর্মে মাহরাম বিবাহের বিষয়টিকে অস্বীকারের যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তা প্রমাণযোগ্য নয়।

সাঈদ নাফিসী বলেছেন ,

তৎকালীন সময়ের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহ হতে প্রমাণিত ,তাদের অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে মাহরামদের বিবাহ অবশ্যই প্রচলিত ছিল ,যদিও বর্তমানে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশত তা অস্বীকারের চেষ্টা করছে।

সাঈদ নাফিসী অতঃপর যারথুষ্ট্র ধর্মের পবিত্র কিছু গ্রন্থ ,যেমন দিনকারত এবং মুসলিম ঐতিহাসিকগণ ,যথা মাসউদী ,আবু হাইয়ান তাওহীদী ,আবু আলী ইবনে মাসকুইয়া প্রমুখের বর্ণনা হতে তা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। সেখানে তিনি সাসানী সম্রাট কাবাদের সঙ্গে তাঁর কন্যা অথবা ভাগিনীর বিবাহ ,বাহরামের সঙ্গে তাঁর সহোদরা ভগ্নির বিবাহ ,মেহরান গুশনাসবের সঙ্গে তাঁর আপন ভগ্নির বিবাহের ঘটনাসমূহ বর্ণনা করেছেন।

মাশিরুদ্দৌলা তাঁর ইরানে বসতন নামক আকর্ষণীয় গ্রন্থে গ্রীক ঐতিহাসিক ইসতারা বুনের সূত্রে হাখামানেশীদের সম্পর্কে বলেছেন , তাদের পুরোহিতগণ ,এমনকি তাঁদের মাতাদের বিবাহ করতেন।

তিনি আশকানীদের সম্পর্কে বলেছেন ,

অ-ইরানী ঐতিহাসিকদের অনেকেই ঘৃণার সঙ্গে আশকানী সম্রাটদের মাহরাম বিবাহের বর্ণনা দিয়েছেন। হাখামানেশী সম্রাট দ্বিতীয় আরদ্শিরের বিষয়ে ঐতিহাসিক প্লুটারিক এবং আশকানী সম্রাট কাম্বুজিয়া সম্পর্কে গ্রীক ঐতিহাসিক হিরোডেটাস এরূপ বিবাহের কথা বলেছেন। কিন্তু কোন কোন পারসিক যারথুষ্ট্র এ বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন , আশকানীদের ক্ষেত্রে ভগ্নি শব্দটি প্রকৃত অর্থে গ্রহণ সঠিক হবে না ,কারণ রাজকীয় বংশের সকল নারীদের তারা এক বংশোদ্ভূত হওয়ায় ভগ্নি বলে ডাকত। যদিও তারা চাচাত বোন ,খালাত বোন বা ফুপাত বোন ,এমনকি তাদের কন্যাও হয়ে থাকে তবুও তারা বোন বলে অভিহিত হতো।

অতঃপর মাশিরুদ্দৌলা মন্তব্য করেছেন ,

কিন্তু যেহেতু ইতিহাস লিখনে সত্যকে অনুসন্ধান করতে হয় সেহেতু অস্বীকার করার উপায় নেই ,অতি নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিবাহের রীতি যা খুইতাকদাস নামে প্রসিদ্ধ প্রাচীন ইরানীদের নিকট পছন্দনীয় বিষয় ছিল। সম্ভবত বংশীয় ও পারিবারিক বিশুদ্ধতা রক্ষার স্বার্থে তা করা হতো।

তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রসিদ্ধ ইরানী ঐতিহাসিক ইয়াকুবী তাঁর ইতিহাস গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের 152 পৃষ্ঠায় বলেছেন ,

ইরানীরা মাতা ,ভগ্নি ও কন্যাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতো এবং তাদের নিকট এ কর্ম ইবাদাত ও আত্মীয়ের হক বলে বিবেচিত হতো।

ক্রিস্টেন সেন ইরানী খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে বলেছেন ,

তারাও যারথুষ্ট্রদের অনুকরণে নিজ ধর্মের নির্দেশের বিপরীতে অতি নিকটজনদের বিবাহ করত। মারব গণ 540 খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। তাদের জাসেলিক (ঈধঃযড়ষরপ) ধর্মযাজক খ্রিষ্টধর্মের নির্দেশের বিপরীতে তাঁর অনুসারীদের এরূপ বিবাহে বিপুলভাবে উৎসাহিত করত। 145

এমনকি ইসলামের আবির্ভাবের সময়েও ইরানের যারথুষ্ট্রদের মধ্যে মাহরাম বিবাহ প্রচলিত ছিল। তাই দেখা যেত কখনও কখনও কোন কোন মুসলমান যারথুষ্ট্রদের কাউকে কাউকে তাদের মধ্যে এ কর্মের প্রচলন থাকার কারণে তিরস্কার করে জারজ সন্তান বলে ডাকত। কিন্তু পবিত্র ইমামগণ মুসলমানদের এরূপ বলতে নিষেধ করেছেন এজন্য যে ,প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীরই বিবাহের নিজস্ব রীতি রয়েছে এবং তারা তাদের রীতি অনুযায়ী বিবাহ করলে তাদের জারজ সন্তান বলে অভিহিত করা উচিত হবে না।

হুদুদের (দণ্ডদান) অধ্যায়ে একটি হাদীসে এসেছে একবার ইমাম সাদিক (আ.)-এর সামনে এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে প্রশ্ন করল: তোমার ঐ পাওনাদারের সঙ্গে কি করেছ ?

সে বলল: আমার পাওনাদার এক জারজ সন্তান।

ইমাম এ কথা শুনে বেশ রাগান্বিত হয়ে বললেন: এ কেমন কথা ?

সে বলল , আমি আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত। ঐ ব্যক্তি মাজুসী আর তার মাতা হলো তার বোন। তাই সে জারজ সন্তান। ইমাম বললেন , তাদের ধর্মে কি এটি বৈধ নয় ? সে তাদের ধর্ম অনুযায়ী এরূপ করেছে। তাই তুমি তাকে জারজ সন্তান বলতে পার না। 146

সাদুক তাঁর তাওহীদ গ্রন্থে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যা ওয়াসায়েলুশ শিয়া গ্রন্থের নিকাহ্ অধ্যায়েও এসেছে। হাদীসটি এরূপ যে ,একদিন হযরত আলী (আ.) দাঁড়িয়ে লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন ,سلوني فبل أن تفقدوني আমাকে হারাবার পূর্বেই আমাকে প্রশ্ন করে জেনে নাও। আশআস ইবনে কাইস নামে একজন প্রশ্নকারী ছিল যে ইরানীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত। পূর্বে হযরত আলীর সঙ্গে তার বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার ঘটনা আমরা বর্ণনা করেছি। সে হযরত আলীকে প্রশ্ন করল , কেন মাজুসদের সঙ্গে আহলে কিতাবদের ন্যায় আচরণ কর ,তাদের হতে জিজিয়া নাও ,অথচ তাদের নিকট কোন ঐশী গ্রন্থ নেই ?

আলী (আ.) বললেন , তাদের আসমানী কিতাব ছিল। আল্লাহ্ তাদের মধ্যে নবীও প্রেরণ করেছিলেন এবং তাদের ধর্মে মাহরামদের সঙ্গে বিবাহ হারাম ছিল। তাদের এক সম্রাট মদ্যপ অবস্থায় তার কন্যার সঙ্গে সঙ্গম করে। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ও তার ওপর হাদ (দণ্ড) জারীর দাবি জানায়। ঐ সম্রাট প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তাদের বলল: সকলে সমবেত হয়ে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন। যদি তা সঠিক না হয় তাহলে তোমাদের দাবি আমি মাথা পেতে নেব। তারা সমবেত হলে সে বলল: তোমরা জান হযরত আদমের সন্তানের কেউই তাদের আদি পিতা-মাতা আদম ও হাওয়ার সমকক্ষ নয়। তারা বলল: হ্যাঁ ,সঠিক। সে বলল: তাঁদের থেকে যে পুত্র-কন্যা জন্মগ্রহণ করেছে তাঁরা তাঁদের সন্তানদের ভাই-বোনদের মধ্যে বিবাহ দিয়েছেন। তারা বলল: সঠিক। সে বলল: সুতরাং বোঝা যায় ভাই-বোন ,পিতা-কন্যা বিবাহে তথা মাহরাম বিবাহে কোন বাধা নেই। জনসাধারণ এ কথায় সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যায় ও পরবর্তীতে বিষয়টি বৈধ হিসেবে তাদের মাঝেও প্রচলিত হয়ে যায়। 147

এ ধরনের প্রশ্নোত্তর হতে বোঝা যায় ইসলামের প্রাথমিক যুগে যারথুষ্ট্রগণের মধ্যে মাহরাম বিবাহ প্রচলিত ছিল বলেই এ ধরনের প্রশ্ন ও আলোচনা উত্থাপিত হতো।

ইরানী-অ-ইরানী ,সুন্নী-শিয়া সর্বোতভাবে সকল ফকীহ্ ফিকাহ্শাস্ত্রের বিভিন্ন অধ্যায়ে বাহ্যিক উদাহরণ ও নমুনার উপস্থিতির কারণেই এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ সকল ফকীহর অধিকাংশই ইরানী ছিলেন। এদের কারো কারো পূর্বপুরুষ মাজুসী (অগ্নি উপাসক) ছিলেন। যেমন ইমাম আবু হানিফার দু পুরুষ পূর্বের সকলেই মাজুসী ছিলেন। যদি যারথুষ্ট্রদের মধ্যে এরূপ বিবাহের প্রচলন না থাকত তাহলে ইসলামের প্রথম যুগের ফিকাহ্শাস্ত্রে তা আলোচিত হতো না।

শেখ আবু জাফর তুসী তাঁর আল খিলাফ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে আল ফারায়িজ অধ্যায়ে মাজুসীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারের আলোচনায়- যেখানে কোন ব্যক্তির নিকট হতে কেউ দু ভাবে উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত হয় অর্থাৎ ওয়ারিস একদিকে মৃতের মাতা ,অপরদিকে পিতার কন্যা হিসেবে ভগ্নি হওয়ায় উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত হয় তার উত্তর দান করেছেন এবং এ বিষয়ে অন্যান্য ফকীহর মতামতও এনেছেন।

যারথুষ্ট্রদের মধ্যে যে এরূপ বিবাহ প্রচলিত ছিল তা অস্বীকার করা সূর্যের উপস্থিতিকে অস্বীকারের শামিল। কিন্তু যারথুষ্ট্রগণ আরেক বারের মত তাদের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত অপর একটি ধর্মীয় মৌল নীতি ও আচারকে অস্বীকার করে কল্যাণমূলক মিথ্যা বলা শুরু করেছে।

নারী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ

যদিও তৎকালীন সময়ে নারীদের অবস্থা তেমন সুখকর ছিল না তদুপরি লক্ষ্য করা যায় সে সময়ের কিছু নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে উন্নত পর্যায় লাভ করেছিলেন। বিশেষজ্ঞগণ তৎকালীন সময়ের একটি আইন গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন যার নাম মদিগান হেযার দযসেতান এবং এর অর্থ হলো এক হাজার বিচারের রায় বা হুকুম। এ গ্রন্থের কিছু অংশ এখনও বিদ্যমান। কিন্তু ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞ ,যেমন বার তালমা তা অনুবাদ করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন। এ গ্রন্থে তৎকালীন সময়ের কিছু প্রসিদ্ধ বিচারকের নাম উল্লিখিত হয়েছে। তবে এ গ্রন্থের অধিকাংশ হুকুম আভেস্তা ও যান্দ হতে নেয়া হয়েছে । এতে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যা এরূপ :

একজন বিচারক বিচারালয়ে যাওয়ার সময় পাঁচ জন নারী তাঁকে ঘিরে ধরে জামানত ও মুক্তিপণের বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করে। সর্বশেষ প্রশ্নটির জবাব দিতে না পেরে বিচারক চুপ করে রইলেন। একজন নারী বলল: হে শিক্ষক! আপনার মাথাকে ক্লান্ত না করে বলুন: জানি না। আমরা গেলুগণ আনদারয বুরয গ্রন্থের ব্যাখ্যায় এর জবাব খুঁজে দেখলে অবশ্যই পাব।

এ কাহিনী তৎকালীন সময়ের নারীরা যে সাধারণ শিক্ষার সুবিধাপ্রাপ্ত ছিল তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট কি ?

এ বিষয়ে বার তালমাহ গবেষণা চালিয়েছেন এবং ক্রিস্টেন সেন তাঁর দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই মূলত মূল্যায়ন করেছেন। সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোতে নারীরা কখনও কখনও উচ্চ শিক্ষা লাভ করত । অর্থাৎ অন্যান্য দিকের মত এ ক্ষেত্রেও শ্রেণীভিত্তিক সমাজের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। সাসানী আমলে খসরু পারভিজের দু কন্যা পুরান দুখত ও অযারমি দুখত স্বল্প সময়ের জন্য রাজত্বও করেছিলেন। তাঁদেরকে সম্রাজ্ঞীর জন্য মনোনীত করার পেছনে ইরানীদের রাজবংশীয়দের প্রতি গভীর বিশ্বাসের বিষয়টিই মুখ্য ছিল। কারণ তারা রাজবংশকে স্বর্গীয় মনে করত। সাসানী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আরদ্শির বাবাকান তাঁর বংশকে ইরানের প্রাচীন এক সম্রাটের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে দেখান যাতে করে জনগণের পক্ষ হতে প্রতিবাদ না ওঠে যে ,তিনি রাজবংশীয় নন ও তাঁর দেশ পরিচালনার অধিকার নেই। খসরু পারভিজের পরবর্তী গোলযোগপূর্ণ সময়ে দু ব্যক্তি রাজবংশীয় না হওয়া সত্ত্বেও রাজকীয় শাসন ক্ষমতা লাভ করার চেষ্টা করে। কিন্তু এ কারণেই ব্যর্থ হয়। এ অবস্থা সৃষ্টির কারণ হলো খসরু পারভিজের পুত্র শিরাভেই তাঁর সাতজন ভ্রাতাকে হত্যা করে ফলে রাজ সিংহাসনের জন্য ঐ দু জন কন্যা ব্যতীত অন্য কোন দাবিদার ছিল না। তাই রক্ত-বংশের প্রতি বিশ্বাসের বিষয়টিকে নারী অধিকারের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা ভুল হবে। পুরান দুখত ও অযারমি দুখতের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়া এবং সম্ভ্রান্ত কিছু নারীর উচ্চ শিক্ষা লাভের বিষয়কে মানদণ্ড ধরে নারীদের সার্বিক অবস্থার মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

ঐতিহাসিক যে সকল উৎস হাতে রয়েছে তা হতে নারী শিক্ষার বিষয়ে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। বার তালমাহর মত হলো নারী শিক্ষার বিষয়টি গৃহ পরিচর্যার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট ছিল। তা ছাড়া বাগনাসাক তৎকালীন সময়ের নারীদের গৃহ পরিচর্যা বিষয়ক প্রশিক্ষণের বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা করেছেন। তদুপরি কিছু কিছু অভিজাত পরিবারের নারী বা সাধারণ শিক্ষায়ও গভীর বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন বলে জানা যায়।

ক্রিস্টেন সেন তাঁর গ্রন্থের সপ্তম অধ্যায়ে মাসদাকী আন্দোলনের আলোচনায় বলেছেন :

সাসানী শাসনামলে নারী অধিকারের বিষয়ে বার তালমার গবেষণার ফলে অনেক বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। এর কারণ হলো সাসানী শাসনামলে বিভিন্ন পর্যায়ে নারী অধিকার আইনে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বার তালমাহর মতে শিক্ষা ও চিন্তাগতভাবে সেসময় নারীর অধিকার অন্যের অধিকারের ছায়ায় ছিল অর্থাৎ তার নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ব্যক্তি অধিকার না থাকলেও নির্দিষ্ট অধিকার অবশ্যই ছিল। সাসানী আমলে নতুন আইনের পাশাপাশি প্রাচীন আইনও বিদ্যমান ছিল এবং বাহ্যিক বৈপরীত্য এ কারণেই ছিল। আরব মুসলমানগণ ইরান জয়ের পূর্বেই ইরানের নারীরা তাদের অধিকার ও স্বাধীনতার মর্যাদা লাভ করেছিল। 148

নৈতিক অবস্থা

তৎকালীন সময়ের ইরানী সমাজের নৈতিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেও পর্যাপ্ত দলিল আমাদের হাতে নেই। অবশ্য বিভিন্ন নমুনা ও নিদর্শন হতে সাধারণ নৈতিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

নৈতিকতা ও মানসিকতা দু প্রকারের। যথা: প্রাকৃতিক ও অর্জিত। কোন জাতির প্রাকৃতিক নৈতিকতা হলো ঐ জাতির ভৌগোলিক ও বংশগত বৈশিষ্ট্য। প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশ এবং বংশীয় উত্তরাধিকারের বিষয়টি মানুষের দৈহিক ,যেমন গায়ের রং ,চোখের বর্ণ ও চুলের ধরন প্রৃভৃতিতে যেমন প্রভাব ফেলে তেমনি আত্মিক ,নৈতিক ও মানসিক অবস্থায়ও প্রভাব রাখে। অবশ্য এ দু য়ের পার্থক্য হলো জাতি ও বংশগত উত্তরাধিকারের বিষয়টি বিবাহ ,সংমিশ্রণ ,

স্থানান্তর প্রভৃতি কারণে ভিন্ন রূপ ও প্রকৃতি ধারণ করে ,কিন্তু ভৌগোলিক ও অঞ্চলগত বিষয়টি মোটামুটিভাবে স্থিতিশীল। ভালবাসা ,দয়াশীলতা ,অতিথিপরায়ণতা ,মেধা ,বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা ,সহনশীলতা ও সম্মানবোধের বৈশিষ্ট্যের কারণে ইরানীরা সকল সময়ই প্রশংসিত হয়েছে।

অর্জিত নৈতিকতা ও মানসিকতা সভ্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অবশ্য সভ্যতার অর্থ এখানে মানবিক ও নৈতিক সভ্যতা ;শিল্প ও যান্ত্রিক সভ্যতা নয়। অর্জিত নৈতিকতা একদিকে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং অন্যদিকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত আদব-কায়দা ,রীতি-নীতি ও সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীল। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রভাব হলো প্রত্যক্ষ এবং সামাজিক পরিবেশের প্রভাব হলো পরোক্ষ।

মানুষের সাধারণ চরিত্র ও মানসিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ সামাজিক পরিবেশের বিভিন্ন ধারার বিপরীতে তাঁর আত্মিক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত। বিশেষত যে সকল প্রচলিত রীতি ও আচার মানুষের জীবনে ব্যাপক প্রভাব রাখে সেগুলো লক্ষণীয়।

ইরানীরা প্রাকৃতিক নৈতিকতা অর্থাৎ জাতি ও বংশগত নৈতিক চরিত্রের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নৈতিকতার অধিকারী ছিল। তারা প্রাচীনকাল হতেই উন্নত নৈতিক চরিত্রের জন্য প্রশংসিত ছিল । খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর প্রসিদ্ধ গ্রীক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস যিনি ইতিহাসের জনক বলে খ্যাত এবং মূলত এশিয়া মাইনরের মানুষ তিনি তৎকালীন সময়ের ইরানী সমাজ সম্পর্কে মোটামুটি সার্বিক আলোচনা রেখেছেন। তিনি যা লিখেছেন তাতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই রয়েছে। কিন্তু মোটামুটিভাবে বলা যায় ইতিবাচক ও সুন্দর দিক অধিক এসেছে এবং অসুন্দর দিক কম এসেছে।

সক্রেটিসের ছাত্র গাযানফুন যিনি হিরোডোটাসের একশ বছর পরের ব্যক্তি তিনিও ইরানীদের প্রশংসা করেছেন। কিন্তু হিরোডোটাসের বিপরীতে তিনি ইরানীদের পতনের যুগও দেখেছেন অর্থাৎ হিরোডোটাস কেবল ইরানীদের উত্থানের যুগ দেখেছিলেন ও প্রশংসা করেছিলেন। গাযানফুন কুরুশের (সাইরাসের) যুগের ইরানীদের নৈতিকতা ও মানসিকতার সঙ্গে তাঁর যুগের ইরানীদের আচার ও নৈতিকতার তুলনা করেছেন এবং তাঁর যুগের ইরানীদের অধঃপতন ও পরিবর্তনীয় অবস্থায় ব্যাখ্যা দান করেছেন। যদি ইরানীদের প্রকৃতিগত চরিত্রকে অন্যান্য জাতির সঙ্গে তুলনা করি নিঃসন্দেহে বলা যায় অন্যদের নিকট হতে তা উত্তম না হলেও অধম ছিল না। বক্তব্য দীর্ঘায়িত যাতে না হয় এ জন্য তাঁদের উল্লিখিত ইরানী মানসিকতার ভাল-মন্দ দিকসমূহ নিয়ে আর আলোচনা করছি না।

ইসলামী সূত্রের বিভিন্ন বর্ণনায় দু টি দৃষ্টিকোণ হতে ইরানীদের চরিত্র ও মানসিকতার প্রশংসা করা হয়েছে :

1. চিন্তার স্বাধীনতা ,কুসংস্কার ও গোঁড়ামিমুক্ত মানসিকতা ,2. জ্ঞান পিপাসা।

পবিত্র কোরআনে এসেছে:

) و لو نزلناه على بعض الاعجمين فقرأه عليهم ما كانوا به مؤمنين(

যদি আমি একে (কোরআন) কোন ভিন্ন ভাষীর প্রতি অবতীর্ণ করতাম ,অতঃপর সে তা তাদের (আরবদের) কাছে পাঠ করত তবে তারা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করত না। 149

ইমাম সাদিক (আ ,) বলেছেন , হ্যাঁ ,যদি এই কোরআন কোন অনারবের ওপর প্রেরণ করা হতো তাহলে এ আবররা কখনই ঈমান আনত না। কিন্তু তা আরবের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে ও অনারব এতে ঈমান এনেছে এটি অনারবদের শ্রেষ্ঠত্ব। 150

ইমাম সাদিক আরো বলেছেন ,

যে ব্যক্তি ভালবেসে ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে সে ঐ ব্যক্তি হতে উত্তম যে ভয়ে ইসলামকে মেনে নিয়েছে। আরবের মুনাফিকরা ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই তাদের ঈমান প্রকৃত ঈমান নয়। কিন্তু ইরানীরা ভালবেসে ও স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছে। 151

আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর রাসূল (সা.)-এর নিকট হতে বর্ণনা করেছেন ,তিনি বলেছেন , স্বপ্নে এক পাল কালো মেষকে দেখলাম যাতে অসংখ্য সাদা মেষ প্রবেশ করছে। সকলে তাঁকে প্রশ্ন করল , হে রাসূলাল্লাহ্! এ স্বপ্নকে কিভাবে ব্যাখ্যা করছেন ? তিনি বললেন , এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা হলো অনারবরা তোমাদের ধর্ম ,রক্ত ও বংশে অংশীদার হবে অর্থাৎ তোমাদের ধর্মে ঈমান আনবে ,তোমাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে এবং তাদের রক্ত তোমাদের সঙ্গে মিশ্রিত হবে। সকলে আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করল , ইয়া রাসূলুল্লাহ্! অনারবরা ইসলাম গ্রহণ করবে এবং আমাদের রক্তে অংশীদার হবে ? রাসূল (সা.) বললেন , হ্যাঁ ,ঈমান যদি সুরাইয়া তারকাতেও পৌঁছায় আজমদের (অনারবদের) একদল সেখানেও পৌঁছবে।

ক্রিস্টেন সেন তাঁর গ্রন্থের শেষাংশে কয়েক পৃষ্ঠায় ইরানীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মানসিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন ,

পশ্চিমা ঐতিহাসিকগণ যেমন আমিওজুস মারসলিনুস152 এবং প্রকুপিউস153 প্রমুখ যেভাবে ইরানের সমাজকে ভাল-মন্দ উভয় দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন তাতে মনে হয় তা একটি অভিজাত সমাজ। অর্থাৎ শুধু অভিজাত শ্রেণী এ সমাজের পরিচায়ক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং ইরান জাতির বিশেষ দীপ্তির প্রকাশ ঘটেছে।

আমিওনুস মারসলিনুসের বিবরণ হতে ক্রিস্টেন সেন যে বর্ণনা দিয়েছেন তা অভিজাত শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত বিধায় স্বাভাবিকভাবেই ভাল দিক হতে খারাপ দিকগুলো তাদের মধ্যে অধিক ছিল। তাই সেগুলোর উল্লেখের কোন প্রয়োজন নেই।

ক্রিস্টেন সেন বলেছেন ,

আরব লেখকগণ প্রাচ্যের শাসকবর্গের আদর্শ হিসেবে সাসানী শাসকদের সম্মান ও প্রশংসা করেছেন এবং ইরানী জাতিকে মর্যাদার সাথে স্মরণ করেছেন।

অতঃপর তিনি খোলাসাতুল আজায়েব গ্রন্থ হতে নিম্নোক্ত বর্ণনা দান করেছেন , পৃথিবীর সকল জাতিই ইরানীদের শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করে। বিশেষত রাষ্ট্র পরিচালনা ,যুদ্ধ কৌশল ,চিত্রকলা ,খাদ্য প্রস্তুত ,ঔষধ প্রস্তুত ,পোশাকের ধরন ,প্রদেশ প্রতিষ্ঠা ,কোন বিষয়কে যথার্থ স্থানে সংরক্ষণ ,কবিতা ,গজল ,বক্তৃতা ,চিন্তা শক্তি ,সততা ,পবিত্রতা এবং সম্রাটদের প্রশংসা প্রভৃতি বিষয় বিশ্বের অন্যান্য জাতির ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। এ জাতি এর পরবর্তী শাসন ক্ষমতার অধিকারী জাতিসমূহের জন্য আদর্শ।

আশ্চর্যের বিষয় হলো এত কিছু উল্লেখ করার পর তিনি বলেছেন ,

ইরানীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের নৈতিক মর্যাদাকে ইসলামী জাতিগুলোর মাঝে সমুন্নত রেখেছে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ও স্বভাবগত প্রতিভা সাসানী সাম্রাজ্যের পতনের পর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে যায়। কারো কারো মতে এ দুর্বলতার কারণ এটি নয় যে ,ইসলাম ধর্মের নৈতিক ভিত্তি পারসিকদের ধর্ম হতে দুর্বল ;বরং ইরানী জাতির অধঃপতনের কারণ ইসলাম সাধারণ মানুষের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে অভিজাত শ্রেণীর অবস্থান ক্ষুন্ন হতে শুরু করে ও এ শ্রেণী সাধারণের মাঝে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তাদের শ্রেয়তর গুণসমূহ দুর্বল হয়ে পড়ে।

অবশ্য ক্রিস্টেন সেন রাজনৈতিক প্রতিভার পাশাপাশি স্বভাবগত যে প্রতিভার কথা বলেছেন তা এমন এক রাজনৈতিক স্বভাব যা মানবিক স্বভাবের বিপরীতে অবস্থান করে। রাজনৈতিক স্বভাব ও চরিত্রের যে দৃষ্টিতে ক্রিস্টেন সেন দেখেছেন তাতে অভিজাত শ্রেণীর পতন ও তাদের বিশেষ স্বভাবের দুর্বল হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ স্বভাবের কারণেই সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সকল ক্ষমতা ও সম্পদ হস্তগত ও অন্যান্য সকলের অধিকারকে হরণ করে নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট করেছিল এবং এ প্রক্রিয়ায় তাদের শোষণ ক্রিয়া চালাত। এই রাজনৈতিক চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে তারা ক্ষমতাধর ও শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। বিষয়টি দুঃখজনক। তাই মানবীয় চরিত্রের মানদণ্ড ও দৃষ্টিতে এরূপ অভিজাত শ্রেণীর পতন হয়ে সাধারণের শাসন প্রতিষ্ঠা দুঃখজনক তো নয়ই বরং কাক্সিক্ষত ও পূর্ণ আনন্দের বিষয়।

সাসানী আমলের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা কিরূপ ও কিসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ছিল এ বিষয়ে পূর্ণ কোন তথ্য জানা যায় না। তবে যে ব্যবস্থাই থাকুক না কেন তা যারথুষ্ট্র পুরোহিতগণের মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং তাঁরা আভেস্তার বিষয়সমূহ মানুষকে শিক্ষা দিতেন ,এর বাইরের কিছু তাঁদের নিকট ছিল না।

যে দর্পণ অন্য সকল দর্পণ হতে তৎকালীন ইরানের মানুষের নৈতিক অবস্থাকে ফুটিয়ে তুলতে পারে তা হলো সেসময়ের পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা। সেসময়ের পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা ভারসাম্যপূর্ণ ছিল না। আমরা পূর্বে এ বিষয়ে আলোচনা করেছি ।

ভারসাম্যহীন এ সমাজে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু শ্রেণী এভাবে বিভক্ত ছিল যে ,সংখ্যালঘুরা সম্পদশালী ও সুবিধাভোগী এবং সংখ্যাগুরুরা ছিল দরিদ্র ও সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত।

সম্পদশালী সুবিধাভোগীরা তাদের অবস্থার কারণে এক ধরনের চরিত্র এবং দরিদ্র ও বঞ্চিতরা ভিন্ন ধরনের চরিত্রের অধিকারী ছিল। তবে উভয় শ্রেণীর চরিত্রই ছিল ভারসাম্যহীন। সুবিধাভোগী শ্রেণী ছিল আত্মতুষ্ট ,অহংকারী ,কর্মহীন ,চাটুকার ,ভীতু ,ধৈর্যহীন ,অসহিষ্ণু ,বদ মেজাজী ,অপচয়কারী ,আয়েশী ও আদুরে। আমিওনুস মারসলিনুস ইরানী অভিজাতদের যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে কম-বেশি এ সব বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে বঞ্চিত শ্রেণী ছিল হতাশাগ্রস্ত ,অসন্তুষ্ট ,হিংসুক ,প্রতিশোধপরায়ণ ,অহিতৈষী ,কুসংস্কারাচ্ছন্ন ,বিশ্বে ন্যায় ও শৃঙ্খলার অনুপস্থিতিতে বিশ্বাসী। যদিও ঐতিহাসিকগণ তৎকালীন ইরানের সাধারণ জনগণের বিবরণ দান করেন নি তদুপরি বলা যায় ঐরূপ শ্রেণীবিভক্ত সমাজে এমন অবস্থাই স্বাভাবিক। ইরানে সেসময় মাথা পিছু কর নেয়া হতো ,কিন্তু যে শ্রেণীটি করের জন্য অধিকতর উপযোগী ছিল আইনগতভাবে তারা কর হতে মুক্ত ছিল। আনুশিরওয়ান কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন সাধন করলেও অভিজাত শ্রেণী ,সেনাপতি ,রাজকীয় ব্যক্তিবর্গ ,পুরোহিত ও সরকারী সেবকদের কর বহির্ভূত রাখেন। স্বাভাবিকভাবেই করদাতা শ্রেণী এই ব্যতিক্রম ও বৈষম্যের প্রতি অসন্তুষ্ট ও প্রতিবাদী ছিল।

তৎকালীন সময়ের কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনা হতে সেসময়ের সাধারণ শ্রেণীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা যেতে পারে। ইবনে আসির তাঁর কামিল গ্রন্থে লিখেছেন ,

যখন পারস্য সেনাপতি রুস্তম ফারাখযাদ দজলা-ফোরাতের মধ্যবর্তী মুসলিম সেনাদলের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য যাত্রা করেন তখন পথিমধ্যে এক আরবের সঙ্গে দেখা হয়। আরব ব্যক্তিটি রুস্তমের সঙ্গে কথোপকথনের পর ইরানীদের পরাস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত ঘোষণা করল। রুস্তম তাকে বিদ্রূপ করে বললেন: আমরা তাহলে ধরে নেব এখন হতে তোমাদের অধীনে রয়েছি। আরব বলল: তোমাদের অপকর্মই তোমাদের এরূপ নিয়তি ডেকে আনবে। রুস্তম এ আরবের কথা শুনে রাগান্বিত হয়ে তার শিরোচ্ছেদের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তাঁর সেনাদল নিয়ে বুরসে পৌঁছে ছাউনী পাতলেন। সেখানে পৌঁছে তাঁর সেনাবাহিনী জনসাধারণের সম্পদ লুটপাট শুরু করল ,তাদের নারীদের জোরপূর্বক ছাউনীতে ধরে এনে নিপীড়ন চালাল। অতঃপর মদ ও নারী নিয়ে মেতে উঠল। সাধারণ মানুষের আর্তনাদ শুরু হলো। তখন রুস্তম তাঁর সেনাদলের প্রতি উদ্দেশ্য করে বললেন: হে ইরানীরা! এখন বুঝতে পারছি ঐ আরব সত্য বলেছে। প্রকৃতই আমাদের অপকর্ম আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি ডেকে আনবে। এখন আমার বিশ্বাস হচ্ছে আরবরা আমাদের ওপর জয়ী হবে। কারণ তাদের চরিত্র ও আচরণ আমাদের চেয়ে অনেক উত্তম। খোদা পূর্বে তোমাদের শত্রুদের ওপর বিজয় দান করতেন এ জন্য যে ,তোমরা উত্তম স্বভাবের ছিলে ,মানুষের ওপর অত্যাচারের অবসান ঘটাতে ও তাদের সঙ্গে সদাচারণ করতে ,কিন্তু এখন তোমরা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছ। তাই অবশ্যই তোমাদের ওপর হতে নিয়ামত তুলে নেয়া হবে।