ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 51638
ডাউনলোড: 2263

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 51638 / ডাউনলোড: 2263
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

ভারতবর্ষে ইরানীদের কর্মকাণ্ড

গজনভীরা প্রথম ইরানী হিসেবে পবিত্র ইসলামকে ভারতবর্ষে নিয়ে যায়। গজনভীদের সময় পাঞ্জাব প্রদেশ তাদের অধীনে ছিল এবং এ প্রদেশের সবচেয়ে বড় শহর লাহোর ছিল গজনভীদের প্রাদেশিক রাজধানী। এই বংশের শাসনামলে বেশ কিছু মনীষী ভারতে গমন করেন। তন্মধ্যে খোরাসানের প্রসিদ্ধ জ্ঞানী ব্যক্তি আল বিরুনীর নাম উল্লেখ্য। যদিও গজনভীদের আক্রমণের লক্ষ্য লুটপাট ও হত্যা ছাড়া কিছু ছিল না এবং তারা ইসলামের বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দিত না ,কিন্তু ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বলয়কে ধ্বংস করতে এ আক্রমণ ফলপ্রসূ ছিল এবং এতে উত্তরসূরিদের পথ উন্মুক্ত হয়।

ঘুরিগণ

ঘুরী সম্রাটগণ মূলত হেরাতের ঘুর হতে গিয়েছিলেন। ঘুরদের পূর্বপুরুষ শানসাব নামক এক ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছায় যিনি হযরত আলী (আ.)-এর সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আলী তাঁকে ঘুর অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন বনু উমাইয়্যাদের শাসনকালে যখন মসজিদের মিম্বারগুলোতে হযরত আলীর ওপর লানত পড়া হতো এবং বনু উমাইয়্যা প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের এ কর্মে বাধ্য করত তখন ঘুর অঞ্চলের অধিবাসীরা এতে কোন ক্রমেই রাজী হয়নি ,এমনকি ঘুর ও গুর্জেস্তানের শাসনকর্তারাও এ কর্মে রাজী হননি। প্রথম ঘুরী শাসক যিনি ভারতবর্ষে সামরিক অভিযান চালান তিনি হলেন সুলতান মুহাম্মদ সাম ঘুরী। তিনি দিল্লী জয় করেন ও একে রাজধানী ঘোষণা করেন। সপ্তম হিজরী শতাব্দীতে দিল্লী ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকদের রাজধানী হওয়ার পর হতে ইংরেজদের পদানত হওয়া পর্যন্ত তা-ই ছিল। ঘুরীরা ভারতবর্ষে ইসলামের প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়েছিল। তাদের শাসনকালে অসংখ্য আলেম ও মনীষী ভারতে যান ও সেখানেই থেকে যান। প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষে ইসলামের কাজ ঘুরীদের শাসনামলেই শুরু হয়। এ সময়েই মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গনসমূহ বিস্তৃতি লাভ করে।

ইরানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক ও মনীষী যিনি ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন তিনি হলেন খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতি। তিনি ভারতবর্ষে ব্যাপক অবদান রাখেন ও প্রচুর ছাত্র তৈরি করেন যাঁরা বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় নেতৃত্বের অধিকারী হন। তাঁর ধারার শিক্ষা এখনও ভারতবর্ষে বিদ্যমান। তাঁর মাযার ভারতের আজমীরে অবস্থিত এবং সকলেই তাঁকে সম্মান করে থাকেন।

তৈমুরিগণ (মোগলগণ)

তৈমুর লংয়ের বংশধর জহিরউদ্দীন মুহাম্মদ বাবর ভারতবর্ষে আক্রমণ চালান ও দিল্লী অধিকার করে তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরগণ চার শতাব্দী ভারতে রাজত্ব করেন। তৈমুরীদের সঙ্গে সাফাভী শাসকদের সুসম্পর্ক ছিল। এ সময় অনেক ইরানী ভারতে যায়। তৈমুরীদের সময় রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় সকল পদ ইরানীদের দখলে ছিল। অসংখ্য সুফী ,কবি ,আলেম ও ফকীহ্ ভারতে হিজরত করে বসবাস শুরু করেন ও সেখানে ইসলাম প্রচারের কাজ চালান। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে যে ইরানী ব্যক্তিত্ব ভারতবর্ষে খেদমতের উৎসে পরিণত হয়েছিলেন তিনি হলেন এতেমাদ্দৌলা মির্জা গিয়াস বেগ। তিনি পূর্বে খোরাসানে বসবাস করতেন এবং সম্রাট তাহমাসাবের পক্ষ হতে মারভের শাসনকর্তা ছিলেন। সম্রাট তাহমাসাব তাঁর ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর সকল সম্পত্তি ক্রোক করলে তিনি ভারতবর্ষে হিজরত করেন। সম্রাট জালালউদ্দীন আকবর তাঁকে রাজসভায় গ্রহণ করেন। আকবর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মির্জা গিয়াসের কন্যার বিবাহ দেন। নূর জাহান ভারতের সম্রাজ্ঞীর পদে অধিষ্ঠিত হন।

মির্জা গিয়াসের নাতনী (প্রপৌত্রী) মমতাজ মহলের সঙ্গে জাহাঙ্গীর পুত্র শাহজাহানের বিবাহ হয়। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও নজীরবিহীন ঐতিহাসিক নিদর্শন তাজমহল এই রমণীরই সমাধিস্থল। মির্জা গিয়াস শিয়া ছিলেন ,তাঁর সঙ্গে অনেক ইরানীই ভারতবর্ষে গমন করেন ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

দক্ষিণাত্যের কুতুবগণ

মুহাম্মদ আলী কুতুবশাহ ইরানের হামেদানে জন্মগ্রহণ ও যৌবনের প্রারম্ভেই ভারতে হিজরত করেন। তিনি পরবর্তীতে দক্ষিণাত্যের শাসনকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ও পরমর্শদাতা হন। যেহেতু তাঁর যথেষ্ট প্রতিভা ছিল তাই দিন দিন তাঁর পদমর্যাদা বাড়তে থাকে ও তিনি কুতুবুল মূলক উপাধি লাভ করেন। 918 হিজরীতে তিনি দক্ষিণাত্যের শাসন ক্ষমতা লাভ করেন। কুতুবশাহ শেখ সাফিউদ্দীন আরদিবিলীর ভক্ত ছিলেন। তাই যখন তিনি শুনলেন শাহ ইসমাঈল ইরানে শিয়া মাযহাবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তখন তিনি দক্ষিণাত্যেও তা করার সিদ্ধান্ত নেন ও শিয়া মাযহাবকে রাষ্ট্রীয় মাযহাব ঘোষণা করেন।

কুতুবশাহ বংশ দক্ষিণাত্যে ইসলাম ও শিয়া মাযহাবের প্রচারের প্রচেষ্টা চালায় এবং তাঁদের শাসনামলে ইরানীদের এক দল সেখানে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। তৎকালীন সময়ে যে সকল ইরানী ভারতবর্ষে হিজরত করেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব হলেন মীর মুহাম্মদ মুমেন আসতারাবাদী। তিনি একজন বড় আলেম ও হাদীসশাস্ত্রবিদ ছিলেন ও পঁচিশ বছর সুলতানের পক্ষ হতে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি তৎকালীন সময়ের প্রচলিত বুদ্ধিবৃত্তিক209 ও বর্ণনামূলক210 জ্ঞানসমূহে সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বিজ্ঞ বলে পরিচিত ছিলেন। কুতুবশাহ বংশ এ অঞ্চলে দু বছরের মত রাজত্ব করেছে। তাঁদের উজ্জ্বল ইতিহাস গ্রন্থসমূহে বিধৃত হয়েছে।

বিজাপুরের আদিল শাহ বংশ

এ রাজবংশের প্রধান হলেন ইউসুফ আদিল শাহ যিনি একজন ইরানী ও সাভে প্রদেশে শৈশব অতিবাহিত করেছেন। তিনি তাঁর যৌবনকালের প্রারম্ভে ইরান হতে ভারতবর্ষে গমন করেন এবং ভারতে পৌঁছে বিজাপুরের শাসনকর্তার অধীনে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি এতদঞ্চলের সুলতান হন এবং ইউসুফ আদিল শাহ সাভেঈ বলে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনিও শিয়া মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালান। তাঁর শাসনামলে মধ্যভারতের হিন্দুশাসিত বৃহৎ অংশ মুসলমানদের হস্তগত হয়। তাঁর রাজদরবারে সব সময়ই ইরানী আলেম ও মনীষীদের উপস্থিতি ছিল। মদীনা মুনাওয়ারা ,নাজাফে আশরাফ ও কারবালার সাইয়্যেদগণের এক বড় অংশও তাঁর রাজদরবারে আলেমদের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রচার কাজে অংশগ্রহণ ও ভূমিকা রাখতেন। তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মে নিয়োজিত অধিকাংশ ব্যক্তি ছিলেন ইরানী। এই শাসকবর্গের রাজত্বের ইতিহাস গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে ভারতবর্ষের ইসলামী ইতিহাস গ্রন্থের নাম স্মরণীয়।

আহমাদ নগরের নিজামশাহী বংশ

এ রাজবংশের প্রধান হলেন তিমাভাট নামের এক ভারতীয় যিনি সুলতান আহমাদ শাহ বাহনামীর শাসনামলে মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। সুলতান তাঁকে বুদ্ধিমান ও সম্ভাবনাময় লক্ষ্য করে নিজ পুত্র মুহাম্মদ শাহের সঙ্গী হিসেবে মক্তবে প্রেরণ করেন। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই ফার্সী পঠন ও লিখন পদ্ধতি শিক্ষালাভ ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। সুলতান তাঁকে মুলকে হাসান বাহরী উপাধি দান করেন। পরবর্তীতে তিনি এতদঞ্চলের শাসনভার গ্রহণ করেন ও সিংহাসন লাভের পর শিয়া মাযহাব গ্রহণ করে জাফরী ফিকাহর প্রসারে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালান।

নিজামশাহী শাসকবর্গের রাজদরবারের অধিকাংশ রাজকীয় ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ইরানী বংশোদ্ভূত ছিলেন। তাঁরা ধর্মীয় ও শাসন সংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনা করতেন। এ রাজবংশের শাসনকালেই শাহ তাহের হামেদানী (দাক্কানী বা দুকনী নামে প্রসিদ্ধ) ভারতবর্ষে আশ্রয় নেন। তিনি প্রথমে শাহ ইসমাঈল সাফাভীর কৃতজ্ঞভাজন থাকলেও পরবর্তীতে তাঁর বিরোধিতার কারণে বিরাগভাজন হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেন। তাই গোপনে ভারতে পালিয়ে যান ও নিজামশাহীদের রাজদরবারে আশ্রয় নেন এবং সেখানে মহাসম্মানের সঙ্গে গৃহীত হন। ভারতবর্ষে শাহ তাহেরের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ইসলামের বিবিধ বিষয়ে আলেমদের প্রশিক্ষিত করে তোলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দীনী মাদ্রাসা ভারতবর্ষের তৎকালীন অন্যতম বৃহত্তম মাদ্রাসা ছিল। তিনি যেমন সম্মানিত ছিলেন তাঁর ভূমিকাও তেমনি মূল্যবান ছিল। তাঁর অবদানের প্রেক্ষিতে তাঁর নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচিত হওয়া উচিত। নিজামশাহী বংশের অবদানও ইতিহাসগ্রন্থসমূহে বিধৃত হয়েছে তবে তাঁদের কর্মকাণ্ড ও ভূমিকার ওপর পুরু একটি গ্রন্থ রচিত হওয়া আবশ্যক।

অযোধ্যার নিশাবুরী সুলতানগণ

শাহ সুলতান হুসাইন সাফাভীর সময়কালে সাইয়্যেদ মুহাম্মদ নামের নিশাবুরের একজন আলেম ভারতে যান ও দিল্লীতে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সন্তানরা বিভিন্ন সরকারী (রাজদরবারে) পদ লাভ করেন এবং ধীরে ধীরে গুরুত্ব পেতে শুরু করেন। বোরহানুল মূলক নামের তাঁর এক প্রপৌত্র এই অযোধ্যার সুবেদার হন। বেশ কিছুদিন পর তিনি স্বাধীনতা লাভ করে দিল্লীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন। তাঁর পরবর্তীতে তাঁর সন্তানরা এ প্রদেশে শাসন ক্ষমতা লাভ করে।

নিশাবুরের এই শাসকগণের সময় মাশহাদ ,নিশাবুর ও খোরাসানের অন্যান্য শহর হতে উল্লেখযোগ্য ইরানী ভারতবর্ষে গমন করেন এবং এ প্রদেশের রাজধানী লক্ষে èৗতে বসবাস শুরু করেন। তাই এ শহরের প্রায় সকল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব খোরাসানের অধিবাসী ছিলেন। নিশাবুরের নাকাভী সাইয়্যেদগণ (ইমাম আলী নাকীর বংশধর) এ সময়েই ভারতবর্ষে যান। আবাকাতুল আনওয়ার গ্রন্থের রচয়িতা মরহুম মীর হামিদ হুসাইন নিশাবুরী এই শাসকবর্গের সময়েই তাঁর ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। নিশাবুরের এ সম্রাটগণের ইতিহাস ভারতীয় ইতিহাসগ্রন্থসমূহে উল্লিখিত হয়েছে।

কাশ্মীরে ইসলাম

মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে 710 হিজরী পর্যন্ত কাশ্মীরের অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করেনি। এ শতাব্দীতেই একজন ইরানী দরবেশের পোষাক পরিধান করে কাশ্মীরে প্রবেশ করেন এবং ধর্মীয় প্রচার শুরু করেন। যেহেতু ভারত ও কাশ্মীরের মানুষ দুনিয়াত্যাগী দরবেশদের পছন্দ করত তাই তারা তাঁর চারিদিকে ভীড় জমাল। এভাবে ধীরে ধীরে তাঁর প্রভাব বাড়তে লাগলো।

কাসিম ফিরিশতা তাঁর তারিখে ফিরিশতা গ্রন্থে লিখেছেন , এ ব্যক্তির নাম ছিল শাহ মির্জা। তিনি রাজা সিয়েদেব-এর শাসনামলে কাশ্মীরের শ্রীনগরে যান ও তাঁর দরবারে চাকুরী নেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এই রাজার মনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন ও নিজের জন্য পথ উন্মুক্ত করতে থাকেন। কিছুদিন পর সিয়েদেবের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র রঞ্জন সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং শাহ মির্জাকে মন্ত্রী ও পরামর্শদাতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এ সময় মির্জা অধিকতর ক্ষমতা লাভ করায় তাঁর সন্তানরা বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ইত্যবসরে রাজা রঞ্জনের মৃত্যু হলে তাঁর স্ত্রী রাজ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। শাহ মির্জা ও তাঁর সন্তানরা তাঁর সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু করেন। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে শাহ মির্জাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ইসলাম কবুল করেন । এর ফলে শাহ মির্জা স্বয়ং রাজার দায়িত্ব নেন ও নিজেকে রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি শামসুদ্দীন উপাধি ধারণ করে তাঁর নামে খুতবা পড়ার নির্দেশ দেন।

তিনিই কাশ্মীরে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তন করেন এবং মানুষের মাঝে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের চেষ্টায় ব্রত হন। ফলে কিছুদিনের মধ্যে কাশ্মীরের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হয়।

অন্য যে ব্যক্তিটি কাশ্মীরে ইসলামের সেবায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন তিনি হলেন মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানী। ইসলামের প্রবাদ এই ব্যক্তিত্ব কাশ্মীরে সহস্র ছাত্র তৈরি করেছেন যাঁদের প্রত্যেকেই পরবর্তীতে উঁচু মানের শিক্ষকে পরিণত হয়েছিলেন। কাশ্মীরে এখন তাঁর নাম সম্মানের সাথে স্মরণ করা হয়। তাঁর কবরে সহস্র লোক যিয়ারত করে। আশুরার দিন শোকাহত জনতা তাঁর মাজারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের পতাকাসমূহ তাঁর সম্মানে নীচু করে।

চীনে ইসলাম

স্পষ্টরূপে বলা সম্ভব নয় যে ,চীনে ইসলাম কিভাবে ও কখন প্রবেশ করেছিল। এতটুকু জানা যায় ,ইসলামের আবির্ভাবের প্রথম শতাব্দীগুলোতেই সামারকান্দ ,বুখারা ও খাওয়ারেজমের কিছু ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ইসলাম সেখানে প্রচারিত হয়। খাওয়ারেজম শাহী আমলে বিশেষত আলাউদ্দীন মুহাম্মদ খাওয়ারেজম শাহ যখন তুর্কিস্তান ও আতরাবা দখল করেন তখন ইরানীদের চীনে যাতায়াত ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। মোগলদের ইরান জয়ের পর প্রচুর সংখ্যক ইরানী চীনে গমন করে। চেঙ্গিস খান খোরাসান দখলের পর সেখানকার জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদেরকে চীন ও মঙ্গোলিয়ায় তাঁর সঙ্গে নিয়ে যান। তিনি জ্ঞান ও স্থাপত্যকলায় পারদর্শী এই সকল ব্যক্তিকে চীন ও মঙ্গোলিয়ার মানুষদের প্রশিক্ষিত ,স্থাপত্য ও শিল্পকলা শিক্ষাদানের নির্দেশ দেন। ইরানের প্রচলিত শিল্প ও স্থাপত্যকলা ছাড়াও তাঁরা তাদের ধর্ম শিক্ষা দান করতেন। এভাবেই ইরানীদের মাধ্যমে ইসলাম চীনে পরিচিত হয়। চীনা মুসলমানদের সকল ধর্মীয় গ্রন্থ ফার্সী ভাষায় রচিত হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায় ইসলাম

পবিত্র ইসলাম ধর্ম ভারতবর্ষ ,পারস্য উপসাগরের বন্দরসমূহ ও ওমান সাগর হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ,ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও পূর্ব আফ্রিকায় পৌঁছায়। এসব অঞ্চলেও ইসলাম প্রসারে ইরানী নাবিক ও ব্যবসায়ীদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল । মোগলদের ইরান আক্রমণের সময় এতদঞ্চলের শহরসমূহ ধ্বংস হওয়ায় অনেক মনীষী ও ব্যবসায়ী এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যান। ইরানের পূর্বাঞ্চলের লোকজন ভারতবর্ষে হিজরত করে এবং মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের অধিবাসীরা সমুদ্রপথে অন্য দেশে পাড়ি জমায়।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চল ,পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর তীরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীরা মোগলদের বিশেষত তৈমুর লংয়ের আক্রমণের পর বাধ্য হয়ে দূরবর্তী কোন অঞ্চলে পুঁজিসহ হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেয়। পুঁজি নষ্ট বা হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে তাদের অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবাসী হয়। পূর্ব আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ায় হিজরতকারী অধিকাংশ ইরানীই এ অঞ্চলের। মোটামুটিভাবে বলা যায় এই প্রবাসী ইরানীদের মাধ্যমেই এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। তারা তাদের বক্তব্য ও উপদেশের মাধ্যমে স্থানীয়দের ইসলামের মহাসত্যের পথ প্রদর্শন করত। ইরানীদের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন এখনও এতদঞ্চলে বিদ্যমান রয়েছে। এ বিষয়ে গবেষণানির্ভর গ্রন্থ রচিত হওয়া উচিত।

উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার ইরানীদের ইসলাম প্রচারে অবদান

এ নিবন্ধের প্রথমে আমরা উল্লেখ করেছি পূর্ব ইরানের খোরাসানের অধিবাসীরা সাহসী এক আন্দোলনের মাধ্যমে উমাইয়্যা শাসনের পতন ঘটায়। আব্বাসীরা ক্ষমতায় আরোহণের পর নিজস্ব কিছু লোক ছাড়া আরবদের সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতার বিভিন্ন পদ হতে দূরে সরিয়ে রাখে। যেহেতু খোরাসানীদের পক্ষ হতে অভ্যুত্থানের কারণে তাদের ক্ষমতা লাভ সম্ভব হয়েছিল সেহেতু অধিকাংশ প্রদেশেই তারা খোরাসানীদের প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিযুক্ত করে।

মামুনের শাসনকালে যখন তিনি খোরাসান হতে বাগদাদে ফিরে আসেন তখন খোরাসানের কিছু সম্ভ্রান্ত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। মামুন তাঁদের সকলকেই বিভিন্ন পদ দান করেন ও বিভিন্ন শহরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন। বিশেষত যে অঞ্চলটির প্রতি বনি আব্বাস বিশেষ দৃষ্টি রাখত ও তার বিষয়ে ভীত ছিল সেটি হলো উত্তর আফ্রিকা ও দূর পাশ্চাত্য। কারণ তখনও স্পেন (আন্দালুস) উমাইয়্যাদের হাতে ছিল এবং তারা ঐ দিক হতে আক্রমণের ভয় করত।

এ কারণেই আব্বাসীয় খলীফা মাহ্দীর শাসনামল হতে মিশর ও আফ্রিকার শাসনকর্তাদের খোরাসানীদের মধ্য হতে নির্বাচন করত ;কারণ তারা বনু উমাইয়্যার চরম শত্রু ছিল। এ সময়ে ইরানের পূর্বাঞ্চলের ও খোরাসানের অধিবাসীদের প্রভাব মিশর ও উত্তর আফ্রিকায় ব্যাপক বেড়ে যায় এবং তারা ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পায়। সে সাথে ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ বা সন্ধি স্থাপনের ক্ষমতাও লাভ করে।

এ ইরানী পরিবারসমূহ দূর পাশ্চাত্য ,ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ ও এশিয়া মাইনরের দেশগুলোতে ইসলামের প্রচারে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালায়। আমরা নিম্নে মাহ্দী আব্বাসীর সময়কাল হতে ফাতেমীদের সময়কাল পর্যন্ত যে সকল ইরানী মিশর ও উত্তর আফ্রিকায় শাসনকর্তা ছিলেন তার উল্লেখ করছি :

1. ইয়াহইয়া ইবনে দাউদ নিশাবুরী

2. মুসল্লামাহ্ ইবনে ইয়াহইয়া খোরাসানী

3. ইবাদ ইবনে মুহাম্মদ বালখী

4. সারী ইবনে হাকাম বালখী

5. মুহাম্মদ ইবনে সারী বালখী

6. আবদুল্লাহ্ ইবনে সারী বালখী

7. আবদুল্লাহ্ ইবনে তাহের বুশানজী

8. উমাইর বদগাইসী হারভী

9. ইসহাক ইবনে ইয়াহইয়া সামারকান্দী

10. আবদুল ওয়াহেদ বুশানজী

11. আনবাসাহ্ ইবনে ইসহাক হারভী

12. ইয়াযীদ ইবনে আবদুল্লাহ্

13. মুযাহিম ইবনে খাকান

14. আহমাদ ইবনে মুযাহিম

15. আরখুজ ইবনে আউলাগ

16. আ হমাদ ইবনে তুলুন ফারগানী

17. খামারুইয়াহ্ ইবনে আহমাদ ফারগানী

18. জাইশ ইবনে খামারুইয়াহ্ ফারগানী

19. হারুন ইবনে খামারুইয়াহ্ ফারগানী

20. ঈসা নুশাহরী বালখী

21. শাইবান ইবনে আহমাদ ফারগানী

22. মুহাম্মদ ইবনে আলী খালানজী

23. মুহাম্মদ ইবনে তাগবাজ ফারগানী

24. আনুজুর ইবনে আখশিদ ফারগানী

25. আলী ইবনে আখশিদ

26. আহমাদ ইবনে আলী ইবনে আখশিদ

27. শো লে আখশিদী

28. হাসান ইবনে উবাইদুল্লাহ আখশিদী

29. ফাতেক আখশিদী আমীরে শাম

30. হুসাইন ইবনে আহমাদ ইবনে রুস্তম

উপরিউক্ত 30 ব্যক্তি খোরাসানের। তাঁরা ধারাবাহিকভাবে দু বছর মিশর ,উত্তর আফ্রিকা ,দূর পাশ্চাত্য ,ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী অঞ্চলসহ আটলান্টিক মহাসাগরের কূল ঘেঁষে অবস্থিত দেশসমূহে যা ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল তাতে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষা ,ইসলামী শরীয়তের প্রচার এবং স্পেনসহ ইউরোপের কোন কোন অঞ্চলের বিজয়ে তাঁরা ভূমিকা রেখেছিলেন। এই সময়কালে খোরাসান ও ইরানের অন্যান্য শহর হতে শত শত আলেম ,ফকীহ্ ,মুজতাহিদ ,মুফাসসির ,মুহাদ্দিস ,কাযী (বিচারক) ,বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ অঞ্চলে হিজরত করেন এবং সেখানে ইসলামের শিক্ষা ও মৌলনীতিকে দৃঢ় ও প্রতিষ্ঠিত করেন। স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার ইসলামের ইতিহাস ,সাহিত্য ও অন্যান্য গ্রন্থে প্রচুর ইরানীর নাম লক্ষ্য করা যায় যা বৃহত্তর খোরাসানের ইতিহাস গ্রন্থে তিউনিসিয়া ও মরক্কোর বিভিন্ন গ্রন্থাগারের সূত্রে আজিজুল্লাহ্ আত্তারাদী বর্ণনা করেছেন।

প্রতিক্রিয়াসমূহ

ইরানীদের ইসলামের প্রতি আন্তরিকতা ও ইখলাস প্রমাণের জন্য অত্যন্ত বলিষ্ঠ একটি উদাহরণ হলো দ্বিতীয় হিজরীতে ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ের বিরোধী কিছু ধারার বিরুদ্ধে ইরানীদের প্রতিক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে তারা এ বিরোধী ধারাসমূহকে শক্তিশালী করেছে নাকি তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে তা আমরা আলোচনা করব।

তিনটি ভিন্ন ধারা তখন সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল :

একটি ধারা হল জিন্দিক বা নাস্তিক্য ধারা। জিন্দিকরা দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রথমভাগে তাওহীদ ও ইসলামের অন্যান্য মৌল বিশ্বাসসমূহের বিরুদ্ধে প্রচারণার মাধ্যমে ইসলামের ভিত্তি নষ্ট করার কাজে লিপ্ত হয়।

দ্বিতীয় ধারাটি হলো আরব জাতীয়তাবাদ যার ভিত্তি নির্মাতা উমাইয়্যা শাসকগণ। তারা ইসলামের বৈষম্যহীন সমাজ বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করে ইসলামের মৌলনীতিকে পদদলিত করে।

তৃতীয় বিষয় হলো বিলাসব্যসন ,সংগীত ও অনর্থক কর্মের প্রচলন। এটিও উমাইয়্যাগণ শুরু করে ও আব্বাসীয় আমলে এর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এই তিন ধারা পর্যায়ক্রমে ইসলামের মৌল বিশ্বাস ,সামাজিক মৌলনীতি ,নৈতিক ও ব্যবহারিক দিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘটনাক্রমে তিনটি আন্দোলনের পক্ষে ও বিপক্ষেই ইরানীদের ভূমিকা ছিল।

সামাজিক ইতিহাস বিশ্লেষকগণ দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীতে জিন্দিক চিন্তাধারার উদ্ভবের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। যেমন প্রথমত জানাদাকা বা জিনদিকাহ্ শব্দটির মূল কোথা হতে এসেছে ?زنديق (জিন্দিক) শব্দটিزنديك হতে এসেছে নাকি অন্য কোন শব্দ হতে ? কাদেরকে জিন্দিক বলা হতো ? তারা কি মনী ধর্মের অনুসারী ? তারা কি সেই সকল ইরানী যারা তাদের প্রাচীন ধর্মে অটল ছিল ,যেমন যারথুষ্ট্র ,মনী ও মাযদাকী নাকি তারা অতি প্রাকৃতিক কোন অস্তিত্বে অবিশ্বাসী বা নাস্তিক ছিল যারা কোন ধর্মকেই স্বীকার করত না ?

বাস্তব সত্য হলো এদের সকলকেই জিন্দিক বলে ডাকা হতো ,এমনকি যে সকল মুসলমান বিভিন্ন অবৈধ কর্মে লিপ্ত হতো ,ধার্মিক ব্যক্তিদের উপহাস করত বা কোন কোন সময় গদ্য ,কবিতা বা ছন্দের মাধ্যমে ইসলামের বিভিন্ন বিধানকে তিরস্কার করত তাদেরকেও জিন্দিক বলা হতো।

আরবদের মধ্যে জিন্দিকী প্রবণতা কখন হতে শুরু হয়েছে ? ইসলামের আবির্ভাবের পর অন্যান্য জাতি বিশেষত ইরানীদের সঙ্গে মিশ্রণের ফলে ,নাকি পূর্ব হতেই তারা এরূপ চিন্তার সঙ্গে পরিচিত ছিল ?

জিন্দিক শব্দটির মূল ও ভাবার্থ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণের ধারণা এ শব্দটি প্রথমদিকে শুধু মনুয়ীদের (মনী ধর্মের অনুসারীদের) ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে দাহরী ,মাজুসী ,এমনকি যে কোন নাস্তিকের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়।

এ ধারণার উৎপত্তি সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে ইসলাম-পূর্ব আরবদের মাঝে এরূপ চিন্তার

অস্তিত্ব ছিল। ইবনে কুতাইবার আল মাআরিফ এবং রাসতাহর আল-আলাকুন নাফিসা গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে জাহেলিয়াতের সময় কুরাইশরা হীরার আরবদের মাধ্যমে এ শব্দের সঙ্গে কিছুটা পরিচিত হয়েছিল।

যা হোক নিশ্চিত যে ,ইসলামের আবির্ভাবের প্রথম শতাব্দীগুলোতেই একদলকে এ নামে অভিহিত করা হতো। তাদের কেউ কেউ আরব ,আবার কেউ ইরানী ছিল। যেমন আবদুল কারিম ইবনে আবিল আউজাহ্ ,সালিহ ইবনে আবদুল কুদ্দুস ,আবু শাকির দাইছানী ,ইবনুর রাভান্দী ,বেশর ইবনে বারেদ ,আবদুল্লাহ্ ইবনে মুকাফফা ,ইউনুস ইবনে আবি ফারওয়া ,হাম্মাদ আজরাদ ,হাম্মাদ রাভিয়া ,হাম্মাদ ইবনে যিবারকান ,ইয়াহ্ইয়া ইবনে যিয়াদ ,মুতী ইবনে আইয়াম ,ইয়াযদান ইবনে বাজান ,ইয়াযীদ ইবনুল ফাইয ,আফশিন ,আবু নাওয়াস ,আলী ইবনুল খালিল ,ইবনে মুনাযার ,হুসেইন ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস ,আবদুল্লাহ্ ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে জাফর ,দাউদ ইবনে আলী ,ইয়াকুব ইবনে ফাযল ইবনে আবদুর রহমান মাতলাবী ,ওয়ালিদ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে আবদুল মূলক ,আবু মুসলিম খোরাসানী ,বারামাকে প্রমুখ।

এদের কেউ কেউ যেমন ইবনে আবিল আউজাহ্ নিশ্চিতভাবেই অতি প্রাকৃতিক কোন অস্তিত্বে অবিশ্বাসী ছিল। শিয়া হাদীসগ্রন্থ সমূহের বর্ণনামতে সে পবিত্র ইমামগণ ও তাঁদের শিষ্যদের সঙ্গে যে বিতর্কসমূহ করেছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় ,সে অতিপ্রাকৃতিক কোন অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিল না। উপরোক্ত ব্যক্তিসমূহের কারো কারো জিন্দিক হওয়ার বিষয়ে কোন সন্দেহ না থাকলেও কারো কারো বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

দলিল-প্রমাণ হতে জিন্দিকদের উদ্ভব যে অর্থেই হয়ে থাকুক-যেমন মনুয়ী অর্থাৎ আলো ও অন্ধকারের জন্য দু খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসী অথবা খোদায় অবিশ্বাসী নাস্তিক বা দাহ্রী-এ বিষয়টি রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ক্ষমতাশালীদের হাতে বড় একটি অস্ত্র হয়েছিল যার মাধ্যমে তারা বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করত । তাই কোন অবস্থাতেই বিশ্বাস করা যায় না ,যাদের জিন্দিক বলে অভিহিত করা হয়েছে তাদের সকলেই আসলেও জিন্দিক ছিল। যখন অভিযুক্ত এ সকল ব্যক্তির মধ্যে অনেকেই ইসলামের প্রতি নিবেদিত ,দুনিয়াত্যাগী ও সৎকর্মশীল বলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। এদের কেউ কেউ প্রতিশ্রুতবদ্ধ শিয়া ও পবিত্র ইমামগণের বিশেষ নৈকট্যের অধিকারী ছিলেন বলে জানা যায়। সুতরাং স্পষ্ট ,ক্ষমতাসীন খলীফাদের বিরোধিতার কারণেই তাঁদের এরূপ নামে অভিহিত করা হয়েছিল।

তাদের কেউ কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের চর্চার কারণে এরূপ নামে অভিহিত হয়েছেন। ইবনুন নাদিম তাঁর আল ফেহেরস্ত নামক গ্রন্থে আবু যাইদ আহমাদ ইবনে সাহল বালখী সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন ,তিনি জিন্দিক বলে অভিযুক্ত। অতঃপর যাইদের এক নিকটতম ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেছেন , এই ব্যক্তি মজলুম ছিলেন। তিনি একত্ববাদী ও খোদা উপাসক ছিলেন। অন্যদের হতে আমি তাঁকে উত্তমরূপে চিনতাম। আমরা একত্রে বড় হয়েছি ,তিনি যুক্তিবিদ্যা অধ্যয়ন করায় জিন্দিক নামে অভিহিত হয়েছিলেন। আমরা দু জন একত্রে যুক্তিবিদ্যা অধ্যয়ন করতাম এবং কেউই নাস্তিকতার প্রতি ঝুঁকে পড়িনি। 211

আহমাদ আমিন212 আল আগানী হতে বর্ণনা করেছেন , হামিদ ইবনে সাঈদ মুতাজিলাদের প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। কোন কোন বিষয়ে তিনি আব্বাসীয় খলীফা মোতাসিমের রাজকীয় কাজী ইবনে আবি দাউদের বিরোধিতা করতেন। ইবনে আবি দাউদ তাঁকে জিন্দিক বলে অভিহিত করে মুতাসিমের কান ভারী করেন। 213

ইবনে মুনাযির সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে ইউনুস ইবনে আবি ফারওয়া প্রকাশ্য সভায় তাঁকে জিন্দিক বলে প্রচার করেন এবং ঐ সভায় উপস্থিত এক ব্যক্তি সভা হতে বেরিয়ে মসজিদে গিয়ে দেখে ইবনে মুনাযির এক কোণায় নামাজে রত।

আফশিন নামক অপর এক ব্যক্তিকে জিন্দিক বলা হতো ,অথচ কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তাঁর ব্যক্তিত্বহানির জন্য এরূপ করত ।

আব্বাসীয় খলীফা মনসুর দাওয়ানেকী এবং তাঁর বসরার প্রাদেশিক শাসনকর্তা সুফিয়ান ইবনে মুয়াবিয়া মাহলাবীর সঙ্গে আবদুল্লাহ্ ইবনে মুকাফফার কোন এক কারণে শত্রুতা ছিল। তাই মনসুরের গোপন নির্দেশে সুফিয়ান তাঁকে হত্যা করেন এবং বলেন ইবনে মুকাফফা বাহ্যত ইসলাম প্রকাশ করত ,কিন্তু আন্তরিকভাবে জিন্দিক ছিলেন। ইবনে মুকাফফা একজন পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন ও মনীর গ্রন্থসমূহ আরবীতে অনুবাদ করেছিলেন। তার কোন কোন লেখায় ইসলামের প্রতি নিবেদিত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই মনীর রচিত গ্রন্থসমূহ অনুবাদ বা জিন্দিকদের সমাবেশে উপস্থিতি তাঁর জিন্দিক হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না।

বার্মাকীদের ক্ষমতার শীর্ষে থাকাকালীন আসমায়ী তাদের প্রশংসা ও গুণকীর্তন করতেন। যখন বার্মাকীদের উজ্জ্বল দিনের অবসান ঘটল তখন তিনি তাদের জিন্দিক বলে প্রচার শুরু করলেন।

আব্বাসীয় খলীফা মাহ্দী জিন্দিকদের সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তিনি অনেক জিন্দিককে হত্যা করেন ও বলেন তাঁর পিতামহের প্রপিতা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব তাঁকে স্বপ্নে এ কর্মের নির্দেশ দিয়েছেন ,অথচ প্রসিদ্ধ জিন্দিক বেশার ইবনে বারেদ তাঁর দরবারের প্রিয়ভাজন ব্যক্তি ছিল এবং আশি বছর এ পথে (কুফরীর) অতিবাহিত করা সত্ত্বেও মাহ্দী তাকে কিছু বলেননি ;বরং বিশিষ্ট ফকীহ্গণের নিকট তিনি বেশারের মতামতের ইতিবাচক ব্যাখ্যা দান করতেন। কিন্তু শেষ বয়সে যখন বেশার রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করে মাহ্দীর অসম্মানে বনু উমাইয়্যার প্রশংসায় কবিতা রচনা করে তখন খলীফা মাহ্দী আব্বাসীর জিন্দিক বিরোধী অনুভূতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তিনি তাকে চাবুক দ্বারা প্রহারের নির্দেশ দেন ও এভাবেই তার মৃত্যু হয়।

জিন্দিকদের বিরুদ্ধে ইরানীদের প্রতিক্রিয়া

যদিও জিন্দিকী চিন্তাধারার মূল ভিত্তি কিছু সংখ্যক সংখ্যালঘু কিছু ইরানীর মধ্যে প্রোথিত ছিল তদুপরি জিন্দিকতার ধারা ইরানীদের মধ্যে কখনোই বিস্তার লাভ করেনি ;বরং ইরানীদের পক্ষ হতে এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে। ইরানী মুসলমান আলেমগণ একদিকে কালামশাস্ত্রের মাধ্যমে অন্যদিকে ইরানী ফকীহগণ ফেকাহ্শাস্ত্রের মাধ্যমে এ ধারার জবাব দেন।

আমরা জানি ইরাক ইরানী ফকীহ্ ,আলেম ও অন্যান্যদের কেন্দ্র ছিল। ইরাকের ফকীহ্গণ214 জিন্দিকদের বিরুদ্ধে অন্যদের চেয়ে কঠোরতর প্রতিক্রিয়া দেখান। আবু হানীফা ও তাঁর অনুসারীরা ইরানী ফকীহ্গণের অংশ হিসেবে ইরাকে বসবাস করতেন। জিন্দিকদের বিষয়ে শাফেয়ী ও তাঁর অনুসারীদের চেয়ে ইরানী আবু হানিফার ফতোয়া কঠোরতর। শাফেয়ী মুরতাদের তওবা কবুল -এর অধ্যায়ে মুরতাদ ও জিন্দিকের মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি এবং উভয়ের তওবাকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন। এর বিপরীতে আবু হানীফা তাঁর দু মতের একটিকে প্রাধান্য দিয়ে জিন্দিকের তওবা অগ্রহণযোগ্য বলেছেন।

কথিত আছে আবু হানিফার অনুসারীরা তাঁর পক্ষ হতে জিন্দিকদের তওবা অগ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে ফতোয়াটি ব্যাপকভাবে প্রচার করতেন যা জিন্দিকদের বিরুদ্ধে ইরানীদের কঠোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত।

দ্বিতীয় ধারাটি হলো জাতিগত গোঁড়ামি ও গরিমা এবং জাতি-বৈষম্য যা ইসলামের সাম্য ধারণার বিরোধী। আরবগণ এ বিচ্যুতির জন্ম দেয়। উমাইয়্যাগণ আরব ও অনারবের মধ্যে পার্থক্যের নীতির ওপর তাদের রাজনীতির ভিত্তি রচনা করে। মুয়াবিয়া তাঁর অধীন বিভিন্ন শাসনকর্তাকে এ মর্মে নির্দেশ দেন যে ,আরবদের অন্যদের ওপর সব বিষয়ে যেন প্রাধান্য দেয়া হয়। এ বিষয়টি ইসলামের দেহে মারাত্মক আঘাত হানে। ইসলামী শাসন ক্ষমতা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হওয়ার মূল কারণ ছিল এটি। স্বাভাবিকভাবেই কোন জাতি তাদের ওপর অপর জাতির প্রাধান্য ও শাসন কর্তৃত্বকে মেনে নেয় না। ইরানীরা ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ;আরবদের প্রভুত্বকে নয়। অন্যান্য জাতির ইসলাম গ্রহণের অন্যতম কারণ ছিল ইসলাম জাতি-বর্ণের ঊর্ধ্বে বিশ্বজনীন ও মানবতাবাদী ধর্ম। তাই ইরানীসহ অন্যান্য জাতি কখনই আরবদের প্রাধান্যকে মেনে নেয়নি।

এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইরানীরা যে প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে তা অত্যন্ত মানবিক ও যুক্তিপূর্ণ ছিল। তারা আরবদের আল্লাহর কিতাবের প্রতি আহ্বান জানায়। তাদের এ কর্ম রাসূলের এ কথার সত্যতাকে প্রমাণ করে , আল্লাহর কসম! পরবর্তীতে ইরানীরাই তোমাদের ইসলাম ও আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান করবে ঠিক যেমনটি তোমরা প্রথমে তাদের দাওয়াত করেছিলে। 215 ইসলামের প্রথম যুগে ইরানী মুসলমানগণ এ ধারার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন করে তার মূলে ছিল ইসলামের সাম্যের ধারণা ;আরবদের ওপর ইরানীদের প্রাধান্যের ধারণা নয়।

উমাইয়্যাদের বৈষম্য ও জুলুমের বিরুদ্ধে খোরাসানের কৃষ্ণ পোশাকধারিগণ যে আন্দোলন গড়ে তোলে তা ইসলাম ও ন্যায়ের দাবিতে ছিল ;অন্য কোন দাবিতে নয়। আব্বাসীয়দের তৎকালীন প্রতিনিধিগণ গোপনে যে আহ্বান রাখতেন তাতে ইসলামের ন্যায়বিচার ও রাসূল (সা.)-এর বংশধরদের সন্তুষ্টির দিকে আহ্বান করতেন। খোরাসানের মানুষদের এ পথে আহ্বানকারীর নাম গোপন থাকলেও তাঁর পক্ষে যে কৃষ্ণ বর্ণের দাওয়াত পত্র প্রেরণ করা হয়েছিল তাতে লেখা ছিল :

) أُذِن للّذين يقاتلون بأنَّهم ظلموا و إنَّ الله على نصرهم لقدير(

যাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো। কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে ,আল্লাহ্ তাদের সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম। (সূরা হজ্ব: 39)

এ আন্দোলনের শুরুতে আলে আব্বাস বা আবু মুসলিমের নাম যেমন ছিল না তেমনি ইরানী জাতীয়তাবাদের কথাও সেখানে ছিল না ;বরং শুধু ইসলাম ,কোরআন ,রাসূলের আহলে বাইতের সন্তুষ্টি ,ন্যায়বিচার ও ইসলামের সাম্যের কথা উপস্থাপিত হতো। অর্থাৎ ইসলামের পবিত্র স্লোগানগুলোই এ আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়েছিল। আবু মুসলিম পরবর্তী সময়ে ইবরাহীম ইমামের পক্ষ হতে এ আন্দোলনের নেতা নিযুক্ত হয়েছিলেন। একবার আব্বাসীয় প্রতিনিধি গোপনে হজ্বে আসলে ইবরাহীম ইমাম তাঁকে তাঁর সঙ্গে পরিচিত করান। আবু মুসলিম সম্পর্কে জানা যায়নি তিনি আরব না ইরানী। তবে যেহেতু তিনি খোরাসান হতে আন্দোলন শুরু করেন সেহেতু আবু মুসলিম খোরাসানী হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

সাম্প্রতিক কোন কোন ইরানী ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন কৃষ্ণ পোশাকধারীদের সমগ্র আন্দোলনকে আবু মুসলিম খোরাসানীর কৃতিত্ব বলে চালাতে। সন্দেহ নেই আবু মুসলিম একজন যোগ্য সেনাপতি ছিলেন ,কিন্তু তাঁর সাফল্যের পরিবেশ সৃষ্টির কারণ ছিল ভিন্ন। ইতিহাসে উল্লিখিত হয়েছে যখন আবু মুসলিম মনসুরের দরবারে তাঁর ক্রোধের শিকার হয়ে আনীত হন তখন আবু মুসলিম আব্বাসীয় খেলাফতের প্রতি তাঁর সেবার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মনসুরের ক্রোধকে প্রশমনের চেষ্টা করেন। মনসুর জবাবে বলেন , যদি কোন ক্রীতদাসী এ কথা বলত তাহলে হয়তো সফল হতো ,কিন্তু তুমি তোমার নিজ ক্ষমতা বলে এরূপ অভ্যুত্থানে কখনই সক্ষম ছিলে না ,এমনকি এক ব্যক্তির ওপরও তোমার কর্তৃত্ব কার্যকর ছিল না। যদিও মনসুরের কথায় অতিরঞ্জন রয়েছে তদুপরি কথাটি সত্য। এ কারণেই মনসুর তাঁকে ক্ষমতা ও সম্মানের শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও হত্যা করতে সক্ষম হন এবং কেউই আবু মুসলিমের পক্ষে প্রতিবাদ করেনি।

আব্বাসীয়গণ ইরানীদের ইসলামী চেতনাকে ব্যবহার করে এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবংأُذن للّذين يقاتلون بأنّهم ظلموا আয়াতটি তেলাওয়াতের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নবীর আহলে বাইতের মাজলুমিয়াতের কথাই বলত এবং ইরানীদের ওপর উমাইয়্যাদের নির্যাতনের কথা কমই বলত।

129 হিজরীতে ঈদুল ফিতরের দিনে কৃষ্ণ পোশাকধারীরা দজলা-ফোরাতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অভ্যুত্থান করে এবং ঈদের খুতবায় তাদের বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়। ঈদের খুতবা সুলাইমান ইবনে কাসির নামক এক আরব যিনি সম্ভবত আব্বাসীয়দের প্রতিনিধি ছিলেন ,পাঠ করে। তাদের স্লোগানের মধ্যে তাদের লক্ষ্য নিহিত ছিল। নিম্নোক্ত আয়াতটি তাদের অন্যতম স্লোগান ছিল :

) يا أيّها النّاس إنّا خلقناكم من ذكر و أُنثى و جعلناكم شعوباً و قبائل لتعارفوآ إنّ أكرمكم عند الله أتقاكم(

হে মানব জাতি! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর নিকট সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক পরহেজগার। 216

এ আয়াতে ব্যবহৃত শুয়ুব শব্দ হতে ইরানীদের শুয়ুবীয়া বলা হতো। কারণ মুফাসসিরদের বর্ণনানুযায়ী শুয়ুবীয়া হলো যাদের সম্মিলনে গোত্রীয়তার রং নেই। ইরানীরা সাম্যের পক্ষে ও জাতিগত বৈষম্যের বিরোধী হওয়ায় তখন এ নামে অভিহিত হয়েছিল।

আরবদের এরূপ বিচ্যুতির বিরুদ্ধে ইরানীদের এ প্রতিক্রিয়া তাদের ইসলামী চরিত্রের ও ইসলামের প্রতি ঐকান্তিকতার সাক্ষ্য বহন করে। যদি ইসলামের প্রতি ইরানীদের ঐকান্তিকতা না থাকত তবে তারাও আরবদের ন্যায় তাদের ইতিহাস ও জাতিগত ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করতে পারত এবং সে ক্ষেত্রে আরবদের পেছনে ফেলে দিত। কারণ আরবদের চেয়ে ইরানীদের জাতিগত ঐতিহ্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তারা তা করেনি ;বরং আরবদের চেয়ে ইসলামের আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।

অবশ্য শুয়ুবী আন্দোলন পরবর্তীতে বিচ্যুত হয়ে আরব জাতীয়তাবাদের পরিণতি লাভ করেছিল। অর্থাৎ আরবদের ওপর ইরানী (আর্য) জাতি ও রক্তের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে পর্যবসিত হয়।

তবে যখনই শুয়ুবী আন্দোলন এ পর্যায়ে পৌঁছে তখনই ইরানের তাকওয়াসম্পন্ন আলেম ও সাধারণ মুসলমানরা এর বিরুদ্ধে দাঁড়ান অর্থাৎ ইরানীদের পক্ষ হতে আরেকটি ইসলামী প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় যা তাদেরই বিচ্যুত এক অংশের বিরুদ্ধে প্রদর্শিত হয়। ফলে শুয়ুবী আন্দোলন পরাস্ত হয়। যদি সকল ইরানীই ইসলামের প্রথম পথকে আঁকড়ে থাকত তবে সাধারণভাবে ইসলামী বিশ্বে ও বিশেষভাবে তাদের নিজেদের ক্ষেত্রে আরো উত্তম ভূমিকা রাখতে পারত।

কোন কোন ইরানী এই শুয়ুবী আন্দোলনের প্রতি এতটা অসন্তুষ্ট ছিলেন যে ,একে ইসলামের জন্য বড় বিপদ মনে করে নিজ জাতিসত্তার বিরুদ্ধে আরবীয় গোঁড়ামি প্রদর্শন শুরু করেন। এটি ইতিহাসের অন্যতম আশ্চর্যজনক ঘটনা যা ইরানীদের অন্তরে ইসলামের গভীর ছাপের প্রমাণ।

কাশশাফ তাফসীরের লেখক জামাখশারী একজন ইরানী বড় আলেম ও তাঁর সময়ের বিরল প্রতিভা ,তিনি ইরানের খোরাসানের খাওয়ারেজমের অধিবাসী। তিনি তাঁর জীবন বায়তুল্লাহর পাশে কাটিয়েছেন বলে জারুল্লাহ্ বা আল্লাহর প্রতিবেশী উপাধি লাভ করেছিলেন। তিনি সারফ নাহু সম্পর্কিত তাঁর আল মুফাস্সাল নামক গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন , একমাত্র আল্লাহর প্রশংসা যিনি আমাকে আরবী সাহিত্যের পণ্ডিত হওয়ার ও আরবদের পক্ষাবলম্বনের প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর অনুগ্রহে আমি তাদের সহযোগীদের হতে বিচ্ছিন্ন হইনি ও শুয়ুবীয়াদের খপ্পরে পড়িনি। শুয়ুবীরা কোন কল্যাণই লাভ করেনি ;লানতকারীর লানত ও তিরস্কারকারীদের তীরবিদ্ধ হয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়া ব্যতীত।

জামাখশারীর শেষ কথাটি হতে বোঝা যায় শুয়ুবী হওয়ার বিষয়টি ইরানীদের নিকট কতটা নিন্দনীয় ও প্রত্যাখ্যাত ছিল। তাই এর পক্ষাবলম্বনকারীদের ভাগ্যে সমালোচনা ,অভিশাপ ও লানত ছাড়া কিছুই জোটেনি।

ইয়াতিমাতুদ দাহর গ্রন্থের লেখক সায়ালাবী নিশাবুরী (মৃত্যু 329 হিজরী) জামাখশারীর ন্যায় ইরানী মুসলমানদের গৌরব বলে বিবেচিত হতেন। এই প্রখ্যাত আলেম জামাখশারী হতেও তীব্রভাবে শুয়ুবীদের বিরুদ্ধে ও আরবদের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি তাঁর সিররুল আদাব ফি মাজারী কালামিল আরাব গ্রন্থে একজন গোঁড়া আরবের ন্যায় অনারবদের ওপর আরবদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও নবীর ওপর দরূদ পড়ে বলেন ,

যে কেউ আল্লাহ্কে ভালবাসে সে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কেও ভালবাসবে। আর যে কেউ রাসূলকে ভালবাসবে সে আরবদের ভালবাসবে । যারা আরবদের ভালবাসবে এই শ্রেষ্ঠ জাতির ওপর অবতীর্ণ গ্রন্থের ভাষাকেও ভালবাসবে। যে আরবী ভাষাকে ভালবাসবে সে এ ভাষার প্রতি গুরুত্ব দেবে। আল্লাহ্ যাকে ইসলামের দিকে হেদায়েত করেন সে বিশ্বাস করবে মুহাম্মদ (সা.) সর্বোত্তম নবী ,ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট পথ। আরব শ্রেষ্ঠ জাতি ও আরবী সর্বোত্তম ভাষা।

তবে সায়ালাবীর আরব সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি এ কথাটি ভ্রান্ত। ইসলামের প্রতি বিশ্বাসের সঙ্গে আরবদের শ্রেষ্ঠ মনে করার কোন সম্পর্ক নেই। বরং এ ধরনের চিন্তা ইসলামী চিন্তার পরিপন্থী। তাই যে ইসলাম বিশ্বাস করবে সে অবধারিতভাবে বিশ্বাস করবে- কোন জাতিরই অপর জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা এই যে ,মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব হয় জ্ঞানের কারণে ,নতুবা তাকওয়া ও আমলের কারণে।

) هل يستوي اللذين يعلمون و اللّذين لا يعلمون(

যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে ? 217

) إنَّ أكرمكم عند الله أتقاكم(

নিশ্চয় আল্লাহর নিকট সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক তাকওয়াসম্পন্ন। 218

) فضّل الله الْمجاهدين على القاعدين أجراً عظيماً(

আল্লাহ্ মুজাহেদীনকে (তাঁর পথে যুদ্ধ ও প্রচেষ্টাকারীকে) উপবিষ্টদের ওপর মহান প্রতিদানে শ্রেষ্ঠ করেছেন। 219

সায়ালাবী তাঁর বক্তব্যে যে পর্যায়ক্রম উল্লেখ করে আরবদের প্রতি ভালবাসার ফল আরবী ভাষার প্রতি ভালবাসা বলে দাবি করেছেন তাও সঠিক নয় ;বরং কোরআন ও মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালবাসার সরাসরি ফল হলো আরবী ভাষার প্রতি ভালবাসা। শুয়ূবীদের বিপরীতে অবস্থান নিতে গিয়ে সায়ালাবীর মতো বিচ্যুত ধারার সৃষ্টি হয়েছিল।

দ্বিতীয় শতাব্দীর অন্যতম প্রসিদ্ধ ইরানী কালামশাস্ত্রবিদ আবু উবাইদা মুয়াম্মার ইবনে মুসান্নাও এরূপ আরব গোঁড়ামি পোষণ করে অনারবদের ছোট করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রসিদ্ধ একটি গ্রন্থ হলো মাকাতিলু ফারসানুল আরাব

এর বিপরীতে প্রসিদ্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদের বংশধর এবং মুরুজুয যাহাব আত তানবিহ্ ওয়াল আশরাফ গ্রন্থের লেখক মাসউদী (মৃত্যু চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর প্রথমার্ধ) আবু উবাইদার গ্রন্থের জবাবে মাকাতিলু ফারসানুল আজাম গ্রন্থ রচনা করেন। মাসউদী তাঁর আত তানবিহ্ ওয়াল আশরাফ গ্রন্থের 49 পৃষ্ঠায় সাসানী সাম্রাজ্যের কথা উল্লেখ করে বলেছেন ,

চব্বিশতম মনোরম শহরে তিনি চল্লিশ দিন শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। আমরা তাঁর জীবনী ,তিনি ও তাঁর সহযোগীদের নিহত হওয়ার কারণ এবং যে সকল ইরানী সাহসিকতা ও মর্যাদায় ইতিহাসে স্মরণীয় তাঁদের গৌরবময় জীবনী মাকাতিলু ফারসানুল আজাম গ্রন্থে বর্ণনা করেছি। গ্রন্থটি আবু উবাইদা মুয়াম্মার ইবনে মুসান্না রচিত মাকাতিলু ফারসানুল আরাব গ্রন্থের জবাবে লেখা হয়েছে।

মাসউদী আরব মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও যখন দেখলেন ইরানীদের বিরুদ্ধে ও আরবদের পক্ষে অন্যায় প্রচার হচ্ছে তখন তিনি ইরানীদের সপক্ষে এই গ্রন্থ রচনা করেন। এটিও ইসলামের অন্যতম আশ্চর্য ও সৌন্দর্য।

আমাদের বর্তমান আলোচনার লক্ষ্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ;এর পক্ষে-বিপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও আন্দোলনটি স্তিমিত হওয়ার কারণ নিয়ে পূর্ণ বিশ্লেষণ নয়। বিষয়টি বিশ্লেষণের জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। আমাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো এটি বলা যে ,শুয়ূবীয়া আন্দোলন আরবদের জাতি বৈষম্যভিত্তিক নীতির বিরুদ্ধে ইরানীদের ইসলামী চেতনার এক পবিত্র প্রতিক্রিয়া ছিল যা পরবর্তী সময়ে ইরানীদের ক্ষুদ্র একটি অংশের দ্বারা বিচ্যুত হয়ে জাতীয় গোঁড়ামি ও জাতীয়তাবাদের রং ধারণ করে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ইসলামবিরোধী জিন্দিক চিন্তায় পর্যবসিত হয়। এ ধারা ইরানের পরহেযগার আলেম ও সর্বসাধারণের দ্বারা নিন্দিত ও প্রত্যাখ্যাত হয়। তারা এক হাজার বছর পূর্বেই এই ধারাকে নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হন। যদিও বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এক হাজার বছর পর এ চিন্তাকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টায় রত কিন্তু কখনই তারা সফল হবে না।

তৃতীয় যে ইসলামবিরোধী ধারার বিরুদ্ধে ইরানীরা অন্য সকলের চেয়ে অধিক প্রতিক্রিয়া দেখায় তা হলো গান-বাজনা ,আনন্দ-ফুর্তি ও বিলাসিতা।

ইরানের সংগীত ও গানের ইতিহাস বেশ পুরোনো। এ দেশের মানুষের জীবন এর সঙ্গে জড়িত ছিল। মশিরুদ্দৌলা তাঁর ইরানের ইতিহাস গ্রন্থের 201 পৃষ্ঠায় বলেছেন , বাহরাম গুর ভারত হতে বারো হাজার সংগীত শিল্পী এনেছিলেন।

ফাজরুল ইসলাম গ্রন্থে হামযা ইসফাহানীর ইতিহাস গ্রন্থের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে ,

বাহরাম জনসাধারণের প্রতি নির্দেশ দেন অর্ধেক দিবস কাজ করার ও অর্ধেক দিবস

গান-বাজনা ও আনন্দ ফুর্তিতে মেতে থাকার। এই অর্ধেক দিবস যেন তারা মদ্যপান ও গান বাজনা করে। এর ফলে সংগীত শিল্পীদের কদর বেড়ে যায়। একদিন কিছু লোককে শুধুই মদ্যপানে রত দেখে প্রশ্ন করা হলো শুধুই পান করছ ,শুনছ না কেন ? সংগীত শিল্পী কোথায় ? তারা বলল ,তাদের মজুরী বেড়ে যাওয়ায় পাওয়া যায়নি ? বাহরাম ভারতের রাজাকে পত্র লিখে সংগীত শিল্পী পাঠাতে বলেন। তিনি বার হাজার সংগীত শিল্পী প্রেরণ করেন। বাহরাম তাদেরকে ইরানের বিভিন্ন শহরে বণ্টনের ব্যবস্থা করেন।

আরবগণ গান-বাজনার ক্ষেত্রে সাদাসিধে ছিল। কিন্তু ইরানীদের সঙ্গে মিশে তাদের মধ্যেও গান-বাজনা ব্যাপক প্রসার লাভ করে। পরবর্তীতে গান-বাজনার কেন্দ্র ইরাক ও সিরিয়া হতেও তারা এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হেজায হাদীস ও ফিকাহর ক্ষেত্রে যেমন ঠিক তেমনি সংগীত ও গানের ক্ষেত্রেও প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। উমাইয়্যা শাসকগণ ও তাদের প্রদেশিক শাসনকর্তারা এগুলোর প্রচারে ব্যাপক উদ্যোগ নেয় ও নিজেরাও এতে নিমজ্জিত হয়। এর বিরুদ্ধে নবীর আহলে বাইতের ইমামগণ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান যা শিয়া ফিকাহ্ ও হাদীসগ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।

ইমামগণের কথা বাদ দিয়ে সাধারণ পর্যায়ের মানুষের মধ্যে দেখলে বিষয়টি ইরানী মুসলমান ও আলেমগণের দ্বারাও ব্যাপকভাবে আক্রমণের শিকার হয় ,এমনকি আবরদের চেয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া অনেক তীব্র ছিল যদিও এ বিষয়ে তাদের পূর্ব-ঐতিহ্য ছিল।

আহমাদ আমিন উল্লেখ করেছেন ,হেজায যেমন ফিকাহ্ ও হাদীসের কেন্দ্র ছিল তেমনি গান ও সংগীতেরও। কিন্তু কিভাবে ফিকাহ্ ও হাদীসের কেন্দ্র গান-বাজনার কেন্দ্র হতে পারে ? সম্ভবত এর কারণ হেজাযের অধিবাসীদের সুন্দর প্রকৃতি ও নরম হৃদয় ,এমনকি হেজাযের সুন্নী ফকীহ্গণ এ সকল বিষয়ে ইরাকের ফকীহ্দের চেয়ে কম কঠোর ছিলেন। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি ,ইরাকে এরূপ বিষয়ে কঠোরতার মূলে ছিলেন ইরানী ফকীহ্গণ। তাঁরা দীনের সীমার বিষয়ে অধিকতর স্পর্শকাতর ছিলেন। অতঃপর তিনি আবুল ফারজ ইসফাহানী হতে নিম্নোক্ত ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন :

উবাইদুল্লাহ্ ইবনে উমর আমরী বলেন: হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় গিয়েছিলাম। একজন সুন্দর নারীকে ইসলামের নির্দেশের বিপরীতে সেখানে কৌতুকময় ও অশ্লীল কথা বলতে দেখলাম ,আমি তার নিকটবর্তী হয়ে বললাম: হে আল্লাহর দাসী! তুমি কি ভুলে গিয়েছ যে ,হজ্বে এসেছ ? তোমার আল্লাহর ভয় নেই ,ইহরাম বাঁধা অবস্থায় অশ্লীল কথা বলছ ? এ কথা শুনে সে তার নেকাব উন্মুক্ত করে অদ্ভুত সুন্দর চেহারাটি দেখিয়ে বলল: চাচাজান! দেখুন আমি এই কবিতার নারী:

من اللاء لم يحججن يبغين حسبة

و لكن ليقتلن البرئ المغفّلا

ঐ নারীর অন্তর্ভুক্ত যারা আল্লাহর জন্য হজ্ব করতে আসেনি ;বরং অসচেতন ও বোকাদের হত্যা করার (ফাঁদে ফেলার) জন্য এসেছে।

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব-এর বংশের এই মনীষী ও সাধক বলেন , আমি এই সফরে দোয়া করব যেন আল্লাহ্ তোমার এত সুন্দর চেহারাকে আজাব না দেন।

এ ঘটনাটি মদীনার বিশিষ্ট ফকীহ্ সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেবকে বললে তিনি বলেন , আল্লাহর কসম! এই নারী ইরাকের কোন ফকীহর মুখোমুখি হলে এরূপ জবাব দিতেন না ;বরং বলতেন: দূর হও! আল্লাহ্ তোমার চেহারাকে কুৎসিত করে দিন! কিন্তু কি করার রয়েছে হেজাযের মানুষের আচরণ মোলায়েম।

তিনি আগানী হতে বর্ণনা করেছেন ,

মদীনার অন্যতম ফকীহ্ ইবনে জারীহ্ আবদুল্লাহ্ ইবনে মুবারাকসহ ইরাকের কিছু ফকীহর সঙ্গে বসে ছিলেন। এমন সময় একজন সংগীত শিল্পী আসলে ইবনে জারীহ্ তাকে সংগীত পরিবেশনে অনুরোধ জানালেন। সে রাজী হচ্ছিল না । কিন্তু জারীর নাছোড়বান্দা হওয়ায় সে কিছক্ষণ গান গাইল ,কিন্তু বুঝতে পারল শ্রোতারা তা পছন্দ করছে না। তাই সংক্ষিপ্ত করে বলল: যদি এই সম্মানিত ব্যক্তিরা না থাকতেন তবে আপনাকে গান শুনিয়ে আনন্দ দিতাম। ইবনে জারীহ্ উপবিষ্টদের উদ্দেশে বললেন: আপনারা বোধ হয় আমার এ কর্মকে খারাপ ভেবেছেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে মুবারক যিনি একজন ইরানী বংশোদ্ভূত কুফার ফকীহ্ ছিলেন তিনি বললেন: হ্যাঁ ,ইরাকে আমরা এসবের বিরোধী...।

যে বিষয়টি আশ্চর্যের তা হলো প্রথমত ইরানীদের সংগীত শিল্পে প্রসিদ্ধ হিসেবে দীর্ঘ ইতিহাস ছিল তাই স্বাভাবিকভাবেই ধারণা হওয়া উচিত ,তারা এ বিষয়কে শরীয়তসম্মত ভেবে বৈধ ব্যাখ্যা করার সুযোগ খুঁজবে ,কিন্তু তার বিপরীতে দেখা গেছে তারা এ বিষয় হতে দূরে থাকত ও এর প্রতি ঘৃণা পোষণ করত। দ্বিতীয়ত হেজাযে সংগীতের প্রসারে প্রথমদিকে ইরানীরাই অধিক ভূমিকা রেখেছিল এবং তৎকালীন সময়ের সংগীত শিল্পীদের অধিকাংশই ইরানী ছিল। এইরূপ পরিবেশেও ইরানী ফকীহ্ ও সাধারণ জনগণ বিষয়টিকে কোমলভাবে নেয় নি ;বরং কঠোরতা দেখিয়েছে। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি ,এ ধর্মীয় অবস্থাটি সাধারণের মাঝে বিরাজমান থাকলেও ধর্মহীন পরিবেশে ,যেমন আব্বাসীয়দের বা বার্মাকীদের রাজদরবারের অবস্থা ছিল ভিন্নরূপ।