ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 65883
ডাউনলোড: 2756

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 65883 / ডাউনলোড: 2756
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

হাদীসশাস্ত্র

ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ইরানীদের অবদানের অন্যতম ক্ষেত্র হলো হাদীসশাস্ত্র অর্থাৎ রাসূল (সা.) ও পবিত্র ইমামগণের মূল্যবান বাণী শ্রবণ ,লিখন ,মুখস্থকরণ ও সংকলনশাস্ত্র।

তাফসীরের ন্যায় হাদীসশাস্ত্রকেও শিয়া ও সুন্নী এ দু শাখায় বিভক্ত করা যায়। হাদীস শিক্ষা ,বর্ণনা ও সংকলনের ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য প্রধান প্রেরণাদায়ক উপাদান ছিল প্রথমত ধর্মীয় বিষয়ে মুসলমানদের হাদীসের প্রতি মুখাপেক্ষিতা ;দ্বিতীয়ত সুন্নী ও শিয়া উভয় সূত্রে হাদীস লিখন ও সংকলনে রাসূলের পুনঃপুন তাকিদ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বর্ণনায় উদ্বুদ্ধকরণ। এ কারণেই ইসলামের প্রথম যুগ হতেই মুসলমানদের মধ্যে হাদীস সংকলন ও বর্ণনার প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। অন্যান্য জাতির মধ্যে ইসলামের প্রসার ঘটার পর সাহাবীরা তাদের কাছে রাসূলের নিকট হতে সরাসরি হাদীস শ্রবণকারী হিসেবে বেশ গুরুত্ব পান। আগ্রহী মুসলমানগণ সাহাবী বা তাবেয়ীদের নিকট হতে হাদীস শ্রবণের আকাঙ্ক্ষায় এক শহর হতে অন্য শহর বা অঞ্চলে সফর করতেন। কখনও কখনও একটি হাদীসের বিশ্বস্ততা যাচাই বা একজন নির্ভরযোগ্য রাবী হতে হাদীস শ্রবণের উদ্দেশ্যে তারা শত শত মাইল পথ অতিক্রম করে নির্দিষ্ট মুহাদ্দিসের নিকট পৌঁছতেন ও তাঁর নিকট হতে শ্রবণ করে লিখে নিতেন।

জর্জি যাইদান বলেছেন ,

মুসলমানরা কোরআনের অর্থ অনুধাবনের জন্য রাসূলের হাদীসের মুখাপেক্ষিতা অনুভব করল। এতে করে কোরআনকে অধিকতর ভালভাবে বোঝা সম্ভব হতো । অবশ্য নবীর হাদীসসমূহ সাহাবীদের নিকট হতে শুনত ,কারণ সাহাবীরা নবীর নিকট হতে হাদীস সরাসরি শুনে মুখস্থ করতেন। তাই মুসলমানরা হাদীস বুঝার জন্য সাহাবীদের শরণাপন্ন হতো। মুসলমানরা তাদের ভূমির সম্প্রসারণে রত হলে মুহাজিরদের প্রধান হিসেবে সাহাবীরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। এ কারণেই যে কেউ হাদীস শ্রবণের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে দেশের পর দেশ অতিক্রম করে বিশেষ সাহাবীর নিকট পৌঁছত। কোন কোন ক্ষেত্রে একটি হাদীস শুধু একজন সাহাবীর নিকটই শোনা যেত এবং অন্যরা তা জানতেন না। তাই যদি কেউ হাদীস শিক্ষা লাভ করতে চাইতেন তাহলে বাধ্য হয়ে মক্কা ,মদীনা ,কুফা ,বসরা ,রেই বা অন্য কোন শহরে যেতেন এবং যেখান থেকেই হোক তা শিক্ষা নিতেন। জ্ঞানান্বেষণে সফর হলো এটি যা মুসলমানরা পালন করত। 263

নবীর হাদীসসমূহ শ্রবণ ,বর্ণনা ও সংকলনের প্রতি মুসলমানদের আগ্রহ স্বয়ং রাসূলের জীবদ্দশায়ই সৃষ্টি হয়। বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে যেমন নকল পণ্যে বাজার ছেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তেমনি তাঁর উপস্থিতির যুগেই দুর্বল ঈমানের কিছু লোক তাঁর নামে হাদীস বর্ণনা করা শুরু করে। তাই তিনি নিজেই তা খণ্ডনের জিহাদে অবতীর্ণ হন এবং স্বতন্ত্র এক খুতবায় মিথ্যাবাদীদের উৎপত্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দেন ও হাদীসকে যাচাইয়ের জন্য মৌলিক মানদণ্ড পেশ করেন। তিনি তাঁর প্রতি আরোপিত হাদীসকে কোরআনের সঙ্গে তুলনা (কোরআনের মানদণ্ডে যাচাইয়ের) করে বিশুদ্ধতা যাচাই করতে নির্দেশ দেন। হাদীস শ্রবণ ,লিপিবদ্ধকরণ ও বর্ণনার বিষয়টি সুন্নী ও শিয়া উভয়ের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও প্রথম হিজরী শতাব্দীতে এ ক্ষেত্রে সুন্নী ও শিয়াদের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান ছিল। পার্থক্যটি হলো আহলে সুন্নাত দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ও কোন কোন সাহাবীর মতের অনুসরণে এ শতাব্দীতে হাদীস লিখনকে মাকরুহ মনে করতেন এ কারণে যে ,হাদীস কোরআনের সঙ্গে মিশে যেতে পারে ও কোরআনের গুরুত্ব কমে হাদীসের গুরুত্ব বাড়ার সম্ভবনা রয়েছে। এর বিপরীতে নবীর আহলে বাইতের অনুসারীরা প্রথম হতেই হাদীস শ্রবণ ,লিখন ও বর্ণনার বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন এবং তা সংকলন ও সংরক্ষণের বিষয়ে খুবই সচেতন ছিলেন।

আহলে সুন্নাত প্রথম হিজরী শতাব্দীর শেষ বছরে এই ভুলের বিষয়ে সচেতন হয় ও উমাইয়্যা খলীফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ যিনি মাতৃকুলের দিক হতে খলীফা হযরত উমরের বংশধর এবং একজন দুনিয়াত্যাগী ব্যক্তি হিসেবে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব তিনি এ ভুলের অপনোদন ঘটান। তাই শিয়ারা আহলে সুন্নাত হতে হাদীস সংকলনে একশ বছর এগিয়ে ছিল।

বিশিষ্ট গবেষক ,পণ্ডিত ও আলেম আল্লামা সাইয়্যেদ হাসান সাদর তাঁর তাসিসুশ শিয়া নামক মূল্যবান গ্রন্থে সহীহ মুসলিম ও ইবনে হাজারের ফাতহুল বারী হতে বর্ণনা করেছেন ,

সাহাবীরা হাদীস লিখনের ক্ষেত্রে মতদ্বৈততা পোষণ করতেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব ,আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ ,আবু সাঈদ খুদরী এবং আরো কয়েকজন সাহাবী হাদীস লিখনকে মাকরুহ মনে করতেন। কিন্তু হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) ,আনাস ইবনে মালেক ও অনেকেই ভিন্ন মত পোষণ করতেন। এ কারণেই হযরত আলীর অনুসারীরা ইসলামের প্রথম যুগ হতেই হাদীস লিপিবদ্ধকরণ শুরু করেন। অনেকেই হযরত উমরের অনুসরণে তা হতে বিরত থাকেন। প্রায় একশ বছর এ অবস্থা অব্যাহত থাকার পর দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রথম বছর হাদীস সংকলনে ইজমা স্থাপিত হয়। 264

শিয়াদের প্রথম হাদীস গ্রন্থটি হযরত আলীর হাতে লিখিত যা নবীর আহলে বাইতের ইমামদের নিকট বিদ্যমান ছিল এবং তাঁরা কখনও কখনও তা অন্যদের দেখিয়েছেন বা তা হতে বর্ণনা দিয়ে বলেছেন ,হযরত আলীর লিখিত গ্রন্থে এমনটি বলা হয়েছে। দ্বিতীয় হাদীস গ্রন্থটি মুসহাফে ফাতিমা (আ.) নামে প্রসিদ্ধ।

এ দু গ্রন্থ বাদ দিলে প্রথম হাদীস গ্রন্থ রাসূলের আযাদকৃত দাস আবু রাফের লিখিত এবং এতে ধর্মীয় বিধিবিধান ও বিচার বিষয়ক বিভিন্ন হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আবু রাফে একজন মিশরীয় (কিবতী) দাস যাঁকে রাসূল মুক্ত করে দেন। তাঁর দু পুত্র উবাইদুল্লাহ্ ও আলী ,হযরত আলীর উত্তম অনুসারী ছিলেন। বিভিন্ন গ্রন্থে উবাইদুল্লাহ্ ইবনে আবি রাফের নাম হযরত আলীর লিপিকার অথবা বায়তুল মালের রক্ষক হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে। শিয়া আলেমদের মধ্যে নাজ্জাশী তাঁর আল ফেহেরেস্ত গ্রন্থে তাঁকে প্রথম শিয়া লেখক বলেছেন।265

আবু রাফের পর হযরত সালমান ফারসী শিয়া হাদীস লেখক হিসেবে প্রসিদ্ধ। রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর একজন রোমীয় পাদ্রী মদীনায় অনুসন্ধানের জন্য আসলে হযরত সালমান তাঁকে নবীর কিছু হাদীস ব্যাখ্যা করে শোনান। এটি তিনি তাঁর লিখিত সংকলন গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

হযরত সালমানের পর হযরত আবু যার গিফারী ,আসবাগ ইবনে নাবাতা ও অন্যান্যদের নাম আসে। হযরত আলীর সাহাবীদের মধ্যে সালিম ইবনে কাইস হাদীস গ্রন্থ রচনা করেন যা সম্প্রতি ছাপানো হয়েছে।

এর পরবর্তী স্তরের শিয়াদের নিকট হতে যে গ্রন্থটি এখনও বিদ্যমান তা হলো সহীফায়ে সাজ্জাদিয়া । এটি ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর দোয়ার সংকলন। ইমাম সাজ্জাদ প্রথম হিজরী শতাব্দীর শেষ দশকে ইন্তেকাল করেন। তাঁর এ দোয়ার গ্রন্থটি মুহাম্মদ (সা.)-এর আহলে বাইতের যাবুর নামে অভিহিত। দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর শেষার্ধে এটি সংকলিত হয়। ইতোপূর্বে তা শুধু পঠিত ও বর্ণিত হতো।

দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রথমার্ধে অর্থাৎ ইমাম বাকির ও ইমাম সাদিক (আ.)-এর সময়কালে শিয়াগণ মোটামুটি স্বাধীন ছিল এবং এ সময়কাল হাদীস লিখন ,বর্ণনা ও সংকলনের সুবর্ণ যুগ ছিল। ইমাম সাদিকের নিকট চার হাজার ব্যক্তি শিক্ষা লাভ করতেন বলে উল্লিখিত হয়েছে। ইমাম সাদিক ও ইমাম কাযিম (আ.)-এর শিষ্যগণ চারশ হাদীস গ্রন্থ সংকলন করেছিলেন যা উসূলে আরবায়া মিয়াতা নামে প্রসিদ্ধ। এ গ্রন্থগুলোর রচয়িতাগণ বিভিন্ন জাতির।

তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর শেষ ও চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর প্রথমদিকে জাওয়ামে হাদীস গ্রন্থ রচনা ও সংকলন শুরু হয়। বর্তমানে সুন্নী ও শিয়াদের মাঝে প্রচলিত হাদীস গ্রন্থসমূহ জাওয়ামে হাদীস266 এ সময়েই ইরানীরা ইসলামের প্রতি তাদের অবদান ও নিজ যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখে।

বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যমান ইরানী হাদীসশাস্ত্রবিদগণের নাম এখানে উল্লেখ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এ জন্য কয়েক খণ্ড বই রচনার প্রয়োজন। এখানে আমরা শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য কিছু সংখ্যক হাদীস গ্রন্থের নাম উল্লেখ করব যা হতে স্পষ্ট হবে ,সুন্নী ও শিয়া জাওয়ামে হাদীস লেখকগণের অধিকাংশই ইরানী ছিলেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে শিয়া জাওয়ামে হাদীস গ্রন্থ দিয়ে শুরু করছি।

1. আল কাফি: এ হাদীস গ্রন্থটি সিকাতুল ইসলাম শাইখুল মুহাদ্দিসীন আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব কুলাইনী রাযী রচিত। এ বিখ্যাত ব্যক্তি তেহরানের নিকটবর্তী রেই শহরের পাশ্ববর্তী কুলাইনের অধিবাসী। তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য শিয়া মুহাদ্দিস ছিলেন। তাঁর পিতা ইয়াকুব ও মামা আ লান কুলাইনে বসবাস করতেন (ও মুহাদ্দিস হিসেবে পরিচিত ছিলেন)।

তাই তিনি শিশুকাল হতেই হাদীসের সঙ্গে পরিচিত হন ও হাদীস শিক্ষা শুরু করেন। অতঃপর তিনি রেই শহরে যান। কুলাইনী সেই সকল ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত যাঁরা হাদীস শিক্ষার জন্য প্রচুর সফর করেছেন। তিনি হাদীসের অর্থ অনুধাবন ,হাদীস সংকলন ও প্রসিদ্ধ হাদীসবিদদের নিকট শিক্ষা লাভের জন্য সফর করেন। তিনি তাঁর জীবনের শেষ বিশ বছর বাগদাদে কাটান ও সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। এ সময়েই তিনি আল কাফি গ্রন্থটি সংকলন করেন।

আল কাফি শিয়াদের একটি সামগ্রিক হাদীস গ্রন্থ যাতে মৌল বিশ্বাস সম্পর্কিত আলোচনা হতে চরিত্র ও ধর্মীয় বিধানগত বিষয়সমূহও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ গ্রন্থে ষোল হাজার হাদীস সংকলিত হয়েছে এবং এটি শিয়াদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ। কুলাইনী 329 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. মান লা ইয়াহদারুহুল ফাকীহ্: এটি রাইসুল মুহাদ্দিসিন আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে বাবভেই কুমী কর্তৃক সংকলিত। তিনি শেখ সাদুক নামে প্রসিদ্ধ এবং তাঁর পিতা শিয়াদের প্রথম সারির আলেমদের অন্যতম। শেখ সাদুকের পরিবার শিয়াদের মধ্যে প্রসিদ্ধ পরিবার। সাদুক তিনশ গ্রন্থ রচনা ও সংকলন করেছেন। তিনি তাঁর গ্রন্থের নাম মান লা ইয়াহদারুহুল ফাকীহ্ (অর্থাৎ যার নিকট ফকীহ্ উপস্থিত নেই বা নিজে নিজে ফিকাহ্ শিক্ষা) মুহাম্মদ ইবনে যাকারিয়া রাযীর মান লা ইয়াহদারুত তাবিব (যার নিকট চিকিৎসক উপস্থিত নেই বা নিজে নিজে চিকিৎসা) গ্রন্থ হতে নিয়েছেন। তাঁর এ হাদীস গ্রন্থে পাঁচ হাজার নয়শ বিশটি হাদীস রয়েছে।

শেখ সাদুক হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের জন্য সফর করেছেন। যৌবনকালে বাগদাদে যান। সেখানে অনেক বড় বড় হাদীসবেত্তাও তাঁর নিকট থেকে উপকৃত হন এবং তাঁরা তাঁকে বিশেষ সম্মান দিতেন। শেখ সাদুক বিশিষ্ট রেজালশাস্ত্রবিদের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে খোরাসানের বিভিন্ন শহরে ,যেমন নিশাবুর ,তুস ,সারাখশ ,মারভ ,বুখারা ,ফারগানেহ প্রভৃতি স্থানে যান। তিনি তাঁর মান লা ইয়াহদারুহুল ফাকীহ্ গ্রন্থের ভূমিকায় এ সফর সম্পর্কে বলেছেন।

শেখ সাদুক 381 হিজরীতে মারা যান। রেই শহরে হযরত শাহ আবদুল আযিম (রহ.)-এর কবরের নিকটবর্তী স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। স্থানটি এখন তাঁর নামেই প্রসিদ্ধ।

3. তাহযীবুল আহকাম: শাইখুত তায়িফা আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে হাসান আত তুসী এ গ্রন্থটি সংকলন করেছেন। আমরা ইতোপূর্বে মুফাসসিরদের নামের তালিকায় এ বিরল প্রতিভাধরের বিষয়ে বলেছি। শেখ তুসী ইসলামী জ্ঞানের অধিকাংশ শাখায় ,যেমন সাহিত্য ,ব্যাকরণ ,কালামশাস্ত্র ,তাফসীর ,ফিকাহ্ ,হাদীস ও রিজালশাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন এবং প্রথম সারির ব্যক্তিত্বদের মধ্যে পরিগণিত হতেন। তিনি মাবসুত নামক ফিকাহ্ গ্রন্থটি রচনা করে ফিকাহ্শাস্ত্রকে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করিয়েছেন। শেখ তুসী তাওযীবুল আহকাম -এ ধর্মীয় বিধিবিধান (আহকাম) সম্পর্কিত তের হাজার পাঁচশ নব্বইটি হাদীস সংকলন করেছেন।

4. ইসতিবসার: এটিও শাইখুত তায়িফা আবু জাফর তুসীর রচিত। এ গ্রন্থে পাঁচ হাজার পনরটি হাদীস রয়েছে। শেখ তুসী 460 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

উপরোক্ত চারটি গ্রন্থ শিয়াদের নিকট কুতুবে আরবায়া নামে সুপরিচিত এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ বলে গৃহীত। এ গ্রন্থসমূহের তিনজন রচয়িতার নামই মুহাম্মদ এবং তাঁদের ডাক নাম ছিল আবু জাফর। তাঁরা মুহাম্মাদিন সালাসা মুতাকাদ্দিম নামে প্রসিদ্ধ।

উপরোক্ত চারটি ছাড়াই অপর তিনটি জামে হাদীস গ্রন্থ শিয়াদের মধ্যে প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ। তা হলো :

1. বিহারুল আনওয়ার: এটি শাইখুল ইসলাম আল্লামাতুল মুহাদ্দিসীন মুহাম্মদ বাকের ইবনে মুহাম্মদ তাকী মাজলিসী রচিত। এটি সর্ববৃহৎ ,সামগ্রিক (বিষয়ভিত্তিতে) ও পূর্ণতম হাদীস গ্রন্থ। অন্যান্য হাদীস গ্রন্থের বিচ্ছিন্ন হাদীসসমূহকে এ গ্রন্থে সমন্বিত করা হয়েছে। এ হাদীস গ্রন্থটির রচনার পেছনে লেখকের মূল উদ্দেশ্যে ছিল যেন হাদীসসমূহ বিলুপ্ত না হয়। এ জন্য তিনি সহীহ ও ত্রুটিযুক্ত সকল হাদীসই এতে এনেছেন। আল্লামা মাজলিসী 1111 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. ওয়াফী: এটি প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ,আরেফ ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইবনে মুরতাজা ফাইয কাশানী কর্তক রচিত। এ হাদীস গ্রন্থটি প্রসিদ্ধ চার গ্রন্থের (কতুবে আরবায়া) একক সংকলন যাতে ঐ চার গ্রন্থের পুনারবৃত্তিসমূহকে বাদ দেয়া হয়েছে। মোল্লা মুহসেন ফাইয কাশানী বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় দু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি 1191 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. ওয়াসায়েলুশ শিয়া: এ গ্রন্থটি স্বনামধন্য মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনে হাসান আশশামী যিনি হুররে আমেলী নামে প্রসিদ্ধ ,রচনা করেছেন। এ গ্রন্থে ফিকাহ্গত বিষয়ের প্রতি অধিকতর লক্ষ্য রাখা হয়েছে। চেষ্টা করা হয়েছে ফিকাহর বিভিন্ন অধ্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল হাদীসসমূহ স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আনার। এজন্য প্রতিটি হাদীসকে খণ্ডিত করে উপযোগী অধ্যায়ে খণ্ডিত অংশ আনা হয়েছে। হুররে আমেলী আল্লামা মাজলিসীর সমসাময়িক। তাই তাঁরা একে অপর হতে হাদীস শ্রবণ ও বর্ণনা করেছেন। তিনি 114 হিজরীতে মাশহাদে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কবর ইমাম রেজা (আ.)-এর রও