ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 65882
ডাউনলোড: 2756

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 65882 / ডাউনলোড: 2756
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

ভারতবর্ষে ইরানীদের কর্মকাণ্ড

গজনভীরা প্রথম ইরানী হিসেবে পবিত্র ইসলামকে ভারতবর্ষে নিয়ে যায়। গজনভীদের সময় পাঞ্জাব প্রদেশ তাদের অধীনে ছিল এবং এ প্রদেশের সবচেয়ে বড় শহর লাহোর ছিল গজনভীদের প্রাদেশিক রাজধানী। এই বংশের শাসনামলে বেশ কিছু মনীষী ভারতে গমন করেন। তন্মধ্যে খোরাসানের প্রসিদ্ধ জ্ঞানী ব্যক্তি আল বিরুনীর নাম উল্লেখ্য। যদিও গজনভীদের আক্রমণের লক্ষ্য লুটপাট ও হত্যা ছাড়া কিছু ছিল না এবং তারা ইসলামের বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দিত না ,কিন্তু ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বলয়কে ধ্বংস করতে এ আক্রমণ ফলপ্রসূ ছিল এবং এতে উত্তরসূরিদের পথ উন্মুক্ত হয়।

ঘুরিগণ

ঘুরী সম্রাটগণ মূলত হেরাতের ঘুর হতে গিয়েছিলেন। ঘুরদের পূর্বপুরুষ শানসাব নামক এক ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছায় যিনি হযরত আলী (আ.)-এর সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আলী তাঁকে ঘুর অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন বনু উমাইয়্যাদের শাসনকালে যখন মসজিদের মিম্বারগুলোতে হযরত আলীর ওপর লানত পড়া হতো এবং বনু উমাইয়্যা প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের এ কর্মে বাধ্য করত তখন ঘুর অঞ্চলের অধিবাসীরা এতে কোন ক্রমেই রাজী হয়নি ,এমনকি ঘুর ও গুর্জেস্তানের শাসনকর্তারাও এ কর্মে রাজী হননি। প্রথম ঘুরী শাসক যিনি ভারতবর্ষে সামরিক অভিযান চালান তিনি হলেন সুলতান মুহাম্মদ সাম ঘুরী। তিনি দিল্লী জয় করেন ও একে রাজধানী ঘোষণা করেন। সপ্তম হিজরী শতাব্দীতে দিল্লী ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকদের রাজধানী হওয়ার পর হতে ইংরেজদের পদানত হওয়া পর্যন্ত তা-ই ছিল। ঘুরীরা ভারতবর্ষে ইসলামের প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়েছিল। তাদের শাসনকালে অসংখ্য আলেম ও মনীষী ভারতে যান ও সেখানেই থেকে যান। প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষে ইসলামের কাজ ঘুরীদের শাসনামলেই শুরু হয়। এ সময়েই মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গনসমূহ বিস্তৃতি লাভ করে।

ইরানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক ও মনীষী যিনি ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন তিনি হলেন খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতি। তিনি ভারতবর্ষে ব্যাপক অবদান রাখেন ও প্রচুর ছাত্র তৈরি করেন যাঁরা বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় নেতৃত্বের অধিকারী হন। তাঁর ধারার শিক্ষা এখনও ভারতবর্ষে বিদ্যমান। তাঁর মাযার ভারতের আজমীরে অবস্থিত এবং সকলেই তাঁকে সম্মান করে থাকেন।

তৈমুরিগণ (মোগলগণ)

তৈমুর লংয়ের বংশধর জহিরউদ্দীন মুহাম্মদ বাবর ভারতবর্ষে আক্রমণ চালান ও দিল্লী অধিকার করে তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরগণ চার শতাব্দী ভারতে রাজত্ব করেন। তৈমুরীদের সঙ্গে সাফাভী শাসকদের সুসম্পর্ক ছিল। এ সময় অনেক ইরানী ভারতে যায়। তৈমুরীদের সময় রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় সকল পদ ইরানীদের দখলে ছিল। অসংখ্য সুফী ,কবি ,আলেম ও ফকীহ্ ভারতে হিজরত করে বসবাস শুরু করেন ও সেখানে ইসলাম প্রচারের কাজ চালান। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে যে ইরানী ব্যক্তিত্ব ভারতবর্ষে খেদমতের উৎসে পরিণত হয়েছিলেন তিনি হলেন এতেমাদ্দৌলা মির্জা গিয়াস বেগ। তিনি পূর্বে খোরাসানে বসবাস করতেন এবং সম্রাট তাহমাসাবের পক্ষ হতে মারভের শাসনকর্তা ছিলেন। সম্রাট তাহমাসাব তাঁর ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর সকল সম্পত্তি ক্রোক করলে তিনি ভারতবর্ষে হিজরত করেন। সম্রাট জালালউদ্দীন আকবর তাঁকে রাজসভায় গ্রহণ করেন। আকবর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মির্জা গিয়াসের কন্যার বিবাহ দেন। নূর জাহান ভারতের সম্রাজ্ঞীর পদে অধিষ্ঠিত হন।

মির্জা গিয়াসের নাতনী (প্রপৌত্রী) মমতাজ মহলের সঙ্গে জাহাঙ্গীর পুত্র শাহজাহানের বিবাহ হয়। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও নজীরবিহীন ঐতিহাসিক নিদর্শন তাজমহল এই রমণীরই সমাধিস্থল। মির্জা গিয়াস শিয়া ছিলেন ,তাঁর সঙ্গে অনেক ইরানীই ভারতবর্ষে গমন করেন ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

দক্ষিণাত্যের কুতুবগণ

মুহাম্মদ আলী কুতুবশাহ ইরানের হামেদানে জন্মগ্রহণ ও যৌবনের প্রারম্ভেই ভারতে হিজরত করেন। তিনি পরবর্তীতে দক্ষিণাত্যের শাসনকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ও পরমর্শদাতা হন। যেহেতু তাঁর যথেষ্ট প্রতিভা ছিল তাই দিন দিন তাঁর পদমর্যাদা বাড়তে থাকে ও তিনি কুতুবুল মূলক উপাধি লাভ করেন। 918 হিজরীতে তিনি দক্ষিণাত্যের শাসন ক্ষমতা লাভ করেন। কুতুবশাহ শেখ সাফিউদ্দীন আরদিবিলীর ভক্ত ছিলেন। তাই যখন তিনি শুনলেন শাহ ইসমাঈল ইরানে শিয়া মাযহাবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তখন তিনি দক্ষিণাত্যেও তা করার সিদ্ধান্ত নেন ও শিয়া মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় মাযহাব ঘোষণা করেন।

কুতুবশাহ বংশ দক্ষিণাত্যে ইসলাম ও শিয়া মাযহাবের প্রচারের প্রচেষ্টা চালায় এবং তাঁদের শাসনামলে ইরানীদের এক দল সেখানে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। তৎকালীন সময়ে যে সকল ইরানী ভারতবর্ষে হিজরত করেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব হলেন মীর মুহাম্মদ মুমেন আসতারাবাদী। তিনি একজন বড় আলেম ও হাদীসশাস্ত্রবিদ ছিলেন ও পঁচিশ বছর সুলতানের পক্ষ হতে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি তৎকালীন সময়ের প্রচলিত বুদ্ধিবৃত্তিক209 ও বর্ণনামূলক210 জ্ঞানসমূহে সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বিজ্ঞ বলে পরিচিত ছিলেন। কুতুবশাহ বংশ এ অঞ্চলে দু বছরের মত রাজত্ব করেছে। তাঁদের উজ্জ্বল ইতিহাস গ্রন্থসমূহে বিধৃত হয়েছে।

বিজাপুরের আদিল শাহ বংশ

এ রাজবংশের প্রধান হলেন ইউসুফ আদিল শাহ যিনি একজন ইরানী ও সাভে প্রদেশে শৈশব অতিবাহিত করেছেন। তিনি তাঁর যৌবনকালের প্রারম্ভে ইরান হতে ভারতবর্ষে গমন করেন এবং ভারতে পৌঁছে বিজাপুরের শাসনকর্তার অধীনে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি এতদঞ্চলের সুলতান হন এবং ইউসুফ আদিল শাহ সাভেঈ বলে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনিও শিয়া মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালান। তাঁর শাসনামলে মধ্যভারতের হিন্দুশাসিত বৃহৎ অংশ মুসলমানদের হস্তগত হয়। তাঁর রাজদরবারে সব সময়ই ইরানী আলেম ও মনীষীদের উপস্থিতি ছিল। মদীনা মুনাওয়ারা ,নাজাফে আশরাফ ও কারবালার সাইয়্যেদগণের এক বড় অংশও তাঁর রাজদরবারে আলেমদের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রচার কাজে অংশগ্রহণ ও ভূমিকা রাখতেন। তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মে নিয়োজিত অধিকাংশ ব্যক্তি ছিলেন ইরানী। এই শাসকবর্গের রাজত্বের ইতিহাস গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে ভারতবর্ষের ইসলামী ইতিহাস গ্রন্থের নাম স্মরণীয়।

আহমাদ নগরের নিজামশাহী বংশ

এ রাজবংশের প্রধান হলেন তিমাভাট নামের এক ভারতীয় যিনি সুলতান আহমাদ শাহ বাহনামীর শাসনামলে মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। সুলতান তাঁকে বুদ্ধিমান ও সম্ভাবনাময় লক্ষ্য করে নিজ পুত্র মুহাম্মদ শাহের সঙ্গী হিসেবে মক্তবে প্রেরণ করেন। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই ফার্সী পঠন ও লিখন পদ্ধতি শিক্ষালাভ ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। সুলতান তাঁকে মুলকে হাসান বাহরী উপাধি দান করেন। পরবর্তীতে তিনি এতদঞ্চলের শাসনভার গ্রহণ করেন ও সিংহাসন লাভের পর শিয়া মাযহাব গ্রহণ করে জাফরী ফিকাহর প্রসারে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালান।

নিজামশাহী শাসকবর্গের রাজদরবারের অধিকাংশ রাজকীয় ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ইরানী বংশোদ্ভূত ছিলেন। তাঁরা ধর্মীয় ও শাসন সংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনা করতেন। এ রাজবংশের শাসনকালেই শাহ তাহের হামেদানী (দাক্কানী বা দুকনী নামে প্রসিদ্ধ) ভারতবর্ষে আশ্রয় নেন। তিনি প্রথমে শাহ ইসমাঈল সাফাভীর কৃতজ্ঞভাজন থাকলেও পরবর্তীতে তাঁর বিরোধিতার কারণে বিরাগভাজন হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেন। তাই গোপনে ভারতে পালিয়ে যান ও নিজামশাহীদের রাজদরবারে আশ্রয় নেন এবং সেখানে মহাসম্মানের সঙ্গে গৃহীত হন। ভারতবর্ষে শাহ তাহেরের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ইসলামের বিবিধ বিষয়ে আলেমদের প্রশিক্ষিত করে তোলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দীনী মাদ্রাসা ভারতবর্ষের তৎকালীন অন্যতম বৃহত্তম মাদ্রাসা ছিল। তিনি যেমন সম্মানিত ছিলেন তাঁর ভূমিকাও তেমনি মূল্যবান ছিল। তাঁর অবদানের প্রেক্ষিতে তাঁর নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচিত হওয়া উচিত। নিজামশাহী বংশের অবদানও ইতিহাসগ্রন্থসমূহে বিধৃত হয়েছে তবে তাঁদের কর্মকাণ্ড ও ভূমিকার ওপর পুরু একটি গ্রন্থ রচিত হওয়া আবশ্যক।

অযোধ্যার নিশাবুরী সুলতানগণ

শাহ সুলতান হুসাইন সাফাভীর সময়কালে সাইয়্যেদ মুহাম্মদ নামের নিশাবুরের একজন আলেম ভারতে যান ও দিল্লীতে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সন্তানরা বিভিন্ন সরকারী (রাজদরবারে) পদ লাভ করেন এবং ধীরে ধীরে গুরুত্ব পেতে শুরু করেন। বোরহানুল মূলক নামের তাঁর এক প্রপৌত্র এই অযোধ্যার সুবেদার হন। বেশ কিছুদিন পর তিনি স্বাধীনতা লাভ করে দিল্লীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন। তাঁর পরবর্তীতে তাঁর সন্তানরা এ প্রদেশে শাসন ক্ষমতা লাভ করে।

নিশাবুরের এই শাসকগণের সময় মাশহাদ ,নিশাবুর ও খোরাসানের অন্যান্য শহর হতে উল্লেখযোগ্য ইরানী ভারতবর্ষে গমন করেন এবং এ প্রদেশের রাজধানী লক্ষে èৗতে বসবাস শুরু করেন। তাই এ শহরের প্রায় সকল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব খোরাসানের অধিবাসী ছিলেন। নিশাবুরের নাকাভী সাইয়্যেদগণ (ইমাম আলী নাকীর বংশধর) এ সময়েই ভারতবর্ষে যান। আবাকাতুল আনওয়ার গ্রন্থের রচয়িতা মরহুম মীর হামিদ হুসাইন নিশাবুরী এই শাসকবর্গের সময়েই তাঁর ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। নিশাবুরের এ সম্রাটগণের ইতিহাস ভারতীয় ইতিহাসগ্রন্থসমূহে উল্লিখিত হয়েছে।

কাশ্মীরে ইসলাম

মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে 710 হিজরী পর্যন্ত কাশ্মীরের অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করেনি। এ শতাব্দীতেই একজন ইরানী দরবেশের পোষাক পরিধান করে কাশ্মীরে প্রবেশ করেন এবং ধর্মীয় প্রচার শুরু করেন। যেহেতু ভারত ও কাশ্মীরের মানুষ দুনিয়াত্যাগী দরবেশদের পছন্দ করত তাই তারা তাঁর চারিদিকে ভীড় জমাল। এভাবে ধীরে ধীরে তাঁর প্রভাব বাড়তে লাগলো।

কাসিম ফিরিশতা তাঁর তারিখে ফিরিশতা গ্রন্থে লিখেছেন , এ ব্যক্তির নাম ছিল শাহ মির্জা। তিনি রাজা সিয়েদেব-এর শাসনামলে কাশ্মীরের শ্রীনগরে যান ও তাঁর দরবারে চাকুরী নেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এই রাজার মনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন ও নিজের জন্য পথ উন্মুক্ত করতে থাকেন। কিছুদিন পর সিয়েদেবের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র রঞ্জন সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং শাহ মির্জাকে মন্ত্রী ও পরামর্শদাতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এ সময় মির্জা অধিকতর ক্ষমতা লাভ করায় তাঁর সন্তানরা বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ইত্যবসরে রাজা রঞ্জনের মৃত্যু হলে তাঁর স্ত্রী রাজ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। শাহ মির্জা ও তাঁর সন্তানরা তাঁর সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু করেন। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে শাহ মির্জাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ইসলাম কবুল করেন । এর ফলে শাহ মির্জা স্বয়ং রাজার দায়িত্ব নেন ও নিজেকে রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি শামসুদ্দীন উপাধি ধারণ করে তাঁর নামে খুতবা পড়ার নির্দেশ দেন।

তিনিই কাশ্মীরে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তন করেন এবং মানুষের মাঝে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের চেষ্টায় ব্রত হন। ফলে কিছুদিনের মধ্যে কাশ্মীরের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হয়।

অন্য যে ব্যক্তিটি কাশ্মীরে ইসলামের সেবায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন তিনি হলেন মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানী। ইসলামের প্রবাদ এই ব্যক্তিত্ব কাশ্মীরে সহস্র ছাত্র তৈরি করেছেন যাঁদের প্রত্যেকেই পরবর্তীতে উঁচু মানের শিক্ষকে পরিণত হয়েছিলেন। কাশ্মীরে এখন তাঁর নাম সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয়। তাঁর কবরে সহস্র লোক যিয়ারত করে। আশুরার দিন শোকাহত জনতা তাঁর মাজারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের পতাকাসমূহ তাঁর সম্মানে নীচু করে।

চীনে ইসলাম

স্পষ্টরূপে বলা সম্ভব নয় যে ,চীনে ইসলাম কিভাবে ও কখন প্রবেশ করেছিল। এতটুকু জানা যায় ,ইসলামের আবির্ভাবের প্রথম শতাব্দীগুলোতেই সামারকান্দ ,বুখারা ও খাওয়ারেজমের কিছু ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ইসলাম সেখানে প্রচারিত হয়। খাওয়ারেজম শাহী আমলে বিশেষত আলাউদ্দীন মুহাম্মদ খাওয়ারেজম শাহ যখন তুর্কিস্তান ও আতরাবা দখল করেন তখন ইরানীদের চীনে যাতায়াত ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। মোগলদের ইরান জয়ের পর প্রচুর সংখ্যক ইরানী চীনে গমন করে। চেঙ্গিস খান খোরাসান দখলের পর সেখানকার জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদেরকে চীন ও মঙ্গোলিয়ায় তাঁর সঙ্গে নিয়ে যান। তিনি জ্ঞান ও স্থাপত্যকলায় পারদর্শী এই সকল ব্যক্তিকে চীন ও মঙ্গোলিয়ার মানুষদের প্রশিক্ষিত ,স্থাপত্য ও শিল্পকলা শিক্ষাদানের নির্দেশ দেন। ইরানের প্রচলিত শিল্প ও স্থাপত্যকলা ছাড়াও তাঁরা তাদের ধর্ম শিক্ষা দান করতেন। এভাবেই ইরানীদের মাধ্যমে ইসলাম চীনে পরিচিত হয়। চীনা মুসলমানদের সকল ধর্মীয় গ্রন্থ ফার্সী ভাষায় রচিত হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায় ইসলাম

পবিত্র ইসলাম ধর্ম ভারতবর্ষ ,পারস্য উপসাগরের বন্দরসমূহ ও ওমান সাগর হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ,ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও পূর্ব আফ্রিকায় পৌঁছায়। এসব অঞ্চলেও ইসলাম প্রসারে ইরানী নাবিক ও ব্যবসায়ীদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল । মোগলদের ইরান আক্রমণের সময় এতদঞ্চলের শহরসমূহ ধ্বংস হওয়ায় অনেক মনীষী ও ব্যবসায়ী এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যান। ইরানের পূর্বাঞ্চলের লোকজন ভারতবর্ষে হিজরত করে এবং মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের অধিবাসীরা সমুদ্রপথে অন্য দেশে পাড়ি জমায়।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চল ,পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর তীরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীরা মোগলদের বিশেষত তৈমুর লংয়ের আক্রমণের পর বাধ্য হয়ে দূরবর্তী কোন অঞ্চলে পুঁজি