ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 43098
ডাউনলোড: 1847

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 43098 / ডাউনলোড: 1847
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

ইসলামের প্রচার ও প্রসার

বিশ্বে ইসলামের প্রচারের কারণ ও পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্পষ্ট যে ,এ ধর্ম যুক্তিভিত্তিক ও মানব প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল বিধায় দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।

খ্রিষ্টধর্ম প্রচারকগণ ইসলামের প্রাথমিক যুগের যুদ্ধসমূহকে ইসলামের প্রসারের প্রধান কারণ দেখিয়ে এ ধর্মকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রসারিত ধর্ম বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। যদি কোন ধর্ম মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও বিবেককে সন্তুষ্ট করার পর্যাপ্ত ক্ষমতা না রাখে তবে শক্তি প্রয়োগে মানুষের মধ্যে ঈমান ,ভালবাসা ,উদ্দীপনা ও ধর্মীয় অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারবে না। হ্যাঁ ,ইসলামের প্রাথমিক সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এবং তা এজন্য যে ,ইসলাম একটি সামাজিক ধর্ম হিসেবে শুধু ব্যক্তির ব্যক্তিগত সাফল্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেনি এবং ব্যক্তিগত সাফল্য ও সামাজিক সাফল্যের মধ্যে পার্থক্যকে স্বীকার করে না। তাই ইসলামে সম্রাটকে তার অধিকার ও কর্মে স্বাধীনতা দাও এবং আল্লাহর অধিকার আল্লাহ্কে দাও এ মৌলনীতিতে বিশ্বাসী নয়। তাই ইসলাম জিহাদকে দীনের অংশ বলে মনে করে ও বাস্তবে তা প্রয়োগ করে। অবশ্য দেখতে হবে ইসলামের জিহাদের উদ্দেশ্যে কি এবং প্রথম যুগের মুসলমানগণ কোন্ শ্রেণীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে ? সেই যুদ্ধগুলোতে কোন শ্রেণীর শক্তি ব্যবহার করেছে ও কোন শ্রেণীকে মুক্তি দিয়েছে ?

এসব বাদ দিলেও দেখতে হবে ইসলামের যোদ্ধারা কোন্ কোন্ অঞ্চলে গিয়েছেন ? বর্তমানে মুসলিম অধ্যুষিত কোন্ কোন্ দেশে যুদ্ধ ও জিহাদ সংঘটিত হয়নি ? মুসলিমপ্রধান দেশসমূহ এবং যে সব অঞ্চলে মুসলমানগণ সংখ্যালঘু সেগুলোর কোন্ কোন্টিতে মুজাহিদদের পদধূলি পড়েনি ?

প্রকৃতপক্ষে ইসলামের প্রচার ও প্রসার স্বাভাবিক গতিতেই হয়েছে। আমরা এই গ্রন্থের প্রথমভাগে বর্ণনা করেছি ইরানে ইসলাম পর্যায়ক্রমে বিশেষত আরব শাসনের অবসানের পর ইরানীদের দ্বারা স্বতঃস্ফুর্তভাবে গৃহীত হয় এবং ইরানীদের স্বাধীন ক্ষমতা লাভের পরই যারথুষ্ট্র ধর্মের অবধারিত মৃত্যু হয় এবং ইতোপূর্বে কোন শক্তিই তাদের পূর্বধর্ম পরিত্যাগে বাধ্য করতে পারেনি।

দাওয়াত প্রচারের ক্ষেত্রে ইসলাম ইরানে ব্যাপকভাবে প্রসারমান খ্রিষ্ট ,মাজুসী ও অন্যান্য ধর্ম হতে যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিল তার কারণ হলো এ ধর্মের প্রচারক ছিল সাধারণ মানুষ ;কোন ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় প্রচার দফতর নয়। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফুর্তভাবে বিবেকের তাড়নায় উদ্দীপিত হয়ে এ ধর্মের প্রচার কার্য চালাত। কোন আলেম শ্রেণী বা অন্য কেউ তাদের উদ্দীপিত করেনি। এ বিষয়টিই এ ধর্মের প্রচারে ভিন্ন এক মূল্যবোধ দান করেছিল ও ইসলামকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করেছিল।

আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় ইসলামী ভূখণ্ডগুলোকে একে একে পর্যালোচনা করে দেখব যে ,এ সব অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের পশ্চাতে কি উপাদান কার্যকর ছিল। কারণ প্রথমোক্ত এ বিষয়টি এ গ্রন্থের লক্ষ্য নয়। দ্বিতীয়ত এর জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। আমরা এখানে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ইরানীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করব যাতে বিশ্বে ইসলাম প্রচারের পদ্ধতিটি আমাদের নিকট স্পষ্ট হবে।

বর্তমানে পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা নব্বই কোটি (1979 সালের হিসাব অনুযায়ী)। ইরানের বর্তমান লোকসংখ্যা সাড়ে তিন কোটি। বর্তমানের এই তিন বা সাড়ে তিন কোটি মানুষই মুসলিম বিশ্বের অর্ধেক মানুষের মুসলমান হওয়ার পেছনে অবদান রেখেছে। অর্থাৎ ইরানীদের আহ্বান ও প্রচারের ফলেই জাতিসমূহের মধ্যে ইসলামের প্রাথমিক পরিচয় ও ভিত্তি রচিত হয়েছিল।

মুসলিম বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ইন্দোনেশিয়া ,ভারত ,পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বসবাস করে। কিভাবে এই দেশগুলোর মানুষ মুসলমান হয়েছিল ? ইরানীরা তাদের ইসলাম গ্রহণে কি ভূমিকা রেখেছিল ? প্রথমে ইন্দোনেশিয়া দিয়ে শুরু করছি।

রাস্তোখিযে ইন্দোনেযি 220 নামক গ্রন্থের ইন্দোনেশিয়ায় ধর্ম নামক অধ্যায়ে বলা হয়েছে :

হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার যেভাবে ঘটেছিল ,ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামও একইভাবে প্রবেশ করেছিল। অবশ্য এটি ঘটেছিল দু জন ইরানী বংশোদ্ভূত আরব ব্যবসায়ীর মাধ্যমে। যাঁরা হলেন আবদুল্লাহ্ আরিফ ও তাঁর ছাত্র বুরহান উদ্দীন। তাঁরা উভয়েই ভারতের গুজরাটে বসবাস করতেন এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাতায়াত করতেন। তাঁরাই সেখানে ইসলামের মহান শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রচার করেন।

একই গ্রন্থের ঐ আলোচনায় বলা হয়েছে :

সুমাত্রায় মুসলমানদের দাওয়াতী কার্যক্রমের প্রভাব জাভা ও কালিমানতানেও পড়ে এবং এ বিষয়টি মুসলমান ও রাজকীয় বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি করে এবং বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক রাজা মুচু পহিতের পতনের মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এই শতাব্দী (চতুর্দশ খ্রিষ্টীয় শতাব্দী) হতে একশ বছর ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম প্রচারের কেন্দ্রে পরিণত হয়।221 এই প্রচার কার্য ইসলামের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা যা ভালবাসা ,আমানতদারী ,ন্যায়পরায়ণতা ,ভ্রাতৃত্ব ,সাম্য ও অন্যান্য উন্নত গুণাবলীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এগুলো ইন্দোনেশিয়ার মানুষের কাছে আকাক্সিক্ষত বিষয় ছিল ও তাদের দ্বারা গৃহীত হয়েছিল। ফলে দীর্ঘ সাতশ বছর (700-1400 খ্রিষ্টাব্দ) বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরণের পর তারা স্বল্প সময়ের মধ্যে ইসলামকে গ্রহণ করেছিল।... ইসলামের অগ্রগতির সাথে সাথে ব্রা হ্ম ধর্ম ও এর সংস্কৃতিও জাভা হতে দূরে সরে দূরবর্তী গ্রাম ও পাহাড়াঞ্চলে চলে যায়। এ সময় বৌদ্ধ ,শিবায়ী ও স্থানীয় অন্যান্য ধর্ম পরস্পর সমন্বিত হয়ে প্রচেষ্টা চালায় ,কিন্তু ইসলাম ক্রমবর্ধমানভাবে প্রসারিত হতে থাকে ও অন্যান্য ধর্মকে প্রভাবিত করে ফেলে।

উক্ত গ্রন্থে ডক্টর সুকর্ণের বক্তব্য হতে উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে :

মর্যাদা ,সততা ,সাম্য ও যথার্থতা হলো তা-ই যা ইসলাম ইন্দোনেশিয়ার মানুষদের জন্য উপহার হিসেবে এনেছিল।

ইসলাম: সিরাতে মুস্তাকিম 222 নামক গ্রন্থে বি.এ. হুসাইন জাজা ওয়ানিনগারাত 223 তাঁর ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম নামক প্রবন্ধে বলেছেন , ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রচার সম্পর্কে প্রাচীনতম যে তথ্য পাওয়া যায় তা বিশ্বখ্যাত পর্যটক মার্কপোলোর ভ্রমণকাহিনী হতে। তিনি দীর্ঘ সময় চীনের সম্রাট কুবলাই কানের (মৃত্যু 789 হিজরী) রাজদরবারে থাকার পর 692 হিজরীতে সুমাত্রার উত্তর তীরের পারলাকে যাত্রাবিরতি করেন ও এতদঞ্চলে আরব সওদাগরদের ধর্মীয় প্রচারের ফলে ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ্য করেন...। মরক্কোর প্রসিদ্ধ পর্যটক ইবনে বতুতা (মৃ. 779 হি.) 746 হিজরীতে চীনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে সুমাত্রায় আসেন। সে সময় বাদশাহ সালিহের প্রপৌত্র বাদশাহ জহির সেখানকার শাসনকর্তা ছিলেন। ইবনে বতুতা বলেন , তখন সেখানে ইসলামী শাসনের একশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল। অধিকাংশ মানুষ শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিল। বাদশার বদান্যতা ,ধর্মপরায়ণতা ও দুনিয়াবিমুখ জীবন সকলকে আকর্ষণ করত। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। বাদশাহ জহির আলেম ও কালামশাস্ত্রবিদদের নিয়ে কোরআন তেলাওয়াত ও দীনী আলোচনার সভা বসাতেন। তিনি হেঁটে জুমআর নামাজে যেতেন এবং মাঝে মাঝেই দেশের অভ্যন্তরের বিদ্রোহী অমুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতেন।

উক্ত প্রবন্ধে তিনি নয়জন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করেছেন যাঁদের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। তাঁদের একজন হলেন সেসিতি জানার যিনি মনসুর হাল্লাজের ন্যায় সুফীবাদে বিশ্বাস রাখতেন ও অন্যদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছিলেন। অতঃপর তিনি উল্লেখ করেছেন ,

যদিও সেসিতির আকীদা ইরানী মনসুর হাল্লাজের আকীদার ন্যায় ছিল তদুপরি এটি জাভায় ইসলাম ইরানীদের মাধ্যমে গিয়েছিল বলে প্রমাণ করে না। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে ,যে ইসলাম জাভায় প্রচলিত তা ইরান হতে পশ্চিম ভারতে ও পরবর্তীতে সুমাত্রা হয়ে জাভায় পৌঁছায়। উপরোক্ত বিষয়টি প্রমাণের জন্য একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। শিয়ারা দশই মুহররম হুসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর শাহাদাত উপলক্ষে শোকানুষ্ঠান পালন করে। এই দিন ইন্দোনেশিয়ায় বিশেষ একটি খাদ্য তৈরি করা হয় যার নাম বুবুদসুরা । সম্ভবত এটি ইরানীদের দাহুমে মাহে মুহররম শব্দের প্রতিশব্দ। জাভাতেও মুহররমকে সুরা বলা হয়। সুমাত্রার উত্তরাঞ্চলের আতজাহ তে শিয়াদের ব্যাপক প্রভাব লক্ষণীয়। ঐ অঞ্চলে মুহররম মাসকে মাহে হাসান-হুসাইন বলা হয়।

ইরানীদের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামের প্রভাব প্রমাণের জন্য আরেকটি বিষয় হলো সঠিকভাবে কোরআন শিক্ষাদানের জন্য আরবী পরিভাষা ব্যবহার না করে ইরানী পরিভাষায় আরবী বর্ণমালার উচ্চারণ-পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। অধ্যয়নের মাধ্যমে এরূপ অন্যান্য প্রমাণও হাতে পাওয়া যাবে।

ইন্দোনেশিয়ার সুরাবাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রফেসর ইসমাইল ইয়াকুবের সঙ্গে ফার্সী 1349 সালের (1971 খ্রি.) ফারভারদিন (মার্চ) মাসে অনুষ্ঠিত শেখ তুসীর সহস্র বর্ষ পালন অনুষ্ঠানে দেখা করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তিনি ঐ সেমিনারে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ: ইরানী মনীষীদের অবদান ও বিশ্বের জ্ঞানগত উত্তরাধিকার শিরোনামে যে প্রবন্ধ পাঠ করেন তাতে বলেন , নবীজীর হাদীসে যে পারস্যের কথা আছে ,বর্তমানে তা ইরান নামে পরিচিত। ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের নিকট এটি প্রসিদ্ধ। কারণ আমরা জানি ইসলাম ধর্ম যে বিদেশী প্রচারকদের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ায় গিয়েছিল ইরানীরা তাদের অন্যতম। ইরানী ধর্ম প্রচারকগণ ইন্দোনেশিয়ায় হিজরত করে এর সমগ্র ভূখণ্ডে ইসলাম প্রচার করেন। এর ফলেই আজ ইন্দোনেশিয়ার এগারো কোটি মানুষের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা নব্বই ভাগ।

ভারত ও পাকিস্তানেও ইসলামের প্রচার-প্রসারে ইরানীদের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। এ বিষয়ে আজিজুল্লাহ্ আত্তারাদীর ইরানীদের ইসলামী কর্মকাণ্ড শীর্ষক প্রবন্ধ হতে আমরা উল্লেখ করেছি। সেখান হতে ভারত ও পাকিস্তানে ইসলামের প্রচারে ইরানীদের ভূমিকা ও প্রভাব সম্পর্কে জানা যাবে। ভারত ও পাকিস্তানে ইরানী ও অ-ইরানী বিভিন্ন সুফীর মাধ্যমে ইসলাম প্রভাব বিস্তার করে।

পাকিস্তানের সিন্ধের হায়দারাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান মাযহার উদ্দীন সিদ্দীকী ভারত ও পাকিস্তানে ইসলামী সংস্কৃতি শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন ,

আরবগণ ইসলামের আবির্ভাবের বহু পূর্ব হতেই দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখত। নবী (সা.)-এর অবির্ভাবের পর তাদের বাণিজ্য অব্যাহত থাকে ,কিন্তু তখন ব্যবসায়ের সঙ্গে ইসলামের প্রচারও যুক্ত হয়। পঞ্চাশ হিজরী হতে প্রথম হিজরী শতাব্দীর শেষলগ্ন পর্যন্ত ভারতবর্ষে ধর্মীয় উত্তেজনা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগকে নওমুসলিম আরবরা সুবর্ণ সুযোগ মনে করে ভারতবর্ষে হিজরত করে এবং মালাবার তীরবর্তী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ইসলাম ধর্মের সহজ সাবলীলতা ও স্পষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসসমূহ হিন্দুদের মনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই অর্থাৎ প্রথম পঁচিশ বছরেই তাদের (মালাবার অঞ্চলের) অনেকেই ,এমনকি মালাবারের সুলতানও এ নতুন ধর্ম গ্রহণ করেন । যদিও আরবগণ ভারতবর্ষে সমুদ্রপথেই বাণিজ্য করত ,কিন্তু ইসলাম ধর্ম ভারতবর্ষে ইরান ও মধ্য এশিয়া হতে স্থলপথেই অধিকতর প্রসার লাভ করে।

তিনি আরো বর্ণনা করেছেন ,

ধর্মীয় আলেমদের চেয়ে সুফীরা অধিকতর প্রিয় ছিলেন। কারণ তাঁরা রাজনীতি হতে দূরে থাকতেন ,যদিও কখনও কখনও সুলতান ও বাদশাদের কিছু কাজে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়াতেন। দিল্লীর শাসনকর্তারা প্রায় সকলেই এই সুফী বা পীরদের মুরীদ অথবা ভক্ত ছিলেন। সালার মাসউদ গাজী ও শেখ ইসমাঈল নামের দু জন প্রসিদ্ধ সুফী-সাধক পঞ্চম হিজরী শতাব্দীতে ভারতবর্ষে আসেন। তখন সেখানে হিন্দু শাসন থাকা সত্ত্বেও তাঁরা কয়েক সহস্র হিন্দুকে মুসলমান করতে সক্ষম হন। অন্যতম প্রসিদ্ধ সুফী খাজা মুঈনউদ্দীন যিনি সামারকান্দে জন্মগ্রহণ করেন ;তিনি ঘুরী বংশের শাসন প্রতিষ্ঠার কিছু পূর্বে ভারতবর্ষে চিশতীয়া তরীকার ভিত্তি স্থাপন করেন। এই তরীকা ভারত ও পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ সুফী তরীকা।

ভারতের আজমীরে তাঁর মাজারটি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের যিয়ারতে মুখরিত হয়। চিশতিয়া তরীকার কিছু দিন পর ভারতে সোহরাওয়ার্দী তরীকার জন্ম হয়। এই তরীকার ধর্মীয় নির্দেশের অনেক বিষয়েই চিশতীয়া তরীকার সঙ্গে পার্থক্য ছিল। কারণ সোহরাওয়ার্দী চিশতীয়া ও অন্যান্য তরীকায় প্রচলিত বিশেষ ধরনের সামা ও রাকসের (নাচ-গান) বিরোধী ছিলেন। মোগলদের ভারত আগমনের পূর্বে আরো দু টি তরীকা যথাক্রমে কাদেরিয়া ও নাকশেবন্দিয়া ভারতবর্ষে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পায়।

এই সুফিগণের অধিকাংশই ইরানী ছিলেন। মুঈনউদ্দীন চিশতী নামক যে ইরানী সুফী-সাধক ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন তাঁর সম্পর্কে আজিজুল্লাহ্ আত্তারাদী এ গ্রন্থের জন্য বিশেষভাবে যে গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন তা হতে হুবহু এখানে তুলে ধরছি। তিনি এই প্রবন্ধে অপর এক ইরানী সুফী-সাধক নিজামউদ্দীন আউলিয়া যিনি অন্যতম প্রসিদ্ধ ইসলাম প্রচারক হিসেবে ভারতবর্ষে ছিলেন তাঁর সম্পর্কেও বর্ণনা দিয়েছেন। আমরা তাঁর বর্ণনাটি নিম্নে তুলে ধরছি :

খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতী হারভী ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীতে সিস্তানে224 জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি জ্ঞান শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীতে হেরাতের225 চাশতে হিজরত করে সাধানায় লিপ্ত হন এবং চিশতী হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। পরে তিনি চাশত হতে তুসে যান এবং তুসের তাবেরানে খোরাসানের প্রসিদ্ধ সুফী খাজা উসমান হারুনীর খানকায় ওঠেন। চিশতী খাজা উসমানের নিকট আধ্যাত্মিক চর্চার পূর্ণতার প্রশিক্ষণ নেন এবং খাজা উসমানের বিশেষ প্রতিনিধি বা খলীফার পদ লাভ করেন।

খাজা মুঈনউদ্দীন অতঃপর বাগদাদে যান। বাগদাদ তখন ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র ছিল। সেখানেও তিনি বিশিষ্ট সুফীদের নিকট জ্ঞান শিক্ষা করেন এবং কিছুদিন সেখানে ধর্মীয় পাঠদানও করেন। অনেকেই তাঁর নিকট আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর তিনি কিছুদিন মক্কা ,মদীনা ,মিশর ও সিরিয়ায় ভ্রমণ করেন এবং ঐ স্থানসমূহের অনেকেই তাঁর নিকট হতে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতার শিক্ষাগ্রহণ করেন।

সপ্তম হিজরী শতাব্দীতে হেরাতের পূর্বাঞ্চলের পর্বতময় ফিরুযকুহ অঞ্চলের শাসক মুহাম্মদ ঘুরী ভারতবর্ষে অভিযান চালান। তিনি লাহোরের গজনভী শাসকদের পতন ঘটিয়ে পাঞ্জাব অধিকার করেন ও দিল্লীর দিকে যাত্রা করেন এবং কিছু দিনের মধ্যে দিল্লী তাঁর অধীনে চলে আসে। তিনি দিল্লীকে রাজধানী ঘোষণা করেন। ঘুর বংশ কর্তৃক পাঞ্জাব অধিকৃত হওয়ার পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আলেম ও মুসলিম মনীষী পাঞ্জাব ও রাজস্তানে হিজরত করে দীনী প্রচার কাজ শুরু করেন। খাজা মুঈনউদ্দীনও ঘুরী বংশের ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ভারতে হিজরত করে

রাজস্তানের আজমীরে বসতি স্থাপন করেন। তিনি আজমীরে মসজিদ ও দীনী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলামের মৌলনীতি ও বিধিবিধান শিক্ষাদান শুরু করেন।

তিনি ভারতীয়দের মানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল ও উপযোগী তাসাউফ (সুফী) চিন্তার আলোকে ইসলাম শিক্ষাদান করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ফলে নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সকল অঞ্চল হতে মানুষ দলে দলে তাঁর পাশে ভীড় জমাতে শুরু করল ও তাঁর নিকট হতে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করতে লাগল।

ভারতের মুসলিম শাসকরা তাঁর প্রতি বিশেষ সম্মান দেখাতেন। ফলে সবদিক হতেই তিনি সহযোগিতা পেতে শুরু করলেন। তাঁর শিক্ষায় লক্ষ লক্ষ হিন্দু ইসলাম ধর্ম ও তাওহীদের পথে পা বাড়াল। তাঁর প্রচারেই উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ইসলাম প্রসার লাভ করে। তিনি প্রচুর মুরীদ তৈরি করেন। তাঁর প্রশিক্ষিত অনেক ছাত্রই ভারতে ইসলাম প্রচারে মূল্যবান অবদান রাখেন। ফরিদউদ্দীন গাঞ্জে শেকার এবং কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী তাঁর স্বনামধন্য দু ছাত্র যাঁরা ইসলামের প্রাণবন্ত উৎসে পরিণত হয়েছিলেন।

খাজা মুঈনউদ্দীন তাঁর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে আজমীরেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর মুসলমানগণ তাঁর কবরের ওপর জাঁকজমকপূর্ণ যে গম্ভুজ তৈরি করে তা আট শতাব্দী পরও বিদ্যমান। তাঁর মাযার ভারতীয় মুসলমানদের সর্ববৃহৎ যিয়ারতের স্থান। নাসিরুদ্দীন খিলজী থেকে হায়দারাবাদের নিজামগণ সকলেই এ মাযারে স্মরণীয় হিসেবে কিছু রেখেছেন। তাঁর মাযারে ও কবরের দেয়াল ও বিভিন্ন স্থানে তৎকালীন ভারতের রাজকীয় ভাষা হিসেবে প্রচুর ফার্সী কবিতা লিখিত রয়েছে। সম্মানিত পাঠকদের জন্য তার একটি এখানে তুলে ধরছি :

খাজাগণের নেতা মুঈনউদ্দীন

অলিকুলের শিরোমণি শ্রেষ্ঠ পীর।

তাঁর পূর্ণতা ও সৌন্দর্য বর্ণনাহীন

তিনি ছিলেন দীনের সুরক্ষিত দুর্গ শির

তাঁর গুণের প্রশংসায় বলছি দু টি ছত্র

তাঁর কথা ছিল যেন মূল্যবান রত্ন।

ওহে! যার গৃহ ছিল বিশ্বাসীদের কেবলা

ওহে! যার পদে ঠেকাত ললাট চন্দ্র ,সূর্য

লক্ষ কোটি বাদশার যেথায় আনাগোনা সর্বদা

চীনের বাদশাও তাঁর নিকট করেন নত মাথা

তোমার সেবকেরা সকলে জান্নাত অধিবাসী

তোমার বেহেশেতের বাগানে হয়েছে তারা চিরস্থায়ী

তোমার সমাধির মাটির সুবাস প্রাণহারা

সেথা হতে বয়ে চলেছে সুপেয় পানির ঝরনা-ধারা।

ভারতের তৈমুর বংশের শাসকগণ (মোগলগণ) খাজা মুঈনউদ্দীনের প্রতি অত্যন্ত অনুরাগ পোষণ করতেন। সম্রাট জালাল উদ্দীন আকবর তাঁর রাজধানী আগ্রা হতে একবার পায়ে হেঁটে আজমীরে মুঈনউদ্দীন চিশতীর মাজার যিয়ারত করেন। ভারতবর্ষের শিয়া-সুন্নী সকল মুসলমানই তাঁর প্রতি অনুরক্ত। প্রতি বছর এই মহান সুফীর স্মরণে রজব মাসে বৃহৎ সভার আয়োজন করা হয় এবং সমগ্র ভারত হতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজমীরে ভীড় জমায়। তারা ইসলামের সেবায় তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে। তাযকিরাহ সমূহে তাঁর জীবনী ও কর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে।

নিযামউদ্দীন আউলিয়া

মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ নিযামউদ্দীন আউলিয়া ভারতেই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জন্মভূমি বোখারা হতে ভারতবর্ষে হিজরত করেছিলেন। কিছুদিন তিনি লাহোরে বসবাসের পর বাদাউনে যান ও বসতি স্থাপন করেন। নিযামউদ্দীন সেখানেই জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ বছর বয়সে তাঁর পিতার মৃত্যু হলে মাতাই তাঁকে লালন-পালন করেন। তাঁর মাতা একজন আল্লাহ্প্রেমিক তাকওয়াসম্পন্না পবিত্র মহিলা ছিলেন। তিনি সন্তানকে প্রতিপালনে যথেষ্ট চেষ্টা করেন। নিযামউদ্দীন বাদাউনেই তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করেন। অতঃপর মাতার সঙ্গে দিল্লী যান। সেখানে শামসুদ্দীন দামগানী ,আলাউদ্দীন উসূলী এবং ফরিদউদ্দীন মাসউদ গাঞ্জে শেকারের নিকট শিক্ষা জীবনের পূর্ণতা লাভ করেন। তিনি ফরিদউদ্দীন মাসউদের খলীফা ও প্রতিনিধিত্বের সৌভাগ্য লাভ করেন।

নিযামউদ্দীন প্রথম দিকে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিন অতিবাহিত করলেও কারো নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করতেন না। কিছুদিনের মধ্যে তাঁর সুনাম সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ল। মুসলিম শাসক ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা তাঁর শরণাপন্ন হতে শুরু করলেন। সম্রাট জালালউদ্দীন খিলজী তাঁর সাক্ষাৎ লাভে উদগ্রীব ছিলেন। সে সময়ের প্রসিদ্ধ কবি আমির খসরু দেহলভী সামারকান্দী তাঁর মুরীদ ছিলেন এবং তাঁর প্রশংসায় কবিতা লিখেছেন ।

নিযামউদ্দীন ইসলামী জ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে অনেক প্রচেষ্টা চালান। তাঁর ছাত্ররা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে দীনী প্রচার চালান। তাঁর অন্যতম ছাত্র খাজা নাসিরুদ্দীন পাঞ্জাব ,গুজরাট ও অন্ধপ্রদেশে দীনী শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক ও ম্মরণীয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর অপর ছাত্র সিরাজুদ্দীন বাংলা ,বিহার ও আসামে দীনী প্রচার কার্য চালান। তাঁর অন্যতম ছাত্র বুরহানউদ্দীন দক্ষিণাত্য ও মধ্য প্রদেশে ইসলাম প্রচার করেন। মোটামুটি বলা যায় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের প্রসার তাঁর বিশেষ দৃষ্টি ,তাঁর ছাত্র ও প্রতিনিধিদের প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিল। তিনি 725 হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাযার দিল্লীতেই এবং প্রতি বছর তাঁর স্মরণে সেখানে ধর্মীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সহস্র মুসলমান তাঁর মাযারে সমবেত হয়ে তাঁর কর্মময় জীবন সম্পর্কে বক্তব্য শুনেন।

খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতী ও নিযামউদ্দীন আউলিয়ার জীবনী ঐতিহাসিক ফিরিশতা ও শাহ আসতারাবাদীর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে।226

ইরানের মুসলমানগণ ভারতে ইসলাম প্রচারে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। ইরানে ইসলামের আবির্ভাবের সময়কালের ঠিক বিপরীত অবস্থা তখন ভারতে সৃষ্টি হয়। কারণ আমরা দ্বিতীয়াংশের আলোচনায় উল্লেখ করেছি ভারতে উদ্ভূত বৌদ্ধ ধর্ম ইসলামের আবির্ভাবের প্রাক্কালে ভারতের উত্তর দিকে প্রসারমান ছিল এবং ইরানের পূর্বাংশেও প্রভাব বিস্তার শুরু করে। যদি ইসলামের আবির্ভাব না ঘটত তাহলে ভারত হতে আগত বৌদ্ধ ধর্ম ইরানে অধিকতর প্রভাব বিস্তার করত। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পর ধমনীতে সজীব রক্ত প্রবাহের ফলে ইরানীরা নতুন জীবন লাভ করে ,পরিস্থিতি পাল্টে যায় ;ইরান তখন ভারতবর্ষকে নিজ ধর্মে প্রভাবিত করতে শুরু করে ও বৌদ্ধ ধর্মকে ভারত হতে বিতাড়িত করে।

ইসলামই ফার্সীকে ভারতবর্ষে নিয়ে যায়। তাই এই ভাষা ভারতবর্ষে প্রচলন লাভের জন্য ইসলামের নিকট ঋণী। ভারতের ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময় এ ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা ছিল। ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচলিত হওয়ার সময় হতেই এই ভাষা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারী ভাষা ছিল।

এ শতাব্দীতে পাকিস্তানী কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের ন্যায় অনেকেই ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভারতবর্ষে ফার্সী ভাষাকে শক্তিশালী করেছেন। যে সকল ইরানী জাতীয়তাবাদের মিথ্যা অথবা সত্য দাবিতে ইসলামকে বাদ দিয়ে ফার্সী ভাষাকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে প্রচার করতে চাইছেন তাঁরা এক অসম্ভব চিন্তা করছেন। তাঁরা কখনই সফল হতে পারবেন না।